নির্বাসিতের আত্মকথা – পঞ্চম পরিচ্ছেদ
নির্বাসিতের আত্মকথা – পঞ্চম পরিচ্ছেদ
যে রাত্রে জেলে গিয়া পৌঁছিলাম, সে রাত্রে আর ভালমন্দ কিছু ভাবিবার মতো অবস্থা আমাদের ছিল না। ধরা পড়িবার পর বারীন্দ্র বলিয়াছিল—My mission is over — আমার কাজ ফুরিয়ে গেছে! কিন্তু সে কথার প্রতিধ্বনি ত নিজের মধ্যে একটুও খুঁজিয়া পাইলাম না! দেশের কাজ ত সবই বাকি!— শুধু আমার কাজই ফুরাইয়া গেল! প্রাণভরা সহস্র আকাঙ্খা, কত কি বিচিত্র কল্পনা লইয়া যুগান্তর গড়িতে নামিয়াছিলাম-এক ভূমিকম্পে সবটাই ধুলিসাৎ হইয়া গেল! এ জগতে শুধু পাহারাওয়ালার লাল পাগড়ীটাই সত্য, আর বাকি সবটাই মায়া? অতীতের কত স্মৃতি তুবড়ী বাজীর মত মাথায় ফুটিয়া উঠিতে লাগিল। মনে পড়িল তিন চার মাস দেশময় টো টো করিয়া ঘুরিয়া যখন শীর্ণ ক্লান্ত দেহভার লইয়া একদিন বাড়ীতে ফিরিয়াছিলাম তখন মা আমার মুখের দিকে চাহিয়া অভিমান ভরে বলিয়া ছিলেন—“ছেলের আমার আর মায়ের রান্না ভাত ভাল লাগে না! কোথায় দীন দুঃখীর মত ঘুরে ঘুরে বেড়াস, বাবা! ‘ভদ্দর নোকের ছেলে, শেষে কি কোন্ দিন পুলিসে ধরে ‘অপমান্যি’ করবে!”— আজ সত্য সত্যই পুলিসে ধরিয়া ‘অপমান্যি’ করিল! আবার মনে পড়িল সেই পাহারাওয়ালার কথা, যে আসিতে আসিতে বলিয়াছিল—“বাবুজী, তোমরা যদিএকটা কিছু গোলাগুলি ছুঁড়তে, তাহলে আমরা সবাই পালিয়ে যেতুম।” তাইত! চুপচাপ একেবারে ভেড়ার দলের মতো ধরা পড়িলাম। এ দুঃখ যে মরিলেও ঘুচিবে না! একজন পুলিস সার্জেন্ট ঠাট্টা করিয়া বলিয়াছিল—“এরা এমনি লুবোধ ছেলে যে, বাগানে ঘুমাইবার সময় রাস্তায় একজন পাহারা পর্যন্ত রাখে নাই।” কথাটা সারারাত মাথার ভিতর ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল, কিন্তু এখন আর হাত কামড়ান ছাড়া উপায় নাই। একবার উল্লাসের উপর রাগ ধরিল। পুলিসের দল যখন প্রথম বাগানে আসিয়া ঢুকে, তখন সে জাগিয়া উঠিয়াছিল; ইচ্ছা করিলে সে পলাইতেও পারিত। কিন্তু নির্বিকার সাক্ষীস্বরূপ ব্রহ্ম পুরুষের ন্যায় সে ব্যাপারটা চুপ চাপ বসিয়া দেখিয়াছিল মাত্র; পালাইবার কথা তাহার মনে আসে নাই।
সে বাতটা এই রকম দুশ্চিন্তায় কাটিয়া গেল। সকালে উঠিয়া কুঠরীর ( cell ) বাহিরে উঁকি মারিয়া দেখিলাম— নরক একেবারে গুলজার। আমাদের সব আড্ডাগুলির ছেলেরাই আসিয়া জুটিয়াছে। অধিকন্তু পাঁচ সাতজন অপরিচিত ছেলেও দেখিলাম। ইহারা আবার কোথাকার আমদানী? একটাকে জিজ্ঞাসা করিলাম—“বাপু হে, তুমি কে বট?”
ছেলেটা কাঁদ কাঁদ হইয়া বলিল—“আজ্ঞে, আমার বাড়ী মানিকতলায়। আপনাদের বাগানের কাছে সকালবেলা একটু মর্নিং ওয়াক করাটা যে এত বড় মহাপাপ তা’ত জানতুম না।”
দেখিলাম নগেন সেনগুপ্ত আর তাহার ভাই ধরণীকেও পুলিস জেলে পুরিয়াছে। বেচারারা বোমার ‘ব’ পর্যন্ত জানে না। পুলিস বোমার আড্ডার সন্ধান পাইয়াছে ভাবিয়া উল্লাসকর বোমাগুলি কোথায় সরাইয়া রাখিবে স্থির করিতে না পারিয়া বাল্যবন্ধু নগেনের বাড়ীতে একটা বোমার প্যাটরা রাখিয়া আসিয়াছিল। প্যাটরার ভিতরে সাপ আছে কি ব্যাঙ আছে, নগেন বা ধরণী তাহার বিন্দু-বিসর্গও জানিত না। তাহাদের বাঁচাইবার জন্যই উল্লাস পুলিসের নিকট সব কথা স্বীকার করিল। উল্লাসের বিশ্বাস ছিল যে সত্য কথা জানিতে পারিলেই পুলিসের কর্তারা নগেন ও ধরণীর উপর আর মোকদ্দমা চালাইবে না। পুলিস যে ঠিক ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের বংশসম্ভূত নয়, এ কথাটা তখন উল্লাসের মাথায় ভাল করিয়া ঢুকে নাই।
ক্রমে পুলিস নানা জেলা হইতে অনেকগুলি ছেলে আনিয়া হাজির করিল। শ্রীহট্ট হইতে সুশীল সেন ও তাহার দুই ভাই বীরেন ও হেমচন্দ্র আসিল। সুশীলকে আমরা পূর্বে চিনিতাম কিন্তু তাহার দুই ভাইকে ইহার পূর্বে কখনও দেখি নাই। মালদহ হইতে কৃষ্ণজীবন, যশোহর হইতে বীরেন ঘোষ ও খুলনা হইতে সুধীরও আসিয়া পৌঁছিল।
আর আসিয়া পৌঁছিলেন আমার পুরাতন বন্ধু পণ্ডিত হৃষীকেশ। হৃষীকেশ আমার কলেজের সহপাঠী। কলেজ হইতে মা ইংরাজী সরস্বতীকে বয়কট করিয়া আমি যখন সাধুগিরি করিতে বাহির হই, তখন পণ্ডিত হৃষীকেশ ভাবাধিক্যবশতঃ নিমতলার ঘাটে গঙ্গাজল স্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল যে, সমস্ত সৎকর্মে সে আমার সহগামী হইবে। একে নিমতলার ঘাট—মহাতীর্থ বলিলেই হয়; তাহার উপর মা গঙ্গা-একেবারে জাগ্রত দেবতা, সেখানকার প্রতিজ্ঞা কি আর বিফল হইবার জো আছে? মা গঙ্গা কি কুক্ষণেই তাহার প্রতিজ্ঞা শুনিয়া মনে মনে ‘তথাস্তু’ বলিয়াছিলেন জানি না, কিন্তু সেইদিন হইতে আজ অবধি পণ্ডিত হৃষীকেশ আমার পিছনেই লাগিয়া আছে। শাস্ত্রে বলে যে, উৎসবে, ব্যসনে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, রাজদ্বারে ও শ্মশানে যে একসঙ্গে গিয়া দাঁড়ায়, সেই বান্ধব। হৃষীকেশের বিবাহে ও তাহার পুত্রের অন্নপ্রাশনে আমি লুচি খাইয়া আসিয়াছি, দুর্ভিক্ষের সময় দুজনে পীড়িতের সেবা করিয়াছি; এক সঙ্গে উভয়ে সাধুগিরি করিয়া ফিরিয়াছি, মাষ্টারীও করিয়াছি। আজ রাষ্ট্রবিপ্লব করিতে গিয়া একসঙ্গে উভয়ে পুলিসের হাতে ধরাও পড়িলাম। ভবিষ্যতে যে উভয়কে একসঙ্গে শ্রীধাম আন্দামান বাস করিতে হইবে, তাহা তখন জানিতাম না। বান্ধবত্বের সব লক্ষণই মিলিয়াছে; বাকি আছে শুধু শ্মশানটুকু! নিমতলার এতটুকু এখন নিমতলায় উদযাপন করিয়া আসিতে পারিলেই আমি নিশ্চিন্ত হই।
যাক, সে ভবিষ্যতের কথা। জেলে গিয়া দুই দিন বিশ্রাম করিতে না করিতেই দেখি পণ্ডিত হৃষীকেশ বিশাল দেহভার দোলাইতে দোলাইতে সেখানে আসিয়া উপস্থিত। তাহার সহিত মানিকতলার বাগানের কোনও ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল না; আমাদের কার্যকলাপের কিছু কিছু সে জানিত মাত্র। তাহার বিরুদ্ধে বিশেষ কোন প্রমাণও ছিল না। বাগানের কাগজ-পত্রের মধ্যে দু’ এক জায়গায় তাহার নাম পাইয়া পুলিস সন্দেহ করিয়া তাহাকে ধরিয়াছিল। কিন্তু গঙ্গাজল ছুঁইয়া প্ৰতিজ্ঞা ত আর বিফল হইবার নয়! তাহাকে যে আন্দামানে যাইতেই হইবে! পুলিস যখন তাহাকে ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট লইয়া গিয়া হাজির করে তখন তাহার ব্রাহ্মণপণ্ডিতের মত গোলগাল নাদুসনুদুস চেহারা দেখিয়া ম্যাজিষ্ট্রেটের তাহাকে নিরপরাধ বলিয়াই ধারণা হইয়াছিল। কিন্তু ম্যাজিষ্ট্রেটের মুখ দেখিয়াই বন্ধুর আমার মেজাজটা একেবারে বিগড়াইয়া গেল। মহামান্য সরকার বাহাদুরের রাজ্য ও শাসননীতি সম্বন্ধে বন্ধু আমার ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট যে সমস্ত মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহা আর এখানে পুনরুদ্ধত করিয়া এ বৃদ্ধ বয়সে বিপদে পড়িবার আমার ইচ্ছা নাই। পূর্ববঙ্গের ছোটলাট ফুলার সাহেবের টম-ফুলারির (tom foolery) আলোচনা হইতে আরম্ভ করিয়া লাট মরুলীর পিতৃ-শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা পর্যন্ত তাহার মধ্যে সবই ছিল। পণ্ডিতজীর বক্তৃতা শুনিয়া ম্যাজিষ্ট্রেট তাঁহাকে জেলের মধ্যে এক পৃথক কুঠরীতে আবদ্ধ করিয়া তাঁহার রাজনৈতিক মতামতের সংস্কার করিতে আদেশ দিলেন।
সপ্তাহের মধ্যে আসিয়া হাজির হইলেন শ্রীমান দেবব্রত। প্রায় এক বৎসর পূর্বে তিনি যুগান্তরের সহিত সম্বন্ধ পরিত্যাগ করিয়া নবশক্তির সম্পাদকের কাজ করিয়াছিলেন। নবশক্তি উঠিয়া যাওয়ার পর আপনার সাধন ভজন লইয়াই বাড়ীতে বসিয়া থাকিতেন। বাহিরের লোকের সহিত বড় একটা দেখাশুনা করিতেন না। চলমান পর্বতবৎ তিনিও একদিন সুপ্রভাতে জেলে আসিয়া হাজির হইলেন।
পুলিস কোর্টে শুনিয়াছিলাম যে আমরা যে-দিন ধরা পড়ি সে-দিন অরবিন্দ বাবুকেও ধরা হইয়াছিল। কিন্তু আমরা জেলের যে অংশে আদ্ধ ছিলাম সেখানে তাঁহার দেখা পাইলাম না। শুনিলাম, তাঁহাকে অন্যত্র আবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে।
হৃষীকেশকে যে দিন পুলিস ধরিয়া আনে, তাহার দুই একদিন আগে শ্রীরামপুর হইতে গোস্বামীদের বাড়ীর নরেন্দ্রকেও ধরিয়া আনিয়াছিল। সে আমাদের সহিত এক জায়গায় আবদ্ধ ছিল!
আমাদের বাগানে একখানা নোটবুকে একটা নাম লেখা ছিল— চারুচন্দ্র রায়চৌধুরী। খুলনার ইন্দুভূষণকে আমরা চারু বলিয়া ডাকিতাম। পুলিস তাহা না জানিয়া চারুচন্দ্র রায়-চৌধুরীকে খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিল। শেষে স্থির করিল যে চন্দননগরে ডুপ্লে কলেজের অধ্যাপক শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র রায়ই ঐ চারুচন্দ্র রায়-চৌধুরী। চারুবাবুর বোধ হয় অপরাধ যে কানাইলাল দত্ত ও আমি উভয়েই তাঁহার ছাত্র ও উভয়েরই বাড়ী চন্দননগর। যাঁহার ছাত্রেরা এমন রাজদ্রোহী, তিনি ‘রায়’ই হোন, আর ‘রায় চৌধুরীই হোন তাহাতে কি আসিয়া যায়? তাঁহাকে ত ধরিতেই হইবে!
যাক্ সে কথা। অল্পদিনের মধ্যেই এক এক করিয়া পুলিশ প্রায় ত্রিশ পঁয়ত্রিশজন লোককে হাজতে টানিয়া আনিল। তিন চারটা কুঠরীতে তিন তিন জন করিয়া রাখিল; বাকি সকলের জন্য পৃথক পৃথক কুঠরীর ব্যবস্থা হইল।
ধরা পড়ার উত্তেজনা সামলাইতে প্রায় এক সপ্তাহ কাটিয়া গেল। প্রকৃতিস্থ হইয়া দেখিলাম একটি প্রায় সাত হাত লম্বা পাঁচ হাত চওড়া কুঠরীর মধ্যে আমরা তিনটি প্রাণী আবদ্ধ আছি। আমি ছাড়া দুইটিই ছেলে মানুষ; একটার বয়স বছর কুড়ি আর একটির বয়স পনেরো। প্রথমটি নলিনীকান্ত গুপ্ত— প্রেসিডেন্সী কলেজের চতুর্থ বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্র, নিতান্ত সাত্ত্বিক প্রকৃতির ভাল ছেলে; আর দ্বিতীয়টি শচীন্দ্রনাথ সেন ন্যাশন্যাল কলেজের পলাতক ছাত্র—একেবারে শিশু বা বাচ্ছা বলিলেই হয়। সেই কুঠরীর এক কোণে শৌচ প্রস্রাবের জন্য দুইটি গামলা। তিন জনকেই সেখানে কাজ সারিতে হয়; সুতরাং একজনকে ঐ অবশ্যকর্তব্য অশ্লীল কর্মটুকু করিতে গেলে আর স্কুই জনের চক্ষু মুদিয়া বসিয়া থাকা ভিন্ন উপায়ান্তর নাই। কুঠরীর সামনে একটি ছোট বারান্দা। সেইখানে হাত মুখ এইবার ও স্নানাহার করিবার ব্যবস্থা। বারান্দার সামনে সরু লম্বা উঠান, আর তাহার পরেই অভ্রভেদী প্রাচীর। প্রাচীরটা ছিল আমাদের চক্ষুশূল। সেটা যেন অহরহঃ চীৎকার করিয়া বলিত—“তোমরা কয়েদী, তোমরা কয়েদী। আমার হাতে যখন পড়িয়াছ তখন আর তোমাদের নিস্তার নাই।”
প্রাচীরের উপর দিয়া খানিকটা আকাশ ও একটা অশ্বত্থ গাছের মাথা দেখিতে পাওয়া যাইত। জেলখানার কবিত্ব কেবল এইটুকু লইয়াই; বাকি সবটাই একেবারে নিরেট গদ্য। আর সব চেয়ে কটমটে গদ্য আহারের ব্যবস্থাটা। প্রথম দিন তাহা দেখিয়া হাসি পাইল, দ্বিতীয় দিন রাগ ধরিল, তৃতীয় দিন কান্না আসিল। সকাল বেলা উঠিতে না উঠিতেই একটা প্রকাণ্ড কালো জোয়ান বালতি হইতে সাদা সাদা কি খানিকটা আমাদের লোহার থালার উপর ঢালিয়া দিয়া গেল। শুনিলাম, উহাই আমাদের বাল্যভোগ এবং আলীপুরী ভাষায় উহার নাম ‘লপসী’। লপসী কিরে বাবা! শচীন বাবু দূর হইতে খানিকটা পরীক্ষা করিয়া বলিল,—“ওহো! এ যে ফেন-মিশান ভাত।”—পরদিন দেখিলাম ডালের সহিত মিশিয়া লপসী পীতবর্ণ ধরিয়াছে; তৃতীয় দিন দেখিলাম উহা রক্তবর্ণ। শুনিলাম উহাতে গুড় দেওয়া হইয়াছে এবং উহাই আমাদের প্রাতরাশের রাজ সংস্করণ। সাড়ে দশটার সময় একটা টীনের বাটীর এক বাটী রেঙ্গুন চালের ভাত, খানিকটা অরহর ডাল, কি খানিকটা পাতা ও ডাঁটা সিদ্ধ ও একটু তেঁতুল গোলা। সন্ধ্যার সময়ও তদ্বৎ, কেবল তেঁতুল গোলাটুকু নাই।
ডাক্তার সাহেব ও জেলার বাবু আমাদের সহিত দেখা করিতে আসিবামাত্র আমরা একটা প্রকাণ্ড উদরনৈতিক আন্দোলন শুরু করিয়া দিলাম। ডাক্তার সাহেব জাতিতে আইরিস, নিতান্ত ভদ্রলোক। আমাদের সব কথাগুলি চুপ করিয়া শুনিয়া বলিলেন—“উপায় নাই। জেলের কয়েদীর খোরাক একেবারে সরকারের হিসাব মত বাঁধা।” কাহারও অসুখ-বিসুখ হইলে তিনি হাসপাতাল হইতে পৃথক বন্দোবস্ত করিতে পারেন; কিন্তু সুস্থ অবস্থায় অন্য আহার দিবার অধিকার তাঁহার নাই। জেলার বাবু বলিলেন,—“জেলের বাগানে আলু বেগুন কুমড়া পেঁয়াজ প্রভৃতি সব তরকারীই ত হয়; জেলের খোরাক ত মন্দ নয়।” শচীন নিতাস্ত ঠোঁটকাটা ছেলে; সে বলিল—“বাগানে ত হয় সবই; কিন্তু পুই ডাটা আর এঁচোড়ের খোসা ছাড়া বাকি সব গুলা বোধ হয় রাস্তা ভুলিয়া অন্যত্র চলিয়া যায়।”
দেখিলাম অসুখ করা ছাড়া আর বাঁচিবার উপায় নাই। কাজেই আমাদের সকলকার অসুখ করিতে লাগিল। নিত্য নিত্য নূতন অসুখ কোথায় খুঁজিয়া পাওয়া যায়? পেট কামড়ান, মাথা ধরা, বুক ছড় ছড় করা, গা বমি বমি করা সবই যখন একে একে ফুরাইয়া আসিল তখন বাহিরে প্রকাশ পায় না এমন অসুখ আবিষ্কারের জন্য আমাদের মাথা ঘামিয়া উঠিল। রোগ ত একটা কিছু চাই—তা না হইলে প্রাণ যে বাঁচে না। ডাক্তার সাহেব আসিলে পণ্ডিত হৃষীকেশ গম্ভীর ভাবে জানাইলেন যে, তাঁহার বামচক্ষুর উপরের পাতা তিনদিন ধরিয়া নাচিতেছে, সুতরাং তিনি যে কঠিন পীড়াগ্রস্ত সে বিষয়ে আর সন্দেহ নাই। তাঁহার মনে হইতেছে যে, হাসপাতালের অন্ন ভিন্ন তাঁহার বাঁচিবার আর উপায় নাই। ডাক্তার বেচারা হাসিয়া তাহারই ব্যবস্থা করিয়া দিয়া গেলেন।
হঠাৎ আমরা আরও একটা পথ আবিষ্কার করিয়া ফেলিলাম। সেটা এই যে, পয়সা থাকিলে জেলখানার মধ্যে বসিয়াই সব পাওয়া যায়। জেলের প্রহরী ও পাচকের হাতে যৎকিঞ্চিৎ দক্ষিণা দিতে পারিলেই ভাতের ভিতর হইতে কৈমাছ ভাজা ও রুটির গাদার ভিতর হইতে আলু পেঁয়াজের তরকারী বাহির হইয়া আসে; এমন কি পাহারাওয়ালার পাগড়ীর ভিতর হইতে পান ও চুরুট বাহির হইতেও দেখা গিয়াছে।
একটা মহা অসুবিধা ছিল এই যে, এক কুঠরীর লোকের সহিত অপর কুঠরীর লোকের কথা কহিবার হুকুম ছিল না। প্রথমে লুকাইয়া লুকাইয়া এক আধটা কথা কওয়া হইত; তাহাতে পাহারাওয়ালাদের ঘোরতর আপত্তি! তাহারা জেলারের কাছে রিপোর্ট করিবার ভয় দেখাইতে লাগিল। হঠাৎ কিন্তু একদিন দৈখা গেল তাহারা বেশ শান্ত শিষ্ট হইয়া গিয়াছে; আমরা চীৎকার করিয়া কথা কহিলেও তাহারা শুনিতে পায় না; অনুসন্ধানে জানা গেল, আমাদের একজন বন্ধু রৌপ্য খণ্ড দিয়া তাহাদের কানের ছিদ্র বন্ধ করিয়া দিয়াছেন। জেলার বা সুপারিন্টেণ্ডেন্ট আসিবার সময় তাহারাই আমাদের সতর্ক করিয়া দিতে লাগিল। রৌপ্যখণ্ডের যে অনন্ত মহিমা তাহা এতদিন কানেই শুনিয়াছিলাম, এইবার তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাইয়া মানব জন্ম সফল হইল। কিন্তু একটা দুঃখ কতকটা ঘুচিতে না ঘুচিতে আর এক দুঃখ দেখা দিল।
আমরা জেলে আসিবার পর হইতেই জেলের মধ্যে সি-আই-ডির কর্তাদিগের শুভাগমন আরম্ভ হইয়াছিল। তাঁহাদের কথাবার্তা শুনিলে মনে হইত যেন আমাদের বীরত্বের গৌরবে তাঁহাদের বুক ফুলিয়া দশ হাত হইয়াছে, আমাদের সহিত সহানুভূতিতে প্রাণ যেন তাঁহাদের ফাট-ফাট। কথাগুলি ভাহাদের এমনি মোলায়েম, হাব ভাব এমনি চিত্তবিমোহন যে দেখিলে শুনিলেই মনে হইত ইহারা আমাদের পূর্ব জন্মের পরমাত্মীয়। তবে ধরা পড়িবার পরদিন তাঁহাদের ঘরে একরাত্রি বাস করিয়া এসব ছলাকলার পরিচয় অনেক পূর্বেই পাইয়াছিলাম—তাই রক্ষা। ইহারা সপ্তাহ খানেক যাতায়াতের পর নরেন্দ্র গোস্বামী যেন হঠাৎ একটু বেশী অনুসন্ধিৎসু হইয়া দাঁড়াইল। বাংলা ছাড়া ভারতের অন্য কোথাও বিপ্লবের কেন্দ্র আছে কি না, আর থাকিলে সেখানকার নেতাদের নাম কি—ইত্যাদি অনেক রকম প্রশ্নই সে আমাদের জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। জেলের কর্তৃপক্ষের এক আধ জনের কথাবার্তায়ও বুঝিলাম—একটা গোলমাল কোথাও লাগিয়াছে।
হৃষীকেশ একদিন আসিয়া আমায় বলিল—“গোটা দুই তিন বেয়াড়া রকমের মাদ্রাজী বা বর্গিটর্গির নাম বানিয়ে দিতে পারিস্?”
“কেন?”
“নরেন, বোধ হয় পুলিসকে খবর দিচ্ছে; গোটা কতক উদ্ভট রকমের নাম বানিয়ে দিতে পারলে স্যাঙ্গাতরা দেশময় অশ্বডিম্ব খুঁজে খুঁজে বেড়াবে খন।” তাহাই হইল; মহারাষ্ট্রীয় কেন্দ্রের সভাপতি হইলেন শ্রীমান পুরুষোত্তম নাটেকার, গুজরাতের সভাপতি হইলেন কিষণজী ভাওজী বা এই রকম একজন কেহ; কিন্তু মাদ্রাজের ভার লইবেন কে? মাদ্রাজী নাম যে তৈয়ারী করা শক্ত! খবরের কাগজে তখন চিদম্বরম্ পিলের নাম দেখা গিয়াছিল। হৃষীকেশ বলিল, যখন চিদম্বরম্ মাদ্রাজী নাম হইতে পারে তখন বিশ্বস্তরম্ কি দোষ করিল? আর পিলের বদলে যকৃৎ বা অমনি একটা কিছু জুড়িয়া দিলেই চলিবে।
