কাঞ্চন-মূল্য – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

কাঞ্চন-মূল্য – ১৭

১৭

আরও কটা দিন কেটে গেল। নেহাত যে কষ্টেই কাটল তাও নয়। আমি যে পাঁচটা ট্যাকা দিদিমণিকে দিয়েছিলুম, ব্রেজঠাকরুন ফিরিয়ে নিতে বলেছেল তা বললুম নিয়েচি, কিন্তু নিই নি তো ফিরিয়ে। ঐ ট্যাকাটা ছেল, বাবাঠাকুর দুটো দিয়ে গেল, তার ওপর ব্রেজঠাকরুনও দুটো একটা ক’রে যোগান দিয়ে যেতে লাগল। ইদিক দিয়ে তেমন কোন কষ্ট নেই—কিন্তু অন্য দিক দিয়ে সমিস্যে যেন ঘোরালো হয়ে আসতে লাগল। বাবাঠাকুরের একেবারে দেখা নেই! দশদিন গেল, পনরো দিন গেল, একেবারে দেখাটি নেই ওনার। মাঝে মাঝে বেরিয়ে যেত, গা-সওয়া হয়ে গেছল, কিন্তু এবার ভয়ে নয়, রাগারাগি ক’রে গেচে, বিয়ের কথা নিয়ে দিদিমণিকে একরকম কুকথাই বলে গেচে, য্যাতই দিন যেতে লাগল, ত্যাতই দুজনের মুখ যেন শুকিয়ে যেতে লাগল। ব্রেজঠাকরুন অবিশ্যি চিনতে পেরেচে দিদিমণিকে, তবে যে অপবাদটি সিদিন অমন ক’রে চাপিয়ে দিলে বাবাঠাকুর-নর্দমায় ভেসে যাবে ব’লে—তাতে তো মনে হয় বিতিষ্টেই ধ’রে গেছে সংসারে; ভয়ে মনে হতে লাগল এবার আর বুঝি ফিরবে না। দিদিমণি পেরায়ই বসে কাঁদে, দুদিন ব্রেজঠাকরুনের নজরেও পড়ে গেল, বুঝোলে, যাবে কোথায়?—বাউন্ডুলে মানুষ, ঘুরে ফিরে আবার আসচেই তো ফিরে। বুঝোলে, কিন্তু আরও যেন মুখ শুকিয়ে যেতে লাগল ওনার। একদিন আমায় আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললে—“তুই আর যা কথা বলিস বলগে—সিদিন তো বললুমই আমি গেরাহ্যি করিনে, কিন্তু আমার পাঁ ছুঁয়ে দিব্যি কর আজ যা বলচি তা কাউকে বলবি নে?

আমি পা ছুঁয়ে দিব্যি করে বললুম— ‘না, বলব না।’

আঁচলে একটা ট্যাকা ছিল, গেরোটা খুলে আমার হাতে দিয়ে বললে—‘এই নে, দিব্যি তো রইলই, তার ওপর একটা ট্যাকা দিচ্চি, ভাঙিয়ে কিছু কিনে খাস যখন ইচ্ছে হবে।’

চারিদিকে চেয়ে নিয়ে আরও মুখটা কাছে নিয়ে এসে বললে—হ্যাঁরে, তোর দিদিমণি

তোকে কিছু এনে দিতে বলে না তো?—এই বিষ-টিষ, আপিন-টাপিন?’

বেশ মনে আচে দা’ঠাকুর, ভয়ে একেবারে গলা শুকিয়ে আমি যেন কিরকম হয়ে গেলুম, মাত্তোর একটা কথা শুনে আমি এত ভয় আর জন্মে কখনও পাইনি। বুঝলেন না? এ ধরনের কথা কখনও মনে হয় নি, ভয়ে গলা শুকিয়ে ফ্যাল ফ্যাল ক’রে চেয়ে রইলুম ওনার মুখের পানে, রা সরচে না মুখে। তাইতেই সন্দোটা বেড়ে গিয়ে উনিও আরও ভয় পেয়ে গেল। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠেচে, আরও গলা নামিয়ে মুখটা আরও কাছে এনে সুদোলে—‘বলে আনতে?’ উত্তুর দোব কি, আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে একেবারে কেঁদে উঠলুম। ব্রেজঠাকরুন আরও ভয় পেয়ে গেল, বললে—‘বলে নাকি রে? তা বলিস নি তো আমায়!”

ফোঁপাতে ফোঁপাতেই বললুম—‘না, বলে নি।’

‘তবে কাঁদছিস যে!’

‘ম’রে যাবে নাকি দিদিমণি?’—বলে আমি দু’হাতে মুখ চেপে একেবারে ডুকরে কেঁদে উঠলুম!

ব্রেজঠাকরুন আমার পিঠে হাত দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে, বেশ একটু চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে রইল। একটু পরে বললে—‘চুপ কর। বড্ড ভালোবাসিস তোর দিদিমণিকে, নয়?

কেঁদেই ফুরসত নেই, তার ওপর আবার ওনার আদর ক’রে অমন কথা বলা, কান্নাটাই আরও বেড়ে গেল আমার। ব্রেজঠাকরুন আমার পিঠে আস্তে আস্তে হাতটা বুলিয়ে দিতে লাগল, বললে—‘ষাট, মরবে কেন? শত্রুর মরুক ওর। তোকে জিগ্যেস করছিলুম-বাপ আসচে না, ছেলেমানুষ, মনটা উতলা হয়ে উঠতে পারে তো! নেত্য আমার অবিশ্যি সে ধরনের মেয়ে নয়, তবু বাপের ব্যাভারটা তো বড্ড খারাপ যাচ্চে। তুই ছেলেমানুষ, অত বুঝবিনি—অবিশ্যি ভয় একেবারেই নেই, তবু একটু কাছেকাছেই থাকবি, বুঝলি?…চুলোয় যাক, ভারি তো একটা বাঁজা গোরু, খুলে মাঠের দিকে তাড়িয়ে দিয়ে তুই বরং কাছে কাছেই থাকবি। বুঝলি? আর কিছুই নয়, তোকেও নেত্য বড় ভালোবাসে-বাপের ব্যাভারটা তো ভালো হচ্চে না—সিদিন তো শাপমণ্যিই দিয়ে বসল-তুই কাছে কাছে থাকলে অন্যমনস্কও থাকবে একটু। তারপর দেখ না-পালিয়ে থাকবে কোথায়? আমি চর লাগাই নি?’

এখন বুঝেচি—সব কথা তো পষ্ট ক’রে বলতে পারে না, ঐরকম ঘুরিয়ে, এক কথা পাঁচবার ক’রে আমায় অনেক বুঝিয়ে বললে দা’ঠাকুর। আবার পা ছুঁয়ে দিব্যি করিয়ে নিলে- যদিই দিদিমণি তেমন কিছু আনতে-টানতে দেয় কখনও তো যত শিগগির পারি আগে যেন জানাই।

যা বলছিলুম—কি ক’রে হাঁড়ি চড়বে সে ভাবনাটা তত নেই, তবু অন্য চারিদিক দিয়ে সমিস্যে ঘোরালোই হয়ে উঠতে লাগল দিন দিন। বিষ আনবার কথার পর থেকে আমার মনটাও আরও মুষড়ে রইল দা’ঠাকুর; কৈলীকে ছেড়ে একরকম সারাক্ষণই দিদিমণির কাছে কাছেই কাটাতে লাগলুম—তাও আগে যেমন ছিলুম তেমন থাকলে হয়তো ভালো হোত-তা তো নয়, আমারও সব্বদা ভয়, মুখ চুন, উদিকে দিদিমণিরও মুখে সব্বদা একটা দুশ্চিন্তের ভাব, বাড়িটা হরদমই যেন থমথমে হয়ে রয়েছে।

আর একটা জিনিস মিলিয়ে দেখলুম, ব্রেজঠাকরুনেরুও যেন সব্বদা একটা ভয় ভয় ভাব। – ঠিক আগেকার মতন নয়, কেননা এখন বুঝতে পারচি, সেই যে শুনেচে—দিদিমণি আমায় চৌধুরীমশাইয়ের ছায়া মাড়াতে বারণ করেচে, সেই থেকে তো টের পেয়েছিল তিনি কি রকম খাঁটি সোনা; ওদিকটা আর আশঙ্কা ছেল না, তবে মনে হোত এই নতুন ভয়টা যেন সব্বদা লেগে – থাকত—আপ্তহত্যে না ক’রে বসে। আগের চেয়ে বাড়িতে থাকেও বেশি, আর কয়েকবারই নজর পড়ে গেল, আমরা দুজনে ব’সে আচি, উনি আড়াল থেকে একদিষ্টে চেয়ে আচে আমাদের দিকে। সমস্ত বাড়ির হাওয়াটাই যেন বিগড়ে গেল, দা’ঠাকুর, সব্বদাই আইঢাই করছে মন।

আজ্ঞে চর লাগিয়েছেল বৈকি ব্রেজঠাকরুন। দুটো কারণ ছেল তো, সিদিন চৌধুরীমশাই একরকম কথাই দিলে বাবাঠাকুর রাজী হ’লে একটা মন্দির তুলে তানাকে দিয়ে নেত্য সেবার জন্যে বিগ্রহ পিতিষ্টে ক’রে দেবে; তাহলেই তো একটা কায়েমী রুজির ব্যবস্থা হয়, তার সঙ্গে গাঁয়ের জমিদারের নিত্যি নেক নজরে থাকা। এটা ছেলই, তারপর দিদিমণির এই অবস্থা, ব্রেজঠাকরুন আমার কাছে য্যাতই চাপা দিতে চেষ্টা করুক না, য্যাত দিন যাচ্ছেল তাতই তো ভয়ে ভয়ে কাটাচ্ছেল কখন কি করে বসে। লোক লাগিয়েছেল উনি। কোথায় কোন্ শিষ্যিবাড়ি আচে খোঁজ নিয়ে নিয়ে আমার বাবা আর মণ্ডলপাড়ার আরও দুজনকে পাটোছেল চারিদিকে। তারা সব ফিরে ফিরে এল। বাবাঠাকুরের দেখা সাক্ষাৎ নেই।

তবে, এল বৈকি বাবাঠাকুর, না এসে পারে?

কিন্তু সে কাহিনী বলবার আগে এদিককার দুটো কথা বলে নিতে হয়—আরও কিছুদিন কেটে গেল, বাবাঠাকুর বাড়ি ছেড়েচে সে প্রায় এক মাস হতে চলল। এর মধ্যে একদিন—প্রায় দিন পনরোর মাথায়—দেবনারাণ চৌধুরীর লোক এসেছিল ওনাকে ডাকতে। ব্রেজঠাকরুন বাড়িতেই ছেল, বললুম না, এদানি বেরুত বড় কম, জিগ্যেস করতে লোকটা বললে, বিশেষ দরকার আছে, এর বেশি কিছু বলেন নি কত্তা। বাড়ি থাকলে সঙ্গেই নিয়ে যেতে বলেচে, নয়তো এলেই যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ব্রেজঠাকরুন বললে—দিনকয়েক হোল শিষ্যিবাড়ি গেচে, দু’এক দিনেই আসবার কথা, এলেই পাঠিয়ে দেব।

লোকটা চলে গেলে ব্রেজঠাকরুন তখুনি আমায় মণ্ডলপাড়ায় পাঠিয়ে দিলে, বললে বাবাকে গিয়ে বলতে য্যাত শিগগির পারে পাড়ায় যে ক’জনকে পায়, সঙ্গে করে নিয়ে আসতে। সিদিন আবার ওনার অন্য এক রূপ দেখলুম; দিদিমণিকে জন আষ্টেকের যুগ্যি চালডাল আর তরকারি বের করে দিতে বলে দাওয়াতেই নিজেই তাড়াতাড়ি একটা ইটের উনুন তোয়ের ক’রে নিজেই হেঁসেলেরটা আর এটায় আঁচ দিয়ে দিলে। দুটো হাঁড়িতে ভাত আর ডাল ছেড়ে দিয়ে দিদিমণিকে আলুপটোলগুনো কুটতে ব’লে নিজেই বসে গেল মশলা বাটতে। কাজের দিকটা ওনার এতটা দেখিনি, যেন চরকি ঘুরচে; য্যাতক্ষণে বাবা সবাইকে নিয়ে এল—জনা ছয়েক এল ওনারা ত্যাতক্ষণে এদিকে সব তোয়ের একরকম। বললে কোথায় বাবাঠাকুরের শিষ্যিবাড়ি . আচে-এক একজনকে চ’লে যেতে হবে। ডেকে নিয়ে আসতে হবে, ভীষণ জরুরি কাজ।

ওনারা খেয়ে দেয়ে য্যাখন বেরুচ্চে, বললে— ‘না আসতে চায়, পাঁজা ক’রে নিয়ে আসবে, আমার হুকুম রইল।’

ঐ ছিল ওনার শেষ কথা, সমস্তদিন আমায় কি দিদিমণিকে কিছু বললে না, শুধু বাবারা যাবার খানিক পর থেকেই ভেতর-বার করতে থাকল; দরজা পজ্জন্ত নেমে আসে, এক প্রকার রাস্তা অবধি ঠেলে বেরিয়ে যায়, তারপর আবার ঘরে গিয়ে তক্তপোশে শুয়ে পড়ে। ওনারা, খেয়ে-দেয়ে দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর বেরিয়ে গেছল, এই ক’রে ক’রে য্যাখন প্রায় সন্দে হয় হয়, দেউড়ি থেকে আর একজন লোক এসে উপোস্থিত। ব্রেজঠাকরুন সেই সবে ঘরে গিয়ে দাঁড়িয়েচে, আমি খবর দিতে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এল!

সকালে যে এসেছেল সে নেহাত পাইক-বরকন্দাজ না হোক, কতকটা ঐ দরেরই লোক, এখন যিনি এল তিনি অন্য ধরনের। পায়ে সেকালের পক্ষে একটু দামী জুতো, গায়ে পরিষ্কার ফতুয়ার ওপর একটা পাকানো উড়ুনি, পরণেও তদনুরূপ ধুতি,–নেহাত নায়েব যদি না হয় তো ওপরের দিকের কেউ আমলা একজন। বাইরেই দাঁড়িয়ে ছেল, ব্রেজঠাকরুনকে নেমে আসতে দেখে প্রশ্ন করলে’ভেতরেই আসি?’

ব্রেজঠাকরুন হতভম্ব হয়ে গেচে একেবারে। আমি দাওয়ায় ছিলুম, দিদিমণি ওনাকে দেখেই ঘরের ভেতর চলে গেছল, মাদুরটা বাড়িয়ে ধরে আমায় ফিসফিশ ক’রে বললে—‘শিগির বিচিয়ে দে দাওয়ায়।’

হয়তো সিদিন সিংদরজায় ওনার দাপটটা দেখে থাকবে। সে জন্যেই হোক্, কি মনিবের হুকুমই হোক, পায়ের ধুলো নিয়ে গড় করলে ব্রেজঠাকরুনকে, তারপর মাদুর পাততে দেখে আমায় বললে—‘থাক্, বসব না আমি; দুটো কথা আচে, এক্ষুনি চলে যাব।’

ব্রেজঠাকরুনকে বললে—‘আমায় ছোটকত্তা পাঠিয়েচেন—আপনাদের দেবনারায়ণ চৌধুরী মশাই। আজ সকালে লোক এয়েছিল; কি দরকার সে জানত না, তাই আবার আমায় পাঠিয়ে দিলেন। আপনাকে সিদিন বলেছিলেন পণ্ডিতমশায় যদি নিত্যসেবায় রাজী হন তো একটা মন্দির গড়িয়ে বিগ্রহ পিতিষ্টে করিয়ে দেবেন। সেই নিয়ে ওনার সঙ্গে একটা পরামর্শ করতে চান ছোটকত্তার ইচ্ছে কি বিগ্রহ থাকবে মন্দিরে, কোন্ দেবতার সেবা করতে চান উনি সেটা পণ্ডিতমশাই ঠিক করবেন। আগেই ডেকে পাঠাতেন, তা ওনার শরীলটা এদানি বেশ ভালো যাচ্চে না, কলকাতা থেকে ডাক্তার এয়েছিল, বসেচে একটু বায়ুপরিবত্তনে যেতে। ফরেশডাঙায় গঙ্গার ধারে একটা বাড়ি ঠিক হয়েচে, যাবেন, তার আগে মন্দিরের ব্যাপারটা ঠিক ক’রে যেতে চান। দিনচারেক পরেই সামনে একটা ভালো দিন রয়েচে বনেদ দেওয়ার, সেটাও যাগ-যজ্ঞ দরকার, পণ্ডিতমশাই ক’রে কম্মে দেবেন।’

ব্রেজঠাকরুনের কথা ফুটল এতক্ষণে, বললে, ‘কিন্তু সে তো নেই এখেনে।

‘সেই জন্যেই ছোটকত্তা পাঠালেন আমায়। আপনি শিষ্যিবাড়ি লোক পাঠিয়ে দিন। ওনার শরীল তেমন ভালো নয়, এই জন্যেই আটকে রয়েচেন তো। বললেন—নিজেই আসতেন পণ্ডিতমশায়ের সঙ্গে কথা কয়ে যেতে, ঐ জন্যেই আসতে পারলেন না।’

ব্রেজঠাকরুন বললেন—“সে আমি কি ব’সে আছি বাবা? তুমি তাঁকে বোল, লোক আমার অনেকক্ষণ বেরিয়ে গেচে। চারদিকে অনেক শিষ্যি তো, গুরু নিয়ে টানাটানি চলবে নিশ্চয়, তা আমি ছ’ছ’জন লোক পাঠিয়ে দিয়েচি, যেখেনে আচে ডেকে নিয়ে আসবে। তবে তাঁকে বোল, যেমন আজও রাত্তিরে কোন সময় এসে পড়তে পারে, তেমনি দূরে চলে গেলে দু’দিন দেরিও তো হতে পারে। অসুখটা ওনার খুব বেশি কি?’

উনি বললে—‘বুঝতেই পারচেন, নৈলে হাওয়া বদল করতে বলচে? তবে দুদিন কি চারদিনে কিছু যাবে-আসবে না, মন্দিরের গোড়াপত্তন ক’রে বেরুতেও তো দিন সাতেক লেগে যাবে। এলেই আপনি দেবেন পাঠিয়ে।’

আবার পায়ের ধুলো নিয়ে চলে গেল।

দুটো দিন যে আমাদের তিনজনের কি ক’রে কাটল ভগবানই জানেন। পাছে বাবাঠাকুর এসে পড়লে পাঠাতে একটু বিলম্ব হয়, সেই ভয়ে ব্রেজঠাকরুন বাইরে যাওয়া তো একেবারেই বন্ধ ক’রে দিলে। গঙ্গা দূরে থাকুন, ঘোষপুকুরেও নয়, খিড়কির ডোবাতেই দুটো ডুব দিয়ে বাড়ি এসে ঢুকত, আর কোথাও নয়, শুধু ঘর-বার করতে যা দরজা ডিঙোনো—তা দিনে-রেতে এমন বিশ-পঞ্চাশবার। খাওয়া-দাওয়াও ছেড়ে দেচে একরকম, মুখেও কোন কথা নেই, শুধু থেকে থেকে নিজ হতেই বাবাঠাকুরের ওপর ঝালটা যে এক একবার বেরিয়ে পড়চে—‘আসবে…. রোজগার করে খাবার মানুষ বড়!… একটা সোমত্ত মেয়ে ঘাড়ে, যার মান ইজ্জতের খেয়াল নেই!…আমিও আর দুটো দিন,—একটা ভালো লোককে কথা দিয়েচি, তারপর উঠোনে লাথি মেরে যাচ্চি চলে…’

দিদিমণির ভাবটা ঠিক বোঝা যায় না। আতালি-পাতালি করা তো ওনার কোন কালেই ছেল না, যেন চুপচাপ সব দেখে যাচ্ছে শুনে যাচ্চে। একবার আমি, বাবাঠাকুর না এলে কি হবে জিগ্যেস করতে, যেন গায়ে না মেখেই বললে— ‘না এলে, ইদিকে যা হবার তা তো দেখতেই পাচ্চিস-মাসিমা থাকবে না, আমিও নিজের পথ ঠিক ক’রে রেখেছি, বাকি থাকিস তুই আর তোর কৈলী—তা কি করবি তুই আর কৈলীই জানিস, ফুরিয়ে গেল ল্যাঠা।’

আর একবার বললে- ‘দেখিস, ঠিক ক্ষেপে যাবে মাসিমা-চাঁদে হাত বাড়াতে গেলে যা হয়। বড়মানুষ—সে ওনার সমিস্যে মিটুতে আসবে! পূবের সূয্যি পশ্চিমে উঠবে।’

আমি বললুম—‘না হয় একবার বলবে ওনাকে? যেন কেমন ধারা হয়ে রয়েছে।’

দিদিমণি হেসে উঠল, বললে—“কেন, বামন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়ালে কি হয় জানে না নাকি পোড়াকপালী? ঘোষালের কুপুত্তর য্যাখন ওর দিকে হাত বাড়িয়েছিল, স্বয়ম্বর হবে ব’লে, অমন শিক্ষাটা তাকে দিলে কি করে?’

দুটো দিন কেটে গেল, এর মধ্যে সবাই ফিরে এল, বাবাঠাকুরের কোন খোঁজই নেই। পরের দিনটা যে কি ক’রে কাটল দা’ঠাকুর, বুঝিয়ে বলতে পারি না আপনাকে। ব্রেজঠাকরুন অবিশ্যি সকালে উঠেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেল না, তবে ভাবগতিক দেখে মনে হোল যেন যে কোন সময় চলে যেতে পারে। বাবাঠাকুরের জন্যে সেই যে ঘর-বার করা সেটা একেবারেই ছেড়ে দিলে, দু’বার মনে হোল, যা নিজের আছে—কাপড়টা ঘটিটা, তালাটা—একটু গোছগাছ করে রাখচেও। খেলে না, একটু এদিক-ওদিক করে আর তক্তপোশে শুয়ে থাকে, কথাবার্তা একেবারে নেই মুখে। দিদিমণির মুখটা একেবারে কঠিন। খেতে বললে পাছে আরও চ’টে বেরিয়ে যায় বোধ হয় সেইজন্যে খেতে বললে না ওনাকে; নিজেও যা ভাতে ব’সল তাও বোধ হয় ঐজন্যেই, পেটে বোধ হয় একমুঠোও ভাত গেল না, শুধু মুখটা শক্ত ক’রে কাজে-অকাজে এখান-ওখান ক’রে কাটাতে লাগল—যেন সত্যিই ওর যা করবার তা ঠিক করে ফেলেচে—যদিই বা ব্রেজঠাকরুন বাড়ি ছেড়ে যায় চলে।

আমার অবস্থাটা বুঝতেই পাচ্চেন দা’ঠাকুর। ঠিক যে করেচে দিদিমণি সেটা কি?—সেই যে বলে মাস্টারনি হয়ে বেরিয়ে যাবে বাড়ি থেকে, তাই করবে, না, আপ্তহত্যেই, না, আরও কিছু ভেবে রেখেছে ঐরকম যা আমায় জানতে দেয়নি। এ-কথা ও-কথা ব’লে ওনার মনটা ঘোরাবার চেষ্টা করলুম ক’বার, যাদের কথা এনে ফেললে উনি হেসে ফেলেই তাদের কথাও ফেললুম এনে; মুখ ঘুরিয়ে নেয়। শেষে একবার বললেও—তুই সর স্বরূপ, সারাদিন গায়ে নেবড়ে নেবড়ে রয়েচিস, ভালো লাগে কখনও? আর মস্ত বড় পুণ্যি-কথা ঘোষালের পো কবে কি করেছিল–ছ’’আনি কবে শাড়ি পরেচে-তোর নিজের কাজ কর তো, যা দিকিন, কৈলীটা এখনও বাড়ি ফেরেনি।’

দু’ঘা মারে সেটা সয় দা’ঠাকুর। একে মনের অবস্থা ঐরকম তার ওপর এই বকুনি, তাও কখন না, ওনারই মনটা য্যাখন ফেরাতে চাচ্চি, এমন অপরুদ্ধ হয়ে পড়লুম, লজ্জায় যেন পা-ই তুলতে পারি না। বসেই ছিলুম দুজনে, দিদিমণি আর মুখ ঘোরায় না, আমি সেই সুযোগে আস্তে আস্তে উঠে বাইরে বেরিয়ে এলুম। আঘাতটা বড্ড লেগেচে। যদি কেঁদে ফেলতে পারি খানিকটা, মনটা হালকা হয়ে যায়; কিন্তু যে ধরনের ধমক, কেমন যেন একটু নজ্জা-নজ্জা করচে, তাইতেই অভিমানটা আরও গেল বেড়ে। বেশ বুঝতে পারলুম আমার মুখটাও যেন দিদিমণির মতন শক্ত হয়ে উঠেচে; ঠিক করলুম আমিও আপ্তহত্যে হব, দিদিমণির আগেই।’

কথাটাতেই আমি একটু চকিত হয়ে স্বরূপের দিকে চাইলুম। স্বরূপ একটু হেসে বললে- ‘আজ্ঞে না, করতে পেলুম আর কোথায়? পেলে কি আজ ব’সে আপনাকে সেই সব দুঃখের কাহিনী শোনাতে পাই?”

প্রশ্ন করলাম—‘কেউ দেখে ফেললে?’

‘দেখবে না কেন দা’ঠাকুর? আমি যদি ঘটা ক’রে দেখাতে চাই তো দেখবে না কেন? ঘোষপুকুরের ঘাটে মেয়ে-মদ্দর একঘাট লোক, গ্রীষ্মির সন্দে, গা ধুচ্চে। আপ্তহত্যে করবার তো জায়গা রয়েচে দা’ঠাকুর, পুকুরের অন্য দিকে নিরিবিলি ঝোপঝাড় দেখে, তা আমি যদি এখন তকতকে সানবাঁধানো ঘাট না হলে মরতে না চাই। খানিকক্ষণ ব’সে রইলুম। তা আমি মরব ব’লে তাড়াতাড়ি উঠে যেতে কার দায়টা পড়েচে বলুন না? ত্যাখন ঠিক করলুম তা হলে দত্তদের পুকুরটায় যাই। তাই যাচ্চি, বেশ ঘোর হয়ে এল। ত্যাখন একটু মনে হ’তে লাগল যাই না হয় দিদিমণির কাছে ফিরে। -বুঝলেন না?—বাড়ি থেকে ঘোষপুকুর আসতেই খানিকটা অভিমান কেটে গেচে, তারপর ঘাটে অতখানিটা বসা, তারপর আবার এই এতখানি পথ; তার ওপর আবার গা-ঢাকা হয়ে এসেচে, মরে গেলেই এক্ষুণি-এক্ষুণি ভূত হয়ে রাত কাটাবার ভাবনাটুকুও ঢুকে পড়েচে তো—দিদিমণির কথাটা আবার মনে ঠেলে উঠতে ফিরেই যাব কি না ভাবচি, এমন সময় পড়বি তো পড় একেবারে ছিরু ঘোষালের সামনা-সামনি।

সঙ্গে সেই সাতকড়ি পালের ছেলে জ’টে, যে নাকি ওর ঘোড়াটাকে ল্যাজ মোড়া দিয়ে ঠেলে আনছেল সেই যেদিন ছিরু ঘোষাল ব্রেজঠাকরুনের সঙ্গে স্বয়ম্বরা হ’তে এসে চেলাকাঠ পেটা খেয়ে গেল। এ তো আর সানবাঁধানো ঘাটে ব’সে আরাম ক’রে আপ্তহত্যে নয়, সব মনে আচে, ঠ্যাং দুটো ধরে রাস্তায় এক্ষুণি আছড়ে মারবে। পালাতেই যাচ্ছিলুম, তবে গাঢাকা অন্ধকারে একেবারে নাকি সামনাসামনি এসে পড়েছি, একটু হকচকিয়ে যেতেই জ’টে ধরে ফেললে। পিটপিট ক’রে চেয়ে দেখে সুদোলে—‘মণ্ডলের পো না? কোথায় চলেচিস?’

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল— ‘আপ্তহত্যে করতে।’

বুঝলেন না দা’ঠাকুর, আপ্তহত্যে করতে যাচ্ছে, তা এ কথাটা আর কে প্রকাশ করে বলে? তবে জাঁতিকলে চেপে ধরেচে, এবার তো আর রক্ষে নেই—তাই, ঐ বলে যদি রেহাই পাই অর্থাৎ কিনা, নিজেই তো মরতে যাচ্চি, তোমরা আর কষ্ট ক’রে থেঁতলে মারতে যাবে কেন? …বললুম আপ্তহত্যে করতে যাচ্ছি।’

চরোস আর গুলির নেশাটা আপনাদের একালে একরকম উঠে গেচে দা’ঠাকুর। ভালোই হয়েচে, বড্ড ছ্যাঁচড়া নেশা ছেল। একটা কথা মাথায় ঢুকলে যেমন চট করে বেরুতে চাইত না, তেমনি আবার যদি একটা কথা পিছলে বেরিয়ে গেল মাথা থেকে তো টপ করে যে ফিরিয়ে আনবেন সে উপায়টি ছেল না। সিদিন আবার গুরুবল, মাত্রাটা বেশি হয়েচে, আর সবে বোধ হয় বেরিয়েচে দুজনে আড্ডা থেকে। দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে একটু একটু ঢুলতে লাগল, জ’টে আমার হাতটা বজ্র আঁটুনিতে ধরে আচে, ছিরু ঘোষালের হাতে একটা সেকেলে বাসাই, এক একবার মুখে দিয়ে আস্তে আস্তে ধোঁয়া টানচে। শেষে ওই বললে—‘ভচায্যির সেই রাখালটা। একটু ধরে থাকবি তো জ’টে; একটা যেন শক্তরকম দরকার আচে ওকে নিয়ে, মনে করে দেখি।’

বললুম— ‘আমার যে উদিকে দেরি হয়ে যাবে।’

মানে, যদি ছেড়ে দেয় তাতে। জ’টে একটা কড়া ঝাঁকানি দিয়ে বললে—‘দিই আছাড়? শালার জন্যে বিষ্ণুদূত পুষ্পকরথ নিয়ে ঘড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আচে, দেরি হয়ে যাবে।”

ফাঁসির আসামীর মতন চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে আচি, ছিরুই সুদোলে –’আপ্তহত্যে করতে যাচ্ছিস?’

বললুম— ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘কেন?’

হঠাৎ একটা বুদ্ধি মাথায় যুগিয়ে গেল দা’ঠাকুর। ব্রেজঠাকরুন আমায় যে ট্যাকাটা দেছল, সেটা আমার কাপড়ের খুঁটেই বাঁধা রয়েচে। যা এক আধটা পয়সা থাকে কেড়েকুড়ে নেয় তো, যাতে আর খানাতল্লাসী না করে সেইজন্যে বললুম—‘দেনার দায়ে।’

ছিরুর যেন দেখলুম হঠাৎ একটু চমক ভাঙল, চোখে একটু চাড়া দিয়ে আমার দিকে চেয়ে বললে —‘কি বললি, আবার বল্ তো।’

বললুম—‘দেনার দায়ে আপ্তহত্যে করতে যাচ্ছি।’

ছিরু ঘুরে জ’টে পানের দিকে চাইলে, বললে—‘শালা মণ্ডলের পো, মস্ত বড় একটা কথা যেন মনে পড়িয়ে দেবে দেবে করচে; ধরে থাকিস।’

আমার দিকে চেয়ে বললে—‘কি বলছিলি আর একবার বল্ তো শুনি।’

আমার আবার বলতে ওর মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল, পকেট থেকে একটা পাইপয়সা বের করে আমার হাতে দিয়ে বললে— ‘নে সিকিটা ধর। আপ্তহত্যে যে করবি, খুব তাড়াতাড়ি আচে কি?’

এক্ষুণি জ’টের কাছে একটা ফাঁড়া গেল ঐ নিয়ে, তার ওপর দেখচি সিদিনের স্বয়ম্বরের কথাটা দুজনের মধ্যে কারুরই মনে নেই, মনটাও ভালো, বললুম—‘না, ঘণ্টাখানেক পরে করলেও চলবে, আপনার কাজ আচে কিছু?’

ছিরু জ’টের দিকে চেয়ে বললে—‘শালা মণ্ডলের পো খুব মনে করিয়ে দিয়েছে রে! নানা ধান্দার মধ্যে একেবারে ভুলে গেছলুম। বাবা-ব্যাটা ক’দিন হোল ব’লে দেছল ভচায্যিকে একবার তাগাদা দিতে-দেনার দায়ে বাবার কাছে টিকি বাঁধা তো। ওবিশ্যি ছিরে ভোলবার পাত্তর নয়—সিদিন যাচ্ছিলুম, আমার শ্বশুর হবার কথা ছেল, তা এদানি উল্ট গাইবার যোগাড় করচে কিনা—যাচ্ছিলুম একটা কড়া তাগাদা দিয়ে বাপধনকে একটু চাঙ্গা ক’রে আসতে, তা পথে কার কাছে যেন শুনলুম গা-ঢাকা দিয়েচে।’

আমি বললুম—‘গা-ঢাকা নয়, শিষ্যিবাড়ি।’

বললে—ঐ হোল রে শালা, যার নাম চালভাজা তার নাম মুড়ি।…তা শোন্, দিব্যি মনে করিয়ে দেচিস? ভচাজ ফিরেচে?’

এসব কথার উত্তুর তো আমি ভেবে দিতুম না দা’ঠাকুর, ভেবে দিতে গেলে চলতও না; বললুম—‘আজ্ঞে হ্যাঁ, পরশু ফিরেছে, এখন তো বাড়িতেই রয়েচে।’

বুঝলেন না দা’ঠাকুর? বাড়িতে সবাই ঝিমিয়ে রয়েচে, নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারলে, আমার আক্রোশটাও মেটে, ইদিকে বাবাঠাকুরের ওপর রাগটা ব্রেজঠাকরুন যদি ঘোষালের পো’র গায়ে খানিকটা মিটিয়ে নিতে পারে তো অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে বাড়ির হাওয়াটাও একটু বদলায়। বললুম—তিনি তো বাড়িতেই রয়েচে পরশু থেকে।’

বললে—চল যাই তাহলে।’

ঘুরে তিনজনেই পা বাড়িয়েছি, জ’টে বসলে—‘ছিরে, একটু দাঁড়িয়ে যা তো, কেমন একটা খটকা লেগে গেল তোর ঐ কথায়,—বললি নে, ভচাজ তো শ্বশুর হতে যাচ্ছেল? ঐ বাড়িতেই সেই স্বয়ম্বরটাও ছেল না? সেই তোকে যে রাজবেশ করে নিয়ে গেলুম, নটবরের হেটুরে ঘোড়াটা নিয়ে…

য্যাতক্ষণ ভুলে ছিল, ছিল; একবার মনে পড়ে গেলে আর দ্বিতীয়বার বলতে হয় সে কথা? যেন আপনা হ’তেই ছিরু ঘোষালের হাতটা পিঠের ওপর গিয়ে পড়ল। চ্যালাকাঠের বাড়ি তো, তায় আবার ব্রেজঠাকরুনের হাতের, পিঠে হাতটা বুলুতে বুলুতে আমার দিকে চেয়ে সুদোলে—“সে আচে নাকি? সেই স্বয়ম্বর-কন্যের সহচরী না কে বললি না সিদিন?”

বললুম—‘না, সে একটু তিরিক্ষি মেজাজের আর পাগলাটে ছেল তো, কন্যে তাকে বরখাস্ত করে দিলে সিদিনই, স্বয়ম্বরটা পণ্ড করে দিলে কিনা।’

সুদোলে—‘আর কন্যে?”

বললুম—‘তিনিও এখান নেই এখন; আবার তোড়জোড় ক’রে আসবে।’

বললে—“এলেই খবর দিবি। চল্।’

একটু এগিয়েচি, সামনেই হাত কয়েক দূরে ব্রেজঠাকরুন। আস্তে চলা কাকে বলে জানত না তো, দেখতে দেখতে আমাদের সামনে এসে আমায় দেখে থমকে দাঁড়াল, জিগ্যেস করলে—‘স্বরূপে না? এখেনে কি করচিস? এরা কারা?’

আজ্ঞে সহচরীর সেই বাজখেয়ে গলা তো ভোলবার নয়, আর চেহারা তো যে দেখবে তার সাতপুরুষ পজ্জন্ত মনে থাকবে। আচমকা; কি জবাব দোব ঠিক করতে না পেরে ওদের মুখের দিকে চাইতে মনে হোল যেন দুজনের আদ্দেক নেশা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেচে, আবার এনারই আলোচনা হচ্ছিল তো।

কপালজোর ছিল ওদের, কিছু হোল না কিন্তু। ব্রেজঠাকরুন সিদিন যে দেখেছেন তা একেবারে অন্য বেশে, তায় গা-ঢাকাও হয়ে এসেচে, চিনতে পারলে না। আরও একটা কথা ছিল যা পরে টের পেলুম, ব্রেজঠাকরুন ছিল বড় অন্যমনস্ক। আর একবার ওদের দিকে চেয়ে নিয়ে আমায় বললে—“আয় ইদিকে, একটা কাজ আচে।’

এগিয়েই নিয়ে গেল আমায়। একটু গিয়েই একবার ঘুরে দেখলুম, ওরা দুজনে অদিশ্য হয়ে গেচে।

ব্রেজঠাকরুন বললে—‘ওবিশ্যি একলা যেতে আর দোষ নেই, তবু তোকে যখন পেয়ে গেচি, চল্ না হয়। একটা বেটাছেলে সঙ্গে থাকা ভালো। যাচ্চি চৌধুরীবাড়ি।’

জিগ্যেস করলুম—“দিদিমণি?’

‘তোর বাপকে ডেকে বসিয়ে এসেচি। পা চালিয়ে আয়।’

আর কিছু কথা হোল না, তবে বেশি দূর গেলুমও না তো। এই ধরুন রসিকয়েক গেচি,… একটা মোড় ঘুরতেই মনে হোল সামনে খানিকটা তফাতে একটা যেন বড় ছায়া, তারপরেই টের পেলুম চৌধুরীমশাই ঘোড়ায় চ’ড়ে এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই আমাদের চিনতে পারলে, ব্রেজঠাকরুনকে সুদোলে— ‘আপনারা যাচ্চেন কোথায়?’

উনি বললে—তোমার ওখানেই তো। তুমি কোথায় যাচ্চ? শুনলুম খুব নাকি অসুখ, তাই মনে করলুম না হয় দেখে আমি একবার।’

চৌধুরীমশাই ঘোড়া থেকে নেমে ভুঁয়ে দাঁড়াল। অসুখের কথা শুনে আমার মনটাও তো.. খারাপ হয়ে ছেল, কিন্তু দেখলুম তেমন কিছু নয় তো। চৌধুরীমশাই একটু আমতা আমতা করে বললে—‘অসুখ—তা—হ্যাঁ তাই জন্যেই মনে করলুম পণ্ডিতমশায় এয়েচেন কিনা নিজে গিয়ে একবার না হয় দেখে আসি, এসে থাকলে অমনি কথাবার্তাও ঠিক ক’রে আসব মন্দিরটা নিয়ে। ডাক্তার হাওয়া বদলের কথা বলচে—ঠিক হ’লে দু’তিনদিনের মধ্যে বেরিয়ে পড়ি। না এসে থাকেন, কালই; তারপর সেখান থেকে ফিরে না হয় মন্দিরের কথা ঠিক হবে। তা আসেননি আজও মনে হচ্চে।

ব্রেজঠাকরুন বললেন— ‘না, আসেননি এখনও।’

‘তাহলে আমি এখন ফিরি! চ’লে যাচ্চি পরশু পজ্জন্ত। আমার কর্মচারীদের বলা থাকবে, উনি এলেই আমায় খবর দেবে, চলে আসব না হয় দুটো দিনের জন্যে; এই ফরেশডাঙাতেই রয়েচি। ইদিকে আপনাদের খবর ভালো তো?’—বলে ঘোড়ায় উঠতে যাচ্ছেল, ব্রেজঠাকরুন চুপ করেই ছেল, বললে—‘দাঁড়াও বাবা একটু; একটা বড্ড দরকারী কথা আচে তোমার সঙ্গে।’

উনি রেকাবে পা দিয়েছিল, নামিয়ে নিয়ে বললে —‘বলুন।’

‘এখেনে হবে না।’

“তবে? আমার ওখেনে সে তো অনেক দূর।’

‘দূর গেরাহ্যি করিনে, বিপদের মুখে দূর আর কাছে। যাচ্ছিলুমও তো। তবে তুমি য্যাখন এয়েচই এতটা ত্যাখন না হয়…কি করবে? পোড়ো মন্দিরের পেছনের চাতালটায় হলে মন্দ হয় না। যাবে? তাহলে আমার ফিরতে রাত হবার ভয় থাকে না। মেয়েটা একরকম একলাই রয়েচে তো। ওখানটা একেবারে নিজ্জনও।’

পোড়ো মন্দিরের সেই কাহিনী তো? মনে হোল চৌধুরীমশাই একটু যেন হাসলে, বললে—তাই ভালো। তাহলে আমি না হয় এগিয়ে যাই, আপনারা আসুন।’

ঠিক বলতে পারিনে দা’ঠাকুর, হয়তো যা বলবে একটা ভেবে বেরিয়েছেল ব্রেজঠাকরুন, আমার সামনেও বলত; কিন্তু ঐ যে উনি নিজেই এগিয়ে আসছেল, এইতে যেন আরও কিছু একটা ঠিক করে ফেললে। তাই মনে হয় তো, কেননা য্যাখন পৌঁছুলুম মন্দিরের কাছে, আমায় বললে, তুই না হয় বাড়ি চলে যা স্বরূপে, মেয়েটা একরকম একলা রয়েচে। আমি কথাটুকু শেষ ক’রেই আসচি।’

চৌধুরীমশাই ঘোড়াসুদ্যু মন্দিরের পেছন দিকটায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেল। আমায় বাড়ি পাঠিয়ে উনিও ঘুরে ঐদিকে চলে গেল। জায়গাটা একেবারে নিজ্জন, নিষুতি, বেশ অন্ধকারও হয়ে এসেচে; উনি চলে যেতে আমি একটু চুপ ক’রে দাঁড়িয়ে রইলুম; ছেলেমানুষের মন তো, ভাবছি বাড়িই যাব, না, শুনি গিয়ে একটু কি কথা হচ্ছে।

হ্যাঁ-না, হ্যাঁ-না করে একটু দেরি হয়ে গেল। য্যাতক্ষণে মন্দিরের মধ্যে সেঁদিয়ে একটা ফাটলের মুখে কান দিয়ে দাঁড়িয়েচি ত্যাতক্ষণে মুখপাতের খানিকটে কথা হয়ে গেছে; আমি শুনলুম চৌধুরীমশাই জিগ্যেস করলে— ‘সত্যি নাকি? তা হঠাৎ এরকম করতে গেলেন কেন?’

ব্রেজঠাকরুন বললে— ‘হঠাৎ কি করে বাবা! যার ঘাড়ে একটা সোমত্ত মেয়ে। হঠাৎ নয়, অনেকদিন থেকেই ধিকি ধিকি জ্বলছেল আগুন। তা সে আগুন নিবুবে এমন ক্ষ্যামতা তো নেই, এখন বেড়ে উঠে সংসারটা এই ছারেখারে দিচ্চে।’

তারপর উনি এয়েচে পজ্জন্ত রাজু ঘোষাল আর তার ছেলেকে নিয়ে যা যা ব্যাপার—ঋণের ওপর ঋণ, বাড়ির এক একখানি ক’রে ইট বেচলেও যা পরিশোধ হবার নয় – পরে মতলবটা টের পাওয়া- ঐ গেঁজেল, গুলিখোর ছেলের হাতে মেয়েটিকে তুলে দিতে হবে- বাবাঠাকুর চ’লে যেতে রাজু ঘোষালের বাড়ি বয়ে আসা, ব্রেজঠাকরুনের সঙ্গে কথাকাটাকাটি করে শাসিয়ে যাওয়া- তারপর বাবাঠাকুরের সঙ্গে মা-ঠাকরুনের বাচ্ছরিকের পর ওনার কথাকাটাকাটি, যাতে নাকি বাবাঠাকুর পষ্টই বললে ঐখেনেই মেয়ের বিয়ে দেবে—তার পরদিন সকালেই ওনার অন্তদ্ধান- মানে, ব্রেজঠাকরুন উদিককার য্যাতটা জানে সব একটি একটি করে ব’লে, বোধ হয় ছিরু ঘোষাল পাত্তোরটি কেমন বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে স্বয়ম্বরের কাহিনীটা ও আগাগোড়া বর্ণনা ক’রে বললে—এই হচ্ছে কাহিনী বাবা, মন্দির তুলে দেবে, তা পাবে কোথায় তাকে? সে এখন মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল হয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্চে।

একটু চুপচাপ গেল। চৌধুরীমশাই ফাটলটার ঠিক সামনাসামনি দাঁড়িয়ে, অন্ধকার হলেও চোখ সয়েচে তো খানিকটা, আমি ওনার মুখের আদলটা দেখতে পাচ্চি, মুখটা উঁচু ক’রে থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর সেই ভাবেই থেকে বললে—‘পণ্ডিতমশাই তো কিছুই বলেন নি আমায় এ-সবের, ঘুণাক্ষরেও কিছু জানি না।’

ব্রেজঠাকরুন বললে—‘বলবার মানুষ বড়।… মস্তবড় মানী লোক যে!’

আমি অন্ধকারে চোখ ঠেলে চেয়ে আচি, যেন একটুও কিছু বাদ না যায়। মনে হোল চৌধুরীমশাইয়ের মুখে একটু যেন হাসি ফুটল, তারপর সেই হাসিই বেড়ে গিয়ে মুখটা একটু নামিয়ে ওনার দিকে চেয়ে বললে— ‘আপনিও তো কৈ বলেন নি কিছু, একটু আগে পজ্জন্ত নুকিয়েই রেখেছিলেন তো।’

ব্রেজঠাকরুনকে আমি দেখতে পাচ্ছি না, তবে সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিতে না পারায় মনে হোল যেন অপরুদ্ধ হয়ে গেচে। আবার রাগী মানুষ, কিভাবে নেয় সেই ভয়ে আমি নিঃশ্বেস বন্ধ করে ওপিক্ষ্যে করচি, বললে—‘বাবা, অনেক পাপে আমার নিজের আজ এই দুদ্দশা, তার ওপর আবার ভগবান বুড়ো বয়েসে এই এক বোঝা ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। মিছে কথা বলব না, একে ঘরের কেচ্ছা কেউ বের করতে চায় না সহজে, তারপরে আবার ‘

কথাটা যেন আটকে গিয়ে চুপ ক’রে গেল। চৌধুরীমশাই বললে—‘তারপরে কি? বলুন।’

না—‘যার ঘরে সোমত্ত মেয়ে বাবা, অথচ অসহায়, বেপর্দা, চারিদিকেই শত্রু—তার চারিদিকেই ভয়। গাঁয়ের রাজা—তার বয়েস, তার অর্থবল, নুকুলে চলবে কেন বাবা?—তোমায় এই ভালো ক’রে না-জানা না-চেনা পজ্জন্ত আমার মনের অবস্থাটা কি রকম ছেল তা তো সিদিনই বুঝতে পেরেচ! আজ না হয় বুঝচি এ-গাঁয়ে তুমিই আমাদের একমাত্র সহায়সম্বল- বিপদ বুঝে অসুখ শরীলেও ঘোড়া ছুটিয়ে…’

‘থাক ওসব—বলে চৌধুরীমশাই সেই একটু হেসে কথাটা চাপা দিলে! বললে—“কি করতে পারি আপনাদের জন্যে এ অবস্থায় বলুন?”

‘সবই পার। এত সমিস্যে, কোন্টার নাম করি?”

চৌধুরীমশাই বললে—“কোনটাই পারি না। বড় দুটোর কথাই ধরা যাক্, ঋণ—তা পণ্ডিত মশাই না চাইলে তো আমি গা-জুরি হয়ে তার কোন ব্যবস্থা করতে পারি না। রাজীব ঘোষালও তো না নিতে পারেন আমার কাছে, বিশেষ করে য্যাখন একটা কু-উদ্দেশ্য রয়েছে অমন। তারপর…’

যেন একটু আটকে যেতেই ব্রেজঠাকরুন এগিয়ে দিলে—হ্যাঁ, মেয়ের বিয়ে।’

চৌধুরীমশাই বললে—‘তাতে তো আমার দখল দেওয়া আরও চলে না-বাপ রাজী না হলে। ধরুন আমি করলুম একটা ব্যবস্থা—একটা পাত্তোর খুঁজে পেতে ঠিক করা শক্ত নয় এমন, তারপর বাপ এসে…’

ব্রেজঠাকরুনের গলাটা খনখনে হয়ে উঠল, বললে—‘বাপ আর কে? এখন আমি রয়েচি।’

চৌধুরীমশাই একটু হেসে বললে—‘আপনি রাগের মাথায় ভেবে কথা বলচেন না।’

‘বেশ আমায় বাদই দাও, কিন্তু মেয়ে তো সাবালক, তার বয়স আঠার পেরিয়ে গেছে।’

মুখটা আমি বেশ দেখতে পাচ্চি, হাসিটা লেগেই রয়েছে, চৌধুরীমশাই বললে—‘জেনেচেন মেয়ের মত?’

তারপরে হাসিটা আরও একটু বাড়িয়ে বললে—‘মেয়ে একদিকে, বাপ একদিকে?”

ব্রেজঠাকরুন বললে—‘দরকার পড়লে হ’তে হবে বৈকি বাবা। সোমত্ত মেয়ে, তার বুদ্ধিসুদ্ধি হয়েচে; বাপের মাথার য্যাখন ঐ রকম অবস্থা ত্যাখন চিরকাল আইবুড়ো থেকে নিজের জীবনের ওপর একটা বিপদ নিয়ে আসতে পারে না, যদি আর ঐরকম একটা অপদার্থ গেঁজেলের হাতে প’ড়ে নিজের জীবন আখেরের জন্যে নষ্ট করতে না চায় তাতেও কিছু বলবার নেই কারুর। কথাটা কাটতে পার তুমি?”

চৌধুরীমশাই আবার শুধু একটু হাসলে। ব্রেজঠাকরুন জোর দিয়ে বললে- —“তুমি হচ্চ বাবা গাঁয়ের রাজা, এইরকম একটা পরিবার—অর্থই নেই কিন্তু কুলেশীলে তো গাঁয়ের কারুর চেয়ে ছোট নয়—তা নিঃসহায় হয়ে ভেসে যেতে বসেচে, তোমার কাছে না দাঁড়িয়ে কার কাছে দাঁড়াব বাবা? তুমি যে-ভাবে এসে উদ্ধার করতে চাও করো—ধৰ্ম্ম রয়েচে, সমাজ রয়েচে, তুমি কারুরই কাছে দুষী হবে না।—তার তো মতিস্থির নেই, তা ভেন্ন সে আর ফিরবে কিনা তারও তো কিছু ঠিক নেই, হয়তো চিরতরেই বিবাগী হয়ে গেচে—শুধু তার মুখ চেয়ে যদি ভেসে যেতে দাও একটা পরিবারকে—দেশের রাজা তুমি—সেইটেই কি তোমার ধম্ম হবে? না বাবা, তুমি কথা দাও; কার কাছে আর দাঁড়াব? একটা সোমত্ত মেয়ে, সে যদি কোন উপায় না দেখে মনের দুঃখে…’

হঠাৎ গলাটা ওনার ধ’রে এল, এগিয়ে এসে খপ করে চৌধুরীমশাইয়ের হাতটা ধরে ফেললে।

চৌধুরীমশাই একটু ওপর দিকে মুখটা তুলে থির হয়ে শুনছেল। মুখের সে হাসি-হাসি ভাবটা চলে গেচে। ব্রেজঠাকরুন হাতটা চেপে ধরবার পরও সেই ভাবে একটু দাঁড়িয়ে রইল, তারপর মুখটা ওনার দিকে নামিয়ে বললে—‘বেশ, ভেবে দেখি।’

‘আর ভেবে দেখাদেখি নয়, তোমায় এ-দায় তুলে নিতেই হবে মাথায়।’

‘একেবারে কি ক’রে দিই কথা? তবে আমি দেখচি কতদূর কি করা যায়। রাজীব ঘোষাল উনি আবার আমার দলের লোক নন, তবু চেষ্টা করচি ওঁর মন বোঝবার। ইদিকে আপনি যেমন বলছেন—বেশ, আপনাদের মেয়ে যদি সাবালক হয়ে থাকে তবে মতটা জেনে রাখুন। যদি পাই পাত্র—যেতেও পারে পাওয়া তো—তাহলে দরকার হতে পারে তার মত।’

ব্রেজঠাকরুন যেন কেতাত্ত হয়ে গেচে, চোখদুটো মুছে বললে— ‘তোমার কাছ থেকে কবে জানতে পারব বাবা, তাহলে?’

না, ‘আমি কালই যাচ্চি ফরেশডাঙা, সেখান থেকেই সব খবর নোব। গোপনেই নোব, আপনার সেদিক দিয়ে চিত্তে নেই। তারপর একদিন না হয় আসব’খন। খবর পাবেন। আর এর মধ্যে যদি কোন দরকার হয়—বিপদের মধ্যেই তো রয়েচেন…’

‘হ্যাঁ বাবা, বড্ড বিপদ আমাদের, যদি হঠাৎই তেমন দরকার হয়?’

একটু ভাবলে উনি, তারপর জিগ্যেস করলে- ‘চিঠি…কেউ লিখতে পারে? ওবিশ্যি বাইরের কাউকে দিয়ে লেখাতে গেলে…এমন কথাও তো থাকতে পারে কেউ না জানলেই ভালো।’

‘কেন, নেত্যই নিকে দেবে বাবা।…

না,’নেতা কে?’

‘ঐ যে আমাদের মেয়ে—নেত্যকালী—বাপ নেকাপড়া শেকাতে তো কসুর করেনি-অত নেকাপড়া বোধ হয় ভালোও নয়—আমাদের গরিবের ঘরের কথা বলচি, বড় মানুষের ঘরে তো সবই মানায়।’

চৌধুরীমশাই শুনতে শুনতে যেন হঠাৎ ব’লে উঠল—তা বেশ, তা হলে ঐ কথাই রইল। খবর দেবেন আমায়। দেখা করব—আমার বাড়িতে আসেন তো পালকি পাঠিয়ে দিই। যদি মনে করেন আপনাদের মেয়ে একলা থাকবে—বেশি দূরে যাওয়া ঠিক নয় তো এই মন্দিরেই এইরকম সন্ধ্যের পর দেখা করব। এখন যাই তাহলে, কি বলেন? আপনাদের মেয়ের মতের কথা যা বলছিলেন—নিয়ে রাখবেন- পাত্তোর-টাত্তোর সব ঠিক করে আবার ফ্যাসাদে না পড়ি। গাঁয়ের অবস্থা তো জানেনই

আমি কথাটা শুনতে শুনতে মন্দির ছেড়ে বাড়ির দিকে ছুটলুম—কে জানে, যদি দুজনের মধ্যে কারুর নজরে পড়ে যাই।

দিদিমণি ঘরে কি করতে করতে দাওয়ায় বাবার সঙ্গে গল্প করছেল, আমি সোজা গোয়ালঘরে গিয়ে কৈলীর জন্যে জাবনা মাখতে লাগলুম। বুকটা ধড়ফড় করচে, অনেক কথা শুনলুম—আর ভালো ভালো কথা সব, কখন বাবা যাবে, দিদিমণিকে একলা পাব, সব কথা বলব। আর, বলবই বা কি ভাবে?—উদিকে চৌধুরীমশাইয়ের ছায়া মাড়ানো তো মানা—এই সব নিয়ে তোলপাড় করচি মনে মনে আর জাবনা মাখচি। ইদিকে ব্রেজঠাকরুনের দেখা নেই—পাঁচ মিনিট গেল, মনে হোল যেন দশ মিনিট ব’য়ে গেল, ত্যাখন পজ্জন্ত না আসতে বুঝলুম নিগ্‌্যাৎ আরও সব কথা হচ্চে। সদর দিয়ে গেলে বাবা কিম্বা দিদিমণির নজরে পড়ে যেতে পারি, আমি খিড়কি দিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে ছুটলুম। বড় রাস্তায় প’ড়ে মন্দিরের দিকে ঘুরব, দেখি তেমাথা ছেড়ে একটু আগেই চৌধুরীমশাই ঘোড়ায় চড়ে আস্তে আস্তে চলেচে। আমি ছুটে গিয়ে খানিক তফাতেই পেছন থেকে ডাকলুম— ‘আজ্ঞে আমি! এই যে, পণ্ডিতমশায়ের নফর।’

উনি রাশ টেনে ঘুরে চাইলে। কাছে হ’তে জিজ্ঞেস করলে—‘হঠাৎ তুই কোথা থেকে?’

হাঁপাচ্চি। বললুম—‘আজ্ঞে, আপনি যে ব্রেজঠাকরুনকে বললে না?—মেয়ের মতটা জেনে রাখতে, তা আমি জানি ওনার মত, আমায় বলেছেল।’

বললে—‘সত্যি নাকি? তা শুনচি; কিন্তু তার আগে বল দিকিন তুই টের পেলি কি ক’রে ওনাকে কি বললুম, না বললুম? তুই তো ছিলি নে।’

এক এক সময় এরকমও হয়ে যেত তো, ঝোঁকের মাথায় আগুপিছু না ভেবেই একটা কথা ব’লে ফেলতুম। বেশ একটু ঘাবড়েই গেলুম, কিন্তু যুগিয়েও যেত তো একরকম করে, বললুম—‘মন্দিরে প্রেণাম করতে গেছলুম কিনা। ভাঙা মন্দির তো, শুনব না শুনব না ক’রেও খানিকটে কানে ঢুকে গেল।

হাসার চেয়ে হাসিটুকু চাপলেই বলা ঠিক। বললে—তাহলে তোর আর দোষ কি? কিন্তু হঠাৎ ঠাকুর প্রেণাম করতে গেছলি যে ওসময়?’

বললুম—যাই তো রোজ।’

না,—‘কেন?’

‘দিদিমণির বিয়ের জন্যে… ভালো জায়গায়।’

না,–‘মন্দিরে তো ঠাকুর নেই। তাহলে বিয়েটা কিরকম হবে? বর নেই বিয়ে হয়ে গেল? যেমন সেই শুনি মহীন চৌধুরীর মেয়ের বিয়েতে হয়েছেল?’

বেশ বড় ক’রেই হেসে উঠল। বললে ‘বেশ, তোর দিদিমণির মতটাই শুনি আগে। তোকে বলেছেল?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, বলেছেল এক ঐ ঘোষালমশাইয়ের ছেলে ছাড়া পৃথিবীতে সবাইকে বিয়ে করবে। আরও বলেছেল—বিয়ে না হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বেম্মোজ্ঞানী জেনানাদের মতন মেয়ে-ইস্কুলে মাস্টারনি হবে—কিম্বা ঘরের মেয়েকেই পড়াবে। আপনি তো ব্রেজঠাকরুনকে বলছিলে। তা এ-ব্যবস্থাও করতে পারো।”

মুখের দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে শুনছেল, বললে—তা আমার তো মেয়ে-স্কুলও নেই; নিজেও মেয়ে নয় আমি যে তোর দিদিমণিকে ডেকে তার কাছে পড়ব। আর কিছু বলছিল?’

জো বুঝে বেশ ভালো কথাই মনে পড়ে গেল দা’ঠাকুর, বললুম—‘আর হ্যাঁ, একটা কথা—দিদিমণি আপনাদের পার্টিতেই।’

না,—‘সত্যি নাকি। কি রকম?”

বললুম—‘উনি বিধবা বিয়েই বেশি পছন্দ করে যে। দুঃখ করে বলছেল—তা একবার সাদামাটা একটা বিয়ে হয়ে গিয়ে সোয়ামীর একটা ভালোমন্দ না হলে তো বিধবা বিয়ে হবার জো নেই, তাই…’

—আজ্ঞে, শেষ করতে দেয় কখনও? এমন ডুকরে ঘাড় উল্টে হেসে উঠল যে বুঝি ঘোড়া থেকে যায় পড়ে। সেই নিজ্জন জায়গায় থামে আর উল্টে হেসে হেসে ওঠে, তারপর কতকটা সামলালে, বললে—‘তা যা, বলিস-দুঃখু করতে হবে না, দুরকমেরই বরের ব্যবস্তা ক’রে রাখব আমি। যা এখন।

আস্তে আস্তেই যাচ্ছেল, ঘোড়াটা কদম চালে চালিয়ে বেরিয়ে গেল।

আজ যেন রবিবার, কাল নয়, পরশুও নয়, তরশু বুধবার বাবাঠাকুর এসে উপস্থিত।