ঢেউ আসে ঢেউ যায় – সুচিত্রা ভট্টাচার্য

কোনার্ক ও মধুময় : এক

ট্যুরিস্ট বাসে পর পর সিট পাওয়া গেছে। সামনে মিত্রা পুলু, মাঝে অন্তু টুটুল জয়া, তারপর শুভ্র বন্দনা, শেষে আমি। এমনটাই হয়, বেড়াতে বেরোলে সব চেয়ে ওঁচা জায়গাটা আমার জন্যই বরাদ্দ থাকে। এর ব্যত্যয় ঘটলেই আমি অবাক হই।

তবে এই সিটটার একটা অদ্ভুত প্লাস পয়েন্ট আছে। জানলা পাওয়া গেছে। এটুকুও না’ও জুটতে পারত।

আমার পাশে এক মাঝবয়সী লোক। শিক্ষিত চেহারা, চোখে হাই পাওয়ারের চশমা, পোশাক আশাকেও বেশ আভিজাত্য আছে। একটাই দোষ। ঘন ঘন নস্যি নিচ্ছে লোকটা, ছিটে ওড়াচ্ছে। বাপস্ কী ঝাঁঝ, এক্ষুনি আমার একটা হাঁচি হবে। হলও। একটা নয়, চলল পর পর কয়েকটা। মাথার ঘিলু চলকে গেল। শুভ্র সিটের ফাঁক দিয়ে ঘুরে তাকিয়েছে,–এই গাড়োল, হচ্ছেটা কী? ভদ্রলোকেদের সঙ্গে যাচ্ছিস, সভ্য-ভব্যের মতো হাঁচ্। নিদেনপক্ষে একটা রুমাল চাপ্ নাকে

ঝকঝকে সকালটা বিস্বাদ হয়ে গেল। বন্ধুরা কি চিরকাল আমার সঙ্গে এই ভাষায় কথা বলবে? আমি অভব্য গাড়োল, আর যে লোকটা সবার অসুবিধে করে নাকে নেশা ঠুসছে সে হল ভদ্রলোক?

জোর করে হাসি ফোটালাম,—হেহ্, আমার কাছে রুমাল! ল্যাঙোটের আবার বুকপকেট!

বন্দনা কটমট তাকাল। শব্দগুলো কি ওর কানের পর্দায় বিঁধল? আহা, মধুময় যেন জানে না শুভ্র তোমার ওপর চোটপাট করার সময়ে কী ভাষা ব্যবহার করে!

হাতের পিঠে নাক মুছে বাইরে চোখ মেললাম। হু হু হাওয়া আসছে জানলা দিয়ে। পথের ধারে লাইন দিয়ে এক ধরণের গাছ। কাজু না? দিঘায় অন্তু আমায় দেখিয়েছিল? আজ আকাশে ভাসা ভাসা মেঘ, কাজুবনে কী সুন্দর হাল্কা ছায়া! এই রাস্তার নাম মেরিন ড্রাইভ রোড, আমি জানি। রাস্তাটাও প্লেন, একদম ঝাঁকুনি টাকুনি নেই। ভাগ্যিস নেই, থাকলে নাড়িভুড়ি চটকে যেত! একদম চাকার মাথায় সিট। মাঝে মাঝে বালিয়াড়ি আসছে, তারপর আবার সবুজ, আবার সবুজ। মনের তেতো ভাবটা কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সারা বছর ধরে কেন এমন বেড়ানো হয় না?

আর মাত্র কটা দিন, তারপর আবার গয়ংগচ্ছ। সেই ঘুম থেকে উঠেই কারখানায় ছোটা, টিফিনে বাড়ি এসে বউদির বিরস মুখ দেখতে দেখতে চাট্টি ভাত গিলে যাওয়া, ফেরা সেই সন্ধের পর। হরেনদা টা খাটায়ও খুব, রস নিংড়ে নেয়। তা নিক, কাজকে মধু নন্দী ডরায় না। শুধু কারখানাটা যদি আরেকটু ভাল হত, যদি একটু আলো বাতাস ঢুকত, হরেনদার মুখের বুলিগুলো যদি একটু অন্য রকম হত, কটা টাকা যদি আরও বেশি দিত…..!

এত চাওয়ার সময় এখন নয় রে মধুময়। এই মুহূর্তটা নিয়েই বাঁচ্ এখন। একটা গান কুনকুন করে উঠছে বুকে। ঘোড়ে জ্যায়সি চাল, হাতি জ্যায়সি দুম্, ও শাওন রাজা কাঁহা সে আয়ে তুম্….। গাই গলা ছেড়ে? থাক, শুভ্র এক্ষুনি চেঁচিয়ে উঠবে, অ্যাই গাধা, ফাল্গুনে তুই শ্রাবণ পেলি কোত্থেকে! গান মনে এলে দিন মাস অত খেয়াল থাকে নাকি? শ্রাবণ মাসে যদি গানটা না মনে পড়ে! ঠিক আছে, একটু গলা নামিয়েই নয় গাই। কী আর হবে? বড় জোর বন্ধুদের আওয়াজে বাসসুদ্ধু লোক হাসবে! এই মাগ্‌গিগণ্ডার বাজারে ক্লাউন সেজে মানুষকে হাসাতে পারাটাও তো মহাপুণ্যের কাজ।

টুটুল বাবা মা’র পাশ থেকে উঠে আসছে। টলমল পায়ে। জয়া হাত ধরে এগিয়ে দিচ্ছে মেয়েকে,—মধুদা, আপনার কাছে যাবে বলে বায়না ধরেছে।

ধরবেই তো, আমি যে টুটুলের বেস্ট ফ্রেন্ড। শিশুদের মনে প্যাঁচ পৌঁচ থাকে না, ওদের সঙ্গে আমার বেশ বনে। আয় মামণি আয়।

হাঁটুর ওপর বসল টুটুল। পাশের লোকটা একটু বিরক্ত যেন। হবেই তো, সভ্যভদ্র লোক, সামান্যতম অসুবিধে সহ্য করতে পারে না।

ঘাড় ঘোরালাম,—কিছু বলবেন?

অড়ি বড়ি করে কী যেন বলল লোকটা। ইংরিজি, না তেলেগু? গম্ভীর মুখে বললাম, –একটু মেরে বসুন, চিলড্রেন আছে।

লোকটা কী বুঝল কে জানে, উদাস হয়ে গেল।

টুটুলের কানে কানে বললাম,—দেখলি, ভয় পাইয়ে দিলাম কেমন?

—কেন ভয় পাওয়ালে গো?

—ইচ্ছে হল।

—কেন ইচ্ছে হল?

ঠোঁটে এসে গিয়েছিল, মুখোশ পরা ভদ্রলোকদের ভয় দেখাতে আমার ভাল লাগে, গিলে নিলাম কথাটা। হাসতে হাসতে বললাম,—ওরে মামণি, সব প্রশ্নেরই যদি উত্তর দিতে পারতাম, তবে তো আমি তোর বাবার মতো প্রফেসার হতাম! ক্লাস নাইনে তিন বার গাড্ডু খেতাম না, বিনয় স্যার কথায় কথায় আমায় মুরগি করে রাখত না….

—মুরগি করা কী গো মধুকাকা?

মনে মনে বললাম, আমাকে তোর বাবা মায়েরা এখনও যা করে। মুখে বললাম, –ও আছে একটা প্যাঁচ। হাত দুটোকে হাঁটুর মধ্যে দিয়ে গলিয়ে, মাথা ঝুঁকিয়ে, উবু হয়ে বসে….

—আমায় শিখিয়ে দেবে? আমিও মুরগি হব।

—রাম কহো! তুমি কোন্ দুঃখে মুরগি হবে মামণি? তুমি এখনই কত কী শিখে গেছ, এ বি সি ডি, ওয়ান টু থ্রি, হাট্টিমাটিম টিম….

—ওগুলো শিখে গেলে বুঝি মুরগি হওয়া যায় না?

কঠিন প্রশ্ন। মেয়েটা ভারি ব্রিলিয়ান্ট, প্যাঁচ কষে কষে এমন প্রশ্ন করে, উত্তর খুঁজে পাওয়া ভার। জয়া অন্ত কি প্রশ্নের গুঁতো সামলাতে না পেরেই এখানে পাঠিয়ে দিল?

টুটুলের পেটে আলগোছে কাতুকুতু দিলাম, হি হি হেসে উঠল টুটুল। আরেকটু কাতুকুতু, হাসছে খিলখিল। হেসে একেবারে যাকে বলে কুটিপাটি। ঠিক জয়ার মতো হাস্যমুখী হয়েছে টুটুল, ভারি মিষ্টি, ভারি মিষ্টি।

জয়াটা খুবই ভাল মেয়ে। অন্তু সত্যিই লাকি, ওর বউটাই সবার সেরা। জয়াকে দেখলেই আমার মা’র কথা মনে পড়ে যায়। ঠিক যেন মা’র মতো করেই কথা বলে জয়া, হাসে, বকে…. জয়ার ধমক শুনলেও গা চিড়বিড়িয়ে জ্বলে ওঠে না। সুন্দর তো বন্দনাও, তবে বড্ড কাঠ কাঠ। প্রাণহীন প্রতিমার মতো। মুখটিও সর্বক্ষণ ভেটকে আছে, ঠিক যেন আমার বউদিটি। ছটার জায়গায় সাতটা রুটি খেলেই কপাল জুড়ে ভাঁজ, এত যে গিলছ, আটার দামের খবর রাখো! মিত্রা আবার যেন কেমন কেমন। দেখতে বেশ, লম্বা চওড়া ফর্সা। আমার মা ছিল ছোট্টখাট্টো, নরম সরম, এত বড়সড় চেহারার মেয়ে দেখলে আমার যেন কেমন অস্বস্তি হয়। যেন অনেক দূরের কেউ, আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। মিত্রাকে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি, চোখাচোখি হলেই বুক ধড়ফড়। কেন এমন হয়?

কথা বলতে বলতেই টুটুল ঢুলতে শুরু করেছে। আর প্রশ্ন করবে কি, গায়ে ফুরফুরে হাওয়া লাগতেই মেয়ের দম শেষ। কিচ্ছু দেখছে না, কত সুন্দর সুন্দর সব বালিয়াড়ি চলে যাচ্ছে পর পর। ওই তো একটা, ঠিক যেন উটের কুঁজ।

বুকটা কেঁপে উঠল। অমনই এক বালিয়াড়ির ওপারে কাল বসে ছিল ওরা দুজন। পুলু আর মিত্রা। শুভ্র অন্তু কাল হোটেল থেকে বেরোলই না, জয়াও হোটেলে রয়ে গেল, আর বন্দনা তো কাল সারাদিন বিছানায়। এমনকি টুটুলেরও মুড খারাপ, ঘ্যানঘ্যান করছিল, অন্তুর কাছ থেকে নড়লই না। আমারও যে খুব বেরোনোর ইচ্ছে ছিল তা নয়, পুলুর টানাটানিতেই অগত্যা….।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা সমুদ্রের পাড়ে। পুলু হঠাৎ উশখুশ করতে শুরু করল। আচমকা মিত্রা বলল,—মধুদা, একটা কাজ করে দেবেন? প্লিজ যদি কিছু মনে না করেন….

মধুর মনে করায় কার কী এসে যায়! বন্ধু বা বন্ধু পত্নীদের হুকুম তামিল করাই তো তার ভবিতব্য। বললাম, –বলো, কী করতে হবে?

—আমার জন্য একটা মাথা ধরার ট্যাবলেট এনে দেবেন?

দুম করে ছবিটা আমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে গেল। একা দুজনে বেরোলে খারাপ দেখায়, তাই আমাকে সঙ্গী করা হয়েছে! এখন আমিই কাবাবমে হাড্ডি। অথচ মিত্রা যখন বলছে, মুখের ওপর না বলাও যায় না।

কাঁধ ঝাঁকালাম,—যাচ্ছি। ….তোমরা এখানেই থাকবে তো?

—না থাকলে খুঁজে নেবেন। কি, পারবেন না?

ওষুধের দোকান সমুদ্র থেকে বেশ খানিকটা দূর। ক’পা হেঁটেই কী যেন একটা বিক্রিয়া ঘটল আমার মধ্যে, থেমে গেলাম। কেন আমি এইভাবে বক্রা বনব বার বার? কী এমন নিষিদ্ধ কাজ করবে পুলুরা, যে আমি সেখানে অবাঞ্ছিত? না হয় একটু দূরেই বসতাম আমি, সমুদ্রের ঢেউ গুনতাম।

একটা অন্য মধুময় আমায় তাড়িয়ে নিয়ে চলল অন্য পথে। সমুদ্রতীরে ভিড়ভাট্টা ভালই, তাদের আড়ালে গা ঢাকা দিলাম আমি। গোয়েন্দার চোখে নজর রাখছি কোন্ দিকে যায় যুগলে। আগের দিন কিছু না ভেবেই ওদের পিছু নিয়েছিলাম, কিন্তু কাল আমি ছিলাম অতি সতর্ক, এবং সচেতন। হওয়ার প্রয়োজনই ছিল না, ওরা হাত ধরাধরি করে হাঁটছে, ফিরেও তাকাচ্ছে না, আমার দিকে তাকানোর ওদের অবকাশ কই! নির্জন জায়গা দেখে বসল দুজনে। ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ওরা। আরও ঘনিষ্ঠ! পুলুর ঠোঁট মিশে গেল মিত্রার ঠোঁটে!

আমার শরীরে আগুন জ্বলে উঠল। এক তীব্র আগুন, যা দিয়ে গোটা পৃথিবীকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া যায়। দেহ জুড়ে পাল পাল বুনো জন্তু গরম নিশ্বাস ছড়াচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে জিভ টাগরা কণ্ঠনালী। কেন আমিই থাকব চিরকাল বঞ্চিতের দলে? মাত্র বারোশো টাকা মাইনে পাই বলে? ইস্কুলের গণ্ডিটাও পার হতে পারি নি, তাই? সবটাই কি আমার দোষ? বাপ মা মরা ভাইকে গরুর মতো খাটাত দাদা বউদি, নিজে মাস্টার হয়েও জন্মে কখনও আমাকে পড়া দেখিয়ে দেয় নি, এক পয়সা খরচ করে নি আমার জন্য। হ্যাঁ, মাথা আমার একটু মাটো ছিল বটে, কিন্তু মাধ্যমিকটাও কি আমি উৎরোতে পারতাম না? একটু সাহায্য পেলে? উল্টে দাদা গল্প চাউর করে দিল, ছোটবেলায় মেনিনজাইটিস হয়ে ভাইটা আমার নিরেট হয়ে গেছে!

আশ্চর্য, বন্ধুরাও কথাটা গিলে নিল!

সেই বন্ধুরা এখন সুখে ঘরকন্না করছে। মিত্রাকে চুমু খাচ্ছে পুলু!

শরীরে আগুন নিয়েই সরে এলাম আমি। চাবুক খাওয়া কুকুরের মতো যন্ত্রণাটা তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে আমাকে, তখনই একবার ফিরেছিলাম পুলুদের দিকে। আর দেখা যাচ্ছিল না পুলুদের, ওরা তখন বালিয়াড়ির ওপারে। ঠিক ওই রকমই এক বালিয়াড়ি, উটের কুঁজের মতো।

কতক্ষণ পর আবার এলাম সমুদ্রতীরে? আধ ঘণ্টা? এক ঘণ্টা? সময়ের হিসেব ছিল না। গোটা পাড় জুড়ে তখন ঘন অন্ধকার।

ট্যাবলেট বাড়িয়ে দিলাম মিত্রাকে। ঠাণ্ডা গলায় বললাম,—ধরো।

মিত্রার মাথা তখনও পুলুর বুকে, পুলুর হাত মিত্রার কাঁধে। আমাকে দেখেও একটু সরে বসে নি ওরা।

ওষুধটা হাতেই নিল না মিত্রা। মুচকি হেসে বলল,ওটা আপনার পকেটেই রেখে দিন। এখানে জল কোথায় যে খাব?

বটেই তো, জল আনাটাও তো মধুময়েরই কর্তব্য ছিল! এই সমুদ্র কিনারে। আরও ঠাণ্ডা গলায় বললাম,—চাঅলা ডাকব? চা দিয়ে খাবে?

পুলুর বোধহয় আমায় দেখে করুণা হল। মিত্রার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, ছেড়ে দে।

—কিন্তু মিত্রার মাথা ধরা?

—উবে গেছে। চুপ করে বোস্‌, সমুদ্র দ্যাখ।

এই পুলু আমার বন্ধু! এরকমই বন্ধুর সঙ্গের জন্য লালায়িত থাকি আমি। কেন থাকি? এরা আমার চেয়ে সফল বলে? নাকি আমি এদের মতো হতে চাই বলে? কেন আমি মিত্রার মতো একটা বউ পাব না, একটা নিখাদ মেয়েমানুষ?

—কী রে, টুটুল কি ঘুমিয়ে পড়ল?

অন্তুর ডাকে ভাবনা ছিঁড়ে গেল। পলকে ঢুকে পড়েছি চেনা মধুর খোলসে। হেসে বললাম, – হ্যাঁ রে, এক্কেবারে কাদা।

সামনে থেকে বন্দনা বলে উঠল,—ওকে আমার কাছে দিয়ে দিন।

টুটুল সরে যেতে ভার খানিকটা লাঘব হল। জয়ার হাতে চায়ের ফ্লাক্স, ভায়া শুভ্র আমার কাছে পৌঁছে গেল। ঢেলেছি ঢাকনা-কাপে, চুমুক দিচ্ছি সড়াৎ সড়াৎ। ভাল লাগছে বেশ, মাথা হাল্কা হচ্ছে। নাহ্, এই জন্যই জয়াটা সেরা বউ।

শুভ্র ঘাড় হেলাল,—আস্তে খা। অত শব্দ করছিস কেন?

—বা রে, চা খেলে শব্দ হবে না?

—আমাদের হয়?

লে হালুয়া, আমি আর তোরা সমান? নিঃসাড়ে কোন্ কাজটা করতে পারি আমি, তোদের মতো? প্রেম হিংসে আর স্বার্থপরতার খেলা যদি আমিও চুপিসাড়ে চালাতে পারতাম?

একটা তালঢ্যাঙা লোক ড্রাইভারের কেবিন থেকে গেটের মুখে এসে দাঁড়াল। হাতে মাউথপিস, কোনার্ক মন্দিরের জন্ম ইতিহাস শোনাচ্ছে। যত্ত সব ভ্যাজার ভ্যাজারং। বাসসুদ্ধ লোকের আক্কেল দ্যাখো, ইস্কুলের ছেলেদের মতো হাঁ করে গিলছে! মন্দির কবে তৈরি হয়েছে জেনে পরীক্ষায় বসবে নাকি? পৌঁছলে তো আস্ত মন্দিরটাই দেখতে পাবে।

লোকটাকে একটু ঝেঁকে দিতে ইচ্ছে হল। ইয়া বড় এক হাই তুলে প্ৰশ্ন ছুঁড়লাম,ও মোয়াই, বাইরে কী দারুণ কাজুবাদামের গাছ, সে নিয়ে কিছু বলছেন না যে?

ব্যস্, লোকটা হোঁচট খেয়ে গেল। মুখস্থ বিদ্যে ঘুলিয়ে গেছে। আমতা আমতা করে বলল,—হ্যাঁ, বলছি। ….দু পাশে এই যে গাছপালা দেখছেন, এ সবই উড়িষ্যার জঙ্গলের অংশ।

—যাহ্ বাবা, জঙ্গলে কাজুবাদাম? ….জঙ্গলে বাঘ নেই?

যা ভেবেছি তাই, বাসসুদ্ধু লোক খ্যাঁ খ্যাঁ হেসে উঠেছে। নাহ্, আমার ক্লাউনজন্ম সার্থক।

অন্তু পিছন ফিরে চোখ পাকাল,—একদম কথা নয়, মুখে চাবি এঁটে বসে থাক।

অন্তুর হুকুম, অমান্য করি সাধ্য কি! খরচ খরচা দিয়ে সঙ্গে এনেছে, একটা কৃতজ্ঞতাবোধও তো আছে। যদিও বেগার খেটে উশুল করে দিচ্ছি, তবু….

চুপ করলাম, তো ঘাড়ও সঙ্গে সঙ্গে এলিয়ে গেল। তন্দ্রা ভাঙল চাপা কলরোলে। বাসসুদ্ধু লোকের চোখ ডান দিকের জানলায়, হৈ হৈ করে কী যেন দেখছে!

সেই ব্যাটা মাউথপিস হেঁকে উঠল,—ওই ওই, ওই হল রামচূর্ণী নদী। ওই নদী তিন ভাগে ভাগ হয়ে সমুদ্রে মিশেছে। তাকিয়ে থাকুন, এক্ষুনি মোহনা দেখতে পাবেন।

উঁকিঝুঁকি দিয়ে হতাশ আমি,—দূর মশাই, ও নদী কোথায়, ওটা তো একটা খাল। সমুদ্রের ঢেউগুলো খালে ঢুকছে।

আবার বাস জুড়ে হাসির রোল।

শুভ্র ধমকে উঠল,অ্যাই পাঁঠা, ওটা খাল নয়, নদী। সাগরে গিয়ে পড়ছে।

কী অন্যায় কথা, মিত্রার পর্যন্ত হাসি থামছে না।

ক্লাউনেরও বোধহয় বিরক্তি আসে। ঝেঁঝে উঠে বললাম, –যা খুশি বোঝালেই হল? আমি কি দেখতে পাচ্ছি না ঢেউগুলো এক পাল শুশুকের মতো খালে চলে আসছে?

—আইব্বাস্, তুই যে কবিতা আওড়াচ্ছিস রে!

সকলের দেখার চোখ কি এক ছাঁচে ঢালা হয়? আমার যেমনটা মনে হয়, তেমন আমি বলতে পারব না?

কথা বাড়ানোর আর প্রবৃত্তি হল না। ফিরে গেলাম পুরনো পোজে। ঘুমই ভাল, ঘুমেই শান্তি।

এক সময়ে কোনার্ক এসে গেল।

হাই তুলতে তুলতে বাস থেকে নামলাম। টুটুলও জেগে গেছে, সে এখন শুভ্রর সঙ্গী। পাশেই হোটেল, বেলা বেড়েছে, অন্তু সেখানে ভাতের অর্ডার দিতে গেল। আমি জয়া আর বন্দনা পাশাপাশি চলেছি, সামনে মিত্রা আর পুলু যথারীতি আলাদা আলাদা।

কোথথেকে গোটা তিন চার গাইড এসে ছেঁকে ধরল। পঞ্চাশ টাকা দিলে মন্দিরের ইতিহাস ভূগোল সব বুঝিয়ে শুনিয়ে দেবে। শুভ্র তাদের পাত্তাই দিল না, ওর কোনার্ক ঘোরা আছে, গাইডের ভূমিকাটা নাকি নিজেই নিতে পারবে।

বন্দনা দু পা হেঁটেই কাহিল, বসে পড়ল গাছের ছায়ায়। অন্তু চলে এসেছে, হাঁ হাঁ করে ছুটে গেল,—কী হল? আবার শরীর খারাপ লাগছে?

বন্দনা মাথা দোলাল। নিশ্বাস ফেলছে জোরে জোরে।

অন্তু অসহায় চোখে তাকাল আমাদের দিকে,–এই, আমি একটু বন্দনার সঙ্গে বসি, তোরা ঘুরে আয়।

জয়াও ওমনি ঝুপ করে বসে পড়ল,—আমিও বাবা তাহলে একটু রেস্ট নিই।

অন্তু বলল, – আহা, তোমরা যাও না। স্কালপচারগুলো দেখে এসো। মারভেলাস, চোখ ফেরাতে পারবে না।

শুভ্র চোখের কোণ দিয়ে বন্দনাকে জরিপ করছিল। হঠাৎ গম্ভীর স্বরে বলল,—চলো জয়া, বন্দনাকে ভাল করে রেস্ট নিতে দাও।

কী একটা যেন নাটক চলছে! পাত্রপাত্রীরা কে কোন্ ভূমিকায় অভিনয় করছে ঠিক ধরা যাচ্ছে না, কিন্তু নাটক একটা চলছেই।

শুভ্র-জয়ার পিছন পিছন চলেছি আমি। টুটুল দৌড়ে দৌড়ে একবার শুভ্র জয়ার কাছে যাচ্ছে, একবার ফিরে আমার কাছে। এখনও তার প্রশ্নের শেষ নেই! চাকাগুলো অত বড় বড় কেন গো? এত এত পাথর এল কোথেকে? কে পাথর কাটল গো? সূর্যকে কেন পুজো করে, সূর্য কি ভগবান?

সাধ্য মতো উত্তর দিচ্ছি। হাঁটছি। দেখছি পাথরে খোদাই করা সার সার মূর্তি। কী অসভ্য ভঙ্গি সব! ওই ভাবে কি রমণ করে নারীপুরুষ? ভাগ্যিস টুটুল পাশে আছে, জয়া মিত্রারা কেউ থাকলে ওদিকে তাকানোই যেত না।

শুভ্রর গলা কানে এল,—বুঝলে জয়া, এসব মূর্তি দেখে অনেকে অনেক রকম ধারণা করে। আসলে কাম ক্রোধ লোভ হিংসে সব ত্যাগ করে পবিত্র স্থানে যেতে হয়, তাই মন্দিরের বাইরে এসব….ওই দ্যাখো, একটা হাতির নীচে সিংহ পড়ে আছে, সিংহের নীচে মানুষ, এর মানে কি জানো? মানুষ পরাজিত শৌর্যের কাছে, সেই শৌর্য আবার বিশালত্বের কাছে অসহায়।

জয়া শুনছে মন দিয়ে। ঘাড় নাড়ছে।

জয়ার হাত ছেড়ে টুটুল আবার আমার কাছে এল,—বিশালত্ব মানে কি মধুকাকু?

শুভ্র জয়া ঘাড় ফিরিয়ে হেসে উঠল। শুভ্র বলল, – বিশালত্ব মানে প্ৰকাণ্ড কিছু। এই যেমন তোমার মধুকাকু।

—আর অসহায় মানে?

টুপ করে শুভ্রর মুখ থেকে হাসি মুছে গেল। চোরা চোখে তাকাল জয়ার দিকে, জয়াও। অন্যমনস্ক মুখে আবার হাঁটছে দু জনে। রোদ বেশ চড়া এখন, পায়ের তলার পাথর বেশ তেতে উঠেছে। এক পা এক পা করে উঁচু উঁচু সিঁড়ি ভেঙে মন্দিরে উঠলাম আমরা। তিন দিকে তিনটে সূর্যমূর্তি। নোনা ধরা, ধ্বংসস্তূপের মতো। এই মূল মন্দিরটার সামনে নাট মন্দির, পিছনে সূর্যের স্ত্রী ছায়া মায়ার মন্দির, সবই এখান থেকে স্পষ্ট দৃশ্যমান। পল্লব আর মিত্রা ছায়াদেবী মায়াদেবীর মন্দির ঘুরছে, টুটুল চেঁচিয়ে ডাকল ওদের, ওরা হাত নেড়ে সাড়া দিল। নগ্ন মূর্তির দিকে আঙুল তুলে কী যেন বলল পুলু, মিত্রা মুখে আঁচল চেপে হেসে উঠল।

আমার আর ভাল লাগছিল না। নেমে এলাম পায়ে পায়ে। একা একাই ঘুরছি মন্দিরকে বেড় করে। ওই ছায়া মায়ার মন্দির, ওই নাটমন্দির যেখানে এক সময়ে নাচত দেবদাসীরা, পড়ে থাকা ওই বিপুল ভগ্নস্তূপ, হাতি, সিংহ, রথের চাকা, ওই মৈথুনরত যক্ষ যক্ষিণী—সব মিলে মিশে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে বুকে। বিচিত্র এক অনুভূতি হচ্ছে আমার। এমন এক অনুভূতি যাকে ব্যাখ্যা করার আমার ক্ষমতা নেই, অথচ ছমছম করে ওঠে গা।

হঠাৎ কেন এত ভয় করছে আমার?

দ্রুত পা চালিয়ে ফিরলাম গাছতলায়। বন্দনা ঘাসের ওপর শুয়ে পড়েছে, পাশে চিন্তিত মুখে অন্ত

ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম, – বন্দনা এখন কেমন?

অন্তু মাথা তুলল,—ভাল নয় রে। বলছে ভীষণ মাথা ঘুরছে। বমি বমি ভাবটাও বেড়েছে।

—কী হবে এখন? সারাটা দিন এখনও বাসজার্নি বাকি…..

—তাই তো ভাবছি। ….ভুবনেশ্বর টুবনেশ্বর বাদ দিলে কেমন হয়?

—সে নয় দিলি। কিন্তু ফিরবি কী করে?

—আজ ফিরব না। এখানে পান্থনিবাসে থেকে যাব।

—দ্যাখ, সবাই কী বলে।

কথার মাঝেই টুক টুক করে এসে গেছে শুভ্র পুলুরা। প্রস্তাবটা শুনে পুলু প্ৰায় লাফিয়ে উঠল,—গ্র্যান্ড আইডিয়া। ফালতু ফালতু আরও কটা মন্দির দেখে কী হবে? বন্দনা যেমন নেতিয়ে পড়েছে, ফারদার স্ট্রেইন করাটাও একদম ঠিক নয়।

এখানকার পান্থনিবাসের দারুণ চাহিদা, আগে থেকে বুক না করে এলে জায়গা পাওয়া কঠিন। কপাল ভাল, আজ সকালে কিছু জাপানী ট্যুরিস্ট চলে গেছে, এক রাতের জন্য মিলবে পান্থনিবাস।

হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে পুলুর গলা কানে এল,—ভালই হল, না মিত্ৰা? রাত্তিরবেলা আরেক বার মন্দিরটা দেখা যাবে। চাঁদের আলোয়।

আবার গা ছম ছম করে উঠল আমার। কেন এমন হচ্ছে বার বার?