কলিকাতায় নবকুমার – ৪২

বিয়াল্লিশ

মিনিটদশেক পরে পাড়াটা শান্ত হয়ে গেল। কোথাও কোনও শব্দ নেই। নিজের ঘরে ফিরে এসে জানলায় দাঁড়িয়েছিল নবকুমার। বোমার আওয়াজ কী ভয়ঙ্কর! এখনও কানের ভেতর সেই শব্দ যেন লেগে আছে।

রাস্তা জনশূন্য। সন্ধের মুখে যারা সেজেগুজে দাঁড়িয়েছিল তারা উধাও। সব দরজা বন্ধ। আলো নিভে গিয়েছে। মনে হচ্ছিল চারপাশে কোনও মানুষ নেই। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু পালটে গেল ওই বোমার শব্দ শুনে! কারা বোমা ফাটাল? অত আওয়াজের বোমা তারা কোথায় পেল? নিশ্চয়ই কিনতে পাওয়া যায়। তাহলে যারা বিক্রি করে তাদের পুলিশ ধরে না কেন? জানলা থেকে সরে এল নবকুমার।

রাতের খাবার নিয়ে এল মুক্তো, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ো।’

‘এখনই খাব?’

‘তাহলে ঢেকে রাখি। যখন ইচ্ছে হবে খেও!’

‘বাইরেটা অদ্ভুত চুপচাপ হয়ে গিয়েছে।’ নবকুমার বলল।

‘কতক্ষণ! বড় জোর আধঘণ্টা। তারপর দেখবে আগের মতো হয়ে যাবে। নীচের মেয়েরা শুনেছে একটা লোক নাকি খুন হয়েছে। পুলিশ বডি নিয়ে চলে গেলে ভয় কেটে যাবে।’ মুক্তোবলল।

‘লোকটাকে খুন করতে এসেছিল?’

‘মাস্তানদের ব্যাপার। খেয়ে নিও।’ মুক্তো চলে গেল।

তাহলে একটা মাস্তানকে খুন করতে কিছু মাস্তান বোমা মেরেছে। নবকুমার ভাবল, আচ্ছা, এই কলিকাতায় কত মাস্তান আছে? পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে পুলিশ তো সহজেই তাদের একটা তালিকা তৈরি করতে পারে। তারপর তাদের বলতে পারে, হয় মাস্তানি ছাড়ো, নয়তো তোমাদের সুন্দরবনের ওপাশে কোনও নির্জন দ্বীপে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। দেখা যেত, কোনও পাড়ায় আর কেউ মাস্তানি করছে না। সুন্দরবনে গিয়ে বাঘ এবং কুমিরের সঙ্গে তো মাস্তানি করা যাবে না।

মুক্তোর কথাই ঠিক হল। খেয়ে নিয়ে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে আসতেই রিকশার ঠুনঠুন শব্দ কানে এল। একটা মেয়ে হেসে কাউকে কিছু বলল। দ্রুত জানলায় গিয়ে অবাক হয়ে গেল নবকুমার। রাস্তায় আলো জ্বলছে। মেয়েরা আগের মতো দরজায় দাঁড়িয়ে গল্প করছে। যেন কিছুই হয়নি এখানে।

একটু পরে মুক্তো এল থালা গ্লাস নিয়ে যাওয়ার জন্যে, ‘যাক খেয়ে নিয়েছ। মা তোমাকে একবার যেতে বলল।’

নবকুমার শেফালি-মায়ের ঘরে এল। ইতি তখনও মোড়ায় বসে রয়েছে।

শেফালি-মা বললেন, ‘রাস্তাঘাট নাকি এখন স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। তাই শুনে এই মেয়েটা ফিরে যেতে চাইছে। মুক্তোকে বলেছি ওকে পৌঁছে দিয়ে আসতে। তুমিও সঙ্গে যাও।’

ইতি মুখ তুলল, ‘না, না। আমার কিছু হবে না, আমি একাই যেতে পারব। এইটুকু তো পথ, কোনও অসুবিধে হবে না।’

শেফালি-মা ধমকালেন, ‘এই মেয়ে, চুপ করো। যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে লোকে বলবে সব জেনেও আমি তোমাকে একা পাঠালাম কী করে?’

‘আমার জন্যে ওঁরাও তো বিপদে পড়তে পারেন।’

‘মুক্তোর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আর সঙ্গে একজন ছেলে থাকলে ফেরার সময় মুক্তোর একা লাগবে না। যাবে তুমি?’ প্রশ্নটা যেহেতু নবকুমারকে তাই সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

তাড়াতাড়ি পোশাক বদলে এল নবকুমার। এ-বাড়ির নীচের মেয়েদের দুজন দরজায় দাঁড়িয়েছিল। তারা অবাক হয়ে ওদের বেরোতে দেখল। মুক্তো এবং ইতি এগিয়ে যাচ্ছিল, পেছনে নবকুমার। রাস্তার ডানদিক চেপে হাঁটছিল ওরা।

মন্দিরের কাছে পৌঁছে ডানদিকে ঘুরতে হবে ওদের। নবকুমার দেখতে পেল বাঁ-দিকের একটা রাস্তায় মানুষেরা ভিড় করে আছে। মুক্তো বলল, ‘চলো, চলো, ওসব দেখতে হবে না।’

ইতিকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ফিরছিল ওরা। মোড়ের কাছে আসতেই একজন চিৎকার করল, ‘সরে যাও, সরে যাও, পুলিশ আসছে।’ সঙ্গে-সঙ্গে ভিড়টা পাতলা হয়ে মিলিয়ে গেল। নবকুমার দেখতে পেল একটা লোক ফুটপাথ ঘেঁষে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। দূর থেকে ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। মুক্তো বলল, ‘হাঁ করে কী দেখছ? চলো।’

‘এই যে গুরু! তুমি এখন এখানে?’

নবকুমার তাকিয়ে দেখল ছেলেটাকে। একসময় যার সঙ্গে মারপিট হয়েছিল, এখন বন্ধুর মতো আচরণ করছে। সে বলল, ‘আমরা ইতিকে পৌঁছে দিতে এসেছিলাম।’

‘কেসটা দেখেছ?’

‘কোন কেস?’

‘ওই যে শুয়ে আছে। দুই পার্টির মধ্যে লড়াই হচ্ছিল যখন, তখন কী দরকার ছিল ওর ওখান দিয়ে যাওয়ার?’ ছেলেটা জিভে শব্দ করল।

‘লোকটা কি মাস্তান ছিল?’

‘না-না। এ পাড়ায় কেন এসেছিল, ও-ই জানে। কাস্টমার নয়। বোমাটা পড়ল ওর পাশে আর ও লটকে গেল।’

‘কিন্তু লোকটা তো বেঁচে থাকতেও পারত। ওকে কেউ হাসপাতালে নিয়ে যায়নি কেন? বোমার শব্দ তো অনেক আগে হয়েছিল, এতক্ষণ পড়ে আছে।’ নবকুমার বলল।

‘কে নিয়ে যাবে? পাগল। যে ওকে ছোঁবে পুলিশ তার বারোটা বাজিয়ে দেবে। খবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সোনাগাছির রাস্তায় বডি পড়ে থাকলে যখন সময় হয় তখন পুলিশ আসে।’ ছেলেটা বলল।

মুক্তো ধমকালো, ‘তুমি যাবে কি না?’

ছেলেটা বলল, ‘আরে ঘাবড়াচ্ছ কেন মাসি, আমি তো আছি।’

‘কেমন আছ তা জানি। পুলিশ দেখলেই লেজ তুলে পালাবে।’

এইসময় একটা পুলিশের ভ্যান এসে শরীরটার পাশে দাঁড়াল। তখন ওই জায়গায় কোনও মানুষ নেই। দুজন সেপাই ভ্যান থেকে নেমে চারপাশে তাকাল। এত দূরে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করার ইচ্ছা বোধহয় তাদের হল না। ড্রাইভারের পাশে বসা অফিসার নীচে নামলেন না। তাঁর নির্দেশেই সম্ভবত ওরা শরীরটাকে তুলল। তুলতেই এতদূর থেকেও নবকুমারের মনে হল কীরকম চেনা-চেনা লাগছে। ধন্দে পড়ল সে। তারপর ছেলেটাকে বলল, ‘লোকটাকে একটু দেখতে চাই। যাবে?’

ছেলেটা বলল, ‘না। গেলে তোমাকেও ভ্যানে তুলবে। কে না কে লোক তাকে দেখতে চাইছ কেন?’

‘ওকে কোথায় নিয়ে যাবে?’

‘প্রথমে থানায়, তারপরে মর্গে।’

‘থানায় গেলে দেখা যাবে?’ নবকুমার দেখল ভ্যানটা বেরিয়ে গেল।

ছেলেটা ভাবল, ‘ওখানে গেলে অবশ্য তেমন ভয় নেই। আচ্ছা, চলো।’

মুক্তো চেঁচিয়ে উঠল, ‘একী? তুমি হঠাৎ এইসময় থানায় যাবে কেন? শেফালি-মা খুব রাগ করবেন। কে-না-কে মারা গিয়েছে আর তুমি তাকে দেখতে যাচ্ছ?’

‘আমার মনে একটা সন্দেহ এসেছে। না দেখে থাকতে পারব না। তুমি শেফালি-মাকে বলবে, আমি ফিরে এসে সব জানাব।’ পা বাড়াল নবকুমার।

পুলিশ ভ্যান চলে যাওয়ার পরে জায়গাটা একদম স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। এই রাত্রেও একটা ট্যাক্সি ঢুকল গলির ভেতর।

‘তোমার পকেটে মাল আছে গুরু?’ হাঁটতে-হাঁটতে ছেলেটা জিজ্ঞাসা করল। খেয়াল হল নবকুমারের। ইতিকে পৌঁছে দিতে সে টাকা নিয়ে বেরুবার কথা ভাবেনি। মাথা নাড়ল নবকুমার।

‘এই রে! অনেকটা হাঁটতে হবে তাহলে। নইলে এই ট্যাক্সিটা ধরা যেত।’

‘এখন বনধ নেই?’

‘সকালে শুরু হয়েছিল, এখন সব বনধ আলগা হয়ে গিয়েছে।’

একটা রিকশাওয়ালাকে পাকড়াও করল ছেলেটা, ‘অ্যাই, থানায় যাব আর আসব, কত নিবি?’

রিকশাওয়ালা যা বলল তা শুনে ছেলেটা হাসল, ‘তাহলে যাব আর তোর রিকশায় আসব না। তোকে থানায় ঢুকিয়ে দেব।’

দরাদরি করে রিকশায় উঠল ছেলেটা। পাশে বসে নবকুমার বলল, ‘বাড়িতে ফিরে এসে ভাড়াটা দিলে হবে না?’

‘কেন হবে না! ওটা আমি ম্যানেজ করে দেব। কিন্তু গুরু, দূর থেকে বডি দেখে তুমি হঠাৎ খেপে গেলে কেন?’

রিকশা ছুটছিল। হাওয়া লাগছিল শরীরে। নবকুমার মাথা নাড়ল, ‘হয়তো আমি ভুল করছি। যদি ভুল করি তাহলে আমি খুব খুশি হব।’

‘ভুল করলে খুশি হবে? যা: শালা! এরকম কথা জিন্দেগিতে শুনিনি। লোকটাকে তুমি চিনতে পেরেছ?’ ছেলেটা সিগারেট ধরাল।

‘না। কিন্তু—।’

ছেলেটা আর কথা বাড়াল না।

এখন অনেক রাত। কলকাতার রাস্তা এত শুনশান সাধারণত থাকে না। বনধ-এর জন্যে বাস ট্যাক্সি না বের হওয়ায় রাতের কলকাতা ঘুমোচ্ছে। তাই শূন্য পথ দিয়ে রথের মতো ছুটে এসে থানার সামনে থামল রিকশা। দুটো ভ্যান এবং একটা জিপ দাঁড়িয়ে আছে।

ছেলেটা বলল, ‘থানায় ঢুকবে না।’

‘তাহলে?’

‘একটু দেখা যাক।’ উলটোদিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওরা দেখল, থানায় কোনও ব্যস্ততা নেই। একটা সেপাই এগিয়ে এল। তখনও খোলা সিগারেটের দোকান। এসে বলল, ‘থানার সামনে বলে সারাদিন খোলা রেখে বেশ ব্যাবসা করলি।’

দোকানদার বলল, ‘ধুর! কাস্টমার কোথায়? বসে মাছি তাড়াচ্ছি। নিন।’

সিগারেট এগিয়ে দিল দোকানদার। পাশে ঝোলানো নারকেল দড়ির আগুনে সিগারেট ধরিয়ে সেপাই বলল, ‘শালা, মরার আর সময় পেল না।’

‘কে?’ দোকানদার তাকাল।

‘আমি জানব কী করে? সোনাগাছির রাস্তায় যার ডেডবডি পড়ে থাকে তার পরিচয় জানার কী দরকার।’

‘কীভাবে মারা গেল দত্তদা?’

‘বোম খেয়েছে। সমাজবিরোধী। শালা এখন মর্গে ছুটতে হবে।’ সিগারেট টানতে-টানতে লোকটা বলল।

কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল ওরা। ছেলেটা নীচু গলায় নবকুমারকে বলল, ‘আমি যা বলব তুমি তাতে সায় দেবে। বুঝলে?’

নবকুমার কিছু বলার আগে ছেলেটা এগিয়ে গেল। সেপাই-এর সামনে গিয়ে বলল, ‘নমস্কার। আপনি কি দত্তদা?’

সেপাই অবাক হল, ‘হ্যাঁ। কী ব্যাপার?’

‘জগৎদা আপনার কাছে আমাদের পাঠাল।’

‘জগৎদা?’

‘আমাদের পার্টির।’

‘ও হ্যাঁ। জগৎদা আমার কাছে আপনাদের পাঠাল? কী ব্যাপার?’

‘জগৎদা বললেন, বড়সাহেবদের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। তোরা দত্তদার কাছে যা।’ ছেলেটা হাসল।

‘ও। তা সমস্যা কী?’

‘ওই যে, ওর নাম বাবু। ওর মা খুব কান্নাকাটি করছে। ওর দাদা আজ সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল আর ফেরেনি।’

‘তা আমি কী করব? ভেতরে গিয়ে ডায়েরি করো।’

‘তাই করত ও। কিন্তু একটু আগে একজন এসে বলল, ওর দাদা মার্ডার হয়ে গিয়েছে। মাকে খবরটা দিইনি। জগৎদা বললেন, সত্যি কি না আপনার কাছ থেকে কনফার্ম করতে।’

‘মার্ডার? কোথায় মার্ডার হয়েছে? সোনাগাছিতে?’

‘তা জানি না।’ ছেলেটা ঘুরে দাঁড়াল, ‘এই, তোর দাদা কি সোনাগাছিতে যেত? সত্যি কথা বল।’

নবকুমার ঘাবড়ে গিয়ে মাথা নেড়ে না বলল।

সেপাই সিগারেট মাটিতে ফেলে বলল, ‘একটাই মার্ডার হয়েছে। সোনাগাছিতে ডেডবডি পাওয়া গিয়েছে।’

‘তার নাম কী?’

‘নাম জানি না। ওই গাড়িতে বডি আছে এখনও। দরজা খুলে চটপট দেখে নাও। সাহেবরা যেন না দ্যাখে। জগৎদা পাঠিয়েছে বলে—।’ কথা শেষ করল না সেপাই।

ছেলেটা ইশারায় ডাকল নবকুমারকে। যে ভ্যানটার দিকে তারা এগিয়ে যাচ্ছিল সেটা নয় পরেরটা, জানিয়ে দিল সেপাই পেছন থেকে। দরজাটা টানতেই খুলে গেল। ভেতরটা অন্ধকার।

ছেলেটা বলল, ‘মুখ দেখা যাচ্ছে না দত্তদা।’

সেপাই উঠে গেল ভ্যানের ভেতরে। পকেট থেকে লাইটার বের করে আলো জ্বালল লোকটা, ‘দেখে নাও।’

দেখা মাত্রই অসাড় হয়ে গেল নবকুমার। পাজামা পাঞ্জাবি পরা ছোটখাটো চেহারা দেখে দূর থেকে তার সন্দেহ হয়েছিল। এখন ভ্যানের মধ্যে পড়ে থাকা রক্তাক্ত এই শরীরটা তাকে বলল, সে ভুল করেনি। ছিটকে সরে গিয়ে রাস্তায় উবু হয়ে বসে পড়ল সে। এবং তখনই শরীর কাঁপিয়ে কান্না ছিটকে উঠল গলা দিয়ে।

কিন্তু তাকে টানতে লাগল ছেলেটা। ভ্যান থেকে সেপাই বেরুনোর আগেই তাকে টেনে নিয়ে এল রিকশাওয়ালার কাছে। জোর করে তাকে তুলে সে রিকশাওয়ালাকে বলল, ‘জলদি চালাও।’

ছুটল রিকশা। ছেলেটা ধমকাল, ‘তুমি কি পাগল! লোকটা তোমার চেনা জানলে পুলিশ তোমায় কী হয়রানি করবে তা বুঝতে পারছ না? কে হয় তোমার?’

‘কেউ না।’ গলা জড়িয়ে গেল নবকুমারের।

‘তাহলে কাঁদছ কেন?’ ঝাঁঝিয়ে উঠল ছেলেটা।

ঢোঁক গিলল নবকুমার। মাস্টারদা মরে গেল? তার কাছ থেকে বেরিয়ে মানুষটা মরে গেল!