Course Content
সমুদ্র কন্যা – আশাপূর্ণা দেবী
সমুদ্র কন্যা – আশাপূর্ণা দেবী
0/5
সমুদ্র কন্যা – আশাপূর্ণা দেবী

সমুদ্র কন্যা – ১

এক

‘এই আমার পরিকল্পনা শঙ্খ! সোনা দৃঢ়গলায় কথায় সমাপ্তির রেখা টানে, অনেক কিছু ভেবেছি, এছাড়া আর উপায় দেখছি না।’

শঙ্খ এতক্ষণ ভুরু-কপাল কুঁচকে বসে সোমার অপরূপ পরিকল্পনার খসড়া শুনছিল। কারণ সোমা বলেছিল, ‘আগে আমাকে সবটা বলতে দাও শঙ্খ, তারপর তুমি কথা বলো।’ অতএব সবটা শুনে তবে কথা বলল শঙ্খ, ‘এ ছাড়া আর কোনো উপায় দেখতে পেলে না তুমি?’

শঙ্খের এই প্রশ্নের মধ্যে ক্ষোভ ছিল, হতাশা ছিল, ব্যঙ্গ ছিল, বেদনা ছিল। কিন্তু সোমা তো জানতই এসব থাকবে, তাই সোনা বিচলিত হল না। সোমা আবারও দৃঢ় হল, আমি তো দেখতে পাচ্ছি না, তুমিই তবে বলো আর কী উপায় আছে?’

শঙ্খ ক্ষুব্ধ গলায় বলে, ‘বলেছি অনেকবার।

‘ওঃ, সেই বিয়ের পরও চাকরি-বাকরি করে বাবার দেনা শোধ করা? কিন্তু ক্ষিধে যেখানে কুম্ভকর্ণের, সেখানে একমুঠো খুদ কোন কাজ দেবে শঙ্খ? তেষ্টা যেখানে মরুভূমির সেখানে ফোঁটা ফোঁটা জল ছিটিয়ে কী করব আমি? তিন মাসের মধ্যে হাজার দশেক টাকা যোগাড় করতে না পারলে সমস্ত পরিবারকে রাস্তায় দাঁড়াতে হত সে কথা কি তোমার অজানা?’

দুই

তা অজানা অবশ্য নয়, কারণ শঙ্খ আর সোমারা তিন পুরুষে গায়ে গায়ে প্রতিবেশী। আর সেই প্রতিবেশীত্ব শুধু কুশল প্রশ্ন বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার। এদের বাড়িতে কুটুমবাড়ির তত্ত্ব এলে যেমন ওরা খেতো, তেমনি এদের বাড়িতে কারো অসুখ হলে ওরা এসে রাত জাগতো।

আবার ওদের বাড়িতে কুটুম এলে এরা সৌষ্ঠব রক্ষা সম্পর্কে সচেতন থাকতো— ওদের বাড়িতে যজ্ঞি হলে এরা তিন দিন হাঁড়ি চড়াতো না।

কিন্তু এসব কি অতীত হয়ে গেছে?

এসব কি আর হয় না?

হয়, আজও সম্পর্ক অটুট আছে, তবে একপক্ষের জীবনতরণীটি একেবারে টুটা ফুটা ঝাঁজরা হয়ে গেছে, তাই সেই স্বচ্ছন্দ ভাবটা যেন ব্যাহত হয়ে গেছে।

সোমার বাবা যখন চাকরি করতেন, তখন ক্ষীণ হলেও প্রবাহটা ছিল, কাজেই সেই প্রবাহের সঙ্গে শঙ্খদের জীবনপ্রবাহ মিলতে পারতো, মিলতো।

দুই গিন্নিতে পরামর্শ করে—দু-দিনের বাজার খরচ বাঁচিয়ে একদিন দুপুরের শো-এ সিনেমা দেখে আসতো, আবার একদিন হয়তো দুই কর্তাই মাসের প্রথম দিকে হঠাৎ দুঃসাহসে ভর করে একজোড়া ইলিশ কিনে বসতেন, যার দাম তিন দিনের বাজার খরচার সমান।

কিন্তু বিপর্যয় ঘটেছে দু-দিকেই। শঙ্খর বাবা মারা গেছেন, আর সোমার বাবা? তিনি নিজেকে জীবস্মৃত বলে ঘোষণা করেন। একের হাঁড়ির খবর অপরের নখদর্পণে। তবু কেউ কাউকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ভরাডুবি থেকে ভাসিয়ে তুলবে, এ ক্ষমতা নেই।

অথচ সোমাদের সংসারে হয়েছে সেই ভরাডুবি। সোমার বাবা চাকরিতে অবসর গ্রহণের পর এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের সমস্ত টাকাগুলো দিয়ে এক ব্যাবসা ফেঁদে বসেছিলেন, কারণ পরপর দুটো মেয়ের বিয়ে দিয়ে আর একটা ছেলেকে ডাক্তারি পড়িয়ে সোমার বাবা আকণ্ঠ ঋণে ডুবে পড়েছিলেন তখন

কিন্তু সোমার বাবার সেই ব্যাবসা সোনার হরিণের ছলনা নিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল, ঋণের বোঝার উপর আরো একরাশ ঋণ চাপিয়ে। মরীয়া ভদ্রলোক অতঃপর ডুবো জীবনতরীখানাকে টেনে তুলতে বসতবাড়িখানাকে বন্ধক দিয়েছিলেন, এবং শেষ অবধি শেষ কপর্দকটি পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিয়ে রক্তচাপ বৃদ্ধি ঘটিয়ে বিছানা নিয়েছেন।

বাঁধা দেওয়া বাড়িটাকে আবারও বাঁধা দিয়ে সংসারটাকে চালানো হচ্ছিল—মানে সোমা, সোমার মা-বাবা, আর ছোট দুটো ভাই, সর্বসাকুল্যে এই পাঁচজন সদস্যে গঠিত সংসারটাকে। তারই ফাঁকে পার্ট-ওয়ান-পাস করা সোমা একটা সাবান কোম্পানির প্রচার বিভাগে ঢুকে পড়ে চলার পথটা কিছু সুগম করে আনছিল, কিন্তু ঘাড়ের উঁচোনো খাঁড়া এবার ঘাড়ে এসে কোপ দিয়েছে।

পরোয়ানা এসে গেছে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। সুদে-আসলে যা দাঁড়িয়েছে, তাতে নাকি বাড়ির দাম অনেকদিন আগেই উঠে গেছে। নেহাত ভদ্রতার দায়েই এতদিন, ইত্যাদি ইত্যাদি…

দাম উঠে গেছে, সেটা এদেরও জানা ছিল বই-কি। প্রাসাদ নয়, অট্টালিকা নয়, নিতান্তই একটু মাথা গোঁজার আশ্রয়, ওকে বিকোতে আর কতই লেগেছে? সামান্য মূল্যেই বিকিয়ে বসে আছে সে, যে ‘সামান্য’টা অবশ্য সোমাদের কাছে অসামান্য।

আর সোমার চাকরি? সে তো সোমার ভাষায় মরুভূমিতে জলবিন্দু, কুম্ভকর্ণের গহ্বরে ক্ষুদ্ৰ মুষ্টি!

তিন

শঙ্খর যদি সামর্থ্য থাকত, শঙ্খ কি দিত না সোমার বাবার ওই বোঝা হালকা করে? সামর্থ্য থাকলে অবশ্যই দিত। আর সেই বীরত্বের মহিমায় সোমার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারত সোমার জন্যে হাত পেতে

সেই হাত পাতার মধ্যে দীনতা থাকত না, থাকত মহিমা, থাকত গৌরব!

কিন্তু সে গৌরব শঙ্খদের জন্য থাকে না।

সে মহিমার চন্দন-তিলক শঙ্খদের ললাটে আঁকা হয় না।

শঙ্খও তো স্রেফ শুধু কেরানীর ছেলে, শুধু কেরানী। ওদেরও কোনোখানে নেই তালুক-মুলুকের বনেদ, কোথাও নেই নিত্য প্রয়োজনীয়ের অতিরিক্ত কোনও সম্বল।

তাও বাপ যতদিন বেঁচেছিল শঙ্খর, একটু গায়ে হাওয়া দিয়ে বেড়িয়েছে সে। লেখাপড়ার অবকাশে ‘পাশের বাড়ির মেয়ের’ সঙ্গে হৃদয়-চর্চা করেছে, খেলাধুলো করেছে, গান-বাজনাও কিছু করেছে। মানে ওদের মতো মধ্যবিত্ত ঘরের দৌড়ের সীমানা যতটুকু, তার মধ্যেই দৌড়াদৌড়ি করে নিয়েছে। কিন্তু সে দিন গত। বাপ মারা গিয়ে বড়ছেলের ঘাড়ে জাঁতা চাপিয়ে গেছে।

সোমাকে বিয়ে করে ফেলতে পারলে এ অবস্থার অবসান হতে পারত শঙ্খর। কারণ সোমার মাইনে শঙ্খর মাইনেরই প্রায় সমান সমান। এই দুটো সমানের ‘টানা’য় অসমানের ‘পোড়েন’গুলো খাপ খাইয়ে বুনে নেওয়া যেত, কিন্তু সে আর হচ্ছে কোথা থেকে? সোমা বলেছে, ‘এখন যদি বিয়ে করে চলে যাই, নিজেকে জানোয়ার ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারব না আমি।’

তিনপুরুষে বন্ধুত্ব, তবু এমন অবস্থাটা ঘটেনি এর আগে। বন্ধুত্ব হয়েছে মেয়েয় মেয়েয়, পুরুষে পুরুষে, মেয়ে আর ছেলের এই চিরন্তন হৃদয়ঘটিত বন্ধন প্রথম ঘটেছে এই তৃতীয় পুরুষে। আর ঘটেছে সেই শৈশবকাল থেকে। কাজেই অজানা ছিল না কারো।

ওদের যে বিয়ে হবে, এটা দুটো পরিবারই মেনে নিয়েছিল, কিন্তু সেই মেনে নেওয়ায় চিড় ধরাল শরদিন্দুর ভাগ্য-বিপর্যয়। বড়মেয়ে দুটো বিয়ে হয়ে দূরে চলে গেছে, কৃতী ছেলেটি বিয়ে করে আর চাকরি নিয়ে দূরে চলে গেছে, কদাচিৎ খোঁজ নেয় তারা, অথবা নেয়ও না। কোলের এই মেয়েটাকে অতএব আঁকড়ে ধরেছিলেন শরদিন্দু। আরো আঁকড়ালেন মেয়ের চাকরি হওয়া ইস্তক। ধরেই নিলেন, এ খুঁটি আর ছাড়া চলবে না। ওকে ধরেই এই লাটখাওয়া সংসারকে খাড়া করে তুলতে হবে।

মমতা? মানবিকতা?

পেটের কাছে কে?

অতএব সোমার যে বিয়ে-থাওয়া করে ঘর-সংসার করা চলবে না, এটা ওঁরা ধরেই রেখেছেন।

চার

কিন্তু হঠাৎ এল এক নতুন পরিস্থিতি, নতুন ঘটনা, কিংবা নতুন কিছুই নয়, সেই আদ্যিকালের কোন এক কাহিনিরই পুনরাবৃত্তি। যা নাকি এক অতি কাঁচা লেখকের এক অতি কাঁচা উপন্যাসের মত। টেকনিকটা বাজে, প্লটটা ছাঁচে ঢালাই।

সত্যি, বিধাতাপুরুষের মতো এমন কাঁচা লেখক আর কোথায় দেখা যায়? লোকটার রচনায় না আছে প্লটের নতুনত্ব, না আছে চরিত্রের নতুনত্ব। সেই আদি অন্তকালের উপকরণ—রোগ, শোক, মৃত্যু, অভাব! সেই মানুষের নিষ্ঠুরতা, নির্লজ্জতা, ক্রূরতা, বিশ্বাসঘাতকতা! কাহিনি ঘোরালো করবার জন্যে এছাড়া আর কিছু পায় না ও। তাই তার রচনা শুধু একই কাহিনির পুনরাবৃত্তি। তার সৃষ্ট ‘চরিত্রগুলো’ কালে কালে বেশবাস বদলালেও চরিত্র বদলায় না।

একের দুর্বলতার মধ্যে অপরের সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা, একের লোভের মধ্যে অপরের লোভের পরিপূর্তি, চিরন্তন এই কাঁচা একটা গল্পকেই অতএব আবার দেখা যাচ্ছে, সোমাদের কাছাকাছি। যদিও ওরা ভাবছে কী নতুন, কী আশ্চর্য। আশ্চর্য! দুর্ভাগ্য আর দুর্ভাগ্য-দূরের দাওয়াই একই সঙ্গে দেখা দিয়েছে। বাড়ি ছাড়ার নোটিসের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি উদ্ধারের আশা উঁকি মেরেছে এক অভাবিত কোণ থেকে।

ঘটনাটা এই—

হঠাৎ একদিন শরদিন্দুর একদার ‘বস্’ মিস্টার সিংহ মস্ত এক গাড়ি চড়ে এসে হাজির দীনহীন শরদিন্দু সরকারের কুটিরে তত্ত্ববার্তা নিতে।

শরদিন্দুও আর চাকরিতে নেই, মিস্টার সিংহও আর চাকরিতে নেই, দুজনেই অবসরে অ-পদস্থ, তবু শরদিন্দু দিশেহারা বশংবদের মূর্তিতে প্রাক্তন ‘বস’ কে আপ্যায়িত করলেন, এবং তাঁর কাছে নিজের এই দৈন্যদশার কারণ উদ্ঘাটিত করে ফেলতে দ্বিধা করলেন না। বাড়ি ছেড়ে পথে দাঁড়াতে হবে এবার, সে সত্যও প্রকাশ করলেন।

এই ‘বস’টি কি শরদিন্দুকে খুব মমতা করতেন? বয়সের কাছাকাছির সূত্রে কি বিশেষ হৃদ্যতা ছিল? না কি লোকটা স্বভাবতই দয়ালু আর পরোপকারী? তাই তার কাছে দুঃখের গাথা গেরে বুকের বোঝা কিঞ্চিৎ হালকা করতে চাইলেন শরদিন্দু?

তাই তো করে থাকে মানুষ!

বলে কী লাভ হবে ভেবে দেখে না। প্রতিকারের আশাও রাখে না। শুধু কোনো একটি দরদী হৃদয়ের কাছে আপন দুঃখ নিবেদন করতে পাওয়াই তার সুখ।

তেমন সুযোগ পেলে মানুষ ছাড়ে না। শরদিন্দুও ছাড়লেন না। বিশদ করে বোঝাতে বসলেন তাঁর প্রাক্তন উপরওয়ালা সিংহসাহেবকে, কী মারাত্মক অবস্থায় রয়েছেন তিনি।

তা সুযোগ পেলেন সিংহসাহেবও, তাকমাফিক বলে ফেললেন, ‘আপাতত এক-তৃতীয়াংশ শোধ দিতে পারলেই বসতবাড়িটা রক্ষা পায় আপনার? তাই না কি? জানতাম না তো? কত সেটা? হাজার দশেক? বেশ তো, নিন না আমার কাছে। ঈশ্বরের অনুগ্রহে আমার যখন রয়েছে।’

‘রয়েছে’ অবশ্য ঠিকই, তবে ঈশ্বরের অনুগ্রহে কি শয়তানের অনুগ্রহে, সেটা ঈশ্বরই জানেন। সরকারি এক শাঁসালো ডিপার্টমেন্টের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন তো সিংহসাহেব। আর অবসর গ্রহণের আগে একবার নাকি খবরের কাগজে কোন এক ‘কেলেঙ্কারী’র সূত্রে নামও বেরিয়েছিল তাঁর। কিন্তু সে সব যথারীতি যথাকালে ধামা চাপাও পড়ে ছিল। এখন যেটা চাপা নেই সেটা হচ্ছে ‘অনেক আছে’ তাঁর।

একটি সুন্দরী মেয়ের জন্য দাদন হিসেবে হাজার দশেক টাকা তিনি অনায়াসেই খরচা করতে পারেন।

অবশ্য ওই ‘দাদন’ কথাটা শঙ্খর সৃষ্টি, গায়ের জ্বালাতেই বলেছে ওকথা। বলেছে, ‘ঘুষ খেয়ে খেয়ে পিপে হয়ে যাওয়া পেট থেকে হাজার দশেক বার করে দেওয়া আর শক্ত কি? একটা সুন্দরী মেয়ের জন্যে ওটুকু ‘দাদন’ দেওয়া তো কিছুই নয়।’

সোমা বলেছিল, ‘শঙ্খ, তুমি বোধ হয় খেয়াল করছো না এটা সিংহ সাহেবকে অপমান করা হল না, অপমান করা হল আমাকে।

শঙ্খ বলেছিল, ‘অপমান আমি কাউকেই করছি না। শুধু যা ফ্যাক্ট তাই বলছি।’

‘তুমি তাহলে ধরেই নিচ্ছ, এই দাদনটি দিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত আমার বাবার সুন্দরী কন্যাটিকে লুঠে নেবেন?’

‘নেবেন কিনা জানি না, তবে নেবার বাসনাতেই এই মবলগ খরচ।’

‘সাহায্যও তো হতে পারে?’

বলেছিল সোমা। কারণ সোমা তখনও জানতো আসলে এটা ভাবী শ্বশুরকেই ‘অসময়ে’ সাহায্য সিংহসাহেবের।

হ্যাঁ, সিংহসাহেব সেই প্রস্তাবই করতে এসেছিলেন। অকৃতদার সিংহসাহেব। সারাটা জীবন স্বর্ণ নেশায় ছুটে ছুটে এখন জীবনের অপরাহ্ণে হঠাৎ খেয়াল হয়েছে তাঁর, একটি গৃহিণী ব্যতীত ‘সব ঝুটা হ্যায়’।

বিয়ের অনীহা ছিল এমন নয়, বিয়ের অবসর জোটেনি। এখন অবসরের জীবনে সমস্ত প্রাণটা ‘হায় হায়’ করে উঠেছে।

কী করলাম এতদিন! জীবনটা যে একেবারে শুকদেবের মতো কেটেছে তা হয়তো নয়, কিন্তু সে জীবনে আর খুব একটা রুচি নেই সিংহসাহেবের।

তিনি তাঁর অনবধানতায় হাত ফস্কে পালিয়ে যাওয়া জীবনকে আবার আহরণ করে আস্বাদ করতে চান বটে, কিন্তু তার সঙ্গে বজায় রাখতে চান মান-সম্ভ্রম, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, পারিবারিক পবিত্রতা।

অতএব বিয়ে।

আর নয়ই বা কেন?

শরদিন্দুর মতন অকালবৃদ্ধ কি তিনি?

এখনো স্বাস্থ্য অটুট, গড়ন মজবুত, জীবনের আস্বাদ নেবার ক্ষমতা রয়েছে দেহে মনে দু-দিকেই! তাঁর একক জীবনের ঘর-সংসার দেখলে তাক লেগে যাবে লোকের, তাঁর রুচি পছন্দ শখ-শৌখিনতা তাজা তরুণদেরও লজ্জা দিতে পারে।

‘সিলভার টনিক’টা যে সত্যিই শক্তিশালী টনিক, সেটা যেন নতুন করে অনুধাবন করা যায় সিংহসাহেবকে দেখে।

অতএব বিয়ে তিনি বিয়ের মতোই করবেন।

নিজে প্রৌঢ়ত্বের সীমায় এসে পৌঁছেছেন বলেই যে একটি প্রৌঢ়া কুমারী অথবা আধবুড়ি বিধবাকে বিয়ে করবেন, তা নয়। সুন্দরী সদ্বংশজাতা তরুণীই তাঁর আকাঙ্ক্ষিত। আর সেই আকাঙ্ক্ষার বস্তু রয়েছে তাঁরই একদার অধস্তনের ঘরে। যে লোকটা নাকি এখন অধস্তন না হয়েও অধমাধমের ভূমিকায় অভিনয় করে মরছে।

‘টাকা আমি আপনাকে এমনিই দেব শরদিন্দুবাবু’, পূর্ব অভ্যাসমতো উচ্চপদস্থ অফিসারজনোচিত অতি অমায়িক ভঙ্গীতেই বলেন সিংহসাহেব, ‘মনে করবেন না, কোনোরকম বাধ্য-বাধকতায় ফেলছি আপনাকে, এটা সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার। তবে ওই কথাটা আপনি একটু বিবেচনা করে দেখবেন। তাড়াতাড়ি নেই। দু-চার দিন পরে বললেও চলবে, প্রধানত আপনার মেয়ের মত নেওয়া দরকার।’

বিগলিত শরদিন্দু ওজন হারান, বলে বসেন, ‘তার আবার মতো! কী বিবেচনা বুদ্ধি হয়েছে তার? ওই দেখতেই বড় হয়েছে—’। চাকরির কথাটা চেপেই ছিলেন, চেপেই রইলেন। বললেন, ‘এখনো কোথাও যেতে মাকে জিজ্ঞাসা করে কী শাড়ি পরবে। তাছাড়া মেয়ে আমার—বলব কি, আমার ছেলের মতো আত্মসুখী স্বার্থপর নয়।’

‘সুন্দর কথা, মহৎ কথা,’ সিংহসাহেব তাঁর দীর্ঘ উন্নত দেহ নিয়ে উঠে দাঁড়ান, “তা বলে আমরা যেন ওঁর সেই মহত্ত্বের সুযোগ নিয়ে স্বার্থপর না হই। কথা হচ্ছে, ঠিক বিয়ের বয়সটা তো নেই আমার!’

হাসলেন একটু সিংহসাহেব।

যেন খানিকটা মিথ্যা বিনয় প্রকাশ করলেন।

যেমন প্রাসাদের অধিকারী বলে, ‘এই গরীবের কুঁড়ে—’

বিপদ শরদিন্দুর।

‘বয়েস নেই’, একথায় সায় দেওয়া অধস্তনের পক্ষে কঠিন। অথচ ‘বয়েস আছে-এটা বলতে গেলে চোখের চামড়াটা ফেলতে হয়।

তাই শরদিন্দু একটু হেঁ হেঁ করেন।

যাতে না, হ্যাঁ দুই-ই বোঝায়।

অথবা কিছুই বোঝায় না।

সিংহসাহেব আবার উদাত্ত হন, ‘সেন্স বলে একটা বস্তু তো আছে মশাই! জানি বয়েস নেই, তবে এও জানি এদেশে একটা পয়সাওলা বুড়ো বিয়ে করতে চাইলে পাত্রীর অভাব হয় না। আর শুধু এদেশকেই বা দোষ দিচ্ছি কেন, এ-দেশ ও-দেশ, পৃথিবীর কোন দেশেই বা নয়? পাত্রী এখুনি জুটবে ডজন ডজন। কিন্তু কথাটা তো তা নয়। বিয়ের সময় প্রথমেই দেখতে হবে বংশ। না, পাত্রীর রূপ নয়, বিদ্যে নয়, ওই কুলশীল বংশ ভালো কি না? এখানে আমাকে সে প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। শুধু পরবর্তী প্রশ্ন—’

সিংহসাহেব সময় নেন।

আর শরদিন্দু সরকার বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবেন, অনেকদিন লোকটার তাঁবে কাজ করেছি বটে, জেনেছি তাঁবেদারের সম্পর্কে ব্যবহারে রীতিমতো ওয়াকিবহাল ও।

কিন্তু ও যে তার ফাঁকে শরদিন্দু সরকারের কুলশীলের ‘মান’ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে বসেছিল, তা তো কই কোনোদিন টের পাননি।