স্বর্ণমুকুট – ৪
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
‘শক্তি-সংঘ’-এর জরুরী অতি-গোপনীয় সভা বসেছে। সভার প্রশস্ত মিটিং-হলে সভ্যরা ছাড়া কেউ নেই—এমন কি সংঘের চাকর-মালিদেরও প্রবেশ নিষেধ। হলের চারদিকের দরজা-জানালা বন্ধ। সবাই গম্ভীর। পুরুষ সভ্যদের সকলের মিলিটারী ও মেয়েদের গার্ল-গাইডের পোশাক।
হলের এক প্রান্তে একটা ছোট প্লাটফরমের উপর শক্তি-সংঘের ক্যাপ্টেন বুলেট দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনের পর পর ক’টা বেঞ্চিতে বসে আছে সংঘের মেয়ে সভ্যারা—লক্ষ্মীবাই, হায়েনা, ভোজালী, ভীমা প্রভৃতি; তারপরে রয়েছে ছেলেরা–বস্ত্র, বোমা, বাঘ, বেয়নেট, বর্শা, বোল্ট, ব্যাটন এবং আরও অনেকে।
হল-ঘর নিঝুম স্তব্ধ—সূঁচ পড়লেও বোধহয় শোনা যায়। সবাই ক্যাপ্টেনের দিকে চেয়ে আছে।
বুলেট ধীর দৃঢ় কণ্ঠে বলতে আরম্ভ করলে, “শক্তি-সংঘের ভাই ও বোনেরা, এইবার আমাদের আসল অভিযান বা প্রচেষ্টা শুরু হবে আমাদের শ্রদ্ধেয় বীরেনদাকে উদ্ধার আমরা করবোই। এর জন্যে আমরা এমন কি সহজে পুলিসেরও সাহায্য নেব না। আর আমাদের এই প্রচেষ্টার কথা শেষ পর্যন্ত আমরা সম্পূর্ণ গোপনীয় রাখবে।। অবশ্য প্রয়োজন হলে আমরা নিজেদের অভিভাবকদের জানাতে পারি। আমার মনে হয়, আমাদের কোন অভিভাবকই এই কাজে অমত করবেন না। তাঁর। সকলেই বীরেনদাকে জানেন আর আমাদের সংঘের ছেলেমেয়েরা কেমন, তারও খবর রাখেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে আমাদের অবশ্যই জানাতে হবে, তিনি হলেন অমিতাভ সেন। তিনি এক হপ্ত। পরে কলকাতায় ফিরবেন। কিন্তু তাঁর জন্যে আমরা অপেক্ষা করতে পারবো না। ইতিমধ্যেই আমাদের বহু বিলম্ব হয়ে গেছে। এ কাজে বহু বাধাবিঘ্ন বিপদ পদে পদে আসবে, এমন কি প্রাণহানিরও সম্ভাবনা আছে। আমরা যাদের বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছি, তারা খুবই শক্তিশালী ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির লোক; আর আমাদের এই যাত্রার কর্মক্ষেত্র হলো সুন্দরবন। আমার মনে হয়, বীরেনদা দুর্গম সুন্দরবনের কোন গুপ্ত স্থানে অসহ্য নির্যাতন ভোগ করছেন, যেকোন মুহূর্তে নিহত হতে পারেন। সুন্দরবনের পরিচয় সবাই জান—যেখানে জলে ভয়ঙ্কর কুমীর-হাঙ্গর, ডাঙায় গহন বন—হিংস্র বাঘ বরা বিষাক্ত সাপ সে বনের বাসিন্দা। আমাদের লড়তে হবে এইসব সাপ বাঘদের চেয়েও হিংস্র একদল লোকের সঙ্গে। মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রও আছে তাদের সঙ্গে। এইসব জেনেও আমরা সেখানে যেতে চাই। এ বিষয়ে কারো যদি কিছু বলবার থাকে তো বল, আর কে কে এই অভিযানে সেই দুর্গম ভয়ঙ্কর জায়গায় যেতে চাও তাও বল?”
বুলেটের বক্তৃতা শেষ হতেই, সব ছেলেমেয়েরা উঠে দাঁড়ালো,-অর্থাৎ সম্মতি জানালে সকলেই।
বুলেটের মুখে হাসি দেখা দিল। খুশির স্বরে সে বললে, “এই তো চাই। তবে আমাদের প্রথম যাত্রায় সকলের দরকার হবে না। আমার সঙ্গে যাবে বজ্র, বোমা, বাঘ,,বেয়নেট, বর্শা, বোল্ট আর ব্যাটন। আর একজনকে আমরা ঘটনাস্থলেই পাবো। সে যদিও আমাদের সংঘের সভ্য নয়, তবুও তার সঙ্গে আমার ও বস্ত্রের খুব জানাশুনা আছে। সে আমাদের দুজনের সহকর্মী ছিল ‘সুন্দরবনের গুপ্তধন’ উদ্ধারের সময়। ছেলেটি ঐ অঞ্চলেরই বাসিন্দা। তাকে দিয়ে আমরা অনেক কাজ পাব। মেয়ে সভ্যাদের সেখানে যেতে হবে না। এইখানে তাদের ওপর বিশেষ দায়িত্বপূর্ণ কাজ দেব। প্রথমেই সে কাজের কথা বলি। আমরা প্রায় সবাই এখন কলকাতার বাইরে যাচ্ছি আমার অবর্তমানে লক্ষ্মীবাই এই সংঘের ক্যাপ্টেন হোক, এই প্রস্তাব আমি করছি।”
সকল মেম্বারই সানন্দে প্রস্তাব অনুমোদন করলে।
বুলেট মেয়ে সভ্যাদের উদ্দেশে বললে, “আগামী কাল লক্ষ্মীবাই, ভীমা, ভোজালী, হায়েনা—এই চারজনে একটা কাজ করবে। কাজটা যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি খুব বিপদের সম্ভাবনাও আছে। তবে আমি এই চারজনের বুদ্ধি, ক্ষমতা ও সাহসিকতার উপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখি, তাই এই কাজের ভার তাদের উপর দিচ্ছি।”
লক্ষ্মীবাই, ভোজালী, ভীমা ও হায়েনা বুলেটের সামনে এসে মিলিটারী স্যালুট করে দাঁড়ালো।
বুলেট তাদের বলতে লাগলো, “পৈলান জায়গাটা কোথায়, তা তোমরা আমাদের কাছে কাল শুনেছ। ওখানে হাবু নস্করের বাড়িটা কোথায়, তা বজ্র তোমাদের ম্যাপ এঁকে বুঝিয়ে দেবে। তোমরা কাল বিকেল চারটার সময় হাবু নস্করের বাড়ি গিয়ে কতকগুলি জিনিসের খোঁজ নেবে। হাবু নস্কর লোকটা আমাদের বিরুদ্ধ দলের। সে এখন বাড়িতে নেই, কালও থাকবে না। হাবু নস্করের বাড়ি গিয়ে ‘ তার বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে তোমরা খুব আলাপ জমাবে, আর সেই সুযোগে ওদের বাড়ির ঘরগুলো ভাল করে খুঁজে দেখবে। লক্ষ্য করবে, বীরেনদাকে ওখানে লুকিয়ে রেখেছে কিনা। বীরেনদাকে সুন্দরবনে না পাঠিয়ে ওখানে রাখতে পারে, সে সম্ভাবনাও আছে। বহু ও বোমা মোটরে করে তোমাদের পৈলানে নিয়ে যাবে। তারা পৈলানের কাছে একটা বড় বাগানের সামনে তোমাদের নামিয়ে দিয়ে ডায়মণ্ড হারবার রোডের উপর গাড়িতে অপেক্ষা করবে। তোমরা যে বাগানটার সামনে নামবে, তার নাম ‘চিরন্তনী’। ওই বাগানের মাঝ দিয়ে তোমরা হাবু নস্করের বাড়ি যাবে ও আসবে। তোমাদের আত্মরক্ষা করার মতো সব জিনিসই ব্যাগে ভরে দিচ্ছি। সঙ্গে হুইসিলও দিচ্ছি। যদি কোন বিপদে পড়, নিজেরা নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করবে। একান্ত অপরাগ হলে হুইসিল বাজাবে, বজ্র ও বোমা সতর্ক থাকবে।”
মেয়ে সভ্যারা স্থিরভাবে সব কথা শুনলে। বুলেটের কথা মতো বজ্র চারটে ছোট ছোট ব্যাগ এনে তাদের দিলে; তারা কাঁধে ঝুলিয়ে নিলে। গার্লগাইডের পোশাকের সঙ্গে খাকী রংয়ের ব্যাগগুলো বেশ মানিয়ে গেল।
বুলেট বললে, “রাত প্রায় নটা, মেয়ে সভ্যারা এইবার যেতে পার।”
সংঘের মেয়েদের মধ্যে লক্ষ্মীবাই, ভোজালী, ভীমা ও হায়েনা—এই চারজন সব বিষয় দক্ষ। স্বাস্থ্যও তাদের অতি সুন্দর। লাঠি বা ছোরা খেলায় এমন কি বক্সিং-এও এদের নাম আছে।
লক্ষ্মীবাইয়ের দল বুলেটকে স্যালুট করে চলে গেল।
বুলেট আবার বলতে লাগলো, “আমরা যে অঞ্চলে যাব ঠিক করেছি, তার পরিচয় তো দিলুম। সেদিকে আমাদের মতো চেহারার বিদেশী একদল কমবয়সের ছেলে গেলেই সেখানকার লোকেরা আমাদের সন্দেহের চোখে দেখবে। আমরা ও দিকে কি উদ্দেশ্যে এসেছি, সে বিষয়ে তাদের কৌতূহল হবে। অথচ সব সময় কোন ছদ্মবেশ পরে থাকাও সম্ভব নয়। আমাদের বেশ কিছু দিন সেখানে থাকতে হবে। সেইজন্যে অন্য রকম ছদ্মবেশ ধরতে হবে, কিন্তু পোশাক-পরিচ্ছদে নয়। ওখানে গিয়ে আমাদের প্রচার করতে হবে – আমরা পল্লীবাসীদের উপকারের জন্যে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে তাদের দেশে গেছি। এই ছলনাটা আমাদের করতে হবে। সৎ কাজে ও যুদ্ধেতে এ জাতীয় ছলনা দূষণীয় নয়। এ কাজে যা দরকার, আমি ও বজ্র সবই ব্যবস্থা করে রাখবো। আত্মরক্ষার সব জিনিসেরই ব্যবস্থা। থাকবে। আমরা কাল বাদে পরশু ভোর সাড়ে পাঁচটার সময় সকলে এখানে এসে মিলিত হয়ে যাত্রা করবো। এই স্থির রইল।”
বুলেট থামলে। সভা ভঙ্গ হলো।
.
কলকাতা থেকে প্রায় দশ মাইল দক্ষিণে ডায়মণ্ড হারবার রোডের উপর ম্যাকলিয়ড কোম্পানীর একটা ছোট রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশনটার নাম ‘পৈলান’। তার একটু আগে পৈলান বাজার এখান থেকে পৈলান গ্রাম কাছেই।
পৈলানের হাবু নস্করের বাড়িতে একটি বার-তের বছরের মেয়ে উঠোনে বসে কি কাজ করছে। এমন সময় স্কুলটিউনিক্স ও জুতামোজা-পরা চারজন ভদ্রঘরের বড় বড় মেয়েকে ওদের বাড়ির দিকে আসতে দেখে সে উঠে দাঁড়ালো। তার জিজ্ঞাসু দৃষ্টি লক্ষ্য করে লক্ষ্মীবাই বললে, “বেড়াতে এসেছি।”
মেয়েটি বললে, “ওঃ! বোধহয় ‘বিজয়ভূমি’ কি ‘চিরন্তনী’ বাগান থেকে আসছো? মাঝে মাঝে আমাদের এদিকে বাবুদের মেয়েরা আসে আমাদের গা দেখতে।”
লক্ষ্মীবাই উত্তর দিলে, “হাঁ, ঐ দিক থেকেই আসছি। তোমাদের গ্রামখানা বেশ। তোমার নাম কি?”
“সত্যভামা।”
সত্যভামা ছাড়া বাড়িতে অন্য কেউ নেই, এমন কি তার মাও নেই। সত্যভামা ঘরের দাওয়ায় একখানা চাটাই পেতে আগন্তুক মেয়েদের বসতে দিলে।
ভোজালী ও ভীমা বসে সত্যভামার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে নিলে। লক্ষ্মীবাই ও হায়েনা ওদিকে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখছে—শোবার ঘর, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশালা, রান্নাঘর, চণ্ডীমণ্ডপ, ধানের মরাই।
ভীমা সত্যভামাকে জিজ্ঞাসা করলে, “তোমাদের বাড়ির আর কাউকে তো দেখছি না, তোমার বাবা মা আর সব কোথায়?”
সত্যভামা উত্তর দিলে, “মা আর আমার ছোট ভাই বিষ্ণুপুরে মেলা দেখতে গেছে। এইবার আসবে। আর বাবা গেছে জমিদারবাবুদের লাটে—সেই সুন্দরবনে।”
খুব বিস্ময়ের সুরে ভীমা বললে, “সুন্দরবনে! ও বাব্বা! সেখানে তো বড় বড় বাঘ থাকে! সেখানে তোমার বাবা কেমন করে গেল?”
সত্যভামা বললে, “বাবুদের মোটরগাড়ি এসেছিল। বাবা তাতে করে যাবে কাকদ্বীপ, সেখান থেকে সুন্দরবনে যাবে নৌকোয়। কিছু-দিন পরে কাকাও আবার সেখানে যাবে। বাবা কি জিনিস ফেলে গেছে, তাই নিতে আসবে।”
ভীমা জিজ্ঞাসা করলে, “বাঘের রাজ্যে তোমার বাবা গেছে, আবার তোমার কাকাও যাবে! তোমার কাকাকে তো দেখছি না?”
সত্যভামা উত্তর দিলে, “সে এ বাড়িতে থাকে না। আমার ঠিক কাকা সে নয়, জাতে হিন্দুস্থানী—আমায় খুব ভালবাসে। আমি তাকে কাকা বলে ডাকি।”
ভীমা বললে, “ওঃ! তাই এখানে থাকে না! আচ্ছা, সুন্দরবনে বাঘের রাজ্যে তোমার কাকা কি জিনিস নিয়ে যাবে?”
সত্যভামা বললে, “কি জিনিস, তা আমি কি জানি—মা জানে। মেলায় যাবার আগে মা আমাকে বলে গেছে, কাকা বা তার কোন লোক যদি একটা জিনিস চাইতে আসে তো শোবার ঘরের কুলুঙ্গিতে তোয়ালে জড়ানো যে জিনিসটা আছে, তাকে দিবি।”
লক্ষ্মীবাই বাড়ির মধ্যে ঘুরছিল আর এদের আলাপ-আলোচনাও শুনছিল। সে ভীমাকে একটা ইশারা করে সন্তর্পণে ঘরে ঢুকে কুলুঙ্গির উপর থেকে তোয়ালে জড়ানো জিনিসটা নিয়ে খপ, করে নিজের ব্যাগের মধ্যে পুরলে।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে সত্যভামার মা বাড়ি ঢুকলে। চারজন অচেনা মেয়েকে তাদের বাড়ির মধ্যে দেখেই সে বলে উঠলো, “কে? কে তোমরা? বলা নেই কওয়া নেই, লোকের ঘরের মধ্যে ঢুকেছ! কোথা থেকে আসছো তোমরা?”
সত্যভামা বললে, “ওরা বিজয়ভূমি থেকে—”
বাধা দিয়ে সত্যভামার মা রেগে বললে, “তুই থাম্! তুই কি বুঝিস্? বাবু বলে গেছে খুব সাবধানে থাকতে, পেছনে লোক লেগেছে। এরা যে সেই সব বদমাইস লোকদের চর নয়, কে বলতে পারে!”
লক্ষ্মীবাই খুব রাগ দেখিয়ে বললে, “কি যা তা আমাদের বলছেন? আমরা শহরে থাকি, পাড়াগাঁ কখনো দেখি নি। তাই আপনাদের এদিকে এসেছিলুম–।”
বাধা দিয়ে চড়া গলায় সত্যভামার মা বললে, “আমার মাথা কিনেছ! তা এসেছ পাড়াগ। দেখতে, পাড়াগাঁ দেখবে! আমাদের ঘরের মধ্যে ঢুকেছ কি মতলবে?”
খুব যেন রেগে লক্ষ্মীবাই বললে, “আপনি কি আমাদের চোর বলে সন্দেহ করেন? ছিঃ ছিঃ! এই মুহূর্তেই আপনাদের বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি।”
লক্ষ্মীবাই ঘরের দাওয়া থেকে লাফিয়ে নীচে নেমে সঙ্গীদের বললে, “তোমরা চলে এসো এক্ষুনি।”
হাবু নস্করের শোবার ঘর থেকে তোয়ালে জড়ানো যে প্যাকেটটা লক্ষ্মীবাই নিয়ে ব্যাগের মধ্যে পুরেছিল, সেটা সম্পুর্ণ ঢুকলেও তোয়ালের একটু অংশ ব্যাগ থেকে বের হয়েছিল।
সত্যভামার মায়ের সন্ধানী চোখে তা পড়তেই সে ছুটে এসে খপ্ করে লক্ষীবাইয়ের একটা হাত চেপে ধরে চিৎকার করে বললে, “কি তোমার ঝোলায়? খোল দেখি! এতক্ষণ তো খুব মুখ সাফাই করছিলে! খোল, নইলে এক্ষুনি চেঁচিয়ে গাঁয়ের লোক সব জড়ো করবো, টানতে টানতে পুলিসে দিয়ে আসবো -আমার ঘরের জিনিস চুরি করেছ বলে।”
লক্ষ্মীবাই দেখলে, একেবার হাতে নাতে ধরা পড়েছে; এখন আর উপায় নেই—আসল মূর্তি ধরতে হবেই। সে চাপা গলায় বললে, “বি রেডি সিস্টারস উইথ ড্যাগার্স।”
মুহূর্ত মধ্যে চারখানা ঝকঝকে ধারালো ছোরা বের করে চারজনে সত্যভামার মাকে ঘিরে ফেললে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সত্যভামার মা লক্ষ্মীবাইয়ের হাত ছেড়ে দিলে। সত্যভামা কাঁদবার উপক্রম করতেই লক্ষ্মীবাই তার বুকের উপর ছোরাটা ধরে ধমক দিয়ে বললে, “চুপ! এক্কেবারে চুপ! টু শব্দ করলে, হাতে কি আছে দেখছো তো?”
সত্যভামা আর তার মার মুখ দিয়ে কথা সরলে না। থরথর করে তারা কাঁপছে। আদেশের স্বরে লক্ষ্মীবাই বললে, “দুজনে এই মুহূর্তে তোমাদের ঘরের মধ্যে ঢোক—ওয়ান—টু—”
সত্যভামা ও তার মা দ্রুতপদে ঘরে ঢুকতেই লক্ষ্মীবাই ঘরের শিকল তুলে দিয়েই বললে, “কুইক মার্চ সিস্টারস্!”
কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই তারা অদৃশ্য হয়ে গেল।
পৈলান গ্রামে মেয়ে ডাকাতদের কথা রাষ্ট্র হবার আগেই বোমার মোটর লক্ষ্মীবাঈদের নিয়ে ঠাকুরপুকুর ব্রতচারী গ্রাম পার হয়ে গেছে।
.
জায়গাটির নাম কুমীরখালি। এখান থেকে সুন্দরবন বেশী দূরে নয়। স্থানটাকে বাংলা দেশের দক্ষিণ প্রান্ত বলা যেতে পারে। স্থানে স্থানে গভীর বন-জঙ্গল। কিছু দূরে বঙ্গোপসাগর। এই পর্যন্ত এসে লোকের বসবাস বা পল্লী শেষ হয়েছে। এর দক্ষিণে আর কোন লোক বাস করে না।
সপ্তমুখী নদী এইখানে পশ্চিমে বাঁক নিয়ে সোজা দক্ষিণ দিকে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। নদীর উত্তর তীরের গ্রামটির নাম কুমীরখালি। গ্রামখানা এ অঞ্চলের মধ্যে একটু উন্নত—বেশ কিছু লোকের বসবাস আছে, হাট-বাজার আছে, কুদঘাটা ও ফরেস্ট অফিসও আছে।
শিকারী, বাউলে বা মৌলেরা—যারা গভীর সুন্দরবনে যাতায়াত করে তাদের সকলকেই এই গ্রামে আসা-যাওয়া করতে হয়। মীরবরপুর এখান থেকে বড়জোর মাইল খানেক দূরে।
সপ্তমুখী নদীর দক্ষিণ তীর থেকে গভীর সুন্দরবন আরম্ভ হয়েছে। দিনের বেলায়ও সেখানে বড় বড় বাঘ আর নানা রকম হিংস্র জন্তু-জানোয়ারকে মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
কুমীরখালি থেকে সুন্দরবনের রেখা চোখে পড়ে। এখানকার হাট মীরবহরপুরের রায়দের এর ইজারাদার হলো অভিমন্যু সাফুই। সাফুইমশাই এ অঞ্চলের একজন গণ্যমান্য ধনী ব্যক্তি। তাঁর চণ্ডীমণ্ডপে নিখিলবঙ্গ পল্লী উন্নয়ন সমিতির ক্যাম্প বসেছে। কলকাতা থেকে তরুণ বয়স্ক বহু স্বেচ্ছাসেবক এসেছে। তারা এই অঞ্চলের অধিবাসীদের সুখ-দুঃখ অভাব-অভিযোগ সব শুনছে। স্থানীয় লোকদের স্বাস্থ্য, বিদ্যাশিক্ষা, চাষ-আবাদ প্রভৃতির উন্নতি করতে হয় কি করে, জমিকে উর্বর করতে হয় কি প্রকারে, গৃহপালিত পশুপক্ষীর উন্নতি হয় কেমন ভাবে, তা উন্নয়ন সমিতির স্বেচ্ছাসেবকরা পল্লীবাসীদের বুঝিয়ে দিচ্ছে।
অভিমন্যু সাঁফুই শুধু স্বেচ্ছাসেবকদের স্থানই দেয় নি, এদের সব কাজে খুব সহায়তাও করছে।
স্বেচ্ছাসেবকরা সারা দিন সমিতির কাজ করে পল্লীতে পল্লীতে ঘুরে। সন্ধ্যার পর পল্লীবাসীদের সঙ্গে ক্যাম্পে বসে আলাপ-আলোচনা করে, গানবাজনাও করে। এজন্যে সাফুইমশাই তাদের একটা হারমোনিয়াম আর একটা হ্যাজাক্স, আলো দিয়েছে।
নিখিলবঙ্গ পল্লী উন্নয়ন সমিতির প্রচার, পরামর্শ ও সাহায্যের ফলে স্বেচ্ছাসেবকরা এ অঞ্চলে বেশ সুনাম পেয়েছে। দু-তিন দিনের মধ্যে তারা তিন-চারটে পল্লীর লোকদের আপনার করে নিয়েছে। শহরবাসী শিক্ষিত ভদ্র বংশের ছেলেরা কেউ এমন আন্তরিকতার সঙ্গে এর আগে কোন দিন তাদের সঙ্গে মেশে নি। তার। তাই উন্নয়ন সমিতির একটা স্থায়ী ক্যাম্প এখানে করবার ব্যবস্থা করছে। মাতব্বর ব্যক্তিরা অর্থ দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এবার স্বেচ্ছাসেবকরা বেশী দিন একস্থানে থাকতে পারবে না, তাই তারা টাকা নেয় নি। পরে যদি দরকার হয় তো নেবে, কথা দিয়েছে।
রাত বোধহয় তখন এগারোটা হবে।
সমিতির স্বেচ্ছাসেবকরা সারা দিন উন্নয়নের কাজ করে সন্ধ্যার সময় কীর্তন গান, খাওয়া ও আলাপ-আলোচনা সেরে শুয়ে পড়েছে। অভিমন্যু সাফুই বা অন্য পল্লীবাসীরা, যারা রাত্রে ক্যাম্পে এসেছিল, তারাও চলে গেছে অনেকক্ষণ।
চারিদিক নিঝুম নিস্তব্ধ।
বুলেট চাপা গলায় বজ্রকে বললে, “কি বুঝছো? আজ মীরবহরপুর কাছারির সেই নব নে পাইকটা এসেছিল। তুমিও তো ওদিকে গেছলে? কি ফল হলো?”
বজ্র উত্তর দিলে, “বীরেনদাকে ওরা কাছারিতে রাখে নি। সাধু কাছারিতে থাকে না, কাছাকাছি কোথায় এক দ্বীপে থাকে—এই পর্যন্ত খবর পেয়েছি। আমার মনে হয়, বীরেনদাকে ওরা সেই দ্বীপেই রেখেছে। দ্বীপটা কোথায়, তা জানতে পারি নি।”
বুলেট বললে, “সেইটে জানা আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ।”
বজ্র বললে, “সাধু মাঝে মাঝে মীরবহরপুর কাছারিতে আসে, সারা দিন কাছারিতে থাকে, রোগীদের হোমিওপ্যাথি ঔষধ বিতরণ করে, আবার সন্ধ্যার পর চলে যায়। আসে যায় একটা ছোট ডিঙি নৌকোতে। এবার যেদিন আসবে, ঠিক সময়ে খবর পাব। নব, নে পাইককে সেই খবর গোপনে দেবার জন্যে দশটা টাকা দিয়েছি।”
বুলেট বললে, “এ কাজ ভীমকে দিয়েও হবে। ভীম আজ এসে গেছে। সে কুদঘাটার লোকজনের সঙ্গে আছে, ক্যাম্পে ইচ্ছা করেই আনি নি! ও যে আমাদের লোক, তা কাউকে জানতে দেব না। ওর ওপর সাধুর বাসের সন্ধান নেবার ভার দেব।”
বজ্র বললে, “সাধুর নিজের একটা নৌকো আছে, তবে চালায় একটা মাঝি। সে লোকটা ভারি চালাক, তার কাছ থেকে কথা বের করা যাবে না। শুনেছি, কাছারির ছোট নায়েব হাবু নস্কর ছাড়া কেউ সাধুর আস্তানার খবর জানে না। কাছারির লোকদের ধারণা, সাধু গোপনে খুব ধ্যান পূজো যজ্ঞ প্রভৃতি করে, তাই অতি গোপনে থাকে।”
বুলেট বললে, “ভীম এদিককার লোক, ওকে দিয়ে সাধুর সাধন-ক্ষেত্রটি আবিষ্কার করা অসম্ভব হবে না। তার জন্যে নব নেকে কিছু আর বলবার দরকার নেই। ভীম মীরবহরপুরের ঘাটে থাকবে; সাধু যখন কাছারি থেকে ফিরবে, তখন ও ফলো করবে। তোমরা দুজন সঙ্গে থাকবে।”
অনেক রাত হয়েছিল। বুলেট ও বজ্র শুয়ে পড়লো।
.
গভীর রাত।
সুন্দরবনের মধ্যে সরু একটা নদী। তার দুপাশে গেঙ, হেতাল, সুন্দরী গাছের গভীর ঘন বন। ভয়াবহ অন্ধকারে সেই নদী দিয়ে সাধুর নৌকো চলেছে উজান ঠেলে ধীরে ধীরে। সাধু হাল ধরে আছে। একটা হিন্দুস্থানী দাড় বাইছে। সাধু গুনগুন করে গান গাইছে, আর মাঝে মাঝে টর্চের আলো ফেলে সামনের দিকে দেখে নিচ্ছে। জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ শোনা যায় না—শুধু মাঝে মাঝে দু-একটা শেয়াল বা ভীমরাজ পাখির আতঙ্ককর ডাক ছাড়া। একবার বাঘের ডাকও -শোনা গেল। বাঘটা ডাকছে খুব দূর থেকে।
ঘণ্টা দুই চলবার পর সাধুর নৌকো নদীর কিনারায় এসে থামলো। নদীতে জোয়ার শেষ হয়েছে। ভাটার টান পড়েছে। নদীর তীরে কাঁটাভরা বোলার ঝোপ জেগে উঠেছে। নদীর তীরে নৌকো ভিড়ানো সম্ভব হলো না। সেখান থেকে জল অনেক দূরে সরে গেছে। কাদার উপর দিয়ে মাবিটা এসে সাধুকে কাঁধে করে তীরে এনে নামিয়ে দিলে।
ঘন ঝুপী জঙ্গল। তার মাঝ দিয়ে সরু পায়ে চলা পথ। সাধু ও মাঝি টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে চলে গেল।
তারা চলে যাবার একটু পরেই দেখা গেল, সেই পথ দিয়েই অতি সন্তর্পণে বজ্র, ভীম ও বল্লম চলেছে। তাদের হাতেও টর্চ। কিন্তু তা জ্বালে নি। সেই ঝুলের মতো কালো অন্ধকারে জন্তুজানোয়ারভরা ঝুপী জঙ্গলের মাঝ দিয়ে তারা চলেছে। সবার হাতে সড়কি ও ছোরা। দু-একটা শেয়াল ও বাঘরোল কাছ দিয়ে চলে গেল। ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকী পোকা উড়ছে, আলো দিচ্ছে একটু একটু।
সাধু ও মাঝি প্রায় আধ মাইল জঙ্গল পার হয়ে একটা ভাঙা ইটের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। টর্চের আলো ফেলে সব দিক ভাল করে দেখে নিয়ে সাধু বাড়িটার একটা দরজায় আস্তে আস্তে টোকা দিলে।
দরজা খুলে যেতেই সাধু ঘরের মধ্যে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে দিলে। মাঝি অন্য একটা ভাঙা ঘরে গিয়ে উঠলো।
সাধুর আস্তানা বাড়িটা বর্তমানে জরাজীর্ণ, কিন্তু এককালে বেশ ভাল ছিল মনে হয়। বোধহয় নীলকুঠির সাহেবদের আমলের হবে। বাড়িটার চারদিকে একসময় পাঁচিল ছিল, তা প্রায় সবটাই ভেঙে গেছে। পাঁচিলের এক দিকে আর একটা ঘর আছে। সেটা আরো বেশী জীর্ণ। এই ঘরেই বোধহয় মাঝি থাকে
সাধুর ঘরের দরজা-জানলা সব বন্ধ থাকলেও একটা ভাঙা জানলা দিয়ে ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্ছে। বজ্র ও ভীম সেইখানে এসে ভাঙা জায়গায় চোখ লাগিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
ঘরের মধ্যে একটা হ্যারিকেন লণ্ঠন জ্বলছে। মেঝের উপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দুজন লোক কম্বলের উপর শুয়ে আছে। তাদের পাশে লাঠি হাতে বসে আছে একজন হিন্দুস্থানী। বন্দীদের সে পাহারা দিচ্ছে।
সাধু আহারে বসেছে। আহার শেষ হলে সে এগিয়ে এল। বন্দীদের একজনকে লক্ষ্য করে বললে, “কি নায়েমশাই, কি ঠিক করলে বল। আমি আজ তোমার কাছ থেকে পরিষ্কার জবাব চাই। মন্দিরের নীচে থেকে একটা সিন্দুক বের হয়েছে। আরও সিন্দুক ওখানে আছে কিনা তোমাকে বলতে হবে। আর ঐ সিন্দুকের চাবি কোথায় আছে, তুমি নিশ্চয়ই জান। তার সন্ধানও দিতে হবে।”
নায়েবমশাই দৃঢ় স্বরে উত্তর দিলেন, “আমি কোন কথাই তোমায় বলবো না।”
সাধু বললে, “তার ফল কি হবে জান?”
নায়েবমশাই উত্তর দিলেন, “জানি মৃত্যু।”
সাধু বললে, “হাঁ মৃত্যু, আর খুব নৃশংস মৃত্যু।
নায়েবমশাই বললেন, “তাও জানি। পশুর কাছে তা ছাড়া আর কি আশা করা যায়?”
সাধু বললে, “গরম এখনও কাটে নি দেখছি। তোমাকে প্রথম মারবে। না। তোমার চোখের সামনে প্রথমে মারবো এই বীরেনকে, তারপর তোমাকে।”
নায়েবমশাই বললেন, “বংশের কুলাঙ্গারের পক্ষে সবই সম্ভব। তবু জিজ্ঞেস করি, বীরেনের কি দোষ? ও তো কিছুতেই নেই। এ সবের কিছুই ও দাবি বা প্রত্যাশা করে না। এর বিদ্যার জোর আছে, তাইতে ওর রাজার হালে চলে যাবে। তোমার মতো ও মূর্খ নয়, তোমার কোন ক্ষতির চিন্তাও করে না।
সাধু বললে, “পথের কাঁটা কে রাখতে চায়? ও থাকলে কাকাবাবুর নগদ টাকা, কলকাতার বাড়ি, মায় ওই সিন্দুকের মধ্যে যা আছে, সবই ও পাবে। তাই ওকে ছনিয়া থেকে সরাবো।”
নায়েবমশাই বললেন, “সব তুমিই ভোগ করবে?”
সাধু উত্তর দিলে, “নিশ্চয়ই। এই আমিই সব ভোগ করবো—একদম একলা, এক পাইও কাউকে দেব না। কাল সিন্দুক আনবার পর তোমাদের দুজনকে শেষ করবো, তারপর কাকাকেও। তারপর সবই আমার হবে—সবই আমার।”
সাধু মহোল্লাসে অট্টহাস্য করে উঠলো—হাঃ হাঃ হাঃ।
যে লোকটা বীরেন রায়দের পাহারা দিচ্ছিল, সে সাধুকে জিজ্ঞাসা করলে, “সিন্দুকটা এখানে আনাই ঠিক করলে?”
সাধু উত্তর দিলে, “হাঁ, এখানে এনেই ভাঙবো। ওটা বেশী ভারী নয়—তিনজনেই বয়ে আনতে পারবে মনে হয়। বেশী লোককে এখানে আনবো না। ওর মধ্যে যা আছে, তার ভাগও ওদের সকলকে দেব না। তশীলদার বা ছোট নায়েবটাকে কিছু টাকা দিয়ে ভাগিয়ে দেব। কাছারির দারোয়ানদেরও দু-পাঁচ টাকা করে দেব।”
লছমন জিজ্ঞাসা করলে, “ওরা যদি তাতে দাবি ছাড়তে রাজী না হয়?”
দৃঢ়কণ্ঠে সাধু বললে, “রাজী না হয়তো দুনিয়ার দাবি তাদের ছাড়তে হবে।”
লছমন বললে, “আচ্ছা, আচ্ছা। ও কথা পরে হবে। কাল আমাকেও তো ঐখানে যেতে হবে। কিন্তু আমরা না-ফেরা পর্যন্ত কে এদের পাহারা দেবে?”
সাধু বললে, “নেই বা কেউ থাকলো! ওদের দুজনের হাত-পা খুব ভাল করে বেঁধে রেখে, ঘরে ডবল তালা লাগিয়ে যাবে। সুন্দরবনের এই দুর্গম দ্বীপের মধ্যে কে আর আসছে?”
সাধু কিছুক্ষণ কি চিন্তা করে আবার বললে, “আমি কাল সকালেই কাছারিবাড়িতে যাব, তুমি ওখানে বিকেল নাগাত যেও। আর একটা কথা,—রান্নাঘরের সামনে যে পাতকো আছে, সেখানের আগাছাগুলো সাফ করে রেখ, আমরা সিন্দুকটা এনে ঐখানে রেখে ভাঙৰো। তারপর পাতকোয় খালি সিন্দুকটা ফেলে দেব। পুলিস বাবাজীরা পরে এসে কোন প্রমাণই পাবে না। পায়ের দাগগুলোও তুলে দিয়ে যাব।”
লছমন মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে রান্না ঘরে অন্য সঙ্গীদের সঙ্গে শুতে চলে গেল। সাধু ঐ ঘরেই একটা বিছানার উপর শুয়ে পড়লো। আলোটা জ্বালাই রইল।
বস্ত্র সরে এল জানলার কাছ থেকে। রাত শেষ হতে আর বোধহয় বেশী দেরী নেই।
কুমীরখালি হাটের উপর বুলেটের বক্তৃতা বেশ জমে উঠেছে। বহু চাষী লাটদার চকদার ব্যাপারী তার বক্তৃতা শুনছে আর তারিফ করছে।
বুলেট বক্তৃতা দিচ্ছে, “ভগবান জল দিলে না বলে আকাশের দিকে চেয়ে বসে থাকবেন না। গ্রামে গ্রামে পল্লীতে পল্লীতে পুকুর কাটাবেন, নলকূপ বসাবেন। যে সব নদীর জলে নোনা নেই, সেই নদী থেকে নালা কেটে জমিতে জল দেবার চেষ্টা করবেন। পল্লী অঞ্চলে গরু ছাগল হাঁস মুরগী মড়কের সময় হাজারে হাজারে মরে। মড়ক থেকে কি করে তাদের রক্ষা করা যায়, তা আপনাদের জানতে হবে। বর্তমান কালে তাদের রক্ষা করার যথেষ্ট উপায় বের হয়েছে। জমির বাঁধ ভেঙে গিয়ে চাষ-আবাদ নষ্ট হয়। সেজন্যে গভর্নমেন্ট বা জমিদারদের মুখাপেক্ষী না হয়ে থেকে আপনারা নিজেরা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করে বাঁধ বাঁধবেন। প্রায় গ্রামেই বিদ্যাশিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। নিজেরা যাঁরা কিছু কিছু লেখাপড়া জানেন, তাঁরা কিঞ্চিৎ ত্যাগ স্বীকার করে কোন অবস্থাপন্ন লোকের চণ্ডীমণ্ডপে বা বাইরের ঘরে পাঠশালা বসাবেন। এর জন্যে খরচ খুবই কম। আশা করা যায়, পরে সরকারী সাহায্যও পেতে পারেন। আপনারা গ্রামের সকলে মিলে দাবি জানাবেন সরকারের কাছে। আমরা মিলিতভাবে দাবি করি না, তাই অনেক কিছুই পাই না।”
নিশ্চয়! নিশ্চয়! শ্রোতাদের মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে গেল।
বিকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। জমাট মেঘে আকাশ কালো। বাতাস পড়ে গেছে। এই সময় হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলে। সভা আর চললো না। শ্রোতারা দ্রুত রওনা হলো বাড়ির দিকে। বুলেট একটা দোকানে এসে উঠলো। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে।
.
গভীর সুন্দরবনের মাঝে মহা দুর্যোগের রাত। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, ক্ষণেকের জন্যে থামছে এক-একবার। কিন্তু ঝড়ের তাণ্ডব চলেছে সমানে—অবিরাম ভয়ঙ্কর।
কেওড়া-গরাণ গাছের ঘন জঙ্গলে গাছে গাছে ঘর্ষণ লেগে মাঝে মাঝে শব্দ হচ্ছে কড়–কড় কড়-কড়। যে কোন সময় দাবাগ্নি জ্বলে উঠতে পারে। নদীতে বড় বড় ঢেউ পাড়ের বালিয়াড়ির উপর আছাড় খেয়ে পড়ছে।
প্রকৃতির রূপ যেমন বীভৎস তেমনি ভয়াবহ। হেঁতাল ঝোপের মধ্যে দু-একটা বনচারী জীব চলাফেরা করছে সড় সড় শব্দে। ফেউ ডাকছে তারস্বরে। কাছাকাছি কোথাও বাঘ বেরিয়েছে।
‘রোঘ’ দ্বীপের বহু দিনের পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ির একটি ঘরে ফাটল-ভরা মেঝের উপর কম্বলের শয্যায় হাতপা বদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন বীরেন রায় আর তাঁর এস্টেটের নায়েবমশাই শ্রীচরণ দাশ। রাত বেশ হয়েছে। অথচ দুজনের চোখে ঘুম নেই। এ অবস্থায় কারোই ঘুম আসতে পারে না। আজ তাঁদের দুজনের জীবনের শেষ রাত—তাঁরা জেনেছে।
নায়েবমশাই বীরেন রায়কে বাঁচাবার জন্যে শেষ পর্যন্ত সাধুর হাতে-পায়ে ধরেছে। বীরেন রায় শৈলেনবাবুর কোন সম্পত্তি নেবেন না বলে প্রতিজ্ঞাও করেছেন। কিন্তু সাধু তাঁদের কাউকে ছেড়ে দিতে রাজী নয়। সে স্থির করেছে, আজ নিজের হাতে এদের দুজনকে গুলি করে মারবে।
সাধুদের আজ মহা উল্লাস। গুপ্তধনের সিন্দুকটি ওরা আজ এইখানে এনে ভাঙবে। তার পর বীরেন রায় ও নায়েবমশাইকে হত্যা করে ঐ ভাঙা সিন্দুকের সঙ্গে বেঁধে শুকনো পাতকোর মধ্যে ফেলে দেবে।
নায়েবমশাই ধরা গলায় বীরেনবাবুকে বললেন, “খোকাবাবু, নিজে মরি তাতে ক্ষোভ নেই, আমার বয়স প্রায় সাতষট্টি পার হতে চললো। আমার জীবনের মেয়াদ এমনিতেই আর কত দিন! দুঃখ হচ্ছে তোমার জন্যে। এই কম বয়েস, বিলেত থেকে এত লেখাপড়া শিখে এসেছ, ভবিষ্যতে একজন নামজাদা গণ্যমান্য লোক হতে পারতে। কিন্তু তোমার এ অমূল্যজীবন শেষ হতে যাচ্ছে এই পশুটার হাতে, কেউ রক্ষা করতে পারলো না। এই গহন দুর্গম সুন্দরবনে পুলিস কেন, এমন কোন জনপ্রাণীও নেই…হায়! · ভগবানও কি নেই?”
খট্ করে একটা শব্দ হলো ঘরের কোণ থেকে। সঙ্গে সঙ্গে একটা জানালা খুলে গেল। চমকে উঠলেন বীরেনবাবু ও নায়েবমশাই। বিস্ফারিত চোখে তাঁরা চেয়ে রইলেন সেই দিকে। অসহায় বিহ্বল চাউনি।
সাবেক ধরনের ঘর—বেশীর ভাগ জানালা প্রায় কড়িকাঠের কাছাকাছি। একটা হাফপ্যান্ট-পরা লোক সেই জানালা দিয়ে ওপর থেকে ঘরের মধ্যে লাফিয়ে পড়লো। দ্রুত সে এগিয়ে এল ওদের দিকে। তার সারা দেহ জলে ভিজে গেছে, হাতে একটা ছোর!।
বীরেনবাবু ও নায়েবমশাইয়ের চোখে অসহায় বিহ্বল দৃষ্টি। ছোরা হাতে লোকটি সোজা তাদের দিকে আসছে। আর নিস্তার নেই—কয়েক মুহূর্ত মাত্ৰ!
অকস্মাৎ লোকটি বীরেন রায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে চাপা গলায় বললে, “ভয় নেই বীরেনদা, আমি বুলেট।”
“বুলেট!” বীরেনবাবু বিস্ময়ে আনন্দে প্রায় চীৎকার করে উঠলেন।
আর্ত বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে নায়েবমশাই বলে উঠলেন, “নারায়ণ! নারায়ণ! তুমি আছ তাহলে!”
বুলেট দ্রুতহস্তে বীরেনবাবু ও নায়েবমশাইয়ের সব বাঁধন খুলে দিয়ে বললে, “আর ভয় নেই। আমরা শক্তি-সংঘের তোমার নজন শিষ্য এসে গেছি। তোমাদের উদ্ধার করবো
বজ্রও জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে এসে আলোটা জোর করে দিলে। তার সঙ্গে ব্যাগে ভরতি খাবার। বীরেনবাবু ও নায়েমশাইকে সেগুলি দিয়ে বললে, “খেয়ে গায়ে বল করে নিন।”
সব কথা শুনে বীরেন রায় বললেন, “তোমরা ওদের সঙ্গে লড়তে চাচ্ছ। কিন্তু ওরা সবাই ভীষণ বলবান আর সংখ্যায়ও তিন-চার জন হবে। তা ছাড়া মন্টু দার একটা পিস্তলও আছে।”
বুলেট বললে, “আমাদের কাছেও হাতিয়ার কিছু আছে। সংখ্যায় আমরাও কম নই। একটা সত্যিকাবের রিভলভারও পেয়ে গেছি। বীরেনদা আপনি শুনলে গর্ববোধ করবেন, এই রিভলভারটা সংঘের বোনেদের দ্বারা পৈলানের হাবু নস্করের বাড়ি থেকে দুঃসাহসিক-ভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে। আমরা হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে ওদের আক্রমণ করবো। ওরা প্রস্তুত হবার আগেই ওদের খায়েল করবো।”
সায় দিয়ে বজ্র বললে, “ওরা শক্তি প্রয়োগের আগেই ওদের আমরা আক্রমণ করে দমিয়ে দেবো।”
বীরেনবাবু তাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, ভাবছেন, “স্বপ্ন দেখছি না তো। বজ্র আর একবার উদ্ধার করবার চেষ্টা করেছিল, সেই রকম যদি হয়।”
বুলেট কি চিন্তা করছিল। বললে, “আচ্ছা বীরেনদা, আমরা যদি এখুনি তোমাদের ঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য কোথাও রেখে আসি, তাহলে কেমন হয়? ঘাটে আমাদের দুটো ডিঙি আছে।”
বীরেনবাবু বললেন, “আমরা দুজনেই শুধু যাব আর তোমরা?”
বুলেট উত্তর দিলে, “আমরা? আমরা এই ডাকাতের দলকে শায়েস্তা করে তবে যাব। এরা আমাদের কত বড় ক্ষতি করতে গিয়েছিল! এদের ক্ষমা করবো না। এদের সঙ্গে লড়বো।”
নায়েবমশাই বললেন, “আমি যাব না তোমাদের ফেলে।”
বীরেনবাবুও তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললেন, “আমাদের যাওয়া হতে পারে না। আমাদের প্রাণরক্ষা করতে এসেছ তোমরা। আর আমরা তোমাদের এই পশুদের হাতে ফেলে নিজেরা চলে যাব, তা হতেই পারে না। আমিও তোমাদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় থাকবো, যতটা পারি সহায়তা করবো।”
নায়েবমশাই বললেন, “আমি বৃদ্ধ হয়েছি বটে, কিন্তু গায়ে এখনো যথেষ্ট শক্তি আছে। আমার প্রতিজ্ঞা, যদি সুযোগ পাই, বংশের ঐ কুলাঙ্গারটাকে নিজের হাতে শেষ করবো। ও যদি বেঁচে থাকে, তাহলে বীরেনকে ও সারা জীবন জ্বালাবে। এজন্যে আমার জেল-ফাঁস যা হয় হোক, আমি গ্রাহ্য করি নে। এই ঘরেই একটা টাঙি আছে দেখেছি। তাই দিয়ে নরপিশাচ মন্টুকে আমি শেষ করবো।”
ঘরের আবহাওয়া থমথম করছে। দরজা-জানালার ফাঁক দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া মাঝে মাঝে ঘরে ঢুকে আলোটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
সাধুর বিছানার তলা থেকে টাঙিটা টেনে নিয়ে নায়েবমশাই বসে আছেন। তাঁর দুই চোখ যেন জ্বলছে।
বুলেট বললে, “আপনারা যখন আমাদের ফেলে যাবেন না ঠিক করেছেন, তখন এক কাজ করুন। নায়েবমশাই টাঙিটাকে নিজের কম্বলের মধ্যে এখন লুকিয়ে রাখুন। বীরেনদার হাতে একটা ছোরা দিচ্ছি। আপনারা এই দুটি অস্ত্র নিয়ে যেমন শুয়ে ছিলেন, তেমনি কম্বল জড়িয়ে শুয়ে থাকুন। আমরা কি ভাবে আজ লড়াই করবো, তা মোটামুটি যা ঠিক করেছি, আপনাদের বলি। তবে কাজের ক্ষেত্রে এর রদবদল হতে পারে কিছু কিছু।
“আমরা প্রথম আক্রমণ করবো মন্টু বাবুকে। তার হাত থেকে ব্যাগটা ছিনিয়ে নিতে পারলে ওর পিস্তলটা আমাদের হাতে এসে যাবে। তাহলে আমাদের জয় প্রায় সুনিশ্চিত। ওদের বলবিক্রম অর্ধেক কমে যাবে ঐ একটা ঘটনায়। কাল আড়াল থেকে ওদের কথাবার্তা শুনে বুঝেছি, ওদের হাতে আর কোন পিস্তল বা বন্দুক জাতীয় জিনিস নেই তবে ওদের সকলের কাছে সব সময় ছোরা থাকে।”
বীরেন রায় বললেন, “ঠিক কথা। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, মন্টু দা খুব শক্তিশালী।”
বুলেট উত্তর দিলে, “শক্তি প্রয়োগের সুযোগই দেব না।”
বজ্র বীরেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করলে, “আচ্ছা, এই ঘরে রোজ প্রথম ঢোকে আপনার মন্টু দা, ওর কাছে এই ঘরের চাবি থাকে—না?”
বীরেনবাবু উত্তর দিলেন, “হাঁ! মন্টুদা আর লছমন ছাড়া ঘরে কেউ ঢোকে না। ওদের দলের যে রান্নাঘরটা আছে ঐ ঘরে থাকে। থাকে, কিন্তু রাত্রে থাকে না। এই অন্য সবাই ওই পাঁচিলের কাছে সময় সময় লছমন এই ঘরে মন্টুদাই শুধু দিনে রাতে এই ঘরে থাকে।”
বুলেট বললে, “আচ্ছা বেশ। তাহলে শুনুন বীরেনদা, আমরা কি ভাবে এদের সঙ্গে লড়বো, তার বাকিটুকু বলি। কাল আমরা শুনেছি, ওদের দল সেই সিন্দুকটাকে রান্নাঘরের সামনে এনে রাখবে। তার মানে, দলের সবাই ওইখানেই থাকবে। মণ্ট বাবু মনে হয়, সিন্দুক ভাঙবার জন্যে ছেনি হাতুড়ি নিতে বা আপনারা কি করছেন দেখতে, একবার নিশ্চয়ই এই ঘরে আসবে। হয়তো একলা আসবে, কি বড়জোর লছমন ওর সঙ্গে থাকতে পারে। আমি ও বস্ত্র এই ঘরে ঢোকবার দরজার দুপাশে ছজন দাঁড়িয়ে থাকবো। আমার হাতে থাকবে রিভলবার, বস্ত্রর হাতে ছোরা। মন্টুবাবু ঘরে ঢুকলেই ওর বুকের ওপর রিভলবার ধরে ওর হাত থেকে পিস্তলটা কেড়ে নিয়ে বাঘের হাতে দেব। বাঘ ঘরের সামনে ভাঙা থামের আড়ালে এই জন্যেই অপেক্ষা করবে। সে পিস্তলটা হাতে পেয়েই পাতকোর ধারে গিয়ে আত্মগোপন করে দাঁড়াবে। সেখানে ঐ সময় আমাদের দলের অন্য সকলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গোপনে অপেক্ষা করবে। তাদের হাতে সড়কি বর্শা ছোরা আর চার-পাঁচটা টয়-পিস্তল আর থিয়েটারের তলোয়ার থাকবে। আর একটা কথা এর মধ্যে বলা দরকার। আমরা যখন মন্টুবাবুকে রিভলভার দেখিয়ে ঠাণ্ডা করে দেব, ঠিক সেই মুহূর্তে নায়েবমশাই ও আপনি দুজনে দড়ি দিয়ে ওকে বেঁধে ফেলবেন, সঙ্গে সঙ্গে মুখে কাপড় গুঁজেও দেবেন, যেন চেঁচিয়ে দলের কাউকে ডাকতে না পারে। রান্নাঘরটা বেশী দূরে নয়, জোরে চেঁচালে ওখানে শব্দ পৌঁছুতে পারে।’
হঠাৎ দূরে থেমে থেমে তিনবার ফেউ ডেকে উঠলো। মিনিট খানেক বিরতির পর আবার কানে এল ফেউয়ের ডাক। এবার দুবার।
সংকেত শুনে বুলেট ত্রস্ত হয়ে বললে, “ওরা আসছে। নাউ বি রেডি।”
সে তাড়াতাড়ি কতকগুলো আছাড়ে-পটকা বীরেন রায়ের হাতে দিয়ে বললে, “আমি ইশারা করলেই এগুলো ছুঁড়বেন।”
.
প্রকৃতির তাণ্ডব লীলা কিছু কমেছে। অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছে। ঝড়ের বেগও বিশেষ নেই।
সাধুদের অর্থাৎ মন্টুবাবুদের আজ মহা আনন্দের দিন। তাদের বহু দিনের বহু পরিশ্রম আজ সফল হতে চলেছে। প্রাচীন কালের সিন্দুকটা তাদের মুঠোর মধ্যে।
অন্ধকার ঝোপজঙ্গলের মাঝ দিয়ে মন্টুবাবু টর্চের আলো ফেলে আসছে। তার পিছনে লছমন, মাহাতো আর আগলু একটা মোটা বাঁশে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে সিন্দুকটা কষ্টে বয়ে নিয়ে আসছে।
বাঁশের সামনে একা লছমন, আর পিছনে মাহাতো ও আগলু। মন্টুবাবু মাঝে মাঝে লছমনকে সাহায্য করছে। মন্টুবাবু এগিয়ে এসে পাতকোর ধারে পরিষ্কার করা জায়গাটা দেখিয়ে সঙ্গীদের বললে, “এইখানে ওটা রাখ।”
সন্তর্পণে সিন্দুকটা সেইখানে রেখে তিন জনেই মাটির উপর বসে পড়লো। হাঁফাচ্ছে তারা। একটু পরে লছমন রান্নাঘর থেকে একটা মশাল এনে জ্বেলে দিলে।
মন্টুবাবু সঙ্গীদের বললে, “আগে ওদের দুটোকে শেষ করে তারপর সিন্দুকটা ভাঙা হবে, কি বল?”
লছমন বললে, “না। আগে সিন্দুকটা ভাঙা হোক। ভাগ বাঁটোয়ারা হয়ে গেলে, তারপর ওদের এখানে এনে গুলি করা যাবে। ওরা আর যাচ্ছে কোথায়?”
মন্টু বাবু বললে, “বেশ তাই হবে। আমি আমার ঘর থেকে ছেনি হাতুড়ি নিয়ে আসি। ওদেরও একবার দেখি।”
টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে মন্টু বাবু চলে গেল। তার আনন্দটা আজ বোধহয় সবচেয়ে বেশী। তার কারণও আছে। ওদের নিজেদের মধ্যে চুক্তি হয়েছে, সিন্দুক থেকে যা পাওয়া যাবে, তার দশআনা ভাগ সে পাবে, আর বাকী ছআন। পাবে মাহাতো, আগলু ও লছমন। হাবু নস্কর বা অন্য যারা তাদের এই কাজে সাহায্য করেছে, তাদের সামান্য কিছু নগদ টাকা দেওয়া হবে।
মন্টুবাবু গুনগুন করে গান করতে করতে ঘরে ঢুকে মেঝের উপর ডাক্তারী ব্যাগটা রেখে নায়েবমশাই ও বীরেন রায়কে উদ্দেশ করে বললে, “এইবার তোমরা নিজেদের ইষ্ট দেবতার নাম জপ করতে শুরু করো। আর বেশীক্ষণ তোমাদের এ জগতের কষ্ট সইতে হবে না। তার ব্যবস্থা—ওঃ!”
হঠাৎ কারা দুজন তাকে পিছন থেকে ভীষণ জোরে জড়িয়ে ধরলে। সেও খুব বলশালী। সে সজোরে এক ঝটকা মেরে তাদের ছিটকে ফেলে দিলে; কিন্তু পরক্ষণেই দেখলে, তার সামনে—মাত্র এক হাত দূরে, তার ঠিক বুকের উপর পিস্তল ধরে একজন মুখোশ পরা লোক দাঁড়িয়ে আছে।
বুলেট আদেশের স্বরে বললে, “হ্যাণ্ডস্ আপ। হাত তোল! একটু টু শব্দ করলেই এই পিস্তলের ছটা গুলিই তোমার বুকে ঢুকবে।”
ব্যাপারটা এত আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত যে মন্টুবাবুর কাছে দুঃস্বপ্নের মতোই মনে হয়। নিজের চোখকেই সে বিশ্বাস করতে পারছে না।
ব্যাগটা যেখানে রেখেছিল, সেই দিকে সে পা বাড়ায়। পরক্ষণে তার কোমরে সজোরে একটা লোহার ডাণ্ডা পড়লো।
“ওঃ!” বলে মন্টু বাবু মেঝের উপর পড়ে পেল। ব্যাগটা ইতিমধ্যে বাঘ সরিয়ে ফেলেছে। বজ্র ও নায়েবমশাই ঝাঁপিয়ে পড়লো মন্টু -বাবুর উপর, আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললে তাকে। বুলেট পিস্তল উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মন্টু বাবুর মুখের মধ্যে ওরা একটা কমাল ঢুকিয়ে দিলে। অসহায়ভাবে সে চেয়ে থাকে ওদের দিকে। সারা দেহ দড়ি-বাঁধা। নায়েবমশাই ধারালো টাঙিটা নিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বীরেনবাবু চুপ করে সব দেখছেন। মন্টুকে বাঁধতে তাঁর হাত ওঠে নি।
বুলেট নায়েবমশাইকে বললে, “আপনি ঠিক এই ভাবেই থাকুন। কিছু করাব দরকার নেই। ও কিছুই করতে পারবে না। আমি আর বজ্র পাতকোর দিকে যাচ্ছি। বীরেনদা আপনি পটকাগুলো ছুড়তে থাকুন।”
.
দুম্! দুম্! দুম্! দুম্!
ভয়ঙ্কর শব্দ পর পর তিন-চারটা। সুন্দরবনের নির্জন গভীর রাতের আকাশবাতাস কেঁপে উঠলো। মরণ আতঙ্ক মাহাতোদের দলে—লাফিয়ে উঠলো তারা। দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাতে যাবে, এমন সময় দু-তিনটা টর্চের তীব্র আলো তাদের মুখের উপর পড়লো। অন্ধকার থেকে হুঙ্কার, “খবরদার! হ্যাণ্ডস্ আপ! সবাই হাত তোল! নড়েছ কি মরবে!”
মাহাতোরা দেখলে, কালো কালো মুখোশ-পরা আট-নজন লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ঘিরে ফেলেছে। তাদের একেবারে সামনে যে দুজন দাঁড়িয়ে আছে, তাদের এক জনের হাতে পিস্তল, অপরের হাতে রিভলবার। অন্য সবার হাতে খোলা তলোয়ার, ছোরা, বর্শা, সড়কি। লছমন উঠে দাঁড়াবার উপক্রম করতেই একটা সড়কি এসে তার পায়ে বিঁধলো। আর্তনাদ করে সে বসে পড়লো। বুলেট পিস্তল উঁচিয়ে আবার হুঙ্কার ছাড়লে, “হাত ওঠাও! ছাড়লে, “হাত ওঠাও! জলদি—এক দুই তিন—”
হুম্! দুম্! দুম্! আবার সেই শব্দ। এবার আরও কাছে; আরও ভয়ঙ্কর।
হিন্দুস্থানী পলোয়ানেরা এবার সুবোধ বালকের মতো হাত তুলে দাঁড়ালো। তিন-চার জন মুখোশ-পরা লোক চোখের নিমিষে তাদের হাত পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে ফেললে।
বুলেট হুকুম করে, “আও, হামারা সাথ।”
ঘরের দিকে সে পা বাড়ায়। বিনা বাক্যব্যয়ে ওরা হুকুম তামিল করে। লছমন খোঁড়াচ্ছে। ওদের দুপাশে বুলেট ও বজ্র, হাতে পিস্তল ও রিভলবার। পিছনে আর সবাই।
এতক্ষণ প্রকৃতি কিছু শান্ত ছিল। আবার তাণ্ডব শুরু হয়। প্রবল ঝড়ে বড় একটা সুন্দরী গাছ মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়লো কিছু দূরে। নিকষকালো অন্ধকার আকাশে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টির ধারাও নামলো যেন আকাশ ভেঙে।
বন্দী মাহাতোর দলকে ঘরে ঢুকিয়ে বুলেট আবার হুকুম করলে, “সবকোই লেট যাও।” মন্টু বাবুর পাশে তারা সবাই ধুলো-ভরা মেঝের উপর শুয়ে পড়লো।
বাঘ ও বোমাকে বুলেট বললে, “এদের পাগুলোও দড়ি দিয়ে বাঁধো। বস্ত্র, তুমি পিস্তল নিয়ে সতর্ক থাকো, একটু বেয়াদপি করলেই কুকুরের মতো গুলি করে মারবে। এরা মানুষ নয়, পিশাচ।”
নায়েবমশাই বললেন, “সব চেয়ে হিংস্র পিশাচ থাকতে হয় তো আছে এই সাধুভেকধারী বংশের কুলাঙ্গারটি। আমি যা প্রতিজ্ঞা করেছি, এইবার তা পালন করবো।”
নায়েবমশাই টাঙি-হাতে মন্টুর দিকে পা বাড়ালেন। মন্টুর জুই চোখ আতঙ্কে বিস্ফারিত। সে ডুকরে কেঁদে উঠলো
মন্টু ও নায়েবমশাইয়ের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন বীরেন রায়।
… … …
কলকাতার টেম্পল্ চেম্বারস্-এর মরিস এণ্ড মিটার সলিসিটারস্ অফিস আজ মহাসরগরম।
বেলা এগারোটা বাজতে না বাজতেই সেখানে এসে গেছেন বহু সম্মানিত ব্যক্তি—খ্যাতনামা ঐতিহাসিক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, পদস্থ রাজকর্মচারী প্রভৃতি।
বরাকরের আশ্রম থেকে শৈলেনবাবুর আসাটা বিশেষ অপ্রত্যাশিত হলেও তাঁকে আসতে হয়েছে বন্ধু ও উক্ত ফার্মের সিনিয়র পার্টনার এটর্নি চুনীবাবুর জরুরী ডাকে।
এটর্নি অফিসের প্রশস্ত হল-ঘরের প্রায় মাঝখানে একটি কেদারায় শৈলেনবাবু, তাঁর পাশে বীরেনবাবু ও তাঁর দুজন বন্ধু এটর্নি অমিতাভ সেন ও অধ্যাপক ডঃ ললিত চৌধুরী বসে আছেন।
দেওয়ালের ধারে শক্তি-সংঘের ছেলে-মেয়েরা বসে আছে। ছেলেদের সকলের স্কাউট ও মেয়েদের গার্লস্ গাইডের পোশাক। নায়েব মশাই আছেন একটু দূরে। তিনি বীরেনবাবুদের এস্টেটের উকিলের সঙ্গে কথা বলছেন। বীরেনবাবুর মামা মিস্টার মিত্র ও চাকর ভামুও উপস্থিত।
সুন্দরবনের মাঝ থেকে আনা বহুকালের প্রাচীন লোহার সিন্দুকটা আজ এইখানে খোলা হবে সকলের সামনে। হলের প্রত্যেকের মন সেই সিন্দুকের দিকে।
সিন্দুকটা হলের ঠিক মাঝখানে রাখা হয়েছে।
নায়েবমশাই সেই দিকে তাকিয়ে উকিল দেবেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ সিন্ধুকের মধ্যে যা আছে তার মালিক কে হবে, বলতে পারেন?”
কিছুক্ষণ চিন্তা করে দেবেনবাবু উত্তর দিলেন, “ঠিক বলা যায় না, গভর্নমেন্ট দাবি করতে পারে, বাবুরাও পেতে পারেন। এর মধ্যে কোন ডকুমেন্ট আছে কিনা দেখা যাক।”
ওদের কথা শৈলেনবাবুর কানে যেতে তিনি বললেন, “না, ভাই ওই সিন্দুকের মধ্যে যা আছে তা আমরা দাবি করতে পারি নে। ওসব · সম্পত্তি আমাদের কোন পূর্বপুরুষের কাছে কে যেন গচ্ছিত রেখেছিলেন—তাঁকে বা তাঁর উত্তরাধিকারীকে ফিরিয়ে দেবার চুক্তিতে বা বিশ্বাসে। এই পর্যন্ত আমি জানতে পেরেছি আমাদের জমিদারীর একটা বহু পুরোনো কাগজ থেকে, আর বেশী কিছু জানতে পারি নি। ওর মধ্যে কি আছে কিংব। আমাদের কোন্ পূর্বপুরুষের কাছে কে বা কি কারণে কোন্ সময়ে এই সব রেখেছিলেন, তা কিছুই জানি নে।”
পুলিস অফিসার দুজন এসে গেলেন। এঁদের জন্যেই অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। এইবার সিন্দুক খোলা হবে।
সিন্দুকটার চাবি পাওয়া যায় নি, একটা মিস্ত্রীর সাহায্যে খোলা হবে। মিস্ত্রী উপস্থিত তার যন্ত্রপাতি নিয়ে। পুলিস সাহেবের আদেশে সে সিন্দুকের পিছনের দিকের কব্জা কাটতে শুরু করলে।
বীরেন রায় বুলেটকে কাছে ডাকলেন। শক্তি-সংঘের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বুলেট তাঁর সামনে এসে স্যালুট করে পা ঠুকে দাঁড়ালো।
পুলিস সাহেব বুলেট ও শক্তি-সংঘের ছেলে-মেয়েদের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে চব্বিশ পরগনার পুলিস সুপারকে বললেন, “শক্তি-সংঘের ছেলে-মেয়েদের দেখলে শুধু মনে আনন্দ হয় না, অনেক আশাও জাগে।”
এস. পি. উত্তর দিলেন, “এরা এই কেসে যা কৃতিত্ব ও বীরত্ব দেখিয়েছে, তাতে মনে হয় আমাদের দেশের স্বাধীনতা আমরা কৃতিত্বের সঙ্গেই রক্ষা করতে পারবো। এরা যা কাজ করেছে, তা যে কোন স্বাধীন দেশের গর্বের বিষয়। আমি এদের শুধু ধন্যবাদ দিয়েই ক্ষান্ত হবো না—এদের সকলকে পুলিসের পক্ষ থেকে বীরত্বের পুরস্কার দেবারও ব্যবস্থা করবো।”
কব্জা কেটে সিন্দুকটা খুলে ফেলা হলো। বীরেন রায়ের নির্দেশ মতো ও পুলিস সাহেবের অনুমোদনে বুলেটকে ভার দেওয়া হলো সিন্দুকের মধ্যের জিনিসগুলি একে একে বের করবার।
হলের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন ওঠে। সবাই নিঃসন্দেহ, এইবার বের হবে হীরা, পান্না, মোহর, সোনার তাল। তার পরিমাণ নিয়েই বোধহয় শুরু হয় গুঞ্জন।
বুলেট সিন্দুকের মধ্যে হাত ঢোকালে। প্রথমে বের হলো রেশমের তৈরী একটা বিরাট নিশান—গভীর লাল রঙের। তার বহু জায়গা পোকায় কেটে নষ্ট করেছে। নিশানটার চারদিকে জরির ঝালর, মাঝখানে সলমা ও জরি দিয়ে সূর্য আঁকা বা বোনা। সূর্যের নীচে কি লেখা ছিল, পড়া গেল না।
নিশানের পর বের হলো ফুলস্কেপ কাগজের মাপের একটি পাতলা তামার পাত। তামার পাতটির এক কোণে রূপোর তার দিয়ে বাঁধা একটি পোড়ামাটির সিল বা মোহর। সিলটা ডিম্বাকৃতি ও ছোট—এর অনেক স্থান ক্ষয়ে গেছে।
তামার পাতট। বহু শতাব্দী সিন্দুকের মধ্যে থাকায় নওলা ধরে কালো হয়ে গেছে। তার উপর খোদাই করা কিসব লেখা আছে দেখা গেল।
এটর্নি চুনী মিত্র পুলিস সাহেবকে বললেন, “আপনাদের চোখ তো খুব ধারালো। দেখুন, তামার পাটায় কিসব লেখা আছে, পড়তে পারেন কিনা?”
পুলিস সাহেব তামার পাতটা চোখের খুব কাছে নিয়ে কিছুক্ষণ পড়বার চেষ্টা করে বললেন, “এতে বাংলা ভাষাই লেখা আছে, কিন্তু অনেকগুলো অক্ষর ঠিক পড়া যাচ্ছে না।”
পুলিস সাহেব তামার পাতটা টেবিলের উপর রেখে দিতে বীরেন রায় তাঁর বন্ধু অধ্যাপক ডক্টর ললিত চৌধুরীকে দেখিয়ে বললেন, “ইনি ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক। ইনি চেষ্টা করলে বোধহয় পাঠোদ্ধার করতে পারবেন।”
ডক্টর চৌধুরী প্রথমে সেই পোড়ামাটির তৈরী সিলটা পড়বার চেষ্টা করেন।
সবাই উৎকর্ণ।
কিছুক্ষণ বাদে সিলের উপর থেকে চোখ তুলে অধ্যাপক চৌধুরী বললেন, “এই সিলের উপর লেখা রয়েছে সং ২৫ মাঘ দিনে গুহস্য প্রতাপাদিত্য।”
সবাই বিস্মিত হতবাক! বীরেন রায় বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, “প্রতাপাদিত্যের সিল! মহারাজ প্রতাপাদিত্যের?”
মাথা নেড়ে শৈলেনবাবু বললেন, “ঠিক! ঠিক! আমাদের পূর্ব-পুরুষদের কে যেন মহারাজ প্রতাপাদিত্যের নৌ-সেনা-পতি বা মীরবহর ছিলেন। বহু দিন আগে জমিদারীর কাগজপত্রের মাঝ থেকে এক টুকরো কাগজ পাই, তাতে এই রকম একটা কথা লেখা ছিল। তখন ভালো বুঝতে পারি নি।”
ডক্টর চৌধুরী তামার পাতটা পড়বার চেষ্টা করছিলেন আর কি যেন নোট করছিলেন।
সকলের দৃষ্টি তাঁর উপর নিবদ্ধ।
বহুক্ষণ বাদে পড়া ও নোট করা শেষ করে অধ্যাপক চৌধুরী বললেন, “প্রথমেই বলি, এটা হলো মহারাজ প্রতাপাদিত্যের একটা আজ্ঞাপত্ৰ—তাম্রশাসনও বলা যায়। মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যখন তাঁর ধুমঘাটায় যুদ্ধ চলছিল, সেই সময় তিনি এটা লিখে তাঁর একজন অতি বিশ্বস্ত ও উচ্চ কর্মচারীকে দেন। এই তাম্রশাসন বাংলা ভাষাতেই লেখা, তবে এর বহু অক্ষর দেবনাগরীর মতো। একে ত্রিহুটে অক্ষর বলে। তিন-চারশো বছর আগে এই রকম অক্ষর আমাদের বাংলা দেশে চলিত ছিল। এর বহু স্থান আমি ঠিক পড়তে পারি নি, কোন কোন জায়গায় ধারণা করে নিয়েছি। তখনকার ভাষার সঙ্গে এখনকার ভাষার একটু তফাতও আছে। সেইজন্যে এই তাম্রশাসনের ভাষা হুবহু বললে আপনাদের সকলে হয়তো ঠিক বুঝতে পারবেন না। আমি সেই ভাষা যথাসম্ভব বজায় রেখে আধুনিক চলিত ভাষায় যা নোট করেছি, তাই বলছি—
“মীরবহর ও ধুমঘাটার দুর্গরক্ষক শ্রীমধুসূদন বসু (রায়)
“মোগল সৈন্যেরা আমার যশোহর রাজ্য আক্রমণ করিয়াছে। ইহার ফল হয়তো রাজ্যের প্রজাদের পক্ষে মঙ্গলকর হইবে না, এইরূপ চিন্তা করিয়া আমি মোগলদের সহিত সন্ধি করিব, স্থির করিয়াছি। তজ্জন্য আমি মোগল সুবাদার ইসলাম খাঁর সহিত সাক্ষাৎ সন্ধির প্রস্তাব করিবার জন্য বাংলার রাজধানী ঢাকা নগরে যাইতেছি। যুদ্ধ এখন বন্ধ থাকিবে, উভয় পক্ষ হইতে এই চুক্তি হইয়াছে। আমার পুত্র যুবরাজ উদয়াদিত্য রাজকার্য পরিচালনা করিবে। আমি আমার রাজমুকুট ও পতাকা তোমার কাছে রাখিয়া যাইতেছি। রাজ্যে শাস্তি ফিরিয়া আসিলে, তৎকালে আমি যদি জীবিত থাকি তাহা হইলে আমাকে, নচেৎ আমার স্থলাভিষিক্ত আমার বংশধরকে তুমি বা তোমার বংশধর যাহার নিকট এই মুকুটাদি থাকিবে, সে শ্রীশ্রীযশোরেশ্বরী বিগ্রহের সম্মুখে কুলগুরুকে সাক্ষ্য রাখিয়া প্রত্যর্পণ করিবে। আমার
আদেশ রক্ষা না করিলে নরকস্থ হইবে। অত্রসহ কয়েকটি মুদ্রা রহিল। উহা তুমি বা তোমার উপযুক্ত বংশধর এই কার্যের পুরস্কারস্বরূপ পাইবে। সন ১০১৬ দশ শত ষোড়শ। শ্রীশ্রীকালী প্রসাদেন ভবতি শ্রীমন্মহারাজা প্রতাপাদিত্য।”
ডক্টর চৌধুরীর পড়া শেষ হলো।
নিস্তদ্ধ হল-ঘর—একটা সূঁচ পড়লেও বোধহয় শোনা যায়। কোথায় সেই সুদূর অতীত মহারাজ প্রতাপাদিত্যের যুগ আর কোথায় আজ বর্তমান! শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে সবাই যেন সেই প্রতাপাদিত্যের যুগে চলে গেছে।
শৈলেনবাবু চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
পুলিস সাহেব বললেন, “তাহলে এই সিন্দুকের মধ্যেই মহারাজা প্রতাপাদিত্যের রাজমুকুট আছে? অত্যদ্ভুত ঘটনা!”
বুলেট আবার সিন্দুকের মধ্যে হাত ঢোকায়। গভীর আগ্রহে সবাই চেয়ে আছে। কাবো চোখের পাতাও বুঝি পড়ছে না। থমথম করছে হল-ঘর।
বুলেট একটা ছোট থলে বের করে টেবিলের উপর রাখতেই থলেটা ফেঁসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা মোহর ও রূপার মুদ্রা ছড়িয়ে পড়লো।
ললিত চৌধুরী কয়েকটি মুদ্রা তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে বললেন, “মোহরগুলি পাঠান সুলতান দাউদ খাঁর সময়ের। কিন্তু ত্রিকোণ রূপার মুদ্রাগুলো কার সময়ের, তা বলা যায় না। শুনেছি, মহারাজ প্রতাপাদিত্য ত্রিকোণাকৃতি মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু এগুলি এমন ক্ষয়ে গেছে যে উপরে কি লেখা ছিল, পড়া যাচ্ছে না।”
নিস্তব্ধ হল-ঘরে কেবল ওয়ালক্লকের পেন্ডুলামের শব্দ কানে আসছে। বুলেট এইবার সিন্দুকের ভিতর থেকে একটা বড় পুলিন্দা বের করলে। পুলিন্দাটা পুরু লাল রংয়ের মখমলের কাপড়ে জড়ানো। বহুকাল সিন্দুকের মধ্যে থেকে মখমলের রং নষ্ট হয়ে গেছে, কোন কোন জায়গা পোকায়ও কেটেছে। অতি জীৰ্ণ অরস্থা।
পুলিন্দাটা খুলতে বেশী সময় লাগলো না। মুহূর্তে ঝলমল করে উঠলো অপূর্ব এক বস্তু!
গভীর শ্রদ্ধায় ও বিস্ময়ে সবাই দেখলে, প্রায় চারশো বছর আগের তৈরী অথচ অপূর্ব কারুকার্যময় একটি স্বর্ণমুকুট, যা একদিন বাঙালী জাতির গৌরব মহারাজ প্রতাপাদিত্য চির-উন্নত শিরে পরেছিলেন।
মুহূর্ত মধ্যে নিস্তব্ধ হল-ঘর জয়োল্লাসে ফেটে পড়লো। আনন্দে গর্বে জয়ধ্বনি করে উঠলো সবাই। পুলিস সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বললেন; “আসুন, বাংলার সেই মহাবীর সন্তান, স্বাধীনতাযুদ্ধের সেই মহানায়কের এই প্রতিভূকে আমরা অভিবাদন জানাই।”
শ্রদ্ধায় গর্বে সবাই উঠে দাঁড়ালো।
***
