অগোছালো সংসার – অর্পিতা সরকার
অগোছালো সংসার
একটা কথা বলবে তন্ময়, হঠাৎ তোমার এই মাসি কোথা থেকে উদয় হল আমাদের ফ্ল্যাটে? দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটে মাঝে মাঝে আমার বাবা-মা এসে এক-দুদিন থাকেন,তাতেই বুক চাপ লাগে। আর ইনি কি পার্মানেন্টলি এলেন নাকি? এতদিন তো জানতাম তোমার একটাই মাসি টাটানগরে থাকেন, এখন ইনি কে?
তন্ময় ফিসফিস করে বলল, একটু চুপ করবে নূপুর প্লিজ? উনি শুনতে পাবেন যে! পান্না মাসি সত্যিই খুব ক্লান্ত। দুদিন রেস্ট নিক তারপর আমি যাহোক একটা ব্যবস্থা করছি।
নূপুর বিরক্তি উগরে দিয়ে বলল, আমি তো বুঝতেই পারছি না, মায়ের মৃত্যুর পরও এই মাসিকে তো দেখিনি সেদিন। এখন তোমার হঠাৎ মাসিকে মনে পড়ল কেন? তন্ময় শান্ত গলায় বলল, ফ্ল্যাটটা কিন্তু আমি কিনেছি, তাই এখানে আমারও একটু অধিকার আছে!
নূপুর অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল… এমন তন্ময়কে ও কোনোদিন দেখেনি। একই অফিসের কলিগ হিসাবেই তন্ময়ের সঙ্গে প্রেম নূপুরের। এক কথায় শান্ত, নির্বিবাদী তন্ময়কে বেশ ভালো লাগত নূপুরের। কিন্তু তন্ময়ের দিক থেকে কোনো এক্সট্রা আগ্রহ না দেখেই নূপুরও তেমন এগোয়নি। বছর দুয়েক একই ডিপার্টমেন্টে জব করার পরেও হাই, হ্যালোর বাইরে তেমন কোনো কথা এগোয়নি ওদের মধ্যে। আচমকা বিধ্বস্ত তন্ময় নূপুরের সামনে এসে বলেছিল, চারদিনের জ্বরে মা চলে গেলেন। বাবা তো আগেই গিয়েছিলেন, মা-ও চলে গেলেন। একেবারে একা হয়ে গেলাম নূপুর। কাছা পরেই অফিসে ছুটির অ্যাপ্লিকেশন দিতে এসেছিল তন্ময়। ওর অমন বিধ্বস্ত, পরিশ্রান্ত মুখটা দেখে কে জানে কেন বুকটা কেঁপে উঠেছিল। নূপুর নরম গলায় বলেছিল, আর কেউ নেই বাড়িতে? কোনো রিলেটিভও নেই?
তন্ময় করুণ ভঙ্গিমায় বলেছিল, আমি একমাত্র সন্তান। এক পিসি আছেন অসুস্থ, মাসি টাটানগরে থাকেন, খবর পেয়েছেন, আসবেন বোধ হয়। মাকে ঘিরেই ছিল আমার ছোট্ট পৃথিবীটা, সেটা এমন আচমকা ঝড়ে এলোমেলো হয়ে গেল। নূপুরকে কিছু সাহায্য করতে বলেনি তন্ময়, তবুও নূপুর যেচে গিয়েই হাল ধরেছিল তন্ময়ের এলোমেলো সংসারের। নিজের বাড়িতে বলেছিল, হঠাৎই এক কলিগের মা মারা গেছেন, তাই সকালে রোজ যেতে হবে ওদের বাড়ি, একটু গুছিয়ে দিতে। মা একটু সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলেছিল, কলিগ? কি নাম?
একটু থমকে নূপুর বলেছিল, তনিমা।
তন্ময়কে তনিমা করে দিতেই আর নিষেধের বেড়াজালে পড়তে হয়নি নূপুরকে। তাছাড়া নূপুরই ছিল ওদের সংসারের সব থেকে রোজগেরে পার্সন। বাবার পেনশনের টাকায় যখন খুঁড়িয়ে চলছিল সংসার তখনই নূপুর চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিল। তাই ভাইয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সব দায়িত্ব ওই নিতে পেরেছিল। নূপুর জানে আর দুটো বছর কষ্ট করলেই হয়তো ভাই চাকরি পেয়ে যাবে, তখন ওদের বাড়ির ধূসর সিলিঙে আবার ডিস্টেমপার হবে। একটু বয়েস হলেই যেখানে মধ্যবিত্ত ঘরে মেয়ের বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে যায় সেখানে নূপুরের বাবা-মা ওর বিয়ের কথা অবধি তোলে না। নূপুরদের সংসারটা বোঝে, মেয়েটা না থাকলে ভেসে যাবে ওদের চারটে খুঁটির ওপরে সোজা হয়ে দাঁড়ানো সংসারটা। তাই ওর সব বান্ধবীদের বিয়ে হয়ে গেলেও ত্রিশ বছরে দাঁড়িয়ে নূপুর এখনও অবিবাহিতা। সেই জন্যই হয়তো ওদের সংসারে নূপুরের কথার একটা গুরুত্ব আছে। তনিমার জায়গায় তন্ময় বললে মা হয়তো একটু ঠুনকো আপত্তি করত, কিন্তু নূপুর দৃঢ় হয়ে দাঁড়ালে খড়কুটোর মতোই ভেসে যেত মায়ের নিষেধটুকু। তবুও অকারণে অশান্তির সম্মুখীন হতে চায়নি ওর নির্বিবাদী মন।
রোজ সকালে তন্ময়ের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাচ্ছিল নূপুর। পিতলের হাঁড়িতে ওর হবিষ্যির সব ব্যবস্থা করে দিয়ে তারপর অফিস যাচ্ছিল। তন্ময় তখন সদ্য কিনেছিল এই ফ্ল্যাটটা। অগোছালো দুটো ঘর, এখানে জামাকাপড় তো অন্যত্র ম্যাগাজিন খবরের কাগজের স্তূপ। সেসব পরিষ্কার করে বাসযোগ্য করে তুলেছিল নূপুর। তারপর নিজের টাকায় ফ্ল্যাটের পর্দা থেকে বেড সাইট লাইট অবধি কিনে সাজিয়েছিল তন্ময়ের ফ্ল্যাটটাকে।
মায়ের কাজ সুস্থভাবে মেটার পর নূপুর ভেবেছিল তন্ময় হয়তো নিজেই প্রোপজ করবে ওকে। কিন্তু কৃতজ্ঞতা ভারে ন্যুব্জ তন্ময়, নূপুরের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে নিজেকে ঋণী স্বীকার করা ছাড়া আর একধাপও এগোয়নি।
নূপুরও তীব্র অভিমানে চুপ করেই ছিল। খুব ইচ্ছে করত একদিন আবার হাজির হতে তন্ময়ের ফ্ল্যাটে, নিশ্চয়ই আবার এলোমেলো করে রেখেছে ঘর, ডাইনিং, ড্রয়িংরুমের কুশনগুলো, নিজের হাতে গুছিয়ে দিতে বড্ড সাধ জাগত। কিন্তু সেই অদম্য ইচ্ছেটাকে জোর করেই চেপে রেখেছিল নূপুর। নিজেকে এভাবে তন্ময়ের চোখে ছোট হতে দিতে পারে না বারবার। তাই তন্ময়কে ভালোলাগা সত্ত্বেও গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। তন্ময়ের ফ্ল্যাট সাজাতে সাজাতে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়েছিল নূপুরের, মনে হয়েছিল এ যেন ওর একলার সংসার। রান্নাঘরের গ্যাসের নবটাও যেন ওর হাতের ছোঁয়ার অপেক্ষায় আছে এমনই অদ্ভুত অনুভূতিতে ভেসেছিল ও তখন। তারপর তন্ময় যেদিন বলেছিল, নূপুর এ কদিন বড্ড সাহায্য করলে তুমি, কলিগের জন্য এমন কেউ করে না। আমি কৃতজ্ঞ তোমার কাছে, তবে তোমাকে আর কষ্ট করে আসতে হবে না রোজ এই ফ্ল্যাটে, এবারে আমি সামলে নেব যাহোক করে। মায়ের আকস্মিক মৃত্যুর পর দিশাহীন হয়ে গিয়েছিলাম। ভাগ্যিস তুমি ছিলে নূপুর। আমি তোমার কাছে চিরঋণী হয়ে রইলাম।
কৃতজ্ঞতার বোঝা বইতে চায়নি নূপুরের স্বপ্ন দেখা মন, বরং আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল উদভ্রান্ত তন্ময়কে। বোঝেনি তন্ময় নূপুরের টুকরো টুকরো কথার মানে। নূপুর বলেছিল, পারবে একা একা? বলতো অন্য কোনো ব্যবস্থা করি? তন্ময় অবুঝের মতো বলেছিল, কাজের লোকের কথা বলছ? সে রাখবক্ষন। আপাতত শেফালীদি যেটুকু করছে করুক।
নূপুর বলেছিল, বিয়ে করবে না তন্ময়?
তন্ময় হেসে বলেছিল, আমার মত অগোছালো বাউন্ডুলে মানুষকে কে বিয়ে করবে নূপুর?
নূপুর আর কথা বাড়ায়নি। তাই বন্ধুত্ব আর কলিগের গণ্ডি পেরোয়নি ওদের সম্পর্কের সুতোটা।
তারপরেও বছর দুয়েক কেটে গিয়েছিল কেমন আছো, কী টিফিন আনলে বলে।
ততদিনে নূপুরের ভাই জব পেয়েছে। ভাইয়ের জবের খবরে একবাক্স মিষ্টি এনে অফিসের সবাইকে খাইয়েছিল নূপুর। ওর কাঁধ থেকে একটু হলেও দায়িত্ব নামক কঠিন বোঝাটা হালকা হবার আনন্দে একটু বেশিই সেজেছিল সেদিন। ওর ব্যাকক্লিপ দেওয়া অযত্নের চুলে যত্নে বাঁধা হয়েছিল একটা এলো খোঁপা। চটজলদি রোজ চুড়িদার পরা নূপুরের শরীর ঘিরে সেদিন চাপাতা রঙের একটা সিফন শাড়ির হিল্লোল, দুই ভ্রুর মাঝে ম্যাচিং কুমকুমকে ইচ্ছে করেই ঘেঁটে দেওয়া হয়েছিল। অফিসে ঢুকে কলিগদের হাতে মিষ্টি ধরিয়ে দিতেই কেকাদি আলগোছে বলল, নূপুর, বয়েস কিন্তু এখনও যায়নি তোমার, ভেবে দেখতে পারো। কেকাদির কথার সূত্র ধরে অফিসে একটু হইচই শুরু হয়ে গেল। কলিগরা হেসে বলতে শুরু করল, শুধুই ভাইয়ের জবের খবর নাকি অন্য কোনো সুখবর আছে নূপুর? সাজগোজ দেখে তো সন্দেহ হচ্ছে! শ্যামলদা মজা করে বলেছিল, মেনুকার্ডটা ঠিক করার দায়িত্বটুকু আমায় দিও, বাকি তোমরা যা ইচ্ছে করো।
নূপুর মুচকি হেসেছিল শুধু।
মিষ্টির বাক্স নিয়ে তন্ময়ের টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই অস্থিরভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল তন্ময়। রাগী গলায় বলেছিল, কাকে বিয়ে করছো? সে নিশ্চয়ই তোমার যোগ্য? সে নিশ্চয়ই আমার মতো এলোমেলো উড়নচণ্ডী নয়?
নূপুর হেসে বলেছিল, ভাই জব পেয়েছে, আমি এখন কর্তব্য নামক ভারী শব্দটার ফাঁক দিয়ে একটু হলেও মুক্তির বাতাস নিতে পারব, তাই মিষ্টি খাওয়াচ্ছি সবাইকে। তন্ময় অপলক তাকিয়ে ছিল নূপুরের চোখের দিকে। যেন পড়ে নিতে চাইছিল, ও সত্যি বলছে না মিথ্যে? তারপর ভাঙা গলায় বলেছিল, সাজলে তোমায় বড্ড মিষ্টি লাগে নূপুর। আমি বোধহয় তোমায় ডিজার্ভ করি না তাই না?
নূপুর কেকাদির কান বাঁচিয়ে বলেছিল, সবটাই নিজে ঠিক না করে নিয়ে, কিছু প্রশ্ন আমাকেও করতে পারতে তন্ময়।
তন্ময় অল্প হেসে বলেছিল, হিরোর মতো প্রোপজ করতে পারবো না, আবার পাশ্চাত্য কালচার অনুযায়ী বলতে পারব না, উইল ইউ ম্যারি মি?
শুধু বলব, দেখলে তো আমার ফ্ল্যাটটা শুধু ঘর হয়ে পড়ে আছে, সংসার হবার কোনো লক্ষণ নেই, জানো তো আমি অদ্ভুত রকমের ভুলভাল মানুষ, এত ওলটপালট জিনিসকে গুছিয়ে নিতে কি চাও নূপুর? স্বেচ্ছায় হাঁটতে চাও এমন অগোছালো মানুষের হাত ধরে? আসলে আজ যখন সবাই বলছিল তোমার নাকি বিয়ে, তখন একটা অপরিচিত অনুভূতির সম্মুখীন হলাম। মনে হচ্ছিল, আমি স্টেশনে বসে আছি অথচ শেষ ট্রেনটা আমার সামনে দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে, আমি ছুটছি তবুও ধরতে পারলাম না। তখনই বুঝলাম, হারিয়ে ফেলার ভয়টা হারিয়ে যাওয়ার থেকেও বেশি ভয়ংকর।
নূপুরের চোখে বাধ না মানা জল এসে হাজির হয়েছিল অবাধ্য বৃষ্টির ফোঁটার মতো। নেহাত অফিস তাই সামলে নিয়েছিল।
শেষপর্যন্ত তন্ময় ওর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। খুব ঘরোয়া ভাবেই অফিস কলিগ আর কয়েকজন আত্মীয় নিয়ে বিয়েটা হয়েছিল ওদের। নূপুর তন্ময়ের সংসারে এসেছে তা দেখতে দেখতে বছর দেড়েক হল। টুকটাক বিষয়ে মনোমালিন্য যে হয়নি তা নয়, তবে ওর অগোছালো সংসারের হাল ধরে নূপুরই ওর জীবনটাকে ছন্দে ফিরিয়েছিল বলে তন্ময় বিশেষ রেসপেক্ট করত ওকে। ভালোবাসা ছাড়াও অন্যরকম একটা ভরসার জায়গা ছিল নূপুর তন্ময়ের জীবনে। বিয়ের দিনেও তন্ময়ের তরফে তেমন কোনো আত্মীয়স্বজন দেখেনি নূপুর। ওর ওই টাটানগরের মাসিই যা একজোড়া কানের দুল দিয়েছিল বিয়েতে। আর তন্ময়ের এক দূরসম্পর্কের কাকা এসেছিলেন বিয়েতে। এছাড়া দেড় বছরের বিবাহিত জীবনে তেমন কোনো রিলেটিভ দেখেনি নূপুর। হঠাৎ করে ফ্ল্যাটে এই মাসির আগমন দেখে একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করেছিল তন্ময়কে। তাতে তন্ময় নূপুরকে আরও বিস্মিত করে বলল, ফ্ল্যাটটা নাকি ওর, ও যাকে খুশি থাকতে দিতেই পারে! বুকে তিরের মতো বিঁধল কথাটা। এটাই সেই তন্ময়? কদিনে এত পরিবর্তন হয়ে গেল ওর। এর আগে অবধি তো নূপুরকে না জানিয়ে একটা সিদ্ধান্তও নেয়নি তন্ময়, এখন হঠাৎ কী হল যে ওকে না জানিয়ে একজন অসুস্থ রিলেটিভকে একেবারে বাড়িতে এনে তুলল!
আবার তাকে নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে গেলেই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে নূপুরের ওপরে। এত মহাসমস্যা এসে উপস্থিত হল ওর সাজানো সংসারে। এমনিতেই বেশি বয়েসে বিয়ে, তারপর চাকরি, সংসার সামলে সবে ভাবতে শুরু করেছিল ফ্যামিলি প্ল্যানিং নিয়ে তখনই তন্ময় এই মাসিকে নিয়ে উপস্থিত।
নূপুর তন্ময়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল দেখেই হয়তো তন্ময় বলল, পান্না মাসিকে আমি খুব ছোট থেকে চিনি। নিজের নয় ঠিকই, কিন্তু চিনি সেই ছোট থেকে। এখন উনি অসুস্থ, কেউ দেখার নেই, ওনার টাকাপয়সা সব নিয়ে নিয়েছে দুই ছেলে, মেয়ে। মাসি বড্ড অসহায় হয়ে পড়েছে, তাই ট্রিটমেন্ট করাব বলে এনেছি এখানে। হিমোগ্লোবিন কমে গেছে, অ্যানিমিক টেন্ডেন্সি, কয়েকদিন থাকলে কি খুব অসুবিধা হবে নূপুর? হয়তো বেশিদিন বাঁচবেন না, বয়েসও অনেক হয়েছে। তবুও এই কটা দিন থাকুন না।
নূপুর তন্ময়ের অসহায় চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, তাহলে বল, আমায় এখন তোমার মাসির জন্য কী সেবা করতে হবে? তন্ময় হাসি মুখে বলেছিল, জানি তো নূপুর তুমি মুখে যাই বলো, ফেলতে পারবে না। তোমার মনটা যে বড্ড সফ। নূপুর বলেছিল, এসব ন্যাকামি থাক। কোন ডক্টরকে দেখাবে সেসব ঠিক করেছ? দেখো চাকরি, সংসার সামলে আমার পক্ষে ওনার সেবা করা সত্যিই কঠিন। একজন সব সময়ের লোক রাখলে বোধহয় ভালো হয়। আমি অফিস থেকে ফেরার পর সে বাড়ি যাবে। কারণ এই ফাঁকা ফ্ল্যাটে তোমার মাসিকে একা রেখে আমি অফিসে শান্তিতে থাকতে পারব না।
তন্ময় নূপুরকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, জানি তো তুমি অনন্যা, আমাকে সহ্য করার সব ক্ষমতা তোমার আছে।
এত কিছুর পরেও কিন্তু পান্নাবালা দেবীর সম্পর্কে সঠিক তথ্য তন্ময় দিল না। উনি তন্ময়ের ঠিক কেমন মাসি সেটাও জানতে পারল না নূপুর, তবুও চুপচাপ মেনে নিল বিষয়টা, শুধু মনে মনে ভাবল ভদ্রমহিলাকে একটু চোখে চোখে রাখতে হবে। আজকাল সব হচ্ছে, এত সহজে মানুষকে বিশ্বাস করাটা বোকামি। তন্ময়ের ভালোমানুষ হওয়ার সুযোগ নিয়ে এই মাসির ছেলেমেয়েরা তন্ময়ের ঘাড়ে একে গুছিয়ে বসিয়ে দিয়ে গেল কি না কে জানে!
একটা বয়স্ক মানুষকে দিনে তিনবার খেতে দেওয়াটা বড় ব্যাপার নয়, কিন্তু সত্যিটা তো জানতে হবে নূপুরকে!
নূপুর একা হাতে ওদের ডুবে যাওয়া সংসার সামলেছে, তন্ময়ের হালভাঙা সংসারের হাল ধরেছে, তাই যুক্তিবাদী মন এত সহজে সব কিছু মেনে নেয় না।
অফিস বেরোনোর সময় পান্না মাসির ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল মাসি কি সব কাগজের কাটিং নিয়ে ঘাঁটছে। সবই খবরের কাগজের কাটিং।
পরে এসে দেখতে হবে ওগুলো কী! আসলে তন্ময় ভদ্রমহিলাকে এত পাহারা দিয়ে দিয়ে রাখছে যে নূপুর ওই ঘরে ঢোকার সুযোগই পাচ্ছে না। তন্ময় অবশ্য বলল, পরশুদিন মাসিকে নিয়ে একটা নিউরোলজিস্টকে দেখাতে যাবে। তখনই মাসির জিনিসপত্র দেখতে হবে একটু। যদিও এসব নূপুরের স্বভাববিরুদ্ধ ব্যাপার তবুও কেন যে এই বিষয়টাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারছে না ও, সেটা নিজেও জানে না।
সন্ধেবেলা অফিস থেকে বাপের বাড়ি হয়ে ফ্ল্যাটে ফিরে দেখল তন্ময় একটা মধ্যবয়স্ক মহিলাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে মাসির জন্য কী কী করতে হবে।
অবাক লাগল নূপুরের, চেনা মানুষের অচেনা রূপ দেখে। বিয়ের পর থেকে কোনোদিন সংসারের কোনোদিকে তাকাতে দেখেনি তন্ময়কে, সে এখন মাসির জন্য এত উদ্বেগ নিচ্ছে দেখেই আশ্চর্য লাগলো।
নূপুরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, উনি দেখবেন মাসিকে, কথা ফাইনাল হয়ে গেছে, মাইনেও ঠিক করে ফেলেছি।
যাক, নূপুরকে ছাড়া সবই ঠিক করতে শিখে গেছে তন্ময়, এটাই তো শান্তি নূপুরের!
পান্না মাসি ঘর থেকে তেমন বেরোন না। নূপুরের তো মনে হয় মহিলা ইচ্ছাকৃতভাবে অসুস্থ হয়ে আছেন। ফাঁকা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াতেও যেন ইচ্ছে করে না ওঁর। ঘরে বসেই খাওয়াদাওয়া সেরে নেন। আয়া স্নান করিয়ে কাপড় পরিয়ে দিলেই একটা লোহার ট্রাংক খুলে কি সব ঘাঁটেন। অদ্ভুত টাইপের মহিলা যেন। নূপুরের সঙ্গে কথা খুবই কম হয়েছে এখনও পর্যন্ত।
তবে মহিলা আর তন্ময় যে কিছু একটা গোপন করতে চাইছে ওর কাছ থেকে সেটা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে নূপুর।
তন্ময় হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকেই বলল, ডক্টরের অ্যাপয়েনমেন্ট পেয়ে গেছি, কাল যাব মাসিকে নিয়ে। ওনার বোধহয় নার্ভের সমস্যা হচ্ছে বুঝলে?
নূপুর একটু বিদ্রুপের সুরে বলল, আমার থেকে তুমিই বুঝবে ভালো ওনাকে। যতই হোক মাসি বলে কথা, হয়তো ছোটবেলায় কোলেপিঠে করে মানুষও করেছেন তোমায়।
তন্ময় একটু চমকে গেল যেন, ওর চমকানোটা নজর এড়াল না নূপুরের।
মাসিকে গাড়িতে তুলে বেরিয়ে যাবার পরেই অফিস বেরোলো না নূপুর। কাজের মেয়েটিকে একটু দোকানে পাঠিয়ে ঢুকে গেল পান্না মাসির ঘরে।
ওনার ওই লোহার ট্রাঙ্কের ভিতরের রহস্যের সন্ধানেই খুলে ফেলল ট্রাঙ্কটা। অন্যের জিনিস না বলে হাত দেওয়ার অপরাধবোধে ভুগছিল নূপুর, তবুও সত্যিটা জানতেই হবে এই জেদের বশেই খুলে ফেলল ট্রাঙ্কটা। আধ ঘণ্ট ঘাঁটাঘাঁটির পরে নূপুর নিশ্চিত হল, পান্নাবালা দেবী কিছুতেই তন্ময়ের মাসি হতে পারেন না। মাসি তো নয়ই তন্ময়ের সাথে কোনোরকম ব্লাড রিলেশনই নেই এনার। নূপুর শুধু এটুকুই বুঝতে পারছিল না, তন্ময়ের ইনি কেউ নন তাতেও কেন তন্ময় এনাকে বাড়িতে নিয়ে এল।
বাড়িতে ঢুকেই তন্ময় বলল, ডক্টর দুটো ওষুধ দিয়েছেন, বললেন বয়েসজনিত রোগ, ঠিক হবে না, তবে একটু আরাম পাবেন মাত্র। মাসির হার্ট খুব দুর্বল, যেকোনো মুহূর্তে অ্যাটাক হতেই পারে। ইসিজি রিপোর্ট তাই বলছে।
নূপুর একটা কথাও না বলে তন্ময়ের হাত থেকে ওষুধ দুটো নিল। পান্নাবালা দেবীকে ধরে ধরে নিয়ে গেল নিজের ঘরে।
পরেরদিন নূপুর ঘরের টুকিটাকি কাজ সারছিল দেখে তন্ময় বলল, অফিস যাবে না? এখনও রেডি হওনি যে!
নূপুর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, আমার অন্য কাজ আছে, ছুটি নিয়েছি আমি।
তন্ময় বেশ বুঝতে পারছিল নূপুর কিছু সন্দেহ করেছে, ও যে গোপন করেছে সেটা বুঝতে পেরেছে হয়তো। মাসিকে কি বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবার কথা ভাবছে নূপুর? বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ খবর নিচ্ছিল পরিচিত দুজন অফিস কলিগের কাছ থেকে, অফিসেই কথাটা কানে এসেছে তন্ময়ের। নূপুরকে এতদিন অন্যরকম শ্রদ্ধার চোখে দেখত তন্ময়, এখন বুঝতে পারছে ও সেই টিপিক্যাল ওয়াইফ, যারা নিজের সাজানো বাগানে একটা ঘাসের চারা দেখলে নিষ্ঠুর হাতে সেই চারাটিকে উৎখাত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
মনটা বেশ ভারাক্রান্ত হয়ে গেল তন্ময়ের। ডক্টর বলেই দিয়েছেন, মাসি বেশিদিন বাঁচবেন না। হয়তো মাস তিনেক। এই শেষ কটা দিন যদি ওদের বাড়িতে থাকত তাহলে কি খুব কিছু খারাপ হয়ে যাবে ওদের জীবনটা! মাসি তো এককোণে পড়ে আছে, কোনো ইন্টারফেয়ার তো করতে আসছে না, তবুও কেন নূপুরের এত সমস্যা হচ্ছে!
অফিসে গিয়েও অস্থির লাগছিল তন্ময়ের। বারবার মনে হচ্ছিল, বাড়ি ফিরে হয়তো মাসিকে দেখতেই পাবে না ও। নূপুর বোধহয় এতক্ষনে ওনাকে দিয়ে আসবে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে। ওই জন্যই দিনদুই ছুটির এপ্লিকেশন করেছে অফিসে।
একটু তাড়াতাড়িই ফিরল তন্ময় অফিস থেকে। ওর সন্দেহ অমূলক নয় একেবারেই। মাসি নেই ঘরে। পড়ে আছে লোহার ট্রাঙ্কটা। নূপুরও নেই ওর ঘরে। তন্ময় উদ্ভ্রান্তের মতো ফোন করল নূপুরকে।
ফোনটা সুইচ অফ বলছে। বাড়ি থেকে বেরোতে যাবে এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে নূপুর ঢুকছে বাড়িতে। ওকে দেখেই মাথাটা গরম হয়ে গেল তন্ময়ের।
চিৎকার করে বলে বসল, কোথায় পাঠিয়ে দিলে মাসিকে? বৃদ্ধাশ্রমে? নাকি হাওড়া স্টেশনে বসিয়ে দিয়ে এলে? ছি নূপুর এতটা নীচে নামতে পার তুমি?
তোমার সাথে আর এক মুহূর্ত থাকার ইচ্ছেটাই আমার নেই।
নূপুর স্তম্ভিত হয়ে দেখছে অতিপরিচিত মানুষটার অপরিচিত রূপটা। এই ওর তন্ময়? যার প্রতিটা রক্ত বিন্দু ও চেনে বলে গর্ব করে!
মাসিকে ধরে ধরে বাড়িতে নিয়ে এল কাজের মেয়েটা। মাসিকে অনেকটা সুস্থ মনে হচ্ছে যেন। পাতলা গোলাপি ঠোঁটে হাসির ছোঁয়া। ঘোলাটে চোখে আনন্দের ঝিলিক।
আলতো গলায় বলল, তন্ময়, তোর বউটা বড্ড ভালো রে।
তন্ময় কিছুই বুঝতে পারেনি। নূপুর রাতে ড্রয়িংয়ে শুয়ে পড়েছে। এই ফ্ল্যাটে আসার পর এই প্রথম ও তন্ময়ের থেকে দূরে থাকল।
সকাল দশটায় তন্ময় অফিস বেরোনোর আগেই দেখল, প্রেসের গাড়ি এসে থামল ওদের বাড়ির সামনে। দুজন রিপোর্টার এসে জিজ্ঞেস করল, আপনার বাড়িতেই তো আর্টিস্ট পান্নাবালা দেবী আছেন তাই না?
তন্ময় একটু অবাক হয়েই বলল, আপনারা কী ভাবে…
নূপুর গাঙ্গুলী আমাদের এই বাড়ির অ্যাড্রেস দিয়েছিলেন।
ওদের গলা পেয়েই বোধহয় নূপুর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, হ্যাঁ আসুন, উনি এখানেই আছেন।
পান্নাবালা দেবী, সেই কিংবদন্তি অভিনেত্রী, যিনি এক সময় থিয়েটারের স্টেজ থেকে যাত্রার মঞ্চ কাঁপিয়েছেন, তারপর রুপালী পর্দায় যাকে দেখা গেছে একাধিকবার, তিনি কেন হঠাৎ নিজেকে লুকিয়ে রাখলেন লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের থেকে? এই প্রশ্নের উত্তর দেবেন উনি নিজে!
পান্নাবালা দেবীর ভাঁজ পড়া গাল দিয়ে ঝরে পড়ল নোনতা জলের রেখা। কাঁপা, ধীর গলায় বলতে শুরু করলেন, নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েছিলাম আমি। ‘বসন্ত এসেছিল’ সিনেমায় আমি নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করব এমন কাস্টিং হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মিস রিতা কী করে যেন পরিচালকের কানে আমার নামে মিথ্যে রটিয়েছিল। আমি নাকি প্রেগনেন্ট, মাতৃত্বকে অস্বীকার করে অভিনয়ে সুযোগ নিতে চাইছি। আমি ডাক্তারি পরীক্ষা করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু কোনো প্রমাণ ছাড়াই অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়া হয় আমায়। এই কথা রটে যায় গোটা স্টুডিয়ো পাড়ায়। কাজ চাইতে গেলেই লোকে আমার পেটের দিকে কুৎসিতভাবে তাকাচ্ছিল। দু-একজন তো বলেও বসল, বিয়ে কবে হল পান্নাবালা তোমার? গর্ভবতী হলে কী করে?
অসহ্য অপমানে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম ওই লাইন থেকে। বিয়ে না করেই দুটো অনাথ বাচ্চাকে পালন করেছিলাম আমি। সেটা নিয়েও ইন্ডাস্ট্রিতে দুর্নাম রটেছিল আমার নামে। সেই সন্তানরাও আজ প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু আমার পরিচয় দিতে চায়না কাউকে। পথে পথে ভিক্ষে করছিলাম, হঠাৎই এই ছেলেটি আমায় দেখে কী করে যেন চিনে ফেলল। বলল, আপনি যাত্রার পান্নাবালা দেবী নন? চমকে উঠেছিলাম আমি! আজকাল তো কেউ নাম বললেও চেনে না, তুমি কী করে চিনলে?
তন্ময় উত্তর দিয়েছিল, তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি, জীবনে প্রথম যাত্রা দেখতে যাব ভেবেছিলাম মামার বাড়িতে গিয়ে। কিন্তু একটাও পয়সা নেই টিকিট কাটার মতো। ভেবেছিলাম, পাঁচিলে বসেই দেখব যাত্রা। সেই মতোই পাঁচিলে পা ঝুলিয়ে বসেছি এমন সময় মাইকে আপনি বললেন, পাঁচিলের বাঁ কোণে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা ছেলেটি আমার সামনে স্টেজে এসো।
আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গেটকিপারের হাত ধরে পৌঁছালাম আপনার সামনে। আপনি বললেন, আমি গ্রিনরুম থেকে বেরোনোর সময়েই তোমায় দেখেছি। পড়ে গেলে হাত পা ভাঙবে যে বাপ। যাও, সামনে বসে দেখ আমার যাত্রা।
আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে মেকআপের আড়ালে যেন নিজের মায়ের মমতাময়ী রূপ দেখেছিলাম। তাই ভুলিনি আপনাকে। যাত্রা শেষে আমায় ডেকে হাতে দশ টাকার একটা নোট দিয়ে বলেছিলেন, চানাচুর খাবে।
তারপরে আমার সব যাত্রা, সিনেমাই দেখেছে ওই ছেলে। মনে মনে নাকি বলত, এটা তো মাসির যাত্রা, দেখতেই হবে।
মাধ্যমিকের পরীক্ষার কিছুদিন আগে আমার বাড়িতে হাজির হয়েছিল তন্ময়, আমি প্রথমে চিনতে পারিনি। বলেছিল, দুটো বই কিনব, টাকা দেবে মাসি?
চিনেছিলেম ওকে, টাকাও দিয়েছিলাম বিনা বাক্যে। তারপর যোগাযোগ হয়নি বহু বছর।
সেই প্রাপ্তি ভুলতে পারেনি বলেই তন্ময় আমায় ওর বাড়িতে নিয়ে এসে তুলল।
রিপোর্টার বলল, আপনি তো কাল স্টুডিয়োতে গিয়েছিলেন শুনলাম? কেন যদি একটু বলেন…
পান্নাবালা দেবী একটু দম নিয়ে বললেন, এই যে আমার বউমা যোগাযোগ করেছে, আমায় নিয়ে ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাবে এক পরিচালক। তাই কথা বলতে গিয়েছিলাম। তখনকার দৈনিক পত্রিকায় বেরোনো পান্নাবালাদেবীর বড় বড় পোস্টারের দিকে তাকিয়ে রিপোর্টার বললেন, অভিনয় করার ইচ্ছে আছে আর?
নূপুর উত্তর দিল, নিশ্চয়ই অভিনয় করবেন। পান্নাবালাদেবীর বৃদ্ধ বয়েসের রোলটা মাসিমনি নিজেই করবেন, কথা দিয়েছেন আমায়।
আবার দৈনিক কাগজে ছবি বেরোবে ওনার, এই ছবিগুলো রোজ দেখেই স্মৃতি আগলে বেঁচে ছিলেন উনি। আমি চাই এমন একজন প্রতিভাময়ী অভিনেত্রীর জীবন সম্পর্কে এখনকার প্রজন্ম জানুক, চিনুক ওনাকে।
পান্নাবালা দেবী নূপুরের থুতনিতে হাত ছুঁইয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, আমার মা।
তন্ময় বেশ বুঝতে পারছে, মাসির ট্রাঙ্ক ঘেঁটেই নূপুর আবিষ্কার করেছে সত্যিটা। এবং ওর পরিচিত বান্ধবীর মাধ্যমেই যোগাযোগ করেছে পরিচালক বা প্রেসের সাথে।
এখন তো প্রায় দিন বিভিন্ন চ্যানেল থেকে বাইট নিতে আসছে পান্নাবালা দেবীর।
মাসি হয়তো এটাই চেয়েছিল, ক্যামেরার ওই আলোটা চোখে পড়তেই বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে মাসি। কিন্তু নূপুর আর তন্ময়ের মাঝে গড়ে উঠেছে একটা শীতলতার প্রাচীর। নূপুরের মারাত্মক অভিমানের দেওয়ালে কিছুতেই ধাক্কা দিতে পারেনি ও, তাই সেটা ভাঙতেও পারেনি।
নিত্যদিনের কথাবার্তা হলেও আর সেভাবে তন্ময়কে জড়িয়ে ধরেনি নূপুর।
সেদিন সন্ধেবেলা তন্ময় ফিরতেই মাসি বলল, বুঝলি, তোর বুদ্ধিটা এখনও সেই পাঁচিলে বসে থাকা ছেলেটার মতোই আছে রে। বউমা যে গর্ভবতী হয়েছে তুই জানিস?
গতকাল ডাক্তারের রিপোর্ট এনে আমায় বলল, আমার শাশুড়ি নেই, তাই নাতি, নাতনি যেই হোক তাকে মানুষ করে তবে আপনার ছুটি হবে। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। আমার সন্তান যেন গর্ব করে বলতে পারে, তার ঠাকুমা প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী পান্নাবালা দেবী।
তন্ময় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, আমায় তো কিছু বলল না?
পান্নাবালা ফিসফিস করে বলল, আমার ‘রূপের লাগি’ সিনেমার একটা সিন করতে পারবি বাড়িতে?
তন্ময় বলল, কী করতে হবে বল!
নূপুর অফিস থেকে ফিরে ঘরে ঢুকে দেখল ঘর অন্ধকার। অথচ তন্ময় আগেই বেরিয়ে এসেছিল অফিস থেকে, সেটা ও খেয়াল করেছিল। ইদানীং ওরা আর একসাথে অফিস যাচ্ছে না। নূপুর ইচ্ছে করেই যাচ্ছিল না তন্ময়ের সঙ্গে। যে মানুষটা ওকে ভরসা করে না, তার সঙ্গে আর নাইবা হাঁটল পথ।
অন্ধকার ঘরে হাতড়ে লাইট জ্বালাতে গিয়ে দেখল, একটা একটা করে বাতি জ্বালাচ্ছে কেউ।
খাটের ওপরে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। মাঝে একটা পিঙ্ক কালারের টেডির বুকে লেখা, ‘মা, আমি আসছি’।
বাতিগুলো জ্বালাচ্ছে তন্ময়। ওর প্রিয় জুঁইয়ের মালা ঝুলছে দেওয়ালে। কিছু বোঝার আগেই কেউ বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিতে দিতে বলল, নে এবারে সারারাত ঝগড়া কর।
তন্ময়ের বুকে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলল নূপুর।
তন্ময় কানে মুখ দিয়ে বলল, আমার মতো এলোমেলো স্বামীকে না হয় তুমি মেনে নিয়েছ, এমন উড়নচণ্ডী বাবাকে কি মেনে নেবে সে?
নূপুর কাঁদতে কাঁদতেই বলল, তোমার মতো বড় মন যেন সে পায়, কৃতজ্ঞতা শব্দের অর্থ যেন সে বোঝে, শুধু এটুকুই চাইব।
তন্ময় বলল, তোমার কাছে মাসির আসল পরিচয় লুকিয়ে আমি অন্যায় করেছিলাম, আসলে ভয়ে বলিনি। ক্ষমা করো আমায়।
নূপুর হাসতে হাসতে বলল, আজকের এই রোম্যান্টিক প্ল্যান যে তোমার নয়, সে আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট জানি, এ প্ল্যান কার?
তন্ময় হাসতে হাসতে বলল, তুমি আমায় বড্ড চেন নূপুর। এ প্ল্যান তোমার সেলিব্রিটি মাসির।
নূপুর বলল, জানো মাসিমনি কীভাবে যেন আমাদের পরিবারের একটা অঙ্গ হয়ে গেছেন। প্রথম যেদিন জানলাম ওনার সাথে কেমন অন্যায় হয়েছে, সেদিনই ভেবেছিলাম, ফিরিয়ে দিতে না পারি প্রতিবাদটুকু করব।
আগামীকাল থেকে ওই ডকুমেন্টারি ফিল্ম শুরু হবে। দু-দুটো বড় খবর এল আমাদের সংসারে।
টেডিটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নূপুর বলল, তোর প্রতীক্ষায় দিন গুনছি।
