সমুদ্র কন্যা – ১৫
পনেরো
‘ও এখন গেল সিংহীসাহেবের কাছে।’
‘সিংহীসাহেবের কাছে! ও? সোমা? গেল?’
ক্ষুদ্ধ বিস্ময়ে স্তব্ধ হলেন শরদিন্দু।
সুপ্রভা বলেন, ‘গেল তো! বললো, আমি যাচ্ছি বুঝিয়ে বলছি।’
‘কী বলতে চায় ও?’
‘ও জানে আর ওর ভগবান জানেন।’
‘শেষ পর্যন্ত ডোবাবে!’ বলে বিছানায় শুয়ে পড়েন শরদিন্দু।
কিন্তু বাপকে আর ডোবাল কই সোমা? নিজেই তো ডুবল।
গিয়েছিল তো নীচের বৈঠকখানায়। শান্ত গলায় বলেছিল, ‘এইসব অনুষ্ঠান-টনুষ্ঠান আজ থাক না!’
সিংহ্ সাহেব ইতিপূর্বে আরও একদিন এসেছিলেন, এসে শরদিন্দুর তত্ত্ববার্তা নিয়ে গিয়েছিলেন। সোমাকে দেখেওছেন, তবু এমন একা দেখেন নি।
পুরোহিত আর সেই আত্মীয়টিকে বাজারে পাঠিয়ে দিয়ে বসেছিলেন একখানা ম্যাগাজিন হাতে, এই সময় এই আবির্ভাব।
কিন্তু কথাগুলো ওর কেমন উলটো-পালটা যেন।
নড়ে-চড়ে বসলেন সিংহসাহেব, হাতের বইটা মুড়লেন, বললেন, ‘কী বলছেন?’
হ্যাঁ, ভদ্রমানুষ সিংহসাহেব, ভাবী স্ত্রীকে এখনো ‘আপনি’ই বলছেন।
সোমা বলে, ‘বলছিলাম—হঠাৎ এই সব অনুষ্ঠান! আমার একটু অসুবিধে রয়েছে।’
‘আপনার অসুবিধে?’ সাহেব যেন বিনয়ে গলে পড়েন, ‘তাহলে তো হতেই পারে না আজ। আপনার মা যে সব অসুবিধের কথা বলছিলেন, তার ব্যবস্থা করতে লোক গেছে। কিন্তু আপনার অসুবিধে দূর করতে পারি, এ স্পর্ধা রাখি না। বলুন তাহলে আজ চলে যাই।’
এ আবার কী মুশকিল!
সোমা যেন পায়ের নীচে তেমন জুৎসই মাটি পায় না। ভেবেছিল লোকটা এ প্রস্তাবে রেগে উঠবে, কড়া কথা বলবে, সোমাও তার উত্তরে কড়া হবে।
কিন্তু এটা কী হল?
হ্যাঁ চলে যাও—এটা কেমন করে বলা যায় ভদ্রলোককে?
তাই বলতে হয়, ‘আমি ঠিক এভাবে বলছিলাম না।’
‘বলুন তবে কীভাবে বলতে চান?’
সোমা বিপন্ন গলায় বলে, ‘মানে, অন্য কিছু নয়, হঠাৎ এরকম—’
সিংহসাহেব একটু হাসেন, ‘তার মানে—আপনি এখনো মনস্থির করতে পারেন নি। বেশ তো করুন মনস্থির। জোর করে আপনার ওপর এটা বিয়ে চাপিয়ে দেব, এমন বর্বর ভাববেন না আমাকে। আপনার বাবা-মা দুজনেই বললেন, আপনি খুব— মানে আপনার কোনো আপত্তি নেই। তবু যেন ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। ভালোই হল যে আপনার সঙ্গে এভাবে কথা বলার সুযোগ হল। আজ তাহলে পাকা কথা থাক।’
উঠে দাঁড়ালেন সিংহসাহেব।
বললেন, ‘আমি তাহলে বাইরে গিয়ে দাঁড়াই, ওরা আবার এসে পড়বে। মানে যারা বাজারে গেছে।’
সোমা আরো বিপন্ন হয়।
সোনা যা পরিকল্পনা করে এসেছিল, সেটা যেন ভেস্তে যাচ্ছে।
সোমা এই প্রবল ব্যক্তিত্বের সামনে অসহায়তা অনুভব করে।
তাই বলে ফেলে, ‘বাইরে গিয়ে দাঁড়াবেন কেন?’
‘আপনি বসতে অনুমতি দিলে বসতে পারি। তবে—’ একটু হাসেন সিংহসাহেব, ‘বুঝতেই তো পারছেন, ওদের সামনে একটু লজ্জায় পড়তে হবে। অথচ—’ আরো একটু হাসেন, ‘আপনার মা-বাবা এমন একটা অ্যাসিওরেন্স দিয়েছিলেন যে, আয়োজনটা করে ফেলতে দ্বিধা করিনি। এখন অবশ্য নিজেকে খুব বোকা লাগছে।’
বোকা লাগছে!
সিংহসাহেবের নিজেকে খুব বোকা লাগছে!
তাহলে সোমার?
সোমার কী লাগছে নিজেকে?
খুব চালাক?
চালাকির জোরে লোকটাকে এত সহজে তাড়াতে পারছে বলে আত্মপ্রসাদ অনুভব করছে?
এরপর মা-র কাছে গিয়ে বড় মুখ করে বলতে পারবে, ‘কী হল? আকাশ থেকে বজ্রপতন? অপমানও করি নি, তাড়িয়েও দিই নি। আল কথা, বুদ্ধি করে কথা বলা চাই।’
কিন্তু তা তো হল না।
সোমা বলে ফেললো, ‘বাঃ, তা কেন? বরং আমিই বোকার মতো কথা বলছি। মানে, বাবা-মা আমাকে ঠিক আজই জানান নি বলেই—’
‘সেটাই অনুমান করছি। যাক, আপনি মনঃস্থির করুন। কোনোমতেই আমি আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবো না।’ সেই ‘অফিসারের ডাঁট’টা যেন একটু শিথিল হয়ে যাচ্ছে।
যেন চোখের কোণায় একটু আকুলতার ছায়া
তবু—কথা গম্ভীর, মার্জিত, শান্ত।
‘যদি আদৌ না মনঃস্থির হয়, তাতেও আমি কোনো অভিযোগ তুলব না। আচ্ছা—’
সোমা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এই সময় হুড়মুড়িয়ে এসে পড়ল সিংহসাহেবের আত্মীয়, পুরুত, ড্রাইভার, আর তাদের সঙ্গে মুটে একটা।
প্রচুর মিষ্টি ফল খাবারদাবার, ভালো ভালো কাচের প্লেট, কাচের গ্লাস, পানের খিলি, লেমন স্কোয়াশ, রুপোর রেকাবী, ধান-দুর্বো। আর শাড়ির বাক্স। হৈচৈ করে নামাল এ-সব তারা। তার মানে মজুত ছিল এসব কোথাও।
সোমা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে, কী বলবে সে এখন?
উঠিয়ে নিয়ে যাও এসব?
না কি, হে সাহেব; তুমিই উঠে যাও তোমার দলবল নিয়ে, আমরা এগুলি গ্রহণ করি।
ওরা সোমাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আশ্চর্য হয়। এবং পুরোহিত ঠাকুর শশব্যস্তে বলেন, ‘তোমাকে তো মা এবার একটু প্রস্তুত হতে হবে। এই যে শাড়ি—’ খুলে ধরেন।
আগাগোড়া জরিদার একখানা ফিকে নীল বেনারসী শাড়ি ঝলমলিয়ে ওঠে। পুরুত আবার বলেন, ‘এই শাড়িখানি, প’রে আসতে হবে মা! আর কপালে একটু চন্দন। ফুলের মালা আমাদের সঙ্গে আছে।’
শাড়িখানা সোমার শিথিল হাতে গুঁজে দেন।
আর সিংহ সাহেব এই সময় বলে ওঠেন, ‘থাক ঠাকুরমশাই, আজ উনি একটু অসুস্থ রয়েছেন—’
‘অসুস্থ!’
ঠাকুরমশাই বসে পড়েন। ‘সে কী? এত আয়োজন!’
‘কী আর করা যাবে! সুযোগ এলে আর একবার আয়োজন করা এমন কিছু শক্ত হবে না।’
সিংহসাহেব হাসেন, উঠে পড়ে বলেন, ‘শরদিন্দুবাবুর সঙ্গে একটু দেখা করে যেতাম—’
সোমার চোখের সামনের দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে আসে।
দেখা করে যাবে!
দেখা করে বলে যাবে, ‘ওহে মশাই, আপনার মেয়ে এখনো মনঃস্থির করতে পারেন নি, অতএব আমি বিদায় নিচ্ছি।’
এইসব খাবারদাবার সোমাদের বাড়িতে পড়ে থাকবে, ওরা না খেয়ে বিদায় নেবে। অপরাধের মধ্যে ও বিনা খবরে এসেছে।
সোমা তার বাবার মুখটা ভাবে, মা-র মুখটা ভাবে। ছোট ছোট যে ভাই দুটো ভয়ানক নতুন একটা আমোদের আশায় উৎসুক আগ্রহে ফুরফুর করছে, তাদের মুখগুলো ভাবে।
শুধু সোমা হঠাৎ এই মুহূর্তে শঙ্খর মুখটা ভাবতে ভুলে যায়।
তাই সোমা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বলে, ‘বাবাকে কী বলবেন?
সিংহসাহেব হাসেন, ‘যা হোক একটা কিছু বলা যাবে। সিধু, তুই ঠাকুরমশাইকে নিয়ে গাড়িতে বসগে যা—’
ওরা চলে যাবার ভঙ্গী নিয়েও ইতস্তত করে।
সোমা কী যেন বলতে যায়, সিংহসাহেব মৃদু হেসে বলেন, ‘জিনিসটা বয়ে এনেছি, আর ফিরিয়ে নিয়ে যাব না, বরং আপনার মাকে বলবেন তুলে রাখতে।’
নেকলেসের কেসটা নামিয়ে রাখেন টেবিলে।
সোমা সহসা কঠিন হয়। সোমার বোধকরি এখন শঙ্খর মুখটা মনে পড়ে।
সোমা বলে, ‘না, ও আপনি নিয়ে যান। ধরুন যদি এ অনুষ্ঠানটার সুযোগ আদৌ না আসে?’
এতক্ষণে যেন স্মার্ট আর চটপটে লাগে সোমার নিজেকে। আর নিজের উপর খুব খুশী হয়ে ওঠে। ইস্! এতক্ষণ কী বোকার মতো ভেবে যাচ্ছিল!
কিন্তু ওটা কী?
সিংহসাহেবের মুখে ও কিসের হাসি?
অবিচলিত, আর প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গময়!
যেন এই রকম একটা কথাই শুনতে হবে সেটা জানতেন তিনি।
এই ‘বুঝে ফেলা’ হাসিটুকু দেখে সোমার হঠাৎ নিজেকে ভারী অপদস্থ লাগে। আর লোকটার উপর রাগে জ্বলে যায়।
তার উপর আরো ‘চাল’ চালায় লোকটা। আরো অমায়িক গলায় বলে, ‘তাহলে ওটা আপনার ভবিষ্যৎ শুভদিনের জন্য উপহার হিসেবে থাকবে।’
‘তার মানে?’
রুদ্ধকণ্ঠে বলে সোমা।
সিংহসাহেব হেসে উঠে বলেন, ‘কী আশ্চর্য! এর আর মানে বোঝাবার কী আছে? আপনার বিয়ের প্রেজেনটেশান হিসেবে রইল।’
সোমা কি এই অপমান গায়ে মেখে বসে থাকবে? বলবে, ‘আচ্ছা, তাই থাক।’
তা তো সম্ভব নয়।
তাই সোমা আরক্তিম মুখে বলে, ‘অদূর সুদূর কোনো ভবিষ্যতেই সে শুভদিনের আশা নেই।’
‘আহা, ‘নেই’ এ-কথা কি জোর গলায় বলা যায়? আশা রাখাই মানুষের ধর্ম।’
‘ঠিক আছে। কিন্তু তাই যদি হয়, আপনিই বা কেন দিতে যাবেন, আর আমিই বা কেন—’ থেমে যায় সোমা, ভাবে বড় রূঢ় হচ্ছে বোধহয়। কিন্তু কথাটা শেষ করে নেন শ্রোতাই।
‘তুমিই বা কেন নিতে যাবে, এই তো?’ সিংহসাহেব যেন শিশুর বীরত্বের আস্ফালন শুনছেন, সিংহসাহেবের মুখে সেই বীরত্বের দর্শকের সকৌতুক হাসি ফুটে ওঠে। আর তাই বোধকরি ‘আপনি’ ছেড়ে ‘তুমি’ ধরেন। বলেন, ‘এতবড় মেয়ে, আচ্ছা ছেলেমানুষ তো! তোমার বিয়ের সময় তোমার বাবার একদার কোনো সহকর্মীর অধিকার থাকবে না বিয়েতে উপহার দেবার?
সহকর্মী! ওপরওলা নয়, সহকর্মী!
দেখা যাচ্ছে, বাংলা ভাষাটা ভালোই জানেন সাহেব। কোনখানটায় কী মারপ্যাঁচ কষলে প্যাচে ফেলা যায়, সেটা দিব্যি জানা আছে।
এখন সোমা, তুমি কী বলবে বল?
পারবে আরো স্মার্ট হতে? ·
পারবে আধুনিক ভঙ্গীতে কাটা কাটা বুলি বলতে?
তা পারলই না বটে।
নেহাত সেই বোকার মতোই বলে বসল, ‘সে তাহলে বই-টই কি সামান্য কিছু দেবেন। এত টাকা খরচ করবেন কেন?’
‘কেন?’. সিংহসাহেব মৃদু হাসির সঙ্গে বলেন, ‘কারণ আমার খরচ করবার মতো বাড়তি কতকগুলো টাকা আছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত থাকলে সেটা খরচ করবার একটা পথ চাই তো? উপলক্ষ জুটে গেলেই খুশী হই।’
বাড়তি কতকগুলো টাকা! অর্থাৎ ঘুষের টাকা!
সোমা আবার চেষ্টা করে প্রখর হবার, ‘ওঃ! তার মানে—আপনার সেই একদার সহকর্মীদের মেয়ে বা ছেলের বিয়ে হলেই একটা করে জড়োয়া নেকলেস উপহার দেন আপনি?’
আশ্চর্য! সিংহসাহেব, যাঁর কেশর ফোলানো দেখলে পীলে চমকে যায় লোকের, এবং পান থেকে চুন খসলেই যাঁর কেশর ফুলে ওঠে, তিনি এই অনাসৃষ্টি অবস্থার মধ্যেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ের বাচালতা শুনছেন! তাও কোন মেয়ে? না, তাঁর একদার অধস্তনের মেয়ে।
আর যে অধস্তনের ‘পথে দাঁড়ানো’ বন্ধ করেছেন তিনি বস্তাখানেক টাকা ঢেলে।
অযাচিত সেই দানের ভারে তো নুইয়ে থাকবার কথা সমগ্র পরিবারটারই। সে জায়গায় কিনা এতখানি ঔদ্ধত্য!
এখনি ‘টাইট’ দিয়ে দিতে পারেন না সিংহসাহেব ওই বাচাল মেয়েটাকে? অপমানের কাদায় মুখ ঘষে দিতে পারেন না? এক ধমকে চুপ করিয়ে দিতে পারেন না?
পারেন, অথচ করছেন না তা।
তার মানে সকৌতুকে উপভোগ করছেন ওই বাচালতা
হয়তো ওটা উপভোগ্যই লাগছে তাঁর। যেমন লাগে তরুণ পুরুষের।
পুরুষজাতির কাছে মেয়েদের বাচালতাটা তো উপভোগ্যই। এখানে ওদের মান-অপমানের প্রশ্ন ওঠে না।
তাই সিংহসাহেবকেও সে প্রশ্ন ওঠাতে দেখা গেল না।
ওই জড়োয়া নেকলেসের উল্লেখেও সমান হাসিমুখেই উত্তর দিলেন, ‘তা হয়তো দিই না, কিন্তু উপহারটা তো দেয় খাজনা নয় যে, তার একটা ধরা-বাঁধা অঙ্ক থাকবে? ওটার কম বেশী মুড-এর ওপর।’
তার মানে সিংহসাহেব এখন জড়োয়া নেকলেসের মুড-এ আছেন।
পাকা দেখতে এসেছিলেন শাড়ি গহনা মিষ্টি-মাষ্টি নিয়ে, হল না সে দেখা। পাকা-দেখার কনে তাড়িয়ে দিচ্ছে সাংঘাতিক এক পাকামি করে, তবু মুড-এ আছেন।
আশ্চর্য প্রাণশক্তি বলতে হবে।
সোমা যেন এই শক্তির কাছে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তাই সোমা ফ্যাকাসে গলায় বলে, ‘কিন্তু আজ তো আপনার ভালো মুড-এ থাকবার কথা নয়!’
‘কথা?’ এবার বেশ জোর গলায় হেসে ওঠেন সাহেব, ‘মুডও কি তোমার অঙ্কশাস্ত্র যে, হিসেবের ছক মেনে চলবে?’
আশ্চর্য, এত ভালো বাংলা শিখল কোথা থেকে লোকটা? চিরদিন তো উঁচু পোস্টে বসে দপ্তর চালিয়েছে, কেবল উঁচুভাষার দাপটে। বাংলা গল্প-উপন্যাস পড়ে বুঝি? সময় পেয়েছে কোথায় এত?
ও ঘর থেকে সোমার মা-বাবা আশান্বিত চিত্তে বলাবলি করেন, ‘হঠাৎ এত হাসি? তাহলে মেয়েটা ফাঁসায়নি আমাদের! যেভাবে তাল ঠুকে গেল ওঘরে…আরে বাবা, টাকা বড় জিনিস! দেখলে তো কোথাও কিছু না, দু’হাতে টাকা ছড়াচ্ছে।
সোমার মা মুখ টিপে হাসেন, ‘ঘুষে ভগবান বশ তো মানুষ কোন ছার! আর দেখছ তো, শুনতেই বয়েস হয়েছে, কী স্বাস্থ্য, কী চেহারা!’
তা কথাটা সোমার মা-র মিথ্যে নয়।
স্বাস্থ্যটা সিংহসাহেবের দ্রষ্টব্য। আর চেহারা? সৌন্দর্য না থাক প্রাচুর্য আছে।
ওই খোলা গলার হাসিটার পরই কেমন একটু স্তব্ধতা।
কী হল? বেশী ঘোরালো কিছু নয় তো?
আবেগের মাথায় হঠাৎ—যতই হোক আইবুড়ো মেয়ে।
ধৈর্য ধরতে পারলেন না সোমার মা, চলে এলেন। পিছু পিছু শরদিন্দুও।
আর ঠিক যে সময় সোমা ওই অঙ্কশাস্ত্র সম্পর্কে একাট ঘোরালো উত্তর দেবার চেষ্টা করছিল, সেইসময় ওঁদের দরজার অদূরে ভিতর দালানে দেখা গেল।
সোমা তাকিয়ে দেখল।
আগ্রহে ব্যাকুল, আনন্দে ছলছল, উৎসাহে অধীর দু’খানি মুখ। যেন সোমার উপর সমস্ত প্রত্যাশার ভার নামিয়ে স্বস্তির আর নিশ্চিন্ততার নিশ্বাস ফেলছেন।
সোমা এখনি ওই মুখ দুটোর উপর ছাই ছড়িয়ে দেবে। সোমা তার পরও আবার মুখ দেখাবে?
তাছাড়া এই শয়তান লোকটা এখন ভদ্রতার পরাকাষ্ঠা দেখালেও আশাভঙ্গে ক্ষিপ্ত হয়ে কী না কী করে বসবে কে জনে! হয়তো এমন মারাত্মক অপমান করে বসবে যে, হাই ব্লাডপ্রেসার রুগীটা উত্তেজন য় স্ট্রোক হয়ে গড়িয়ে পড়বে। হয়তো বা তার থেকেও বেশী ভয়ঙ্কর কিছু—
সোমার পায়ের নীচে থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, সোমার মাথার মধ্যে অর্কেস্ট্রা বাজছে, সোমার চোখের সামনেটা কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আসছে।
ওঁরা এসে পড়েছেন, ওঁদের সামনে ওই ধূর্ত লোকটা এখুনি হাতজোড় করে অমায়িক গলায় বলবে, ‘আজ পাকা-দেখায় আপনার মেয়ের অসুবিধে রয়েছে শুনলাম, তাহলে আজ বিদায় নিচ্ছি। যদি কোনোদিন সুবিধে হয়, ডাক দেবেন
অথচ এমনভাবে বলবে, বুঝিয়ে ছাড়বে সুবিধে যে সোমার কোনোদিনই হবে না সেটা জেনেই যাচ্ছে সে। আর তার পরের কথা, ডাকলেও আসবে না।
এসব বোঝাবার মতো ভয়ানক একটা ব্যঙ্গের হাসি হাসতে জানে ও।
অতএব তৎক্ষণাৎ ঘটে যাবে সেই ঘটনাটা।
সেই হাসির দিকে তাকিয়েই গড়িয়ে পড়ে যাবে একটা ভারসাম্য রক্ষায় অক্ষম অশক্ত দেহ।
কে জানে—
মনের অগোচর পাপ নেই, তাই একটা পাপ-চিন্তা মনে উঁকি দিয়ে যায় সোমার। কে জানে, ঠিক ততখানি অশক্ত না হলেও ক্রোধে ক্ষোভে, মেয়েকে শাস্তি দেবার বাসনায় তেমন অ-শক্তির অভিনয় দেখাবে দুর্বল চরিত্রের মানুষটা। ইচ্ছে করেই গড়িয়ে পড়বে। দুর্বল চরিত্র? তা ছাড়া কী? ঘোরতর—
একজনের অযাচিত করুণায় লজ্জিত হল না, অসম্মানিত বোধ করল না, অঞ্জলি পেতে সেই করুণাধারা পান করতে বসল, আর তার বিনিময়ে-
চৌকাঠের কাছে এসে গেছেন ওঁরা।
বাবার হাঁটতে দেরি হয় বলেই এতটা সময় লাগল, কিন্তু আর লাগবে না। ঘরে এসে ঢুকবেন।
সোমা কী করবে?
সোমা কি সেই আসন্ন ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত হবে?
না না, এই মুহূর্তে আর সে সাহস খুঁজে পাচ্ছে না সোমা। সোমা তাই এখন বালির বাঁধ দিয়ে ভাঙনের মুখে গড়িয়ে পড়া থেকে আত্মরক্ষা করবে।
সোমা গলার স্বর নামায়, সেই মৃদুগলাকে দ্রুত করে, ‘শুনুন। এতক্ষণ যে কথা হচ্ছিল, সেটা বলবেন না ওঁদের। যা হতে যাচ্ছিল হোক।’
‘যা হতে যাচ্ছিল হোক!’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, যা করতে এসেছিলেন করেই যান। আমি—হ্যাঁ, আমি আমার কথা উইথড্র করছি। বাবা বিচলিত হবেন, প্রেসার বেড়ে যেতে পরে, বাবার জন্যেই—’
মা-বাপকে পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সোমা।
মা-বাপ ঘরে ঢুকেছেন, তবু ভাবী বরের সঙ্গে ফুসফুস গুজগুজ!
সোমার মা ভাবেন, সেই যে বলে না–হয়তো হয়, নয়তো নয়, এ হচ্ছে তাই! এলেন যেন রাগে আগুন হয়ে, অথচ — হুঁ!
নিজেরই তাঁর একটু রাগ-রাগ হয়।
কোথায় একেবারে সাজিয়ে-গুছিয়ে মেয়ে নিয়ে আসবেন, তা নয়। তারপরই চোখে পড়ল টেবিলের উপর চৌকির উপর চেয়ারের উপর জিনিসের সম্ভার।
দিশেহারা গলায় বলে উঠলেন, ‘এ কী, এত কী করেছেন আপনি!’
হ্যাঁ, এখনো ‘আপনি’। তাছাড়া কিছু বলা সম্ভব নয়।
যখন জামাই হয়ে যাবে, তখন চেষ্টা করবেন ‘বাবা, তুমি’ বলতে।
সিংহসাহেব মৃদু হেসে বলেন, ‘কি আর? সামান্য কিছু—’
শরদিন্দু এসব সৌজন্যের দিকে তাকান না, সন্দিগ্ধ গলায় বলেন, ‘ওঁরা কোথায় গেলেন?’
‘বাইরে গাড়িতে আছে—’
এবার উদ্বিগ্ন গলা, ‘কেন, বাইরে কেন?
‘বাইরে কেন?’ সিংহসাহেব একটু হাসেন, ‘আমিই বললাম।’
হ্যাঁ, ওঁরা ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সোমার কথা উইথড্র করবার আগেই সিংহসাহেব চোখের ইসারায় তাদের বাইরে পাঠিয়েছেন। মুটেটা জিনিস নামিয়েছে, চলে গেছে।
সিংহসাহেব সেই কথাই বলেন, ‘আমিই বললাম বাইরে গিয়ে বসতে। হঠাৎ তাড়াহুড়ো করে এসে আপনাদের অসুবিধেয় ফেললাম—’
শরদিন্দু ব্যস্ত স্বরে খাপছাড়া গলায় বলেন, ‘অসুবিধে? কী বলছেন আপনি? অসুবিধে কিছু না। না, মোটেই না। আপনার পায়ের ধুলো পড়া আমাদের ভাগ্য…সোমার বহুজন্মের ইয়ে—’ ওপরওলার সঙ্গেই কথা বলেন শরদিন্দু। শুধু বহুজন্মের কী সেটাই চট করে খুঁজে পান না।
‘ঠিক আছে—’
অভয়ের প্রসন্ন হাসি হাসেন সিংহসাহেব, ‘ব্যস্ত হবেন না। আমি বরং একটু ঘুরে আসছি—’
ঘুরে আসছি! সর্বনাশ!
তার মানে, আর আসছি না। তার মানে, মন ঘুরে গেছে।
ওই পাজি লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে তাহলে বলেছে কিছু। ফুসফুস করে তাহলে ওই সবই কিছু বলছিল। ইনি ভদ্রলোক, তাই ঘুরে আসছি বলে সরে পড়ছেন।
সোমার মা-র এক ভয়ে আর ভয়ের বাঁধ ভাঙে। তাই মুখ দিয়ে ‘তুমি’ বেরিয়ে আসে। সোমার মা আঁতকে উঠে বলেন, ‘সে কী বাবা, এখন আবার ঘুরে আসবে কী? এখুনি শুভ কাজটুকু হবে—’
‘তাতে কী? এখনি আসব।’ প্রজ্ঞাপারমিতার মতো করুণাঘন প্রসন্ন মুখ থেকে ঝরে ঝরে পড়ে কথা, ‘আসলে একটা দরকারি জিনিস আনতে ভুল হয়ে গেছে। মানে, বুঝছেনই তো, বাড়িতে বলে দেবার কেউ নেই। ভুল হবেই সর্বদা। খরচা হয়তো করতে পারি কতকগুলো, নিয়ম-টিয়ম তো জানি না!
সোমার মা’ মনে মনে বলেন, আহা! একেই বলে, ‘সোনা কাঁদে কান রে—’
রাজার সংসার! অথচ যেন বেচারী! মুখে বলেন, ‘তা হোক, তা হোক। ভুল আর কী? এই এত সব কাণ্ড—’
আবার ‘আপনি’ ‘তুমি’র সীমানায় হোঁচট খাচ্ছেন সোমার মা। তাই ওটা বাদ দিয়ে কথা চালানোর চেষ্টা।
সিংহসাহেব বলেন, ‘ও-সব না, একটা দরকারি জিনিস আনা হয়নি। এখুনি আসছি। আচ্ছা, আপনারা প্রস্তুত হোন।’
সিংহসাহেব দরজার বাইরে পা ফেলেন। পাখি বুঝি উড়ে গেল, শরদিন্দু আর থাকতে পারেন না, বলে ওঠেন, ‘আমার ওই লক্ষ্মীছাড়া মেয়েটা কিছু বলেছে বুঝি?’
সিংহসাহেব আকাশ থেকে পড়েন। উনি কী বলবেন?’
শরদিন্দু আবার সামলান, ‘না, মানে, একালের মেয়ে তো? হয়তো এখনই এটা চাই, ওটা নইলে হবে না, বলে ব্যস্ত করেছে!’
‘ছি ছি, এ আপনি কী বলছেন?’ সিংহসাহেব যেন মরমে মরে যান, ‘আপনার মেয়ে—তার প্রকৃতি আপনি জানেন না? বাস্তবিকই একটা জিনিসের ভুল হয়ে গেছে—
রাস্তায় নামেন। সরু রাস্তাটা পার হয়ে এগিয়ে যান বড়রাস্তায় দাঁড় করানো গাড়ির দিকে।
ষোল
‘আর এসেছে!’
ভোট-যুদ্ধে পরাজিত নির্বাচন-প্রার্থীর মতো শিথিল ভঙ্গীতে চৌকিটার কোণ চেপে বসে পড়েন শরদিন্দু, মিষ্টির হাঁড়ির গায়ে গা লাগিয়ে।
সোমার মার-ও ভঙ্গী শিথিল। স্বর ভয়ার্ত, ‘ও-কথা বলছ কেন?’
‘কেন আর? যা স্পষ্ট দেখছি!’
‘আসবে না? তার মানে বিয়ে করবে না?’
‘তাই তো মনে হচ্ছে। প্রথমে কি-রকম উৎসাহভাবে এসেছিল। এখন দেখলে তা?’
‘কিন্তু তা যে বলছ, তাহলে ওই টাকাটা? বিয়ের আশাতেই তো ফেলেছিল সেটা? অমনি ছেড়ে দেবে?’
‘অমনি ছেড়ে দেবে, কি পরে চোখে সর্ষেফুল দেখাবে কে জানে! অফিসেও তো— ওই কর্ম করেছে। কত সময়—’
অফিসের স্মৃতির কথা তুলে মনটাকে আরো অন্ধকার করে তুলতে ইচ্ছে করে না বলেই, অথবা এনার্জিব অভাবে, চুপ করে যান সোমার বাবা।
অনেকক্ষণ বসে থাকেন হাত-পা এলিয়ে। দুটো মানুষই। কোনো জিনিসে হাত ঠেকান না, যেন জিনিসগুলোর প্রেত-আত্মার স্পর্শ লেগে গেছে।
তারপর সোমার মা আস্তে সাবধানে প্রায় অবৈধ কাজের ভঙ্গীতে গহনার কেসটা একটু ফাঁক করে দেখেন, আর সঙ্গে সঙ্গে একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে ওঠেন।
জড়োয়া নেকলেস!
হঠাৎ উঠে দাঁড়ান, তীব্রবেগে ভিতরে ঢুকে যান, আক্রোশের গলায় ডাক দেন, ‘সোমা!’
সোমা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
এলো চুল, শিথিল বেশবাস
সোমার মা আর ভদ্রতার আবরণ রাখতে পারেন না। চাকরি-করা মেয়েকে বলে ওঠেন, ‘কী বলেছিস ওকে লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে?’
সোমা ভুরু কুঁচকোয়।
‘কী বলেছি?’
‘যা বলতে গিয়েছিলি নিষ্ঠুর অবিবেচক মেয়ে!’ সোমার মা হাঁপান, ‘সেই তাড়িয়ে ছাড়লি অতবড় লোকটাকে?’
‘তাড়িয়ে?’
‘তা, তার মানেই তাই। ঘুরে আসছি বলে চলে গেল। সেকথার মানে বুঝছি না আমি? আর আসবে ও?’
চলে গেল!
সোমার চোখের সামনে আবার কুয়াশার পর্দা। শেষকালের কথাগুলো কি শুনতে পায় নি? না কি অনুধাবন করতে পারে নি? অথবা সোমার ধৃষ্টতার শাস্তি দিয়ে গেল? বুঝিয়ে দিয়ে গেল, আমি তোমার হাতের বাঁদর নাচের বাঁদর নই।
তবু, বলতেই হবে ভদ্র।
চলে যাবার উপরে একটা আবরণ দিয়েছে। একেবারে নির্লজ্জ নিরাবরণ করে দিয়ে যায়নি।
তা দিলে এই লোক দুটো হার্ট-ফেল করত। কে জানে এখনই করবে কিনা।
মা-র ওই আশাহত উত্তেজিত মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ভারী ঘৃণা এল সোমার। তোমাদের স্বার্থের হাঁড়ি-কাঠে সন্তানকে বলি দিতে বসেছ তোমরা, তবু লজ্জা নেই?
ভিটে বাঁধা দিয়ে পেট ভরিয়েছ, এখন মেয়ে বাঁধা দিয়ে ভিটে ছাড়াতে বসেছ! অথচ বড় মুখ করে শাসন করতে এসেছ মেয়েকে!
ভয়ানক একটা উত্তেজনা বোধ করছিল সোমা।
অথচ তীব্র কিছু বলবার অভ্যাসের অভাবেই কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে থাকে তার।
কথা সোমার মা-ই বলেন, ‘এখন ওই জড়োয়া নেকলেস, বেনারসী শাড়ি, এত খাবার-দাবার, কী করব এইসব নিয়ে আমি? আমার যে মাথা কুটে মরতে ইচ্ছে করছে গো!’
সোমা তবুও স্তব্ধ হয়ে থাকে।
সোমা যেন অবাক হয়ে গেছে। সোমার হিসেব গুলিয়ে যাচ্ছে। সোমা ভেবেছিল সোমার ওই শেষ সম্মতির সুযোগটুকু লুফে নেবে অতিক্রান্ত-যৌবন লুব্ধ-চরিত্র লোকটা। ভদ্রতার পালিশ লাগিয়ে কথা বলছে বলেই তো ভদ্র হয়ে যায়নি! গরীবের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটা মেয়ের সর্বনাশ করতে বসেছে, সহজে ছাড়বে না।
আচ্ছা, তাহলে চলে গেল কেন?
তবে নিশ্চয় শুনতেই পায়নি সোমার শেষ কথাটা। অথবা বুঝতে পারেনি। তাই! সেটাই সম্ভব। তাড়াতাড়িতে ঠিক কোন শব্দটা উচ্চারণ করে এসেছে, নিজেই যেন স্মরণে আনতে পারে না সোমা।
কী বলে এলাম আমি?
কী বলে এলাম?
.
‘এক পুরিয়া বিষ এনে দুজনে খেয়ে সব জ্বালা জুড়িয়ে চলে যাব, ব্যস।’
সোমার মা ঘোষণা করেন, ‘বেঁচে থাকা মানেই তো তোমার মতো নিষ্ঠুর মেয়ের হাতে পড়ে থাকা! কত আশা করেছিলাম আবার বুঝি দিন ফিরল। দোজবরে তেজবরে নয়, শুধু বয়েসটা একটু বেশি, সেইটাই যখন এত বড় হল তোমার কাছে, তখন আর বলার কী আছে?
সোমার মা নিশ্বাস ফেলেন। রোদে হাঁপানো কুকুরের মতো দেখতে লাগে ভঙ্গীটা।
সোমা হঠাৎ দৃঢ় হয়। তীব্র হয়।
বলে, ‘ঘুরে আসবেই তো বলেছে, একেবারে ধরেই নিচ্ছ কেন আর আসবে না? না আসে, ঠিকানাটা দিও, আমি নিজে গিয়ে পায়ে ধরে ডেকে নিয়ে আসব।’
‘সে-কথা বলিনি তোমায় আমি।’
তুমি বলনি, আমিই বলছি। বিয়ে ব্যাপারটা যখন তোমাদের কাছে এতই তুচ্ছ আর সহজ, তখন—’
সোমার মা-ও যুদ্ধে নামেন।
‘ক্ষতিই বা কী তাও তো বুঝছি না। দোজবরে বিয়েও কি শোনোনি কখনো? বরের বয়েস বেশি, এই খোঁচ্ মনে তুলে, এই সংসারটাকে মাথা তুলতে দেবে না তুমি? বয়েসটাই সব? রূপ-গুণ, বিদ্যে-বুদ্ধি, ধন-দৌলত, আর কিসে খাটো ও?’
সোমা একটু হাসে। ঘৃণার হাসি।
বলে, ‘তোমার কথাটা কেমন হল জানো? হাত-পা, চোখ-কান, নখ চুল, সবই তো রয়েছে মানুষটার, শুধু প্রাণটাই নেই, তাতে এত দুঃখের কী আছে?’
‘সেইটা আর এইটা এক হল?’
‘বেশি তফাত্ত নেই। মা, তুমি বোধহয় আর একটা মানুষকে হিসেবের মধ্যেই আনোনি? তাই না?’
আর একটা মানুষ! সোমার মা কেঁপে ওঠেন।
হয়ে গেল! উদ্ঘাটন হয়ে গেলে আর কী রইল?
সোমার মা অতএব আকাশ থেকে পড়েন!
‘আর একটা মানুষ মানে? ‘
‘ওঃ, মানেও জানো না কথাটার?’ সোমা ঘৃণার হাসি হাসে। ‘তুমি যে এত চমৎকার অভিনয় করতে পারো মা, এতদিন জানতাম না।’
‘কী, কী বললি?’
সোমার মা যেন ধ্বসে পড়েন। লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে সব বুঝে ফেলেছে! সোমার মা তবু বলেন, ‘অভিনয় মানে?’
‘তোমাকে তাহলে এবার থেকে সব কথার মানে বোঝাতে হবে?’ সোমা জ্বলন্ত গলায় বলে, ‘অবাক হয়ে যাচ্ছি মা—’
কথা শেষ হয় না, ওদিক থেকে শরদিন্দুর ভাঙা ভাঙা আনন্দ-উদ্বেল কণ্ঠের ব্যস্ত ডাক শোনা যায়, ‘কই গো, তোমাদের মেয়ে সাজানো হল? এঁরা তো এসে গেছেন। নাঃ, তোমাদের নিয়ে আর—খোকা-ই বা গেল কোথায়—কে যে কী করে—’
শরদিন্দু ভিতরে চলে আসনে।
আর সোমা তাকিয়ে থাকে বাবার মুখের দিকে। বাবাও যে এমন নিপুণ অভিনেতা তা তো কই জানা ছিল না।
তারপর মা-র দিকে চাইল। বললে, ‘দেখলে? বলিনি আসবে?’
এরপর কি সোমা সেই লোকটার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে?
অভিনেতার এবার উচ্চগ্রামের পরিবর্তে নিম্নগ্রাম, ‘যা হোক করে ম্যানেজ করে এলাম। এখন যা হোক করে একবার বেরিয়ে আজকের মতো মুখটা রাখো আমার। তারপর যদি ইচ্ছে হয়—’
ইচ্ছে হলে কী হবে, অথবা ইচ্ছেটা কী হবে সে সম্পর্কে অন্ধকারেই রেখে আবার চলে যান ব্যস্ত হয়ে। আর-একবার গলাটা চড়ান, ‘থাক, আর কনেসাজে দরকার নেই, যেমন আছে চলে আসুক। এঁরা কতক্ষণ সময় দেবেন? ‘
তা, ওঁরা হয়তো সময় দিতেন, মেয়ের বাবা-ই দিলেন না।
এমনিই চলে এল সোমা।
তবে ওঁরা অর্থাৎ ওঁদের পুরুত আর আগের ভাগ্নেটি এবং দ্বিতীয় বারে নিয়ে আসা একটি জ্ঞাতি ভাইপো উচ্ছ্বসিত বাক্যে বলে উঠলেন, ‘এ মেয়েকে আর সাজাবার কী আছে!’
.
তারপর সোমার সেই আটপৌরে সাজের উপরই জড়োয়া নেকলেস দুলল, সোমার কোলের উপর পাট-করা বেনারসীটা পড়ে রইল।
তারপর চর্ব-চোষ্য করে খেল সবাই। ভাগ্নেই মেয়েলী ভঙ্গীতে সব প্লেটে প্লেটে সাজিয়ে ফেলল, সোমার মা হাতে করে এগিয়ে দিলেন।
পুরোহিত বিবাহের দিন-স্থির করলেন। অতঃপর উঠলেন তাঁরা, এবং ঠিক বিদায়ের প্রাক্কালে সিংহসাহেব এক ভয়াবহ কাণ্ড করে বসলেন।
দ্বিতীয়বার ঘুরে আসার ফসল একটি শাড়ির বাক্স খুলে চওড়া লাল-পাড়ের একখানি দামী গরদ শাড়ি বার করে—ভাবী শাশুড়ির পদপ্রান্তে নামিয়ে রেখে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন তাঁকে। মৃদুস্বরে কী যেন বললেন।
হ্যাঁ, সিংহসাহেব।
তাঁর অধস্তন শরদিন্দুর স্ত্রীকে পায়ে হাত দিয়ে!
অথচ পৃথিবী স্থির হয়ে রইল।
সতেরো
‘অথচ পৃথিবী স্থির হয়ে রইল—’ বলল সোমা শঙ্খর কাছে বড় কাছাকাছি বসে।
‘তা, ভালোই তো—’ শঙ্খ বলে, ‘শাঁসাল জামাই হচ্ছে, কাকীমার এখন গৌরব কত! তাছাড়া—আবার পদপ্রান্তে প্রমাণ! এবং শুধু নির্জলা প্রণামও নয়, তার সঙ্গে চওড়া-পাড় গরদ শাড়ি!’
‘অমন কুটিল কুটিল কথা বলছ কেন বল তো?’ সোমা এতক্ষণকার রুদ্ধ হৃদয়-বেদনাকে মুক্তি দেয় ঝঙ্কারের গড়নে।
‘তা, আমাকে এখন কুটিল কুটিল মনে হওয়াই স্বাভাবিক।’
‘থাম, আমার পরিকল্পনাটা শোন।’ সোমা বলে, ‘সবটা বলতে দেবে আগে—’
শঙ্খ তেঁতো গলায় বলে, ‘আর এসব ফার্সে দরকারটা কী? পাকা-দেখাটাই যখন হয়ে গেছে?’
সোমা এবার রাগে আগুন হয়, ‘তবে আর কি, চিরকালের মতো সব শেষ হয়ে গেছে! এমন বোকার মতো কথা বলছ! পরিস্থিতিটি কেমন হয়েছিল শুনলে তো সব সে অবস্থায় উপায় ছিল কিছু? তাই বলে ওই অভিনয়টাকেই পরম সত্য বলে গণ্য করতে হবে? এ ছাড়া তখন বাবাকে বাঁচাবার আর পথ ছিল না তা বললাম না?’
.
তারপর সোমা তার পরিকল্পনা প্রকাশ করে।
বিচলিত শঙ্খ বলে, ‘এ ছাড়া আর কোনও উপায় খুঁজে পেলে না তুমি?’
‘কই আর?’
‘কী ভীষণ রিস্ক, তা ধারণা আছে তোমার?’
‘আরে বাবা, মহৎকর্ম মানেই রিস্ক। তবে তোমার ওই রকবাজ ছেলেগুলিকে দেখলে রিস্কই রিস্ক মেনে সরে পড়বে। একবার শুধু ব্যাপারটা ওদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া।’
শঙ্খ এবার যেন উৎসাহিত বোধ করে। বলে, তার জন্যে বেশি পরিশ্রম করতে হবে না। সে ঠিক হয়ে যাবে। শুধু ভাবনা, তুমি আবার না মিইয়ে যাও।’
‘দেখে নিও।’ বলে মাথাটা ঝাঁকায় সোমা।
তারপর ঈষৎ গাঢ় গলায় বলে, ‘না শঙ্খ, এতে দোষ দেখছি না আমি। এ-সব লোকের শিক্ষা হওয়া দরকার। ভেবে দেখ, যখন উঁচু পোস্টে থেকেছে, রাঘব বোয়ালের হাঁ নিয়ে ঘুষ খেয়েছে। আর সেই নোংরা টাকাগুলোর অহঙ্কারে ধরাকে সরা দেখেছে, মানুষকে মানুষ জ্ঞান করেনি। আর এখন? নখ-দন্তহীন সিংহ। এখনো সেই টাকার জোরে একটা ভদ্রঘরের মেয়েকে টাকা দিয়ে কিনতে এসেছে। ক্ষুধার্তর সামনে থালা-ভর্তি সুখাদ্যের প্রলোভন সাজিয়ে ধরে নিজের মতলব হাসিল করছে। অথচ—’ নড়ে-চড়ে বসে সোমা, ‘সবচেয়ে অসহ্য লাগছে কী জানো শঙ্খ, ওর ওই মহানুভবতার খোলস। লোকটার সঙ্গে কথা কয়ে দেখ, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারবে না ও অতবড় শয়তান। ধাঁধা লাগবে, কিন্তু যেই চোখের আড়ালে যাবে, বিতৃষ্ণায় মন ভরে উঠবে। মনে হবে লোকটা কি আমায় হিপনোটাইজ করে রেখেছিল, তাই ওর কথা সহ্য করেছি বসে বসে, প্রতিবাদ করে উঠিনি?’
শঙ্খ চুলগুলোকে মুঠোয় চাপতে চাপতে বলে, ‘তাই অপ্রতিবাদে বাক্দানের অনুষ্ঠানটি মেনে নিলে! তখন তোমার পাড়ার রকবাজ ছেলেদের কথা মনে পড়ল না? এখন তুমি হিসেবমতো অন্যের বাক্দত্তা, তা জানো?’
সোমা চোখ তুলে তাকায়। সোমার সেই চোখ দুটো ঝকঝক করে ওঠে।
সোমা স্থিরদৃষ্টিতে তাকায়। স্থির স্বরে বলে, ‘জানি বইকি! জ্ঞান হয়ে অবধি জানি আমি বাক্দত্তা। আর সেটা জানি বলেই তো বাড়তি আজে-বাজে কিছুকে কোনো মূল্য দেবার দরকার বোধ করছি না।’
শঙ্খ ওর হাতটায় একটু চাপ দেয়, তারপর আস্তে বলে, ‘লোকটার যদি বয়েসের ঘরে এতখানি শূন্যতা না থাকত, আমি আমার ক্লেমটা ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়াতাম।’
সোমা হাতটা ছাড়িয়ে নেয়।
আরক্ত মুখে বলে, ‘তোমার এই উদার মহৎ মনোভাবের জন্য ধন্যবাদ!’
‘রাগ করো না সোমা, মাঝে মাঝে যখন ভাবি স্বার্থপরের মত আমার এই দারিদ্র্যের সঙ্গে জুড়ে নিতে চাইছি তোমায়, তখন—’
সোমা আরো আরক্ত মুখে বলে, ‘তার মানে সবটাই তোমার দিকে, কেমন? দরকার বোধ কর, রাখতে পার। বদান্যতা করে দান করতেও পার। এই তো?’
‘সোমা, ক্ষমা কর। আমার ভুল হয়েছে।’
‘মনে রেখো কথাটা। যাতে ভবিষ্যতে আর পুনরাবৃত্তি না হয়।
অতএব স্থিরীকৃত হয়, সোমার পরিকল্পনাই কার্যকরী হবে।
চলুক যা চলছে।
এগোক বিয়ের আয়োজন।
খরচ তো সবই সেই নীচ-চরিত্র লোকটার?
হোক। পাপের কড়ি প্রায়শ্চিত্তে যাক।
ওর দেওয়া চেকটা ফেরত দিয়ে কাঁচা টাকা চেয়ে নিয়েছিলেন সোমার বাবা। বলেছিলেন, ‘আমার মতো লোক হঠাৎ এত টাকার একটা চেক ভাঙাতে গেলে সন্দেহ হবে স্যর! হয়তো ভাববে জাল! হয়তো বা টাকাটা আনবার সময় গুণ্ডা ধরবে—’
‘বাঃ তা কেন?’ সিংহসাহেব বলেছিলেন ওটা আপনি আপনার সেই উত্তমর্ণকে দিয়ে দেবেন। ‘বেয়ারার’ চেকও তো কাঁচা টাকারই সামিল।
‘তা হোক স্যর! কোথা থেকে এল, কে দিল, নানা প্রশ্ন থেকে যাবে। তার থেকে আপনি ভাঙিয়েই—’
অতএব কোথাও কোনো প্রমাণ নেই, সোমার বাবা মেয়ে বেচে টাকা নিয়েছে।
খবরটা দেয় সোমা। বলে—
‘এতএব বুঝতে পারছ—’ সোমা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে, ‘নালিশ ঠুকতে যাবার সুবিধেও রইল না ভদ্রলোকের। এখন বাড়িটার ব্যাপারে কিছুদিনের মতো নিশ্চিন্ত, তারপর দেখা যাক। তারপর… হি হি, বিয়ের রাত্রে… হি হি!’ সোমা যেন অস্বাভাবিক জোরে হাসতে থাকে।
নিজের বুদ্ধি-গৌরবে পুলকিত হচ্ছে সোমা।
পাড়ার ওই রকবাজ গুণ্ডা ছেলেগুলো, যাদের দিকে ঘৃণায় তাকায় না সোমা, এখন তাদেরই কাজে লাগাতে চাইছে সে। তবে প্রত্যক্ষে নয়, পরোক্ষে।
শঙ্খই বলবে তাদের।
কানে ঢুকিয়ে দেবে যে একটা পয়সাওলা বুড়ো একদা শরদিন্দুবাবুর ‘বস’ ছিল। সেই হুমকি দিয়ে শরদিন্দুবাবুর সুন্দরী যুবতী মেয়েটাকে বিয়ে করতে চায়। গরীব শরদিন্দু নিরুপায় হয়েই—
মেয়েটাই বা কী করবে?
অরাজি হলে হয়তো বাপটার বিপদ আসবে। মহাপাজি ছুঁদে ঘুষখোর সেই লোকটা রাগের মাথায় কী না কী করতে পারে। অতএব তারা, এই পাড়ারক্ষী বীর ছেলেরা, বিয়ের রাত্রে উচিত-শিক্ষা দিয়ে দিক বুড়োকে। ইহজীবনে যাতে আর বাছার বিয়ের বাসনা না হয়।
‘শিক্ষা ওর হওয়া দরকার শঙ্খ,’ সোমা বলে, ‘আজ বাবা লোভে অন্ধ হয়ে পূর্বকথা ভুলে গেছেন। কিন্তু আমি তো জানি, দিনের পর দিন কী অপমানের মধ্যে কেটেছে বাবার ওই দাম্ভিক লোকটার তাঁবে কাজ করতে! শুধু বাবাকে বলেই নয়, অধস্তন সবাইকেই ও মশা-মাছির মতো দেখত, একবার তার প্রায়শ্চিত্ত হোক।
ঠিক! ঠিক!
হোক শিক্ষা! হোক প্ৰায়শ্চিত্ত!
শুধু যেন খুন-জখমের দায়ে না পড়ে ছেলেগুলো।
আঠারো
ছেলেগুলোর উৎসাহ খুনজখম ঘেঁষাই ছিল। বলেছিল দলনেতা, ‘আপনি যদি বলেন শঙ্খদা, শালার মাথাটা স্রেফ দু-ফাঁক করে দিতে পারি।’
শঙ্খ অবশ্য এতে উৎসাহ বোধ করেনি।
বলেছিল, ‘আরে বাবা, না না, শুধু ঠ্যাংটা জখম করে দিলেই হবে। বাকি জীবনটা যাতে ন্যাংচায়।’
শুধু একটা ছেলে বলেছিল, ‘পুলিস-কেসের দায়ে পড়ব না তো দাদা!’
‘আরে দূর’, দলনেতা তুড়ি দিয়ে ওড়ায় তাকে, ‘নিজের কেচ্ছা নিজে পেপারে বার করে কখনো? কেস করলেই ‘পেপারে’ বেরোবে না? শুনলে ও তোর পুলিসেও জিভ ভ্যাঙাবে, বুঝলি? বুড়োর বিয়েয় কার ছেদ্দা আসে বল? পাবলিক্ আমাদের দিকে। আর পাবলিক পেছনে থাকা মানেই—’
মানেটা কী তা আর ভাষায় বোঝায় না ছোকরা, অঙ্গভঙ্গীতেই বুঝিয়ে ছাড়ে।
উনিশ
‘তুমি আমায় খুব খারাপ ভাবছ শঙ্খ?’ সোমা বলে, ‘হয়তো খুব খারাপ ডিসিশানই নিয়েছি আমি। কিন্তু এ ছাড়া তো আর কোনো উপায় দেখছি না। আমি যদি প্রত্যক্ষে বেঁকে বসি, বাবা যে চিরদিনের মতো আমার ওপর বিরূপ হয়ে যাবেন। আর মা-র কথাবার্তা যদি শোন তুমি!’ সোমা একটা নিশ্বাস ফেলে বলে, ‘বাঁচতে আর ইচ্ছে করে না। লোভ যে মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, আর টাকা যে কী করতে পারে!’
শঙ্খ আস্তে বলে, ‘ভাবছি, এরপর, এত কাণ্ড করেও আমি কি তোমায় পাব?’
সোমা দৃঢ়গলায় বলে, ‘পেতেই হবে শঙ্খ! নইলে আমরা কী করে বাঁচবো বল তো?’
.
কী করব, বাঁচার আর কোনও পথ তো দেখছি না আমি!
গভীর রাত্রে জানলায় এসে দাঁড়ায় সোমা, শঙ্খদের বাড়ির একদিকের দেয়ালটা চোখে পড়ে এখান থেকে, তবু চোখাচোখি হবার কোনো আশা নেই। ওই দেয়ালটায় এদিকে কোনো জানলা নেই।
ওদের জানলা নেই, তবু এই জানলায় এসে দাঁড়ায় সোমা। আর ওই বোবা দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলে, ‘কী করব, বাঁচার আর কোনো পথ তো দেখছি না আমি। আর এতে কোনো পাপও দেখছি না আমি। কেন পাপ হবে? আততায়ীর হাত থেকে আত্মরক্ষা করা মানুষের পাপ নয়। আমার ভাগ্যে আততায়ী শুধু বাইরের লোকটাই নয়, আমার নিজের মা-বাপ।’
অতএব ছলে কৌশলে যেভাবেই হোক নিজেকে বাঁচাতে হবে আমায়। তবে —
শঙ্খকে বলে দিতে হবে ছেলেগুলোকে যেন ভালো করে সাবধান করে দেয় ভয়ানক কিছু না করে বসে। শুধু ওকে একটু শিক্ষা দেওয়া। বিয়ের কথা হতে হতেই তত্ত্ব-তাবাসে বাড়ি ভরে দিচ্ছে পাজিটা। তার মানে চাঁদির জুতোয় জব্দ করে রাখতে চাইছে।
আর আমার মা-বাপ তাতেই বিগলিত হচ্ছেন। মাসিদের সঙ্গে সাতজন্মে যোগাযোগ ছিল না, এখন মা গাড়িভাড়া করে গিয়ে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, আর তাঁর মেয়ের সৌভাগ্যের গুণগান করে আসছেন।
সেদিন মীনামাসি এসেছিলেন। মায়ের মাসতুতো বোন, মা তাঁকে সব দেখাতে বসলেন। শাড়ি, গহনা, রুপোর বাসন, আরো কত কিছু, যা নাকি ‘পানপত্র’ বলে পাঠিয়েছে বুড়ো।
মীনামাসি দেখলেন, উচ্ছ্বসিত হলেন, যদিও মুখটা কালো হয়ে গেল তাঁর। তারপর জেরা করতে লাগলেন, পাত্রের বয়েস বেশী তো কত বেশী। মা-ও তেমনি ঘুঘু, ভাঙলেন না কিছুতেই। বললেন, ‘স্পষ্ট করে জিগ্যেস করিনি ভাই; তবে দেখলে তো গোটা চল্লিশের বেশী মনে হয় না (এটা অবশ্য মা বেশী বাড়ালেন)। যাক গে, দোজবরে তো নয়?
বিয়ের বাসরে ওঁরা সমালোচনার বান ডাকাবেন, ওঁদের কালো মুখটা কিঞ্চিৎ ফর্সা করে নেবেন। হেসে হেসে বললেন, ‘একে তুই চল্লিশ বছরের দেখেছিলি? তোর চোখের চালশে তো অনেক দিনের পুরোনো হয়ে গেছে রে?’ কিন্তু সে যাক, ও নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না আমি। আমি শুধু জানি শঙ্খকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
শঙ্খ, তুমি নিশ্চয় এখন নিশ্চিন্তে ঘুম দিচ্ছ। জানতেও পাচ্ছ না তোমার ওই শ্যাওলা-পড়া বোবা দেয়ালটার দিকে তাকিয়ে জেগে বসে আছি আমি।
.
শুনছি ওদের সব ঠিক করা আছে। সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
মোড়ের মাথায় বরের গাড়ি ঘেরাও করবে ওরা, গাড়ি থেকে টেনে নামাবে, বলবে, ‘ভালোয় ভালোয় বিয়ের বাসনায় জলাঞ্জলি দিয়ে ফিরে যাও যাদু, নচেৎ এইখানে শুইয়ে রাখব।’
বলেছে শঙ্খ আমায় এ-কথা।
প্রথমে ও এই ব্যবস্থায় উৎসাহ বোধ করছিল না, এখন করছে। ও বলেছে, হৈ-চৈ করে পায়ে ল্যাং মারবে ওকে ছোঁড়ারা, ল্যাং-টি অবশ্য একটু মোক্ষমই দেবে। তা সে সব কৌশল-কায়দা ওদের জানা আছে। তারপর হঠাৎ সেই রঙ্গমঞ্চে শঙ্খের আবির্ভাব ঘটবে। ইনোসেন্ট ভদ্র যুবকের ভঙ্গীতে বলবে সে, ‘ফিরে যান মশাই, উপায় নেই, এ সব সাংঘাতিক ছেলে! এরা পারে না এমন কাজ নেই। শুধু আপনাকেই নয়, মেয়ের বাপকেও নাকি শাসিয়ে রেখেছে এ বিয়ে দিতে চেষ্টা করলে একটি দাঁত আস্ত রাখবে না তাঁর। দেখুন, এর ওপর জোর করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে? এখন তো এদেরই রাজত্ব।’
কথাবার্তা সবই রেডি করা আছে।
একদিন নাকি রিহার্সালও দিয়েছে ছেলেগুলো।
টোপর ওর খুলিয়ে ছাড়বে।
এরপর আর ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না সিংহসাহেবের। কারণ মস্ত সুবিধে, বরযাত্রী আনবে না। বলে রেখেছে শুধু ওই বর পুরুত নাপিত আর সেই ভাগ্নেটা, ভাইপোটা।
ভেবেছে বোধহয় বুড়োবয়সের কেলেঙ্কারী—কে কোথা থেকে ভাংচি দেবে, অতএব চুপিসাড়ে কাজ সেরে একবার আইন-সঙ্গত অধিকারের মধ্যে পুরে ফেলি। তারপর বৌভাতে সমারোহ করবো।
বাবার ইচ্ছে ছিল রেজিস্ট্রী করে হোক বিয়েটা।
কারণ বাবা আর কোনো ঝামেলা চাইছেন না।
কিন্তু ও তাতে রাজি নয়। বলে কি না, ‘সেটা যেন কেমন কেমন লাগছে শরদিন্দুবাবু (এখনো বাবাকে বাবুই বলছে), বিয়ের যে একটা চিরাচরিত চেহারা ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি, সেটা না দেখতে পেলে, মনে হবে না বিয়েটা হল।’
তার মানে চেলি টোপর চন্দন গোড়েমালা সবকিছুর বাসনা। মা-ও ওর দলে। মা-রও নাকি সেই কড়ি দিয়ে কিনে দড়ি দিয়ে বেঁধে হাতে মাকু তুলে না দিতে পারলে মেয়ে-পারের সুখ হবে না।
কিন্তু কে কাকে কড়ি দিয়ে কিনছে?
ভাবতে পারছি না আমি যে আমাকে একজন স্রেফ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যেতে চাইছে।
ভাঙতেই হবে ওর স্পর্ধা! আমি ঠিক করেছি ভাঙবো।
আমি খড়ের গাদায় একটি দেশলাই কাঠি গুঁজে দিয়ে এসেছি। আর কিছু করতে হবে না আমাকে। আগুন তার ভূমিকা পালন করবে।
.
সোমার মা জল খেতে উঠলেন। বললেন, ‘সোমা, জেগে রয়েছিস?’
সোমা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল। চাপা তীব্রগলায় বলে উঠল, ‘কেন, তাতেও তোমাদের আপত্তি আছে? ক্ষতি হচ্ছে কিছু তোমাদের?
‘ও মা, শোন কথা!’ সোমার মা ভাবী বড়লোক জামাইয়ের ভাবী স্ত্রীকে তোয়াজের গলায় কথা বলেন, ‘রাত জেগে শরীর খারাপ হবে তাই বলছি।’
সোমা একটু হাসে এবার, ‘রাত কখনো জাগিনি এর আগে, তাই না মা?’
সোমার মা বোঝেন শরদিন্দুর অসুখের সময়ের কথা উল্লেখ করছে সোমা। নিজে তিনি ও-কাজটায় একান্ত অক্ষম, সোমাই রাতের পর রাত জেগেছে।
সোমার মা অপ্রতিভ গলায় বলেন, ‘তা কি বলছি? ওঁর অসুখের সময় কত রাতই তো—আজ বাদে কাল বিয়ে, তাই বলা।’
চলে যান।
ও-ঘরে গিয়ে স্বামীকে ঘুম ভাঙিয়ে কাহিনিটি বিবৃত করেন, তারপর মন্তব্য করেন, ‘সিংহীসাহেবের গিন্নী হয়ে কী যে হয়ে উঠবেন মেয়ে তা অনুমানেই বুঝেছি, এখনই তো হাতে মাথা কাটছেন। এখন তো আশা করছি আমাদের দুঃখু ঘুচবে, কে জানে এরপর আমাদের মুখই দেখবে কি না!’
তারপর বলেন, ‘আরো হয়েছে ওই শঙ্খ।’
শঙ্খর ব্যাপারেই যে মেয়ের মেজাজ সর্বদা খাপ্পা এ ওঁরা অনুমান করছেন, ছোটছেলেটাকে আড়ালে ডেকে ডেকে তল্লাস নিচ্ছেন, ‘দিদি শঙ্খদার সঙ্গে দেখা করছে নাকি? যাচ্ছে ওদের বাড়ি?’
তথাপি নিজেরা উচ্চারণ করছেন না শঙ্খর নাম। যেন এ সম্ভাবনা যে ছিল, তাঁরা জানেনই না।
যেন ওদের ভালোবাসাটা যে ভাইবোনের মতো ছাড়া আর কিছু এ ওঁদের ধারণাতেই নেই। তাই সেদিন আর একটা মানুষের উল্লেখে—আকাশ থেকে পড়েছিলেন। ভাগ্যি সে নামটা উল্লেখ করেনি সোমা।
শঙ্খর মা একদিন এসেছিলেন। কী জানি কী উদ্দেশ্যে। কোনও কথা পাড়তে দেননি সোমার মা।
আগেভাগেই ভাবী জামাইয়ের রূপ-গুণ, বিবেচনা, পয়সা, সব কিছুর বর্ণনায় মূক করে দিয়েছিলেন তাঁকে।
তিনি শুধু শেষপর্যন্ত একটি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তা, তোমার সোমার এতে মত আছে তো?’
সোমার মা মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘তা আছে। এখনকার মেয়েরা বাপু চালাক। তারা বোঝে বাড়ি গাড়ি টাকাকড়ি এই সবই সংসারের সার বস্তু।’
আর কী বলবেন শঙ্খর মা?
পরে বলেছিল সোমা, ‘এখনকার মেয়েদের তো বেশ চিনে ফেলেছ মা!’
সোমার মা এটা-ওটা বলে চাপা দিয়েছিলেন কথাটা। সবকিছুই চাপা দিয়ে দিয়েই চালাচ্ছেন। দু-হাত একবার এক হলে হয় বাবা!
