Course Content
লোকায়ত জীবন ও লোকসাহিত্য – সুমনকুমার দাশ
লোকায়ত জীবন ও লোকসাহিত্য – সুমনকুমার দাশ
0/40
লোকায়ত জীবন ও লোকসাহিত্য – সুমনকুমার দাশ

চৈত-বোশেখের বান্নি

আশির শেষে, নব্বইয়ের গোড়ায় আমার দেখা গ্রামীণ মেলা বছর পঁচিশের ব্যবধানে কেমন যেন পালটে গেছে। কেবল চৈত্র-বৈশাখ মাসে বাংলাদেশের ভাটিঅঞ্চলে অন্তত শো-চারেক মেলার আয়োজন হয়। বারোয়ারি এসব মেলা। গ্রামের মানুষ এসব মেলাকে ‘বান্নি’ (বরুণ>বারুণী>বান্নি) বলতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। তো, এই বান্নি গ্রামাঞ্চলে এখনও ঘটা করে পালিত হয়, এখনও প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে। তবে ফি-বছর দর্শনার্থী কমছে। মেলা থেকে ক্রমশ নির্বাসিত হচ্ছে বাঁশ ও বেতের সামগ্রী, মৃৎশিল্প, লৌহ ও কাঁসা শিল্প, পুতুলনাচ, সার্কাস, নাগরদোলা, লাঠিখেলা। সংকুচিত হচ্ছে মেলার পরিসর। আগে যেমন আড়ালে-আবডালে লোকালয়ের কিছুটা বাইরে জুয়াখেলা চলত, এখন কোনও রাখঢাক না-রেখে অনেকটা প্রকাশ্যেই চলে সে আয়োজন। জুয়াখেলাই যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে মেলার প্রধানতম অনুষঙ্গ! এরপরও বাংলার জনপদে তারিখ-তিথি মেনে ঐতিহ্য-পরম্পরায় মেলা আসে। আর বাঙালির লোকায়ত জীবনে মেলা মানেই উৎসব ও নানা আচার-বিশ্বাস-সংস্কার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক-ঠিক বলেছিলেন, ‘উৎসব একলার নহে’। সত্যিই তা-ই। গ্রামীণ সমাজে মেলা মানেই পার্বণ, ঘরে-ঘরে নাইয়রি আর ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে প্রচুর মানুষের মিলনমেলা। শচীন দেববর্মণের কণ্ঠে এক স্বজন-বিরহিণী নারীর বরাতে ‘আমার ভাইধন রে কইও নাইয়র নিত বইলা’ বলে যে করুণ আকুতি ঝরে, সে সুরটাই যেন এই চৈত্র-বৈশাখ মাসে ভাটিঅঞ্চলে আয়োজিত মেলাগুলো গ্রামীণ নারীদের উসকে দেয়। তাঁরা উদগ্রীব হয়ে থাকেন-কখন বাপের বাড়ি থেকে ভাই কিংবা স্বজন আসবেন, আর তিনি নাইয়র যাবেন। যাঁরা নাইয়র যেতে পারেন না কিংবা কোনও কারণে যাওয়া হয় না, তাঁদের জন্য মেলা থেকে কেনা সাবান, সিঁদুর, স্নো-পাউডার কিংবা অন্য কোনও সামগ্রী নিয়ে পরদিনই হাজির হন ‘ভাইধন’রা। তবে আমাদের শৈশব আর বাল্যে দেখা এ আচার-সংস্কৃতিতে এখন চির ধরেছে, অনেকটাই লোপ পেতে চলেছে।

গ্রামীণ মানুষ ঐতিহ্য-পরম্পরায় চিরকালই বিনোদনপ্রিয়। তাই উপলক্ষ যাই হোক, সেখানে অনায়াসেই ঢুকে পড়ে আরও নানা কৃষ্টি-আচার-সংস্কৃতি। যেমন, গ্রামীণ মেলার কথাই যদি ধরি, তাহলে দেখা যায়-সাধারণত যেকোনও লৌকিক দেবদেবী।পিরের আবির্ভাব কিংবা তিরোধান তিথি অথবা চৈত্রসংক্রান্তি কিংবা বাংলা নববর্ষ, এসব উপলক্ষেই মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। কিন্তু শেষতক সেটা আর বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে না, সেটা হয়ে পড়ে হিন্দু-মুসলিম সব মানুষের মিলনমেলা। ধর্মীয় আচার।রীতিনীতির অংশটুকু ছাড়া সবখানেই সব ধর্মের মানুষের থাকে সমান উপস্থিতি। আর তাই তো যে উপলক্ষেই মেলার আয়োজন হোক, সেখানে সংগত কারণেই কিছু পৃথক উৎসব।আয়োজন ঘনিষ্ঠমাত্রায় সংযুক্ত হয়ে পড়ে। আর মেলা উপলক্ষে আয়োজিত ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই, পুথিপাঠ, কবির লড়াই, বাউলগানের আসর-এ সংযুক্তিরই একটা অংশ।

বছরজুড়েই গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় নানা ধরনের লোকমেলার চল রয়েছে। তবে চৈত্র-বৈশাখ মাসের মেলা অন্যসব আয়োজন থেকে একটু পৃথক। এ সময়ের মেলাগুলোর বর্ণিল রূপ ও ঐতিহ্য ইতোমধ্যেই আলাদা সত্তা ও অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। এসব মেলার অধিকাংশই কয়েক শ বছরের প্রাচীন। ভাটিঅঞ্চলের প্রাচীন মেলাগুলো সচরাচর নদীর পার ও বটগাছের নিচে হয়ে আসছে। এর বাইরে বিস্তীর্ণ মাঠ ও খোলা প্রান্তরে মেলা আয়োজনের রেওয়াজও প্রচলিত রয়েছে। পুরুষেরা মেলা থেকে পরিবারের সদস্য।আত্মীয়স্বজনদের জন্য ভালো কিছু সওদা করে আনেন আর নারীরা বাড়িতে বসে মুখরোচক।মজাদার খাবারের আয়োজন করেন। ‘শালি ধানের চিড়ে, বিন্নি ধানের খই, নতুন চালের পিঠাপায়েস, গামছা বাঁধা দই’-সত্যিকার অর্থেই গ্রামের খাবারদাবার সম্পর্কে প্রচলিত এ প্রবচনের উপস্থিতি গ্রামীণ জনসংস্কৃতিতে ব্যাপকমাত্রায় লক্ষ করা যায়।

কিন্তু বছরের অন্য সময় বাদে কেনই-বা চৈত্র ও বৈশাখ মাসে মেলা প্রাণ ফিরে পায়? এর কারণ হচ্ছে হাওরের আশিভাগ মানুষ কৃষিজীবী, তাই চৈত্র-বৈশাখ মাসে এখানকার প্রায় সব মানুষ তাঁদের একমাত্র বোরো ধান তুলতে ব্যস্ত সময় পার করেন। ধান কাটা, মাড়াই, রোদে শুকানোর পর গোলায় তোলা, কৃষকদের কাজের তো আর শেষ নেই। তাই এ সময়টাতে বিনোদনেরও তেমন ফুসরত থাকে না। এ অবস্থায় তাদের কাছে মেলার একেকটা দিন হাজির হয় অবকাশযাপনের উপলক্ষ হিসেবে। তাই দিনের পর দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর একদিন অবকাশযাপনের সুযোগ পেয়ে গ্রামের হাজারো-লাখো মানুষের সমাগমে মেলা প্রাণবন্ত রূপ নেয়, আর তখন সেটি হয়ে দাঁড়ায় সত্যিকার অর্থেই মিলনমেলায়।

হাওরের মানুষের এই মিলনমেলা অত্যাধুনিক নব্য-সংস্কৃতির ঠেলায় এখন অনেকটাই উবে যেতে বসেছে। নাব্যতা হারিয়ে বছর-বছর যেমন করে ভরাট হচ্ছে নদনদী, জলবায়ুর প্রভাবে যেমন করে ফি-বছর কমছে হাওরের পানি, তেমনইভাবে আধুনিক সভ্যতা ও তথ্য-প্রযুক্তির চাপে ক্রমশ পিষ্ট হতে চলছে ভাটিঅঞ্চলের মেলাগুলো, দেশের মেলাগুলো। পয়সার অভাবে মেলা থেকে একটি রাঙা লাঠি কিনতে না-পারার দুঃখে কাতর এক ছেলের ভেতরকার আর্তনাদ অনুভব করে যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘সুখদুঃখ’ কবিতাটি, তবু কেমন যেন সে-বর্ণনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে মেলার বর্তমান রূপটিও। কতই-না প্রাসঙ্গিক কবিতার শেষ চার পঙ্ক্তি-‘চেয়ে আছে নিমেষহারা,। নয়ন অরুণ-। হাজার লোকের মেলাটিরে। করেছে করুণ।’ দিনে-দিনে গ্রামীণ মেলা করুণ রূপ পাচ্ছে, বিবর্ণ হচ্ছে, সেসঙ্গে লুপ্ত হতে চলেছে মেলাকেন্দ্রিক লোকাচারগুলো। এটি রোধ করার কোনও পথই কি আর আমাদের সামনে উন্মুক্ত নেই?