Course Content
একাত্তরের দিনগুলি – জাহানারা ইমাম
একাত্তরের দিনগুলি – জাহানারা ইমাম
0/142
একাত্তরের দিনগুলি – জাহানারা ইমাম

১৮ জুলাই, রবিবার ১৯৭১

১৮ জুলাই, রবিবার ১৯৭১

শরীফের দাঁতে ভীষণ ব্যথা হয়েছে। সন্ধ্যাবেলা ওর জন্য পিপাস্ রান্না করছিলাম। উস্কখুষ্ক চুল নিয়ে ফকির এসে হাজির, ভাবি, ময়মুরব্বিদের দোয়া ছিল, তাই অল্পের জন্য বেঁচে গেছি।

কি ব্যাপার? কোথায় কি হলো?

জীবনে এই প্রথম চোখের সামনে গেরিলা অপারেশান দেখলাম।

বলেন কি? দাঁড়ান, দাঁড়ান, এক্ষুণি শুরু করবেন না। চুলো থেকে হাঁড়িটা নামিয়ে আসি।

বিকেলবেলা জিন্না এভিনিউতে গিয়েছিলাম একটা কাজে। গ্যানিজের দোকানটা আছে না? ওইখানে কয়েকজন বিচ্ছ গুলি আর গ্রেনেড ছুড়ে কয়েকটা পুলিশ মেরে দিয়ে চলে গেল। উঃ, কি সাহস ছেলেগুলোর। একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে, বুঝলেন?

উত্তেজনায়, আনন্দে ফকিরের চোখ চকচক করছে। সারামুখ লাল টকটকে। শরীফ দাঁতের ব্যথা ভুলে সোজা হয়ে বসে জিগ্যেস করল, আঃ আরেকটু খুলে বল না। কয়টা ছেলে ছিল? কিসে করে এসেছিল?

অত কি গুনেছি? দুটো তো দেখলাম হাতে স্টেনগান বা মেশিনগান ঐরকম কিছু একটা হবে। দোকানের ভেতরে ঢুকে গেল আর ব্রাশ ফায়ারের শব্দ শুনলাম। একটা গ্রেনেড়ও ফাটিয়েছে। গাড়ি একটা ছিল বটে, কিন্তু ঠিক গ্যানিজের সামনে তো দেখি নি। সামনে মনে হয় একটা মোটরবাইক ছিল, একটা ছেলেও যেন বসে ছিল বাইকটাতে।

আমি বলে উঠলাম, একটা কথা যদি ঠিক করে বলতে পারেন! খালি মনে হয় আর যেন!

জামী বলল, মা তুমি কিন্তু চাচার ওপর অবিচার করছ! তখন মেশিনগান থেকে লাশ ফায়ার হচ্ছে, পুলিশ মরছে। রাস্তার লোকজন ছুটে পালাচ্ছিল নিশ্চয়। তাই না চাচা? আপনি তখন কি করলেন? ছুটে পালাননি কোথাও? ফকির সোফায় হেলান দিয়ে বললেন, পালিয়েছিলাম তো বটেই। ওরকম অবস্থায় কেউ দাড়িয়ে থাকে গোরস্থানে যাবার জন্য? গ্যানিজের দুটো দোকান পরে সিঁড়িঘর ছিল একটা সেইখানে ঢুকে সিঁড়ির নিচে লুকোই। আমার সঙ্গে আরো অনেকে।

শরীফ আবার জিগ্যেস করল, কজন লোক মরেছে, জানতে পেয়েছ?

না, ছেলেগুলো চলে যাবার পর তাড়াতাড়ি ওখান থেকে পালিয়ে আসি। তক্ষুণি তো মিলিটারিতে ভরে যাবে জায়গাটা। তবে আসার সময় দেখলাম গ্যানিজের দরজার সামনে কয়েকটা মিলিশিয়া পড়ে আছে।

এখন মুখরোচক বিষয়, আলাপ-আলোচনা করতে করতে কোথা দিয়ে দুই ঘণ্টা উড়ে গেল। গেরিলারা আজকাল বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতেও প্রায় প্রায়ই বোমা ফাটিয়ে যাচ্ছে এত কড়া পাহারা সত্ত্বেও। কি করে করে ওরা? জানের ডর বলে কিছু নেই বোধ হয়। জীবন মৃত্যু পায়ের ভূত?

রাত প্রায় দশটা। ফকিরসহ আমরা সবাই মিলে শরীফের জন্য রান্নাকরা পিপাস্ খেলাম খুব তৃপ্তি করে।