Course Content
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
0/42
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৭২

।। বাহাত্তর।।

কোর্টের বাইরে চত্বরে পার্কিং লটে গাড়ির সমুদ্র। মাস্টারদার স্ট্যাচুর পিছন দিয়ে হেঁটে বাঁদিকে চলতে চলতে হঠাৎ পিছন থেকে উচ্চকণ্ঠে ‘দিদি’ ডাক শুনে বিদ্যাদি আর নমিতা পিছন ফিরে তাকাল।

গগন ঝোলা কাঁধে হনহন করে ফিরে আসছে। নমিতা আর বিদ্যাদি দাঁড়িয়ে গেল। কাছে এসে গগন বিদ্যাদিকে বলল, ‘দিদি, আপনার ভাইপোকে দেখলাম, ওরা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে এগিয়ে এসে বলল আপনি কোথায়। ওরা আপনার জন্যই অপেক্ষা করে আছে বলল।’

‘বাবলু!’ বিদ্যাদি অবাক। ‘কোথায়?’

‘চলুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি। আমি ওনাকে বললাম আপনাদের নিয়ে আসছি।’ ঠিকাদারের কর্মচারীরা অসামান্য তৎপরতার সঙ্গে একচুলের ব্যবধান মাঝে রেখে রেখে গাড়িগুলো পার্ক করিয়েছে। গাড়ির ভিড়ের পাশ দিয়ে গগন পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। ‘ওই যে ওনারা ওখানে,’ গগন দূর থেকে দেখিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

একটা ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে পৃথুযশ আর তথাগত। সঙ্গে আরেকজন। একটা হুইল চেয়ারে বসে একজন অল্প বয়সী মেয়ে, একটা বড় হলুদ সিল্কের রুমাল দিয়ে মাথা ঢাকা।

বিদ্যাদি আর নমিতা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল।

‘কনগ্র্যাচুলেশনস!’ পৃথুযশ শুকনো হাসি হেসে বলল।

‘থ্যাঙ্কস!’ নমিতা ভদ্রতা করে ঠোঁট চিপে হাসল। এই হিপোক্রিট লোকটার সঙ্গে কথা বলতে এতটুকু ইচ্ছা করছে না। পৃথুযশ বলল, ‘বিদ্যাধরী—’

বিদ্যাদি একটা বড় শ্বাস নিল।

পৃথুযশ বলল, ‘এ আমার মেয়ে অমৃতা। ওই জোর করে এল। তথাগতর বাবা আর পিসির সঙ্গে একবার দেখা করতে চায়। আর সুযোগ হবে না, তাই এখানেই এসে দেখা করতে চাইল।’ পৃথুযশ মেয়ের মাথায় আদরের স্পর্শের হাত রাখল। তারপর মলিন হেসে বলল, ‘আমার মেয়েকে ওর বাবার অতীতের কুম্ভীলকবৃত্তির কাহিনি আমি বলেছি। সত্য সব সময় সামনে আসা উচিত। আমরা কাল ফিরে যাচ্ছি। আমি ফিরে গিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় আমার রেজিগনেশন সাবমিট করব। কিন্তু বিশ্বাস করো, মেয়ের মাথায় এই হাত রেখে বলছি, আমি নিজে থিসিস লিখলে তোমার লেখার একটা লাইনও আমি চুরি করতাম না।’ পৃথুযশ দু’হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে, দু’চোখের পাতা বন্ধ করে একটা বড় শ্বাস নিল।

হুইল চেয়ারে অমৃতাকে বিদ্যাদির কাছে এগিয়ে নিয়ে এল তথাগত। তথাগত বলল, ‘অমৃতা, এই সেই পিসি, আমার মা’র মতো।’

অমৃতার শীর্ণ শরীর। ওর মলিন মুখে একফালি হাসি জেগে উঠল। অমাবস্যার পর অন্ধকার আকাশে প্রতিপদে প্রথম চাঁদের আলো। বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা শারীরিক ও মানসিক লড়াইয়ের ধকলে খুব ক্লান্ত। দু’হাত বুকের কাছ জোড় করে বিদ্যাদিকে নমস্কার করল অমৃতা

‘আমি উঠে দাঁড়িয়ে সামনে ঝুঁকতে পারি না, পিসি। আমি মনে মনে আপনার পা ছুঁলাম।’ এবার বিদ্যাদি অমৃতার একদম পাশে গিয়ে ওর দু’হাত ধরে বলল, ‘বাবলু আমার সঙ্গে ক’দিন আগে দেখা করে তোমার সব কথা বলেছে অমৃতা। আমি বুঝি তোমার এই শরীরে এত লম্বা প্লেন জার্নি করার ধকল নেওয়া কঠিন। তবু তুমি এসেছো আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। আমিও একবার মনে মনে তোমায় দেখতে চেয়েছিলাম অমৃতা। আমাদের অত প্রিয় বাবলুর বৌ হবে তুমি।’ এবার বিদ্যাদি ওর গলার সরু গিনি সোনার হারটা খুলে বলল, ‘এটা বাবলুর মায়ের গায়ের শেষ সোনা। বৌদি ওঁর চিকিৎসার জন্য এটা কিছুতেই বিক্রি করতে দেয়নি। মারা যাওয়ার আগে নিজের গলা থেকে খুলে আমায় পরিয়ে বলেছিল বাবলুর বৌকে আমার হয়ে এটা দিস। আর তো কিছু নেই আমার।’ হারটা অমৃতার হাতে দিল বিদ্যাদি।

‘আমায় এটা পরিয়ে দেবে পিসি?’ অমৃতা বলল।

হারটা অমৃতার গলায় পরিয়ে দিয়ে অমৃতার মাথায় হাত বুলিয়ে ওর কপালে চুমু খেল বিদ্যাদি—‘দীর্ঘায়ু হও অমৃতা। ভগবান আমার আয়ু তোমাকে দিন।’ বিদ্যাদির অশ্রুভারাক্রান্ত দু’চোখে স্নেহমাখা দৃষ্টি।

অমৃতা গলার হারটা ডান হাতের মুঠোতে চেপে ধরে বলল—‘পিসি, তথাগত আমার কাছে প্রমিস করেছে যে এই পেটেন্ট থেকে ইনভেন্টর হিসেবে ওর নাম উইথড্র করে নেবে। কিন্তু আমি জানি যে তথাগত ঠিক অন্য বড় কিছু আবিষ্কার করবে। ও খুব ট্যালেন্টেড। ওর আবিষ্কার দেখবে তোমাদের খুব প্রাউড করবে। ও যখন নিজের পেটেন্ট পাবে তখন তোমরা একটা বড় পার্টি দেবে পিসি? সেদিন আমি তো থাকবো না, তাই তোমার ওপর দায়িত্ব দিয়ে গেলাম পিসি। আর –’ অমৃতার গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে গেল। অমৃতা দু’চোখ বুজে নিজেকে সামলাতে সামলাতে বলল, ‘আমি যখন থাকব না, তখন তথাগত খুব একলা হয়ে যাবে। তাই—’

বিদ্যাদি দু’চোখ বুজে অমৃতার মাথা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে বড় একটা শ্বাস নিল।

‘তথাগতকে ক্ষমা করে দিও পিসি, অমৃতা ওর চোখ মুছল।

তথাগত এবার মাথা নীচু করে বিদ্যাদির পা স্পর্শ করল, তথাগত যখন মাথা তুলল তখন ওর মুখ থমথমে ‘বাবাকে বোলো পারলে আমায় ক্ষমা করতে। আর তুমিও।’ তথাগত ফিরে গিয়ে অমৃতার হুইলচেয়ারের পিছনের হাতল শক্ত মুঠিতে ধরে দাঁড়াল। তথাগতর চোখ ভেজা।

বিদ্যাদিরও দু’চোখ সজল। বিদ্যাদি পৃথযশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবলুটার ভাগ্য খুব ভালো। অত সুন্দর একটা বৌ। তোমার মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই পৃথিবীর সব অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া যায়।’

পৃথুযশ অন্যমনস্ক হাসি হাসল। কারণ ড. পৃথুযশ ভৌমিকের মন তখন অতীতের বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতে। এক লহমায় তাঁর অতীত বোধহয় তাকে তাঁর পাপকর্মের স্থানে নিয়ে গিয়ে বেত্রাঘাত করে চলেছে।

আশেপাশে দু-চারজন করে কৌতূহলী লোকজন জড়ো হচ্ছে। ‘এবার আসি ড. ভৌমিক,’ নমিতা বলল।

নমিতার কথায় পৃথুযশের চমক ভাঙল। ‘অ্যাাঁ, হ্যাঁ, আসুন—’  

‘একটা কাজ বাকি আছে,’ বিদ্যাদি বলল।

নমিতা এরপর যে দৃশ্যটা দেখল সে দৃশ্য না দেখলে ওর জীবন বোধহয় অসম্পূর্ণ থেকে যেত। বিদ্যাদি এবার তার শান্তিনিকেতনের ঝোলা ব্যাগ থেকে পুরোনো ফাইলটা বের করে পৃথু্যুশকে বলল ‘এটা আমার প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনের আমার কপিটা।’ বিদ্যাদি ফাইলটা পৃথু্যুশের দিকে এগিয়ে দিল— ‘এই ফাইলের দায়িত্ব আমি তোমাকে দিলাম, পৃথুযশ।’

পৃথযশের দৃষ্টিতে বিস্ময়। কম্পিত হাতে ফাইলটা নিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল পৃথুযশ। মর্মর মূর্তির মতো নিথর।

নমিতার মনে হলো সে কত ভাগ্যবতী যে সে এই কাহিনির সাক্ষী। তারপর ওর মনে এক অদ্ভুত চিন্তার উদয় হল। সে এই কাহিনির শুধুই দর্শক? নাকি সেও এক বহমান কাহিনির একজন চরিত্র? এক ঘোরের মধ্যে নমিতার যুক্তিবাদী মন এই প্রথমবার এক অজানা অস্পষ্টতায় প্রবেশ করল। সেও কি এই কাহিনির জন্যই জন্ম নিয়েছে? এতগুলো কাকতলীয় ঘটনা একসঙ্গে ঘটল! মাধবী বসাক ওর কাছে কেন এল? বিদ্যাদির সঙ্গে দেখা হওয়া! সবটাই কি কাকতলীয়? নাকি পূর্ব নির্ধারিত? বিদ্যাদি কি জিভকাটি বেহুলা? তাহলে নমিতা নিজে কে? মাধবী বসাক হালকা হেসে একদিন বলেছিলেন আপনি বচনপিসির থেকেও ভালো প্রবচন বলেন। বচনপিসির বচনের আকুতি কি তাহলে এক জনমে শেষ হয়নি? এখনও অতৃপ্ত? এক জন্মের অতৃপ্তি পরের জন্মে প্রবৃত্তি হয়ে প্রবাহমান? আর অতীতের বচনপিসি আগলে আগলে রেখেছে তার এজন্মের বেহুলাকে? সে কেন বিদ্যাদির জন্য পৃথুযশের বিরুদ্ধে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল? শুধুই তার ছাত্রাবস্থার ভুলের অনুশোচনার জন্য? নাকি পূর্বজন্মের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা? মাথা দপদপ করছে নমিতার। আর কিছু ভাবতে পারছে না সে। নমিতা এক ঘোরের মধ্যে রয়েছে।

চোখের সামনে এক অপার্থিব দৃশ্য। নমিতার চোখ জলে ভরে যাচ্ছে। বিদ্যাদির ফাইল নিজের বুকের মধ্যে চেপে ধরে দু’হাত জোড় করে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে পৃথুযশ। সরস্বতীর বরপুত্র প্রণাম করছে মা সরস্বতীকে। আর বিদ্যাদি আজ বিদ্যাধরী না, সে সমস্ত কলহ-বাদ-বিসংবাদ-হিংসা-দ্বেষ-অসূয়ার ঊর্ধ্বে। ক্ষমা করুণার প্রতীক হয়ে কাল অতিক্রম করে বিদ্যাদির রূপে যেন ধরায় নেমে এসেছে স্বয়ং জিভকাটি খনা। তাঁর প্রারব্ধের জমা-খরচের লড়াই চিরতরে শেষ করল। এক বিদুষী আবার হারিয়ে দিল তাঁর যশস্বী বিদ্বান প্রতিদ্বন্দ্বীকে।

এবার শুধু মহানুভবতায়।

সমাপ্ত

***

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

১) গ্রাম বাংলার উপকথা—রেভারেণ্ড লালবিহারী দে

২) ঢাকাই মসলিন—ড. আবদুল করিম

৩) জ্যোতিষ প্রভাকর—শ্রী কৈলাসচন্দ্র জ্যোতিষার্ণব কর্তৃক সংকলিত

৪) জ্যোতিষতত্ত্ববারিধিঃ—শ্রী নীলকমল বিদ্যানিধি দ্বারা সংগৃহীত

৫) আমাদের জ্যোতিষী ও জ্যোতিষ—শ্রী যোগেশচন্দ্র রায়

৬) ফলিতজ্যোতিষ—শ্রী রসিকমোহন চট্টোপাধ্যায়

৭) The Brihat Samhita of Varaha—Mihira—H. Kern

৮) Varahamihira and his times—Ajay Mitra Shastri

৯) খনার বচন—রামলাল শীল কর্তৃক সংগৃহীত

১০) খনা—শ্রী যোগেশচন্দ্র রায়—সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা

১১) পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি—শ্রী বিনয় ঘোষ

১২) বাংলার লোক-সাহিত্য—শ্রী আশুতোষ ভট্টাচাৰ্য্য

১৩) ইতিহাসে দেগঙ্গা—দিলীপ কুমার মৈতে

১৪) লবণহ্রদের ইতিকথা—সুশীল কুমার রায়চৌধুরী

১৫) Rivers of Bengal Delta—S. C Majumdar

১৬) Changing face of Bengal—R. K. Mukherjee

১৭) The Neem Tree Patent : International Conflict over the Commodification of Life—Emily Marden

১৮) কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা—মহেন্দ্ৰনাথ দত্ত

১৯) ভাবপ্রকাশ নিঘন্টু—শ্রী কৃষাণ দাস জী

২০) কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত—বিনয় ঘোষ

২১) প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী—শ্রী জগদ্বন্ধু মৈত্র

২২) আলালের ঘরের দুলাল—টেকচাঁদ ঠাকুর

২৩) জঙ্গল থেকে জলারণ্য—মলয়রঞ্জন আইচ সরকার

২৪) বাংলা প্রবাদ শ্রী সুশীল কুমার দে সম্পাদিত। এই উপন্যাসে ব্যবহৃত প্রবাদগুলি মূলত এই বই থেকে নেওয়া হয়েছে।

২৫) পল্লীচিত্র—শ্রী দীনেন্দ্র কুমার রায়

২৬) স্বপ্নজীবন—শ্রী শ্রী অন্নদাঠাকুর

২৭) Kolkata to Dhaka—Google Map.

২৮) WorldwideCyclone Tracking—YouTube

২৯) Conjectural map of Kolkata Available at Raja Binaya Krishna Deb’s ‘The Early History and Growth of Calcutta, 1905 & A.K. Ray’s ‘A Short History of Calcutta’ 1902

৩০) জ্যোতিষ রত্নাকর—উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সঙ্কলিত

৩১) Al Biruni and Indian Eras—R. N. Rai.

৩২) Varahamihira, The Best Sanskrit Source of Al—Biruni on Indian Jyotisa—Ghayasuddin

৩৩) গঙ্গারিডি ও বঙ্গভূমি—ড. প্রভাত কুমার ঘোষ

৩৪) গৃহস্থ জীবন—শ্রী অম্বিকাচরণ গুপ্ত

৩৫) চিরঞ্জীব বনৌষধি—শিবকালী ভট্টাচার্য

৩৬) বাঙলা ও বাঙালীর বিবর্তন—ড. অতুল সুর

৩৭) সতীদাহ—শ্রী কুমুদনাথ মল্লিক।

৩৮) বাংলার লৌকিক শব্দকোষ—ড. কামিনীকুমার রায়

৩৯) কলকাতা সেকালের ও একালের—শ্রী হরিসাধন মুখোপাধ্যায়

৪০) পৃথিবীর তাঁতঘর—সুশীল চৌধুরী