পাখির বাসা – উল্লাস মল্লিক

পাখির বাসা – ৭

মেন রোডের ওপরেই ঘটনাটা ঘটল। রাত বারোটার কিছু পর। সোনাগাছি থেকে ফিরছিল ভোঁদাই। এখন কাজরির কাছে ঘন ঘন যায় সে। রাতটা কাজরির ঘরে কাটাবার ইচ্ছে ছিল।

কিন্তু কাজরি আজ ব্যস্ততা দেখাল। সারারাতের কনট্রাক্টে রাজি নয়। সেই নিয়ে কাজরির সঙ্গে লাগল কিচাইন। রাগের মাথায় দু-একটা চড়চাপড় চালায় ভোঁদাই। তখন হইচই। নেশা আর মেজাজ দুটোই বিগড়ে গেল তার। ‘ধুত্তোর’ বলে বেরিয়ে এসেছিল ওখান থেকে। মেজাজ বিগড়ে ছিল বলেই বোধহয় হাঁটার সময় অসাবধান হয়ে পড়েছিল একটু। দুটো লোক যে নি:শব্দে ফলো করছে তাকে খেয়াল করেনি। ছোট মন্দিরটার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল আরও দুজন। একদম সামনে দু-হাতের মধ্যে এসে দাঁড়াল তারা। এবার চমকে উঠল ভোঁদাই। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় ডান হাত চলে গেল পকেটে। কিন্তু হাত বের করার সুযোগ পেল না। পরপর দুটো গুলি বুকের বাঁদিকে আর পেটে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল রাস্তার ওপর। দুটো কুকুর শুয়ে ছিল মন্দিরটার পেছনে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করল তারা। ফাঁকা রাস্তায় বাইক চালিয়ে আসছিল একটা ছেলে। ব্রেক কষে দাঁড়াল সে, তারপরেই উলটোদিকে পালিয়ে গেল প্রচণ্ড স্পিডে। একজন এগিয়ে এসে সামনে থেকে মাথা লক্ষ করে একটা গুলি চালাল। তারপরেই চারজন দৌড়ে ঢুকে গেল গলির মধ্যে। কুকুর দুটো চিৎকার করতে করতে একটু একটু করে এগিয়ে গেল রাস্তায় পড়ে থাকা শরীরটার দিকে। এদিক-ওদিক থেকে আরও কয়েকটা কুকুর ডেকে উঠল। আশপাশের দু-একটা ফ্ল্যাটের জানলা খুলেই বন্ধ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। লাল রক্তের ধারা গড়িয়ে গেল রাস্তার পাশের ড্রেনের দিকে।

পুলিশি অভিজ্ঞতায় উজ্জ্বল দেখেছে পলিটিকাল পার্সন খুন হলে চাপ সবচেয়ে বেশি। কেষ্ট-বিষ্টুর দরকার নেই, নিতান্ত খুচরো নেতা বা চ্যালা-চামুণ্ডা গোছের কারও বডি পড়লেই হল —জগৎ সংসার একেবারে রে-রে-রে-রে করে ঝাঁপিয়ে পড়বে পুলিশ প্রশাসনের ওপর। তার দলের লোকেরা বলবে—বিরোধীদের কাজ; আর বিরোধীরা বলবে—দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব। দু-পক্ষই অবশ্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাবে। তারপর আছে মিডিয়া। গোদের ওপর বিষফোঁড়া। দলে দলে এসে একই প্রশ্ন, বোকা বোকা প্রশ্ন, বারবার করবে, তারপর যে যার মতো করে লিখে দেবে।

আর ঠিক উলটো মস্তানদের বেলায়। বিষয়-সম্পত্তি রেখে যাওয়া দরের মস্তান হলে একরকম, না হলে ছুটকো মস্তানের বেলায় অনেক সময় বডি ক্লেম করার লোক পাওয়া যায় না। বড়জোর খুনখুনে বুড়ি মা কিংবা ক্ষয়াটে চেহারার বউ এসে বসে থাকে। সাধারণত দেখা যায়, যে মহিলার সঙ্গে থাকত তাকে আইনমাফিক বিয়ে করেনি, আর যাকে একসময় বিয়ে করেছিল তার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই।

কত সময় সেই লোকটা, যে একদিন বোমা-পিস্তল হাতে দাপিয়ে বেড়াত পাড়া, তার বডি বড় হতভাগ্যের মতো পড়ে থাকে মর্গে। পিঁপড়ে ধরে, ইঁদুর খাবলায়। তবে বেশির ভাগ সময়ই একটা ব্যাপার প্রায় অবধারিত থাকে। দু-চারদিনের মধ্যেই পালটা একটা লাশ পড়ে। প্রথমটার বদলা।

ভোঁদাইয়ের বেলায় অবশ্য দস্তুরমতো দাবিদার পাওয়া গেছে। ভোঁদাইয়ের দাদা কয়েকজন লোক নিয়ে এসে বডি নিয়ে গেল। যাবার সময় সোজা অভিযোগ করল বিজুর বিরুদ্ধে। বিজু নাকি জেল থেকে বেরিয়ে নিজে দল করেছে। তারই কাজ। একটা মেয়ে নাকি আছে এর মূলে, ওই মেয়েটাকে নিয়েই দুজনের গন্ডগোল।

বিজু ছেলেটাকে মনে করার চেষ্টা করল উজ্জ্বল। একটা ডাকাতির কেসে ধরেছিল ছেলেটাকে। লম্বা ছিপছিপে চেহারা। ভাবভঙ্গি ঠিক মস্তানসুলভ নয়। চোখ-মুখে কঠিন একটা জেদের ছাপ আছে শুধু। সেই বিজু জেল থেকে বেরিয়ে দল করেছে। দেখা যাচ্ছে দল করাটা খুব জল-ভাত হয়ে গেছে এখন।

নতুন দল তৈরি হলে পুলিশের একটু চিন্তার কথা। পাত্তা লাগাল উজ্জ্বল। খবর পেয়েও গেল। বিজু নয়, দলটা তৈরি করেছে পলাশ নামে একটা ছেলে। এই ছেলেটাও একসময় অসিতের হয়ে কাজ করত; পরে ঝামেলার জন্যে বেরিয়ে যায়। মেলাপাড়া বস্তির নতুন কয়েকটা ছেলে, আর ভাইলালের দল ভেঙে চলে আসা ক’টা ছেলেকে নিয়ে তৈরি করেছে দলটা। বিজু আছে সেই দলে।

ভোঁদাইয়ের ব্যাপারটা আরও একটু গড়াল। একদিন সাতসকালেই লোকাল কাউন্সিলার প্রসূন হাজরা হাজির থানায়। সঙ্গে একটা অল্পবয়সি ছেলে। লোকটা ঘনঘন দল পালটায় এবং প্রতিবারই ঠিক একটা পদ বাগিয়ে নেয়। এমন একটা হাবভাব যেন মনে করলেই দেশের প্রধানমন্ত্রী, শচীন তেন্ডুলকর বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো কিছু একটা হয়ে যাওয়া তার কাছে কঠিন কিছু নয়। প্রসূনকে দেখেই মনে পড়ে গেল অসিত এখন প্রসূনের খাস লোক। লাস্ট ইলেকশনে ফুল ম্যান পাওয়ার দিয়ে প্রসূনকে জিতিয়েছিল অসিত। অসিত ইদানীং প্রাোমোটারি লাইন ধরেছে। সমাজসেবা সংস্কৃতি এইসব করে ভদ্রলোক হয়ে গেল বলে। কিছুদিন আগেই প্রসূন একটা রক্তদান শিবির আর সঙ্গে গানবাজনার আসর বসাল। তার মূল পান্ডা অসিত। দুজনে শেয়ারে একটা বারও খুলেছে কোনা এক্সপ্রেসওয়ের ওপর। তাই প্রসূনকে থানায় দেখেই সরল পাটিগণিতের এইসব স্টেপগুলো পর পর মনে পড়ে গেল উজ্জ্বলের।

বড়বাবু নেই—ছুটিতে। থানার দায়িত্ব এখন উজ্জ্বলের ওপর। অফিসে কাজ করছিল উজ্জ্বল। আজ সকাল থেকে টানাপোড়েনের মধ্যে আছে সে। সেই অসহ্য টানাপোড়েন। কোনও মানে হয় না এইভাবে দিনগুলো টেনে নিয়ে যাবার। শুধু একটু মনের জোর দরকার। একটা মাত্র গুলি কপালের ঠিকঠাক জায়গায়। ব্যস, অপার শান্তি। অফিসে কাজ করতে করতে সেই প্রবল প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চাইছিল সে। যুক্তি, পালটা যুক্তি। সেই সময় ঘরে ঢুকেই হড়াস করে চেয়ার টেনে বসে পড়ল প্রসূন। প্রসূনের ভঙ্গিটাই এই রকম—হেড মাস্টারের মতো হাবভাব। বিরক্ত হল উজ্জ্বল এবং বিরক্তিটা চাপা দেবার চেষ্টা না করেই ভুরু কুঁচকে বলল—কী ব্যাপার!

প্রসূন একটু রুক্ষ স্বরে বলল, কোশ্চেনটা তো আমারও, কী ব্যাপার কী!

কেন? হাতের পেনটা বন্ধ করে বলল উজ্জ্বল।

কেন মানে; কী করছেন কী আপনারা?

দেখতেই তো পাচ্ছেন।

দেখতে পাচ্ছি না বলেই তো আসতে হল এখানে।

উজ্জ্বল শান্ত গলায় বলে, আমাদের যা কাজ তাই করছি—সোসাইটির নোংরা পরিষ্কার।

করছেন আর কোথায়, নোংরামি তো বেড়েই যাচ্ছে।

আসলে ম্যানপাওয়ার কম আমাদের…আর এদিকে নোংরা লোক বাড়ছে দিন দিন…তার ওপর পুজো গেল; পুজোর সময় অন্য চাপ থাকে আমাদের। পাত্তা না দেবার ভঙ্গিতে বলল উজ্জ্বল।

প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে দাঁতে চাপে প্রসূন। তারপর ধরিয়ে বলে, আজ ক’দিন হল?

বিরক্তি বাড়ছে উজ্জ্বলের। সে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে তর্কযুদ্ধে নেমেছিল। তার মধ্যে এই ফালতু লোকটার উপস্থিতি খুব অসহ্য মনে হচ্ছে। সে-ও তাই একটু রুক্ষ স্বরে বলল, কীসের ক’দিন?

ভোঁদাই মার্ডার হয়েছে?

হিসেব করে রাখিনি, আমি অ্যাকাউন্ট্যান্ট নই।

উজ্জ্বলের রুক্ষতায় একটু যেন থমকাল প্রসূন। তারপরই, একটু গলা চড়িয়ে বলল, হিসেব রাখিনি মানে…! কে হিসেব রাখবে!

আপনার দরকার হলে, আপনি রাখুন।

এবার বেশ অবাক হয়ে গেছে প্রসূন। লোকাল থানার কোনও পুলিশ অফিসার যে তার সঙ্গে এ ভাবে কথা বলবে, সে ভাবতেও পারে না। তাই আরও বিকট চিৎকার শুরু করল সে, কী ভেবেছেন কী আপনি! কত টাকা খেয়েছেন। বলুন…তার চেয়েও বেশি টাকা আমি আপনাকে দেব—কিন্তু কালপ্রিটকে ধরে দিতে হবে—বলুন, কত টাকা চাই আপনার…?

প্রসূনের চোখে চোখ রাখল উজ্জ্বল। শীতল কঠিন দৃষ্টি। আর পেছনে তাকানোর দরকার নেই। পেছনে তাকালেই তার সেই প্রতিপক্ষ যুক্তিজালে জড়িয়ে দেবে। জোর কমিয়ে দেবে মনের। মাথায় ঠেকিয়েও নামিয়ে রাখতে হবে রিভলভার। তার চেয়ে সোজা এগিয়ে যাওয়া। থামবে না, থমকাবে না, তাকাবে না কোনও দিকে। রিভলভারের ছ’টা গুলি। ভাগাভাগি করে নেবে প্রসূন হাজরার সঙ্গে। তিনটে প্রসূনের, তিনটে তার।

উজ্জ্বল ঝট করে উঠে দাঁড়ায়। চিৎকার করে—শাট আপ! খুলি উড়িয়ে দেব শালার!

দুজন কনস্টেবল দৌড়ে আসে। সুকুমার জড়িয়ে ধরে উজ্জ্বলকে। আর একজন বুঝিয়ে শুনিয়ে বাইরে নিয়ে যায় প্রসূনকে।

কোয়ার্টারে ফিরে চুপ করে বসে থাকে উজ্জ্বল। কিছুক্ষণ তড়পে চলে গেছে প্রসূন। শাসিয়ে গেছে। মজার কথা, সকালের সেই দমচাপা কষ্টটা আর নেই। হাঁসফাঁস করা মনটা এখন বুক ভরে অক্সিজেন নিচ্ছে। রিভলভারটা খাপের মধ্যে দেওয়ালে টাঙানো। সেই প্রতিপক্ষ ভারী ম্রিয়মান। গলায় পরাজয়ের গ্লানি। খুব বিষণ্ণ গলায় জিগ্যেস করল, কী ঠিক করলে তাহলে উজ্জ্বল?

মৃদু হেসে উজ্জ্বল বলল, বিজুকে ধরব।

খুব ভালো কথা, কিন্তু তারপর…? তারপর তো সেই একঘেয়ে জীবন। তার চেয়ে…।

উজ্জ্বল বলে, তখন দেখা যাবে, এখন এসো তুমি।

কিন্তু একটু আগেই তো আমাকে ডাকছিলে, খুব ডাকছিলে, কী এমন হল হঠাৎ!

প্রসূন এসে গেল যে!

এখন তো সে চলে গেছে।

হ্যাঁ, রেঞ্জের বাইরে চলে গেছে, একটু দেরি হয়ে গেল যে! আমার সেই চিরকালের দ্বিধা—মাথাটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ছিল—দিতামও—সুকুমার এসে জড়িয়ে না ধরলে, ঠিক দিতাম।

যাক, আর তো কিছু করার নেই—কিন্তু গুলিগুলো এখনও তোমার কাছে আছে।

উজ্জ্বল বলে, তুমি তো আচ্ছা আজব লোক, যখন যেতে চাই তোমার কাছে, খুব ইচ্ছে করে যেতে, তখন তুমি কত বাহানা দেখাও; আর এখন আমার ইচ্ছে নেই, দিব্যি ভালো আছি, তুমি কেবল ডাকছ, লোভ দেখাচ্ছ—কেমন লোক তুমি!

সে বলল, এটাই তো মস্ত রহস্য—আমাকে বুঝে ওঠা! আমাকে কেউ বুঝতে পারে না বলেই যত গন্ডগোল, আমাকে বুঝে ফেললে দুনিয়া তো একেবারে সহজ-সরল হয়ে যেত।

আমার দরকার নেই বুঝে, উজ্জ্বল বলে, তুমি এখন এসো!

ভেবে বলছ তো, গুলিগুলো কিন্তু রয়েই গেল।

থাক, ওগুলো প্রসূনের জন্যে থাক। বিজুকে ধরব, আর তারপর প্রসূনকে রেঞ্জের মধ্যে পেতে হবে আমায়, আজ দেরি হয়ে গেল, সেদিন আর হবে না।

কিন্তু একটা প্রসূন গেলে, পরদিনই পাঁচটা প্রসূন হবে।

সে তখন দেখা যাবে, তাদের জন্যে হয়তো অন্য উজ্জ্বলরা আসবে, আরও পাঁচজন উজ্জ্বল, এখন তুমি এসো।

মাথা নামিয়ে চলে যায় সে।

উজ্জ্বল উঠে পড়ে। অনেক কাজ এখন তার।

১৩নং বিনোদ মল্লিক বাই লেনের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল উজ্জ্বল। রাত প্রায় নটা। সিভিল ড্রেস উজ্জ্বলের। বিকেলে এসডিপিও-র ফোন এসেছিল। কেসটার তাড়াতাড়ি রেজাল্ট চাইছেন এসডিপিও সাহেব। প্রসূন হাজরা ঘুঁটি চালাচালি শুরু করে দিয়েছে। মনে মনে হাসে উজ্জ্বল। একটু দেরি হয়ে গেল আজ। প্রসূন তোমার এখন মর্গে শুয়ে থাকার কথা। আর একবার রেঞ্জের মধ্যে পাই তোমায়…ছ’টা গুলি ভাগাভাগি হবে তোমার-আমার মধ্যে।

ঘরের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলছে। পুরুষ আর মহিলা কণ্ঠ। চুপ করে দরজার সামনে দাঁড়াল উজ্জ্বল। কান খাড়া।

লোকটা টাকার দাবি করছে। মহিলাটি নারাজ। গালমন্দ করছে লোকটা। ঝগড়া কিছুক্ষণ শুনে উজ্জ্বল বুঝল সেই চিরাচরিত বিষ দাম্পত্যের কাহিনি। স্ত্রী রোজগেরে। অপোগণ্ড স্বামী। প্রায়ই এসব ঝামেলা মেটাতে হয় উজ্জ্বলদের।

ঠেলতেই খুলে গেল দরজাটা। দুজনেই খুব অবাক চোখে তাকাল উজ্জ্বলের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লোকটা একটু তেড়িয়া গলায় বলল, কী চাই?

উত্তর দিল না উজ্জ্বল। শান্তভাবে ঘরে ঢুকল। ভালো করে আপাদমস্তক দেখল লোকটাকে। একেবারে মার্কামারা চেহারা। সারা শরীরে বেহিসেবি জীবনযাপনের স্পষ্ট ছাপ। চোখ দুটো অসম্ভব ধূর্ত। মদ্যপান করেছে। মুখে পানমশলা জাতীয় কিছু আছে; তবু সস্তা মদের গন্ধ ঢাকা পড়েনি। বিছানায় বালিশ কোলে বেশ বাবুয়ানি চালে বসে আছে লোকটা।

কী চাই কী? এবার প্রায় তেড়ে এল লোকটা।

থানা থেকে আসছি। খুব কঠোর দৃষ্টিতে লোকটার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল উজ্জ্বল। কঠিন করে নিল মুখের পেশিগুলো। খুব বেশিক্ষণ চোখ-মুখে এই ভাব ধরে রাখলে নার্ভের ওপর চাপ পড়ে। তবু পেশার জন্যে মাঝেমধ্যে এমন রূপ ধারণ করতে হয় তাকে। পুলিশি কর্কশতা এখানেও কাজ দিল সঙ্গে সঙ্গে। চমকাল লোকটা। মুখে ভয়ের ছায়া নামল একটু।

থানা থেকে…কেন স্যার!

দরকার আছে। আরও কঠিন উজ্জ্বলের গলা।

কী-কী দরকার? লোকটা তোতলাচ্ছে।

থানায় গেলেই বুঝবে।

আ-আমি তো কিছু করিনি স্যার।

সেটা দেখতে পাবে…। উজ্জ্বল বলে, নাম কী?

ভবেশ—স্যার।

ভবেশ—কী? ধমকে ওঠে উজ্জ্বল।

ভবেশ দাস।

কী করো?

চাকরি স্যার…!

এখানে কী করছ?

ও তো স্যার রানু—মানে আমার ওয়াইফ।

সে তো বুঝলাম…চিৎকার চেঁচামেচি করছিলে কেন?

চেঁচামেচি নয় তো স্যার—ওই ওয়াইফের সঙ্গে একটু আলোচনা আর কি।

মুখ খারাপ করছিলে কেন?

না তো স্যার—মুখ খারাপ তো নয়…।

মদ খেয়েছ কেন?

না-না তো স্যার…বিশ্বাস করুন!

আবার মিথ্যে কথা! জোরে ধমক দিয়ে ওঠে উজ্জ্বল।

ভুল হয়ে গেছে স্যার—আর হবে না কোনওদিন…।

কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল বউয়ের সঙ্গে?

তেমন কিছু নয় স্যার—ওই আর কি…।

টাকা চাইছিলে—তাই তো?

না স্যার, মানে ঠিক টাকা নয়…।

আবার মিথ্যে কথা…মারব এক থাপ্পড়!

এবার চুপ করে যায় লোকটা। ভয়ে যেন আধসেদ্ধ হয়ে গেছে।

লজ্জা করে না—বউকে খাওয়াবার মুরোদ নেই, আবার টাকা চাইছ!

আসলে স্যার বাজারে অনেক দেনা…খুব প্রবলেম।

দেনা কেন—মদ খেয়ে?

না না স্যার…। লোকটা এবার হাতজোড় করে ফেলে।

তাহলে দেনা কেন—বউকে তো খাওয়াতে হয় না!

আসলে স্যার কাজটা চলে গেছে।

কী করে গেল?

ওই আর কি স্যার…ফ্যাক্টরির অবস্থা ভালো নয়।

তোমার মতো লেবার থাকলে ফ্যাক্টরির অবস্থা ভালো হওয়া মুশকিল।

আর কিছু বলে না লোকটা। ভয়ে সাদা হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে বসে থাকে।

শোনো। খুব গম্ভীর গলায় উজ্জ্বল বলে, আর কোনওদিন মদ খাবে না।

হ্যাঁ স্যার।

কোনওদিন একটা পয়সাও চাইবে না—ঠিক আছে?

খুব বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় কাত করে লোকটা।

স্ত্রীকে কোনওরকম হ্যারাস করবে না।

ঠিক আছে স্যার।

আমি কিন্তু খোঁজ নেব এবার—একটু গন্ডগোল করলেই ঝুলিয়ে পিটব। পুলিশের পিটুনি খেয়েছ কোনওদিন?

না স্যার।

খাবার ইচ্ছে আছে?

জোরে জোরে মাথা নাড়ে লোকটা।

উজ্জ্বল এবার তাকায় মহিলার দিকে। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। একটু কঠিন চোখ-মুখ। ভয়ের ছাপ নেই কোথাও।

শান্ত গলায় উজ্জ্বল বলে, আপনার নাম রানু দাস?

হ্যাঁ।

আপনার ওপর কি এরকম ঝামেলা রোজ করে?

কিছু বলে না রানু। শুধু তাকায় ভবেশের দিকে।

স্যার, পেচ্ছাপ পেয়েছে স্যার, করে আসব?

উজ্জ্বল তাকায় লোকটার দিকে। চোখে-মুখে করুণ আর্তি। হাতজোড় করেছে আবার।

গম্ভীর গলায় উজ্জ্বল বলে, ঠিক বলছ?

হ্যাঁ স্যার।

ঠিক আছে, যাও।

সঙ্গে সঙ্গে লোকটা তড়াক করে নামে তক্তোপোশ থেকে। তারপর যেন পড়ি-মরি করে বেরিয়ে যায়।

আপনার সঙ্গে কথা ছিল একটু। ঘরের চারদিক খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বলে উজ্জ্বল।

বলুন। একটু যেন কাঠ কাঠ রানুর গলা।

কয়েকদিন আগে একটা ছেলে মার্ডার হয়েছে, শুনেছেন?

না; কোথায়?

নেতাজি সুভাষ রোডে; ছোট শিবমন্দিরটা নতুন হয়েছে যেখানে।

না, শুনিনি কিছু।

ঠিক করে বলুন।

ঠিকই বলছি।

আপনি তো ‘সেবায়ন’ আয়া সেন্টারে কাজ করেন?

হ্যাঁ।

জয়ন্ত হাজরার বাড়িতে ডিউটি করছেন এখন?

হ্যাঁ।

ওর বাবা প্যারালাইজড—তারই দেখাশোনা করেন—ঠিক বলছি তো?

হ্যাঁ।

দেখছেন তো আমাদের কাছে সব ইনফরমেশনই থাকে; কিছু গোপন করবেন না; লাভ হবে না; তার চেয়ে যা জানেন ঠিক ঠিক বলে দিন।

বললাম তো, আমি কিছু জানি না। খুব নীরস রানুর গলা।

ঠিক আছে—ভোঁদাইকে চেনেন?

একটু চুপ করে থাকে রানু। তারপর বলে, চিনি মানে দুদিন দেখেছি।

আগে থেকে পরিচয় ছিল না?

না।

ঠিক বলছেন?

হ্যাঁ।

আপনি এফআইআর করেছিলেন থানায়?

হ্যাঁ।

ভোঁদাই বিরক্ত করত আপনাকে?

হ্যাঁ।

কে বলেছিল ডায়েরি করতে?

কেউ বলেনি, আমি নিজেই করেছিলাম।

ভোঁদাই মার্ডার হয়ে গেছে, শুনেছেন?

না।

বিজুকে কতদিন চেনেন?

কে বিজু—আমি চিনি না।

কিন্তু আমাদের কাছে খবর আছে—চেনেন।

আমি কিছুদিন এখানে এসেছি, কাউকেই চিনি না এখানকার।

তাহলে ওকে শেল্টার দিয়েছিলেন কেন?

একটু চুপ করে থাকে রানু। তারপর বলে, আমি তো সবই বলে এসেছি থানায়, ও জোর করে ঢুকে পড়েছিল।

কিন্তু আমার কাছে খবর আছে বিজু তারপরেও এসেছিল আপনার কাছে।

একটু যেন চমকে ওঠে রানু। তারপর বেশ জোর গলায় বলে, একদম বাজে কথা, আসেনি।

রানুর সামান্য চমকে যাওয়াটা নজর এড়ায় না উজ্জ্বলের। সে তাই একটু গম্ভীর গলায় বলে, কেন মিথ্যে কথা বলছেন, দেখছেন তো, আমাদের কাছে কোনও খবরই গোপন থাকে না, তার চেয়ে সত্যিটা বলে দিন।

রানু জোরে ঘাড় নাড়ে, কিছু গোপন করছি না আমি।

চুপচাপ ঘরের চারদিকটা আবার খুঁটিয়ে দেখতে থাকে উজ্জ্বল। এই চালটা সে আন্দাজেই দিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা যেন চমকে গেল একটু। চমকাবে কেন…? গলাটা গম্ভীর করেই সে বলে, ভোঁদাই মার্ডারে আপনি কিন্তু একটা সাসপেক্ট।

আমি! ভীষণ অবাক গলায় বলে রানু।

হ্যাঁ, আপনি।

আমি মানুষ খুন করেছি…! একটু ভেঙে যায় রানুর গলা।

নিজের হাতে না করলেও, করিয়েছেন কাউকে দিয়ে।

কিছু বলে না রানু। প্রচণ্ড ভয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে উজ্জ্বলের দিকে। ঠোঁট দুটো থিরথির করে কাঁপছে। চোখ দুটো একটু ভিজে উঠেছে যেন।

একটু মায়া হয় উজ্জ্বলের। তবু গলাটা কঠিন রেখেই সে বলে, ভোঁদাইয়ের ফ্যামিলির লোক আপনাকে সন্দেহ করছে।

আমাকে…!

হ্যাঁ, আপনাকে, আপনাকে নিয়ে দুজনের একটা টানাটানি ছিল, তাই বিজু খুন করেছে ভোঁদাইকে।

এবার ভেঙে পড়ে রানু। কান্নাভাঙা গলায় বলে, বিশ্বাস করুন, আমি কিছু জানি না—ওদের কাউকেই চিনি না আমি…ছি: ছি:, আমার স্বামী শুনলে কী বলবে বলুন।

ভয় নেই। উজ্জ্বল বলে, আপনার স্বামী কিছু শুনছে না, সে আশপাশে কোথাও নেই।

আঁচলে চোখ মোছে রানু।

আপনি বাইরে গিয়ে দেখে আসতে পারেন—সে পালিয়েছে।

নাক টানে রানু।

আপনার বীরপুরুষ স্বামী আর মনে হয় ডিসটার্ব করবে না আপনাকে…যদি করে, একবার শুধু বলবেন—ব্যবস্থা করে দেব।

কিছু বলে না রানু। নীচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

পুলিশকে আপনারা যতটা খারাপ ভাবেন, ততটা খারাপ নয় তারা।

দু:খের মধ্যেও মৃদু একটা শ্লেষের হাসি ফুটে ওঠে রানুর মুখে।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আপনারা দরকারের সময় পুলিশকে হেল্প করেন না—কেন করেন না বলুন তো?

রানু মৃদু গলায় বলে, আমি যা যা জানি সবই তো বলেছি আপনাকে—কিন্তু আপনি শুধু শুধু আমার নামে মিথ্যে অপবাদ…।

উজ্জ্বল বলে, আমি অপবাদ কোথায় দিলাম—ভোঁদাইয়ের ফ্যামিলি থেকে অভিযোগ করা হয়েছে—এবার প্রমাণ করার দায়িত্ব আপনার।

কী ভাবে প্রমাণ করা যায়, বলুন।

আপাতত আমাদের সঙ্গে ঠিকঠাক কো-অপারেট করুন।

করছি তো—কিন্তু যা জানি না সেটা বলব কী করে…! আমার খুব ভুল হয়েছিল…।

উজ্জ্বল একটু অবাক হয়ে তাকায়। বলে, কী ভুল…?

থানায় যাওয়াটাই ভুল হয়েছিল—আমি আমার সব অভিযোগ তুলে নিচ্ছি। তার জন্যে কী করতে হবে বলুন।

উজ্জ্বল বলে, ওহ সব মানুষই যদি আপনার মতো হত—বেঁচে যেতাম। মানুষ কেবলই অভিযোগ জানায়—উঠতে বসতে নড়তে চড়তে মানুষের অভিযোগ, অভিযোগের আর শেষ নেই…।

এবার কেউ মেরে কেটে ফেললেও পুলিশকে বলতে যাব না।

এবার আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আসলে, আমাদের কাজটাই এমন—সব মানুষকে খারাপ ভাবতে শেখায়…।

উজ্জ্বল হাসে। অনেকক্ষণ চোখ-মুখ কঠিন করে রেখেছিল। হাসতে পেরে ভারি একটা স্বস্তিবোধ করে সে। দেখে রানু তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখে ঘোর বিস্ময়। সম্ভবত, কোনও পুলিশকে আগে সে এভাবে হাসতে দেখেনি।

রানু অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, সেদিন থানায় গেলাম, গিয়ে মনে হল খুব অপরাধ করে ফেলেছি—এমন ভাব করা হল, যেন দোষটা আমার…তাহলে বলুন, তারপর এমন বদনাম…ছি: ছি:!

উজ্জ্বল বলে, খুব সরি…আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন…।

ঘর থেকে বেরিয়ে যায় উজ্জ্বল। তারপর আবার ঘরে ঢোকে। বলে, আমার নাম্বারটা রেখে দিন—কোনও সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন।

জোরে ঘাড় নাড়তে নাড়তে রানু বলে, আমার লাগবে না—মরে যাই সেও ভালো…তবু থানায় আর নয়…দরকার নেই আমার…!