পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ৩.১৫

১৫

কেদার চাটুজ্জেরও সেই কথা।

গোড়ায় ব্রাহ্ম ছিল এখন ভক্তিতে সাকারবাদী হয়েছে। এত দৃষ্টিময় স্বাদময় হয়েছে যে বলছে দক্ষিণেশ্বরে এসে, ‘অন্য জায়গায় খেতে পাই না, এখানে পেট-ভরা পেলাম।’

‘সাধুসঙ্গ সর্বদা দরকার।’ কেদারকে বলছেন ঠাকুর, ‘সাধুই ঈশ্বরের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন।

‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’ কেদার বললে, ‘যেমন রেলের এঞ্জিন। পেছনে কত গাড়ি বাঁধা থাকে, টেনে নিয়ে যায়। কিংবা যেমন নদী। কত লোকের পিপাসা মেটায়। তেমনি সব মহাপুরুষ। তেমনি আপনি।’

ঈশ্বরের কথায় চোখ জলে ভেসে যায় কেদারের। সংসারে রুচি নেই। মন যেন পাদ-পদ্মলোভী মধুকর।

কালীঘরে মাকে প্রণাম করে এসেছেন, চাতালে বেরিয়ে এসে ঠাকুর আবার প্রণাম করলেন ভূমিষ্ঠ হয়ে। চেয়ে দেখলেন সামনে কেদার, রাম, মাস্টার আর তারক।

তারক মানে বেলঘরের তারক মুখুজ্জে। প্রথম যখন এসেছিল দক্ষিণেশ্বরে, চার বছর আগের কথা, তখন তার বয়স মোটে কুড়ি। বিয়ে করেছে। বাপ-মা আসতে দেয় না ঠাকুরের কাছে। কিন্তু ঠাকুর যে বাপ-মা’র চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। সঙ্গে সেবার একটি বন্ধু নিয়ে এসেছে। নাস্তিবাদী বন্ধু। নাকের ডগায় সব সময়ে একটু ব্যঙ্গের তীব্রতা।

ঘরে প্রদীপ জ্বলছে, ছোট খাটটিতে বসে আছেন ঠাকুর। তারককে দেখে শিশুর মত খুশি হয়ে উঠলেন, কিন্তু সঙ্গের ওই ল্যাজটি কোত্থেকে জুটিয়ে আনল? বন্ধুটিকে ঠাকুর বললেন, ‘একবার মন্দির সব দেখে এস না।’

বন্ধু উপেক্ষার একটা ভঙ্গি করল। বললে, ‘ও সব ঢের দেখা আছে।’

‘শোন,’ তারককে কাছে ডাকলেন ঠাকুর, ‘বিশালাক্ষীর দ, মেয়েমানুষের মায়াতে যেন ডুবিসনি। যে একবার পড়েছে সে আর উঠতে পারে না। তোর অনেক শক্তি, তুই পড়বি কেন? দেখি তোর হাত দেখি।’

ঠাকুর তারকের হাতের ওজন নিচ্ছেন। বললেন, ‘একটা আড় যে নেই তা নয়। আছে। কিন্তু আমি বলছি ওটুকু যাবে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবি আর মাঝে-মাঝে আসবি এখানে।’

তারক মাথা নোয়ালো। বললে, ‘বাবা-মা আসতে দেয় না।’

“জোর করে আসবি। বাপ-মা শিরোধার্য, কিন্তু ঈশ্বরের চেয়ে কম।

‘এটা কি বললেন মশাই?’ সেই বন্ধু ফোড়ন দিল: ‘যদি কারু মা দিব্যি দিয়ে বলে ছেলেকে, যাসনি দক্ষিণেশ্বরে, সে যাবে? মা’র অবাধ্য হবে?’

‘যে মা ওকথা বলে সে মা নয়, সে অবিদ্যা। সে মা’র অবাধ্য হলে কোনো দোষ হয় না।’ বললেন ঠাকুর: ‘ঈশ্বরের জন্যে গুরুবাক্য লঙ্ঘন করা চলে, কিন্তু মনে রাখিস, শুধু ঈশ্বরের জন্যে। তা ছাড়া অন্য সব কথা মাথা পেতে শুনতে হবে বাপ-মা’র। নির্বিবাদে, তর্ক-বিচার না করে।’

‘আপনি যে কথাটা বলছেন শাস্ত্রে এর দৃষ্টান্ত আছে?” বন্ধু আবার চিপটেন কাটলো।

‘বহু। ভরত রামের জন্যে শোনেনি কৈকেয়ীর কথা। প্রহ্লাদ কৃষ্ণের জন্যে শোনেনি হিরণ্যকশিপুর শাসন। বলি শোনেনি গুরু শুক্রাচার্যের কথা, জ্যেষ্ঠ ভাই রাবণের কথা শোনেনি বিভীষণ। আর গোপীরা? কৃষ্ণের জন্যে শোনেনি পতিদের নিষেধ। কি বাপু মিলছে শাস্ত্রের সঙ্গে?’

ওরা চলে গেলে পর ঠাকুর শুয়েছেন ছোট খাটটিতে, আর বলছেন মাস্টারকে, ‘বলতে পারো, ওর জন্যে আমি এত ব্যাকুল কেন? সঙ্গে ওটাকে আবার কেন নিয়ে এল?’ ‘বোধ হয় রাস্তার সঙ্গী।’ বললে মাস্টার, ‘অনেকটা পথ তাই একজনকে সঙ্গে করে এনেছে।

যদি সঙ্গী কেউ না জোটে ঈশ্বরই তোর সঙ্গী। ঐ নির্জনতাই তোর নিবিড়তা। কেউ সঙ্গে নেই বলেই তো সে চলেছে তোর পাশে-পাশে।

কালীঘর থেকে বেরিয়ে চাতালে ফের ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন ঠাকুর। তারকের চিবুক ধরে আদর করলেন।

‘নরেন রাঙাচক্ষু রুই, কিন্তু তুই হচ্ছিস মৃগেল।’

ভাবাবিষ্ট হয়ে ঘরের মেঝেতে বসেছেন ঠাকুর। পা দুখানি সামনের দিকে প্রসারিত। রাম আর কেদার নানা জাতের ফুল দিয়ে সেই পা দুখানি বন্দনা করছে। ঠাকুরের দুপায়ের দুই বুড়ো আঙুল ধরে বসে আছে কেদার। বিশ্বাস, স্পর্শে শক্তি সঞ্চার হবে। কিন্তু তাইতেই কি হয়? যিনি দেবার তিনি যদি না দেন শুধু তাঁর আঙুল ধরলে কিছু হবে না।

মা, ও আমার আঙুল ধরে কি করতে পারবে?’ ঠাকুর বলছেন অর্ধবাহ্যদশায়।

কেদার তো অপ্রস্তুত। মনের কথা কি করে টের পেয়েছেন অন্তর্যামী! তাড়াতাড়ি আঙুলে ছেড়ে দিয়ে হাত জোড় করলে।

মনের আরো কথা যেন টের পেয়েছেন। গোপনীয় নিগূঢ় কথা। প্রকাশ্যেই তাই বলছেন ঠাকুর, ‘মুখে বললে কি হবে যে মন নেই, কামকাঞ্চনে এখনো তোমার মন টানে! আমি বলি কি এগিয়ে পড়ো। একটু উদ্দীপন হয়েছে বলে মনে কোরো না যে সব হয়ে গেছে। চন্দন গাছের বনের পর আরো আছে, রূপার খনি, সোনার খনি, হীরে-মাণিক। এখনি থামলে চলবে কেন?’

কণ্ঠ শুকিয়ে গিয়েছে কেদারের। রামের দিকে চেয়ে বলছে ভয়ে ভয়ে, ‘ঠাকুর এ কি বলছেন!’

ঠিকই বলছেন। এমনি তো মনের মুখোমুখি হবে না, খালি পাশ কাটিয়ে যাবে। ঠাকুর মনের সঙ্গে সম্মুখে সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দিলেন। এখন দেখ একবার নিজের নির্ভেজাল রূপটুকু, আর আত্মতৃপ্তির আবরণ টেনে রেখো না। দেখ এখনো কত বিকৃতি, কত বৈচিত্ত্য। কৃপা পেয়েছ বলেই তো পেলে এই আত্মদর্শনের সুবিধে। দর্পণ আবার মার্জন করো। ক্ষালন করো ক্ষতক্লেদ।

‘এই কামকাঞ্চনই আবরণ। এত বড়-বড় গোঁফ, তবু তোমরা ওতেই রয়েছ জুজু হয়ে। বলো, ঠিক বলছি কিনা, মনে-মনে দেখ বিবেচনা করে–

কেদার চুপ করে আছে। ঠিক বলছেন!

‘যাকে ভূতে পায় সে জানতে পায় না তাকে ভূতে পেয়েছে। যারা কামকাঞ্চন নিয়ে থাকে, তারা নেশায় কিছু বুঝতে পারে না। যারা দাবাবোড়ে খেলে, তারা অনেক সময় জানে না, কি ঠিক চাল! কিন্তু যারা অন্তর থেকে দেখে তারা বুঝতে পারে।’ একদিন কেদারের বুকে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে হল ঠাকুরের, পারলেন না। বললেন, ‘ভিতরে অঙ্কট-বঙ্কট। ঢুকতে পারলাম না। বললাম তো, আসক্তি থাকলে হবে না। তাই তো ছোকরাদের অত ভালোবাসি। ওদের ভিতর এখনো বিষয়বুদ্ধি ঢোকেনি। অনেকেই নিত্যসিদ্ধ। জন্ম থেকেই টান ঈশ্বরের দিকে। যেন বনের মধ্যে ফোয়ারা বেরিয়ে পড়েছে। জল একেবারে বেরুচ্ছে কলকল করে। সেদিন আপিস যাবার পথে কেদার এসে হাজির। সরকারী একাউন্টেন্টের কাজ করে, থাকে হালিসহরে। সেখান থেকে কলকাতায় আসে। আসবার পথে কি মনে করে ঢুকেছে আজ দক্ষিণেশ্বরে। আপিসের পোশাক পরনে, চাপকান মায় ঘড়ি আর ঘড়ির চেন। হঠাৎ মন কেমন ব্যাকুল হয়েছে, দেখে যাই একবার ঠাকুরকে। যেই মনে হওয়া, অমনি গাড়ি থেকে নেমে পড়ে সটান দক্ষিণেশ্বর।

তাকে দেখেই ঠাকুরের বৃন্দাবনলীলার উদ্দীপন হল। প্রেমে বিহ্বল হয়ে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন ও রাধিকার ভাবে গেয়ে উঠলেন গদগদ হয়ে: সখি, সে বন কতদূর! যেথায় আমার শ্যামসুন্দর! আর যে চলিতে নারি।’

ঠাকুর দেখলেন কেদারের অন্তরে গোপীর ভাব। তার সেই ব্যাকুলতাটিই কৃষ্ণাম্বেষিণী গোপবালা!

ব্রজবন থেকে কৃষ্ণ যখন অকস্মাৎ অন্তর্হিত হলেন তখন গোপীদের কী দশা? বন হতে বনান্তরে খুঁজতে লাগল পাগলের মত। অশ্বত্থ আর অশোক, কিংশুক আর চম্পক, হে পরার্থ জীবিত বৃক্ষ, আমাদের প্রিয়তম কোন পথ দিয়ে চলে গেল তা কি তোমরা দেখেছ? হে তুলসী, যার বুকে থেকেও যার পদযুগল ধ্যান করো, তুমি কি দেখেছ কোথায় পড়েছে তার পদধূলি? মালতী আর যুথিকা, করস্পর্শে তোমাদের শিহরিত করে তিনি কি গেছেন এই পথ দিয়ে? সখীগণ দেখ, দেখ, এই ব্রততী শরীরে পুলক ধারণ করে বিরাজ করছে, তবে কি তিনি একে নখাঘাত কবে চলে গেছেন? হে তৃণাঞ্চিত পৃথিবী, কোন পুরুষভূষণের আলিঙ্গনে তোমার এই নবীন রোমাঞ্চ? কৃষ্ণবিরহে আমরা বিগতপ্রাণা, আমাদের পথ বলে দাও। পতি-পুত্র দ্বারা বারিতা হয়েও আমরা নিবৃত্ত হইনি। লোলায়িতকুণ্ডলকর্ণে ছুটে এসেছি এখানে। কেউ গোদোহন ফেলে এসেছি, কেউ বা দুগ্ধাবর্তন; কেউ শিশুকে স্তন্যপান করাচ্ছিলাম, কেউ বা করছিলাম অন্নপরিবেশন, কেউ বা অঙ্গরাগলেপন- যার যা হাতের কাজ সব ফেলে ছড়িয়ে ছুটে এসেছি তাঁর বাঁশি শুনে। সেই অরবিন্দনেত্র এতক্ষণ তো ছিলেন আমাদের সামনে, তিনি কোথায় গেলেন? কেন অদৃশ্য হলেন?

এই ব্যাকুলতাটিই বাস করছে কেদারের বুকের মধ্যে। এই ব্যাকুলতাই ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব বিধিবন্ধনের কাঁটাবেড়া।

অধর সেন বললে, ‘শিবনাথবাবু সাকার মানেন না।’

‘সেটা হয়তো তাঁর বোঝবার ভুল।’ বললে বিজয় গোস্বামী। ঠাকুরের দিকে ইশারা করলে: ‘ইনি যেমন বলেন, বহুরূপী কখনো এ রঙ কখনো সে রঙ। যার গাছতলায় বাসা সে ঠিক খবর রাখে। আমি ধ্যান করতে-করতে দেখতে পেলাম চালচিত্র। কত দেবতা, কত কি। আমি বললাম, আমি অত-শত বুঝি না, আমি তাঁর কাছে যাব, তবে বুঝব।’

ঠাকুর বললেন, ‘তোমার ঠিক-ঠিক দেখা হয়েছে।’

কেদারের মধ্যে তন্ময়তা এল। বললে, ‘ভক্তের জন্যে সাকার। প্রেমে ভক্ত সাকার দেখে। ধ্রুব যখন শ্রীহরিকে দর্শন করল, বললে, কুণ্ডল কেন দুলছে না? শ্রীহরি বললেন, তুমি দোলালেই দোলে।’

‘সব মানতে হয় গো সব মানতে হয়—নিরাকার সাকার সব। কালীঘরে ধ্যান করতে-করতে দেখলাম, রমণী। বললাম, মা, তুই এরূপেও আছিস? কোন রূপে কার সামনে কখন এসে দাঁড়াবেন কেউ জানে না।’

‘যাঁর অনন্ত শক্তি,’ বললে বিজয়, ‘তিনি অনন্তরূপে দেখা দিতে পারেন।’

‘সেই যে গো চিনির পাহাড়ে পিঁপড়ে গিয়েছিল।’ বললেন ঠাকুর, ‘এক দানা চিনি খেয়ে তার পেট ভরে গেল। আরেক দানা মুখে করে বাসায় নিয়ে যাচ্ছে। যাবার সময় ভাবছে, এবার এসে গোটা পাহাড়টা নিয়ে যাব। তেমনি একটু গীতা, একটু ভাগবত, একটু বা বেদান্ত পড়ে লোকে মনে করে আমি সব বুঝে ফেলেছি।’ নবগোপাল ঘোষ একবার তিন বছর আগে এসেছিল। তারপর ভুলে গিয়েছে দক্ষিণেশ্বরের কথা। কিন্তু ঠাকুর ভোলেননি। কি জানি কেন, তিন বছর বাদে ঠাকুর তাকে ডেকে পাঠালেন।

নবগোপাল তো অবাক। আমি তোমাকে ভুলে গিয়েছি অথচ তুমি আমাকে ভোলোনি। কিংবা এতদিন ভুলিয়ে রেখে শুভক্ষণ দেখে ডেকে পাঠিয়েছ। নবগোপাল পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল। বললে, ‘কামকাঞ্চনে ডুবে আছি, কি করে আমার ত্রাণ হবে! ‘কোনো চিন্তা নেই।’ ঠাকুর বললেন স্নিগ্ধাননে, ‘দিনে শুধু একবারটি আমায় মনে করো। শুধু একবার।

গুরু-শিষ্য বোঝাচ্ছেন ঠাকুর। যিনি ইষ্ট তিনিই গুরুরূপ ধরে আসেন। শবসাধনের পর যখন ইষ্টদর্শন হয় তখন গুরু এসে শিষ্যকে বলেন তুইই গুরু তুইই ইষ্ট। যখন পূর্ণজ্ঞান হয় তখন কে বা গুরু কে বা শিষ্য। সে বড় কঠিন ঠাঁই, গুরু শিষ্যে দেখা নাই।

কে একজন ভক্ত বলে উঠল, ‘তাই তো বলে গুরুর মাথা শিষ্যের পা।’

‘বোঝো মানে।’ বললে নবগোপাল, শিষ্যের মাথাটা গুরু আর গুরুর পা শিষ্যের।

‘না, ও মানে নয়।’ বললে গিরিশ, ‘বাপের ঘাড়ে ছেলে চড়েছে। শিষ্যের পা এসে ঠেকেছে গুরুর মাথায়।’

‘তবে তেমনি কচি ছেলে হতে হয়।’ বললে নবগোপাল, ‘কচি ছেলে হলেই তবে বাপ তুলবে কাঁধের উপর।’

হতে হবে সরলশুভ্র। হতে হবে লঘুমৃদু। হতে হবে মানহীন ভারহীন সহায়-সম্বলহীন। মা তখন ছেলেকে ধূলো থেকে কোলে, কোল থেকে কাঁধে তুলে নেবেন। চুমু খাবেন পদাম্বুজে।

বেলঘরের তারক মুখুজ্জে অমনি এক খাঁটি ছেলে, কচি ছেলে। দক্ষিণেশ্বর থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, ঠাকুর দেখলেন, তাঁর ভিতর থেকে আলো বেরিয়ে চলেছে তারকের পিছন পিছন। তারক অসহায়, তারক আশ্রিত অর্পিতসর্বস্ব। তাই তাকে একা ছেড়ে দিতে পারেন না। তাই তার সঙ্গ নেন, হাত ধরেন, পথ দেখান, শ্রান্ত হলে নেন তাকে কাঁধে করে।

কয়েকদিন পর আবার এসেছে, ঠাকুর সমাধিস্থ হয়ে তারকের বুকের উপর পা তুলে দিলেন। তারক আর কি চায়! যম ভয়লয়কারী পরম পদ। কারুণ্যকল্পদ্রুমের ধ্রুবচ্ছায়া! এ পদের বাইরে আর কী সম্পদ চাইবার আছে!

‘খুব উঁচু ঘর তারকের। তবে শরীর ধারণ করলেই যত গোল। স্থলন হল তো সাতজন্ম আসতে হবে। বড় সাবধানে থাকতে হয়। বাসনা থাকলেই দেহধারণ।’ বললেন ঠাকুর।

কে একজন ভক্ত বলে উঠল, ‘যাঁরা অবতার তাঁদেরও কি বাসনা থাকে?”

সরল ঠাকুর বললেন সহাস্যে, ‘কে জানে! তবে আমার দেখছি সব বাসনা যায়নি। এক সাধুর আলোয়ান দেখে ইচ্ছে হয়েছিল অমনি পরি একখানি। সেই ইচ্ছে এখনো আছে। জানি না আবার আসতে হবে কিনা-

বলরাম বসেছিল পাশে। হেসে উঠল শিশুর মত। বললে, ‘আপনার জন্ম হবে কি ঐ আলোয়ানের জন্যে?”

‘কে জানে। তবে শেষ পর্যন্ত একটি সৎ কামনা রাখতে হয়। ঐ চিন্তা করতে-করতে দেহত্যাগ হবে বলে। সাধুরা চার ধামের এক ধাম বাকি রাখে। হয়তো গেল না শ্রীক্ষেত্র। তা হলে জগন্নাথ ভাবতে-ভাবতে শরীর যাবে।’

ঘরের মধ্যে একজন গেরুয়াধারী লোক ঢুকল। ঠাকুরকে প্রণাম করলে। চিরকাল ঠাকুরকে ভণ্ড বলে এসেছে। তবু প্রণাম করবার ঘটা দেখ।

বলরাম হাসছে। ঠাকুর বলছেন, ‘বলুক গে ভণ্ড। হাসিসনি। কে জানে ভেক ধরেই হয়তো ওর ভিক্ষে মিলবে। ভেকেরও আদর করতে হয়। ভেক দেখলেও উদ্দীপন হয় সত্যবস্তুর।’

১৬

মনোমোহন মিত্তিরও ঈশ্বর মানে না। মেসো রায় বাহাদুর রাজেন্দ্র মিত্রের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে। বন্ধু বলতে রাম দত্ত, আরেক মেসোর ছেলে। সমপন্থী নাস্তিবাদী।

ব্রাহ্মসমাজের আওতায় এসেছে দুজনে। অথচ কেশব সেনই দক্ষিণেশ্বরে কোন এক সাধুর কথা লিখেছে কাগজে। কেশব যখন লিখেছে তখন উড়িয়ে দেওয়া যায় না। চল দেখে আসি।

নাস্তিকে-নাস্তিকে মাসতুতো ভাই। এল দুজন দক্ষিণেশ্বরে। রাম দত্ত তখন ডাক্তার, মেডিকেল কলেজে চাকরি করে, আর মনোমোহন বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে চল্লিশ টাকার কেরানি।

এসে দেখে ঠাকুরের দরজা বন্ধ। অবিশ্বাস নিয়ে এসেছে, বন্ধ তো থাকবেই। শরণাগতি নিয়ে আসত, খোলা পেত। শরণাগতি কি সহজে আসে?

‘ওরে হৃদে, মস্ত এক ডাক্তার এসেছে।’ ঠাকুর ডাকলেন হৃদয়কে: ‘তোর কি ভাগ্যি। নাড়ী দেখাবি তো এবেলা দেখিয়ে নে।

হৃদয় তখনি বাড়িয়ে দিল হাত। রাম দত্তও দিব্যি পরীক্ষা করল। কিন্তু হৃদয়ের হাত দেখে কি হবে! ঠাকুর রামকৃষ্ণের পা কই?

ঘন-ঘন আসা-যাওয়া করছে মনোমোহন, বিশ্বাসের পর্বত ভেদ করে নির্গত হয়েছে ভক্তির নির্ঝরিণী, ইচ্ছে হল পা দুখানি টেনে নেয় বুকের মধ্যে। কিন্তু কেন কে জানে, সেদিন পা দুখানি গুটিয়ে নিলেন ঠাকুর।

অভিমানে ফুলে উঠল মনোমোহন। বললে, ‘বড় যে পা গুটিয়ে নিলেন! শিগগির বার করুন, নইলে কাটারি এনে পা দুখানি কেটে নিয়ে যাব। আমার একার নয় সকল ভক্তের সাধ মেটাব বলে রাখছি।

তাড়াতাড়ি পা বার করে দিলেন ঠাকুর।

প্রার্থনায় না পাই, অভিমান করে নেব। নেব ছল করে জোর করে কৌশল করে। একদিন দক্ষিণেশ্বরে যাবার উদ্যোগ করছে, মাসি এসে বাধা দিল। বললে, যাস নে ওখানে। মাসির বাড়িতে থাকে তাঁর কথার অমান্য করা যায় না, কিন্তু দক্ষিণেশ্বরে না গিয়েই বা থাকা যায় কি করে। রাম দত্তকে সঙ্গে নিয়ে গেল তাই চুপি-চুপি। গিয়ে দেখে ঠাকুরের মুখ ভার। কি হল?

‘ভক্ত আসতে চায় দক্ষিণেশ্বরে কিন্তু তার মাসি তাকে আসতে দিতে নারাজ। ভয় হয় মাসির কথা শুনে সে আসা না বন্ধ করে!

আরেকদিন দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছে, বাধা দিল স্ত্রী। বললে, ‘মেয়েটার অসুখ, যেয়ো না বাড়ি ছেড়ে।’ কিন্তু দক্ষিণেশ্বরের ডাক যে ত্রৈলোক্যাকর্ষী বংশীর ডাক। স্ত্রীর কথা তাই কানে তুলল না। এবার আর সঙ্গে নিল না রামকে। কৃতকর্মের ফল সে নিজেই বহন করবে বলে একা গেল। গিয়ে দেখে ঠাকুর বিমর্ষ হয়ে বসে আছেন। ব্যাপার কি?

‘ভক্ত আসতে চায় দক্ষিণেশ্বরে কিন্তু তার স্ত্রী তাকে আসতে দিতে নারাজ। ভয় হয় বউয়ের কথা শুনে সে আসা না বন্ধ করে।’

আসা বন্ধ করল না মনোমোহন। আর থেকে-থেকে সঙ্গে আছে রাম দত্ত।

দুই নিরীহ গৃহস্থ কিন্তু আসলে দুই বিরাট আবিষ্কর্তা। মনোমোহন আবিষ্কার করল রাখালকে, রাম দত্ত নরেনকে। শুধু সন্ধান দিল না, ধরে নিয়ে এল ঠাকুরের কাছে। প্রতীক্ষিত বারুদের কাছে দুই উড়ন্ত বহ্নিকণা।

মনোমোহন, মহিমাচরণ আর মাস্টার বসে আছেন। মনোমোহনের দিকে চেয়ে বলছেন ঠাকুর, ‘সব রাম দেখছি। তোমরা সব বসে আছ, কিন্তু আমি দেখছি রামই সব এক-একটি হয়েছেন।’

‘তবে আপনি যেমন বলেন, আপো নারায়ণ—জলই নারায়ণ, তেমনি।’ বললে মনোমোহন, ‘জল কোথাও খাওয়া যায়, কোথাও বা মাত্র মুখে দেওয়া চলে, কোথাও বা শুধু বাসন মাজা।’

‘ঠিক তাই। কিন্তু তিনি ছাড়া কিছু নেই। জীব-জগৎ সব তিনি।’

চতুর্বিংশতি তত্ত্ব, সব তুমি। মন-বুদ্ধি-অহঙ্কার সব তুমি। পাপ-পূণ্য, সুখ-দুঃখ, সব তুমি। তুমিই ভোক্তা-ভোজ্য, আধার আধেয়। তুমিই অখণ্ডমণ্ডলাকার।

হাটখোলার সুরেশ দত্ত নাগমশায়ের বন্ধু। ঠাকুরের প্রতি ভক্তিতে দৃঢ়ীভূত। ঠাকুরকে একবার ভোগ দেবে, নতুনবাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে পাঠিয়েছে গাড়ি করে। নিজে চলেছে পায়ে হেঁটে, দইয়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে। গাড়িতে দিলে ঝাঁকুনিতে দই পাছে চলকে যায়, তাই এই ক্লেশসাধন। ভোগের দই, ভ্রষ্ট হতে পারবে না। তেমনি আমিও অভঙ্গ থাকব।

তেইশ নম্বর সিমলে স্ট্রিটে মনোমোহনের বাড়িতে এসেছেন ঠাকুর। বসেছেন বৈঠকখানায়। বলছেন, ‘যে অকিঞ্চন যে দীন তারই ভক্তি ঈশ্বরের সব চেয়ে প্রিয়। খোলমাখানো জাব যেমন গরুর প্রিয়। দূর্যোধনের কত ধন কত ঐশ্বর্য, তার বাড়ি ঠাকুর গেলেন না। গেলেন বিদুরের বাড়ি।’

পরামর্শের জন্যে বিদুরকে ডাকলেন ধৃতরাষ্ট্র। কত কিছু ঘটে গেল এর মধ্যে, কিছুই সুফল আনল না। জতুগৃহ দগ্ধ হল না। দ্যুতক্রীড়ায় হেরে গেল, দ্রৌপদীর বেশাভিমর্ষ হল, বনবাস-সত্য-পালন করে ফিরে এল পাণ্ডবেরা। রাজ্যভাগ দাবি করল। কৃষ্ণ এসেছিল অনুনয় করতে, ফিরিয়ে দেওয়া হল। এখন বিদুরের কি মত?

বিদুর বললে, ‘মহারাজ, কুরু কুলের কুশলের জন্যে মুধিষ্ঠিরকে দিন তার রাজ্যভাগ। অশিব দুর্যোধনকে ত্যাগ করুন।’

আর যায় কোথা। এ দাসীপুত্রকে কে ডেকে আনল এখানে? যার অন্নে পুষ্ট তারই সে বিরুদ্ধতা করছে? শ্বাস মাত্র অবশিষ্ট রেখে একে এখনি তাড়িয়ে দাও পুরী থেকে। গর্জে উঠল দুর্যোধন।

এও ভগবানেরই লীলা। দ্বারদেশে ধনুর্বাণ রেখে বেরিয়ে পড়ল বিদুর। পরিধানে কম্বল, ধূলিরুক্ষ কেশপাশ, বেরিয়ে পড়ল তীর্থোদ্দেশে। মুখে শুধু কৃষ্ণনাম। ‘রসিকশেখর কৃষ্ণ পরমকরুণ। সর্বাবস্থায যিনি সর্বচিত্তাকর্ষক। এত মধুর নিজের পর্যন্ত মনোহরণ করেন, নিজেকে নিজেই চান আলিঙ্গন করতে।

যে আকাঙ্ক্ষা অভাব থেকে জাগে তা দূষণস্বরূপ। আর যে আকাঙ্ক্ষা স্বভাব থেকে জাগে তা ভূষণস্বরূপ। ঈশ্বরের স্বভাবই হচ্ছে ভক্তের প্রীতিরস আস্বাদন। যত খান তত চান। কাউকে ছাড়েন না, যার থেকে যতটুকু পান নিংড়ে-নিংড়ে নেন। শ্রেষ্ঠকে পেলেও কনিষ্ঠকে ছাড়েন না, উত্তমকে পেলেও ছাড়েন না অধমকে। তিনি আর কারু বশীভূত নন শুধু ভক্তের বশীভূত। আর কারুতে বৎসল নন শুধু ভক্তে বৎসল।

‘বৎসের পিছে যেমন গাভী যায় তেমনি ভক্তের পিছে ভগবান যান।’ বললেন ঠাকুর। কথক প্রহ্লাদচরিত বলছে। হিরণ্যকশিপু যেমন নিন্দা করছে হরির, তেমনি নির্যাতন করছে প্রহ্লাদকে। তবু প্রহ্লাদের বিচ্যুতি নেই। হরিকে প্রার্থনা করছে, হে হরি, বাবাকে সুমতি দাও। আর আমাকে? আমাকে দাও অবিসংবাদিনী ভক্তি। ঠাকুর কাঁদছেন। পাশে বসে বিজয়, মনোমোহন, সুরেন্দ্র। বলছেন বিহ্বল কণ্ঠে, ‘আহা, ভক্তিই সার। সর্বদা তাঁর নাম করো ভক্তি হবে। দেখ না শিবনাথের কি ভক্তি! যেন রসে-ফেলা ছানাবড়া।

পরে আবার যখন এলেন মনোমোহনের বাড়ি, ঈশান মুখুজ্জের সঙ্গে কথা বলছেন ঠাকুর।

ঈশান বলছে, ‘সবাই যদি সংসার ত্যাগ করে তা হলে কি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কাজ হয় না?’

‘সবাই কেন ত্যাগ করবে? যাকে দিয়ে করাবার তাকে দিয়ে করাবেন। জোর করে কি কেউ ত্যাগ করতে পারে? মর্কট বৈরাগ্য কি বৈরাগ্য?” বলে ঠাকুর গল্প গাঁথলেন।

সেই যে বিধবার ছেলে, মা সুতো কেটে খায়, একটা কাজ পেয়েছিল সে কাজ চলে গিয়েছে। বেকার হয়ে বৈরাগ্য হল, গেরুয়া পরল, কাশীবাসী হল। কিছুদিন পরে মাকে চিঠি লিখলে। মা, আমার একটি চাকরি হয়েছে, দশ টাকা মাইনে। ওই মাইনে থেকেই সোনার আংটি কেনবার চেষ্টা করছে। ভোগের বাসনা যাবে কোথায়?

দ্বিতীয়বার, প্রাঙ্গণে বসেছেন। কেশব এসে প্রণাম করল। গৃহস্থ ভক্তেরা চার দিকে ব’সে।

‘সংসারে কর্ম বড় কঠিন।’ বলছেন ঠাকুর, বন-বন করে যদি ঘোরো, মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। কিন্তু যদি খুঁটি ধরে ঘোরো, আর ভয় নেই। ঘুরবে কিন্তু পড়বে না। কর্ম করো চুটিয়ে, কিন্তু ঈশ্বরকে ভুলো না।’

‘বড় কঠিন।’ কে একজন বললে। ‘তবে উপায় কি?’

উপায় অভ্যাসযোগ। ছুতোরের মেয়ে একদিকে চিঁড়ে কুটছে, ছেলেকে মাই দিচ্ছে, আবার খদ্দেরের সঙ্গে কথা কইছে, কিন্তু সর্বক্ষণ মন রয়েছে মুষলের দিকে। অভ্যাসের থেকেই অনুরাগ। কাঁদতে-কাঁদতে শোক, খেতে-খেতে খিদে। ডাকতে-ডাকতে ভালোবাসা। চলতে-চলতে পথ পাওয়া। প্রদীপ জ্বালতে জ্বালতে নিজে প্রদীপ হয়ে জ্বলে ওঠা!

হোক কঠিন। কঠিন বলেও যদি নিবৃত্ত না হও তবেই তো কৃপা করবেন। যারা সংসারে থেকেও তাঁকে ডাকতে পারে তারাই তো বীর ভক্ত। মাথায় বিশ মণ বোঝা তবু ঈশ্বরকে পাবার চেষ্টা করছে। যখনই ভগবান দেখবেন এই বীরত্বের কৃতিত্ব তখনই কৃপাস্পর্শে তাকে তিনি মর্যাদা দেবেন। আর তাঁর কৃপাস্পর্শে সমস্ত বোঝা হালকা হয়ে যাবে।

‘ভক্তি লাভ করে কর্ম করো।’ বলছেন ঠাকুর, ‘শুধু কাঁঠাল ভাঙলে হাতে আটা লাগবে। হাতে তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙলে আর আটা লাগবে না।’

নিজে একজন খুব বড় ভক্ত, মনে-মনে ঘোরতর স্পর্ধা মনোমোহনের। এ একরকম ভক্তির অহমিকা। কিন্তু ঠাকুর তার গর্ব চূর্ণ করে দিলেন। একদিন বললেন সকলের সামনে, ‘সুরেশের ভক্তিই সকলের চেয়ে বেশি।’

মনোমোহনের অভিমানে ঘা লাগল। ভাবল, তবে আর ঠাকুরের কাছে গিয়ে লাভ কি। ছাড়ল দক্ষিণেশ্বর। রবিবার রবিবার বৈঠক বসত সেখানে, তারও চৌকাঠ মাড়াল না।

কি হল হে তোমার বন্ধুর? আর আসে না কেন? ভালো আছে তো? রাম দত্তকে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

রাম দত্ত কিছু‍ই জানে না। খোঁজ নিয়ে জানল ভালোই আছে। তবে যাও না কেন? আমার খুশি।

ঠাকুরের কাছে খবর গেল। তিনি লোক পাঠালেন। মনোমোহন তা গ্রাহ্য করল না। বললে, ‘আমাকে তাঁর কি দরকার! তিনি তাঁর ভক্ত নিয়ে সুখে থাকুন। আমি তাঁর কে!’

অভিমানের কথা! আমার যখন ভক্তি নেই তখন আমাকে আবার ডাকা কেন! বারে বারে লোক পাঠাতে লাগলেন ঠাকুর, আর বারে বারেই তাদের ফিরিয়ে দিলে। বিরক্ত হয়ে মনোমোহন কোন্নগরে চলে গেল, সেখান থেকেই আফিস করতে লাগল, যাতে ঠাকুরের লোক তাকে ধরতে না পায়। ঠাকুরও ছাড়বার পাত্র নন। কোন্নগর পর্যন্ত ধাওয়া করলেন। একদিন পাঠিয়ে দিলেন খোদ রাখালকে।

রাখালকে ফিরে যেতে দিল না মনোমোহন। সঙ্গের লোকটিকে বলে দিল, ‘ঠাকুরকে গিয়ে বোলো, ভক্তিহীনকে ডেকে লাভ কি! আগে ভক্তি-টক্তি হোক, তারপর যাব একদিন।’

ক্রোধে পুড়তে লাগল মনোমোহন। বিপরীত আচরণ করছে বটে কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যেও ঠাকুরকে ভুলতে পারছে না। মন বসছে না আফিসের কাজে, থেকে থেকেই ছুটে যাচ্ছে দক্ষিণেশ্বর। যাকে পরিহার করতে চাইছে সর্বক্ষণ তারই উপর অভিনিবেশ!

যেমন কংসের অবস্থা। পান-ভোজন, ভ্রমণ-শয়ন, নিশ্বাস-প্রশ্বাস সর্ব সময়েই দেখছে চক্রধারীকে। কেশাকর্ষণ করে উচ্চ মঞ্চ থেকে ফেলছেন নিচে তখনো শ্রীকৃষ্ণকে দেখছে অপলক চোখে। দেখতে-দেখতে তাঁরই দুষ্প্রাপ্য রূপ প্রাপ্ত হচ্ছে।

তেমনি মনোমোহনেরও সব সময়ে মনোমোহনদর্শন। বৈমুখ্যের জন্যে সব সময়েই অভিমুখিতা। বৈরুপ্যের জন্যে সব সময়েই সারূপ্য। যাকে সরিয়ে দিতে চাই বারে-বারে তারই কাছটিতে গিয়ে বসা। যাকে এড়িয়ে যেতে চাই তাকেই জড়িয়ে ধরা। অশান্ত মনে দিন কাটছে মনোমোহনের। একদিন গঙ্গাস্নানে গিয়েছে, দেখল সামনে একখানি নৌকো। তাতে বলরাম বোস বসে। বলরামকে দেখে নমস্কার করল মনোমোহন। বলল, ‘কি সৌভাগ্য আমার! সকালেই ভক্তদর্শন।

কথার সুরে কি সেই পুরোনো অভিমানের ঝাঁজ রয়েছে লুকিয়ে?

হাসিমুখে বলরাম বললে, ‘শুধু ভক্ত নয়, গুজরত খোদ এসেছেন।’

কে, ঠাকুর? কোথায় তিনি? নৌকোর দিকে ফের চোখ পড়ল। কোথায়? ও তো নিরঞ্জন!

হ্যাঁ, নিরঞ্জনই তো! নিরঞ্জন বললে, ‘আপনি যান না কেন দক্ষিণেশ্বর? আপনি যান না বলে ঠাকুর ব্যাকুল হয়ে এসেছেন আপনার কাছে।’

এসেছেন? কোথায় তিনি? ঐ যে নিরঞ্জনের পাশটিতে বসে আছেন লুকিয়ে।

ওরে, না এসে কি পারি? তুই যে সর্বক্ষণ আমাকে ডাকছিস। তুই যে আমাকে দূরে রাখছিস ঐ তো তোর আমাকে কাছে ডাকা। ঠেলে দিচ্ছিস বারে-বারে ঐ তো তোর আমাকে কাছে টানা। আমাকে তুই আর বসে থাকতে দিলি কই?

ঠাকুর সমাধিস্থ হলেন। জলের মধ্যেই মনোমোহন ছুটল তাঁর দিকে। জলের মধ্যেই প্রায় টলে পড়ে—ধরে ফেলল নিরঞ্জন। টেনে তুলল তাকে নৌকোয়। ঠাকুরের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল। কাঁদতে লাগল ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে।

আমি তোমাকে চাইনি, কিন্তু আশ্চর্য, তুমি আমাকে চেয়েছ। আমি তোমাকে পিছনে ফেলে পালাতে চেয়েছি, কিন্তু আশ্চর্য, সামনেই আবার তুমি দাঁড়িয়ে। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চেয়েছি, তুমি নিজেই কখন ধরা দিয়েছ। তোমাকে চাই না, এ কথা বললেও তুমি ছাড়ো না। তোমার কাছে না গেলেও তুমি আস। না ডাকলেও খুঁজে বার করো। বারে বারে হেরে গিয়ে জয়ী হও। তোমার সঙ্গে পারি এমন সাধ্য কি!

রসিকের কথা মনে আছে? সেই রসিক মেথর? দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ির ঝাড়ুদার? পঞ্চবটীর কাছটায় ঝাঁট দিচ্ছে, ঠাকুর যাচ্ছেন ঝাউতলার দিকে। পিছনে গাড়ু হাতে রামলাল। ঠাকুরকে দেখে সরে গেল রসিক। কে জানে যদি অশুচি ধূলির দূষিত স্পর্শ তাঁর গায়ে লাগে। ফেরবার সময় সরল না। কোমরের গামছাখানি খুলে গলায় জড়ালে। ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলে ঠাকুরকে।

ঠাকুর হাসিমুখে শুধোলেন, ‘কি রে রসিক, ভালো আছিস তো?’

‘বাবা, আমরা হীন জাত, হীন কর্ম করি, আমাদের আবার ভালো কি!’ হাত জোড় করে বললে রসিক!

মথুরবাবু ছাড়া আর কেউ বাবা বলতে পায়নি এতদিন। মথুরবাবুর পরে এই আবার রসিক মেথর। তার বাবাডাক মেনে নিলেন সস্নেহে। কিন্তু সতেজে বলে উঠলেন, ‘হীন জাত কি! তোর ভেতরে যে নারায়ণ আছেন। নিজেকে জানতে পাচ্ছিস না তাই হীন মনে করছিস—

‘কিন্তু কর্ম তো হীন।’

‘কি বলিস! কর্ম কি কখনো হীন হয়?’ ঠাকুর আবার বললেন তেজী গলায়: ‘এইখানে মায়ের দরবার, দ্বাদশ শিবের দরবার, রাধাকান্তের দরবার, কত সাধু সন্ত আসছে-যাচ্ছে, তাঁদের পায়ের ধূলো ছড়িয়ে আছে চারপাশে। ঝাঁট দিয়ে সেই ধুলো তুই তোর গায়ে মাখছিস! কত পবিত্ৰ কৰ্ম। কত ভাগ্যে এ সব মেলে বল দেখি।’ রসিক যেন আশ্বস্ত হল। বললে, ‘বাবা, আমি মুখ্‌খু তোমার সঙ্গে তো কথায় পারব না। কে বা পারবে তোমার সঙ্গে? শুধু একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞেস করি। বাবা, আমার গতিমুক্তি হবে তো?”

ঠাকুর চলে যাচ্ছেন, যেতে-যেতে বললেন, ‘হবে, হবে। বাড়ির উঠোনে তুলসী-কানন করে সন্ধ্যেবেলায় হরিনাম করবি, কোনো ভয় নেই।’

এ যেন স্থির হয়ে ঠিক বললেন না। কে জানে হয়তো বা স্তোক দিয়ে গেলেন।

রসিক পিছু নিল। প্রলুব্ধের মত জিজ্ঞেস করলে, ‘বাবা, সত্যি আমার গতিমুক্তি হবে?’

এক মূহুর্ত দাঁড়ালেন ঠাকুর। বললেন, ‘হবে হবে হবে। শেষ সময়ে হবে।’

ঠাকুরের অপ্রকট হবার পর দু বছর কেটে গেছে। একদিন কাজে রসিক না এসে এসেছে তার স্ত্রী। রামলাল জিজ্ঞেস করলে, ‘কি রে রসকে এল না কেন?’

‘বাবাঠাকুর, তার খুব জ্বর।’

পরদিন আবার রসিকের স্ত্রী এলে রামলাল কুশল-প্রশ্ন করল। রসিকের স্ত্রী বললে, ‘ভালো নয়। চার টাকা ভিজিট দিয়ে ভালো ডাক্তার আনা হয়েছিল। কিন্তু এমনি জেদ, ওষুধ কিছুতেই খাবে না। আমাকে বললে ঠাকুরবাড়ি থেকে চন্নামৃত নিয়ে আয়। চন্নামৃতই আমার ওষুধ।’

রামলাল চরণামৃত দিল। কালকে আবার কেমন থাকে না জানি।

মেথরপাড়ার মোড়ল এই বড়ো রসিক। কাঁচড়াপাড়ার কর্তাভজার দল থেকে দীক্ষা নিয়েছে। তুলসী-মালা জপ করে। ঠাকুরের কথা শুনে বাড়ির আঙিনায় কানন করেছে তুলসীর। মেথরদের সব ছেলে-বুড়ো নিয়ে রোজ সন্ধ্যেবেলা কীর্তন করে। হরি-নামের তুফান তোলে।

ভর দুপরবেলা সেদিন হঠাৎ স্ত্রীকে হুকুমজারি করলে, ‘আমাকে তুলসীতলায় নিয়ে চলো।’

সে কি কথা? স্ত্রী তো স্তম্ভিত!

ছেলেদের ডাকো। আমার এখন শরীর যাবে।’

‘তুমি তো এখন দিব্যি ভালো আছ–স্ত্রী প্রতিবাদ করল।

‘যা বলছি তাই শোনো। ছেলেদের ডাকো। তুলসীতলায় মাদুর বিছিয়ে শুইয়ে দাও আমাকে।’

একবার জেদ ধরলে কিছুতেই টলানো যায় না। ছেলেরা জোয়ান, রোজগেরে। বাপের কথায় ছুটে এল। ধরাধরি করে বের করে শুইয়ে দিল তুলসীতলায়। খাড়া রোদের মধ্যে।

‘আমার জপের মালা নিয়ে আয়।’ বললে রসিক। স্বাভাবিক সুস্থ কন্ঠস্বর। জপ করতে-করতে হঠাৎ যেন কি দেখতে লাগল তীক্ষ চোখে। সমস্ত রৌদ্রে যিনি ছায়াময় ও সমস্ত ছায়ায় যিনি জ্যোতির্ময় তিনি যেন দাঁড়িয়েছেন সামনে। তৃপ্তির একটি সচেতন লাবণ্য ফুটে উঠল মুখমণ্ডলে। বললে, ‘কি বাবা এয়েছ? তাই বলি, এয়েছ? আহা কি সুন্দর, কি সুন্দর!’ টান-টান শ্বাস কিছু হল না। বলতে-বলতে গভীর প্রশান্তিতে চোখ বুজল।

নীলকণ্ঠ মুখুজ্জে গান শোনাতে আসে ঠাকুরকে। কী সুস্বন সে গান! যে শোনে সেই মজে।

‘আহা, নীলকণ্ঠের গান কী চমৎকার!’ বলছেন শ্রীমা: ঠাকুর বড় ভালোবাসতেন। কি আনন্দেই তখন ছিলাম! কত রকমের লোকই তাঁর কাছে আসত। দক্ষিণেশ্বরে যেন আনন্দের হাটবাজার বসে যেত।’

তাঁর ঘরে মেঝেতে মাদুরের উপর বসে আছেন ঠাকুর। দীননাথ খাজাঞ্চিও দর্শন করতে এসেছে। পাঁচ-সাতজন সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ঘরে ঢুকল নীলকণ্ঠ। নীলকণ্ঠ না সুধাকণ্ঠ।

তাকে দেখে ঠাকুর বললেন, ‘আমি ভালো আছি।’

সেই ভালোটিই তো চাই। নীলকণ্ঠ যুক্তকরে বললে, ‘আমায়ও ভালো করুন। এই সংসারে পড়ে রয়েছি।’

‘পাঁচজনের জন্যে তিনি রেখেছেন তোমাকে সংসারে।’

পাঁচজনের সেবাতেই তো ঈশ্বরপূজা। তিনি কাজের মধ্য দিয়ে পূজা নিচ্ছেন। কাজ যেমন হোক, পূজা ঠিকই হচ্ছে। বলো এ তাঁর সংসার। যাদের সেবা করছি তারা তাঁরই প্রতিনিধি।

‘তুমি যাত্রাটি করেছ, তোমার ভক্তি দেখে কত লোকের উপকার হচ্ছে।’ বললেন রামকৃষ্ণ: ‘তুমি যদি এখন ছেড়ে দাও তোমার সাঙ্গোপাঙ্গরা কোথায় যাবেন?” ঠিকই তো। আমাকে দিয়ে কতগুলো লোকের ভরণপোষণ হচ্ছে। এ দিয়েই আমি ঈশ্বরের সাধন-ভজন করছি। যাকে দিয়ে তিনি যা করাবেন তাতেই তাঁর তুষ্টি। তস্মিন তুষ্টে জগৎ তুষ্টম্।

‘তোমাকে দিয়ে তিনি কাজ করিয়ে নিচ্ছেন, তাঁর যেমন খুশি। কাজ শেষ হলে তুমি আর ফিরবে না।’ আবার বলছেন রামকৃষ্ণ, ‘গৃহিণী সমস্ত সংসারের কাজ সেরে সকলকে খাইয়ে-দাইয়ে নাইতে যায়। তখন শত ডাকাডাকি করলেও ফেরে না।’

নীলকণ্ঠ বললে, ‘আমাকে আশীর্বাদ করুন।

‘যেকালে তাঁর নাম করতে তোমার চোখ জলে ভেসে যায় সেকালে আর তোমার ভাবনা কি? তাঁর উপরে তোমার যে ভালোবাসা এসেছে।’

শুধু ঐটিই তো মন্ত্র। ভালো হও আর ভালোবাসো। ভালো হতে পারলেই ভালোবাসবে। কিংবা ভালোবাসতে পারলেই ভালো হবে।

তোমার ও গানটি বেশ। শ্যামাপদে আশনদীর তীরে বাস।’ বলছেন ঠাকুর, ‘পদে যদি নির্ভর থাকে তা হলেই হল। তাই বলে চুপ করে থাকলে চলবে কি? ডাকতে হবে, কাজ করতে হবে। উকিল সওয়াল শেষ করে শেষে বলে, আমি যা বলবার বললাম, এখন হাকিমের হাত।’

সকালে নবীন নিয়োগীর বাড়িতে কীর্তন করে এসেছে নীলকণ্ঠ। সেখানে গিয়েছিলেন ঠাকুর। তবু আবার এসেছে বিকেলে। শত কথাবার্তার মধ্যেও এই অনুরাগের অঙ্গীকারটুকু রয়েছে প্রচ্ছন্ন হয়ে। শেষকালে বললেন, ‘তুমি সকালে এত গাইলে। আবার এখানে এসেছ কষ্ট করে। এখানে কিন্তু “অনারারি”।”

‘কি বলেন!’ নীলকণ্ঠ অভিভূতের মত বললে, ‘আমি এখান থেকে অমূল্য রতন নিয়ে যাব।’

‘সে অমূল্য রতন নিজের কাছে। না হলে তোমার গান অত ভালো লাগে কেন? রামপ্রসাদ সিদ্ধ, তাই তাঁর গান অত মধুর। জানো তো, সাধারণ জীবকে বলে মানুষ, যার চৈতন্য হয়েছে সে মানহুঁস। তুমি সেই মানহুঁসের দলে।’

মাস্টারমশায়ের সঙ্গে হরিবাবু এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। সন্ধ্যা সাতটা-আটটা। ছোট খাটটিতে মশারির মধ্যে বসে ধ্যান করছেন। ওরা এসে মেঝের উপর প্রণাম করে বসতেই ঠাকুর মশারির বাইরে এলেন। বললেন, ‘কে বা ধ্যান করে, কারই বা ধ্যান করি! যাই বলো তিনি ধ্যান করালেই তবে হবে। তুমি নিজের ইচ্ছেয় করো তোমার সাধ্য কি।

‘ইনি আপনাকে দর্শন করতে এসেছেন।’ হরিবাবুর দিকে ইশারা করল মাস্টার: ‘এঁর অনেকদিন পত্নীবিয়োগ হয়েছে, প্রায় এগারো বছর।’

‘তুমি কি কর গা?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।

হরিবাবুর হয়ে মাস্টারই বললে, ‘একরকম কিছুই করেন না। তবে বাপ-মা ভাই-ভগ্নীর সেবা করেন।’

ঠাকুর হাসলেন। বললেন, ‘সে কি গো, তুমি যে সেই কুমড়োকাটা বড়ঠাকুর হলে। না সংসারী না হরিভক্ত। এ কেমনতরো কথা?

বাড়িতে একরকম পুরুষ থাকে জানো, নিষ্কর্মা হয়ে বসে কেবল ভুড়ুর ভুড়ুর করে তামাক খায় আর মেয়েছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। কাজের মধ্যে মাঝে-মাঝে কুমড়ো কেটে দেওয়া। মেয়েদের কুমড়ো কাটতে নেই, তাই বড়ঠাকুরকে ডেকে আনায়। বলে কুমড়োটাকে দুখান করে দিন। বড়ঠাকুর তাই করে দেয় খুশি হয়ে। তার ঐ পর্যন্ত পৌরুষ। তাই তার নাম হয়েছে কুমড়োকাটা বড়ঠাকুর।

‘আমি বলি তুমি এও কর ওও কর। ঈশ্বরের পাদপদ্মে মন রেখে সংসারের কাজ করে যাও।’

শুধু কাজ করলে হবে না, কাজের সামনে একটি লক্ষ্য রাখতে হবে। কেন কাজ করছি, কিসের জন্যে, রাখতে হবে সেই একটি চেতনার উজ্জ্বলতা। ফলের জন্যে লাভের জন্যে জয়ের জন্যে কাজ করছি না, কাজ করছি তিনি কাজে লাগিয়েছেন বলে। আফিসের বড়বাবু তো চাকরি দেননি, চাকরি দিয়েছেন ঈশ্বর। তাই আফিসের বড়বাবুকে ফাঁকি দিয়ে আমার সুখ কই? সেই সর্বতশ্চক্ষু ঈশ্বরকে তো ফাঁকি দিতে পারব না। তাঁর কাজ তিনি বুঝে নেবেন, আমি শুধু করে যাই। যে পার্টে নামিয়েছেন অভিনয় করে যাই নিখুঁত করে। বাহবা পাই না পাই কিছু এসে যায় না। তাঁর দেওয়া পার্টটি তো করলাম জীবন ভরে-এই আমার সন্তোষ। আমি না হলে তাঁর এই বৃহৎ নাটক যে সম্পূর্ণ হত না, তাই আমার পার্টে তাঁরও তৃপ্তি। কর্ম করতে-করতেই মনের ময়লা কেটে যাবে। আর মনের ময়লা কাটলেই দেহ পরিশুদ্ধ হবে।

ঐ দেখ না, সেদিন শ্রীরাম মল্লিক এসেছিল, তাকে ছুঁতে পারলাম না। শ্রীরামের সঙ্গে ঠাকুরের খুব ভাব ছিল ছেলেবেলায়। একে-অন্যের অদর্শনে অস্থির হয়ে পড়ত। এত গলায় গলায় ভাব, লোকে বলত এদের ভিতর একজন মেয়ে হলে এদের বিয়ে হয়ে যেত। তাকে এখন দেখবার জন্যে ঠাকুরের খুব আগ্রহ। কতবার লোক পাঠিয়েছেন তার জন্যে তার ঠিক নেই।

একদিন এসে উপস্থিত শ্রীরাম। ছেলেপিলে হয়নি, একটি ভাইপো মানুষ করেছিল সেটি মরে গেছে। কেঁদে আকুল হল ভাইপোর জন্যে। কিন্তু শোকাগ্নিতে পড়েও পবিত্র হয়নি দেহ।

‘ছুঁতে পারলাম না।’ বললেন ঠাকুর, ‘দেখলাম তাতে আর কিছু নেই।’

সংসারে থাকব না তো যাব কোথায়? যেখানে থাকি রামের অযোধ্যায় আছি। এই জগৎ-সংসারই রামের অযোধ্যা। গুরুর কাছে জ্ঞানলাভ করবার পর রাম বললে, আমি সংসার ত্যাগ করব। দশরথ তাকে অনেক বোঝালো, রাম নিবৃত্ত হল না। তখন বশিষ্ঠকে পাঠাল দশরথ। বশিষ্ঠ দেখলে রামের তীব্র বৈরাগ্য। তখন বশিষ্ঠ রামকে বললে, আগে আমার সঙ্গে বিচার করো, তোমার জ্ঞানের বহরটা একবার দেখি, তারপর যেথা ইচ্ছা চলে যেও। রাম বললে, বেশ, বলুন কিসের বিচার? তখন বশিষ্ঠ বললে, আচ্ছা বলো, সংসার কি ঈশ্বরছাড়া? যদি ঈশ্বরছাড়া হয়, তুমি এ দণ্ডে তা ত্যাগ করো। রাম দেখল, ঈশ্বরই জীবজগৎ হয়েছেন। তাঁর সত্তাতেই সমস্ত কিছু সত্য হয়ে রয়েছে। তখন সে নিবৃত্ত হল।

‘সংসারে রেখেছেন তা কী করবে? সমস্ত তাঁকে সমর্পণ করো।’ বললেন ঠাকুর: ‘সংসারেই থাকো আর অরণ্যেই থাকো ঈশ্বর শুধু মনটি দেখেন।’

কলঙ্কসাগরে ভাসো কলঙ্ক না লাগে গায়।

১৭

ওরে যোগীন, যা তো, গিরিশের বাড়ি যা। আমার জন্যে একটা বাতি চেয়ে নিয়ে আয়। আমার বাতি ফুরিয়ে গেছে। আর শোন–ঠাকুর পিছু ডাকলেন। আর দেখে আয় সে কেমন আছে।

কে গিরিশ ঘোষ? ওই যে থিয়েটার করে। ওই যে মাতালের সর্দার! বাতি আনতে তার কাছে? কোথায় দক্ষিণেশ্বর, কোথায় বাগবাজার! কাছে-পিঠে কেউ কি রাখে না মোমবাতি?

কিন্তু উপায় নেই, ঠাকুরের হুকুম।

চলো বাগবাজার। বাড়ি নেই গিরিশ, কোথায় গিয়েছে নেমন্তন্ন খেতে। তবে আর কি, বসে থাকো। এই যে, ফিরেছে, কিন্তু এ কি চেহারা? টলছে, নেতিয়ে পড়ছে। ‘কে হে তুমি? চাই কি?’

‘আমাকে ঠাকুর পাঠিয়ে দিয়েছেন।’

‘ঠাকুর! আহা, ঠাকুর পাঠিয়ে দিয়েছেন!’ ঠাকুরের উদ্দেশে প্রণাম করল গিরিশ। ‘পাঠাবেন না? না পাঠিয়ে কি পারেন? গিরিশের জন্যে যে তাঁর মন পোড়ে।

‘একটা বাতি চেয়েছেন আপনার কাছে–

‘আহা, কি দয়া! একটা বাতির জন্যে এত দূরে পাঠিয়েছেন, আমার কাছে ?’ দক্ষিণেশ্বরের দিকে চেয়ে গড় করে প্রণাম করল এবার। ‘একটা কেন, এক বাণ্ডিল নিয়ে যাও।’

বলে উঠেই গালাগাল! সে আরেক মূর্তি। তুমি বাতি চাইবার আর জায়গা পাওনি? কেন, তোমার বরানগর-আলমবাজারে বাতি মেলে না! একেবারে আমার বাড়ি ধাওয়া করেছ! তুমি কোথাকার জমিদার, পেয়াদা পাঠিয়েছ সমন দিয়ে! আমি কি তোমার বাস্তুবাড়ির প্রজা, না, তুমি আমার মহাজন? বলেই খেউড় শুরু করল। মাতালের পাঁচফোড়ন ৷

বাতি একটা ছুঁড়ে দিল যোগেনের দিকে। নিয়ে যাও। অন্ধকারে আছে, একটু আলো জ্বালানো মন্দ নয়। আলোর অভাব বলেই তো এই দুর্দশা!

আবার গালাগাল।

বাতি নিয়ে ছুট দিল যোগেন। কি বদ্ধ মাতাল রে বাবা ! লাফিয়ে পড়ে কামড়ায়নি যে বড়, এই ভাগ্যি।

‘কি এক ত্ৰেপণ্ড মাতালের কাছেই পাঠিয়েছিলেন-

‘কেন, কি হল?’ প্রসন্ন মুখে তাকিয়ে রইলেন ঠাকুর।

‘খালি গালাগালি, খালি খিস্তি-খেউড়।’

‘কাকে?’

‘আর কাকে! আপনাকে।’

এতটুকুও লাগল না ঠাকুরকে। বললেন, ‘শুধু গালই দিলে, আর কিছু করলে না?’ ‘আপনার কথা বলতে প্রথমে প্রণাম করেছিল, উত্তর দিকে মুখ করে কি সব বলছিল বিড়-বিড় করে, আর মেঝেতে মাথা ঠেকিয়ে গড় করছিল বার-বার–

‘তবে?” উল্লসিত হলেন ঠাকুর। ‘তুই শুধু তার মন্দটা দেখলি, ভালোটা দেখলিনে? গালাগাল শুনলি, শুনলিনে তার ভক্তির মন্ত্র? টলে-পড়া দেখলি, দেখলিনে তার নুয়ে-পড়া?”

তাই তো দেখি সর্বক্ষণ। কার কোথায় ত্রুটি, কার কোথায় ন্যুনতা। আমরা ত্বকসর্বস্ব, অন্তঃসারের খবর নিই না। যেমন আমরা লোক তেমনি আমাদের বিচার। আধ-গ্লাশ জল কাছে থাকলে যে দোষদর্শী সে বলে, দেখলে? জল দিলে তো ‘গ্লাশটা ভরতি করে দিলে না! আর যে গুণগ্রাহী সে বলে, আহা কি ভালো, অন্তত আধ-গ্লাশ তো দিয়েছে!

কুব্জার মধ্যে কী দেখলেন শ্রীকৃষ্ণ? দেখলেন অনবদ্যাঙ্গী গৃহাঙ্গনা।

রাজপথ দিয়ে যাচ্ছেন, বক্রদেহা এক যুবতীর সঙ্গে দেখা। হাতে অঙ্গ-বিলেপের পাত্র। শ্রীকৃষ্ণ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি? এই বিলেপন কার জন্যে নিয়ে যাচ্ছ?

কুব্জা বললে, আমার নাম ত্রিবক্রা, আমি কংসের প্রধানা অঙ্গলেপন-দাসী।

‘এ লেপন আমাকে দাও।’ কৃষ্ণ হাত বাড়ালেন: ‘আমাকে দিলে তোমার শ্রেয়োলাভ হবে।

এক মুহর্তে দ্বিধা করল কুব্জা। এ লেপন কংসের অতি কামনীয়, কিন্তু এ রসিকশেখর পথিকের মত যোগ্যতর অধিকারী আর কে আছে? শুধু হাতের পাত্রের নয়, যেন প্রাণপাত্রের সমস্ত চন্দনলেপন দিয়ে দিল পথিককে।

শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছা হল ঐ কুব্জা যুবতীকে সরলাঙ্গী করে দিই। যেহেতু প্রাণের সরলতাটি আমায় দিয়েছে তখন আর তো ওর বাঁকা থাকবার কথা নয়। আমি ওকে ঋজু করে দিই।

কুব্জার দু পায়ের উপর নিজের দু পা রাখলেন শ্রীকৃষ্ণ। দু আঙুল দিয়ে তার চিবুক ধরে তার মুখখানি ঠেলে তুললেন উপরের দিকে। মুকুন্দস্পর্শে গরীয়সী কুব্জা মুহূর্তে উন্নতদর্শনা হয়ে উঠল। শ্রীকৃষ্ণের উত্তরীয় আকর্ষণ করে বললে, ‘হে বীর, আমার গৃহে চলো। তুমি আমার চিত্ত মথিত করেছ, তোমাকে কিছুক্ষণ আমার অতিথি হতেই হবে।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘হে সুভ্রু, আমি লোকদুঃখ মোচন করতে এসেছি। সে ব্ৰত সাঙ্গ হলে আসব তোমার ঘরে। আমি গৃহশূন্য পথিক, আর তোমার ঘর ঘরছাড়াদের আশ্রয়।’

মা, তাকে টেনে নিও, আমি আর ভাবতে পারি না।’ আকুল হয়ে কেঁদে উঠলেন ঠাকুর।

‘আমি নিতান্ত পাষণ্ড।’ করজোড়ে বলছে গিরিশ, ‘কত গালাগাল দিই আপনাকে।’

‘বেশ করো। গালাগাল, খারাপ কথা, অনেক বলো তুমি—তা হোক, ও সব বেরিয়ে যাওয়াই ভালো।’ অভয়ানন্দ ঠাকুর বললেন উদারম্বরে, ‘উপাধিনাশের সময়ই শব্দ হয়। পোড়বার সময় চড়চড় শব্দ করে কাঠ। পুড়ে গেলে আর শব্দ থাকে না।

‘কি উপায় হবে আমার?”

‘তুমি দিন-দিন শুদ্ধ হবে, দিন-দিন উন্নত হবে। লোকে দেখে অবাক মানবে।’ বলে মা’র দিকে তাকালেন। ‘মা, যে ভালো আছে তাকে ভালো করতে যাওয়ায় বাহাদুরি কি! মরাকে মেরে কি হবে? যে খাড়া আছে তাকে মারতে পারো তবে তো তোমার মহিমা!’

নরেন এসে প্রণাম করে বসল। বসল মেঝের উপর মাদুরে।

‘হ্যাঁ রে, ভালো আছিস? তুই নাকি গিরিশ ঘোষের কাছে প্রায়ই যাস?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, যাই মাঝে-মাঝে। সব সময় আপনার চিন্তায় মাতোয়ারা। মুখে কেবল আপনার কথা।’

‘কিন্তু রশুনের বাটি যত ধোও না কেন, গন্ধ একটা থাকবেই। যেন কাকে-ঠোকরানো আম। দেবতাকেও দেওয়া হয় না, নিজেরও সন্দেহ।’ বললেন ঠাকুর, ‘ওর থাক আলাদা। যোগও আছে ভোগও আছে। যেমন রাবণের ভাব। নাগকন্যা দেবকন্যাও নেবে, আবার রামকেও লাভ করবে।’

কিন্তু আগেকার সব সঙ্গ ছেড়েছে গিরিশ।’

কিন্তু সংস্কার যাওয়া কি সোজা কথা? সেই যে একজায়গায় সন্ন্যাসীরা বসে আছে, একটি স্ত্রীলোক সেখান দিয়ে চলে গেল। সকলেই ঈশ্বরধ্যান করছে, একজন হঠাৎ আড়চোখে দেখে নিলে। কি করবে, তিনটি ছেলে হবার পর সে সন্ন্যাসী হয়েছিল।

সংস্কারের অসীম ক্ষমতা। রাজার ছেলে, পূর্বজন্মে জন্মেছিল ধোপার ঘরে। রাজার ছেলে হয়ে যখন খেলা করছে, সমবয়সীদের বলছে, ‘ও সব খেলা থাক, আমি উপুড় হয়ে শুই, তোরা আমার পিঠে হুস-হুস করে কাপড় কাচ।’

‘বাবুই গাছে কি আম হয়?” বললেন ঠাকুর। ‘কে জানে, হতেও পারে। তেমন সিদ্ধাই থাকলে বাবুই গাছেও আম ধরে।’

কর্মাগ্নিতে অঙ্গার হীরক হয়। কাম প্রেম হয়। শুষ্ক তরুতে ফুল ধরে। তোমার কৃপার বাতাসটুকু যদি গায়ে লাগে, আমি অশত্থ বৃক্ষ, আমিও চন্দনতরু হয়ে যাব।

দৈব না পুরুষকার? কে না জানে, দুইই দরকার। শুধু একচাকায় কি রথ চলে, না এক দাঁড়ে নৌকো? শুধু পাল তুললেই তো হয় না, লাগসই হাওয়াটি চাই। মাঠে বীজ পুঁতলেই কি হবে? চাই সলিলসিঞ্চন।

কিন্তু এ দৈব কি? একটা নির্বুদ্ধির খামখেয়াল? যারা জড়, অবিবেকী ও ভীরু তারাই দৈব মানে। আমরা পুরুষসিংহ, আমরা পৌরুষ মানি, বিশ্বাস করি সমরে। আমরা মাটি খুঁড়ে ফসল ফলাই। যুদ্ধে জিতে ছিনিয়ে আনি রাজমুকুট।

সাধ্য কি শুষ্ক পৌরুষে সিদ্ধি পাই। কত শক্তিমান কৃতী লোক প্রাণপণ প্রযত্ন করছে: কত দুর্নিবার নিষ্ঠা, তবু কিছুতে কিছু হচ্ছে না। বিন্দুমাত্র কুলোচ্ছে না পৌরুষে। আবার কত অধম লোক কত অক্লেশে সফলকাম হচ্ছে। এ রহস্যের মানে কি? এর মানে হচ্ছে দৈব। প্রাক্তন বা পূর্বজন্মের কর্মের নামই দৈব। তাই দৈব আর কিছুই নয়, পূর্বকৃত পুরুষকার। এক কথায় প্রারব্ধ।

প্রারব্ধ দিয়ে তৈরি হল আমার ইহজন্মের পরিবেশ। ইহজন্মের পুরুষকার দিয়ে খণ্ডন করব সে পরিমণ্ডল। ব্যর্থ করব সে অদৃষ্টের বিধিলিপি।

যেমন বিশ্বামিত্র করেছিল।

চতুরঙ্গিণী সেনা নিয়ে পৃথিবীভ্রমণে বেরিয়েছিল, উপনীত হল বশিষ্ঠের আশ্রমে। সসৈন্য ক্ষত্রিয়রাজাকে যোগ্য অভ্যর্থনা করতে পারে এমন সামর্থ্য নেই সেই নিঃসম্বল ঋষির—এমনি মনে হল বিশ্বামিত্রের। তবু আতিথ্য নেবার জন্যে বারে বারে অনুরোধ করতে লাগল বশিষ্ঠ। বিশ্বামিত্র রাজী হল, কিন্তু এই বিপুল বাহিনীকে বশিষ্ঠ খাওয়াবে কি? ভাঁড়ে তো মা-ভবানী।

বিচিত্রবর্ণা কামধেনুকে আহবান করল বশিষ্ঠ। বললে, শবলা, অতিথি সৎকারের খাদ্য দাও।

কামদায়িনী শবলা ভূরি ভূরি খাদ্য-সৃষ্টি করল। দেখে তো বিশ্বামিত্রের চক্ষু স্থির, যে করে হোক লাভ করতে হবে এই কামদুঘাকে। বললে, ‘রত্নে রাজারই অধিকার। অতএব এই রত্ন আমাকে দান করুন। বিনিময়ে যা কিছু চান ধেনু বা ধন দিচ্ছি আপনাকে।’

অসম্ভব! এই শবলা থেকেই আমার হব্য কব্য, আমার প্রাণযাত্রা। শত কোটি ধেনু বা রাশীভূত রজত শবলার তুলনায় অকিঞ্চিৎকর। কিছুতে রাজী হল না বশিষ্ঠ। তখন বিশ্বামিত্র সবলে টেনে নিয়ে চলল শবলাকে। বশিষ্ঠকে উদ্দেশ করে সরোদনে বললে শবলা, ‘আপনি কি আমাকে ত্যাগ করলেন?”

আমি কি করব। এই বলোদ্ধত রাজা তোমাকে স্পর্ধাপূর্বক নিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে এর অক্ষৌহিণী সেনা। এর তুলনায় আমি কিছুই নয়। আমি নির্বল, নিস্তেজ।

কে বলে? আপনিই অধিক বলবান। ক্ষত্রবলের চেয়ে ব্রহ্মবল শ্রেষ্ঠ। ‘অনুমতি করুন, শবলা বললে দৃপ্তস্বরে, ‘আমি সৈন্য সৃষ্টি করি। বিধস্ত করি এই দুর্বৃত্তকে।

তথাস্তু। মুহূর্তে অগণন সৈন্য-সৃষ্টি করল শবলা। বিশ্বামিত্রের সমস্ত সৈন্য নির্জিত ও বিনষ্ট হল। শুধু তাই নয়, শতপুত্র মারা পড়ল একে-একে।

এ কী বিপর্যয়! নির্বেগ সমুদ্র, রাহুগ্রস্ত সূর্য ও ভগ্নদন্ত সাপের মত নিষ্প্রভ হল বিশ্বামিত্র। তখনো একটিমাত্র পুত্র বেঁচে আছে, তাকে রাজ্য দিয়ে চলে গেল হিমালয়ে। বসল শিবারাধনায়। কি বর চাও, তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব দেখা দিলেন। দিব্যাস্ত্র দাও, ত্রিজগতে যত অস্ত্র আছে, সব আনো আমার অধিকারে। মহাদেব বর দিলেন।

আর যায় কোথা! মহাবলে ধাবিত হল বিশ্বামিত্র। অস্ত্রানলে বশিষ্ঠের আশ্রম দগ্ধ করতে লাগল। আশ্রমবাসীরা পালাতে লাগল ঊর্ধ্বশ্বাসে। ভয় পেয়ো না, রৌদ্ৰ যেমন শিশির ধ্বংস করে, তেমনি আমি বিশ্বামিত্রকে শেষ করছি। বলে বশিষ্ঠ তার দণ্ড উত্তোলন করল। তার ব্রহ্মতেজপূর্ণ উদ্দণ্ড দণ্ড। যত অস্ত্র সংগ্রহ করেছিল বিশ্বামিত্র, ঐন্দ্র আর রৌদ্র, বারুণ আর পাশুপত, সব নিক্ষেপ করল একে-একে। কিছুতেই কিছু হবার নয়। বশিষ্ঠের ব্রহ্মদণ্ড সমস্ত অস্ত্র নিরাকৃত করল, নির্বাপিত করল সমস্ত কালানল।

ক্ষান্ত হোন, মুনি-ঋষিরা স্তব করতে লাগল বশিষ্ঠকে। বিশ্বামিত্র হতমান হয়েছে, বশীকৃত হয়েছে, স্তব্ধ হয়ে বসেছে অধোমুখে। আপনি আপনার দণ্ড সংবরণ করুন।

বিশ্বামিত্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, ক্ষত্রিয়বলকে ধিক, ব্রহ্মতেজই বল। তাই এক ব্রহ্মদণ্ডেই আমার সমস্ত অস্ত্র পরাজিত হল। এই ক্ষত্রিয়ত্ব পরিহার করে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করব তবে আমার নাম।

দুশ্চর তপস্যায় আরূঢ় হল বিশ্বামিত্র। চিত্তমল বিশোধিত হল। কাম ক্রোধ লোভ অনেক উপকরণ আসতে লাগল সামনে। বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। ধীরে-ধীরে উপনীত হল ব্রহ্মর্ষি পদবীতে।

দেবতারা অভিনন্দন করে বললে, তীব্র তপস্যা দ্বারা তুমি ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেছ। এস দীর্ঘ আয়ু গ্রহণ করো।

একেই বলে পুরষকার। প্রারব্ধনির্দিষ্ট গতি বদলে দিল পৌরুষ প্রাবল্যে। দুস্ত্যজ প্রকৃতিকেও অতিক্রম করলে তপস্যায়।

‘তোমার প্রকৃতিতে তোমায় কর্ম করাবে।’ বললেন ঠাকুর, ‘ভগবান অর্জুনকে বলছেন তুমি ইচ্ছে করলেই যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত হতে পারবে না। তোমায় যুদ্ধ করাবে তোমার প্রকৃতিতে। তা তুমি ইচ্ছে করো আর নাই করো। আমি চিন্তা করছি আমি ধ্যান করছি, এও কর্ম। আমার দান-যজ্ঞ এও কর্ম। নামগুণকীর্তনও কর্ম। কিন্তু যাই করো, ফল আকাঙ্ক্ষা করে কোরো না।’

মৃগ না মিলুক তবু ফিরব না মৃগয়া থেকে। মৃগয়ায় যে বেরুতে পেরেছি সেই আমার পরম লাভ।

১৮

দেবেন মজুমদারও নরেনের মত ঠাকুরকে পরীক্ষা করতে চায়। ঘর ফাঁকা দেখে কখন ঠাকুরের বিছানার নিচে ছোট্ট একটি রূপোর দু-আনি রেখে দিয়েছে।

বসতে গিয়ে উঠে পড়লেন ঠাকুর। আবার চেষ্টা করলেন বসতে, আবার উঠে পড়লেন।

‘এ কি, এমন হচ্ছে কেন? জিজ্ঞেস করলেন ঠিক দেবেন মজুমদারকেই। ‘ছুঁতে পাচ্ছি না কেন বিছানা?”

পরীক্ষকই ধরা পড়ে গেল। পাংশুমুখে স্বীকার করলে অপরাধ।

কিন্তু ঠাকুরের কোনো গ্লানি নেই। হাসিমুখে বললেন, ‘আমায় বিড়ে দেখছ নাকি? তা বেশ, বেশ।’

তবু আরো এক পরীক্ষা বুঝি বাকি আছে।

ঠাকুর নিজেই পাড়লেন সেই কথা। বললেন, ‘ওগো, মন বড় কেমন করছে। অনেক দিন দেখিনি তাকে।

কাকে? দেবেন তাকাল কৌতূহলী হয়ে।

ঠাকুর তার নাম করলেন। এ কি, এ যে স্ত্রীলোক! একজন স্ত্রীলোকের প্রতি ঠাকুরের টান! দেবেনের মন কালো হয়ে উঠল।

‘ওরে রামনেলো, রসগোল্লা নিয়ে আয়। খিদে পেয়েছে।’

অনেকগুলো নিয়ে এল রামলাল। একটি নিজে খেয়ে বাকিগুলো খাওয়ালেন দেবেনকে। বললেন, ‘এ সব সে-ই পাঠিয়েছে। এখানকে বড় ভালোবাসে। বড় ভালো লোক।’

মুখের স্বাদে যেন আর মিষ্টতা নেই এমনি মনে হল দেবেনের। এ কেমনধারা আকর্ষণ।

‘ওগো, তাকে বড় দেখতে ইচ্ছে করছে।’ ব্যস্ত হয়ে ঠাকুর পাইচারি শুরু করেছেন। সহসা ঝুঁকে পড়ে দেবেনের কানের কাছে মুখ এনে বললেন চুপি-চুপি, ‘আমাকে একটি টাকা দেবে?’

টাকা? কেন?

‘গাড়ি না হলে যেতেও পারি না, আবার গাড়ি করে গেলে তার ছেলে গাড়িভাড়া দিতে মনে বড় কষ্ট করে। তাই তোমার কাছে চাইছি। তুমি যদি দাও তবে একবার দেখে আসি।’

তার আর কি! দেব না-হয় যখন চাইছেন।

দেবেনের ভঙ্গি দেখে হাসলেন ঠাকুর। বললেন, ‘কিন্তু বলো আবার লিবে। কি, আবার লিবে তো?’

তা বেশ মশাই, শোধ যদি দেন তো নেব। টাকা বের করে রামলালের হাতে দিলে। রামলাল কলকাতা যাবার গাড়ি আনতে গেল।

মাস্টারমশাই ও লাটুর সঙ্গে দেবেনও উঠল গাড়িতে। যাই ব্যাপারটা দেখে আসি স্বচক্ষে।

পথে মন্দির পড়ছে তাকে প্রণাম করছেন ঠাকুর, মসজিদ পড়ছে তাকেও। শুধু তাই নয়, মদের দোকানকেও। কত লোককে এখানেও আনন্দ দিচ্ছেন মহামায়া। মদিরার কথা ভেবে মনে পড়ছে হরিনামের কথা। হরিরসমদিরা পিয়ে মম মানস মাতো রে! যার যাতে নেশা, যার যাতে আনন্দ!

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মেয়েরা। তাদের উদ্দেশেও প্রণাম করছেন ঠাকুর। বলছেন, মা আনন্দময়ী!

দেবেনের গা টিপলেন ঠাকুর। বললেন, ‘আমি কারু ভাব নষ্ট করি না।’

যার যা ভাব তার সেই ভাব রক্ষা করি। বৈষ্ণবকে বৈষ্ণবের ভাবটিই রাখতে বলি, শাক্তকে শাক্তের ভাব। তবে যেন এ কথা বোলো না, আমার ভাবই সত্য আর সব ভুয়ো। যে ভাবই হোক, যদি তা আন্তরিক হয় ঠিক পেয়ে যাবে ঠিকানা। ‘বারোয়ারিতে নানা মূর্তি করে, নানান মতের লোকের ভিড়। রাধাকৃষ্ণ, হরপার্বতী, সীতারাম। যারা বৈষ্ণব তারা রাধাকৃষ্ণের কাছে দাঁড়িয়ে দেখছে। যারা শাক্ত তারা হরপার্বতীর কাছে। যারা রামভক্ত তাদের সামনে সীতারাম। কিন্তু যাদের কোনো ঠাকুরের দিকে মন নেই,’ ঠাকুর হাসলেন: ‘তাদের কথা আলাদা। বেশ্যা তার উপপতিকে ঝাঁটাপেটা করছে এমন মূর্তিও করে বারোয়ারিতে। ও সব লোক তাই দেখছে হাঁ করে। দেখছে আর চেঁচাচ্ছে। বন্ধুদের ডাকছে, ওসব কি দেখছিস, আয়, এদিকে আয়।’

গাড়ি এসে পৌঁছল বাড়িতে।

ঠাকুর একা অন্দরমহলে ঢুকে পড়লেন।

সন্দেহ বুঝি আরো উগ্র হল দেবেনের। মাস্টারমশাই তখন গান ধরলেন: আমরা গোরার সঙ্গী হয়েও ভাব বুঝতে নারলুম রে। গোরা বন দেখে বৃন্দাবন ভাবে, ভাব বুঝতে নারলুম রে–

কিছুক্ষণ পরেই ঠাকুর আবার ফিরে এলেন। অসমাপ্ত গানের অবশিষ্টটুকু গাইতে লাগলেন। তবু সন্দেহ কি যায়। কালিমা কি ঘোচে!

ভিতর থেকে চাকর এসে আবার ডেকে নিয়ে গেল ঠাকুরকে। কতক্ষণ পরে আবার এল চাকর। এবার আপনারা আসুন।

ভেতরে গিয়ে কী দেখল দেবেন! দেখল আসনের উপর আলুথালু হয়ে ঠাকুর বসে আছেন, যেন পাঁচ বছরের ভোলানাথ ছেলে আর তাঁর সামনে বসে তাঁকে খাওয়াচ্ছেন এক বৃদ্ধা মহিলা, চোখে জল, মুখভাবে বাৎসল্যের লাবণ্য।

‘বাবা, চৈতন্যচরিতামৃতে পড়েছিলুম,’ বলছে সেই বৃদ্ধা গৃহিণী, ‘চৈতন্যদেবের মা চৈতন্যদেবকে খাইয়ে দিতেন নিজের হাতে। আমার মনে হত, আমি যদি শ্রীচৈতন্যের মা হতুম, এমনি করে খাওয়াতুম তাকে। কি আশ্চর্য, আমার সে আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হল। তুমি এসে উদয় হলে আমার জীবনে!’ বলছে আর কাঁদছে অনর্গল। কৃষ্ণ মথুরায় গেলে যশোদা এসেছিলেন শ্রীমতীর কাছে। ধ্যানস্থা ছিলেন শ্রীমতী। যশোদাকে বললেন, আমি আদ্যাশক্তি, তুমি আমার কাছে বর নাও। যশোদা বললেন, কি আর বর দেবে! শুধু এইটুকু করো, আমার গোপালকে আমি যেন প্রাণ ভরে সেবা করতে পারি, খাওয়াতে পারি হৃদয়মথিত স্নেহনবনী।

এই তো সেই যশোমতীর মাতৃপ্রতিমা।

কৃষ্ণ বললে, আমাকে অহৈতুকী ভক্তি দাও, অব্যবহিতা ভক্তি। ফলাভিসন্ধিরহিত অবিচ্ছিন্ন ভালোবাসা। কার জন্যে তোমার কাছে তোমার প্রাণ-বুদ্ধি দেহ-মন স্ত্রী-পুত্র এত প্রিয়, কার কৃপায়? যার জন্যে যার কৃপায় এই প্রিয়ত্ববোধ, তার চেয়ে প্রিয়তর আর কে আছে?

এই কি সেই প্রিয়-প্রীণন নয়?

আত্মধিক্কারে ভরে গেল দেবেন। এ কে নয়নভুলানো দেখা দিলেন চোখের সামনে! চোখে যেন আর পলক পড়তে চায় না। খাবার থালা কে দিয়ে গিয়েছে সমুখে। কিন্তু না, দাঁড়াও, এই বাৎসল্য-মাধুর্য আস্বাদন করি।

বাগবাজারের এক বড় ঘরের গৃহিণী—কেমন ইচ্ছে হল, যদি একবার যেতে পারতাম দক্ষিণেশ্বর। এত কথা শুনছি যাঁর সম্বন্ধে তাঁকে যদি দেখতে পেতাম চোখ ভরে। কেন প্রাণ উতলা হয় কে বলবে। ঈশ্বরপিপাসা তো কোনো হেতুবাদের উপর দাঁড়িয়ে নেই, ক্ষুৎপিপাসার মতই এ বৃত্তি স্বাভাবিকী। ভক্তিতে যত আনন্দ বাড়ে তেমন আর কিছুতে নয়। কেন না ভক্তিতেই আর দেহদুঃখ থাকে না, চিত্ত শান্ত ও অমৎসর হয়, ভোগে অনাসক্তি আসে। যত দুঃখ এই আসক্তি থেকে। আসক্তি চলে গেলেই একটা আশ্চর্য স্থিতিশক্তিতে জীবন দৃঢ় হয়ে ওঠে।

কে একজন আছে চেনা মহিলা, কয়েকবার যাতায়াত করেছে দক্ষিণেশ্বরে, তার শরণাপন্ন হল। বেশ তো, কালই চলো না। নৌকো করে যাব দুজনে।

পরদিন বিকেলে দুজনে এসে উপস্থিত। কিন্তু এ কি, ঠাকুরের ঘরের দরজা বন্ধ।

উত্তরের দেয়ালে দুটি ফোকর আছে, তারই ভিতর দিয়ে উঁকি মারল দুজনে। দেখল ঠাকুর শুয়ে আছেন, বিশ্রাম করছেন। এখন যাই কোথা? সারদামণিও নেই, গেছেন বাপের বাড়ি। এ-ওর মুখের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। এখন করি কি? অপেক্ষা করো। সমীপাগত হয়েছ, এখন যদি ধৈর্য না ধরো, তবে যাত্রা ব্যর্থ হয়ে যাবে। বয়ে যাবে লগ্ন। ক্লেশ-নদী অতিক্রম করে এসেছ, এখন কৃপাজলনিধিকে দেখে যাও।

নবতের দোতলার বারান্দায় গিয়ে বসে রইল দুজনে।

কিছু পরেই ঠাকুর উঠলেন। উত্তরের দরজা খুলতেই চোখ পড়ল মহিলাদের উপর। ওগো, তোরা এখানে আয়, ডেকে উঠলেন সানন্দে।

ঘরে এসে বসল পাশাপাশি। যে মহিলাটি পরিচিত, তক্তপোশ থেকে নেমে তার কাছটিতে এসে বসলেন ঠাকুর। বসতেই সে মহিলাটি লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। সরে যাবার জন্যে ত্বরিত ভঙ্গি করলে। ঠাকুর বললেন, ‘লজ্জা কি গো! লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন থাকতে নয়। শোনো, তোরাও যা আমিও তাই।’ নিজের দাড়িতে হাত দিলেন: ‘তবে এগুলো আছে বলে বুঝি লজ্জা? তাই না?”

কৃষ্ণান্বেষিণীদের আবার লজ্জা কি। শ্রবণ কীর্তন স্মরণ পদসেবন অর্চন বন্দন দাস্য সখ্য আত্মনিবেদন—এই নবলক্ষণা ভক্তি কৃষ্ণকে নিবেদন করো।

অনেক ভগবৎকথা শোনালেন ঠাকুর। সঙ্কোচের আড়ষ্টতা আর থাকল না। হরি-প্রসঙ্গ শেষে সাংসারিক কথাও পাড়লেন। বললেন, ‘সপ্তাহে অন্তত একবার করে এসো। প্রথম-প্রথম এখানে আসা-যাওয়াটা বেশি রাখতে হয়। কিন্তু নিত্য অত নৌকো বা গাড়িভাড়া দিতে যাবে কেন? শোনো, আসবার সময় তিন-চারজনে মিলে নৌকো নেবে আর যাবার সময় হেঁটে বরানগর গিযে সেখান থেকে শেয়ারে ঘোড়ার গাড়ি।’

১৯

আহিরিটোলার দিগম্বর ময়রার খাবারের খুব নাম-ডাক। ঠাকুরের জন্যে কিছু কিনে নিলে হয়।

মিহিদানা বাঁধা হচ্ছে। কি হে টাটকা না কি?

‘হাতে করে দেখুন না। কত গরম!’

এক সের কিনলে দেবেন মজুমদার। ঘাটে এসে দেখে খেয়ার নৌকো ছাড়ো-ছাড়ো। শুধু একজন যাত্রীর অপেক্ষা। উঠে বসলো এক লাফে।

মিষ্টির ঠোঙা কোলে নিয়ে বসলো সন্তর্পণে। এত ভিড়, ছোঁয়া বাঁচানো দুঃসাধ্য। পাশেই এক চাপদাড়িওয়ালা মুসলমান। ভীষণ গোপ্পে, মুখের আর কামাই নেই। ছুঁয়ে তো দিয়েইছে, কে জানে তার মুখামৃতের ছিটে-ফোঁটাও পড়ছে কি না ঠোঙার উপর।

বিশীর্ণ হয়ে গেল দেবেন। আর ঠাকুরকে দেওয়া চলবে না কিছুতেই। সেবার এক ঝুড়ি জিলিপি নিয়ে এসেছিল রাম দত্ত। পথে একটি ভিখিরি ছেলের সঙ্গে দেখা। তাকে কি ভেবে রাম একখানা জিলিপি দিয়ে দিল। ঠাকুর বললেন, “সব উচ্ছিষ্ট হয়ে গিয়েছে। দেবতার উদ্দিষ্ট বস্তুর আগ-ভাগ তুলে কাউকে দিলে তা উচ্ছিষ্ট হয়ে যায়।’

একখানা জিলিপি নিয়েছিলেন হাতে করে, গড়িয়ে ফেলে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেললেন গঙ্গাজলে।

গরুর গাড়িতে গুড়ের নাগরির মতন গায়ে গা ঠেকিয়ে বসা, তার পর এই মৌলবীর বকর-বকরের আর শেষ নেই। দরকার নেই এ মিষ্টি ঠাকুরের কাছে নিয়ে গিয়ে। রামের জিলিপির অবস্থা হবে। তার চেয়ে গঙ্গায় ফেলে দিয়ে হাত ধুয়ে হালকা হয়ে যাই। কিন্তু আহা, মিহিদানাগুলো এখনো গরম।

বাঁচোয়া, ঠাকুর ঘরে নেই। দূরের তাকের এক কোণে দেবেন ঠোঙাটা লুকিয়ে রাখল। সহজে কারু নজর পড়বে না। এ জিনিস ঠাকুরকে দিয়ে কাজ নেই। আরো অনেক আছে এর ভাগীদার।

খাবারের ঠোঙাটা যে ঠাকুরের চোখের আড়াল করতে পেরেছে তাইতেই দেবেন নিশ্চিন্ত।

চটি ফট-ফট করতে-করতে ঠাকুর এসে বসলেন তাঁর ছোট তক্তপোশে। খানিক পরে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, ‘এ কি, খিদে পাচ্ছে কেন?”

কি যেন খুঁজতে লাগলেন ঘরের আনাচে-কানাচে। কি খাবার? যাই বলি গে, নিয়ে আসুক কিছু যোগাড় করে। উঠে গেল একজন ভক্ত-যুবক। একটু ধৈর্য ধরুন। অন্তরে বসে কাঁদতে লাগল দেবেন। তোমার নাম করে খাবার আনলাম অথচ তোমাকে দিতে পারলাম না। খাদ্যকে করতে পারলাম না নৈবেদ্য। নিজের রূপকে করতে পারলাম না অরূপের রূপ।

তাক-লাগানো ব্যাপার। ঠিক তাকটি খুঁজে পেয়েছেন ঠাকুর। দেবেনের বুক দূর-দূর করে উঠল। কিন্তু, এ কি, ঠাকুর যে আনন্দে তরলতনু হয়ে উঠলেন। আরে, এই যে, মেঠাই! বাঃ, কে আনলে? এখনো যে হাতে-গরম। বলে, বলা-কওয়া নেই, মুঠো-মুঠো খেতে লাগলেন।

অন্তরের যে কান্না সেই তো তোমার সুধা। আমার অশ্রুক্ষরণই তো তোমার মধুক্ষরণ। তাই মিষ্টত্ব মিহিদানায় নয়, মিষ্টত্ব ব্যাকুলতায়। দিতে এসেও তোমাকে যে দিতে পারলাম না সেই ব্যর্থতার বিষাদে।

হে প্রণতপ্রিয়, হে দয়াসারসিন্ধু তোমাকে কি দেব, কিবা চাইব, কিবা বলব তোমার কাছে। শুধু জীবন ভরে এই জেনে থাকব আমার নিদ্রাহীন হৃদয়ের ব্যথা কিছুই আর তোমার অজানা নেই।

ব্যথা হরণ করলেন, নিবারণ করলেন সমস্ত ভয়ভ্রান্তি। শুধু নিজে খেলেন না, সবাইকে প্রসাদ দিতে লাগলেন। খাদ্যকে শুধু নৈবেদ্যে নিয়ে গেলে চলবে না, নৈবেদ্যকে নিয়ে যেতে হবে প্রসাদে।

ভোলা ময়রার দোকানে চমৎকার সর করেছে। ওরে, ঠাকুরের জন্যে একখানা কিনে নিয়ে যাই চল।

মেয়ের দল চলেছে দক্ষিণেশ্বরে। নৌকো করে। একখানা বড় দেখে সর কিনে নিয়েছে। ঠাকুর বড় ভালোবাসেন সর। দেখে কত খুশি হবেন না-জানি!

দক্ষিণেশ্বরে এসে শোনে—কী সর্বনাশ—ঠাকুর কলকাতায় গিয়েছেন। সবাই বসে পড়ল। এত সাধ করে এলাম, দেখা হল না! কোথায় গিয়েছেন কলকাতায়? রামলাল বললে, কম্বুলিটোলায়। মাস্টারমশায়ের বাড়িতে। কখন ফিরবেন কে জানে! চল সেখানেই ফিরে যাই। আমি চিনি সে বাড়ি। আমার বাপের বাড়ির লাগোয়া। কিন্তু যাবি কি করে? বললে আরেকজন। নৌকো তো ছেড়ে দিয়েছিস। পায়ে হেঁটে যাব।

সরখানি রামলালের হাতে দিয়ে বললে, ঠাকুর এলে দিও। পেটরোগা মানুষ, সবটা তো আর খেতে পারবেন না, একটু যেন খান।

আলমবাজার পার হতে না হতেই, ঠাকুরের কৃপা, ফিরতি গাড়ি জুটে গেল একখানা চলো শ্যামপুকুর।

বাপের বাড়িই চেনে সে মেয়েটি, কম্বুলিটোলায় মাস্টারের বাড়ি আর বের করতে পারে না। একবার এ-গলি ঢোকে, ঘুরে-ফিরে আরেক বারও এ-গলি। শেষ পর্যন্ত বাপের বাড়ির সামনেই দাঁড় করালে। একটা চাকর ডেকে নিলে। বাবা, দেখিয়ে দে কম্বুলিটোলা।

জয় শ্রীরামকৃষ্ণ! সামনের ছোট ঘরে তক্তপোশের উপর একলা বসে আছেন। আমরা পর্দার মেয়ে, রাস্তা-ঘাটে বেরোই না কখনো, কিন্তু তোমার জন্যে ছেড়েছি সব লোকলাজ, মানিনি দেয়াল-বেড়া। কার বাড়ি, কে মাস্টার, কিছুই জানি না। শুধু এইটুকু জানি তুমি যেখানে আছ তাই আমাদের ঘর-দোর। আমাদের তীর্থ-মন্দির।

‘তোরা এখানে কেমন করে এলি গো?’ ঠাকুর উছলে উঠলেন।

প্রণাম করে বললে যা হয়েছে। বসলে মেঝের উপর। দুজন বুড়ি, তিনজন অল্পবয়সী। আনন্দে কথা কইতে লাগলেন ঠাকুর। এমন সময় আসবি তো আয় ঠাকুর যাকে ‘মোটা বামন’ বলতেন সেই প্রাণকৃষ্ণ মুখুজ্জে এসে উপস্থিত। কি সর্বনাশ পালাবি কোথায়, পালাবি কি করে? বুড়ি দুজন জবুথবু হয়ে বসে রইল কোন রকমে, কিন্তু অল্পবয়সীদের উপায় কি? উপায় ঠাকুরই যুগিয়ে দিলেন। ঠাকুরেরই তক্তপোশের তলায় হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকলে তিনজন। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে রইল মশার কামড়ে ছিন্নভিন্ন হবার যোগাড় তবু নড়ল না এক তিল।

পুরুষ না নারী এই দেহবুদ্ধি নেই ঠাকুরের। কিন্তু প্রাণকৃষ্ণের আছে। তাই ঠাকুরকে তাদের লজ্জা নেই, প্রাণকৃষ্ণকে লজ্জা।

সেই সরোবরতীরে বসন রেখে স্নান করছে সুরাঙ্গনারা। সংসার ত্যাগ করে চলেছে যুবক শুক, সেই সরোবরের তীর দিয়ে। তাকে দেখে সর্ববিনির্মূক্তা অপ্সরীদের এতটুকু সঙ্কোচ নেই, কেন না যুবক হলেও শুক মায়াহীন, ভগবদ্ভাববিভোর। কিন্তু ছেলের পিছনে ছুটছেন ব্যাসদেব, তাকে সংসারে ফিরিয়ে আনতে। হলেনই বা বৃদ্ধ, তিনি মায়াধীন, তাকে দেখামাত্রই স্বর্গসুন্দরীরা ত্বরান্বিত হয়ে গায়ের উপর টেনে নিল আচ্ছাদন।

মন্দ পরিহাস নয়। ব্যাসদেব দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন, এ তোমাদের কেমন ব্যবহার? আমার যুবক পুত্র শুককে দেখে তোমাদের লজ্জা হল না, আর আমি বুড়ো, আমাকে দেখে তোমাদের লজ্জা?”

কার সঙ্গে কার তুলনা! শুক নিবৃত্তাশয়, উপশান্তাত্মা। দেহবুদ্ধির লেশমাত্র নেই। তাই তাকে দেখে আমাদের লজ্জা করবে কেন? আর বুড়ো হলেও তুমি রূপ-পিপাসু, সর্বশৃঙ্গারবেশাঢ্যা রমণীদের কটাক্ষগর্ভ নেত্রপাতের ভিখারী, তোমার কাব্যে-গ্রন্থে কত তুমি বর্ণনা করেছ লাবণ্যবিলাস ও বিভ্রমমণ্ডনের কথা। তোমাকে দেখে লজ্জা হবে না তো কাকে দেখে হবে?

প্রাণকৃষ্ণ কি আর শিগগির যায়! ঠায় এক ঘণ্টা ধরে তার নানা নিবন্ধ। ওরে বাপু এবার সরে পড়। পারি না আর উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে। মশার কামড়ে যে গেলুম। ঘন্টাখানেক লাগল মোটা বামুনের হাওয়া হতে। চলে গেলেই বেরিয়ে এল মেয়েরা। তখন ঠাকুরের কি হাসি!

বাড়ির মেয়েরা অচেনা, কি যায় আসে, ঠাকুর যখন সঙ্গে আছেন তখন চরাচরে আর পরাপর নেই। এরাও তাই ঢুকে পড়ল অনায়াসে। ঠাকুরের সঙ্গে-সঙ্গে এরাও খেল-দেল।

রাত ন’টা, ঠাকুর ফিরলেন ঘোড়ার গাড়িতে আর এরা পায়ে হেঁটে।

ঠাকুরের ফিরতে প্রায় সাড়ে দশটা। খানিক বাদে রামলালকে ডেকে বললেন ‘ওরে রামনেলো, বড্ড খিদে পেয়েছে।’

‘সে কি, খেয়ে আসেননি?

‘খেয়ে এলে কি হয়, আবার খিদে পেতে পারে না? শিগগির কিছু দে। নিদারুণ খিদে।

সেই সরখানি এনে সামনে ধরল রামলাল। দিব্যি খেয়ে ফেললেন একটু একটু করে।

পরদিন সকালে আবার এসেছে। সেই মেয়ের দল। তাদের দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন ঠাকুর। ‘ওগো রাত্তিরেই তোমার সেই সরখানি সব খেয়ে ফেলেছি। কোনো অসুখ করেনি কিন্তু।’

মেয়েরা সব অবাক। পেটে কিছু সয় না ঠাকুরের, তা ছাড়া রাত্রে দিব্যি খেয়ে এসেছেন মাস্টারের বাড়ি থেকে, তার পরে আবার এই বন্য ক্ষুধা।

বন্য ক্ষুধা নয় অন্য ক্ষুধা। এ ক্ষুধা অন্তরমধুর জন্যে, ভক্তির আস্বাদনের জন্যে। ক্ষুধা কি বস্তুর, ক্ষুধা ভালোবাসার।

কৃষ্ণের সেই গৃহাশ্রমী ব্রাহ্মণ-বন্ধুর কথা মনে করো। একসঙ্গে পড়েছিল পাঠশালায়, সান্দীপনি গুরুর ঘরে। কিন্তু ভাগ্যদোষে আজ সে ভিখারি। মলিন জীবন যাপন করছে ভার্যার সঙ্গে। একদিন স্ত্রী বললে, সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণ তোমার সখা, তার কাছে গিয়ে কিছু চাও না।

মন্দ কি। কিছু পাই না পাই অন্তত দেখে আসতে তো পারব। মুখে ভাষা না ফোটে চোখে অন্তত থাকবে তো নীরবতা!

ভিক্ষে করে জুটেছিল কিছু চিঁড়ের খুদ, তাই ব্রাহ্মণী বেঁধে দিল বস্ত্র খণ্ডে। দ্বারকার দিকে যাত্রা করল ব্রাহ্মণ। পুরপ্রবেশ করতে পারবে কিনা তারই বা ঠিক কি। তার পরে অন্তঃপুরে কোন গোপন কক্ষে তিনি আছেন তাই বা কে বলবে! আশ্চর্য, কেউ বাধা দিল না। তোরণ পেরিয়ে ক্রমে ক্রমে তিনটি কক্ষ অতিক্রম করল। এই শ্রীশালী গৃহই শ্রীকৃষ্ণের। দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রইল দীনভাবে।

প্রিয়ার পর্যঙ্কে শুয়েছিল কৃষ্ণ। ছুটে কাছে এল ব্রাহ্মণের, দুবাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরল নিবিড় করে বসাল পালঙ্কের উপর। নিজের হাতে ধুয়ে দিল পা দুখানি। সেই পাদোদক মাথায় ধরলে। অর্চনা করল নানা উপকরণে। রুক্মিণী ব্যজন করতে বসল।

এত সব কাণ্ডের পর কৃষ্ণ বললে, ঘর থেকে আমার জন্যে কি এনেছ দাও। কোথায় আমি চাইব, তা নয়, তুমিই কি না চেয়ে বসলে!

শ্রীকৃষ্ণ বললে, ভাই আমিও ভিখিরি। আমি ভিখিরি ভালোবাসার। ভালোবাসার সঙ্গে যদি অণুমাত্রও কেউ দেয় তাই আমার কাছে অনেক। হোক তা ছোট্ট একটা ফুল নয় তো তুচ্ছ একটা পাতা, কিংবা এক অঞ্জলি জল।

তবু কি এনেছে বলতে সাহস পেল না ব্রাহ্মণ। কি এনেছ দেখি, কৃষ্ণ নিজেই তখন বস্ত্রখণ্ড খুলে ফেললে। এক মুঠো খুদ তুলে নিয়ে মুখে পুরলে। দ্বিতীয় মুষ্টি তুলতে যাচ্ছে, রুক্মিণী হাত চেপে ধরল। বললে, তোমার সন্তোষ দেখাবার জন্যে এক মুষ্টিই যথেষ্ট, আবার দ্বিতীয় মুষ্টি কেন?

সেই রাত হরি-ঘরেই বাস করল ব্রাহ্মণ। কি যে তার অভাব কি যে তার চাইবার কিছুই মনে করতে পারল না। প্রত্যূষে ফিরে চলল।

কোথায় আমি দরিদ্র পাপী আর কোথায় শ্রীনিকেতন শ্রীকৃষ্ণ! আমি তাঁর বন্ধু শুধু এটুকু জেনেই তিনি আমাকে আলিঙ্গন করলেন। আমি অধন, ধন পেলে মত্ত হয়ে আর তাঁকে স্মরণ করব না, এই ভেবেই করুণাময় ধন দিলেন না আমাকে।

ঘরের কাছাকাছি এসে ব্রাহ্মণ যেন ইন্দ্রজাল দেখল। এ কি, এ উপবন আর সরোবর এল কোত্থেকে, সেই কুঁড়েঘরের পরিবর্তে এ কি বিচিত্রপুরী! কোথা থেকে এল এত দাসদাসী! আর এই যে চন্দ্রচন্দনভূষাঙ্গী পরাঙ্গনা এই কি তার সেই মনোরথ-প্রিয়তমা ব্রাহ্মণী?

চাইলাম না, অথচ এত সব হল কি করে? মেঘ তো না চাইতেই জল দেয়। তেমনি তাঁর যা ইচ্ছে তা নেন যত ইচ্ছে তত দেন। নইলে আমার পুঁটলি খুলে কেন নিলেন সেই তণ্ডুলকণা, আর কেনই বা দিলেন এত ভোগৈশ্বর্য? পাছে পতন ঘটে তাই তো তিনি ধনবৈভব দেন না ভক্তদের। কিন্তু এ তো আমার প্রাপ্তি নয় এ তোমার প্রীতি। এ তোমার ঐশ্বর্য।

ঠাকুর নবতখানায় খবর পাঠালেন ব্যাঘ্রহুঙ্কারে: ভীষণ খিদে পেয়েছে। শিগগির খাবার পাঠাও।

কি বুঝলেন শ্রীমা, এক খাদা সুজির পায়েস করে পাঠালেন। একজনের চেয়ে অনেক বেশি, একাধিক দিনের আহার। ভক্ত-মেয়ে সেই অন্নপাত্র নিয়ে কাছে এসে এ কি দেখল! ঠাকুর অস্থির পায়ে পাইচারি করছেন। যেন ঠাকুর নয় কে এক অতিকায়-মূর্তি। ঠাকুর ইশারা করলেন খাবার রাখতে। আসনের কাছে খাবার রেখে ভক্ত-মেয়ে দাঁড়িয়ে রইল জোড় করে।

কি পর্বতপ্রমাণ ক্ষুধা! ঠাকুর খেতে লাগলেন ভীমগ্রাসে।

সেই মেয়ের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কে খাচ্ছে? আমি না আর কেউ? ‘আর কেউ।’