সমুদ্র কন্যা – ২০
কুড়ি
আর একদিন এলেন সিংহসাহেব।
বিয়ের আর দিন-তিনেক বাকি।
বিনীত অনুরোধ জানালেন, বিয়ে-বাবদ আসল ভালো শাড়িগুলোই কেনা বাকি। ইচ্ছে যে, যে পরবে সে নিজে পছন্দ করে নেবে। অবশ্য একা নিয়ে যাবার মতো অসভ্য প্রস্তাব তিনি করছেন না, সোমার মা-ও চলুন।
সোমার অনুমতি চাইলেন তিনি।
সোমা এই বিনীত অনুরোধের সামনে রূঢ় হবে কী করে?
অথচ সোমা বেশ টের পাচ্ছে এ আর একটা প্যাঁচ। গাড়িতে নিয়ে ঘোরানো মানেই মেয়েটিকে চিহ্নিত করে রাখা।
তবু ভদ্রভাবেই জানায়, দরকার কী? সিংহসাহেবের তো পছন্দটা নিন্দের নয়।
সিংহসাহেব মৃদু হাসেন।
মুখের সেই দাম্ভিকতার খোলসটা যেন খসে গেছে। শুধু আশা আর আনন্দের একটি আভা সেখানে জ্বলজ্বল করছে। সেই জ্বলজ্বলে মুখে বলেন সাহেব, ‘পছন্দটা নিন্দের নয়, সে বিষয়ে আমিও তোমার সঙ্গে একমত।’
কথাটার নিগূঢ় অর্থে সোমার কানটা লাল হয়ে ওঠে, তবু সোমা না-বোঝার ভান করে বলে, ‘তবে আর কি, ও আপনি নিজেই যা পারবেন করবেন।’ সোমা আরো শান্ত গলায় বলে, ‘তাছাড়া জানেনই তো গরীবের মেয়ে, দামী দামী জিনিস কখনো চোখেও দেখিনি, কাজেই দোকানে গিয়ে দিশেহারা হয়ে যাব বৈ তো নয়!’
‘তার মানে অ্যাভয়েড করছ।’ সিংহসাহেব সহসা ব্যাকুল হয়ে ওঠেন, সহসা প্রায় হরিণ-শাবকের ভঙ্গিতে বলেন, ‘কিন্তু তোমার মা তো থাকবেন সঙ্গে। ভয় করবার কী আছে? আমাকে কি তোমার একটা জানোয়ার বলে মনে হয়?
সোমা লাল হয়। সোমা বলে, ‘কী আশ্চর্য, এ আপনি কী বলছেন? তবে চলুন।’
.
সোমার মা মেয়ের সুমতি দেখে যাত্রাকালে মা কালীর ছবিতে নমস্কার রেখে যান।
সোমারা সরু রাস্তাটুকু পার হয়ে দ্রুতপায়ে গিয়ে গাড়িতে ওঠে।
হঠাৎ পাশের রোয়াকের জটলা থেকে একটা সিটি ওঠে, একটা গলা বলে ওঠে, ‘এটা কী হচ্ছে দিদিমণি?’
সোমা ঘাড় নিচু করে গাড়িতে ওঠে।
সোমার ভয় হচ্ছিল এক্ষুনি বুঝি ওই জটলাটা এসে গাড়ি ঘেরাও করে দাঁড়াবে। সিটি দেবে, অশালীন কথা বলবে, হয়তো আরোহীদের টেনে নামাবে। রাস্তায় ভিড় জমে যাবে।
সোমা সেই ভয়াবহ অবস্থাটা কল্পনা করে। সোমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। তবু সোমা ওদের সঙ্গে ইশারায় একটা ষড়যন্ত্রের আভাসের ভঙ্গী করে।
ওরা হয়তো সেটা বুঝতে পারে। তাই হাসতে থাকে ফ্যাকফ্যাক করে।
পাড়ার এলাকা ছাড়িয়ে সাহস ফেরে সোমার।
তবে শাড়ি জামা পছন্দটা প্রকৃতপক্ষে সোমার মা-ই করেন। সোমা শুধু মাঝে দু-একবার
বলেছে, ‘এত পয়সা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।…এই একটা শাড়ির দামে আমাদের
মত গৃহস্থের দু-মাস স্বচ্ছন্দে সংসার চলে যায়।’
মা-র অন্তর-টিপুনিতেও থামেনি।
সিংহসাহেব এতে বিচলিত হননি। শুধু গলা খাটো করে বলছেন, ‘দেখ, সারাজীবন শুধু ভূতের মতো খেটেইছি, কখনো এসব করবার সুযোগ পাইনি। সুযোগ পেয়েছি, করতে দাও না। ভবিষ্যতে বিউটি অ্যান্ড বীস্টের প্রতীক হয়ে বেড়াতে বেরোনো যাবে।’ সোমা ওই বয়স্ক লোকটার আবেগ-বিহ্বল মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছে, আর প্রতিবাদ করেনি।
শাড়ির দোকান থেকে জুয়েলারের দোকানে ফোন করেন সিংহসাহেব, ‘ওগুলো কালকের মধ্যেই পাচ্ছি তো? হ্যাঁ নিশ্চয়।… ও আচ্ছা…তাহলে এক কাজ করবেন, কাল সন্ধের দিকে ফোন করবেন একটা। আমি নিজেই ডেলিভারী নিয়ে নেব। ফোন-নাম্বারটা মনে আছে তো? আচ্ছা তবু আর একবার লিখেই নিন। নিয়েছেন কাগজ-পেন্সিল? লিখুন—’
পর পর ছ’টা সংখ্যা বলে যান সাহেব থেমে থেমে।
একুশ
ওরা যখন পায়ে ‘ল্যাং মেরে স্রেফ ল্যাংড়া বানিয়ে’ দেবার পরিকল্পনায় মসগুল হয়ে শীস্ দিচ্ছিল, সিংহসাহেব তখন সেই পায়ের জোরে টগাবগ করতে করতে দুটো সিঁড়ি টপকে টপকে দোতলায় উঠছিলেন।
মনের সঙ্গে শরীরটাও বুঝি অর্ধেক হালকা হয়ে গেছে।
ঘরে ঢুকে আরশির সামনে দাঁড়ালেন, একটি সুন্দরী তরুণীর চোখ দিয়ে নিজেকে দেখতে চেষ্টা করলেন।
এমন কী ত্রুটি খুঁজে পাবে সে এই স্বাস্থ্যদীপ্ত দীর্ঘ দেহটার মধ্যে? প্রৌঢ়ত্বের ছাপ পড়েছে কোথাও? আর যৌবন কি শুধুই বয়সে?
ওই যে সিংহসাহেবের দূর-সম্পর্কের জ্ঞাতি ভাগ্নেটা, যাকে বলতে গেলে বাজার সরকার হিসেবেই বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন সিংহসাহেব, তার বয়েস নাকি আটাশ! তার মানে সিংহসাহেবের বয়সের অর্ধেক।
মশলাহীন সেদ্ধ ঝোল খেয়ে কাটায় সে
তেল মশলা খেলেই নাকি আমাশা হয় তার। আর একখানার বেশী দু’খানা মাছ খেলে চোয়া ঢেঁকুর ওঠে। এই ঐশ্বর্যের ঘরে আশ্রয় পেয়েও ভোগের সুখ নেই।
শুধু ও কথাই বা কেন, আজকালকার কোনো ইয়ংম্যানটারই বা ওর চেয়ে ভালো অবস্থা? সময় মেপে খায়, থেমে থেমে হাঁটে, গুরুপাক খাদ্য দেখলে শিউরে ওঠে, আর ডাক্তারকে আর জ্যোতিষীকে শিয়রে নিয়ে বসে থাকে।
ভগবান মানেন না বাবুরা, কিন্তু ভূত মানেন।
মানেন গ্রহদের ষড়যন্ত্র আর তার দরুণ দুর্বিপাক। তাই সেকেলে মাদুলী কবচকে ত্যাগ করে একেলে ‘স্টোন’ পরে একগাদা।
সিংহসাহেব কি ওই ক্ষীণ-বক্ষ শীর্ণ-মুখ, ডিপেপটিক্ যুবকদের থেকেও বৃদ্ধ?
আর একবার মদগর্বভরে নিজেকে দেখেন সিংহসাহেব।
অনেক আধুনিক যুবকদের থেকে অনেক বেশী যুবক সিংহসাহেব।
পুরোনো চাকর এল।
বললো, ‘বাবু দর্জি এটা দিয়ে গেছে।’ সিল্কের পাঞ্জাবী আনলো একটা।
হ্যাঁ, বরসজ্জার জন্যে এই সেরা দামী গরদের পাঞ্জাবীটি করতে দিয়েছিলেন সিংহসাহেব।
কিন্তু—
সিংহসাহেব হাসলেন, মনে মনে বললেন, তা’ বললে কী হবে, বিয়ে করতে তো— আমি বুশসার্ট আর প্যান্ট পরে যাব না?
হ্যাঁ, ওইটাই পরে থাকেন সাহেব। অবশ্য পার্টি ফার্টি বাদে।
সে সব জায়গায় ফুল স্যুট পরতেই হয়
যখন যা উপলক্ষ, তখন তার উপযুক্ত।
কিন্তু বাকি সময় ওই—টেরিলিন প্যান্ট, ডেক্ৰন শার্ট।
ধুতি পাঞ্জাবী কদাচ না।
আত্মীয়জনের বাড়িতে কাজে কর্মে নেমন্তন্নেও না।
আগে আগে পরতেন ‘ধুতি পাঞ্জাবী।
সামাজিক কাজে সামাজিক সাজ নিয়ে গিয়ে উদয় হতেন!
কিন্তু বয়েস একটু বাড়ায় আর চেহারাটা একটু ঢিলে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টের পেলেন সিংহসাহেব, ধুতি পাঞ্জাবী পরলেই কেমন যেন বুড়ো বুড়ো লাগে।
কোনোমতেই অভ্যস্ত স্মার্ট ভাবটা ফোটানো যায় না। পেটটা বড় লাগে, কাঁধটার কাছে যেন একটা অসহায়তার ছাপ!
অথচ ওই প্যান্ট-শার্টে?
টগবগে চকচকে!
যেন একটা তেজী ঘোড়া!
যেন একটা নতুন মডেলের মোটর গাড়ি!
আজও তা দেখায়।
অতএব তদবধি ধুতি পাঞ্জাবী বাতিল। যাতে যাতে বয়েস বেশী দেখায় সেগুলো সর্বদা পরিত্যজ্য।
কিন্তু—
সিংহসাহেব হাসলেন একটু, বিয়ে বলে কথা!
বিয়েতে তো ঠিক বরের মতোই সাজতে হবে।
গরদের পাঞ্জাবী, চেলির ধুতি—তাতে জরিপাড়, আর মাথায় টোপর, হাতে জাঁতি।
অতএব এই পাঞ্জাবীটা যেমনই হোক, আর প’রে যেমনই দেখাক, পরতেই হবে।
এখনি একবার পরব! দেখব কেমন দেখায়! ভাবলেন সিংহসাহেব।
তারপরেই ভাবলেন, না না সেটা অন্যায় হবে।
একেবারে শুভলগ্নেই নতুন পরবেন।
এখন শুধু আর্শির সামনে দাঁড়িয়ে একবার গায়ে ধরে দেখা! তার বেশী নয়।
দেখলেন।
পছন্দই হচ্ছে না।
তবু কী আর করা যাবে।
বিয়ের সময় কি অতটা তাকিয়ে দেখবে কনে?
কনে!
কনে!
কী চমৎকার শব্দটি!
পাঞ্জাবীটা নামিয়ে রেখে একবার চারিদিকে তাকিয়ে দেখেন সিংহসাহেব।
কনের উপযুক্ত সাজানো আছে তো সব?
নতুন কেনা জোড়া খাটের দিকে তাকালেন, ড্রেসিং আয়নাটার দিকে তাকালেন।
কল্পনা করতে লাগলেন। ওই আর্শির সামনে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চুল বাঁধছে সে।
কী রোমাঞ্চময় হবে সেই দৃশ্য!
.
বিয়েটা পাকা করে ফেলে আসার পর থেকে ভাবী বধূর সুখ সুবিধে আরামের জন্যে আয়োজনের অবধি নেই, তবু চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন কোথায় কী ত্রুটি রয়ে গেল!
মাঝে মাঝে অবশ্য সোমাদের সেই দেয়ালে চটা ওঠা গলির মধ্যেকার বাড়িটা আর তার সাজসজ্জার কথা মনে পড়ে মুখে একটু সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠছে, যেটাকে করুণারই বলা চলে।
সেটা মাঝে মাঝেই। তারপরই সেই ভাঙা বাড়ির ছায়াকে আড়াল করে এসে দাঁড়াচ্ছে—একটি অলৌকিক লাবণ্যে মণ্ডিত পূর্ণ যৌবনের মহিমা
গাড়িতে যখন উঠে এসে বসলো, যখন তাকে তার জীর্ণ পরিবেশ থেকে মুক্ত মূর্তিতে দেখতে পেলেন সিংহসাহেব, যেন দিশেহারা হয়ে গেলেন। এই লাবণ্যের প্রতিমা আর দু’দিন পরে হবে সিংহসাহেবের নিজস্ব। তাকে নিয়ে এসে এই প্রাসাদে স্থাপন করবেন।
লাল ভেলভেটের চটি পরা দু’খানি সোনালি পা সিংহসাহেবের এই কার্পেট পাতা মেজেয় বিচরণ করে বেড়াবে।
আজ ‘রসভঙ্গ’ স্বরূপ ওই প্রৌঢ়া মহিলাটি গাড়িতে বসেছিলেন, এরপর থাকবেন না। সিংহসাহেব আর সেই লাবণ্য মূর্তির—মাঝখানে কোনো ব্যবধানের প্রাচীর থাকবে না।
ওই যে আধহাত পুরু ডানলোপিলোর গদি মোড়া রাজশয্যা, ওখানে বিছিয়ে থাকবে একখণ্ড সুষমা।
সিংহসাহেবের আবেগ আর কল্পনার রঙে রঞ্জিত হয়ে সোমা যেন অপরূপ হয়ে ওঠে। নইলে এ যাবৎ ওর সম্বন্ধে এত কে ভেবেছে!
ছেলেবেলা থেকে ‘সুন্দরী’ আখ্যাটা পেয়েছে বটে, তবে এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কে দেখেছে? কে ভেবছে? কে তার প্রতিটি অঙ্গের আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা করেছে।
বড়জোর শঙ্খর মা কি দিদি বলেছেন, ‘এত কাজ করিস, তবু তোর আঙুলগুলো কী চমৎকার বাবা! যেন চাঁপার কলি!’
বড়জোর ক্লাসের মেয়েরা বলেছে, তুই যে এখনো রাস্তায় ঘাটে চরে বেড়াচ্ছিস কী করে তাই ভাবি। কোনকালে লুঠ হয়ে যাবার কথা।’
আর ইদানীং যখন দুপুরে দুপুরে ঘুরে সাবান কোম্পানির ক্যানভাসিং করতে গেছে, মহিলারা ওকে ভাগিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেবার পর বলাবলি করেছেন, ‘তোমার আবার সাবান বেচে বেড়াবার কী দরকার বাবা? এত রূপে একটা কেষ্ট বিষ্টু বর বাগাতে পারছ না?’
আর শঙ্খ? সে হয়তো আবাল্যের নিত্য সাহচর্যে ভুলেই গেছে সোমা নামের ওই অরূপের মূর্তিটার রূপ আছে।
অতএব সোমার রূপ এতদিন গেরস্থর উঠোনের গাছের গোলাপের মতো অবহেলিতই ছিল। সিংহসাহেব তাঁর বুভুক্ষু চোখ আর অসময়ের আবেগের মন নিয়ে সে-রূপকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন।
তাই সিংহসাহেব আর আগের মতো বাড়ি ফিরে আরামে গা ডুবিযে পড়ে থাকতে পারছেন না, ছটফট করছেন, ওঠাবসা করছেন, এটা নাড়ছেন ওটা নাড়ছেন।
আর মাঝে মাঝেই পুলক রোমাঞ্চে বিহ্বল হচ্ছেন।
তরুণী মেয়ের সঙ্গ কি সিংহসাহেবের জীবনে এতই দুর্লভ ছিল?
তা-তো নয়।
তবু এই বিহ্বলতা।
তেমন একটি মেয়েকে বৈধভাবে নিজের ঘরে প্রতিষ্ঠিত করতে পারার কল্পনায় যে এত সুখ, সম্পূর্ণ অধিকারের দাবিতে আয়ত্তে পাওয়ার ভাবনায় যে এত শান্তি, কে জানতো এ কথা?
এই মেয়ে শুধু তাঁর লীলাসঙ্গিনীই হবে না, জীবনসঙ্গিনীও হবে।
একে তিনি কোনোদিন বলতে পারবেন, চাকর-বাকরের হাতে আর হোটেলে খেয়ে খেয়ে জীবন গেল, একদিন তোমার হাতে খাবো কিন্তু। আচ্ছা তুমি পোস্ত চচ্চড়ি রাঁধতে জানো না? ছেলেবেলার মার হাতে খেতাম। কী ফার্স্টক্লাস যে লাগতো!’
কোনোদিন হয়তো একথাও বলা যাবে, ‘তোমাদের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো হয় না? জানো না কী ভাবে করতে হয়? মা লক্ষ্মীপুজো করতেন, ধূপের গন্ধ ফুলের গন্ধ এই সব মিলিয়ে বেশ লাগতো বাড়িটা। এমনিতে তো ফুলও আসে রাশি রাশি, ধূপও জ্বালা হয় গোছা গোছা, কিন্তু সেই গন্ধটা পাই না। করতে পারোনা তুমি? কী কী লাগে ওতে?’
হ্যাঁ, এসব ইচ্ছের আভাস আসছে মনের মধ্যে।
ছেলেবেলাটা স্মরণে আসা, ছেলেবেলার কথা কারো কাছে বলার ইচ্ছেটা যে বার্ধক্যের লক্ষণ, সেটা টের পান না সিংহসাহেব। শুধু মনটা ভূষিত হয়ে ওঠে কাউকে সে কথার শ্রোতা পাবার জন্যে।
ওই মেয়েটি হতে পারবে সে শ্রোতা।
ও গেরস্থ ঘরের মেয়ে।
যেমন ঘরের ছেলে ছিলেন সিংহসাহেব নিজে। আজকের এই প্রাচুর্যের বৃহৎ চাপের নীচেও সেই ছেলেটা কোথাও যেন টিকে আছে।
কর্মজীবনের বহু দুর্নীতি আর বহু অনাচারের আড়ালেও যার স্মৃতির ঘরে মায়ের লক্ষ্মীপুজোর ধূপের গন্ধটি আজো অম্লান আছে।
স্ত্রীর মধ্যে মায়ের ভাব-রূপটিকে খুঁজে পেতে চায় পুরুষ মাত্রেই, সিংহসাহেবও তার ব্যতিক্রম নন।
চাকর এসে বলল, ‘খেতে দেওয়া হবে?’
সিংহসাহেব তাকালেন ওর দিকে।
আয়োজন চলছে বহুবিধ, বিস্মিত কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে চাকর-বাকররা, কী জানি নিজেরা কী বুঝছে, কী বলাবলি করছে, কিন্তু সিংহসাহেব স্পষ্ট করে বলেননি ওদের কাছে।
হয়তো নিজের কাছেই জিনিসটা অস্পষ্ট ছিল সিংহসাহেবের তাই।
হয়তো আশাটা আশঙ্কার ঝঙ্কারে স্পন্দিত হচ্ছিল বলেই।
.
আজ একসঙ্গে অনেকক্ষণ এক গাড়িতে চড়ে, দোকানে দোকানে ঘুরে, নিতান্ত সন্নিকটে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় কথা কয়ে যেন আশঙ্কাটা ঝাপসা হয়ে গেছে, আশা পায়ের নীচে মাটি পেয়েছে।
তাই ভাবলেন এদের বলা দরকার।
ভাবলেন আত্মীয় মহিলাদের মধ্যে কাকে আগে থেকে এনে রাখা যায়?
চাকরটার দিকে তাই তাকালেন উৎফুল্ল কৌতুকের চোখে।
বললেন, ‘দে! আর দু-চারদিন দে। এরপর তোর দায়িত্ব কমবে।
দায়িত্ব কমবে!
এ আবার কী কথা!
ও থতমত খেয়ে বলে, ‘আজ্ঞে কী বলছেন?’
‘বলছি—আর আমার খাওয়া নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না তোকে। বাড়িতে গিন্নী আসছেন!’
হ্যাঁ, এই রকম বেখাপ্পা কথাটাই বলে ফেলেন সিংহসাহেব।
বলেন না ‘মেমসাহেব আসছেন।’
‘তোমাদের মা আসছেন’ বলতেও বাধল। তাই ওই গ্রাম্য শব্দটাই ব্যবহার করে বসেন।
.
পুরোনো চাকর, তবে মাইডিয়ার নয়, মানে তেমন হবার সাহস তাকে কখনো দেননি সিংহসাহেব, তাই সে শুধু মাথাটা একটু নিচু করে বললো, ‘কবে?’
‘এই তো সামনের বারো তারিখে। বিয়ে বাড়িতে খাটিস ভালো করে, বখশীস পাবি বলে সহসা এই প্রথম একটু মাইডিয়ার হাসি হাসলেন সিংহসাহেব। আর তারপরই তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘কই, দে খেতে?’
হয়তো লজ্জা ঢাকতেই এই ব্যস্ততা!
ওরা যে ওঁর সেই ভাগ্নের সদ্বিবেচনার ফলে প্রথম দিনেই খবরটা পেয়ে অবহিত আছে তা খেয়াল করলেন না।
ব্যস্ততা দিয়ে লজ্জা ঢাকলেন।
চাকরটা চলে গেলে উঠলেন।
আর একবার আর্শির সামনে দৃপ্ত ভঙ্গীতে দাঁড়ালেন। তারপর কল্পনা করতে চেষ্টা করলেন ধুতি পাঞ্জাবী টোপর আর ফুলের মালা পরে কেমন দেখাবে। জানতে পারলেন না সেই মালা ছিঁড়ে ধুলোয় লুটোবার ষড়যন্ত্র চলছে ঠিক এই মুহূর্তেই।
বাইশ
সোমাকে, সোমার মাকে ওদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছেন সিংহসাহেব।
ঈশ্বর রক্ষা করেছেন যে ফেরার সময় সেই ছেলেগুলোর সঙ্গে চোখাচোখি হতে হয়নি। দিনের মধ্যে খানিকটা সময় জায়গাটা ফাঁকা রাখে ওরা, নেহাতই নাওয়া-খাওয়ার দরকারে।
সোমা শান্তির নিশ্বাস ফেলে। অথচ সোমার মনের মধ্যে একটা অশান্তির ঝড় বয়। সোমার চোখের সামনে সিনেমার ছবির মতো অনেক দৃশ্য ছুটোছুটি করে। সোমা একটা উচ্ছৃঙ্খল জটলার ভয়ঙ্কর অসভ্য চিৎকার শুনতে পায়। সোমা একটা ভাঙা-চোরা তোবড়ানো গাড়ি দেখতে পায়, সোমা একটা থ্যাৎলানো মানুষের খানিকটা খানিকটা দেখতে পায়, তার সঙ্গে সোমা একখানা জ্বলজ্বলে মুখ দেখতে পায়, আশা আনন্দ আর বিশ্বাসের আভায় জ্বলজ্বলে।
মুখটায় বয়সের ছাপ
কিন্তু সোমা নামের মেয়েটার গায়ে ওটা কিসের ছাপ? ক্লেদাক্ত কালচে। রাত্রিভোর ওই ছাপটা তাড়া করে ফেরে সোমাকে
সোমার মাথার মধ্যে, মস্তিষ্কের সমস্ত কোষে কোষে ছ’টা সংখ্যা হাতুড়ি পিটতে থাকে…থ্রি ফোর জিরো সেভেন…থ্রি ফোর জিরো সেভেন…আরো যেন কী? হ্যাঁ, মনে পড়েছে। কানের পর্দা মনে পড়িয়ে দিয়েছে। পরপর দুটো একই সংখ্যা।
ওই সংখ্যাগুলো এত সশব্দ হচ্ছে কী করে?
সারাক্ষণ হাতুড়ি পিটিয়ে পিটিয়ে ঘোষণা করছে কেন নিজেকে?
কী বলছে ওরা সোমাকে?
সকালবেলা সোমা মা-র কাছে গিয়ে কি যেন বলতে গিয়ে ফিরে আসে, দুপুরবেলা সোমা একটা বইয়ের পাতার ওপর মন বসাবার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মা-র ঘরে এসে দাঁড়ায়, আবার ফিরে যায়।
অসম্ভব চাঞ্চল্য নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ছাতে—ঘরে। অবশেষে সোমা বিকেলবেলা মা-র কাছে এসে বলে, ‘মা, একবার বাসন্তীদের বাড়ি যাচ্ছি।’
বাসন্তীদের বাড়ি।
সোমার মা প্রসন্ন হন।
বাসন্তীরা বড়লোক, ওদের বাড়ি যাওয়া চলে এখন।
আগে সোমার মা বলতেন, ‘ওদের বাড়ি আবার যাওয়া কেন বাপু? ওরা বড়লোক!’
আজ সোমার মা প্রসন্ন সম্মতি দেন। ভাবেন, ভয়ানক চাঞ্চল্য দেখছি, যাক বন্ধুর সঙ্গে দুটো গল্প-গাছা করে আসুক। মন স্থির হবে।
সোমা বেরিয়ে আসে।
রকের ছেলেগুলো হৈ-চৈ করে ওঠে। সিটি মারে, কে একটা বলে ওঠে, ‘নিশ্চিন্দি থাকুন দিদি!’
সোমা দ্রুতপায়ে পার হয়ে যায় রাস্তাটা।
বাসন্তীদের বাড়িতে গিয়ে দেখল বাসন্তী নেই। সোমা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
বাসন্তীর মা বলেন, ‘বোস একটু, আসবে এখুনি।’
সোমা বলে, ‘বসছি। তারপর বলে ওঠে, ‘মাসীমা, একটা ফোন করতাম।’
ডায়াল করতে থাকে সোমা, মস্তিষ্কের কোষে কোষে একটা সিটির শব্দ ওঠে। সোমা ঘামে-ভিজে হাতে রিসিভারটা চেপে ধরে।
তারপর ছাড়া ছাড়া থামা থামা কাঁপা গলা শোনা যায় সোমার, ‘জানেনই তো আজকালকার এইসব ছেলেদের কাণ্ড! শুনেছে আর কি। ….তাই ভাবছি যদি অন্য কোথা…মানে আর কি যদি আগের দিন বাবা-মা আমি…না, ধন্যবাদের কী আছে? একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটে, এ আর কার ইচ্ছে হয় বলুন?…
.
তারপর সোনা বাসন্তীর টেবিল থেকেই একটা কলম কাগজ টেনে নেয়। লেখে—
‘শঙ্খ, দেখছি বিশ্বাসভঙ্গ কাজটা যত সোজা ভেবেছিলাম, তত সোজা নয়। সহজ নয় ‘মানুষ’ শব্দটার গণ্ডির বাইরে চলে যাওয়া।…তাই নিজের পাতা জাল নিজেই কেটে দিচ্ছি। তবে যদি তোমার সম্পর্কে বিশ্বাসভঙ্গের প্রশ্ন তোল? তা, সে তো তুমি আগেই বদান্যতার খাতায় সই করে রেখেছ। আর এখন ভাবছি একটা ক্লেদাক্ত অনুভূতির উপরে প্রতিষ্ঠিত জীবনে কি সুখী হতে পারতাম আমরা? ধরেই নাও অতএব সোমা বলে কোনো মেয়েকে দেখনি কোনোদিন।
ইতি
সোমা’
***
