স্বর্ণমুকুট – ১
প্রথম পরিচ্ছেদ
সকাল সাতটা পঁয়তাল্লিশ।
পুরী এক্সপ্রেস হাওড়া স্টেশনে পৌঁছতেই এগারো নম্বর প্লাটফরম সরগবম হয়ে উঠলো। গাড়িখানা এখনও থামে নি, আরোহীরা নামবার জন্যে তৈরী হচ্ছে। স্টেশনের কুলিরা গাড়ির মধ্যের মোটের দিকে দৃষ্টি রেখে সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে আট দশজন,—কেউ কেউ ইতিমধ্যে চলন্ত গাড়ির পাদানীতে উঠে পড়েছে। রাত্রিজাগা ও দীর্ঘসময় গাড়ির কামরার মধ্যে আবদ্ধ থাকায় আরোহীদের বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ফ্লাটফরমের মধ্যে গাড়িখানা আস্তে আস্তে কিছু দূর গিয়ে একেবারে থেমে গেল।
সেকেণ্ড ক্লাস কামরা থেকে বুলেট একটা চামড়ার সুটকেশ ও বেডিং নিয়ে নামতেই দুজন কুলি তার কাছে ছুটে এসে সেলাম করলে। বুলেট কিন্তু নিজেই মোট দুটো বয়ে নিয়ে চললো। প্লাটফরমের মাঝামাঝি আসতে দূর থেকে বজ্রকে দেখতে পেয়ে জোর গলায় ডাকলে, “বজ্র!”
বজ্র বুলেটের জন্যেই স্টেশনে এসেছিল; সে ছুটে এসে বুলেটের হাত থেকে বেডিংটা নিয়ে বললে, “যাক্, তুমি ঠিক সময় এসে গেছ, পুরীর গাড়ি এক-একদিন লেট করে। চল, স্টেশনের বাইরে বোমা .তার মোটর নিয়ে অপেক্ষা করছে।”
স্টেশনের সামনে বড় রাস্তার ওপর মোটরে বোমা বোধ হয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার আর অপরাধ কি! কদিন যা পরিশ্রম যাচ্ছে—দিনে, রাতে। বুলেট ও বজ্র স্টেশন থেকে বের হলো। কিছু দূরে দেখা যায় বোমার গাড়ি। বজ্র ডাকলে, “বোমা, বোমা!”
একদল ট্রেনযাত্রী সেইখান দিয়ে স্টেশনে ঢুকছিল। ‘বোমা’ কথাটা কানে যেতেই তারা হকচকিয়ে যায়। চারিদিকে তাকায়—চোখে আতঙ্ক। বুলেট তাদের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারে, বলে, “কিছু মনে করবেন না আপনারা। আমাদের যে বন্ধুটি ঐ মোটরে বসে আছে, তার নাম ‘বোমা’, আমরা তাকে ডাকছি।”
বোমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, সে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বের হয়ে বললে, “কে, বুলেট! এসেছ?
বজ্রকে নিয়ে তুমি গাড়ির মধ্যে
এসে বস, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আসছি।”
‘বুলেট’ ‘বজ্র’ ‘বোমা’!
ট্রেনযাত্রীদের মধ্যে গুঞ্জন উঠলো। একজন বললে, “আচ্ছা সব নামই বটে! বুলেট, বজ্ৰ, বোমা—হু!”
আর একজন মন্তব্য করলে, “তা যাই বলুন, ঐরকম নামই কিন্তু ওদের মানায়। দেখছেন না, বয়সে তরুণ বটে, কিন্তু কি সুন্দর মাস্কুলার স্বাস্থ্য প্রত্যেকের!”
তারা চলে গেল।
বোমা চোখমুখ ধুয়ে এসে স্টীয়ারিংয়ের সামনে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলে।
হাওড়া পুলের ওপর দিয়ে গাড়ি চলেছে। বুলেট বজ্রকে জিজ্ঞাসা: করলে, “তারপর কি খবর বল তো? হঠাৎ জরুরী তার কি জন্যে?”
বুলেট আরও কি বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বজ্রের দিকে ভালো করে লক্ষ্য করতেই সে চুপ করে গেল। মোটে দশ দিন ওকে দেখে নি। কিন্তু তারই মধ্যে বজ্রের চেহারা—মুখ চোখ—যেন শুকিয়ে গেছে। মনে হয়, গুরুতর কোন বিপদ ঘটেছে। মাথার চুল এলোমেলো, পরনের হাফপ্যান্ট-সার্ট বা জুতা-মোজার অবস্থা অপরিষ্কার, শোচনীয়। আর বোম। তো গোড়া থেকেই চুপচাপ – নীরবে ধীরে ধীরে গাড়ি চালিয়ে চলেছে।
বুলেট বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলে, “কি ব্যাপারব বল তো? তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে, কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে।”
গাড়িখানা হাওড়ার পুল পার হয়ে স্ট্রাণ্ড রোডে পড়লো। বজ্ৰ বললে, “আমাদের ‘শক্তি-সংঘে’র সম্পাদক বীরেনদাকে আজ চারদিন হলো পাওয়া যাচ্ছে না। গেল রবিবার সন্ধ্যায় শক্তি-সংঘের লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা হলো, তারপর মিটিং শেষ হতে প্রায় আটটা। মিটিং হয়ে গেলে বীরেনদা তার টু-সীটার গাড়ি করে চলে গেলেন। আমরা শক্তি-সংঘের ছেলে-মেয়েরাও বাড়ি ফিরলাম। বাড়িতে সেদিন বেশী রাত পর্যন্ত লেখাপড়া কবে সবে শুয়েছি, রাত প্রায় সাড়ে বারোটার সময় বীরেনদার বাড়ির দরোয়ান ও ভানু চাকর এসে আমাকে ঘুম ভাঙিয়ে তুলে জিজ্ঞাসা করলে—বীরেনদার কোন খবর জানি কিনা। আমি বললাম, ‘রাত আটটার পর বীরেনদার কোন খবর জানি না। কেন তাঁর কি হয়েছে?’ ভানু যা বললে তা থেকে জানতে পারলাম—বীরেনদা বাড়ি ফিরে তাঁর বৈঠকখানায় বসবার পরই একজন ভদ্রলোক একখানা মোটর করে এসে তাঁকে জানায় যে, বীরেনদার বন্ধু এটর্নি অমিতাভ সেনের হঠাৎ খুব বাড়াবাড়ি অসুখ হয়েছে, অমিতাভ বাবু সেই ভদ্রলোককে পাঠিয়েছেন, বীরেনদাকে তক্ষনি তাঁর বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে। বীরেনদা জানতেন, অমিতাভ সেনের বাড়িতে সেবা-শুশ্রূষা করার মত কোন লোক নেই, সেইজন্যে তিনি একজন নার্স কে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আগন্তুক ভদ্রলোকটি কিছুতেই এজন্যে অপেক্ষা করতে রাজী হলেন না। বীরেনদা তখন অমিতাভ বাবুর বাড়িতে নার্স কে নিয়ে যাবার ভার ভানুর ওপর দিয়ে সেই ভদ্রলোকটির সঙ্গে চলে গেলেন।
“রাত প্রায় দশটায় ভানু সেই নার্স কে নিয়ে একটা ট্যাক্সি করে অমিতাভ বাবুর বরানগরের বাড়িতে গিয়ে দেখলে, অমিতাভ বাবুর কিছুই হয় নি, তিনি সুস্থ আছেন। তিনি বললেন, বীরেনদাকে আনবার জন্যে সেদিন তিনি কাউকে পাঠান নি। বীরেনদাকে যে ভদ্রলোক মোটরে করে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ সাধুর মতন। সেই সাধু যে বীরেনদাকে কোথায় এবং কি কারণে নিয়ে গেলেন, তা গভীর রহস্যাবৃত। খবরটা জানবার পর থেকেই আমরা শক্তি-সংঘের ছেলে-মেয়েরা সবাই কত চেষ্টা করছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত বীরেনদার কোন সন্ধানই পাই নি, পুলিসও তাঁর কোন খবর দিতে পারছে না।”
গাড়িখানা ভবানীপুরের কাছাকাছি এসে গিয়েছিল। বুলেট সব কথা শুনে বিশেষ উদ্বিগ্নকণ্ঠে বজ্রকে জিজ্ঞাসা করলে, “পুলিসের এবিষয়ে কি ধারণা? তারা কি বলে?”
বজ্র উত্তর দিলে, “পুলিস বলে, কেমটি ‘কিডন্যাপিং ফর র্যানসম্’ অর্থাৎ টাকা আদায়ের জন্যে কেউ বা কোন গুপ্ত দল বীরেনদাকে চুরি করে গুম্ করে রেখেছে। সম্প্রতি এই রকম কেস নাকি দু-চারটা এদেশে হচ্ছে। কিন্তু একাজটা ঠিক কাদের দ্বারা হয়েছে, পুলিস তা এখনও স্থির করতে পারেনি। তবে তাদের ধারণা, বীরেনদার হরণকারীরা খুব বুদ্ধিমান ও সাংঘাতিক প্রকৃতির লোক।”
কিছুক্ষণ চিন্তা করে বুলেট বললে, “কিন্তু ঐ রকম দলের লোকেরা বড়লোকদের ছেলে কি মেয়ে চুরি করে নিয়ে যাবার দু-একদিন পরেই হরণ-করা ছেলে বা মেয়ের অভিভাবকের কাছে চিঠি দিয়ে বা অন্য প্রকারে খবর দেয় যে, অমুক জায়গায় এই সময় এত পরিমাণ টাকা যদি পাঠিয়ে দেওয়া হয় তো তার হারানো ছেলে কি মেয়েকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। যদি তাদের কথা ঠিক মত মানা না হয় বা তাদের কোন ক্ষতি করবার চেষ্টা করা হয়, তাহলে অপহৃতকে হত্যা করা হবে।”
বোমার গাড়িখানা চৌরঙ্গী রোড ছেড়ে এলগিন রোডে ঢুকলো।
বুলেট আবার বজ্রকে জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা, সেই রকম কোন চিঠ বা খবর বীরেনদার বাড়িতে এসেছে কি?”
বোমা আজ খুব সকালে বীরেন রায়ের বাড়িতে গিয়েছিল, সে উত্তর দিলে, “না, ও রকম কোন খবর আজ সকাল পর্যন্ত বীরেনদার বাড়িতে আসে নি। বীরেনদার সেই আধপাগলা বিলাতফেরত মাম। ব্যাঙ্ক থেকে দশ হাজার টাকা তুলে নিয়ে এই রকম খবরের জন্যে অপেক্ষা করছেন।”
বুলেট এবার আরও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললে, “চার দিন হলো, বীরেন-দাকে হরণ করা হয়েছে, অথচ এখনও ঐরকম কোন খবরই এলো না। মনে হচ্ছে, এটা তাহলে সেই জাতীয় সাধারণ কিডন্যাপিং কেস নয়, আরও কিছু সাংঘাতিক ব্যাপার এর মধ্যে আছে। যারা বীরেনদাকে হরণ করেছে, তারা বোধহয় টাকা চায় না, চায় বীরেনদার জীবন।”
বজ্র ও বোমা এ কথায় চমকে উঠলো।
বজ্র বিস্মিত হয়ে বললে, “বীরেনদার মতো নির্বিবাদী বিদ্বান লোকের এমন কোন্ শত্রু থাকতে পারে, যে তার জীবন চাইবে?”
বুলেট উত্তর দিলে, “অতি সাধু সজ্জন ব্যক্তিরও শত্রু থাকতে পারে।” বজ্র বললে, “ধর, বীরেনদার যদি অদৃশ্য শত্রু থাকেও, সে কি উদ্দেশ্যে তাঁকে হরণ করলে?”
বুলেট উত্তর দিলে, “সেইটাই আমাদের আবিষ্কার করতে হবে।” ল্যান্সডাউন রোডে গাড়িটা আসতে বুলেট বোমাকে জিজ্ঞাসা করলে, “গাড়ি এখন যাচ্ছে কোথায়?”
বোমা উত্তর দিলে, “কেন, তোমাদের বাড়িতে।”
বুলেট বললে, “না, চল সানি-পার্কে ‘রায়ভিলা’য়—বীরেনদার বাড়িতে।”
বজ্র বললে, “এখনি সেখানে যাবে? সারারাত ধরে ট্রেনে এলে, ঘুম ভালো হয় নি নিশ্চয়ই, এখন তোমার দরকার কিছু বিশ্রাম—”
বজ্রের কথায় বুলেট বাধা দিলে, “বিশ্রামের কথা আমাদের এখন ভুলতে হবে, যতদিন না বীরেনদা উদ্ধার পাচ্ছেন।”
… … …
সানি-পার্কের ‘রায়ভিলা’ সাবেক বালিগঞ্জের অভিজাত পল্লীর মধ্যে একটি বিখ্যাত বাড়ি।
বেলা প্রায় নটা। রায়ভিলায় পুলিশের বড় বড় অফিসার চার-পাঁচজন এসেছেন। তার মধ্যে আছেন অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিস কমিশনার রায় সাহেব পি. এন. চৌধুরী আর ভবানীপুর ও বালিগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর দুজন। সকলেরই ইউনিফরম পরা; একজনের পরনেই কেবল সাদা বাঙালী পোশাক। তিনি বোধহয় আই. বি. অর্থাৎ গুপ্ত পুলিসের কোন বড় অফিসার।
‘রায়ভিলা’র বৈঠকখানায় লোক ভর্তি, গেটে ও বাড়ির সর্বত্র লাল-পাগড়িধারী পুলিস দাঁড়িয়ে আছে। কেসটি সম্পর্কে পুলিস কর্তৃপক্ষের পূর্বে যে ধারণা হয়েছিল, তার কিছু পরিবর্তন হয়েছে। সেইজন্যে আবার তাঁরা নতুন করে অনুসন্ধান বা একোয়ারী আরম্ভ করেছেন।
বৈঠকখানায় বীরেন বায়ের আধপাগল। বিলাতফেরত মামা মিস্টার মিত্র একটি কৌচে বসে পাইপ টানছেন। এই প্রথম তাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। তাঁর পাশে একটি চেয়ারে বীরেন রায়ের বন্ধু এটর্নি অমিতাভ সেন। টেবিলের সামনের চেয়ারগুলিতে পুলিস অফিসাররা বসে। তাঁরা নিজেদের মধ্যে গভীর আলোচনায় ব্যস্ত।
‘রায়ভিলা’র চাকর দরোয়ান ড্রাইভার ঘরের সামনের বারান্দায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
বুলেট ও বজ্র এসে ঘরের কোণে একটা বেঞ্চিতে বসে পড়লো। রায় সাহেব তাদের দিকে চাইতেই অমিতাভ সেন বুলেট ও বজ্রের পরিচয় জানালেন তাঁকে।
বীরেন রায়ের অপহরণের বিষয় এ বাড়ির কে কতটা জানে, তা জানবার ও নোট করবার জন্যে রায় সাহেব এইবার প্রস্তুত হলেন।
প্রথমে বীরেন রায়ের চাকর ভানু বলতে আরম্ভ করলে :
“গেল রবিবার রাত আটটা নাগাদ দাদাবাবু অর্থাৎ বীরেন বাবু তাঁর ছোট গাড়ি করে ফিরে এসে এই ঘরে বসে সবে সেদিনকার চিঠিপত্র দেখছেন, এমন সময় একখানা মোটর গেট পেরিয়ে হাতাতে এসে থামলো। সঙ্গে সঙ্গে একটি ভদ্রলোক সেই মোটর থেকে নেমে সোজা এই ঘরে ঢুকলেন। আমি তখন এই ঘরেই ছিলুম। দাদাবাবু ভদ্রলোকটির দিকে চাইতেই তিনি জানালেন যে, তিনি দাদাবাবুর বন্ধু অমিতাভ বাবুর বাড়ি থেকে আসছেন। অমিতাভ বাবুর থ্রম্বসিস্ না কি একটা সাংঘাতিক রোগ হয়েছে, তিনি দাদাবাবুকে এক্ষনি চান। ভদ্রলোকটির কথায় দাদাবাবু ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, বললেন, ‘অমিতাভের অসুখ! নিশ্চয়ই আমাকে যেতে হবে—এক্ষনি যাব। আর সঙ্গে এক-জন নার্স কেও নিয়ে যাব। অমিতাভের বাড়িতে নার্স করবার কেউ নেই।’ মামাবাবুর অসুখের সময় যে নার্স এ বাড়িতে আসতো, দাদাবাবু তার হোস্টেলে ফোন করে জানলেন, সে তখনও ফেরে নি, ফিরবে এক ঘণ্টা পরে। দাদাবাবু তার জন্যে অপেক্ষা করতে চাইলেন, কিন্তু ভদ্রলোকটি রাজী হলেন না, বললেন, ‘নার্স নয় পবে যাবে, আপনি এক্ষনি চলুন, আপনি না যাওয়া পর্যন্ত ভালো রকম চিকিৎসা আরম্ভ হবে না। কি রকম চিকিৎসা হবে, কোন্ ডাক্তারকে ডাকা হবে, তা আপনার সঙ্গে পরামর্শ না করে কিছু করতে পারছি নে। অমিতাভের অভিভাবক বলে তো কেউ নেই।’ দাদাবাবু একটু ভেবে বললেন, ‘আচ্ছা, নার্স পরে ভানুর সঙ্গে যাবে। যাবার পথে ভানুকে নার্সের হোস্টেলে আপনার গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাব।’ ভদ্রলোকটি বললেন, ‘জগুবাবুর বাজারের কাছে আমার একটা দরকার আছে, আমি ভবানীপুর হয়ে যাব।’ “দাদাবাবু বললেন, “তাহলে তো ভালোই হলো। নার্সের বাড়ি জগুবাবুর বাজারের কাছেই। ওখানে গিয়ে আপনি আপনার কাজ সেরে নেবেন, ইতিমধ্যে আমি ভানুকে সঙ্গে করে নার্সের হোস্টেলে গিয়ে তার যাবার ব্যবস্থা করে আসবো। এজন্যে আমার পনেরো মিনিটের বেশী সময় লাগবে না।’
“আমরা সেই ভদ্রলোকের গাড়ি করে জগুবাবুর বাজারের পিছনে মোহিনীমোহন রোডে এসে থামলুম। দাদাবাবু ও আমি গাড়ি থেকে নাবতেই, সেই ভদ্রলোক দাদাবাবুকে বললেন, ‘আপনি তো মিনিট পনেরো পরে আসছেন। আপনি এসে ঠিক এইখানে আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন। আমার একটু দেরি হতে পারে—আইস্ব্যাগ, হট-ওয়াটার বল্, আরো দু-একটা জিনিস কিনতে হবে।”
“সেদিন মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছিল। দাদাবাবু ও আমি নার্সের বাড়ির দিকে কিছু দূর যাবার পর দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করলে। দাদাবাবু বললেন, ‘ভানু, বৃষ্টি বোধ হয় জোর হবে, ওয়াটার প্রুফ টা মোটরে রেখে এলুম, তুই ছুটে গিয়ে নিয়ে আয়, আমি নার্সের হোস্টেলে থাকছি। মোটেই দেরি করিস নি।’ দাদাবাবু তাড়াতাড়ি চলে গেলেন, আমি প্রায় ছুটে মোহিনীমোহন রোডে এসে দেখি, সেই গাড়িখানা যেখানে ছিল সেখানে নেই। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করার পর দেখতে পেলুম, গাড়িটা কিছু দূরে একটা গলির মধ্যে একটা মোটর কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। গলিটা অল্প অল্প অন্ধকার। ঐখানে সেই ভদ্রলোক অর্থাৎ যিনি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি একটা হিন্দুস্থানীর সঙ্গে কথা বলছেন, আর আমাদের বয়সী একটি ছেলে, দু হাতে দুটো পেট্রলের টিন এনে সেই গাড়িতে রাখছে। আমি ওদের কিছু না বলে হুডের ওপর থেকে দাদাবাবুর ওয়াটার প্রুফটা নিয়ে নার্সের বাড়ি গেলুম। দাদাবাবু সেখানে ছিলেন, তিনি বললেন, ‘মিস্ সরকার এখনও আসেন নি, আমি একটা চিঠি লিখে রেখে যাচ্ছি। তিনি এলে তাঁকে নিয়ে একটা ট্যাক্সি করে অমিতাভের ওখানে যাবি, আমি ওখানে থাকবো।’ দাদাবাবু আমাকে দুখানা দশ টাকার নোট দিয়ে চলে গেলেন।
“বরানগর ডানলপ ব্রীজের কাছে অমিতাভ বাবুর বাড়ি আমি চিনি। দাদাবাবু চলে যাবার প্রায় এক ঘণ্টা পরে আমি নার্স কে ট্যাক্সি করে সেখানে নিয়ে গিয়ে দেখলুম, অমিতাভ বাবুর কিছুই হয় নি, তিনি ভালোই আছেন আর দাদাবাবুও সেখানে যান নি। অমিতাভ বাবু সব শুনে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন, বললেন, ‘বীরেন কি তাহলে কোন বদমাইশ লোকের পাল্লায় পড়লো? তিনি তক্ষনি কোথায় কোথায় তিন-চার জায়গায় ফোন করলেন। আমাদের ট্যাক্সিতে সোজা লালবাজার পুলিস অফিসে এসে ডাইরি করে আমাকে ও নার্স কে বাড়ি পৌঁছে দিলেন, মামাবাবুকেও সেই রাত্রে সব কথা জানিয়ে চলে গেলেন। সেই রাত্রেই আমি ও দরোয়ান দেউকীনন্দন দাদাবাবুর ক্লাব, ক্লাবের ছেলেমেয়েদের ও তাঁর সব আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিলুম, কিন্তু কেউই দাদাবাবুর কোন সন্ধান দিতে পারলে না। এর পর আমি আর কিছুই জানি নে।” ভানু থামলো।
যে পুলিস অফিসার ভানুর কথাগুলি নোট করছিলেন, তিনি ভালুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা, যে ভদ্রলোক তোমার দাদাবাবুকে মোটরে করে নিয়ে গিয়েছিল, তাকে দেখতে কেমন, আর তার বয়স কত, বলতে পার?”
ভানু উত্তর দিলে, “লোকটি দেখতে সাধু-সন্ন্যাসীর মতো; হলদে রংয়ের জামাকাপড় পরা, মাথায় বড় বড় চুল, মুখে দাঁড়িগোঁফ, চোখে কালো চশমা। কিন্তু ঠিক কত বয়েস তা বলতে পারি নে, তবে দাদাবাবুর চেয়ে অনেক বড় কিন্তু বুড়ো নয়—–বেশ জোয়ান, নিজেই মোটর চালায়।” ভানুর বক্তব্য শেষ হলো।
রায়ভিলার আবহাওয়া থমথম করছে।
ভানুর পর রায়ভিলার দরোয়ান দেউকীনন্দন ও ড্রাইভার সন্তোখ সিং-কে ডাকা হলো—তারা সেদিন কি দেখেছে, বলার জন্যে। কিন্তু তার। বিশেষ কিছু দেখে নি বা জানে না, তবে তারা দেখেছে রাত নটা নাগাদ একজন সাধুর সঙ্গে দাদাবাবু ও ভানুকে মোটরে উঠে চলে যেতে। সাধুর চেহারার বিষয় তারা যা বললে, তা ভানুর বর্ণনার সঙ্গে মিলে গেল। আর বেশী কিছু তারা বলতে পারলে না।
দেউকীনন্দনের ধারণা, সেই লোকটা শিখ। কিন্তু সন্তোখ সিং প্রতিবাদ করে বললে, “শিখদের হাতে বালা থাকে, সঙ্গে একটা কিছু অস্ত্রও থাকে, কিন্তু লোকটির তার কিছুই ছিল না। ও বাঙালী।”
সেই পুলিস অফিসারটি এদের দুজনের বক্তব্যই নোট করে নিলেন।
রায়ভিলার একটি উর্দি-পরা বেয়ারা একটি বড় ট্রেতে করে দশ-বারো কাপ চা ও সিগারেট দিয়ে গেল। চা খাবার পর বীরেন রায়ের বন্ধু অমিতাভ সেন বলতে আরম্ভ করলেন :
“আমি কলকাত। হাইকোর্টের একজন সলিসিটার। অপহৃত বীরেন্দ্রনারায়ণ রায় ও আমি বহুদিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু। দুজনে এক সঙ্গে এক কলেজ থেকে আই-এসসি ও বি-এসসি পাস করেছি। তারপর বীরেন বিলাতে ডাক্তারী পড়তে যান, আমি ল কলেজে ভর্তি হই। বীরেন রায় ছিলেন কলেজের আদর্শ ছাত্র—শুধু লেখাপড়ায় নয়, তাঁর স্বাস্থ্য-স্বভাব ছিল উৎকৃষ্ট, স্পোর্টস্ বা খেলাধুলায় তিনি ছিলেন কলেজের মধ্যে অদ্বিতীয়, ইন্টার-কলেজিয়েট বক্সিংয়ে তিনি ছাত্রজীবনে চ্যাম্পিয়ান হন। অন্য ব্যায়ামও তিনি করতেন। দেশের ছেলেনেয়েদের শরীর ও মন যাতে বলিষ্ঠ ও উন্নত হয়, সেই উদ্দেশ্যে তিনি নিজের বহু অর্থব্যয়ে এই বালিগঞ্জে ‘শক্তি-সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সংঘ কোন রাজনৈতিক মতের বা দলের নয়—যে কোন ছেলেমেয়ে এর মেম্বার হতে পারে। এই সংঘের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এই সংঘের ছেলে বা মেয়ে-মেম্বারদের একটি করে নামকরণ করা হয়—যেমন ‘বুলেট’, ‘বজ্র’, ‘লক্ষ্মীবাই’, ‘হায়েনা’, এই রকম।
আমি এই সংঘের কাজে বীরেনের সহকারী এবং তাঁর বিলাত থাকা কালে এর সম্পাদক ছিলাম। তাই এই সব কথা বলছি।
“এই প্রসঙ্গে আর একটি ঘটনার কথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করবো। সেই বিষয় থেকে পুলিস কর্তৃপক্ষের যদি এই কেসের অনুসন্ধানের কাজে কিছু আলোকপাত হয়, সেই উদ্দেশ্যেই বলছি।
“গত মাসে বীরেন রায় ইংলণ্ড থেকে ফিরে আসার এক সপ্তাহ পরে আমরা অর্থাৎ শক্তি-সংঘের ছেলেমেয়েরা ও বীরেন রায়ের আত্মীয়-বন্ধুরা সকলে মিলে এই রায়ভিলায় একটি ‘আনন্দ-মিলন’ উৎসব করি। সারাদিন গান-বাজনা খাওয়া-দাওয়ার পর সন্ধ্যার সময় আমি রায়ভিলা থেকে বের হয়ে বড় রাস্তায় মোটরে উঠতে যাচ্ছি, ঠিক সেই সময় এক ভদ্রলোক এসে আমাকে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে একটি কথা আছে।’ ভদ্রলোকটিকে আমার অচেনা মনে হলো, আমি বললাম, ‘আপনাকে তো চিনতে পারছি নে। কি দরকার সংক্ষেপে বলুন। আমাকে এক্ষনি বাড়ি ফিরতে হবে।’ ভদ্রলোক বললেন, ‘বেশ তো, আপনার সঙ্গে গাড়িতে যেতে যেতে সব বলছি।’ তিনি গাড়িতে উঠে আমাব পাশে বসলেন। আমি গাড়ি চালাতে আরম্ভ করলাম। ভদ্রলোকটির বয়স চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ, গায়ের রং বেশ ফরসা, মাথায় বড় বড় চুল, মুখে গোঁফদাড়ি। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন, ভিনি এক বড় জমিদারের ম্যানেজার, তার মনিবের বাগবাজারে যদিও মস্ত বাড়ি আছে, তবুও তিনি সানি-পার্ক বা রেনি-পার্ক কি ন্যাণ্ডেভিলার কাছে একটা বাড়ি করতে চান। সানি-পার্কে বীরেন রায়ের যে জমিটা পড়ে আছে, তা যদি ঐ জমিদারকে তিনি বিক্রি করেন, তাহলে জমিদারবাবু বাজার-দর অপেক্ষা বেশী দাম দিয়ে কিনতে পারেন। আমি বললাম ‘কিন্তু বীরেন রায়ের জমি কেনা-বেচার বিষয়ে আমাকে কেন বলছেন? সোজা তাকে বললেই হয়? ভদ্রলোকটি উত্তর দিলেন, ‘তাতে একটা বাধা আছে। আমার মনিবের সঙ্গে বীরেন বাবুদের নিকট আত্মীয়তা আছে, তাই তিনি আপনার মাধ্যমে কথা কইতে চান। তাছাড়া আপনি একজন এটর্নি।’ আমি তাঁর কথায় বাধা দিয়ে বললাম, ‘আমি একজন এটর্নি সত্যি এবং আমার অফিসে এজাতীয় কাজও হয় সন্দেহ নেই। কিন্তু বীরেন রায়ের কাছে আমি এটর্নি নই–বন্ধু। তবে আপনি যখন অনুরোধ করছেন, তখন এ বিষয়ে তাঁকে বলে দেখবো। আপনি আমার অফিসে সামনের সোমবার দেখা করবেন।’ ভদ্রলোককে আমার একটি ভিজিটিং কার্ড দিলাম। গাড়ি শ্যামবাজারে এসে গেল, কিন্তু ভদ্রলোকের নামার লক্ষণ দেখা গেল না। ভদ্রতার খাতিরে তাঁকে নামার কথা বলতেও পারলাম না। তিনি আমার বরানগরের বাড়িতে গিয়ে কিছুক্ষণ থেকে চলে গেলেন। তারপর তিনি কিন্তু আমাব বা বীরেনের সঙ্গে দেখা করেন নি। আমার বলবার আগে ভানু বা অন্য সকলে বীরেন রায়ের অপহরণকারীর চেহারার যা বর্ণনা দিলে, আমার সঙ্গে আলাপকারী সেই ভদ্রলোকটির চেহারার সঙ্গে তার সম্পূর্ণ মিল আছে,—পার্থক্য শুধু পোশাক-পরিচ্ছদে। ভদ্রলোকটির পরনে খদ্দরের স্যুট ছিল। বয়সের কথা আগেই বলেছি। আর তিনি যে জাতে বাঙালী, তা নিঃসন্দেহে বলতে পারি।”
অমিতাভ সেনের বক্তব্য শেষ হলো।
একজন পুলিস অফিসার বীরেন রায়ের মামা মিস্টার ওয়াই. মিত্রকে বললেন, “মিস্টার মিত্র, এ বিষয়ে আপনি যদি কিছু জানেন তো বলুন।”
মিস্টার মিত্র তন্ময় হয়ে একটা বিরাট বই পড়ছিলেন। হঠাৎ যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন, জিজ্ঞাসা করলেন, “কি বিষয়ে?”
বালিগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর বললেন, “আপনার ভাগ্নে বীরেন রায়ের অপহরণের বিষয় জিজ্ঞেস করা হচ্ছে।”
মিস্টার মিত্র বললেন, “ওঃ—হ্যাঁ! আমি জানি বই কি! সবই জানি। কিন্তু বড্ড ভুল হয়ে গেছে। তখন যদি বুঝতে পারতুম, তাহলে বীরেনকে সেই সাধুর সঙ্গে কক্ষনো যেতে দিতুম না। সাধু যখন বীরেনের ঘরে ঢুকলো, আমি তখন এই সামনের বারান্দায় ছিলাম। আমার পাশ দিয়েই তো লোকটি গেল—বেশ সুন্দর চেহারা, গেরুয়া ধুতি-পিরান পরা, চোখে নীল চশমা, মাথায় লম্বা লম্বা চুল, মুখে দাঁড়িগোঁফ। দেখে ভালো বলেই মনে হলো;–ইণ্ডিয়ান যোগীদের আমি খুব শ্রদ্ধা করি। তখন কি জানতাম, সে একটা ইম্পস্ট্যার ছদ্মবেশী। তাহলে তাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলতুম।”
পুলিস সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা মিস্টার মিত্র, আপনি সেই সাধুকে তো খুব কাছ থেকেই দেখেছেন, তাকে কোন্ জাতির লোক বলে মনে হয়?”
মিস্টার মিত্র একটু চিন্তা করে বললেন, “কোন্ জাতির অর্থাৎ কোন্ রেসের? মানব জাতিকে মোটামুটি চারটি রেসে ভাগ করা হয়। প্রথম ধরুন, নিগ্রো বা ব্ল্যাক ডিভিশন; দ্বিতীয় : এম্যারল্ড বা রেড ডিভিশন; তৃতীয় : মঙ্গোলিয় বা ইয়োলো ডিভিশন—।”
পুলিস অফিসারদের প্রায় সকলেরই ধৈর্যচ্যুতি হবার উপক্রম হচ্ছিল,’ অবশ্য রায় সাহেবের ছাড়া। তিনি মিস্টার মিত্রের সব কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। একজন অফিসার তাঁর কানে কানে কি বলতে তিনি মিস্টার মিত্রকে বাধা দিয়ে বললেন, “মিস্টার মিত্রের সঙ্গে এ বিষয়ে অন্য একদিন বিশেষভাবে আলোচনা করবো, আজ আমাদের সময় খুবই কম। সংক্ষেপে আপনার বক্তব্য বলুন—সাধুটির চেহারার বিষয় যা বলছিলেন বলুন, আমবা নোট করে নিই।”
বক্তৃতায় বাধা পাওয়ায় মিস্টার মিত্র বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হলেন বলে মনে হলো না, তিনি রায় সাহেবের দিকে চেয়ে বললেন, “লোকটির চেহারা? হু! চেহারার বিষয় তো বলেছি বেশ ভালোই—সুপুরুষ, ফেয়ার কমপ্লেক্শন, টল ফিগার, সার্প-কাট নোজ, লং-ড্রন আইজ, কার্লিং ব্ল্যাক হেয়ার, নাইস বিয়ার্ড এণ্ড ম্যাসটাশ। ঐ সাধুটির চেহারার সঙ্গে বীবেনের চেহারার খুব এফিনিটি বা সাদৃশ্য আছে।”
মিস্টার মিত্রের এ কথায় ঘরের সকলে হেসে উঠলো। তিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে আবার বলতে লাগলেন, “এই রকম কি-ন্যাপিং কেস আমেরিকায় বেশী হয়, ইউরোপের অন্যত্রও কিছু কিছু হয়। স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের পুলিসেরা এই রকম কেসে কোন্ কোন্ উপায় অবলম্বন করে, সে বিষয়ে এই বইখানায় কয়েকটা ইলাসট্রেশন আছে। বইটা কাল পাবার পর থেকে পড়া আরম্ভ করেছি, এর দু-একটা স্থান আপনাদের পড়ে শোনাচ্ছি।”
পুলিস অফিসাবেরা এবার আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। অসহায়ের মতো বারবার সবাই ঘড়ির দিকে তাকাতে থাকেন।
রায় সাহেব বললেন, “মিস্টার মিত্রের সঙ্গে দ্বিতীয় যেদিন দেখা হবে, সেই দিন বইটার বিষয় সব শুনবো। আজ আমরা সবাই খুব ব্যস্ত, এখন সকলেই উঠবো।”
মিস্টার মিত্র পাইপে তামাক ভরতে লাগলেন। পুলিসের দল শশব্যস্তে জীপ গাড়ি করে চলে গেল।
তখন বেলা প্রায় এগারোটা।
… … …
বুলেট ও বজ্র বীরেন রায়ের বৈঠকখানা থেকে বের হয়ে বাগানের মধ্যে আসতেই বোমা এসে জিজ্ঞাসা করলে, “কি বুঝলে?”
বুলেট উত্তর দিলে, “তখন যা বলেছিলাম, এখনও আমার সেই ধারণা। সে সব কথা পরে হবে। এখনও আমাদের একটা কাজ বাকি আছে, সেটা সেরে বাড়ি ফিরবো।”
বজ্র জিজ্ঞাসা করলে, “কাজ? এখনো? কোথায়?”
বুলেট উত্তর দিলে, “কাজ এই বাড়িতেই, অর্থাৎ এই বাড়িটা ভালো করে দেখবো।”
বোমা মোটরে গিয়ে বসলো।
বুলেট বজ্রকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির বাইরেটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো।
বিরাট বাড়ি, সাবেকী অর্থাৎ গত শতাব্দীর প্রথায় তৈরী। বাড়ির সামনে ফুলবাগান, ছোট লন, জলের ফোয়ারা, স্ট্যাচু; গেটের ধারে চাকর দরোয়ানদের ঘর।
গেটের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বুলেট বললে, “এ গেটটা তৈরী হয়েছে পরে, তা বেশ বোঝা যায়।”
বজ্রও বললে, “হু”, গেটটা আধুনিক প্রথায় তৈরীই বটে। মনে হয়, পুরোনো গেট ভেঙে এটা তৈরী হয়েছে।”
ভানু এদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল, সে বুলেটদের বললে, “এ বাড়ির আর একটা গেট আছে, সেটা ব্যবহার করা হয় না—পুরনো
ভানু বুলেটদের সেই গেটটা দূর থেকে দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল।
বুলেট পুরনো গেটটা ভালো করে দেখতে দেখতে এগিয়ে গিয়ে বজ্রকে বললে, “দ্যাখ দ্যাখ, গেটটায় লেখা রয়েছে ‘দশক্ষরা হাউস’।”
বজ্র বললে, “কি বিচিত্ৰ নাম!”
একটু চিন্তা করে ধীরে ধীরে বুলেট বললে, “আমার কি মনে হয়, জানো? বীরেনদাদের আদি দেশ ছিল এই দশক্ষরায়। এঁদের পূর্ব-পুরুষ যিনি এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন, তিনিই এই নাম দিয়েছিলেন হয়তো।”
বজ্র বললে, “হু, তা বটে! কলকাতায় এ রকম নামের বাড়ি অনেক আছে—যেমন ‘টাকী হাউস’, ‘জনাই কটেজ’।”
বুলেট কি ভাবছিল, বজ্রকে বললে, “এখন আবিষ্কার করতে হবে, ‘দশক্ষরা’ জায়গাটা কোথায়। বীরেনদার কোন জ্ঞাতি বা শরিক সেখানে আছে কিনা। দশক্ষরার সন্ধান আমি নেব, এখন চল যাই। তুমি আর বোমা বীরেনদার চাকর ভানুকে নিয়ে সন্ধ্যাব সময় আমাদের বাড়িতে যাবে, আমি বাড়িতে থাকবো। এইবার আমাদের অনুসন্ধানের কাজ আরম্ভ হবে।”
বুলেট ও বজ্র রায়ভিলা থেকে বের হলো। মিস্টার মিত্র তখন ওপরের বারান্দায় কৌচে বসে ম্যাণ্ডোলিন বাজাচ্ছেন।
… … …
ভবানীপুরে ল্যান্সডাউন রোড থেকে বেরিয়ে গেছে একটা চওড়া রাস্তা। এই রাস্তার প্রথম বাড়িটা বুলেটদের—বাড়িটা দোতলা, বেশী বড় নয়, সামনে একটা ছোট মাঠ ও গেট আছে।
বুলেট সারাদিন তার পড়ার ঘরে বসে ডাকঘরের তালিকা, রেলওয়ে টাইমটেবল, বাংলার ম্যাপ, পাঁজি, ভূগোল ইত্যাদি তন্নতন্ন কবে খুঁজেছে; কিন্তু ‘দশঙ্কর।’ জায়গাটা কোথায়, বের করতে পারে নি। সন্ধ্যা হয় হয়, এমন সময় বোমার মোটর তাদের বাড়ির মাঠে এসে থামলো। বজ্র, বোমা ও ভানু এসে গেল। বুলেট এদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। ঘর থেকে বের হয়ে এলো।
মাঠে ঘাসের ওপর এসে বসলো তারা। ভানু দাঁড়িয়ে ছিল, বুলেট তাকে বসতে বলে বললে, “আজ তোমার সঙ্গে, ভাই, আমাদের খুব দরকারী কথা আছে।”
একটু দূরে ভানু বসলো। বজ্র বুলেটকে জিজ্ঞাসা করলে, “দশক্ষরাব সন্ধান পেলে?”
বুলেট কি বলতে যাচ্ছিল, ভানু বলে উঠলো, “দাদাবাবুবা দশক্ষরার নাম জানলেন কি করে? সেখানে তো বাবুদের আদি দেশ—”
ভানুর কথায় বুলেট প্রায় লাফিয়ে উঠলে, “এ্যা! বল কি ভানু? তোমার বাবুদের আদি দেশের কথা তুমি জানো? বল তো কোথায়? ওঃ! এটা জানবাব জন্যে আজ সারাদিন কি পরিশ্রমই না করেছি!”
তার বাবুদের আদি দেশের কথা জানার এতটা আগ্রহ কারো হতে পারে, তা ভানুর ধারণায় ছিল না। সে বললে, “তা ঠিক করে বলতে পারবো না—ভালো মনে নেই। যখন খুব ছোট ছিলুম, সেই সময় কর্তাবাবুর সঙ্গে টমটম গাড়ি করে মাত্র একবার দশক্ষরায় গিয়েছিলুম। বাবুদেব সে কি বড় বাড়ি, বিরাট পুকুর, নবতখানা—”
তাব কথায় বাধা দিয়ে বুলেট বললে, “সে সব কথা পরে শুনবো; এখন বল দশক্ষরাটা কোথায়? অন্তত কত দূবে ও কোন্ দিকে, তাও যদি বলতে পার, তাহলেও কাজ চলবে।”
ভানু খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললে, “বালিগঞ্জ থেকে টমটম করে আমরা খুব ভোর বেলা বের হয়ে দুপুর বেলায় সেখানে পৌঁছেছিলুম। মাঝে অবশ্য ওয়েলার দুটো কিছুক্ষণ দানাপানি খাওয়ার জন্যে জিরিয়ে নিয়েছিল। তাহলে বুঝুন, জায়গাটা কতদূর। বাবুদের গ্রাম থেকে খানিকটা দূরে মস্ত বড় নদী আছে, সেখানে কেল্লা আছে, কেল্লায় গোরা সৈন্য থাকে…সে জায়গাটার নাম কি হাওড়া যেন।”
বুলেট ভানুর সব কথা খুব মন দিয়ে শুনছিল, বললে, “হাওড়া? হাওড়া কি!.. ধ্যেৎ! স–ব গুলিয়ে দিলে!”
ভানু অপ্রস্তুত হয়ে বললে, “না, হাওড়া ঠিক নয়, হাওড়া কথাটার আগে কি যেন আর একটা কথা আছে…ডাই—ডাইমণ্ড হাওড়া।”
বজ্র বললে, “ডাইমণ্ড হাওড়া আবার কি?”
বুলেট লাফিয়ে উঠে বললে, “হয়েছে! হয়েছে! ইউরেকা! ডায়মণ্ড হারবার। ওঃ! এতক্ষণ বাদে দশক্ষরার সন্ধান কিছুটা পাওয়া গেল।”
সকলে হেসে উঠলো। ভানুও হাসলো। কিন্তু এই সামান্য ব্যাপাবে এতটা হাসির কি কারণ থাকতে পারে, সে বুঝতে পারলে না। বুলেট বললে, “আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, ডায়মণ্ড হারবারের দিকে গেলে দশক্ষরার সন্ধান মিলবে। এখন সে কথা থাক। তোমাদের এই সময় যে জন্যে আসতে বলেছিলুম, সেই কথা বলি।”
ভানু এতক্ষণ একটু দূরে বসে ছিল, বুলেট তাকে কাছে বসিয়ে ধীরভাবে বললে, “ভানু, তুমি নিশ্চয়ই তোমাব বীরেনদাদাবাবুকে খুব ভালোবাস, আমবাও সকলে তাঁকে খুব ভালোবাসি, ভক্তিও করি। বীরেনদাকে বদমাশ লোকে চুরি করে নিয়ে গেছে, আমরা তাঁকে উদ্ধার করবার চেষ্টায় নামছি। তোমাকেও সেজন্যে দরকার। তোমার কাছ থেকে কতকগুলো খবর জানতে চাই। দরকার হলে এ ব্যাপারে তোমাকে দিয়েও কিছু কিছু কাজ করাতে চাই; বলো রাজী তো?”
ভানু উত্তর দিলে, “সে কথা কি আর পুছতে হয়! দাদাবাবুর ভালোর জন্যে আমাকে আপনারা যা বলবেন, তাই করবো।”
বুলেট বললে, “কিন্তু খুব সাবধান! আমরা যে এই চেষ্টা করছি, তা কাউকে বলবে না, এমন কি পুলিসকেও নয়।”
ভানু বললে, “তা যখন মানা করে দিচ্ছেন, তখন বলবো না।”
বুলেট বললে, “বেশ। আচ্ছা, ভানু, সেদিন রাত নটা নাগাত যখন সেই সাধু বীরেনদাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়, তুমি তো ওদের সঙ্গে জগুবাবুর বাজার পর্যন্ত গিয়েছিলে। . তারপর তুমি ও বীরেনদা সাধুর গাড়ি থেকে নেমে নার্সের বাড়ির দিকে কিছু দূর যাবার পর বৃষ্টি আসতে, তুমি তোমার দাদাবাবুর ওয়াটার প্রুফ টা আনতে সেই সাধুর মোটর যেখানে ছিল, সেখানে গিয়েছিলে। সেই সময় তুমি দেখলে, সাধুর মোটর একটা গলির মধ্যে একটা মোটর গাড়ি সারানোর কারখানার সামনে রয়েছে, আর সাধু, একজন হিন্দুস্থানীর সঙ্গে কথা বলছে, আর তোমাদের বয়সী একটা ছেলে পেট্রলের টিন এনে সাধুর মোটরে রাখছে—এসব তো তুমি ভালো ভাবেই দেখেছ, কি বল?”
ভানু উত্তর দিলে, “হ্যাঁ, ভালো ভাবেই দেখেছি।”
বুলেট বললে, “সেই কারখানা আর ঐ লোক দুটোকে তুমি এখন দেখলে চিনতে পারবে?”
ভানু উত্তর দিলে, “হ্যাঁ! তবে সেই কারখানা বা যে ছেলেটা পেট্রলের টিন বইছিল, তাদের চিনতে পারবো; কিন্তু সেই হিন্দুস্থানীকে বোধহয় চিনতে পারবো না। তাকে ভালো করে দেখি নি।”
বজ্র বললে, “যাক্, তুমি যতটা পার, করবে।”
বুলেট সকলকে উদ্দেশ করে বললে, “সকলেই শুনে রাখ, আমার মনে হয়, বীরেনদাকে যারা অপহরণ করেছে, তারা খুব বুদ্ধিমান ও সাংঘাতিক প্রকৃতির • লোক; তারা নিশ্চয়ই পুলিসের দিকে লক্ষ্য রাখছে। কিন্তু ওরা যদি জানতে পারে, আমরাও তাদের সন্ধান করছি, তাহলে শুধু যে আমাদের বিপদে পড়তে হবে তাই নয়, ওরা আরও সতর্ক হয়ে যাবে। তাই, আমার বক্তব্য, আমরা যা কিছু করবো, তা অতি গোপনেই আর খুব সাবধানেই করবে।”
বজ্র বললে, “নিশ্চয়ই। আমাদের ‘শক্তি-সংঘে’র ছেলেমেয়েরা ছাড়া কাউকে আমাদের এই প্রচেষ্টার কথা জানতে দেব না—বাইরের লোক এক এই ভানুই যা জানলে। তা ওকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যেতে পারে।”
বুলেট হাতঘড়ি দেখে বললে, “ঠিক সময় হয়েছে। এইবার সকলে অনুসন্ধানের কাজে বের হব। আজকের এই কাজে ভানুই আমাদের প্রধান সহায়। এখন আমরা যাব জগুবাবুর বাজারের দিকে। ওখানে গিয়ে কে কি করবো, তার একটা প্ল্যানও এবার আমরা ঠিক করে নিই।
“আমরা সবাই বোমার মোটরে করে জগুবাবুর বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম গেটের সামনে গিয়ে থামবো। প্রথম আমি ও ভানু মোটর থেকে নেমে বাজারের মধ্য দিয়ে উত্তরে মোহিনীমোহন রোডে আসবো। বজ্র দূর থেকে আমাকে ফলো করবে। বজ্র মোটর থেকে নেমে গেলে বোমা তার মোটর নিয়ে নর্দার্ন পার্কের উত্তর গেটের সামনে অপেক্ষা করবে। আগেই বলেছি, আজকের কাজে ভানুর ওপরই সব ও যদি ঠিকমত সব করতে পারে, তাহলে মনে হয়, নির্ভর করছে। আজই আমরা কিছু ক্লু পাব।”
তারপর একটু থেমে সে আবাব বললে, “শোন ভানু, তুমি আর আমি জগুবাবুর বাজার থেকে বেরিয়ে সেই কারখানার দিকে যাব; ভাব দেখাব, যেন আমাদের একটা পোষা কুকুর হারিয়ে গেছে, আর আমরা সেই কুকুরটাকে ঐ দিককার রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়াচ্ছি। তুমি একটু এগিয়ে চারদিক চাইতে চাইতে যাবে, আমি তোমার পিছনে থাকব। সেই কারখানার সামনে গিয়ে তুমি বলবে, ‘বাবু, এইখানে কুকুরটাকে দেখেছিলুম।’ কিন্তু সেখানে মোটেই দাঁড়াবে না। যদি সেই ছেলেটাকে দেখতে পাও তো ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিয়ে বলবে, ‘আমার ভাই এই পাড়ায় থাকে, সে যদি কুকুরটার সন্ধান দিতে পারে’,–এর বেশী কিছু বলবে না। আর যদি সেই হিন্দুস্থানীটাকে দেখে চিনতে পার, তাহলে তার দিকে চেয়ে নাক চুলকোবে। এই লোকটার বেলায় খুব সাবধান হবে। তাকে ইশারা করেও দেখাবে না। আর, কোন কারণেই বেশী কথা বলবে না।”
… … …
সন্ধ্যা ছটা। জগুবাবুর বাজার জমজম করছে। দক্ষিণ দিকের গেটের প্রায় সামনে জনকতক পানওয়ালা ফুটপাতের ওপর বসে তার স্বরে চিৎকার করছে। বোমা ঠিক তাদের পিছনে পদ্মপুকুর রোডের উপর গাড়ি থামাতেই, বুলেট ও ভানু মোটর থেকে নেমে বাজারের মধ্যে ঢুকলো। কিছু পরে বজ্র তাদের অনুসরণ করলে। বোমা মোটর নিয়ে চলে গেল।
বাজারে ঢুকে বুলেট একটা কুকুরের চেন কিনে উত্তর দিকের গেট দিয়ে মোহিনীমোহন রোড ধরে পুর দিকে চলতে লাগলো। ভানু তার সঙ্গে যাচ্ছে দু-এক পা আগে আগে। কিছুদূর যাবার পর বুলেট বললে, “কুকুরটা যে কোথায় গেল—অমন পোষা কুকুর!”
দ্বারকানাথ রোড পার হয়ে একটু আসতেই ভানু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লে। বললে, “বাবু, এইখানে তখন কুকুরটাকে দেখেছিলুম
বুলেট দেখলে ভানুব ঠিক সামনে একটা মোটর গাড়ি সারাবার কারখানা—কারখানার একটা জায়গায় টিনের সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে “আগলু মাহাতো এণ্ড কোম্পানী’। কারখানার মধ্যে একটা লেদ চলছে, চার-পাঁচ জন মিস্ত্রী কাজ করছে তখনও।
ভানু বললে, “বাবু, আসুন এই দোকানের পিছনদিকের গলিটা একবার দেখে আসি, যদি কুকুরটা ওখানে থাকে।
গলিটা একটু অন্ধকার। একখানা বাড়ি পার হতেই ভানু আবার বললে, “আমার ভাই এ পাড়ায় থাকে, সে যদি কুকুরটা দেখে থাকে শুধবো।” ভানু ইশারা করে একটা ছেলেকে দেখালে।
ছেলেটার বয়স আঠারো-উনিশ, গায়ের রং কালো, পরনে খাকী হাফপ্যান্ট ও স্যাণ্ডো গেঞ্জী, দুই-ই খুব ময়লা—কালিঝুলি মাখানো। তাকে দেখলেই কারখানার মিস্ত্রী বলে মনে হয়। ছেলেটা একটা মোটর গাড়ির মাডগার্ড নিয়ে ‘আগলু মাহাতো এণ্ড কোম্পানী’র কার-খানায় ঢুকলো। বুলেট বেশ ভালোভাবে তাকে দেখে নিয়ে ভানুকে বললে, “চল্ কুকুরটার জন্যে আজ আর সময় নষ্ট করতে পারি নে, ঢের খোঁজাখুজি করেছি। কাল সকালে দেখা যাবে।”
তারা গলি ধরে নর্দার্ন পার্কের উত্তর দিকের গেটের সামনে এসে গেল। বোমা মোটরে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বজ্র বুলেটদের এতক্ষণ অনুসরণ করছিল, সে একটু পরে আসতেই বুলেট তাকে বললে, “তোমরা এখন ফিরে যাও, আমি এখনি আবার ঐ দিকে যাবে।। আজকের যাত্রা বেশ সফল বলে মনে হয়। বজ্ৰ, তুমি সকাল ছটায় সাইকেল নিয়ে আমার বাড়িতে আসবে, রেডি হয়ে এসো। আমরা দুজনে ডায়মণ্ড হারবার দেখতে যাব।”
বজ্র, ভানু ও বোমা মোটর নিয়ে চলে গেল।
বুলেট আবার মোহিনীমোহন বোডে ‘আগলু মাহাতো এণ্ড কোম্পানী’র কারখানার সামনে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে উঠলো। এক কাপ চা নিয়ে কারখানার দিকে লক্ষ্য রেখে চা খেতে শুরু করলে।
কারখানাটা বেশী বড় নয়। জনপাচেক লোক সেখানে কাজ করে। একটা মোটা মত হিন্দুস্থানী তক্তপোশের ওপর একটা ক্যাশ বাক্স নিয়ে বসে আছে। মনে হয়, সে-ই দোকানের মালিক।
রাত সাতটা বাজতেই কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। ভানু একটু আগে যে ছেলেটিকে দেখিয়ে দিয়েছিল, সে কারখানার সব ঝাঁপ বন্ধ করলে। একটা দরজা শুধু খোলা রইল। কারখানার লোকের। সেই দরজা দিয়ে বের হয়ে যে যার দিকে চলে গেল। সেই ছেলেটা বেরোলো একটু পরে। দ্বারকানাথ রোড ধরে কিছু দূর গিয়ে সে একটা চায়ের দোকানে ঢুকে টিনের চেয়ার টেনে নিলে। চা ও লেড় বিস্কুটের অর্ডার সে দিয়েছিল ঢোকবার সময়েই। প্রায় তার সঙ্গে সঙ্গে বুলেটও দোকানে ঢুকে ছেলেটার পাশের চেয়ারে বসে দুটো কেকের অর্ডার দিলে। ছেলেটার সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো দু-চারবার। মৃদু হেসে বুলেট শেষে বললে, “তোমাকে, ভাই, যেন চিনি চিনি মনে হচ্ছে,—কোথায় থাক তুমি?—এই পাড়ায়?”
ছেলেটা বুলেটের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলে, “আমি থাকি হাজরা রোডে লকার বস্তীতে, তবে এ পাড়ায় কাজ করি আগলু মাহাতে। এণ্ড কোম্পানীর কারখানায়।”
বুলেট বললে, “ওঃ! তাই তোমাকে দেখেছি। আমাদের মোটর গাড়ির মাডগার্ড আগলু মাহাতো এণ্ড কোম্পানী থেকে সারিয়েছিলুম। তুমি কি ঐ কারখানার মিস্ত্রী?”
ছেলেটা উত্তর দিলে, “না। এখনও মিস্ত্রী হতে পারি নি; তবে হাফ-মিস্ত্রী বলতে পারেন। মাডগার্ডের কাজ থেকে লেদের কাজ অবধি সবই জানি।”
বুলেট বললে, “লেদের কাজ জানো? আমার জানা একটা ‘কারখানায় লেদের জন্যে জনকতক লোক খুঁজছে। তুমি সেখানে কাজ করতে চাও তো ব্যবস্থা কবে দিতে পারি—ভালো মাইনে পাবে।”
আশান্বিত হয়ে ছেলেটা বললে, “নিশ্চয়ই করবো। এখানে খুব কম হপ্তা পাই, তাতে চলে না।”
বুলেট বললে, “বেশ। ভালোই হলো। চলো, তোমার সঙ্গে একটু নিরিবিলি কথা বলি। তোমার নাম কি?”
“পোনা দাস।”
একটা রিক্সা করে বুলেট পোনা দাসকে নিয়ে নর্দার্ন পার্কে এসে মাঠের ঠিক মাঝখানে গিয়ে বসলো। সেখানে ভীড় খুব কম।
চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বুলেট চাপা গলায় পোনাকে বললে, “শোন ভাই, চায়ের দোকানে তখন কাজের সম্পর্কে তোমাকে যা বলেছিলুম, তা ঠিকই আছে। বড় একটা কারখানায় তোমাকে ঢুকিয়ে দিতে পারি এবং দেবও। কিন্তু এখন ঠিক সেজন্যে তোমাকে এখানে আনি নি। যেজন্যে আনলুম, তা বলি—আমার একটা কাজ তোমাকে করে দিতে হবে। কাজটা একটু হুঁশিয়ারির! এই নাও অগ্রিম পাঁচ টাকা, কাজ করবার সময় আরও পাবে।”
বুলেট পোনাকে একখানা পাঁচ টাকার নোট দিলে। নোটটা পেয়ে পোনা যেন গলে গেল, একগাল হেসে জিজ্ঞাসা করলে, “মোটরের কোন পার্ট্ স্ চাই বুঝি?”
বুলেট উত্তর দিলে, “না, ঠিক তা নয়। তুমি তো আগলু মাহাতো এণ্ড কোম্পানীতে কাজ করো, আমি ঐখানকার কয়েকটা খবর জানতে চাই।
খবর কয়টি ঠিক ঠিক পেলে আমার একটু সুবিধা হয়। আর তার জন্যে হাতে হাতে তুমি টাকাও পাবে।”
পোনা বললে, “কি খবর জানতে চান?”
বুলেট জিজ্ঞাসা করলে, “তোমাদের কারখানার মালিক কে? সে-লোকটা কেমন?”
পোনা উত্তর দিলে, “কারখানার মালিক দুজন বেহারী—একজনের নাম আগলু মিশির, অন্যজনের নাম বংশী মাহাতো। লোক ওরা মোটেই ভালো নয়। একটা কারখানা দেখিয়ে রেখেছে শুধু, ওদের আসল কারবার হলো চোরাই জিনিসের কেনা-বেচা।”
বুলেট বললে, “তা মোটামুটি আন্দাজ করেছিলুম। আচ্ছা, বলতে পার, মাঝে একদিন রাত সাড়ে আটটা নাগাত একটা সাধু গোছের লোক ওদের কাছে এসেছিল কি না?”
মুখ বেঁকিয়ে পোনা উত্তব দিলে, “হু, খুব পারি। লোকটা সাধু না ছাই—একটা আস্ত জুয়োচোর, ওদের চোরাই কারবারের একজন
পাণ্ডা। সে মাঝে মাঝে কারখানায় আসে। আরো অনেকে আসে। কি সব সলা পরামর্শ হয়; আমাদের জানায় না। ওসব ব্যাপারে আমরা নেই। তা না হলে এই দশা!”
বিষণ্ন চোখে পোনা তার ছেঁড়া ময়লা কাপড়চোপড়ের দিকে ইঙ্গিত করলো।
চাপা গলায় বুলেট বললে, “ভাই পোনা, তোমাকে একটা কাজ করতে হবে, অবশ্য শুধু একটা খবর দেওয়া—অন্য কিছু নয়। আর এজন্যে তুমি টাকাও পাবে।”
পোনা বললে, “কি খবর জানতে চান?
বুলেট বললে, “সাধু লোকটার খবর চাই। লোকটা কোন্ ধাঁচের ঠিক বুঝতে পারছি নে। তুমি বলছো, মোটেই ভালো নয়। আমার তাই মনে হচ্ছে। ওর কথায় বিশ্বাস করে আমরা একটু ফ্যাসাদে পড়েছি। ও যখনি কারখানায় আসবে, তক্ষনি আমাকে তোমার খবর দিতে হবে। পারবে? তুমি ফোন করতে জানো?”
“জানি। আমাদের কারখানায় ফোন—।”
বাধা দিয়ে বুলেট বললে, “না। সে ফোনে খবর দেবে না। অন্য কোন জায়গা থেকে আমাকে খবর দেবে। সব কথা ফোনে বলবে না, আমাকে শুধু ডাকলেই বুঝতে পারবো।”
বুলেট নিজের ফোন নম্বর দিয়ে বললে “কিন্তু খুব সাবধান, বুঝলে?”
বুলেট ও পোনা নর্দার্ন পার্ক থেকে যখন বের হলো, রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা।
