Course Content
প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম
প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম
0/26
প্লেটোর রিপাবলিক – সরদার ফজলুল করিম

১৭. ‘দার্শনিক শাসক’ কেবল কল্পনা নয়

অধ্যায় : ১৭ [৪৯৭–৫০২]

দার্শনিক শাসক’ কেবল কল্পনা নয়

কিন্তু বাস্তবজীবনে দার্শনিক যদি অপদার্থ বলে পরিচিত হয় এবং দর্শনের শিক্ষা যদি অযোগ্য শিক্ষকের হাতেই ন্যস্ত থাকে তা হলে বাস্তব রাষ্ট্রে ‘দার্শনিক-শাসক’ কি একেবারে দুষ্প্রাপ্য থেকে যাবে? দার্শনিক-শাসক কি কেবলই কল্পনা? প্লেটো শুধুমাত্র কল্পনা বিলাসী? প্লেটো কল্পনাবিলাসী ছিলেন না। তাঁর রাষ্ট্রীয় দর্শন যতই কাল্পনিক বলে বোধ হোক-না কেন, আসলে এ কেবল বাস্তব রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সমালোচনা নয়। এ-দর্শনকে প্লেটো বাস্তব রাষ্ট্রীয় জীবনে নিজের সাধ্যমতো প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছেন। এথেন্স তাঁর দর্শনপ্রয়োগের উপযুক্ত নগরী ছিল না বটে, কিন্তু প্লেটোর সমসাময়িককালে এথেন্সই একমাত্র উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্র ছিল না। এথেন্স অবশ্য সেকালের জ্ঞানালোচনার কেন্দ্রস্থল ছিল। ক্রিট, কার্থেজ, সাইরাক্যুজ—বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে শিক্ষার্থী এবং রাজনীতিজ্ঞ এথেন্স আসত জ্ঞান অর্জনের জন্য। এবং জ্ঞানচর্চা-শেষে তারা ফিরে যেত নিজ নিজ রাষ্ট্রে অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগের জন্য। প্লেটো তাঁর একাডেমিকে তেমনি জ্ঞানদানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। তিনি প্রত্যক্ষভাবে এথেন্সের শাসনব্যবস্থাকে তাঁর আদর্শ অনুসারে পরিবর্তিত করতে সক্ষম না হলেও তাঁর আশা ছিল, তাঁর একাডেমির জ্ঞানচর্চা মানুষের চরিত্র-পরিবর্তনে কার্যকর প্রভাব বিস্তার করবে। কেবল একাডেমির শিক্ষাদানেই প্লেটো নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, সাইরাকজের শাসকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে প্লেটো প্রত্যক্ষভাবে চেষ্টা করেছিলেন সাইরাক্যুজের শাসককে ‘দার্শনিকে’ পরিবর্তিত করতে (৩৮৮ খ্রিঃ পূঃ)। সে-চেষ্টার বাস্তব ব্যর্থতা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে প্লেটোর বিশ্বাস যে, সমসাময়িক রাষ্ট্রীয় জীবনেও তাঁর পরিকল্পনা প্রয়োগ করা সম্ভব। তাই ‘দার্শনিকের শাসক হওয়ার অবাস্তবতার অভিযোগের জবাবে সক্রেটিস বলছেন : দার্শনিককে বাঁচিয়ে রাখা যে সহজ নয়, তা আমরাও অস্বীকার করিনে। কিন্তু কোনোকালেই এদের মধ্যে একটি ব্যক্তির পক্ষেও কলুষমুক্ত থাকা সম্ভব হবে না—এমন কথা কে বলতে পারে!

না, তা কেউ বলতে পারে না।

আমি বললাম : বেশ। একটি বেঁচে থাকলেই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট। একজন দার্শনিক-শাসকেরও যদি এমন একটি নগর থাকে, যে-নগর তার ইচ্ছার বাধ্য, তা হলে যে-আদর্শ রাষ্ট্র সম্পর্কে সাধারণ পৃথিবী এত অবিশ্বাসী সে-আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয়ে উঠবে [৫০২]।

*

আলোচনার কী অবশিষ্ট রয়েছে, সক্রেটিস?

প্রশ্ন হচ্ছে : রাষ্ট্র নিজের ধ্বংসের কারণ না হয়ে দর্শনচর্চাকে কেমন করে সংগঠিত করতে পারে, তা নির্ধারণ করা। কাজটি অবশ্যই কঠিন। কারণ সমস্ত বৃহৎ কাজই কঠিন। প্রবাদের কথাই সত্য, যা মূল্যবান তা কখনো সহজ নয়।

এ্যাডিম্যান্টাস বললেন : তবু প্রশ্নটির মীমাংসা আবশ্যক। তা হলেই আমাদের আলোচনাটি সম্পূর্ণ হবে।

আমি বললাম : আমার শক্তিতে কুলালে আলোচনার জন্য আমার ইচ্ছার অভাব হবে না। আলোচনায় আমার উৎসাহ তুমি এখনই দেখতে পাবে। সে যাক, তুমি খেয়াল করো এ্যাডিম্যান্টাস। আমি সাহস করে একথাই বলতে চাই যে, দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নীতি বর্তমানের চেয়ে ভিন্নতর হওয়া আবশ্যক।

কী প্রকারে সক্রেটিস?

আমি বললাম : বর্তমানে দর্শনের যারা ছাত্র তারা বয়সে খুবই তরুণ। শৈশব পার না হতেই তারা সংসারের আর্থিক এবং অপর কাজে ব্যয়িত সময় থেকে রক্ষিত সময়টুকু দর্শনচর্চার ন্যায় জ্ঞানচর্চায় ব্যবহার করে। এবং এদের মধ্যে যারা দর্শনভাবাপন্ন বলে প্রশংসিত হয় তারাও যখন এর কঠিন স্থানটি অর্থাৎ দ্বান্দ্বিকতার তত্ত্বে আসে তখন আর টিকে থাকে না। দর্শনচর্চা ছেড়ে দেয়। পরবর্তী জীবনে কোনো দর্শন আলোচনায় আমন্ত্রিত হয়ে এরা দুএকটি বক্তৃতা শ্রবণ করে এবং একেই বাহাদুরির সঙ্গে প্রচার করে। কারণ দর্শনকে এরা নিজেদের জীবনের কোনো গুরুতর বিষয় বলে মনে করে না। পরিশেষে বৃদ্ধ হয়ে তারা হিরাক্লিটাসের সূর্যের ন্যায়* চিরদিনের জন্য অস্তমিত হয়ে যায়। কারণ দ্বিতীয়বার তাদের উদয় ঘটে না।

[হিরাক্লিটাস বলতেন কোনোদিনই পুরনো সূর্যের উদয় ঘটে না। প্রতি সন্ধ্যায় দিনের সূর্য নিভে যায়। প্রতি সকালে নূতন সূর্যের দীপকে জালানো হয়। কথাটির দার্শনিক তাৎপর্য আছে। হিরাক্লিটাস মনে করতেন নিত্য পরিবর্তন হচ্ছে বিশ্বজগতের মূল সত্য। একটি নদীতে কেউ দ্বিতীয়বার নামতে পারে না। কারণ প্রতি মুহূর্তের নদীই নূতন নদী—একথাও হিরাক্লিটাসের। হিরাক্লিটাস প্রাচীন গ্রীসের অন্যতম বিখ্যাত দার্শনিক। তাঁর জীবনকাল ছিল : খ্রিঃ পূর্ব ৫৩৫ থেকে ৪৭৫।]

তা হলে তাদের অধ্যয়ন পদ্ধতি কী হওয়া সঙ্গত?

এর বিপরীতটিই হওয়া সঙ্গত। শৈশবে এবং কৈশোরে যে-দর্শন তারা শিক্ষালাভ করবে, সে-দর্শন তাদের কাঁচা বয়সের উপযোগী হতে হবে। এটি শিশুদের বৃদ্ধির বয়স। তারা বৃদ্ধি পেয়ে বয়স্ক মানুষে পরিণত হবে। এ-বয়সে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে তাদের দেহের গঠনের প্রতি যেন পরবর্তীকালে দর্শনের সেবায় তাদের শরীরকে তারা নিয়োজিত করতে পারে। তাই বয়স যত তাদের বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং বুদ্ধি তাদের পরিপক্ক হতে থাকবে তত আত্মার চর্চা তাদের অধ্যয়নের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াবে। পরে যখন তারা বৃদ্ধ হবে, বেসামরিক এবং সামরিক দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণের সময় যখন এসে যাবে, যখন তারা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে তখন আর তাদের জন্য কোনো গুরুভার পরিশ্রমের কাজ আমরা নির্দিষ্ট করব না। তারা এবার শান্তিতে জীবন কাটাক এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনে অনুরূপ শান্তির কল্পনা করুক।

তুমি বেশ সাহসের সঙ্গে কথাটি বলেছ, সক্রেটিস। তোমার এ-অভিমত সম্পর্কে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবু আমার ধারণা তোমার শ্রোতাদের অধিকাংশই, অধিকতর সাহসের সঙ্গে তোমার বিরোধিতা করবে। তারা, এবং বিশেষ করে থ্র্যাসিমেকাস, তোমার এ-অভিমতে আস্থা স্থাপন করবে না।

কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস, তুমি এ্যাসিমেকাসের সঙ্গে আমার ঝগড়া বাধিয়ে দিও না। খুবই সম্প্রতি আমরা একটা মিটমাট করেছি এবং সুহৃদে পরিণত হয়েছি। অবশ্য আমি বলব না আমরা কখনো শত্রু ছিলাম। আমার চেষ্টাটি আমি শক্তিমতো চালিয়ে যাব যতক্ষণ-না আমি তাদের মনে প্রত্যয় সৃষ্টি করতে পারি কিংবা এমন কিছু তাদের জন্য করতে পারি যা তাদের পরবর্তী জীবনে, তাদের অস্তিত্বের অপর কোনো পর্যায়ে, এরূপ আলোচনায় তাদের সাহায্য করতে পারবে।

তাদের অস্তিত্বের সে-পর্যায়টি আসতে বেশ বিলম্ব আছে, সক্রেটিস।

সত্য, এ্যাডিম্যান্টাস। কিন্তু অনন্তকালের তুলনায় সে বিলম্বের দৈর্ঘ্য কতটুকু? তা হলেও এটা আমার জন্য বিস্ময়ের ব্যাপার কিছু নয় যে, তারা আমাকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করছে। কারণ যার সম্পর্কে আমরা বর্তমানে আলোচনা করছি তাকে বাস্তবায়িত হতে তারা কখনো দেখেনি। তারা শব্দের কৃত্রিম যোজনার ভিত্তিতে দর্শনের প্রচলিত অনুকরণকেই মাত্র দেখেছে*—তারা আমাদের আলোচিত বিষয় অর্থাৎ শব্দের যথার্থ ঐক্যকে প্রত্যক্ষ করেনি। কিংবা তারা তেমন মানুষকে দেখেনি, যে আমাদের আদর্শ অনুসরণ করে জীবনযাপন করেছে এবং যার কথায় ও কাজে পূর্ণ সঙ্গতি ঘটেছে। এরূপ সঙ্গতিময় মানুষ তারই মতো সঙ্গতিপূর্ণ একটি নগরকে শাসন করছে—এ-দৃশ্য তাদের কেউ কখনো দেখেনি। তুমি কী বল এ্যাডিম্যান্টাস?

[* এ-সমালোচনার লক্ষ্য আইসোক্রাটিসের একাডেমিতে অনুসৃত শিক্ষাপদ্ধতি হতে পারে। আইসোক্রাটিস (৪৩৬–৩৩৮ খ্রিঃ পূঃ) প্লেটোর সমকালীন প্রখ্যাত শিক্ষক।]

না, এ-দৃশ্য তারা কখনো দেখেনি।

না, এরূপ তারা দেখেনি। এবং মুক্ত এবং মহৎ চিন্তার আলোচনা—যে-আলোচনার উৎস জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা এবং সত্য আবিষ্কার, যে-আলোচনায় মানুষের সকল ইন্দ্রিয়কে কেন্দ্রীভূত হতে হয়, সে-আলোচনাও তারা খুব কমই শুনেছে। যে-আলোচনার সঙ্গে আদালত কিংবা বক্তৃতামঞ্চের বক্তৃতার কলাকৌশলের কোনো সম্পর্ক নেই সে-আলোচনাও তারা খুব কমই শ্রবণ করেছে। তাদের পরিচয় আদালত এবং জনসম্মেলনের বক্তৃতার সঙ্গে যার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে কূটকৌশলে জনমতকে প্রভাবান্বিত করা এবং নিজের পক্ষকে জয়যুক্ত করা।

তোমার একথা সত্য, সক্রেটিস।

এ-সমস্ত কারণের জন্য এবং এই পরিস্থিতি স্মরণ রেখে, ভীত হলেও সততার স্বার্থে আমাকে বলতে হয়েছে যে, যাদের আমরা সংখ্যালঘু বলছি কলুষতামুক্ত সেই কতিপয় দার্শনিক, যাদের এখন অপদার্থ বলা হচ্ছে, তারা যতক্ষণ শাসন করতে বাধ্য না হবে, যতক্ষণ তারা রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করবে, এবং সমাজকে তাদের কথা শুনতে বাধ্য না করবে কিংবা যতক্ষণ বিধাতা আমাদের বর্তমান শাসকদের মনে কিংবা তাদের সন্তানদের মনে যথার্থ দর্শনের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি না করবে ততক্ষণ সকল ত্রুটিশূন্য সর্বোত্তম রাষ্ট্র কিংবা সমাজ বা ব্যক্তি কখনো জগতে বাস্তব রূপ লাভ করতে পারবে না। এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, এদের কোনোটাই সম্ভব হবে না। তাদের কোনোটিই যদি সম্ভব না হয় তা হলে অবশ্য দিবাস্বপ্নের জন্য পরিহাস এবং বিদ্রূপই আমাদের যুক্তিসঙ্গত প্রাপ্য হবে। তুমি কী বল?

হ্যাঁ, তা-ই আমাদের প্রাপ্য হবে।

আমরা বরঞ্চ বলব যে, সেই অনন্ত অতীতে কিংবা ভবিষ্যতে কিংবা বর্তমানে কোথাও, হোক না সে আমাদের পরিচিত দিগন্তের বাইরে অপর কোনো দেশে, যথার্থ দার্শনিক যদি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে থাকে তা হলে যে-রাষ্ট্রের বর্ণনা আমরা করেছি সে-রাষ্ট্র অবশ্যই বাস্তবায়িত হয়েছে কিংবা সে অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। তখন দর্শনই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়াবে। এর মধ্যে কোনো অসম্ভবতা নেই। যা আমরা বলেছি তা অবশ্যই কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।

আমি তোমার সাথে একমত, সক্রেটিস।

হ্যাঁ, কিন্তু মনে কোরো না যে জনতা আমাদের সঙ্গে একমত হবে?

সম্ভবত তারা আমাদের সঙ্গে একমত হবে না।

কিন্তু এ্যাডিম্যান্টাস, জনতার বিরুদ্ধে এরূপ অভিযোগ উত্থাপন করা আমাদের সঙ্গত নয়। কেননা জনতার উপর জবরদস্তি না করে, তাদের সঙ্গে নম্র ব্যবহার করলে তারা সহজেই তাদের মত পরিবর্তন করে। তুমি যদি তাদের বুঝিয়ে বল যে, দার্শনিক বলতে তারা যা বুঝেছিল তা ঠিক নয়, তুমি যদি দার্শনিকদের চরিত্র এবং আচরণকে একটু পূর্বে যেরূপ ব্যাখ্যা করেছ অনুরূপভাবে জনতার নিকট ব্যাখ্যা কর তা হলে জনতা দার্শনিক সম্পর্কে তাদের মত পরিবর্তন করবে। অথবা তুমি কি মনে কর, তুমি যদি অভদ্র আচরণ না কর তা হলে নম্রস্বভাবের লোকও তোমার প্রতি অভদ্র আচরণ করবে? আমি কিন্তু মনে করি না যে, অধিকসংখ্যক মানুষই এরূপ বিকৃতমনা। এই বিকার অধিকসংখ্যকের নয়; এরূপ বিকৃতি তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যকেরই বৈশিষ্ট্য।

এক্ষেত্রেও আমি তোমার সঙ্গে একমত, সক্রেটিস।

তা হলে এ-বিষয়েও নিশ্চয়ই তুমি একমত হবে যে, অধিকসংখ্যক মানুষের দর্শনের প্রতি এই যে বিরাগ এবং বিরূপ ধারণা তার মূল রয়েছে সেই উচ্ছৃঙ্খল অনধিকার-প্রবেশকারীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, ঈর্ষা এবং আদর্শ পরিত্যাগ করে ব্যক্তিকে সকল চিন্তার কেন্দ্রে পরিণত করার প্রবণতা। ঠিক নয় কি?

খুব ঠিক কথা।

কারণ, এ্যাডিম্যান্টাস, যে যথার্থ দার্শনিক তার মন সাধারণ মানুষের চেয়ে উঁচুস্তরে বিচরণ করে। সাধারণ মানুষের ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব, কলহপূর্ণ জীবন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হওয়ার সময় দার্শনিকের থাকতে পারে না। দার্শনিকের দৃষ্টি শাশ্বত অপরিবর্তনীয় সত্যের প্রতি নিবদ্ধ। তার লক্ষ্যের সেই রাজ্যে অন্যায়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। সে-রাজ্যের সবকিছু যুক্তি এবং সঙ্গতির সূত্রে বাঁধা। আর এই যুক্তি এবং সঙ্গতির আদর্শ হচ্ছে দার্শনিকের আরাধ্য। একেই সে নিজের চরিত্রে বাস্তবায়িত করে তোলে। কারণ, যে-মানুষ যাকে ভালোবাসে তার অনুকরণে কোনোকিছুই প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এ-কাজে কেউ কি তাকে বাধা দিতে পারে?

না, এরূপ বাধাদান অসম্ভব।

আর ঐশ্বরিক সেই সঙ্গতির একাত্মতায় দার্শনিক নিজেও সঙ্গতি এবং শৃঙ্খলার আকর হয়ে ওঠে। নানা আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষের পক্ষে যতখানি সম্ভব, আমাদের দার্শনিক ততখানি ঐশ্বরিক চরিত্রে চরিত্রবান হয়ে উঠবে। ঠিক নয় কি?

অবশ্যই।

এখন তার উপর যদি দায়িত্ব পড়ে, শুধু নিজের চরিত্র গড়ার নয়, রাষ্ট্র এবং মানুষের চরিত্র পরিবর্তন করার, তা হলে এ্যাডিম্যান্টাস, তুমি কি মনে কর সে ন্যায়, সংযম এবং অপর সব গুণের অদক্ষ কারিগর বলে প্রমাণিত হবে?

না, সে অদক্ষ কেন হবে?

আর পৃথিবীর মানুষ যখন দেখবে, দার্শনিক সম্পর্কে আমরা যা বলছি তা যথার্থ, তখন কি জনতা দর্শনের উপর ক্রোধান্বিত হয়ে উঠবে? আমরা যদি তাদের বলি, যে নগরের নকশা ঐশ্বরিক পরিকল্পনার জ্ঞানে জ্ঞানী শিল্পী অঙ্কন করে না, সে-নগরী কখনো সুখী হতে পারে না, তা হলে কি তারা আমাদের অবিশ্বাস করবে? কিংবা আমাদের উপর ক্রোধান্বিত হবে?

না, তারা বুঝতে পারলে আমাদের উপর অবশ্যই ক্রোধান্বিত হবে না। কিন্তু রাষ্ট্রের যে-রূপরেখার কথা তুমি বলছ, তা কেমন করে তারা অঙ্কিত করবে?

আমি বলব তাদের করণীয় হবে রাষ্ট্র এবং তার মানুষকে ধুয়েমুছে তাকে নিষ্কলঙ্ক বা নি-দাগ এক-একটি প্লেটে পরিণত করা। কাজটি অবশ্যই সহজ নয়। কিন্তু কঠিন কিংবা সহজ যা-ই হোক, তাদের সঙ্গে অন্য বিধানকারীর এই হবে পার্থক্য। আমাদের রাষ্ট্রের দার্শনিক শিল্পীরা যতক্ষণ তাদের ছবি আঁকার পটকে পূর্ণরূপে নিষ্কলঙ্ক করতে না পারছে ততক্ষণ ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্র কারোর জন্যই তারা কিছু করবে না কিংবা কোনো বিধানও তারা প্রণয়ন করতে সম্মত হবে না।

এক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক

এই কাজ সম্পন্ন হলে তারা রাষ্ট্রের সংবিধান বা সংগঠনের রূপরেখাটি তৈরি করবে।

হ্যাঁ, এবার তা-ই তাদের করণীয়।

আর এই কাজটি যখন তারা সম্পূর্ণ করতে থাকবে তখন তাদের দৃষ্টিকে নিয়ত ঊর্ধ্বে এবং নিম্নে চালনা করতে হবে। অর্থাৎ এ-কাজের জন্য যেমন প্রথমে তাদের পরম ন্যায়, সুন্দর এবং সংযমের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে, তেমনি আবার এই পরম সত্তার সঙ্গে তাদের মানবিক প্রতিরূপকে তুলনা করতে হবে। বিভিন্ন উপাদান তাদের গ্রহণ করতে হবে। সকল উপাদানকে সঙ্গতির সূত্রে মিশ্রিত করে তারা পরম ন্যায়ের মূর্ত রূপের আদর্শে এমন মানুষ তৈরি করবে যাকে আমরা হোমারের ভাষায় বলতে পারব : ‘এ হচ্ছে মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি।’

তোমার কথাটি খুবই ঠিক ।

তাদের এই শিল্পকর্মে কখনো তারা একটি বৈশিষ্ট্যকে মুছে অপর একটি বৈশিষ্ট্যকে স্থাপন করবে। যতক্ষণ তাদের সাধ্যমতো তাকে ঈশ্বরের সকল বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট করে তুলতে তারা সক্ষম না হচ্ছে ততক্ষণ এই প্রচেষ্টায় তারা নিরত থাকবে, ঠিক নয় কি।

অবশ্যই ঠিক। অপর কোনো উপায়ে তাদের পক্ষে সুন্দরের কোনো ছবি অঙ্কন করা সম্ভব হবে না।

এ্যাডিম্যান্টাস, তোমার কী মনে হয়? এবার কি সেই বিক্ষুব্ধ প্রতিপক্ষ একটু শান্ত মূর্তি ধারণ করবে? আমাদের প্রশংসিত শিল্পীর হাতে রাষ্ট্রের সংবিধানের ছবি-অঙ্কনের দায়িত্ব অর্পণ করায় তারা ক্রোধান্বিত হয়েছিল। শিল্পীর এই সুসম্পন্ন কর্ম দেখে এবার কি একটু শান্ত ভাব তারা ধারণ করবে?

হ্যাঁ সক্রেটিস, তাদের মধ্যে কোনো জ্ঞান থাকলে অবশ্যই তারা অনেকটা শান্ত হয়ে আসবে।

‘অনেকটা’ কেন? তাদের কি এখনও আপত্তির কোনো কারণ আছে বলে তুমি মনে কর? দার্শনিক জ্ঞান এবং সত্যের প্রেমিক, এ-বিষয়ে কি তারা এখনও সন্দেহ পোষণ করবে?

না, তারা এতটা যুক্তিহীন হবে, এরূপ আমি মনে করিনে।

আমরা কি বরঞ্চ বলতে পারিনে যে, আমরা যেরূপ বর্ণনা করেছি তাতে দার্শনিকের চরিত্র পরম উত্তমেরই সদৃশ হবে?

এ-বিষয়েও তারা আর সন্দেহ পোষণ করতে পারে না।

কিংবা তারা একথাও কি অস্বীকার করতে পারবে, উপযুক্ত পরিবেশে এই দার্শনিক সর্বোত্তম দার্শনিকে পরিণত হবে? এর বদলে যাদের আমরা নাকচ করেছি তাদেরকেই কি তারা অধিক পছন্দ করবে?

না, তা হতে পারে না।

তা হলে আমরা যদি আবার বলি : দার্শনিকরা যতক্ষণ শাসক না হবে ততক্ষণ রাষ্ট্র কিংবা ব্যক্তি কারোরই অমঙ্গল থেকে মুক্তি নেই কিংবা আমাদের কল্পিত আদর্শ রাষ্ট্রেরও বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবে আমাদের প্রতিপক্ষ কি এখনও আমাদের প্রতি বিরাগ পোষণ করব?

না, আমার তো মনে হয় তাদের বিরাগ অনেকটা প্রশমিত হবে।

বরঞ্চ, আমরা কি বলতে পারিনে, তাদের বিরাগ কেবল যে অনেকটা প্রশমিত হবে তা-ই নয়, তারা বেশ পরিমাণে সুজন হয়ে উঠবে? আমরা বলব, তাদের আস্থা সৃষ্টিতে আমরা সক্ষম হয়েছি। এবার অপর কোনো কারণ না থাকলে কেবল লজ্জার কারণে তারা আমাদের সঙ্গে সমঝোতা স্থাপন করতে অস্বীকার করতে পারে না। তুমি কী বল?

অবশ্যই।

ঠিক আছে। ধরা যাক, আমাদের মধ্যে সমঝোতা স্থাপিত হয়ে গেছে। এবার আমাদের অন্য কথাটিতে আসা যাক। রাজকুমার অর্থাৎ শাসকের সন্তানরাও যে স্বভাবগতভাবে দার্শনিক হতে পারে—একথাটিতে কি কারোর আপত্তি হতে পারে?

না, কারোরই এতে আপত্তি হতে পারে না।

আমরা ধরে নিলাম, এই দার্শনিক-শাসকরা জন্মগ্রহণ করেছে। তারা অস্তিত্বময় হয়েছে। এবার কি কেউ বলবে, এদের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়? অনিবার্যভাবে এরা কলুষিত এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে? তাদের বাঁচিয়ে রাখা যে সহজ নয়, তা আমরাও অস্বীকার করিনে। কিন্তু কোনোকালেই এদের মধ্যে কোনো একটি ব্যক্তির পক্ষেও কলুষমুক্ত থাকা সম্ভব হবে না—এমন কথা কে বলতে পারে?

না, তা কেউ বলতে পারে না।

আমি বললাম : বেশ! একটি বেঁচে থাকলেই আমাদের পক্ষে যথেষ্ট। একজন দার্শনিক-শাসকেরও যদি এমন একটি নগর থাকে যে-নগর তার ইচ্ছার বাধ্য, তা হলে যে-আদর্শ রাষ্ট্র সম্পর্কে সাধারণ পৃথিবী এত অবিশ্বাসী সে-আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয়ে উঠবে।

হ্যাঁ সক্রেটিস, এরূপ একটি লোকই যথেষ্ট।

আমরা যে-সমস্ত বিধান এবং সংগঠনের কথা আলোচনা করেছি আমাদের এই শাসক তাদের প্রবর্তন করবে। নাগরিকগণ এই সমস্ত বিধানকে স্বেচ্ছায় মেনে চলবে। ঠিক নয় কি?

অবশ্যই, সক্রেটিস।

আর আমরা যা বলছি তাতে অপরের সম্মত হওয়ার মধ্যে বিস্ময়ের কিছু কি আছে?

আমার তো মনে হয়, না। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

যাহোক, আমরা উপযুক্তভাবেই দেখিয়েছি যে, আমাদের পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়িত হয়, তা হলে সে অবশ্যই সর্বোত্তম হবে।

হ্যাঁ, আমরা উপযুক্তভাবেই দেখিয়েছি।

আমরা তা হলে বলব, যেসব বিধানের কথা আমরা বলেছি তাদের যদি প্রবর্তন করা যায় তা হলে তারা যে কেবল সর্বোত্তম হবে তা-ই নয়, তাদের প্রবর্তন কঠিন হলেও অসম্ভব হবে না।

উত্তম কথা।

তা হলে এ্যাডিম্যান্টাস, বহু কষ্ট এবং শ্রমের মধ্য দিয়ে একটি বিষয়ের উপান্তে এসে আমরা উপস্থিত হয়েছি একথা আমরা বলতে পারি। কিন্তু আলোচনার বিষয় আরও রয়েছে : আমাদের রাষ্ট্রের এই যে পরিত্রাতা, মুক্তিদাতা—কোন্ অধ্যয়ন এবং পরিচর্যার মাধ্যমে তাদের আমরা গঠিত করে তুলব? তাদের কোন্ বয়সের অধ্যয়নের বিষয় কী হবে?

হ্যাঁ, এ-প্রশ্ন তো রয়েছেই।