৫৭ থেকে ৪৭ (স্বাধীনতা সংগ্রামের কল্পিত বিকল্প ইতিহাস)

মুক্তির পথ – শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়

সহ্যাদ্রির ওপরে আলো মরে আসছিল। বর্ষার এই সময়টায় সারাদিন ঝিরঝির টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়েই যায়। মাঝে মাঝে থামে, হয়তো মেঘের আস্তর সরে গিয়ে সূর্যও দেখা যায়। আবার যে কে সেই। আজ বিকেলের পর থেকেই বৃষ্টি ধরে এসেছিল। সূর্যের আলোর হালকা আভাস ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁক দিয়ে যতটুকু গড়িয়ে আসছিল তা-ও নিভে যেতে বসেছে। পাহাড়ি পথের একপাশে একটা ছোট্ট একচালা চায়ের দোকান। জায়গাটা নির্জন। স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা দূর। এই রাস্তায় ইদানীং সন্ধের পর বড়ো একটা গাড়িঘোড়া আসে না। নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে, তাও প্রায় শেষের মুখে। তাছাড়া পুনা-বোম্বাই পথে বেশিরভাগ লোকই এখন রেলে যাতায়াত পছন্দ করেন। দোকানটা থেকে আন্দাজ দুশো গজ দূরে একটা পরিত্যক্ত বাড়ি। আপাতত সেই বাড়িটাই লক্ষ্য ভূষণ রাওয়ের। প্রতিটা খুঁটিনাটি তাকে জানাতে হবে এমনই নির্দেশ ওপরওয়ালার।

তিলক লোকটা অসুস্থ, আগের মতো আর তেমন তেজ নেই, তবু বিশ্বাস নেই পুনার ইংরেজ পুলিশের গোয়েন্দা মিস্টার ক্রিকসনের। হোম রুল আন্দোলনের আড়ালে কিছু না কিছু মতলব ভাঁজছে লোকটা। আন্দাজ করতে পারেন ক্রিকসন, কিন্তু তেমন কোনো সূত্র হাতে আসেনি। এখুনি লোকটাকে গ্রেফতার করলে ঝামেলা হতে পারে। আপাতত তাঁর সমস্ত গতিবিধির ওপর পালা করে নজরদারি চলেছে। পুনা থেকে আজ সকালেই বোম্বাই যাবার জন্য রওনা হবার সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকসন খবর পেয়ে গেছেন। অমনি গোটা রাস্তায় সক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে খোচরদের দলকে। ভোরঘাটের দায়িত্ব ভূষণ রাওয়ের। তার নজর এখন বাড়িটার সামনে দাঁড়ানো কালো রঙের শেভ্রলে গাড়িটার ওপরে। কিছুক্ষণ আগেই ওটা থেকে দুজন মানুষকে ঢুকতে দেখেছে সে। ধুতি, কুর্তা, মাথায় কাপড়ের পাগড়ি পরা ওই দুজনকেই সে বিলক্ষণ চেনে। একজন তিলক, অন্যজন বিশ্বনাথ শিন্ডে।

বাড়িটায় আরও কিছু লোক রয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে সে চিনতে পেরেছে। গণেশ আপ্তে। বাকিরা কারা এবং কী কারণে এখানে এসেছে এই খবরটা তাকে জোগাড় করতেই হবে। বোম্বাই যাবার পথে তিলককে এখানে হঠাৎ কেন থামতে হল সেটাও ভাবার বিষয়। ভূষণ রাও এক এক করে ভাবনাগুলো গুছিয়ে তুলছিল মনে মনে। সরাসরি কিছু করা নিষেধ। নইলে পুলিশ ডেকে বাড়ি ঘিরে কখন ব্যাটাদের তুলে নেওয়া যেত! কিন্তু তাতে আসল অভিসন্ধি যে কী তা হাতে না-ও আসতে পারে। এমনটাই ক্রিকসনের অনুমান। তাই অনেকটা আঁটঘাট বেঁধে এগোতে চাইছেন তিনি।

***

রাত আটটা নাগাদ তিলকজি বেরিয়ে গেলেন। গাড়ি চলে যাবার পর চারদিক নিস্তব্ধ। গণেশ ওদের এগিয়ে দিতে গিয়েছিল। ফিরে আসার পর তাকে বেশ চিন্তিত মনে হল। খানিকক্ষণ চুপ থেকে সে বলল, “ভেবেছিলাম আজ রাতটা এখানে নিশ্চিন্তে কাটিয়ে কাল ভোরবেলা রওনা দিলেই হবে। কিন্তু তা আর হল না। ভোরের আলো ফোটার আগেই রওনা দেব আমরা।”

ওর কথা শুনে দুজন যুবক এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, তারপর তাদের একজন মুখ খুলল, “সমস্যা হয়েছে কোনো?”

“ব্রিটিশের চর লেগেছে পেছনে। জানি না পুলিশও আছে কি না। আজ রাতটা আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”

দুজনের মধ্যে ছোটো যে, তার বয়েস ষোলো কি সতেরো। অনেকক্ষণ থেকেই উশখুশ করছিল সে। এবারে সে বলেই ফেলল, “তিলকজি কোথায় গেলেন এখন? এই রাত্তিরে?”

“উনি এখানেই থাকবেন আজ। কাল সকালে বোম্বাই রওনা দেবেন। বোম্বাই হাইকোর্টে একটা জরুরি মামলা রয়েছে।”

“ওঁকে দেখে শরীর খারাপ মনে হল।”

“হুঁ। শরীরটা ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। তবু শরীরের বাধা কোনো বাধা বলে মনেই করেন না। ব্রিটিশের চরেরা তো সারাক্ষণ নজর রাখছে, পান থেকে চুন খসলেই বা একটু কিছুর গন্ধ পেলেই নিয়ে জেলে আটকে রাখবে। তাই পুনা শহরে ডাকেননি তোমাদের। তোমাদের আমি নিরাপদেই ট্রেনে তুলে দেব। কিন্তু তারপর খুব সাবধানে তোমাদের ফিরে যেতে হবে। ইংরেজদের চেয়েও বেশি ভয় দেশি চরেদের। খুব সাবধানে ফিরবে তোমরা। যতক্ষণ এখানে আমার সঙ্গে আছ কোনো চিন্তা নেই। এখন চলো, ভবেশকে বলে রেখেছি, সে খাবার নিয়ে এল বলে।”

“ভবেশ?” এসে অবধি এখানে অন্য কাউকে তো দেখা যায়নি।

“ভয় নেই,” গণেশ হেসে ফেলে, “এই ডেরাটা ভবেশেরই। সে কাছেপিঠেই থাকে। বিশ্বস্ত লোক।”

***

দুচোখের পাতা এক করতে পারছিল না অবিনাশ। বিপিনদা বলে দিয়েছিলেন গণেশ আপ্তের সঙ্গে দেখা করতে। আহমেদ নগরে। বোম্বাই বা পুনায় আসার নিষেধ ছিল। সেইমতো যোগাযোগ করে এইখানে আসা। তিলকজির সঙ্গে যে-কারণে দেখা করা তা ভালোয় ভালোয় মিটেছে। এখন পরের পর্ব। সে-দায়িত্বটুকু পালন করার সময় পাওয়া যাবে কি? অবিনাশ ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠল। পাশেই যতীন ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক। ওর ওপরেও তো দায়িত্ব নেহাৎ কম নেই। এইটুকু ছেলে হলে হবে কী, ছাইচাপা আগুন। বিপিনদার কথা মনে পড়ে গেল।

জুলাইয়ের পাঁচ তারিখ ওদের দুজনকে ডেকে যখন এই কাজের ভার দিলেন উনি ওর পা যেন আর মাটিতে পড়ছিল না, আকাশে উড়ছিল। কংগ্রেসের এক নেতা অবশ্য আপত্তি করেছিলেন, “বিপিনবাবু! দুটি আনকোরা ছেলেকে এই দায়িত্ব…”

তাকে কথা শেষ করতে দেননি বিপিন। হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “আমি মানুষ চিনি, নিবারণবাবু। এই ছেলেরা ছাইচাপা আগুন। মিলিয়ে নেবেন।”

আহমেদনগরে দেখা হবার পরই গণেশ বলেছিলেন, “একটা বিশেষ কাজে তোমাদের পাঠানো হয়েছে তা জানো নিশ্চই?”

“আজ্ঞে পুরোটা না হলেও খানিকটা বলেছেন বিপিনদা।”

“বেশ বেশ। তোমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা এখান থেকে ভোরঘাট যাব। তিলকজি সেখানেই দেখা করবেন তোমাদের সঙ্গে।”

সেইমতো ভোরঘাটে চলে আসা। হঠাৎ গায়ে কারো হাতের ছোঁয়ায় চমকে ওঠে অবিনাশ। গণেশদা। ওকে হাতের ইশারায় চুপ করে উঠে আসতে বলেন। অবিনাশ উঠে পড়ে। রাত প্রায় দুটো বাজে।

বন্ধ চা-দোকানের বাইরের বেঞ্চেই গা এলিয়ে বসে থাকতে থাকতে চোখের পাতা লেগে গিয়েছিল ভূষণের। বাড়িটায় বাকি লোকেদের গতিবিধি জেনে নিয়ে সকালে তার করে দেবে এরকমই মনস্থ করে রেখেছিল সে। দুটো ছায়ামূর্তি নিঃশব্দে কখন তার দুপাশে এসে দাঁড়িয়েছে তা সে টেরও পেল না।

একটা শক্ত হাত তার মুখটা চেপে ধরতেই চটকা ভেঙে গেল ভূষণের। লোকটার বাঁহাত এত জোরে মুখ চেপে ধরেছে যে ঘাড় ঘোরাতে পারল না সে। অবশ্য কয়েকমুহূর্ত মাত্র, ডানহাতের একটা নিখুঁত টানে গলার কাছটা ভিজে ভিজে আর গরম হয়ে উঠল, ঘাড়টা ঝুঁকে পড়ল আর রাজ্যের ঘুম নেমে এল চোখে।

অবিনাশ আর গণেশ ধরাধরি করে শরীরটা বয়ে নিয়ে গেল রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নীচে। ওপাশে খাদে ফেলে দিলে একশো বছরেও ইংরেজ পুলিশ খুঁজে পাবে না দেহটা।

তবে আজ রাত থাকতেই ওদের কেটে পড়তে হবে। আরও কোনো টিকটিকি লেগে আছে কিনা কে জানে!

ঘণ্টাখানেকেরও কম সময় লাগল অবিনাশদের বেরিয়ে পড়তে। যতীন যাবে নাগপুর হয়ে কলকাতা। অবিনাশ লাহোরের পথে। অনেক ঘুরপথে দুপুর নাগাদ কল্যাণ রেলস্টেশনে এসে উঠল ওরা। এখান থেকে জলগাঁও অবধি একত্রে যাবে তারপরেই যে যার পথে। গণেশ এখানে ট্রেনে বসিয়েই বিদায় নেবে।

সারাটা রাস্তা অবিনাশদা কোনো কথা বলেনি। ট্রেনে উঠেও না। যতীন ভেবে চলেছিল আকাশ পাতাল। অবিনদাকে সে চেনে ছেলেবেলা থেকে। বলতে গেলে অমন ডাকাবুকো ছেলে খুব কমই দেখেছে সে। যেমন সাহস তেমন মায়াদয়া তার শরীরে। কংগ্রেসের যুবদলের সদস্য। তারই হাত ধরে এই তো সেদিন, ভারতসভাঘরে একটা বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিল সে। মূল বক্তা ছিলেন দুজন, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিপিনচন্দ্র পাল। মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। ছেলেবেলা থেকে সে নিজেও পরোপকারী, স্পষ্টবক্তা। বন্ধুদের সঙ্গে দল পাকিয়ে মানুষের আপদে-বিপদে দাঁড়ানোটা তাদের মজ্জায়। কিন্তু সে তো পাড়ার গণ্ডীতে, বড়োজোর শহরের একটা ছোটো অঞ্চলে।

কিন্তু সেদিন যেকথা সে শুনল তাতে জুড়ে রয়েছে গোটা দেশ। শুনল সে, সারা দেশের মানুষের কান্না মুছিয়ে বুকের ভেতর আগুন জ্বেলে দিতে হবে। রুখে দাঁড়াতে হবে সৎসাহসে ভর করে। বিপিনদার সঙ্গে পরিচয়ও সেদিনই। আলাপ হতে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “বিকেলের দিকে সময় পেলে মাঝে মাঝে আমার কাছে আসিস তো!”

অবিনাশের কাছেই শুনেছিল, বিপিনদা তার আগের মাসেই এলাহাবাদ থেকে মিটিং সেরে ফিরেছেন। সেদিন আরো একটা কথা শুনেছিল সে। বিপিনদা বলেছিলেন দেশের কোনায় কোনায় শুধু নয় সারা বিশ্ব জুড়ে স্বরাজের লক্ষ্যে আওয়াজ তুলতে হবে, বিশ্বজনমত গড়ে তুলে চরম আঘাত হানতে হবে প্রবল ইংরেজের বিরুদ্ধে।

তো, গিয়েছিল সে। প্রায়দিনই, বলতে গেলে রোজই। মাত্র ক’টা দিনেই লোকটা তার এতটাই কাছের হয়ে উঠল যে সে ধন্য মনে করেছিল নিজেকে। কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে ওঁর বাসা থেকে ভবানীপুরের বাড়ি অবধি কেমন ঘোরের মধ্যে হেঁটে ফিরত। সারা শরীর রোমাঞ্চে ভরে থাকত।

বিপিনদার কথারই যেন প্রতিধ্বনি শুনতে পেল সে তিলকজির মুখে, “স্বরাজ আন্দোলনের কথা শুনেছ নিশ্চয়। তা নিয়ে কংগ্রেসের মধ্যে এখনও দোলাচল রয়েছে। কী হবে এর পথ? সশস্ত্র আন্দোলন নাকি অহিংসনীতি। ইংরেজদের মতো প্রবল প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হলে, এই আন্দোলনকে শুধু মহারাষ্ট্রে আটকে রাখলে হবে না। সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। আরো একটা কাজ করতে হবে এর আড়ালে এবং গোপনে। একসঙ্গে একাধিক জায়গায় এই গোপন বিপ্লবের বিস্ফোরণ ঘটলে ইংরেজ দিশাহারা হতে বাধ্য। শক্তি বাড়াতে বাড়াতে একসময় আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে ওদের ওপরে। কোনোরকম প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া যাবে না। আর হ্যাঁ আরেকটা কথা প্রাথমিকভাবে এ-আন্দোলনের মুখোশ থাকবে অহিংস, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের মতো সশস্ত্র সংগ্রামের বীজ লালন করতে হবে আর প্রকৃত সময় এলে সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। শিবাজি মহারাজের মতো। পূর্ণ স্বরাজ আমাদের লক্ষ্য।”

গায়ে যেন কাঁটা দেয়। রক্ত টগবগ করে ফুটে ওঠে। ওরা মন দিয়ে শুনছিল:

“পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, বাংলা, আসাম, মাদ্রাজ, মহারাষ্ট্র একযোগে ঢেউ তুলতে হবে। এই পরিকল্পনার অংশীদার করে তুলতে হবে কংগ্রেসের প্রতিটা সদস্যকে শুধু নয় দেশের প্রতিটা সাধারণ মানুষকে বিশেষ করে ছাত্রদের। পরিচালনার ভার থাকবে গুটিকয় মানুষের হাতে। চূড়ান্ত গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। ব্রিটিশ সরকারের বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলেই এই আন্দোলন বানচাল করতে তারা দাঁত নখ বার করে উঠে পড়ে লাগবে। আমি কিছু নথি তোমাদের দেব। তোমাদের একজনকে তা নিয়ে যেতে হবে লাহোরে সাহেব সিংহের কাছে। অন্যজন ফিরে যাবে বাংলায়। তার কাছে থাকবে বিপিনবাবুর কাছে পৌঁছে দেবার জন্য কিছু জিনিস। পারবে তো?”

“যতে! এই যতে! কী ভাবছিস?”

যতীন চমকে উঠল। সে নিজের ভাবনায় এমন বিভোর হয়েছিল যে তার নাম শুনে চমকে উঠেছিল।

ওকে চমকে উঠতে দেখে সে বলে, “কী রে! ভয় পেলি?”

যতীন হাসে, দুদিকে মাথা ঝাঁকায়, “না গো অবিনদা।”

আর তো কয়েকটা ঘণ্টা। ।তারপর দুজনের রাস্তা দুদিকে। কে

জানে আর কখনো দেখা হবে কিনা। এই সেবাব্রতে কে কখন কোন পথে পাড়ি দেবে তার কি ঠিক আছে কোনো! অবিনাশ মুখার্জি নিজের মনেই হাসে, তারপর যতীনের চুলটা ঘেঁটে দিতে দিতে বলে, “দাঁড়া, গণেশ ঝোলায় কী কী সব খাবার দিয়ে দিয়েছে দেখি। খিদে পায়নি তোর?”

***

তিনদিনের মাথায় কলকাতায় ফিরল যতীন। তবে বিপত্তি ঘটল বাড়ি ঢোকার সময়। সোজা বাবার মুখোমুখি। তখনই ধাঁ করে মনে পড়ে গেল ম্যাট্রিকের ফলাফল বেরিয়ে যাবার কথা। সেকথা তো সে ভুলেই গিয়েছিল। নতুন দায়িত্বের উত্তেজনায় বাড়িতে না বলেই চলে গিয়েছিল অবিনাশের সঙ্গে।

রাজনৈতিক ঝোঁকটা তার ছোটোবেলা থেকেই। বঙ্কিমবাবু অবশ্য চান ছেলে লেখাপড়া করে উকিল ব্যারিস্টার হোক। ভাবেন ছেলে রাজনীতি করে স্বদেশিদের দলে ভিড়ে না যায়। তিনি আসলে ভয় পান। চোখের সামনে স্বদেশি ছেলেগুলোর ওপর অত্যাচার তো কম দেখেননি।

“কোথায় গিয়েছিলে? বাড়িতে বলার প্রয়োজন মনে করনি তো?”

যতীন চুপ করে থাকে। বাপের একথার কী জবাব দেবে সে? সেকথা মুখ ফুটে কাউকেই বলা যে নিষেধ। আবার মিথ্যেও তো বলা যায় না বাবাকে। তাই নিরুত্তর।

যতীনকে চুপ করে থাকতে দেখে বঙ্কিমবাবু আবার বললেন, “জবাব দিলে না যে?”

“আমি বলতে পারব না।”

“কেন?”

“বারণ আছে।”

শুনেই বুকটা কেঁপে উঠল বঙ্কিমবাবুর। ছেলের গলার স্বর তাঁর কাছে অচেনা ঠেকল।

“বাবা! ওকে বসতে দেন। জলটল খাক। ঠান্ডা হোক, তারপর না হয় জিজ্ঞাসা করবেন।” কিরণ বেরিয়ে এসেছিল। ভাইকে সে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। মা-মরা যতীনের একমাত্র আশ্রয়স্থল। যতীনের কাছে গিয়ে কিরণ তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “তুই ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছিস খাঁদু।” আদরের ভাইটিকে সে এই নামেই ডাকে।

বঙ্কিমবাবু তখনকার মতো চুপ করে গেলেন।

“তা, হ্যাঁ রে। যেখানেই যাস, খাওয়া-দাওয়া তো ঠিকমতো করিসনি নিশ্চই। এই ক’দিনেই মুখখানা শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। যা যা, ভেতরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে কিছু মুখে দে যা।”

যতীন ঘাড় নেড়ে কাঁধের ঝোলাটি নিয়ে ভেতরবাড়িতে চলে গেল। বিকেলের মধ্যে বিপিনদার সঙ্গে দেখা করতে হবে তাকে।

***

সাউথ সুবার্বান কলেজ যতীনের বাড়ি থেকে হাঁটাপথ। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে সেখানে নিয়ে গিয়ে কিরণ ভর্তি করে দিল ভাইকে। এক সপ্তাহ ক্লাস হয়েছে সবে। সেদিন রবিবার, আগস্টের প্রথম দিন। একটু বেলাতেই বিপিনদার ডেরায় গিয়ে হাজির হল যতীন। গিয়েই শুনল সেই মর্মন্তুদ সংবাদ। তিলকজি মারা গেছেন। বোম্বাইতেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর। সকালেই খবর এসেছে শরৎবাবুদের বাড়িতে।

বিপিনদা খুব শান্ত হয়ে বসেছিলেন। ঘরে কেউ নেই। ওকে ইশারায় বসতে বলে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আমাদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল যতীন। আরও সন্তর্পণে আমাদের তিলকজির অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দু’বছর, পাঁচবছর, আটবছর যতদিন লাগে লাগুক, হাল ছেড়ে বসে যাওয়া চলবে না। তোমার এলাকার স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আমাদের আদর্শের প্রচার করতে হবে। কিন্তু তা করতে হবে এমনভাবে যাতে সরকারের সন্দেহ হলেও কোনো প্রমাণ তারা উদ্ধার করতে না পারে। তা সত্ত্বেও তাদের বিষনজর এড়ানো সম্ভব হবে না হয়তো, কিন্তু তোমার ব্যাটন ততদিনে অন্য কারো হাতে তুলে দিয়ে যেতে হবে। এই পথ খুব কঠিন। আমি তোমায় জিজ্ঞাসা করছি না যে তুমি পারবে কিনা, কেননা আমার বিশ্বাস তা তুমি পারবে।”

যতীন শুনছিল। ওর মনে পড়ছিল সেদিন সন্ধের কথা, যেদিন তিলকজির সঙ্গে ওদের দেখা হয়েছিল। অবিনদার আর কোনো খবর নেই। বিপিনদাকে মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারেনি। মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল যতীনের। সেদিন ফিরে আসার সময় বিপিনদা হঠাৎ বললেন, আগামি একমাস আমি থাকব না। তুমি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আমার সঙ্গে দেখা কোরো। ততদিন যেভাবে বলেছি সেভাবেই কাজ করে যাও।

হেঁটেই বাড়ি ফিরছিল যতীন। লোয়ার সার্কুলার রোড থেকে বাঁদিকে ঘুরে খানিকটা আসতেই ওর ইস্কুল, মিত্র ইন্সটিটিউশন। ইস্কুলের কাছাকাছি আসতেই নজরে পড়ল ঘটনাটা। একটা রিকশাওয়ালা ইস্কুলের উলটোদিকে রাস্তার পাশে হাতরিকশাটা দাঁড় করিয়ে পাদানিতে বসেই ঝিমোচ্ছিল। পাশের গলি থেকে এক ইংরেজ লোক বেরিয়ে এসে রিকশাটার সামনে থমকে দাঁড়াল। তারপর পা দিয়ে ঠেলা দিতে থাকল লোকটাকে। ঘুমের ঘোরে সে বেচারা বুঝতেই পারছিল না কী ঘটছে। লোকটা এবারে খুব রেগে তাকে আরো জোরে ঠেলা দিতেই পাদানি থেকে পড়ে বেচারার ঘুম ছুটে গেল। সে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই লোকটা তড়াক করে রিকশায় উঠে বলল, “চলো।”

সদ্য ঘুম ভেঙে রিকশাওয়ালা একটু সময় নিচ্ছিল। এরই মধ্যেই সওয়ারি তাকে গালমন্দ দিতে আরম্ভ করেছে। যতীনের আর সহ্য হল না। সে সোজা রিকশার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সাদা চামড়ার লোকটা এবারে বেজায় বিরক্ত হয়ে কিছু বলার আগে যতীনই বলল, “আপনি নেমে আসুন।” ইংরিজিতেই বলল। লোকটা এবারে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে ভুরুটুরু কপালে তুলে ফেলল, ভাবখানা, তুমি কে হে ছোকরা!

কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলেছিল সে কিন্তু তার আগেই যতীন ।।আবার ।।বলল, “আপনি ।নেমে এর কাছে ক্ষমা না চাইলে রিকশা যাবে না।”

রিকশাওয়ালা কাঁচুমাচু মুখে যতীনের দিকে তাকাতেই সে তাকে হাত তুলে থামতে বলল, তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে ইংরেজ লোকটার দিকে চেয়ে বলল, “কই আসুন।”

লোকটা এদিক-ওদিক দেখছিল সাহায্যের আশায়, কিংবা বেরাদরির লোক খোঁজার জন্য। ভিড় জমছিল আশপাশে, পাশেই যতীনের পাড়া, বন্ধুবান্ধবরাও জুটে আসছিল একে একে। যতীনের বন্ধু গৌর এসে পড়েছিল। যতীনের এই বন্ধুটি নিয়মিত শরীরচর্চা করে, বেশ শক্তপোক্ত, একেবারে যতীনের উলটো। সে এসেই দু-ঘা দেবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যতীন তাকে আটকাল, “কেউ গায়ে হাত দেবে না। শুধু ঘিরে থাকো রিকশাটা। ক্ষমা না চাইলে এখান থেকে উনি যেতে পারবেন না। আর ওঁকে পায়ে হেঁটেই যেতে হবে এখান থেকে।”

শেষমেষ যতীনদের কথাই মানতে হল। লোকটি দাঁত কিড়মিড় করে কোনোমতে ক্ষমাটমা চেয়ে চলে গেল। রিকশাওয়ালাটার সওয়ারি হল না। যতীনের পকেটে এক আনা পয়সা ছিল সেটা সে ওকে দিয়ে ফিরে এল পাড়াতে।

ঘটনাটার রেশ টের পাওয়া গেল পরদিন। থানা থেকে দু’জন কনস্টেবল এসে পাড়ায় খোঁজ-টোজ করে চারটে ছেলেকে তুলে নিয়ে গেল। তাদের মধ্যে গৌরও একজন। যতীন কলেজে গিয়েছিল। বিকেলে বাড়ি ফিরে শুনল দাদার মুখে। ভাগ্যিস সে-সময় বাবা বাড়িতে ছিলেন না। যতীন শুনেই বলল, “থানায় যাচ্ছি দাদা।”

কিরণ মুখ শুকনো করে ভাইকে বলে, “তুই আবার যাবি কেন? সেখানে গেলে ছেড়ে কথা বলবে ভেবেছিস?”

“না গেলেও কী রেহাই আছে দাদা!” কিরণ ঘটনাটা জানত না, যতীন আদ্যোপান্ত তাকে খুলে বলাতে ভারী চিন্তায় পড়ে গেল সে।

“আমাকে যেতেই হবে দাদা। ওরা নিরপরাধ তিনটে ছেলেকে ধরে রাখবে সে হয় না।”

কিরণ জানত কী হতে চলেছে। তাও সে ভাইকে থামাতে পারল না। সে তার সঙ্গে গেল। দারোগা সত্যব্রত চক্রবর্তী থানাতেই ছিলেন। যতীন গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করে খুলে বলল ঘটনাটা। একবর্ণও বাড়িয়ে বা কমিয়ে নয়।

ইংরেজ পুলিশের দারোগা হলেও সত্যব্রত ভালো মানুষ। তিনি বললেন, “বাহাদুর বটে বাপু তোমার বন্ধুরা। তোমার নামে তো কেউ টুঁ শব্দটি করেনি। তোমাকেও বলিহারি। থানায় এসে এমন বন্ধুকৃত্য করতে আমি আর কাউকে দেখিনি। তোমাদের অপরাধ তো কিছু নেই সে আমিও জানি। তবে আমি ইংরেজের গোলামি করে সংসার চালাই। আমার যে হাত পা বাঁধা।”

লক আপে যতীনকে ঢোকাতেই গৌর, সুকেশ, বদন আর কুঞ্জ হইহই করে উঠল। যেন এর অপেক্ষাতেই বসেছিল তারা।

“আমাদের খুব জেরা করেছে জানিস। মারের ভয়ও দেখিয়েছে।” একগাল হেসে সুকেশ বলল, তারপর যোগ করল, “অবশ্য একথা শুনে তুই যে থানা অবধি দৌড়ে আসবি সেকথা আমি ভাবিনি।”

“আমি জানতাম।” গৌর বলে ওঠে। আমাদের বিপদ দেখে বাড়িতে লুকিয়ে থাকবে এমন বান্দা যতে নয়।”

দুদিন পর তেমন তেমন সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব আর অপরাধের গুরুত্ব বিচার করে বেকসুর খালাস হয়ে গেল সকলের।

কাজ শুরু করে দিল যতীন। মূলত স্কুল কলেজের ছাত্রদের মধ্যে এবং পাড়ার সমবয়েসী ছেলেদের মধ্যে স্বরাজ আন্দোলনের বীজ বুনে দেওয়া। বিপিনদা বলে দিয়েছিলেন কী কৌশলে এই কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ পড়ানো। স্কুল কলেজের বিভিন্ন বিষয় পড়ানো দিয়ে আরম্ভ করে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিটা ছাত্রকে অবহিত করানো, এবং তাদের কী কাজ হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা। দ্বিতীয় কাজটি সামাজিক সহায়তা। কংগ্রেসের সংগঠনের ছায়ায় এক একটা স্বেচ্ছাসেবী দল তৈরি করে সাধারণ লোকের আপদে বিপদে গিয়ে দাঁড়ানো এবং তাদের সঙ্গে একটা যোগসূত্র গড়ে তোলা, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই দলগুলির প্রতি একটা পূর্ণ সহানুভূতির ভাব গড়ে ওঠে। এ-কাজ তো তার ছেলেবেলা থেকেই স্বভাবগত, এইবারে বিভিন্ন জায়গায় স্বেচ্ছাসেবী দল গড়ার কাজেও হাত লাগাল সে। শুধুমাত্র সাহায্যই নয়, যেকোনো সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।

আরেকটা গোপন কাজের দায়িত্ব ছিল তার। এই স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়ে এবং স্বেচ্ছাসেবী দলের সদস্যদের মধ্যে নজর করা কাদের গুপ্তসমিতির কাজে যুক্ত করা যাবে। সে সরাসরি তাদের যোগাযোগ করাবে না। সে কাজের দায়িত্বে বিপিনদা অন্য কাউকে নিয়োগ করবে। প্রতিটা যোগসূত্রের মধ্যে যাতে একটি করে ফাটল থাকে, বিপিনদার নির্দেশ ছিল সেইমতো। একটি সুতোয় টান পড়লে যেন গোটা পরিকল্পনাটা ধসে না যায়।

তিলকজির মৃত্যুর খবর আসতে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সেদিনই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়েছিল অসহযোগ আন্দোলনের। বোম্বাই শহরের অঝোর বরষা উপেক্ষা করে সেদিন কাতারে কাতারে লোক তাদের প্রিয় নেতাকে সম্মান জানাতে গিয়েছিল। তারপর জায়গায় জায়গায় শুরু হয়েছিল সমাবেশ ও মিছিল। যতীনরা সে-সব খবর শুনেছে কলকাতায় বসেই। কলকাতাতেও কংগ্রেসের জমায়েত হল তিলকজির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। সেপ্টেম্বরের গোড়ায় কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলনে সিলমোহর পড়ল। গান্ধিজির প্রস্তাব মতো ঠিক হল আন্দোলনের অভিমুখ হবে অহিংস। ইংরেজদের সমস্ত আইন আদালত স্কুল কলেজ চাকরি ত্যাগ করা হবে। বিলিতি জিনিস বর্জন করা, কর দেওয়া বন্ধ করা, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য তৈরি করা, কাউন্সিল নির্বাচন বয়কট করা এবং ক্রমে এই আন্দোলনের ঢেউ প্রতিটা ভারতবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে গণ আইন অমান্যের পথে হাঁটা। অহিংসভাবে এই পথে হাঁটলে গান্ধিজির স্থির বিশ্বাস যে এক বছরের মধ্যে স্বাধীনতা আসবে।

সব খবরই কানে আসছিল যতীনদের। মতিলাল নেহরু, ইয়াকুব হাসানদের মতো নেতা গান্ধিজির এই পথ সমর্থন করলেও চিত্তরঞ্জন দাশ বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ নেতারা সেই মত সমর্থন করেননি। বিপিনদা ঘোষণা করে দিলেন আর সরাসরি রাজনীতিতে থাকবেন না। বিপিনদার এই কথা শুনে যতীন মনে মনে অস্থির হয়ে উঠল। তার তর সইছিল না। বিপিনদা এমাসের মাঝামাঝিই দেখা করতে বলে গিয়েছেন।

কিন্তু এরই মধ্যে এমন ঘোষণা শুনে তার কেমন দিশাহারা লাগল। ধৈর্য ধরতে হবে। বিপিনদার সঙ্গে দেখা না হওয়া অবধি পরবর্তী কাজকর্মের দিশা স্থির হবে না। আপাতত যেমন চলছিল তেমন চালিয়ে যেতে হবে। স্কুল কলেজেও এসে লেগেছে অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ। তাদের কলেজে অনেকেই পড়া ছেড়ে দেবার পরিকল্পনা করছে। তার কাজকর্মে এদিকে বাবাও খুব উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে একদিন খিদিরপুরে গিয়েছিল যতীন। ওখানে একটা ক্লাবঘরে ইস্কুলের ছেলেদের পড়ায় সে। সেদিন একটু রাত হয়ে গিয়েছিল বাড়ি ফিরতে। সেদিন এক অন্য বাবার মুখোমুখি হল সে।

“শোনো যতীন!” বাবার গলার স্বর খুব ক্লান্ত শোনায়, “কংগ্রেসের আন্দোলনের আগুন এখন চতুর্দিকে জ্বলছে। তুমি আমার মতামতকে গুরুত্ব দেবে কি দেবে না সেটা তুমিই সিদ্ধান্ত নেবে তবে এই আন্দোলনের সমর্থক আমি নই। আমায় এত বড়ো সংসার টানতে হয়, প্রতিবেশী পরিজন নিয়ে বসবাস করতে হয়। এই পরিবারের বেঁচে থাকা আমার রোজগারের ওপর নির্ভর করে। এখন তুমি যদি সরাসরি এই আন্দোলনে যোগ দাও তবে তোমায় এবাড়ি ছাড়তে হবে। তুমি নিশ্চয় চাও না তোমার জন্য পরিবারের সকলে বিপদে পড়ুক, হেনস্থা হোক।”

যতীন কিছুই উত্তর দিল না। সে নিজেই যথেষ্ট ধন্দে রয়েছে। পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার না হওয়া অবধি সে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। এক একবার মনে হচ্ছে এখনই সব ছেড়েছুড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, পরক্ষণেই আবার বিপিনদার বলা কথা মনে পড়ে। যুদ্ধে সৈনিক প্রয়োজন, কিন্তু সব সৈনিকের কাজ যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে গুলি চালানো নয়। কারো কারো কাজ থাকে নেপথ্যে সৈন্যদল গঠনের কাজে, নীতিপ্রণয়নের কাজে, পরিচালনার কাজে, সৈনিকদের শিক্ষাদানের কাজে। সে আরও কঠিন কাজ, তাতে প্রয়োজন নিষ্ঠা আর অসীম ধৈর্যের, নিজের বিশ্বাসের প্রতি চরম আস্থা এবং ভালোবাসা। বিপিনদা যে তাকে সেই কাজের ভার দিয়েছেন। যতীন নিজেকে সংযত করে। সে শুধু আস্তে আস্তে বলে, “আপনার কথা আমি মনে রাখব বাবা।”

ছেলের কথায় মুখ তুলে চান বঙ্কিমবাবু। এইটুকু ছেলে, অথচ তাকে তাঁর নিজের চেয়ে মাথায় অনেকটা বড়ো বলে মনে হয়। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ওঁর।

***

সেপ্টেম্বর মাস পেরিয়ে গেল। বিপিনদার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। সে দুদিন গিয়েছিল তাঁর ডেরাতে। উনি নেই। ফিরে চলে এসেছিল। অক্টোবরের শুরুতে যতীন একদিন হুগলিতে গিয়েছিল। সেখানে কংগ্রেসের একটা ছোটো সভা ছিল। অনেকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হল সেখানে। সভা ভাঙার পর একটি তরুণ ছেলে, তারই সমবয়েসী হবে, যতীনকে এসে বলল, “ভাই তোমায় নেড়ুদা একটু ডাকছেন।”

“কোথায়?”

“ওই যে ওখানে।” ছেলেটি হাত তুলে দেখায়।

সভা যে বাড়িতে হল, তার চারপাশে পাঁচিল দেওয়া। যতীন বেরিয়ে পড়বে বলে বাড়ির গেটের কাছে চলে এসেছিল। বাড়ির পাশে ছোটো একফালি জমি। গাছপালা ঘেরা। জমির একপাশে বাড়ির গেট। ঠিক তার উলটোদিকে দুজন লোক পাশাপাশি দুটি চেয়ারে বসে রয়েছেন।

যতীন ছেলেটার সঙ্গে এগিয়ে গেল।

“নেড়ুদা এই যে উনি।” ছেলেটা বলতেই সামনের লোকটা ওকে হাত নেড়ে বললেন, “তুই যা এখন। কাল একবার দেখা করিস।” তারপর যতীনের দিকে ফিরে বললেন, “তোমার নাম তো যতীন?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“আমার নাম নবগোপাল চৌধুরী। এনাকে চেনো?” পাশের লোকটিকে দেখান ভদ্রলোক। যতীন মাথা নাড়ে। অন্য লোকটি খুব নরম চোখে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। মুখে মৃদু হাসি। চোখে একটা কালো ফ্রেমের চশমা। তার ভেতর দিয়েও চোখের উজ্জ্বলতা চাপা পড়ছে না।

“উনি মনিলাল রায়।” নবগোপালবাবু বললেন। যতীন নিচু হয়ে প্রণাম করতে যেতেই মনিলাল রায় ওকে ধরে ফেলেন, “উঁহু। মাথা নোয়ানো তো চলবে না ব্রাদার।” বলেই হো হো করে হেসে উঠে ওকে জড়িয়ে ধরেন। যতীনের খুব ভালো লাগতে থাকে।

“তোমায় কেন ডেকেছি জানো?”

“না।”

“আলাপ করব বলে।”

“আলাপ?” আশ্চর্য হয় যতীন। সব্বাইকে ছেড়ে তার সঙ্গে আলাপ! এঁরা তো তাকে আগে দেখেনওনি। ওর চোখে সন্দেহের হালকা ছায়া।

‘আলাপ’ শব্দটা একটু জোরেই বলে ফেলেছিল যতীন। মনিলাল হো হো করে হেসে ফেললেন। না ভায়া, তুমি এক শব্দেই সব বলে দিয়েছ! সন্দেহের কিছু নেই। বিপিনদা তোমাকে খবর পাঠিয়েছেন, এই চিঠিটা তুমি এখানেই পড়ো।”

মনিলাল চিঠিটা যতীনের হাতে দেয়। যতীন একটু পাশে সরে গিয়ে পড়তে থাকে।

“স্নেহাস্পদেষু যতীন,

আশা করি কুশলে আছ। মুখোমুখি সাক্ষাতের জন্য তোমাকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আপাতত আমি কংগ্রেসের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক সম্পর্ক ত্যাগ করেছি এমনটাই প্রচারিত। তবে রাজনৈতিক লেখালেখি বন্ধ হবে না। তোমাকে যে কাজের ভার দিয়েছি তা মনে আছে নিশ্চই। সে কাজ পূর্ণ উদ্যমে চালিয়ে যাবে। আপাতত কলেজ ছেড়ো না। যথাসময়ে আমি তোমায় জানাব। এর মধ্যে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, চব্বিশ পরগণা এই হবে তোমার কাজের ক্ষেত্র। প্রয়োজনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা ও আসামে যেতে হতে পারে সেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখো।

বহুকাল ধরে আমাদের বোঝানো হয়েছে ইংরেজ সরকার ধীরে ধীরে ভারতীয়দের শিক্ষিত করে তুলে তাদের হাতে শাসনভার তুলে দেবেন। আমরাও তাই-ই বিশ্বাস করে এসেছি। কংগ্রেসের ধ্যানধারণা কাজকর্ম সেইভাবেই এগিয়েছে একটু একটু করে। কিন্তু এ যে সম্পূর্ণ এক ছলনা তা ধরা পড়ে যাবার পর ইংরেজের দাঁত নখ যেভাবে একের পর এক বেরিয়ে চলেছে তা নিশ্চই আর অজানা নেই কারো কাছে।

এখন সময় এসেছে চরম প্রস্তুতির। সংবিধানের দোহাই দেয় ইংরেজ। জারের শাসনেও তো সংবিধান ছিল, কিন্তু সে কার স্বার্থে? জনগণের ইচ্ছা স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা সেখানে ঠাঁই পেত কি? দেশের সংবিধান হবে রাজনৈতিকভাবে একক ও জনহিতকর। আপামর জনতার কণ্ঠস্বর সেখানে প্রতিফলিত হবে। মানুষের স্বার্থ, স্বাস্থ্য, জীবন রক্ষায় সে হবে হাতিয়ার। কে দেবে সেই আশ্বাস? সেই সংবিধান নিজেদের রচনা করে নিতে হবে। মানুষের বিশ্বাসকে আমাদের হাতিয়ার করে তুলতে হবে। তরবারি কখনো ভারতকে জিতে নিতে পারেনি, তরবারির সামনে আমরাই নতজানু হয়ে থেকেছি ভগবানের আশীর্বাদ ভেবে। সেই অন্ধতাকে আলো দিয়ে দূর করে দিতে হবে আমাদের। নতুন শক্তি নিয়ে জেগে উঠতে হবে যেভাবে জেগে উঠেছে অনেক দেশ।

আপাতত কিছুদিন নীরবে কাজ করে যেতে হবে তোমায়। আজ থেকে ঠিক একমাস বাদে, মনিলালের কাছে এমন দুটি ছেলেকে পাঠাবে, যাদের গুপ্তসমিতির যেকোনো কাজে বহাল করা যায়। কোন দুই ছেলে তা তুমিই স্থির করবে। তোমার বিচারবুদ্ধির ওপর আমার আস্থা রয়েছে। তুমি পর্যবেক্ষণ করে সঠিক দুজনকে খুঁজে নেবে বলেই আমার বিশ্বাস। দক্ষিণ কলকাতা কংগ্রেস কমিটির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে চলবে। খুব শিগগিরই দেখা হবে। আশীর্বাদ নিও।

বিপিনদা।”

পড়া হয়ে যেতে মুখ তুলতেই মনিলাল চিঠিটা যতীনের হাত থেকে নিয়ে দেশলাই জ্বেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

কলেজ ছেড়ে দিল যতীন। ততদিনে দক্ষিণ কলকাতার কংগ্রেস কমিটির অন্যতম সক্রিয় সদস্য সে। এখন এখানে অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্বে চিত্তরঞ্জন দাশ। সেই আন্দোলনে এবারে সরাসরি যোগ দিল সে। কলকাতা হাওড়া চব্বিশ পরগণা হুগলি নানান জায়গায় ছুটে বেড়াতে হয় তাকে। তার কাজ মূলত ছাত্রদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা, দেশের রাজনৈতিক হালচাল সম্পর্কে জানানো। আর গোপনে পর্যবেক্ষণ করা সেইসব ছেলেদের, যাদের ওপর গুরু দায়িত্ব দেওয়া যায়। এছাড়া কংগ্রেসের কাজকর্ম তো আছেই। বিপিনদার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে সে।

কলেজ ছাড়ার কারণ জানানোয়, বাড়িও ছাড়তে হল। বলতে গেলে সে নিজেই ছেড়ে এল বাড়ি। দাদা লুকিয়ে কয়েকটা টাকা দিয়ে দিয়েছিল বাড়ি ছেড়ে আসার সময়, তাও শেষ। কংগ্রেসের সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে সে কোনো ভাতা পায় না, তাকে দলের নেতারা বলা সত্ত্বেও সে কোনো টাকা নিতে অস্বীকার করে। যতীনের সাফ কথা, “এ আমার নিজের সিদ্ধান্ত। দেশের কাজ আমি স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছি। টাকা নেবার কোনো প্রশ্নই আসে না।”

যাহোক তাহোক করে চলে যাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে দাদা খোঁজ করতে আসে কংগ্রেসের আপিসে। বেশিরভাগ দিনই দেখা হয় না। যতীন নানান কাজে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। যেদিন দেখা হয়, সেদিন বাড়ি থেকে আনা খাবারও পেটে পড়ে খানিক। দাদা দুঃখ করে, “কী চেহারা হয়েছে দেখেছিস! এমনি করলে চলবে?”

যতীন দাদার কথার জবাব দেয় না। শুধু হাসে। কিরণের বুক চেপে দীর্ঘশ্বাস পড়ে কেবল।

বেশিরভাগ দিনই রাতের দিকে খাবার জোটে না। দিনের বেলা যাহোক তাহোক এদিক ওদিক মিটিং মিছিল ইত্যাদিতে চিঁড়ে মুড়ি গুড় কিছু না কিছু জুটে যায়। কোনো কোনোদিন কারো না কারো বাড়িতে দুটো ডালভাত। কিন্তু তা করে কি আর দিন চলে! শচীশবাবু একদিন কংগ্রেস অফিসেই ওকে ধরে পড়লেন।

“শোনো যতীন। এভাবে চললে তো বেশিদিন টানতে পারবে না হে। তোমার জন্য একটা কাজের কথা বলেছি।”

যতীন একগাল হেসে বলল, “কী কাজ শচীবাবু?”

“ভয় নেই। হ্যারিসন রোডে হোপ অ্যান্ড কোং -এর একটি আপিস আছে। তারা স্বদেশি মালের ব্যাবসা করে। মালিক সজ্জন লোক। কংগ্রেসের সমর্থক। সেইখানে খাতা লেখার কাজ। সন্ধের পর গিয়ে কাজটুকু সেরে দিলেই হবে।”

যতীন উত্তর না দিয়ে হাসে। শচীশবাবু বহুকালের কংগ্রেসকর্মী। গোলদিঘির কাছে থাকেন। মল্লিকবাড়ির আশ্রিত।

দিন দশেক তাই-ই চলল। অ্যাদ্দিন কংগ্রেসের আপিসঘরেই রাতে থাকত। এখন কাজের সুবিধের জন্য কাজের জায়গাতেই রাতে থাকার ব্যবস্থা করে নিল যতীন।

তবে যার বুকে আগুন সে কি ঘরে বসে তিষ্ঠোতে পারে? এরই মধ্যে খবর এল খুলনায় দুর্ভিক্ষের কারণে লোকেদের করুণ অবস্থার কথা। ইংরেজ সরকারের ভ্রুক্ষেপ নেই। মানুষ মরছে মরুক। নেটিভরা মরলে কী আর এমন ক্ষতি। কংগ্রেসের মধ্যে আলোচনা হয়, সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি রিলিফের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ শুরু হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছু এগোয় না। যতীন অস্থির হয়ে ওঠে। ওর কানে আসে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের মাস্টারমশাই প্রফুল্লচন্দ্র রায় রিলিফের উদ্যোগ নিয়েছেন। সেইমতো কাজ শুরু হয়ে গেছে। পরদিনই ও সটান সেখানে পৌঁছে গেল।

দায়িত্ব বুঝে নিতে দেরি হয়নি। মাস্টারমশাইয়ের নির্দেশ মতো সেদিনই দৌলতপুর রওনা হয়ে গেল যতীন। চাল ডাল চিঁড়ে মুড়ি গুড়… খাদ্যদ্রব্য বলতে এইই। সেইসঙ্গে বেঙ্গল কেমিক্যালের তৈরি কিছু জরুরি ওষুধ। এগুলোই গ্রামের মানুষদের মধ্যে বিলি বন্দোবস্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় জমিদারবাবু হিতেন মজুমদার যথেষ্ট সাহায্য করছেন। ওরই কাছারিঘরের এক কোণে তৈরি হয়েছে রিলিফ ক্যাম্প।

রিলিফ ক্যাম্পে কাজ করতে করতেই যতীনের সঙ্গে আলাপ হল দুটি ছেলের। ললিত বসু এবং কাজল দে। যতীনেরই বয়েসী, তবু যতীনকে তারা দাদা বলেই ডাকে। সারাদিন চরকির মতো ঘুরে যাচ্ছে। ক্লান্তি বলে কোনো পদার্থ শরীরে নেই। মুখে হাসি। সন্ধের পর তিনজনে গল্পগাছা করে। গল্পের বিষয় অবশ্য একটাই, দেশের বর্তমান হাল এবং স্বাধীনতা অর্জন কোন পথে। খুব সতর্কভাবে যতীন এই দুটি ছেলের মনে বিপিনদার শিখিয়ে দেওয়া মন্ত্র ‘মুক্তির পথ’ বুনে দিতে থাকে। ওদের বুঝিয়ে দিতে থাকে এ এক দীর্ঘ প্রস্তুতির কাল। অনেক ঝড় জল বিরোধিতা পার করে প্রস্তুতির চূড়ান্ত দিনে আঘাত হানতে হবে প্রতিপক্ষের ওপর, আর তাতে জয় সুনিশ্চিত।

মাসখানেক পর কলকাতা ফেরার চারদিনের মাথায় পুলিশ এসে একদিন ওকে তুলে নিয়ে লক আপে পুরে দিল। অপরাধ কী? খুলনার জেলা পুলিশের সুপারিনটেন্ডেন্টকে খুনের পরিকল্পনায় যুক্ত থাকা। ও ফিরে আসার পরেরদিনই সুপারিনটেনডেন্ট জন স্টুয়ার্ট দৌলতপুর পরিদর্শনে আসেন। রিলিফের কাজে মোটেও খুশি নন তিনি। এর নাকি কোনো দরকারই নেই। এসব স্বদেশি ডাকাতদের ফন্দি বিশেষ।

হিতেনবাবুও কিছু করতে পারেননি। রিলিফের কাজ বন্ধ করার হুমকি দিয়ে দৌলতপুর ক্যাম্পে ফিরে যান তিনি। সেই রাত্রেই দুটি ছেলে সাহেবের তাঁবুতে বোমা মারে। সাহেব সেইসময়ে তাঁবুর ভেতরে ছিলেন না বলে বেঁচে যান।

তারপরই শুরু হয় ব্যাপক খানাতল্লাশি আর ধরপাকড়। ছেলেদুটির টিকিও খুঁজে পায়নি তারা। তবে জেনেছিল রিলিফ ক্যাম্পে তাদের সঙ্গে নাকি কলকাতার একটি ছেলেও ছিল। নাম জানতে দেরি হয়নি। গন্ধ শুঁকে শুঁকে পুলিশের চর ঠিক পৌঁছে গেছে কলকাতায়।

দিন পাঁচেক লক আপে রইল যতীন। সত্যি বলতে কি এমন একটা কাজে এত দ্রুত যে ললিত আর কাজল নেমে পড়বে ও ভাবতে পারেনি। আরো একটু ধৈর্য ও পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। আর কাজটা যে হঠাৎ হয়েছে তা বলাই বাহুল্য।

পুলিশ অনেক করেও যতীনের যোগসাজশ সরাসরি প্রমাণ করতে পারল না। অবশ্য তারা যে খুব প্রমাণের ধার ধারে তাও নয়। তবে এ যাত্রা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র সেন-এর হস্তক্ষেপে পার পেয়ে গেল যতীন।

যতীন ভাবছিল এই ছুটকোছাটকা কাজকর্মে টের পাওয়া যাচ্ছে বারুদের সলতে কতদূর ঢুকে গেছে তরুণ এবং যুবক সম্প্রদায়ের মধ্যে। এইসব ছোটো ছোটো ফুলকি একত্র করে তুলে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলেই গণ অভ্যুত্থান সম্ভব, সেইটেই হয়তো ‘মুক্তির পথ’।

দিন সাতেকের মধ্যে খিদিরপুরের একটা ডেরা থেকে আবার যতীনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। যতীন তখন ছেলেদের পড়াচ্ছিল। একেবারেই নিরীহ অঙ্কের পাঠ। পুলিশ কেস দিল আইন ভেঙে সভা করেছে যতীন এবং তার দলবল। যতীনের সঙ্গে আরো চারপাঁজনকে ধরে প্রেসিডেন্সি জেলে চালান করে দিল এবারে। সেখানে চোর ডাকাত পকেটমারদের মতো সাধারণ বন্দিদের সঙ্গে একসঙ্গে রাখা হত রাজনৈতিক বন্দিদের। জেলে সশ্রম কারাদণ্ড হলে তো হাড়ভাঙা খাটুনির শেষ নেই। তার ওপরে আবার হাতে হাতকড়ি পায়ে বেরি, চাবুকের ঘা, সারাদিন হাত টান করে দাঁড় করিয়ে রাখা, কতরকম যে ফিকির বার করেছে!

যতীনের কপাল ভালো তার ওপরে শারীরিক অত্যাচারটা হয়নি তবে বাগানের মাটি কোপাতে হয় দু’বেলা। কোদাল চালিয়ে হাতে ফোসকা পড়ে গেছে। খাবার মানে শুকনো রুটি গুড়। এছাড়া ভাতের মণ্ড আর একটা ঘ্যাঁট। এযাত্রা মাসখানেক বাদে জেল থেকে ছাড়া পেল যতীন। 

পুলিশ যে তক্কে তক্কে রয়েছে তা টের পেতে দেরি হয়নি। যতীন সাবধান হল। জেল থেকে বেরিয়ে বিপিনদার সঙ্গে একদিন দেখা করতে হল। উনিই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। ওর নির্দেশে বছরের শেষদিকে যতীনকে পরপর যেতে হল চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ। এইবারে যত দ্রুত সম্ভব এবং অত্যন্ত কৌশলে দেশের সর্বত্র গোপন সংগঠন ছড়িয়ে দেবার কাজ জোরকদমে শুরু হয়ে গেছে। সঠিক সময় এলে একযোগে দাবানলের মতো আগুন জ্বেলে দিতে হবে। ব্রিটিশ পুলিশ ছেড়ে কথা বলবে না ঠিক। চরম অত্যাচার নামিয়ে আনবে। কিন্তু বিপিনদার বলা কথাকটা ওর কানে বাজে। যা ঘটে ঘটুক, নিজে নিঃশেষ হয়ে যাবার আগে ব্যাটনটা আরেকটা হাতে তুলে দিয়ে যেতে হবে। আদর্শের মৃত্যু নেই, যে কাজ হাতে তুলে নেওয়া হয়েছে তার শেষ না হওয়া অবধি, এই আগুনের শিখা জ্বলতে থাকবে যতদিন না বাংলা তথা ভারতের প্রতিটা তরুণ পুড়ে ছাই হচ্ছে।

ময়মনসিংহ থাকতেই টের পেয়েছিল যতীন। কোনো না কোনো ছুতোয় তাকে পুলিশ ধরবেই। হলও তাই। কলকাতায় ফেরার পর, কাজের চাপ বেড়ে গেল। বিদেশি জিনিস বয়কট করার ডাক দেওয়া হয়েছে। রোজই নানা জায়গায় পিকেটিং চলছে কংগ্রেসীদের। স্বদেশি জিনিস কেনার জন্য মানুষকে আরো উদ্বুদ্ধ করার জন্য কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বড়োবাজারে পিকেটিং চলছিল। যতীনের সুবিধেই, রথ দেখা কলা বেচা দুইই হবে। তার কোম্পানির আপিসের মাল বেচার কাজে সাহায্যও হবে পাশাপাশি আন্দোলনের কাজও করা হবে। সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে যতীনই সেখানে মধ্যমণি।

প্রথম দিন শান্তিপূর্ণভাবেই কাটল। দ্বিতীয় দিন সকালে লাল পাগড়ির লোক একটু যেন বেশিই কাছেপিঠে। পিকেটিং শুরু হয়েছে কি হয়নি দলের একজনের সঙ্গে এক দেশীয় পুলিশের কথা কাটাকাটির মাঝে অতি উৎসাহে গৌর তাকে দিল দু-ঘা লাগিয়ে। ব্যস আর যায় কোথায়! পুলিশ অমনি লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে পড়ে ছত্রভঙ্গ করে দিল। সব্বাইকে ধরে ধরে ভ্যানে তুলল। গৌরকে অবশ্য ধরতে পারেনি তারা। যতীনকে এবারে পাঠাল হুগলি জেলে।

জেল নতুন নয় যতীনের কাছে। কিন্তু হুগলিতে এসে দেখল এই জেলের দেশীয় বন্দিদের দশা তথৈবচ। সেলগুলো অত্যন্ত অপরিষ্কার এবং একসঙ্গে এতজনকে রাখা হয় যে শুয়ে বসে থাকার জায়গাটুকু হয় না। দুর্গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত। প্রথম দিনেই এর বিরুদ্ধে সোজাসুজি জেলারের কাছে নালিশ জানাল যতীন। ফল হল উলটো। যতীনকে ধরে সলিটারি সেলে ঢুকিয়ে দিল জেলার। ঘরটায় না ঢোকে আলো, না ঢোকে বাতাস। একটা ছোট্ট চৌখুপী জানলা দিয়ে টিমটিম করে দিনের আলো চুঁইয়ে আসে। সন্ধে হলে তাও নিভে যায়।

সাতদিনের মাথায় যতীনের শরীর এমন ভেঙে পড়ল যে জেলার বাধ্য হল যতীনকে জেল হাসপাতালে নিয়ে যেতে। হাসপাতালে ডাক্তারের সাহায্যে কাগজ কলম জোগাড় করে ফেলল যতীন। শুয়ে শুয়েই যতীন জেলের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে চিঠি লিখে পাঠাল। জেলের ভেতর থাকাকালীন এ সুযোগ সে পায়নি।

ইতিমধ্যে জেল রিফর্ম নিয়ে সরকারের ভেতরই কথা উঠছিল, জেলের কয়েকজন উচ্চপদস্থ ইংরেজ আমলা এ-ব্যাপারে কাউন্সিলে রিপোর্ট পাঠিয়েছিল। যতীনের চিকিৎসা যিনি করছিলেন তিনি একজন ইংরেজ। ইংরেজ তায় জেলের ডাক্তার হলেও লোকটি অমানুষ নন। তাঁর সুপারিশে চিঠিটা যাওয়াতে জেলার খেপে লাল হলেও চট করে তা উড়িয়ে দিতে ভরসা পেল না। যতীন লিখেছিল রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে তার দাবী না মানা হলে সে অনশন করবে। এক দুই করে তার দাবিগুলো পেশ করেছিল সে।

১) হাত-পায়ে শক্ত লোহার ডান্ডা বেঁধে রাখা চলবে না। ২) সেলের বাইরে খোলা জায়গায় শারীরিক কসরৎ করার এবং নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করার অনুমতি দিতে হবে। ৩) দিনের বেলায় সাধারণ ওয়ার্ডে বন্দিদের রাখতে হবে, যেখানে আলো হাওয়া চলাচল করে। সেলের ভেতর কেবলমাত্র রাতেই রাখতে হবে। ৪) খাবারদাবার, কাপড়জামা, লেখাপড়ার বই, কাগজপত্র আনার অনুমতি দিতে হবে। ৫) অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন পোশাকে রাখা চলবে না। ৬) পচা, বাসী, নোংরা খাবার দেওয়া চলবে না। পরিচ্ছন্ন এবং খাওয়ার যোগ্য খাদ্য দিতে হবে।

জেল কর্তৃপক্ষ গড়িমসি করতে লাগল। জেলের ভেতর জাঁতা ঘুরিয়ে গম পেষাই করতে হত যতীনকে। হাসপাতাল থেকে দিন দশেক পর ছাড়া পেয়ে জেলের ভেতর ফিরে গিয়ে আবার যে কে সেইই। জাঁতা ঘুরিয়ে গম পেষাই।

তবে সকালে এক ঘণ্টা এবারে সেলের বাইরে থাকার অনুমতি পাওয়া গেছে। ওই সময়টাকেই কাজে লাগাবে বলে ভেবে নিল যতীন। বাকি স্টেট প্রিজনারদের সঙ্গে দেখা হয় ওই সময়, সাধারণ বন্দিদের সঙ্গেও, তবে কথা বলা বারণ। তবুও সেসব অমান্য করেই কথাবার্তা বলে যতীনেরা, পুরস্কার হিসেবে জোটে গলা ধাক্কা, রুলের গুঁতো, বুটের লাথি। খাবারের মান সামান্য ভালো হলেও পরিমাণে অত্যন্ত অল্প। যতীন ক্রমশ দুর্বল হতে শুরু করে। একসময় সে সিদ্ধান্ত নেয় জেলের খাবার সে খাবেই না।

ইতিমধ্যে জোর করে খাওয়ানো আইনি বৈধতা পেয়েছে। জেলবন্দিদের জোর করে খাওয়ানো নাকি ইংরেজ সরকারের মানবিক কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। সুতরাং আর কে পায়। যারা যারা যতীনের সঙ্গে জেলের খাবার বয়কট করেছিল এবারে তাদের ওপরে জোর করে খাওয়ানোর মানবিক দাওয়াই শুরু হল।

জেলের মধ্যে যখন যতীনরা নিজেদের মতো করে লড়াই চালাচ্ছিল সেসময় বাইরেও স্বদেশিরা থেমে ছিল না। অসহযোগ আন্দোলন তখন জোর কদমে, আইন অমান্য আন্দোলন দেশের সর্বত্র দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে কংগ্রেসি স্বেচ্ছাসেবকদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন চিত্তরঞ্জন দাশের মতো কংগ্রেস নেতা। যতীনদের মুক্তির দাবীতে ঘেরাও, ধর্না আরম্ভ হয়েছে। সুভাষচন্দ্র আইসিএস থেকে নিজের নাম কাটিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। হুগলি জেলে এসে একদিন দেখা করে গেলেন যতীনদের সঙ্গে। ফর্সা মুখটি অপমানে লাল, চোখে যতীনদের জন্য ব্যথার দৃষ্টি।

তবে, এত অত্যাচার সত্ত্বেও আসল কথাটি গোপন রইল। কেননা সেটা চলেছিল একেবারে গভীরে গভীরে। এবারে পরিকল্পনাটা করাই হয়েছিল এমনভাবে যাতে মূল সূত্রগুলি মাত্র কয়েকজন লোকের কাছেই থাকে। ১৯১৫ সালের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের পরিকল্পনা দেশের সর্বত্র কংগ্রেসের সংগঠনের আড়ালে আড়ালে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, দলের সংখ্যা অনেক বেশি এবারে। চট্টগ্রাম থেকে লাহোর। দেরাদুন থেকে মাদ্রাজ সর্বত্র। নামকরণও অন্যরকম – “মুক্তির পথ।” নিরীহ নাম। শুনলেও বোঝার উপায় নেই।

কিন্তু যে কারণে এই জেল-হাজত তা আচমকাই বন্ধ করে দিল কংগ্রেস। গান্ধিজি চেয়েছিলেন অহিংস আন্দোলন। কিন্তু চৌরিচৌরার ঘটনার পরে এই সহিংস কর্মকাণ্ডের দায় তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। জেলে বসেই শুনল যতীনরা অসহযোগ আন্দোলনে আপাতত দাঁড়ি। গান্ধিজি আন্দোলন তুলে নিয়েছেন। ফলে মাস তিনেক বাদে যতীনরাও ছাড়া পেল।

ছাড়া পেতেই কিরণ ভাইকে নিয়ে সোজা বাড়িতে। বঙ্কিমবাবু এবারে আর আপত্তি করলেন না। শরীরের যা হাল হয়েছে যতীনের তাতে বাইরে থাকলে ছেলেকে আর বাঁচানো যাবে না।

বাড়ি ফেরার পরে মাস দুই বিছানাতেই শুয়ে রইল যতীন। সুভাষচন্দ্র প্রায়ই আসেন দেখা করতে। নানান কথাবার্তা হয়। কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে নানান আলোচনা হয়। বিপিনদার সঙ্গেও এর মধ্যে কথা হয়েছে তাঁর। এরই মধ্যে একদিন বিপিনদার নির্দেশ এল।

মাস চারেক বাদে একটু সুস্থ হতে যতীন আবার কলেজে যাওয়া শুরু করল। এবারে যতীন যোগ দিল ইউনিভার্সিটি ট্রেনিং কর্পসে। উদ্দেশ্য সেইখানে ছেলেদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা। লড়াইয়ের জন্য যে প্রশিক্ষিত ছেলেদের দল গড়ে নিতে হবে!

ইন্টারমিডিয়েট পাশ করতে করতে যতীন দক্ষিণ কলকাতার কংগ্রেস কমিটির সহসম্পাদক হয়েছে। এবারে বঙ্গবাসী কলেজ। কলেজে গিয়ে ইউনিভার্সিটি কর্পসের ঢং-এ যতীন দক্ষিণ কলকাতা যুবদল গঠন করল যাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য সাধারণ গরিব মানুষদের সামজিক সুরক্ষা দেওয়া এবং আপদে বিপদে পাশে দাঁড়ানো। বিপিনদার নির্দেশ ছিল সমাজের প্রতিটা স্তরের লোকেদের মধ্যে, দেশীয় সৈনিক, ব্যবসায়ী, ছাত্রছাত্রী, চাকুরিজীবী, সাধারণ কায়িক শ্রম করে বেঁচে থাকা মানুষ, আটপৌরে গেরস্ত সকলের মধ্যে এই অভ্যুত্থানের বীজ গোপনে বুনে দিতে হবে যাতে আগুন জ্বললে প্রতিটা মানুষের ভেতর থেকেই ডাক আসে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ার।

বছরখানেক সভাসমিতি, বন্যাত্রানের কাজ, গ্রামে গঞ্জে গিয়ে মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা শুনে তা লাঘবের চেষ্টা করা এসব চলল। আর গোপনে গোপনে চলল বিপ্লবের মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।

ব্রিটিশ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ অবশ্য চুপ করে ছিল না। যতীনের পেছনে ছায়ার মতো লেগে ছিল একজন লোক। নিবারণ দাস। লালবাজারের দুঁদে গোয়েন্দা।

গৌর দুচারবার যতীনকে বলেওছে, “ব্যাটাকে নিকেশ করে দিই?”

যতীনই আটকেছে, “এখনও সময় আসেনি। এই হিংসায় এখুনি কোনো লাভ হবে না। আমার পেছনে ঘুরে নিবারণ দাস কোনো প্রমাণ জোগাড় করতে পারবে না। তুই নিশ্চিন্ত থাক।”

হায় রে। খলের কি ছলের অভাব হয়! ইংরেজ সরকার এইবারে বেঙ্গল অর্ডন্যান্স অ্যাক্ট পাশ করিয়ে নিল। সন্দেহ হলেই গ্রেফতার। তদন্তের নামে অন্যায়ভাবে আটকে রাখার খুব সুবিধে।

যতীন যুবদলের নেতা, কংগ্রেসের দক্ষিণ কলকাতার সহ সম্পাদক এই অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু নিবারণ দাসের কেন যেন সন্দেহ হত আরো গভীর কিছুর সঙ্গে সে জড়িত। কিন্তু সেটা ঠিক কী তা ধরতে পারছে না সে। চট করে গ্রেফতার করলে সেই কারণটা জানার উপায় নাও থাকতে পারে। তবে ব্যাটাকে ধরে জেলে এনে কয়েকদিন ধরে জিজ্ঞাসবাদ করলে ক্ষতি কী!

দক্ষিণেশ্বর কাণ্ডে বেশ কয়েকজনকে ধরার সুবাদে এইবারে সে সুযোগ এসে গেল নিবারণ দাসের হাতে। তার কর্তা চ্যাটার্জি সাহেবকে সেকথা জানাতেই তিনি এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। সুতরাং আবার প্রেসিডেন্সি জেল। এইবারে জেলে আর দেখা করার সুযোগ নেই। হুট করে কদিন বাদে যতীনকে মেদিনীপুর জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হল।

এখানে এসে যতীন দেখল ঠা ঠা রোদ্দুরে বসে বন্দিদের দিয়ে দড়ি বানানোর কাজ হয়। দুপুরের খাবার সময়ও রাজনৈতিক বন্দিদের একত্রে থাকতে দেওয়া হয় না। সাধারণ বন্দিদের সঙ্গেই রাখা হয় তাদের। তাতে অবশ্য যতীনের আপত্তি তত নেই। সে ঠিক করেছে জেলের ভেতর অথবা জেলের বাইরে, তার কাজ সে চালিয়ে যাবে। সাধারণ কয়েদিরাও তো এ দেশেরই লোক। তাদেরও কাজে লাগানোর চেষ্টায় ক্ষতি কী।

কিন্তু যতীনের স্বাস্থ্য বিদ্রোহ করল। রোদের মধ্যে বসে কাজ করতে করতেই একদিন অজ্ঞান হয়ে গেল সে। চোর বদমায়েশের দল যারা সাজা খাটছে জেলে তারাই ধরাধরি করে নিয়ে জলটল দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনল। এই দিন দশেকেই তারা যতীনদাকে আপন বলে ভাবতে শুরু করেছে। যতীনদা যে তাদের হয়েও গলা ফাটায়!

যতীনকে এইবারে আলিপুরে ফেরত পাঠানো হল চিকিৎসার জন্য। দুম করে জেলের মধ্যে মরেটরে গেলে অবস্থা বেগতিক হতে কতক্ষণ। মেদিনীপুরের এমনিতেই খুব সুনাম নেই।

গোপনে আনা হলেও খবরটা জোগাড় করে ফেলেছিল গৌর। যতীনকে তিনদিন আগে আলিপুরে আনা হয়েছে। দুদিন ধরে নিবারণ দাসের পেছু নিয়ে সে দেখেছে বিকেলের দিকে ব্যাটা আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ঢোকে আর সন্ধের পর বেরোয়। গৌর যে তাকে ফলো করছে ঘূণাক্ষরেও টের পায়নি সে।

তৃতীয়দিন সন্ধের পর যথারীতি নিবারণ আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের গেটে এসে দাঁড়িয়েছে। একশো গজ দূরে গৌর একটা দোকানের আড়াল থেকে দেখল নিবারণ জেল গেটের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বাঁ দিকে ঘুরে কালিঘাট ফুটব্রিজের দিকে এগোতে লাগল। জায়গাটা এমনিতে নির্জন, সন্ধের পর লোকজন চলাচল করে কম। ব্রিজের মুখটাতে এসে দাঁড়াল নিবারণ। পকেট হাতড়ে সিগারেট বের করতে যাবে, ততক্ষণে গৌর কাছে এসে পড়েছে। মুখ নিচু, হাতে দেশলাই, ঠিক তখনি গৌরের শক্ত হাতদুটো নিবারণের গলা আর মুখ একসঙ্গে পেঁচিয়ে ধরল। এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিয়ে নিবারণকে জেলের পুব পাঁচিলের গা বেয়ে টেনে নিয়ে যেতে গৌরের বেশি সময় লাগল না।

এদিকটা মিশকালো অন্ধকার। ঝোপঝাড়, জঙ্গল, পাশেই আদি গঙ্গা। লোকজন নেই। গৌর অস্ফুটে শুধু বলল, “ক্ষমা করিস যতীন, তোর কথা রাখতে পারলাম না।”

কট করে একটা শব্দ হল শুধু আর নিবারণের ঘাড়টা একদিকে এলিয়ে পড়ল। দেহটা ঝোপের আড়ালে শুইয়ে দিতে দিতে গৌর অনুভব করছিল ওর ভেতরটা হালকা লাগছে। দুগাল বেয়ে অঝোরে নেমে আসছে চোখের জল।

সেই রাতেই কলকাতা ছেড়ে সমস্তিপুর পাড়ি দিল গৌর। সে শুধু জানতে পারেনি পরদিন দুপুরে আরেকজন ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছিল, সে নিবারণের ঊর্ধ্বতন সিআইডির বি এম চ্যাটার্জি। জেলের মধ্যেই কারা শাবল দিয়ে দুফাঁক করে দিয়েছিল তার মাথাটা।

কর্তৃপক্ষ আর দেরি করেনি। পরদিনই ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দিল যতীনকে। পরপর এতগুলো ঘটনা ঘটে যাওয়াতে জেলের ভেতর অত্যাচারটা একটু বেশিই বেড়ে গেল। তবে যতীন দমেনি। যথারীতি জেলের ভেতরও সকলকে নিয়ে তাদের আন্দোলন, দাবিদাওয়া জারি রেখেছে। ঢাকাতেও বেশিদিন রাখার ভরসা পায়নি ইংরেজ সরকার। কদিন বাদেই ওকে পাঠিয়ে দিল ময়মনসিংহ জেলে। যতীন বুঝতে পারছিল এভাবে তাদের কোমর ভেঙে দেবার চেষ্টা করছে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট। জেলের মধ্যে থেকেই আরো জোর শোরগোল তুলতে হবে।

***

নিয়ম ছিল বড়ো সায়েব ব্রায়ান যখন জেলের বন্দিদের তদারকি করতে আসবেন তাকে দাঁড়িয়ে পড়ে সেলাম ঠুকতে হবে। যতীন সব বন্দিদের জড়ো করে বোঝাল যে তারা একাজ করবে না। ইংরেজ বুঝুক নিরস্ত্র জেলবন্দিদেরও তারা বশ করতে ব্যর্থ।

ব্রায়ান এলেন। দরজা খুলে দিল রক্ষী। সায়েব এসে দাঁড়ালেন সামনে। যতীন তাঁর দিকে তাকিয়েও দেখল না। সায়েব বলল, “হে বয় আই অ্যাম দাই ফাদার অ্যান্ড ইউ রিকোয়ার টু স্ট্যান্ড আপ বিফোর মি।”

এই প্রথম যতীনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। ব্রায়ানের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে, “আর একবার। বলে ।দ্যাখ তুই ।আমার বাপ, তোর মাথা ভেঙে দেব আমি।”

সাহেব বেসামাল হয়ে পড়লেও সামলে নিল নিজেকে। তবে যতীনের কপালে জুটল সলিটারি কনফাইনমেন্ট। এবারে অন্যায়ভাবে বিনা বিচারে আটকে রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে অনশন শুরু করল সে। আরো পাঁচজন সহবন্দিও তার দেখাদেখি অনশন শুরু করে দিল।

জেলবন্দিদের অনশনের খবরে বাইরেও হল্লাগুল্লা শুরু হল। দেশীয় কাগজে তো বটেই লন্ডনের খবরের কাগজেও সমালোচনা করে খবর ছাপা হল। জেলকর্তারা প্রমাদ গুণলেন। অবস্থা আয়ত্বের বাইরে যাবার আগেই ওপরওয়ালার নির্দেশে ব্রায়ান এসে ক্ষমা চাইল। যতীনও দুঃখপ্রকাশ করল তার ওপর রূঢ় ব্যবহারের জন্য। তবে যতীনকে আর ময়মনসিংহ জেলে রাখতে ভরসা হল না। বাংলার যা অবস্থা তাতে যেকোনোদিন এদিকসেদিক ঘটে যেতে পারে।

যতীনকে এবারে পাঠিয়ে দেওয়া হল পাঞ্জাবের জেলে। বাংলা ও বাঙালির থেকে যত দূরে রাখা যায়।

শারীরিকভাবে ভেঙে পড়লেও মনের জোর হারাল না যতীন। জেলের অব্যবস্থা আর নতুন কী! এখানে অবশ্য অবস্থা আরও করুণ। সুতরাং বাদ প্রতিবাদ চলতে থাকল। স্বভাবগুণে সুদূর পাঞ্জাবের জেলেও সহবন্দিদের ভালোবাসা পেতে বেশি দেরি হল না যতীনের। সে ভাবল এদের মধ্যেও “মুক্তির পথ”-এর  বীজ বুনে দেওয়া যাক এবারে।

বঙ্কিমবাবু খবর পেয়েছিলেন যতীনকে পাঞ্জাবের জেলে রাখা হয়েছে। কংগ্রেসের নেতাদের ধরে তিনি আর্জি জানালেন তাঁর ছোটো মেয়ে মৃত্যুশয্যায়। সুতরাং তাঁর ছেলেটিকে যেন একটিবার মুক্তি দেওয়া হয় বাড়ি আসার জন্য।

খবর শুনে মন ভেঙে গেল যতীনের। বিস্তর চিঠি লেখার পর একদিনের জন্য আসার অনুমতি পাওয়া গেল। কিন্তু। শেষরক্ষা। হল

না। ডাক্তারেরা জবাব দিয়ে দিয়েছিল।

বাড়ি থেকেই সেপাই দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হল যতীনকে। এবারে চট্টগ্রামে নিয়ে গেল ইংরেজ পুলিশ। সেইদিনই মারা গেল তার ছোটো বোন। জেলের শত অত্যাচার সয়েছে যতীন কিন্তু এই শোক সে আর সহ্য করতে পারল না।

ইতিমধ্যে দু’বছর কেটে গেছে। ইংরেজ সরকার যতীনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করতে না পেরে এইবারে অন্য পন্থা নিল। যতীনকে দিয়ে যদি স্বীকার করানো যায় কিছু। কলকাতা থেকে এক উচ্চপদস্থ ইংরেজ অফিসারকে চট্টগ্রামে পাঠান হল। নরমপন্থী ও ভালোমানুষ বলে কিঞ্চিৎ নাম ছিল তার।

যতীন তাকে বলল, “আমার বিরুদ্ধে অপরাধের যে অভিযোগ এনেছে সরকার তার কোনোরকম প্রমাণ আছে আপনাদের কাছে?”

অফিসার বলল, “না সত্যি বলতে কি তোমার বিরুদ্ধে নেই। কিন্তু অন্যান্যদের বিরুদ্ধে আছে।”

যতীন – আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে তো বটেই আমার কিছু বন্ধুদের বিষয়েও আমি দায়িত্ব নিয়েই কথা বলতে পারি। নথিপত্র বাদ দিন, আমি বা আমার বন্ধুদের বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রমাণ আপনারা পেয়েছেন যা অরাজক অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে?”

অফিসার – তোমাদের দলের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই ঠিকই কিন্তু তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই একটা বৈপ্লবিক ঝোঁক আছে কেননা সুযোগ পেলেই তোমরা ১৯১৫ –এর পুনরাবৃত্তি করতে পারো।

যতীন- তার মানে আমাদের রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে আপনাদের মাথাব্যথা, আমাদের কাজকর্ম নয়, তাই তো। তাহলে গলা ফাটিয়ে কেন বলছেন যে যাদের ধরা হয়েছে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আপনাদের কোনো বক্তব্য নেই?

অফিসার চুপ করে রয়েছেন দেখে যতীন আবার বলতে শুরু করে, “আর আপনি, আপনিই তো কাউন্সিলের কাছে মিথ্যে গল্প বলেছেন যে কলম্বোয় এবং ভারত মহাসাগরের অন্যত্র যে অস্ত্র ধরা পড়েছে তা আমরা পাচার করছিলাম। আপনি ভালো করেই জানতেন যে ওইসব অস্ত্রশস্ত্র চীনের বিপ্লবী দলের জন্য এবং তারাই আমদানি করছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি আমাদের নাম মিথ্যে করে জুড়ে দিয়েছেন। আর হ্যাঁ রাজনৈতিক মতবাদের কথা বলছেন যখন শুনে রাখুন নিরানব্বইজন ভারতীয়ের ভাবনাই হুবহু এক। হয় তারা ভয়ে চুপ করে থাকে নয়তো অন্য কোনো কারণে। যেদিন এই ভয় মুছে যাবে, সমস্ত মানুষ একযোগে এই বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়বে।”

অফিসার হেসে ফেললেন, “সমস্ত ভারতীয় যুবক মানেই এক একজন সম্ভাবনাময় বিপ্লবী।”

যতীন অমনি বলে উঠল, “তাহলে সব্বাইকে ধরে জেলে পুরে দিন। পরাধীন দেশে এমনটাই কি স্বাভাবিক নয়? প্রতিটা দেশবাসীর মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কি অন্যায়? ইংলন্ডে কি হয়েছিল শেষ মহাযুদ্ধে? জার্মানির বিরুদ্ধে আপনাদের কি এই একই ভাবনা ছিল না?

অফিসার মৃদু হাসলেন।

যতীন বলে চলে, “আমাদের ছাড়া হবে কবে? রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলালে? নাকি আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হলে?”

অফিসার- “দুটোই।”

যতীন- “শেষেরটা যদি ভাবেন, আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি সুদূর ভবিষ্যতেও এটা ঘটার সম্ভাবনা নেই।”

অফিসার মাথা নেড়ে চলে গেলেন।

অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে যতীনের ক্লান্ত লাগছিল। একটু বিশ্রাম নিতে ও সেলের মেঝেতেই এলিয়ে বসে পড়ল।

পুলিশ কিছুই প্রমাণ করতে পারল না। সরকারের ওপর চাপ বাড়ছিল। অ্যাসেম্বলিতে কথা উঠল এ-প্রসঙ্গে। শেষমেষ সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখ মুক্তি পেল যতীন।

তিন-তিনটে বছর জেলে কাটিয়ে শরীর একেবারে ভেঙে পড়েছে যতীনের। ও বুঝতে পারছিল বেশিদিন আর সময় পাওয়া যাবে না। ছুতোনাতায় আবার ওকে ধরে জেলে পুরবে সরকার। বছর ঘোরার আগেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলতে হবে। ডিসেম্বরে কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশন। গান্ধীজি প্রস্তাব রাখলেন দুবছরের মধ্যে ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস দিতে হবে ব্রিটিশ সরকারকে নইলে পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু হবে। সুভাষচন্দ্রের মনঃপুত হল না প্রস্তাবটা। এখুনি কেন নয়। আর পূর্ণ স্বাধীনতাই বা কেন নয়।

অধিবেশনের সময় দিনরাত এক করে কাজ করল যতীন। কিন্তু বুঝতে পারছিল এপথে কিছু হবার নয়। বিপিনদার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অনেক ভেবে ও সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত পরিকল্পনাটা খুলে বলল। চেতলা বালিগঞ্জ খিদিরপুরের ছেলেদের একত্র করে ওর দল গড়াই ছিল। এবারে তাদের মূল কাজটা বুঝিয়ে দিতে হবে। আর সে কাজে ও সুভাষচন্দ্রকে পাশে চায়। পরিকল্পনার শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছে তারা। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ঢাকা, মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, জলপাইগুড়ি বাংলাদেশের সর্বত্রই শুধু নয় কটক, ভাইজাগ, মাদ্রাজ, পাটনা, লক্ষ্ণৌ, কানপুর, দিল্লি, পুনা, বোম্বাই, লাহোর এসব জায়গায় একযোগে খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। আর একাজে সুভাষচন্দ্রের চেয়ে যোগ্য লোক আর কে আছেন। যতীন সুভাষচন্দ্রের কাছেই খবর পেলেন যে বিপিনদা এখন ভূপালে আছেন। এবং পরিকল্পনার আগাগোড়াই তাঁর জানা। সুতরাং যতীন নিশ্চিন্তে তার কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

জানুয়ারি মাসে যতীন কলেজে যোগ দিল আবার। তদ্দিনে ভলান্টিয়ার কর্পসের আয়তন অনেক বেড়েছে। যতীন এবারে তাদের সরাসরি প্রস্তুতির কথা বলতে শুরু করল। ঠিক হল ঠিক ন’মাস বাদে সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে গণ অভ্যুত্থান করা হবে। খুবই গোপনে নির্দিষ্ট দিনটি সমস্ত দলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং চূড়ান্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলার জন্য এই ন’টি মাস। একেবারে গেরিলা কায়দায় মুহুর্মুহু আক্রমণ নামিয়ে আনতে হবে ব্রিটিশ সরকারি ব্যবস্থাপনার ওপর।

প্রস্তুতি চলছিল। সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিল যতীন। সেদিনও কলেজে গিয়েছে সে। এপ্রিলের গরম। কলেজের ছাতের ঘরে কয়েকজন বাছাই ভলান্টিয়ারদের নিয়ে কথাবার্তা বলছিল সে। সেই সময়েই খবরটা এল। দিল্লির অ্যাসেম্বলি হলে বোমা মেরে দুজন ধরা পড়েছে। ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত। আরো দুজন বিপ্লবী বাইরে ছিল। তাদের একজনকে পুলিশ ধরতে পারেনি, সে পালিয়ে যায়। অন্যজনকে ধরার আগেই সে নিজের মাথায় গুলি করে। মৃত ছেলেটির নাম ললিত বসু।

শুনেই চমকে ওঠে যতীন। ভেতরে ভেতরে প্রমাদ গোনে সে। আর বুঝি সময় নেই। তাহলে কি এবারেও ব্যর্থ হবে পরিকল্পনা? তার পরেই সমস্ত ভাবনা ঝেড়ে ফেলে মন থেকে। যতক্ষণ প্রাণ আছে শেষ অবধি আন্দোলনের মুখ এগিয়ে দেওয়াই তার কাজ। তারপর অন্য কেউ…

***

ভুল আশঙ্কা করেনি যতীন। মাস দুই বাদে যতীনকে গ্রেফতার করা হল লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায়। পুলিশ তাকে নিয়ে চলল লাহোর জেলে। যতীন বন্ধুদের শুধু বলে আসতে পেরেছিল, আমি হয়তো ফিরব না কিন্তু বন্ধুরা লড়াই জারি রেখো। যে সংকল্প নেওয়া হয়েছে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। ঘরে বাইরে সর্বত্র এই আগুন যেন না নেভে।

লাহোর জেলেও ছবিটা একই। অমানুষিক অত্যাচার, নোংরা অপরিষ্কার থাকার জায়গা। মুখে তোলা যায় না এমন খাবার। তার ওপরে শিখ বন্দি সহ সকলকে চুলদাড়ি কেটে ফেলার নির্দেশ। কোনো নিয়মের তোয়াক্কা নেই। এই জেলেই ভগৎ সিং আর বটুককে রাখা হয়েছে।

তবে এখানে এসে যে সে অবিনদাকে দেখবে তা ভাবেনি সে। সেই দেখা হল, তাও জেলে! অবিনাশ মুখার্জিকে লাহোর থেকে ধরেছে পুলিশ। চূড়ান্ত অব্যবস্থার জন্য ভগৎ সিং আর বটুক দত্ত অনশন শুরু করেছিল। যতীন যোগ দিল। ব্রিটিশ সরকারের কাছে জানাল তাদের দাবি মূলত চারটি।

১) রাজনৈতিক বন্দিদের অত্যাচার করা অপমান করা চলবে না।

২) উপযুক্ত খাদ্য, পোশাক ।।এবং জীবনধারনের ।জন্য ন্যূনতম জিনিস দিতে হবে। উপযুক্ত ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩) বই খাতা এবং লেখার সামগ্রী দিতে হবে।

৪) সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিদের একত্রে রাখতে হবে।

যতীন পরিষ্কার জানিয়ে দিল তার দাবিগুলি ন্যায্য এবং তা মানা না হলে সে অনশন ত্যাগ করবে না। ব্রজেন ব্যানার্জি, উজ্জ্বল সিং, রতন সিং সহ আরো এগারোজন যতীনের সঙ্গে অনশন শুরু করল। যতীনকে রাখা হল সলিটারি সেলে। স্বাস্থ্য ভঙে গেল যতীনের। জেল কর্তৃপক্ষ জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা করতে নাকমুখ দিয়ে রক্ত পড়তে আরম্ভ করল। কিরণ ইতিমধ্যেই চিকিৎসার জন্য ভাইয়ের মুক্তির আবেদন করেছে। যথারীতি তা মঞ্জুর হল না। কোর্টে যতীনের পক্ষে উকিল অভিযোগ করলেন সাত আটজন মিলে জোর করে যতীনকে খাওয়ানোর চেষ্টা করায় তার প্রাণসংশয় হয়েছে, তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হোক।

যতীনের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এক ফোঁটা জলও তাকে খাওয়ানো যাচ্ছে না। প্রায় অচেতন অবস্থাতেও তার সংকল্প থেকে নাড়ানো যাচ্ছে না তাকে। কিরণ টেলিগ্রাম পাঠালেন কংগ্রেসের নেতাদের কাছে। অ্যালবার্ট হলে সকলের সামনে পড়া হল সেই টেলিগ্রাম- যতীনের অবস্থা আরও গুরুতর হয়েছে।

সারা দেশে একটা চাপা উত্তেজনার পরিস্থিতি। আগস্টের মাঝামাঝি অবস্থা সামাল দিতে পাঞ্জাবের গভর্নর নামলেন। যতীনের বেল পিটিশন মজুর হল। কিন্তু যতীন রাজি হল না। দাবি মানা না হলে মুক্তিরও প্রয়োজন নেই তার।

জহরলাল নেহরু সহ অন্যান্য কংগ্রেস নেতারা ইতিমধ্যে জেলে দেখা করে এসেছেন অনশনরত বন্দিদের সঙ্গে। কিরণ শুধু অসহায়ের মতো যতীনকে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়তে দেখছেন। যতীনদের অনশনের খবর ইতিমধ্যে ভারত ছাড়িয়ে ইউরোপে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে উত্তেজনার আঁচ চরমে পৌঁছেছে। কিন্তু তাতেও ইংরেজ সরকারের টনক নড়ল না। ডাক্তার বদ্যি শত চেষ্টাতেও ফল হল না।

সেপ্টেম্বরের তেরো ।তারিখ ।১৯২৯। তেষট্টি দিন অনশনের পর যতীন না ফেরার দেশে চলে গেল। লাহোর জেল থেকে কলকাতা –কফিনে শোয়ানো যতীনের দেহ পৌঁছল দুদিন বাদে। হাওড়া স্টেশনে কফিন নামালেন সুভাষচন্দ্র নিজে। সমস্ত চত্বর লোকে লোকারণ্য। কলকাতার রাস্তায় আজ তিলধারণের জায়গা নেই। শুধু তার ভলান্টিয়ার দল নয়, কলেজের ছাত্ররা নয়, সমস্ত কলকাতার মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। শেষ যাত্রায় সঙ্গী হবে বলে।

***

যতীনের শেষযাত্রার ঠিক তিনদিন বাদে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে আক্রমণ হল দিনের বেলা। পুলিশের কিছু করার ছিল না। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ সামিল হয়েছিল সে আক্রমণে। জেল ভেঙে মুক্ত করা হল ভগত সিং সহ রাজগুরু সহ সমস্ত বন্দিদের। একই দিনে কলকাতা, পুনা, আগ্রা, চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিং, সমস্তিপুর মেদিনীপুর, হুগলি, হাজারিবাগ, মিরাট, পূর্ণিয়া, পাটনা, লক্ষ্ণৌ সহ সাতাশটা জেলে একযোগে আক্রমণ চালাল মুক্তির পথ বিপ্লবীদল। পুলিশ কংগ্রেসের অনেক নেতাকে ধরল ঠিকই কিন্তু দিশাহারা হয়ে গেল কোন জেলে তাদের নিয়ে যাবে এই ভেবে। তাছাড়া যে কংগ্রেসের নেতাদের ধরা হল তারা মনে মনে ভেবে পাচ্ছিলেন না এই আক্রমণ একযোগে সংগঠিত করল কে। তারা তো এর বিন্দুবিসর্গও জানতেন না। কেবলমাত্র যতীনের মুখাগ্নির পর থেকে সুভাষচন্দ্রকে আর কেউ দেখেনি। বাড়িতেও পুলিশ খোঁজ করে জেনেছে তিনি বাড়িতে নেই। পরদিন থেকে মুহুর্মুহু ছোটো ছোটো দলে সারা ভারতজুড়ে সরকারি সংস্থানের ওপর, অফিস, পুলিশ ক্যাম্প, ম্যাজিস্ট্রেটের অফিস, ইউরোপিয়ান ক্লাব, ইংরেজ অফিসারদের বাসস্থান সহ সর্বত্র একযোগে আক্রমণ শুরু হল। পুলিশ চেষ্টা করে কাউকে কাউকে ধরল কিন্তু বিশেষ সুবিধে করতে পারল না। কারণ বিচ্ছিন্ন ও এককভাবে প্রতিটা দলই সুসংঠিত গুপ্ত সেনাদলের মতো কাজ করছিল। কিন্তু সারা দেশের সমস্ত মানুষ যখন একত্রে এমন বিপ্লবে নেমে পড়ে তখন শাসকের আর কিছু করার থাকে না। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে গান্ধিজি জানালেন তিনি এই সহিংসনীতিতে বিশ্বাস করেন না ঠিকই কিন্তু তিনি এর বিরুদ্ধে কোনোরকম বার্তা দেবেন না কেননা এটা জনগণের স্বতস্ফুর্ত প্রতিক্রিয়া, ভীরু দেশবাসী হবার চেয়ে সংগ্রামী জনগণ অনেক শ্রেয়। কংগ্রেস এখন পূর্ণ স্বরাজ দাবি করছে। ইংরেজ সরকার পেরে উঠছিল না। ব্যারাকে ব্যারাকে দেশীয় পুলিশদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল এই বিপ্লবের আঁচ। এইবারে সৈন্যদলের মধ্যেও বিদ্রোহ শুরু হল। সারা দেশের মানুষ শুনতে পেল একটি নাম। বিদ্রোহী সৈন্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাহেব সিং বলে একজন বিপ্লবী। দিল্লির কর্তারা প্রমাদ গুণেছিল। প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড হাউস অব কমন্সে তড়িঘড়ি ভারত ছাড়ার প্রস্তাব দিয়ে ফেললেন ৩০ সেপ্টেম্বরের অধিবেশনে।

কলকাতা থেকে পাঁচশ মাইল দূরে সেদিন হাজারিবাগের জঙ্গলের কাছে একটি আদিবাসী গ্রামে বসে দুজন লোক শুধু ভাবছিল ভারত স্বাধীন হওয়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই আগুন নিভতে দেওয়া যাবে না।

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তথা ইতিহাসবিদের ধারণা যতীন দাসের অনশন ও আত্মাহুতির পরবর্তী সময়ে জনমানসে এমন জোয়ার এসেছিল যে গান্ধিজি তথা তৎকালীন কংগ্রেসের নেতৃত্ব তাকে সুপরিকল্পিতভাবে প্রবল জন আন্দোলনে পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তা হলে অনেক আগেই ভারতবর্ষ স্বাধীন হতে পারত। এই গল্পে সেই সম্ভাবনাটুকুকেই কল্পনার রং দেওয়া হয়েছে। বাকিটা সত্য ইতিহাস। এ-প্রসঙ্গে সি এস কুন্নিয়া, মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত সি এস ভেনু প্রণীত ‘যতীন দাস – দা মার্টার’ বইটির তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে।