Course Content
বকুলকথা – আশাপূর্ণা দেবী
বকুলকথা – আশাপূর্ণা দেবী
0/38
বকুলকথা – আশাপূর্ণা দেবী

০১. মিছিল

ধ্বনিটা অতিপরিচিতশব্দগুলোও বহুপরিচিতচেয়ার থেকে উঠে জানলার ধারে না গেলেও বোঝা যেত কারা চলেছে মিছিল করেআর কী বলে চলেছে তারা। মিছিল তো চন্দ্রসূর্যের মতই নিত্য ঘটনা। কানের পর্দায় যেন লেগেই থাকে ধ্বনিটাচলবে নাচলবে নাযেন অহরহই মস্তিষ্কের কোযে কোষে ধাক্কা মারেমানতে হবেমানতে হবে, আমাদের দাবী মানতে হবে।

তবু হাতের কলম নামিয়ে রেখে জানলায় এসে দাঁড়ালেন অনামিকা দেবী!

কিন্তু কেন দাঁড়ালেন?

মিছিলের ওই উচ্চরোলে লেখার ব্যাঘাত ঘটছিলো বলেনাকি নেহাৎই অকারণ কৌতূহলেহয়তো তাই। অকারণ কৌতূহলেই। শুধু জেনে নেওয়ানতুন কোন অন্যায় বা অত্যাচারের বিরুদ্ধে আজকের এই প্রতিবাদ। নইলে রাস্তার গোলমালে লেখার ব্যাঘাত ঘটলে চলে না

কলকাতা শহরের এমন একটি জনবহুল রাস্তার একেবারে মোড়ের ধারের বাড়িতে যাদের আজন্মের বাসএই কোলাহলের মাঝখানে বসেই যার কলম ধরার শুরুতার কি করে এ আবদার করা সম্ভবনিঃশব্দে নির্জনতার গভীরে মগ্ন হয়ে লিখতে চাই আমি!

বিচিত্র শব্দবিরক্তিকর কোলাহল আর অগণিত মানুষের আনাগোনার মধ্যে থেকেই তো সাধনা করে যেতে হয় শহরে সাহিত্যিকদের। প্রতিক্ষণই করতে হয় প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রামকিন্তু একেবারে স্তব্ধ শান্ত স্তিমিত পল্পীজীবনের পরিবেশই কি সাধনার নিতান্ত অনুকূলতেমন পরিবেশ পেলেই অনামিকা দেবী আরো অধিক লিখতে পারতেনঅধিকতর উচ্চমানেরঅধিকতর মননশীল?

অপরাপর শহরবাসী কবি সাহিত্যিকরা কী বলেনকী মনোভাব পোষণ করেনঅনামিকা দেবীর জানা নেইমনের কথার আদানপ্ৰদান হবে এমন অস্তরঙ্গ তাই বা কার সঙ্গে আছেতবে নিজে তিনি তা বলেন না। তা ভাবেন না।

তাঁর মনে হয়শহরের মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তনশীল উত্তাল জীবনরসের মধ্যেই সাহিত্যের তীব্ৰ তপ্ত জীবনীরস। শহরের অফুরন্ত বৈচিত্র্যের মধ্যেই সাহিত্যের অফুরন্ত উপাদান।

নির্জনতার শাস্তিতে গতিবেগ কোথায়শহরের নাড়ি সর্বদাই জ্বরতপ্ত চঞ্চল। সেই জ্বর ছাড়াবার ওষুধ জানা নেই কারোতবু একথা সবাই জানে ওই জুরাটাই প্রেরণা দিচ্ছে শিল্পকেসাহিত্যকেজীবনচিস্তাকে। এই জুরাটাই বরং রোগীকে চাঙ্গা করে রেখেছে।

তাই কোলাহলকে কখনো বাধা স্বরূপ মনে হয় না। অনামিকা দেবীর। তিনি সর্বদা এই কথাই বলেনআমি জনতার একজন। আমি জনতার সাহিত্যিক। কোলাহল থেকেই রস আহরণ করে নেওয়া আমার কাজ।

কিন্তু অনামিকা দেবীর সেই কবি সেজদিতিনি কিন্তু অন্য কথা বলেনতিনি বরং বলেনধন্যবাদ দিই তোকে। এই কলরবের মধ্যে লিখিস!

তা তিনি একথা বলবেন সেটাই স্বাভাবিক। অনামিকা দেবী যদি জনতার তো তিনি নির্জনতার।

তিনি কবি।

ইচ্ছের কবি।

তিনি তাঁর সেই মফঃস্বলের বাড়িটিতে নিঃসঙ্গতায় নিমগ্ন হয়ে বসে সেই ইচ্ছার ফুলগুলি ফোঁটান। সেইগুলিই হয়তো তার সঙ্গী।

অনামিকা দেবীর ভূমিকা আলাদা।

এ যুগের আরো সকলের মতইঅহরহ পরের ইচ্ছের বায়না মেটাতে হয় তাঁকে! পরের ইচ্ছেয় পরিচালিত হতে হয়

মনের মধ্যে ওই মিছিলের ধ্বনি উঠলেও মেটাতে হয়

জানলার ধারে এসে দাঁড়ালেন অনামিকা দেবীনীচের দিকে তাকালেনমানুষের প্রাচীর এগিয়ে চলেছে একটা অখণ্ড মূর্তিতেআর যান্ত্রিক একটা শব্দ উঠছে তা থেকে চলবে না! চলবে না!

হঠাৎ অদ্ভুত একটা কৌতুক বোধ করলেন অনামিকা দেবী।

একদিক থেকে অবিরাম প্রতিবাদ উঠবে চলবে না চলবে নাআর একদিকে অব্যাহত গতিতে চলেই চলবে সেই অসহনীয়।

কোটি কল্পকালের পৃথিবীর বুকে কোটি কোটি বছর ধরেই চলেছে এই লীলা। পাশাপাশি চলেছে। অন্যায় আর তার প্রতিবাদ। আজকের মিছিলটা যে বিশেষ একটা কিছু তা বোঝা যাচ্ছে তার দৈর্ঘ্যেশেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না। একবার স্তিমিত হয়ে আসছে আওয়াজআবার পিছন থেকে আসছে নতুন আওয়াজের ঢেউ।

অবশেষেঅনেকক্ষণের পর হালকা হয়ে এল দলফিকে হয়ে এল ধ্বনিযারা পিছিয়ে পড়েছিল তারা ছুটে ছুটে আসছেতাদের ফাঁকে ফাঁকে অন্য অন্য পথচারীর চেহারা দেখা যাচ্ছে।

দূরে এগিয়ে যাওয়া আওয়াজটা নিয়মমাফিক কমে কমে আসছে।

জানলা থেকে আবার ফিরে এলেন অনামিকা দেবী। চেয়ারে এসে বসলেনকলামটা হাতে তুলে নিলেন। কিন্তু চট করে যেন মনে এল না কি লিখছিলেনঅন্যমনস্কের মত সম্পূর্ণ অবান্তর একটা কথা মনে এল। লেখার কথা নয়ওই মিছিলের কথা নয়দেশের বহুবিধ অন্যায় অনাচার দুর্নীতি আর রাজনীতির কথাও নয়মনে এল। এই বাড়িটা যখন তৈরী হয়েছিল তখন এপাশেওপাশে ফাঁকা ফাকা মাঠ পড়ে ছিল।

এখন সমস্ত রাস্তাটা যেন দম আটকে দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু বাড়িটা কি আজ তৈরী হয়েছেকত দিন মাস বছর পর হয়ে গেল তার হিসেব করতে হলে বুঝি খাতা পেনসিল নিয়ে বসলে ভাল হয়

অনামিকা দেবী ভাবলেনআমি এর শৈশব বাল্য যৌবন আর এই প্রৌঢ়াবস্থা সব অবস্থার সাক্ষী। অথবা এই বাড়িটাই আমার সমস্ত দিন মাস বছরের সাক্ষী। এর দেওয়ালে দেওয়ালে লেবা আছে আমার সব কথা

আচ্ছাদেওয়াল কি সত্যি সাক্ষ্য দিতে পারেসে কি সব কথা ধরে রাখতে পারে অদৃশ্য কোনো অক্ষরেবিজ্ঞান এত করছেএটা করতে পারে না কোনো দিনমৌন মূক দেওয়ালগুলোকে কথা কইয়ে ইতিহাসকে পুরে ফেলবে হাতের মুঠোয়! নির্ভুল ইতিহাস!

টেলিফোনটা ডেকে উঠলো ঘরের কোণ থেকে। আবার চেয়ার ছেড়ে উঠলেন অনামিকা দেবীরিসিভারটা তুলে নিলেন হাতে।

টেলিফোনটা লেখার টেবিলে রাখাই সুবিধেসময় বঁচেপরিশ্রম বাঁচেতবু কোণের ওই ছোট্ট টেবিলটার উপরেই বসিয়ে রাখেন সেটা অনামিকা দেবী। এটা তার এক ধরনের শপ। বার ব্যার উঠতে হলেও।

থেমে থেমে কেটে কেটে বললেনহ্যাঁআমি কথা বলছিবলুন কি বলছেন?..নতুন পত্রিকা বার করছেনশুনে খুশি হলাম। শুভেচ্ছা জানাচ্ছিসাফল্য কামনা করছি।লেখামানে গল্পপাগল হয়েছেন?…কী করবো বলুনঅসম্ভবসম্পূর্ণ অসম্ভব।উপায় থাকলে না করতাম না।বেশ তো চলুক না কাজপয়ে হবে। কী বলছেনআপনি বলব নাবয়সে আপনি আমার থেকে অনেক ছোটঠিক আছেনা হয় তুমিই বলা যাবে। কিন্তু গল্প তো দেওয়া যাচ্ছে না।কীকী বলছেনকথা দিয়ে রাখবো?…না না। ওইটি পারবো নাকথা দিয়ে বসে থাকতে থারবো না। সে আমাকে বৃশ্চিকযন্ত্রণা দেবে।...তা বটে। বুঝছি তোমার খুব দরকারকিন্তু উপায় কি?

উপায় কি? অপর অর্থ নিরুপায়। তা সত্ত্বেও ও-পক্ষ তার নিজের নিরুপায়তার কথা ব্যক্ত করে চলে এবং কথার মাঝখানে এমন একটু কমা সেমিকোলন রাখে না, ফাঁকিটুকুতে ফুলস্টপ বসিয়ে দিতে পারেন অনামিকা দেবী।

অতএব শেষ পর্যন্ত বলতেই হয়আচ্ছা দেখি।

পক্ষের উদ্দণ্ড কণ্ঠের ধ্বনি এ ঘরের দেওয়ালে ধাক্কা মারেনা নাদেখিটেখি নয়। আমি নাম অ্যানাউন্স করে দিচ্ছি।

ছেড়ে দিলো এবার।

অনামিকা দেবীকে আর কিছু বলবার অবকাশ না দিয়ে

অনামিকা দেবী জানেনএরপর যদি তিনি সময়ে লেখা দিয়ে উঠতে না পারেনতাহলে ওই ভাবী সম্পাদক ভদ্রলোক এখানে সেখানে সকরুণ গলায় বলে বেড়াবেনকী করবো বলুনকথা দিয়ে যদি কথা না রাখেনএই তো আমাদের দেশের অবস্থা। কেউ একটু নাম করলেন কি অহঙ্কারআমাদেরও হয়েছে শাঁখের করাত। ওনাদের লেখা না নিলেও নয়–।

বলেন বটে না নিলেও নয়কিন্তু আসল ভরসা রাখেন তঁরা সিনেমাস্টারদের ছবির উপর। তারা কী ভাবে হাঁটেনকী ভাবে চলেনকোন ভঙ্গীতে কলা ছাড়িয়ে মুখে ফেলেনকোন ভঙ্গীতে দোলে আবীর ছড়ানইত্যাদি প্রভৃতি সবওই ভঙ্গীগুলিই ওদের পত্রিকার মূল জীবনীরসতা ছাড়া তো আছে ফিচার। তথাপি গল্পউপন্যাসও আবশ্যকসব শ্রেণীর পাঠককেই তো মুঠো পুরতে হবে। আর সেক্ষেত্রে ওই নাম করে ফেলা লেখকদের লেখা নেওয়াই নিরাপদপাণ্ডুলিপিতে চোখ বোলাতে হয় নাসোজা প্রেসে পাঠিয়ে দেওয়া যায়। নতুন কাগজের সম্পাদকও এ ছাড়া নতুন কিছু করবেন কি?

আগে নাকি সাংবাদিকতার একটি পবিত্র দায়িত্ব ছিল। সম্পাদকেরা নাকি লেখক তৈরী করতেনতৈরী করতেন পাঠকও অনামিকা দেবী যে সে বস্তু দেখেননি তা নয় তাঁর জীবনেই তিনি একদা সেই উদার আশ্রয় পেয়েছেন।

কিন্তু কদিনের জন্যেই বা?

সেই মানুষ চলে গেলেন।

তারপর কেমন করে যেন অনামিকা দেবী এই হাটে দাঁড়িয়ে গেছেনচালিয়ে যাচ্ছেন। বাংলা দেশের পাঠকপাঠিকারা অনামিকা দেবীকে ভালবাসে।

রিসিভার নামিয়ে রেখে আবার এসে কলম নিয়ে বসলেন অনামিকা দেবীআর ওর ভাইঝি। শম্পার কথাটা আবার নতুন করে মনে এল।

আচ্ছা পিসিতত্বার ওঠা উঠি করতে হয়ওটাকে তো তোমার লেখার টেবিলে রেখে দিলেই পারে।

অনামিকা দেবী নিজের উত্তরটাও ভাবলেননাঃ! টেবিলে টেলিফোন বসানো থাকলেঘরটাকে যেন অফিস ঘর অফিস ঘর লাগে।

হ্যাঁএই কথাই বলেন বটেকিন্তু আরও কারণ আছে। আর হয়তো সেটাই প্রকৃত কারণ। মাঝে মাঝেই একটি তাজা আর সপ্ৰতিভ গলা কথা কয়ে ওঠেশম্পাকে একটু ডেকে দিন তো!

ডেকে দেন অনামিকা দেবী।

শম্পা আহ্লাদে ছলকাতে ছলকাতে এসে ফোন ধরে। পিসির দিকে পিঠ আর দেওয়ালের দিকে মুখ করে গলা নামিয়ে কথা বলে মিনিটের পর মিনিটঘণ্টায় গিয়ে পৌঁছয়

টেবিলে রাখলে অসুবিধে উভয় পক্ষেরই। শম্পার জীবনে এখন একটি নতুন প্রেমের ঘটনা চলছে। এখন শম্পা সব সময় আহ্লাদে ভাসছে।

অনামিকা দেবী সঠিক খবর জানেন নাসত্যি কিছু আর সব খবর রাখেনও নাতবু যতটুকু ধারণা তাতে হিসেব করেনশম্পার এ ব্যাপারে এই নিয়ে সাড়ে পাঁচবার হলো। সাড়ে অর্থে এটা এখনও চলছেতার মানে অর্ধপথে।

প্রথম প্রেমে পড়েছিল শম্পা ওর দূরসম্পর্কের মামাতো দাদা বুবুলের সঙ্গে। শম্পার তখন এগার বছর বয়েসবুবুলের বছর সতেরো।

মফঃস্বলের কোনো স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাস করেজায়গার অভাবে এই দূর সম্পর্কের পিসির বাড়িতে থেকে কলেজে পড়তে এসেছিল বুবুল।

চাঁদের মত ছেলেমধুর মত স্বভাবনিঃস্বও নয়। বাপ টাকা পাঠায় রীতিমত। কার আর আপত্তি হবেপিসিরও হল না। মানে অনামিকার ছোটবৌদির।

কিন্তু জোরালো আপত্তি হল তার ভাইপোর সঙ্গে মেয়ের প্রেমে পড়ায়তিনি প্রথমে বিনিপয়সায় বাড়িতে এসেপড়া (যেগুলোর জন্যে অনামিকা দেবী দায়ীরাশি রাশি সিনেমা পত্রিকার দোষ দিলেনঅনামিকা দেবী রচিত প্ৰেমকাহিনীগুলির প্রতি কটাক্ষপাত করলেনতারপর মেয়েকে তুলে ধুনলেন এবং ভাইপোকে পথ দেখতে বললেন।

এগারো বছরের মেয়ের উপর এ চিকিৎসা চালানো গেলঅনামিকা দেবীর ছোটবৌদি ভাবলেনযাকশিক্ষা হয়ে গেল। আর প্রেমে পড়তে যাবে না মেয়ে

কিন্তু কী অলীক সেই আশা!

সাড়ে বারো বছরেই আবার প্রেমে পড়ল। শম্পাপাড়ার এক স্টেশনারী দোকানের সেলসম্যান ছোকরার সঙ্গে। খাতা পেনসিল রবার আলপিন চকোলেট ইত্যাদি। কিনতে গিয়ে আলাপের শুরুতারপর কোন ফাঁকে আলাপ গিয়ে প্ৰেমালাপের পর্যায়ে উঠে বসলো। বিনা পয়সায় চকোলেট আসতে লাগলো।

এটা বেশ কিছুদিন চাপা ছিলউদ্‌ঘাটিত হলো একদিন পাড়ার আর একটি ছেলের দ্বারা। হয়তো নিজে সে প্রার্থী ছিলতাই বলে দিয়ে আক্রোশ মেটালো।

খবরটা বাড়িতে জানাজানির পর দিনকতক শম্পার গতিবিধির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হলোশম্পার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে এনে দেওয়ার ভার নিলো তার বাবা। কিন্তু প্রয়োজন তো শম্পার জিনিসের নয়প্রেমের।

অতএব কিছুদিন মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়ালো শম্পাতারপর আবার নতুন গাছে বাসা বাঁধলো। এবারে এক সহপাঠিনীর দাদা।

এ খবরটা বাড়িতে এসে পৌঁছবার কথা নয়। কারণ সহপাঠিনী সহায়িকা। সে তার বান্ধবীকে এবং দাদাকে আগলে বেড়াতে যত রকম বুদ্ধিকৌশল প্রয়োগ করা সম্ভব তা করতে ত্রুটি করেনি।

কিন্তু খবরটা তথাপি এলো

এলো অনামিকা দেবীর কাছে।

প্ৰণয়ভঙ্গের পর।

শম্পা নিজেই তার লেখিকা পিসির কাছে বাক্ত করে বসলো। কারণ শম্পার তখন বয়স বেড়েছেসাহস বেড়েছে। একদিন অনামিকা দেবীর এই তিনতলার ঘরে এসে বললোপিসিএকটা গল্পের প্লট নেবে?

তারপর সে দিব্যি একখানি প্ৰেমকাহিনী ব্যক্তি করার পর প্রকাশ করলো প্লটের নায়িকা সে নিজেই। এবং স্বচ্ছন্দ গতিতে সব কিছু বলার পর হেসে কুটিকুটি হয়ে বলতে লাগলোবল তো পিসিএরকম বুদ্ধমার্কা ছেলের সঙ্গে কখনো প্রেম চালানো যায়না তাকে সহ্য করা যায়?

অনামিকার নিজের গল্পের অনেক নায়িকাই দুঃসাহসিকা বেপরোয়ামুখরা প্রখরা। তথাপি অনামিকা তার নিজের দাদার মেয়েনিজের বাবার নাতনীর এই স্বচ্ছন্দ বাকভঙ্গীর দিকে তাকিয়ে রইলেন অভিভূত দৃষ্টি মেলে।

শম্পা বললোলিলি তো আমার ওপর মহা খাপপাওর দাদার নাকি অপমান হয়েছে।

তা সেটাই স্বাভাবিক।

বলেছিলেন অনামিকা দেবী।

শম্পা হেসে হেসে বলেছিলতা কি করা যাবেউনিশ বছর এখনো পার হয়নিসবে থার্ড ইয়ারে ঢুকেছেবলে কি না তোমার পিসিকে বলেকয়েহি হি হি,—বিয়ের কথাটা পাড়াও!

অনামিকা দেবী মৃদু হেসে বলেছিলেনতা তুমিও তো এখনো স্কুলের গণ্ডি ছাড়াওনিসবে পনেরো বছরে পা দিয়েছ

তা আমি কিহি হিবিয়ের চিন্তা করতে বসেছি?

প্রেম করছো!

শম্পা লেশমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে বলেছিলসে আলাদা কথা। ওটা হচ্ছে একটা চার্ম। একটা থ্রিলও বলতে পারো। তা বলে বিয়েহি হি হি!

তা সেই বুদ্ধুটাকে ত্যাগ করার পর শম্পা অন্ততঃ মনমরা হয়ে বেড়ালো না। সাঁতার ক্লাবে ভর্তি হলোআবদার করে সেতার কেনালো।

মা পিসি বাপ ঠাকুমা সরাই ভাবলোএটা মন্দ নয়বেটা ছেলেদের সঙ্গে হৈচৈ করে বেড়ানোর থেকে ভাল। দাদা তখন নিজের ব্যাপারেই মগ্নএকটা স্কলারশিপ যোগাড় করে বিলেত যাবার তাল করছেতুচ্ছ একটা বোন আছে কিনা তাই মনে নেই। তাছাড়া শম্পার মাও মেয়ের ব্যাপারটা সাবধানে ছেলের জ্ঞানগোচর থেকে তফাতেই রাখতে চেষ্টা করতেন। যা কিছু শাসন চুপি চুপি

কিন্তু শম্পা চার্ম চায়।

তাই শম্পা তাদের ওই সাঁতার ক্লাবের এক মাস্টার মশায়ের প্রেমে হাবুড়ুবু খেতে শুরু করলো। বোধ করি তিনিও এর সদ্ব্যবহার করতে লাগলেন।

সাঁতারের ঘণ্টা বেড়েই চলতে লাগল এবং বেড়ে চলতে লাগলো। শম্পার সাহস।

অতএব ক্রমশঃ মা বাবা শাসন করবার সাহস হারাতে লাগলো। দাদা তো তখন পাড়ি দিয়েছে সমুদ্রপারে। শম্পার বাড়ি আরো বেড়ে যায়। শম্পাকে এক কথা বললে,—একশো কথা শুনিয়ে দেয়বাড়ি ফিরতে রাত হয়েছে বলে রাগারাগি করলে পরদিন আরো বেশী রাত্তির করেবেরোতে হবে না বললে তৎক্ষণাৎ চটি পায়ে গলিয়ে বেরিয়ে যায়। বলেহারেমের যুগে বাস করছে নাকি তোমরা?

বাবা রাগ করে বললোমরুকগে। যা খুশি করুকগে।

অনামিকা দেবী বললেনভালো দেখে একটা বর খোজো বাপুসব ঠিক হয়ে যাবে। সময়ে বার না পেয়েই মেয়েগুলো আজকাল বর্বর হয়ে উঠছে। লেখিকার মতো নয়। অবশ্য কথাটানিতান্তই মাসিপিসির মত কথা।

শম্পার মা কথাটা নস্যাৎ করলেন। বললেনসবে ফাস্ট ইয়ারে পড়ছেএক্ষুনি বিয়ে দিতে চাইলে লোকে বলবে কিতাছাড়া কৃতী ছেলেই বা পাবো কোথায় বয়সের সঙ্গে মানানোআমাদের আমলের মতো দশবারো বছরের বড় বর তো আর ধারে দিতে পারি না?

কি আর করা। তবে?

শম্পাই ছেলে ধরে বেড়াতে লাগলো। সাঁতারুকেও ত্যাগ করলো একদিন লোকটার কথাবার্তা বড় একঘেয়ে বলে।

তারপর কিছুদিন খুব উঠে পড়ে লেগে লেখাপড়া করলে শম্পামনে হলো এইবার বুঝি বুদ্ধি থিতিয়েছে।

কিন্তু নিজে মুখেই স্বীকার করে গেল একদিন শম্পা পিসির কাছেএকটা প্ৰেমট্রেম থাকবে নাকেউ আমার জন্যে হাঁ করে বসে থাকবে নাআমায় দেখলে ধন্য হবে নাএ ভালো লাগে নাবুঝলে পিসিকিন্তু সত্যি প্রেমে পড়তে পারি এমন ছেলে দেখি না!

তা যখন সত্যি প্রেমের প্রশ্ন নেইতখন আজেবাজেতেই শুধু চার্ম খুঁজলে বা ক্ষতি কিসেই সময়টায় শম্পা একজন ক্যাবলীমার্কা প্রফেসরের প্রেমে পড়লো।

প্রফেসারটি যদিও বিবাহিত।

কিন্তু তাতে কিশম্পা বললেআমি তো আর তাকে বিয়ে করতে চাইছি নাশুধু একটু ঘোল খাওয়ানো নিয়ে কথা।

সেই ঘোল খাওয়ানো পর্বটার পর কলেজলাইব্রেরীর লাইব্রেরীয়ান ছোকরার সঙ্গে কিছুদিন এখন শম্পার আর একটি চলছে।

অনামিকা আর একবার লেখায় মন দেবার চেষ্টা করেছিলেনফোনটা আবার বেজে উঠলো।

একটি তাজা সপ্রতিভ কণ্ঠ বলে উঠলোশম্পাকে একটু ডেকে দিন তো।

ডেকে দিলেন।

শম্পা উঠে এল।

বললেবাবাঃতোমার এই তিনতলায় উঠতে উঠতে গেলামকই দেখি আবার কে বকবকাতে ডাকছে!…এই নাওনীচে তোমার একটা চিঠি এসেছিল

টেবিলের ওপর খামের চিঠিটা রেখে পিসির দিকে পিঠ আর দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ালো শম্পা রিসিভারটায় কানমুখ চেপে।

অনামিকা দেবী খামের মুখটা না খুলেই হাতে ধরে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। সেজাদির চিঠি।

অনেক দিন পরে এসেছে। সেজদি আর চিঠিপত্র লেখে না।

 

কিন্তু অনামিকাই বা কত চিঠি দিচ্ছেনশেষ কবে দিয়েছেন মনেও পড়ে না। অথচ কত চিঠিই লিখে চলেছেন প্রতিদিন রাশি রাশি। আজেবাজে লোককে। সেজদি বড় অভিমানী। কাজে সারা চিঠি চায় না সে।