Course Content
প্রিয় পঁচিশ – অর্পিতা সরকার
প্রিয় পঁচিশ – অর্পিতা সরকার
0/26
প্রিয় পঁচিশ – অর্পিতা সরকার

নিলামে উঠেছি আমি – অর্পিতা সরকার

আমি যখন মাত্র ছয় বছরের তখন আমার বাবা আমায় বিক্রি করে দিয়েছিল এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে। আমরা মোট পাঁচ ভাইবোন ছিলাম। আমার বাবা একটা গ্যারেজের মিস্ত্রি ছিল। মোটরবাইক, চারচাকা এসব সারাতো।

মা দু-বাড়িতে রান্নার কাজ নিয়েছিল। তবুও আমরা পাঁচ ভাইবোন আধপেটা খেতাম। আমার বড় দাদার বয়েস যখন বারো তখন সে স্কুল ছেড়ে দিয়ে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ নিল। ওহ, আপনাদের তো আমার নামটাই বলা হয়নি। আমার একটা গাল ভরা নাম আছে, জানি না কেন আমার বাবা, মা এমন নাম রেখেছিল আমার? কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনের মতোই আমার নাম, সংযুক্তা গুপ্ত। জয়চাঁদ রাজের কন্যা নই, বরং পেটের জ্বালায় অনাহারে থাকা মেয়ে আমি। না গুপ্ত সারনেমটা আমার বায়োলজিক্যাল ফাদারের নয়। ওটা আমায় যারা দত্তক নিয়েছিল তাদের। না, আমি পৃথ্বীরাজের পছন্দের নই, বা কোনো রাজকন্যা নই। নামটা শুধু মাত্র নামই। আমি হলাম সেজো বোন। আমার ওপরে এক দিদি আমার থেকে বছর দেড়েকের বড়।

আমার ছোট দুটো ভাই, বোন ছিল। একজনের বয়েস তিন আরেকজনের দুই। সারাদিন কান্নাকাটি লেগেই থাকতো আমাদের দু-কুঠুরি বাড়িতে।

তবুও আমরা রাতে ভাইবোনেরা একসঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে শুতাম। নিজেদের গায়ের গন্ধ পেতাম, মনে হত খুব নিরাপদে আছি।

আমিও স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। একদিন স্কুল থেকে ফিরেছি আর আমার বাবা একজন ভদ্রলোককে নিয়ে এসে হাজির। সেই ভদ্রলোকের নাকি ছেলেমেয়ে নেই। আর আমার বাবার অনেক আছে। তাই সেই মধ্যযুগের বিনিময় প্রথার মতোই ভদ্রলোক টাকা দিয়ে একটা বাচ্চা কিনতে চান। আমার ছোট, ভাই, বোনকে নয় পছন্দ হল আমাকে। এক্ষেত্রে অবশ্য আমার সংযুক্তা নামটা সার্থক হল। অন্তত একবার সয়ম্বর সভা বসল আমার। ধুর, সয়ম্বর না বলে নিলাম বলা ভালো। কারণ আমার ইচ্ছের দাম ছিল না ওখানে। আমরা পাঁচ ভাইবোন লাইন দিয়ে দাঁড়ালাম। কাকে পছন্দ হয় দেখার জন্য। আমার সব থেকে ছোট্ট ভাইটা কেঁদেই যাচ্ছিল মায়ের কোলে। আমার দিদির ইচ্ছে ছিল, ওই গাড়িতে চাপার, তাই ও বারবার এগিয়ে যাচ্ছিল ভদ্রলোকের দিকে। দাদাও বোধহয় ভালোমন্দ খেতে পাবে বলেই, ফিসফিস করে বলল, যদি আমাকে নিয়ে যায়, তো আমি এখুনি যাব। ছোট দুটোর তখনও এত বোঝার ক্ষমতা ছিল না। একমাত্র আমিই ঘাড় গোঁজ করে নীচের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। শ্যাওলা ধরা নোনা দেওয়ালগুলো আমার বেশি পছন্দের ছিল। তেলচিটে ধরা বিছানার স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধটা আমার খুব আপন ছিল। নিজেদের বাড়ির ওপরে একটা অধিকারবোধ ছিল। মায়ের হাতের গুগলি চচ্চড়ির স্বাদ আমার কাছে অমৃতের মতো ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, আমার নাম সংযুক্তা। রাজকীয় একটা ব্যাপার ছিল বোধহয়। তাই নিলামে উঠে গেলাম আমি। আমার বাবা বলল, কী যে বলেন স্যার? সংযুক্তা আমার সব থেকে গুণের মেয়ে, আরেক লাখ বাড়িয়ে দিন। একটু দর কষাকষির পরে বাবার হাতে অনেক টাকা দিয়ে আমায় কিনে নিলেন ভদ্রলোক। মানে আমার নতুন বাবা। ভাইবোনরা জড়িয়ে ধরে কাঁদল, মা কাঁদল, বাবাও অশ্রুসিক্ত চোখে বলল, ভালো থাকিস। শুধু আমার চোখ দুটো ছিল মরুভূমির মতো শুকনো। এক ফোঁটা জল বেরোল না। আমার বইপত্র, জামা- যে দুখানা ছিল, কিছু নিলাম না আমি। মা দিতে চেয়েছিল গুছিয়ে, আমিই নিইনি। মাত্র ছয় বছর বয়সেই আমি প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলাম।

শিখে গেলাম কান্না চেপে রাখার কঠিন রহস্য। আবেগ লুকিয়ে রাখতে শিখে গেলাম ওই বয়সেই।

আমি এসে দামি গাড়িতে চড়ে এসে হাজির হলাম একটা বড় রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িতে। যে বাড়ির গ্যারেজটার মধ্যে আমার গোটা বাড়িটা ঢুকে যাবে।

ভয়ে ভয়ে আমি উঠলাম সেই বিশাল বাড়িটাতে। পা পিছলে যাচ্ছিল আমার মেঝেতে। ইট বের করা খসখসে নয় সে মেঝে, ঝকঝকে সাদা, মুখ দেখার মতো। আমি যেতেই একজন মহিলা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। পাগলের মতো চুমু খেতে শুরু করল আমার গালে। আমি থতমত খেয়ে গেলাম।

এতদিন পর্যন্ত আমার ব্যস্ত গরিব মা আমাকে হাতে গুনে বার কয়েক চুমু খেয়েছিল। নোংরা জামা, গায়ের রং ময়লা বলে তেমন কেউ আদর করত না। যাদের গায়ের রং ফরসা, বেশ আদুরে দেখতে হয়, লোকে দেখতাম তাদের গাল ধরে খুব আদর করত। আমি ভাবতাম, অমন পুতুল পুতুল দেখতে হয় যাদের তাদের বোধহয় আদর করে লোকে। আমাকেও যে কেউ এমন করে বুকে চেপে ধরতে পারে, এটা আমি ভাবিনি কোনোদিন। অস্বস্তি হলেও আমি ওই মহিলার বুকে মুখ লুকিয়েছিলাম।

বাড়ি থেকে আসার সময় আমার চোখ দিয়ে জল পড়েনি, কিন্তু ওই মহিলার বুকে মুখ গুঁজে প্রথম আমার চোখ ছাপিয়ে জল এসেছিল।

ওই মহিলা বলেছিল, আমার নাম দীপালি। তুই আমায় মা বলে ডাকবি, পিঙ্কি? তোকে আমি পিঙ্কি বলে ডাকি? আমি ঘাড় নেড়েছিলাম। সেদিন থেকে দীপালিদেবী আমার মা আর প্রণববাবু আমার বাবা হয়েছিলেন। সেসব স্মৃতি এখন অতীত।

বছর পাঁচেক পরে অত বয়েসে আবার দীপালিদেবী সন্তানসম্ভবা হয়েছিলেন। আমার একটা ফুটফুটে ভাই হয়েছিল। আমি দিনরাত ভাইকে নিয়ে মেতে ছিলাম। তখন আমি ক্লাস সিক্সের স্টুডেন্ট। বাবা রেগুলার অফিস থেকে ফিরে আমাকে পড়তে বসাত। বাবা বলত, দিনরাত ভাইকে নিয়ে থাকলে হবে? তোকে বড় ডাক্তার হতে হবে। বাবা আমাকে যেন একটু বেশিই ভালোবাসতো। মা বলত, বাপ সোহাগী পিঙ্কি। আর আমার ভাইটা ছিল একেবারে পুতুল। একমাথা কোঁকড়ানো চুল, ধবধবে ফর্সা, ঠিক যেন মোম দিয়ে গড়া। আমার মতো শ্যামলা নয়। কিন্তু ওই যে বলে না, দিদির স্নেহ, তাই কখনো আমার ভাইয়ের রঙের প্রতি হিংসা ছিল না। বরং খুব গর্ব হত অমন একটা ফুটফুটে পুচকে আমার ভাই বলে। আমি ভুলতে বসেছিলাম আমার অতীত। আমার বর্তমান বাবা, মায়ের স্নেহই ভুলিয়ে দিয়েছিল। আর আমার বায়োলজিক্যাল ফাদার বা মাদারও বোধহয় ভুলেই গিয়েছিল আমার অস্তিত্বের কথা। কারণ ওই পাঁচ বছরে তাদের কোনোদিন আমাদের বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে দেখিনি।

দিনগুলো কাটছিল খুব সুন্দর ভাবেই। ভাইও বড় হচ্ছিল সময়ের নিয়মেই। আমি ছিলাম ভাইয়ের সব থেকে আবদারের জায়গা। আমার ভাই আমার মতো শান্ত ছিল না। ছিল ভীষণ দুরন্ত। আমাকে পাওয়ার আগে পর্যন্ত মাকে বেশ চড়া ডোজের মেডিশন নিতে হত। মায়ের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। আমাকে পাওয়ার পরে মা ধীরে ধীরে সেরে উঠেছিল। কিন্তু ভাইয়ের অত দুরন্তপনা সামলানো মায়ের কম্ম নয়। আমাদের বাড়ির দুজন পরিচারিকাও হাঁপিয়ে যেত। ভাই একমাত্র আমার কথা শুনত। আমি পড়াশোনাটা মন দিয়েই করতাম। বাবা দিনরাত বলত, তোকে বড় ডাক্তার হতে হবে। কে জানে কেন আমার মাথায় ওটা ঢুকে গিয়েছিল স্থির ভাবে। আমি ভাবতাম, ডাক্তার আমায় হতেই হবে। তাই দিনরাত পড়াশনা করতাম ছোট থেকেই। ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল ছিলাম। জয়েন্টেও একচান্সেই মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেলাম। এদিকে আমার ভাইয়ের পড়াশোনায় একেবারেই মন ছিল না। দিনরাত শুধু ব্যাট বল নিয়ে পড়ে থাকত। বাড়ির কারোর কথা শুনত না শুধুমাত্র আমার কথাটুকু সে ফেলতে পারত না। আমার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ওর নাম রাখা হয়েছিল সংযোগ। আমার থেকে প্রায় এগারো বছরের ছোট আমার ভাই। আর যেহেতু স্নেহ নিম্নগামী তাই বাবা, মা সকলের কাছে থেকেই আমি ভাইয়ের দোষগুলো ঢেকে রাখতাম। ওকে যেন কখনো বাবা বা মা না মারে সেই চেষ্টা করতাম। কবে থেকে যেন আমার ভাইটা বাবা, মায়ের থেকেও আমাকে বেশি ভালোবাসতে শুরু করে দিল। একমাত্র আমি বললেই সে পড়তে বসত। মা বলত, পিঙ্কির আদরে সঞ্জুটার বারোটা বাজছে। বাবা বলত, দিদি ডাক্তার আর ভাই জমাদার। বাহ, ভালোই মানাবে যাইহোক।

আমার ভাইটা পড়াশোনাতে হয়তো অত ভালো ছিল না, কিন্তু ছবি আঁকত তুখোড়। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিলাম, ভাইকে আমি আর্ট কলেজে ভর্তি করব।

ছয়টা বছর কঠিন পরিশ্রম করে আমি ডাক্তারি পাশ করলাম। আমার বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত তখন। মা বলেছিল, যাক, আমার রোগের ট্রিটমেন্ট আর বাইরে গিয়ে করতে হবে না, আমার নিজের মেয়েই করবে। বাবা, মা, ভাই সকলের গর্বের ছিলাম আমি।

আমি প্র্যাকটিস শুরু করলাম। আর মা আমার পাত্র দেখতে। ঠিক তখনই একদিন আমাদের বাড়ির গেটে একজন বয়স্ক লোক এসে হাজির। সংযুক্তা পালের খোঁজ করছে। আমি বেরিয়ে গিয়ে বলেছিলাম, ডক্টর সংযুক্তা গুপ্তা আমার নাম। পাল নয়। ভদ্রলোকের জামাকাপড় বেশ মলিন, চেহারাতেও দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ওমা, এত বড় হয়ে গেছিস? আমায় চিনতে পারছিস না? আমি তোর বাবা রে, সুকুমার পাল। না, মনে ছিল না আমার বাবাকে। স্মৃতির পাতায় খুব আবছা একটা মুখ ছিল। দীর্ঘদিনের অদর্শনে সেটাও ভুলে যেতে বসেছিলাম।

আমি একটু বিরক্ত হয়েই বলেছিলাম, আমার বাবার নাম প্রণব গুপ্ত। কে আপনি? বলে আমি ভ্রু কুঁচকেছিলাম। তখনই বাবার আড়াল থেকে মা বেরিয়ে এসে বলছিল, মুনি তুই আমাদের চিনতে পারছিস না? এই গলাটা ছিল আমার খুব পরিচিত। অন্ধকারে ভয় পেলে একদিন এই গলাটার স্বর শুনেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তাম।

এই মানুষটার আঁচলের গন্ধটা একবার নেব বলে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে পিছন পিছন ঘুরতাম। এই বাড়িতে এসেও লুকিয়ে লুকিয়ে বাথরুমে ঢুকে কাঁদতাম। মা বলে ডাকার সময় বারবার এই মুখটা মনে পড়ত। তারপর কবে থেকে যেন কষ্টগুলো রাগে পরিণত হয়ে জমাট বেঁধে গিয়েছিল। আর সেই ক্ষত থেকে কখনো রক্তক্ষরণ হতে দিইনি আমি। আমার এই বাড়ির বাবা, মা, ভাই আমাকে ভরিয়ে দিয়েছিল। ভাই হবার পরও বাবা, মা আমাকেই বেশি ভালোবাসতো। মা বলত, তুই না এলে আমি বাঁচতামই না। তোর মুখের মা ডাকই তো আমায় বাঁচিয়ে দিল, বন্ধ্যা নামক কষ্ট থেকে।

কবে থেকে যেন আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম, এটাই আমার বাড়ি, এরাই আমার পরিবার। স্মৃতির ধূসর পাতায় আমার গর্ভধারিণী কবেই যেন ধুলো ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। বাবার মুখটা অবশ্য আমি মনে করতে চাইনি কখনো। যে মানুষ নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দেয় তাকে আমি বাবার আসনে বসায়নি কোনোদিনই।

ওদের সেদিন দেখে আমি বিরক্ত হয়েই বলেছিলাম, তো, এত দিন পরে কী মনে করে? বাবা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেছিল, তোর জন্য মনটা খুব উতলা হয়ে উঠেছিল রে। অনেক বছর তো বুকে পাথরচাপা দিয়ে রইলাম, আর পারছি না। চল ফিরে চল। আমি ছিটকে উঠে বলেছিলাম, প্রশ্নই আসে না। এটা আমার পরিবার। এখানে আমার বাবা, মা, ভাই সবাই থাকে। ওদের কথার মাঝেই আমার মা বেরিয়ে এসেছিল ঘর থেকে। দীপালিদেবীর দয়ার শরীর বলে আমি আর ভাই প্রায়ই রাগতাম মাকে। সেই দয়ার শরীর আর সরল মন নিয়েই মা বলেছিল, আহা, অভাবের তাড়নায় টাকা নিয়েছিল, মায়ের মন তো বল পিঙ্কি। তুই এভাবে ওদের তাড়িয়ে দিস না। ওরাও থাকুক আমাদের বাড়িতে।

আমার গর্ভধারিনী মা আর বায়োলজিক্যাল ফাদার ঢুকে পড়ল গুপ্ত বাড়ির অন্দরমহলে। প্রথম প্রথম খুব সংকোচেই থাকত। আমিও খুব বেশি কথা বলতাম না। সেই টানটাই তো আর নেই। কেমন যেন হারিয়ে যাওয়া একটা সম্পর্কের নামটুকুকে জোর করে বয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। এভাবে শুধু জন্ম দেওয়ার জোরে বাবা, মা হওয়া যায় না বলেই আমার বিশ্বাস ছিল। আমার কাজের প্রেসার বাড়ছিল। একদিকে হসপিটাল, অন্য দিকে প্র্যাকটিস সব মিলিয়ে সময় কমছিল হাতে। বাড়ির সকলের সঙ্গে কথা হত ওই রাতে ডিনার টেবিলেই। আচমকা একদিন খেয়াল করলাম, আমার বায়োলজিক্যাল বাবা আর মা এ বাড়িতে বেশ সাবলীল হয়ে গেছে। নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে খাবার আনছে, বাবা খবরের কাগজ পড়ছে, প্রথমের সেই সংকোচটা আর নেই তাদের দৃষ্টিতে। আমি এমনি কৌতূহলের বশেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, রেবা এখন কোথায়? রেবা আমার পরের বোন ছিল। মা ফট করে বলে বসল, রেবা এখন গুজরাটে। ওকে যে কিনেছে সে অনেক বড়লোক। বাবা ইশারায় মাকে থামানোর জন্যই বলল, রেবাও তোর মতোই ভালো আছে। আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, দাদা, দিদি, ভাই তারা কোথায়? মা মুখ নিচু করে বলেছিল, সকলকেই একেক জায়গায় বেচে দিয়েছে বাবা। দাদা নাকি কোন হোটেলে কাজ করে। আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়েছিলাম আমার বায়োলজিক্যাল বাবার দিকে। ঘৃণায় গাটা রিরি করে উঠেছিল। মুখে জমেছিল অবাঞ্ছিত থুথু। সামলে নিয়ে বলেছিলাম, পাঁচজনকে বিক্রি করার পরেও তোমাদের এমন অবস্থা কেন? বাবা প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলেছিল, একটা ব্যবসা শুরু করেছিলাম, নিজের গ্যারেজ। কিন্তু ওই যে কপালে নেই। তাই টাকাপয়সা সব উড়ে গেল। ব্যবসাটা বসে গেল। আমি বিমূঢ় হয়ে বললাম, তোমরা সবাইকে বিক্রি করে দিলে? মা হাউমাউ করে বলল, আমার কথা কোনোদিনই শোনেনি তোর বাবা। আমার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, মিথ্যেবাদী। চোখের সামনে ভেসে উঠল, সংযুক্তা পালের নিলামে ওঠার দিনটা। কেন বাবা সব ছেলেমেয়েদের লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল, এতদিনে পরিষ্কার হল আমার কাছে। লজ্জায়, ঘৃণায় কুঁকড়ে গেলাম আমি। নিজের শরীরের লোহিত রক্ত কণিকার প্রতি ঘৃণা হচ্ছিল আমার। চূড়ান্ত ঘৃণা।

আমি ছুটে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলাম। সঞ্জু কিছু না বুঝেই বলেছিল, কেউ চিট করেছে তোকে দিদিভাই? তুই শুধু আমায় বল। আমি গিয়ে সেই ছেলেকে শেষ করে দেব। সঞ্জুর উত্তেজনা দেখে মা এসে বলেছিল, কী রে পিঙ্কি, কী হয়েছে তোর? তুই এমন অস্থির কেন হচ্ছিস?

আমি রেগে গিয়েছিলাম মায়ের ওপরে। প্রায় চিৎকার করে বলেছিলাম, ওদের তাড়িয়ে দাও মা। ওরা এবাড়িতে থাকলে আমি অসুস্থ হয়ে যাব। বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ধুর পাগলি এমন বলতে নেই। ওরা না থাকলে তোকে কি আমরা পেতাম? ভাই আমাকে দু-হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে বলেছিল, তোর চোখে জল দেখলে আমি কিন্তু লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দেব এই বলে দিলাম। আমার দিদিভাইকে যে কষ্ট দেবে, তাকে আমি ছাড়ব না।

আমি আমার পাগলা ভাইটাকে কপালে চুমু দিয়ে শান্ত করেছিলাম।

আমার বায়োলজিক্যাল বাবা, মা এখন বেশ সচ্ছন্দেই রয়েছে এবাড়িতে। বহালতবিয়তে আছে।

একদিন ডিনার টেবিলে আমার সন্দেহ হল ওদের ভাবভঙ্গি দেখে। সুকুমার পালকে দেখলাম একটু বেশিই অস্থির লাগছে। পুডিংয়ের একটা বাটি খুব সুচারুভাবে বদলে দিল সঞ্জুর সঙ্গে। খেতে খেতে সকলের চোখ থাকে টিভি পর্দায়। তাই কেউই খেয়াল করল না বিষয়টা। সুকমার পাল তারপর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছিল টিভির খবরের নিরিখে।

আরেকটা বিষয়ও কারোর নজরে পড়েনি। সেটা করেছিলাম আমি। ভাইয়ের পুডিংয়ের বাটিটা আমি নিজে নিয়ে ওকে নিজেরটা দিয়ে দিয়েছিলাম।

হ্যাঁ অফিসার, কয়েক ঘণ্টা আগেই আমাকে বের করা হয়েছে আই সি ইউ থেকে। আমার শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হবার আগেই আমাকে ভর্তি করা হয়েছিল নার্সিং হোমে। তাই হয়তো আমি এখনও বেঁচে আছি। যদিও আমি বাঁচতে চাইনি। কারণ আমার গোটা শরীরের রক্তটাই বিষাক্ত। তাই আমি মৃত্যু চেয়েছিলাম। সেদিন পুডিং বানিয়েছিল আমার গর্ভধারিনী। আর আমার ভাইকে বিষটা খাওয়াতে চেয়েছিল সুকুমার পাল, আমার বাবা। এদের সন্তানের বাঁচার কোনো অধিকার নেই অফিসার।

ওরা গুপ্ত বাড়ির ওয়ারিশকে মেরে ফেলতে চাইছিল। যাতে সব সম্পত্তি আমি পাই, আর তারপর ওরা।

অফিসার বললেন, ওদের অ্যারেস্ট করা হবে শুধু আপনার বয়ানের অপেক্ষায় ছিলাম। টেস্ট রিপোর্টে বিষের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

আমার মা দীপালিদেবী, আমার বাবা প্রণববাবু আর ভাই সংযোগ তিনজনের গালেই নোনতা জলের ভিজে দাগ। সঞ্জু বলল, দিদিভাই, তুই সব জেনেও কেন ওটা খেলি? আমাকে ছেড়ে তুই থাকতে পারতিস?

মা অভিমানে মুখ ফিরিয়ে বলল, তবে কি আমার ভালোবাসায় কোনো খামতি ছিল পিঙ্কি?

বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, এত সহজে প্রণব গুপ্তর মেয়ে হারে না।

কেন কে জানে, আমার আবার বাঁচতে ইচ্ছে করছিল। ভাইয়ের সঙ্গে ব্যাটবল খেলতে, মায়ের লেগপুল করতে, বাবার আদর খেতে ইচ্ছে করছিল।

আমি ঈশ্বরকে বললাম, আমায় আরেকবার সুযোগ দাও প্লিজ। আমি আমার পরিবারে ফিরতে চাই। ওই নোংরা রক্তের দায় আমার নয়। আমি বাঁচতে চাই।

আমি এখন সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছি। গোটা পরিবার আমায় আগলে রেখেছে। তবুও মাঝে মাঝেই মনে হয়, কেন যে আমি আমার বায়োলজিক্যাল বাবা, মায়ের নামটা পালটে প্রণব গুপ্ত আর দীপালি গুপ্ত করতে পারলাম না, কে জানে!

কিছু সত্যি কেন যে এত বেদনাদায়ক হয় জানি না। কিছু স্মৃতিতে যত তাড়াতাড়ি ধুলোর আস্তরণ পড়ে ততই মঙ্গল।

কম্পাউন্ডার চেম্বারে উঁকি দিয়ে বলল, ম্যাম, একজন এসেছেন, বলছেন হার্ট পেশেন্ট, আপনার মা পাঠিয়েছেন।

ডক্টর সৌরিক রায় স্মার্টলি আমার চেম্বারে ঢুকে বলল, ম্যাম আমি ডিরেক্ট ম্যাট্রিমনি থেকে আসছি। আপনার মা বললেন, আপনি ভীষণ ব্যস্ত। তাই চেম্বারেই চলে এলাম।

সৌরিকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আমি বললাম, বয়েস? সৌরিক হেসে বলল, বয়েস ত্রিশ বছর চার মাস, হাইট পাঁচ ফিট এগারো, পেশায় ডক্টর, আপনাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম মেডিকেল কলেজে, না, তখন সাহস করে প্রোপজ করতে পারিনি। সেই তখন থেকেই বুকের বাম দিকের যন্ত্রটা বিকল হয়ে পড়ে আছে। কদিন আগেই ম্যাট্রিমনির সাইটে আপনার ছবি দেখে আপনার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তারপর ট্রিটমেন্ট করাতে সোজা আপনার চেম্বারে। সুস্থ করা আপনার দায়িত্ব।

আমি হেসে বললাম, আমার মায়ের রেফারেন্সে যেহেতু এসেছেন তাই ট্রিটমেন্টের দায়িত্ব আমি নিলাম। মনে মনে বললাম, আমি সত্যি ভাগ্যবতী, নাহলে এমন বাবা, মা পাই?

সৌরিক বলল, আপনার মা বেজায় টেনশনে আছেন, আপনি আদৌ আমার ট্রিটমেন্ট করবেন কিনা সেই নিয়ে! তাহলে ওনাকে কনফার্ম করে দিই ম্যাম? আমি মুচকি হেসে বললাম, কলেজের সেই লাজুক ছেলেটা কবে এত কথা শিখল?

সৌরিক হেসে বলল, তোমার বায়োডাটা পড়ে ভাবলাম, এত বড় সত্যি বলার সাহস যার আছে তার সামনে কথা না বলতে পারলে জাস্ট আউট হয়ে যাব। তখন এই হৃদয়ঘটিত রোগের ট্রিটমেন্ট কে করবে? সংযুক্তা, আমি অবাক হয়েছিলাম, তুমি পরিষ্কার লিখেছ, প্রণব গুপ্ত আর দীপালি গুপ্ত তোমার বায়োলজিক্যাল পেরেন্টস নয়। তোমার বায়োলজিক্যাল পেরেন্টস তোমায় বিক্রি করে দিয়েছিল। এটা পড়ার পর খাপখোলা ঝকঝকে তরবারিটাকে আপন করতে বড্ড ইচ্ছে হল। তাই সাহসে ভর করে চলেই এলাম।

আমি সৌরিককে বললাম, ফোন করে বলে দাও আমার মাকে, আমি তোমার হৃদযন্ত্রের দায়িত্ব নেব।

সৌরিক একটু আস্তে বলল, ম্যাডাম বাইরে আপনার অনেক পেশেন্ট ওয়েট করছেন, আমি আজ চললাম, আপাতত শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক পড়ছে আমার।

আমি বেলটা বাজালাম, নেক্সট….

আমার ফোনটা বেজে উঠল, মা কলিং…

কিছু স্বপ্ন, কিছু মেঘলা

কিছু বই টই ধুলো লাগা,

কিছু ইচ্ছে, সাড়া দিচ্ছে

এ বসন্ত রাত জাগা…..