Course Content
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
0/42
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬৫

।। পঁয়ষট্টি।।

লাঞ্চের পর আবার বিচার শুরু হল। সমীর আহুজা দুদে উকিল, প্ৰথমেই ভুল শুধরে নিল ‘ইয়োর অনার, একথা ঠিক এই ওষুধ অ্যামফার্মার সানফ্রান্সিসকোর বে-এরিয়ার মাউন্টেনভিউ ল্যাবে আবিষ্কার হয়েছে, কিন্তু অ্যামফার্মার হেড অফিস এবং সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরি বাল্টিমোরে অবস্থিত হওয়ায় পেটেন্ট পেপারে বাল্টিমোর ল্যাবের নাম দেওয়া হয়। অ্যাকচুয়ালি আজ পর্যন্ত যত পেটেন্ট অ্যামফার্মা ফাইল করেছে সব পেটেন্টেই বাল্টিমোর ল্যাবের নাম দেওয়া হয়েছে। তবে হ্যাঁ আজকের এই কমপ্লিকেশনস থেকে লেসনস লার্নড যে, ইয়েস গোয়িং ফরোয়ার্ড, কোম্পানির যে ল্যাবে রিসার্চ হবে কোম্পানি তার নামও উল্লেখ করবে। ইফ ইউ পারমিট, মে আই কন্টিনিউ উইথ মাই নেক্সট উইটনেস প্লিজ?’

‘ইয়েস, পারমিটেড। আপনার পরের সাক্ষীকে আনুন।’

‘আমার পরের সাক্ষী ড. পৃথুযশ ভৌমিক, ইয়োর অনার।’

‘প্লিজ প্রসিড।’

এবার পৃথুযশ ভৌমিককে কোর্টরুমে ডেকে আনা হল। পৃথুযশ নমিতাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নমিতা ইচ্ছা করে চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল যাতে পৃথুযশের অস্বস্তিকর দৃষ্টির সঙ্গে দৃষ্টি না মেলাতে হয়। পৃথুযশ উইটনেস ডেস্কে গিয়ে সত্যকথনের শপথ নিল। আহুজা প্রশ্ন শুরু করল—’

‘ড. ভৌমিক, আপনি এখন কোথায় কর্মরত?’

‘আমি ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের চেয়ার।’

‘কত বছর আপনি বিদেশে?

‘ত্রিশ বছর।’

‘আপনার নাগরিকত্ব?’

‘আমি আমেরিকান সিটিজেন।’

‘আপনি বাঙালি তো?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি আদ্যন্ত বাঙালি,’ পৃথুযশ হাসল।

‘বেহুলার খনা’ নামে এই বইটা পড়ে আপনার মতামত চেয়েছিল অ্যামফার্মা, কারেক্ট?’

‘হ্যাঁ।’

‘আপনি একটি রিপোর্ট অ্যামফার্মাকে সাবমিট করেছেন, কারেক্ট?’

‘হ্যাঁ।’

‘এই বই সম্বন্ধে আপনার মতামত কি ছিল তা আপনি কোর্টকে সংক্ষেপে বলবেন?’

‘দুটো মেজর ব্যাপার,’ পৃথুযশ বলল। ‘ফার্স্ট, এটা কোনো ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এই বই গল্পের বই হিসেবে উৎকৃষ্ট, কিন্তু এখানে গল্পে গোরুকে গাছে চড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেকেন্ড, এখানে খনাকে এক ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে প্রমাণ করাবার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু খনা বলে কোনোদিনই কোনো বাঙালি বিদুষী মহিলা রিয়েল লাইফে ছিলেন না, খনার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, অতএব এই খনাবাক্যং বলে যত শ্লোক লেখা হয়েছে সবই কারোর কল্পনাপ্রসূত।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ প্রফেসর ভৌমিক, আহুজা বলল। ‘ইয়োর অনার, প্রফেসর ভৌমিক একজন রিনাউন্ড স্কলার। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির চেয়ার। তাঁর ডিটেলড মতামত আমরা কোর্টের কাছে সাবমিট করেছি। অপোজিং কাউন্সেলের অবজেকশন না থাকলে কোর্টের কাছে আবেদন করব ড. পৃথুযশ ভৌমিকের রিপোর্ট একজিবিট থ্রি হিসেবে অ্যাডমিট করতে।’

‘নো অবজেকশন ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন।

‘একজিবিট থ্রি অ্যাডমিটেড,’ জাজ বললেন।

‘ড. ভৌমিক, আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির একটা ডিবেটে কি আপনি অংশ নিয়েছিলেন যার টপিক ছিল খনা মিথ না রিয়েল?’

‘ইয়েস স্যার।’

‘আপনি কোন পক্ষ নিয়েছিলেন?’

‘খনা একটা মিথ।’

‘সেই ডিবেটে বিচারক কে ছিলেন?’

‘দু’জন ছিলেন। প্রখ্যাত আমেরিকান ইন্ডোলজিস্ট ড. হেনরী গ্যালাগার এবং বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট—ড. প্রমথেশ বক্সী।’

‘ডিবেটে আপনি কি জিতেছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘ড. ভৌমিককে আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই, ইয়োর অনার,’ আহুজা বলল। ‘মিস বসাক, ইউ হ্যাভ ক্রশ কোয়েশ্চেন ফর ড. ভৌমিক?’

‘ইয়েস ইয়োর অনার।’

‘প্লিজ প্রসিড।’

মাধবী বসাক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর স্মিত হেসে প্রশ্ন করলেন, ‘প্রফেসর ভৌমিক আপনি এর আগে কতবার এক্সপার্ট হিসেবে কোর্টে সাক্ষ্য দিয়েছেন?’

‘এটা আমার প্রথম অ্যাপিয়ারেন্স।’

‘আপনি এই এক্সপার্ট ওপিনিয়নের জন্য কত ডলার পেয়েছেন?’

‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ আহুজা বাধা দিল।

‘এটা কোর্টে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করা হয় এবং সাক্ষী তার উত্তর দেন।

অবজেকশন ওভাররুলড,’ জাজ বললেন।

‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘তাহলে ড. ভৌমিক, আপনি কত ডলার পেয়েছেন বা আপনাকে দেওয়া হবে?’

‘ফ্রি, পৃথুযশ ভৌমিক তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুলি লাগিয়ে একটা শূন্যের আকার সৃষ্টি করে দেখাল। ‘আমি অর্থের জন্য এ কাজ করিনি।’

‘আপনার এই ওভারসিজ ট্রাভেল, প্লেন ভাড়া, হোটেলে থাকা এসব?’

‘হ্যাঁ এসবের খরচা অ্যামফার্মা দিচ্ছে।’

‘আপনি বললেন আপনি অর্থের জন্য এ’কাজ করেননি। তাহলে কিসের জন্য আপনি এ কাজ করলেন?’

পৃথুযশ এবার এক মুহূর্ত থামলেন।

‘ড. ভৌমিক?’

‘অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্টে। খনাকে নিয়ে বাংলায় অজস্র আজগুবি মিথ আছে এবং অনেক বাঙালি সেটা ইতিহাস বলে মনে করে। বাঙালিদের সেই ভ্রান্ত ধারণাটা পাল্টানোর জন্য আমি আমার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে সত্য মতামত দিয়েছি। খনা বলে আদপেই কেউ ছিল না।’

‘ওয়েট ওয়েট ড. ভৌমিক। ডু নট জাম্প ইনটু এনি কনক্লুশন সো ফ্যাস্ট। আমরা এখানে ডিবেট লড়তে আসিনি। আপনার কাজ শুধু আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া।’

পৃথুযশ চুপ করে রইলেন।

‘ড. ভৌমিক, ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?’

‘ইয়েস ম্যাম।’

‘গুড। আগে এটা ক্লিয়ার হয়ে নিই যে আপনাকে কেন এক্সপার্ট হিসেবে অ্যামফার্মা সিলেক্ট করল? আপনি বললেন আপনি এর আগে কখনো পেটেন্ট কেসে এক্সপার্ট রিপোর্ট দেননি, আপনি কখনো কোর্টে আসেননি। তাহলে আপনাকে কেন এই কেসের জন্য আনা হল?’

‘সেটা অ্যামফার্মা বলতে পারবে ওরা কেন আমাকে এক্সপার্ট মনে করেছে-’

‘অ্যামফার্মার বাঙালি বৈজ্ঞানিক ড. তথাগত দাসের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে?’

‘অবজেকশন ইয়োর অনার। পার্সোনাল রিলেশনশিপ –’ আহুজা বলল। ‘তথাগত দাস এই পেটেন্টের দাবিদার। নাথিং পার্সোনাল ইয়োর অনার, ‘ মাধবী বসাক বললেন।

‘অবজেকশন ওভাররুলড।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘ড. ভৌমিক, অ্যামফার্মার বাঙালি বৈজ্ঞানিক ড. তথাগত দাসের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী পরিচয়?’

‘উনি আমার মেয়ের বন্ধু।’

‘বন্ধু?’

‘আমার মেয়ের ফিঁয়াসে।’

‘তথাগত দাস আপনাকে অনুরোধ করেছিল এই রিপোর্ট লিখতে?’

‘হ্যাঁ,’ পৃথুযশ ধীর গলায় বলল।

‘তথাগতর নামে পেটেন্ট, এই রিপোর্ট তথাগতর পেটেন্ট কেসে ব্যবহার করা হবে, তথাগত আপনার মেয়ের ফিয়াসে, তথাগত আপনাকে অ্যাপ্রোচ করছে—আপনার কি মনে হয়নি এটা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট?’

‘আমি তথাগতের জন্য নতুন করে কোনো রিপোর্ট লিখিনি। এটা আমার পিএইচডি পেপার। বত্রিশ বছর আগেকার লেখা রিপোর্ট। আমি সেটাকে রিপ্রোডিউস করেছি মাত্র।’

‘আপনি পিএইচডি থিসিসে লিখেছেন যে খনা বলে কেউ ছিল না, কারেক্ট?’

‘ইয়েস ম্যাম। আমি বারবার বলছি খনা বলে কেউ ছিল না। আপনাদের কাছে কী খনা সম্বন্ধে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক এভিডেন্স বা অ্যাকসেপ্টেন্স আছে? নেই তাই না?’

‘আছে। আপনাকে দুটো ডকুমেন্ট দেখাই। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার নোটিশ বোর্ড। একটু কাইন্ডলি পড়তে পারেন কী লেখা আছে?’

মাধবী বসাক ভারতীয় পুরাতত্ত্ব ডিপার্টমেন্টের চন্দ্রকেতুগড়ের নোটিশ বোর্ডের দুটো ফটো পৃথুযশের হাতে দিল।

পৃথুযশ পড়ল। এবার মিস বসাক পৃথুযশকে বললেন, ‘চন্দ্রকেতুগড়ের এই জায়গাটির নাম আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া অফিসিয়ালি খনা-মিহিরের ঢিপি নামে অ্যাকনলেজ করে রেখেছে। এই ফলকটা পড়ে কি তাই মনে হচ্ছে না ড. ভৌমিক?’

পৃথুযশ নিরুত্তর।

‘ড. ভৌমিক ইয়েস অর নো?’

‘ইয়েস।’

‘আর সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং, এই খনার সঙ্গে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে বরাহমিহিরের নামও জড়িয়ে রেখেছে। তার মানে খনা বলে প্রাচীন কালে কেউ ছিল না একথা বলা যায় না, তাই না ড. ভৌমিক? যদি এটা গুজব বলে তারা মানতেন তাহলে এভাবে ফলক লেখা থাকত না।’

পৃথুযশ নিরুত্তর।

মিস মাধবী বসাক জলের বোতল খুলে এক চুমুক দিয়ে বোতলের ছিপি ঘুরিয়ে আটকাতে আটকাতে বললেন, ‘ড. ভৌমিক, তাহলে এখন এটা মানতে অসুবিধা নেই তো যে খনার সম্বন্ধে প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যাকসেপ্টেন্স আছে?’

পৃথুযশ নিরুত্তর।

‘আচ্ছা, এবার আপনার রিপোর্ট নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক, ‘মিস বসাক বললেন। ‘আপনি আপনার রিপোর্টে বলেছেন যে এই ওষুধের ফর্মুলা খনার বচনে লেখা ছিল না। আপনি কী কেমিস্ট? বা আপনার কি কেমিক্যাল কম্পোজিশন বোঝার মত শিক্ষা আছে?’

‘অ্যাকচুয়্যালি-’

‘প্লিজ আমার প্রশ্নের উত্তর দিন, ড. ভৌমিক,’ মিস বসাক শান্তস্বরে বললেন। ‘আপনি কি কেমিস্ট? বা আপনার কি কেমিক্যাল কম্পোজিশন বোঝার মত শিক্ষা আছে?’

‘না।’

‘আপনি কি এই ওষুধের ফর্মুলাটা পড়েছেন?

‘না।’

‘ড. ভৌমিক, তাহলে আপনি কীভাবে জানলেন এই ওষুধের ফর্মুলা খনার বচনে লেখা ছিল না?’

‘এই গাছের ব্যবহার খনার নামে যে চার লাইনের কবিতায় লেখা হয়েছে সেটার লেখক বেহুলা নামে এক প্রাচীন নারী। সেই বেহুলা তার পুঁথিতে অজস্র আজগুবি মিথকে সত্যি ঘটনা বলে লিখে রেখে গেছে। বেহুলার সেই সব আজগুবি অবাস্তব মিথের পরিপ্রেক্ষিতে তার লেখা খনার এই বচনও মনে করা হচ্ছে এক অসত্য লেখনী।’

‘কীভাবে এটা আপনি বলছেন?’

‘উনি লিখেছেন ডিঙিবাদল নামে একটা গ্রামে নাকি ডিঙির বৃষ্টি হয়েছিল। সেটা কখনো সম্ভব?’

মাধবী বসাক বললেন, ‘সে প্রসঙ্গে আমরা পরে আসব। ইয়োর অনার, আমার ড. ভৌমিককে আর কোনো প্রশ্ন করার নেই। থ্যাঙ্ক ইউ ড. ভৌমিক।’

‘মিস্টার আহুজা, এনি রিডাইরেক্ট কোয়েশ্চেন?’ জাজ বললেন।

‘নো কোয়েশ্চেন, ইয়োর অনার।’ আহুজা বলল।

‘থ্যাঙ্ক ইউ ড. ভৌমিক, ইউ আর এক্সকিউজড’ জাজ বললেন। মিস্টার আহুজা, আপনার আর কোনো উইটনেস আছে?’

‘না ইয়োর অনার, আমি আমার সব সাক্ষীদের উপস্থিত করেছি।’

‘ঠিক আছে, মিস বসাক, প্লিজ প্রসিড উইথ ইয়োর উইটনেসেস।’

মিস বসাক মা সারদার লকেটটা এবার শক্ত করে ধরে চোখ বুজলেন।