অপারেশন বালোচ – ২৫
২৫
মুজফফরাবাদ রওনা হতে হবে। পাকিস্তানী আর্মি ক্যাম্প ভিজিট করার ব্যাপার আছে। ইমতিয়াজ তৈরি হচ্ছিলেন।
মেজর জেনারেল কাদিরের ফোন এল। ইমতিয়াজ ধরলেন, “বলুন কাদির সাহাব। আপনি কি রওনা দিয়ে দিয়েছেন?”
কাদির বললেন, “না জনাব। আমি আধঘণ্টা পরে রওনা দেব। আপনাকে একটা খবর দেওয়ার জন্য ফোন করলাম।”
ইমতিয়াজ বললেন, “কী খবর?”
কাদির বললেন, “আসাদ শেখ এর মধ্যেই একজনকে এনকাউন্টারে উড়িয়ে দিয়েছে। আফতাবের লিড পাওয়া গেছে কোয়েটায়। ওকে খুঁজতে গিয়ে একটা ছেলে ওকে মিসলিড করেছিল। পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে দিয়েছে।”
ইমতিয়াজ হাসলেন, “বাহ। আজকের বেস্ট খবর শোনালেন আপনি। তার মানে আমাদের এজেন্ট অ্যাক্টিভেট হয়ে গেছে। দ্যাটস গুড়।”
কাদির বললেন, “জি জনাব। কিন্তু এর ফলে ওই সেক্টরে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ওরা প্রথমে মসজিদের ভিতর ঢুকেছিল। খবর ছিল আফতাব ওখানে আছে।”
ইমতিয়াজ বললেন, “সে খবরটা কে দিয়েছিল?”
কাদির বললেন, “সাহিল।”
ইমতিয়াজ বললেন, “যাক। তার মানে আমার গালাগালি কাজে দিয়েছে। গায়ে গিয়ে লেগেছে। সাহিলও তার মানে এখন ঠিক করে কাজ করবে।”
কাদির বললেন, “কিন্তু কোয়েটা জানতে চাইছে সেক্টর থাটি এইটের বিক্ষোভের কী করব আমরা?” ইমতিয়াজ বললেন, “কী আবার করবেন? সেনা মোতায়েন করে দিতে বলুন। যেখানে বিক্ষোভ হবে লাঠি মেরে ঠ্যাং খোঁড়া করে দিন। আফতাবের মত দেশদ্রোহীকে আশ্রয় দিয়েছে, এত বড় পাপ করে ছাড় পাবে কেন? ব্যবস্থা নিন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”
কাদির বললেন, “কিন্তু এর ফলে বালোচদের প্রতি সিমপ্যাথি বাড়তে পারে।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আর কত বাড়বে? সব কিছুর একটা সীমা থাকে। এখানেও আছে। তবে দ্য গুড় থিং ইজ্ আফতাব ইজ ইন কোয়েটা। আর আসাদ ওখানেই আছে। দেখা মাত্র গুলি করার অর্ডার জারি করুন। আফতাবের উপর কোন রকম হামদরদি দেখানো যাবে না। আমাদের সেনার উপর যারা অ্যাটাক করে, তাদের উপর কোন দয়া নেই।”
কাদির বললেন, “কিন্তু জনাব আফতাব ওখানে আছে, এটা আমাদের চিন্তাও বাড়াল।”
ইমতিয়াজ বললেন, “কী রকম?”
কাদির বললেন, “রুমান আলীর কান্দাহার থেকে ফেরার সময় হয়েছে। আমরা চাইছিলাম ব্যাপারটা যত গোপনে করা যায় তত ভাল। এখন রুমান আলীর আগমন আর আফতাবের ওখানে যাওয়াটা ক্ল্যাশ করে গেলে নিউজ বেরিয়ে যাবে। এবারেও তো রুমানের আমার কনভয়েই ফেরার কথা।”
ইমতিয়াজ একটু ভেবে বললেন, “এটা চিন্তার ব্যাপার সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কোয়েটার নিরাপত্তা আরো বাড়িয়ে দিতে হবে। যে গর্তেই আফতাব লুকিয়ে থাকুক, ওকে বের করে মারতে হবে এবং সেটা রুমানের ফেরার আগেই। আমি আসাদের সঙ্গে কথা বলছি।”
কাদির বললেন, “জি জনাব।”
ফোন রেখে ইমতিয়াজ আসাদকে ফোন করলেন। আসাদ ধরে বলল, “জি জনাব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “তোমার অপারেশন শুরু হয়ে গেছে জেনে ভাল লাগল।”
আসাদ বলল, “আমার ভাল লাগে নি জনাব। বরং নিজের উপর রাগ হচ্ছে। আমি নিশ্চিত আফতাব ওই মসজিদেই ছিল। দারুণ লিড দিয়েছিল সাহিল। মিস করে গেলাম। ফিলিং টেরিবলি ব্যাড।”
ইমতিয়াজ বললেন, “দেখো আসাদ, তুমি যাওয়ার আগে আমাদের কাছে কোয়েটা একবারেই লস্ট কেস ছিল। তুমি এখন কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করেছো। ওদের কাছে মাঠটা এখন আর ফাঁকা থাকবে না। এটা আমার কাছে স্বস্তির। আমি তোমাকে একটা অ্যাডভাইস দিচ্ছি। কোয়েটা রেজিমেন্টের দশ জন নন বালোচ সেনাকে নিয়ে একটা টাস্ক ফোর্স বানিয়ে নাও। তারপর তাদের নিয়ে তুমি আফতাবকে খুঁজতে শুরু কর। আই থিংক দ্যাট উইল হেল্প ইউ।”
আসাদ বলল, “না জনাব। আমি ওভাবে কাজ করব না। আমার সঙ্গে শুধু সাহিল থাকলেই হবে।”
ইমতিয়াজ ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “আর ইউ শিওর?”
আসাদ বলল, “ইয়েস স্যার। আমি শিওর। এই মুহূর্তে আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কোয়েটা একটা বড় ট্র্যাপ হয়ে গেছে। কে বিক্রি হয়ে গেছে, কে হয় নি, এখন সেটা খুঁজতে গেলে আরো বড় সমস্যায় পড়তে হবে। তার আগে আমি ওই আফতাবকে খুঁজে মারব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমি তোমাকে ভরসা করি। তুমি যখন বলছ, তাহলে ঠিক আছে। বাট আই ওয়ান্ট রেজাল্ট আসাদ।”
আসাদ বলল, “আফতাবকে না মেরে আমি কোয়েটা থেকে ফিরব না ইনশাল্লাহ।”
ইমতিয়াজ হাসলেন, “দ্যাটস মাই বয়।”
২৬
কোয়েটা পেরিয়ে পাহাড়ি রুক্ষ্ম রাস্তায় একটা ভাঙা গাড়ি চলতে চলতে অনেকখানি পথ পেরিয়ে একটা ভাঙা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে সৈকত চারদিকে তাকিয়ে বলল, “নেমে এসো আফতাব।”
আফতাব নামল গাড়ি থেকে। শ্বাস ছেড়ে বলল, “আসাদ শেখ ইজ হিয়ার।”
সৈকত বলল, “হ্যাঁ। সে তো দেখতেই পাচ্ছি। তোমার প্ল্যানটা কী, সেটা বল তো!”
আফতাব বলল, “তালিবরা লস্করের সঙ্গে কোল্যাব করে যাচ্ছে আই এস আই এর সহায়তায়। আমি শুধু আই এস আইকে এক্সপোজ করতে চাই।”
সৈকত অবাক হয়ে বলল, “এর মানে কী? তালিবান আর লস্কর অবশ্যই পাকিস্তানের বন্ধু। সেখানে তুমি কী করবে?”
আফতাব বলল, “আমার কাছে খবর আছে পাকিস্তানের মেজর জেনারেল কাদিরের সাহায্যে লস্করের রুমান আলী কান্দাহার বর্ডার পেরিয়েছে।”
সৈকত চমকে আফতাবের দিকে তাকিয়ে বলল, “সেকি।”
আফতাব বলল, “এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, সঠিক প্রমাণ পেলে ব্যাপারটা আমাদের দুজনের কাছে কতটা লাভজনক হতে পারে?”
সৈকত বলল, “বর্ডার পেরিয়েছে এই খবরটা কী করে পেলে?”
আফতাব হেসে বলল, “ওরা যতই টপ সিক্রেট মিশন চালাক, যে ঘটনা ঘটবে, তার খবর আমার কাছে আসবে না, তা কি হয়?”
সৈকত ডান হাত দিয়ে নিজের বা হাতে ঘুষি মেরে বলল, “এটা বিরাট খবর। এর কোন রকম প্রমাণ পেলেই আমাদের আর কিচ্ছু চাই না।”
আফতাব বলল, “কিন্তু এখন আমার হাত পা বাঁধা। আমি কী করব? আমার আব্বাসাবাদের সঙ্গীদের মা, বাবা, বিবি, বাচ্চাদের সব তুলে নিয়ে গেছে পাকিস্তান আর্মি। আমি ওদের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলেই ওরা ওদের গায়ে হাত দেবে। হে আল্লা!”
আফতাব হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার দুচোখ জলে ভর্তি হয়ে এল। বলল, “আমাদের এত কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, অথচ পরম করুণাময় আল্লাহ আমাদের দিকে দৃষ্টিপাতই করেন না। এ কেমন পক্ষপাতিত্ব? মাঝে মাঝে মনে হয় সব কিছুই যেন ওদের জন্যই। আল্লাহ আমাদের না। ওই পাকিস্তানীদের জন্যই এই দুনিয়া তৈরি করেছেন। আমরা এসেছি শুধু মার খেতে। মার খেতে খেতে আমরা এক কোণে পড়ে থাকব, আর এরা আমাদের উপর এভাবেই রাজত্ব করে যাবে। কোন দেশের মানুষ তার দেশের মেয়ে আর বাচ্চাদের উপর এরকম অকথ্য অত্যাচার করতে পারে?”
সৈকত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “হিউম্যান রাইটসে জানিয়ে কিছু হল না?”
আফতাব বলল, “কোন লাভ হল না। কিছু হবে বলেও মনে হয় না। এখন আমি যা করব, তার সব এফেক্ট পড়বে এদের উপর। আমার কোয়েটায় থেকে কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না আর।”
আফতাব হতাশায় মাথা নাড়ল।
সৈকত কিছুক্ষণ চিন্তিত ভঙ্গিতে পায়চারি করে বলল, “রুমান আলী মুজফফরাবাদের ছেলে। আর যতদূর ওকে আমি চিনি, ও বেশিদিন নিজের কমফোর্ট জোনের বাইরে থাকবে না। হয় ও এতদিনে মুজফ্ফরাবাদে ফিরে গেছে, নয়ত রুমান এই রুটেই ফিরবে। আর যদি এই রুটে ফেরে তবে সেটাই আমাদের শেষ সুযোগ হবে। তবে ওকে এই রুটেই ফিরতে হবে। ও কি ফিরবে?”
আফতাব বলল, “আমি কীভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছি তা তুমি খুব ভাল করে জানো। এরপরে এত কষ্টের পর যদি আমরা ব্যর্থ হই তাহলে আর কোন লাভ হবে না।”
সৈকত বলল, “আমি নেগেটিভ চিন্তা করার মানুষ না। তুমিও নও। এই কাজটা আমরা একসঙ্গে করব। জানি না ওয়ান লাস্ট টাইম নাকি, তবে এটা আমাদের একসঙ্গে করতেই হবে।”
যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে আফতাব বলল, “কী করতে হবে? প্ল্যান কী?”
সৈকত বলল, “কান্দাহারে খবর নাও লিবারেশনের মেইন অফিসে। রুমান কোথায় আছে, কী করছে, কবে ফিরবে বা আদৌ ফিরেছে নাকি। সে ক’টা দিন আমাদের চুপ করে অপেক্ষা করতে হবে। আই এস আই
যেন ভাবে তুমি কোয়েটা ছেড়ে পালিয়েছ। ওদের সে বিশ্বাস করে দিতে হবে। বাকিটা ভাগ্যের হাতে ছাড়তে হবে।”
আফতাব বলল, “আর ওদের হাতে বন্দী আমাদের পরিবারের মানুষজন?”
সৈকত বলল, “গোটা পৃথিবীতে এই ছবিগুলো সারকুলেট করতে হবে। আমি দেখছি কী করে ওদের উপর হওয়া অত্যাচারের ছবি তোলা যায়। আমি কোয়েটার জেলে ঢোকার প্ল্যান করছি।”
আফতাব অবাক হল, “ওটা তো আমি জেল! কী করে ঢুকবে?”
সৈকত বলল, “ও আমি ঢুকে যাবো। এই ছবিগুলো আমাদের কাজে দেবে। আমি দেখছি কী করা যায়।
আফতাব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে চোয়াল শক্ত করে বলল, “দেখো। যা প্রয়োজন হবে বলবে। আমি নিজে দেখব।”
সৈকত বলল, “বলব। তুমি শুধু ধরা পড়বে না, তাহলেই হবে।”
আফতাব হাসল, “ভয় নেই। আই এস আই যত বড় অফিসারই পাঠাক, আমাকে কোয়েটা থেকে ধরার ক্ষমতা নেই ওদের। তুমি চিন্তা কোর না।”
২৭
বরফ পড়ছে কাশ্মীর উপত্যকায়। জওয়ানদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে এসে আর্মি ক্যাম্পে ফেরত এসেছেন ইমতিয়াজ হুসেন। সঙ্গে মেজর জানারেল কাদির।
হুসেন বললেন, “আওয়ার কান্ট্রি ইজ গ্রেট। একদিকে বালোচিস্তান, আরেকদিকে কাশ্মীর। অসাধারণ কন্ট্রাস্ট।”
কাওয়া চা দিয়ে গেল সেনা ক্যান্টিন থেকে। চায়ে চুমুক দিয়ে ইমতিয়াজ বললেন, “পলিটিকাল প্রেশার না থাকলে ইন্ডিয়ার থেকে শ্রীনগর নেওয়া সময়ের অপেক্ষা। চীন আমাদের সঙ্গে আছে। এটার অ্যাডভান্টেজ নিতে পারলাম না।”
কাদির চিন্তিত মুখে বসে ছিলেন। ইমতিয়াজ বললেন, “কী হল আপনার মেজর? কোন প্রব্লেম?”
কাদির বললেন, “রুমান আলী জানিয়েছে ও যেভাবে গেছিল, সেভাবেই ফিরবে। তার মানে আবার একটা অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে হবে। ব্যাপারটা খুব রিস্কি হয়ে যাচ্ছে জনাব।”
ইমতিয়াজ মাথা নাড়লেন, “কিন্তু কিছু করার নেই। এটা আমাদের করতেই হবে।”
কাদির বললেন, “জি জনাব। মৌলানার সঙ্গে মিটিং কখন?”
ইমতিয়াজ ঘড়ি দেখে বললেন, “এখনই। চা শেষ করে বেরোব। কাওয়া ইজ গুড ফর দিস ওয়েদার।”
কাদির বললেন, “আসাদের উপর আপনি খুব ভরসা করছেন জনাব।”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমি ওর কাজ দেখে ইম্প্রেসড হয়েছি। আসাদ আমাদের ফিউচার। আই এস আইতে আসাদের মত অফিসার দরকার। আমাদের ডিকশনারি থেকে “রেহেম” (ক্ষমা) শব্দটা যত তাড়াতাড়ি মুছে দেওয়া যাবে, দেশের পক্ষে ততটাই লাভ।”
কাদির মাথা নাড়লেন, “জি জনাব।”
ইমতিয়াজ উঠলেন, “চলুন। মৌলানা অপেক্ষা করছে।”
কাদির বিস্মিত হলেন, “আমি যাব?”
ইমতিয়াজ বললেন, “যাবেন না মানে? আপনার সঙ্গে তো মৌলানা আরো বিশেষভাবে দেখা করতে চাইছেন। এত ঝুঁকি নিয়ে আপনি এত বড় কাজ করে দিয়েছেন।”
কাদির শুকনো মুখে বললেন, “চলুন।”
দুজনে বেরোলেন। মুজফফরাবাদ পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় বেশ খানিকটা যাওয়ার পর কনভয়ের বাকি গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে গেল। শুধু তাদের গাড়িটা চলতে থাকল। কিছুক্ষণ পরে লস্করের ক্যাম্পে পৌঁছলেন তারা।
মৌলানা বরকতউল্লাহ তাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
সৌজন্য বিনিময়ের পর তারা বসল। মৌলানা বলল, “ক্যাম্পের দিকে আপনার নজর নেই হুসেন সাহাব।” ইমতিয়াজ বললেন, “কেন হুজুর?”
মৌলানা বলল, “রাস্তা খারাপ হয়ে গেছে। ঠিক করাবেন কবে?”
ইমতিয়াজ বললেন, “এই রাস্তা ঠিক করলে বা ক্যাম্পের অস্তিত্বের ব্যাপারে হাইলাইট হলে ইন্ডিয়ানরা বুঝে যাবে জনাব।”
মৌলানা বলল, “তাতে কী হয়েছে? আপনি ইন্ডিয়ানদের ভয় পান বুঝি? ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকবে এর পরে পাকিস্তান আর্মির চিফ?”
ইমতিয়াজ বললেন, “বিষয়টা তা নয় জনাব। ইন্ডিয়া গোটা পৃথিবীতে আমাদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করছে যে আমরা টেরোরিস্ট পুষছি”…
মৌলানা চিৎকার করে উঠল, “আমরা টেরোরিস্ট নই। আমরা জিহাদি। এই দুনিয়াটাকে কাফিরদের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। ইন্ডিয়া কী বুঝবে? ওরা তো এখন মুসলমানদের কোণঠাসা করে দিতে ব্যস্ত। আমরা কতদিন আর এভাবে ভয়ে ভয়ে থাকব? এভাবে বেশিদিন চলবে না। কাশ্মীরিদের রক্ষা করতে হবে আমাদের। আপনি আমাদের সঙ্গে থাকুন। আপনাদের কিছু করতে হবে না। যা করার আমরাই করব। আমার ক্যাম্পের প্রতিটা ছেলে জিহাদের জন্য প্রস্তুত। এই সপ্তাহেই দশজন এল ও সি ক্রস করবে ইনশাল্লাহ। তো জেনারেল সাহাব।”
মৌলানা কাদিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি করে আমার বেটাকে ফেরত আনবেন?”
কাদির অবাক হয়ে ইমতিয়াজের দিকে তাকালেন। ইমতিয়াজ বললেন, “জেনারেল সাহাব জানেন না যে জনাব। আপনি যে দিন বলবেন, উনি সেদিনই কোয়েটায় রওনা দেবেন।”
মৌলানা বলল, “আমেরিকা আর বেশিদিন আফগানিস্তানে থাকবে না। আফগানিস্তানে খুব শিগিগির আবার শরিয়তি শাসন আসতে চলেছে ইসহাল্লাহ।”
ইমতিয়াজ বিস্মিত হয়ে বললেন, “এই খবরটা তো জানতাম না জনাব।”
মৌলানা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, “অনেক খবরই আছে যেগুলো আপনারা জানবেন না। আপনাদের জানার দরকার নেই। তবে পাকিস্তান আমাদের পাশে থাকলে আমরাও পাকিস্তানের পাশে থাকব। রুমান কান্দাহার থেকে আমাদের জন্য অনেক সামান নিয়ে আসবে জনাব। এই ক্যাম্প পর্যন্ত তার সেফ প্যাসেজের ব্যবস্থা আপনাদের করতে হবে। ইন্ডিয়াতে ধমাকা করতে চাইলে আমাদের বারুদের জোগানের ব্যবস্থা তো আপনাদেরই করতে হবে তাই না?”
ইমতিয়াজ বললেন, “ক’টা ট্রাক আসবে?”
মৌলানা বলল, “এগারোটা।”
ইমতিয়াজ কাদিরের দিকে তাকালেন।
কাদির বললেন, “কোয়েটা হয়ে এগারোটা ট্রাক নিয়ে আসা খুব ঝুঁকির কাজ হবে জনাব।” মৌলানা বলল, “আপনাদের লজ্জা হওয়া উচিত। আপনাদের জন্য আমাদের ছেলেরা এত বড় ঝুঁকি নিচ্ছে, আর আপনারা এটুকু আমাদের জন্য করতে পারবেন না। এই অস্ত্রের সাপ্লাই তো আপনাদেরই করার কথা ছিল। আমাদের ছেলেকে ঝুঁকি নিয়ে আফগানিস্তান হয়ে এই সাপ্লাই নিয়ে আসতে হচ্ছে। তারপর আপনারা বলছেন সেফ প্যাসেজ দিতে পারবেন না। কোন মুখে বলছেন এ কথা?”
ইমতিয়াজ মৌলানাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, “ঠিক আছে জনাব। আমি দেখছি এই বিষয়টা। আপনি চিন্তা করবেন না। এমনিতেই বালোচিস্তান নিয়ে আমাদের একটু প্রেশার যাচ্ছে। ওদের বিদ্রোহে ক্ষতি হচ্ছে দেশের ইমেজের।”
মৌলানা বলল, “লাভ ক্ষতির হিসেব না করে গুলি করে মেরে দিন। যারা কাফেরদের সাহায্য নিয়ে চলে, তাদের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই।”
ইমতিয়াজ বলল, “কতজনকে মারব জনাব?”
মৌলানা বলল, “এমন একটা দিন আসবে, যেদিন আমেরিকা, ইন্ডিয়ার মত দেশে আমাদের পায়ের তলায় থাকবে। আমাদের কাছেই ওদের মাথা নোয়াতে হবে। সেদিন বেশি দূরে নেই। আমাদের যোদ্ধারা তৈরি হচ্ছে। কালকেই কাবুলে দুজন আমেরিকান কুকুরকে গুলি করে মারা হয়েছে। আপনারা কীসের ভয় পান? কাকে এত ভয় পাচ্ছেন? শুনেছি বশির আলী একবারেই দুর্বল। এরকম দুর্বল মানুষ কী করে পাকিস্তানের মানুষের নেতা হয়?”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমাদের সমস্যা হল আমরা যদি বেশি দমন নীতি চালাতে যাই, তখন আমেরিকা সুযোগ পেয়ে যাবে। আফগানিস্তানের মত যদি ওরা পাকিস্তানেও একই ভাবে ঢুকে যায়, তাহলে আমাদের কাজটা কঠিন হয়ে যাবে।”
মৌলানা বলল, “ঢুকবে না। পাকিস্তানে কি তেল পাওয়া যায়? যদি পাওয়া না যায়, আমেরিকা পাকিস্তান আর আসবে না। আফগানিস্তানেও ওদের লুটবার মত কিচ্ছু নেই। ওরা আফগানিস্তানেও আর বেশিদিন থাকবে না। আমি বললাম তো সেটা। যাই হোক, আপনারা এখন যেতে পারেন। আমার নামাজের সময় হয়েছে। রুমানের সেফ প্যাসেজের যেন কোন অসুবিধা না হয় তার দায়িত্ব আপনাদের।” ইমতিয়াজ গাড়িতে উঠে বললেন, “এই শীতেও ঘেমে গেলাম কাদির সাব।”
কাদির বললেন, “এদের ছাড়া আমরা চলতেও পারব না জনাব। নইলে…”
ইমতিয়াজ বললেন, “ইয়েস। উই নিড দেম। উই নিড দেম। রুমান আলীর ব্যাপারটা আমি দেখছি কাদির সাহাব। আপনাকে একা এত প্রেশার নিতে হবে না। বালুচিস্তানের কয়েকটা পকেট শুধু। তারপর বাকি রাস্তায় তো কোন অসুবিধা হবার কথা না।”
কাদির বললেন, “হু ইজ ফান্ডিং দেম জনাব? এত আর্মস! এটা অনেক বড় ব্যাপার।”
ইমতিয়াজ বললেন, “কিছু কিছু কথা আপনি না জেনেই ভাল থাকবেন কাদির সাহাব। কী দরকার সব কিছু জেনে? তবে মৌলানা যদি ঠিক হয়, তাহলে আমাদের উপর থেকে বড় একটা বোঝা সরে যাবে। আমেরিকান সেনা আমাদের এত কাছে থাকা যথেষ্ট চিন্তার।”
কাদির বললেন, “কথাটা বেসলেস। আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে এত তাড়াতাড়ি সরবে না।” ইমতিয়াজ বললেন, “সরতেই পারে। আমি শুনছিলাম ওদের বাজেটের অনেক বড় একটা অংশ খরচ হয় আফগানিস্তানের জন্য। এত বছর ধরে এখনও কেন খরচ করতে যাবে? ইভেন লাদেন ইজ ডেড নাও।” কাদির বললেন, “আর সেটা আমাদের জন্য একটা লজ্জার এপিসোড।”
ইমতিয়াজ বললেন, “লজ্জার কিছু নেই। আমেরিকা কি জানে না লস্করের ক্যাম্পগুলো কোথায়? কোথায় কী করে যাচ্ছে এই অর্গানাইজেশনগুলো? স্যাটেলাইট স্পাইং এর সব থেকে বড় নেটওয়ার্ক ওদের। যতক্ষণ না ওদের গায়ে হাত পড়ছে, ওরা কিচ্ছু করবে না। আল কায়দা টুইন টাওয়ারে অ্যাটাক না করলে এত ঝামেলা হত না। সব যেমন চলছিল, তেমন ভাবেই চলত। ইন্ডিয়ার থেকে আমরা কাশ্মীর ঠিক একদিন ছিনিয়ে নিতাম আর এই আমেরিকানগুলোই আমাদের হেল্প করত। লাদেন সব বিগড়ে দিল। আরো বিগড়ে দিল অ্যাবোটাবাদ।”
হতাশায় মাথা নাড়লেন ইমতিয়াজ।
কাদির বললেন, “আমার কি তাহলে এখন কোয়েটা যাওয়াই ঠিক হবে জনাব?”
ইমতিয়াজ বললেন, “আমরা দুজনেই যাব। আমি আপনাকে বললাম তো। ইসলামাবাদে ফিরে কোয়েটার প্রস্তুতি নিয়ে রওনা দেব।”
কাদির বললেন, “আর পি এম সাব কিছু বললে?”
ইমতিয়াজ হাত দিয়ে মশা তাড়ানোর ভঙ্গি করে বললেন, “ছাড়ুন তো আপনার পি এম সাব। হুজুর ঠিকই বলেছে। এত ভয়ে ভয়ে থাকলে হয় না। ওকে বলার দরকারও নেই।”
কাদির চুপ করে গেলেন। কয়েকদিন ধরে শোনা যাচ্ছে ইমতিয়াজ হুসেন সেনা অভ্যুত্থানের ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করছেন। যদিও তার সঙ্গে এ ব্যাপারে কখনোই খোলাখুলি কিছু বলেন নি। হয়ত এখনও সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। সেনা অভ্যুত্থান যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে বুঝতে হবে ইমতিয়াজ রুমানের মাধ্যমেই তার ঘুটি সাজানো শুরু করে দিয়েছেন।
যতবার মৌলানার কাছে আসেন কেমন গা ঘিন ঘিন করে। এখনও পারেন না হুসেন সাহেবের মত এদের সঙ্গে কথা বলতে। এদের কাছে আসলে যেন সেনাবাহিনীর সব শিক্ষা বিসর্জন দিয়ে আসতে হয়। অদ্ভুত ভাবে সেই তাকেই যেতে হচ্ছে রুমান আলীকে সেফ প্যাসেজ দিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে। চোয়াল শক্ত হল তার। সামনের দিনগুলো আরো কঠিন হতে চলেছে।
২৮
রাত এগারোটার পর জামশেদ বাইরের দরজায় কড়া নাড়া শুনে দরজা খুলে দেখল সৈকত দাঁড়িয়ে আছে। সে চারদিক দেখে বলল, “তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়। সাহস দেখাচ্ছ কিছু তুমি।”
সৈকত ঘরের ভিতর ঢুকে বসে বলল, “তুমি কি খুব ভয় পাচ্ছ?”
জামসেদ বলল, “চিফ চারবার ফোন করেছেন আজকে। প্রত্যেকবার বলেছেন তোমাকে জানাতে নিজের জন্য আলাদা থাকার জায়গা খুঁজতে। আমার ভরসায় থাকতে বারণ করেছে। উনি চাইছেন আমি যেন এক্সপোজ না হই।”
সৈকত ক্লান্ত গলায় বলল, “ঠিক আছে। চিফকে জানিয়ে দাও আমি এখনই বেরিয়ে যাচ্ছি।”
জামশেদ অবাক গলায় বলল, “এত রাতে কোথায় যাবে?”
সৈকত বলল, “দেখে নিচ্ছি।”
জামশেদ বলল, “আরে না মিয়াঁ, নাইট কারফিউ শুরু হয়ে গেছে, এখন রাস্তায় বেরোলেই তোমায় আর্মি গুলি করে মেরে দেবে। কাউকে রেয়াৎ করছে না ওরা। কোয়েটা না সিরিয়া বুঝতে পারছি না। তুমি এত রাতে কী করে বেরোবে? ভোরে যেও।”
সৈকত বলল, “চিফ যখন অর্ডার করেছেন, ভেবে চিন্তেই করেছেন। আমার এখানে থাকাটা ঠিক হবে না।” জামশেদ বলল, “শোন শোন, তুমি রাগের বশে কোন ডিসিশন নিও না। আমি শুধু তোমাকে চিফ কী
বলেছেন সেটা জানিয়েছি, আমি বলি নি তুমি এখনই বেরিয়ে যাও।”
সৈকত জামশেদের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, “চিফ ঠিকই বুঝেছেন। আমি যে কাজে জড়িয়েছি, সেখানে তোমাকে যুক্ত করা ঠিক না। তা ছাড়া আমি স্বাধীনভাবে কাজ করি। আমার কাজের পদ্ধতির জন্য তোমার কোন রকম ক্ষতি হওয়া ঠিক না। আমাকে মিনিট দশেক সময় দাও।”
জামশেদকে আর কোন কথা বলতে না দিয়ে সৈকত তার ব্যাগ নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। জামশেদ স্যাটেলাইট ফোন চিফকে ফোন করল। চিফ ধরলেন, “বল। ও ফিরেছে?”
জামশেদ বলল, “স্যার, আমি ওকে বললাম আপনি বলেছেন ওকে আলাদা আস্তানায় থাকতে, ও তো এত রাতেই বেরিয়ে যাচ্ছে।”
চিফ ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “ঠিক আছে। ও যদি ডিসিশন নিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু না বলাই ভাল।”
জামশেদ বলল, “কিন্তু স্যার, এখানে রাতে বেরনোয় অনেক রিস্ক আছে। আমি ভীষণ ক্ষেপে আছে। কোন রকম সুযোগ পেলেই গুলি করে দেবে।”
চিফ বললেন, “লেট হিম হ্যান্ডেল ইট। তোমার কিছু বলার দরকার নেই।”
ফোন কেটে গেল। জামশেদ বলল, “আমারই ভুল। কেন ওকে বলতে গেলাম। এখন এত রাতে কোথায় যাবে?”
কিছুক্ষণ পর সৈকত এক পাঠানের ছদ্মবেশে বাথরুম থেকে বেরোল।
জামশেদ শূন্য চোখে তাকিয়ে বলল, “আমার ভুল হয়ে গেছে মিয়াঁ। এভাবে রাত্রি বেলা তোমাকে বেরোতে বলাটা ঠিক হয় নি। কাল সকালে বললেই হত।”
সৈকত জামশেদের কাঁধে হাত দিয়ে বলল, “পরে দেখা হবে সময় হলে।”
জামশেদ বলল, “কোথায় যাবে?”
সৈকত বলল, “দেখা যাক।”
বেরিয়ে গেল সৈকত। কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে। জামশেদ দরজা বন্ধ করে দিল। মরমে মরে যাচ্ছে সে। রাস্তায় একটাও লোক নেই। শহরে শ্মশানের শূন্যতা। চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছে সৈকত পুলিশের গাড়ির শব্দ শুনে একটা দোকানের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। গাড়িটা চলে যেতে আরো কিছুটা রাস্তা পেরিয়ে সে একটা বাড়ির প্রাচীরের ভিতর ঢুকে পড়ল। নিঝুম নিঃশব্দ বাড়ি। বাড়ির ভেতরে কেউ নেই বুঝলেও সে কোন ঝুঁকি না নিয়ে পাইপ বেয়ে বাড়ির ছাদে পৌঁছে ছাদের দরজা খোলার চেষ্টা করে বুঝল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ আছে। সে ব্যাগ থেকে চাদর বের করে প্রবল শীতের মধ্যে গুটিশুটি মেরে বসে ঘুমিয়ে পড়ল। চোখ লেগে এসেছিল সারাদিনের ক্লান্তিতে। ভোরের দিকে ঘুম ভাঙল।
আবার একই পাইপ বেয়ে নেমে হাঁটতে হাঁটতে কোয়েটা বাজারের বিখ্যাত সাজ্জাদ টি স্টোরে গিয়ে বসল। ফজরের আজান শেষে মসজিদ থেকে এসে অনেকেই চায়ের দোকানে ভিড় করেছে। তার পাশে বসে এক বৃদ্ধ বলল, “আল্লাহ বাঁচাবেন, আর উনিই মারবেন। কী হবে মিয়াঁ আমাদের? আল্লাহ কি কোনভাবে আমাদের সুস্থভাবে বাঁচতে দেবেন না? মানুষের চোখের সামনে একটা তরতাজা ছেলেকে গুলি করে খুন করে দিল। ছি ছি। এই দিন দেখব এই দেশে থেকে ভাবতেই পারি নি। শেষ জীবনে আমাকে এটাও দেখতে হল।”
সৈকত বৃদ্ধের কথায় উত্তর না দিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল। বৃদ্ধ বিড় বিড় করে তার হতাশা জাহির করে যাচ্ছেন। সৈকত বুড়োর সব কথা শুনলেও কিছু বলল না। চা শেষ করে আবার হাঁটতে শুরু করল। বাস স্ট্যান্ডে যেতে হবে। সারাদিন অনেক কাজ পড়ে আছে…
২৯
চিফ তার চেম্বারে কাজ করছিলেন। রাণা নক করলেন। চিফ ইশারায় রাণাকে চেম্বারে প্রবেশ করতে বললেন।
রাণা চেম্বারে প্রবেশ করলে ইশারায় বসতে বললেন।
রাণা বসামাত্র উশখুশ করছিলেন। চিফ কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি কিছু বলতে চাও। যা বলার আছে, বলে ফেলো।”
রাণা বললেন, “কোয়েটা থেকে জামশেদ ফোন করেছিল।”
চিফ বললেন, “কান্নাকাটি করছে?”
রাণা বললেন, “সেরকমই। অপরাধবোধে ভুগছে। মাঝরাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে নাকি।”
চিফ বললেন, “কান্নাকাটি করলে করতে দাও। ভাল তো। যে বেরিয়েছে, সে ঠিকই বুঝেছে কেন তাকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছে।”
রাণা বললেন, “কিন্তু সে কী করে রাত কাটালো, কিছুই তো জানি না স্যার।”
চিফ মনিটরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাণার দিকে তাকিয়ে বললেন, “লেভেল সেভেন কম্যান্ডো ট্রেনিং আছে ছেলেটার। ওকে নিয়ে কোন রকম চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।”
রাণা বললেন, “স্যার, বাজের ফাইল আমি কি অ্যাক্সেস করতে পারব? আমি তো সেভাবে কিছুই জানি না ওর সম্পর্কে?”
চিফ বললেন, “জেনে যাবে। আপাতত অ্যাক্সেস দেওয়া সম্ভব না। এটুকু জেনে রেখো, ছেলেটাকে আমি একটা কারণেই বেশি তোয়াজে রাখি না। ওর একটাই উইকনেস। রিপোর্টিং করবে না অর্ধেক ইভেন্টের। মাঝে মাঝে ও ভুলে যাবে ও ওদেশে কী করতে গেছে। যেখানেই পাঠাবে, সে দেশের মানুষের সঙ্গে মিশে যাবে।”
রাণা বললেন, “সেটা তো খুব ভাল ব্যাপার স্যার। মানে রিপোর্ট করে না সেটা ঠিক না, তবে ও যদি পাকিস্তানের লোকের মধ্যে মিশে যায়, সেটা তো একজন স্পাইয়ের সব থেকে বড় কোয়ালিটি হিসেবে ধরা যায়।”
চিফ বললেন, “কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটা ঠিক হয় না। তুমি একটা বিশেষ মিশনে ওদেশে গেছো। সব কিছুর পরে কূটনীতি ভুললে কী করে চলবে? সার্ভে করলে দেখা যাবে পাকিস্তানের কোন অঞ্চলের নব্বই শতাংশ মানুষ চাইবে না আমাদের কোন শহরের ক্ষতি হোক। কিন্তু ওই দশ পারসেন্টের জন্য দু দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। স্পাই হিসেবে তোমার কাজ দশ পারসেন্টটাকে খুঁজে বের করা। নব্বই শতাংশের সঙ্গে মিশে বিরিয়ানি খেয়ে ঘুমনো না। ছেলেটা ছ’মাস করাচী পোর্টে কাজ করে গেল নিজে ইচ্ছেতে। একবারও কোন রকম অনুমতি নিল না। এ জিনিসগুলোই আমার রাগের কারণ।”
রাণা বললেন, “হতে পারে ওর এমন কোন অ্যানালিসিস আছে যেখানে করাচী পোর্টে ওর কাজ করাকে পরে জাস্টিফাই করবে। হতে পারে আফতাব বালোচও ওই সময়টা করাচী পোর্টেই ছিল।”
চিফ নড়ে চড়ে বসে বললেন, “এটা তুমি কীভাবে বলছ?”
রাণা তার হাতের ট্যাবলেটটা চিফের হাতে দিয়ে বললেন, “স্যার করাচী পুলিশের একটা মেল আইডি আমরা হ্যাক করেছিলাম। পোর্ট এরিয়ার। খুব একটা কঠিন কাজ ছিল না। সেখান থেকে জানা গেছে আফতাব বালোচ তিন মাস করাচী পোর্টেই ছিল।”
চিফ বললেন, “দেখি।”
রাণা ট্যাবলেটটা চিফের দিকে এগিয়ে দিলেন।
চিফ কয়েক মিনিট ধরে মেইলটা দেখে বললেন, “হুম। তার মানে ও এই কারণেই করাচী পোর্টে এদ্দিন বসে ছিল। নিশ্চয়ই আফতাবের সঙ্গে মিলে কোন ঘোঁট পাকিয়েছে। আর এই কারণেই আমার ওর উপর রাগ হয়। পোর্টে ছিল জানাবে, কী করেছে বলবে না। তাহলে ওকে আমরা কেন ওখানে রেখে দেব?”
উত্তেজনায় চিফ উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করে বললেন, “আশা করব আই এস আইয়ের হাতে ধরা পড়বে না। উফ, কী করেছে কে জানে!”
রাণা হাসতে হাসতে বললেন, “স্যার আমি বাজের ফ্যান হয়ে গেছি। আশা করব অদূর ভবিষ্যতে ওর সঙ্গে দেখা হবে।”
চিফ বললেন, “জামশেদকে বলে দাও কোয়েটার আস্তানা পাল্টাতে। আর ভবিষ্যতে বাজের সঙ্গে কোন কন্ট্যাক্ট না রাখতে। কী ফুল ফুটিয়ে এসেছে কে জানে। জামশেদ ইজ নট বাজ। ধরা পড়লে সব উগড়ে দেবে।”
রাণা বললেন, “ওকে স্যার।”
চিফ চিন্তিত মুখে বসলেন কম্পিউটারের সামনে। রাণা বেরিয়ে যেতে চিফ কাবুলে ফোন করলেন।
ও প্রাপ্ত রিং হতেই ফোন ধরল, “হ্যাঁ স্যার। এমব্যাসিতেই আছি। বলুন কী হুকুম।”
“হ্যাঁ বড়াল? একটা হেল্প করতে পারবে?”
