Course Content
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
0/49
বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে – ২৪

পর্ব ২৪

স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, যদি টাইম মেশিনে চেপে হাজার বছর পিছনে ফিরে যাওয়া যেত তবে বড় ভালো ইতো।’

বিক্রম বলল, “ঠিক বলেছ। তবে সন্ধ্যা নামার পর এই মূর্তিগুলোকেই কেমন যেন রহস্যময় মনে হয়।’

টুকটুক চালকের কানে যাচ্ছিল তাদের দু’জনের কথা। মূর্তি প্রসঙ্গে তারা আলোচনা করছে- এ ব্যাপারটা অনুমান করেই মনে হয় সে বলল, ‘এই মূর্তিগুলোর মধ্যে আত্মা আছে। অন্ধকার নামলেই ওরা জীবন্ত হয়ে ওঠে। আবার ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা নিজেদের জায়গায় ফিরে আসে।’

ড্রাইভারের কথা শুনে মজার ছলে বিক্রম বলল, ‘তুমি তাদের দেখেছ? কোনও দিন তোমার গাড়িতে তারা কেউ চড়েছে?’

লোকটা বলল, “আমি দেখিনি। আর আমার গাড়িতে চড়ারও দরকার নেই। তাদের যারা দেখে তারা কেউ বাঁচে না। সে জন্য অন্ধকার নামলে আমরা কেউ এ পথে যাওয়া-আসা করি না।”

এ কথা বলার পর সে বলল, ‘আমার ফোন নম্বরটা নিয়ে নিন। বাজার ও অন্য কাজ মিটে গেলে আমাকে ডেকে নেবেন। তাছাড়া আপনাদের কোনও প্রয়োজন হলে অন্যদিন আমাকে। ডেকে নিতে পারেন।”

বিক্রম আবারও মজার ছলে জানতে চাইল, ‘যদি রাত্রিবেলা। বেড়াতে ইচ্ছা হয় তুমি আসবে তো?’

টুকটুক ড্রাইভার এ কথার কোনও জবাব না দিয়ে তার ফোন নম্বরটা বলল। স্বাগত নম্বরটা নিজের মোবাইলে তুলে নিল।

বিক্রম বলল, “তোমার সঙ্গে আসার পিছনে আমার কিন্তু একটা অন্য উদ্দেশ্য আছে। সেটা আমি সবার সামনে বলিনি।’

—‘কী উদ্দেশ্য?’ জানতে চাইল স্বাগত।

বিক্রম বলল, ‘ওই কুমিরের মাংস খাবার ইচ্ছা। তাছাড়া দুটো হুইস্কির বোতলও কিনতে হবে।”

স্বাগত বলল, “ঠিক আছে মাংসটা চেখে দেখা যেতে পারে।’

বিক্রম তার স্বভাবসিদ্ধ মজার ছলে বলল, ‘হ্যাঁ, কুমিরের মাংস আর একটা কারণেও খাবার দরকার আছে। প্রীতমের দেখা কুমিররা যদি ‘কুমির ভূত’ হয়ে থাকে তবে আমরা কুমিরের মাংস খেলে সে আর আমাদের কাছে আসবে না।’

স্বাগতদের কথাবার্তা ড্রাইভারের কানে যাচ্ছে। তাই স্বাগত এ প্রসঙ্গে কথা বন্ধ করার জন্য বিক্রমকে ইশারা করল। বিক্রমও তাই এরপর অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়ে বলল, “তবে তোমরা কাল যে তালের রসটা আনলে অমন পানীয়ের তুলনা নেই। আমার তো খেয়েই ঝিমঝিমে ভাব এসে গেল। দু-বোতল খেলেই নেশা হবে যাবে।’

স্বাগত বলল, ‘হ্যাঁ, ওটা ফারমেন্টেড অবস্থায় ছিল। আমাদের বাংলার গ্রামাঞ্চলে অনেকে ওই রস পান করে নেশা করে।’

বিক্রম বলল, ‘এরপর কোনওদিন দেখতে পেলে আমার জন্য কয়েক বোতল কিনে এন। আর আমি পেলে তো কিনবই। দেখি প্রফেসর আমাদের কবে বায়ুম মন্দির দেখাতে নিয়ে যান?’

কথা বলতে বলতে এক সময় তারা পৌঁছে গেল প্রাচীন নগরী আঙ্করের তোরণের সামনে। যার মাথাতে জেগে আছে পাথরের তৈরি প্রকাণ্ড আকৃতির ভগবান বিষ্ণুর মুখমণ্ডল। ট্যুরিস্টরা আর তাদের গাড়ির ভিড় সেখানে। বিস্মিতভাবে পর্যটকরা তাকাচ্ছেন হাজার বছর আগে খামের ভাস্করদের রচিত বিস্ময়কর মুখমণ্ডলের দিকে। তোরণ অতিক্রম করে বাইরে বেড়িয়ে পড়ল স্বাগতদের বাহন। আগের দিনের মতোই তারা দেখতে পেল উল্টোদিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গাড়ি আসছে আঙ্কর নগরী দর্শনের জন্য। রাস্তার নানা দৃশ্য দেখতে দেখতে এক সময় স্বাগতরা পৌঁছে গেল সিয়েমরিপের বাজারে। সে জায়গায় আগের দিনের মতোই ভিড়। ফুটপাতে ফলের পসরা নিয়ে রয়েছে বিক্রেতারা। খাবারের দোকানে ঝুলছে রোস্ট করা শূকরের দেহ। স্বাগতরা প্রথমে গিয়ে হাজির হল ব্যাটারির দোকানে। চীনা ব্যাটারি ব্যবসায়ী চিনতে পারল তাদের। ব্যাটারি নামানো হল সেখানে। তিনি বললেন, ব্যাটারি চার্জ দেবার জন্য ঘণ্টা তিনেকের মতো সময় দিতে হবে তাকে। স্বাগত হিসাব করে দেখল এ জায়গা ছেড়ে বেরতে দেড়টা-দুটো বেজে যাবে। অর্থাৎ আঙ্কর নগরীতে নিজেদের জায়গায় পৌঁছতে বেলা তিনটে হবে। তারপর প্রফেসর রামমূর্তি যদি তাকে কোনও কাজে নিয়োজিত না করেন তবে আজ বিকালেও সে যেতে পারবে ওই খামের যুবতীর গল্প শোনার জন্য। হয়তো বা আজ সে ওই মন্দিরের ব্যাপারে কোনও কথা বলতে পারে তাকে? ব্যাটারির দোকানের পর বাজারের ভিতর এক জায়গায় গাড়ি তাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। রসদের দোকানগুলো আগের দিনই চেনা হয়ে গেছে তাদের। সেখানে জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে খানিকটা সময় লাগল তাদের। তবে থলে, বস্তা সেখানেই রইল। গাড়ি ডেকে একবারে সব জিনিস গাড়িতে তোলার পরিকল্পনা তার। বিক্রম দুটো হুইস্কির বোতলও কিনল এক দোকান থেকে। আর সেই দোকান থেকে সে জেনে নিল রান্না করা কুমিরের মাংসের দোকানের সন্ধান। দু’জনে মিলে তারা এগল সেই দোকানের বা রেস্টুরেন্টের খোঁজে। বুলের কুমিরের চামড়ার দোকানের কাছাকাছিই রেস্টুরেন্টটা। তবে একটা গলির ভিতর। বড় রাস্তা থেকে সেই গলিতে ঢোকার আগে স্বাগতর চোখে পড়ল কিছু দূরে বুলের দোকানটা। খোলা আছে দোকান। তবে স্বাগতদের গন্তব্য রেস্টুরেন্ট। গলির ভিতর ঢুকে একটু এগিয়েই তারা পেয়ে গেল সেই রেস্টুরেন্ট।

ছোট রেস্টুরেন্ট। তার তিনদিক খোলা বসার জায়গা। একপাশে একটা কাচ ঢাকা দেওয়া জায়গার মধ্যে মাঝারি আকৃতির একটা কুমিরের রোস্ট করা দেহ ঝুলছে। কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ ট্যুরিস্ট বসে বিয়ার আর খাবার খাচ্ছে। তাদের দেখে স্বাগতরা বুঝতে পারল যে লোকগুলোও তাদেরই মতো কুমিরের মাংস চাখতে এসেছে। স্বাগতরা রেস্টুরেন্টে ঢুকে একটা টেবিলে বসল। মেনু কার্ডে কুমিরের মাংসর নানান পদ লেখা আছে। যা তারা চেনে না। শেষ পর্যন্ত ‘রোস্টেড মিট’ অর্ডার করা হল। খাবার এসে গেল। কিছু শাকসব্জির সঙ্গে কুমিরের মাংসর ছোট ছোট স্লাইস। স্বাগতরা মাংস টুকরো মুখে তুলল, নরম মাংস, মুরগির মাংসর মতো কিছুটা তার স্বাদ। বিক্রম বেশ তৃপ্তি করে মাংস খাওয়ার পর তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় বলল, ‘বেশ লাগল। কুমিরটা হয়তো আগের জন্মে আমাকে খেয়েছিল, আর এ জন্মে আমি ব্যাপারটার শোধ তুললাম ওকে খেয়ে।’

বিল মিটিয়ে রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে দাঁড়াল দু’জনে। স্বাগত রিস্ট ওয়াচের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যাটারি চার্জ হতে এখনও প্রায় দু-ঘণ্টা সময় লাগবে। এ সময়টা কী করা যায়?’

বিক্ৰম বলল, ‘কাছাকাছি দেখার মতো কিছু থাকলে তা দেখে আসা যেত।’

আর এরপরই কাকতালীয়ভাবেই সামনের একটা দেওয়ালে একটা লেখা স্বাগতর নজরে পড়ল। দেওয়ালের গায়ে সাঁটানো একটা কাগজে বড় বড় হরফে ইংরেজিতে ‘ফ্রগ রেস’ কথাটা লেখা আছে। স্থানীয় ভাষায় আরও কিছু কথা লেখাও আছে পোস্টারে। তা অবশ্য পাঠ করা সম্ভব নয় স্বাগতর।

তবে একটা ‘তির চিহ্ন’ আঁকা আছে কাগজটাতে। সেটা গলির ভিতর দিকটা নির্দেশ করছে। অর্থাৎ ব্যাঙের দৌড়ের স্থানটা ওদিকেই।

স্বাগত পোস্টারটা দেখিয়ে বিক্রমকে বলল, ‘ব্যাপারটা দেখে আসবে নাকি?’

বিক্রম বলল, ‘প্রফেসর রামমূর্তি যখন যেতেন বা যান তখন যাওয়া যেতে পারে। হোয়াঙ নামের যে চাইনিজ লোকটা গতকাল রামমূর্তি স্যরের খোঁজে গেছিল সে লোকও তো ব্যাঙের রেস চালায় বলল, দাঁড়াও জিজ্ঞেস করে নিই জায়গাটা কোথায়? এই বলে যে দু-পা পিছু ফিরে রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে বসা লোকটার কাছে গিয়ে পোস্টারটা দেখিয়ে জানতে চাইল, ‘ওই জায়গাটা কোথায়?’

লোকটা বলল, “ভিতর দিকে দু-তিন মিনিটের পথ। গেলেই দেখতে পাবেন টিনের উঁচু ছাদওয়ালা একটা বাড়ি। তার সামনে লোকজন জটলা করছে।’

এ কথা বলে একটু থেমে সে বলল, ‘অনেক ট্যুরিস্ট ওখানে যায় ঠিকই। তবে একটু সাবধানে যাবেন।’

বিক্রম জানতে চাইল, ‘সাবধানে কেন?’

লোকটা জবাব দিল, ‘নানারকম লোক যান ওখানে। বিশেষত চীনারা। ওরা লোক ভালো হয় না।’ —এ কথা বলে নিজের হিসাবপত্র, কাজে মনোনিবেশের ভাব দেখিয়ে লোকটা বিক্রমকে বুঝিয়ে দিল সে আর কিছু বলতে আগ্রহী নয়।

বিক্রম, স্বাগতর কাছে এসে লোকটার সঙ্গের কথোপকথন জানাল স্বাগতকে। স্বাগত তা শুনে বলল, ‘আমার ব্যাপারটা দেখতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু কাউন্টারে বসে থাকা লোকটাতো জায়গাটার সম্বন্ধে আমাদের সতর্ক করল। যাবে ওখানে?’

বিক্রম স্বাগতকে ভরসা দেবার ঢঙে বলল, ‘জায়গাটা খুব খারাপ হলে রামমূর্তি কী যেতেন ওখানে। খামের লোকরা চীনাদের ঠিক পছন্দ করে না বলেই হয়তো লোকটা কথাগুলো বলল। আমরা দু’জন শক্ত সমর্থ পুরুষ। ওখানে গেলে আমাদের আর কীই বা হবে। ইচ্ছা যখন হয়েছে এখন ঘুরেই আসি সময়টা তো কাটাতে হবে।’

বিক্রমের কথা শোনার পর স্বাগত তাকে নিয়ে এগল গলির ভিতর দিকে। গলিটা ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে। রাস্তার পাশের দোকানগুলো বিবর্ণ, কোনও কোনও দোকানের ঝাঁপও বন্ধ। পথটাও অপরিষ্কার। নানা ধরনের বাতিল জিনিস, খালি বিয়ারের বোতল পড়ে আছে। যে সব লোকজন চোখে পড়ছে তাদের পোশাক পরিচ্ছদও ভালো নয়। এক সময় তারা জায়গাটায় পৌঁছে গেল। রেস্টুরেন্টের লোকটা যেমন বলেছিল ঠিক তেমনই টিনের উঁচু ছাদ আর কাঠের দেওয়ালের একটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আর তার সামনে জটলা করছে একদল মানুষ। কেউ উচ্চস্বরে কথাও বলছে। চীনা, খামের নানা ধরনের মানুষ জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। তবে তাদের অধিকাংশর পোশাকই বিবর্ণ। স্বাগতরা সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই তাদের দেখে দু’জন লোক ছুটে এল কাছে। তাদের হাতে বেত বা বাঁশের তৈরি ঝাঁপি বা মুখবন্ধ ঝুড়ি। সেগুলোর আকৃতি দেখে স্বাগতর হঠাৎই মন্দিরের দেওয়ালে খদিত শূদ্র ব্রাহ্মণদের হাতে ধরা ভাণ্ডগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। লোক দু’জন তাদের সামনে এসে ঝুড়ির মুখটা খুলে ভিতরটা দেখাল। দুটো ঝাঁপির ভিতরেই রয়েছে একটা করে বেশ বড় আকৃতির ব্যাঙ। সেই ব্যাঙগুলো দেখিয়ে লোক দু’জন সম্ভবত চীনা ভাষায় কী যেন বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগল। যদিও স্বাগতরা সে ভাষার বিন্দু বিস্বর্গ বুঝতে পারল না। তারা এগল বাড়ির ভিতর প্রবেশ করার জন্য দরজার দিকে। ভিতরে ঢোকার জন্য একটাই দরজা। তার মাথার ওপর একটা রংচটা সাইন বোর্ডে লেখা ফ্রগ হাউস। একটা লোক দরজার পাশে বসে আছে। স্বাগতরা গিয়ে দাঁড়াতেই সে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জানাল, ভিতরে ঢুকতে গেলে জনপ্রতি এক ডলার করে দিতে হয় বিদেশিদের। আর ভিতরে কোনওরকম ছবি তোলা যাবে না।

লোকটার হাতে দু-ডলার গুঁজে দিয়ে বাড়ির ভিতর স্বাগতরা প্রবেশ করল। একটা হলঘর। তার কেন্দ্রস্থলে একটা জায়গা ঘিরে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে।

ঘরটার বিভিন্ন জায়গাতেও লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চীনা, খামের থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতের বিভিন্ন ধরনের মানুষ। কয়েকজন শেতাঙ্গকেও সে ভিড়ে দেখতে পেল তারা।

লোকজনের কথাবার্তাতে গমগম করছে হলঘর। যে সব লোক ঘরটার মধ্যে রয়েছে তাদের সকলের চোখেমুখে উত্তেজনার ছাপ। স্বাগতের কিছুটা তফাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। একজন মাঝবয়সি শক্তপোক্ত চেহারার চীনা। পরনে জিন্স আর ড্রাগনের ছবি আঁকা টি-শার্ট। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে যেন নজর রাখছে চারপাশে। বিক্রম লোকটাকে দেখিয়ে স্বাগতকে চাপা স্বরে বলল, ‘ওই চীনা লোকটাই হোয়াঙ। সে রামমূর্তি স্যরকে খুঁজতে গিয়েছিল।’ আর এরপরই লোকটার দৃষ্টি পড়ল তাদের ওপর। চেরা চোখে কয়েক মুহূর্ত তাদের দেখার পর হোয়াঙ নামের লোকটা স্বাগতদের কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল আঙ্করের পুরনো মন্দিরে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল তাই না?’

বিক্রম জবাব দিল, ‘হ্যাঁ।’

হোয়াঙ জানতে চাইল, ‘প্রফেসর কই? সে কি আমার কাছে তোমাদের পাঠিয়েছে?’

বিক্রম উত্তর দিল, ‘তিনি আসেননি। আমাদেরকে পাঠানওনি তোমার কাছে। তবে তুমি যে তাঁকে খুঁজতে গেছিলে তা তাঁকে জানিয়েছি। আমরা দু-জন সিয়েমরিপে বাজার করতে এসেছিলাম, তারপর রেস দেখতে এসেছি।’

হোয়াঙ বলল, ‘ফিরে গিয়ে তাকে বল, আমার সঙ্গে সে যেন যোগাযোগ করে।’

এ কথা বলার পর সে স্বাগতদের উদ্দেশে বলল, ‘এখনই একটা রেস শুরু হবে। ইচ্ছা হলে শুধু দেখা নয় খেলতেও পার। আমার কাছে ভালো ব্যাঙ আছে। সামান্য কিছু টাকা লাগালে অনেক টাকা জেতার সুযোগ আছে এখানে।’

তার কথা শুনে স্বাগত হেসে বলল, ‘আগে একবার খেলাটা দেখে নিই। তারপর না হয় খেলা যাবে।’

হোয়াঙ কোনও চাপ দিল না তাদের রেস খেলার জন্য। সে বলল, ‘আচ্ছা দেখ।’

একটা লোক এরপর ডাক দিল হোয়াঙকে। স্বাগতদের ছেড়ে সে লোকটার সঙ্গে কথা বলতে গেল। আর স্বাগতরা এগল হলঘরের মাঝখানে যেখানে জটলা সেখানে।

টেবিল টেনিস বোর্ডের মতো একটা টেবিল। তবে সেটা দৈর্ঘ্যে আরও বেশ খানিকটা লম্বা। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে লোকজন। তাদের কারও হাতে টাকার গোছা বা ব্যাঙের ঝুড়িও আছে। টেবিলটার বিশেষত্ব হল তার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত পাশাপাশি অনেকগুলো খোপ বা চ্যানেল করা আছে। আর সেই খোপগুলোর একপ্রান্তে রয়েছে জালের তৈরি ছোট ছোট খাঁচা। তার মধ্যে নানা ধরনের ব্যাঙ রাখা আছে— কালো, সবুজ, হলুদ রঙের বড় বড় ব্যাঙ। সেই ব্যাঙগুলো দেখে স্বাগতরা বুঝতে পারল ওই ব্যাঙগুলোই খোপের মধ্যে দিয়ে দৌড়বে।

ইতিমধ্যে হোয়াঙের সঙ্গে কথা বলে আর চারপাশের লোকজনদের দেখে স্বাগতরা বুঝতে পেরে গেছে যে এখানে বাজি ধরে ব্যাঙ দৌড় করানো হয়। আসলে এটা একটা জুয়ার আড্ডা বলা চলে। খেলাটা দেখার জন্য টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে রইল দু’জন। টেবিল ঘিরে থাকা অন্য লোকগুলো নিজেদের মধ্যে কেউ কেউ টাকা লেনদেন করছে, উত্তেজিতভাবে কথা বলছে।

একসময় হোয়াঙ তার একজন সঙ্গীকে নিয়ে টেবিলের কাছে এসে দাঁড়াল। একটা টুলের উপর দাঁড়িয়ে সে নিজের ভাষায় কী যেন বলতে লাগল। আর অন্যরা চুপ করে শুনতে লাগল তার কথা। স্বাগতরা বুঝতে পারল রেস শুরু হতে চলেছে। হোয়াঙয়ের কথা শেষ হবার পরমুহূর্তর জন্য একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল চারপাশে। হোয়াঙ এরপর তার সঙ্গীকে ইশারা করতেই সে টেবিলের গায়ে একটা হাতল ধরে টান দিল। সঙ্গে সঙ্গে একসঙ্গে উঠে গেল ব্যাঙের খাঁচার আগলগুলো আর টেবিলের নীচে একটা পটকা ফাটার মতো শব্দ হল। সেই শব্দের জন্যই হয়তো ব্যাঙগুলো একে একে বাইরে বেরতে শুরু করল। টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো এবার উত্তেজিতভাবে চিৎকার শুরু করল ব্যাঙগুলোর দিকে তাকিয়ে। খোপ বেয়ে ধীরে ধীরে ব্যাঙগুলো যত এগতে লাগল তত বেড়ে চলল চিৎকার। ঠিক ঘোড়দৌড়ের রেসের মতোই। তবে ব্যাঙগুলোর থপথপ করে চলছে। হঠাৎ একটা ব্যাঙ খোপ ছেড়ে বাইরে লাফ দিল। স্বাগতরা দেখল একজন লোক রাগে ব্যাঙ-টাকে উঠিয়ে নিয়ে দেওয়ালের গায়ে ছুড়ে মারল। সাত-আটটা খোপের মধ্যে দুটো ব্যাঙ অন্যদের থেকে কিছুটা এগিয়ে যাচ্ছে টেবিলের অপর প্রান্তে অর্থাৎ ফিনিশিং পয়েন্টের দিকে। সেখানে একটা লাল দাগ আছে। স্বাগত ভেবেছিল এগিয়ে থাকা দুটো ব্যাঙের মধ্যেই কেউ জিতবে। কিন্তু তারা যখন দাগটার কাছাকাছি পৌঁছেছে ঠিক তখনই পিছনের একটা ব্যাঙ লাফ দিয়ে তাদের টপকে সেই লাল দাগ ছুঁয়ে ফেলল। ব্যস, রেস শেষ হয়ে গেল। তুমুল চিৎকার শুরু হল চারপাশে। হোয়াঙ টুল থেকে নামতেই কিছু লোক তাকে ঘিরে ধরল। আর সেই ফাঁকে স্বাগত আর বিক্রম দরজার দিকে এগল বাইরে বেরবার জন্য। জুয়ার আড্ডার বাইরে বেরিয়ে গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে বিক্রম বলল, ‘রামমূর্তি স্যর কি এখানে রেস খেলতে আসেন? এ ব্যাপারটা আমার কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে!’

স্বাগত বলল, ‘তা ঠিকই। তবে খেলাটা দেখার মধ্যে একটা উত্তেজনা আছে তা অনুভব করছ নিশ্চয়ই? অনেক লোক আছে যারা বাজি না ধরলেও ওই উত্তেজনা অনুভব করতে ঘোড়দৌড়ের মাঠে যায়। রামমূর্তি স্যর হয়তো উত্তেজনা উপভোগ করার জন্যই এখানে এসে থাকতে পারেন।’

স্বাগতরা কথা বলতে বলতে বড় রাস্তায় বেরিয়ে এল। আর তারপরই তারা দেখতে পেল বুলের দোকানের সামনে বুল আর নারেঙ খাম দাঁড়িয়ে আছে!

আর তাদের দেখতে পেয়েই নারেঙ খাম তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘ওদিকে কোথায় গেছিলেন? এদিকে আসুন। দরকার আছে কথা বলার।’

বিক্রম স্বাগতকে বলল, ‘যাওয়াটা কি ঠিক হবে? রামমূর্তি স্যর জানলে অসন্তুষ্ট হবেন।’

স্বাগত বলল, ‘ডাকছে যখন তখন দেখি ও কী বলতে চায়?’

স্বাগত বিক্রমকে নিয়ে এগল তাদের দিকে।