Course Content
শ্যামাপ্রসাদ : বঙ্গবিভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ – দীনেশচন্দ্র সিংহ
শ্যামাপ্রসাদ : বঙ্গবিভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ – দীনেশচন্দ্র সিংহ
0/17
শ্যামাপ্রসাদ : বঙ্গবিভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ – দীনেশচন্দ্র সিংহ

পরিশিষ্ট – বাংলা ভাগ না হলে বাঙালী হিন্দু যেত কোথায়?

পরিশিষ্ট – পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি না হলে বাঙালী কোথায় যেত?

ভারত ভাগ হলে পাকিস্তানও ভাগ হবে

অখণ্ড বঙ্গ, অখণ্ড ভারত ছিল হিন্দুদের কাছে বীজমন্ত্র স্বরূপ। কিন্তু বাংলা ও পাঞ্জাবের পৈশাচিক ঘটনাবলীর পর যখন পাঞ্জাব ভাগ তথা ভারতভাগের পাকাপাকি সিদ্ধান্ত প্রায় নেওয়াই হয়ে গেছে, তখন মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বিষে জর্জরিত বাঙালী হিন্দুদের মধ্যেও বাংলা ভাগের দাবি উঠতে থাকে।

এই দাবি উত্থাপিত হতেই কয়েকজন তরুণ কর্মী শ্যামাপ্রসাদের নিকট তাদের মনোবেদনা প্রকাশ করলে তিনি তাদের যে যুক্তি দেখিয়েছিলেন, তা প্রণিধানযোগ্য। জীবনের প্রান্তসীমায় এসে তাদেরই একজন তৎকালীন পরিস্থিতি এবং শ্যামাপ্রসাদের বক্তব্য সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে লেখেন :

“বিখ্যাত বিপ্লবী উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তখন দৈনিক বসুমতী পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর নেতৃত্বে বসুমতীকে কেন্দ্র করে নতুন আন্দোলন আরম্ভ হল যার মূল কথা, মুসলিম-গরিষ্ঠ প্রদেশগুলি যদি হিন্দুপ্রধান ভারত রাষ্ট্রে না থাকতে পারে তবে হিন্দুপ্রধান জেলাগুলিই বা ইসলামী পাকিস্তানে যাবে কেন? যে নীতিতে ভারত ভাগ হচ্ছে সেই একই নীতি মেনে পাকিস্তানকেও ভাগ করতে হবে। ভারতের সংলগ্ন হিন্দুপ্রধান জেলাগুলিকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

বঙ্গবিভাগের নতুন দাবি ক্রমশই প্রবল হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা আন্দোলনও আরম্ভ হয়। ১৯শে ফেব্রুয়ারী (১৯৪৭) কুমিল্লার বিশিষ্ট হিন্দু কংগ্রেস নেতা অখিলচন্দ্র দত্ত কলকাতায় বঙ্গভঙ্গ দাবির তীব্র বিরোধিতা করেন। বাংলার নেতাদের মধ্যে একমাত্র শরৎচন্দ্র বসু অখিল দত্তকে সমর্থন করেন। ঠিক একমাস পরে ১৯শে মার্চ কলকাতায় সারা বাংলার বিশিষ্ট হিন্দু নেতাদের এক কনভেনশনে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নতুন বঙ্গভঙ্গ দাবি সমর্থন করেন এবং এই আন্দোলনের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন। এই কনভেনশনের মাত্র পাঁচদিন পরে ২৪ মার্চ ভারতের নতুন গভর্ণর জেনারেল হয়ে আসেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। আসেন এই স্থির সংকল্প নিয়ে যে, অতি দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে এবং তা হবে বিভক্ত ভারতের দুটি অংশের নিকট। অর্থাৎ ভারতবিভাগ তখন অনিবার্য, বঙ্গ বিভাগ হবে কিনা তখনও ঠিক নেই।

কেন বাংলা ভাগ চেয়েছি? – শ্যামাপ্রসাদ

“এই সময় একদিন বর্তমান লেখক ও তার কয়েকজন সমবয়সী তরুণ, যারা সবাই ছিল ডঃ শ্যামাপ্রসাদের অনুগামী, তারা ডঃ মুখার্জীর সঙ্গে দেখা করে বলে— স্যার, বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার মধ্যে দিয়েই ভারতে জাতীয় আন্দোলন গড়ে ওঠে। আজ কি আমরা আবার সেই বঙ্গভঙ্গের দাবিতেই আন্দোলন করব? তিনি সস্নেহে বলেছিলেন, তোমাদের সেণ্টিমেণ্ট আমি বুঝি। বাস্তবে ওটা আমারও সেণ্টিমেণ্ট। কিন্তু দেখতে হবে, সেণ্টিমেণ্ট যেন বাস্তববোধকে আচ্ছন্ন না করে। দেশ খণ্ডিত হচ্ছেই। বিগত নির্বাচনে (১৯৪৫) হিন্দু ভোটদাতারা আমাদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছে। দেশ বিভাগে বাধা দেওয়ার কোন সুযোগ বা শক্তি আমাদের নেই। একবার নিজের দেশের দিকে তাকিয়ে দেখ। লক্ষ লক্ষ বিহারী আর ওড়িশী কলকাতা ও বাংলার অন্যত্র করে খাচ্ছে। তাই বিহারে ও ওড়িশায় কিছু বাঙালী আছে। অসমিয়াদের নিজ প্রদেশের বাইরে কিছু করার যোগ্যতা নেই। তাই মাঝে মাঝেই সেখান থেকে বাঙালীদের খেদিয়ে দেওয়া হয়। গোটা বাংলা পাকিস্তানে পড়লে প্রথম ধাক্কাতেই এই বিহারী ও ওড়িশীদের ঘরে ফিরে যেতে হবে। তখন কি একজনও বাঙালী হিন্দু ওইসব প্রদেশে থাকতে পারবে? তখন কোথায় যাবে এই কোটি কোটি বাঙালী হিন্দু? কেউ তাঁদের ঠাঁই দেবে না। যারা প্রাণে বাঁচবে তাদের সবাইকে ধর্মত্যাগ করতে হবে। তাই আমি বাংলার যতখানি সম্ভব রক্ষা করতে চেষ্টা করছি।”

“৪ এবং ৫ জুন সমগ্র পাঞ্জাবে শিখদের গণহত্যা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক হাজার শিখ নরনারী শিশু নিহত হয়। বহু কোটি টাকার সম্পত্তি অগ্নিদগ্ধ হয়। বিচলিত গান্ধীজী ৮ জুন মাউন্টব্যাটনকে বললেন, হিন্দু ও শিখদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পাঞ্জাবকে দ্বিখণ্ডিত করা দরকার। ইতিমধ্যে কলকাতার দাঙ্গায় ২০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। নোয়াখালিতে অসংখ্য হিন্দু গ্রামের সমস্ত মানুষ নিহত হয়েছে। কয়েক হাজার হিন্দু নারী ধর্ষিতা ও ধর্মান্তরিতা হয়েছে। তবু গান্ধীজীর মনে বাংলার হিন্দুর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য কোন চিন্তা নেই।

ডঃ শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন প্রবল হয়ে উঠতেই শরৎচন্দ্র বসু ও বাংলার মুসলিম লীগ নেতা সুরাবর্দি যৌথভাবে ‘স্বাধীন সার্বভৌম বৃহৎ বঙ্গরাষ্ট্র’ গঠনের ডাক দিলেন। শরৎবাবু একা এই ডাক দিলে কি হত বলা যায় না। কিন্তু সুরাবর্দির হিন্দু-ঘাতক কুৎসিত ভাবমূর্তিকে বাংলার হিন্দুরা তখনও ভোলে নি। তার সঙ্গে যৌথভাবে দেওয়া ডাকে বাংলার হিন্দুরা সাড়া দিল না। বাংলার মুসলমানেরাও এই প্রস্তাবে উৎসাহ দেখাল না। হতোদ্যম শরৎ-সুরাবর্দি গান্ধীজীকে জানানোর জন্য দিল্লি গেলেন। ডঃ মুখার্জীও তাঁর বক্তব্য গান্ধীজীকে বুঝিয়ে বললেন। তিনি বললেন, বৃহৎ বঙ্গ আন্দোলন আসলে বিহার ওড়িশা ও আসামের বঙ্গভাষী অঞ্চলগুলিকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করে ‘বৃহত্তর পূর্ব পাকিস্তান’ গঠনের চক্রান্ত। গান্ধীজী ডঃ মুখার্জীর বক্তব্য উপলব্ধি করলেন। শরৎ-সুরাবর্দির প্রস্তাব পত্রপাঠ খারিজ করে দিলেন। ১৪ জুন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি পাঞ্জাব ও বাংলা বিভাগের দাবি করে প্রস্তাব গ্রহণ করে।” (দেশভাগ : যে ব্যথা ভুলবার নয়— ভৈরব ভট্টাচার্য, স্বস্তিকা, ১৫ আগস্ট, ১৯৯৮) শ্যামাপ্রসাদের বঙ্গবিভাগ আন্দোলন জয়যুক্ত হয়।

সুতরাং বাংলাভাগে শ্যামাপ্রসাদের অক্লান্ত অবদানের কথা অস্বীকার করা হস্ত দিয়ে সূর্যরশ্মিকে আড়াল করার মতোই হাস্যকর। বাংলা ভাগ হিন্দুরা অন্তর থেকে চায়নি; কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হিন্দুদের তা চাইতে বাধ্য করেছে। দেশত্যাগ হিন্দুরা স্বেচ্ছায় করতে চায়নি; কিন্তু হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। হিন্দুদের নিঃশ্বাস ফেলবার ও পা রাখবার ব্যবস্থা করতে শ্যামাপ্রসাদের অমূল্য অবদানের কথা অস্বীকার করা নিছক নিমকহারামি। শ্যামাপ্রসাদ আর যা-ই করুন, রিফিউজীদের নিয়ে রাজনীতি করেননি; আর অন্য অনেক পাকিস্তান সমর্থকের মতো রিফিউজীদের কাঁধেই ভর দিয়ে রাইটার্সে ঢোকেননি। যারা বাঙালীর সর্বনাশের অন্যতম হোতা, তারাই রাতারাতি ভোল পালটে পরিত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে কেল্লা ফতে করেছে। আর নিজেরা জন্মাবধি মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাকে তোষণ-পোষণ করে শ্যামাপ্রসাদকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদী বলে অপবাদ দিতে চাইছে—যা ইতিহাস ও তথ্য বিরোধী।

তারপর তো দীর্ঘ ৫৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। একদা সোনার পূর্ববঙ্গ ইসলামী পূর্ব পাকিস্তান হয়েছে। ১৯৪৯-৫০ সাল থেকে দফায় দফায় হিন্দু-বিরোধী দাঙ্গায় ৭০-৮০ লক্ষ হিন্দুকে সর্বস্বান্ত করে সীমান্ত পার করেছে। তারপরে বাংলাদেশ হয়েছে। কত আশা আমাদের। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে হিন্দুরা মানসম্মান নিয়ে বাস করবে। কিন্তু হা হতোস্মি! তিন বছর পার না হতে ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ ইসলামী বাংলাদেশে পরিণত। পাকিস্তানী আমলেও হিন্দুরা পূর্ববাংলায়/পূর্বপাকিস্তানে যেটুকু নিরাপত্তা বোধ করত তাও উধাও। তাদের ধর্মসংস্কৃতি চুলোয় গেছে। ধনসম্পত্তি রক্ষা করতে প্রাণ সংশয়। আর মা-বোনের ইজ্জত তো খোলামকুচি। প্রতিদিন সেদেশে লাঞ্ছিত হচ্ছে হিন্দু কন্যা, হিন্দু বধূরা। অনুসন্ধিৎসু পাঠক তসলিমা নাসরিনের “লজ্জা”, সালাম আজাদের “হিন্দু সম্প্রদায় কেন দেশত্যাগ করছে”, দেবজ্যোতি রায়ের “কেন উদ্বাস্তু হতে হল?” ইত্যাদি গ্রন্থগুলি এবং ‘স্বস্তিকা’ পত্রিকার ‘বাংলাদেশের আয়নায়’ এবং ‘মায়ের ডাক’ পত্রিকার “বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কেমন আছে?” কলামগুলি পাঠ করলে সে দেশের হিন্দুদের নরক জীবন যাপনের ইতিহাস জানতে পারবেন।

বয়স্ক ব্যক্তিরা আজও স্মরণ করতে পারেন পূর্ববঙ্গে পথেঘাটে মুসলমান মেয়ের দর্শন পাওয়া ছিল এক বিরল ঘটনা। আর স্কুল কলেজ, খেলাধুলা গানবাজনার আসরে বাসরে, নৌকা রেল স্টিমারে হিন্দু মেয়ে-বৌরা দাপিয়ে বেড়াত নিৰ্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে। ১৯৪৬-৪৭-এর পর হিন্দু মেয়েদের পথেঘাটে চলাফেরা প্রায় বন্ধ হল। এমনকি ঘরবাড়িতেও একশ্রেণীর বিধর্মী প্রতিবেশীর শ্যেনদৃষ্টি থেকে তাদের আড়ালে রাখা বিষম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। হিন্দু মেয়ে-বৌরা হল লোচ্চা-গুণ্ডাদের সহজ শিকার। তাদের কোথায় লুকোবে, কেমন করে বিধর্মী প্রতিবেশীর দৃষ্টির আড়ালে রাখবে, কি করে পশ্চিমবঙ্গে পার করবে, তাই ভেবে তাদের পিতামাতার আহার-নিদ্রা ঘুচে গিয়েছিল।

কন্যা সন্তান তো দূরের কথা, অনেক অভিভাবক তাদের অপোগণ্ড ছেলেদেরও যে দলে দলে পশ্চিমবঙ্গে পাঠান, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সে সময়কার স্টেটস্ম্যান পত্রিকার রিপোর্ট এবং জনৈক পত্রদাতার পত্র থেকে :

“Sir, A recent report in your paper said that trains were carrying large numbers of women and children from East Bengal to Calcutta and suggested that there was an exodus.

This is not a pleasing commentary on our politics. It is disgusting to learn that women and children should feel insecure in a huge country like East Bengal. It looks as if politics in Bengal has ceased to be civilized and Hindus and Muslims are no longer decent people.

Hardly a year ago, in my pargana in Vikrampur, our Muslim neighbours used to escort our women and children travelling by boat from village to village. They were trusted friends and decent neighbours. There were scarcely a Hindu family which did not have Muslims as friends and confidents. This had been the tradition from generation to generation. In some cases Muslims escorting our women lost their lives while fighting robbers and dacoits. I do not know of any better folk than our Muslim neighbours whom we knew from our childhood.

But all this seems to have changed.” (15.8.1947)

হ্যাঁ, সব পরিবর্তন হয়ে গেছে। মুসলিম লীগের ধর্মদ্বেষী রাজনীতি হিন্দু-মুসলিম পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরতার সম্পর্ক ধ্বংস করে দিয়েছে। তাই পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দুরা পশ্চিমবঙ্গে ছুটে আসছে। প্রমাণের কি অভাব আছে? সেকালের সংবাদপত্রেই তার প্রতিফলন ঘটেছে :

“পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়”

“মহাশয়, নোয়াখালি ও ত্রিপুরায় শোকাবহ ঘটনার পর পূর্ববঙ্গ হইতে স্থানত্যাগের যে ব্যাপক হিড়িক পড়িয়াছিল তাহা বঙ্গভঙ্গের পর আরও বাড়িয়াছে। ঢাকাতে জন্মাষ্টমীর মিছিল বন্ধ হইয়া যাওয়ায় পূর্ববঙ্গবাসীদের মনে নিরাপত্তা সম্বন্ধে আশঙ্কার কারণ ঘটিয়াছে। মহাত্মাজীর প্রার্থনাকালীন বক্তব্য ভুল প্রচারিত হওয়ায় তাহা যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তররূপেই সর্বত্র বর্ণিত হইয়াছে। মহাত্মাজী এই ভুল প্রচারের প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও লোকের আতঙ্ক কমে নাই। অতীতে বাঙ্গলা দেশে বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা নিরঞ্জনে মুসলমানদের বাধা দেওয়ার ঘটনা বহুবার সংঘটিত হইয়াছে। ঢাকায় মিছিল বন্ধ হইয়া যাওয়ার পর পূর্ববঙ্গের হিন্দু অধিবাসীরা স্ব স্ব গৃহে নিরাপদে দুর্গাপূজা করিবার সাহস পাইতেছে না। তাহারা অনেকেই পূজার প্রাক্কালে স্ত্রী-পুত্র পরিজন লইয়া পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় গ্রহণের জন্য চলিয়া আসিতেছেন। মহাত্মাজী এইরূপ ব্যাপক স্থান ত্যাগের বিরোধী। তাঁহার উপদেশ জনসাধারণের প্রাণে সাহস সঞ্চার করিতে পারিতেছে না। হিন্দু সমাজের মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের অনেকেই নিরাপত্তার জন্য তাহাদের পরিবারবর্গ ভারতীয় ইউনিয়নে স্থানান্তরিত করিয়াছেন। কিন্তু যাহারা দরিদ্র এমন কি স্থান ত্যাগের জন্য সামান্য পাথেয় সংস্থান করিতে অক্ষম তাহাদেরই অনুপায় হইয়া গভীর আশঙ্কার মধ্যে স্ব স্ব স্থানেই বাস করিতে হইতেছে। যদি মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়কে তাহাদের স্ব স্ব গৃহে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না করা যায়, তাহা হইলে দরিদ্র সম্প্রদায়কে এখন নিরুপায়ভাবে পাকিস্তানে বাস করিতে দেওয়ার কোন তাৎপর্য নাই। বিগত এক বৎসর ধরিয়া ব্যাপক লুঠতরাজ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মনে নিরাপত্তার ভাব আদৌ নাই। যদি ধন, জন ও জীবন নিজগৃহে নিরাপদ থাকে তাহা হইলে এমন কেহ নির্বোধ নাই যিনি তাহার প্রিয়তম জন্মভূমি ও পৈতৃক আবাসস্থান পরিত্যাগ করিয়া নিরুদ্দেশের পথে বাহির হইবে। স্থান ত্যাগ না করিবার জন্য বৃথা উপদেশ না দিয়া যদি গভর্ণমেণ্ট নিরাপত্তা আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখিতে পারেন, তাহা হইলে সকল সমস্যার সমাধান হইয়া যাইবে। সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মনে নিরাপত্তার ভাব ফিরাইয়া আনিবার জন্য গভর্ণমেন্টের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজন। ইতি

কে. এন. দালাল।”
(ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, নাথ ব্যাঙ্ক)”
আনন্দবাজার-১৭। ১২। ৪৭

কিন্তু সেসব তো ৫৩ বছর পূর্বেকার বাসী খবর। অধুনা বাংলাদেশ থেকে প্রাপ্ত তরতাজা খবরে জানা যায় বাংলাদেশের হিন্দুদের কি শোচনীয় পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে এবং তারা ক্রমাগত কি বিপুলহারে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসছে।

“প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয়, বাংলাদেশ যুবলীগ নেতা শেখ সেলিমের আশীর্বাদধন্য গোপালগঞ্জ জেলার বনগ্রাম কংশুর গ্রামের বুলবুল মোল্লা (৩৬) হিন্দু নির্যাতনে সেঞ্চুরী করার পথে। এ পর্যন্ত ১৮টি হিন্দু কিশোরী এবং যুবতীকে ধর্ষণ করেছে। স্থানীয় হিন্দুদের নিকট থেকে বর্তমানে জিজিয়া কর বাবদ অর্থ আদায় করছে। মোল্লা সাহেবের দাবি অনুসারে চাঁদা না দিলে দৈহিক নির্যাতনের সাথে বাড়ী ঘর ভাঙচুর অবশ্যম্ভাবী। দ্বি-চক্রযানে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হিন্দু এলাকায়। কংশুর, করপাড়া, হাট বাউড়া, বৌলতল এলাকা বুলবুল মোল্লার স্বঘোষিত মুক্ত এলাকা বলে ঘোষণা করেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের উদাসীনতায় ঐ সমস্ত এলাকা থেকে ব্যাপক হারে হিন্দুরা দেশত্যাগ করে ভারতে পাড়ি জমাচ্ছে। গত পাঁচ বছর যাবৎ ঐ সমস্ত এলাকা থেকে হিন্দুদের দেশত্যাগের সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হল।

(সূত্র : মায়ের ডাক-১০.২.২০০০)

এই যে বিপুল সংখ্যক হিন্দু ক্রমাগত বাংলাদেশ থেকে ভারতে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসছে, পশ্চিমবঙ্গ না হয়ে যুক্তবঙ্গ থাকলে এই অত্যাচারিত হিন্দুরা কোথায় যেত আশ্রয়ের সন্ধানে? ধর্মনিরপেক্ষী বুদ্ধিজীবীরা এই প্রশ্নের জবাব দিবেন কি?

ইদানীং পত্রপত্রিকায় রায়, ঘোষ, ভদ্র, মিত্র, দে, দত্ত, চৌধুরী, চক্রবর্তী, চ্যাটার্জী, মুখার্জী, ব্যানার্জী, ভট্টাচার্য, সেন, সেনগুপ্ত, গাঙ্গুলী, দাশগুপ্ত, সমাদ্দার ইত্যাদি উপাধিধারী কিছু চাঁদতারা মার্কা কলমচি যে কলকাতার বুকে বসে সংহতি সমন্বয়ের পিণ্ডি চটকাচ্ছেন, সে সুযোগটুকু শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীই করে দিয়ে গেছেন সে কথা ভুলে যাবেন না। পশ্চিমবঙ্গ নামক চিলতে ভূমিখণ্ডটুকু মুসসিম লীগের করালগ্রাস থেকে রক্ষা না করলে, তাঁরা ইসলাম কীর্তন ও খ্রীস্টান ভজন করে আখের গোছাতেন কোন বনে বসে? জিন্না, সুরাবর্দী ও মুসলিম লীগের দেশভাগের পাপস্খালন করতে যে পেট্রো-ডলার দাদন নিয়েছেন, তার জন্য পায়ের তলার মাটিটুকু কে রক্ষা করেছে, সে সত্য ইতিহাস জানতে চেষ্টা করুন। জলজ্যান্ত ঐতিহাসিক সত্যের সম্মুখীন না হয়ে এরা নির্বিচারে মনগড়া ইতিহাস রচনা করে চলেছে। যেমন—

“বাংলায় সাধারণভাবে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, দেশটাকে মুসলমানরা ভাগ করেছে। ভারত বিভাগের ক্ষেত্রে অভিযোগটা সত্য হলেও বাংলাভাগের ক্ষেত্রে নয়। এটা সত্য যে, মুসলিম লিগের দাবি এবং কার্যকলাপের জন্য (তার কারণ যা-ই হোক) ভারত ভাগ হয়েছে। কিন্তু কোন মুসলিম লিগ নেতা-ই বাংলাকে ভাগ করতে চাননি। বাংলাকে ভাগ করার দাবি হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের। তাঁরাই মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলার মুসলমান প্রাধান্যের বাইরে বাংলার একটা অংশ নিয়ে সেখানে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গভঙ্গের দাবি করেছেন এবং তাঁদের দাবি মতই ১৯৪৭ সালে বাংলাকে দুভাগ করা হয়েছে। তাই বাংলাকে ভাগ করেছে হিন্দু নেতারা—মুসলমান নেতারা নয়।”

বাংলা ভাগ করেছে মুসলিম লীগের ছোরা-মারা রাজনীতি

ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের বৃত্তিভোগী ও পেট্রো-ডলার প্রসাদপুষ্ট এসব জনাবদের বলতে হচ্ছে—হুজুর, হিন্দু নেতারা নয়, মুসলিম লীগের ছোরামারা রাজনীতি ও হিন্দু নারীর ইজ্জতনাশা পশুপ্রবৃত্তিই বাংলাকে দুভাগ করেছে; বাংলাভাগ অবধারিত করে তুলেছে; হিন্দু মুসলমানে চিরবিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। মুসলমান নেতারা হিন্দু মা-বোনের উপর সঙ্ঘটিত এসব মানবতা-বিরোধী পশু-প্রবৃত্তি ঠেকাতে কোনও চেষ্টা করেননি; নিন্দা পর্যন্ত করেননি। বরং তাতে ছিল তাদের পূর্ণ সায়। যদি তারা তা করতেন, তবে ইতিহাসের ধারা অন্য খাতে প্রবাহিত হতো। কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসনে যাদের বিবেক বন্ধক দেওয়া হয়েছে, তারা হিন্দুদের উপর মুসলমানদের এসব অমানবিক পশ্বাচারের নিন্দা করবেন কোন্ মুখে?

শ্যামাপ্রসাদ : কম্যুনিজম : কম্যুনিস্ট পার্টি

পাকিস্তান অন্দোলন ও দেশভাগে মুসলিম লীগের সহযোগী কম্যুনিস্ট দল শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে কটূক্তি করতে, তাঁকে সাম্প্রদাযিক বলে গালি পাড়তে, তাঁর মতাদর্শকে যুগধর্ম বিরোধী বলে কটাক্ষ করতে একপায়ে খাড়া। এমন কি তাঁর জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সৌজন্য দেখাতেও তাঁরা কুণ্ঠিত।

অথচ এই বিচিত্র চরিত্র ভারতের কম্যুনিস্টদের পিতৃভূমি রাশিয়ার ও তাঁদের মহান নেতাদের মতাদর্শের সঙ্গে এদেশীয় কম্যুনিস্টদের মতাদর্শের তুলনামূলক বিচার করে শ্যামাপ্রসাদ যে মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন সেসব বোধ হয় সবজান্তা কমরেডদের কখনও নজরে পড়েনি। না পড়লে একটু নজর করে দেখুন :

“It has almost been a fashion on the part of a certain section of the Indian youth, most of whom are Hindus, to idolise what they call communism, irrespective of the immediate problems that face the Hindus of India. They hesitate to call themselves Hindus. They forget that Hindus themselves constitute a nation and when that term is used as defined by the Hindu Mahasabha, their rights are identical with the rights of India as a whole. To my mind, it is no less an indication of slave-mentality and inferiority-complex to accept everything that is Russian because it comes from Russia than it is to accept everything British simply because it comes from Britain. When I am encountered with a new creed, I should examine my own creed to which I was born and nurtured and see how best I can assimilate what is new with the creed that is mine. The Hindu philosophy of life does not envisage a less noble and wholesome ideal for human conduct than the philosophy of communism.’(29.12.40)

প্রতিক্রিয়াশীল শ্যামাপ্রসাদের মুখে এসব কথায় অস্বস্তি বোধ হলে তিনি কমরেডদের খুশি করার মতো কথাও বলেছেন। লেনিনের প্রশংসায় তো তিনি পঞ্চমুখ :

“I do not hold the view that we have nothing to learn from communism and the activities of Russia or of any other country. But I am against blind and uncritical acceptance of any creed, simply because it is the latest fashion in the market. We can and should learn a good deal from the example of men like Lenin, Trotsky and Stalin. Who in the world would not emulate Lenin in his idealism which was so tempered with a sense of reality that he could go against the orthodox Marxists and apply his principle with an eye to the objective conditions of Russia? A tenacity of will, an iron discipline, a single-minded devotion to one’s cause and a keen sense of responsibility are virtues which characterised Lenin and which men in our country can worthily emulate.” (29.12.40)

কমরেডরা ভিরমি খাবেন না যেন! আরও আছে। তাঁদের মহান নেতা কমরেড স্ট্যালিনের দেশপ্রেম সম্পর্কে শ্যামাপ্রসাদ যে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তা শুনলে তাঁরা না মূর্ছা যান!

“Look at the present dictator of Russia. Who will not admire Stalin’s shrewd sense of reality? The same England which considered him as untouchable is to-day anxious for his friendly gesture. Between him and Hitler, there was all conflict and no agreement. But did such conflict stand in the way of his entering into a non-aggression pact with Hitler and reaping rich benefits out of it? The unique position that Stalin occupies to-day is not due to his blind adherence to his communistic ideals. He bears first and foremost the interests of Soviet Russia in mind, and he is playing his cards with commendable skill and foresight, always anxious to take the fullest advantage of the situation to add feathers to the cap of Russia.” ( 29.12.40)

স্ট্যালিনের এরকম নির্জলা প্রশংসা তো তার বন্ধুদের মুখেও আজকাল শোনা যায় না। সুতরাং শ্যামাপ্রসাদ সম্পর্কে কটূক্তি করার আগে কমরেডদের আরেকটু পড়াশোনা করে নেওয়া উচিত। কিন্তু এদের স্বভাব সেই—”খায় দায় পাখিটি, বনের দিকে আঁখিটি”র মতো। তাই মুসলমানদের প্রতি (এবং কম্যুনিস্টদের প্রতিও) শ্যামাপ্রসাদ সবসময় বলতেন—”নিজেদের একটু ভারতীয় বলে ভাবুন, সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।” একথা আজও তাঁদের প্রতি প্রযোজ্য।

আর যে সমস্ত মহাবিপ্লবী পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের অসহায় অবস্থায় নেকড়ের মুখে ফেলে রেখে, বীরবিক্রমে লাঙ্গুল গুটিয়েও ফুড়ুৎ করে বর্ডার ডিঙিয়ে পূর্ববঙ্গাগত হিন্দু উদ্বাস্তুদের কাঁধে ভর দিয়েই, সুরুৎ করে রাইটার্স-বিল্ডিংস-এ ঢুকে মৌরসী পাট্টা নিয়ে বসেছেন, তাও সম্ভব হয়েছে শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে হিন্দু জনজাগরণের জোয়ারে বাংলা ভাগ হবার ফলেই। “বাংলা ভাগ করল কে? – শ্যামাপ্রসাদ আবার কে” —বলে তো অনেক চিল্লিয়েছেন। বাংলাভাগের ইতিহাস সম্পর্কে উদ্বাস্তুদের ধোঁকা দিয়েছেন। এখন সে ভাগফল ভোগ করতে তো গলায় আটকাচ্ছে না! সুতরাং বাম হাতে হলেও লাল সেলামটি কিন্তু শ্যামাপ্রসাদেরই প্রাপ্য।