প্রফেসর সোম – কৌশিক সামন্ত

ক্ষুধা – কৌশিক সামন্ত

“শুনছো! একটু জল খাব।”

“ও মশাই শুনছেন? বলি এখানে খাওয়ার জল কাছাকাছি কোথাও পাওয়া

যায়?”

প্রশ্নটা যাকে করা, তার কোনো বিকার হল না।

“এই বুড়ো! এই নোংরা মাতাল! কথার জবাব দিচ্ছিস না যে বড়ো? জানিস আমি কে?” আর নিজের মেজাজ ধরে রাখতে পারলেন না কার্ল, কার্ল এবসন। হাজার হোক, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার। সিভিলিয়ানদের থেকে অন্তত মিনিমাম রেস্পেক্ট-টা আশা করেই থাকেন। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা এক বুড়ো মাতালও যদি তাঁকে পাত্তা না দেয়, তাহলে মেজাজের আর দোষ কী?

বুড়োর উঁচু হয়ে থাকা পেটখানা লক্ষ্য করে সজোরে একটা লাথি কষিয়ে দিলেন ব্রিগেডিয়ার। ঘোঁত করে একটা বিশ্রী শব্দ করে জেগে উঠল বুড়োটা। তারপর শুরু হল তার অকথ্য ভাষায় শাপ-শাপান্ত। ফলে পরের জোরালো লাথিটা এসে পড়ল চোয়ালে। ফিনকি দিয়ে রক্তের ধারা নেমে এসে বুড়োর নোংরা জামাটাকে আরও নোংরা করে তুলল।

এবারে কার্ল নন। লাথিটা মেরেছিল সার্জেন্ট স্যামুয়েল। সে ব্রিগেডিয়ারের পুত্রসম। সদ্য কেনা নতুন বাড়িতে কার্ল আর তাঁর স্ত্রীকে পৌঁছে দিতে সেই এসেছিল।

“আর একটা খারাপ কথা বলবি তো এই বন্দুকের সবকটা গুলি দিয়ে তোর নোংরা মুখটা পাকাপাকিভাবে সেলাই করে দেব শয়তান বুড়ো!” হুঙ্কার দিয়ে উঠল স্যামুয়েল।

“এমন কানকাটা নির্লজ্জ মানুষ আগে দেখিনি বাপু। এমন লাথি খেয়েও হাসছে!” বললেন ব্রিগেডিয়ার।

“ওর হাসি আমি বন্ধ করে দিচ্ছি।” বন্দুক হাতে নিয়ে পাগলা বুড়োটার দিকে তেড়ে গেল স্যামুয়েল।

“আহ্! একটা নতুন জায়গায়, নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি। সেখানেও অকারণ রক্তপাত, সর্বক্ষণ শুধু বন্দুক আর খুনখারাপি!”

গাড়ি থেকে যিনি নেমে এলেন, তাঁকে দেখে স্যামুয়েলের উদ্যত হাত থেমে গেল। মিসেস জেসমিন এবসন। মিস্টার কার্লের হুঙ্কারও যেন খানিকটা ম্লান হয়ে এল সেই ব্যক্তিত্বময়ীর সামনে।

“কী শুরু করেছ তোমরা? এভাবে বুড়ো মানুষকে কেউ মারধোর করে? আপনি কিছু মনে করবেন না।” এই বলে তিনি সেই ধুলো-বালি আর রক্ত মাখা বৃদ্ধকে হাত ধরে তুলতে লাগলেন।

স্যামুয়েলের হাত নিশপিশ করতে লাগল। কিন্তু কিছু করার নেই। মিসেস এবসনের সামনে স্বয়ং ব্রিগেডিয়ার সাহেবই জুজু হয়ে থাকেন, আর সে তো…

“না মা। আমার লাগেনি। আমার আর লাগে না। এসব আমার গা সওয়া হয়ে গেছে।”

“আমি ওঁদের তরফ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন। আপনার চিকিৎসার প্রয়োজন। আমাদের ভুল শুধরে নেওয়ার একটা সুযোগ দিন প্লিজ।”

“আমি ভিক্ষুক মা। কারো দান নিতে আপত্তি করি না। কিন্তু অবজ্ঞার এক পাত্র জলও আমার কাছে বিষতুল্য। তাছাড়া তোমরা নিজেরাই তো রাস্তা জান না। আমাকে কীভাবে বয়ে নিয়ে যাবে?” বলেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে থাকে বুড়োটা।

“আহ্ জেসমিন! অনেক আদিখ্যেতা করেছ, এবারে গাড়িতে ওঠো। অপাত্রে এভাবে ভালোবাসা দান কোরো না।” বিড়বিড় করে বলে ওঠেন কার্ল।

বুড়োর সামনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন মিসেস এবসন।

“এই টিলাটা পেরিয়ে গেলে সামনে একটা পরিত্যক্ত সরাইখানা পড়বে। ওটাকে বাঁদিকে রেখে ঢাল দিয়ে নেমে গেলেই একটা পাহাড়ি ঝর্ণা দেখতে পাবে। সেখানে প্রাণ ভরে তেষ্টা মিটিও মা। আর ওটা ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলেই তোমরা তোমাদের গন্তব্যের রাস্তা পেয়ে যাবে।”

কী উত্তর দেবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না মিসেস এবসন্। কার্ল এবসন প্রায় জোর করেই তাঁকে ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দেন। স্যামুয়েলও তার ঘোড়াতে চেপে বসে। একরাশ ধুলো উড়িয়ে আবার তাঁদের যাত্রা শুরু হয়।

শুধু মিসেস এবসন, গাড়ির ছোট্ট জানলাটা দিয়ে এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকেন সেই বুড়োটাকে। একইভাবে ফাটা ঠোঁটের রক্ত চাটতে চাটতে দাঁত বের করে হেসে চলেছে বুড়ো মানুষটা।

“মরবি, শালা সবকটা মরবি! কিন্তু তোরা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারবি না তোদের অন্তিম পরিণতি কী হতে চলেছে। খুব তেষ্টা না তোদের! মুক্তির তেষ্টা বুকে নিয়ে মাথা খুঁড়ে মরবি তোরা। কেউ তোদের মুক্তি দেবে না। এমনকি তোদের পরম করুণাময় ঈশ্বরও না!” খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে থাকে বুড়োটা।

হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ার ঝাপটা আসে। বুড়োর অবিন্যস্ত চুলগুলো উড়তে থাকে। দূর থেকে দেখলে অনেকটা মাথার দু-পাশে গজানো দুটো শিঙের মতো দেখতে লাগে। কিন্তু জেসমিনের চোখে অবশ্য কিছুই ধরা পড়ে না। তাঁদের গাড়িটা টিলাটা পেরিয়ে গেছে ততক্ষণে।

.

দুই

“কবরখেকো কোনো এন্টিটির কথা শুনেছ কোনোদিন?”

“অ্যাঁ! কবর?” প্রতি শনিবারের মত আজ বিকেলেও প্রফেসর সোমের বসার ঘরে আড্ডা জমিয়েছিলাম, নতুন গপ্পো শোনার আশায়। সবেমাত্র গরম কাটলেটে কামড় বসিয়েছি। আচমকা এরকম বিচ্ছিরি প্রশ্ন শুনে বিষমই খেয়ে গেলাম।

“আরে! কী হল? এই প্রহ্লাদ! এক গ্লাস জল দিয়ে যাও।” হাঁক পাড়লেন প্রফেসর।

“শুধু জল? আরও দুটো করে কাটলেট দিই?” প্রহ্লাদের সরল প্রশ্ন।

“এই জন্যে প্রহ্লাদকে এত ভালবাসি আমি! কৌশিক, কাটলেটে আপত্তি নেই তো?”

“আজ্ঞে না, খাওয়াদাওয়ায় আমি খুব একটা আপত্তি করি না। সেটা প্রহ্লাদের হাতের বানানো হলে তো কথাই নেই।”

দু’প্লেট কাটলেট আর দু’গ্লাস জল নামিয়ে প্রহ্লাদ চলে গেল। মাঝে অনেকটা গ্যাপ পড়ে গেছিল, তাই আমি আবার প্রশ্ন জুড়লাম

“হ্যাঁ, কী যেন বলছিলেন প্রফেসর? কবরখেকো এন্টিটি বলতে?”

“পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন কিছু-না-কিছু জিনিস পাওয়া গেছে, যারা কবরের ভেতরকার অবশিষ্টের ভরসায় বাঁচে। জিনিস বললাম, কারণ কোথাও সেটা গাছ, কোথাও আবার কোনো বিচিত্র জীব, আবার কোথাও কিছু প্যারানর্মাল এন্টিটি।”

“আপনি নিশ্চয় গাছপালা বা জীব-জন্তু নিয়ে বলবেন না? ওই প্যারানর্মাল ইয়ে নিয়েই…”

সারা ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন প্রফেসর সোম।

“আরে কৌশিক, এই জগতে এমন অনেক কিছু আপাতভাবে নর্ম্যাল বস্তু আছে যারা প্যারানর্মালকেও নিরামিষ বানিয়ে দিতে পারে। তবে হ্যাঁ, আজকের কাহিনি তুমি যা বললে তা নিয়েই। ঘুল ( Ghoul)-এর নাম শুনেছ?”

“ঘুল? আজ্ঞে না। সেটা কী বস্তু?”

“আরব্য রজনীর গল্প পড়া আছে নিশ্চয়? শিশুপাঠ্য সংস্করণ, বা বড়োদের ভার্শন?”

“পড়েছি কিছু-কিছু গল্প। টিভিতেও দেখেছি।

“আরবের পুরোনো, খুব পুরোনো লোককথা থেকেই এই গল্পগুলোর উৎপত্তি। অতটা পুরোনো বলেই হয়তো ওই জিনিসটির বর্ণনা পাই তাতে, নইলে সভ্যভব্য বইপত্র আবার একটু শুচিবায়ুগ্রস্ত হয়। যাকগে। অনেক রকম সংজ্ঞা থাকলেও, পাতি কথায় বলতে গেলে এরা এক ধরনের মনস্টার অথবা ইভিল স্পিরিট, যারা এখনও পুরোপুরি পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারেনি। কবরখানার আশেপাশে এদের অবস্থান। মৃত ব্যক্তির শরীরের গলা পচা অবশিষ্ট থেকেই এরা পুষ্টি সংগ্রহ করে থাকে। পরজীবী টাইপ বলতে পার।”

“এদের সঙ্গে আপনার এনকাউন্টার হল কীভাবে? আরবে গেছিলেন নাকি?”

“না হে। মোলাকাতটা হয়েছিল ইংল্যান্ডের বুকেই।”

“বলেন কী?”

আমাদের হাত খালি হয়েছে দেখে প্রহ্লাদ কফি নিয়ে এসেছিল। তাতে চুমুক দিলাম আমি। প্রফেসর সোম তাঁর রোমহর্ষক আখ্যান শুরু করলেন।

“নাহ্! এটা হতেই পারে না।”

.

তিন

“কেন? কেন হতে পারে না? আপনি কি বলতে চাইছেন, আমি এখানে গাঁজাখুরি গল্প শোনাচ্ছি এতগুলো মানী-গুনী লোকের সামনে?”

“তাতো আমি বলিনি।”

“তাইলে আপনি ঠিক কি বলতে চাইছেন একটু খুলে বলুন মশায়।”

“আপনার বয়স হয়েছে। রাতে কম আলোয় কী দেখতে কী দেখেছেন!”

“মশাই, বয়স আমার হয়েছে ঠিকই। কিন্তু এখনও আমার দৃষ্টিশক্তি আপনার অভিজ্ঞতার থেকে অনেক বেশি স্বচ্ছ।”

“তিন-তিনটে যুদ্ধ লড়ে ফেললাম। আর আজ একজন গ্রাম্য স্কুল শিক্ষকের থেকে আমাকে, এই ব্রিগেডিয়ার কার্ল এবসনকে অভিজ্ঞতার পাঠ নিতে হবে? হাসালেন মশায়।”

তিনদিক পাহাড় আর ছোটো ছোটো টিলা দিয়ে ঘেরা একটা ছবির মতো সুন্দর গ্রাম ব্রিকলে। প্রতিবারের মত এবারেও সপ্তাহান্তে গ্রামের শেরিফ উইলকিনসনের বাড়িতে সান্ধ্য বৈঠকে সামিল হয়েছিলেন গ্রামের পাঁচজন। এমনি দিনে এই আড্ডায় বিষয় হিসেবে যুদ্ধ-রাজনীতি-দর্শন-সিনেমা-নাটক কিছুই বাদ পড়ে না। কিন্তু আজ ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ অন্য রকম। একটা বিষয়কে কেন্দ্র করে তর্কটা ক্রমশ তরজায় রূপান্তরিত হচ্ছিল এক্স ব্রিগেডিয়ার এবসন আর রিটায়ার্ড স্কুলশিক্ষক থমাসের মধ্যে। গৃহকর্তা শেরিফ উইলকিনসন বাধ্য হলেন ব্যাপারটায় হস্তক্ষেপ করতে, নইলে এবারে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।

“আপনারা ছেলেমানুষের মতো ঝগড়া করবেন না। যুক্তিতর্ক দিয়ে কথা বলুন। কিন্তু কেউ কারো মর্যাদায় আঘাত দিয়ে প্লিজ কথা বলবেন না, এটা আমার রিকোয়েস্ট রইল আপনাদের কাছে।”

“আজ এত শোরগোল কেন? কী নিয়ে আবার ক্ষেপে গেলেন বুড়ো খোকারা?”

সবার চোখ দরজার দিকে ঘুরে গেল। স্থানীয় চার্চের পাদ্রি জোসেফ এসেছেন। উনিও মাঝেমাঝে এই সান্ধ্য আড্ডায় যোগদান করে থাকেন।

“এই তো ফাদার এসেছেন। একদম ঠিক সময়ে এসেছেন ফাদার! এই তর্ক থামানোর যোগ্য লোক আপনিই।”

“ধীরে, মাই সন। আগে বলো, সবাই এত উত্তেজিত কেন?”

“আমাদের কার্ল আর থমাসের মধ্যে তর্ক লেগে গেছে একটা বিষয়কে নিয়ে।” বললেন শেরিফ।

“কী নিয়ে? আমাকে বলো। আমি হয়তো সাহায্য করতে পারি।”

“থমাসের বক্তব্য, গতকাল বেশ গভীর রাতে শহর থেকে গ্রামে ঢোকার সময় সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়।”

“তাহলে আমি থমাসের মুখ থেকেই পুরোটা শুনতে চাই।”

“ওকে ফাদার। থমাস, তুমি প্রথম থেকে আবার বলো।”

“গতরাতে শহর থেকে আসতে বেশ দেরি হয়ে গেছিল ফাদার।” বললেন থমাস, “অত্যাধিক তুষারপাতে আটকা পড়েছিলাম। চারদিক একদম শুনশান। কোনো জনমানুষ ছিল না রাস্তায়, আমি আর আমার ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া। তখন রাত এগারোটা। গ্রামে ঢোকার রাস্তায় যে পরিত্যক্ত কবরখানাটা পড়ে, ওখানে এসেই বেশ বিপদে পড়ে গেলাম।”

“কী রকম বিপদ?” ফাদার জোসেফ প্রশ্ন করলেন।

“ঘোড়া দুটো একদম দাঁড়িয়ে গেল। কিছুতেই এগোয় না! যতই ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিই, রেগে চাবুক মারি, এক ইঞ্চিও নড়বে না তারা। গ্রামের মূল ফটক তখনও বেশ খানিকটা দূরে। কাউকে চিৎকার করে যে সাহায্য চাইব, তারও উপায় নেই। হঠাৎ পাশের কবরখানা থেকে একটা আওয়াজ পেলাম। কেউ যেন সরে গেল। এই পথে আমি নতুন নই, তাই হিমেল রাতে নেকড়েদের আনাগোনা আমার ভালোই জানা আছে। ওতে আমি ভয় পাই না। গাড়ি থেকে বন্দুকটা নামালাম। ওরা দলবদ্ধ ভাবে আক্রমণ করতে পারে ভেবে এক হাতে বন্দুক, আর অন্য হাতে লণ্ঠনটা উঁচিয়ে ধরলাম। কার্তুজ ভরে একটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ারও করলাম। সচরাচর দু-একটা ফাঁকা আওয়াজেই ওরা ভেগে যায়। কিন্তু এবার…!”

“এবার?”

“আওয়াজটার পরিমাণ আরও বেড়ে গেল। খসখস করে কেউ বা কারা যেন মাটি খুঁড়ছে। আওয়াজটা পেতেই ঘোড়াগুলো যেন পাগল হয়ে উঠল। আমার অতদিনের পোষা ঘোড়া, কিন্তু আমি নিজেই তাদের আর চিনতে পারছিলাম না, এমন উন্মত্ত দাপাদাপি তাদের! লাগাম ধরে প্রায় ঝুলে পড়েও আমি তাদের আটকাতে পারলাম না। রাস্তার মধ্যে আমাকে একা ফেলে সেদু’টো স্রেফ পালাল।

এবার বেশ ভয়-ভয় করতে লাগল। এতক্ষণ অন্তত দুটো অবলা প্রাণী ছিল আমার সঙ্গে। কিন্তু তখন আমি সম্পূর্ণ একা! আমিও গ্রামের ফটকের দিকে দৌড় লাগাব কি না ভাবছি। হঠাৎ…”

“হঠাৎ?”

“একটা বিশ্রী গন্ধে চারপাশ ভরে গেল। হাতের লন্ঠনের বাতিটা আরও বাড়িয়ে কবরখানার দিকে একটু তুলে ধরতেই যা দেখলাম, বিশ্বাস করুন ফাদার, সেটা বলতে আমার এখনও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। আপনারা হয়তো ভাববেন আমি বানিয়ে বলছি। কিন্তু ঈশ্বরের দিব্যি, আমি যা বলছি তার এক বিন্দুও বানানো নয়।”

“আরে থমাস, তুমি তোমার মতো বলে যাও। বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।”  

“দেখলাম, একটা ভাঙা কবরের পাশে একটা ছায়ামূর্তি বসে আছে। আমি ‘কে?’ বলে চিৎকার করতেই সেটা আমার দিকে ঘুরে তাকাল। ফাদার! কী ভয়ানক তার চেহারা, আমি বোঝাতে পারব না। তার দুটো রোমশ কালো হাতে ধরা আছে একটা মাংস লেগে থাকা, কিন্তু কিছুটা জীর্ণ শরীর। সেটা যে সদ্য কবর খুঁড়ে বের করা, তা বোঝাই যাচ্ছে।

প্রাণীটার মুন্ডুর জায়গায় একটা গম্বুজ চেহারা জিনিস। তাতে দুটো ভাঁটার মতো গোলগোল চোখ। মুখের যায়গায় একটা কালো গর্ত। তার থেকে কষ বেড়িয়ে পড়ছে। প্রাণীটা আমাকে পাত্তাই দিল না। বরং এক ঝটকায় মৃতদেহের একটা হাত ছিঁড়ে নিয়ে পরম আনন্দে চিবোতে লাগল। বিশ্বাস করুন আপনারা সবাই, এরপরে আমি কীভাবে যে গ্রামে ফিরে এসেছি তা ঠিকমতো মনে নেই। পরমপিতার আশীর্বাদ না থাকলে আজ এখানে বসে এ কাহিনি আমি শোনাতে পারতাম না।”

এই পর্যন্ত বলে কাঁপতে থাকলেন থমাস।

“ওকে কেউ গরম দুধে ব্র্যান্ডি গুলে দাও। তুমি চিন্তা কোরো না থমাস। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি ঈশ্বরের কাছে তোমার জন্য প্রার্থনা করব।” নিজের গলার ক্রুশটা থমাসের মাথায় ছুঁইয়ে দিলেন ফাদার।

“সব তো শুনলেন। আপনার কী মত ফাদার?”

“দেখো, ওর বর্ননা শুনে মনে হচ্ছে ও খুব ভয় পেয়েছে। আর ভয় পেলে ভুল দেখাটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ও যা দেখেছে, তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও নয়। শপথ নিয়ে মিথ্যে বলার লোক থমাস নয়।”

“তার মানে আপনিও কি ওর মতো বলতে চাইছেন, এই বিজ্ঞানের যুগে হঠাৎ করে আকাশ ফুঁড়ে গ্রামের মধ্যে কবরখেকো ঘুল এসে হাজির হয়েছে?” প্রশ্ন করলেন কার্ল।

“আমি কিছুই বলতে চাইছি না। শুধু একটা সম্ভাবনার কথা বলেছি। আলো থাকলে অন্ধকার তো থাকবেই, তাই না?”

“মাফ করবেন ফাদার। আপনার প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, এই যুগে এসব কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দেওয়াটাও একটা অপরাধ কিন্তু। আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি, ওটা নেকড়েই। বুড়ো থমাস ঘাবড়ে গিয়ে ভুলভাল দেখে এখন গল্প ফাঁদছে। মাফ করবেন শেরিফ। আমার পক্ষে এই গাঁজাখুরি আলোচনায় আর অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়।”

সবাইকে অবাক করে দিয়ে হন-হন করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন কার্ল।

.

চার

“তখন আমি বার্নেটে কুষ্ঠ রোগীদের নিয়ে একটা ক্যাম্প করছিলাম।” কফির কাপে একটা বড়ো চুমুক দিয়ে বললেন প্রফেসর, “হঠাৎ চার্চ থেকে খবর এল। আমার সঙ্গে একজন পাদ্রি, জোসেফ নাম, দেখা করতে চান। উনি নাকি কী একটা সমস্যায় পড়েছেন। অনেকদিন হাতে কোনো কেস ছিল না। যদিও এমন ভাবা উচিত নয়, তবু সমস্যার সমাধানে নামার সুযোগ পেয়ে বেশ আনন্দই হল।”

“ফাদার জোসেফ কী বললেন?”

.

“নমস্কার, আমার নাম স্যামুয়েল জোসেফ। আমি ব্রিকলের সেন্ট লুই চার্চের দায়িত্বে আছি।”

“নমস্কার ফাদার। আমি প্রফেসর রুদ্র সোম। আমাকে সোম বলেই ডাকতে পারেন।”

“ধন্যবাদ। আপনার কথা অনেক শুনেছি। একটা অদ্ভুত সমস্যায় পড়ে আপনার কাছে আসা। আমার জ্ঞান পড়াশোনা অভিজ্ঞতা সবই ফেল মেরে গেছে এ ব্যাপারে।”

“বেশ তো। আপনি বলুন, আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব। তবে আমাকে আপনি করে বলবেন না, আপনি আমার থেকে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ, তুমিটাই ঠিক আছে।”

“বেশ, তবে তাই হোক। আমাদের ব্রিকলে গ্রাম একদম ছবির মতো সাজানো একটা জায়গা। নয়-নয় করে বহু গ্রাম আমাকে ঘুরতে হয়েছে চার্চের কাজে। ব্রিকলেতে এই নিয়ে আমার চার বছর চলছে। বিশ্বাস কর, এরকম শান্তিপূর্ণ জায়গা আমি খুব কম দেখেছি। কিন্তু হঠাৎ…”

“হঠাৎ?”

“মনে হচ্ছে শয়তানের একটা অদৃশ্য থাবা একটু-একটু করে গ্রাস করে নিচ্ছে গোটা গ্রামটাকে।”

“একটু খুলে বলুন ফাদার।”

.

পাঁচ

উফ্! এই শীতের রাতেও রেহাই নেই। গ্রামের মধ্যে নাকি ঘুল এসে হাজির হয়েছে! কে এক মাষ্টার নাকি তাকে আবার দেখেও ফেলেছে। যত্তসব বুড়ো মাতালদের ভীমরতি। এই শীতের রাতে তার আগুনের ওম আর ওয়াইনের উষ্ণতা উপভোগ করার কথা। তার বদলে সে কি না এই জনমানব শূন্য রাস্তায় রাত পাহারায় বেরিয়েছে! নেহাত ফাদার জোশেফ অনুরোধ করলেন…।

আসলে, ফাদারের কোনো অনুরোধ হ্যারি ফেলতে পারে না। অনাথ হ্যারির জীবনে একমাত্র আপনজন তো ফাদার জোসেফই।

গ্রামের পরিত্যক্ত কবরখানার পাশে এসে থমকে দাঁড়ায় হ্যারি। অদ্ভুত একটা বিশ্রী গন্ধ ছড়িয়ে আছে চারপাশে। বাতাসটাও যেন বেশ ভারী এখানে। চাঁদের আলো ভাসিয়ে দিচ্ছে চারদিক। কবরখানার ভেতরটা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। উৎসুক হ্যারি গন্ধের কারণটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। আরে! ঐ কোণের কবরটার পাশে কে যেন বসে আছে, তাই না?

“কে? কে ওখানে? সামনে আসুন।” এত রাতে কবরখানায় কে থাকতে পারে? তবে কি মাস্টারের কথাটাই সত্যি? এই হিমেল রাতেও দরদর করে ঘামতে থাকে হ্যারি। হাতের লন্ঠনের বাতিটা আরও জোরালো করে দেয় সে।

ছায়ামূর্তি একটু-একটু করে উঠে দাঁড়ায়। বেশ খানিকটা দূরে হলেও হ্যারি বুঝতে পারে, সেটা তার দিকেই একৃদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে। আর যাই হোক না কেন, এ কোনো মানুষের অবয়ব হতে পারে না!

.

“আমারই ভুল ছিল, বুঝলে সোম। এভাবে ওকে নিরস্ত্র অবস্থায় অজানা বিপদের মুখে এগিয়ে দেওয়া উচিত হয়নি। ওর পুরো শরীরটাকে খুবলে খুবলে খেয়েছিল ওই…”

“কে?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“আমিও ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলাম ফাদার জোসেফকে।” বললেন

প্রফেসর সোম।

“কী বলেছিলেন উনি?”

“খুব ভেঙে পড়েছিলেন ভদ্রলোক। আসলে হ্যারি ওঁর পুত্রসম ছিল। ফলে হ্যারির এই মৃত্যুর জন্য নিজেকেই বারবার দায়ী করছিলেন ভদ্রলোক। আমার হাতদুটো ধরে বলেছিলেন, যে করেই হোক আসল দোষীকে শাস্তি দিতে হবে।

আমি আর দেরি করিনি। পরদিনই ফাদার জোসেফের সঙ্গে ঘোড়ার গাড়ি করে বেরিয়ে পড়েলাম ব্রিকলের উদ্দেশ্যে।”

.

ছয়

“আমি আর পারছি না! এই অবস্থার চেয়ে মৃত্যুও ভালো।”

“আর ক’টা দিন অপেক্ষা করো, প্লিজ! ফ্রান্সিস জানিয়েছে, সে এক জিপসি মহিলার সন্ধান পেয়েছে। সেই হয়তো পারবে…”

“আর কত অপেক্ষা করব? কম চেষ্টা তো তুমি করলে না। কিন্তু ফলাফল শূন্যই রইল। ডাক্তার, কবিরাজ, ভগবান, শয়তান… সবার দরজা নাড়া হয়ে গেছে। জীবদ্দশায় এই অভিশাপ থেকে আমাদের আর নিস্তার নেই, যদি না তুমি নিজে আমাদের মুক্ত করে দাও।”

“যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালানোর কথা যেন তোমার মুখে আর না শুনি কোনোদিন! বাকি যুদ্ধগুলোর মত এই যুদ্ধটাও আমরাই জিতব। তুমি শুধু একটু ভরসা রাখো আমার ওপরে।”

তুষারাচ্ছন্ন গভীর রাত। গ্রামের অন্য সব ঘরের আলো নিভে গেছে। ব্যতিক্রম শুধু শিক্ষক স্যামুয়েল থমাসের দোতলা বাড়িটা।

“স্যামুয়েল, বাড়ি আছ?”

আরে! ফাদার জোসেফের গলা না? কিন্তু ফাদার এত রাতে? আবার কি কিছু বিপদ হল? থমাস দম্পতির আলোচনায় ছেদ পড়ে।

“আসুন ফাদার। সব কুশল-মঙ্গল তো?”

“এমন অসময়ে তোমাদের বিরক্ত করলাম বলে মাফ চাইছি।”

“ছি-ছি! এভাবে আমাদের লজ্জা দেবেন না ফাদার। বলুন না, কী ব্যাপার?”

“তুমি তো জানোই থমাস, হ্যারি আমার কতটা কাছের ছিল। সেই হ্যারির এরকম একটা পরিণতি, সেও আমার কথা শুনতে গিয়ে… এটা আমি মানতে পারছি না।”

“ফাদার, আপনি নিজেকে অযথা দোষারোপ করবেন না। আপনি তো গ্রামের সবার ভালো চেয়েই….”

“আসলে কষ্ট হয় কেন জান? গ্রামের মধ্যে যাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে না পড়ে, তাই হ্যারিকে নিঃশব্দে শেষ বিদায় জনিয়েছি। এমন এক কাছের মানুষের জন্য শোকটুকুও প্রকাশ না করার কষ্ট যে কী তা বলে বোঝাতে পারব না।”

“সবটাই জানি ফাদার। পরমপিতার আশ্রয়ে হ্যারি শান্তি পাবে। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।”

“কিন্তু আমি যে শান্তি পাচ্ছি না থমাস। প্রকৃত অপরাধী শাস্তি না পাওয়া অবধি, সুন্দর ব্রিকলেকে শয়তানের অবাধ চারনভূমি হওয়া থেকে আটকানো অবধি আমি তো শান্তি পাব না। সেজন্যই তো… হায় ঈশ্বর!”

“কী হল ফাদার?”

“প্রতিশোধের স্পৃহা আমাকে অন্ধ করে দিয়েছে। স্বাভাবিক বিবেচনাটুকুও বুঝি লোপ পেয়েছে আমার। চার্চ থেকে আমার সাহায্যের জন্য এক প্যারানর্মাল বিশেষজ্ঞকে পাঠানো হয়েছে। প্রফেসর রুদ্র সোম। উনি এই ঠান্ডায় বাইরেই দাঁড়িয়ে আছেন। আর আমিই কথায়-কথায় সেটা ভুলে মেরে দিয়েছি। উনি তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চান। আসলে তুমিই প্রথম ওই ঘটনার সাক্ষী, তাই তোমার সঙ্গে কথা না বলে উনি এগোবেন না। এদিকে এত রাত হয়েছে…!”

“আপনি এখনও আমাদের পর মনে করেন ফাদার? এত কিন্তু-কিন্তু কেন? আপনি বসুন ফাদার। আমি এখনই ওঁকে ভেতরে নিয়ে আসছি।”

.

সাত

“সুপ্রভাত প্রফেসর। কাল রাতে ঘুমোতে কোনো সমস্যা হয়নি তো? আসলে নতুন জায়গা তো।”

“একেবারেই না, শেরিফ উইলকিনসন। বরং কাল বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় আপনাকে ধন্যবাদই জানানো হয়নি আপনার আতিথেয়তার জন্য।”

“ছি-ছি! এভাবে বলবেন না। গ্রামের একজন হিসাবে এটুকু না করতে পারলে তো আমার শেরিফ হওয়াই বৃথা। বিশেষ করে আপনি যখন আমাদের এত বড়ো বিপদ থেকে উদ্ধার করতেই এসেছেন।”

“বিপদটা একজ্যাক্টলি যে কী, সেটা বুঝতে আমার বেশ কিছুটা সময় লাগবে। আপনাদের সাহায্য ছাড়া তো আমি এক পাও এগোতে পারব না।”

“যেকোনো সাহায্যের জন্য আমি প্রস্তুত প্রফেসর। আপনি শুধু বলুন।”

“আচ্ছা, ফাদার জোসেফ যে সেই কাল রাতে আমাকে আপনাদের বাড়িতে দিয়ে গেলেন। আর তো ওঁর দেখা পেলাম না।”

“আপনি চিন্তা করবেন না প্রফেসর, উনি এসে পড়বেন। আসলে আমাকে উনি বলে রেখেছিলেন, আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠলে ওঁকে খবর দিয়ে আসতে। কাল অত রাত হওয়ার পরেও আজ যে এত সকালে আপনি উঠে পড়বেন, এ আমি ভাবিনি। আমি এখুনি ওঁকে খবর পাঠানোর ব্যাবস্থা করছি।”

“সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা আমার চিরকালের অভ্যাস।”

“তাহলে চলুন, বাইরে গিয়ে বাগানে বসা যাক, চা খেতে খেতে সকালের ব্রিকলেকে দেখুন তাহলে।”

“বেশ তো, চলুন।”

.

আট

“সকালের ব্রিকলে রাতের থেকে একেবারে অন্যরকম, তাই না সোম?”

“আরে! ওই তো ফাদার জোসেফ এসে গেছেন। আসুন ফাদার।” উইলকিনসন উঠে গেলেন গেট খুলতে।

“সুপ্রভাত ফাদার।”

“সুপ্রভাত সোম। কাল কোনো সমস্যা হয়নি তো?”

“একেবারেই না ফাদার। শেরিফ উইলকিনসন অমায়িক মানুষ।”

“হ্যাঁ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাইতো লোকের নজর এড়িয়ে তোমার থাকার জন্য এই বাড়িতেই ব্যবস্থা করেছি।”

“আমার আসল পরিচয় তথা আগমনের কারণ এখানে ক’জন জানেন ফাদার?”

“হ্যারির ব্যাপারটা যারা জানে, মানে সেদিন উইলকিনসনের সান্ধ্য আড্ডায় যারা উপস্থিত ছিল তারাই। সব মিলিয়ে সাত-আটজন হবে। তারা সকলেই গ্রামের বেশ প্রতিপত্তিশালী ব্যাক্তি। আসলে আমাকেও তো এদের নিয়েই চলতে হয়।”

“ওই প্রতিপত্তিশালীরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ফাদার। যাইহোক, বাকি গ্রামবাসীদের কী বলা হয়েছে আমার ব্যাপারে? প্রায় সব বাড়িই আমাকে যেতে হবে। সেখানে খোশগল্প না করলেও আমার কিছু জিনিস দেখা দরকার। ব্রিকলে আসার পথে খেয়াল করেছি, এর আগের গ্রামটা প্রায় মাইল সাতেক দূরে। মাঝে শুধুই জঙ্গল ঘেরা পাহাড়। তাই আগে আমাকে বুঝতে হবে বিপদটা বাইরে থেকে আসে, নাকি এই গ্রামেই তার সূত্রপাত।”

“সে নিয়ে ভাবতে হবে না। তোমাকে অ্যাংলিকান চার্চ থেকে পাঠানো হয়েছে আমার অনুরোধে। গ্রামে শান্তি বজায় রাখার জন্য কিছু ধর্মীয় ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য, এরকমই প্রচার করেছি। এই সুযোগে উইলকিনসন নিজে তোমাকে সারা গ্রাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবে।”

“বেশ ফাদার। আচ্ছা, কাল রাত থেকে একটা প্রশ্ন আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।”

“কী প্রশ্ন?”

“কাল রাতে প্রথমেই যার বাড়িতে গেছিলাম, মানে থমাস, উনি কি কোনো কারনে খুব আপসেট? সচরাচর একজন শিক্ষক নতুন লোকের সামনে খুব মেপে কথা বলেন। কিন্তু ওঁর কথাবার্তা বেশ অসংলগ্ন মনে হচ্ছিল। ওঁর স্ত্রীকেও দেখে মনে হল, খুব ভাবনায় বা কষ্টে আছেন। এটা কি আমার বোঝার ভুল?”

“আসলে ওঁদের জীবনে একটা খুব বড়ো ট্র্যাজেডি ঘটে গেছে।”

“আমি প্রফেসরকে বাকিটা বলছি ফাদার।” শেরিফ উইলকিনসন বাগানে এসে উপস্থিত হলেন, সঙ্গে একটি কাজের ছেলে, তার হাতে ধরা খাবারের ট্রে। “আপনারা ব্রেকফাস্ট শুরু করুন।”

“এ কী শেরিফ! এত কিছু আয়োজন কেন?”

“শুধু আপনার জন্য নয় ফাদার। প্রফেসর শুধু আমার নন, গোটা গ্রামের অতিথি। তাঁকে এটুকু আপ্যায়ন না করলে কী করে চলে?”

“থমাস দম্পতির কোন্ ট্র্যাজেডির কথা বলছিলেন আপনারা?” কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে দেখে প্রফেসর সোম প্রশ্ন করতে বাধ্য হলেন।

“হ্যাঁ, বলছি। আসলে ওঁদের একটি ছেলে আছে। জ্যাকব। বয়স এই চব্বিশ-পঁচিশ হবে। এই বয়সের স্বাভাবিক তরুণরা যেমন হয়, ও তাদের থেকে একটু আলাদা।”

“কেন? আলাদা কেন?” প্রফেসর প্রশ্ন করেন।

চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে উইলকিনসন বলেন, “বছরখানেক আগের ঘটনা। জ্যাকব এক শীতের রাতে একা ঘোড়ায় চেপে ফিরছিল। জোয়ান স্বাস্থ্যবান ছেলে, কোনো কিছুকেই ডরায় না। কিন্তু দুর্ঘটনার ওপর তো কারও হাত চলে না।”

“দুর্ঘটনা?

“হ্যাঁ। নেকড়ে বা অন্য কিছু দেখে জ্যাকবের ঘোড়া ভয় পেয়ে হঠাৎ দৌড় দেয়। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে জ্যাকব মাথায় মারাত্মক চোট পায়। সারারাত সে রাস্তাতেই পড়েছিল। পরে আলো ফুটতে গ্রামবাসীরা তাকে ওই অবস্থায় পায়। ততক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। জ্যাকবের মাথার ঘা সারলেও বেচারি পাগল হয়ে যায়। অনেক ওষুধ, ডাক্তার, বদ্যি, কবিরাজ, জিপসি, যাদুকর, এমনকি আমিও অনেক চেষ্টা করেছি, বুঝলে সোম। কিন্তু কিছুই করা যায়নি।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ফাদার।

“এমনি সময় ঠিক থাকলেও, মাঝে মাঝে খুব হিংস্র হয়ে ওঠে জ্যাকব। ওদের কটেজের নীচের একটা ঘরে বেচারিকে বন্ধ করে রাখা হয়। কোনো মা- বাবার পক্ষে নিজের সন্তানকে এভাবে দেখা যে কী চরম দুঃসহ, তা থমাস দম্পতিকে দেখলে বোঝা যায়।”

“আগে তো আরও ঘনঘন হিংস্র হয়ে উঠত জ্যাকব! তবে ইদানীং …”

“ইদানীং কী ফাদার?” ফাদার থেমে যাওয়ায় প্রফেসর সোম প্ৰশ্ন তোলেন। তবে উত্তর দেওয়ার আগেই একটা আওয়াজ ভেসে আসে বাইরে, বড়ো রাস্তা থেকে। সবার দৃষ্টি সেদিকেই ঘুরে যায়। দেখা যায়, সশব্দে এগিয়ে চলেছে এক ঘোড়ার গাড়ি। একটা বিশ্রী গন্ধে ভরে গেছে চারদিক।

“ওটা কার গাড়ি ফাদার?” প্রফেসর সোম আবার প্রশ্ন করেন।

“অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার কার্ল এবসনের। উনি প্রায়ই শহরে যান। ওঁর বাড়ির পেছনে এক বিশাল দিঘি আছে। সেখানে মাছের চাষ করেন ভদ্রলোক। এই গন্ধ সেই মাছের চারের। আর হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, আগে জ্যাকব প্রায়ই ভায়োলেন্ট হয়ে যেত। কিন্তু এখন ব্রিগেডিয়ার কার্লের শহর থেকে আনা এক ভেষজ ওষুধেই বেশ শান্ত থাকে ছেলেটা।”

“হুঁ।” চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখেন প্রফেসর সোম।

.

নয়

“কেসটা বেশ কনফিউজিং ছিল, বুঝলে কৌশিক।” বললেন প্রফেসর সোম।

“কেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“কারণ আমার হাতে এমন কিচ্ছু ছিল না যা দিয়ে বোঝা যায়, আমি কীসের বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছি। টানা চার দিন শেরিফ উইলকিনসনকে নিয়ে গোটা গ্রামের প্রতিটা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও, আমার যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা সেরে ফেলেও, কোনো সন্দেহজনক কিছু, এমনকি কোনো আভাসও আমি পাইনি। বড্ড অসহায় লাগছিল। কেননা রোগের উৎস সম্বন্ধেই যদি জানতে না পারি, তাহলে চিকিৎসা করব কীভাবে? তবে এই ঘোরাঘুরিতে একটা লাভ হয়েছিল আমার।”

“কী প্রফেসর?”

“বেশ কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশান পেয়েছিলাম আমি। যেমন, থমাসের ঘুল দেখা, বা হ্যারির ওপর নেকড়ের আক্রমণ, সবই ঘটেছে একটা বিশেষ তিথিতে, পূর্ণিমায়! এর পাশাপাশি কয়েকটা অন্য জিনিসও জানতে পেরেছিলাম।”

“অন্য জিনিস? মানে এই কেসের সঙ্গে জড়িত নয়, এমন কিছু?”

“সেই যোগসূত্রটা খুঁজে পাওয়াই আসল ছিল হে। বেশ কয়েকমাস ধরেই নাকি গ্রামে খামারের মুরগি, ভেড়া, এসব হারিয়ে যাচ্ছে। শীত এলে নেকড়ে বা অন্য প্রাণীদের হানা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক। গ্রামবাসীরা সেভাবেই দেখেছিল এগুলোকে, তবে আমার অন্য কথা মনে হয়েছিল। শেষ অবধি অবশ্য একটা অকাট্য প্রমাণ পেলাম।”

“কীভাবে?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“সেদিন সন্ধেয় শেরিফ উইলকিনসনের বাড়িতে বসেছিলাম। আমি, ফাদার জোসেফ, আর উইলকিনসন ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ঠিক তখনই চার্চ থেকে একটা চিঠি এসে পৌঁছল। সেই যে নেকড়ের চামড়াটা আমি ল্যাবে পরীক্ষা করতে দিয়ে এসেছিলাম, তার ল্যাব রিপোর্ট।”

“কী ছিল সেই রিপোর্টে?”

“ক্রমশ প্রকাশ্য ভায়া। তবে যা জেনেছিলাম সেগুলো জুড়ে গোটা ছবিটা বানাতে গেলে আমাকে একবার শহরে যেতে হত। কিছু জিনিস আনানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। শেরিফ আর ফাদারকে বললাম, পরদিন সকালেই আমি যাতে শহরে যেতে পারি সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তবে তার আগে আমার একটা অন্য কাজ ছিল।”

“কী কাজ প্রফেসর?”

“গ্রামের বাকী সবার বাড়ি দেখা হয়ে গেলেও সেই এক্স ব্রিগেডিয়ার কার্ল এবসনের বাড়িটা দেখা আমার তখনও বাকি ছিল। ভদ্রলোক নিজেও সকালে এসে ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়ে গেছিলেন। ভাবলাম, এক ঢিলে দুই পাখি মেরে আসি। ফাদার আর রাতে যেতে চাইলেন না। আমি আর শেরিফই চললাম ব্রিগেডিয়ারের বাড়ি।

ব্রিগেডিয়ার ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল। দেখলাম ভদ্রলোকের মিলিটারি মেজাজ এখনও অটুট। আমাকে তো রীতিমতো জেরাই করে ফেললেন। উনি এসব ভূত প্রেত ঈশ্বর কিছুই মানেন না। ওঁর মত, পাগল ছেলের শোকে থমাস মাস্টারের নিজের মাথাটাও খারাপ হয়ে গেছে, তাই ভুলভাল দেখছে। হ্যারির মৃত্যুর কারণও ওঁর মতে পাহাড়ি নেকড়ের হামলা ছাড়া আর কিছুই না। ওঁর যদি আগের মতো বয়স আর হাড়ে জোর থাকত, উনি নিজেই বন্দুক হাতে রাতে গ্রামের রাস্তায় নেমে পড়তেন আর এসব রহস্য নাকি নিমেষে দূর করে দিতেন।”

“বাপরে! বেশ কড়া মেজাজের মানুষ দেখছি।”

“হ্যাঁ। নেহাত ফাদারকে সম্মান করেন – উনি, তাই আমার কাজে বাধা দেবেন না। নইলে উনি এসব প্যারানর্মাল-টর্মাল নামক কুসংস্কারে বিশ্বাসী নন। শুধু তাই নয়, উনি আমার ইন্ডিয়ান অরিজিনকেও খোঁটা দিতে ছাড়েননি এসব ভোজবাজিতে বিশ্বাস করার জন্য। পেট ভরে অপমান আর মিসেস এবসনের হাতের সুস্বাদু খাবার খেয়ে আমি আর শেরিফ বেরিয়ে পড়লাম। আর তখনই রাস্তায় ঘটে গেল সেই ভয়ানক ঘটনাটা।”

.

দশ

“বরফের যা অবস্থা দেখছি, কাল সকালের মধ্যে গ্রামটাই জমে না যায়!” বললেন শেরিফ উইলকিনসন।

“তাইতো মনে হচ্ছে। কাল সকালে আমার শহরে যাওয়ায় আবার সমস্যা হবে না তো?”

“কোনো সমস্যা হবে না প্রফেসর। আমার এই ঘোড়ার গাড়ি সাক্ষাৎ তুফান। যতই বরফ জমুক রাস্তায়, ও আপনাকে ঠিক পৌঁছে দেবে।”

“কার্ল এবসনের বাড়িটা কিন্তু বেশ দূর আপনার বাড়ি থেকে।”

“আসলে আমার বাড়িটা গ্রামের একেবারে উত্তরে, আর ওঁরটা একদম দক্ষিণে। আপনি তো হেঁটেই যেতে চাইছিলেন। কিন্তু আমি জানি, এইরকম রাতে এই গাড়িটা খুব বড়ো সহায়।”

রাস্তায় জনপ্রাণী নেই। বেশিরভাগ বাড়ির আলোও নিভু নিভু। উইলকিনসনের ঘোড়ার গাড়িটা সেই পাষাণপুরীর নিস্তব্ধতাকে অস্বীকার করে তুষারের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে।

“নেমে আসুন প্রফেসর, বাড়ি এসে গেছে।”

পায়ের তলায় নরম তুষার। মাথার ওপর চাঁদের আলো। এমন সুন্দর ব্রিকলেতে এমন এক কালো রহস্য কীভাবে এল, সেটাই ভাবছিলেন প্রফেসর সোম। হঠাৎ সামনের ঝোপের আড়াল থেকে যেন একটা জমাট বাঁধা কালো অন্ধকার ছুটে এল তাঁর দিকে। প্রফেসরের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সেটা! আর তারপরেই শুরু হল এলোপাথাড়ি আঁচড় কামড়। জ্ঞান হারালেন প্রফেসর।

*****

“প্রফেসর! শুনতে পাচ্ছেন? আপনি ঠিক আছেন?”

সারা গায়ে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে উঠে বসলেন প্রফেসর। বিছানার চারদিকে রীতিমতো ভিড়। ফাদার জোসেফ, মিস্টার থমাস, শেরিফ উইলকিনসন… সবাই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

“তুমি ঠিক আছো তো বাবা?” ফাদার জোসেফের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন।

“আমি ঠিক আছি, কিন্তু কে এভাবে হঠাৎ…” আসতে আসতে বলে উঠলেন প্রফেসর।

“আমাকে মাফ করবেন প্রফেসর, সব আমারই দোষ।” এগিয়ে আসেন থমাস।

“কিন্তু কেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“আমি বুঝিয়ে বলছি প্রফেসর। জ্যাকব আমার ছেলে, মানসিকভাবে অসুস্থ। এমনিতে ওকে ঘরের মধ্যে আটকেই রাখা হয়। কিন্তু আজ কীভাবে জানি নিজেকে ছাড়িয়ে রাস্তায় চলে এসে আপনার ওপর এভাবে…!” ব্যথাভরা গলায় কথাটা অসমাপ্ত রাখেন থমাস।

“ফাদার!”

“বলো সোম।”

“ঘরটা একটু ফাঁকা করুন। আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। প্ৰায় ভোর হয়ে এল। আমি একটু পরেই বেরিয়ে যাব। তার আগে কথাগুলো আপনাকে বলা দরকার।”

“প্রফেসর! আপনি এভাবে আমার ওপর রাগ করে চলে যাচ্ছেন?” থমাসের ব্যথাভরা গলাটা বলে ওঠে, “আসলে ডাক্তার অনেক আগেই বলেছিলেন জ্যাকবকে শহরের কোনো মেন্টাল অ্যাসাইলামে রেখে আসতে। কিন্তু নিজের ছেলেকে ওরকম কোথাও রেখে আসতে কে চায় বলুন? এর আগে তো এরকম ঘটনা কোনোদিন ঘটেনি।”

“আপনি ভুল করছেন মিস্টার থমাস। আপনার বা আপনার ছেলের উপর রাগ করে নয়। আমার হাতে সত্যিই একদম সময় নেই। এখনই শহরে গিয়ে আমাকে কিছু জোগাড়যন্ত্র করতে হবে। নইলে আরও বড়ো বিপদ ঘনিয়ে আসবে ব্রিকলের উপরে। ফাদার! প্লিজ আপনি ঘর ফাঁকা করার ব্যবস্থা করুন। শুধু আপনি, শেরিফ, আর মিস্টার থমাস থাকুন।”

“বেশ সোম। তবে তাই হোক।”

.

এগারো

“ইশ! ঈশ্বর কার কপালে যে কী লিখে রাখেন কে জানে।”

“ঠিকই, এভাবে ফুটফুটে একটা প্রাণ ঝরে গেল।”

“ফুটফুটে না ছাই। একটা হিংস্র পাগল। অমানুষ একটা! আপদ গেছে।”

“আহ্! একটা মানুষ মারা গেছে, এভাবে মারা গেছে আর তোমরা এসব আলোচনা করছ?”

সারা গ্রাম আজ ভেঙে পড়েছে পুরোনো কবরখানায়। গ্রামের শিক্ষক মিস্টার থমাসের একমাত্র ছেলে জ্যাকব মারা গেছে আগের রাতে তারই অন্তিম যাত্রায় জড়ো হয়েছে সব গ্রামবাসী।

“কীভাবে মারা গেল বলো তো?”

“জানি না বাপু। তবে শুনেছি, ঘর থেকে পালিয়ে গেছিল রাতে। ব্যস! পাগল মানুষ পড়েছে ক্ষুধার্ত নেকড়ের সামনে। টুকরো-টুকরো করে খেয়েছে নাকি সব।”

“হ্যাঁ। এমন হাল করেছে শরীরটার, যে কফিনে নাকি পিস্-বাই-পিস্ ভরতে হয়েছে।”

“কিন্তু মিসেস থমাসকে তো দেখছি না এখানে?”

“নিজের ছেলের এ অবস্থা কেউ দেখতে পারে? থমাস লাশ শনাক্ত করার পর শেরিফ আর ফাদার জোসেফই সব ব্যাবস্থা করেছেন।”

“মে হিজ সোল রেস্ট ইন পিস।”

চারিদিক থেকে ভেসে আসা টুকরো টাকরা মন্তব্যের মাঝে জ্যাকবের অন্তিম সংস্কার সম্পূর্ণ হয়। জমে থাকা ভিড়টা একটু-একটু করে কমতে থাকে।

“আমি কিন্তু কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা ফাদার।” শেরিফ উইলকিনসন ফাদার জোসেফের কানে-কানে বলেন।

“আর একটু ধৈর্য ধরুন শেরিফ।”

“কিন্তু প্রফেসরও সেই যে গেলেন দু’দিন আগে… আর তো ফিরে এলেন না!”

“আজকের রাতটা অপেক্ষা করুন শেরিফ। আমার মন বলছে আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর আমরা পেয়ে যাব এরপরেই।”

.

বারো

চার্চের পুরোনো ঘড়িটায় ঢং ঢং করে বারোটা বাজল। পথ-ঘাট একদম শুনশান। অবশ্য এত রাতে কারো বাইরে থাকার কথাও নয়। কিন্তু ও কী?

পুরোনো কবরখানার গেটটা খুলে এত রাতে কে ঢুকছে ওখানে?

না। সে কোনো মানুষ নয়। মানুষ আর নেকড়ের মাঝামাঝি কদাকার এক প্রাণী টলমল করতে করতে কবরখানায় পাগলের মত কী খুঁজে চলেছে যেন।

জ্যাকবের টাটকা কবরের সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় প্রাণীটা। তারপর পাগলের মত আছড়ে কবরের মাটি খুঁড়তে থাকে। চাঁদের গায়ে জমে থাকা মেঘগুলো যত সরে যেতে থাকে, প্রাণীটার গায়ের লোম, হাতের নখ, মুখ সব বদলে যেতে থাকে, ছিঁড়ে পড়তে থাকে পরনের পোশাক।

পেছন থেকে ওই সময় আরেকজনকে দেখা যায়। ওভারকোট পরা সেই ছায়ামূর্তি পায়ে-পায়ে জ্যাকবের কবরের দিকে এগিয়ে এসে বলে, “ওই কফিনে কোনো লাশ নেই। তোমার খেলা শেষ মিস্টার শেপ-শিফটার। অনেক অন্যায় করেছ, এবারে নরকের আগুনে পোড়ার জন্য প্রস্তুত হও।”

ওভারকোট থেকে একটা গজাল বের করেন প্রফেসর সোম। সেটার রুপোলি ঝলক দেখা যায় আলো-অন্ধকারেও। গজালটা বিঁধে যায় প্রাণীটির শরীরে।

পাশবিক চিৎকারে, রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ে। এক ঝাটকায় প্রাণীটা প্রফেসরকে মাটিতে ছিটকে ফেলে। যন্ত্রণা আর রাগে তার শরীর কাঁপতে থাকে।

“আর চেহারা বদলানো যাবে না।” মাটি থেকে উঠে দাঁড়ান প্রফেসর। রুপো দিয়ে বানানো ছুরিটা বাগিয়ে, অভ্যস্ত কৌশলে অন্য হাত দিয়ে রসুনফুলের একটা মালা ছুঁড়ে দেন তিনি প্রাণীটার গলায়। আবার একটা প্রচণ্ড চিৎকারে বিদীর্ণ হয় আকাশ বাতাস।

“শেরিফ। আমার দেওয়া ওই বিশেষ জালটা নিয়ে এগিয়ে আসুন এদিকে।” হুঙ্কার ছাড়েন প্রফেসর সোম, “শেরিফ! আমার দিকে তাকান। আপনি না পারলে আমার হাতে জালটা দিন।”

ঘটনার আকস্মিকতায় শেরিফ উইলকিনসন যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গেছেন।

অন্ধকারের বুক চিরে চিরে ফাদার ফাদার জোসেফ ছুটে আসেন। শেরিফ উইলকিনসনের হাত থেকে জালটা নিয়ে তিনি ছুঁড়ে দেন প্রফেসরের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে যা দেরি হওয়ার হয়ে গেছে। সেই প্রাণীটি ততক্ষণে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রফেসরদের দিকে এক আগুনে দৃষ্টি হেনে সে চারপায়ে দৌড় লাগায় পাশের জঙ্গলের দিকে।

“হা ঈশ্বর! এত কাছে এসেও আমরা হেরে গেলাম শয়তানের কাছে?” আর্তনাদ করে উঠলেন ফাদার, “আর কি আমরা এই সুযোগ পাবো কোনোদিন?”

“আমাকে মাফ করে দিন প্রফেসর।” অনুতপ্ত কণ্ঠে বলেন শেরিফ, “শুধু আমারই ভুলে এত ভালো একটা প্ল্যান নষ্ট হয়ে গেল। আমি কখনও নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।”

“এখন আত্মবিলাপের সময় নয় শেরিফ। ও আর রূপ বদল করতে পারবে না। দেরি না করলে এখনও ওকে ধরা সম্ভব।”

“কিন্তু কোথায়? কীভাবে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“চোখ-কান খোলা রাখলে আপনিও বুঝতে পারতেন। নিঃসন্তান ব্রিগেডিয়ার এবসন দম্পতির টেবিলে সেদিন দুটো নয়, তিনখানা ফাঁকা চায়ের কাপ ছিল।”

.

তেরো

“আসুন প্রফেসর। আমি জানতাম আপনি আসবেন। শেরিফ আর ফাদারও এসেছেন! ভালোই হল তাহলে। আমার শেষ কনফেসানটা সবার সামনেই হোক।”

একটা আরাম কেদারায় শুয়ে ছিলেন প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার কার্ল এবসন। হাতে ধরা একটা পিস্তল। শরীরের একধারে হওয়া ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। কিন্তু মানুষটার গলার স্বর একেবারে শান্ত।

ঘরের একপাশে উপুড় হয়ে পড়ে আছে মিসেস এবসনের ছিন্নভিন্ন শরীর। আর ব্রিগেডিয়ারের ঠিক পায়ের কাছে পড়ে রয়েছে সেই বিকটা জীবটা। রক্তের ধারা বইছে তার শরীর থেকে।

“হাতের বন্দুকটা ফেলে দিন এবসন।” প্রফেসর সোম বলে উঠলেন।

“তা আর সম্ভব নয় প্রফেসর। বাকিদের প্রাপ্য শাস্তি আমি তাদের দিয়েছি। কিন্তু আমার শাস্তি কে দেবে? আমার তো পাপের শেষ নেই প্রফেসর।”

“মাথা ঠান্ডা করো কার্ল। পরমপিতার ঘরে সবার জন্য ক্ষমা আছে।” বলে উঠলেন ফাদার।

“রাখুন আপনার পরমপিতা!” গর্জে ওঠেন এবসন, “কোথায় ছিল আপনার পরমপিতা, যখন সেই বুড়ো পিশাচটা আমাদের ওই অভিশপ্ত নদীর জল খেতে বাধ্য করেছিল? কোথায় ছিল আপনার পরমপিতা যখন এই নিঃসন্তান দম্পতির একমাত্র অবলম্বন, আমাদের পুত্রসম সার্জেন্ট প্রতি পূর্ণিমার রাতে অভিশপ্ত রূপ ধারণ করতে বাধ্য হত, আর খিদের জ্বালায় বনে-জঙ্গলে-কবরখানায় ঘুরে বেড়াত?

না! আর এগোবেন না প্রফেসর। এটা কিন্তু লোডেড গান, আর বুড়ো হয়ে গেলেও আমার হাতের টিপ কিন্তু এখনও বেশ ভালো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনুন আমার কথা।”

ধীরপায়ে পিছিয়ে আসেন প্রফেসর সোম।

“আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি জানেন। ওঝা, গুণিন, জিপসি, আপনাদের ভগবান, শয়তান… কারো কাছে যেতে বাকি রাখিনি আমি। কিন্তু কেউ আশার আলো দেখাতে পারেনি। তবু আমি থামিনি। কারণ পূর্ণিমার ওই একদিন বাদে সে যে একটা সত্যিকারের মানুষ। দিনের-পর-দিন শহর থেকে মাছের চারার নাম করে কাঁচা মাংস এনেছি। পুরোনো কবরখানাগুলো খুঁড়িয়ে হাড়গোড় এনেছি। কিন্তু আর পারিনি!

আস্তে-আস্তে স্যামুয়েলের খিদেটা বাড়ছিল। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন হারাচ্ছিল সে। মুরগি, ভেড়া, পুরোনো কবর… এ-সব ছেড়ে সে যেদিন হ্যারির উপর হামলা করল, সেদিনই আমি বুঝেছিলাম, শেষের পালা উপস্থিত। অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন? ওর ওই ভীষণ রূপকে ওর মা কিন্তু ভয় পেত না। ওই যেত রাতে ওকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে। পেট ভরে গেলে স্যামুয়েল… ওই প্রাণীটাও বাধ্য ছেলের মতো ঘরে ফিরে আসত। আজও ও সেভাবেই গেছিল। কিন্তু আজ খিদের জ্বালায়, আর আপনার খোঁচায় ও সত্যিকারের পশুই হয়ে গেছিল। নিজের মাতৃসম মানুষটিকেও আর চিনতে পারেনি সে! যাক! মিসেস এবসন অবশেষে মুক্তি পেয়ে গেলেন।”

“আর স্যামুয়েল?”

“ওকেও মুক্তি দিলাম আমি। চারটে গুলি পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে। এক- না-একদিন তো থামাতেই হত এই নারকীয় খেলা। কাউকে তো এটা শেষ করতেই হত। আমিই সেটা করলাম না হয়।

বাই দা ওয়ে প্রফেসর, জীবনে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর অনেক ছক আমি উল্টে দিয়েছি। কিন্তু আপনার ওই থমাস মাস্টারের ছেলের মৃত্যুর ভুয়ো নাটকের ছকটা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। যাইহোক, পারলে আমাদের আপনারা ক্ষমা করে দেবেন।”

প্রফেসর সোম ব্রিগেডিয়ারের দিকে ছুটে গেলেন। কিন্তু ততক্ষনে আবার একটা গুলির শব্দ ঘরটা জুড়ে ধ্বনিত হয়েছে। ছোপ ধরা সাদা দেওয়ালে রক্ত আর ঘিলু তৈরি করেছে নতুন এক নকশা!