নলিনী বাবু B.Sc. – হুমায়ূন আহমেদ

০৩. শরীর শুদ্ধি খাবার

দুপুরবেলা শরীর শুদ্ধি যে খাবার নলিনী বাবু প্রস্তুত করলেন তার বর্ণনা দিতে চাচ্ছি। অনেক পাঠকের শরীর নিশ্চয়ই বিষাক্ত হয়ে আছে, তারা এই খাবারটা খেয়ে দেখতে পারেন। শরীর শুদ্ধ হবে কি না জানি না, তবে খেতে ভালো লাগবে।

নলিনী বাবু প্রথমেই আমার প্লেটে স্যুপের বাটির এক বাটি গরম ধোয়া ওঠা ভাত দিয়ে বললেন, ভাত এইটুকুই, এর বেশি খেতে পারবেন না।

আমি বললাম, আচ্ছা।

আঙুলে করে সামান্য নুন জিভের ডগায় ছোঁয়ান। এতে শরীর খাবার গ্রহণের জন্যে প্রস্তুত হবে। খাবার হজম করার জন্য যত জারক রস প্রয়োজন তাদের সবার কাছে ক্যামিকেল সিগন্যাল পৌছাবে যে খাবার আসছে।

আমি জিভে লবণ ছোঁয়ালাম।

শুরু করবেন উচ্ছে ভাজা দিয়ে। গরম পানি দিয়ে উচ্ছে ধুয়ে এনেছি এতে তিক্ত স্বাদ কম লাগবে। তবে তিক্ত স্বাদ দরকার। আপনি কি জানেন বিষের স্বাদ তিক্ত।

জানি। মানুষ যেন বিষাক্ত ফল না খায় এই জন্যেই প্রকৃতি বিষাক্ত ফল এবং খাবারের স্বাদ তিতা করেছে।

নলিনী বাবু বললেন, আমাদের শরীরেও বিষ আছে। করলার তিতা শরীরে যাওয়ায় বিষে বিষক্ষয় হবে।

আমি করলা খেলাম।

এটা হলো সজনে পাতার ভাজি। সজনে পাতাও শরীরের বিষ দূর করে। খেতে কেমন হয়েছে বলুন।

অসাধারণ হয়েছে। সজনে পাতা যে খাওয়া যায় এটাই জানতাম না।

পরের আইটেম রসুন ভর্তা। রসুন এবং কাঁচা মরিচ ভাপে সিদ্ধ করে চটকানো।

রসুন ভর্তা কোন উপকারে আসবে?

খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে শরীরে অনেক ভারী ধাতু ঢুকে যায়। নিশ্বাসের সঙ্গে ঢুকে সীসা। নদীর মাছের সঙ্গেও অনেক ভারী ধাতু শরীরে ঢুকে। রসুন এই ভারী ধাতুগুলি প্রস্রাবের সঙ্গে বের করে দেয়।

আমি বললাম, এই তথ্য কেমিস্ট্রির ছাত্র হিসাবে আমার জানা। আপনি কোথেকে জেনেছেন।

এক আয়ুর্বেদের কাছ থেকে জেনেছি। উনার নাম শ্রীযুক্ত হরেন্দ্রচন্দ্র আচার্য। ব্যাকরণ তীর্থশাস্ত্রী।

নেক্সট আইটেম।

এটা হলো মূল খাবার খেয়ে বলুন কি?

প্রথমে মনে হলো আলু। হালকা হলুদ ঝোলে আলুর মতোই দেখা যাচ্ছে। মুখে দেয়ার পর বুঝলাম আলু না, পেঁপে। আলুর মতো গোল করে কেটে রান্না করা হয়েছে। খেতে অসাধারণ।

নলিনী বাবু বললেন, পেঁপে আপনার শরীরকে স্নিগ্ধ করবে। পাকস্থলী বলবান করবে। এর পরে খাবেন টক। অনেকে বলে খাট্টা। স্যুপের মতো চুমুক দিয়ে খাবেন। এই অস্ত্র শরীরের এসিডকে নিউট্টলাইজ করবে।

ডাল নেই?

না। ডাল কিডনির জন্য ভালো না। শেষ করবেন পায়েস দিয়ে। লবণ দিয়ে শুরু চিনি দিয়ে শেষ। খেয়ে তৃপ্তি পাচ্ছেন?

পাচ্ছি। ভাত আরেকটু নিতে পারলে ভালো হতো।

ভাত আর নিতে পারবেন না। পাকস্থলীর অর্ধেক খালি রাখতে হবে।

শরীর শুদ্ধি করে আরামের ঘুম দিলাম। ঘুম ভাঙল ঠিক আগের দিনের মতো সন্ধ্যাবেলা। তবে অজি বৃষ্টি নেই।

বসার ঘরে সোফায় বসে নলিনী বাবু নিবিষ্ট মনে কি যেন লিখছেন। আমি বললাম, কি লিখছেন।

নলিনী বাবু বললেন, সংস্কৃত শ্লোক। যে কয়টা মনে পড়েছে লিখে যাচ্ছি। হয়তো আপনার কাজে লাগবে।

আমি চোখ বুলালাম। নম্বর দিয়ে বেশ গুছিয়ে লেখা।

উদাহরণ

১. পঙ্কো হি নভমি ক্ষিপ্তঃ
ক্ষেপ্তঃ পতনি মূর্ধতি।

(কাদা উপরে ছুড়লে, যে ছুড়ে তার মাথায় এসে পড়ে।)

২. পঞ্চভি মিলিতৈঃ কিং যদ্দো গতিহ ন সাধ্যতে।

(পাঁচজন মিলে কাজ করলে জগতের সব কার্য সিদ্ধ হয়।)

৩. কো ন যাতি বশং লোকঃ মুখে পিন্ধ্রেন পুরিতঃ।

(মুখে অন্ন তুলে দিলে কোন ব্যক্তি না বশীভূত হয়?)

সন্ধ্যা পুরোপুরি মিলাবার পর নলিনী বাবু আমাকে নিয়ে বারান্দায় বসলেন। বারান্দার বাতি নেভানো। ঘরের ভেতর থেকে আলো আসছে। নলিনী বাবু পান মুখে দিতে দিতে বললেন, মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত আপনাকে বলেছি। এর পর থেকে শুরু করি?

আমি বললাম, করুন।

মায়ের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মণ পুত্রকে কঠিন শোক পালন করতে হয়। আপনি কতটুকু জানেন আমি জানি না, একটু বলে নেই। ১৩ দিন পর্যন্ত হবিষ্যান্ন খেতে হয়। দিনে এক বেলা আহার। এক মুঠো আতপ চালের ভাত, কাঁচকলা সিদ্ধ, এক চামুচ গব্যঘৃত। সাধারণ লবণ খাবারে দেওয়া যাবে না। দিতে হবে সৈন্ধব লবণ। রান্না নিজেকে করতে হবে। রান্নায় খড়ি ব্যবহার করা যাবে না। শুকনা পাতায় রাঁধতে হবে। খেতে হবে আঙট পাতায়। আঙুট পাতা কি জানেন?

না।

আঙট পাতা হলো কলাপাতা। এই তের দিন কোনো চেয়ারে বসা যাবে। খাটে শোয়া যাবে না। কুশাসন বা মৃগচর্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর ফল ছাড়া কিছুই খাওয়া যাবে না।

১৩ দিন পার হওয়ার পর হবে নিয়ম ভঙ্গ অনুষ্ঠান। তখন নাপিত এসে মাথা, ভুরু সব কামিয়ে দেবে। সেলাই ছাড়া এক টুকরা নতুন কাপড় পরিয়ে দেবে।

আমার বয়স কম তারপরও আমাকে নিয়মমতো শোক পালন করতে হলো। নিয়ম ভঙ্গ অনুষ্ঠানের শেষে নিজের ঘরে ঢুকে মেঝেতে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল পাঁচালি পাঠের আওয়াজে। বাবার গলা–তিনি সুর করে পাঁচালি পাঠ করছেন। বাবাকে আমি কখনও পাঁচালি পাঠ করতে শুনিনি। মা পাঠ করতেন। বাবা বলতেন, কানের কাছে ঘ্যানঘ্যানানি করবা না। নীরবে পড়।

আমি অবাক হয়ে উঠে বসলাম। কিছুক্ষণ বাবার পাঁচালি পাঠ শুনলাম।

সেদিন উনিশে জ্যৈষ্ঠ আর রবিবার
সকালে হয়েছে খোলা মন্দিরের দ্বার।
রামকুমার, চন্দ্র ভট্টাচার্য দুজনে
বাবার মন্দিরে আসি প্রণাম চরণে…

পাঁচালি শুনতে শুনতেই হঠাৎ লক্ষ করলাম আমার গায়ে সেলাই ছাড়া নতুন কাপড় না। সাধারণ কাপড়। মাথায় হাত দিয়ে দেখি মাথাভর্তি চুল। প্রথম প্রশ্ন মাথায় এলো, আমি কি স্বপ্ন দেখছি? অবশ্যই স্বপ্ন। আমার মাথা কামানো হয়েছে। মাথাভর্তি চুল থাকার কোনোই কারণ নাই।

আমি ঘর থেকে বের হলাম। দোতলা থেকে নামলাম।

বাবা কুয়াতলায় বসে পাঁচালি পড়ছেন। তার সামনে বড় মামা বসে আছেন। তিনি আগ্রহ নিয়ে পাঠ শুনছেন। বড় মামা তো চলে গেছেন। আবার কখন এসেছেন? বাবা আমাকে দেখেই হাত ইশারা করে কাছে ডাকলেন। নরম গলায় বললেন, বাবা! জ্বর কি কমেছে?

আমি কিছু না বলে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাবা বললেন, কাছে আয় জ্বর দেখি।

আমি কাছে গেলাম। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, গা এখনও খানিকটা গরম। তখন বড় মামা আমার মাথায় হাত দিলেন। মামা বললেন, নাহ জুর নেমে গেছে।

বাবা বললেন, তোর মা ঘাটে বসে আছে। মাকে ডেকে নিয়ে আয়। চা খাব।

আমি অবাক হয়ে ঘাটের দিকে যাচ্ছি। এখন আর মনে হচ্ছে না আমি স্বপ্ন দেখছি। এখন মনে হচ্ছে মায়ের মৃত্যুর ব্যাপারটা ছিল স্বপ্ন। এখন যা দেখছি সেটাই বাস্তব। মা মারা যাননি। বেঁচে আছেন।

ঘাটে মা না, ললিত ছিপ হাতে বসে আছে। সে আমাকে দেখে মায়ের মতো করে মিষ্টি গলায় বলল, আমার বাবুটার জ্বর কমেছে? দেখি দেখি জ্বরটা দেখি।

আমাকে তার কাছে যেতে হলো না। সে এসে কপালে হাত রেখে আনন্দিত গলায় বলল, শরীর গাঙের পানির মতো ঠাণ্ডা। জ্বর নাই! আমার বাবুর জ্বর নাই নাই রে। তাইরে নাইরে না রে।

আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাথার ভেতরটা তখন পুরোপুরি এলোমেলো। সব তালগোল পাকিয়ে গেছে। ঘটনা কিছুই বুঝতে পারছি না। একবার মনে হলো এক্ষুনি মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাব। শরীর কেমন জানি করছে। প্রচণ্ড পিপাসা হচ্ছে। ললিতা হাত ধরে টেনে তার পাশে আমাকে বসাল। পানিতে বড়শি ফেলে গানের সুরে বলতে লাগল–

নাই নাই নাই
বাবুর জ্বর নাই।
দীঘির জলে বড়শি ফেলি
বিশাল মাছ পাই।

সেদিনের অভিজ্ঞতা আপনাকে ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারছি না। তা সম্ভবও না। আপনি লেখক মানুষ। লেখকদের কল্পনাশক্তি প্রবল হয় বলে শুনেছি। আপনি কল্পনা করে নিন। জলের মাছ ডাঙ্গায় বাস করতে এলে যা হয়, তাই। কিংবা ডাঙ্গার কোনো প্রাণীকে হঠাৎ জলে বাস করতে দিলে যা হয়।

আমি ললিতার পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ঘরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ললিতা পেছন থেকে ডাকল, এই বাবু যাস কই। একটু বস না! মার সাথে কিছুক্ষণ বসলে কি হয়?

আমি ফিরেও তাকালাম না। বাবার সামনে দিয়ে ঘরে ঢুকে গেলাম। বাবা তখনও মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে পাঁচালি পড়ছেন।

বেদনায় মৌন মূক বাক্য নাহি স্বরে
চুক্ষ মেলি লোকনাথ চাহে ধীরে ধীরে।

একতলায় ঢুকে ঝাঁটার শব্দ পেলাম। বাড়ির সম্মুখ বারান্দা কে যেন ঝাট দিচ্ছে। আমি গেলাম সেখানে। মা বারান্দা ঝাট দিচ্ছেন। মার শাড়িটা মলিন, মুখ মলিন। আমি চাপা গলায় ডাকলাম, মা!

মা চমকে ফিরে তাকালেন। হাসলেন। ঝাঁটা ফেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, পেরায়ই তুমি আমারে মা ডাকো। কেন ডাকো বাবু? তোমার মা কোনোদিন জানলে মনে বেজায় কষ্ট পাইব। আমি তো তোমার মা না। দাসীরে মা ডাকতে হয় না। তয় বাবু, তুমি যখন মা বইল্যা ডাক দেও, আমার কইলজা জুড়ায়া যায়।

হিন্দুরা জন্মান্তরে বিশ্বাস করে। ছোটবেলা থেকে আমরা এই বিষয়ের গল্পগাথা শুনি। জাতিশ্বর বালকের গল্প, যার পূর্বজন্মের স্মৃতি আছে–এসব।

আমার মনে হলো, এ গ্রনের কিছু আমার হয়েছে। আমি আবার নতুন করে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছি। তবে পূর্বজন্মের স্মৃতি আমার আছে। আগের জগতের চেয়ে নতুন এই জগ সম্পূর্ণই আলাদী।

দিন সাতেক পার হওয়ার পর আমি যা বুঝলাম তা হলো আমার এই বাবা অতি ভালো মানুষ ধর্মকর্ম নিয়ে থাকেন। আমাদের বাড়িটা ঠাকুর্দা বানিয়ে দিয়ে গেছেন। বড় মামা আমাদের সঙ্গে থাকেন। কাজকর্ম কিছু করেন না। তার একটা ফার্মেন্স আছে। ফার্মেসির নাম ললিতা আরোগ্য বিতান। সেই ফার্মেসি কর্মচারী চালায়। বড় মামা বেশিরভাগ সময় ঘরেই থাকেন।

আমাদের দাসী (আমার মা) অনেক দিন থেকেই এই বাড়িতে আছে। সে লেখাপড়া জানে। তাকে প্রায়ই দেখা যায় কুয়াতলায় বলে পকিয়ে লুকিয়ে বই পড়ছে।

সব মিলিয়ে আমাদের অতি মুখের এক সংসার। একটাই শুধু কষ্ট। আমার মা এখানে দাসী আমার এটাই মূল গল্প। আপনার মতামত শোনার পর আরও কিছু বলব।

নলিনী বাবু থামলেন একনাগাড়ে কথা বলে তিনি খানিকটা ক্লান্তও হয়েছেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি ধূমপান করি না। কিন্তু কেন জানি ধূমপান করতে ইচ্ছা হচ্ছে।

আমি সিগারেটের প্যাকেট তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, আপনি হঠাৎ নতুন এক জগতে ঢুকে গেলেন। এই বিষয়ে কারো সঙ্গে কথা বলেছেন?

বড় মামাকে বলেছি। তিনি সব শুনে বলেছেন, টাইফয়েড় হবার কারণে এইসব তোর মনে হচ্ছে। টাইফয়েড় খারাপ রোগ। এতে অঙ্গহানি হয়। মাথার গোলমাল হয়। ভিটামিন খেতে হবে। কড লিভার ওয়েল খেতে হবে।

বড় মামা আমাকে তার ফার্মেসি থেকে ভিটামিন আর কড লিভার ওয়েল ক্যাপসুল এনে দেন।

নতুন জগতে আপনি কতদিন ছিলেন?

তিনি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, তিন বছর।

আমি বললাম, হঠাৎ একদিন আগের জায়গায় ফিরে এলেন?

এসে কি দেখেন এখানেও তিন বছর পার হয়েছে?

হা। মঙ্গলবার সকাল নটার সময় ঘটনাটা ঘটে। আমি আগের অবস্থায় ফিরে গিয়ে দেখি সকাল নটা বাজে। মঙ্গলবার। চৈত্র মাস।

আপনার পোশাক কি একই ছিল?

না।

আমি বললাম, আপনার এক পরিবেশ থেকে আরেক পরিবেশের ট্রানজিশানের ঘটনাটা বলুন।

নলিনী বাবু বললেন, স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি, তখন ললিতা অর্থাৎ ওই জগতে আমার মা বলল, বাবু স্কুলে আজ না গেলি। তোর গা গরম। মনে হয় জ্বর আসছে। শুয়ে থাক। আমি বললাম, আচ্ছা। চাদর গায়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলাম। সে বসল আমার মাথার পাশে। ফুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, বাবু তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

আমি বললাম, করো।

দাসী মেয়েটাকে তুই মা ডাকিস কি জন্য? আমি নিজেও কয়েকবার শুনেছি। ছিঃ বাবা ছিঃ আমি কি তোকে কম আদর করি? বাইরের কেউ শুনলে নোংরা অর্থ করবে। করবে না?

আমি বললাম, হু।

তোর বাবা সাধু-সন্ন্যাসীর মতো মানুষ। লোকে তখন তাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলবে। সেটা কি ভালো হবে?

আমি বললাম, না।

ললিতা বলল, আমি ঠিক করেছি দাসী মেয়েটাকে আমি তাড়ায়ে দিব। যন্ত্রণা আমার ভালো লাগে না।

আমি বললাম, তুমি যদি তাকে তাড়ায়ে দাও আমি ছাদে উঠে ছাদ থেকে লাফ দিব।

এই সব কি বলো?

যা বললাম তাই করব।

ঐ রাক্ষসী মেয়ে তো তোমারে জাদুটোনা করেছে। জাদুটোনা ছাড়া এটা সম্ভব না। এই রাক্ষসীরে আমি কালই বিদায় কব।

বিদায় করবা না। সে আমার মা।

তাহলে আমি কে?

তুমি একটা খারাপ মেয়ে।

আমি খারাপ মেয়ে? আমি? কেন আমি খারাপ মেয়ে সেটা বলো। গোছায়ে বলো। আমি রাগ করব না। মন দিয়ে শুনব।

আমি জবাব দিলাম না। এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল বাবার চিৎকার-চেঁচামেচিতে। সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে দেখি বাবার এক হাতে একটা চ্যালা কাঠ, অন্য হাতে তিনি ললিতার চুল ধরে আছেন। তার শাড়ির সবটাই মাটিতে লুটাচ্ছে। গায়ে ব্লাউজ এবং পেটি কোট ছাড়া কিছু নেই। ললিতা নিঃশব্দে কাঁদছে। বাবা অতি নোংরা ভাষায় তাকে গালি দিচ্ছেন। বাবা বলছেন, আজ তোর কপালে মরণ আছে। তোকে নেংটা করে বাড়ি থেকে বের করে দেব। গায়ে একটা সুতা থাকবে না। নেংটা হেঁটে বাজারে গিয়ে উঠবি। ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া খাটবি। এক ঘণ্টা একশ টাকা। সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম আমি আগের কদর্য জগতে চলে গেছি। সাধুর মতো বাবার জায়গায় পিশাচ বাবার আগমনও ঘটেছে।

নলিনী বাবু আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, আমি আমার এই নোংরা বাবার সঙ্গে অতি নোংরা পরিবেশে বাবার মৃত্যু পর্যন্ত ছিলাম। তারপর হঠাৎ করে ফিরে যাই অতি শান্তিময় এক ভুবনে।

আমি বললাম, এমন কি হতে পারে না যে, প্রবল ইচ্ছাপূরণ চেষ্টার কারণে আপনার ব্রেইন এসব আপনাকে দেখাচ্ছে?

নলিনী বাবু বললেন, সেই সম্ভাবনা নেই। কারণ আমার শান্তির জগতেও কঠিন কিছু বেদনা আছে। সেখানে আমার মা দাসী। বিষয়টা কখনোই কোনো সন্তানের ইচ্ছাপূরণের অংশ হতে পারে না।

আমি বললাম, কোয়ান্টাম থিওরি প্যারালাল ইউনিভার্সে কথা বলে। তাদের একটা থিওরি আছে Many world theory, সেখানে অসংখ্য সম্ভাবনার অসংখ্য জগৎ একই সঙ্গে থাকে। একটিতে আপনি সুখে আছেন। একটিতে আপনি দুঃখে আছেন এসব। কিন্তু সেখানেও এক জগৎ থেকে আরেক জগতে যাওয়া সম্ভব না। তাতে Wave function collapse করে। আপনাকে মনে হয় ঠিকমতো বুঝতে পারছি না।

নলিনী বাবু বললেন, একেবারেই যে বোঝাতে পারছি না তাও কিন্তু না। এ জগতে আমি একজন বিএসসি শিক্ষক। কিন্তু ওই জগতে আমি পদার্থবিদ্যার একজন শিক্ষক। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই।

আমি বললাম, ওই জগতের স্মৃতি যেহেতু আপনার আছে, পদার্থবিদ্যা যা শিখেছেন তার স্মৃতিও নিশ্চয়ই আছে।

নলিনী বাবু বললেন, আছে। সামান্যই আছে, তবে আছে। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন।

আমি বললাম, আমি তো কেমিস্ট্রির মানুষ। পদার্থবিদ্যার পড়াশোনা সামান্য। তারপরও বলুন মাধ্যাকর্ষণজনিত ত্বরণের সমীকরণটা কী?

নলিনী বাবু বললেন, g = v/(f sin x)

আমি বললাম, ঠিক আছে। আইরিশ পদার্থবিদ Fitz Gerald-এর সমীকরণটা কি মনে আছে?

নলিনী বাবু বললেন, মনে আছে। তিনি বস্তুর দৈর্ঘ্য তার চলার গতির সঙ্গে কীভাবে কমে তার সমীকরণ বের করেছিলেন। Michelson-Moreley পরীক্ষায় এই সমীকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল। সমীকরণটা বলব?

না তার প্রয়োজন নাই।

এই প্রথম আমি সামান্য চিন্তিত বোধ করলাম। একজন স্কুলের বিএসসি শিক্ষকের Fitz Gerald সমীকরণ জানার কথা না। একই সঙ্গে একজন মানুষ Parallel দুই জগতে বাস করার কথাও না। বিজ্ঞান অনেক সম্ভাবনার কুপ্ত বলে। সম্ভাবনা সম্ভাবনাই। কল্পবিজ্ঞান এবং বাস্তবতা এক জিনিস না। আমি বললাম, আপনি যে দুটি জগৎ দেখছেন তাদের মধ্যে মিল এবং অমিল কী?

নলিনী বাবু বললেন, দুটি আসলে একই।

তার মানে? বুঝিয়ে বলুন। তার আগে আপনার জগৎ দুটি আলাদা করি। একটার নাম দেই দুঃখ জগৎ, যেখানে আপনার মা মারা গেছেন। আর একটার নাম দেই শান্তি জগৎ, যেখানে আপনার মা বেঁচে আছেন যেখানে একজন দাসী আপনার মা। এই দুই জগতে মিলটা কোথায়?

নলিনী বাবু বললেন, আমার বাবার কথা ধরুন। দুঃখ জগতে আমার বাবার স্ত্রী মারা যান কিংবা তাকে মেরে ফেলা হয়। শান্তি জগতেও একই ঘটনা ঘটে। তার স্ত্রী ললিতা মারা যান কিংবা তাকে মেরে ফেলা হয়।

কে তাকে মেরে ফেলে?

আমার বাবা।

আপনি তো বললেন, শান্তি জগতে আপনার বাবা অতি ভালো মানুষ। ধর্মকর্ম নিয়ে থাকেন।

শুরুতে তা-ই মনে হয়েছিল। যতই দিন যেতে লাগল আমি বুঝতে পারলাম বাবার মধ্যে বিরাট সমস্যা আছে। ধর্মকর্মের আড়ালে তিনি ভয়ঙ্কর একজন মানুষ। বাড়ির দাসীর সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। আমি ওই দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া এক ছেলে। সামাজিকতার কারণে আমার পরিচয় আমি তার বিবাহিত স্ত্রীর সন্তান। এখানে মিলটা লক্ষ করুন। দুঃখ জগতে যিনি আমার মা, তিনিই আবার শান্তি জগতেও আমার মা। দুঃখ জগতে বাবার স্ত্রী মারা যান। শান্তি জগতেও বাবার স্ত্রী মারা যান।

তিনি কীভাবে মারা যান?

ঝাঁপ দিয়ে কুয়াতে পড়েছিলেন। আমার ধারণা, বাবা তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছেন। বাবার পক্ষে অসম্ভব কিছু না। তিনি অতি ভয়ঙ্কর মানুষদের একজন। অথচ এত মিষ্টভাষী। তার মুখে সারাক্ষণ সাধু-সন্ন্যাসীদের গল্প।

আমি বললাম, ঘটনা তো খুবই জটিল হয়ে যাচ্ছে।

নলিনী বাবু বললেন, জটিলতা অবশ্যই আছে। আমি নিজে জট খোলার অনেক চেষ্টা করেছি। তবে আমি মোটামুটি মূখ একজন মানুষ।

আমি বললাম, শান্তি জগতে আপনি পদার্থবিদ্যা পড়ান। কাজেই নিজেকে মূর্খ বলা কি ঠিক হচ্ছে?

এই জগতের আমি কিন্তু মূখ। এই জগতের আমির চিন্তা-ভাবনাও সাধারণ! তবে দুটি জগৎ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। দুঃখ জগতে যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, শান্তি জগতেও তাদের সঙ্গে আমার পরিচয়।

আমি বললাম, তা-ই যদি হয় তাহলে শান্তি জগতেও নিশ্চয়ই আপনি আমার দেখা পেয়েছেন।

জি পেয়েছি।

আমি বললাম, সে বিষয়ে বলুন।

নলিনী বাবু বললেন, আজ না। আরেক দিন বলব। রাত দুটা বাজে। আপনি ঘুমুতে যান। আমি লক্ষ করেছি, আপনি ঘন ঘন হাই তুলছেন। আপনার ঘুম প্রয়োজন। আমি নিজেও ক্লান্ত।

আমি ঘুমুতে গেলাম। পরদিন ঘুম ভাঙল অনেক বেলায়। খোঁজ নিয়ে জানলাম, নলিনী বাবু ভোরবেলা চলে গেছেন। ফ্ল্যাটের দারোয়ানের কাছে আমাকে লেখা একটা চিঠি রেখে গেছেন। চিঠি জোগাড় করে পড়লাম। তিনি লিখেছেন–

মহাশয়

আমার প্রণাম নিবেন। গত রাতে আপনার সঙ্গে উদ্ভট কিছু আলোচনা করেছি। আমার ধারণা, আমি আপনার শান্তি বিঘ্নিত করেছি।

আমি একজন মানসিক রোগী। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছি। রোগের প্রকোপ প্রবল হলে আমাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আমার ধারণা তখনই দুই জগৎ নামক উদ্ভট চিন্তা আমার মাথায় আসে। ধারণা না। ইহাই সত্য আপনার সময় নষ্ট করার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। নিজ গুণে ক্ষমা করবেন।

ইতি

বাবু নলিনী ভট্টাচার্য।

চিঠি শেষ করে আমি মনে মনে বললাম হোলি কাউ এর আক্ষরিক অর্থ পবিত্র গাভী। আমেরিকানরা কোনো কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খেলে পবিত্র গাভীর নমি নেয়। পড়াশোনার কারণে দীর্ঘদিন আমেরিকায় থাকতে হয়েছে বলেই হয়তো তাদের স্বভাবের খানিকটা আমার মধ্যে চলে এসেছে।