সমুদ্র কন্যা – ৫
পাঁচ
সিংহসাহেব এই বিহ্বল দৃষ্টির প্রতি একটি করুণার কটাক্ষ নিক্ষেপ করে বলেন, ‘না, সে প্রশ্ন থাকছে না। দ্বিতীয় পর্যায়টা অবশ্য পাত্রীর চেহারা, তা সে নিয়েও আমি এখন ব্যস্ত হচ্ছি না। মনে হচ্ছে, আপনার ছেলের বিয়ের প্রীতিভোজের দিন মেয়েটিকে আমি দেখেছিলাম।
শরদিন্দু সহসা যেন সংবিৎ ফিরে পান।
ব্যস্ত হয়ে বলেন, ‘কী, সেকী, বিলক্ষণ, মানে পাশের বাড়িতেই আছে বোধহয়, ডেকে পাঠাচ্ছি—’
বলেন অবশ্য কাঁপা-কাপা বুকেই, কারণ অফিস থেকেই ফেরেনি এখনো সোমা, আর ফেরার সময় হয়ে এসেছে। যাকগে—এসে পড়ে, ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে, তাড়াতাড়ি দুটো কথার মারপ্যাচেই হয়ে যাবে, নচেৎ ডাকতে পাঠানোর একটা ‘শো’ করে কিছুটা সময় নেওয়া যাবে।
কিন্তু সিংহসাহেব তার বুকে বল দিলেন।
বললেন, ‘থাক থাক, হবে’খন। মেয়ে তো রইল আপনার। আগে মতটা নিন। বিয়ে ব্যাপারটা তো একটা চাপিয়ে দেওয়ার ব্যাপার নয়।
চারটি সন্দেশের থেকে আধখানা, ও এক পেয়ালা চায়ের দু-চুমুক খেয়ে সিংহসাহেব বিদায় নিলেন, এবং ঠিক বাবার মুখে, বিয়ে কি টাকা এসব কোনো কথা না তুলে খুব আন্তরিক গলায় বলে গেলেন, তাড়াতাড়ি সেরে উঠুন শরদিন্দুবাবু! এ কী! কী বয়েস আপনার যে, এখুনি এমন বুড়িয়ে যাচ্ছেন? আমায় দেখুন।
গাড়িতে গর্জন তুলে চলে যান।
তত্রাচ দেখতেই থাকেন শরদিন্দু-দম্পতি।…গাড়ির ধুলো নিশ্চিহ্ন হওয়ার অনেক পর পর্যন্ত দেখতে থাকেন।
বিহ্বলতা কাটলে শরদিন্দু-গৃহিণী সুপ্রভা বলে ওঠেন, ‘হ্যাঁ গো, এ যে দেবতুল্য লোক! কী অমায়িক, কী ভদ্র! তবে যে তুমি বলতে, অহঙ্কারী উন্নাসিক, মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না—’
শরদিন্দুও অবশ্য বিস্ময়াভিভূত, তবু সামলে নিয়ে একটু উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে বলেন, ‘যে করত না, সে হচ্ছে ‘চেয়ার’, বুঝলে? “চেয়ারে”র অহঙ্কার বড় সর্বনেশে জিনিস, মানুষকে মানুষ রাখে না, কিম্ভূত করে তোলে।
আরো কিছুক্ষণ চলল আলোচনা, আর তারপর হঠাৎই দুজনে দুজনের মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন—কিন্তু টাকার কথাটা শেষ পর্যন্ত কী হল?
তাই তো!
শেষ পর্যন্ত এই কথাই তো হল মনে হচ্ছে, টাকা সিংহসাহেব দেবেনই, একদার অধস্তনের এই বিপদ-বার্তায় বিগলিত হয়েই দেবেন। এবং সেটা কোনো শর্তের অন্তর্ভুক্ত নয়। কিন্তু কীভাবে দেবেন? কবে দেবেন?
সেটার তেমন ফয়সালা হল কই?
‘তোমাকেই একবার দেখা করতে হবে,’ সুপ্রভা বলেন, ‘উনি কি আর যেচে যেচে রোজ আসবেন? এই তো কার মুখে না কার মুখে তোমার অসুখের খবর পেয়ে— তোমাদের নন্দবাবুর কাছে শুনেছেন বললেন না?’
‘হ্যাঁ, তাই তো বলল—।’ শরদিন্দু আর যেন কথা খুঁজে পান না। এবার শরদিন্দুকে একটা ভয় গ্রাস করছে। এতক্ষণে যেন সহসা অনুভব করছেন শরদিন্দু, লোকটা কেবলমাত্র সৌজন্যে বিগলিত হয়েই তাঁকে দেখতে আসেনি, মূল উদ্দেশ্য ছিল ওই বিয়েটাই। যতই অবহেলাভরে উচ্চারণ করুক কথাটা, সোমাকে ও দেখেছে, এবং দেখে মুগ্ধ হয়েছে। তাই পুঁটিমাছের ঘরে রুই রাজার আগমন
কিন্তু সত্যিই যদি ওই বিয়েটা করতে চায় ও?
সোমার মুখ মনে পড়ে এখন, আর এ-ও মনে পড়ে, এলোমেলো অসংলগ্ন কতকগুলো কথার মধ্যে তিনি যেন একটা প্রতিশ্রুতিই দিয়ে বসেছেন।
ওরে বাবা, এ তিনি কী করলেন!
ওই প্রায় তাঁর নিজের বয়সী লোকটার সঙ্গে সোমার বিয়ে? ছি ছি!
আর লোকটার প্রবৃত্তিকেও বলিহারী, এই তিন কাল কাটিয়ে এসে এখন কি না বিয়ের শখ! তা শখ করলি করলি, আমার মেয়ের দিকে নজর কেন?
বিহ্বলতা কেটে গিয়ে আস্তে আস্তে আবার সেই পুরোনো কালের বিরূপতা এসে মনকে আচ্ছন্ন করে তোলে, লোকটাকে মহাপাজি মনে হয়, এবং শেষ পর্যন্ত এই স্থির হয়—ঠিক আছে, টাকা তো আর নিয়ে ফেলিনি যে, বাধ্য-বাধকতায় পড়ে যাব? করব না দেখা, দেব না বিয়ে, চাই না টাকা, ব্যস্।
মেয়ে-বেচা টাকায় আমি বাড়ি রক্ষা করব?
ফুটপাথে গিয়ে দাঁড়াব বরং।
হ্যাঁ, সেদিন সেই কথাই ভাবলেন শরদিন্দু। ভেবেছিলেন।
কারণ তখনো ‘সম্ভ্রম’ শব্দটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল শরদিন্দুকে। মনে হয়েছিল, লোকটা যেন শরদিন্দুর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে, শরদিন্দুকে অপমান করতে চাইছে।
যেন পুরোনোকালের কোনো আক্রোশ পুষে এনেছে, প্রতিশোধ নেবে বলে। তাই ভাবলেন, কক্ষনো দেব না বিয়ে! ওই বুড়োর হাতে আমি সোমাকে তুলে দেব? ছি ছি!
সুপ্রভাকে ডেকে বললেন, ‘সোমাকে এসব কিছু বলার দরকার নেই।’
‘দরকার নেই?’ সুপ্রভা যেন ঝাপসা গলায় বলেন, ‘তাহলে?’
‘তাহলে আর কী? স্পষ্ট বলে দেব, টাকায় আমার দরকার নেই। বরং গাছতলায় থাকবো, তবু তোমার মতো ঘুষখোর পাজি অহঙ্কারী আর কুটিল বুড়োর হাতে মেয়ে তুলে দিতে পারবো না।’
শরদিন্দু নিজের রোগের দুর্বলতা ভুলে বীরদর্পে পায়চারি করতে থাকেন।
সুপ্রভা বিচলিত দৃষ্টিতে তাকান।
সুপ্রভা ঠিক এই পরিস্থিতির উপযুক্ত প্রসঙ্গ খুঁজে পান না।
সুপ্রভার মধ্যেও তোলপাড় চলছিল বই-কি। চলছিল যুদ্ধ।
যুদ্ধ চলছিল স্নেহের সঙ্গে স্বার্থের, লোভের সঙ্গে বিবেকের। আর বারে বারেই একটা অন্ধকার ভবিষ্যৎ যেন ভয়ের ছায়া ফেলে ফেলে এক পক্ষের শক্তি হরণ করে নিচ্ছিল।
এ তো তবু খেয়ে না-খেয়ে পড়ে থাকা যাচ্ছে। এখনো লোক সমাজে ‘শরদিন্দুবাবুর বাড়ি’ বলে একটা পরিচয়ের মর্যাদা আছে।
কিন্তু এই বাড়ির চৌকাঠ পার হয়ে ফুটপাথে নামলে?
সেই বিভীষিকার ছবির সামনে সভয়ে চোখ বোজেন সুপ্রভা, আর তখনই বলবান পক্ষের তীক্ষ্ণ যুক্তির অস্ত্রগুলো ঝকঝকিয়ে ওঠে।…দ্বিতীয় পক্ষেও তো বিয়ে হয় লোকের। বয়েসই বেশী, স্বাস্থ্যে শক্তিতে লোকটা তাজা তরুণদের চেয়ে কিছু কম নয়। টাকা জিনিসটাও ফেলনা নয়, চিরদিনই তো মেয়েটা অভাবের মধ্যেই মানুষ, ইচ্ছেমতো দু’খানা শাড়ি কেনবার সুযোগও হয় না। বলতে গেলে অবস্থার গতিকেই লেখাপড়া হল না। ওখানে বিয়ে হলে একেবারে রাজ-সিংহাসনে বসবে। যা বোঝা যাচ্ছে, বুড়ো একেবারে টাকার কুমীর। তা’ টাকা দিয়েই অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কেনা যায়। সচ্ছলতার বাড়া সুখই বা কী আছে জগতে? অনটনের বাড়া কষ্ট?
ওই প্রকাণ্ড গাড়িটা সোমার নিজের হবে, ইচ্ছে হলেই যখন-তখন মা-বাপের সঙ্গে দেখা করতে আসবে, ছোট ভাইদের দেবে-থোবে, বেড়াতে নিয়ে যাবে। পড়ালেখার সুরাহা করে দেবে। জীবনভোর ওই সাবান কোম্পানীর চাকরিতে ঘসটালেও যা না হবে, এতে কড়ে আঙুলে আগা নাড়লেই তা হবে।
কিন্তু শঙ্খ?
এইখানেই যেন থতমত খাচ্ছেন। যেন চলতে চলতে পায়ের নীচে প্রকাণ্ড একটা গর্ত দেখছেন।
শঙ্খ কী বলবে?
তা’ বলবে হয়তো অনেক কিছুই। হয়তো ব্যঙ্গহাসি হাসবে, হয়তো ধিক্কার দেবে, আর নয় তো বা বিস্ময়ের আঘাতে শুষ্ক হয়ে গিয়ে শুধু বলবে, কাকীমা, আপনারা এই?’
বলাই স্বাভাবিক।
ছেলেবেলা থেকেই তো চন্দ্র-সূর্যের মতোই নিশ্চিত আছে ওদের দুজনের বিয়ে হবে।
সেই যখন ছোট ছিল, শঙ্খ যত ছেলেদের খেলা খেলতো, সোমা তার খিদমদারি করে বেড়াতো। নিজের সমবয়সী মেয়েদের পুঁছতই না সোমা, বন্ধু সঙ্গী গুরুদেব— সবই ওই শঙ্খ।
আনুগত্যও যত, আধিপত্যও তত। শঙ্খ যেন ওর খাসতালুক।
শঙ্খও সোমাকে শাসন করে যত, ভয় করে তত।
আস্তে আস্তে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আধিপত্য আর আনুগত্য যে নিশ্চিত বিশ্বাসের ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে সেকথা কি সুপ্রভা জানেন না?
কিন্তু ইদানীং সুপ্রভাকে চোখ ফিরিয়ে নিতে হয়েছে সেদিক থেকে। সোমা বিয়ে করে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে একথা ভাবতেই পারেন না সুপ্রভা
তাই চোখ বুজে না বোঝার ভান করে চলছেন ইদানীং।
তবে আজ পর্যন্ত মুখ ফুটে ঠিক বিয়ের প্রস্তাব তো কোনো পক্ষ থেকেই হয়নি। কাজেই সে চক্ষুলজ্জার দায় নেই। এরপর যদি সেকথা ওঠে, আকাশ থেকে পড়লেই হবে। বললেই হবে, ‘ওমা সে কী? চিরটা কাল ভাইবোনের মতো হাসল খেলল। বলতে গেলে ভাইবোনই তো! একই তো বাড়ি।’
ব্যস্, চুকে যাবে চক্ষুলজ্জা।
জামাইয়ের ঐশ্বর্যেই তাক লাগিয়ে দেওয়া যাবে সবাইকে।
আর সোমা?
তা’ তাকেও একটু বুঝিয়ে বলতে হবে।
হতে পারে মেয়ের শঙ্খর ওপর আছে টান, কিন্তু ও আমার পেটের সেরা সন্তান, ওর দাদা-দিদিদের মতো আত্মসর্বস্ব স্বার্থপর নয়। ও আমাদের দুঃখ বুঝবে। বুঝবে, ওর একটু বিবেচনায় এই সংসার ভরাডুবি থেকে রক্ষে পাবে। কিছুই না, বিয়ের পাত্র একটু বয়সে বড়।
আর এমনিতেই কি হচ্ছিল বিয়ে?
হচ্ছিলই না তো।
ওই অফিস আর বাড়ি! এই করতে করতেই বুড়িয়ে যেতে হত, এ তো তবু ঘর বর, রাজার সংসার, সব কিছু পাচ্ছিস। দোজবরে নয়, সতীনের চারটি ছেলে-মেয়ে নেই, আপত্তির কী থাকতে পারে? না, ওকে আমি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ম্যানেজ করে নেব, ও বুঝদার।
ও বুঝদার! অতএব ওর প্রতি অবুঝ হও।
ও সকলের প্রতি মমতাময়ী, অতএব ওর প্রতি নির্মম হও।
ও স্বার্থপর নয়, অতএব বাকি সবাই স্বার্থপর হও।
এই নিয়ম পৃথিবীর। কাজেই পৃথিবীর নিয়মেই চলেন সুপ্রভা। মনে মনে সংকল্প করেন, ওকে বলতে হবে।
বলতে হবে বই-কি। বিয়ে বলে কথা, না জানিয়ে তো হবে না?
যুদ্ধ চলছিল মনের মধ্যে। থামল সে যুদ্ধ।
যুদ্ধের একপক্ষ সম্পূর্ণ পরাজিত হল, অতএব আর এসব চিন্তায় লজ্জা নেই।
আর লজ্জা কি থাকলেই হল?
হাজার দশেক টাকার আচ্ছাদন পড়ল না তার ওপর
তবে হ্যাঁ, আস্তে আস্তে বলতে হবে।
কাজেই সেদিন যখন সোমা ফিরল, শুধু সিংহসাহেবের মহানুভবতার কথাই বলা হল তাকে। কোন সেই নন্দবাবু, তাঁর মুখে নাকি শরদিন্দুর অসুখ শুনে দেখতে এসেছেন।
কে কবে শুনেছে এমন?
সোমা অবশ্য অবাক হয়।
বলে, ‘কিন্তু আগে তো ওর অহঙ্কারী বলে খুব নিন্দে শুনেছি বাবার মুখে।’
‘ওই, তো’, সুপ্রভা হাসেন, ‘তোমাদের বাবা বললেন, অহঙ্কারী ছিল ওর চেয়ারখানা। আসলে লোকটা উদার মহৎ। শুধুই কি দেখতে আসা? আরও যা বলে গেছেন, শুনলে অবাক হয়ে যাবি।’
‘আরও অবাক?’ হেসে ওঠে সোমা।
বাড়ি ছাড়ার নোটিস আসা পর্যন্ত হাসিখুশি তো ছিল না এ-বাড়িতে, আজ বইছে তার হাওয়া। সোমা বাড়ি ফিরেই এ-হাওয়ার স্পর্শ পেয়েছে, তাই সোমাও হাসে, ‘আরও অবাক! বাবাকে আবার ডেকে অফিসার করে দিতে চাইল নাকি?”
সুপ্রভাও হেসে ওঠেন, ‘অফিসের সঙ্গে আর সম্পর্ক কী তাঁর? তিনিও তো রিটায়ার করেছেন। এ একেবারে অবিশ্বাস্য অদ্ভুত,—
‘খুলেই বল না বাবা, অত গৌরচন্দ্রিকা কিসের?’
‘বলবে, তোর বাবা বলবে।’ সুপ্রভা রহস্যকে জীইয়ে রাখেন। আমি হয়তো কী বলতে কী বলব!’
সোমা আর দু-একবার বলে, “আঃ! এত রহস্যের আবছায়া কেন? কী এমন মারাত্মক অবিশ্বাস্য আশ্বাস দিয়ে গেলেন তোমাদের সিংহসাহেব?’
বলে, ‘মনে হচ্ছে যেন পরশপাথর-টাথরের সন্ধান দিয়ে গেলেন তিনি!’
সুপ্রভা মৃদু হেসে বলেন, ‘তা’ প্ৰায় তাই।’
‘আশ্চর্য!’ সোমা ভুরু কুঁচকে বলে, ‘বাবা যখন চাকরিতে ছিলেন, উঠতে-বসতে ওই সিংহীসাহেবের শ্রাদ্ধ করেছেন। তুকতাক কিছু করে গেল না কি?’
সুপ্রভার মনটা ছটফট করে কথাটা বলে ফেলবার জন্যে, তবু সুপ্রভা ভয়ে বলেন না। মেয়েকে তাঁর বড় ভয়।
তাই সোমার সব প্রশ্নের উত্তরই এড়িয়ে যান। বলেন, ‘তোর বাবা বলবে।’
ছয়
বললেন বাবা। দশ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতিটার কথা মেয়ের কাছে প্রায় সিংহসাহেবের মতোই অবহেলাভরে বললেন। তবে একটু কারচুপি করে বললেন। চেনেন তো মেয়েকে! হয়তো সাহেব করুণায় বিগলিত হয়ে সাহায্য করতে চেয়েছে, এ-কথা শুনলে দপ্ করে জ্বলে উঠবে মেয়ে। তাই বলেন, ‘যেচে ধার দিতে চাইল। তাও শোধ দেবার জন্যে তাড়া নেই, সুদের কোনো কথা নেই, একেবারে নিশ্চিন্ত শান্তি’।’
সোমা শুনে তীক্ষ্ণ গলায় বলে, ‘খুব দুঃখের গাথা গেয়েছিলে বুঝি পুরোনো মনিবকে কোর্টে পেয়ে?”
শরদিন্দু উষ্ণ হন। বলেন, দুঃখের গাথা গেয়েছি এ-কথা ভাবতে গেলে কেন হঠাৎ?’
‘বাঃ, অকারণ একটা লোক হাত বাড়িয়ে ধার দিতে এলে অবাক লাগে না?’
‘হ্যাঁ, তা অবাক লাগে। তাই বলে অবিশ্বাস্য নয়। মানুষের মধ্যেই ভগবান দেখা দেন। দুঃখের গাথা বলছিস? বলি, এ-বাড়িতে এসে দাঁড়ালেই কি বোঝা যায় না যে আমাদের অবস্থা কোথায় ঠেকেছে? যায় না বোঝা? যাদের দৃষ্টি শার্প, তারা এক নজরেই বুঝতে পারে।’
‘তা বুঝতে পারলেই কি কেউ—’ সোমা বলে।
‘কেউ করে না, উনি মহৎ বলেই সেই অবস্থার ব্যবস্থা করতে ইচ্ছুক।’
‘তা ভালোই বলতে হবে।’ সোমা বলে, ‘তাহলে বলতে হয় উনি তোমাদের সেই ঈশ্বর-প্রেরিত না কী, তাই হয়েই এসেছিলেন। সত্যিই যদি আপাতত কিছু টাকা—’
সাত
যদিও সোমা বাবার কথা ভালো করে বিশ্বাসে আনতে পারছে না। খামোকা একটা লোক একেবারে দশ-দশহাজার টাকা দিতে চাইবে স্বেচ্ছায়, শুধু পূর্বতন অধস্তনের দুরবস্থা দেখে?
সত্যযুগেও হয়েছে কখনো এমন ঘটনা?
তবে কি বাবা এই বন্ধকী বাড়িকেই আবার চালাকি করে বন্ধক দিতে বসেছেন? অথবা বিক্রি করে দিচ্ছেন লুকিয়ে?
বাবার সম্পর্কে এ কথা ভাবতে লজ্জা করলো সোমার, তবু ভাবলো। তারপর আবার ভাবলো, “তা ওই সিংহসাহেবটি কি খোকা? তিনি দলিল-পত্র দেখবেন না ভালো করে?’
তা’হলে কি ওই চিরকেলে ঘুষখোর লোকটা কোনো চোরা কারবার ফেঁদেছে? বেনামীতে করবে বলে ঝুঁকি নিতে রাজি এমন কোনো পার্টনার খুঁজছে? আর বোকাসোকা শরদিন্দুকে মনে পড়েছে সেই খোঁজার সূত্রে?
সোমা কি জোর তলবে তদন্ত করবে ব্যাপারটা কী? না কি চোখ বুজে ভাববে— মরুক গে যা হয় হোক, আসুক কিছু টাকা বাড়িতে!
টাকা টাকা! কিছু টাকা!
এই তো ধ্যানজ্ঞান সংসারের।
সোমার দাদার হৃদয়হীন ব্যবহারের নমুনা দেখা ইস্তক সোমারও তো শয়নে স্বপনে চিন্তা, টাকা!
তার ওপর ওই নোটিস!
ক’দিন ধরে তো আর কোনো চিন্তা নেই। শুধু প্রত্যাশা করা হঠাৎ ঘরের ছাদ ভেদ করে নেমে আসছে এক বস্তা টাকা, ঘুম থেকে উঠেই দেখা যাচ্ছে খাটের শিওরে পুঁটুলি-ভরতি টাকা, পথ চলতে পায়ের কাছে টাকার থলি, পিওন এসে কড়া নেড়ে অকস্মাৎ দিয়ে যাচ্ছে টাকার বার্তাবাহী টেলিগ্রাম, রেঞ্জার্সের ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছেন শ্রীশরদিন্দু সরকার!
অলৌকিকে কখনো আস্থা ছিল না সোমার, এখন যেন ওই অলৌকিকই ভরসা।
তা সেই অলৌকিকের স্বপ্ন দেখতে দেখতে সত্যিই যে অলৌকিক এসে ধরা দিল।
নইলে বাবার সেই সিংহসাহেব, উঠতে বসতে বাবা যাকে শাপমন্যি দিতেন, তিনি হঠাৎ মহানুভব হয়ে—
কে জানে, বাবার কথাই হয়তো ঠিক, চেয়ারটারই দোষ ছিল, মানুষটার নয়। কিংবা কর্মকালীন যত ‘কালি’র চিন্তা হয়তো এখন লোকটার বিবেককে পীড়িত করছে। তাই এই কালি মোছার প্রচেষ্টা।
সোমা তহলে লোকটাকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করবে?
অনুতপ্ত পাপীও তো শ্রদ্ধার পাত্র।
অথবা সোমা সত্যিই সেই চিরকেলে প্রবাদটার বিশ্বাসী হবে?
‘খোদা যব্ দেতা তর্ ছাপ্পর ফোঁড়কে দেতা!’
এ খবরটা কতক্ষণে আর কীভাবে শঙ্খকে দেওয়া যাবে, ভাবতে থাকে সোমা।
আট
খবর শঙ্খর কাছে পৌঁছতে দেরি হল না।
সোমার মা-র মারফত আগেই পৌঁছেছিল। আবার সোমার মারফত!
ভয়ানক ঈর্ষার কারণটা তো এখনো ঊহ্য, তবু কেমন যেন ঈর্ষা বোধ করে শঙ্খ। সোমার বাবা অকূলে কূল দেখতে পেয়েছেন, অন্ধকারে আলোর রেখা, এতে উৎফুল্ল হবার কথা, তবু হতে গিয়েও হতে পারে না। ওই ঈর্ষার কাঁটাটুকুই তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
যেন শঙ্খর প্রাপ্য জয়মাল্যখানা হঠাৎ কোথা থেকে কে এসে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের গলায় পরে ফেলেছে।
টাকা, শুধু টাকার জোরে।
অথচ এ-টাকা শঙ্খর থাকলে কবেই শঙ্খ এমনি অনায়াসে অবহেলায় বলতে পারত, ‘হাজার দশেক পেলেই আপাতত চলবে আপনার? তা, বেশ তো নিন না আমার থেকে। আপনার ব্যাঙ্কে থাকা আর আমার ব্যাঙ্কে থাকায় তফাত ভাবছেন কেন কাকাবাবু?’
এই সুন্দর কথাগুলো সুললিত ভঙ্গীতে বলতে পেল না শঙ্খ, একটা ঘুষখোর বুড়ো এসে বলে নিল! কী আপসোস!
সেই ঝাঁজটাই বেরিয়ে আসে কণ্ঠস্বরে, বাচনভঙ্গীতে, দেবে না কেন? ঘুষের টাকা তো! মা-বাপ নেই টাকার, গোনা-গুনতিও নেই। দশ কেন পুরো তিরিশ হাজারও দিতে পারত।’
সোমা অবাক হয়ে বলে, ‘ওমা, রাগ করছ কেন?’
‘রাগ নয়, কথা হচ্ছে বে-আন্দাজী টাকা থাকলে অমন বেপরোয়া হওয়া যায়।’
‘তা বলে তা নয়—’ সোমা হাসে, ‘ওদেরই ওয়ান পাইস ফাদার-মাদার হয়। টাকাই তো ইষ্টদেবতা ওদের!’
‘তবে বলতেই হবে, ওই তোমাদের সিংহসাহেব, একদা জুট ব্যাগের কেলেঙ্কারীতে যিনি প্রায় দেশবিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন, তিনি একজন মহৎ ব্যক্তি।’
‘দেখ শঙ্খ, লোকটাকে মহৎ আমি বলছি না, এবং ওর টাকাটাও যে খুব পবিত্ৰ নয়, তাতে সন্দেহ নেই। তবে মনে হয়, বড়মানুষের মেজাজ তো! দৈবাৎ পুরোনো পরিচিতের দুঃখ দুরবস্থা দেখে মনটা দুলে উঠেছে। বাবা ওই সুযোগটা না নিয়ে পারছেন না। জানোই তো অভাবে স্বভাব নষ্ট!
‘জানি, তবু এটা যদি কাকাবাবু না নিয়ে পারতেন!
সোমা গাঢ় হয়, সোমা গম্ভীর হয়। ‘আমিও কি সে-কথা ভাবছি না শঙ্খ? অনেকবার ভাবছি। কিন্তু বাবাকে সে-কথা বলব কোন মুখে? বাড়তি একশোটা টাকাও কি হাতে এনে দিতে পারছি? ওদিকে দুর্ভিক্ষ-পীড়িতের সামনে সাজানো থালা!
এ যুক্তির খণ্ডন নেই।
শঙ্খও তাই গুম হয়ে থাকে।
তারপর আবার বলে, ‘জানি না শেষ পরিণাম কী হবে। তবে আমার তো মনে হয় না এসব লোক বিনা মতলবে কিছু কাজ করে—’
‘বাবাকে দিয়ে ওর আর এখন কোন মতলব হাসিল হবে?’
‘কিছু না হোক ইনকামট্যাক্স ফাঁকির ব্যাপারে সুরাহা হতে পারে। বাথরুমের দেয়ালে টাকা গেঁথে রাখবার সময় নেই বোধহয় হাতে—’
‘তা, এই একটা কারণ থাকতে পারে।’
কারণ ভেবে দিশেহারা সোমা ভেবেছিল, এটাও অসম্ভব নয়। হয়তো বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-পরিচিতের কাছে বিশ্বাস নেই, এই হচ্ছে একেবারে হিসেবের বাইরের মানুষ। এই ভাবেই হয়তো আরো কারো কারো কাছে বদান্যতা দেখাচ্ছে নিজে বিপদমুক্ত হতে।
তা মরুক গে, ওর ব্যাপার ও বুঝবে।
বিনা রসিদের টাকায় বাবার আর বিপদে পড়ার আশঙ্কাটা কোথায়?
নয়
—ওই টাকাটা হলে আপাতত তোমাদের গৃহ-সমস্যাটা মেটে তাহলে?’ শঙ্খ বলে, “তাহলে ধরাই যাক ঈশ্বর-প্রেরিত।’
তা’ তাই ধরল সবাই। কিন্তু না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
অবিরত ভাবছেন সেকথা শরদিন্দু আর সুপ্রভা। ‘না আঁচালে বিশ্বাস নেই!’
কই, আর তো কোনো সাড়া-শব্দ নেই!
তবে কি লোকটা তখন নেশায় ছিল?
যেমন নেশায় লোকে হাতি কেনে, রাজ্য দান করে?
হয়তো তাই। পয়সাওলা লোক, নিশ্চয় মদ টদ খায়, সেই মেজাজের মাথায় যা মুখে এসেছে বলে গেছে।
আর তাঁরা বোকাসোকা ভালোমানুষ, সে-কথা বিশ্বাস করে বসেছেন। ছি ছি! দুজনে বলাবলি করেন, সোমাকে চট করে না বলে ফেললেই হতো। এরপর সোমা হাসবে। বলবে ‘কী বাবা, কী হল তোমার সিংহসাহেবের? এত আস্ফালন করে হঠাৎ বিবরে ঢুকে পড়লেন যে?’
তা’ তেমন কথা একদিন বলেও ছিল সোমা হেসে হেসে।
কিন্তু সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়ে ক’দিন পরেই আবার একদিন এসে হাজির হলেন ঈশ্বরের দূত। খুব সম্ভব চেক বই নিয়েই।
সেদিন সোমা বাড়িতে।
সোমা ওঁকে বসিয়েই বাড়ির মধ্যে চলে গেল চা করতে।
এখানে শরদিন্দু আর সুপ্রভা।
মনস্থির হয়ে গেছে দুজনেরই তবু ঘামতে থাকেন গলগলিয়ে।
সোমাকে যে এ পর্যন্ত আসল কথাটাই বলা হয়নি।
কীভাবে, কোন্ ভূমিকা দিয়ে আরম্ভ করা যাবে, তাই ভাবতে ভাবতেই ক’দিন কেটে গেছে।
আর তারপর অবিশ্বাস আসতে শুরু করেছে। সেদিনের কথা মন থেকে ঝাপসা হয়ে গেছে।
কিন্তু এখন, সিংহসাহেবের আবার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই কথাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সোমাকে আসল কথাটাই বলা হয়নি।
হঠাৎ শরদিন্দু পূর্ব পরিস্থিতি ভুলে সুপ্রভার ওপর খিঁচিয়ে উঠে বলে উঠলেন, ‘বলনি সোমাকে?’
‘কই, বললাম আবার কখন?’
‘বললাম আবার কখন! চমৎকার! এখন? এখন কী হবে? সাহেব যদি হঠাৎ ওকেই জিগ্যেস করে বসে, কী ঠিক করলে?’
‘তা’ আমায় বকছো কেন? আমার কী দোষ? তুমিই বা বলনি কেন?’
‘আমি!’ শরদিন্দু গোঁয়ারের মতো বলে ওঠেন, ‘আমি মেয়ের কাছে বিয়ের মতামত চাইতে যাব? তুমি মা, তুমি এই সাত-আট দিনের মধ্যে আস্তে আস্তে সইয়ে সইয়ে বলতে পারনি?’
—তুমিই বলেছিলে মেয়ে-বেচা টাকায় দরকার নেই। বরং ফুটপাতে দাঁড়াব—’
‘বলেছিলাম। পাগলে কী না বলে! শেষ পরে বলিনি কি ওসব মান-সম্ভ্রম গরিবের জন্যে নয়? কন্যাপণ বলে একটা কথাও তো আছে বাংলাদেশে?’
বলেছিলেন সে কথা শরদিন্দু। সুপ্রভা উত্তেজিত হন, ‘তা তোমার সাহেবেরও তো আর খোঁজ ছিল না। যদি মন ঘুরে যায়, শুধু শুধু নিষ্ঠুর কথাটা বলে মেয়ের কাছে হেয় হব আমি?’
শরদিন্দু আরো উত্তেজিত হয়েছিলেন, ‘তা, সাহেবও ভাবতে পারে, কই, এদের তো ইচ্ছে দেখছি না। মেয়ের মতো আছে কি না জানাবে তো সে-কথা।”
এমনি পরিস্থিতিতে সিংহসাহেব একা বসে ঘামতে লাগলেন। আর ভাবতে লাগলেন, একখানা পাখাও করতে পারেনি লোকটা, কী অপদার্থ!
অপদার্থ! সত্যই অপদার্থ!
অতএব ঘামতে ঘামতে এসে বসলেন তাঁরাও। একই দুঃখে দুঃখী দুটো মানুষ। একই অপরাধে অপরাধী দুই অনুতপ্ত। মনে চিন্তা—ইস্, খবর করা উচিত ছিল। লোকটা মহৎ সেকথা ভুলে যাচ্ছিলাম।
চেক বইটা পকেট থেকে বার করে লীলাভরে লোফালুফি করতে করতে বলেন সাহেব, ‘ওদের সঙ্গে রফা একটা করে ফেলেছেন তো?”
না, বিয়ের কথা নয়। স্রেফ শরদিন্দুর সমস্যা নিয়েই কথা। রফাটফা কিছুই করেননি শরদিন্দু। তবু বলেন, ‘সে একরকম হয়েছে।’
বলেন, ‘তিন মাস সময় দিয়েছিল, তার মধ্যে মাস দুই রয়েছে এখনো।’
‘তা বেশ।’ সাহেব হৃষ্ট হন।
কিন্তু কই, চেকটা কাটা হচ্ছে কই? শুধু কথাই বলছে।
ঘুঘু বুড়ো তাহলে মুখে যতই উদারতা দেখাক, ওই বিয়ের ব্যাপারটির ফয়সালা না-করা পর্যন্ত টাকাটি ছাড়বে না।
কে তাহলে বলবে সোমাকে?
না কি সোমার আড়ালে বলেই ফেলা হবে—’মেয়ে তো খুব রাজি! বলেছি তো, ভারী মমতাশীল মেয়ে! বাবাকে নিশ্চিন্ত করতে, মানে বয়স্থা মেয়েও যে বাপের একটা দুশ্চিন্তা, বোঝে তো সেটা। তা ছাড়া আপনার মতো স্বামী পাওয়া—’
আশ্চর্য!
লোকটার আড়াল হলে শরদিন্দুর তার ওপর যেন বিরূপতার শেষ থাকে না। এই ক’দিনের মধ্যে মনে মনে কতবারই ভেবেছে, এমন ব্যাপারটা হলে কেমন হয় যদি লোকটাকে মুখের ওপর যাচ্ছেতাই করতে পারা যায়? যদি বলা হয়, ‘আমার মেয়ের তোমার মতন একটা বুড়ো বদমাস পাজি ঘুষখোরকে বিয়ে করতে দায় পড়েছে হে! সরে পড়। মনে করেছ ঘুষ দিয়েই পৃথিবী কেনা যায়? তোমার জানা পৃথিবীর বাইরে অন্য পৃথিবী আছে, বুঝলে? সৎ সুন্দর সভ্য পৃথিবী। বেশী লোভ দেখাতে আসো তো দেবো পাড়ার রকবাজ ছেলেগুলোকে লেলিয়ে। দেবে তোমার বিয়ের বাসনা জন্মের শোধ ঘুচিয়ে। দাঁতের পাটিটি নামিয়ে দেবে মুখের মধ্যে থেকে। যদি অবশ্য দাঁতটা তোমার নিজের হয়। পয়সা দিয়ে কেনা দাঁত হলে ঘুসির পরিশ্রমটুকুও লাগবে না।’
এরকম অনেক কড়া কড়া আর ঝাঁঝালো ঝাঁঝালো কথা বলতে ইচ্ছে হয়েছে লোকটার মুখের ওপর। দশ হাজার টাকার অঙ্কটা ধূসর হয়ে গেছে।
কিন্তু কী যে প্রভাব আছে লোকটার উপস্থিতির।
তাই মুখোমুখি হলেই মুখে আর কথা যোগায় না। সব কথা গিয়ে জমে যেন হাতের তালু দুটোর মধ্যে। তাই সেই দুটোই কচলাতে ইচ্ছে হয়।
স্ত্রীকে একবার ইসারা করতে চেষ্টা করলেন শরদিন্দু, সফল হলেন না। সুপ্রভাও যেন শত্রুতা সাধছেন, তাকাচ্ছেন না অলক্ষে।
সোমা এসে পড়ল এর মধ্যে।
বুদ্ধিমতী মেয়ে, চা নয়, কফি করে এনেছে, সভ্য সমাজে যেটা বেশী চালু। কফি আর কাজু-বাদাম। সূক্ষ্ম সুরুচিসম্পন্ন আতিথ্য।
এত তাড়াতাড়ি ব্যবস্থাটা করল কী করে?
দুটোর একটাও তো থাকবার কথা নয় বাড়িতে। আর কিছু নয়, অগতির গতি শঙ্খদের বাড়ি। ওদের তবু থাকে ওসব। অবশ্য শরদিন্দুর সংসারও আগে এমন অলক্ষ্মীর সংসার ছিল না।
সময় অসময়ে দু-পরিবারই জিনিসের লেনদেন করেছে। এদের বাড়ি কুটুম এসে পড়া, ওদের বাড়িরও কুটুম আসা। ওদের বাড়ির হঠাৎ অতিথি, এদের বাড়িরও হঠাৎ অতিথি।
চা, চিনি, চায়ের দুধ, কাঁচালঙ্কা, পাতিলেবু, আদা, এইসব হঠাৎ করিয়ে যাওয়ার বস্তু এক বাড়িতে থাকা মানেই দু-বাড়িতে থাকা।
ইদানীং ভাগ্য-বিপর্যয়ে সোমারাই চাওয়ার হাতটা কমিয়েছে, কাজে কাজেই ও-পক্ষ ও সে হাত গুটিয়েছে।
আজ বোধহয় সোমা এত মাননীয় অতিথি দেখেই—
তা’ খুব সমীহের ভাবই তো দেখা যাচ্ছে, খুব যত্নের ভাব। মুখের রেখায় অপ্রসন্নতার চিহ্নমাত্র নেই। অবশ্য কারণও নেই। আসল কথাটি তো জানে না। কিন্তু এমনিই লোকটার প্রতি সোমা বিরূপ নয় বোঝা যাচ্ছে।
না হবারই তো কথা
তা’ সত্যি বলতে, সোমাও তাই ভেবেছিল। আর এ ক’দিন মনে মনে লোকটাকে জোচ্চোর মিথ্যেবাদী ভাবছিল। ভেবে ভারী লজ্জাবোধ করেছিল।
অতএব চলে গিয়েছিল ও বাড়ি।
শঙ্খ ছিল না!
দেখে স্বস্তিবোধ হয়েছিল।
শঙ্খর মাকে বলেছিল, ‘কফি আছে জেঠাইমা?’
শঙ্খর কফি খাওয়ার সখ আছে, মাঝে মাঝে খায়, সে কথা সোমার অগোচর নেই।
শঙ্খর মা বলেছিলেন, ‘দেখি দাঁড়া। কেন কেউ এসেছে বুঝি?’
সোমা বলেনি, ‘হ্যাঁ বাবার বসেই সিংহীসাহেব এসেছে।’ সোমা শুধু বলেছিল, ‘হ্যাঁ’।
আর খুব ব্যস্ততা দেখিয়েছিল ওই সংক্ষিপ্ত ভাষণের ত্রুটিটুকু ঢাকতে।
শঙ্খের মা কৌটোটা হাতে করে এসে বলেছিলেন, ‘তোর ভাগ্যে রয়েছে একটু।’
‘ওতেই হবে’ সোমা আরো ব্যস্ততা দেখিয়েছিল।
বিপদে মধুসূদন, অকূলে কাণ্ডারী!
তারপর শঙ্খর ছোটভাই চক্রকে ডেকে বলেছিল, এই চট করে একটা চার আনার কাজুবাদামের প্যাকেট এনে দে তো। বাবার অফিসের এক বুড়ো এসেছে, মিষ্টি নোনতা চা এসব খাওয়াতে গেলে তো আস্ত একটা টাকাই বেরিয়ে যাবে। কিনে ওখানে আমার কাছে দিয়ে দিস।’
চক্র হাসতে হাসতে চলে গিয়েছিল, ছুটে গিয়ে এনে দিয়েছিল পেছনের গলি দিয়ে।
সোমা এসব সৌষ্ঠব করেছিল। শরদিন্দু দেখে বাঁচলেন। তবু ভাবলেন আধুনিক ছেলেমেয়েদের মতি-গতি তো বোঝা যায় না, ওরা গাছের যে ডালে বসে থাকে, সেই ডালটার গোড়াতেই আগে কোপ দেয়।
হয়তো চেকটা বাক্সে তুলতে তুলতে ও বলতে পারবে, ‘লোকটাকে দেখে কিন্তু হাড় জ্বলে গেল বাবা!’
কিন্তু মনে হচ্ছে তা বলবে না।
সত্যিই বলবে না।
নিজের কাছেই নিজে ভারী লজ্জাবোধ করছিল সোমা। সে-দিনের পর থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ও তো ধরেই নিয়েছিল বাবাকে ভালোমানুষ পেয়ে স্রেফ দুটো কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে গেছে লোকটা। আর জীবনে ও এ পথ মাড়াচ্ছে না।
যদি এরপর বাবা নিয়ে ধর্না দেন, হয়তো বলবে, ‘সেকী, আপনাকে খামোকা টাকা দিতে যাব কেন?’ অথবা বলবে, ‘ইস্, স্রেফ ভুলে গেছি। কী ব্যাপারে দেব বলেছিলাম বলুন তো? ওঃ, বাড়ির ব্যাপারে? আচ্ছা, আজ বড় ব্যস্ত, পরে একদিন আসবেন।’
ঘোরাবে।
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিরস্ত করবে।
এ চিন্তা একেবারে বদ্ধমূল করে ফেলেছিল সোমা মনের মধ্যে। কিন্তু লজ্জা পেল। লোকটা আবার এল। খুব শান্ত অমায়িক গলায় প্রশ্ন করল, ‘বাবা কেমন আছেন আপনার? সেদিন এসেছিলাম, বাড়ি ছিলেন না আপনি। ভারী ভালো লোক আপনার বাবা। অফিসে তো আরো অনেকেই ছিলেন, কিন্তু শরদিন্দুবাবুর মতো—’
এ লোকের ওপর অপ্রসন্ন হতে যাবে কেন সোমা?
মানুষ বৈ তো জানোয়ার নয় সে।
