কাঞ্চন-মূল্য – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

কাঞ্চন-মূল্য – ৫

এই ক’রে ও সমিস্যেটে একরকম মিটল দা’ঠাকুর। হ্যাঁ, বাপের বেটি ছেল বটে দিদিমণি—কেমন না বাড়ি ফেরো দেখি; যেমন তুমি বেম্মদত্তি তেমনি তোমার পেত্নী যোগাড় করে দিচ্চি দাঁড়াও। অবিশ্যি পেত্নীর ভয়েই যে ফিরে এল বাবাঠাকুর তা নয়, তবে খ্যাপাটে মানুষ, যদিই আপ্তহত্যে হয়ে যায় তো একটা কেলেঙ্কারি তো, আর ত্যাখন পুলিশ-রোজাও তো বেম্মদত্তিকে জোড়া-বকুলগাছ থেকে নামাবেই, আর তো গা-ঢাকা দে চলবে না; শুনতে দেরি, হন্তদন্ত হয়ে ছুট্টে এল বাবাঠাকুর। মরা পেত্নীর চেয়ে জ্যান্ত পেত্নী যে আরও কি যে বলে ইয়ে দা’ঠাকুর।

তবে সমিস্যে যা মিটল তা ঐ পজ্জন্তই, মানে, বাড়ির কত্তা বাড়ি ফিরে এল। ইদিকে সংসার কিন্তু দিনদিনই অচল হয়ে উঠচে। অনেকগুনো কারণ তো ছেলই উদিকে, তার উপর ব্রেজঠাকরুন আসতে আরও বেড়েই গেল। আয়ের পথ একেবারেই গেল বন্ধ হয়ে। এগুতে আপনাকে বলেচি, আয়ের দিকে ওনার নজর ছেলই কম; পেটে বিদ্যে না থাক, হাঁকডাকের জোরে রিদয় ভচায্যি উদিকটা একচেটে ক’রে নিয়েছিল গাঁয়ের মধ্যে। এরপর যখন সধবা-বিধবার হ্যাঙ্গাম উঠল, ঠাকুরমশাই গয়ারামের বোনঝির বিধবা-বিয়ে দিলে, ত্যাখন থেকেই ওনার কপাল আরও ভাঙল। তারপর ব্রেজঠাকরুণ উপস্থিত হতে য্যাখন রটে গেল ঠাকুরমশাই নিজেই আবার শালীকে বিধবা-বিবাহ করতে যাচ্চেন, ত্যাখন যে-ক’টা ঘর যজমান টিমটিম করছেল সে-কটাও গেল হাতছাড়া হয়ে। বলবেন, কেন, বিধবা-পার্টিতেও তো লোক ছেল। আজ্ঞে, তা ছেল বৈকি,…তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে তো, বিধবা-পাটি বলতে তো বেটাছেলেরাই শুধু, সিদিক দিয়ে তো আবার ঘরেই মধ্যেই মেয়ে-পুরুষে দলাদলি- মেয়েরা সধবাই হোক আর বিধবাই হোক, বিধবা-পার্টিতে যেতে পারে না, ইদিকে পুজো পান বলতে যা কিছু সব ওদেরই হাতে, কাজেই ওনার পসার একেবারে গেল নষ্ট হয়ে। এর পরও দু’এক ঘর বোধ হয় টেঁকে যেত দা’ঠাকুর, আবার সব রকম মানুষ আচে তো—চুলোয় যাক ওদের সধবা- বিধবা, মন্তর তো বিধবা নয়, একথা বলবার নোকও ছেল-আজ্ঞে- স্ত্রীলোকই—মসনে গাঁটা তো এতটুকু নয়, তা ব্রেজঠাকরুনের আবির্ভাব হ’তে সে-ঘরগুনোও বেরিয়ে গেল হাত থেকে, বুঝলেন না কথাটা? বাবাঠাকুর থাকলে হ্যালাফ্যালা ক’রে যা হয় একটু নৈবিদ্যি সাজিয়ে পুজোটা সারিয়ে নিত সবাই, দুটো পয়সা দক্ষিণে, তা দিলে বা না দিলে, —তা এই নিয়ে যদি ঐ পাটনেয়ে কুঁদুলি ঝগড়া করতে আসে কোমর বেঁধে তো কে তার মহড়া নিতে যায় বলুন?

এর ওপর আবার ক’দিন একটু আয়ের জন্যে শিষ্যিবাড়ি ঘোরাঘুরি করতে হোল উদিকে, তারপর আবার এই বেম্মদত্তির পালা; যখন ফিরল বাবাঠাকুর তখন দেখে রোজগারের আসর একেবারে ফরসা।

আয় নেই, ইদিকে খেতে দুটির জায়গায় তিনটি লোক, তায় বামুনের মেয়ে, পাপমুখে বলতে নেই ব্রেজঠাকরুন একাই বেশি না হোক, কম ক’রে ধরলেও তিনজন তো বটেই, দুশ্চিন্তের ব্যাপার হয়ে উঠল দিন দিন। সম্বলের মধ্যে ঐ দশটি টাকা যা ঠাকুরমশাই আমার হাতে দেছল, তা তার মধ্যে ছেরাদ্দর পাঁচটি বোধ হয় কর্জই—কোন শিষ্যিবাড়ি থেকে—এই অভাবের টানে হু-হু ক’রে শেষ হয়ে আসতে লাগল।

তবু, ধন্যি মেয়ে দিদিমণি, টেনেবুনে, মানিয়ে-সানিয়ে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেল, সেই কথায় কথায় হাসি, সেই ঠাট্টা; বাবা, মাসি, রাজু ঘোষাল, ছিরু—যাকেই পেলে তাকে নিয়ে। ওবিশ্যি কতদিন আর এ-ভাবে চালাতে পারত ভগবানই জানেন, তবে হঠাৎ একদিন একটা ব্যাপার হয়ে ভেতরকার গলদ সব প্রেকাশ হয়ে পড়ল। সে দিনটার কথা বেশ মনে আছে—যায় না এক একটা দিন যেন দাগ কেটে মনের মধ্যে ব’সে? সেইরকম একটা দিন! দিদিমণি আমায় ক’দিন থেকেই বলছেল– তোকে একটা কথা বলব স্বরূপ, কিন্তু বলা আর ওর হয়ে উঠছেল না। সে দিনটা ছেল বাদুলে দিন, মেঘটা সকাল থেকেই নেগে ছিল, তবে বিষ্টি যা হচ্ছেল তা ছেড়ে ছেড়ে। সমস্ত দিন গোরুটাকে বার করা হয়নি, একটা ধরনের মাথায় কাজ থেকেই খানিকটা চরিয়ে নে এসে আমি গোয়ালে তুলচি বিকেল বেলায়, দিদিমণি বললে—‘তুই আজ আর বাড়ি যাবি স্বরূপ? নাই বা গেলি।’

বললুম— ‘কেন গা? দিব্যি তো ধরেচে আকাশটা, কৈলীকে বেঁধে দিয়ে যাই না চলে।’

বললে—‘আকাশটা ধ’রেচে ব’লেই বলচি। কাজ নেই গিয়ে। তোকে একটু বাইরে যেতে

একটু কি যেন ইশারা করলে, তা তেমন বুঝতে পারলুম না, কৈলীকে নিয়ে গোয়ালে চলে গেলুম।

নাদায় জাবনাটা মাখচি, গোয়াল থেকে উঠোনটা দেখা যায়। এই দিকেই আচি চেয়ে, এমন সময় সদর দরজা দিয়ে বাবাঠাকুর হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকল, একবার চারিদিকে চেয়ে নিয়ে ডাকলে—‘নেত্য আচিস? নেত্য কোথায় গা?’ দিদিমণি ঘরের মধ্যে পিদিম জ্বালবার ব্যবস্থা করছেল, বাদলা দিন, তাড়াতাড়ি সন্দে হয়ে আসচে তো, নেমে এল উঠোনে। বাবাঠাকুর আর একবার চারিদিক নজরটা ঘুরিয়ে নিলে, জিগোলে—‘আর কাউকে দেখচি না যে?’

দিদিমণি বললে—‘মাসিমা ঘোষপুকুরে গেল এই গা ধুতে।…আমায় কিছু বলচ? … তোমার মুখটা অমন শুকনো দেখাচ্চে কেন বাবা?”

আমার কথাটা আর বললে না দিদিমণি—হয়তো খেয়ালই হোল না।

বাবাঠাকুর বললে—‘ব্রেজো ঘাটে গেচে? তা ভালোই হয়েচে।…এক্ষুনি বোধ হয় ফিরবে, না?’

দিদিমণি হেসে বললে—‘রোস, আজ সমস্ত দিন বেরুতে পায় নি। ঘোষপুকুরে উঠল বলে ভাঙা কাঁশির আওয়াজ।’

আমি হাতের জাবনা পস্কের করতে করতে বেরিয়েই আসছিলুম, বাবাঠাকুর ব্রেজোঠাকরুন ঘাটে গিয়ে ভালোই হয়েচে বলতে, ছেঁচের কাচেই দাঁড়িয়ে পড়লুম। দেখচি তানার ভাবটাও যেন কেমন চনমনে। দিদিমণির কথায় একটু হাসবার চেষ্টা করলে, কিন্তু কেমন যেন দেঁতো হাসি। দিদিমণি চেনে তো; বললে—‘কি যেন বলবে বলো না বাবা, তোমার মুখটাও যেন শুকনো—কেন?’

বাবাঠাকুর বললে—‘তুই ওরকম দেখি—শুকনো অমনি! একটু জলে ভিজলুম যে।’

‘তাই হবে, জলে ভিজলে শুকনো দেখায় অনেককে, রোদে পুড়লে ভিজে দেখায়।’

আবার একটু হাসলে, জিগ্যেস করলে— ‘তা কথাটা কি?”

‘কিছু নয় তেমন। তোকে সেই পাঁচটা ট্যাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলুম না? সেই যে গো, স্বরূপটা যেবারে কান শুনতে ধান শুনে তোকে এসে বললে বাবাঠাকুর বেম্মদত্তি হয়ে নিজের ছেরাদ্দর জন্যে পাঠিয়ে দিয়েচে—ছেরাদ্দ হ’লে তো বাঁচি—তা সেই ট্যাকাটা—তার আগে যেটা পাঠিয়েছিলুম সেটার কথা নয়, সেটা তুই খরচ কর, এটা, মানে বাতাসপুরের একটা বেনের কাচে নিয়েছিলুম কিনা—একজন শিষ্যির জমানতে—তা কদিন থেকেই জোর তাগাদা নাগিয়েচে, আজ আবার বাড়ি ব’য়ে আসছেল, আমি পোড়ো মন্দিরের দাওয়ায় বসিয়ে এয়েচি—বাড়িতে কুটুম তো।…সেই ট্যাকাটা, আর কিছু না।’

দিদিমণির মুখটা যেন একেবারে ছাইপানা হয়ে গেচে দাদা’ঠাকুর। ভালোও দেখেচি মন্দও দেখেচি কিন্তু সে রকমটা কখনও দেখিনি। আর, একটু সন্দে হয়েচে তো, তাতে বাদুলে আকাশ—যেন আরও কালি ঢেলে দিয়েচে মুখে, ফ্যাল ফ্যাল করে বাপের মুখের দিকে চেয়ে আচে, কি বলবে, কি করবে যেন থৈ পেয়ে উঠচে না।

তবুও দিদিমণিই, সামলে নিতে তো অমন ক’রে আর কাউকে দেখলুম না। ঐ থির চাউনির মধ্যেও দু’একবার চোখ দুটো যেন একটু একটু ঘুরে গেল, তারপর বোধ হয় আর একটু ভাববারই সময় নেবার জন্যে বললেও, সেই পরের বারে যে ট্যাকাটা পাঠিয়েছিলে?’

‘হ্যাঁ, সেইটে…নেই হাতে? তাহলে না হয়…’ আর শেষ করতে দিলে না দিদিমণি। ত্যাতক্ষণে ওর মুখটাও পস্কের হয়ে এসেচে, বললে— ‘ থাকবে না কেন বাবা? তবে এই ভরসন্দের সময় তো ট্যাকা বের করতে নেই—সে তো সেও জানে, আর বাদুলে সন্দে কখন ওরাবে টের পাওয়া যায় না তো—ভিন গেঁয়ের লোক, কতক্ষণ ওপিক্ষ্যে করবে—তার চেয়ে বল, আজ যেতে, কাল তুমি নিজেই দিনমানে গিয়ে দিয়ে আসবে।’

—বাবাঠাকুর চলে যেতে দিদিমণি একটু গলা তুলেই আমায় ডাক দিলে, আমি গোয়াল থেকে সাড়া দিয়ে বেরিয়ে আসতে একটু যেন থমকেও গেল, জিগ্যেস করলে—‘তুই বাড়িতেই ছিলি?’

আমি বললুম—‘গোরুটাকে জাবনা মেখে দিচ্ছিলুম।’

‘তাহলে তো শুনেচিস সব কথা। তা শুনেচিস তো আর কি হবে? বাড়ির ছেলের মতনই তো, তবে বলিসনি বাইরে কাউকে, বাড়ির কথা বের করতে নেই…তোকে ক’দিন থেকে বলচি না যে একটা কথা বলব? তোকে আবার একটা চিঠি দোব স্বরূপ, নিয়ে একাদশী ঘোষালের ওখানে যাবি, মনে করেছিলুম বাদুলে আকাশ, আজ না হয় থাক, তা শুনলি তো সব।…ভয় করবে না তো?’

নিজেই হেসে বললে- ‘ বেম্মদত্তির সঙ্গে সমানে কথা কয়ে এল, ওর আবার ভয়! তা’হলে আয় এক্ষুণি, বাবা, মাসিমা এসে পড়বে।’

তাড়াতাড়ি পিদিমটা জ্বেলে খসখস করে একটা চিঠি লিখে বললে, —‘বাইরে চল, কেউ এসে পড়বে এখুনি।’

আমার সঙ্গে ক’রে খিড়কির পুকুরের দিকে নিয়ে গেল, ঘাটের ওপর একটা জেয়ল গাছ, তার নিচে দাঁড়িয়ে চিঠিটা আমার হাতে দিয়ে বললে—‘সবই নিখে দিয়েছি চিঠিতে, তোকে কিছু বলতে হবে না, শুধু যদি জিগ্যেস করে বাবা কোথায় তো বলবি দিন পনের হোল শিষ্যিবাড়ি গেচেন, ফেরেন নি এখনও, বুঝলি না?—ঐ কথাটা আমিও নিকেচি, কথা আবার দু’রকম না হয়ে যায়।…ঐ পঞ্চাশটা ট্যাকার কথা নিখলুম, অত দেবে না, যা দেয় তুই নুকিয়ে নিয়ে আসবি। ….তা যেন হোল, রাত ক’রে আবার ফিরে এলি কেন—বাবা মাসি কেউ যদি জিগ্যেস করে, কি বলবি বল দিকিন?’

নিজেও ভাবতে লাগল। আমি বললুম— ‘বলবখনি পোড়ো মন্দিরের বেলগাছে বেম্মদত্তি দেখলুম, তাই।’

দিদিমণি খিলখিল করে হেসে উঠল, বললে—‘ও ছোঁড়ার মাথায় কী যে সেই এক বেম্মদত্তি সেঁদিয়ে বসেছে, আর পরিত্রাণ নেই।… বলবি—বলবি-দাঁড়া হয়েচে, সকালে তো তোর বাবার সেই বীরভদ্দর ছাতাটা নিয়ে এয়েছিলি, তা সেটা আর নিয়ে কাজ নেই, বলবি- ভুলে ফেলে গেছলুম নিতে এয়েচি। যা। গুচিয়ে-গাচিয়ে যদি আনতে পারিস, তোর দোয়ানিটা সিকি ক’রে দোব এবার। এইদিক দিয়েই বেরিয়ে যা, উদিকে ওরা আবার এসে পড়তে পারে।’

খিড়কির রাস্তাটা পুকুরধার দিয়ে গিয়ে খানিকটা পরে আবার সদর রাস্তায় এসে উঠেচে। নিজ্জন, অন্ধকার রাস্তা, একটু গা ছমছম করছেলই, কতই বা বয়স ত্যাখন বলুন না—পেরায় সদর রাস্তাটার কাচাকাচি এয়েচি, এমন সময় পেছন থেকে এক ডাক—‘স্বরূপ দাঁড়িয়ে যা।’

ভাঙা কাঁশির আওয়াজ সে আর ভুল হবার নয় তো, ফিরে দেখি ব্রেজঠাকরুন হনহন করে এগিয়ে আসচে। কাছে আসতে চেহারা দেখে ভয় পেয়ে গেলুম, দা’ঠাকুর, ইদিক-উদিক যতই ক’রে বেড়াক আমাদের সঙ্গে ব্যাভারটা তো ভালোই ছেল, দুজনকেই ভালোবাসত, মিষ্টি কথাই ছেল মুখে, অন্তঃকরণটা তো ভালোই ছেল ওনার। ত্যাখন কিন্তু কী ভয়ংকর যে চেহারা, চোখ দুটো যেন জ্বলচে, মুখটা থমথম করচে, মাথার ওপর সেই চুড়োটা রয়েছে উঁচু হয়ে বসে, আমি দাঁড়িয়ে পড়ে নিব্বাক হয়ে চেয়ে রইলুম, বলল –’সদর রাস্তার কাছ থেকে সরে আয় ইদিকে।

ওনার পেছনে পেছনে বেশ খানিকটা ভেতরের দিকে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়ালুম।

বললে- ‘চিঠিটা বের কর।’

আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়েই রয়েছি, বললে- ‘আমি সব দেখেচি ঘরের জানলা দিয়ে, নুকুবার চেষ্টা করেচিস কি আস্ত পুঁতে ফেলব ঐ পুকুরের পাঁকে, কাক-কোকিলেও টের পাবে না। বের কর চিঠি ‘

আমি আস্তে আস্তে চিঠিটা বের ক’রে হাতে তুলে দিলুম। মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে জিগ্যেস করলে–’কার কাছে নিয়ে যাচ্চিস চিঠি? এ নষ্টামি তোদের কদ্দিন থেকে চলচে?’

এসব কথার মানে তো ত্যাখন বুঝিনে, আগেকার কথা ধ’রে খোলসা মনেই বললুম— ‘মাসখানেক ধরে।’

‘মাসখানেক ধ’রে।…উদিক থেকেও চিঠি নে আসিস্ তো? এক্কেবারে নুকুবিনি।’

ঠিক তো গুছিয়ে বলতে পারচি না, আমতা আমতা করে বলে ফেললুম— ‘না—উদিক থেকে চিঠি নয়-ট্যাকা।’

‘ট্যাকা!!…কত টাকা?’

যেটা নেখা থাকে সেইটেই ব’লে ফেললুম দা’ঠাকুর, ট্যাকা তো পাইনি একবারও যে সেইটে বলব, আর ওনার মূর্তি দেখে ত্যাখন তো আর সাড়ও নেই আমার; বললুম— ‘পঞ্চাশ ট্যাকা।’

‘পঞ্চাশ ট্যাকা!!’—ওনার চোখ দুটো অন্ধকারে দুটো ভাঁটার মতন জ্বলে উঠলো, আমার ডান হাতটা কক্কড়িয়ে মুঠিয়ে ধরলে দা’ঠাকুর, আবার বললে—‘পঞ্চাশ ট্যাকা! কে এত টাকা দেয়, কার কাছে নিয়ে যাস্ চিঠি তুই?”

কপালের জোর এইখেনেই কথাটা ঘুরে গেল, নৈলে সিদিন যেমন গোলমেলে হয়ে বেরুচ্ছেল, আর একটু ঐরকম এগুলে কি হোত কি না হোত কিছুই তো বলা যায় না। এখন তো বুঝি কি গুরুচরণ ব্যাপারে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেল; ব্রেজঠাকরুণ যেরকম আগুন হয়ে উঠছেল একটা কথার পর একটায়, কে জানে সেই নিৰ্জ্জন অন্ধকারে এই দূতীগিরি করার হ্যাঙ্গামাটা চুকিয়েই ফেলত হয়তো, সত্যিই কাক-কোকিলে টের পেত না। একেবারে মোক্ষম কথা তো দা’ঠাকুর। তা পরমায়ু আচে, এখানটায় কথার মোড়টা ফিরে গেল, বললুম—“ট্যাকা দেয় নি এখনও।’

‘তবে? দেবে বলেচে তাই যাচ্ছিস?’

‘না, দিদিমণি চেয়ে পাট্যেচে।’

‘কার কাছে? সম্বন্ধটা কি চেয়ে পাঠাবার?’

‘উনি কজ্জ দেয় নোককে।

অনেকটা নরম হয় এসেছে ব্রেজঠাকরুনের চেহারাটা, ওবিশ্যি একেবারে নরম হবার তো নয়। একটু থেমে জিগ্যেস করলে– নোকটা কে?’

আমার ভরসা অনেকটা ফিরে এয়েচে ত্যাখন দা’ঠাকুর, বললুম—‘ঘোষালমশাই, রাজু ঘোষাল দক্ষিণপাড়ার—উনি সবাইকে ট্যাকা দেন বন্দকী রেখে—ঠাকুরমশাইকেও দিয়েচেন- দিদিমণি বলে তানাকে বন্দক রেখে—ওনার ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবে তো—ঠাকুরমশাই ট্যাকা নিয়ে আসে-তা ঐ ভয়ে আর যায় না—তাই দিদিমণি নিখে পাট্যেচে আমায় দিয়ে খরচ চলে না তো—-তায় বাবাঠাকুর শিষ্যিবাড়িতে ধার ক’রে এয়েচে—তাই দিদিমণি বললে—‘

বেশ মনে পড়ে দা’ঠাকুর। দিব্যি গড়গড়িয়ে ব’লে যাচ্ছিলুম—দিদিমণির মানা ভুলে ঘরের কথা অনেকখানি বের ক’রে দিয়ে—এইখেনটায় এসে হঠাৎ কি যে হোল, দিদিমণির সন্দেবেলার সেই মুখটা মনে পড়ে গিয়ে বুকটা এমন উৎলে উৎলে উঠল, কেন বলতে পারি নে—উনি আজ সকাল থেকে কিছু খায়নি’ ব’লে একটা মিথ্যে কথাও জুড়ে দিয়ে, দু’হাতে মুখটা ঢেকে আমি একেবারে হাউ হাউ ক’রে কেঁদে উঠলুম।

ব্রেজঠাকরুন হাতটা যে শক্ত করে ধরে ছেল, আলগা হয়ে গেল, সেই হাতটাই আমার কাঁধে আলগা ক’রে থুয়ে বললে- ‘চুপ কর্, সব বুঝেছি।’

নিজেও আর কোন কথা না ব’লে আস্তে আস্তে আমার কাঁধে হাতটা বুলিয়ে যেতে নাগল। অনেকক্ষণ; তারপর বেশ নরম গলাতেই জিগ্যেস করলে—‘যা বললি সব সত্যি?’

বললুম –’সব সত্যি; তুমি চিঠিটে না হয় পড়ে দেখো না।’

‘বুড়ো শিবের মাথায় হাত দিয়ে বলবি?’

বললুম— ‘চলো না।’

পাও বাড়ালুম, বললে— ‘থাক্, আর যেতে হবে না।’

‘কি ঘোষাল নাম করলি–কজ্জটা যে দেয়—তার ছেলে করে কি?’

বললুম— ‘গাজা খায়—আর গুলি, চরস এই সব

‘কত বয়েস হবে?

মুখটা তুলে বললুম— ‘এই তোমার মতন।’

‘আমার বয়স কত বল্ দিকিন?”

আমি একটু যাকে বলে ফাঁপরে পড়ে গেলুম দা’ঠাকুর। বাবাঠাকুরকে বিধবা-বিয়ে করতে এয়েচে, সিদিক দিয়ে বয়েসটা একটু কমিয়ে বলতে পারলেই ভালো, ইদিকে একটা ভারিক্কে গিন্নীবান্নী মানুষ, য্যাত বাড়িয়ে বলা যায় ত্যাতই মানানসই—কি বলি, কি বলি মাঝামাঝি একটা ঠাহর করে নিয়ে বললুম—‘তিনকুড়ি।’

একটু হেসে উঠল, আবার তাও ছেল তো, বললে—‘এক কুড়ি কমিয়ে দিলি এক কথায়?’

তখুনি আবার ভারিক্কে হয়ে গিয়ে বললে— ‘তাহলে আমার বয়সী?…বাড়িতে আর কে আচে, বাপ ছাড়া?’

বললুম—‘কেউ নেই। ঘোষালগিন্নীর গত বছর কাল হোল তো।’

‘আর বিয়ে করে নি?’

বললুম— ‘না, বড্ড কেপ্পন তো।’

আরও বলতে যাচ্ছিলুম নাম করলে হাঁড়ি ফেটে যায়, পেয়ারা গাছ আগলে বসে থাকে, এই সব; হঠাৎ একটা খেয়াল হতে চেপে গেলুম দা’ঠাকুর। কথাটা হোল – ব্রেজঠাকরুন বিয়ে ক’রে বসবে এই ভয়েই তো বাবাঠাকুর পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্চে, যার জন্যে এত কাণ্ড, তা ওনাকে যদি রাজু ঘোষালের ঘাড়ে চাপ্যে দেওয়া যায় তো ইদিকের সমিস্যেটা বেশ মিটে যায় না? চেপে গেলুম, বললুম—‘বিয়ে করেনি, তবে করবে বলেচে। বিধবা পাটির নোক তো?—বলেচে তেমন মনের মতন বিধবা ক’নে পেলে করবে বিয়ে।’

আরও খানিকটা সামলে নিয়ে বললুম—‘কেল্পন—বিস্তর ট্যাকা থাকলে মন্দ নোকে কেপ্পন বলে তো, তাই আর কি। এমনি খায় দায় ভালো। বউয়ের কোন ক্লেশ হবে না।’

জিগ্যেস করলে—‘খুব ট্যাকা আচে?’

ঘোষালকে নিয়ে অনেক চোখা চোখা কথা শোনা ছেল তো সবার কাছে, বললুম- ‘ট্যাকার ওপর বসে থাকে।’

বুদ্ধিটে ছেলেবেলা থেকেই একরকম মন্দ ছেল না, নানান রকম দেখতুম শুনতুম তো—লোভটা আরো বাড়িয়ে দিয়ে বললুম— ‘তারপর ওনার বয়েস হয়েচে তো, বেশিদিন বাঁচবেও না, ত্যাখন যিনি ওনাকে বিধবা-বিয়ে করবে তিনি ভালো দেখে আর একটা বিয়ে করলেই ট্যাকাণ্ডনো নিয়ে দিব্যি হেসে-খেলে কাট্যে দিতে পারবে।’

কান পেতে শুনছেল কি না-শুনছেল ঠিক বলতে পারি নে দা’ঠাকুর, ভয়ানক অন্যমনস্ক হয়ে রয়েচে তো, তবে শেষের দিকটা যেন অল্প একটু হাসলে, তখুনি আবার পুব্বের মতন ভারিকে হয়ে জিগ্যেস করলে—‘তোর দিদিমণির হাতে কিছু নেই?’

যতটা পারলুম বাড়িয়েই বললুম—‘কানা কড়িটেও না।’

চুপ করে একটু দাঁড়িয়ে কি ভাবলে, তারপর বললে—শোন্, আমার একটু কাজ আচে, এখুনি আসচি; ত্যাতক্ষণ তুই এখেনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবি? না হয় একটু সদর রাস্তার দিকেই এগিয়ে দাঁড়া।’

ভয়টাও কমই ছেল দা’ঠাকুর। থাকবেই তো, বললুম—‘আমি এখানেই দাঁড়াচ্চি।’

‘একলা ভয় করবে না তো? করে, না হয় এগিয়ে যাস্। আমি এলুম ব’লে।’ সদর রাস্তা ধরেই উনি চলে গেল। বেশি দেরি হোল না, খানিক পরেই আবার খিড়কির পথ দিয়েই ফিরে এসে বললে—‘এই আচি দাঁড়িয়ে। এখন যা বলি ঠিক সেইরকম করবি, বেশ তো? একটুও নড়চড় হবে না?’

আঁচলের গেরো খুলে আমার কাপড়ের একটা খুঁট টেনে নিয়ে তাতে গোটাকতক ট্যাকা বেঁধে দিতে দিতে বললে—‘এই পনেরটা ট্যাকা দিচ্চি, সদর রাস্তা দিয়ে সোজা বাড়ি চলে যা, তাতে আর একটু দেরিও হবে’খন। অনাদি বোধ হয় ফেরেনি, ফিরলেও বোধ হয় আহ্নিকে ব’সেচে। আমিও এখন ফিরব না, ঘোষপুকুরেই আহ্নিকটা সেরে নিতে যাচ্চি; তুই সোজা গিয়ে তোর দিদিমণির হাতে ট্যাকাগুনো দিবি। দিয়ে কি বলবি?’

বললুম ঘোষালমশাই দিলে।

‘যদি জিগ্যেস করে—সব ট্যাকা দিলে না যে?’

বললুম—অত দেবে না জানে দিদিমণি, বললে—গোটা পাঁচেক দেবে, কেপ্পন তো।’

ব্রেজঠাকরুন কি একটু ভাবলে, বললে—‘বেশ, তা তুই পনেরটাই নে যা। আর শোন—’

বেশ কড়া হয়ে আমার দিকে চাইলে, বললে—‘এখানে যা যা কথা হোল কারুর কানে কক্ষনোও তুলবি নে।… তুলবি নে তো?’

বললুম—‘না।’

‘আর একটা কথা—নেত্য যেখনি চিঠি দেবে—যার কাছেই হোক, আগে আমায় এসে দেখাবি।…দেখাবি তো?

বললুম—‘হ্যাঁ, দেখাব।’

‘চল, বুড়ো শিবের মাথায় হাত দিয়ে দিব্যি করবি।’

পা বাড়াতেই আবার বললে—‘থাক্, আমার গা ছুঁয়েই বল্। আমি বুড়ো শিবের বাবা, দেখচিসই তো, খেলাপ হ’লে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব একেবারে।’

সদর রাস্তায় আমায় খানিকটা এগিয়ে দিয়ে উনি ঘোষপুকুর পানে চলে গেল।