পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.৫
৫
গদাধরের মোটে সাত বছর বয়েস, ক্ষুদিরাম মারা গেলেন।
গিয়েছিলেন ভাগনে রামচাঁদের বাড়িতে, ছিলিমপুরে। মহাপূজার কাছাকাছি। কিন্তু মনে সুখ নেই। মনে সুখ নেই কেন না সঙ্গে গদাধর নেই।
ইচ্ছে ছিল সঙ্গে নিয়ে আসেন। কিন্তু ছেলেকে দূরে পাঠিয়ে চন্দ্রমণিই বা কি করে থাকবে? ও যে কটাক্ষে স্থিতি আবার সে কটাক্ষেই প্রলয়!
ছিলিমপুরে এসে দিন কয়েক পরেই অসুখে পড়লেন ক্ষুদিরাম। বাড়াবাড়ি অসুখ, তবু পুজোর আনন্দ ম্লান হতে দেবেন না। ষষ্ঠী গেল, সপ্তমী গেল, অষ্টমী গেল—নবমী বুঝি আর যায় না! কাতর চোখে তাকালেন একবার প্রতিমার আয়ত চোখের কোমল করুণার দিকে। নবমীও কেটে গেল।
দশমী? দশমীর সন্ধ্যেয় প্রতিমা বিসর্জনের পর রামচাঁদ দেখলেন ক্ষুদিরাম তখনো বেঁচে আছেন কিন্তু সময় বড় সংক্ষিপ্ত। চোখের দৃষ্টি যেন প্রতিমারই পথ ধরেছে।
ডাকলেন ‘মামা!’
সাড়া নেই, শব্দ নেই। ক্ষুদিরাম নির্বাক।
সে কি? মৃত্যুকালে নাম করবেন না? জিহবা আড়ষ্ট হয়ে যাবে? নামবে বিস্মৃতির বিভ্রান্তি? এতদিনের অভ্যাস-যোগ আজ কোনো কাজে আসবে না? সমস্ত যজ্ঞের শ্রেষ্ঠ হচ্ছে জপ-যজ্ঞ। তাই, ঠাকুর বললেন, রাত-দিন জপ করবি। তা হলেই অভ্যাসবশে মৃত্যুকালে ঈশ্বর-চিন্তা আসবে। মৃত্যুকালে যা ভাববি তাই হবি। ভরত রাজা হরিণ-হরিণ করে শোকে প্রাণত্যাগ করেছিল। তাই তার হরিণ হয়ে জন্মাতে হল। মৃত্যুকালে যদি হরিনাম করতে পারিস তা হলেই সন্ধান পাবি ঈশ্বরের।
‘মামা, রঘুবীরকে ভুলে গেলেন?’ রামচাঁদের চোখ জলে ভরে এল, ‘এত যার নাম করতেন সে আপনাকে আজ পরিত্যাগ করল?’
‘কে? রামচাঁদ?’আচ্ছন্ন চোখ মেলে তাকালেন ক্ষুদিরাম ‘বিসর্জন হয়ে গেছে? আমাকে একবার তবে বসিয়ে দাও ধরাধরি করে।’
বসিয়ে দেওয়া হল। শুয়ে শুয়ে নাম করব না, পূজোর ভঙ্গিতে বসে নাম করব। সে নাম কি ভুলে যেতে পারি? সে আমার কন্ঠের মধ্যে স্বর, মস্তিষ্কের মধ্যে স্মৃতি, রক্তের মধ্যে চেতনা। সে আমার নিশ্বাসবায়ু। আমার নিস্তার-নৌকা। জ্ঞানে গাঢ়, গম্ভীর সে স্বর—ক্ষুদিরাম রঘুবীরের নাম করলেন তিন বার। নাম করার সঙ্গে-সঙ্গেই চলে গেলেন ধামে।
ভূতির খালের শ্মশানে ঘুরে বেড়াচ্ছে গদাধর, বাবা নেই, কোথায় গেলেন, মনটা কেমন উড়ু-উড়ু, ফাঁকা ফাঁকা—কোনো কিছুতে মন বসে না। মা’র কাছা-কাছিই মন ঘুরঘুর করে—এটা-ওটা আবদার করতে সাধ হয়। কিন্তু অভাবের জন্যে মা যদি সে-আবদার রাখতে না পারেন, তা হলে তো বাবার জন্যে শোক আরো উথলে উঠবে। সুতরাং চুপ করে রইল গদাধর। কোথায় গেলে অভাব থাকবে না সংসারে, শূন্যতার ভার উড়ে যাবে মেঘের মত, অন্তরের অন্ধকারে তারই ঠিকানা খুঁজতে লাগল৷
এবারে পৈতে দিতে হয়।
সাত পেরিয়ে আটে পড়েছে। দাদারা কোমর বেঁধেছেন।
পৈতে তো হল, কিন্তু ভিক্ষে দেবে কে? গদাধর গোঁ ধরল, ধনী কামারণী ছাড়া আর কারো হাতে ভিক্ষে নেব না।
সে কি কথা? ধনী ছোট জাতের মেয়ে, ব্রাহ্মণ-কন্যা নয়। সে কি ক’রে ভিক্ষে দেবে? কুল-প্রথা লঙ্ঘন হয়ে যাবে যে।
কিসের কুলাচার? কিসের জাত-বেজাত? প্ৰাণ চাইছে ধনীকে মা বলব, যে ধনী কোলে করে আমাকে মুক্ত করেছে মা’র জঠর থেকে—সেই মা-নামের কাছে কোনো বিধি-নিষেধ মানব না। তোমরা তোমাদের বামনাই নিয়ে থাকো, আমি না খেয়ে এই দরজায় খিল দিলাম।
উপোস করে থাকব।
কত জনের কত কাকুতি-মিনতি, তবু দরজা খোলে না গদাধর। বালক অথচ বিপ্লবী গদাধর!
শেষ কালে রামকুমার বললেন, ‘বেশ, ধনী কামারণীই ভিক্ষে দেবে। খোল দরজা। কুলাচার নষ্ট হয় হোক, তব, তোকে উপোসী দেখতে পারব না।’
প্রসন্ন সূর্যের মত দরজা খুলে দিল গদাধর,
ধনী কামারণী ভিক্ষে দিল। কড়ে রাঁড়ি, নিঃসন্তান, কিন্তু মহা ভাগ্যবতী। ত্রিভুবনে যিনি ভিক্ষে দিয়ে বেড়ান তাঁকেই কি না সে ভিক্ষে দিলে! আনুড়ে বিশালাক্ষী বা বিষলক্ষ্মীর থান। কামারপকুর থেকে মাইল দুই দূরে আনুড়। মাঝখানে খোলা মাঠ। ধর্মদাস লাহার বিধবা মেয়ে প্রসন্ন পূজায় চলেছে। সঙ্গে গ্রামের আরো অনেক মেয়ে। হঠাৎ কোত্থেকে গদাধর এসে বললে, ‘আমিও যাব।’তুই যাবি কি রে! এতটা মাঠভাঙা পথ হাঁটবি কি করে? কিন্তু গদাধরের মুখের দিকে চেয়ে মুখের কথা মুখের মধ্যেই আটকে রইল। মন্দ কি, যাক না সঙ্গে! ফেরবার সময় যদি খিদে পায়, সঙ্গে দেবীর প্রসাদ
থাকবে, দুধ থাকবে, তাই খাবে আর কি! তা ছাড়া, মিষ্টি গলায় খাসা গান গাইতে পারে ছেলেটা, বললে দু’চারটে গানই বা কোন না গাইবে! নে, চল, গান গাইতে হবে কিন্তু।
‘সত্যি, গদাইয়ের গান শুনে অবধি আর কারো গান কানে লাগে না।’ বললে প্রসন্ন। ‘গদাই কান খারাপ করে দিয়েছে।’
ফাঁকা মাঠের মধ্যে গদাধর খোলা গলায় গান ধরলে। দেবী বিশালাক্ষীর মহিমা-কীর্তনের গান। গান গাইতে গাইতে হঠাৎ থেমে গেল গদাধর। মেয়ের দল তাকিয়ে দেখল—এ কি ব্যাপার! গদাধরের দু’চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমেছে, তার শরীর আড়ষ্ট অসাড়, দাঁড়িয়ে আছে নিস্পন্দের মত। কি, কি হল তোর?
কে কার প্রশ্নের জবাব দেয়? গদাধরের জ্ঞান নেই। ও মা, এখন কি হবে?
মেয়ের দল ভয়ে বিশীর্ণ
রোদে নিশ্চয়ই ভিরমি গিয়েছে ছেলে,
খুব করে জলধারানি দে। হাওয়া কর্, হাত বুলিয়ে দে সারা গায়ে।
কিন্তু গদাধরের সাড়া নেই, সঙ্কেত নেই। গদাধর—গদাই!’
‘ব্যাকুল কণ্ঠে কত ডাক, কত কাতরতা!
কি করে মা’র কোলে ফিরিয়ে দেব এই ছেলেকে!
হঠাৎ প্রসন্নর মনে ডাক দিয়ে উঠল—যে বিশালাক্ষীকে দেখতে চলেছি সেই আগ বাড়িয়ে আসেনি তো পথ দেখাতে?
‘ওলো, দেবীর ভর হয়নি তো?’
প্রসন্ন অস্থির হয়ে উঠল, ‘মিছিমিছি তবে গদাইকে ডেকে কী হবে? বিশালাক্ষীকে ডাক। যিনি এসেছেন আগ বাড়িয়ে। আধার পেয়ে অধিষ্ঠিত হয়েছেন আনন্দে।’
সবাই দেবী-স্তব শুরু করলে। গদাধরের কর্ণমূলে রাখলে দেবী-নাম। গদাধরের মুখে হাসি ফুটল। সংজ্ঞার লাবণ্য তরল হয়ে এল সর্বাঙ্গে। কেউ আর তাকে গদাই বলছে না, সবাই মা বলে ডাকছে। নৈবেদ্যের ডালি কি হবে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে? ওলো, গদাইকেই সবাই খেতে দে এখানে। সব তবে মাকেই খেতে দেওয়া হবে।
এই গদাধরের দ্বিতীয় ভাবাবেশ।
কালো মেঘের কোলে সিতপক্ষ বক-বলাকার যে রূপ, বিশালাক্ষীরও সেই রূপ। দুইয়ের একই উদ্ভাস, একই তাৎপর্য। একই দিব্য কাব্যের দু’টি শ্লোক। কামারপুকুরের পাইনদের অবস্থা বেশ শাঁসালো। শিবরাত্রির সময় তাদের বাড়িতে যাত্রা হবে। পালা-ও শিবদুর্গা নিয়ে। ধূমুল পড়েছে, কিন্তু শিব যে সাজবে সে ছোঁড়ার দেখা নেই। অসুখ করেছে না কি, আসতে পারবে না। আর যে কেউ সাজবে তেমন লোক নেই। সুতরাং যাত্রা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর উপায় কি? এদিকে, যাত্রা বন্ধ হলে রাত্রি জাগরণ কি করে হয়? সবাই ধরে পড়ল অধিকারীকে। অধিকারী বললে, আপনারা একজন শিব যোগাড় করুন, বাকিটা আমি চালিয়ে নিতে পারব।
একবাক্যে সবাই বলে উঠল-গদাধরকে শিব সাজালে কেমন হয়? চমৎকার হয়। বয়েস অল্প হোক, শিবের গান জানে সে অনেক। তাই দিয়ে সে চালিয়ে নিতে পারবে। তারপর শিবের পোশাকে তাকে যা মানাবে, আর দেখতে হবে না।
কী যে ঠিক দাঁড়াবে বুঝতে পাচ্ছে না গদাধর।
তবু সকলের ধরাধরিতে সে রাজি হয়ে গেল। আসরে এসে দাঁড়াল সে শিবের মূর্তিতে। একেবারে সেই স্বভাবস্বচ্ছধবল সচ্চিদানন্দ শিব! মাথায় রক্ষবর্ণ জটাভার, গায়ে বিভূতির আচ্ছাদন। এক হাতে শিঙা, অন্য হাতে ত্রিশূল। কন্ঠে ও বাহুতে অনন্ত নাগ খেলা করছে ফণা তুলে, শেখরে খেলা করছে সুধা-ময়ূখ শশধর। পদপাতে ধৈর্য, অবস্থিতিতে শান্তি। চোখে সেই অনিমেষ দৃষ্টি যা তৃতীয় নয়নের দীপ্ততা। যেন মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব নেমে এসেছেন নরদেহে। সেই তপযোগগম্য শূলপাণি বিশ্বনাথ। যিনি প্রচণ্ড-তাণ্ডব অথচ প্রাণপালক৷
অভাবনীয় আনন্দের ঢেউ খেলে গেল চারদিকে। মেয়েরা যারা আসরে ছিল, হঠাৎ উলু দিয়ে উঠল, কেউ কেউ বা শাঁখ বাজালে। হরিধ্বনি করে উঠল পুরুষেরা। স্বয়ং অধিকারী শিবস্তুতি শুরু করলেন। ‘মাইরি, কি সুন্দর মানিয়েছে গদাইকে!’
‘শিবের পার্ট যে এত ভালো উতরোবে কেউ ভাবিনি।’
‘ওকে বাগিয়ে নিয়ে আমাদের একটা দল করতে হবে দেখছি-
এমনি বলাবলি করছিল পাড়া-বেপাড়ার ছোকরারা। কিন্তু, ও কি, গদাধর কিছু বলছে না কেন, নড়ছে না কেন? শুধু চেহারা দেখিয়েই কি পার্ট হয়? বলতে-কইতে চলতে-ফিরতে হয় যে। ও কি? দেখছিস? গদাধর কাঁদছে। শিব আবার কাঁদল কখন?
কেউ কেউ ছুটে গেল গদাধরের কাছে। গদাধরের বাহ্যজ্ঞান নেই। গদাধর তৎস্বরূ! জল দাও। হাওয়া করো। শিবের ভর হয়েছে, কানে শিবমন্ত্র দাও।
‘ছোঁড়াটা রসভঙ্গ করলে মাইরি।
আপশোষ করলে কেউ কেউ ।
এমন পালাটা শুনতে দিলে না।’
যাত্রা ভেঙে গেল। কাঁধে করে গদাধরকে কারা বাড়ি পৌঁছে দিলে। গদাধর তখনো দেহসংজ্ঞাহীন। তখনো শিবময়।
সারা রাত বাড়িতে কান্নাকাটি—গদাধরের জ্ঞান হচ্ছে না। কাকে বলে জ্ঞান, আর কাকেই বা অজ্ঞান। কে বা জাগ্রত, কে বা সুষুপ্ত!
সকালে চোখ মেলল গদাধর। আকাশে চোখ মেলল দিনমণি। এই ‘আমাদের গদাধর। দু’টি আয়ত-উজ্জ্বল চোখ—যে চোখে শান্তি আর সরলতা—মাথাভরা এলোমেলো চুল—যে- চুলে আনন্দময় ঔদাসীন্য। মুখে অমিয়-মধুর হাসি, যে হাসিতে অহেতুকী করুণা। কণ্ঠস্বরে অমৃতনির্ঝর প্রসন্নতা, যে প্রসাদে অশেষ আশ্বাস। যে দেখে সেই তাকে ভালোবাসে। যে একবার চোখ রাখে সেই আর চোখ ফেরায় না। যদি ভালো কিছু আহার্য পায় ইচ্ছে করে গদাধরকে খাওয়াই। ইচ্ছে করে তার একটা কথা শুনি। যেখানে সে গিয়েছে সেখানে গিয়ে বসি।
এদিকে লেখাপড়ায় এক ফোঁটা মন নেই গদাধরের। কিন্তু রামায়ণ-মহাভারত পড়তে দাও, মন মাতিয়ে পড়বে সে অনর্গল। ধ্রুব-প্রহ্লাদের কথা শুনতে চাও, সবাইকে সে ব্যাকুল করে ছাড়বে। মামূলি পাঠশালায় যেতে তার মন ওঠে না। তার চেয়ে মাঠে-মাঠে তাকে মুক্ত হাওয়ার মত ঘুরে বেড়াতে দাও, সে মহা খুশি। যা কিছু সুন্দর, তারই উপর তার মনের টান। মনে হয় কি করে এই সুন্দরকে নিজের সৃষ্টির মধ্যে প্রকাশ করা যায়! গদাধর তাই কাদা নিয়ে মূর্তি গড়ে, গলা ছেড়ে গান গায়, দু’ হাত তুলে নাচে। শিল্পে, সঙ্গীতে আর নৃত্যে সে সে-এক অনির্বচনীয়কে উদ্ঘাটিত করতে চায়। আর যা সে কথা বলে তাই সাহিত্য, সাহিত্যের সারবিন্দু। ‘আমাকে রসে-বশে রাখিস মা, আমাকে শুকনো সন্নেসী করিস নে’ এই প্রার্থনাই একদিন করেছিল গদাধর। আমাকে ‘রস’ দিস, কিন্তু সেই সঙ্গে ‘বশে’ রাখিস। আমাকে উচ্ছাস দে, সঙ্গে সঙ্গে সংযমও দে। ভাবের সঙ্গে-সঙ্গে রূপকেও বিকশিত কর্। আমি তোর কবি হব। তুই যদি মা আদি দেবী, আমিও তোর আদি কবি। কত আর মূর্তি গড়ব, মা, আমি নিজেই এখন নিজেকেই মূর্তি বানাই!
–
৬
প্রায়ই আজকাল ভাবসমাধি হয় গদাধরের। হরিবাসরে, শিবের গাজনে, মনসা- ভাসানে কোথাও একটু দেব-দেবীর নাম-গান হলেই হয়! শুনতে শুনতে গদাধর একেবারে বিহল-তন্ময়। সেই তন্ময়তা একটু গাঢ় হলেই ভাবসমাধি। চন্দ্ৰমণি আগে-আগে ভয় পেতেন, ছেলেকে বুঝি দানোতে পেয়েছে। এখন দেখেন নিজের ভাবে যেমন ডুবে যায় তেমনি আবার নিজের ভাবে উঠে আসে। রোগের চিহ্ন নেই শরীরে। দর্পণের আভা যেন তার সারা গায়ে চমক দিচ্ছে। সেই দর্পণে যেন দেখা যাচ্ছে আরেক মূর্তি—আরেক দেহ! চিন্ময় মূর্তি, চিন্ময় দেহ। কিন্তু দাদারা ধরে নিয়েছেন বায়ুরোগ হয়েছে। তাই তার উপর আর পড়া- শোনার তাড়া নেই, যেমন ইচ্ছে ঘুরে বেড়াও। তব, গদাধরের ‘পাঠশালাতে একবার যাওয়া চাই। সংসার চলে না দেখে রামকুমার কলকাতায় গেলেন, সেখানে গিয়ে টোল খুললেন—গদাধরের তখন বারো-তেরো বছর বয়েস, তখনো সে পাঠশালায় যাচ্ছে। পড়তে নয়, ছোকরাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, দল বাঁধতে। যারা পড়ে জ্ঞানী-গুণী হবে তাদের চিনে রাখতে। যতই কেন না আড্ডা দিক, রঘুবীরের পূজা ঠিক সেরে রাখে, মা’র ঘরকন্নার কাজে যোগান দেয়।
রামেশ্বরের উপর সংসারের ভার, কিন্তু সেও রঘুবীরের উপর বরাত দিয়ে বসে আছে চুপ করে। মনে-মনে বিশ্বাস, গদাইয়ের যখন অত তুকতাক, তখন একটা কিছু হবেই। যিনি চিন্তামণি তিনিই যখন নিশ্চিন্ত, তখন চিন্তা করে লাভ কি! বাড়িতে কাজ-ছুট বসে আছে গদাধর—গাঁয়ের মেয়েদের সঙ্গে তার বড় বনিবনা।
দুপুর বেলা সবাই জোট বেধে চন্দ্রমণির কাছে আসে, আর গদাধরকে হরিনাম গাইতে ফরমাস করে। কিংবা কোনো দিন বায়না ধরে, ধর্মের কোনো উপাখ্যান বলো। এর চেয়ে আর মনোগত বিষয় কী আছে গদাধরের? গদাধর তখুনি তৈরি! ‘মা গো, তুমিও বসে যাও—’ ‘না রে, বাবা, আমার হাতের কাজ এখনো শেষ হয়নি।’ ‘সে কি কথা, আমরা আপনার কাজ সেরে দিচ্ছি।’ সমাগত মেয়েরা চন্দ্রমণির হাতের কাজ চটপট সেরে দিলে। চন্দ্রমণি বসলেন স্থির হয়ে। গদাধর গান ধরলে, কোনো দিন বা পাঠ। গাঁয়ে যত ভাগবত পাঠ বা গান-কীর্তন হয়, সব শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে গদাধরের। তারপর যা কখনো সে শোনেনি সে সব কথাও তার মুখে এসে জোটে। মেয়েরা তন্ময় হয়ে শোনে। সময়ের হুঁস থাকে না। বিকেলে যে আরেক কিস্তি কাজ আছে বাড়িতে তা ভুল হয়ে যায়। গদাধরের সঙ্গে-সঙ্গে তারাও নাম করে।
নাম কি কম? যা নাম তাই তো রাম। সত্যভামা যখন তুলাযন্ত্রে সোনাদানা দিয়ে ঠাকুরকে ওজন করেছিলেন তখন হল না। কিন্তু রুক্মিণী যখন এক দিকে তুলসী আর কৃষ্ণনাম লিখে দিলেন তখন ঠিক ওজন হল। নামের এমনি গুণ। তবু নামের সঙ্গে অনুরাগ চাই। যে প্রিয় তাকে শুধু নাম ধরে ডাকলেই চলে না, তার সঙ্গে চাই একটু প্রেম। যদি নাম করতে করতে দিন-দিন অনুরাগ বাড়ে, আর অনুরাগের সঙ্গে আনন্দ, তা হলে আর ভয় নেই। বিকার কাটবেই কাটবে। তার পরেই তিনি আকারিত হবেন।
ধর্মদাসের মেয়ে প্রসন্ন গদাধরকে ভাবে গোপাল। আর, মেয়েদের মতন এমন হাব-ভাব করে গদাধর, আর আর মেয়েরা তাকে বলে রাধারাণী।
সীতানাথ পাইনের প্রকাণ্ড সংসার। আট ছেলে সাত মেয়ে। তা ছাড়া জ্ঞাতি-গুষ্টিও অনেক। তার ঘরে রোজ দশটা শিলে বাটনা বাটা হয়। এত লোকের জায়গা কার আঙিনায় হবে? তাই গদাধরকে ডেকে নিত সীতানাথ। বলত, আমার বাড়িতে কীর্তন করবে এসো। সীতানাথের বাড়ির মেয়ে-বউরা ঘোরতর পর্দানশিন, সূর্যের সঙ্গে মুখে-দেখাদেখি হয় না। তারা কি করে তবে এই স্বরতরঙ্গ শোনে! কি করে দেখে সেই অনিন্দ্য সুন্দরকে! তারা চন্দ্রমণির সামনে পর্যন্ত বেরোয় না—অথচ গদাধরকে তাদের সংকোচ নেই। গদাধর যেন তাদের অন্তরের মানুষ। ইহকাল-পরকাল সকল কালের চেনা লোক।
কিন্তু দুর্গাদাস পাইনের এটুকুতেও আপত্তি। দুর্গাদাস এই বেনে-পাড়ারই লোক, সীতানাথের প্রতিবেশী। এত বড় ছেলে কেন বাড়ির ভিতরে এসে মেয়েদের সঙ্গে বসে গান করবে এতে তার প্রবল আপত্তি। হোক হরিনাম, হোক গদাধর হীরের টুকরো ছেলে, তবু সমাজ-সংসারে মেয়েদের সম্ভ্রমরক্ষার যে নিয়ম তা মানতে হবে বৈ কি। আমার সংসারে মেয়েদের এমন বেচাল নেই—এমন উটকো লোক কেউ ঢুকতে পারে না আমার বাড়িতে। খুব বারফট্টাই করতে লাগল দুর্গাদাস। কই একটা কাকপক্ষী গিয়ে তার বাড়ির ভিতরের খবর জেনে আসুক তো, দেখে আসুক তো তার মেয়েদের মুখ! আটঘাট বাঁধতে জানা চাই, বুঝলে? হরিনামের পথে ধূলোট হতে দিতে নেই।
সন্ধ্যের দিকে বৈঠকখানায় বসে বন্ধুদের সামনে এমনি তম্বি করছেন দুর্গাদাস। এমনি সময় ঘরের দরজায় একটি মেয়ে এসে উপস্থিত। বেশভূষা দেখেই চিনতে পারলেন দুর্গাদাস। তাঁতিদের কারো মেয়ে হয়তো। পরনে হাতে-বোনা মোটা ময়লা শাড়ি, হাতে রূপোর ভারি পৈছা, কাঁখে চুবড়ি—তাতে কয়েক লাছি সুতো৷
‘কোত্থেকে আসছ?’ দুর্গাদাস প্রশ্ন করলেন।
‘হাট থেকে।’ লজ্জায় জড়সড় হয়ে মুখে ঘোমটা টানল মেয়ে৷
‘কি হয়েছে? চাও কি?’
সংক্ষেপে মেয়েটি যা বললে তাতে বিশেষ বিচলিত হবার কিছু নেই। পাশের গাঁয়ে মেয়েটির বাড়ি, সঙ্গিনীদের সঙ্গে হাটে গিয়েছিল সুতো বেচতে। হাটের পর বাড়ি ফেরার পথে মেয়েটি দেখলে সঙ্গিনীরা তাকে ফেলেই চলে গিয়েছে। এখন এই ভর-সন্ধ্যের সময় একা-একা বাড়ি ফিরতে তার ভয় করছে। যদি আজকের রাতের মত একটু আশ্রয় পায় তো বেঁচে যায়। ‘বেশ তো, ভেতরে যাও, মেয়েদের গিয়ে বলো, থেকে যাবেখন রাতটা। এ আর বেশি কথা কি!’ দুর্গাদাস উদারতায় প্রসারিত হলেন।
শরণাগতা প্রণাম করল দূর্গাদাসকে। অন্তঃপুরে গিয়ে বললে সব মেয়েদের। আগন্তুকাকে ঘিরে ধরল সবাই। অল্প বয়স, মিষ্টি কথা, আতান্তরে পড়েছে, সবাই সহানুভূতিতে নরম হল। বললে, থাকবে বৈ কি, একশো বার থাকবে, তার আগে হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খাও। কি যেন একটা বিশেষ আকর্ষণ আছে মেয়েটির। যে তাকে দেখে তারই মনে মমতা লেগে থাকে। থাকবার জায়গা ঠিক হল এক ধারে, মুড়ি-মুড়কি দিয়ে দিব্যি জলযোগ করলে। তন্ন-তন্ন করে দেখে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বেড়াতে লাগল মেয়েটি, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করলে, ভাব করলে, জেনে নিলে সুখ-দুঃখের ইতিহাস! যেন কি জাদু জানে, এক মহূর্তে অন্তরের অঙ্গ হয়ে উঠল৷
অন্ধকারে রামেশ্বর চলেছে হনহন করে।
এ কি, কোথায় চলেছেন এত রাতে?
সীতানাথের বাড়িতে।
সেখানে কি?
গদাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এত রাত হল, এখনো তার ফেরবার নাম নেই। মা ঘর-বার করছেন। কোথাও মুচ্ছো গেল কি না কে জানে।
ঐ সীতানাথের বাড়িতেই আছে ঠিক। সারা দিন-রাত ঐখানেই পাঠ-কীর্তন করে। ঐখানে গিয়েই হাঁক দিন।
না, সীতানাথের বাড়িতে যায়নি আজ গদাধর। রামেশ্বর চোখে অন্ধকার দেখল। রাত করে কোথায় এখন তাকে খুঁজবে ভেবে পেল না। পাইন-পাড়ার ঘরে-ঘরে অসহায়ের মত সে হাঁক দিয়ে ফিরতে লাগল—গদাই, গদাই,—গদাই আছিস্? তাঁতি-মেয়ে পা ছড়িয়ে বসে মেয়েদের সঙ্গে খোস-গল্প করছে, এমন সময় শুনতে পেল, কে উচু গলায় হাঁক পাড়ছে বাইরে থেকে। কার নাম ধরে ডাকছে? কান খাড়া করল তাঁতিনী। লাফিয়ে উঠল।
‘যাচ্ছি গো দাদা—এই যে আমি এইখানে।’ বলে সেই তাঁতিনী এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল।
বাড়ির মেয়েরা সব বললে গিয়ে দুর্গাদাসকে। দুর্গাদাস চুপ করে রইলেন। খানিক পরে বললেন, ‘প্রভু আমার অহঙ্কার চূর্ণ করেছেন। তাই ঠাকুর বলেছেন উত্তর কালে ‘আপনাতে মেয়ের ভাব আরোপ করলে কামাদি-রিপু নষ্ট হয়ে যায়। ঠিক মেয়েদের মতন ব্যবহার হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমি অনেক দিন মেয়েদের মত কাপড়-গয়না পরে ওড়না গায়ে দিয়ে সখীভাবে ছিলাম। আবার ঐ ভাবেই আরতি করতুম। তা না হলে পরিবারকে আট মাস কাছে এনে রাখতে পারতুম? দুজনেই মা’র সখী। আমি আপনাকে শুধু পুরুষ বলতে পারি কই। একদিন আমার ভাবাবস্থায় পরিবার জিজ্ঞেস করলে – আমি তোমার কে? আমি বললাম – আনন্দময়ী!’
৭
গ্রামে কিছু হচ্ছে না গদাধরের। তাই তাকে কলকাতায় নিয়ে এলেন রামকুমার। কিন্তু গদাধরের মন গ্রামের মাঠে-ঘাটে ঘুরঘুর করে। কত চেনা মুখ, কত মন-কাড়া ভালোবাসা। এই ইট-কাঠের জটিলতার মধ্যে পাওয়া যাবে কি সেই সরল মমতা? সেই নিঃসঙ্গ থাকার শান্তি?
নির্জনে না হলে ভক্তি লাভ হবে কি করে? তাকে ভাববো কোথায়? চাল কাঁড়ছো, একলা বসে কাঁড়তে হয়। একেক বার চাল হাতে করে তুলে দেখতে হয়, সাফ হল কেমন। তা কাঁড়বার সময় যদি পাঁচ বার ডাকে, ভালো কাঁড়া কেমন করে হবে?
কত জনকেই মনে পড়ে। মনে পড়ে বৃন্দার মাকে। বৃন্দার মা জেতে বামুন, গদাইকে নিজ হাতে হামেসা রান্না করে খাওয়ায়। কিন্তু খেতির মা জেতে ছুতোর, ইচ্ছে থাকলেও ঘরে ডেকে এনে খাওয়াতে পারে না। মনটা কেবল আঁটু বাঁটু করে। মনের কথা মুখে ফোটে না। ধনী কামারণীর বোন শঙ্করী কাছে-পিঠেই থাকে। তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলে গদাধর -’আচ্ছা বলতে পারো, খেতির মা আমাকে কি বলতে চাইছে, অথচ যেন বলতে পাচ্ছে না?’ শঙ্করী তো থ ! মনের কথাও জানতে পেরেছ তা হলে? বেশ, তবে বলো, কি খাবে, আমি নিয়ে আসছি। খাবো তো, এখানে এই পথের মাঝখানে খাব না কি? তার ঘরে যাব, ঘরে গিয়ে মেঝের উপর আসন পেড়ে বসে খাব। যা সে নিজের হাতে রেধে দেবে—সমস্ত। তার মনের সাধ পূর্ণ করব ষোলো আনা। তাই গেল ঠিক ছুতোর-বাড়ি। খেতির মা’র হাতের রান্না খেল সে তৃপ্তি করে। খেতির বাপ কিন্তু স্ত্রীর অনাচার সহ্য করতে পারল না। অনাচার বৈ কি। ছোট জাতের মেয়ে, উচ্চবর্ণের জাত মেরে দিলি? দেবতা খেতে চাইবে বলে তুই তার অন্ন যোগাবি? রাগে দিশেহারা হয়ে গেল খেতির বাপ। পায়ের খড়ম তুলে শক্ত কয়েক ঘা বসিয়ে দিল স্ত্রীর পিঠের উপর।
খেতির মা টলল না একচুল। বললে, ‘যতই কেন না মারো আর ধরো, আমার আর কিছুতেই দুঃখ নেই। ঠাকুরের প্রসাদ খেয়েছি আমি।’
আর মনে পড়ে চিনু শাঁখারিকে।
বয়েস হয়েছে, ছোট দোকান, কষ্টে দিন গুজরায়। কিন্তু গদাধর যখনই দোকানে ‘এসে বসে, মনে হয় কোথাও যেন আর কষ্ট নেই। রাত যতই অন্ধকার হোক, গদাধর যেন চিরন্তন সুপ্রভাত। যাই একটু বাড়তি রোজগার হয় তাই দিয়ে মিষ্টি কিনে গদাধরকে খাওয়ায়। গদাধর খায় আর চিনু দেখে। ওদিকে খদ্দের এসেছে দোকানে, সেদিকে খেয়াল নেই। গদাধরকে যেন চিনতে পেরেছে চিনু। তার নাম যখন চিনু তখন সেই তো প্রথমে চিনতে পারবে।
একদিন হলো কি, চিনু ফুল তুলে পরিপাটি করে মালা গাঁথলে। কোঁচড়ে করে লুকিয়ে মিষ্টি কিনে আনলে বাজার থেকে। গদাধরকে বললে, ‘চলো।’
‘কোথায়?’
‘মাঠে। যেখানে কেউ কোথাও নেই। যেখানে কেবল তুমি আর আমি।’ চিনিবাস গদাধরকে নিয়ে মাঠের মধ্যে এসে দাঁড়াল। দৃষ্টির গোচরে নেই কোথাও জনমানুষ। উপরে আকাশ-ভরা শান্তির নীলিমা।
মালা-মিষ্টি পাশে রেখে হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে বসে রইল চিনিবাস। সামনে গদাধর। কৃষ্ণকিশোর। ‘এ কি চিনিবাসদা, এ কি করছ? তার চেয়ে মিষ্টির ঠোঙাটা হাতে দাও।’ ‘দিচ্ছি গো দিচ্ছি—’
আগে মালা দিলে গলায়। কৃষ্ণের গলায় অতসী ফুলের মালা। পরে হাতে করে খাওয়াতে লাগল গদাধরকে। ব্রজের ননীগোপালকে।
জলে চোখ ভেসে যাচ্ছে চিনিবাসের। মিষ্টিভরা হাত কখনো পড়ছে গিয়ে গদাধরের নাকে, কখনো চোখে, কখনো কপালে। গদাধর হাসছে আর খাচ্ছে।
খাওয়ানোর পর আবার স্তব করতে বসল চিনিবাস। বললে, বুড়ো হয়েছি, বাঁচব না বেশি দিন। মর্তধামে তোমার কত লীলা-খেলা হবে, কিছুই দেখতে পাব না। তবু আজ যে আমাকে একটু চিনতে দিলে দয়া করে, তাই আমার পারের কড়ি হয়ে রইল।’
মত্ত অসুরের মত স্বাস্থ্য ছিল চিনিবাসের। দু’হাতে তুলে গদাধরকে কাঁধে চড়িয়ে বীরবিক্রমে নৃত্য করত। বলত, ‘তুমি আমাকে দাদা বলো – চিনিবাস দাদা। আমি যদি তোমার দাদা হই, তবে আমি তো বলরাম।’ বলে আবার নৃত্য।
তুমি সমুদ্র আর আমি সামান্য শঙ্খকার।
একবার, মনে পড়ে, চিনু শাঁখারির পায়ে পড়েছিল গদাধর। শুধু চিনুর নয় আর-আর সমবয়সীদেরও। কি খেয়াল হল, সবাইর পায়ে ধরে ধরে গদাধর মিনতি করতে লাগল, ‘ওরে তোদের পায়ে পড়ি, একবার হরিবোল বল—’
সকলে তো অবাক। যত ছোটজাতের লোক, নুয়ে পড়ে সকলের পায়ে ধরা! আসল কথা বুঝেছিল চিনিবাস। বলেছিল, ‘তোমার এখন প্রথম অনুরাগ, তাই সব সমান দেখছ। জাত-বেজাত স্তর-পঙক্তি দেখছ না। প্রথম যখন ঝড় ওঠে তখন আম-গাছ, তেঁতুল-গাছ সব এক বোধ হয়। এটা আম, এটা তেঁতুল- চেনা যায় না।’
নবানুরাগের বর্ষা। নবানুরাগে মান-অপমান থাকে না। ছায়া-কায়া থাকে না।’ সব তুমি-ময়।
মরে যাবে চিনিবাস–এই তার দুঃখ। বয়সে সে জীর্ণ হয়ে এসেছে। মরে গেলে দেখতে পাবে না এই নিত্যলীলা।
রাবণ-বধের পর রাম-লক্ষ্মণ যখন লঙ্কার প্রাসাদে গিয়ে ঢুকলেন, দেখলেন, রাবণের বুড়িমা নিকষা পালিয়ে যাচ্ছে। লক্ষণ বিদ্রূপ করে উঠল—যার ছেলে-নাতি-পুতি সব গেল, বংশে যার বাতি দেবার কেউ নেই, তার কিনা নিজের প্রাণের উপর এত টান! নিকষাকে রাম কাছে ডাকিয়ে আনলেন, জিজ্ঞেস করলেন, তুমি পালিয়ে যাচ্ছ কেন? তোমার কিসের ভয়? নিকষা বললে, আমার আর কিছু ভয় নেই, ভয়, যদি মরে গিয়ে তোমার এত লীলা না আর দেখতে পাই। বেঁচে ছিলাম বলেই তো দেখলাম তোমাকে৷ তাই এখনো বাঁচবার সাধ যেতে চায় না।
কিন্তু কলকাতায় এসে গদাধরের কি চুপচাপ করে বসে থাকলে চলবে? কত সাধ করে তাকে নিয়ে এসেছেন রামকুমার। অক্ষয়কে জন্ম দিয়েই রামকুমারের স্ত্রী মারা গেল আঁতুড়ে—সেই থেকেই সংসারে অনটন। ছেলে গর্ভে আসতেই কেমন হয়ে গিয়েছিল বৌদি, কাঁধে অলক্ষী চেপেছিল। সংসারে নিয়ম ছিল, যে-ছেলের এখনো পৈতে হয়নি সেই ছেলে কিংবা রুগী ছাড়া আর কেউ রঘুবীরের পুজোর আগে জলস্পর্শ করতে পারবে না। রামকুমারের স্ত্রী সেই নিয়ম অমান্য করতে লাগল। বাধার উত্তরে করতে লাগল অবাধ্যতা। রামকুমার বুঝলেন, স্ত্রীর মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে, আর সেই সঙ্গে বা অমঙ্গলের দিন। হলও তাই। স্ত্রী চলে গেল। সংসারে এল কঠিন দুর্ভাগ্য।
গদাধরের পরে আরেকটি বোন ছিল, সর্বমঙ্গলা। গৌরহাটির রামসদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার বিয়ে দিলে, যখন আট পেরিয়ে নয়ে পড়েছে। আর রামসদয়ের বোনের সঙ্গে বিয়ে দিলে রামেশ্বরের। রামেশ্বর গৃহস্থালি দেখুক, তুই, গদাধর, কলকাতা চল্। ওখানে টোল খুলেছি, একটা কিছু হিল্লে তোর হবেই। অন্তত শান্তি-স্বস্ত্যয়নটা তো শিখবি। কলকাতায় অনেক বড় লোকের বাসা, যদি মানুষ হতে পারিস, টাকার জন্যে ভাবতে হবে না। সংসার স্বচ্ছন্দ হবে।
টাকা? টাকা দিয়ে আমার কী হবে? আমি তো অবিদ্যার সংসার করতে আসিনি। আমি কি ঐশ্বর্যভোগ চাই, না, দেহের সুখে চাই? না, চাই ‘লোকমান্য’?
আর, তুমিই বা অত ভাবছ কেন? যে ঠিক ভক্ত, সে চেষ্টা না করলেও ঈশ্বর তার সব জুটিয়ে দেবেন। যে ঠিক রাজার বেটা সে মাসোয়ারা পায়। যে সদ্-ব্রাহ্মণ, যার কোনো কামনা নেই, হাড়ির বাড়ি থেকে হলেও তার সিধে আসে। যেমনি আসে তেমনি যায়। এই যদৃচ্ছা লাভই ভালো। সাঁকোর তলা দিয়েই জল বেরিয়ে যায় সহজে। সঞ্চয় করে কি হবে? কত কষ্ট করে মৌমাছি চাক তৈরি করে, কে আরেক জন এসে ভেঙে দিয়ে যায়। উপার্জন করাই কি জীবনের উদ্দেশ্য? নরজন্ম পেয়েছি, ঈশ্বর দর্শন করব না?
লক্ষ্মীনারায়ণ মাড়োয়ারি প্রায়ই আসত দক্ষিণেশ্বরে।
ঠাকুরের বিছানা ময়লা দেখে তার বড় ক্ষোভ ৷ বললে, ‘আমি তোমাকে দশ হাজার টাকা লিখে দিচ্ছি—তা দিয়ে তোমার সেবা হবে।’
যেই এ কথা শোনা ঠাকুর অমনি বাহ্যজ্ঞানহীন হয়ে পড়লেন। কে যেন মাথায় লাঠি মারলে!
বাহ্যজ্ঞান পাবার পর বললেন বিমর্ষ কণ্ঠে ‘অমন কথা মুখে এনো না। অমন কথা যদি আর বলো, তোমার এখানে এসে তবে কাজ নেই৷’
‘কেন, কি হল?’
‘তুমি জানো না, আমার টাকা ছোঁবার জো নেই—কাছেও রাখবার জো নেই।’ লক্ষ্মীনারায়ণও ছাড়বার পাত্র নয়। সে বেদান্তবাদী। তর্কপটু।
‘তা হলে এখনো আপনার ত্যাজ্য-গ্রাহ্য আছে?’ লক্ষ্মীনারায়ণ হাসল ‘তবে তো জ্ঞান হয়নি আপনার!
‘না বাপু অত দূর হয়নি এখনো।
যারা-যারা কাছে বসে ছিল, হেসে উঠল।
তবু লক্ষ্মীনারায়ণ দমবে না।
সে ধরল হৃদয়কে৷ হৃদয় মানে হৃদয়রামকে, ঠাকুর যাকে ডাকতেন হৃদে বলে। ক্ষুদিরামের বোন রামশীলার মেয়ে হেমাঙ্গিনী। তারই ছেলে এই হৃদয়।
হৃদয়কে দিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণ গছাতে চাইল টাকা। বললে, ‘আমি হৃদয়কে দিচ্ছি।’ ‘তা হলে আমাকেই বলতে হবে, একে দে, ওকে দে। না দিলে রাগ হবে মনে মনে, অভিমান হবে। টাকা কাছে থাকাই খারাপ। আরশির কাছে জিনিস রাখতে নেই। জিনিস থাকলেই প্রতিবিম্ব হবে। বুঝলে, ও সব হবে না এখানে- যে ঠিক রাজার বেটা সে মাসোয়ারা পায়।’
গদাধর কি রাজার বেটা নয়?
বাবাকে মনে পড়ে গদাধরের। স্নান করবার সময় জলে দাঁড়িয়ে ‘রক্তবর্ণং চতুর্মুখং’ বলে ধ্যান করতেন, আর তাঁর চোখ জলে ভেসে যেত। খড়ম পায়ে দিয়ে যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন, গাঁয়ের দোকানিরা দাঁড়িয়ে পড়ত। বলত, ঐ তিনি আসছেন।
যখন উনি স্নান করতেন তখন আর কেউ সাহস করে নাইতে যেত না। খোঁজ নিত—তিনি কি স্নান করে গেছেন?
রঘুবীর-রঘুবীর বলতেন আর তাঁর বুক লাল হয়ে যেত।
সেই বাপের ছেলে গদাধর।
শুধু এইটুকুই তার পরিচয়? কে বলে! সে জগৎপিতার ছেলে।
সে পড়াশোনা জানে না। শাস্ত্র-সংহিতা সে কিছু ছোঁয়নি। সে হয়তো পুরো ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারে না, উচ্চারণ জানে না সবটার, সে হয়তো আধো-আধো ভাষায় শুধু ‘পা’ বলে৷ বাপের টান কি শুধু ‘বাবা’ বলা ছেলের উপর বেশি হবে, ‘পা’ বলা ছেলের চেয়ে? না, বাবা বলবেন, এ আমার কচি ছেলে, বাবা ঠিক বলতে না পারলেও ডাকছে ঠিক আকুল হয়ে, অতএব একেই আগে কোলে নিই হাত বাড়িয়ে!
কিন্তু সেই যে বাবা স্বপ্ন দেখলেন গয়াধামে গিয়ে, রঘুবীর বলছেন তোমার ঘরে আমি ছেলে হয়ে জন্মাব, তার কি হবে? তবে, আসলে, তার কি কেউ পিতা নেই? সে তবে কে?
এই আত্মদর্শনই তো ঈশ্বরদর্শন।
৮
রানি রাসমণি কাশী যাবেন। কৈবর্তের মেয়ে, কিন্তু আসলে অষ্ট সখীর এক সখী।
কলকাতার জানবাজারের জমিদার রাজচন্দ্র দাসের স্ত্রী। কিন্তু মন রয়েছে কালিকার পাদপদ্মে৷ চার কন্যার মা। আর, তৃতীয় কন্যা করুণাময়ীর স্বামী মথুরামোহন বিশ্বাস। আমাদের সেজবাবু।
বিয়ের অল্প কাল পরেই মারা যায় করুণাময়ী। রাসমণি চতুর্থ কন্যা জগদম্বার সঙ্গে মথুরামোহনের বিয়ে দেন। কিন্তু নাম তার সেই সেজবাবুই থেকে গেল।
স্বামী রাজচন্দ্র তখন গত হয়েছেন। বাড়ির পাশেই গোরা সৈন্যদের ব্যারাক। একদিন মাতাল হয়ে এক দল সৈন্য ঢুকে পড়ে বাড়ির মধ্যে। আত্মীয়-পুরুষেরা কেউ বাড়িতে নেই, রুখতে গিয়ে ঘায়েল হয়েছে দারোয়ানেরা। সৈন্যরা বাড়ি লুঠ করতে শুরু করেছে৷ এখন কি করেন রাসমণি? রাসমণি অস্ত্র ধরলেন। ছিলেন লক্ষ্মী, হয়ে দাঁড়ালেন রুদ্রচণ্ডী চামুণ্ডা।
রাজেন্দ্রাণি রাসমণি। রাজেন্দ্রাণি হয়েও অন্তরে ভিখারিণী। তেজস্বিনী হয়েও মমতার গঙ্গা-মৃত্তিকা। সংসারে কিছুই চান না, শুধু সেই মহাযোগেশ্বরী মহাডামরী সাট্টহাসা মহাকালীর রাঙা পা দু’খানি কামনা করেন। শেরেস্তায় যে শিলমোহর চলতি, তাতে তাঁর নাম লেখা—’কালীপদ-অভিলাষী শ্রীমতী রাসমণি দাসী।’ ঐশ্বর্যের শয়নে শুয়েছেন, কিন্তু উপাধান হয়েছে বিশ্বেশ্বরীর উৎসঙ্গ। বারো শো পঞ্চান্ন সাল। রানি কাশী যাবেন মনস্থ করেছেন। দর্শন করবেন অন্নপূর্ণাকে, মহাভিক্ষুক বিশ্বনাথকে। অঢেল টাকা এ জন্যে আলাদা করা আছে। অজস্র হাতেই তা ব্যয় করবেন। ঘাটে বাঁধা হয়েছে নৌকো, সারি-সারি প্রায় একশোখানি। থরে থরে সম্ভার সাজানো হয়েছে। কত দাস-দাসী আত্মীয়-পরিজন। সবাই বিশ্রাম করছে নৌকোতে। শুধু একজন জেগে আছে। সে স্বয়ং কুবের। রানির কোষাগারের দ্বারপাল।
রাত। নৌকোর বহর ছেড়ে দিয়েছে। রানি ঘুমিয়ে পড়েছেন। উত্তরে দক্ষিণেশ্বর গ্রাম পর্যন্ত এসেছেন, স্বপ্ন দেখলেন রাসমণি। দেখলেন দেবী ভবতারিণী নিজে এসে দাঁড়িয়েছেন। বলছেন, ‘কাশী যাবার দরকার নেই। এই ভাগীরথীর পারেই আমাকে প্রতিষ্ঠা কর। আমাকে অন্নভোগ দে।’
ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন রাসমণি। ওরে, নৌকো ফিরিয়ে নিয়ে চল্। আর কাশী যেতে হবে না। স্বয়ং কাশীশ্বরী এসেছেন দক্ষিণেশ্বরে।
প্রথমে ভেবেছিলেন গঙ্গার পশ্চিম কূলে বালি-উত্তরপাড়ায় জমি নেবেন। কথায় আছে, গঙ্গার পশ্চিম কূল, বারাণসী সমতুল। কিন্তু ও-অঞ্চলের জমিদারের বুদ্ধি-শুদ্ধি আজগুবি। টাকার লোভে জমি দিতে তাঁদের আপত্তি নেই, কিন্তু সেই জমিতে পরের টাকায় যে ঘাট তৈরি হবে সে ঘাট দিয়ে তাঁরা গঙ্গায় নাইতে যাবেন না। না যাবেন তো না যাবেন- এমন কথা বলতে পারলেন না রাসমণি। তিনি পূর্ব কূলে উপস্থিত হলেন।
পূর্ব কূলে দক্ষিণেশ্বর। এক লপ্তে ষাট বিঘে জমি কিনলেন রাসমণি। জমির কতক অংশের মালিক ছিল হেষ্টি নামে এক সাহেব, আর বাকি অংশে মুসলমানদের কবরখানা আর গাজী পীরের থান। জমির গড়ন খানিকটা কচ্ছপের পিঠের মত। তন্ত্রমতে অমন জমিই শক্তিসাধনার অনকূলে। তাই, সন্দেহ কি, ঐ পূর্ব কূল দেবীই নির্বাচিত করেছেন পূর্ব থেকে।
নয় লাখ টাকায় মন্দির আর মূর্তি তৈরি হল। নবরত্নবিশিষ্ট কালীমন্দির, উত্তরে রাধাগোবিন্দের মন্দির, পশ্চিমে দ্বাদশ শিবমন্দির আর দক্ষিণে নাটমণ্ডপ মধ্যস্থলে প্রশস্ত চত্বর। উত্তরে-দক্ষিণে-পূর্বে আরো তিন সার দালান—সব মিলে অতিকায় দেবায়তন। সম্পূর্ণ হতে লেগেছিল প্রায় দশ বছর।
এই দশ বছর—উদ্যোগ থেকে উদযাপন পর্যন্ত—রাসমণি ব্রতধারিণী হয়ে ছিলেন, ছিলেন কঠোর নিয়মে সংযমে। ত্রিসন্ধ্যা স্নান করেছেন, হবিষ্যান্ন খেয়েছেন, শুয়েছেন শুকনো মেঝের উপর। আর জপ করেছেন অবিশ্রান্ত। কিসের জন্যে এত অনুষ্ঠান? এই দেহ-মনকে যদি তাঁর উপযুক্ত বাহন করতে না পারি, তবে দেবী শুনবেন কেন আবাহন? হয় আসবেন না, নয় তো এসে ফিরে যাবেন। তৈরি হল মন্দির। তৈরি হল দেবীমূর্তি। পণ্ডিতেরা পাঁজি দেখতে লাগলেন মন্দিরপ্রতিষ্ঠার শুভদিন কবে ঠিক করা যায়!
মূর্তি ছিল বাক্সের মধ্যে বন্দী হয়ে। দেখা গেল, মূর্তি ঘামছে।
রাত্রিযোগে স্বপ্ন দেখলেন রাসমণি। ক্লান্ত-কাতর কণ্ঠে ভবতারিণী বলছেন, ‘আমাকে আর কত দিন কষ্ট দিবি এমনি বন্ধ করে রেখে। শিগগির আমাকে মুক্তি দে—’
রানি অধীর হয়ে উঠলেন। আর দেরি করা যায় না। আসন্ন যে কোনো শুভ দিনেই প্রতিষ্ঠিত করতে হয় দেবীকে৷ স্নানযাত্রার দিনই নিকটতম শুভদিন। কিন্তু এ দেবী শক্তিস্বরুপিণী—একে বিষ্ণু-পর্বাহে প্রতিষ্ঠিত করা যায় কি করে? হোক বিষ্ণু-পর্বাহ, তবু আর অপেক্ষা করা যায় না—মা আকুল হয়ে উঠেছেন। যা শক্তি তাই মাধুরী-তাই ‘পরমাসি মায়া’। যিনি কালী, তিনিই লক্ষ্মী, তিনিই লজ্জা। যিনি মুণ্ড-মালিনী, তিনিই পদ্মালয়া। সর্বার্থ সাধিকা।
বারো শো বাষট্টি সালের বারোই জ্যৈষ্ঠ স্নানযাত্রার দিনে মন্দির প্রতিষ্ঠা হল। দেবী ভবতারিণী। পাষাণময়ী অথচ করুণাদ্রবা। মৃত্যুবর্জিতা শিবসুন্দরী। ত্রিনয়নী, তেজোরূপোজ্জ্বলা। পুরাতনী, পরমার্থা। কাললোকবাসিনী কালী কপালিনী।
রূপার সহস্রদল পদ্ম, তার উপর দক্ষিণ শিয়রে শবীভূত শিব শুয়ে আছেন। তাঁরই হৃদয়ের উপর পা রেখে দাঁড়িয়েছেন ভবতারিণী। পরনে লাল বেনারসি, মাথায় মুকুট, গলায় সোনার মুণ্ডমালা। নানা অলঙ্কারে ঝলমল করছেন সর্বাঙ্গে। কটিতটে সারে-সারে খণ্ডিত নরকর। দেবী চতুর্ভুজা—দুই বাম করে নৄমুণ্ড আর অসি, আর দক্ষিণ দুই হাতে বর ও অভয়মুদ্রা।
দেবী দক্ষিণাস্যা।
এততেও যেন সম্পূর্ণ হল না। সোয়া দু’লাখ টাকায় দিনাজপুর জেলার শালবাড়ি পরগণা কিনলেন। মা’র সেবায় দান করলেন শালবাড়ি। তবুও হল না পুরো-পুরি। মা অন্নভোগ চেয়েছেন, তার ব্যবস্থা কি?
পণ্ডিতেরা বললেন, তার বিধি নেই।
মাকে চাট্টি খেতে দেব ভক্তি করে, তার বিধি নেই?
না, নেই। তুমি রানি হলে কি হবে, তুমি শুদ্রাণী। শুদ্রাণীর অধিকার নেই দেবতাকে ভোগ দেবার।
ব্যাথায় চমকে উঠলেন রাসমণি। এ কিছুতেই হতে পারে না। বিধিতে আর ভক্তিতে এত প্রভেদ কি করে সম্ভব? নিচু ঘরে জন্মেছি বলে কি আমি মা’র সন্তান নই? মা কি নিচু হয়ে অন্ন খান না?
না। প্রচলিত প্রথার ব্যতিক্রম করবেন রাসমণি। এ বিধি নয়, বিধি-বিড়ম্বনা। এ কিছুতেই মানতে পারব না। অভুক্ত থাকতে দেব না মাকে। তাঁর নিত্য ভোগের ব্যবস্থা করব।
সাবধান! অমন যদি কিছু করো, ব্রাহ্মণেরা মন্দিরে এসে প্রসাদ নেবে না । তোমার দেবালয় অধর্মাশ্রিত হবে।
তবে উপায়? রানি দিকে-দিকে লোক পাঠালেন। কোথাও কেউ কোনো ব্যবস্থা দিতে পারে কি না। কৈবর্তের মেয়ে দেবীকে অন্নভোগ দেবার অধিকারী নয়। রানি আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন।
টোলে বা চতুষ্পাঠীতে, সবাই একবাক্যে বললে,
এতে কাঁদবার কি আছে? এত বড় একটা কীর্তি স্থাপন করলে, দেশে-দেশে তোমার নাম ছড়িয়ে পড়ল-এ কি কম কথা? কী হবে অন্নভোগে? অন্নপূর্ণার কি অন্নের অভাব আছে সংসারে?
তবু মেয়ের সংসারে মা এলে কি মেয়ে তাঁকে উপবাসী রাখে? আমি নাম-কাম চাই না। আমি চাই ভক্তি। আমি চাই সন্তোষ। মাকে অন্নভোগ দিতে না পেলে আমার সন্তোষ নেই ।
আবার কাঁদতে বসলেন রাসমণি।
হঠাৎ রামকুমারের টোল থেকে নতুন বিধান এসে পৌঁছল। প্রতিষ্ঠার আগে রানি যদি দক্ষিণেশ্বরের যাবতীয় সম্পত্তি কোনো ব্রাহ্মণকে দান করেন তবে অন্নভোগ চলতে পারে। সে ক্ষেত্রে মন্দিরে ব্রাহ্মণদের প্রসাদ নিতে কোনো বাধা নেই ।
অন্ধকারে রাসমণি দেখতে পেলেন মা’র আনন্দ চক্ষু । অভয় চক্ষু ।
কিন্তু এ ব্যবস্থা পণ্ডিতদের মনঃপুত হল না। তবু উপায় কি। স্বয়ং রামকুমার ভট্টাচার্য এ-পাঁতি দিয়েছেন, এ কে খণ্ডায়? সাধ্য নেই কেউ এ নিয়ে বিতণ্ডা করে।
রাসমণি ঠিক করলেন তাঁর গুরুর নামে মন্দির প্রতিষ্ঠা করবেন। কিন্তু পূজক-পুরোহিত কে হবে? গুরু বংশের কেউ পূজো-অর্চনা করে এ রানির অভিপ্রেত নয়। তারা সবাই অশাস্ত্রজ্ঞ, আচারসর্বস্ব। তাদের ডাকতে তাই তাঁর মন উঠল না। তবে কাকে ডাকেন? যাকেই ডাকেন সেই মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। বলে পাঠায়, পুজো করা দূরস্থান, যে-দেবতাকে শুদ্রাণী প্রতিষ্ঠিত করবে তার পায়ের গোড়ায় মাথা পর্যন্ত নোয়াব না। পারব না ব্রাত্য হতে।
এখন তবে কি করা যায়! এই মহা দুস্তরে পথ কোথায়?
শেষ পর্যন্ত রানি রামকুমারকেই লিখলেন উদ্ধার করতে। রামকুমার বললেন, ‘পূজকের অভাবে মন্দির যখন প্রতিষ্ঠা হয় না, তখন, বেশ, আমিই পূজক হব।’ মন্দির-প্রতিষ্ঠার দিন গদাধর এসেছে কালীবাড়িতে। বিরাট উৎসব। যাত্রা, কালীকীর্তন, ভাগবত, রামায়ণ পাঠ—কত কি হচ্ছে চার পাশে। কত দিক থেকে কত লোক এসেছে, সংখ্যায় লেখা-জোখা হয় না। সদাব্রত অন্নসত্র বসে গেছে। আহূত-অনাহূতের ভেদ নেই—শুধু দাও আর খাও, নাও আর ধরো। চলেছে চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয়র ঢালাঢলি।
গদাধরের মনে হল ভগবতী যেন কৈলাস শূন্য করে চলে এসেছেন মন্দিরে। কিংবা গোটা রজতগিরিই যেন রানি রাসমণি তুলে এনে দক্ষিণেশ্বরে বসিয়ে দিয়েছেন।
এত আয়োজন এত অজস্রতা, তা, গদাধর মন্দিরের অন্নভোগের অংশ নিল না। বাজার থেকে এক পয়সার মুড়ি-মুড়কি কিনে খেল, আর তাই খেয়ে কাটাল সমস্ত দিন। বেলা পড়লে হেঁটে চলে গেল ঝামাপুকুর।
‘কিছু, খেলি নে কেন রে গদাই?’ জিজ্ঞেস করেছিলেন রামকুমার। ‘কৈবর্তের অন্ন খেতে পারি না দাদা।’
গদাধর এখন বড় হয়েছে, পণ্ডিত হয়েছে। ভাবলেন রামকুমার। নইলে ছেলে-বেলায় ধনী কামারণীর হাতে কি করে সে ভিক্ষে নিয়েছিল?
পরদিন সকালে উঠেও গদাধর দেখলে দাদা ফেরেননি। তার মানে কি? দাদা কি কায়েমী হয়ে থেকে যাবেন না কি মন্দিরে? এ কি অভাবনীয়?
একের পর এক সাত-সাত দিন কেটে গেল, তব, দাদার দেখা নেই। আর অপেক্ষা করা যায় না, গদাধর চলল দক্ষিণেশ্বর
‘এ কি, বাড়ি যাবেন না?’
‘না রে—ভাবছি, জীবনের ক’টা দিন এখানেই কাটিয়ে দেব।’
গদাধর অবাক হয়ে রইল। বললে, ‘তবে কি,
‘হ্যাঁ, মন্দিরের পুজার ভার নিয়েছি। টোল এবার তুলে দেব। তুইও চলে আয় আমার সঙ্গে।’
প্রবল আপত্তি তুলল গদাধর। তা কি করে হতে পারে? বাবা কোনো দিন শুদ্রযাজী হননি, তাঁর ছেলে হয়ে কোন যুক্তিতে তাঁর প্রথার প্রতিকুলতা করবেন? ও সব ছাডুন।
রামকুমার অনেক বোঝালেন। অনেক তর্ক ফাঁদলেন। গদাধর নির্বিচল। নিষ্ঠায় নিয়তস্থিত।
তা হলে ধর্মপত্র করা যাক। বললেন রামকুমার। যা ধর্মপত্র তাই দৈবাদেশ। একটা ঘটিতে কতগুলি কাগজের টুকরো। তাতে কোনোটায় ‘হাঁ’ বা কোনোটায় ‘না’ লেখা। অনপেক্ষ কোনো শিশুকে ডেকে আনো, সে যে কোনো একটা টুকরো তুলুক হাতে করে। সেই টুকরোতে যদি ‘হাঁ’ থাকে, তবে করো, আর যদি ‘না’ থাকে, তবে কোরো না। জানবে তাই তোমার দেবতার ইঙ্গিত।
ধর্মপত্রে হাঁ উঠল।
তার মানে রামকুমার করুক যেমন করছে পূজকের কাজ।
এখন গদাধরের কাজ কী? ঝামাপুকুরের টোল তো পটল তুলল, সে খায় কি, থাকে কোথায়?
রামকুমার বললেন, ‘মন্দিরের প্রসাদ খাবি নে?’
‘না।’
‘কেন গঙ্গাজলে রান্না, মাকে নিবেদন করা, খেতে দোষ কি?’
‘আমি স্বপাকে খাই।’
‘বেশ তো, তবে সিধা নিয়ে যা না গঙ্গাপারে, নিজের হাতে রান্না করে খা গে। গঙ্গাকূলে সবই পবিত্র—এ তো মানতেই হবে।’
গঙ্গার নাম শুনে গদাধর গলে গেল। সকল-কলুষ ভঙ্গা গঙ্গা। ‘তব তট-নিকটে যস্য নিবাসঃ খলু বৈকুণ্ঠে তস্য নিবাসঃ।’ সেই ভবভয়দ্রাবিনী ভাগীরথী। তাকে গদাধর ফেরায় কি করে?
তবে তাই। গদাধর থাকবে দক্ষিণেশ্বরে। গঙ্গাতীরে স্বপাকে রান্না করে খাবে। গঙ্গাজলের রান্না।
কেন, কেন এই নিষ্ঠার কাঠিন্য?
ঠাকুর বললেন, ‘পায়ে একটি কাঁটা ফুটলে আরেকটি কাঁটা যোগাড় করে পায়ের কাঁটাটি বের করতে হয়। তার পরই ফেলে দিতে হয় দু’টো কাঁটাই। তেমনি অজ্ঞান কাঁটা তোলবার জন্যে জ্ঞান কাঁটা যোগাড় করো। তার পর জ্ঞান অজ্ঞান দু’টো কাঁটাই ফেলে দাও। তখন বিজ্ঞান অবস্থা। ত্রিগুণাতীত অবস্থা।’ গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বললেন অর্জুনকে, নিস্ত্রৈগুণ্যো ভবার্জুন।
নিষ্ঠা না থাকলে সত্যে পৌঁছবে কি করে? নিয়মে না থাকলে কি করে হবে নিয়মাতীত? আগে শাসন চাই, শম-দম-সাধন চাই। তবে তো নির্বাণে পৌঁছবে।
আগে কঠিন হও, তবে তো সরল হবে। আগে ডুব দিতে শিখবে তবেই ভো খুঁজে পাবে গভীরতা।
চণ্ডাল মাংসের ভার নিয়ে চলেছে। শঙ্করাচার্যকে সে ছুঁয়ে দিলে।
শঙ্করাচার্য চমকে উঠলেন।
‘আমায় ছুঁলি?’
চণ্ডাল বললে, ‘ঠাকুর, আমিও তোমায় ছুঁইনি, তুমিও আমাকে ছোঁওনি। শুদ্ধ আত্মা যে নির্লিপ্ত।’ এই হচ্ছে বিজ্ঞানীর ভাব। সে কখনো বালক, কখনো জড়, কখনো উন্মাদ, কখনো পিশাচ। সে তখন নিয়মাতীত। তার সর্বত্র ব্রহ্মময়। তার লজ্জা ঘৃণা ভয় ভাবনা নেই—কোনো গুণেরই আঁট নেই। সে কখনো বা জড়ের মত চুপ করে বসে থাকে। কখনো হাসে কখনো কাঁদে। এই বাবার মত সাজে-গোজে, খানিক পরে আবার বগলের নিচে কাপড়ের পুঁটলি পাকিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ডোবার জল আর গঙ্গাজল সমান দেখে।
এই যে নিত্যসত্ত্বস্থ অবস্থা—এতে আসতে হলে কত নিষ্ঠা-নিয়ম কত শাসন- বন্ধন দরকার তার কি ঠিক আছে?
দক্ষিণেশ্বরের মন্দির-প্রতিষ্ঠার কিছু দিন পরে এক পাগল এসে উপস্থিত। এক হাতে একটা কঞ্চি, অন্য হাতে একটা ভাঁড়, পায়ে ছেঁড়া জুতো। গঙ্গায় ডুব দিয়ে উঠে, কোঁচড়ে কি ছিল তাই খেল। তার পরে মন্দিরে গিয়ে স্তব করতে বসল। গমগমে শব্দে কেঁপে-কেঁপে উঠল মন্দির। ভাত জোটেনি, অতিথি-শালার পাত কুড়িয়ে খেতে লাগল ভাত। পথের কুকুরের মত। এমন কি পথের কুকুরদের সরিয়ে সরিয়ে কাড়াকাড়ি করে। হলধারী ছুটে এল মন্দির থেকে। লোকটার পিছু-পিছু ধাওয়া করলে। বললে, তুমি কে?
পাগল বললে, ‘চুপ। কাউকে বলিসনি। আমি পূর্ণজ্ঞানী।’
পূর্ণজ্ঞানী?
‘হ্যাঁ, তোকে বলে যাই। যেদিন এই ডোবার জল আর গঙ্গাজলে কোনো ভেদবুদ্ধি থাকবে না, তখনই বুঝবি পূর্ণজ্ঞান হয়েছে।’ বলেই পাগল চলে গেল কোন দিকে।
ঠাকুর সব শুনলেন। ভয়ে জড়িয়ে ধরলেন হৃদয়কে। মাকে বললেন, ‘মা, আমারো কি তবে এমনি হবে?’
ভয় কি। মা’র মুখে সেই অভয়ঙ্কর প্রসন্নতা।
চুম্বকের পাহাড়ের কাছ দিয়ে জাহাজ চলে গেলে জাহাজের আর কী থাকে? তার কলকব্জা ইস্ক্রুপ-বলটু লোহা-লক্কড় সব আলাদা হয়ে খুলে যায়। তেমনি তোর যখন ঈশ্বরদর্শন হবে তখন তুই আর তুই থাকবি না। তুই তো কাঠ নস যে পোড়ালে ছাই থাকবি। তুই কর্পূর, পোড়ালে তোর কিছুই বাকি থাকবে না। শেষ বিচারের পর তোর সমাধি হয়ে যাবে। নুনের পুতুল হয়ে নামবি তুই লবণের সমুদ্রে। তোর তো আমিই আছি।
তোর ভয় কি। তোর তো আমিই আছি।
মৃন্ময় আধারে চিন্ময়ী মা।
৯
‘এ ছেলেটি কে?’
খানিকটা তন্ময়ের মতই জিজ্ঞেস করলেন মথুরবাবু।
উদারদর্শন, নবীন ব্রহ্মচারী। কুমার-কোমল। এ কে? একে কি আগে কোথাও দেখেছি? কোথায় দেখব? কত দিন আগে?
কিছুতেই মনে করতে পারছেন না মথুরবাবু। তবে কি পূর্বজন্মে দেখেছি? কিংবা, জন্ম-মৃত্যুর পরপারে?
‘কে এই ছেলেটি?’
না, স্বগতোক্তি নয়, প্রশ্ন করছেন রামকুমারকে।
‘আমার ভাই।’ স্নিগ্ধ-বিনয়ে বললেন রামকুমার।
কিন্তু মথুরমোহনের কে? কেউ যদি না-ই হবে তবে তার দিকে মন ছুটে চলেছে কেন?
‘এখানে, এই মন্দিরে, কাজ করবে?’
‘দেখব জিজ্ঞেস করে।
বললেন বটে রামকুমার, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলেন না। তিনি জানেন তো তাঁর ভাইকে। দক্ষিণা নিয়ে ঠাকুর-পূজো করবার সে ছেলে নয়। এমন সময় দক্ষিণেশ্বরে হৃদয়রাম এসে হাজির।
‘এ কি, তুই এখানে কোত্থেকে?’ অবাক হলেন রামকুমার।
‘বর্ধমানে গিয়েছিলাম চাকরির সন্ধানে ।
চাকরির নামে লবডঙ্কা। শুনলাম মামারা এখন মস্ত হয়েছেন, রানি রাসমণির কালীমন্দিরে আছেন পুজুরী হয়ে। ভাবলাম যদি তাঁদের ধরলে একটা হিল্লে হয়।’
ষোলো বছরের বলবান ছেলে। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে দৃঢ়কায়। সুপুরুষ। সদানন্দ। ‘ওরে, হৃদে এসেছিস্?’ আনন্দে ছুটে এল গদাধর। যদিও বছর চারেকের ছোট, সম্পর্কে ভাগনে, তবু একেবারে নিকটতম বন্ধু । ছেলেবেলার খেলুড়েদের একজন। সহজ স্নেহে জড়িয়ে ধরল বুকের মধ্যে। বললে, ‘তুই কী মনে ক’রে?’ হৃদয় কিছু বলল না, চুপ করে রইল। কিন্তু অন্তরে বসে অন্তরবাসিনী বললেন, ‘তোরই জন্যে হৃদয়কে পাঠিয়ে দিলাম তোর কাছে। ও না হলে তোকে দেখবে-শুনবে কে? সামলাবে কে? সাধনায় বসে যখন সব ভুলে যাবি তখন তোর শরীর কে বাঁচিয়ে রাখবে? তুই যদি শিব, ও তোর নন্দী। তুই যদি রাম, ও তোর লক্ষ্মণ।
গাছের যেমন ছায়া, গদাধরের তেমনি হৄদে।
দুটিতে কাছছাড়া নেই। সর্বক্ষণ সমভাব। শুধু খাবার সময় আলাদা। হৃদয় মন্দিরে প্রসাদ নেয়, গদাধর গঙ্গাতীরে রান্না করে।
সেজবাবুকে এড়িয়ে চলে গদাধর। কালী-ঘরে কোনো একটা চাকরিতে তাকে ঢুকিয়ে দেবেন তাঁর মনের কথা চোখের ভাষায় যেন ধরা পড়েছে। চাকরি-বাকরির মধ্যে আমি নেই, ধরা-বাঁধার মানুষ নই আমি। তার চেয়ে নিজের মনে শিব গড়ি, পূজো করি নিজের মনে। সেই আমার ভালো। আমার ধ্যানের আরাম।
এমনি মূর্তি গড়ছে গদাধর। মূর্তি গড়ে পূজোয় বসেছে এক দিন। পূজোয় বসে আবিষ্ট হয়ে রয়েছে। সেই সংযোগে চুপিসারে কখন কাছে এসে পড়েছেন সেজবাবু। তন্ময় হয়ে দেখছেন সেই শিবমূর্তি। তার গঠনলাবণ্য। শুধু ভাস্কর্য নয়, ভাস্কর্যের চেয়েও যা বড় জিনিস তাই যেন ফুটে উঠেছে সর্বাঙ্গে। তা ভক্তি। তা মনোমাধুরী। হাতের পেলবতায় গলে-গলে পড়ছে যেন অন্তরের অনুরাগ৷
‘এ মূর্তি কে করেছে?’
‘গদাধর।’ হৃদয় কাছাকাছিই ছিল, বললে।
এক মুহূর্ত কি ভাবলেন মথুরবাবু। বললেন, ‘পূজো হয়ে গেলে আমাকে দেবে এই মূর্তি?’
আপত্তি কি! চক্ষের নিমেষে এমনি কত-শত মূর্তি গড়তে পারবে গদাধর। হৃদয় সম্মতি দিল।
মূর্তি হাতে পেয়ে আরো ব্যাকুল হলেন মথুরবাবু। যার চকিত কল্পনার এই রূপ, তার অতলতল ধ্যানের না-জানি কেমন চেহারা! ডেকে পাঠালেন রাম কুমারকে। গদাধরকে রাজি করান, তাকে কাজ দেন মন্দিরে।
‘অসম্ভব’—মুখ গম্ভীর করলেন রামকুমার।
গদাধরের চাকরিতে রুচি নেই।
জেদ চাপল মথুরবাবুর। যে করেই হোক গদাধরকে কালীর কোলের কাছে টেনে আনতেই হবে।
‘বাবু আপনাকে ডাকছেন।’
গদাধর চেয়ে দেখল, সেজবাবুর চাকর।
আর পালাবার জো নেই।
সেজবাবু একেবারে চোখের উপর দাঁড়িয়ে।
‘ডাকছেন, যাও না!’ হৃদয় তাড়া দিল ‘এত ভয় কিসের?’
‘গেলেই বলবে, এখানে থাকো, চাকরি করো। ও আমি পারব না।’ ‘দোষ কি! করলেই বা চাকরি! লোক কত সৎ আর মহৎ। এমন লোকের আশ্রয়ে চাকরি করা তো সুখের কথা।
‘তুই কত বুঝিস! চাকরি নিলেই চিরকাল বাঁধা পড়ে যেতে হবে। আমার তা পোষাবে না। তাছাড়া—’গলা নামাল গদাধর ‘তাছাড়া কালীপূজোর ভার নেওয়া চারটিখানি কথা নয়। দেবীর গায়ের অত গয়নার কে ভার নেবে?’
‘আমি নেব।’
‘তুই নিবি? সত্যি বলছিস?’
‘‘আমার একটা কিছু জুটে গেলেই হল।’
‘চাকরি খুঁজতে এসেছি আমি এখানে। ‘তবে যাই, বলি গে সেজবাবুকে,
হাতে চাঁদ পেলেন মথুরবাবু, গদাধরকে বললেন, ‘তুমি মাকে রোজ সাজাবে, মা’র ‘বেশকারী’ হলে তুমি।’ আর, হৃদয়কে বললেন, ‘তুমি হলে ওর সাগরেদ।’ এ সময় একটা কাণ্ড ঘটল।
ক্ষেত্রনাথ চাটুজ্জে রাধাগোবিন্দের পূজারী। রোজ সকালে রাধারানি আর কৃষ্ণকে মন্দিরের সিংহাসনে এনে বসান আর বিকেল হলে নিয়ে যান শয়নঘরে। জন্মাষ্টমীর পরের দিন। দুপরে ভোগরাগ হয়ে গিয়েছে, এখন বিরাম-পর্ব। কক্ষান্তরে রাধারানিকে আগে শুইয়ে দিয়ে এসেছেন, এখন গোবিন্দকে নিয়ে চলেছেন ক্ষেত্রনাথ। হঠাৎ পড়ে গেলেন পা পিছলে। নিজে সামলেছেন কিন্তু বিগ্রহের একটি পা গিয়েছে ভেঙে।
তুমল সোরগোল উঠল মন্দিরে। এ কি অঘটন! এ কি অশুভ সূচনা!
ক্ষেত্রনাথকে বরখাস্ত করে দেওয়া হল সরাসরি। কিন্তু তাতে কী হবে? বিগ্রহ তো তাতে অভঙ্গ হয়ে উঠবে না!
তা উঠবে না, কিন্তু এখন উপায় কী বলো। রানি রাসমণি অস্থির হয়ে উঠলেন। মথুরবাবুকে বললেন, সভা বসাও, ডাকাও পণ্ডিতদের, বিধি নাও৷ বসল পণ্ডিতসভা। সব ন্যায়চঞ্চু তর্কচূড়ামণির দল। অনেক শাস্ত্র ঘেঁটে আর সংস্কৃত আওড়ে তাঁরা পাঁতি দিলেন—ভাঙা বিগ্রহকে গঙ্গায় ফেলে দিতে হবে,
আর তার জায়গায় বসাতে হবে নতুন দেবমূর্তি।
সঙ্গে-সঙ্গে নতুন দেবমূর্তির ফরমায়েস গেল । কিন্তু রানির মনে সুখ নেই। অন্তরের অন্ধকারে কাঁদতে লাগলেন। বলতে লাগলেন গোবিন্দকে, তুমি কি আমার কাছে শুধু পাথর না তামা-পেতল যে, তোমাকে জলে ফেলে দেব? তার চেয়ে তুমি আমাকে চোখের জলে ফেলে রাখো।
মথুর বুঝলেন রানির অস্থিরতা। বললেন, ‘গদাধরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি।’ মনে হল যেন কোথাও একটা সহজ সমাধান আছে। যিনি সরলের মধ্যে সরল তিনিই তরল করে দেবেন।
গদাধরকে বললেন সব মথুরবাবু,
এখন তুমি কী বলো। তোমার মন কী বলে!
‘যেমন পণ্ডিত তেমনি তাদের পাঁতি।’
ঝলসে উঠল গদাধর ‘রানির জামাইয়ের যদি আজ ঠ্যাং ভাঙত, তবে রানি কী করতেন? গঙ্গায় জামাইকে ফেলে দিতেন আর তার জায়গায় বসাতেন এনে নতুন জামাই?’
সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল।
‘কখনো না। জামাইকে রানি চিকিৎসা করাতেন। চিকিৎসা করিয়ে ভালো করে তুলতেন। এখানেও সে-ব্যবস্থা করলেই হয়।’
সবাই বাক্যহীন।
‘হ্যাঁ গো, ভাঙা পা জোড়া দেয়ার কথা বলছি। ভাঙা পা জুড়ে দিলেই ঠাকুর আবার আস্ত-সুস্থ হয়ে উঠবেন। আবার চলবে তাঁর সেবা-পূজা।’ একেবারে সোজাসুজি অন্তরের কথা। মন যেমনটি চায় তেমনি। যা মন থেকে আসে, বিবেক থেকে আসে, তাই ঈশ্বর থেকে আসে। যেখানে সরল-স্বচ্ছ সেখানেই ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব।
এমন যে সহজ মীমাংসা হতে পারে—শুনে পণ্ডিতেরা হতভম্ব হয়ে গেল। অনেক শাস্ত্র পেড়ে আপত্তি তুললে, কিন্তু মনের কাছে আবার শাস্ত্র কি! মনের জোরের কাছে কার জোর খাটবে!
রানির বুক ভরে গেল আনন্দে। দু’চোখে ধারা নেমে এল। কত সহজের মধ্যে তুমি আছ! কত সহজের মধ্যেই ধরা দিলে! মনে-মনে বললেন গোবিন্দকে। গদাধরকে বললেন, তুমিই তবে ভাঙা পা জুড়ে দাও। তুমি ওস্তাদ কারিগর, তুমিই বৈদ্যনাথ।’
ভাঙা পা জুড়ে দিল গদাধর। একেবারে নিখুঁত করে দিল। কারুর সাধ্যি নেই চোখে দেখে বার করে দেয় জোড়ার দাগ। কারুর সাধ্যি নেই বার করে দেয় এই জাদুকরের জারিজুরি।
ফরমায়েসি মূর্তি এসে পৌঁছল। মথুরবাবু বললেন, ‘দেখ তো, ও আগের মতন হল কি না।’
চোখ মেলে নয়, চোখ বুজে দেখল গদাধর। দেখল অন্তরের মধ্যে ডুবে গিয়ে। না, তেমনটি হয়নি। তেমনটি আর হয় না।
দরকার নেই নতুন বিগ্রহে। পুরোনো বিগ্রহই ভালো। কত প্রীতি-ভক্তির কোমলতা তার গায়ে মাখা। কত অশ্রুতে তাকে স্নান করানো। কত প্রার্থনায় তার ঘুম ভাঙানো। তাকে কি আর বিদায় দেওয়া চলে? না কি বিদায় দিলেই তার দায় যাবে?
কিন্তু যাই বলো খুঁতে হয়ে রইল যে। অঙ্গহীন বিগ্রহে কি পূজো সিদ্ধ হয়? খুব হয়। প্রিয়জন যদি খুঁতে হয় তবে সেই খুঁতের জন্যেই সে প্রিয়তর। বরানগরে কুটিঘাটার কাছে রতন রায়ের ঘাটে গদাধর বেড়াতে এসেছে। সেখানে ডাকসাইটে জমিদার জয়নারায়ণ বাঁড়ুয্যের সঙ্গে দেখা। কথায়-কথায় রানি রাসমণির কালী-বাড়ির কথা উঠল। রাধাগোবিন্দের কথা। ‘হাঁ হে মশাই, ওখানকার গোবিন্দ কি ভাঙা?’
‘তোমার বুদ্ধি কি গো!
গদাধর হেসে উঠলঃ ‘যিনি অখণ্ডমণ্ডলাকার তিনি কি কখনো ভাঙা হন?’
জয়নারায়ণ চুপ।
ভাবাবস্থায় পড়ে গিয়ে ঠাকুরের দাঁত ভেঙে গিয়েছিল। সেবার পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে গেল।
‘হাত ভাঙলো কেন জানিস?’ ভক্তদের সম্বোধন করে প্রশ্ন করলেন ঠাকুর।
কে কি বলবে! ঠাকুরের হাত ভেঙে গিয়েছে এ একটা দৈব-বিপাক ছাড়া আর কি। কিন্তু ঠাকুর বললেন, ‘হাত ভাঙলো—সব অহঙ্কার নির্মল করবার জন্যে। এখন আর এই খোলের ভিতরে আমি খুঁজে পাচ্ছি না। খুঁজতে গিয়ে দেখি তিনি রয়েছেন।’
রানি রাসমণি খুঁজতে গিয়ে দেখলেন ভাঙা বিগ্রহের মধ্যেই গোবিন্দ রয়েছেন। জ্ঞানে যিনি সত্তায় যিনি প্রাপ্তিতে যিনি, তিনিই গোবিন্দ।
