মৃত কৈটভ ২ – সৌরভ চক্রবর্তী

ব্রহ্মপদার্থ – ৯

(৯)

বেলা বারোটা। জঙ্গলের উত্তর-পূর্ব কোণে প্রায় তিন ঘণ্টার লম্বা ভ্রমণের পর একটি ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন সবাই। সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন গুরুদেব আর রামানুজ। দাসবাবু, কাঞ্চন, সিনহা সাহেব, ফোর্সের একাংশও রয়েছেন। তাঁরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন।

তারপর গুরুদেব একটা শিশি বের করলেন। নীল রঙের তরল রয়েছে শিশিটার ভেতরে। গুরুদেব রামানুজকে পিছিয়ে যেতে ইঙ্গিত করলেন।

রামানুজ পিছিয়ে গেল।

গুরুদেব শিশির ছিপি খুলে নীল তরল সামনে ছিটিয়ে দিলেন। আর পরক্ষণেই সেখানে ফুটে উঠতে লাগল একটা গুহা। ধীরে ধীরে সেই গুহা পরিপূর্ণ আকার ধারণ করল।

গুরুদেব বললেন, “তোমরা বাইরে দাঁড়াও। আমি আসছি। কেউ গুহার ভেতরে প্রবেশ করবে না।”

রামানুজ মাথা নাড়ল। গুরুদেব গুহামুখের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। গুহামুখের বাঁ-দিকে একটা প্রকোষ্ঠের মতো জায়গা রয়েছে। সেখানে ঢুকলেন।

কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে একটা সাদা রঙের যন্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এলেন। যন্ত্রটা খুবই ভারী গড়নের। কিন্তু তলায় চাকা লাগানো আছে। তাই গুরুদেব খুব সহজেই যন্ত্রটাকে সামনে নিয়ে এসে দাঁড় করাতে পারলেন।

রামানুজ এগিয়ে গেল। বলল, “এই সেই যন্ত্র?”

গুরুদেব হাসলেন। বললেন, “হ্যাঁ। এই সাদা যন্ত্রের মাধ্যমেই আমরা ভবিষ্যতে যাব।”

“তার মানে এই সাদা রঙের যন্ত্রই মাধ্যাকর্ষণ বাড়িয়ে দেবে?”

রামানুজের প্রশ্নে গুরুদেব অল্প কথায় ব্যাখ্যা করলেন,

“এই গুহামুখটা ভবিষ্যতে যাবার আধার। এটাকে আমি লুকিয়ে রাখি। একইরকম কর্কটেরও একটা আধার রয়েছে পাশের ফাঁকা জমিতে। কর্কট এলে নিশ্চয়ই তুমি সেটাও দেখতে পারবে। এ আধারটা পৃথিবীর কোনো অংশ নয়। তাই এর মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর নিয়মের উপর নির্ভর করে না। এখন পৃথিবীতে আছে তাই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ-এর মধ্যে কাজ করবে। এই যে যন্ত্রটা দেখছ এটা এই আধারের বাহক। এই বাহক এই আধারের মধ্যে নিজের মাধ্যাকর্ষণ যোগ করবে। এই বাহকের শক্তি শুধুমাত্র এই আধারের উপরেই ক্রিয়াশীল। এই গুহামুখের বাইরে যারা থাকবে তারা এর শক্তি অনুভব করতে পারবে না। গুহার ভেতরে টর্চের আলো ফেলো।”

গুরুদেবের নির্দেশ মতো রামানুজ গুহামুখের ভেতরে টর্চের আলো ফেলল। জেলি জাতীয় পদার্থে গুহা সম্পূর্ণরূপে ভরতি।

“এটা কী গুরুদেব?”

“সময়ের আস্তরণ। আমরা এই যন্ত্র চালনা করলে এই আস্তরণ আরও ভারী হয়ে উঠবে। তারপর আমরা এর ভেতর প্রবেশ করব। বাইরে থেকে কেউ দেখলে মনে করবে আমরা এই জেলির মধ্যে আটকে রয়েছি। অথচ ভেতরে আমরা আমাদের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারব।”

গুরুদেব বহুকাল পর নিজের সময়-যাত্রা যন্ত্রটাকে হাতের কাছে পেয়েছেন। মমতার সঙ্গে হাত বুলিয়ে রামানুজকে ব্যাখ্যা করছেন।

এরই মাঝে আরও বেশ কিছু মানুষের শব্দ শোনা গেল। সকলে ফিরে তাকাল। ঠাকুরদার বাহিনী এসে হাজির হয়েছে।

এই প্রথম ঠাকুরদা ওরফে কর্কটকে সামনে থেকে দেখল রামানুজ। পেছনের মোঙ্গলীয় যুবকটি যে কৈটভ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পেছনের ঠাকুরদার নাতিরা দুর্গাকে বেষ্টন করে দাঁড়িয়ে আছে।

গুরুদেব একা এগিয়ে গেল তাদের দিকে। রামানুজ এগোচ্ছিল, হাত

দেখিয়ে তাকে বারণ করলেন তিনি। সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন কর্কটের সামনে।

কর্কট পকেট থেকে একটা আপেল বের করে নিজের দুধ সাদা পাঞ্জাবির গায়ে মুছে নিলেন। তারপর সেটা এগিয়ে দিলেন গুরুদেবের দিকে।

গুরুদেব সেদিকে দৃকপাত অবধি করলেন না। চোখে ক্রোধের মশাল নিয়ে তাকিয়ে রইলেন কর্কটের দিকে।

“গুরুদেব, আমাকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছে, তাই তো?”

গুরুদেব কর্কটের এই তাচ্ছিল্যের জবাব দিলেন খলখলিয়ে হেসে। কর্কট তো বটেই, বাকি সকলেই এতে তাজ্জব বনে গেলেন। গুরুদেবকে এভাবে কেউই দেখেননি।

“আমি একেবারেই তোকে মারতে চাই না কর্কট। তোর সেই যোগ্যতাই নেই। শুধু ভাবছি একটা মানুষের ক্ষমতার লোভ তাকে দিয়ে কীভাবে শেষ বয়সে এসে পাপ করায়। এই কৈটভ নিজের পাপের শাস্তি পেতই। কিন্তু তুই তো গ্রাম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলি। আজ পৃথিবী দখল, ব্রহ্মাণ্ড দখলের নেশা তোকে এতটাই পেয়ে বসল যে সব ভুলে নিজের কবর নিজেই খুঁড়ছিস। তোকে মারার ইচ্ছে আমার নেই। তুই কৈটভের মতো সাপকে লালন-পালন করছিস। তোর ধ্বংস সেদিনেই লেখা হয়ে গেছে।”

ঠাকুরদার নাতিরা এসব কথায় যতটা না রেগে গেল তার চেয়ে অধিক কৈটভ রেগে গেল।

সে চিৎকার করে এগিয়ে এল গুরুদেবের দিকে। গুরুদেব তার চেয়েও অধিক চিৎকার দিয়ে বললেন,

“একদম চুপ। মিথ সংঘের মালিকের সঙ্গে কথা বলছি। পেয়াদাদের সঙ্গে না।”

কৈটভ এই অপমানে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল যেন। ঠাকুরদা তাকে হাত দেখিয়ে শান্ত করল বটে, কিন্তু কৈটভের মুখ চোখে তীব্র জিঘাংসক মনোবৃত্তি ফুটে উঠল।

ঠাকুরদা গুরুদেবকে শুধু বললেন, “আমার ক্ষমতালিপ্সা, আমার লোভ,

আমার ধ্বংস। আমি বুঝে নেব।”

নিজের পকেট থেকে একটা শিশি বের করলেন ঠাকুরদা। তাতে সবুজ রঙের তরল ছিল।

গুরুদেবের চোখে চোখ রেখে ডান হাত দিয়ে সেই তরল তিনি ছুড়ে দিলেন ফাঁকা জমির উপর।

ধীরে ধীরে সেখানে ফুটে উঠল একটা কালো রঙের গুহামুখ। কোনো গুহা যে এত কালো হতে পারে তা না দেখলে কেউ জানতেই পারত না।

কিন্তু এই গুহামুখের সামনের মুখ বন্ধ। ঠাকুরদা একা এগিয়ে গেলেন গুহার পিছন দিকে।

কী হচ্ছে সেখানে দেখার জন্য সকলেই ঘুরে গিয়ে দাঁড়াল। ঠাকুরদা একা ঢুকে গেলেন গুহাতে। এখানেও আগেরবারের মতো একটা প্রকোষ্ঠ।

সেই প্রকোষ্ঠে ঢুকে কিছুক্ষণ পর একটা কালো যন্ত্র নিয়ে বেরিয়ে এলেন ঠাকুরদা।

তারপর রামানুজের উদ্দেশে বললেন, “রামানুজ, তুমি বুদ্ধিমান উচ্চপদস্থ অফিসার। তুমি ভবিষ্যতে যাবে আর সেখান থেকে ব্রহ্মপদার্থ নিয়ে সোজা এই গুহামুখের মাধ্যমে বর্তমানে ফিরে আসবে। আশা করি এর অন্যথা হবে না।”

রামানুজও চিৎকার করে বলল, “চাইলে এক্ষুনি আপনাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করতে পারি। কিন্তু জানি তাতে কোনো সুরাহা হবে না। কিন্তু আমি তখনই গুহামুখে প্রবেশ করব যখন দুর্গাকে আপনারা ছেড়ে দেবেন। এতখানি যখন সবাই চলেই এসেছি, তখন সময়-যাত্রা ফেলে যে কেউ নড়বে না এটুকু বুদ্ধি নিশ্চয়ই আপনিও ধরেন।”

ঠাকুরদা হাসলেন। বললেন, “এতদিনে আপেল খাওয়াবার উপযুক্ত কাউকে পেলাম।”

বলেই পকেট থেকে একটা আপেল বের করে তিনি রামানুজের দিকে ছুড়ে দিলেন। রামানুজ ক্যাচটা সহজেই লুফে নিল।

লুফে নেওয়ার আগেই ঠাকুরদা ইশারায় দুর্গাকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দিলেন। দুর্গা দৌড়ে গুরুদেবের পেছনে চলে এল।

রামানুজ আপেলে কামড় দিয়ে বলল, “এই যাত্রায় আমার সঙ্গে কাঞ্চন, দুর্গা যাবে। আমার প্রয়োজন হতে পারে তাদের।

ঠাকুরদা বললেন, “প্রয়োজনে আমাকেও নিয়ে যেতে পারো। শুধু প্ল্যান যেন না পালটায়। কোনোরকম উপরচালাকি বরদাস্ত করা হবে না।”

“বেশ তবে প্ল্যান এখনই পালটে নিচ্ছি।”

রামানুজের এই কথায় ঠাকুরদা চোখ ছোটো করলেন।

“কীরকম?”

“আমি গুরুদেবকেও নিয়ে যাব। আর আপনারা এখানে থাকবেন। আমার পুলিশ ফোর্সও এখানেই থাকবে।”

এই কথা শুনে কৈটভ নিজের স্বভাবের বিরুদ্ধাচরণ করল। ঠাকুরদাকে বলল,

“আপনি এ শর্ত মেনে নেবেন না।”

ঠাকুরদা রামানুজের দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে কৈটভকে আশ্বস্ত করে বললেন, “যাবে আর কোথায়? ভবিষ্যতে লুকিয়ে থাকবে? এতটা নপুংশক এরা নয়। আর যদি না-ও আসে আমরা নাহয় ভবিষ্যতে চলে যাব। যন্ত্র তো চালু হয়েই যাচ্ছে এখন। সেটাও যদি না হয়, জগন্নাথ মন্দির থেকে শ্রীবিগ্রহ চুরির ফন্দি বের করে নেব। কঠিন কাজ। কিন্তু তুমিও তো ব্রহ্মাণ্ডের উপর কবজা করার মতো কঠিন স্বপ্নই দেখছ। ওদের যেতে দাও কৈটভ, যেতে দাও। যাও রামানুজ যাও।”

ঠাকুরদার হাতের ইশারায় একটা তাচ্ছিল্য ছিল যা রামানুজকে প্রভাবিত করে। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করে। গতকালের সেশনগুলো রামানুজকে এই শান্ত থাকতে সাহায্য করছে।

রামানুজ গুরুদেবের কাছে ফিরে গেল। দুর্গা আর কাঞ্চনকে নিজের কাছে ডেকে নিল রামানুজ। সিনহা সাহেবকে বুঝিয়ে দিল দায়িত্ব। তারপর গুরুদেবকে বলল, “আপনি যন্ত্র চালু করুন।”

গুরুদেব কিছু বলার আগেই ঠাকুরদা বললেন, “বর্তমানের প্রতি এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ভবিষ্যতের বারো থেকে কুড়ি বছর কেটে যায়। আর বর্তমানের প্রতি পনেরো মিনিটে অতীতের প্রায় পঞ্চাশ বছর। মোটামুটি এই তো হিসেব ছিল। তাই না গুরুদেব?”

গুরুদেব মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। ঠাকুরদা ওরফে কর্কট আবার বললেন,

“তাহলে সব মিলিয়ে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। এর বেশি সময় লাগলেই অ্যাকশন শুরু হবে।”

গুরুদেবের কথা বাড়াবার রুচি ছিল না। তিনি রামানুজ-সহ বাকি যাত্রীদের উদ্দেশে বললেন, “গুহামুখের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়াও।”

“যাব। তার আগে আমাকে বলুন, আমরা কি এই স্থানেই এগারো বছর পরে বেরোবো নাকি সরাসরি পুরী ধামের কাছে গিয়ে পৌঁছাব?”

রামানুজ গুরুদেবকে জিজ্ঞেস করল। গুরুদেব উত্তরে বললেন,

“দুটোই সম্ভব। কিন্তু দ্বিতীয়ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগবে। আগের চেয়ে দেড় গুণ বেশি।”

“তা লাগুক। কিন্তু আমরা সরাসরি যাব। কারণ নাহলে ফ্লাইট নিয়ে বা ট্রেন দিয়ে পৌঁছাতে দেরি হবে। আর তাছাড়া আগামী এগারো বছর পর কারেন্সিতে পরিবর্তন এসেছে কিনা আমরা জানি না। সেক্ষেত্রে মুশকিলে পড়ে যাব।”

গুরুদেব রামানুজের যুক্তিটা বুঝতে পারলেন। বললেন, “তাহলে দেড় ঘণ্টায় হবে না। আড়াই ঘণ্টা লাগবে।”

রামানুজ মাথা নাড়লেন। তারপর কর্কটের উদ্দেশে বললেন, “আমরা এখানে আসব না। সরাসরি পুরীতে যাব। তাতে যে সময় বেশি লাগবে নিশ্চয়ই জানো। দেড় ঘণ্টা না, আড়াই ঘণ্টা সময় চাই।”

ঠাকুরদা মুখ দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এত সময় অপেক্ষা করলে খিদে পেয়ে যাবে তো!” বলেই হেসে ফেললেন।

তারপর বললেন, “যুক্তিতে কথা বললে সব শুনব। দিয়া, ঢাই ঘনটা দিয়া। কিন্তু এই আড়াই ঘণ্টা কেটে গেলে কিন্তু তোমাদের রক্ষে নেই।”

রামানুজ আর কথা বাড়ায় না। গুরুদেবকে ইশারা করে নিজে গুহামুখের সামনে এসে থামল।

ঠাকুরদা গুরুদেবের দিকে ফিরতে কর্কট এগিয়ে এলেন, “এই নাও শিশি। বুঝে খরচ কোরো আর সামলে রেখো। এটা হারালে আর ফিরতে পারবে না।”

বলে সবুজ তরল পদার্থের শিশিটা গুরুদেবের হাতে দিলেন। গুরুদেবও নিজের ঝোলা থেকে একটা শিশি বের করে দিলেন। নীল রঙের তরল আছে তাতে।

“নাও, যদি আমরা ফিরে আসতে না পারি তবে আমাদের ধ্বংস করতে চলে এসো।”

গুরুদেবের কথাটা শুনে নাক কুঁচকে বিচ্ছিরি হাসলেন ঠাকুরদা। তারপর ফিরে গেলেন নিজের জায়গায়।

গুরুদেব নিজের ঝোলা থেকে বের করলেন একটা টেস্ট টিউব। রামানুজ দেখল সেই টেস্ট টিউবের ভেতরে বিদ্যুতের মতো স্পার্ক দেখা যাচ্ছে।

গুরুদেব গুহামুখের সামনে চলে এলেন। রামানুজের সামনে দাঁড়িয়ে সাদা যন্ত্রটার গায়ে ঢেলে দিলেন টেস্ট টিউবটাকে।

টেস্ট টিউবটা ভেঙে যেতেই বিদ্যুৎ প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। গুহামুখ দুটোকে আবর্ত করে বিদ্যুৎ রশ্মিগুলো ছোটাছুটি করতে লাগল। গুহার ভেতরের ভারী জেলির মতো আস্তরণ আরও গাঢ় হয়ে উঠল। হাওয়া ভারী হয়ে উঠল। তাপমাত্রা বাড়তে থাকল।

গুরুদেব বললেন, “ধীরে ধীরে এক এক করে ভেতরে ঢোকো সবাই।”

রামানুজ সবার আগে ভেতরে প্রবেশ করল। তারপর একে একে কাঞ্চন,

দুর্গা, সব শেষে গুরুদেব। সিনহা সাহেব একটু এগিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য বেশি কাছাকাছি এগোনো যাচ্ছে না।

সিনহা দেখলেন চারজনেই জেলির মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ নড়ছে না। ঠাকুরদা তাকে ডেকে নিলেন।

“পুলিশকর্তা ওরা আটকে গেছে। ভবিষ্যতে ইতিমধ্যে অনেকটা এগিয়েও গেছে। আপনি বসে বসে অপেক্ষা করুন। আপেল লাগলে বলবেন।”

ওদিকে ভেতরে প্রবেশ করা মাত্র রামানুজ দেখতে পেল গুহামুখের বাইরে ক্ষণিকের মধ্যে রাত দিন সমস্ত কিছু পালটে যাচ্ছে।

এই দিন এই রাত। অথচ গুহার ভেতরে সবকিছু কি শান্ত। দুর্গা বলল, “কোথায় যাচ্ছি, কী করছি, কেউ আমায় বলবেন?”

কাঞ্চন উত্তর দিল, “টাইম মেশিনে চড়ে ভবিষ্যতে যাচ্ছি। এর বেশি জানি না।”

দুর্গার মুখটা হতভম্বের মতো হয়ে গেল।

“আমরা টাইম মেশিনে চড়ে বসেছি?”

কাঞ্চন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। দুর্গা আর দেরি না করে ভয়ে জড়িয়ে ধরল কাঞ্চনকে।

“আরে আমায় ছাড়ো। গুরুদেব দেখছেন।”

দুর্গার সেই ভ্রুক্ষেপ অবধি নেই। সে বলে চলেছে, “আমি আর ছাড়ছি না। আর ছাড়ছি না। অনেক হয়েছে।”

রামানুজ আর গুরুদেব এক ঝলক এসব দেখে কাজে মন দিলেন। “কীভাবে কী করবে ভেবেছ?” গুরুদেব জিজ্ঞেস করলেন।

রামানুজ মাথা নেড়ে বলল, “সব ভাবা আছে। আপনি শুধু চৈত্র মাসের যে দিনটিতে বিগ্রহে ব্রহ্মপদার্থ স্থাপন করা হবে, তার আগের দিনটিতে আমাদের অবতরণ করাবেন।”

“ঠিক আছে। হাঁটতে থাকো। আসল স্থানে পৌঁছোতে হলে আমাদের গুহার ভেতর দিক দিয়ে হাঁটতে হবে। পুরী আমাদের এখান থেকে দক্ষিণ দিশায় পড়ছে। দক্ষিণমুখী ওই দেখো একটা সুড়ঙ্গ দেখা যাচ্ছে। ওই পথে হাঁটো। ওদেরকেও হাঁটতে বলো।”

রামানুজ গলা খাঁকারি দিতেই কাঞ্চন আর দুর্গার সংবিৎ ফিরল।

“কাঞ্চন ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে এগোচ্ছি আমরা। পেছন পেছন চলে আয় তোরা।”

সুড়ঙ্গের ভেতর দিকে যত তারা এগোল তারা নিচের দিকে নামতে লাগল।

এক-একটা জায়গা থেকে যখন গভীরতা আরও বেড়ে যাচ্ছিল তখন উপরে তাকালে কিছু আলোর রেখা দেখা যাচ্ছিল।

রামানুজকে সেই আলোর রেখা দেখিয়ে গুরুদেব বললেন, “আমরা কোনো একটা বছর পেরিয়ে গেলাম। এই বরাবর যদি আমরা উঠে নেমে যাই আমরা ওই বছরে এই দক্ষিণ দিকে দূরত্ব-অনুযায়ী কোনো একটি জায়গায় থাকব। হয়তো দেখা গেল সেটা আসাম বা ধরো কলকাতা। কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।”

রামানুজ গুরুদেবের এই কথায় শঙ্কিত হয়ে পড়ল, “তবে পুরী এলে বুঝব কীভাবে?”

“হাঁটো হাঁটো। পুরী এলে এই আলোক রশ্মি নীল রঙের হয়ে থাকবে। মনে নেই শিশি থেকে নীল রঙ ঢেলেছিলাম। এ এক অন্যরকম ইলিউশন। ভয়ের কিছু নেই। এটা আমিই বানিয়েছি। এই যন্ত্রের আনাচকানাচ সব জানি।”

“সবই তো বুঝলাম। কিন্তু এই জলের স্রোতটা কীসের?”

“ওটা জলের স্রোত নয়। সময়ের স্রোত। সময়ের বহমানতা বোঝাচ্ছে। কথা না বলে হাঁটতে থাকো। এটা টিভিতে দেখানো টাইম মেশিন নয় যে ঢুকবে আর বেরিয়ে যাবে। যথেষ্ট কসরত করতে হবে।”

রামানুজ আর কথা বাড়ায় না। পেছনে তাকিয়ে দেখে দুর্গা আর কাঞ্চনও কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে। সেও আপনমনে এগোতে থাকে।

এভাবে আরও আধঘণ্টা হাঁটার পর গুরুদেব থমকে দাঁড়ালেন।

“রামানুজ, ওই দেখো নীল আলো। এই নাও দড়ি। এটা দিয়ে বেয়ে উপরে উঠতে হবে।

রামানুজ দেখল গুরুদেব ঝোলা থেকে একটা লম্বা দড়ি বের করছেন। দড়ির মাথায় হুক লাগানো আছে। রামানুজ কাঞ্চনকে দায়িত্বটা দিল।

কাঞ্চন সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় দড়িটাকে নীল আলোর দিকে বাইরে ছুড়ে দিল। হুকটা উপরে আটকে গেল।

প্রথমে কাঞ্চন উঠল, তারপর দুর্গা, তারপর গুরুদেব। সবচেয়ে শেষে রামানুজ উঠে এল উপরে।

আর উঠে আসা মাত্র হাওয়ায় মিলিয়ে গেল গুহামুখ। সবাই দেখল একটা বিশাল উদ্যানের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তারা। আকাশভরা তারার আলো।

চার ভবিষ্যত-যাত্রী তারা ভরা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে। রাতের আকাশ স্বাগত জানাচ্ছে এই ভবিষ্যতচারীদের।

“গুরুদেব আমরা সত্যিই ভবিষ্যতে চলে এসেছি?”

দুর্গা অবাক চোখে প্রশ্ন করল।

গুরুদেব স্মিত হেসে মাথা নাড়লেন। কাঞ্চন বলল, “আমার ফোনের নেটওয়ার্ক কাজ করছে না। মনে তো হচ্ছে চলে এসেছি।”

রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “কোন সিম কার্ড?”

কাঞ্চন বলল, “ভোডাফোন।”

রামানুজ হেসে বলল, “আমার কিন্তু কাজ করছে ফোন। জিও নেটওয়ার্ক। তার মানে আগামী এগারো বছরের মধ্যে ভোডাফোন বন্ধ হতে চলেছে। আম্বানির ব্যাবসা ২০৩৫ এও একইভাবে চলবে।”

গুরুদেব নিজেই নিজের সৃষ্টিতে প্রায় বিমোহিত হয়ে আছেন। রামানুজ তাঁর কাছে গেল,

“গুরুদেব চলুন।”

সংবিৎ ফিরল গুরুদেবের।

“কোথায় যাব?”

“আমি আমার সিনিয়র, ত্রিবেদী স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কার মাধ্যমে এই কাজ হতে পারে। তিনি একজনের হদিশ দিয়েছিলেন। তাঁর বাড়ি মন্দিরের কাছেই। সেখানেই যেতে হবে। শুধু একটাই চিন্তা।”

“সেটা কী?”

“আশা করছি এগারো বছর পরের এই পৃথিবীতেও তিনি বেঁচে আছেন।” গুরুদেব হতাশ দৃষ্টিতে তাকালেন।

রামানুজ তাঁকে ধরে বললেন, “মজা করছি। চলুন চলুন। হাতে সময় কম।”

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের ধ্বজ দেখা যাচ্ছিল। অল্প কিছুক্ষণ, হাঁটতেই মন্দিরের দেখা মিলল।

কাঞ্চন বলল, “রাত ৯টায় বন্ধ হবে মন্দির। এখন ক-টা বাজে?”

রামানুজ বলল, “ওই দোকানটায় দেখে ঘড়ি মিলিয়ে নিয়েছি। এখন বাজে রাত আটটা।”

দুর্গা জিজ্ঞেস করল, “আমরা লোকটাকে চিনব কী করে?”

রামানুজ মোবাইলে তার ফোটো এগিয়ে দিল।

“আশাকরি এই এগারো বছরে মুখাবয়বে খুব একটা পরিবর্তন আসবে না।”

এই রাতের বেলায়ও মন্দিরে পূজার্চনা চলছে, ঘণ্টাধ্বনি হচ্ছে, দর্শনার্থীদের আগমন চলছে। সকলে এগিয়ে গেল মন্দিরের দিকে।

রামানুজ বাইরে কয়েক মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে গেল। তাঁর স্বপ্নে যিনি দেখা দিয়েছিলেন আজ সে তার হৃদয় চুরি করতে এসেছে।

রামানুজের হৃদয় তো কবেই তিনি চুরি করে বসে আছেন। অস্ফুটে রামানুজের মুখ দিয়ে বেরোল, “জয় জগন্নাথ।”

আশেপাশের লোকজনদের কেউ কেউ বলে উঠল, “জয় জগন্নাথ। জয় জগন্নাথ।”

রামানুজ মন্দিরে প্রবেশ করল। গুরুদেব সহ বাকিরা ভেতরে প্রবেশ করে দাঁড়িয়েছিলেন। রামানুজকে আসতে দেখে গুরুদেব জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা কোথায় সেই মহাশয়ের খোঁজ করব?”

“আসুন আমার সঙ্গে। আমরা এখন নীলাদ্রি বিহারে যাব। আমরা পশ্চিমদিকে প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকেছি, তাহলে এই নীলাদ্রি বিহার পড়বে বহিঃপ্রাচীর আর অন্তঃপ্রাচীরের মধ্যবর্তী জায়গায়। চলুন খুঁজি।”

সবাই রামানুজের দেখানো পথেই এগোল। বেশ কিছুটা এগোবার পর দুর্গা বলল,

“একটা আর্ট গ্যালারি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু নীলাদ্রি বিহার কোথায়?” রামানুজ চকিতে বলল, “আরে নীলাদ্রি বিহার আদতে একটা আর্ট গ্যালারি-ই। কোথায়? ওই তো চলো সবাই।”

নীলাদ্রি বিহারের ভেতরে ঢুকে সবার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। শ্রী জগন্নাথদেবের বিভিন্ন লীলা এবং শ্রী বিষ্ণুর দ্বাদশ অবতার-লীলা প্রদর্শিত হয়েছে এই আর্ট গ্যালারিতে।

অপরূপ সব শিল্পকর্ম। সকলে মুগ্ধ হয়ে দেখছে। কিন্তু রামানুজ সোজা অফিসে গিয়ে হাজির হল, “বাল্মীকি মহারাজ আছেন?” একজন মহারাজ বসেছিলেন।

তিনি চিনতে পারলেন না,

“কোন বাল্মীকি মহারাজ?”

রামানুজ আরেকবার চেষ্টা করে, “যিনি এত বছর মন্দিরের প্রধান কারিগর ছিলেন, সেই বাল্মীকি মহারাজ।”

এবার তিনি চিনতে পারলেন। বললেন, “তিনি তো আর এই কাজ করেন না। এখানে ছিলেন কিছুকাল। ২০২৪ থেকে ২০২৬ অবধি সম্ভবত তিনি নীলাদ্রি বিহারের দায়িত্বে ছিলেন। তারপর থেকে তিনি আহুলা মঠের দায়িত্বে আছেন।”

“আহুলা মঠ?”

“হ্যাঁ, এই মঠটি হেরাগোহিরি মানে যেটা পুলিশ লাইনের কাছে সেখানে অবস্থিত। সবে এখন সোয়া আটটা বাজে। আপনি তাঁকে যজ্ঞ নরসিংহদেব মন্দিরে পাবেন। আমি শুনেছিলাম তিনি এই সময়টা ওখানে পূজার্চনা করে কাটান।”

“আচ্ছা। যজ্ঞ নরসিংহদেব মন্দিরটা কোথায়?”

“একদম কাছে। আপনি ওইদিকটা ধরে হাঁটুন। গুণ্ডিচা মন্দির পাবেন। গুণ্ডিচা মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্বে প্রাচীরের কাছে যজ্ঞ নরসিংহদেব মন্দির।”

“অসংখ্য ধন্যবাদ।”

রামানুজ মহারাজজিকে প্রণাম করে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন। সবাইকে হাত দেখাতে বাকিরাও নীলাদ্রি বিহারের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।

রামানুজ আর সময় নষ্ট না করে বলল, “আমার পেছন পেছন আসুন সবাই।”

অল্প কিছুক্ষণ পর সকলে গুণ্ডিচা মন্দিরের সামনে এসে পৌঁছাল। সেখান থেকে অল্প দূরত্বে যজ্ঞ নরসিংহদেব মন্দির।

সেখানে পৌঁছানোমাত্র গুরুদেবের হাত বুকের কাছে এসে গেল, “জয় নরসিংহ দেবের জয়।”

রামানুজ বুঝল যে এখান থেকেই তো কাহিনি শুরু হয়েছিল। নরসিংহ থেকে গন্দবেরুন্দা। সে দেখল এখানে নরসিংহদেবের দুটো মুখ রয়েছে।

সামনের দিকে তাঁকে শান্ত নরসিংহরূপে দর্শন করা যায়। কিন্তু পেছনের দিকে তাঁর আর একটি মুখ রয়েছে, সেটি উগ্র নরসিংহরূপে, যা সচরাচর দেখা যায় না।

যিনি পূজারি ছিলেন তিনিই ডেকে রামানুজদের পেছনের এই রূপটি দর্শন করালেন।

রামানুজ খুঁজছিল মোবাইলে থাকা ছবিটির সঙ্গে সাদৃশ্য আছে এরকম মুখ। কিন্তু সেরকম কাউকে সে দেখতে পেল না।

তারপর পূজারি যখন বললেন, “দক্ষিণা এই পাত্রে দিন।”

তখন পূজারির দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল রামানুজ। ইনিই তো বাল্মীকি মহারাজ!

“আপনি বাল্মীকি মহারাজ?”

পূজারি পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ। আপনি কে? আজকাল আমাকে তো কেউ চেনে না।”

রামানুজের মুখ খুশিতে ভরে উঠল। অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেছে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে।

“মহারাজ আপনার সঙ্গেই আমাদের বিশেষ প্রয়োজন।”

মহারাজ বড়ো বড়ো করে তাকালেন। তারপর বললেন, “আমি কাছেই থাকি। বাইরে অপেক্ষা করুন, আসছি। কক্ষে গিয়ে কথা বলছি।”

কিছুক্ষণ পর বাল্মীকি মহারাজ বাইরে এলেন। দেখলেন আরও কয়েকজন তাঁর অপেক্ষায়। তিনি বললেন, “চলুন আমার কক্ষে।”

বর্তমানে সবাই বাল্মীকি মহারাজের কক্ষে মেঝেতে বসে আছে। সুন্দর কাজ করা চাটাই পাতা আছে। তাতেই সবাই বসেছে।

“বলুন আমি কীভাবে আপনাদের সেবা করতে পারি।”

“মহারাজজি, আমরা এই সময়ের মানুষ নই। আমরা এসেছি অতীত থেকে।”

রামানুজের সোজাসাপটা কথা শুনে বাল্মীকি মহারাজের মুখ হতভম্ব হয়ে গেল। তিনি চোখ থেকে চশমা নামিয়ে রাখলেন।

রামানুজ এক এক করে সমস্ত নির্জলা সত্য মহারাজকে বলতে লাগল। তিনি যত শুনলেন তত বেশি অবাক হতে লাগলেন।

সে এক-এক করে গন্দবেরুন্দা, কৈটভ, হেমন্তাই, কর্কট, গুরুদেব, সময় অভিযান সমস্ত বলল।

কাহিনি শেষে রামানুজ বলল, “তাই এবার আমরা এখানে এসেছি ব্রহ্মপদার্থ নিয়ে যেতে।”

মহারাজজি হাত তুলে বললেন, “এটা অসম্ভব। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু আপনারা আমাকে যে কাহিনি বলেছেন অভাবনীয়। এরকম কিছু হতে পারে তা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না।”

এবার গুরুদেব হাত জোড় করে বললেন, “আমি আপনাকে হাত জোড় করে বলছি, আপনি সাহায্য না করলে কোনোভাবেই আমরা শেষ রক্ষা করতে পারব না।”

মহারাজজি নিজেও হাত জোড় করলেন, “আপনি ওভাবে বলবেন না। কিন্তু আপনারা ব্রহ্মপদার্থ যদি পেয়েও যান সেটা তুলে দেবেন কৈটভ আর কর্কটের মতো পিশাচের হাতে! তাতে আমাদের মানবসভ্যতার চরম বিপদ ঘনিয়ে আসবে।”

রামানুজ এটা শুনে বলল, “এখানেই তো আমাদের খেলার জায়গা। আমি ওদের বিশ্বাস করিয়েছি যে আমরা ব্রহ্মপদার্থ চুরি করব এবং ওদের হাতে দিয়ে আসব। কিন্তু আমরা সেটা করব না। ব্রহ্মপদার্থ নিয়ে যাব ঠিকই কিন্তু তা আমি লুকিয়ে রাখব অতীতের গর্ভে। ওরা জানে যে ব্রহ্মপদার্থ যদি ব্যবহারই করতে হয় তবে সেটা একেবারে সর্বশেষ ব্রহ্মপদার্থটা করতে হবে। আর সেটা আছে ২০৩৫ সালে শ্রীবিগ্রহের ভেতরে। যদি আমরা সেটাই লুকিয়ে ফেলি, তাতে ওরা মুখে যাই বলুক অন্য শ্রীবিগ্রহের ভেতরের ব্রহ্মপদার্থ চুরি করবে না।”

মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন, “তাতে কী? তোমরা যেখানেই লুকিয়ে রাখো না কেন, সময় যন্ত্রের সাহায্যে সে সেখানে গিয়ে চুরি করতেই পারে।”

রামানুজ বলল, “না পারে না। সে জানবে কী করে যে কোন সালে লুকিয়ে রেখেছি। আর তাছাড়া আমি এক নয় বরং একাধিক অতীত ভ্রমণ করব। ২০১১, ১৯৯৯, ১৯৮৭, ১৯৭৫ কত জায়গায় গিয়ে খুঁজবে সে? ক্লান্ত হয়ে নিজের অভিপ্রায় পরিবর্তন করতেই হবে তাকে।”

“হুম। কিন্তু আমি তোমাদের বিশ্বাস করবই-বা কীভাবে? আর আমার হদিশই-বা তোমাদের কে দিল?”

“আমি নিজে ভারতের ফরেস্ট বিভাগে রয়েছি। আমার টপ বস মি. ত্রিবেদী খোঁজ নিয়ে আপনার কথাই জানিয়েছেন। এ কাজ যে শুধুমাত্র আপনিই করতে পারেন সেটাও উনি বলেছেন। আমি দেশের সম্পদ তথা দেশের গৌরব নিয়ে ছেলেখেলা করব না এতটুকু বিশ্বাস আপনি আমাদের করতে পারেন।”

“আচ্ছা। সেসব তো বুঝলাম। কিন্তু ব্রহ্মপদার্থ ছাড়া তো শ্রী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা “হবে না। সেটা তোমাদের দিয়ে দিলে কীভাবে হবে?”

মহারাজের এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন গুরুদেব, “একটা উপায় আছে। আমাদের বর্তমানের সাপেক্ষে ভবিষ্যতে যেমন সময় দ্রুত চলে তেমন এখানে ভবিষ্যতের সাপেক্ষে যদি ডায়মেনশনকে ভাবি তখন ভবিষ্যতের সাপেক্ষে অতীতে বা বর্তমানে সময় দ্রুত চলে। এদিক থেকে যদি যাত্রা করি তবে আমাদের বর্তমানে কিংবা অতীতে সময়ের গতির তুলনায় এখানে ভবিষ্যতে সময়ের গতি অত্যন্ত ধীরে চলবে। যে সময়ে আমরা এখান থেকে ব্রহ্মপদার্থ নিয়ে যাত্রা করে অতীতে আমাদের কাজ সেরে আবার ফিরে আসব ততক্ষণে ভবিষ্যতে অর্থাৎ আপনার সময়ে কয়েক সেকেন্ড মাত্র কাটবে। এক শ্রীবিগ্রহ থেকে অন্য শ্রীবিগ্রহে স্থানান্তরিত করার সময়ে প্রধান কারিগরের হাত থেকে যদি আমরা সেটা নিয়ে নিই এবং ঠিক স্থানান্তরের মুহূর্তে আবার যদি প্রধান কারিগরের হাতে সেটা রেখে দিই তাতে সমস্ত দিক রক্ষা পায়।”

রামানুজ জিজ্ঞেস করল, “মানে পুরোনো শ্রীবিগ্রহ থেকে নতুন শ্রীবিগ্রহে স্থানান্তরের মাঝে সময়ের মধ্যে আমাদের সমস্ত অতীত ভ্রমণ, কৈটভদের ভুল পথ চালনা ইত্যাদি করে আবার এসে মন্দিরে প্রধান কারিগরের হাতে ব্রহ্মপদার্থ দিতে হবে? এইটুকু সময়ের মধ্যে আমরা আদৌ কতটা সময় পাব গুরুদেব?”

গুরুদেব আশ্বস্ত করলেন, “যথেষ্ট সময় পাবে। মহারাজ একটাই অসুবিধে, প্রধান কারিগর আমাদের দেবেন কেন?”

মহারাজ মাথা নাড়লেন, “ওই সময় তার চোখ ঢেকে দেওয়া হয়। যদি ব্রহ্মপদার্থের কাছাকাছি ওজনের কিছু রেখে দেওয়া যায় তার হাতে, তিনি বুঝতেও পারবেন না।”

রামানুজের চোখ উজ্জ্বল হল, “বাহ, তাহলে তো হয়েই গেল। আগামীকাল সন্ধেতে কাজ শেষ হবার কথা তাই না?”

মহারাজজি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন আর বললেন, “আর এই ব্রহ্মপদার্থটা তো লুকিয়ে ফেলবেন, সেক্ষেত্রে এখানে প্রধান কারিগরের হাতে

কোনটা তুলে দেবেন।”

“অতীতে আমরা যখন মন্দিরে যাব, সেই সময়ের ব্রহ্মপদার্থটা নিয়ে আসব।”

রামানুজের উত্তরে মহারাজ বললেন, “তাহলে ১৯৭৫ সালে চলে যাবেন। সে বছর আমি আমার ঠাকুরদার সঙ্গে ব্রহ্মপদার্থ পালটাতে সাহায্য করেছিলাম। আমার হাতে কিছুক্ষণ ছিল ব্রহ্মপদার্থ। সেই সময়ে সহজেই আপনারা এই কাজ করে ফেলতে পারবেন।”

দুর্গা এটা শুনে বলল, বাহ, তাহলে তো খুব সহজেই সম্ভব। বাচ্চাদের সঙ্গে আমার মিশে যেতে কম সময় লাগে। আশ্রমেও তাই বাচ্চাদের সামলাই আমি। এটা আমি করতে পারব।”

মহারাজ বললেন, “যাই করুন না কেন? দিনের শেষে যে সময়ে ব্রহ্মপদার্থ যেখানে আছে সেখানে থাকা চাই। কীভাবে করবেন আমি জানি না। মানব কল্যাণের খাতিরে কাজটা করছি ঠিকই কিন্তু এর যেন কোনো অন্যথা না হয়।”

গুরুদেব কথা দিলেন, “আমি কথা দিচ্ছি। আপনি যা বললেন সেটাই হবে। আপনাকে দেওয়া কথা আমরা রাখব।”

“ঠিক আছে। জয় জগন্নাথ।”

সকলে মিলে বলে উঠলেন, “জয় জগন্নাথ।”

রাতে দুধ আর রুটি খেলেন সকলে। খাওয়ার সময় মহারাজ বললেন, “মূল মন্দিরে একটি গুপ্ত প্রকোষ্ঠ রয়েছে। বর্গী আক্রমণ করলে শ্রীবিগ্রহকে পাতালে লুকিয়ে রাখার জন্য এই প্রকোষ্ঠ ব্যবহার করা হয়। এই প্রকোষ্ঠের অপর প্রান্ত কোথায় আছে সেটা আমি জানি। আমাদের সেই পথেই মন্দিরে ঢুকতে হবে।

“কিন্তু মহারাজ কাল ভোর থেকে তো সি আর পি এফ শহরের চার্জ নিয়ে নেবে। সেক্ষেত্রে আমরা সেখানে যাব কখন।”

রামানুজের প্রশ্ন শুনে বাটিতে থাকা বাকি দুধ সুরুত সুরুত শব্দে টেনে নিলেন বাল্মীকি মহারাজ।

তারপর উঠে দাঁড়ালেন, “যা করার আমাদের আগামী এক ঘণ্টার মধ্যেই করতে হবে। সবার খাওয়া হয়ে গেলে উঠে পড়ুন। যাত্রা শুরু করতে হবে।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলে বেরিয়ে পড়লেন। চৈত্র মাসের নিঝুম রাত। বেশ গরম। ওরা যখন রওনা দিয়েছিলেন তখন ছিল জানুয়ারির ঠান্ডা। এখন এই গরমে সকল ভবিষ্যতচারীরাই সোয়েটার জাতীয় পোশাক খুলে ফেলেছেন। ওটা সম্ভব অন্ধকার রাস্তা দিয়ে মহারাজজি তাঁদের নিয়ে চলেছেন। এই এলাকার সমস্ত কিছু হাতের চেটোর মতো চেনেন তিনি।

“দেখে আসবেন সবাই। এই জায়গাগুলো একটু পিচ্ছিল।” প্রয়োজনীয় সাবধানবাণী দিয়ে সকলকে নিয়ে এগোচ্ছিলেন তিনি। রামানুজও একদম শেষে চারদিকে চোখ কান খোলা রেখে এগিয়ে চলেছে। পুরীর রান্নাঘর জগৎবিখ্যাত এক স্থান। বলা হয় এই রান্নাঘরের প্রসাদ কাউকে অভুক্ত ফিরতে দেয় না। অথচ ভক্ত সমাগম শেষের পথে আগুন নিভে যায় এই রান্নাঘরে।

বিশ্বের অন্যতম বড়ো রন্ধনশালা পুরীর জগন্নাথ ধামের পাকঘর। সেটার পিছন দিয়ে যাবার পথে প্রসাদের সুমিষ্ট ঘ্রাণ নাকে আসছে। বাল্মীকি মহারাজজি মাঝে মাঝে ‘জয় জগন্নাথ’ বলে উঠেন। রন্ধনশালা পেরিয়ে যাবার সময়েও তাই করলেন।

এক সময় সকলকে দাঁড় করিয়ে বাল্মীকি মহারাজ একা এগিয়ে গেলেন।

অল্প সময় পর ফিরে এসে বললেন, “কেউ নেই। দেখে এলাম। দেরি করবেন না। তাড়াতাড়ি আসুন।”

একটি বড়ো গাছের গুঁড়ির পাশে একটা বেদি রয়েছে। সেটার সামনে সবাইকে নিয়ে গেলেন।

“রামানুজবাবু বেদির ওইদিকটা ধরুন। রামানুজ নির্দেশ মতো ধরল।

“এবার চাপ দিন।”

চাপ দেওয়া মাত্র ঘড় ঘড় শব্দে কিছুটা ঘুরে গেল বেদি। খুব বেশি জায়গা নেই। অল্প ফাঁক হয়েছে।

“এক এক করে ঢুকে পড়ুন সকলে। আমি শেষে ঢুকব এবং বেদিটাকে আবার স্বাভাবিক করে দেব। ওটা আপনারা পারবেন না।”

সবাই একে একে ঢুকে পড়ল বেদির ভেতরে। শেষে মহারাজ প্রবেশ করলেন আর বেদিটাকে আবার আগের মতো স্বাভাবিক করে দিলেন ভেতরের যন্ত্রাংশে চাপ দিয়ে। এখন আর কেউ ধরতে পারবে না এটা আসলে কী।

টর্চ জ্বালিয়ে নিচে নামতে হচ্ছে। এতই অন্ধকার এই গহ্বর। মহারাজ ফিশফিশিয়ে বললেন, “কেউ কোনো শব্দ করবেন না। এর টেকনোলজি এরকম যে কথা বললে গর্ভ গৃহে শোনা যাবে। এতে আমরা ধরা পড়ে যাব। কাশি, হাঁচি একেবারেই দেওয়া যাবে না।”

সকলে এই আদেশ পালন করবে বলে বদ্ধপরিকর হল। অন্ধকারে এগোতে লাগল একটা টর্চের আলোকে সম্বল করে।

অনেকপথ হাঁটার পর মহারাজ হাতের ইশারায় বসে পড়তে বললেন। আবার ফিশফিশিয়ে বললেন, “আগামীকাল অবধি আমরা এখানেই থাকছি।”

সবাই অপেক্ষা করুন। ততক্ষণ আর কিছুই করার নেই। সবাই অন্ধকারের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে অপেক্ষা করতে থাকল।

ওদিকে ২০২৪ সালে গুহামুখের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠাকুরদা, কৈটভ-সহ সিনহা সাহেবের সম্পূর্ণ টিম। ঠিক করে এক ঘণ্টাও কাটেনি।

মাঝে সিনহা সাহেব নিজের মাথা খাটিয়ে একবার ঠাকুরদার ও তার দলবলকে অ্যারেস্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই কৈটভ-সহ পুরো মিথ সংঘ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সিনহা আর তার ফোর্স পাগলের মতো খুঁজেও তাদের পেল না। হতাশ হয়ে আবার নিজের জায়গায়

ফিরে আসার পর দেখা গেল ওরা আবার যথাস্থানে ফিরে এসেছে। ঠাকুরদা বললেন, “তুমি চালাক কিন্তু আমরা অতি চালাক। সমানে সমানে যেহেতু হচ্ছে না শুধুশুধু পরিশ্রম কোরো না। তোমার বড়োবাবু বুদ্ধিমান, তাই শুরুতেই আমাদের কথায় রাজি হয়ে গেছেন। আবার এগোলে এবার যে গায়েব হব আর ফিরব না। ঠিক যেমন সেদিন গাড়িটা খুঁজে পাওনি সেরকম। তারপর রামানুজবাবুকে জবাব তুমি দেবে। কেমন!”

সিনহা আর কথা বাড়াননি। বর্তমানে তিনি আর একবার উঠে গিয়ে দেখে এলেন। সবাইকে এখনও জেলির মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। তবে আগের চেয়ে একটু ভেতরের দিকে। এরকম কিম্ভুতকিমাকার কেস সিনহা জন্মে দেখেননি। মাঝে মাঝে কৈটভের দিকে তাকাচ্ছেন তিনি। সে এক দৃষ্টে গুহামুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

সিনহা সাহেবের এদিক থেকে ওদিক করার মাঝে ২০৩৫ সালে ইতিমধ্যে একদিন কেটে গেল। সকলে এবার প্রকোষ্ঠের মুখের কাছে দাঁড়িয়ে। ওপারে প্রধান কারিগর মইয়ের উপরে উঠেছেন পুরোনো শ্রীবিগ্রহ থেকে ব্রহ্মপদার্থ বের করার জন্য।

বাল্মীকি মহারাজ ঝোলা থেকে বের করে দস্তানা পরে নিলেন। বললেন, “আমি নিয়ে আসছি। এই গর্ভগৃহের সমস্ত কিছু আমার চেনা। কোথায় ক-কদমে কী আছে সব জানি।”

“হ্যাঁ, আপনিই নিয়ে আসুন।” রামানুজ বলল।

“এই বস্তাটা ধরুন। এটা মোটা কাপড়ের তৈরি। ব্রহ্মপদার্থ নীল আলো ছড়িয়ে দেবে। সেটা ঢেকে রাখা খুব মুশকিল। এই বস্তায় ঢোকাতে হবে।”

মহারাজ রামানুজের দিকে এগিয়ে দিলেন বস্তাটা। সে সেটা নিয়ে নিল।

মহারাজ থলের ভেতর থেকে একটা কৃত্রিম ব্রহ্মপদার্থের ওজনের বস্তু বের করে নিজের কাছে রাখলেন। এটাই তিনি আসলটার পরিবর্তে প্রধান কারিগরের হাতে আপাতত প্রতিস্থাপিত করবেন।

আর সময় নষ্ট না করে প্রকোষ্ঠের দরজা খুলে ফেললেন মহারাজ। বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

রামানুজ-সহ বাকি সবাই দেখলেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে চারদিক একটা অদ্ভুত নীল আলোয় ভরে উঠেছে। প্রকোষ্ঠের ভেতরেও এই তীব্র নীল আলোর বিচ্ছুরণ এসে পড়েছে। বাইরে জগন্নাথদেবের জয়গান শুরু হয়ে গেছে।

এসবের মাঝেই একসময় বাল্মীকি মহারাজ এসে পৌঁছালেন প্রকোষ্ঠের ভেতরে।”

“বস্তা খোলো। জলদি খোলো।”

রামানুজ বস্তা উঁচিয়ে ধরল। বাল্মীকি মহারাজ তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন ব্রহ্মপদার্থ। দরদর করে ঘামছেন মহারাজ। তাঁর সারা দেহে ঘাম।

“আপনি ঠিক আছেন?” গুরুদেব জিজ্ঞেস করলেন। বাল্মীকি মহারাজ হাত জোড় করে বললেন, “অনুরোধ করছি, তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। এর অন্যথা যেন না হয়।”

গুরুদেব জড়িয়ে ধরলেন মহারাজকে। “তাই হবে মহারাজ তাই হবে।” রামানুজও বস্তার মুখ দড়ি দিয়ে আটকে ফেলল। কাঁধে নিয়ে নিল এই বস্তা।

“গুরুদেব আর দেরি নয়। সময়-যাত্রা শুরু করুন। সবচেয়ে আগে যাব ২০১১ তে। ত্রিপুরায় আপনাদের গ্রামে যাব। ক্রিয়া অনুষ্ঠানের আগের দিনে চলুন।”

গুরুদেব কোলাকুলি সেরে বললেন, “ওখানে কী হবে?”

“কৈটভের জন্য প্যারাডক্সের সৃষ্টি করব যাতে সে বিভ্রান্ত হয়। আপনি সময়-যানকে ডাকুন।”

গুরুদেব আর দেরি করলেন না। কর্কট আসার সময় যে সবুজ তরল দিয়েছিল তা ছিটিয়ে দিতেই বন্ধ প্রকোষ্ঠের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি কালো গুহামুখ সৃষ্টি হল। এটারও সামনের দিকে কোনো প্রবেশপথ নেই। আছে পিছনদিকে। সবাই গুরুদেবকে অনুসরণ করে পেছনে গিয়ে ঢুকে পড়ল সেই

গুহামুখে। কালো রঙের যন্ত্রটা ওখানেই ছিল। গুরুদেব ঝোলা থেকে বের করে তাতে একটা টেস্টটিউব ভেঙে দিলেন। আবার তৈরি হল এক বজ্র বিদ্যুতের আবর্ত। বাইরে মহারাজজি ভয়ে দু-কদম পিছিয়ে গেলেন। পিছিয়ে যেতে যতটুকু সময় লাগল তার ভগ্নাংশের মধ্যে গুহামুখ-সহ সকলে অদৃশ্য হয়ে গেল।

এবারে রামানুজরা আর আগেরবারে মতো হাঁটছে না। ওরা যেন কোনো একটা গহ্বরে নিরন্তর গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। কত অতলে গিয়ে থামতে হবে তারা জানে না। এভাবে বেশ কিছুটা সময় পার করার পর হঠাৎই কাঞ্চন গড়িয়ে পড়ল ঘাসের উপর। একে একে সবাই গড়িয়ে পড়লেন ঘাসের উপর। যে গোলাকৃতি আলো বিচ্ছুরণকারী পদার্থ থেকে ওরা গড়িয়ে পড়ল সেটি ওরা গড়িয়ে পড়া মাত্র অন্তর্ধান হয়ে গেল।

“কারও বেশি লাগেনি তো?”

গুরুদেব নিজের গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে জিজ্ঞেস করলেন।

“আমরা সবাই ঠিক আছি গুরুদেব।”

দুর্গাও উঠে দাঁড়িয়েছে। রামানুজ উঠে বস্তাটা কাঁধে ফেলে বলল, “এটা আমরা বড়ো রাস্তার ওপারের জঙ্গলে এসে পড়েছি। হেমন্তাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে হবে। গুরুদেব চলুন।”

গুরুদেব এখন আর রামানুজকে প্রশ্ন করছেন না। রামানুজ নিশ্চয়ই সবটা বুঝেশুনেই কাজ করছে।

গুরুদেব সোজা বড়ো রাস্তা পেরিয়ে গ্রামের পথ ধরল। গ্রামবাসী সকলে দুর্গা আর কাঞ্চনকে দেখে অবাক হল। কারণ ওদের এত বড়ো হতে এরা দেখেনি। কিন্তু গুরুদেব সঙ্গে থাকায় কেউ কিছু বলল না। সকলে প্রণাম করল। রামানুজকেও কেউ চিনতে পারল না। গুরুদেব সটান গিয়ে হাজির হল হেমন্তাইয়ের দরজায়।

“হেমন্তাই, ও হেমন্তাই?”

কাঞ্চনের বুকে দুরু দুরু শব্দ শুরু হয়েছে। কতকাল পর সে আবার নিজের

বাবাকে দেখতে পাবে। একই অবস্থা রামানুজের। ঘরের থেকে ভেসে এল,

“কে…? গুরুদেব নাকি?”

হেমন্তাই কটিদেশে লাল পরিধেয় বস্ত্রটি পরে বেরিয়ে এলেন।

“প্রণাম গুরুদেব।”

“ভেতরে বসে কথা বলব।”

“আসুন।”

“তোমরা সবাই এসো।”

গুরুদেব সবাইকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন। একটা খাটিয়া আর বেতের মোড়া মিলিয়ে সকলে বসে পড়ল।

“গুরুদেব আজ হঠাৎ আমার গৃহে এলেন?”

হেমন্তাই বুঝতে পারছিলেন না। হেমন্তাই-কে দেখে রামানুজ আর কাঞ্চনও বিহ্বল হয়ে আছে।

“একে চিনতে পারছ?”

কাঞ্চনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালেন গুরুদেব। হেমন্তাই তার দিকে তাকিয়ে বেশ অবাক হলেন। বললেন, “আমাদের কাঞ্চনের মতো লাগছে। কাঞ্চন বড়ো হলে এরকম দেখতে হবে।”

গুরুদেব বললেন, “এটা কাঞ্চন-ই। কাঞ্চন বড়ো হয়েই এরকম দেখতে হয়েছে। যাও কাঞ্চন বাবার কাছে যাও।”

কাঞ্চন হেমন্তাইয়ের কাছে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। হেমন্তাই কিছু বুঝতে পারছেন না। এভাবে কেউ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলে সামলাবার জন্যেও তার পিঠে হাত রাখতে হয়। সেভাবেই হেমন্তাই তাঁর পিঠে হাত রাখলেন। মুখে বললেন,

“কাঞ্চন তো আপনার আশ্রমে। আজ সকালেও দেখা হল। এরই মধ্যে…”

গুরুদেব বললেন, “ওই আশ্রমে এখন আমিও আছি। আর এই আমিটা এসেছি ভবিষ্যৎ থেকে। ইনি ফরেস্ট অফিসার রামানুজ। এ হচ্ছে আমাদের ছোট্ট দুর্গা। আর তোমার বুকে যে আছে সে হচ্ছে তোমার পুত্র কাঞ্চন।”

হেমন্তাই বিশ্বাস করতে পারল না ঠিকই, কিন্তু কাঞ্চন যখন বাবা বাবা করে ডাকতে লাগল হেমন্তাইয়ের মধ্যেও পরিবর্তন দেখা গেল।

“হ্যাঁ বাবা কাঁদছ কেন?”

বলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কাঞ্চন কেন কাঁদছে সেই কারণটা আর হেমন্তাইকে বলা হল না।

রামানুজ আসল কথায় ঢুকে পড়ল, “আগামীকাল আপনি ক্রিয়াদি সম্পন্ন করবেন। সেখানে কৈটভ বলে এক শিক্ষার্থীকে আপনার জঙ্গলে পাঠাবার কথা। নিশ্চয়ই এতক্ষণে কৈটভের এক্সয়ন সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। আপনি এখনই আশ্রমে যাবেন এবং এই সময়ের গুরুদেবের সঙ্গে কথা বলবেন। যেভাবেই হোক আগামীকাল কৈটভের জঙ্গলযাত্রা আটকাতে হবে।”

হেমন্তাই কাঞ্চনকে বুকে নিয়েই বলল, “আপনি বাইরের লোক হয়ে এতসব জানলেন কী করে?”

রামানুজ শান্তভাবে বোঝাল, “আজ থেকে বারো বছর পর এরকম কিছু ঘটনায় আমি এই গ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ব। তখনই আমি সব জানতে পারব। আপাতত এটুকু বুঝুন যে আপনাকে যেটা করতে বলছি সেটা এই গ্রামের ভালোর জন্যেই। আমাদের হাতে সময় কম। নইলে অনেকটা পথ হেঁটে আশ্রমে গিয়েই সবাইকে বলতাম।

কাঞ্চনকে পাশে দাঁড় করিয়ে হেমন্তাই বললেন, “কৈটভ ভবিষ্যতে কী করবে?”

গুরুদেব বললেন, “ভবিষ্যতে কী হয়েছে তা সমস্ত পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষভাবে আগে থেকে জেনে নেওয়া প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ। এতটুকু বলতে পারি কৈটভ আমাদের গ্রামের পক্ষে ক্ষতিকারক। এতটাই ক্ষতিকারক যে ওর জন্য বহু

অনিষ্ট হবে এই গ্রামে। কিন্তু এই সময়কালে সে একটা সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ শিক্ষার্থী। ওকে আপাতত জঙ্গলে যাওয়া থেকে বিরত করো। তাহলেই সমস্ত কিছুর সমাধান হয়ে যাবে। ওর অনিষ্ট কোরো না।”

“যথা আজ্ঞা। আগামীকাল তো রাতের বেলায় ক্রিয়াদি অনুষ্ঠিত হবে। আপনারা কি ততক্ষণ থাকবেন?”

গুরুদেব মাথা নাড়লেন, “আমাদের অনেকগুলো কাজ বাকি। যেটা বললাম সেটা করো। আমরা আসি।”

সকলে উঠে পড়ল। রামানুজ এগিয়ে গেল হেমন্তাইয়ের কাছে।

“অতি অল্প সময়ে আপনার সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। খুব মনে পড়েন আপনি।”

দু-হাত খুলে আহ্বান করল সে হেমন্তাইকে। হেমন্তাইও খুশি মনে জড়িয়ে ধরল।

“গুরুদেব যখন ঠিক করেছেন যে আপনি আমাদের পরম বন্ধু, তখন আপনি আমারও পরম বন্ধু।”

“এবার আসি।”

গুরুদেব ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে বাকিরাও।

গ্রামবাসী হেমন্তাইয়ের ঘরে মানুষের ভিড় দেখে জমায়েত করেছিল। গুরুদেবকে প্রণাম করছিল সবাই। গুরুদেব সবাইকে হাত তুলে আশীর্বাদ করলেন।

তারপর একটা ফাঁকা জায়গা দেখে সেখানে সবুজ রঙের তরল কিছুটা ছিটিয়ে দিলেন। চোখের পলক পড়ার আগে সেখানে কালো গুহামুখের সৃষ্টি হল।

যাত্রীরা সবাই একে একে গুহামুখের পেছনে প্রবেশ করল। গুরুদেব সবার শেষে উঠলেন সবাইকে হাত দেখিয়ে।

“এবার কোথায় যাবে?”

গুরুদেবের প্রশ্নের উত্তরে রামানুজ বলল, “আবার এই গ্রামে? কৈটভের মা-বাবা বিবাহের আগের দিন।”

কালো যন্ত্রের উপর টেস্ট টিউবটা আছড়ে ভেঙে দিতেই আবার সেই বৈদ্যুতিক প্রবাহের সৃষ্টি হল। গ্রামবাসীরা ভয়ে দূরে সরে গেল। তারপর একসময় চোখের নিমেষে গুহামুখ অদৃশ্য হয়ে গেল। গ্রামবাসীরা তাজ্জব বনে গেল। হেমন্তাই আশ্রমের উদ্দেশে রওনা দিলেন।

কৈটভের বদলে অন্য ছাত্রকে পাঠাতে হবে।

আশ্রমে পৌঁছে তিনি গুরুদেবকে সমস্ত বৃত্তান্ত বললেন। গুরুদেব ভারি চিন্তায় পড়লেন।

“যদি বারো বছর পর কৈটভের জন্য এরকম অবস্থার সৃষ্টি হয় তবে কৈটভকে শুধু তালিকা থেকে সরালে হবে না।”

হেমন্তাইয়ের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল।

“তবে?”

গুরুদেব বললেন, “তুমি ঠিকই বুঝতে পেরেছ। কৈটভকে বিশেষ কক্ষে ডেকে নিচ্ছি। তুমিও থেকো।”

গুরুদেব বেরিয়ে গেলেন। হেমন্তাইকে ভবিষ্যতের গুরুদেব এরকম কোনো কাজ করতে বারণ করেছে আর বর্তমানের গুরুদেব এরকম এক কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। হেমন্তাই ধর্মযুদ্ধের মাঝখানে পড়লেন।