পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.৩৫
৩৫
এক গলা ঘোমটা টেনে স্বামীর কাছে এসে দাঁড়ায় সারদা। যখন পাশে এসে বা বসে তখনো ঘোমটা খোলে না।
কি করে সলতেটি রাখতে হয় প্রদীপে—তা থেকে শুরু করে—কি করে চলতে হয় ট্রেনে-নৌকায় সব তাকে শেখায় রামকৃষ্ণ। গৃহস্থালীর ছোটখাটো ব্যাপার, দৈনন্দিন খুঁটিনাটির কাঁটাখোঁচা। নেমন্তন্ন বাড়ির ভোজ থেকে শুরু করে শাকপাতার কচুঘেঁচু। বাড়ির কে কেমন লোক, কার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবে তার ফিরিস্তি। শুধু নিজের বাড়িতেই বা কেন? ধরো আর কারু বাড়িতে বেড়াতে গেলে, তখন সেখানেই বা কেমনধারা চলবে-ফিরবে, জেনে রাখো। আমি না-হয় টাকা ছুঁই না, কিন্তু তোমার হাতে তো টাকা আসবে, করতে হবে কত দেবতা-অতিথির সেবা, কত ভক্ত-বন্ধুর পরিচর্যা-সুক্ষ করে হিসেব রাখবে মনে-মনে। গরমিল-গোঁজামিলের ধার ধারবে না।
শুধু তাই? তার পর ঈশ্বরসংবাদ আছে না? শুধু কি সংসারের রান্না-ভাঁড়ারের খবর নিয়ে ক্ষান্ত হবে, নেবে না সেই সমস্তসাক্ষী ভগবানের সম্ভাষণ? কচ্ছপ জলে চরে বেড়ায়, কিন্তু তার মন পড়ে আছে আড়ায়, যেখানে তার ডিম রয়েছে। বড়লোকের বাড়িতে ঝি কাজ করছে, কিন্তু তার মন পড়ে আছে নিজের দেশের বাড়িতে। মনিবের ছেলেদের বলে, আমার রাম, আমার হরি, কিন্তু মনে-মনে বেশ জানে, এরা আমার কেউ নয়। তেমনি সংসারে কাজ করবে কিন্তু মন ঈশ্বরে ফেলে রাখবে।
আর, ঈশ্বরও শুধু এই মনটিই দেখেন। একলব্য মাটির দ্রোণ সামনে রেখে বাণ-চালনা শিখেছিল। তার মনের একাগ্রতায়ই সে-মাটির মূর্তি গুরু হয়ে উঠেছে।
কিন্তু মন বিষয়ে ফেলে রাখো, ভিজে-দেশলাই হয়ে উঠবে। যতই কেননা ঘষো, জ্বলবে না কিছুতেই।
পাড়াগাঁয়ে মাছ ধরবার জন্যে মাঠে ঘুনি পাতে দেখনি? ঘুনির ভেতর চিক-চিক করে জল যায় দেখে ছোট-ছোট মাছগুলোর ভারি ফুর্তি, খেলতে খেলতে তারাও ঢুকে যায় ভিতরে। যে পথে ঢুকেছে সেই পথেই বেরিয়ে আসতে পারে অনায়াসে, কিন্তু জলের মিষ্টি শব্দ আর মাছের সঙ্গে খেলা তাদের ভুলিয়ে রাখে। আর বেরিয়ে আসবার চেষ্টাও করে না, সেইখানেই আটকে থাকে। পরে মারা পড়ে। তেমনি সংসারের বাইরের চাকচিক্য দেখে লোকে সাধ করে ঢোকে আর মায়া-মোহে জড়িয়ে পড়ে পথ খুঁজে পায় না। ‘গতায়তের পথ আছে রে তবু মীন পলাতে নারে।’
কিন্তু এমন মাছও আছে যে, ঘুনির কাছে গিয়ে ঐ দেখে লাফিয়ে অন্য দিকে বেরিয়ে যায়।
তাকাও এবার অন্য দিকে। আকাশের দিকে। ‘যঃ সর্বতঃ সর্বং জগৎ প্রকাশয়তি স আকাশঃ।’ যিনি সমস্ত দিক থেকে জগৎকে প্রকাশিত করছেন তিনিই আকাশ।
যিনি সামর্থ্যবান তাঁরই নাম ঈশ্বর। সর্বদা ও সর্বত্র আছেন তাই তিনি ভব। সর্বসংহারক বলে শর্ব। রোদন করান বলে রুদ্র। পরমৈশ্বর্যবান বলে ঈশান। কল্যাণকর্তা বলে শিব। পশু ও পাশের ঈশ্বর বলে পশুপতি। সমস্ত বিশ্বে পূর্ণ হয়ে আছেন বলে পুরুষ। সর্বব্যাপক ও সর্বনিয়ামক বলে অন্তর্যামী। ভজনের যোগ্য বলে ভগবান । আর তিনি উৎপত্তি ও প্রলয়ের পরেও অবশিষ্ট থাকেন বলে তাঁর আরেক নাম বা আদি-নাম ‘শেষ।’
তাঁকে প্রণিপাত করো। নিজেকে নিঃশেষে নিবেদন করে দাও।
কিন্তু জানো তো, তিনি আমাদের কাছে কোনো দূরের জিনিস বা দুষ্প্রাপ্য জিনিস নন। তিনি আমাদের বাপ-মা৷ পালন করেন বলে তিনি আমাদের বাপ, আর সন্তানের সুখ আর উন্নতি কামনা করেন বলে মা।
স্ত্রী-সঙ্গে বসে এমনি সেই অসঙ্গের আলাপ।
ঘৃতকুম্ভসমা নারী আর জ্বলদ্বহ্নিসমান পুরুষ—রাখবে না পাশাপাশি। কিন্তু নারী এখানে ঘৃত নয়, সম্মুখে জলছে যে অর্চিষ্মান অগ্নি সে তারই দাহিকা। যে ভাস্বর সূর্য সে তারই দীধিতি। ‘দেবতা সা ন মানুষী।’
সেই কোপনি-ধারী সাধুর গল্প জানো না?
গুরু বলেছে সাধুকে, নির্জনে গিয়ে সাধনা করো। বনের কোণে কুঁড়ে বেঁধে সাধন-ভজনে মন দিয়েছে সাধু। কিন্তু কোত্থেকে জুটল এসে ইঁদুরের উৎপাত। ইঁদুর আর-কিছুই করে না, স্নান করে ভিজে কৌপীন যখন শুকোতে দেয় সাধু, তখন এসে কেটে দেয়। ভিক্ষেয় বেরিয়ে সাধু জনে জনে নালিশ করে। আপনাকে রোজ-রোজ কে কৌপীন দেবে? একটা বেড়াল পুষুন। উপদেশ দিলে কেউ-কেউ। ভালো কথা—সাধু তখনি এক বেড়ালের বাচ্চা যোগাড় করলে। বেড়ালের ভয়ে পালাল ইঁদুর। কিন্তু বেড়ালের জন্যে রোজ-রোজ দুধ ভিক্ষে করে আনা কঠিন হয়ে উঠল। বারো মাস কে আপনাকে দুধ দেবে? একটা গরু পুষুন। বেড়ালও খাবে নিজেও পরিতৃপ্ত হবেন। তাই সই। দুধালো গরু আনলে সাধু। এখন থেকে ঘরে-ঘরে খড়-বিচালি ভিক্ষে করতে লাগল। নিত্যি-নিত্যি কে আপনাকে খড় জোগাবে? আপনার কুটিরের কাছে পতিত জমি পড়ে আছে, তাই চষে খড় লাগান। মন্দ কি, হাল-বলদ নিয়ে এসে পতিত জমিতে লাঙল চালাল সাধু। এখন তবে গোলাবাড়ি করতে হয়, নইলে ফসল রাখবে কোথায়? সাধু তাই নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, এমন সময় গুরু এসে উপস্থিত। চার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গুরু, প্রশ্ন করলেন, এ সব কী? সাধু অপ্রতিভ হয়ে গেল। বললে, ‘এক কৌপীনকা ওয়াস্তে।
এক কোপনির জন্যে এত কষ্ট! আর সংসারী লোকের স্ত্রী-পুত্র, চাকরি-বাকরি, ঘর-বাড়ি, জিনিস-পত্র, টাকা-পয়সা, লোক-লৌকিকতা—যন্ত্রণার কি অন্ত আছে? তাই তো চৈতন্যদেব বলেছেন, ‘শুন শুন নিত্যানন্দ ভাই, সংসারী জীবের কভু গতি নাই।’
তবে তাদের উপায়? হাসল রামকৃষ্ণ। বললে, উপায় তুমি।
হ্যাঁ, তুমি। তুমিই সমস্ত জীবের জননী। তুমি সংসারসারভূতা সুরেশ্বরী।
কিন্তু এ সব কথায় সারদার ষোলো আনা সুখ কই? তাকে যে পাড়ার সকলে ‘পাগলার বউ’ বলে খেপায়। স্বামীনিন্দা সহ্য করতে পারে না কিশোরী। পাছে বাড়িতে থাকলে পাড়া-বেড়ানো মেয়েদের মুখে স্বামীনিন্দা শুনতে হয়, সারদা চুপি-চুপি ভানু পিসির বাড়িতে চলে আসে। তার দাওয়ায় আঁচল বিছিয়ে শুয়ে থাকে নিরিবিলি।
জয়রামবাটির ক্ষেত্র বিশ্বাসের মেয়ে এই ভানু পিসি। কুড়ি বছর বয়সে বিধবা হয়ে চলে আসে বাপের বাড়িতে। সেই থেকেই আছে একটানা। সারদার উপরে বড় টান। তার পর রামকৃষ্ণ যখন আসে শ্বশুরবাড়ি, তখন আর-আর মেয়েরা তাকে ‘খ্যাপা জামাই’ বলে খেপালেও সে কিছুই বলতে পারে না, মুগ্ধের মত চেয়ে থাকে স্তব্ধ হয়ে।
খ্যাপা যখন তখন মুখের আর আগল কি। এমন সব কথা বলে রামকৃষ্ণ, হাসতে-হাসতে মেয়েদের পেট ছিঁড়ে যায়, লজ্জায় পালাবার পথ পায় না।
‘বেশ হল, আগড়াগগুলো সব উড়ে গেল।’ বললে রামকৃষ্ণ। ‘এবার বোসো তবে তোমরা গোল হয়ে। কথা হবে।
খ্যাপা বাতাস না এলে কি আর আতপের দিন স্নিগ্ধ হয়?
এক দিন ভানু পিসিকে জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণ, ‘তোমার নাম কি?
‘মানগরবিণী।’
সারদাকে নির্দেশ করল রামকৃষ্ণ। এ তোমার কি হয়? কি বলে ডাকে?’
‘পিসি বলে।’
‘তবে আজ থেকে তোমার নাম হল ভানু পিসি।’ বলেই গান ধরল রামকৃষ্ণ, ‘গরবিণী নাম ঘুচেছে।
মখুজ্জেদের পাগলা-জামাইয়ের কাছে ভানু পিসি যায়, এতে তার গৌর-দাদার বড় আপত্তি। কথা বলছে কথা বলছে, হঠাৎ এক সময় চেঁচিয়ে ওঠে রামকৃষ্ণ ‘ঐ গৌরদাদা এল!’ অমনি ভয়ে পুঁটলি পাকিয়ে যায় ভানু পিসি, দেখে রামকৃষ্ণ হাসে আর বলে, ‘লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন থাকতে নয়।’
‘আপনার কাছে আসি বলে আমার অনেক সইতে হয়।’ ম্লান মুখে বললে ভানু পিসি।
‘বেশ তো, যখন গৌরদাদা শাসাতে আসবে তখন দু’হাত তুলে নাচবি আর বলবি ভজ মন গৌর নিতাই। গৌরদাদা ভাববে তুই পাগল হয়ে গিয়েছিস, আর তোকে কিছু বলবে না।’
জয়রামবাটি থেকে কামারপুকুরে ফিরছে রামকৃষ্ণ। হঠাৎ ভানুর সঙ্গে দেখা। বললে, ‘আমাকে খিলি তৈরি করে খাওয়াতে পারিস?’
অমনি পান সাজতে ছুটল ভানু পিসি। পান নিয়ে ফিরে এসে দেখে, রামকৃষ্ণ অনেক দূর চলে গিয়েছে। ভানু পিসি পিছু-পিছু ছুটতে লাগল। কিন্তু মেয়েমানুষ কত দূর ছুটবে? তা ছাড়া রামকৃষ্ণ চলেছে জোর কদমে, যেমন তার অভ্যেস। পিছন থেকে নাম ধরে ডাকে এমনও সাহস নেই। তবু থামছে না ভানু পিসি, গোঁ-ভরে ছুটে চলেছে। দু-একখানা গ্রাম বুঝি পার হয়ে গেল, তবু নিবৃত্তি নেই। হঠাৎ, কেন কে জানে, রামকৃষ্ণ পিছন ফিরে দাঁড়াল। ভানু পিসিকে দেখে চক্ষু স্থির।
‘এ কি, তুই এত দূরে এসেছিস?’
‘আপনি যে তখন পান খেতে চাইলেন, তাই নিয়ে এসেছি। ‘আনন্দে পরিপূর্ণ ভানু পিসি।
ততোধিক আনন্দ রামকৃষ্ণের। বললে, ‘তোর হবে—তোর হবে।’ বলে হাতে পান নিয়ে হাসিমুখে বললে, ‘কী হবে বল দিকি?’
ভানু পিসি চোখ নামাল। তার সে কী জানে।
তোর আজ ঠেঙানি হবে। মেয়েমানুষ হয়ে এত দূর এলি, এখন বাড়ি ফিরে গেলে গোবেড়েন খাবি৷ এক কাজ কর। কুমোরবাড়ি থেকে একটা হাঁড়ি হাতে করে নিয়ে বাড়ি যা। তা হলে সবাই ভাববে কুমোরবাড়ি গিয়েছিলি।’
সেই থেকে ভক্তদের পান খাইয়ে এসেছে ভানু পিসি। বলেছে, ঠাকুরের প্রসাদী পান। ঠাকুর বলে গেছেন, তুমি আমাকে পান খাওয়াবে নিত্যি। ভক্তসেবাই আমার ঠাকুরসেবা।
শ্যামাসুন্দরী, সারদার মা—সেও আস্তে-আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। নির্জনে বসল গিয়ে ঠাকুরের আরাধনায়।
ভানু পিসি বিদ্রূপে ঝলসে উঠল, ‘কি গো, তখন না বলতে, খ্যাপা জামাই! কি আকাটের হাতে মেয়ে দিলাম—সারদার কত কষ্ট! এখন কেন? এখন কেন সেই খ্যাপা জামাইয়ের পট পুজো করছ?’
শ্যামাসুন্দরীর বাক্য স্তব্ধ। চক্ষু নিষ্পলক! মেনকাও এক দিন বসেছিল শিবের আরাধনায়।
কামারপুকুর থেকে একবার শিওড়ে গিয়েছে রামকৃষ্ণ, হৃদের বাড়িতে। দিদি হেমাঙ্গিনীর সঙ্গে দেখা করতে। সেখানে গিয়ে এক মহা ফ্যাসাদ! দিদি কতগুলো ফুল যোগাড় করেছে, বলছে তোমার পাদপদ্ম বন্দনা করব। কোনো বারণ শোনে না। ভোলে না ছদ্মবেশে। বলে, গরিবের ঘরে কাঙালের ঠাকুর এসেছ, তোমাকে ছাড়ব না কিছুতেই। জলে পা ধুয়ে দিয়ে চুল দিয়ে মুছে দেব। একটা শুধু বর দাও যেন কাশীতে গিয়ে প্রাণ যায়।
তথাস্তু। সজ্ঞানে কাশীতেই প্রাণত্যাগ করল হেমাঙ্গিনী।
‘কিন্তু আমার কেন ঘুম আসে না বলতে পারো?’ মধ্যরাত্রের অন্ধকারে বায়ু-রোগগ্রস্ত ভানু পিসি কেঁদে ওঠে।
‘ঘুম আসে না, ঘুমের ওষুধ তো আছে।’ কে যেন বলে ওঠে অন্ধকারে। ‘কি ওষুধ?’
‘সেই যে ভজ-মন-গৌর নিতাই।’
মনে পড়ে যায় ভানু পিসির। অন্ধকারে উঠে পড়ে বিছানা ছেড়ে। দু’হাত তুলে নাচ শুরু করে আর বলে, ভজ মন গৌরনিতাই। বলে, ‘ঠাকুর তুমি দেখ আর আমি নাচি।’
৩৬
তুমি দেখ আর আমি নাচি।
তুমি করাও আমি করি। কর্ম না করলে দর্শন হবে কি করে? পানা না ঠেললে জল দেখব কি করে?
তুমি আছ, শুধু এ জেনে কি বসে থাকলে চলবে? কাঠে আগুন আছে, শুধু এ তত্ত্বে কি ভাত রান্না হবে? পুকুরপাড়ে বসে থাকলেই কি মাছ পাব?
কর্ম করো। কর্মই ফল। খেলাই আসল, হার-জিৎ কিছু নয়। কমেই কৃপা। কর্মেই ভক্তি। কর্ম করতে-করতেই কর্ম ত্যাগ। এক হাতে ঈশ্বরকে ধরে আরেক হাতে কাজ করছ, শেষকালে এক দিন দু’হাতেই ঈশ্বরকে আঁকড়ে ধরবে। যদি একবার ভক্তি লাভ হয় তবে বিষয়কর্ম বিস্বাদ হয়ে যাবে। ওলা মিছরির পানা পেলে চিটে গুড়ের পানা কে খেতে চায়?
তাই তুমি দেখ আর আমি নাচি।
কামারপুকুরে থেকে স্বাস্থ্য ফিরেছে রামকৃষ্ণের। এবার ফিরতে হয় দক্ষিণেশ্বরে। চল রে হৃদু মা’র কাছে যাই।
বর্ধমানের কাছাকাছি এসে এক মাঠের মধ্যে বসে পড়ল রামকৃষ্ণ।
ওখানে কি?
দেখছিস না, মাঠময় কেমন কাঁটাফুল ফুটে আছে। জানিস না ঐ কাঁটাফুল মহাদেবের পছন্দ। ঐ কাঁটাফুলে পূজো করলে শূলপাণি প্রসন্ন হন।
কিন্তু মাঠময় তো শুধু বিষ্ঠা দেখতে পাচ্ছি। হৃদয় ধমকে উঠল৷
বিষ্ঠা-চন্দনে ভেদ নেই রামকৃষ্ণের। সেই মাঠের মধ্যেই বসে পড়ল শিবপূজায়। এ ভালো হচ্ছে না মামা। কলকাতায় যাবার এই একখানা মাত্র আজ ট্রেন। সারা রাত আজ আর ট্রেন নেই। যদি ঐ দুপুরের গাড়ি এখন ধরতে না পারি, তবে সারা দিন-রাত স্টেশনে পড়ে থাকতে হবে। কে শোনে কার কথা। রামকৃষ্ণ শিবধ্যানে সমাহিত হয়ে রইল।
শুচি-অশুচি জ্ঞান নেই—এ কেমনতরো উন্মাদ! ভীষণ বিরক্ত হল হৃদয়। এখন গাড়ি যদি ফসকে যায় উপায় কি হবে?
হঠাৎ হৃদয়ের সেই সাধুর কথা মনে পড়ে গেল, সেই জ্ঞানোন্মাদ সাধু। উলঙ্গ, গায়ে-মাথায় ধূলো, বড়-বড় নখচুলদাড়ি, কাঁধে মড়ার কাঁথার মত একটা ছেড়া কাঁথা। কালীঘরের সামনে দাঁড়িয়ে গমগমে গলায় এমন স্তব পড়লে যে মন্দিরটা পর্যন্ত কাঁপতে লাগল থরথর করে। প্রসাদ পেতে কাঙালীরা যেখানে বসেছে পাত পেড়ে সেখানে গিয়ে বসলে। তাড়িয়ে দিলে কাঙালীরা, চেহারায়-পোশাকে সে কাঙালীদের চেয়েও অধম। তাড়িয়ে দিলে বটে কিন্তু উপবাসী রইল না। যেখানে উচ্ছিষ্ট পাতাগুলো ফেলেছে সেখান থেকে কুকুরদের সঙ্গে ভাগ করে এঁটো ভাত খেতে লাগল—
মামা বললে, ওরে হৃদু এ যে-সে উন্মাদ নয়, এ জ্ঞানোন্মাদ।
তাই শুনে হৃদয় দেখতে ছুটল। বাগান পেরিয়ে চলে যাচ্ছে সাধু হৃদয় তার পিছু নিলে। বললে, মহারাজ, ভগবানকে কেমন করে পাব কিছু বলে দিয়ে যান-
পাগলের দৃক্পাতও নেই। হৃদয়ও নাছোড়বান্দা। সঙ্গে-সঙ্গে চলেছে, আর মুখে সেই এক বুলি। ভগবানকে কেমন করে পাব, কবে পাব, কোথায় পাব?
হঠাৎ রুখে দাঁড়াল পাগল। পথের ধারে নর্দমা ছিল তারই জল দেখিয়ে বললে, ‘এই নর্দমার জল আর ঐ গঙ্গার জল যখন এক বোধ হবে তখন পাবি।
তখন? এ কি একটা মনের মতন কথা হল? নিশ্চয়ই আরো অনেক তর্ক-তত্ত্ব আছে। হৃদয় ফের পিছু নিল। বললে, ‘মহারাজ, আমাকে আপনার চেলা করে সঙ্গে নিন।
তবে রে? মাটি থেকে একটা ইট তুলে নিল পাগল। হৃদয়কে মারতে তাড়া করলে। হৃদয় ছুটে পালাল, দেখতেও পেল না কোন দিকে চলে গেল সেই জ্ঞানোন্মাদ।
মামারও এখন দেখি সেই অবস্থা। নইলে মাঠময় বিষ্ঠার মধ্যে বসে শিবপূজা। শুচি-অশুচি জ্ঞান-অজ্ঞানের পারে যেতে না পারলে ভগবানের স্পর্শ পাওয়া যাবে না। ঐ দ্বন্দ্ববোধের ঊর্ধ্বেই তো সেই ভূমা-ভূমি। শুচি-অশুচিরে লয়ে দিব্য ঘরে কবে শুবি। তাদের দুই সতীনে পিরীত হলে তবে শ্যামা মারে পাবি।’
পুজো শেষ করে ইস্টিশানে পৌঁছে দেখে—যা ভেবেছিল হৃদয়—কলকাতার ট্রেন চলে গিয়েছে। দিনে-রাতে আর ট্রেন নেই৷
‘তখন বলেছিলাম না?’ হৃদয় খিঁচিয়ে উঠল, এখন কি করবে কোথায় থাকবে, দেখ। চেনাশোনা আত্মীয়বন্ধু কেউ নেই এখানে যেখানে থাকা যায়, খাওয়া যায় দুটি পেট ভরে।’
রামকৃষ্ণ নিরুত্তর। আত্মন্যেবাত্মনা তুষ্ট। স্থিতি-গতি উদ্যাতি-বিরতি সব সমান। ইস্টিশানের অফিসে খোঁজ নিতে গেল হৃদয়। বাঁধাধরা ট্রেন আর নেই বটে তবে একটা সুবিধে হতে পারে। বললে স্টেশন মাস্টার। কাশী থেকে একটা স্পেশাল গাড়ি আসছে খানিক পরেই—ঊর্ধ্বতন এক কর্মচারীর স্পেশাল—দেখি তার মধ্যে কোনো এক ফাঁকে জায়গা করে দিতে পারি কিনা। গাড়ি কলকাতায়ই যাচ্ছে, ভয় নেই।
সাধারণ যাত্রীর অধিকার নেই সেই গাড়িতে কিন্তু স্টেশন-মাস্টারের মধ্যে কি ভাব চলে এল কে জানে, মামা-ভাগ্নেকে একটা নিরালা কামরায় চড়িয়ে দিলে নির্ভাবনায়।
হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল একবার রামকৃষ্ণ।
দক্ষিণেশ্বরে ফিরে এসে শুনল মথুরবাবু আর তাঁর স্ত্রী তীর্থে যাবেন বলে ধুয়ো তুলেছেন। তাঁদের সাধ রামকৃষ্ণও তাঁদের সঙ্গে যাক। যাবে?
মন্দ কি। যেখানে অনেক লোক একত্র হয়ে অনেক দিন ধরে ঈশ্বরের জন্যে ব্যাকুল হয়ে জমায়েত হচ্ছে সেখানে ঈশ্বর নিশ্চয় প্রকাশিত। এত সাধু ভক্ত যোগী সন্ন্যাসী যেখানে গিয়ে ঈশ্বরভাবে উদ্দীপ্ত হচ্ছে তার মাহাত্ম্য কে অস্বীকার করবে? মাটি খুঁড়লে সব জায়গায়ই জল পাওয়া যায় বটে, কিন্তু যেখানে পাতকো-ডোবা পুকুর-পুষ্করিণী আছে সেখানে জল সহজে মেলে, সেখানে আর খুঁড়তে হয় না মেহনৎ করে। যেখানে-সেখানেই রান্না করা যায় বটে কিন্তু রান্নাঘরে বেশি সুবিধে।
আমি গেলে আমার সঙ্গে যাবে কিন্তু হৃদয়রাম।
নিশ্চয়ই যাবে। স-শো লোক চলেছে একসঙ্গে—দস্তুরমত একটা বাহিনী বলতে পারো। থার্ড ক্লাশ তিনখানি আর সেকেণ্ড ক্লাশ একখানি গাড়ি রিজার্ভ হয়েছে। যে কোনো স্টেশনে ইচ্ছেমত কাটিয়ে নেওয়া যাবে। গাড়ির শেষ গন্তব্য কাশীধাম।
কা শীতলা গঙ্গা? কাশীতলা গঙ্গা। সেই কাশী।
মাঘ মাস, ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে তীর্থভ্রমণে বেরুল রামকৃষ্ণ। যাবার আগে ভবতারিণীকে প্রণাম করলে। বললে, ‘মা গো, তোকে আরেক বেশে আরেক দেশে দেখে আসি। বেদে যার কথা তন্ত্রেও তার কথা পুরাণেও তারই কথা। সবই তুই। তোর শুধু ভোল ফিরিয়ে মন ভোলানো!
হলধারী কবেই পূজকের পদ থেকে অবসর নিয়েছে, এখন অক্ষয় বসেছে মন্দিরে। যে খুশি তোর পুজো করুক, আমি এখন পরিত্যক্তকর্মা পরমাত্মা।
বৈদ্যনাথধামে নামল প্রথম তীর্থযাত্রীরা।
কিন্তু রামকৃষ্ণের চোখ পড়ল অনাথ-দরিদ্রের দিকে। কোন এক গ্রাম অতিক্রম করে যাচ্ছে, দেখল গ্রামবাসীদের পরনে কাপড় নেই, মাথায় তেল নেই এক ফোঁটা। চলতে-চলতে থেমে পড়ল রামকৃষ্ণ। বললে, কোন বৈদ্যনাথকে দেখতে চলেছি? কত দূরে?
বৈদ্যনাথকে তোরা চিনবি না। দেখে নে একবার এই অনাথের নাথকে।
‘তুমি তো মা’র দেওয়ান।’ রামকৃষ্ণ ধরল মথুরকে, ‘এদের এক মাথা করে তেল আর একখানা করে কাপড় দাও। আর পেট ভরে খাইয়ে দাও এক দিন। মথুরবাবু গাঁইগুঁই করতে লাগলেন। ‘বাবা, তীর্থে অনেক খরচ হবে। এতগুলি লোক খাওয়াতে-দাওয়াতে গেলে টাকার টানাটানি পড়ে যাবে, সামলাতে পারবো না।’
করুণায় কোমল রামকৃষ্ণ প্রচণ্ড নিষ্ঠুর হয়ে উঠল। বললে, ‘দূর শালা, তোর কাশী আমি যাব না। তুই যা তোর দলবল নিয়ে। আমি এদের কাছেই থাকব, এদের ছেড়ে যাব না কিছুতেই।’
সেই অটল প্রতিজ্ঞার কাছে নত হলেন মথুরবাবু। কলকাতা থেকে কাপড় আনালেন, স্থানীয় বাজার থেকে তেল কেনালেন, পাঁটাও। মহাপ্রসাদের ভোগ লাগিয়ে দিলেন একদিন।
গ্রামবাসীর আনন্দেই রামকৃষ্ণের আনন্দ। যদি তুমি দারিদ্রমোচন না করো, তবে তুমি কিসের বৈদ্যনাথ?
সাতদিন দেরি হয়ে গেল কাশী যেতে। তা হোক। তবু মা, তুই আমাকে শুকনো সন্ন্যাসী করিস নে। আমাকে করুণা-কোমলতা দে। আমাকে রসে-বশে রাখ। আমি চিনি খাব, চিনি হব কেন? একটু খানি অহং আমার রেখে দে। সোনার একটু কণা, আগনের একটি ফিনকি। ওটুকু অহং না থাকলে বিলাস করব কি করে? তুমি-আমি আস্বাদন করব কি করে? কি করে ভক্তের রাজা হব?
দূর থেকে দেখা যাচ্ছে কাশী। ‘কাশী সর্বপ্রকাশিকা।’ ‘যেষাং ক্বাপি গতির্নাস্তি তেষাং বারাণসী গতিঃ।’
নৌকো করে ঢুকতে হল কাশীতে। ভাবনেত্রে রামকৃষ্ণ দেখল কাশী স্বর্ণময়ী। কাঠমাটিপাথর কিছুই নেই। আগাগোড়া সুবর্ণমণ্ডিত। তার মানে অক্ষয় নিত্যধাম এই কাশীধাম–জ্যোতির্ময় সব ভাব আর ভক্তি একে কনকান্বিত করে রেখেছে।
কিন্তু ক’দিন পরেই বললে হৃদয়কে, ‘ওরে এখানেও যা সেখানেও তাই। সেখানকার আমগাছ তেঁতুলগাছ বাঁশঝাড়টি যেমন এখানকার সেগুলিও তেমনি। এখানে তবে আর কি দেখতে এলাম রে? সেখানেও যা এখানেও তাই।’
পরে ভক্তদের তাই বলতেন ঠাকুর, ‘ওরে যার হেথায় আছে—তার সেথায় আছে। যার হেথায় নেই তার সেথায়ও নেই।’
‘যদেতেহ তদমুত্র যদমুত্র তদন্বিহ।’ যা এখানে তাই সেখানে, যা সেখানে তাই এখানে। ‘তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।’
কেদারঘাটের পাশে দুখানি বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন মথুরবাবু। কাশীতে এসেও তাঁর রাজসিকতার অন্ত নেই। মাথায় রূপোর ছাতা, সঙ্গে আসাবরদার—চলেছেন যেন কোন রাজারাজড়া। বাইরে ঐশ্বর্যের জেল্লা কিন্তু অন্তরে দীনবন্ধুর দাক্ষিণ্য। রোজ পানসিতে চেপে বিশ্বনাথ দর্শনে যায় রামকৃষ্ণ। সেদিনও তেমনি যাচ্ছে। মণিকর্ণিকার পাশে শ্মশান। সেখান দিয়ে যাবার সময় দেখল চিতায় মড়া পোড়ানো হচ্ছে, ধোঁয়ায় দিক-পাশ আচ্ছন্ন। দেখেই উৎফুল্ল হয়ে নৌকোর বাইরে চলে এল রামকৃষ্ণ, দিব্যভাবে সমাধিস্থ হয়ে গেল। টলে পড়ে যাচ্ছিল বুঝি, ধরতে এল মাঝি-মাল্লারা। কাউকে ধরতে হল না। রামকৃষ্ণ নিজেই নিশ্চেষ্টতার মধ্যে স্থির হয়ে আছে। মুখে দিব্য দীপ্তির প্রসাদ।
কি দেখলাম জানিস? ধ্যান ভাঙবার পর বললে রামকৃষ্ণ। দেখলাম প্রকাণ্ড এক সিতগাত্র পুরুষ শ্মশানে প্রত্যেক শবের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। প্রত্যেককে তুলে নিচ্ছে হাতে করে আর তার কানে তারকব্রহ্ম-মন্ত্র উচ্চারণ করছে। শবের অন্য পাশে বসে আছে শক্তিময়ী মহাকালী—একে-একে জীবের সকল সংস্কার-বন্ধন খুলে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, নির্বাণের দ্বার খুলে দিয়ে অখণ্ডের ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছে তাকে। যা বহু জন্মের যোগসাধনায় পাওয়া যায় তা শুধু কাশীতে মরে বিশ্বনাথের থেকে আদায় করে নিচ্ছে।
কাশীতে মৃত্যু মানেই নির্বাণপদবী।
কাশীতে এক দিন ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে দেখা। সেই ত্রৈলঙ্গ স্বামী! মা’কে শ্মশানে পোড়াতে এসে যে আর ঘরে ফিরল না, সেই শ্মশানেই থেকে গেল।
কাশীতে একবার পদ্মাসনে গঙ্গার উপর বসে ছিল ত্রৈলঙ্গ স্বামী। নৌকো করে এক ম্যাজিষ্ট্রেট যাচ্ছিল সেখান দিয়ে। দৃশ্য দেখে তার চোখ তো চড়ক গাছ। নৌকোয় তুলে নিল সাধুকে। কত আলাপ-বিলাপ শুরু করল, কিন্তু সাধু মৌনী।
কোমরে একটা তরোয়াল ঝুলছিল ম্যাজিষ্ট্রেটের। ত্রৈলঙ্গ স্বামী তা দেখতে চাইলে।
কেন চাইলে কে জানে। হঠাৎ সাধুর হাত ফসকে জলের মধ্যে পড়ে গেল তরোয়াল। এখন উপায়? ভীষণ চটে উঠল ম্যাজিষ্ট্রেট। খুব বকতে লাগল সাধুকে। ঠিক করল পারে গিয়েই পুলিশে দেবে।
পারে এসে নৌকো লাগতেই জলের মধ্যে হাত ডোবাল সাধু। একখানি নয় তিন-তিনখানি তরোয়াল উঠে এল জলের থেকে। তোমার কোনটা? ম্যাজিষ্ট্রেট তো অবাক। এইটে তোমার। যেখানা তার ঠিক তা বেছে দিয়ে দিলে ম্যাজিস্ট্রেটকে। বাকি দুখানা ফেলে দিলে জলের মধ্যে।
আরেক বার উলঙ্গ হয়ে গঙ্গাতীরে বসে আছে ত্রৈলঙ্গ স্বামী। ম্যাজিষ্ট্রেটের হুকুমে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল। উলঙ্গ হয়ে থাকা অপরাধ। বারে বারে আইন লঙ্ঘন করছে সাধু একেবারে হাজতে ঢুকিয়ে দাও। কিন্তু কতক্ষণ পরে ম্যাজিষ্ট্রেট দেখে গঙ্গাতীরে তেমনি উলঙ্গ হয়ে ত্রৈলঙ্গ স্বামী বসে আছে। এ কি, ঘুষ খেয়ে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিলে নাকি হাজত থেকে? ম্যাজিষ্ট্রেট ছুটল অমনি হাজত দেখতে৷ এ কি! হাজতের মধ্যেই তো বসে আছে ত্রৈলঙ্গ স্বামী। অমনি আবার ছুটল গঙ্গাতীরে। গঙ্গাতীরেই তো ত্রৈলঙ্গ স্বামী বসে আছে উলঙ্গ হয়ে।
তাকে খালাস দিয়ে দিল। কারাগারের দেয়াল যাকে আবদ্ধ করতে পারে না, বসন তাকে কি করে আবৃত করবে?
সেই ত্রৈলঙ্গ স্বামী।
রামকৃষ্ণ দেখল সাক্ষাৎ বিশ্বনাথ। সাক্ষাৎ শ্বেতশিখা। সমস্ত কাশীধাম উজ্জল করে আছে।
শরীরে কোনো হুঁস নেই। তপ্ত বালিতে পা রাখা যায় না, তারই উপর সুখে শুয়ে আছে। যদি বৃষ্টি পড়ে তেমনি শুয়ে থাকবে নিশ্চিন্ত হয়ে।
এক দিন নিজ হাতে পায়েস রেঁধে খাইয়ে এল রামকৃষ্ণ। মৌনাবলম্বন করে রয়েছে, তাই কথা হল না। মুখের কথা না হোক, ইশারা-ইঙ্গিতে আলাপ করতে লাগল দুজনে। যেন এক দেশের মানুষ। একই ভাষাভাষী। যেন কত আগের চেনা। রামকৃষ্ণ প্রশ্ন করল ইশারায়, ‘ঈশ্বর এক না অনেক?
ইশারায়ই উত্তর দিল ত্রৈলঙ্গ স্বামী, ‘যদি সমাধিতে দেখ তবে এক, আর যদি জ্ঞানদৃষ্টিতে দেখ তবে বহু। আমি তুমি জীব জগৎ সমস্ত।’
স্বর এক। শুধু রাগরাগিণীর নানা নাম। সবস্তু এক, তার বর্ণনা বিচিত্র ‘একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি।’
বুঝলি?’ হৃদয়কে বললে রামকৃষ্ণ, ‘একেই বলে ঠিক-ঠিক পরমহংস অবস্থা।’
৩৭
কাশীর থেকে প্রয়াগ। পুণ্য সঙ্গমে স্নান আর তিন রাত্রি বাস চাই প্রয়াগে। মথুরবাবুরা সেখানে মাথা মুড়লেন। রামকৃষ্ণ বললে, আমার দরকার নেই।
আমার শরীর কাশীক্ষেত্র। ত্রিভুবনজননী গঙ্গা আমার জ্ঞানগঙ্গা। ভক্তি-শ্রদ্ধা আমার গয়া। গুরু চরণধ্যানযোগ আমার প্রয়াগ। আর যিনি সকলজনমনসাক্ষী তিনি আমার অন্তরাত্মা। ‘দেহে সর্বং মদীয়ে যদি বসতি পুনস্তীর্থমন্যৎ কিমস্তি। আমার দেহেই যখন সকলে বাস করছে তখন আমার আবার তীর্থান্তর কী!
প্রয়াগ থেকে ফের সকলে ফিরল বারাণসী। ‘বিরিঞ্চি-বিরচিতা বারাণসী’। এক দিন চৌষট্টি-যোগিনী পাড়া দিয়ে যাচ্ছে রামকৃষ্ণ, সঙ্গে হৃদয়, কাকে দেখে থমকে দাঁড়াল।
‘ওরে হৃদু ও আমাদের সেই বামনি না?’
সত্যিই তো, সেই যোগেশ্বরী ভৈরবী। কী আশ্চর্য, এখানে কোথায় আছ?
আছি এ পাড়ায়, মোক্ষদার বাড়িতে। মোক্ষদা আমার মূর্তিমতী প্রণতি।
‘তুমি আমাদের সঙ্গে বৃন্দাবন চলো।’
‘চলো।’
গঙ্গাতীরে এসে দাঁড়াল রামকৃষ্ণ। বললে, মা, তোকে ছেড়ে এখন যমুনায় চলেছি। সেই মুরারিকায়কালিমাময়ী সদাসিতা যমুনা। মা গো, তুই দুর্গা, গঙ্গা, গগন-বাসিনী। তুই পাষাণভেদিনী খড়্গাহস্তা। জন্মপ্রবাহহরণী পারায়ণপরায়ণা।
আর যমুনা মধুবনচারিণী রাসেশ্বরী। অশেষনায়িকা কৃষ্ণকান্তা। দুজনেই মা, মহানন্দা মোক্ষদাত্রী। দুজনেই প্রাণদা প্ৰাণনীয়া।
নিধুবনের কাছে বাড়ি ভাড়া করলেন মথুর। কিন্তু চার দিকে চোখ চেয়ে এ সব কী দেখছে রামকৃষ্ণ। দেখছে না কাঁদছে। চোখের জলে বুক ভেসে যাচ্ছে। বলছে, ‘কৃষ্ণ রে, সবই তো রয়েছে, কেবল তোকে দেখতে পাচ্ছি না।’
বাঁকাবিহারীর মূর্তি দেখে বিহ্বল হয়ে গেল। ছুটল আলিঙ্গন করতে। গোবর্ধন দেখে আবার ভাবাবেশ। ভাবাবেশে উঠল গিয়ে একেবারে গিরিচূড়ায়। আর নামে না। তখন ব্রজবাসীদের পাঠিয়ে নামিয়ে আনলেন মথুরবাবু।
সন্ধের দিকে যমুনাতীরে বেড়ায় আর কলিন্দনন্দিনীর গুণগান করে। যমুনার চড়ার উপর দিয়ে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছে রাখালেরা। দেখেই কৃষ্ণের উদ্দীপনা উপস্থিত। ‘কৃষ্ণ কই কৃষ্ণ কই’ বলতে-বলতে ছুটল তাদের পিছু-পিছু। ওরে তোরাই আমার সেই লীলামানুষবিগ্রহ নারায়ণ।
কালীয়দমনের ঘাটে এসে আবার ভাবাবেশ। স্নান করবে কিন্তু শরীরে বশ নেই। ছোট ছেলেটিকে যেমন করে নাওয়ায় তেমনি করে নাইয়ে দিলে হৃদয়।
এইখানেই গঙ্গাময়ীর সঙ্গে দেখা।
ষাট বছর বয়স, নিধুবনের কাছে কুটির বেঁধে একলাটি থাকে গঙ্গাময়ী। ললিতা সখী হয়ে রাধিকার সেবাচর্যা করে। প্রেমরূপা যে ভক্তি করে তার সাধন-মোদন। দুজন দুজনকে চিনে ফেলল। রামকৃষ্ণ বললে, তুমি ললিতা-সখী। গঙ্গাময়ী বললে, তুমি রাসেশ্বরী রাধিকা। তুমি আমার দুলালী, রাজদুলালী।
রামকৃষ্ণকে গঙ্গাময়ী দুলালী বলে ডাকে। কৃষ্ণপ্রাণাধিকা বিষ্ণুমায়া!
গঙ্গাময়ীকে পেয়ে সব ভুল হয়ে যায় রামকৃষ্ণের। কখন বা খাওয়া-দাওয়া, কখন বা বাড়ি ফিরে যাওয়া। কোথায় বাড়ি, কি বা আহার! ভোক্তাও নেই ভোজ্যও নেই চলেছে তবু ভোজনের আস্বাদ।
এক-এক দিন বাসা থেকে খাবার নিয়ে এসে খাইয়ে যায় হৃদয়। কোনো-কোনো দিন গঙ্গাময়ীই খাইয়ে দেয় রান্না করে।
থেকে-থেকে ভাব হয় গঙ্গাময়ীর। সে ভাব দেখবার জন্যে ভিড় জমে চার দিকে। এক দিন হল কি, ভাবাবেশে গঙ্গাময়ী হৃদয়ের কাঁধের উপর চড়ে বসল।
এ তো বড় বিপদ হল দেখছি।’ হৃদয় ঝটকা মারল, কড়া গলায় বললে রামকৃষ্ণকে, ‘তুমি চলো এখান থেকে। একেবারে সটান দক্ষিণেশ্বর। বিন্দেবনে আর কাজ নেই ।
কিন্তু রামকৃষ্ণ ঠিক করল আর ফিরবে না। গঙ্গাময়ীর আশ্রয়ে থেকে যাবে ব্রজধামে। শ্রীমতী হয়ে শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করবে।
মথুরবাবু ভাবনায় পড়লেন। ডাকতে বসলেন মহামায়াকে। মা গো, আমার দক্ষিণেশ্বর কি দক্ষিণাহীন হয়ে যাবে?
হৃদয় ধমকে উঠল, ‘তোমার এত পেটের অসুখ, তোমাকে এখানে দেখবে কে?’
‘কেন, আমি দেখব। আমি সেবা করব।’ বললে গঙ্গাময়ী।
কিন্তু খাবে কি? শোবে কোথায়?
সেদ্ধ চালের ভাত খাব। শোব এই গঙ্গাময়ীর ঘরেই। গঙ্গাময়ীর বিছানা ঘরের ওদিকে হবে, আমারটা এদিকে হবে। ভাবনা কি।
ওসব চলবে না চালাকি। হৃদয় রামকৃষ্ণের হাত ধরে টানতে লাগল, ‘ওঠো। চলো।’
আরেক হাত ধরে টানতে লাগল গঙ্গাময়ী। বললে, ‘না, দেব না। কিছুতেই যেতে দেব না।’
দুজনের টানাটানিতে রামকৃষ্ণ নাজেহাল। এক দিকে রাধিকা অন্য দিকে কালী। এক দিকে মহাভাব অন্য দিকে মহামায়া।
সেই টানাটানিতে মা’র কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল রামকৃষ্ণের। মা’র কথা মানে চন্দ্রমণির কথা। মা সেই কালীবাড়ির নবতে বসে আছেন একলাটি। বসে আছেন রামকৃষ্ণের পথ চেয়ে।
মন স্থির করতে আর দেরি হল না রামকৃষ্ণের। বললে, ‘না, আমার আর এখানে থাকা হবে না। আমাকে মা ডাকছেন।’
মা সকল তীর্থের ঊর্ধ্বে। মা স্বর্গের চেয়েও গরীয়সী।
ওরে সংসারে বাপ-মা পরম গুরু যথাসাধ্য ওঁদের সেবা করতে হয়। যে চরম দরিদ্র, যার শ্রাদ্ধ করবারও ক্ষমতা নেই সে অন্তত বনে গিয়ে তাঁদের কথা মনে করে কাঁদবে। কেবল ঈশ্বরের জন্যে বাপ-মা’র আদেশ লঙ্ঘন করা চলে—আর কিছুতে নয়। বাপের কথায় প্রহ্লাদ ছাড়েনি কৃষ্ণনাম। কৈকেয়ীর কথায় ভরত ছাড়েনি রামসেবা। মা বারণ করলেও ধ্রুব বনে গিয়েছিল তপস্যা করতে। রামের জন্যে রাবণের কথা শোনেনি বিভীষণ। ভগবানের জন্যে বলি তার গুরু শুক্রাচার্যকে অমান্য করেছে। আর কৃষ্ণকামিনী গোপিনীরা মানেনি তাদের পতির আধিপত্য। মা কি কম জিনিস গা? শচী বললেন, কেশব ভারতীকে কাটব। চৈতন্যদেব অনেক করে বোঝালেন। বললেন, ‘মা, তুমি অনুমতি না দিলে আমি যাব না। তবে জানো তো, সংসারে আমি যদি থাকি, তবে আমার দেহ আর থাকবে না। তবে এটুকু বলে দিচ্ছি মা, যখনই মনে করবে, আমাকে দেখতে পাবে। আমি তোমার কাছে-কাছেই থাকব।’ তবে শচীমাতা অননুমতি দিলেন।
আর, নারদের কথা জানো না? মা তাঁর যত দিন বেঁচে ছিল সে তপস্যায় যেতে পারেনি। সে নইলে মা’র সেবা করবে কে? মা’র দেহত্যাগ হল, তবে বেরুল হরিসাধনে।
‘টানাটানিতে মা’র কথা মনে পড়ে গেল। অমনি বদলে গেল সমস্ত। ভাবলাম, মা বুড়ো হয়েছেন, মা’র চিন্তা থাকলে ঈশ্বর-ফিশ্বর সব ঘুরে যাবে। তার চেয়ে তাঁর কাছেই যাই। গিয়ে সেখানেই ঈশ্বরচিন্তা করি নিশ্চিন্ত হয়ে।
হাজরার মা রামলালকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে দক্ষিণেশ্বরে, রামলালের খুড়োমশায় যেন হাজরাকে একবার পাঠিয়ে দেন তাঁর কাছে।
ঠাকুর বললেন হাজরাকে, ‘বুড়ো মা, যাও, একবার দেখা দিয়ে এস।
কিছুতেই গেল না হাজরা। তার মা কেঁদে-কেঁদে মরে গেল।
নরেন বললে, ‘এবারে হাজরা দেশে যাবে।’
এখন দেশে যাবে, ঢ্যামনা-শালা। দূর-দূর-
আচ্ছা, নিজের মা’র রূপ কি ধ্যান করতে পারা যায়? এক দিন জিজ্ঞেস করল মণি মল্লিক৷
‘হ্যাঁ, মা গুরু। ব্রহ্মময়ীস্বরূপা। মাকেই ধ্যান করবি।’
মা ধরিত্রী জননী দয়ার্দ্র হদয়া নির্দোষা সর্বদুঃখহা। পরমা মায়া পরমা ক্ষমা পরমা শান্তি। মা’র মত এমন ধ্যানের মূর্তি আর কী আছে?
গিরিশ ঘোষ বসল এসে ঠাকুরের পদচ্ছায়ে। বললে, আমাকে ত্রাণ করুন।
আমি ত্রাণ করবার কে?
মনে আছে কামারপুকুরের সেই মাগুর মাছটাকে আপনি পায়ে ঠেলে ঠেলে জলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মাছটা নিরাশ্রয় হয়ে চলে এসেছিল মাটিতে। আপনি তাকে স্বধামে পাঠিয়ে দিলেন। তেমনি যদি পাপার্ত জীব আপনার পায়ে এসে পড়ে, আপনি তাকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাবেন না মোক্ষধামে?
আমি পাপ মানি না। পাপী বলে বিশ্বাস করি না কাউকে। আমার যেমন সাধুরূপী নারায়ণ তেমনি আবার ছলরূপী নারায়ণ, লুচ্চারূপী নারায়ণ—
মুগ্ধের মত তাকিয়ে রইল গিরিশ ঘোষ।
গাড়ি করে যাচ্ছি, বারান্দার উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখলাম দুই বেশ্যা। দেখলাম সাক্ষাৎ ভগবতী—দেখে প্রণাম করলাম। শোন, বলি তোকে, কাঁদতে হবে। মল্লিকের মা জিজ্ঞেস করলে, ওদের কি কোনো মতেই উদ্ধার হবে না? নিজে আগে-আগে অনেক রকম করেছে কিনা! বলল,ম, হ্যাঁ, হবে—যদি আন্তরিক ব্যাকুল হয়ে কাঁদে। শুধু হরিনাম করলে কি হবে, আন্তরিক কাঁদা চাই। তাই তোকে বলি, তুই কেঁদে-কেঁদে মাকে একবার ডাক মনের থেকে। যতই তোর পাপ হোক, যতই তুই ক্লেদে-আবর্জনায় ডুবে থাক, মাকে ডাকলে মা এসে তোকে মুক্ত করে দেবেনই—
তেমনি গিরিশ গেল আবার শ্রীমার পদাশ্রয়ে। বললে, আমাকে ত্রাণ করুন।
আমি ত্রাণ করবার কে?
মনে আছে জয়রামবাটিতে একটা বাছুরের কান্না শুনে আপনি তার বাঁধন খুলে দিয়েছিলেন। দিয়েছিলেন তাকে তার অমৃতলাভের অধিকার। তেমনি, মা, কত বাসনা-কামনার বন্ধনে বাঁধা পড়ে আছি। স্বহস্তে খুলে দিন শৃঙ্খল। বুঝতে দিন পরমার্থের আস্বাদ।
‘ঠাকুর বলতেন বিচি খোলা বাদ দিলে সব বেলটা পাওয়া যায় না। তুমি তো সম্পূর্ণ বেল। তুমি তো ভৈরব। তোমার তবে আর ভয় কি।’
গিরিশ ঘোষ স্তব করতে বসল।
‘জগজ্জনন্যৈ জগদেকপিত্রে নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায়।’
৩৮
মথুরায় গেল রামকৃষ্ণ। দাঁড়াল ধ্রুব ঘাটে। স্পষ্ট দেখল সেই জন্মাষ্টমীর দৃশ্য। শিশু-কৃষ্ণকে বুকে করে যমুনা পার হয়ে যাচ্ছে বসুদেব।
দিন পনরো ছিল মোট বৃন্দাবনে। ছিল বৈষ্ণববেশে। গায়ে আলখাল্লা, পরনে ডোর-কোপনি। কপালে-গলায় ঢুকে-বাহুতে তিলক আঁকা। কাঁধে কাঁথার ঝুলি। কণ্ঠে তুলসী কাঠের মালা।
বামনিকে বললে, ‘কোথায় মরবে? কাশী না বৃন্দাবন?’
‘কাশী।’
তবে ফিরে চলো কাশীতে। স্বস্থানে গিয়ে অধিষ্ঠিত হও।
কাশীতে এসে রামকৃষ্ণ বললে, ‘বীণ শুনব।
মদনপুরায় মহেশ সরকার ওস্তাদ বীণকার। দেশ-বিদেশে প্রচণ্ড নাম-ডাক। হৃদয় খবর নিয়ে এল। চল তবে যাই ওস্তাদের বাড়িতে। বীণ শূনে আসি।
মথুরবাবু বললেন, ‘ওখানে যাবে কেন? তাঁকে এখানে ডেকে আনি, ফরমাস মতো শোনো তোমার যতো ইচ্ছে—’
রাখো তোমার মিথ্যে মর্যাদার চটকদারি। এত বড় যে বাজিয়ে সে তো প্রকাণ্ড সাধক, তার খেয়াল রাখো? স্বয়ং বিশ্বযন্ত্রী ঈশ্বর তার স্পর্শে এসে ঝংকৃত হচ্ছেন। সে তো বিভূতি ভূষিত। চল রে হৃদু শুনে আসি। যা-ই শোনা তাই দেখা। ‘যাহা শুনি কর্ণপুটে সকলি মা’র মন্ত্র বটে।’
দুজনে এসে হাজির হল মদনপুরায়। সটান মহেশ সরকারের বাড়িতে। মহেশ সরকার বাইরের ঘরেই বসেছিল। রামকৃষ্ণ বললে, ‘বীণ শোনাও।’ এ যেন স্বয়ং বীণাবাদিনীর আদেশ। মহেশ সরকার বীণ তুলে নিল। ঝংকার তুললে।
সুর-সাগরে অমৃতের ঢেউ খেলে গেল। মুহূর্তে ভাবাবেশে বিহ্বল হয়ে পড়ল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘মা গো, আমায় বেহুঁস করে রাখিস নে, আমায় হুঁস দে! আমি ভালো করে বীণা শুনি।’
রামকৃষ্ণ সমাধি-ভূমি থেকে নেমে এল। নেমে এল অনুভূতির ভূমিতে। বাহ্যজ্ঞানের শেষ প্রান্তে। ঠায় তিন ঘণ্টা বীণ শুনলে একটানা।
শুধু কি বীণা শুনলাম? শুনলাম এই সমস্ত বিশ্বসৃষ্টিটাই একটা অপূর্ব সুর-ঝংকার। গ্রহে-নক্ষত্রে বৃক্ষে-তৃণে, নীহারিকা থেকে ধূলিকণায়, প্রত্যেকটি পলায়মান মুহূর্তকণায়, বাজছে এই গীতছন্দ। ছুটেছে ভুবনপ্লাবিনী সুরশৈবলিনী। যা শোনা তাই আবার দেখা।
রামকৃষ্ণ দেখল সেই সুরশব্দ যেন একটা উজ্জল চৈতন্যের মত প্রতিভাত। যেন সূর্য উঠেছে রাত্রির আকাশে। ইন্দ্রিয়ের জগতে চৈতন্যের আবির্ভাব। হৃদাকাশে চিদাদিত্য।
বীণার সঙ্গে-সঙ্গে রামকৃষ্ণ গলা মিলিয়ে গান ধরল।
মথুরবাবু বললেন, ‘এবার গয়া যাব। তুমি যাবে?’
সর্বনাশ! গয়ায় গেলে এ দেহ কি আর থাকবে? জানো না আমার বাবার সেই স্বপ্নের কথা?
তাই গয়ায় আর নামলেন না মথুরবাবু। জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সবাইকে নিয়ে ফিরে এলেন দক্ষিণেশ্বর।
আবার সেই অনন্ত আনন্দ-তীর্থ।
রামপ্রসাদ গেয়েছে, এ সংসার ধোঁকার টাটি। রামকৃষ্ণ গাইলে, ‘এ সংসার মজার কুটি। ও ভাই আনন্দবাজারে লুটি।’
বৃন্দাবনের রাধাকুণ্ড আর শ্যামকুণ্ড থেকে ধূলো নিয়ে এসেছে রামকৃষ্ণ। কিছুটা পঞ্চবটীর চার দিকে ছড়িয়ে দিল আর কতক পুঁতলে তার সাধন-কুটিরের মধ্যে। এই সেই কুটির যেখানে বসে হয়েছিল তার নির্বিকল্পসমাধি। হয়েছিল ব্রহ্ম-সাক্ষাৎকার।
‘ব্রহ্ম কেমন বল না?’
ঘি খেয়েছিস তো? বল তো কেমন ঘি? কেমন ঘি, না, যেমন ঘি! তেমনি ব্রহ্মর উপমা ব্রহ্ম। তাকে বোঝাব কি দিয়ে?
সেই পণ্ডিতের গল্প জানো না? এক রাজাকে রোজ ভাগবত শোনাত। আর পড়ার শেষে রোজই রাজাকে জিজ্ঞেস করত, রাজা বুঝেছ? আর রাজাও রোজ বলত, আগে তুমি বোঝো। পণ্ডিত বাড়ি গিয়ে ভাবত, রাজা অমন ধারা রোজ বলে কেন? ভাবতে-ভাবতে জ্ঞান হয়ে গেল—শাস্ত্র পাণ্ডিত্য সব মিথ্যে, আসল হচ্ছে হরি-পাদপদ্ম। বিবাগী হয়ে চলে গেল সংসার ছেড়ে। রোজ কত বক্তৃতা ঝাড়ত, আজ যাবার আগে বলে গেল দুটি কথা, ‘এবার বুঝেছি।’
তাই বলি, কলকলানি ছাড়ো। যতক্ষণ ঘি কাঁচা থাকে ততক্ষণ কলকল করে। পাকা ঘিয়ে আর শব্দ নেই। খালি গাড়ুতে জল ভরতে গেলেই ভকভকানি ওঠে। কিন্তু ভরে গেলে আর শব্দ হয় না। বিচারবুদ্ধি কতক্ষণ? যতক্ষণ না তাঁর আনন্দের খবর পাওয়া যায়। মধুপানের আনন্দ পেলে মৌমাছি আর ভনভন করে না।
‘আমি কাঁদতাম আর বলতাম, মা, বিচারবুদ্ধিতে বজ্রাঘাত হোক।’
শশধর পণ্ডিত জ্ঞানমার্গের পন্থী। বললে, ‘সে কি? আপনারো তবে ছিল বিচারবুদ্ধি?’
‘তা, একটু-আধটু ছিল বৈ কি।’
উৎফুল্ল হয়ে উঠল শশধর। বললে, ‘তবে বলে দিন আমাদেরো যাবে। আপনার কেমন করে গেল?’
ঠাকুর বললেন, অমনি এক রকম করে গেল।
আমি দু হাত ছেড়ে দিয়েছি। আমি বগলে হাত দিয়ে টিপি না।
সেই এক বেয়ান এসেছিল আরেক বেয়ানের সঙ্গে দেখা করতে। ঘরের বেয়ান তখন নানা রঙের সুতো কাটছে, বাইরের বেয়ানকে দেখে ভারি খুশি। কত দিন পরে এলে, যাই তোমার জন্যে কিছু জলখাবার আনি গে। যেই জলখাবার আনতে গেছে সেই ফাঁকে বাইরের বেয়ান এক তাড়া রঙিন সুতো বগলের তলায় লুকিয়ে ফেললে। জলখাবার নিয়ে এসে ঘরের বেয়ান বুঝতে পারলে বাইরের বেয়ানের কাণ্ডখানা। তখন সে এক ফন্দি ঠাওরালে। বললে, কত দিন পরে এলে, এস আজ দুজনে একটু আনন্দ করি। কি আনন্দ? এস দুই বেয়ানে নৃত্য করি। ভালো কথা। দুই বেয়ানে নাচতে লাগল। ঘরের বেয়ান দেখল বাইরের বেয়ান হাত না তুলেই নৃত্য করছে। হাত না তুলে নাচ কি একটা নাচ? ঘরের বেয়ান তখন বললে, এমন আনন্দের দিনে এস আজ হাত তুলে নাচি। ভালো কথা। কিন্তু বাইরের বেয়ান এক হাতে বগল টিপে আরেক হাত তুলে নাচতে লাগল। ও আবার কেমন নৃত্য? এস দু হাত তুলে নাচি। এই দেখ—ঘরের বেয়ান হাত তুললে। বাইরের বেয়ান যে-কে-সে। তেমনি বগল টিপে এক হাত তুলেই সে নাচতে লাগল। বললে, যে যেমন জানে বেয়ান-
আমি কিছুই জানি না। আমি তাই দু হাত ছেড়ে দিয়েছি। আমার সরল শরণাগতি।
তীর্থ থেকে ফিরে এসে রামকৃষ্ণের শুধু সেই তীর্থভ্রমণের কথা। তা ছাড়া আবার কি। মাতাল মদ খাওয়ার পর কেবল আনন্দেরই কথা কয়।
কী পেলেন তীর্থ করে?
কী পেলাম? জ্ঞান পেলাম। যতক্ষণ বোধ যে ঈশ্বর সেথা ততক্ষণ অজ্ঞান। যখন হেথা হেথা, তখনই জ্ঞান। যা মন চায় তারই পিছে ধায়। কিন্তু ছুটতে হবে কেন? যা মন চায় তাই মনের মাঝখানে। যা হাত চায় ধরতে তাই হাতের কাছাকাছি।
তামাক খাবে, তাই গেছে প্রতিবেশীর বাড়ি টিকে ধরাতে। ঢের রাত হয়েছে, প্রতিবেশী ঘুমে অচেতন। অনেক ধাক্কাধাক্কি, অনেক হাঁক-ডাক। ঘুম ভেঙে গেল প্রতিবেশীর। দরজা খুলে অবাক হয়ে গেল—এ কি, এত রাতে কি মনে ক’রে। আর কি মনে ক’রে! তামাক খাব কিন্তু টিকে ধরাবার দেশলাই নেই। তারি জন্যে এত কষ্ট, এত হৈ হল্লা! তোমার হাতে যে লণ্ঠন রয়েছে—সে আছে কি করতে? হৃদাকাশে চিদাদিত্য। চলেছি আমরা তবে আর কোন দেশে কোন সুর্যের সন্ধানে?
কথাটা এই, বুড়ি ছুঁয়ে যা ইচ্ছে কর। ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে তার পর লীলা আস্বাদন করে বেড়াও। সাধু শহরে এসে হেথা-হোথা ঘোরাঘুরি করে নানা রকম আমোদ করে বেড়াচ্ছে। পথে আরেক মুসাফির সাধুর সঙ্গে দেখা। মুসাফির বললে, এত যে চার দিকে রঙ দেখে বেড়াচ্ছ, তা তোমার পোঁটলাপুঁটলি কোথায় রাখলে? কেন—আগে বাসা ঠিক করলাম, তালা-চাবি কিনলাম, পরে পোঁটলাপুঁটলি ঘরের মধ্যে চাবি দিয়ে বন্ধ করলাম। বন্ধ করে রেখে তবে আমোদ করতে বেরিয়েছি। জানো, শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলাম। সেখানে খুব সংকীর্তন হল। বহু লোকের আসর বসল। মাকে বললাম, মা এ সব কি সত্য? সত্য যদি হয় তবে দেশের জমিদার কেন আসবে না? এসে গেল জমিদার। সেধে গায়ে পড়ে আদর করে কথা কইলে।
ওরে হৃদু একটি সুন্দরী ধরে নিয়ে আয়।
হৃদয় তো অবাক।
ওরে নিয়ে আয়। আমি পুজো করব।
বুঝি মামীর কথা মনে পড়ল হৃদয়ের। সেই তার পদ্মদল দিয়ে পাদপদ্ম পুজো করার কথা। কিন্তু কোথায় মামী!
চৌদ্দ বছরের একটি সুন্দরী সধবা কন্যা যোগাড় করল হৃদয়। কোন বাড়ির বউ মা মেয়ে।
কিন্তু রামকৃষ্ণ দেখল সাক্ষাৎ ভগবতী। পূজা করলে। প্রণাম করলে। ওরে তোরা কেউ প্রণামীর টাকা এনে দে মাকে।
তাতেও তৃপ্তি নেই রামকৃষ্ণের। যখন যে কুমারী মেয়ে কাছে পায় তাকে ধরে এনে পুজো করে। হোক সে যত অকুলীন যত অপরিচ্ছন্ন।
শুদ্ধাত্মা কুমারীতেই ভগবতীর বেশি প্রকাশ।
রামলীলা দেখতে গেল রামকৃষ্ণ। যারা রাম-লক্ষ্মণ সেজেছিল, হনুমান-বিভীষণ সেজেছিল সবাইকে পুজো করতে বসল। মনে হল আসলে-নকলে ভেদ নেই। নারায়ণই এ সব মানুষের রূপ ধরে রয়েছেন।
বৈষ্ণবচরণও তাই বলত। বলত, নরলীলায় বিশ্বাস হলেই তবে পূর্ণ জ্ঞান হবে।
বকুলতলায় ঘাটের কাছে এক দিন দেখল নীলাম্বরী পরে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঘরের মেয়ে না পথের মেয়ে নজর করে দেখতেও চাইল না। মুহুর্তে সীতার উদ্দীপন এসে গেল। দেখল সীতা লঙ্কা থেকে উদ্ধার পেয়ে রামের কাছে যাচ্ছে।
‘এমন ভাবও দেখিনি, এমন রোগও দেখিনি।’ বলে হৃদয়রাম।
বললে কি হয়, কেবল জমি-জমি করে। এত যার সেবা-পূজা করছে তার সঙ্গ-স্পর্শেও যেন কিছু সফল হচ্ছে না। রামকৃষ্ণ তার হাতের জিনিস, রামকৃষ্ণের পায়ে কাউকে হাত ঠেকাতে দিতে পর্যন্ত সে নারাজ, তবু হাতে পেয়েও আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে রামকৃষ্ণ। হৃদয় টাকা খুঁজছে, জমি খুঁজছে, গরু খুঁজছে।
এক দিন ধরল গিয়ে শম্ভু মল্লিককে। বললে, ‘আমায় কিছু টাকা দাও।
শম্ভু মল্লিকের ইংরিজি মত। বললে, ‘তোমায় কেন টাকা দিতে যাব? তোমার তো দিব্যি শরীর আছে, তুমি তো খেটে খেতে পারো।’
‘দিব্যি শরীর?’
‘যা হোক কিছু রোজগার তো করছ। তোমায় দেব কেন? যারা খুব গরিব, কিংবা কানা-খোঁড়া তাদের দিলে কাজ হয়।’
‘থাক মশাই, ঢের হয়েছে।’ হৃদয় ঝলসে উঠল, ‘আমার টাকায় কাজ নেই। ঈশ্বর করুন আমার যেন কানা-খোঁড়া হতদরিদ্দির না হতে হয়। আপনারো দিয়ে কাজ নেই, আমারো নিয়ে কাজ নেই। খুরে দণ্ডবৎ মশাই।’
রামকৃষ্ণকে গিয়ে ধরল। কি এমন ভাবের ঢেউ দিয়েছ! তোমার মা’র কাছে গিয়ে কিছু সিদ্ধাই চাইতে পার না? যাতে করে কিছু খাঁটি দ্রব্য লাভ হয় তার দিকে দৃষ্টি দিতে পারো না? তোমার এ ভাব দিয়ে কি অভাব মিটবে?
আবার? ধমকে উঠল রামকৃষ্ণ। তোর পাল্লায় পড়ে সিদ্ধাই চাইতে গিয়ে আমি যা দেখেছিলাম তা আমি ভুলিনি। জানিস তো, ‘মাগনেসে ছোটা হো যাতা’। এমন যিনি ভগবান তিনি যখন ভিক্ষে করতে বেরিয়েছিলেন, তাঁকে বামন রূপ ধরতে হয়েছিল। কেন মিছিমিছি চাইতে গিয়ে ছোট হবি?
রাখো ওসব তত্ত্ব কথা। তত্ত্ব কথায় পেট ভরে না। হৃদয় একটা এঁড়ে বাছুর কিনলে। ঘাস খাওয়াবার জন্যে নিত্যি সেটাকে বাগানে বেঁধে রাখে। কত যত্ন-আত্তি করে। সোহাগ করে গলায়-পিঠে হাত বুলোয়।
‘রোজ ওটাকে ওখানে বেঁধে রাখিস কেন রে?’ জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণ।
‘ওটাকে দেশে পাঠিয়ে দেব।’
‘কেন, সেখানে কী?’
‘বড় হলে সেখানে ও লাঙল টানবে ।
কোথায় কামারপুকুর, শিওড়, আর কোথায় কলকাতা। বাছুরটা সেখানে যাবে ঐ পথ ভেঙে! সেখানে গিয়ে বড় হবে! বড় হয়ে লাঙল টানবে!
মুর্চ্ছিত হয়ে পড়ল রামকৃষ্ণ।
এরই নাম মায়া, এরই নাম সংসার।
চালের আড়তে বড়-বড় ঠেকের মধ্যে চাল থাকে। যাতে ইঁদুর ঐ চালের সন্ধান না পায়, আড়তদার একটা কুলোতে করে খই-মুড়কি রেখে দেয়। ঐ খই-মুড়কি খেতে মিষ্টি, ইঁদুরগুলো তাই সমস্ত রাত কড়র-মড়র করে খায়। চালের সন্ধান আর পায় না।
ওরে, মায়াকে চিনতে চেষ্টা কর। মায়াকে যদি চিনতে পারিস, মায়া আপনি লজ্জায় পালাবে। হরিদাস বাঘের ছাল পরে একটা ছেলেকে ভয় দেখাচ্ছিল। ছেলেটা বললে, আমি চিনেছি, তুই আমাদের হরে। হরিদাস হাসতে হাসতে চলে গেল। হরিদাসকে চিনবে না হৃদয়। তার বাঘের ছালেই সে মাতোয়ারা।
৩৯
আমার তো মামাই আছে। আমার আবার ভাবনা কী! আমার আবার কিসের সাধন-ভজন!
হৃদয় ডঙ্কা মেরে বেড়ায় আর বিষয়-আশয়ের ফিকির খোঁজে। কোথায় একখানা জমি, কোথায় একটা গরু, কোথায় কটা টাকা! পরিবারের জন্যে একখানা গয়না, নিজের জন্যে একখানা শাল।
সাধক-ভক্তদের কাছ থেকে শোনে যখন রামকৃষ্ণের অলৌকিকত্বের কথা, তখন বলে, ভালোই তো, আমার মেহনৎ কমল। ঐ যে কথায় বলে না, মামার হলেই ভাগনের হল। আমারো হয়েছে তাই। ওর হওয়াতেই আমার ষোলো আনা হয়ে আছে। মহাদেব যখন পার হবেন তখন নন্দী-ভৃঙ্গীকেও নিয়ে যাবেন সঙ্গে করে।
তার পরে পরিচর্যা কম করছি? আমি না হলে ওর সাধুগিরি বেরিয়ে যেত! আমি আছি বলেই ওর এত জেল্লা-জমক। আমাকে কি আর ও ফেলতে পারে? আমি তাই খাই-দাই আর তুড়ি মারি। আর যদি পারি তো এই ফাঁকে কিছু গুছিয়ে নিই চাল-কলা ।
এমনি সময় তার স্ত্রী মরল।
মুহূর্তে মন কেমন উলটো-মুখো হয়ে গেল। সংসার যেন উড়ে গেল তাসের ঘরের মত। টাকার তোড়া মনে হল ধূলোর ঝোড়ার মত।
সেও খুলে ফেলল পরনের কাপড়, ছুঁড়ে ফেলল গলার পৈতে। উগ্র ভঙ্গি করে বসল ধ্যানাসনে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। শেষে এক দিন ধরল গিয়ে রামকৃষ্ণকে। বললে, ‘তোমার যেমন ভাব-টাব হত, তেমনি আমার করে দাও। আমাকে ডুবিয়ে দাও অতলে। দেখাও তোমার মহামায়াকে—
রামকৃষ্ণ বললে, ‘তোর ও সবে দরকার নেই।
‘আলবৎ আছে।’ গর্জে উঠল হৃদয়। বললে, ‘তুমিই ফল পাবে আর কেউ পাবে না? মা কি তোমার একলার?’
‘ওরে, শুধু আমাকে সেবা করলেই তোর ফল হবে।’
ঢের সেবা করেছি এত দিন। কিছু হয়নি। আমার এখন ভাব চাই। আমাকে ভাব দাও।
‘কী বলিস পাগলের মত!’ রামকৃষ্ণ তাকে বোঝাবার চেষ্টা করল। ‘আমরা যদি দুজনেই ভাবে বিভোর হয়ে থাকি, তখন কে কাকে দেখবে?’
‘তা আমি জানি না।’ হৃদয় ছাড়বার পাত্র নয়। তাকে তখন বৈরাগ্যে পেয়ে বসেছে। বললে, ‘আমাকে তুমি বলে দিয়ে যাও, কি করে কি হবে–
‘আমার ইচ্ছায় কিছুই হবার নয়। সব মা’র ইচ্ছে। মাকে গিয়ে ধর, মা’র যদি ইচ্ছে হয়, তোরও হবে। যদি ইচ্ছে করেন নিঃস্বকেও তিনি বিশ্বজয়ী করতে পারেন।
বেশ, তবে মাকেই ধরব। এই ধরলাম। এই বসলাম দৃঢ়াসনে।
আস্তে-আস্তে দর্শন হতে লাগল হৃদয়ের। পূজোয় বা ধ্যানে বসে শুরু হল অর্ধ–বাহ্যদশা। কখনো বা নিবিড় ভাবাবেশ।
মথুরবাবু প্রমাদ গণলেন। জিজ্ঞেস করলেন রামকৃষ্ণকে, ‘হৃদয়ের আবার এ সব কী হচ্ছে? ঢং না কি?’
‘না। খুব ব্যাকুল হয়ে মাকে ধরেছিল, মা-ই এই ভাব এনে দিয়েছেন।’
‘সর্বনাশ। তা হ’লে কী হবে হৃদয়ের?
কিছু ভয় নেই। মা-ই সব দেখিয়ে-বুঝিয়ে দু দিনে তাকে ঠাণ্ডা করে দেবেন।’ মথুরবাবু বুঝলেন এ সবই রামকৃষ্ণের খেলা। বললেন, ‘বাবা, তুমিই ওকে ভাব দিয়েছ, তুমিই আবার ওকে ঠাণ্ডা করে দাও। আমরা তোমার দুই ভৃত্য নন্দী আর ভৃঙ্গী, আমরা তোমার কাছে কাছে থাকব, তোমার সেবা-চর্যা করব। আমাদের আবার এ ছাড়া ভাব কি, এ ছাড়া কাজ কি। আমাদের আবার কিসের অদ্বৈত
অবস্থা!’
পঞ্চবটীর দিকে চলেছে রামকৃষ্ণ। হয় তো দরকার হতে পারে, হৃদয় গাড়ু-গামছা নিয়ে চলল পিছু-পিছু। যেতে-যেতে অপূর্ব দর্শন হল তার। অলোক-অবলোকিত দর্শন। দেখল রামকৃষ্ণ দেহধারী মানুষ নয়, একটি চলমান জ্যোতি-বর্তিকা। দিব্যকলেবরে অরুণরক্তিমরুচি। সেই আলোতে পঞ্চবটী প্লাবিত, উদ্ভাসিত হয়ে গেছে। রামকৃষ্ণের জ্যোতির্ময় দুখানি পা যেন মাটি স্পর্শ করছে না, শূন্যের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে। যেন শূন্য সরোবরে রক্ত পদ্ম চলেছে ফুটতে ফুটতে।
হৃদয় চোখ মুছল। সব ঠিক আছে। শুধু রামকৃষ্ণই আর দেহে নেই, শিখাময় হয়ে গিয়েছে।
তাকালো সে নিজের দিকে। এ কি! তারও দেখি দিব্যসত্তা, সেও দেখি নিরঙ্গ-উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সে যেন ঐ সম্মুখবর্তী দিব্য-অঙ্গেরই অংশস্বরূপ। দেবতার পশ্চাতে দেবানুচর। দেবতার সেবা-সঙ্গ করবার জন্যে দেববেশে তার এই পৃথকস্থিতি।
হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল হৃদয়, ও রামকৃষ্ণ! শুনেছ? আমরা মানুষ নই, আমরা দেবতা।’
একবার চেঁচিয়ে ক্ষান্তি নেই হৃদয়ের। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে আবার সে চেঁচিয়ে উঠল অবোধের মত, ‘ও রামকৃষ্ণ! দাঁড়াও! দেখছ আমরা কে! আমরা তবে কেন এখানে পড়ে আছি?
‘ওরে থাম, থাম–চেঁচাস নে—’রামকৃষ্ণ মিনতি করল।
‘কেন থামতে যাব? তুমিও যা আমিও তাই। আমরা দু জনেই অবতার।’
‘ওরে থাম, লোকজন সব এখনি ছুটে আসবে।’
‘আসুক না লোকজন।’ হৃদয় তবু থামবে না কিছুতেই। সমানে চেঁচাতে লাগল। ‘এ দেশে থেকে আর আমাদের লাভ কি? চলো অন্য দেশে যাই। দেশে দেশে গিয়ে জীবোদ্ধার করি।’
কিছুতেই স্তব্ধ হবে না হৃদয়।
রামকৃষ্ণ তাড়াতাড়ি ছুটে এল হৃদয়ের কাছে। তার বুকে হাত ঠেকিয়ে দিলে। বললে, ‘দে মা, শালাকে জড় করে দে।’
দিব্যদর্শন ছুটে গেল মুহূর্তে। আনন্দের সাগর এক শ্বাসে শুকিয়ে গেল। সেই শরীরী শিখা নিবে গিয়ে মূর্ত হল রক্ত-মাংসের দেহ।
‘মামা, এ কী করলে?’ কেঁদে ফেলল হৃদয়। ‘আমাকে জড় বানিয়ে দিলে?’ ‘তোকে শুধু একটু স্তব্ধ করে দিলাম।’
‘আমি আর দেখতে পাব না সেই দৃশ্য?’ নিঃস্বের মত তাকিয়ে রইল হৃদয়।
তুই যে বড্ড গোল করিস। একটু কি দর্শন পেয়েই একেবারে দিশেহারা হয়ে গেলি। দেশশুদ্ধ লোক ডেকে হাট বাধাবার যোগাড়।’
দরকার নেই রামকৃষ্ণে। আমি একাই পারব। রামকৃষ্ণ যদি পেরে থাকে, আমিই বা কম কিসে। ধ্যান-জপের মাত্রা বাড়িয়ে দিল হৃদয়। গভীর রাত্রে উঠে-উঠে যেতে লাগল পঞ্চবটী।
ঠিক করল রামকৃষ্ণ যেখানে বসে জপধ্যান করত সেখানেই আসন করতে হবে। হয় তো সেই জায়গাটিই পয়মন্ত। হয় তো বা মাটির কোনো গুণ আছে। দেখি না কি ফল হয়!
যেই সেই জায়গাটিতে বসেছে আসন করে, অমনি চীৎকার করে উঠল, ‘মামা গো, পুড়ে মলাম, পুড়ে মলাম। শিগগির বাঁচাও।’
সে আর্তনাদ শুনতে পেল রামকৃষ্ণ। ত্রস্ত পায়ে ছুটে এল ঘর ছেড়ে। মুখে এক করুণ জিজ্ঞাসা, ‘কি রে, কি হয়েছে?’
‘এইখানে ধ্যান করতে বসা মাত্র কে যেন এক মালসা আগুন গায়ে ঢেলে দিলে।’ যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল হৃদয়। ‘সারা গা জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে।’
‘তুই কেন এ সব করিস বল তো? তোকে বলেছি না আমার সেবা করলেই তোর সব হবে। কেন তবে এ সব ঝামেলা করছিস? নে, ঠাণ্ডা করে দিচ্ছি তোকে–রামকৃষ্ণ তার গায়ে স্নেহকরুণ হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
সেই স্পর্শে শান্তি হয়ে গেল হৃদয়ের। গঙ্গাস্নানের মত এল যেন শীতল নির্মলতা।
বুঝলে সেবা ছাড়া আর তার পথ নেই। শুশ্রুষা ছাড়া নেই তার আর কোনো জিজ্ঞাসা।
বেশ আছি। যেখানে আছি, সেখানেই আমার রামের অযোধ্যা। ‘হরিবোল’ ‘হরিবোল’ বলে হাততালি দিয়ে সকাল-সন্ধ্যায় আমার শুধু হরিনাম। তা হলেই সব পাপ-তাপ চলে যাবে। পাপ হরণ করেন বলেই তো তিনি হরি। দেহবৃক্ষে পাপ হচ্ছে পাখি আর নামকীর্তন হচ্ছে হাততালি। যেমন গাছের নিচে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলে পাখি উড়ে যায়, তেমনি হাততালি দিয়ে হরিনাম করলে দেহ থেকে পালিয়ে যায় অবিদ্যা।
যা আমার হবার নয় তার পিছনে ছুটি কেন? আমার শুধু ডাকের আশায় দাঁড়িয়ে থাকা। ‘হুজুরেতে আরজি দিয়ে মা দাঁড়িয়ে আছি করপুটে।
এই সব ভাবে বটে কিন্তু মনের আনাচে কোথায় একটু অহং থেকে যায়। কার্নিশের ফাঁকে কোথায় লুকিয়ে থাকে অশ্বত্থের বীজ, তা থেকে ফেঁকড়ি বেরোয়।
হৃদয় বললে, বাড়িতে এবার দূর্গোৎসব করব। মা আমার পুজো নেন কি না দেখতে হবে। মথুরবাবুকে বললে, ‘কিছু টাকা দিন।’
‘তা দিচ্ছি।’ মথুরবাবু রাজি হলেন একবাক্যে। বললেন, ‘কিন্তু বাবাকে নিয়ে যেতে পাবে না।’
সে কি কথা? আমার বাড়িতে প্রথম পুজো, মামা থাকবে না?
‘নাই বা থাকলাম। তুই তার জন্যে ক্ষুণ্ণ হোস নে হৃদু।’ সান্ত্বনা দিল রামকৃষ্ণ।
বললে, ‘আমি রোজ সুক্ষ দেহে তোর পুজো দেখতে যাব। আর তোকে বলছি, আর-কেউ দেখতে পাবে না আমাকে, কিন্তু তুই পাবি।’
আরো শোন, বলে দিই, কাকে দিয়ে প্রতিমা গড়াবি, কে হবে তন্ত্রধারক। নিজের ভাবে নিজেই পুজো করবি। আর শোন, একেবারে উপোস করে থাকিস না, দুধ গঙ্গাজল আর মিছরির সরবৎ খাবি। বুঝলি?
হলও তাই। রোজ পুজো-সাঙ্গের পর রাতে আরতি করবার সময় হৃদয় দেখতে পেত রামকৃষ্ণ এসে দাঁড়িয়েছে প্রতিমার পাশে।
আশ্চর্য, প্রতিমা প্রতিমাই থাকে। কিন্তু করুণাঘন রামকৃষ্ণ দাঁড়ায় এসে ভক্তের আঙিনায়।
চল তবে সেই করুণা-নিলয়ের কাছে। সেখানে গিয়ে তারই সেবারাধনায় মন দিই। হৃদয়ও তাই ফিরে গেল দক্ষিণেশ্বরে। শুধু মাঝখান থেকে আরেকবার বিয়ে করে নিলে।
