বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল – হুমায়ূন আহমেদ

০৮. প্রিন্সিপাল হাজি এনায়েত করিমের সামনে হেদায়েত

প্রিন্সিপাল হাজি এনায়েত করিমের সামনে হেদায়েত বসে আছে। প্রিন্সিপাল সাহেব হেদায়েতকে খবর দিয়ে এনেছেন। তার ঘরের দরজা খোলা। কলেজের কিছু মেয়েকে খোলা দরজা দিয়ে উঁকিঝুকি দিতে দেখা যাচ্ছে। প্রিন্সিপাল সাহেবের সামনে প্লেটভর্তি গরম সিঙ্গাড়া। আরেক প্লেটে পেঁয়াজ-কাচামরিচ।

এনায়েত করিম সিঙ্গাড়ার প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, সিঙ্গাড়া খান।

হেদায়েত বলল, আমি সিঙ্গাড়া খাই না স্যার। সেতু পছন্দ করে খায়। আমি খাই না।

সেতু কে?

আমার স্ত্রী। ভালো নাম রুমানা। ডাক নাম সেতু।

ও আচ্ছা। আচ্ছা। কে যেন বলছিল আপনার স্ত্রী সিনেমা করেন। সত্যি -কি?

প্রথম ছবি করছে। কাজ এখনও শুরু হয় নি। ছবির নামটা খুব সুন্দর বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল।

দ্বিতীয় কদম ফুল মানে?

মানে আমি ঠিক জানি না। Script রাইটার জানেন। তার সঙ্গে দেখা হলে মানে জিজ্ঞেস করব।

আপনাকে ডেকেছি কি জন্যে বুঝতে পারছেন?

না।

আপনার বিষয়ে আমরা ডিসিসন চেঞ্জ করেছি। আপনি আবার জয়েন করুন। ম্যাথের নতুন যে টিচার নেয়া হয়েছে ছাত্রীরা কেউ তাকে পছন্দ করছে না। উনি ঠিক মতো না-কি বোঝাতে পারেন না।

 

ও আচ্ছা।

আপনি আগামীকাল থেকে ক্লাস শুরু করে দিন। একটাই শুধু শর্ত পড়াশোনার বাইরে কোনো আলাপ না। ক্লাসরুম বাড়ির বৈঠকখানা না। এটা মনে থাকলেই চলবে।

হেদায়েত বলল, আমার পক্ষে পড়ানো এখন সম্ভব না।

সম্ভব না কেন?

হেদায়েত বলল, আমার মাথা খারাপ হওয়া শুরু হয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই বেশি খারাপ হচ্ছে। এই অবস্থায় আমার পক্ষে ক্লাস নেয়া ঠিক না। কী বলতে কী বলব।

আপনার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে এটা কে বলেছে? ডাক্তার?

ডাক্তার সেইভাবে কিছু বলছে না। আমি নিজে নিজেই বের করছি।

আপনার যে মাথা খারাপ হচ্ছে তার প্রধান লক্ষণ কী?

হেদায়েত বলল, আপনার সঙ্গে আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। স্যার আমি উঠি?

চাকরি তাহলে করছেন না?

না।

বসুন আরও কিছুক্ষণ। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করুন। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন।

দুপুরে ভাইজানের সঙ্গে খাব। উনি অপেক্ষা করে থাকবেন। আজ বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবার দুপুরে সব সময় ভাইজানের সঙ্গে খাই। তিনি নানান জায়গা থেকে ভালো ভালো খাবার যোগাড় করেন। আজ আমরা খাব হরিয়াল পাখির ভুনা মাংস।

হেদায়েত উঠে দাঁড়াল।

এনায়েত করিম বললেন, ডিসিসান চেঞ্জ করলে আমাকে জানাবেন। আপনাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার আগের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। সরি ফর দ্যাট।

হেদায়েত বলল, স্যার আপনার টেলিফোন থেকে একটা টেলিফোন করে দেখি পাই কি-না।

কী পান কি-না?

দ্বিতীয়।

এনায়েত করিম অবাক হয়ে বললেন, দ্বিতীয়টা কী?

ঐ যে ছবির নামের অর্থ। দ্বিতীয় কদম ফুল।

ও আচ্ছা আচ্ছা। বাদ দিন। দরকার নাই।

হেদায়েত বলল, দরকার থাকবে না কেন? আপনার মনে একটা কৌতূহল জেগেছে। কৌতূহল মেটানো দরকার।

সব কৌতূহল মেটানো ঠিক না। আপনি চলে যাচ্ছেন যান। যদি ডিসিসান চেঞ্জ করেন আমাকে জানাবেন।

জি আচ্ছা স্যার।

এনায়েত করিম তাকিয়ে আছেন। এখন তাঁর মন কিছুটা খারাপ। অংক জানা মানুষটার মাথা মনে হয় সত্যি সত্যি খারাপ হয়েছে।

 

বেলায়েতের মেজাজ ভালো না। আজ সকাল থেকে যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে তার সঙ্গেই সে ঝগড়া করছে। তার এসিসটেন্ট পরিমল বাবুর চাকুরি চলে গেছে। তার চাকরি যাবার কারণ তিন বস্তা সিমেন্টের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিমল বাবু বললেন, স্যার আপনার কি ধারণা এই তিন বস্তা সিমেন্ট আমি চুরি করেছি?

বেলায়েত বললেন, Yes you,

স্যার আপনার এই কথার পর আমার উচিত বাসার সামনে আম গাছে ফাঁসি নেয়া।

বেলায়েত বলল, তাই নিন। Hang Mango free.

প্রচণ্ড রেগে গেলে বেলায়েত ইংরেজি বলে। ইংরেজি হচ্ছে কি না হচ্ছে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। হেদায়েত ভাইয়ের সামনে বসে আছে। টিফিন কেরিয়ারে খাবার চলে এসেছে। পরিমল বাবুর সঙ্গে হৈচৈ হচ্ছে বলে খাবার দেয়া হচ্ছে না।

বেলায়েত বলল, আপনি এখন যান। আমরা দুই ভাই খাব। খাবার সময় পারিবারিক কথাবার্তা হবে, এর মধ্যে আপনি থাকবেন না। Go street রাস্তায় যান।

পরিমল বাবু চলে গেলেন। হেদায়েত বলল, এত রাগারাগি করা ঠিক না।

বেলায়েত বলল, ঠিক না আমি জানি। সকালে পত্রিকায় ছবি দেখে রাগ উঠে গেল। ঝুম রাগ।

কী ছবি দেখে রাগ উঠল?

তোর বৌয়ের ছবি। বিনোদন পাতায় বিরাট ছবি। সে না-কি সিনেমা করবে। আমি তো কিছুই জানি না।

হঠাৎ ঠিক হয়েছে। ছবির নাম ‘বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল’।

তুই নিষেধ করলি না?

হেদায়েত অবাক হয়ে বলল, নিষেধ কেন করব? শখ করে একটা কাজ করছে। তুমি যখন শখ করে কোনো কাজ করো, আমি নিষেধ করি?

বেলায়েত বলল, তোর কথায় যুক্তি আছে। কঠিন যুক্তি। ফেলে দেবার মতো না। তবে পত্রিকায় ছবি দেয়া ভুল হয়েছে।

হেদায়েত বলল, ভুল কেন হবে? ছবি না দিলে লোকে জানবে কীভাবে? লোকে জানবে তারপর হলে গিয়ে ছবি দেখবে।

তোর এই কথারও যুক্তি আছে। তবে যে ছবিটা ছাপা হয়েছে সেটা ভালো না।

হেদায়েত বলল, ছবির আবার ভালো মন্দ কী?

বেলায়েত বিব্রত গলায় বলল, নাভি দেখা যায়। নাভিতে আবার দুল পরেছে। দুল পরবে কানে। নাভিতে দুল পরবে কেন? আল্লাহপাক তো নাভি দুল পরার জন্যে তৈরি করেন নাই। এখন বল আমার এই কথাটার যুক্তি আছে কি-না!

হেদায়েত বলল, যুক্তি নাই। নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্যে মেয়েরা নানা কর্মকাণ্ড করে। এক সময় তারা দাঁতে কালো রঙ দিত। একে বলে মিশি। চীনা মেয়েরা লোহার জুতা পরে পা ছোট করতো। আফ্রিকান মেয়েরা জিহ্বা ফুটো করে বড় বড় রিং পরতো।

বেলায়েত বিস্মিত হয়ে বলল, জিহ্বায় রিং পরে ভাত খেত কীভাবে?

হেদায়েত বলল, জানি না।

তুই একটা বিষয় জানবি না এটা কেমন কথা! জানার দরকার না?

হেদায়েত বলল, আচ্ছা জানব। জেনে তোমাকে জানাব। থালা-বাটি এইসব দিতে বলে ভাইজান। ক্ষিধে লেগেছে।

বেলায়েত বলল, ক্ষিদে লেগেছে এটা আগে বলবি না? এতক্ষণ খামাকা বকবক করছি। একটা দুঃসংবাদ আছে, হরিয়াল পাওয়া যায় নি। ঘুঘু পাওয়া গেছে। তবে ঘুঘুর টেস্টও ভালো। সফট মাংস।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই বেলায়েত চুল কাটতে বসল। সকাল থেকেই নাপিত এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ভাত খাওয়ার আগে চুল কাটলে খাবারে চুলের টুকরা চলে যেতে পারে। চুল পাকস্থলিতে গেলে বিরাট সমস্যা। যে কারণে বেলায়েত সব সময় খাবারের পরে চুল কাটে।

হেদায়েত ভাইয়ের সামনে বসে আছে। চুল কাটা দেখছে। বেলায়েত নাপিতকে বলল, মাথাটা পুরো কামায়ে দাও। ইদানীং অল্পতেই মাথা গরম হচ্ছে। মাথা কামানো থাকলে গরম কমবে। বৎসরে একবার এমনিতেই মাথা কামানো দরকার। খুশকি, উকুন এইসব তখন আর জীবনেও হবে না।

নাপিত মাথা কামিয়ে দিল। হেদায়েত বলল, ভাইজান তোমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে। আমিও মাথা কামাব।

বেলায়েতের চোখে পানি আসার উপক্রম হলো। এই না হলে ভাই? বড় ভাইকে মাথা কামাতে দেখেছে বলে সেও মাথা কামাবে। তার ধারণা, কোনো কারণে যদি সে ঝাঁপ দিয়ে ছাদ থেকে রাস্তায় পড়ে হেদায়েতও তাই করবে। ভাইয়ের প্রতি এত শ্রদ্ধা ভক্তি যদিও ঠিক না। বেলায়েত বলল, মাথা কামালে কামা। বাসায় গিয়ে হেভি গোসল দিবি। চুলের কাটা টুকরা গিলা আর বিষ গিলা একই। মাথা কামানোর সিদ্ধান্তটা ভালো নিয়েছিস। মাথা কামাবার। পরপরই মেজাজ অনেকখানি নেমে গেছে। পরিমল বাবুকে আবার চাকরিতে বহাল করব বলে ঠিক করেছি।

ভালো করেছ।

বেলায়েত বলল, মাথা কামানোর পর চল দুই ভাই স্টুডিওতে গিয়ে একটা ছবি তুলে আসি। স্মৃতি থাকুক।

হেদায়েত বলল, আচ্ছা।

 

সেতু হেদায়েতকে ডিভোর্সের কাগজ পাঠাবে। রবিন একজন লইয়ার নিয়ে এসেছে। কী কারণে ডিভোর্স চাওয়া হচ্ছে তা গুছিয়ে লিখতে হবে। লইয়ার একটা মুশিবিদা তৈরি করে এসেছে। সেখানে লেখা–

“আমার মক্কেল শারীরিক এবং মানসিকভাবে নির্যাতিত। প্রায় দিনই তাকে মদ্যপ স্বামীর কাছে প্রহৃত হতে হয়েছে। এতে সে এখন মানসিক ভারসাম্যহীনতার দ্বার প্রান্তে উপস্থিত। আমার মক্কেলের সন্তানের শখ কিন্তু কিছুতেই তার স্বামী তাকে সন্তান ধারণ করতে দিবে না। এমতাবস্থায় দু’জনের ছাড়াছাড়ি ছাড়া আর করণীয় কিছুই নাই।”

সেতু বলল, এইসব কী হাবিজাবি লিখে নিয়ে এসেছেন? আমার স্বামী জীবনে কখনও আমাকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করে নি। সে কোনোদিন এক ফোঁটা মদ খায় নি অথচ আপনি লিখেছেন মদ্যপ। সে সব সময় বাচ্চা চেয়েছে। আমি চাই নি। একবার কনসিভ করে ফেললাম, তাকে জানিয়ে বাচ্চা Abort করলাম। পরে অবশ্যি তাকে জানিয়েছি। সে কিছুই বলে নি। এমন একজন মানুষ সম্পর্কে কুৎসিত কথা আমি লিখব?

রবিন বলল, এগুলি সবই গৎ বাধা কথা। লিখতে হয় বলে লেখা। নিয়ম রক্ষা। কেউ এইসব বিশ্বাস করে না।

সেতু বলল, কেউ বিশ্বাস না করুক, ও বিশ্বাস করবে। মন খারাপ করবে। আমার মতে যেটা সত্যি সেটাই লেখা উচিত।

রবিন বলল, সত্যটা কী?

সেতু কঠিন গলায় বলল, সত্যিটা হচ্ছে— আমি একজন দুষ্ট স্ত্রী। বেশ্যা টাইপ। আমার মতো স্ত্রীর উচিত না ওর মতো একজন ভালো মানুষের সঙ্গে থাকা।

রবিন বলল, এইসব কী বলছ? তোমার কী মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে!

সেতু বলল, উকিলের মুসিবিদ পড়ে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এই জাতীয় মিথ্যা আমি তাকে কখনও পাঠাবো না। নেভার। নেভার।

রবিন বলল, চিৎকার করছ কেন? মুসিবিদ অন্যভাবে লেখা হবে। যেমন তোমাদের বনিবনা হচ্ছে না বলে তুমি ডিভোর্স চাচ্ছ।

সেতু বলল, আমাদের বনিবনা হচ্ছে না, এটাও তো ঠিক না। সে আমাকে খুবই পছন্দ করে, আমিও তাকে করি।

লইয়ার বলল, স্যার! আমি বরং অন্য আরেকদিন আসি?

রবিন বলল, অন্য আরেকদিন না। আজই আসুন। সন্ধ্যার পর আসুন। সমস্যা হবে না।

সেতু কঠিন গলায় বলল, তোমার কী ধারণা সন্ধ্যার পর আমি দুই পেগ হুইস্কি খাব, তারপর তুমি যা বলবে আমি তাই করব?

রবিন বলল, না করলে না করবে। এখন চুপ করো। অকারণে চিৎকার করে তুমি আমার মাথা ধরিয়ে দিচ্ছ। চিৎকার করার মতো কিছু হয় নি। Cool down please. কফি খাবে? কফি দিতে বলি?

 

হেদায়েত বসার ঘরে বসে আছে। তার হাতে টিভির রিমোট। History চ্যানেল বলে একটা চ্যানেলে মিশর নিয়ে কী যেন দেখাচ্ছে। একজন ফারাওদের পোশাক পরে কী যেন বলছে। কোনো কথাই পরিষ্কার না। মনে হচ্ছে লোকটা তোতলাচ্ছে। কোনো ফারাও কি ভোলা ছিল?

নাদুর মা সামনে এসে দাঁড়াল। হেদায়েত বলল, কিছু বলবে নাদুর মা?

নাদুর মা বলল, জি ভাইজান বলব। আমি এইখানে আর কাজ করব না।

হেদায়েত বলল, আগেও তো একবার বলেছ চলে যাবে। যাও নি।

এইবার যাব। নাদুর মা বলল, দুই মাসের বেতন পাওনা আছে। ম্যাডাম জানেন। টাকাটা পাইলে চইলা যাব।

কখন যাবে?

আজই যাওয়ার ইচ্ছা। সইন্ধায় বাস ছাড়ে।

তোমার কত পাওনা হয়েছে?

আটশ টাকা হিসাবে দুই মাসে ষোলশ।

হেদায়েত পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল। মানিব্যাগে তিন হাজার টাকা আছে। সে পুরো টাকাটাই নাদুর মার হাতে দিল।

নাদুর মা শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলল, আপনার খাওয়াখাদ্যের কী ব্যবস্থা হইব ভাইজান?

হেদায়েত বলল, একটা-কিছু ব্যবস্থা হবে। তুমি চিন্তা করবে না।

ম্যাডামের সাথে দুইটা কথা বলতে ইচ্ছা ছিল ভাইজান। টেলিফোনে ধইরা দিবেন?

হেদায়েত অনেক চেষ্টা করল সেতুকে ধরা গেল না। রেকর্ডিং ভয়েস শোনা যায়- “ম্যাডাম দিলরুবা এখন ছবির কাজে ব্যস্ত। পরে যোগাযোগ করুন।” ম্যাডাম দিলরুবাটা কে হেদায়েত বুঝতে পারছে না। সেতু কি তার নাম বদলে দিলরুবা রেখেছে? সেতু নামটাই তো সুন্দর—বন্ধন।

 

রাত ন’টা। হেদায়েত ৰাসার কাছেই একটা হোটেল থেকে তেহারি খেয়ে এসেছে। চল্লিশ টাকা প্লেট। খাবারটা যথেষ্টই ভালো। রেস্টুরেন্টের মালিকের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তাদের হাউস সার্ভিস আছে। টিফিন ক্যারিয়ারে করে বাসায় খাবার পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা। হেদায়েত তার বাসার নাম-ঠিকানা দিয়ে এসেছে। রেস্টুরেন্টের মালিক বলেছে— খাবার যদি খারাপ পান, পচা-বাসি পান বা ঠাণ্ডা পান বাটা কোম্পানির জুতা দিয়া আমার গালে মারবেন। আমি যদি কিছু বলি তাইলে আমি মানুষের বাচ্চা না, আমি শকুনের বাচ্চা। আমার দোকানের নাম দি গ্রেট বিরানী হাউস বদলায়া রাখব ‘শকুন হাউস’।

রাতে আরাম করে সিগারেট ফুকতে ফুকতে হেদায়েত ঘুমুতে গেল। আজ সে দু’টা সিগারেট শুয়ে শুয়ে খাবে। পুরো বাড়ি খালি তার আলাদা আনন্দ আছে। ক্রিং ক্রিং শব্দে ল্যান্ডফোন বাজছে। টেলিফোন ধরবে না ধরবে না। করেও হেদায়েত টেলিফোন ধরল।

স্যার বলছেন?

কে?

স্যার আমি নীতু।

ও আচ্ছা নীতু।

কী করছেন স্যার?

সিগারেট খাচ্ছি।

কেন সিগারেট খাচ্ছেন? হার্টের অসুখ হবে। আচ্ছা স্যার আজ আপনি কলেজে এসেছিলেন না?

হুঁ।

অনেকেই আপনাকে দেখেছে। শুধু আমি দেখতে পাই নি। আমি কলেজে এসেছি আপনি যাবার পর। যখন শুনলাম আপনি এসে চলে গেছেন, তখন খুব। মন খারাপ হয়েছে। স্যার, কবে থেকে ক্লাস নেয়া শুরু করবেন?

আমি কোনো ক্লাস নে মা নীতু।

কেন?

আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি তো এই জন্যে ক্লাস নেব না।

আপনি পাগল হয়ে যাচ্ছেন?

হুঁ। ধীরে ধীরে পাগল হচ্ছি। আমাদের বংশে পাগলামি আছে। আমার দাদা পাগল ছিলেন।

বলেন কি! উনি কি ছোটবেলা থেকে পাগল ছিলেন?

না। তার বয়স যখন চল্লিশ তখন হঠাৎ একদিন পাগল হয়ে যান।

আপনার বয়স কত স্যার?

চল্লিশের উপর।

তাহলে তো স্যার টাইম হয়ে গেছে।

হুঁ।

স্যার, আমার টেলিফোন নাম্বারটা কি এখনো আপনার মনে আছে?

মনে আছে।

যখন পুরোপুরি পাগল হয়ে যাবেন, তখনও কি মনে থাকবে?

বুঝতে পারছি না।

আচ্ছা স্যার, আপনি যে একটা ইকুয়েশন বের করার চেষ্টা করেছিলেন ঐটার কী হলো?

কোন ইকুয়েশন?

আত্মার ইকুয়েশন।

ও আচ্ছা, একটা Wave Functin তৈরি করা কঠিন হবে। আত্মা বিষয়টা তো জানা নেই।

আপনার জন্যে মোটেই কঠিন হবে না। পাগল হবার আগেই ইকুয়েশনটা শেষ করা উচিত না স্যার? পাগল হলে তো আর পারবেন না। স্যার আমি রাখি। মা কয়েকবার এসে দেখে গেছে আমি টেলিফোনে কথা বলছি। আমি যে একটা অতি জরুরি বিষয় নিয়ে স্যারের সঙ্গে কথা বলছি, Math নিয়ে কথা, এটা মা বিশ্বাস করবে না। মা ভাববে আমি প্রেম করছি। স্যার খোদা হাফেজ

খোদা হাফেজ।

 

হেদায়েত শুয়ে পড়েছে। আত্মা নিয়ে চিন্তা করছে। আত্মাটা কী? নিশ্চয় কোনো বস্তু না। বস্তুর বিনাশ আছে। আত্মার বিনাশ নেই। এটাও তো ঠিক না। বস্তুর বিনাশ থাকবে না কেন? বস্তুরও বিনাশ নেই।

আত্মা হলো কিছু অনুভূতির আধার। প্রেম, স্নেহ, মমতা… ভালো কথা, খারাপ অনুভূতির আধারও কি আত্মা ঘৃণা, রগি, বি১দ্বেষ। সহজভাবে কী লেখা যায়—

আত্মা = f (Love) (hate)

লিমিট 0 থেকে ইনফিনিটি

আচ্ছা চিন্তাটা কি আত্মার মধ্যে পড়বে?

হেদায়েত বিছানায় উঠে বসেছে। ঘুমের ওষুধ খাবার পরেও তার ঘুম আসছে না।

রামানুজন বলে গেছেন সহজভাবে চিন্তা করতে। যদিও স্বপ্নে বলেছেন। স্বপ্নের বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। রসায়নবিদ মেন্ডেলিফ পেরিওডিক টেবিল স্বপ্নে পেয়েছিলেন। রামানুজন নিজেও স্বপ্নে অনেক থিওরি পেয়েছেন।

সহজ ভাবে শুরু করা যাক।

আত্মা = a^n

তাহলে a কীসের ফাংশন?

আবার টেলিফোন বাজছে। মনে হয় নীতু মেয়েটাই করেছে। হেদায়েত অনেক চেষ্টা করেও মেয়েটার চেহারা মনে করতে পারল না।

অল্প কিছুদিন মাত্র দেখা হয় নি অথচ চেহারা মনে নেই। পাগলের লক্ষণ। একজন মানুষের মাথা থেকে যখন পরিচিতজনদের ছবি মুছে যেতে থাকে। তখন বুঝতে হবে,…

টেলিফোন বেজেই যাচ্ছে। হেদায়েত টেলিফোন উঠাল।

জি ভাইজান।

আমি কাল ভোরবেলা ময়মনসিংহ যাচ্ছি। যাবি আমার সঙ্গে? রাতে ফিরে আসব।

যাব।

আমি খুব ভোরে রওনা হব। এত ভোরে উঠতে পারবি?

পারব।

না থাক, তোর যাবার দরকার নেই। ট্রাকে করে যাব ড্রাইভারের পাশে বসে যাওয়া। দু’জন বসলে চাপাচাপি হবে। আমার সমস্যা না, তোর কষ্ট হবে।

হেদায়েত বলল, একটা গাড়ি কিনে ফেল।

বেলায়েত বলল, তুই যখন বলছিস তখন কিনে ফেলব। ময়মনসিংহ থেকে ফিরেই কিনব। তোর কোন রঙ পছন্দ।

মেরুন রঙ।

মেরুন রঙ আবার কোনটা। আচ্ছা যা, যেটাই হোক তোকে নিয়ে তোর পছন্দে কিনব। তুই জেগে থাকিস না ঘুমিয়ে পড়। কবিতা আছে না- early to hed, early to rise. শরীর ঠিক রাখা দরকার। শরীর ঠিক থাকলেই মন ঠিক।

বেলায়েত টেলিফোন রাখার পরপরই হঠাৎ করে হেদায়েতের মনে হলোএমন কি হতে পারে যে আত্মার অবস্থান Planck স্তরে? Planck স্তর অতি জটিল স্তর সেখানে সবই এলোমেলো। Planck দৈর্ঘ্য হলো 10^-33 সেন্টিমিটার। Planck সময় হলো 10^-45 সেকেন্ড, ভর হলো 10^-5 gm ভর এত বেশি কেন?

হেদায়েত মূর্তির মতো বসে আছে। Planck ভর সমস্যায় এই মুহূর্তে সে কাতর।