হায়নার গুহা – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

দুটি রহস্যময় গুহা

কোকো পাম হোটেলে পৌঁছুতে আরেকদফা ভিজে গেলাম বৃষ্টিতে। চাচা বলছিলেন, শীতকালটা বেজায় বৃষ্টি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে। তাই এখন পর্যটকদের ভিড় বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কম।

নিজের ঘরে ঢুকে জামাকাপড় বদলে নিলাম। তারপর ববদের খ্বরের দরজায় নক করলাম। ববও পোশাক বদলেছে। ভিজে চুল এমন করে ঘষেছে যে আলুথালু ভয়ংকর দেখাচ্ছে। সে চিরুণী হাতে বাথরুমে ঢুকে গেল। জনখুড়ো টেবিলের সামনে বসে ধ্যান করছিলেন যেন। আমার সাড়া পেয়ে বিডবিড় করে ছুটো শব্দ আওড়ালেন; ওয়েইকাপালি! ওয়েইকানালোয়া!

তারপর খুরে একটু হাসলেন।… বসো জয়ন্ত। ‘আহোয়ায়ালোয়ার রহস্য কিছুটা ভেদ করতে পেরেছি মনে হচ্ছে। পলিনেশীয়আমি অল্পশ্বপ্ন জানি। হুম্‌, ‘তোমার সিগারেটকেসের ভেতরে দুদিকে অনেক কিছু লেখা আছে! তোমার চাষীবন্ধু এটা সাফ করার জন্য এমন ঘষা ঘষেছিল যে অনেক জায়গার খোদাই করা লেখা মুছে গেছে। আহা, সব যদি অক্ষত থাকত, পুরোট! পড়তে পারতাম। যাক গে, যা হবার হয়েছে। যেটুকু পড়া যাচ্ছে, তার সুত্র ধরে এগোলে আমরা দারুণ কিছু আবিষ্কার করতে পারব।

বললাম, একটু আগে কী ছুটো শব্দ উচ্চারণ করলেন জনধুড়ো?

হুম! ওয়েইকাপালি॥ ওয়েইকানালোয়া।

এর মানে কী?

হায়েনার দুটা গুহার নাম। নামদুটো সিগারেট কেসের ভেতর লেখা আছে। কিন্তু তাঁর চেয়ে কাজের কথা হচ্ছে, রাজা হোলাহুয়ার বংশের কেউ এখন এখানে আছে কি না খুঁজে বের করতে হুবে।

ঢাকুচাচার মেয়ে জ্যোৎস্নার মুখে যে পাতালপুণীর কথা শুনেছি, জনখুড়োকে বললাম। খুড়ো এ কিংবদন্তীর কথা সবাই জানেন। বললেন, ওট! নিছক কিংবদন্তী। মিনিহুন বা রত্নপূরী কোনটাই আমি বিশ্বাস করি না বাপু।

তাহলে সিগারেটকেমে কিসের গোপন বৃত্তান্ত থাকতে পারে? কী লেখা আছে দেখলেন?

খুঁড়ো হাসলেন। যা লেখা আছে, তা ততকিছু প্রাচীন ব্যাপার নয়। যদিও ভাষা এবং হরফগুলো প্রাচীন পলিনেনীয়। কী লেখা আছে, তা আমি অবিকল অনুবাদ করেছি। এই দেখ।

জনখুড়ে একটা কাগজ দিলেন। তাতে লেখা আছে:

টিহো বিশ্বাসী। টিহো রাজবংশীয়। যদি আমরা মারা যাই, টিহো এবং মারি হায়েনা…ওয়েইকাপালি ওয়েইকানালোয়া… দক্ষিণ সাত গজ পূর্ব দু’ফুট বাঁদিকে কবচ…অসবোর্ন এবং পিটার ওলসন এফ এফ আর ৫০৩৭…জি ২২১৩…

পড়ার পর বললাম, শুধু এইটুকু বুঝতে পারছি, অসবোর্ন আর ওলসন নামে সম্ভবত দুজন মিলিটারি পাইলটের এই সিগারেটকেস। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মাঠে বিমানঘাঁটিতে তাদের প্লেনটাই ধ্বংস হয়ে থাকবে।

খুতুমি বুদ্ধিমান জয়ন্ত! জনখুড়ো প্রশংসার চোখে তাকিয়ে বললেন। ঠিকই ধরেই। কালই আমি ওয়াশিংটনের সামরিক রেকর্ড দফতরে ফোন করে অসবোর্ন এবং ওলসনের খোঁজ করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সব সামরিক দলিল ওখানে রয়েছে। আমার ধারণা, হায়েনার দুটো গুহায় ওরা কিছু লুকিয়ে রেখেছিল। তখন ভীষণ যুদ্ধ চলেছে। যে-কোনো সময় ওরা মারা পড়তে পারে। তাই সিগারেট কৌটোয় পলিনেশীয় ভাষায় গোপন হদিস খোদাই করে রেখেছিল।

বললাম, রাজবংশীয় জনৈক টিহোর কথা আছে ওতে। কেন?

জন বললেন, এই টিহো ওদের সঙ্গী ছিল সম্ভবত। অর্থাৎ টিহো ব্যাপারটা জানত। ওদের নিশ্চয় ইচ্ছে ছিল, টিহোকে সিগারেটকেসট দেবে। ওরা যুদ্ধে মারা পড়লে টিহো…

জন হঠাৎ থামলেন। চিন্তিতমুখে ফের বললেন, বাকি কথাটা অস্পষ্ট। শুধু বলা যায়, ওরা মারা পড়লে টিহো কাউকে সিগারেটকেসটা পাঠিয়ে দেবে এমন নির্দেশ ছিল। কিন্তু যে কোনো কারণে হোক, টিহোকে ওরা জিনিসটা দিয়ে যেতে পারেনি।

মনে একটা মতলব এঁটে বললাম, খুড়োমণাই! আপনার অনুবাদটার একটা কপি পাব কি? আমি ওটা নিয়ে একটু ভাবনা-চিন্তা করতে চাই।

আলবাৎ, আলবাৎ। জনখুড়ো। বললেন।…সিগারেট কেসটা তো তোমার সম্পত্তি।

বব কথা শুনছিল বাথরুমে। মুখ বাড়ি য়ে বলল, খুড়ো। জায়েন্টো ছদ্মনামে গোয়েন্দাকাহিনী লেখে জানেন? অসংখ্য বই লিখেছে। ক্যালকুট্টা থেকে ডেক্কা পর্যন্ত ওর নাম।

বলো কী জয়ন্ত? জন নড়ে উঠলেন।

বললাম, হ্যাঁ খুড়োমশাই। গোয়েন্দাগল্প আর আ্যাডভেঞ্চার লিখতে লিখতে এমন অভ্যাস হয়েছে, সুযোগ পেলে সত্যিকার রহস্যেও মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করে।

খুব ভাল কথা। খুব ভাল কথা। জনখুড়ো একটা কাগজে ওঁর অনুবাদ কপি করলেন। সেটা আমাকে দিয়ে বললেন, অসবোর্ন আর ওলসন ভারি এলেমদার লোক ছিল, বুঝলে? যে হরফে ওরা লিখেছে, তা কবে লুপ্ত হয়ে গেছে। এখন রোমান হরফে পলিনেশীয় ভাষা লেখা হয়। তুমি শুনলে অবাক হবে, এই আদিম পলিনেশীয় লিপি হচ্ছে চিত্রলিপি। ছবির রেখায় কথা বোঝানো। তোমাদের সিন্ধুসভ্যতার সঙ্গে এর আশ্চর্য মিল আছে। তার আগে প্রাচীন পলিনেশীয় সভ্যতা সম্পর্কে তোমার জানা দরকার।

বব মুখ বাড়িয়ে চোখ টিপল আমাকে। বুঝলাম, সাবধান করে দিচ্ছে। কারণ ওর অধ্যাপক খুড়ো আমার কান ঝালাপালা করে দেবেন বুঝতে পেরেছে। আমিও কি বুঝিনি? বেরসিকের মতো, উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, খুড়োমশাই! কিছু মনে না করেন তো বলি, আমার বেজায় ঘুম পাচ্ছে। কাল সব শুনব বরং।

থুঁড়ো মনমরা হয়ে বললেন, আচ্ছা।