পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.২০
২০
বকুলতলার ঘাটে এসে নৌকো লাগল। সক্কাল বেলা। দক্ষিণেশ্বরের বাগানে গদাধর ফুল তুলছে। সহসা চোখ পড়ল ঘাটের দিকে। কে এল নৌকোয়?
আশ্চর্য, স্ত্রীলোক! কিন্তু এ কী তার অদ্ভুত বেশবাস! পরনে গেরুয়া, হাতে ত্রিশূল, ঘাড়ে-পিঠে অসম্বদ্ধ চুল-এ যে সন্ন্যাসিনী! এ এখানে এল কি করে? এখানে তার কি কাজ? কে তাকে পথ দেখাল?
তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে ফিরে এল গদাধর। ডাকলে হৃদয়কে। ওরে, দ্যাখ গিয়ে, ঘাটে এক ভৈরবী এসেছে। কি তার গায়ের রং, কি তার চোখের ছটা! কি তার ভঙ্গির তেজ! চাঁদনিতে রয়েছে। যা, তাকে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয় এখানে। হৃদয় তো অবাক। সে এখানে আসবে কেন? তুমি ডাকলে তার কি? ‘তুই যা না। গিয়ে বল আমি এখানে আছি। তা হলেই সে আসবে।’ তাই গেল হৃদয়। গিয়ে দেখল, ঘাটের চাঁদনিতে ভৈরবী বসে আছে চুপচাপ। যেন বা তারই সংবাদের প্রতীক্ষায় । বললে তার মামার কথা। মামা যেতে বলেছে তাকে৷
হৃদয় তো অবাক! এক বাক্যে উঠে পড়ল ভৈরবী। বিনা প্রশ্নে অনুসরণ করলে।
চলে এল গদাধরের ঘরের দরজায়। গদাধরকে দেখেই আনন্দে আর বিস্ময়ে কেঁদে ফেলল। বললে উচ্ছাসিত হয়ে ‘বাবা, তুমি এখানে? শুধু এইটুকু জেনেছি তুমি গঙ্গাতীরে আছ। সেই থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি তোমাকে। এত দিনে দেখা পেলাম।’
বছর চল্লিশ বয়েস হবে ভৈরবীর—অভিভূতের মত তার দিকে তাকিয়ে রইল গদাধর। বললে, ‘আমাকে তুমি খুঁজে বেড়াচ্ছ, মা? কিন্তু আমার কথা তুমি জানলে কি করে?’
‘মা মহামায়া জানিয়ে দিলেন। বললেন, এই তিন জনের সঙ্গে গিয়ে দেখা কর।’
‘তিন জন?’
‘হ্যাঁ, আর দু’জনের সঙ্গে পূর্ব-বাঙলায় দেখা হয়েছে। বাকি তোমাকেই এত দিন খুঁজছিলাম।’
গৃহহারা শিশু যেন মাকে ফিরে পেয়েছে এমনি আগ্রহে গদাধর আঁকড়ে ধরল ভৈরবীকে। কত দিনের কত সুখ-দুঃখের কথা বলতে বাকি। মা গো, সব বলি তোকে বসে-বসে। বাহ্যজ্ঞান থাকে না, অলৌকিক কত কি দেখি-শুনি, সমস্ত গা জ্বলে-পুড়ে যায়, চোখের পাতা এক করতে পারি না। সবাই বলে পাগল হয়ে গেছি। তাই কি সত্যি? রাত-দিন মাকে ডেকে-ডেকে শেষে পাগল হয়ে গেলাম? মাকে ডাকার এই পরিণাম?
‘কে তোমাকে পাগল বলে?’ ভৈরবীর কণ্ঠ থেকে অমৃত-আশ্বাস ঝরে পড়ল, ‘একে বলে, মহাভাব। এ ভাব চেনে এখানে এমন কারু সাধ্যি নেই৷ তাই যেমন সব পণ্ডিত তেমনি সব ভাষ্য।’
‘মহাভাব!’গদাধরের দুই উন্নিদ্র চক্ষু, জ্বলজ্বল করে উঠল।
‘হ্যাঁ, এই ভাব হয়েছিল রাধারানির, এই ভাব হয়েছিল শ্রীচৈতন্যের। ভক্তিশাস্ত্রে এ সব লেখা আছে। আমি পড়ে সব দেখিয়ে দেব তোমাকে। মিলিয়ে-মিলিয়ে দেখিয়ে দেব।’
ভৈরবী তার ঝুলি ঘাঁটতে লাগল। ঝুলিতে খান কয়েক পুঁথি আর দু’-একখানা কাপড়। জীবনের পথবাহনের যা-কিছু সম্বল।
দেবীর কিছু প্রসাদ খাও মা। কিছু মাখন আর মিছরি ভৈরবীকে নিবেদন করল গদাধর। কিন্তু ছেলে না খেলে কি মা আগে খায় কখনো? গদাধর তাই মুখে দিল খানিকটা। তবেই ভৈরবী জলযোগ করলে।
কিন্তু কে মা তুমি সংসারত্যাগিনী? কেন তোমার এই সন্ন্যাসসজ্জা? কেউ কিছুই জানে না—আমিও না। শুধু এইটুকু জেনে রাখো, যশোর জেলায় আমার বাড়ি আর ব্রাহ্মণের ঘরে আমার জন্ম। যদি কিছু নাম দিতে চাও, বলো যোগেশ্বরী। এই যোগে বসেই জানতে পেলাম তিন জনকে সাধনায় সাহায্য করতে হবে। প্রথম দু’জনের নাম হচ্ছে চন্দ্র আর গিরিজা—দুয়ের বাড়িই বরিশালে। আর তৃতীয় জন তুমি। চন্দ্র আর গিরিজাকে শিখিয়ে পড়িয়ে এসেছি, এবার তোমার পালা।
ওরা কী শিখল?
কয়েক দিনের মধ্যেই দেখতে পাবে। ওদের নিয়ে আসব দক্ষিণেশ্বরে। তোমার সঙ্গে মিলিয়ে দেব। আমার তিন শিষ্য একত্র হবে ।
মন্দির ঘুরে সব দর্শন করলে যোগেশ্বরী। গলায় ঝুলছে যে রঘুবীর শিলা, এখন তার ভোগের যোগাড় দেখতে হয়। সিধে এল ঠাকুরবাড়ি থেকে। তাই নিয়ে সে পঞ্চবটীতে রাঁধতে গেল।
মহাভাব! মহাভাব কাকে বলে?
যেমন শ্রীমতীর হত। এক সখী ছাতে গেলে অন্য সখী বলত, ওরে এখন কৃষ্ণ-বিলাসের অঙ্গ, ছুঁসনি—এঁর দেহের মধ্যে এখন কৃষ্ণ বিলাস করছেন। মহাভাব ঈশ্বরের ভাব—দেহ-মনকে তোলপাড় করে দেয়। যেন একটা মস্ত হাতি নাড়া-কুচির কুঁড়েঘরে গিয়ে ঢুকছে। ঘর চুরমার। ঈশ্বরের বিরহ-আগুন প্রলয়ের আগুনের মত। সে কি সামান্য? রূপ-সনাতন যে গাছের তলায় বসতেন, সে গাছের পাতা ঝলসা-পোড়া হয়ে যেত ৷
‘এই অবস্থায় তিন দিন ঠায় অজ্ঞান হয়ে ছিলাম।’ বললেন এক দিন ঠাকুর, ‘অনড় হয়ে পড়েছিলাম এক জায়গায়। হুঁস হলে বামনি আমায় ধরে স্নান করাতে নিয়ে গেল। কিন্তু আমার গায়ে হাত ঠেকাবার কি জো আছে! গো মোটা চাদর দিয়ে ঢেকে দিলে। সেই চাদরের উপর দিয়ে ধরলে আমাকে৷ ধরে নিয়ে গেল গঙ্গায়। গায়ে যে সব মাটি লেগেছিল পুড়ে গিয়েছিল—
‘শ্রীমা বলতেন, ‘ঠাকুরের যখন মহাভাব হত, মনে হত বুকের ভিতর যেন সাতটা আগুনের তাওয়া জ্বলছে।’ বলতে বলতে ভাবারূঢ় হতেন, ‘আহা, সে কী গায়ের রং! সোনার ইষ্ট কবচের সঙ্গে গায়ের রং মিশে থাকত। যখন তেল মাখিয়ে দিতুম দেখতুম সব গা থেকে যেন জ্যোতি বেরুচ্ছে! যখনই কালী-বাড়িতে বার হতেন, সব লোক দাঁড়িয়ে পড়ত, বলত ঐ তিনি যাচ্ছেন। বেশ মোটাসোটা ছিলেন। ছোট তেল ধুতিটি পরে যখন থসথস করে গঙ্গায় নাইতে যেতেন, রূপের সে কি ঢেউই উঠত! বেড়ার ফাঁকে দাঁড়িয়ে চোখ ভরে দেখতুম। মথুরবাবু একখানা পিঁড়ে দিয়েছিলেন, বেশ বড় পিঁড়ে। যখন খেতে বসতেন তখন তাতেও বসতে কুলোত না–ছাপিয়ে পড়তেন—
‘আমাকে তিনি কি বলতেন জানো?’ বললেন এক দিন শ্রীমা ‘বলতেন, তাঁর দেহ দেখিয়ে বলতেন, আমার এই দেহটি গয়া থেকে এসেছে। তাই তাঁর মা দেহ রাখবার পর আমাকে তিনি বললেন, তুমি গিয়ে গয়ায় পিণ্ড দিয়ে এস। সে কি কথা? পুত্র বর্তমান থাকতে আমি পিণ্ড দেব কি! হবে গো হবে, তুমি দিলেই হবে। বললেন তিনি, আমার কি আর ওখানে যাবার জো আছে? গেলে কি আর ফিরবো? চমকে উঠলাম। কাজ নেই তবে গিয়ে। আমিই যাব। বুড়ো গোপালকে নিয়ে পরে আমিই গিয়েছিলুম গয়ায়।’
রান্না করে রঘুবীরের সামনে ভোগ্য-ব্যঞ্জন রেখে ধ্যানে বসেছে ভৈরবী। বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গেছে, গাল বেয়ে ঝরে পড়ছে আনন্দবৃষ্টি। ধ্যানে দেখছে, স্বয়ং রঘুবীর যেন খাচ্ছে সেই তার নিবেদনের অন্ন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে। আহা, খাক তৃপ্তি করে।
জ্ঞান হয়ে চোখ মেলে নিজেই আনন্দে আত্মহারা। যে খাচ্ছে এ ভাত সে গদাধর। অনাহূত কখন চলে এসেছে পঞ্চবটীতে। চলে এসেছে অদৃশ্য কোন প্রাণের টানে। অদৃশ্য কোন নিমন্ত্রণের সংবাদে।
ভৈরবীর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই জ্ঞানভূমিতে নেমে এল গদাধর। অপ্রস্তুতের মত বললে, ‘কখন কি যে গোলমাল হয়ে যায়, যত সব আজব কাণ্ড করে বসি।’ ভৈরবীর মুখে প্রশান্ত অভয়। বললে, ‘বেশ করেছ, প্রাণ যেমনটি চেয়েছিল ঠিক তেমনটি করেছ। ধ্যানে যা দেখেছি তাই প্রত্যক্ষ করলাম চোখ মেলে। আমার আর বাইরের পুজোয় দরকার নেই, আমি পেয়ে গেছি আমার রঘুবীরকে। ‘বলে সে খেতে লাগল সেই উচ্ছিষ্টান্ন। তার দেবতার প্রসাদ।
খাওয়ার শেষে এল গঙ্গাতীরে। কী হবে আর শিলামূর্তিতে। পেয়ে গেছি প্রাণ-স্বরূপকে। এত দিন গলায় ঝুলিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছিল যে শিলাখণ্ড, নিমেষে তা ফেলে দিলে গঙ্গায়।
মাকে বলত গদাধর, মা আমাকে দেখিয়ে দে, শিখিয়ে দে। তোর ছেলে হয়ে আমি কি আকাট হয়ে থাকব?
তাকে শেখাবার জন্যেই মা পাঠিয়ে দিয়েছেন ভৈরবীকে, তাঁর জ্ঞানবর্তী যোগেশ্বরী মেয়েকে।
তন্ত্রশাস্ত্রে বিধিবেত্তা, বহুদর্শিনী ভৈরবী। পুত্রবৎ পড়াতে লাগল গদাধরকে। কাকে বলে দিব্য-দর্শন, কাকেই বা বলে দিব্যোন্মাদনা, বইয়ের লিখনের সঙ্গে লক্ষণ মিলিয়ে দেখিয়ে দিতে লাগল। বহু জিজ্ঞাসার সমাধান হল গদাধরের, হল বহু সংশয়ছেদন। পঞ্চবটীতে বইতে লাগল দিব্যানন্দের ঢেউ। ‘চিদানন্দ সিন্ধুনীরে প্রেমানন্দের লহরী।
দিন সাতেক কেটে গেল অলৌকিক ঘনিষ্ঠতায়। কিন্তু বাইরের সংসার এ ঘনিষ্ঠতাকে কি চোখে দেখছে কে জানে। হয়তো বা ভৈরবীর নামে অন্যায় কিছু রটনা করে বসবে। তাই গদাধর ভৈরবীকে বললে, গাঁয়ের মধ্যে তুমি কোথাও একটু দূরে সরে থাকো না-
ঠিক বলেছ। তবে কোথায় কে জায়গা দেয় কে জানে। তবে যেখানেই থাকি রোজ আসব আমি গোপালকে ননী খাওয়াতে। গোপালকে না দেখে যে আমার সূর্য-চন্দ্র উদয় হবে না।
খানিক দূরে উত্তরে দেবমণ্ডলের ঘাটে বামনি থাকবার আশ্রয় পেল। মণ্ডলরাই সাদরে জায়গা করে দিলে তার। চাঁদনিতে তক্তপোশ পেতে দিব্যি থাকো তোমার খুশি-মত।
গাঁয়ে ঘুরে ঘরে দু’দিনেই সকলের মন টেনে নিলে ভৈরবী। যেই কাছে আসে সেই মনে-মনে হাত জোড় করে। মুখে-মুখে মধুরতার রসদ জোগায়। এ বলে আমার থেকে সিধে নাও, ও বলে আমার বাড়িতে এসে থাকো। কারুর সাহস নেই দুর্নামের কাদা ছোঁড়ে।
গোপাল! গোপাল! ননী হাতে করে বসে-বসে কাঁদছে বামনি।
প্রায় দু-মাইল দূর। সে কান্না কালীবাড়িতে গদাধরের কানে এসে লাগে। মা খাবার খেতে ডাকছে শুনে ছেলে যেমন ছোটে তেমনি হঠাৎ ছুট দেয় গদাধর। দু-মাইল রাস্তা এক নিশ্বাসে পার হয়ে যায়। দম না নিয়েই বামনির হাতের থেকে ননী তুলে নিয়ে খেতে আরম্ভ করে।
কোনো-কোনো দিন পোশাক বদলায় ভৈরবী। গাঁয়ের মেয়েদের থেকে শাড়ি-গয়না চেয়ে নিয়ে সাজগোজ করে। ওদেরই সাহায্যে তৈরি করে নানা ভক্ষ্যভোগ্য। থালায় করে সাজিয়ে গান গাইতে-গাইতে চলে আসে কালীবাড়ি। নিজের হাতে খাওয়ায় গদাধরকে, তার গোপালকে।
বলে, নিত্যানন্দের খোলে এবার চৈতন্যের আবির্ভাব।
গদাধরের মনে হয় এ যেন সেই নন্দরাণী যশোদা। বাৎসল্যরসের সুরধুনি।
শুধু জননী নয়, জগৎগুরু। বলে, একে-একে চৌষট্টিখানা তন্ত্র শেখাব তোমাকে। মা’র আদেশ। মা’র আশীর্বাদ।
গদাধরের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে।
ঠাকুরের ধর্মজীবনের প্রথম গুরু নারী। যে নারী মাতৃত্বময়ী মঙ্গলস্বরূপিণী।
২১
এ সব কী দেখছে ভৈরবী?
ভগবানের কথা বলতে গেলেই ভাববিভোর হয়ে যায়। কীর্তনে গলে পড়ে, ঢলে পড়ে। ধ্যানে বসলেই সমাধিস্থ। এ সব সেই চৈতন্যদেবের লক্ষণ। সেই জ্ঞান সেই ভক্তি সেই তীব্ৰ বৈরাগ্য। চৈতন্যদেবের জিভে সার্বভৌম চিনি ঢেলে দিলে, চিনি ভিজলই না, ফরফর করে উড়ে গেল হাওয়ায়। তেমনি বহ্নিময় সন্ন্যাস। প্রজ্বলন্ত অনাসক্তি। যাকে ছুঁচ্ছে তাকেই ঈশ্বরভাবিত করে দিচ্ছে। যাকে ধরছে তাকেই নাচিয়ে ছাড়ছে। এমন প্রিয় যে নিজের দেহ, তাই ভুল করে ফেলছে। শুধু ভুল কি, শরীরের বোধই নেই এক বিন্দু। চেতনার চিহ্ন নেই এক কণা। এ সবই চৈতন্যদেবের হয়েছিল। যাকে বলে প্রেমোন্মাদ। সাগরে ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন, সাগর বলে বোধ নেই। মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়লেন, শরীর সেই মাটির চেয়েও তুচ্ছ। বন দেখে ভাবলেন বৃন্দাবন, সমুদ্র দেখে যমুনা। যেমন গোপিনীদের হয়েছিল। রাসমণ্ডলের মধ্যে থেকে শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্হিত হলেন, গোপিনীরা উন্মাদিনী হয়ে উঠল। গাছ দেখে বললে, তুমি নিশ্চয়ই কৃষ্ণকে দেখেছ নইলে অমন নিশ্চল, সমাধিস্থ হয়ে রয়েছ কেন? তৃণাচ্ছন্ন মাটিকে দেখে বললে, তুমি নিশ্চয়ই কৃষ্ণকে দেখেছ নইলে অমন রোমাঞ্চিত হয়ে রয়েছ কেন? আবার মঞ্জরিত মাধবীকে দেখে বললে, ও মাধবী, আমার মাধবকে এনে দে। সেই প্রেমোন্মাদ। প্রেমে হাসে প্রেমে কাঁদে প্রেমে নাচে প্রেমে গায়। সেই ‘চিদানন্দ সিন্ধুনীরে প্রেমানন্দের লহরী’।
চৈতন্যচরিতামৃত ও চৈতন্যভাগবতে পড়েছে ভৈরবী, মহাপ্রভু আবার দেহ ধরবেন। দুঃখ ও অজ্ঞান থেকে জীবোদ্ধার করবার জন্যে অবতীর্ণ হবেন পৃথিবীতে। সন্দেহ নেই, ঠিক-ঠিক মিলে যাচ্ছে। তিনিই এসেছেন।
‘মা গো, বুক-পিঠ জ্বলে যাচ্ছে। কত চিকিৎসা করালাম, কিছুতেই কিছু হল না।’ ভৈরবীকে বললে গদাধর। ‘কি করি বলতে পারো? কিসে যাবে এই জ্বালা-পোড়া?’
সূর্যোদয়ে শুরু হয়, বেলা বাড়বার সঙ্গে-সঙ্গে বাড়ে। দুঃসহতম হয় দুপরে।
মাথায় গামছা দিয়ে গদাধর তখন গঙ্গায় ডুবে থাকে। রোজ তিন-চার ঘণ্টা। তবু জ্বালার উপশম হয় না।
আরো বেশিক্ষণ ডুবে থাকতে সাহস হয় না, পাছে অন্য কোনো অসুখ হয়। মর্মরের মেঝে ভিজে গামছা দিয়ে মুছে-মুছে ঠাণ্ডা করে। তার পর তার উপর পড়ে থাকে। তবু নিবৃত্তি নেই।
‘কিসে যাবে এই দেহের দাহ? কিছু বলতে পারো?’
‘পারি।’ প্রসন্নচোখে তাকাল ভৈরবী।
এমন কথা শুনতে পাবে গদাধর যেন ভাবতেও পারত না। বিস্ময়ে চমকে উঠল। ‘কিসে? কী সেই প্রতিষেধ?’
ভেবেছিল, কি না-জানি কঠিন ক্লেশসাধনা করতে হবে।
ভৈরবী নির্মল বয়ানে হাসল। বললে, ‘প্রতিষেধ অত্যন্ত সোজা। শাস্ত্রেই তার উল্লেখ আছে।’
কি? কি? সবাই ঘিরে ধরল ভৈরবীকে।
শুধু চন্দনে গা চর্চিত করো। আর গলায় সুগন্ধি ফুলের মালা পরো একটি। সবাই হেসে উড়িয়ে দিলে।
উড়িয়ে দিলেই তো আর উড়ে যায় না। এমনি দাহ শ্রীরাধিকার হয়েছিল। আর যদি প্রত্যক্ষ ইতিহাস চাও, এমনি দাহ হয়েছিল শ্রীগৌরাঙ্গের। এ দাহ চর্মদাহ নয়, এ মর্মদাহ। এ ঈশ্বরবিরহের যন্ত্রণা।
মথুরবাবু বললেন, ‘দেখা যাক না এর চিকিৎসাটা।’
সুবাসিত ফুলের মালা পরল গদাধর। সারা গায়ে চন্দন মাখল। ভালো হয়ে গেল তিন দিনে। গদাধরের গায়ের জ্বালা শীতল হয়ে গেল। পরীক্ষায় সিদ্ধকাম হল ভৈরবী। ঐ দেহে কে বাস করছে—সন্দেহের আর অবকাশ রইল না সিদ্ধান্তে।
তার পর গদাধর যখন বললে সেই শিওড়ে যাবার সময়কার ভাবদর্শনের কথা, কেমন দু’টি ছেলে তার গা থেকে বেরিয়ে এসে ছুটোছুটি করে খেলা করছিল মাঠে-মাঠে, তখন ভৈরবীর সিদ্ধান্ত আরো পাকা হল। ভৈরবী ঘোষণা করলে, নিত্যানন্দের খোলে এবার চৈতন্যের আবির্ভাব।
তুমি সামান্য মানুষ নও। নও বা তুমি শুধু সম্পূর্ণ মানুষ। নও বা তুমি শুধু অতিমানুষ যে উপলব্ধির উচ্চতম চূড়ায় এসে উঠেছে। তুমি অবতার। তুমিই তিনি। অনন্ত ঈশ্বর তোমার মাঝে অন্তবান হয়েছেন। তোমার মূর্তিতে প্রতিমূর্ত হয়েছেন। তোমার মা যা তুমিই তা। তোমার কায়ায় বাসা বেধেছেন মহামায়া। তুমি আবির্ভূত দেবতা। তুমি প্রতিভাত ব্রহ্ম। তারণ করতে তোমার অবতরণ।
এক দিন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করল ভৈরবী।
কিন্তু মথুরবাবু মানতে চান না। কি করে মানবেন? খবরের কাগজে লেখেনি যে। এক জন তার বন্ধুকে এসে বললে, কাল ওপাড়া দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি একটা বাড়ি হুড়মুড় করে পড়ে গেল। বন্ধু বললে, দাঁড়াও, আগে খবরের কাগজখানা দেখি। খবরের কাগজ খুলে দেখল বাড়ি পড়ার কথা কিছু লেখা নেই। কি বলছ হে, খবরের কাগজে তো কিছু নেই। খবরের কাগজে যখন নেই তখন তোমার কথা বিশ্বাস করি কি করে? তুমি দেখবে চলো সেই ভাঙা বাড়ি। ভাঙা বাড়ি তো দেখব কিন্তু হুড়মুড় করে যে পড়েছে তার প্রমাণ কি?
ঈশ্বর মানুষ হয়ে লীলা করছেন এ তো ইন্দ্রিয়ের তত্ত্ব নয়, ভক্তির তত্ত্ব। অবতার তো জ্ঞানীর জন্যে নয়, ভক্তের জন্যে। নইলে চৌদ্দ পোয়ার মধ্যে অনন্ত এসেছেন এ কি সহজে বিশ্বাস করবার? নরলীলায় ভগবান যদি মানুষ হয়েছেন তো একেবারে ঠিক-ঠিক মানুষ হয়েছেন। এতটুকু ভুলচুক নেই, নেই এতটুকু এদিক-ওদিক। একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় নিখুঁত মানুষ। সেই ক্ষুধা তৃষ্ণা রোগ শোক—কখনো বা ভয়, সব ঠিক মানুষের মত। কি করে তাকে চিনতে পারে অবতার বলে? রামচন্দ্র সীতার শোকে অস্থির হয়েছিলেন। লক্ষ্মণ যখন শক্তি-শেলে পড়ল তখনও তাঁর কাতরতার অন্ত নেই। মানুষ হয়ে তেমনিই যদি তিনি হাসেন-কাঁদেন, খান-দান, রোগে-কষ্টে জর্জরিত হন, তবে তাঁকে তুমি চেনো কি করে? মনে হবে এ তো মামুলি মানুষই, নারায়ণ কোথায়? বহুরূপী সাধু সেজে এসেছে, ত্যাগী সাধু। সাজ একেবারে নিখুঁত। সাজ দেখে বাবুরা খুব খুশি। যেই একটি টাকা দিতে চেয়েছে, উহুঁ করে হাত গুটিয়ে চলে গেল। ত্যাগী সাধু টাকা নেয় কি করে? তার পরে সাজ খুলে যখন সে সহজ হয়ে এল, বললে, টাকা দাও। তেমনি ঈশ্বর যখন মানুষ সেজে আসেন, তখন হবহু মানুষের মতই আচরণ করেন।
দেহটি আবরণ, ঘেরাটোপ, কিন্তু চেয়ে দেখ, লণ্ঠনের ভিতরে আলো জলছে। ‘কিন্তু তা কি করে হয়?’ বললেন মথুরবাবু ‘শাস্ত্রে আছে বিষ্ণুর দশাবতার। মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রামচন্দ্র, কৃষ্ণ, বুদ্ধ আর কল্কি। এই দশের বাইরে আর অবতার নেই। অনুভাগবতে যে কল্কির কথা লেখে সে তো বাবা তুমি নও।
‘তার আমি কি জানি!’ গদাধর সরলতার প্রতিমূর্তি। বললে, ‘তবে বামনি বলছে—’
‘কে বামনি?’
‘তাকে তুমি এখনো দেখনি বুঝি?’ কথাটা সংক্ষেপে সারল গদাধর। বললে, ‘সর্বশাস্ত্রে বিদুষী। ঝোলার মধ্যে এক রাশ পুঁথি। সে পুঁথি দেখে মিলিয়ে-মিলিয়ে বলে আমার দেহে আর মনে না কি অবতারের চিহ্ন। কী যে বলে তা কে জানে।’
বিশেষ আমল দিলেন না মথুরবাবু। বললেন, ‘অবতারতত্ত্বের সে জানে কি! বেমক্কা একটা কিছু বললেই তো আর হল না। তবে হ্যাঁ, কালাকালের যে মহিষী সেই কালীকে তুমি পেয়েছ বটে—’
এক থালা মিষ্টি নিয়ে এদিক পানে আসছে ভৈরবী। আসছে গদাধরকে খাওয়াতে। আনন্দময়ী নন্দরাণীর আবেশে। প্রেমময় মাতৃমূর্তিতে। কাছে এসেই মথুরবাবুকে দেখে আড়ষ্ট হয়ে গেল৷ খাবারের থালা হৃদয়ের হাতে ধরে দিলে।
‘এই বুঝি তোমার সেই বামনি?’ ‘কটাক্ষ করলেন মথুরবাবু।
হ্যাঁ, এই সেই যোগেশ্বরী ভৈরবী।’ বলেই ঠাকুর ভৈরবীকে সম্বোধন করলেনঃ ‘ওগো, তুমি যা বলছিলে তা ইনি মানতে রাজি নন। বলেন, দশের বেশি অবতার নেই।’
‘মিথ্যে কথা।’ ভৈরবী হঙ্কার করে উঠল, ‘ভাগবতে বাইশ অবতারের উল্লেখ আছে। তার পরেও সম্ভবামি যুগে-যুগে—অসংখ্য বার ভগবানের অবতীর্ণ হবার কথা বলে গেছেন ব্যাসদেব। বৈষ্ণবশাস্ত্রে আছে মহাপ্রভু আবার দেহ ধরবেন। তা ছাড়া গদাধরের সঙ্গে গৌরাঙ্গদেবের কাঁটায় কাঁটায় মিল–
এ আরেক পাগলি জুটল দেখি দক্ষিণেশ্বরে। মনে মনে হাসলেন মথুরবাবু। আপাদমস্তক একবার নিরীক্ষণ করলেন ভৈরবীকে। এত রাজ্যের রূপ নিয়ে দেশে-দেশে একা-একা ঘুরে বেড়ায়, যোগিনী না নাগিনী, তা কে জানে। দেখি একবার যাচাই করে।
কালীমন্দিরের বারান্দায় তাকে পাকড়াও করলেন মথুরবাবু। বিদ্রূপের টান দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘বলি, বেড়ে ভৈরবী তো সেজেছ কিন্তু তোমার ভৈরব কোথায়?’
এক মুহূর্তে স্থির হয়ে রইল ভৈরবী। মন্দিরে কালীর পায়ের তলায় যে মহাকাল শুয়ে আছে তার দিকে স্পষ্ট আঙুল দেখাল। বললে, ‘ঐ ভৈরব।’
মথুরবাবু ঠোঁট বেঁকালেন। ‘ঐ ভৈরবটি তো অচল। বলি সচল ভৈরবটি কোথায়?’
ফণিনীর মত মাথা তুলল ভৈরবী। দৃঢ়স্বরে বললে, ‘ঐ অচলকে যদি সচল করতে না পারি তবে মিছিমিছি ভৈরবী হয়েছি।’
মথুরবাবু ধাক্কা খেলেন। কিন্তু সন্দেহ যায় না।
গায়ের জ্বালা ঠাণ্ডা হয়েছে গদাধরের, কিন্তু এ আবার কি উপসর্গ শুরু হল! মা গো, নিদারুণ খিদে! এই খাচ্ছি আবার অমনি খিদে পাচ্ছে।’ ভৈরবীর কাছে নালিশ জানাল গদাধর ‘রাত-দিন আর কোনো চিন্তা নেই, কেবল খাবার চিন্তা। এ আবার আমার কি হল?’
‘কোনো ভাবনা নেই।’ অভয় দিল ভৈরবী। বললে, ‘সবই সেই একই কাহিনী। তোমার মাঝে যে ভাবস্বরূপ বিরাজ করছেন এ তাঁরই ভাব। ‘
‘না মা, এ বুঝি আরেক রকম রোগ হল আমার—’
‘দাঁড়াও, সারিয়ে দিই।’
মথুরকে বললে যত রাজ্যের বিচিত্র খাবার পাও সব এক ঘরে জড়ো করো।
গদাধরকে বললে, ঐ খাবারের ঘরে খিল চাপিয়ে একা-একা বাস করো দিন-রাত। যত ইচ্ছে তত খাও, যখন যেমন খুশি। যখন যেমন খিদে। নাও আর খাও, ফেল আর ছড়াও।
অদ্ভুত ব্যবস্থা! কখনো এটা খাচ্ছে কখনো ওটা খাচ্ছে। যত খাচ্ছে ততই খিদে পাচ্ছে। যত খিদে পাচ্ছে ততই খাচ্ছে। কিন্তু তিন দিনের দিন, আশ্চর্য, আর সেই চণ্ডাল খিদে নেই। গদাধর আবার সেই স্বাভাবিক মানুষ।
এ সব নির্ভুল অবতারলীলা। বামনি আবার ঘোষণা করল। গদাধর নরদেহে ভগবান।
মথুরবাবু তবুও নারাজ।
‘তুমি সভা ডাকাও।’ তেজোতপ্ত কণ্ঠে গর্জে উঠল ভৈরবী, ‘আমি শাস্ত্রের উক্তি দিয়ে প্রমাণ করব। সাধ্য থাকে কেউ এসে আমাকে খন্ডন করুক।’
কালীমন্দিরে সাড়া পড়ে গেল। এ বলে কি বামনি?
‘ঠিকই বলছি। তোমরা যাকে এত দিন পাগল ভেবে এসেছ, সে স্বয়ং নরদেহী রামচন্দ্র।’ ভৈরবী আবার হঙ্কার ছাড়ল, ‘এ শুধু আমার মুখের কথা নয়, এ শাস্ত্রের কথা। শাস্ত্র যদি মানো তবে আমার প্রমাণও মানবে।
‘গদাধর বললে, ‘বসাও না পণ্ডিত-সভা। মজাটা দেখা যাক না–
কালীঘরের আমলারা মথুরবাবুর দিকে তাকাল। নিশ্চয়ই উপহাস করে উড়িয়ে দেবেন কথাটা। একটা মাথা খারাপ বাউন্ডুলে, সে না কি ঈশ্বর!
না, না, বসাক না সভা। মন্তব্য করলে কেউ-কেউ। সভা করলেই বুজরুকিটা বেরিয়ে পড়বে।
গদাধর নিজে যখন সভার কথা বলছে তখন মথুরবাবু আর আপত্তি করতে পারেন না।
মন্দ কি, নিজের সন্দেহেরও একটা শান্তি হবে।
কিন্তু ডাকাই কাকে?
সে যুগে সব চেয়ে বড় পণ্ডিত আর সাধক হচ্ছে বৈষ্ণবচরণ আর গৌরীকান্ত তর্কভূষণ ৷
তাদের নিমন্ত্রণ করে পাঠালেন মথুরবাবু।
আমি মূর্খ। তবু পণ্ডিতেরা আমার কাছেই আসবে! আমারই জন্যে! ভাবলে গদাধর। ভেবে অবাক হয়ে গেল। মা গো, এ তোর কি আশ্চর্য খেলা! যে ধান মাপে তার পিছনে বসে আরেক জন কে রাশ ঠেলে দেয়। তুই তেমনি আমাকে রাশ ঠেলে দিস।
২২
সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে বৈষ্ণবচরণ চলে এল দক্ষিণেশ্বরে। বসল পণ্ডিত-সভা। ভৈরবী সওয়াল শুরু করল। অবতারের লক্ষণ সম্বন্ধে শাস্ত্র কি বলে আর গদাধরের মধ্যে সে কী পর্যবেক্ষণ করছে তারই বিবৃতি দিলে। প্রায় প্রতিটি লক্ষণ গদাধরের মধ্যে পরিস্ফুট। দেখুন সবাই মিলিয়ে। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বৈষ্ণবচরণকে সরাসরি সম্বোধন করলে ভৈরবী, গদাধর মর্ত্যদেহী ভগবান। আপনি যদি তা না মানেন, বলুন কেন, কি কারণে আপনি তা মানছেন না—-
সাহসিকা জননীর মত আশ্রয়পক্ষপুট বিস্তার করে দাঁড়াল ভৈরবী। দেখি কে আমার গদাধরকে মন্দ বলে। কার সাধ্য ছোট করে গদাধরকে।
আর গদাধর? সে সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। যাকে নিয়ে এত হট্টগোল, সে হাঁ-ও জানে না, না-ও জানে না।
আত্মভোলা শিশুর মত সভার মাঝখানে বসে আছে। কখনো হাসছে কখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে, কখনো বা বটুয়া থেকে মশলা তুলে মুখে ফেলছে।
অবতার হলেই বা কি, না হলেই বা কি—তার কী যায় আসে! সে যেমন আছে বেশ আছে!
বৈষ্ণবচরণ প্রশ্ন করতে লাগল গদাধরকে।
হ্যাঁ, জ্যোতি দেখি। নিদারুণ আনন্দ হয়। বুকের মধ্যে তুবড়ির মত গুরগুর করে মহাবায়ু ওঠে। নাভি থেকে যে শব্দ ওঠে শুনি সেই অনাহত শব্দ।
শব্দ-কল্লোল ধরে সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছই। সেই সমুদ্রেই প্রতিপাদ্য ব্রহ্ম। তাই পরম পদ। ‘যত্র নাদো বিলীয়তে।’ সেখানে আমিও নেই তুমিও নেই, এক নেই অনেকও নেই। সে জ্ঞান-অজ্ঞানের পার।
বিজ্ঞানী সাধু। যে দুধের কথা কেবল শুনেছে সে অজ্ঞান, যে দুধ দেখেছে তার জ্ঞান। আর যে দুধ খেয়েছে সে বিজ্ঞানী।
শুধু যে জ্ঞানী তার বসবার ভঙ্গিই অন্য রকম। সে গোঁফে চাড়া দিয়ে বসে। লোক দেখলে ডেকে শুধোয়, তোমার কিছু জানবার আছে? আছে তো বোসো, শোনো।
কিন্তু বিজ্ঞানী-যে সর্বদা ঈশ্বরকে দেখছে, ঈশ্বরের সঙ্গে কথা কইছে, তার ধরন-ধারণ অদ্ভুত। সে কখনো জড়, কখনো পিশাচ, কখনো বালক, কখনো উন্মাদ। বেশ আছে, হঠাৎ সমাধিস্থ হয়ে অসাড় অস্পন্দ হয়ে গেল। তাই জড়। জগৎ ব্রহ্মময় দেখছে, তাই শুচি অশুচি মেধ্য-অমেধ্য জ্ঞান নেই। এমন যে ভাত আর ডাল—তাও অনেক দিন রাখলে বিষ্ঠার মতন হয়ে যায়। তাই খাদ্যে আর ত্যাজ্যে সমান ব্রহ্মস্বাদ। তাই আবার পিশাচ। তার রকম-সকম সাধারণের সাদা চোখে স্বাভাবিক নয়। তাই সে পাগল । সে যে খাপ-খোলা তলোয়ার। তাই সে খাপ-ছাড়া। আবার পরমুহর্তেই সে বালকের মত। কোনো পাপ নেই, লজ্জা-ঘৃণা নেই। ছলা-কলার ধার ধারে না। একেবারে সহজ অবস্থা। সহজ অবস্থাই সিদ্ধ অবস্থা।
আরো অনেক সব উত্তর দিল গদাধর। এটা হয় ওটা হয়, এটা দেখি ওটা দেখি—এই ধরনের উত্তর। নিজে কিছুই জানে না। যার খোঁজ তার খবর নেই!
ভৈরবীর সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ সায় দিল বৈষ্ণবচরণ। শুধু তাই নয়, অন্যান্য অবতারে শাস্ত্রোক্ত যত লক্ষণ দেখা দিয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রায় সমস্ত গুলিই বিকশিত। যে পরমা ভক্তির ফল মহাভাব তা গদাধরে সবিশেষ দেদীপ্যমান। সন্দেহ নেই, গদাধর ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি।
স্বয়ং বৈষ্ণবচরণ বলছে। মথুরবাবু থ হয়ে রইলেন। আমলারা যারা ছিল তারা এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। ক’দিন পরে হাজির হল এসে গৌরীকান্ত তর্কভূষণ। বাড়ি বাঁকুড়া জেলার ইন্দাশে। বৈষ্ণবচরণ কর্তাভজা, গৌরীকান্ত তান্ত্রিক। মহা শক্তিশালী তান্ত্রিক। প্রতি দুর্গাপূজায় স্ত্রীকে ভগবতীজ্ঞানে আরাধনা করত। যজ্ঞ করার রীতি ছিল অলৌকিক। যজ্ঞের কাঠ মাটিতে সাজাত না, বাঁ হাতের তালুর উপর সাজাত৷ বাঁ হাত প্রসারিত, করতলের উপর কাঠ সাজিয়ে রাখছে—দু-চারখানা নয়—সম্পূর্ণ এক মণ কাঠ আর তাতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে ডান হাতে। যতক্ষণ অনুষ্ঠান না শেষ হচ্ছে ততক্ষণ হাতের উপর জ্বলছে সেই কাঠ। নিজের চোখে একদিন তা দেখেছিলেন ঠাকুর।
সেই গৌরীকান্ত এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। যেমন পণ্ডিত তেমনি তার্কিক। তার সঙ্গে সহজে কেউ এঁটে উঠতে পারে না। দাঁড়াতে পারে না মুখের সামনে সবাই বলে এও তার তন্ত্রবল।
তর্কসভায় যখন সে ঢোকে তখন প্রাণপণ শক্তিতে একটা হুঙ্কার ছাড়ে। কোনো স্তোত্রের বিশেষ একটা অংশই আবৃত্তি করে হয়তো, কিন্তু কণ্ঠস্বরে গগন-বিদার বজ্রের কাঠিন্য। আওয়াজ শুনে ছাদ-দেওয়াল ফেটে পড়বে মনে হয়, ভয়ে হৃদকম্পন স্তব্ধ হয়ে যায়। এই চীৎকারের উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, প্রতিপক্ষকে ভয় পাইয়ে দেওয়া। কেউ-কেউ বলে অমনি চীৎকার করেই না কি সে নিজের মধ্যে তার আশ্চর্য শক্তিকে উদ্দীপিত করে তোলে। সে যে একজন অসীম শক্তিধর ঐ চীৎকারই তার অভিজ্ঞান!
কালীমন্দিরের প্রাঙ্গণে ঢুকে যথারীতি হৃঙ্কার ছাড়ল গৌরীকান্ত।
নিজের ঘরের নিরিবিলিতে বসেছিল গদাধর। চীৎকার শুনে চমকে উঠল। কোথাকার কোন পণ্ডিত এসেছে, কি তার শক্তি-সাধনা, কিছুরই সে খবর রাখে না। কিন্তু কি স্তোত্রাংশ বলেছে চীৎকার করে তা ঠিক ধরতে পেরেছে। তার অন্তরে যে বসে আছে সেই বলে দিলে গোপনে। বললে, তুইও ঐ ভাঙা লাইনটা আবৃত্তি কর। কিন্তু খবরদার, ও যতটা জোরে চেঁচিয়েছে, তার চেয়ে আরো জোরে চেঁচানো চাই।
তাই সই।
গদাধর চীৎকার করে উঠল। প্রবলতর, পুরুষতর কণ্ঠে। মনে হল যেন ডাকাত পড়েছে।
যে যেখানে ছিল হকচকিয়ে উঠল। লাঠি হাতে ছুটে এল দারোয়ানরা। কি ব্যাপার? ডাকাত কোথায়?
ডাকাত-টাকাত কিছু নয়। গৌরী পণ্ডিতের সঙ্গে পাগলা-পুরোতের প্রতিযোগিতা হচ্ছে—কার গলার কত জোর!
সবাই অবাক মানল। পাগলা-পুরোতের গলা এত দরাজ! এমন সাংঘাতিক!
হার মানল গৌরীকান্ত। মুখ গম্ভীর করে ঢুকল এসে মন্দিরে। এক ডাকে এত নাজেহাল হবে স্বপ্নেও ভাবেনি। কে এ কালীর বরপুত্র!
তর্কে অজেয় ছিল গৌরী। দেখল তারো চেয়ে আশ্চর্যতর শক্তি আছে। তার যা শক্তি তা তাকে তর্কেই আবদ্ধ করে রেখেছে, তর্কাতীতকে দেখতে দেয়নি। সে শুধু রৌদ্রই পেয়েছে, রুদ্রকে পায়নি। কিন্তু কে এ অলোকসম্ভব, যে একটি ধ্বনিতেই সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ করে দেয়! একটি উক্তিতেই শান্ত করে দেয় সমস্ত জিজ্ঞাসা!
গদাধরের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করল গৌরীকান্ত।
এততেও মথুরবাবু তুষ্ট হলেন না। তিনি আরও পণ্ডিত ডাকালেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শাস্ত্র মিলিয়ে বিচার হোক।
মন্দিরের সামনে বিরাট নাটমন্দিরে বিচার-সভা। সে-সভায় ঢোকবার আগে গদাধর মন্দিরে ঢুকল কালী-প্রণাম করতে। কালী-প্রণাম করে বেরিয়ে আসছে, হঠাৎ বৈষ্ণবচরণ তার পায়ে পড়ল।
অমনি ভাবসমাধি হল গদাধরের। বৈষ্ণবচরণের অন্তরে বইতে লাগল দিব্যানন্দের প্রবাহ। মুখে-মুখে সে তক্ষুনি এক সংস্কৃত স্তোত্র রচনা করে ফেলল। সে স্তোত্রে শুধু গদাধরের স্তুতি।
‘বৈষ্ণবচরণের সঙ্গে তর্ক করতে এসেছি আমি।’ সমবেত পণ্ডিতদের উদ্দেশ্য করে বললে গৌরীকান্ত। ‘আপনারা এসেছেন সে বাগযুদ্ধ দেখতে। সে যুদ্ধে কে জেতে তাই নির্ণয় করতে।
কিন্তু সে যুদ্ধের আর দরকার নেই। বৈষ্ণবচরণ আজ বিষ্ণু চরণের স্পর্শ পেয়েছে—তাকে পরাস্ত করা মানুষের অসাধ্য। তা ছাড়া তর্ক করার আছে কি। শাস্ত্র মিলিয়ে দেখেছি আমরা দুজনে, গদাধর ভগবানের মহাবতরণ।’
ওরা বলে কি! গদাধর বালকের মত অবাক মানল। কই আমি তো কিছ বুঝি না।
ঈশ্বরের স্বভাবই তো বালকের মত। ছোট ছেলে যেমন খেলাঘর করে, একবার গড়ে, একবার ভাঙে, ঈশ্বরও তেমনি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করছেন। ছোট ছেলে যেমন কোনো গুণের বশ নয়, ঈশ্বরও তেমনি তিন গুণের অতীত।
তাই ছোট ছেলেদের সঙ্গে মেশ, তাদের সঙ্গে থাকো। তা হলেই তাদের স্বভাব আরোপ হবে। ওদের কথাই চিন্তা করো। তা হলেই সত্তা পাবে ওদের। তদাকারিত হবে।
ঈশ্বর কেমনতরো? না, যেন কোনো ছেলে কোঁচড়ে রত্ন নিয়ে রাস্তায় বসে আছে। কত লোক যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। অনেকে চাচ্ছে তার কাছে রত্ন। কাপড়ে হাত চেপে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সে বলছে না, দেব না। আবার যে হয়তো চায়নি, চলে যাচ্ছে আপন মনে, তারই পিছু-পিছু ছুটে যেচে সেধে তাকে দিয়ে ফেলছে।
ভৈরবীর মুখ প্রদীপ্ত হয়ে উঠল। তার কথা সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
মথুরের বুক ফুলে উঠল দশ হাত। তিনি যাকে গুরু বলে শিরে ধরেছেন সে গুরুর গুরু, স্বয়ং সচ্চিদানন্দ—নিত্য সত্য জ্ঞানময় ও আনন্দস্বরূপ ব্রহ্মের অবতার।
অবতার বলে সবাই মেনে নিলেও গদাধর ক্ষান্ত হবার নয়। লোকের কথায় তার সান্ত্বনা কোথায়? সে চায় নিজের অনুভব, নিজের উজ্জীবন। বোধ থেকে বোধির আস্বাদ। নতুন সাধনায় তাই সে আত্মনিয়োগ করলে। কঠিনতর তপস্যায়। বিধিগত যোগচর্চায়। তারই নাম তান্ত্রিক সাধনা। আর সে সাধনায় তার গুরু হল ভৈরবী যোগেশ্বরী।
এ পর্যন্ত গদাধর নিজের চেষ্টায় ঈশ্বরকে ধরতে চেয়েছে। নিজের চেষ্টায় মানে শুধু অন্তরের ব্যাকুলতায়। দেখা যাক পরের সাহায্যে কত দূর যেতে পারি।
পরের সাহায্যে মানে গুরুর নির্দেশে।
সেই গুরু যোগেশ্বরী। একজন কি না স্ত্রীলোক৷
কামিনী কাঞ্চন ত্যাগ করতে বলেছেন ঠাকুর। অথচ কি না এক নারী তাঁর গুরু!
তার মানে নারীর মধ্যে যে কামিনী যে তামসী তাকে ত্যাগ করবে। যে যোগিনী, যে মহিমাময়ী মাতৃস্বরূপিণী তাকেই গ্রহণ করবে। অভিনন্দন করবে।
‘যতনে হৃদয়ে রেখো আদরিণী শ্যামা মাকে,
মন, তুই দ্যাখ আর আমি দেখি
আর যেন কেউ নাহি দেখে।
কামাদিরে দিয়ে ফাঁকি
আয় মন বিরলে দেখি
রসনারে সঙ্গে রাখি
সে যেন মা বলে ডাকে৷’
জনক রাজার আরেক নাম বিদেহ, যেহেতু তিনি নির্লিপ্ত, তাঁর দেহে দেহবুদ্ধি নেই। সেই জনক রাজার সভায় একদিন এক ভৈরবী এসেছিল। স্ত্রীলোক দেখে জনক হেঁটমুখ হয়ে চোখ নিচু করে রইলেন। ভৈরবী বললে, ‘তোমার এখনো স্ত্রীলোক দেখে ভয়! তোমার তবে এখনো পূর্ণজ্ঞান হয়নি। পূর্ণজ্ঞান হলে পাঁচ বছরের ছেলের স্বভাব হয়—তখন স্ত্রী-পুরুষ বলে ভেদ থাকে না।’ আমাদের গদাধর সেই পাঁচ বছরের ছেলে। স্ত্রীলোক মাত্রই তার মা’র প্রতিমা।
তা ছাড়া কামিনীকাঞ্চনত্যাগ সন্ন্যাসীর পক্ষে, সংসারীর পক্ষে নয়। সন্ন্যাসী স্ত্রীলোকের পট পর্যন্ত দেখবে না। স্ত্রীলোক কেমনতরো জানো? যেমন আচার-তেঁতুল। মনে করলে মুখে জল সরে। আচার-তেঁতুল সামনে আনতে নেই। ‘কিন্তু এ কথা আপনাদের পক্ষে, সংসারীদের পক্ষে নয়।’ বললেন ঠাকুর, ‘আপনারা যদ্দুর পারো স্ত্রীলোকের সঙ্গে অনাসক্ত হয়ে থাকো। মাঝে-মাঝে নির্জনে গিয়ে ঈশ্বরচিন্তা করো। সেখানে ওরা যেন কেউ না থাকে। ঈশ্বরে বিশ্বাস-ভক্তি এলেই অনেকটা অনাসক্ত হতে পারবে। দু’-একটি ছেলেপুলে হলে স্ত্রী-পুরুষ দুই জনে ভাই-বোন হয়ে যাবে। ঈশ্বরকে সর্বদা প্রার্থনা করবে যাতে ইন্দ্রিয়সুখে মন না যায়, ছেলেপুলে আর না হয়।
গিরিশ ঘোষ বললে, ‘কামিনীকাঞ্চন ছাড়ে কই?’
‘তাঁকে ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা করো, বিবেকের জন্যে প্রার্থনা করো। ঈশ্বরই খাঁটি আর সব ভেজাল, অসার-এরই নাম বিবেক। জল-ছাঁকা দিয়ে জল ছেঁকে নিতে হয়। ময়লাটা এক দিকে পড়ে, ভালো জল এক দিকে পড়ে। বিবেকরূপ জল- ছাঁকা আরোপ করো। তোমরা তাঁকে জেনে সংসার করো। তাই হবে বিদ্যার সংসার।’
আর অবিদ্যার সংসারে দেখ না মেয়েমানুষের কী মোহিনী শক্তি! পুরুষগুলোকে বোকা অপদার্থ করে রেখে দিয়েছে। হারু এমন সুন্দর ছেলে, তাকে পেতনিতে পেয়েছে। ওরে, হারু কোথা গেল, ওরে হারু কোথা গেল? আর হারু কোথা গেল! সব্বাই গিয়ে দেখে হারু বটতলায় চুপ করে বসে আছে। সে রূপ নেই সে তেজ নেই সে আনন্দ নেই। বটগাছের পেতনি হারুকে পেয়েছে। পেতনি
যদি বলে, যাও তো একবার, হারু অমনি উঠে দাঁড়ায়। আবার যদি বলে, বোসো তো, অমনি বসে পড়ে।
তবু ঠাকুর বিয়ে করলেন।
‘আচ্ছা, আমার বিয়ে কেন হল বল্ দেখি? স্ত্রী আবার কিসের জন্যে হল? পরনের কাপড়ের ঠিক নেই।—তার আবার স্ত্রী কেন?’
নিজেই আবার উত্তর দিলেন ঠাকুর, ‘সংস্কারের জন্যে বিয়ে করতে হয়। ব্রাহ্মণশরীরের দশ রকম সংস্কার আছে—বিয়ে তার মধ্যে একটা। শুকদেবেরও বিয়ে হয়েছিল সংস্কারের জন্যে। ঐ দশ রকম সংস্কার হলেই তবে আচার্য হওয়া যায়। সব ঘর ঘুরে এলেই তবে ঘুঁটি চিকে ওঠে।’
বিয়ে করলেন অথচ সংসার ভোগ করলেন না। বিয়ের কত বড় আদর্শ হতে পারে তাই দেখালেন সংসারকে। স্বামি-স্ত্রী ভোগাসনে না বসে বসলেন যোগাসনে। যে কামিনী হতে পারত সে হয়ে দাঁড়াল জ্যোতিষ্মতী জগদ্ধাত্রী। রতির পৃথিবীতে ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত করলেন মূর্তিমতী বিরতিকে—অতৃপ্তির জগতে সন্তোষময়ীকে। নারীর সব চেয়ে যে বৃহত্তম মহিমা তাই অর্পণ করলেন নারীকে।
‘এখনকার যা কিছু করা সব তোদের জন্যে।’ ঠাকুর বললেন ভক্তদের ‘ওরে, আমি ষোলো টাং করলে তবে তোরা যদি এক টাং করিস—
ঠাকুরের জন্যে পূর্ণ নিবৃত্তি, সংসারী ভক্তদের জন্যে অন্তত একটু সংযম। ঠাকুরের জন্যে পূর্ণ নির্বাসনা, সংসারী ভক্তদের জন্যে অন্তত একটু অস্পৃহা।
‘বাতাস করো তো মা, শরীর জ্বলে গেল।’অস্থির হয়ে বললেন একদিন শ্ৰীমা ‘গড় করি মা কলকাতাকে। কেউ বলে আমার এ দুঃখ, কেউ বলে আমার ও দুঃখ, আর সহ্য হয় না। কেউ বা কত কি করে আসছে, কারু বা পঁচিশটে ছেলে-মেয়ে—দশটা মরে গেল বলে কাঁদছে। মানুষ তো নয়, সব পশু-পশু। সংযম নেই, কিছু নেই। ঠাকুর তাই বলতেন, ওরে এক সের দুধে চার সের জল, ফুঁকতে ফুঁকতে আমার চোখ জ্বলে গেল। কে কোথায় ত্যাগী ছেলেরা আছিস—আয় রে কথা কয়ে বাঁচি। ঠিক কথাই বলতেন। জোরে বাতাস করো মা, লোকের দুঃখ আর দেখতে পারি না।’
২৩
মা গো, বামনি বলছে তন্ত্রমতে সাধন করতে। করব? করবি বৈ কি, সম্পূর্ণ ভাবে করবি। ইঙ্গিত করলেন জগদম্বা। বললেন, তন্ত্র-সাধনা জীবনের সর্বাঙ্গীন সাধনা। সত্তার নিম্নতম স্তর থেকে উচ্চতম স্তরের ক্রম-উন্মোচন। বোধ থেকে বিকাশে চলে আসা, ভোগ ছেড়ে যোগৈশ্বর্যে। জীব-সত্তার উপর দাঁড়িয়ে ব্রহ্ম-ভূমিকায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া। চিত্ত থেকে চৈতন্যে উদ্বুদ্ধ হওয়া।
শক্তিই তন্ত্রের সর্বস্ব। তন্ত্রে কোথাও কিছু তুচ্ছ নেই হেয় নেই পরিত্যাজ্য নেই৷ সব কিছুর থেকেই ঈশ্বরী শক্তিকে আহরণ করা, আকর্ষণ করা। আত্মশক্তিকে অধ্যাত্মশক্তিতে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ শক্তিকে ছুটিয়ে এনে শিবত্বে পৌঁছে দেওয়া। সমস্ত গতিকে একটি পরম ধৃতির মধ্যে শান্ত করা।
মা গো, তোকে তো আমি দেখেছি, তবে আমার আবার সাধন কি?
দরকার আছে। লাউ-কুমড়োর দেখেছিস তো, আগে ফল হয় পরে ফুল ফোটে। তেমনি তোর আগে সিদ্ধি, পরে সাধন।
তুমি যদি আমাকে অবতারই বলো, বামনিকে গিয়ে ধরল গদাধর, তবে আমার আবার সাধন কেন?
দেখি না তোমার নরদেহে তা কী অপূর্ব ঐশ্বর্য নিয়ে আসে। দেহ যখন ধরেছ তখন নিয়েছ সকল বিকারের ভার। তাই দেহের পক্ষে যা সাধ্য সকল সাধন তোমাকে করতে হবে। এ জৈব দেহকে নিয়ে যেতে হবে শৈব স্থিতিতে। মৃন্ময় থেকে চিন্ময়ে। নইলে জীবোদ্ধার হবে কি করে?
পার্বতী ভগবতী হয়েও শিবের জন্যে কঠোর সাধন করেছিলেন।
পঞ্চমুণ্ডীর উপরে বসে পঞ্চতপা। শীতকালে জলে গা বুড়িয়ে থাকা। অনিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা সূর্যের দিকে।
তেমনি কৃষ্ণ কৃষ্ণ হলেও, অনেক সাধন করেছিলেন রাধাযন্ত্র নিয়ে।
‘আপনি আচরি ধর্ম জীবেরে শিখাও’। নরদেহ ধরেও কোথায় চলে আসা যায় কোন অলৌকিক তীর্থভূমিতে, তাই তুমি প্রমাণ করো। দেহী হয়েও দেহোত্তীর্ণ হবার আদর্শ তুলে ধরো। তুমি নইলে এই সব দুর্বল অবিশ্বাসী জীব কোথায় আশ্বাস পাবে? কোথায় এসে ত্রাণ খুঁজবে? রাগ-বেগ থেকে চলে আসবে বৈরাগ্য-আবেগে?
তা ছাড়া, শাস্ত্রের মর্যাদা তো রাখতে হবে ষোলো আনা। সংস্কারপালনের জন্যে যেমন বিয়ে করেছ তেমনি শাস্ত্রপালনের জন্যেও তোমাকে তন্ত্রসাধন করতে হবে। তন্ত্র সকল শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ।
‘দেবীনাঞ্চ যথা দূর্গা বর্ণানাং ব্রাহ্মণো যথা ।
তথা সমস্তশাস্ত্রাণাং তন্ত্রশাস্ত্রমনুত্তমম্ ॥’
তন্ত্রের তিন রকম আচার-পশু, বীর আর দিব্য। পশ্বাচার সাধারণ জীবের জন্যে। এতে শুধু শম-দম যম-নিয়ম ধ্যান-পূজা যত সব আনুষ্ঠানিক রীতি-নীতি। কামনার থেকে দূরে সরে থাকার চেষ্টা—এতে করে হয়তো বা সেই কামনাকেই মূল্য দেওয়া। এ পথে যতটুকু সম্ভব, জীবভাবের সংস্কার চলে মাত্র, কিন্তু জীবভাবের লয় হয় না। অর্থাৎ জীবত্ব আরূঢ় হয় না শিবত্বে।
বীরাচার অন্য জাতের। কামনার মধ্যে বাস করে তাকে উপেক্ষা করা, উদাসীন থাকা। উল্লাসকে অনুভব করা কিন্তু তাতে আকৃষ্ট বা আবদ্ধ না হওয়া। মৌমাছি হয়ে পদ্মের উপর বসেও মধুপান না করা। ফল পেয়েও ফলত্যাগ করে যাওয়া। সমস্ত স্থূলাধারকে অধ্যাত্মশক্তির আয়ত্তাধীনে নিয়ে আসা । পশু শক্তি দ্বারা চলছে কিন্তু শক্তিকে চালাচ্ছে বীর। বীর শক্তিকে চালিয়ে নিয়ে এসে শিবভাবে প্রতিষ্ঠা দিচ্ছে। শক্তিকে রূপান্তরিত করছে শান্তিতে। স্থূলকে সূক্ষে। বোধকে বিভূতিতে।
আর দিব্য? তিনি জ্ঞানস্বরূপ। তিনি ব্রহ্মমগ্ন। শক্তিতেও তিনি নেই, বিভূতিতেও তিনি নেই। তাঁর স্থিতিতেও ব্রহ্ম, প্রাপ্তিতেও ব্রহ্ম। তিনি প্রশান্ত ও প্রসারিত।
এখন কী করতে হবে?
সর্বপ্রথমে মুণ্ড সাধন করো। যে দেশে গঙ্গা নেই সে দেশ থেকে আগে মুণ্ডমালা সংগ্রহ করি। স্থাপন করি মুণ্ডাসন।
বাগানের উত্তরসীমায় বেল গাছ। তার নিচে বেদী তৈরি হল। নিচে তিনটি নরমুণ্ড পুঁতলে।
বিকল্প আসন হল পঞ্চবটীতে। সেই বেদীর নিচে পঞ্চজীবের পঞ্চমুণ্ড। শেয়াল, সাপ, কুকুর, ষাঁড় আর মানুষ। বামনিই সব যোগাড় করেছে ঘুরে-ঘুরে। যেটার জন্যে যে আসন দরকার তাতেই বসে তন্ত্রসাধন শুরু করলে গদাধর।
অনেক রকম পুজো অনেক রকম জপ, অনেক রকম হোম-তর্পণ। উগ্র হতে উগ্রতর তপস্যা।
একেকটা সাধন ধরে আর দু’-তিন দিনের মধ্যেই নিরাপদে পার হয়ে যায়। শাস্ত্রে যে ফল নির্দিষ্ট আছে তাই প্রত্যক্ষ করে। দর্শনের পর দর্শন, অনুভূতির পর অনুভূতি।
এমনি করে গুনে গুনে চৌষট্টিখানা তন্ত্র শেখালে বামনি।
এতটুকু পদস্খলন হল না গদাধরের। কি করে হবে? মা যে তার হাত ধরে আছেন।
এক দিন রাত্রে বামনি কোত্থেকে এক স্ত্রীলোক ধরে আনল। পূর্ণযৌবনা সুন্দরী স্ত্রীলোক। তাকে বেদীর উপর বসালে। গদাধরকে বললে, ‘বাবা, একে দেবী-বুদ্ধিতে পূজা করো।’
স্ত্রী-মাত্রেই মাতৃজ্ঞান গদাধরের। তার ভয় কি। সে তন্ময় হয়ে পূজা করতে লাগল।
পূজা সাঙ্গ হলে ভৈরবী বললে, ‘বাবা, সাক্ষাৎ জগজ্জননী-জ্ঞানে এর কোলে বোস। কোলে বসে তদ্গত হয়ে জপ করো।’
শিউরে উঠল গদাধর। রমণী দিগম্বরী।
এ কি আদেশ করছিস মা? তোর দুর্বল সন্তান আমি, আমার কি এ দুঃসাহসের শক্তি আছে?
কে বলে তুই আমার দূর্বল সন্তান? তুই আমার সব চেয়ে জোরদার ছেলে। ওখানে ও বসে কে? ও তো আমি। তুই আমার কোলে বসবি নে? এতো সহজ অবস্থা। এতে আবার দুঃসাহস কি!
‘নিবিড় আঁধারে তোর চমকে অরূপরাশি। তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরি-গুহাবাসী।’ সত্যিই তো, মা-ই তো বসে আছেন। অমনি সমস্ত দেহপ্রাণ অনন্ত দৈববলে বলীয়ান হয়ে উঠল। রমণীর কোলে বসেই সমাধিস্থ হল গদাধর।
বামনি বললে, ‘পরীক্ষায় পাশ হয়ে গেছ বাবা।
‘আরেক দিন শবের খর্পরে মাছ রাঁধলে ভৈরবী। জগদম্বাকে তর্পণ করলে।
গদাধরকে খেতে বললে মাছ। নিঘৃর্ণ হয়ে খেল তাই গদাধর।
তার পরে সেদিন যা হল তা কল্পনায়ও ভয়াবহ। ভৈরবী কোত্থেকে গলিত নরমাংস যোগাড় করে আনলে। দেবী-তর্পণের শেষে গদাধরকে বললে, ‘এ মাংস জিভে ঠেকাও।’
‘অসম্ভব! এ আমি পারব না।’ ঝটকা মারল গদাধর।
‘কেন, ঘেন্নার কি! কোনো কিছুকেই ঘেন্না করতে নেই। এই দেখ না, আমি খাচ্ছি।’ বলেই এক টুকরো নরমাংস নিজের মুখে ফেলে চিবুতে লাগল বামনি।
‘এইবার তুমি খাও। গদাধরের মুখের সামনে ধরল আরেক টুকরো।
মা, তুই বলছিস? খাব?
দেহে-প্রাণে চণ্ডীর প্রচণ্ড উদ্দীপনা এসে গেল। ‘মা’ ‘মা’ বলতে-বলতে ভাবাবিষ্ট হল গদাধর। অমনি বামনি তার মুখের মধ্যে মাংসের টুকরো পুরে দিলে।
ভয় নেই লজ্জা নেই ঘৃণা নেই গদাধরের। সে ত্রিপাশমুক্ত৷
শেষ তন্ত্র এখনো বাকি। এবার শিব-শক্তির লীলা-বিলাস দেখতে হবে। এই বীরাচারের শেষ সাধন৷
এক চুল বিচলিত হল না গদাধর। নির্বিকল্প সমাধিতে প্রশান্ত হয়ে রইল। সমস্ত স্ত্রীত্বেই সে মাতৃত্ব নিরীক্ষণ করছে। রমণী মাত্রেই মা। মাতৃভাবেই আদ্যা-শক্তির অধিষ্ঠান।
মাতৃভাব নির্জলা একাদশী—ভোগের গন্ধ নেই এক বিন্দু। ফল-মূল খেয়েও একাদশী হয়। কোথাও বা লুচি ছক্কা খেয়ে। সে সব বামাচার। বামাচারে ভোগের কথা আছে। ভোগ থাকলেই ভয়। সন্ন্যাসী যদি ভোগ রাখে, তা হলেই তার পতন। যেন থুতু ফেলে আবার সেই থুতু খাওয়া।
‘আমার নির্জলা একাদশী। সব মেয়ে আমার মূর্তিমতী মহামায়া।’বললেন ঠাকুর। ‘এই মাতৃভাবই সাধনের শেষ কথা। তুমি মা আমি তোমার ছেলে–এর পরে আর কথা নেই, এর বাইরে আর সম্পর্ক নেই।’
‘বাবা, তুমি আনন্দাসনে সিদ্ধ হয়ে দিব্য ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে।’ বললে ভৈরবী। সাধনাসম্ভূত সে কী রূপ এল গদাধরের শরীরে। সে এক জ্যোতির্ময় দেহ। রোদে গিয়ে দাঁড়ালে ছায়া পড়ে না। সর্বাঙ্গে সুধাংশু-কান্তি। যেন ধবলগিরি-শিরে শিব বসেছেন পদ্মাসনে।
‘মা, আমার এই বাইরের রূপে কী হবে? আমাকে অন্তরের রূপ দে। যেন সকল স্বরূপে-কুরূপে তোকেই কেবল দেখতে পারি।
‘এক দিন কালীঘরে পূজার আসনে বসে ধ্যান করছে গদাধর, কিন্তু কিছুতেই মা’র মূর্তি মনে আনতে পারছে না। হঠাৎ চেয়ে দেখে ঘটের পাশ থেকে উকি মারছে—ও কে? ও তো রমণী, পতিতা, দক্ষিণেশ্বরের ঘাটে যে প্রায়ই স্নান করতে আসে! সে কি কথা? মা আজ পতিতার বেশে পূজা নিতে এলেন?
‘ও মা, আজ তোর রমণী হতে ইচ্ছে হয়েছে? তা বেশ, যেমন তোর খুশি তাই হ। তেমনি হয়েই তুই পুজো নে।’
আরেক দিন থিয়েটার দেখে ফিরছেন ঠাকুর। গণমোহিনীরা সেজে-গুজে, খোঁপা বেধে, টিপ পরে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাঁধা হুঁকোয় তামাক খাচ্ছে। ‘ওমা, মা, তুই এখানে এ ভাবে রয়েছিস?’ বলে ঠাকুর প্রণাম করলেন ওদের।
জননী, জায়া আর জনতোষিণী—সব সেই জগদম্বার অংশ।
তুমি মহাবিদ্যা। মহাবিদ্যাতে মহা বিদ্যাও আছে, আবার মহা অবিদ্যাও আছে। তেমনি বেদ-বেদান্তও তুই, খিস্তি-খেউড়ও তুই।
মা, তুই তো পঞ্চাশৎ-বর্ণ-রূপিণী। তোর যে সব বর্ণ নিয়ে বেদ-বেদান্ত, সেই সবই তো ফের খিস্তি-খেউড়ে। তোর বেদ-বেদান্তের ক-খ আলাদা, আর খিস্তি- খেউড়ের ক-খ আলাদা—এ তো নয়! ভালো-মন্দে পাপে পূণ্যে শুচি-অশুচিতে সর্বত্র তোর আনাগোনা।’
সর্বত্র সমবুদ্ধি। সকলের জন্যে স্থান, সকলের জন্যে মান, সকলের জন্যে আশ্বাস। পাপী আর তাপী, আর্ত আর পীড়িত, অবর আর অধম—কেউ তোমরা হেয় নও, অপাঙ্ক্তেয় নও। কেউ নও নিঃস্ব-নিরাশ্রয়। যে অবস্থায় আছ সে অবস্থায়ই চলে এস। সব অবস্থায়ই সন্তানের স্থান আছে মা’র কোলে। সে যদি আমাদের মা, তবে তার কাছে লজ্জাই বা কি, ভয়ই বা কি! আর, যদি দেরি একটু আমাদের হয়েই থাকে, তাই বলে কি মা’র কখনো দেরি হয়?
ভৈরবী বললে, ‘একটু কারণ খাও।’
কারণ? জগৎকারণ ঈশ্বরের অমৃতই তো খেতে চলেছি। এ তুচ্ছ মদিরা তার কাছে কী!
‘বাবা, বীরভাবে সাধনা করেই সিদ্ধি পেয়েছি আমি।’ ভৈরবী মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকাল গদাধরের দিকে, ‘কিন্তু তুমি দিব্যভাবের অধিকারী হয়েছ তুমি আমার চেয়ে অনেক উঁচুতে।’
দিব্যভাব? হাসল গদাধর।
তুমি জল না ছুঁয়ে মাছ ধরেছ। তোমার দেহবোধ নেই। তোমার সুষুন্মাদ্বার সম্পূর্ণ খুলে গিয়েছে। তুমি বালকস্বভাব হয়েছ। সর্ববস্তুতে তোমার অদ্বৈত-বুদ্ধি এসেছে। গঙ্গার জল আর নর্দমার জল তোমার কাছে সমান। তুলসী আর সজনেতে কোনো ভেদ নেই। আমাকে এবার তোমার শিষ্যা করো। আমাকে বীর থেকে দিব্যে নিয়ে চলো। নিয়ে চলো রূপ থেকে অরূপে, ক্রিয়া থেকে সত্তায়, দীপ্তি থেকে তৃপ্তিতে—
তুমি যোগেশ্বরী। তুমি যোগমায়ার অংশ। তোমার আবার অপূর্ণ কি?
জানি না। কিন্তু তোমার মাঝে এখন যে শান্তি যে বিশুদ্ধি যে স্বচ্ছতা দেখছি, তা আমার অনধিগম্য। তাই মনে হয় আমি অপূর্ণ, অশক্ত। তুমি অগ্নি থেকে চলে এসেছ জ্যোতিতে, ঝড় থেকে নীলিমায়, কেন্দ্র থেকে প্রসারে। আমি তোমার শিষ্যা হব। আমি চাই ঐ শান্তি, ঐ ব্যাপ্তি, ঐ নীরবতা। ঐ দিব্যচেতনা।
গদাধর হাসল। বললে, ‘যে গুরু সেই আবার শিষ্য। যে মা সেই আবার সন্তান। যিনি ভগবান তিনিই আবার ভক্ত।’
ভৈরবী বসল এসে গদাধরের ছায়াতলে।
তার এখনো শেষ তপস্যা বাকি।
২৪
তন্ত্রে তোমার সিদ্ধি হল, এবার কিছু একটা ভোজবাজি দেখাও। হয় পাহাড় টলাও নয় তো মরা নদীতে জোয়ার আনো।
কিছুই করবে না, শুধু চুপচাপ বসে থাকবে, কি করে তবে বুঝব তুমি মস্ত বড় একটা সাধু হয়েছ!
‘মা’র কাছে গিয়ে একটু ক্ষমতা-টমতা চাও না।’ হৃদয় পীড়াপীড়ি করতে লাগল।
ক্ষমতা দিয়ে কী হবে? মাকে দেখতে পাচ্ছি, টেনে আনতে পারছি কাছে, এই কি যথেষ্ট ক্ষমতা নয়?
এ পাঁচ জনে দেখতে পারছে কই? যা দেখে পাঁচ জনের তাক লেগে যায় তেমন একটা কিছু করো।
তন্ত্রবলে অষ্টসিদ্ধির বিকাশ হয়েছে গদাধরে। তাই কি সে এবার প্রয়োগ করবে নাকি? থ বানিয়ে দেবে নাকি সবাইকে?
মা’র কাছে গেল তাই জিজ্ঞেস করতে। চক্ষের নিমিষে মা দেখিয়ে দিলেন ও-সব সিদ্ধাই ঘৃণ্য আবর্জনা। বিষ-কলুষ। ভগবানকে পাবার পথের দুর্লঙ্ঘ্য অন্তরায়। যদি একবার ঐ প্রলোভনে পা দাও তবে মাটি হয়ে যাবে সব তপস্যাফল। দেখতে-দেখতে দেউলে হয়ে যাবে।
কৃষ্ণ অর্জুনকে কী বলেছিলেন? বলেছিলেন, অষ্টসিদ্ধির মধ্যে যদি একটিও তোমার থাকে তা হলে তোমার শক্তি বাড়বে বটে, কিন্তু আমায় তুমি পাবে না। সিদ্ধাই থাকলে মায়া যায় না, আবার মায়া থেকেই অহঙ্কার। অহঙ্কার যদি থাকে তবে ভগবানের পথে এগুবে কি করে? ছুঁচের ভিতর সুতো যাওয়া, একটু রোঁ থাকলে হবে না—
আর কী হীনবুদ্ধির কথা! সিদ্ধাই চাই, না, মোকদ্দমা জিতিয়ে দেব, বিষয় পাইয়ে দেব, রোগ সারিয়ে দেব। আহা, এরি জন্যে সাধন?
যে বড়লোকের কাছে কিছু চেয়ে ফেলে, সে আর খাতির পায় না। তাকে আর এক গাড়িতে চড়তে দেয় না। আর যদি চড়তে দেয়ও, কাছে বসতে দেয় না। কথা কয় না মন খুলে।
যদি সিদ্ধাই-ই নিয়ে নিলাম তবে ভগবান বলবেন, আর কেন? খুব হয়েছে। ঐ নিয়েই ধুয়ে খা। ঐ নিয়েই মজে থাক। সেই সাবির কথা জানিস না? সবাই বলছে, সাবির এখন খুব সময় একখানা ঘর ভাড়া নিয়েছে, দু’খানা বাসন হয়েছে, তক্তপোশ বিছানা মাদুর তাকিয়া হয়েছে, কত লোক আসছে-যাচ্ছে। তার সুখ আর ধরে না। তার মানে আগে সে গৃহস্থ বাড়ির দাসী ছিল এখন বাজারে হয়েছে। তার মানে, সামান্য জিনিসের জন্যে নিজের সর্বনাশ করেছে। যে শরীর-মন-আত্মা দিয়ে ভগবানকে লাভ করব সেই শরীর-মন-আত্মা তুচ্ছ টাকা-কড়ি তুচ্ছ লোকমান্য তুচ্ছ দেহ-সুখের জন্যে বিক্রি করে দেব?
‘তবে কী চাইবে মা’র কাছে?’ হৃদয় ঝটকা মারল।
‘শুধু কৃপা চাইব। বলব, আমাকে ভক্তি দাও, শুদ্ধা ভক্তি, অহেতুকী ভক্তি।
‘হ্যাঁ, প্রহ্লাদের যেমন ছিল। রাজ্য চায় না, ঐশ্বর্য চায় না, শুধু, হরিকে চায়। কিছু চাও না অথচ ভালোবাসো এরই নাম ভক্তি। তুমি বড় লোকের বাড়ি রোজ যাও কিন্তু কিছুই চাও না, জিজ্ঞেস করলে বলো, আজ্ঞে, কিছু না, এমনি একটু শুধু আপনাকে দেখতে এসেছি, এরই নাম নিষ্কাম ভক্তি। যেমন নারদের ছিল। ঘুরে-ঘুরে বেড়ায় আর বীণা বাজিয়ে হরিনাম গান করে।
গদাধর মন্দিরে গিয়ে মা’র পাদপদ্মে ফুল দিলে। বললে, ‘মা, এই নাও তোমার জ্ঞান, এই নাও তোমার অজ্ঞান, আমায় শুদ্ধা ভক্তি দাও। এই নাও তোমার শুচি, এই নাও তোমার অশুচি, আমায় শুদ্ধা ভক্তি দাও। এই নাও তোমার পুণ্য, এই নাও তোমার পাপ, আমায় শুদ্ধা ভক্তি দাও। এই নাও তোমার ধর্ম, এই নাও তোমার অধর্ম, আমায় শুদ্ধা ভক্তি দাও—’
একটা নিলে আরেকটাও নিতে হবে। যদি মা জ্ঞান নেন তবে অজ্ঞানও নেবেন, পুণ্য নিলে পাপও। অনেক ছাড়া এক নেই। অন্ধকার ছাড়া আলো নেই। অহল্যার শাপ-মোচনের পর শ্রীরামচন্দ্র তাকে বললেন, বর চাও। অহল্যা বললেন, যদি বর দেবে তো বর দাও, যদি পশু হয়েও জন্মাই যেন তোমার পাদপদ্মে মন থাকে।
আমি সিদ্ধি চাই, সিদ্ধাই চাই না। আমার এ সিদ্ধি গায়ে মাখলে নেশা হয় না। এ সিদ্ধি খেতে হয় ৷
ভৈরবীর সেই দুই শিষ্য—চন্দ্র আর গিরিজা–এক দিন এসে উপস্থিত হল দক্ষিণেশ্বরে। দুজনেই সিদ্ধাই নিয়ে ব্যস্ত। নানা রকম ক্ষমতার ভেলকিবাজি নিয়ে।
এই হচ্ছে অহঙ্কার। এক রকম মায়া। এক টুকরো মেঘের মতন। সামান্য মেঘের জন্যে সূর্যকে দেখা যায় না। তেমনি এই অহং বুদ্ধির জন্যেই হয় না ঈশ্বরদর্শন।
অহঙ্কার ত্যাগ না করলে ঈশ্বরকে ধরা যায় না। ভার নেন না ঈশ্বর।
কাজকর্মের বাড়িতে যদি এক জন ভাঁড়ারি থাকে তবে কর্তা আর আসে না ভাঁড়ারে। যখন ভাঁড়ারি নিজে ইচ্ছে করে ভাঁড়ার ছেড়ে চলে যায় তখনই কর্তা ঘরে চাবি দেয় আর নিজে ভাঁড়ারের বন্দোবস্ত করে।
তাই, ক্ষমতা নিজের হাতে না নিয়ে ছেড়ে দাও সেই সর্বশক্তিমানের হাতে।
একবার বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মী নারায়ণের পদসেবা করছেন, হঠাৎ নারায়ণ উঠে দাঁড়ালেন। লক্ষ্মী বললেন, ‘ও কি, কোথায় যাও?’ নারায়ণ বললেন, ‘আমার একটি ভক্ত বড় বিপদে পড়েছে, তাকে রক্ষা করতে যাচ্ছি।’ কিন্তু খানিক দূর গিয়েই ফিরে এলেন নারায়ণ। ‘এ কি, এত শিগগির ফিরে এলে যে?’ শুধোলেন লক্ষ্মী। নারায়ণ হেসে বললেন, ‘ভক্তটি ভাবে বিহ্বল হয়ে পথ চলছিল। মাঠে কাপড় শুকোতে দিয়েছিল ধোপারা, ভক্তটি তাই মাড়িয়ে দিলে। তাই দেখে তাকে মারতে ধোপারা লাঠি নিয়ে তেড়ে এল। আমি তাকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম।’ ‘কিন্তু ফিরে এলে কেন?’নারায়ণ বললেন, ‘দেখলাম ভক্তটি নিজেই ধোপাদের মারবার জন্যে ইঁট তুলেছে। তাই আর আমি গেলাম না।
‘নিজেকে নিশ্চিহ্ন করে সমর্পণ করে দাও। নিজের জন্যে কিছু রেখো না। নিজেকে দেখিয়েও ‘আমি’ বলবে না, বলবে ‘তুমি’।
চন্দ্রের ‘গুটিকা-সিদ্ধি’ হয়েছিল। একটি মন্ত্রপূত গুটিকা ছিল তার। সেটি ধারণ করলেই সে অদৃশ্য বা অশরীরী হয়ে যেতে পারত। আর অদৃশ্য হয়েই যেতে পারত যেখানে খুশি, সে জায়গা যতই দূর্গম বা দুষ্প্রবেশ্য হোক। ঐ শক্তি পেয়ে অহঙ্কারে ফুলে উঠেছিল চন্দ্র। ভাবলে, যখন যেখানে খুশি যেমন- খুশি যাতায়াত করতে পারি, তখন ঐ দোতালায় সুন্দরী ঐ মেয়েটির ঘরে ঢুকলে কেমন হয়? সম্ভ্রান্ত বড়লোকের মেয়ে, আছে পর্দার ঘেরাটোপে। তা থাক, আমি তো অশরীরী হয়ে তার ঘরে ঢুকব। দরজা বন্ধ থাক, জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকব, নয় তো বা কোনো দেয়ালের ছিদ্রপথে। সিদ্ধাইর তেজ দেখাতে গিয়ে চন্দ্র ক্রমে-ক্রমে সেই ধনীকন্যাতে আসক্ত হয়ে পড়ল। ফতুর হয়ে গেল নিঃশেষে। যার জন্যে এত চোটপাট সেই সিদ্ধাইও আর রইল না।
আর গিরিজা? এক দিন শম্ভু মল্লিকের বাগানে বেড়াতে গিয়েছেন ঠাকুর। সঙ্গে গিরিজা। কথা বলতে-বলতে কখন এক প্রহর রাত হয়ে গিয়েছে খেয়াল নেই। পথে এসে দেখেন বিষম অন্ধকার। ঈশ্বরের কথা বলতে-বলতে এত তন্ময় হয়ে পড়েছিলেন একটা লণ্ঠন চেয়ে আনতে পর্যন্ত মনে ছিল না। এখন যান কি করে? এক পা হাঁটেন তো হোঁচট খান, দু’পা হাঁটেন তো দিক ভুল হয়ে যায়। কি হল বলো তো এখন করি কি?
‘দাঁড়াও, আমিই আলো দেখাই।’
সিদ্ধাই হয়েছে গিরিজার। সে পিঠের থেকে আলো বের করতে পারে।
কালীবাড়ির দিকে পিঠ করে দাঁড়াল গিরিজা। আলোর ছটা বেরল একটা। সেই ছটায় কালীবাড়ির ফটক পর্যন্ত দেখা গেল স্পষ্ট। আলোয়-আলোয় চলে এলেন ঠাকুর।
কিন্তু ঐ পর্যন্তই। গিরিজার আর কিছু হল না। লণ্ঠনই হল, সূর্য হল না।
ভবতারিণী ঠাকুরের শরীরে ওদের সিদ্ধাই সব টেনে নিলেন। ওরা মোহমুক্ত হল। মন থেকে অভিমান মুছে ফেলে দীনভাবে বসল আবার যোগাসনে।
ও সকলে আছে কি? ও সব তো বন্ধন। মনকে টেনে রাখে, এগোতে দেয় না।
জানিস না সেই এক পয়সার সিদ্ধাইর গল্প?
দু ভাই। বড় ভাই সন্নেসী হয়ে সংসার ত্যাগ করেছে। ছোট ভাই লেখা-পড়া শিখে সংসার-ধর্ম করছে। বারো বছর পর বাড়ি এসেছে সন্নেসী, ছোট ভাইর জমি-জমা চাষ-বাস কেমন কী হয়েছে তাই দেখতে। ছোট ভাই জিজ্ঞেস করলে, এত দিন যে সন্নেসী হয়ে ফিরলে তোমার কি হল? দেখবি? তবে আয় আমার সঙ্গে। ছোট ভাইকে সন্নেসী নদীর পাড়ে নিয়ে এল। এই দ্যাখ, বলে নদীর জলের উপর দিয়ে হেঁটে চলে গেল পরপারে। খেয়ার মাঝিকে এক পয়সা দিয়ে নৌকোয় করে ছোট ভাইও নদী পেরোল। বড় ভাই বললে, ‘দেখলি? কেমন হেঁটে পেরিয়ে এলম নদী।’ ‘আর তুমিও তো দেখলে, ‘বললে ছোট ভাই, ‘আমিও কেমন এক পয়সা দিয়ে দিব্যি নদী পেরোলাম। বারো বছর কষ্ট করে তুমি যা পেয়েছ আমি তা পাই অনায়াসে, মোটে এক পয়সা খরচ করে। তা হলে তোমার ঐ সিদ্ধাইর দাম এক পয়সা!
আরেক যোগী যোগসাধনায় বাক সিদ্ধি লাভ করেছে। কাউকে যদি বলে, মর্, অমনি মরে যায়। আর যদি বলে, বাঁচ, অমনি বেঁচে ওঠে। এক দিন দেখে এক সাধু এক মনে ঈশ্বরের নাম জপ করছে। ওহে, অনেকই তো হরি-হরি করলে, কিন্তু পেলে কিছু? কি আর পাব? শুধু তাঁকেই চাই, কিন্তু তাঁর কৃপা না হলে কিছুই হবার নয়। তাই করুণা ভিক্ষা করেই দিন যাচ্ছে। ও সব পণ্ডশ্রম ছাড়ো। যাতে কিছু একটা পাও তার চেষ্টা দেখ। আচ্ছা মশাই, আপনি কী পেয়েছেন শুনি? শুনবে আর কি। দেখ। কাছেই একটা হাতি বাঁধা ছিল, তাকে বললে, মর্। হাতি মরে গেল তক্ষুণি। ফের মরা হাতিকে লক্ষ্য করে বললে, বাঁচ্। অমনি গা-ঝাড়া দিয়ে হাতি উঠে দাঁড়াল। দেখলে? কি আর দেখলুম বলুন—হাতিটা একবার মলো, আবার বাঁচলো। তাতে আপনার কী এসে গেল? আপনি কি ঐ শক্তিতে নিজের জন্ম-মৃত্যুর হাত থেকে ত্রাণ পেলেন?’
‘শোন, এই দিকে আয়।’ ঠাকুর এক দিন চুপি-চুপি ডাকলেন নরেনকে ।
নিয়ে গেলেন পঞ্চবটীর নির্জনে।
বললেন, ‘তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।’
নরেন নিস্পন্দ, নির্বাক ।
‘শোন, তোকে বলি। আমার মধ্যে অষ্টসিদ্ধি আবির্ভূত আছে। কিন্তু ও আমি কোনো দিন প্রয়োগ করিনি, করবও না। তোকে ও-সব দিয়ে দিতে চাই—
‘‘আমাকে?’
‘হ্যাঁ, তুই ছাড়া আর কে আছে? তোকে অনেক কাজ করতে হবে, অনেক ধর্ম প্রচার। তোরই ও-সব দরকার। তুই ছাড়া কারু সাধ্যও নেই এত শক্তি ধারণ করে। বল, নিবি?’
এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে রইল নরেন। বললে, ‘ঐ সব শক্তি আমাকে ঈশ্বরলাভে সাহায্য করবে?’
কি ভাবলেন ঠাকুর। বললেন, ‘না, তা করবে না।’
‘তবে ও-সবে আমার দরকার নেই।’ নরেনের ভঙ্গিতে ফুটে উঠল অনাসক্তির দৃঢ়তা, ‘যা দিয়ে আমার ঈশ্বরলাভ হবে না শধু লোকমান্য হবে তা দিয়ে ‘আমি কী করব?’
ঠাকুর হাসতে লাগলেন প্রসন্ন হয়ে।
এক দিন নরেন নিজেই গিয়ে উপস্থিত হল ঠাকুরের কাছে। তার ধ্যানের ফল কি হচ্ছে না-হচ্ছে তাই বুঝিয়ে বলতে। খেতে-শুতে-বসতে সব সময়েই ধ্যান করছে নরেন। কাজকর্মের সময়ে মনের কতকটা ভিতরে বসে ঈশ্বরচিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে।
‘এ আমার কী হল বলুন তো?’
‘কী হল?’ ঠাকুর প্রফুল্ল বয়ানে হাসলেন।
‘ধ্যান করতে বসে আমি দূরের জিনিস দেখতে পাচ্ছি, শুনছি অনেক দূরের শব্দ। দেখছি কোন বাড়িতে বসে কে কি করছে, কে কি বলছে। উঠে-উঠে যাচ্ছি সে-সে বাড়িতে। গিয়ে দেখছি যা দেখেছি আর শুনেছি সব সত্যি। এ আবার কী নতুন খেলা!’
ঠাকুর বললেন, ‘এ সব সিদ্ধাই। তোকে ভোলাতে এসেছে। ঈশ্বরলাভের পথে বাধা সৃষ্টি করতে এসেছে। তুই সিদ্ধাই নিবি কেন? তুই ভগবানকে নিবি। তুই ধ্যানসিদ্ধ হবি। দিন কতক ধ্যান তুই বন্ধ করে রাখ। তার পরে দেখবি ও-সব আর আসবে না। তুই পথ পাবি—নিত্য কালের এগিয়ে যাবার পথ!
