Course Content
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
0/42
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬৬

।। ছেষট্টি।।

মাধবী বসাক বললেন, ‘ইয়োর অনার, আমার প্রথম সাক্ষী পুলিশ ইন্সপেক্টর রামকুমার দুবে।’ কোর্টের পুলিশ দরজা খুলে বাইরে অপেক্ষমান সাক্ষীকে ডাকতে গেল। একটু পরে কোর্টরুমে প্রবেশ করল একজন গোঁফওয়ালা লম্বা- চওড়া বয়স্ক মানুষ। এঁকে নমিতা লালবাজারে আগেই দেখেছে। রামকুমার দুবে উইটনেস ডেস্কে গিয়ে সত্যকথনের শপথ নিয়ে চেয়ারে বসল। মাধবী বসাক তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

‘গুড আফটারনুন, মিস্টার দুবে,’ মাধবী বসাকের সৌহার্দ্যপূর্ণ গলা।

‘গুড আফটারনুন, ম্যাডাম।’

‘মিস্টার দুবে, আপনি আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় কোর্টকে দেবেন প্লিজ?’

‘ইয়েস ম্যাডাম। আমার নাম রামকুমার দুবে। আমি কলকাতা পুলিশের ইনস্পেক্টর পদে কাজ করি।’

‘কত বছর আপনি কলকাতা পুলিশে?’

‘একুশ বছর।’

‘আপনার বর্তমান পোস্টিং কোথায়?’

‘লালবাজার।’

‘আপনার বর্তমান কাজের দায়িত্ব কী?’

‘আমি কলকাতা পুলিশের পাব্লিক সার্ভেলেন্স ক্যামেরা সিস্টেমের কন্ট্রোল রুমের সুপারভাইজার।’

‘দুবেজী, একটু ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলবেন প্লিজ?’

‘কলকাতায় ক্রাইম প্রিভেনশনের জন্য, ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের সুবিধার জন্য, আর মানুষ ও প্রপার্টির সিকিউরিটি আর প্রোটেকশনের জন্য শহরের বিভিন্ন জায়গায় হাজার খানেক পাব্লিক সার্ভেলেন্স ক্যামেরা বসানো আছে। এই নজরদার সিসি ক্যামেরার মনিটরিং হল আমাদের কাজ।’

‘কোথা থেকে এই মনিটরিং হয়?’

‘কিছু লোকেশনের ক্যামেরার মনিটরিং করা হয় আমাদের পাব্লিক সার্ভেলেন্স ক্যামেরা সিস্টেমের কন্ট্রোল রুম থেকে, আবার কোনো কোনো ক্যামেরার নজর রাখেন স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের অধিকারিকরা। এই সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের ছাতে, রাস্তার ইমপর্টেন্ট জংশনে ইলেকট্রিক পোলের মাথায় এবং

আরো নানা জায়গায় বসানো আছে।’

‘এরা কি চব্বিশ ঘন্টা পথঘাটের চলাচল রেকর্ড করতে থাকে?’

‘এদের অনেক ক্যামেরা মোশন সেন্সিটিভ, আবার অনেক ক্যামেরা রাউন্ড- দ্য-ক্লক রেকর্ডিং করে।’

‘আপনার কাজটা ঠিক কী?’

‘আমাদের সার্ভেলেন্স মনিটরিং সেন্টারে এই সমস্ত ক্যামেরার ভিডিও ও ডাটা সংগ্রহ করা হয়। আমি এই ডাটা মেইনটেন্সের ইনচার্জ।’

‘এই রিপোর্টগুলো কতদিন স্টোর করা থাকে?’

‘ত্রিশ দিন। যদি পুলিশ বা আদালত তার মধ্যে আমাদের কাছে রিপোর্ট চায়, আমরা সেই তারিখ ও সময়ের রেকর্ডিং পুলিশের হাতে রিলিজ করে দিই।’

‘মিস্টার দুবে, এই ট্রায়ালের প্রিপারেশনের উদ্দেশ্যে আমি আপনার সঙ্গে কি কিছু আলোচনা করেছি?’

‘ইয়েস ম্যাডাম।’

‘যে লোকেশনে ড. আরুষি মিশ্রের অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে, সেখানকার রাস্তার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ কি আপনাদের সেন্টার থেকে হয়?’

‘ইয়েস ম্যাডাম।’

‘ড. আরুষি মিশ্রের অ্যাক্সিডেন্টের সিনটা কি আপনাদের সিসি ক্যামেরা রেকর্ড করেছে?’

‘ইয়েস ম্যাডাম।’

এবার মাধবী বসাক উইটনেস বক্সের দিকে এগিয়ে গেল। একটা পেন ড্রাইভ উইটনেস বক্সে রামকুমার দুবের হাতে দিয়ে বললেন, ‘মিঃ দুবে, এই পেন ড্রাইভটা আপনি চিনতে পারেন?’

রামকুমার দুবে পেন ড্রাইভটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘ইয়েস ম্যাডাম। ‘কীভাবে চিনতে পারলেন?’

‘এর ওপরে আমার সই করা আছে।’

‘এই পেন ড্রাইভটা কি আপনি আমাকে দিয়েছেন?’

‘ইয়েস ম্যাডাম।’

‘এতে কী আছে মিস্টার দুবে?’

‘এতে ড. আরুষি মিশ্রের গাড়ি অ্যাকসিডেন্টের রেকর্ডিং ডাউনলোড করা

আছে।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার দুবে,’ মাধবী বসাক ওর ল্যাপটপে ফিরে গেল—ইয়োর অনার অপোজিং কাউন্সেলের অবজেকশন না থাকলে আমি এটা আদালতে একজিবিট থ্রি হিসেবে জমা করতে চাই।’

‘নো অবজেকশন,’ আহুজা বলল।

‘একজিবিট থ্রি অ্যাকসেপেটেড অ্যাজ এভিডেন্স,’ জাজ বললেন।

‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার’ মাধবী বসাক বললেন। ‘আমি এটা পাবলিশ করার পারমিশন চাই।’

‘পারমিশন গ্র্যান্টেড।’

এবার মিস বসাক পোডিয়ামে রাখা ল্যাপটপে ভিপিএন দিয়ে ই-ড্রাইভে লগ ইন করে পেন ড্রাইভের ফাইলগুলোর লিস্টে গিয়ে একটা ফাইলে ক্লিক করার আগে বললেন, ‘ইয়োর অনার, এটা অ্যাকসিডেন্ট স্পটের সিসি ক্যামেরার রেকর্ডিং—’

কোর্টের পুলিশ কোর্টরুমের আলো কম করে দিল। বিশাল স্ক্রিনে রাতের অন্ধকারের রাস্তার দৃশ্য ভেসে উঠল। ভেসে উঠল একটা ট্রাক আর একটা হন্ডা সিভিকের হেড অন কলিশনের দৃশ্য। ট্রাকটা রং সাইডে হন্ডা সিভিকের মুখোমুখি এসে গেল। সিভিকটা বাঁচবার জন্য ডানদিকে পাশ কাটাবার চেষ্টা করল। ট্রাকটা হন্ডার বাঁ-দিকে ধাক্কাটা লাগল। হন্ডাটা ছিটকে ডান দিকে কাত হয়ে রাস্তার ধারে একটা ল্যাম্প পোস্টে ধাক্কা মেরে দাঁড়িয়ে গেল। নমিতা আতঙ্কে চোখ দু’হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল। মিস বসাক সিনটা পজ করে বললেন, ‘এবার আসল দৃশ্যটা দেখা যাক।’ নমিতা উত্তেজনায় সামনে ঝুঁকে দেওয়ালের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। নমিতা দেখল ধাক্কা মেরে ট্রাকটা দাঁড়িয়ে গেল। একটা লোক মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ পরে ওই ট্রাক থেকে নামল। লোকটার কাঁধে একটা ব্যাগ আর হাতে একটা বোতল। লোকটা ছুটে হন্ডার প্যাসেঞ্জার সাইডের ভাঙা কাঁচের জানলার মধ্যে দিয়ে মাথা গলিয়ে ওই বোতলের ছিপি খুলে কিছু তরল গাড়ির ভিতরে ছিটিয়ে দিল। তারপর লোকটা বোতলের মুখে মুখ লাগিয়ে নিজে এক চুমুক দিল। এক মুহূর্ত পরে লোকটা বোতলে আরেক চুমুক দিল। তারপর বোতলের ছিপি বন্ধ করে গাড়ির ভিতরে ড্রাইভারের পায়ের কাছে বোতলটা ছুঁড়ে দিল। এরপর একটা ব্যাগ পিছনের সিটে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড়ে ফিরে এসে ট্রাকে উঠল আর ট্রাকটা রওনা দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।’

‘লাইট প্লিজ,’ মিস বসাক অন্ধকারে বললেন।

আবার কোর্টরুম আলোকিত হয়ে উঠল।

‘মিঃ দুবে, এই ভিডিওটাই আপনি আমায় দিয়েছেন কলকাতা পুলিশের তরফ থেকে?’

‘ইয়েস ম্যাডাম।’

‘কীভাবে বুঝলেন এটাই ড. আরুষি মিশ্রের অ্যাকসিডেন্ট?’

‘আমাদের কোনো কোনো স্পটে ক্যামেরায় প্যান, জুম ও টেলিলেন্স থাকে আর কোনো জায়গায় ৩৬০ ডিগ্রী ভিশন ক্যামেরা থাকে, তাছাড়াও আমাদের লাইসেন্স প্লেট রেকগনিশন সফটওয়ার থাকে। হণ্ডা সিভিকের লাইসেন্স প্লেট আমাদের ক্যামেরা আইডেন্টিফাই করেছে, কিন্তু, ট্রাকের নাম্বার প্লেটটা ফেক।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার দুবে, মিস বসাক বললেন। ‘আই হ্যাভ নো মোর কোয়েশ্চেন ফর ইউ।’

‘মিঃ আহুজা, এনি ক্রশ কোয়েশ্চেন?’

‘ইয়েস ইয়োর অনার,’ আহুজা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠল। ‘মিস্টার দুবে, এই ক্যামেরা নিশ্চয়ই পরবর্তী অংশও রেকর্ড করেছে। আই মিন কীভাবে ড. আরুষি মিশ্রকে পুলিশ এসে হাসপাতালে নিয়ে গেল, কীভাবে এই গাড়িটা পুলিশের টো-ট্রাক এসে তুলল এটসেট্রা এটসেট্রা?’

‘ইয়েস স্যার।’

‘এই রেকর্ডিং পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড?’

‘ইয়েস স্যার।’

‘আপনাদের ডিপার্টমেন্টে কে কে এই পাসওয়ার্ড জানে?’

‘আমি এবং মনিটরিং রুমের দু’জন সুপারভাইজার।’

‘এই ভিডিও দেখে বুঝব কীভাবে কবে ঘটেছে এই ঘটনা?’

‘ভিডিওর উপরে ডেট, টাইম লেখা আছে। আপনি স্ক্রিনে দেখতে পাচ্ছেন ফিফথ আগস্ট, রাত সাড়ে এগারোটা।’

‘নো মোর কোয়েশ্চেন ইয়োর অনার।’

‘এনি রিডাইরেক্ট, মিস বসাক?’

‘নো রিডাইরেক্ট কোয়েশ্চেন ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন।

‘থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার দুবে। আপনি যেতে পারেন,’ জাজ বললেন। ‘মিস বসাক আপনার পরের সাক্ষী কেউ আছেন?’

‘ইয়েস ইয়োর অনার। আমার পরের সাক্ষী কলকাতা পুলিশের ইন্সপেক্টর মিস্টার অবিনাশ ভরদ্বাজ।’

এবার পুলিশের ইউনিফর্ম পরে চশমা পরা অতীব গাম্ভীর্যপূর্ণ মুখে একজন অল্পবয়সী পুলিশ কোর্টরুমে প্রবেশ করলেন। একই রকম ভাবে ইন্সপেক্টর ভরদ্বাজ এসে শপথ নিয়ে উইটনেস ডেস্কে এসে বসলেন। প্রাথমিক পরিচয়ের পর মিস বসাক জিজ্ঞাসা করলেন—

‘মিঃ ভরদ্বাজ, আপনি কি এই কেসের তদন্তকারী পুলিশ অফিসার?’

পুলিশ অফিসার মাথা নাড়ালেন। জাজ আবার বললেন, ‘মিস্টার ভরদ্বাজ, আপনার মাথা নাড়ানো কোর্ট ট্রান্সক্রিপ্টে রেকর্ডিং হয় না। আপনি ইয়েস অর নো বলুন।’

‘ইয়েস, ইয়োর অনার।’

মিস্টার ভরদ্বাজ, আপনি কি কোর্টকে বলবেন পুলিশ কীভাবে এই অ্যাকসিডেন্টের কথা জানতে পারে?’

‘ট্রাফিক পুলিশ রাতের পেট্রোলে বেরিয়ে গাড়িটা রাস্তার ধারে দেখতে পায়। ওরা আমাদের কাছে কেসটা হ্যান্ডওভার করে।’

‘পুলিশ কেন ড. আরুষি মিশ্রের নামে ড্রাঙ্কেন ড্রাইভিং এর চার্জ আনে? ‘দুর্ঘটনাস্থলে পুলিশ গাড়ির ভিতর থেকে নার্কোটিক্স উইডস আর আধ খাওয়া মদের বোতল পেয়েছিল।’

‘ড. আরুষি মিশ্রের ব্লাড অ্যালকোহল কনটেন্ট কি 0.03% এর বেশি ছিল?’

‘BAC টেস্ট করা হয়নি।’

‘কেন?’

‘ঘটনাস্থলের পুলিশ বলে যে গাড়ির ড্রাইভার অ্যাকসিডেন্টে অচৈতন্য। তখন ড্রাইভারের প্রাণ বাঁচানোই পুলিশের প্রথম দায়িত্ব ছিল।’

‘BAC টেস্ট না করে কীভাবে বুঝলেন উনি মদ খেয়েছিলেন?’

‘ওঁর মুখে মদের গন্ধ পাওয়া গেছে, জামায় গলার কাছে কিছুটা জায়গায় মদে ভেজা ছিল, পায়ের কাছে আধ খাওয়া মদের বোতল পাওয়া গেছিল।’

‘হাসপাতালে কী আপনি ড. আরুষি মিশ্রের ব্লাড রিপোর্ট দেখেছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী দেখলেন আপনি?’

‘আমি তদন্তের জন্য হাসপাতালে গেছিলাম। ওদের রিপোর্ট দেখেছি। ব্লাডে অ্যালকোহল ছিল সেরকম কিছুই রিপোর্টে লেখা নেই।’

‘আপনি কী গাড়িটা চেক করেছিলেন?’

‘হ্যাঁ। আমি অ্যাকসিডেন্টের স্পটে গিয়ে গাড়ির ভিতর চেক করেছিলাম।’

‘চেক বলতে আপনি ঠিক কী করলেন?’

‘বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে গাড়ির ছবি নিলাম, আর তারপর আমাদের ফরেনসিক স্পেশালিস্ট গাড়ির ভিতর থেকে ডিএনএ স্যাম্পেল কালেক্ট করল।’

‘আপনারা কি সব অ্যাকসিডেন্টেই এই ডিএনএ স্যাম্পেল কালেক্ট করেন?’

‘না, এটা হিট অ্যান্ড রান। আমাদের এটা অ্যাটেম্পট টু মার্ডার বলে সন্দেহ হয়েছে। গাড়ির চালকের ভাগ্য খুব ভাল যে উনি বেঁচে গেছেন।

‘কোথা থেকে ডিএনএ স্যাম্পেল নিয়েছিলেন?’

‘তিন জায়গায়। গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল, গাড়ির শিফট স্টিক, আর গাড়ির ভিতর পাওয়া একটা অল্প খাওয়া মদের বোতলের ছিপি খুলে আমি বোতলের মুখের লালা সোয়াব করে ডিএনএ টেস্টের জন্য ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠাই।’

‘ফরেনসিক ল্যাব রিপোর্ট কি পেয়েছেন?’

‘ইয়েস ম্যাডাম।’

‘কী পেয়েছেন তা কি আপনি জাজকে বলবেন প্লিজ?’

‘মদের বোতলের মুখের লালার ডিএনএ আর ড. আরুষি মিশ্রের ডিএনএ ম্যাচ করে না। অ্যাকচুয়ালি মদের বোতলের মুখের ডিএনএ পুরুষের ডিএনএ। আর স্টিয়ারিং হুইল এবং স্টিক শিফটের হ্যাণ্ডেলের ডিএনএ মহিলার ডিএনএ।’

‘আপনি কি ড. আরুষি মিশ্রের বাকল ডিএনএ কালেক্ট করেছেন?’

‘ইয়েস ম্যাম।’

‘ড. আরুষি মিশ্রের বাকল, মানে গালের ভিতর থেকে সোয়াব করা ডিএনএ কি গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলের ডিএনএর সঙ্গে মেলে?’

‘ইয়েস ম্যাম।’

‘ড. আরুষি মিশ্রের ডিএনএ কি গাড়ির শিফট স্টিকের ডিএনএর সঙ্গে মেলে?’

‘ইয়েস ম্যাম।’

‘তার অর্থ কি এই হয় যে ড. আরুষি মিশ্র নয় অন্য কোনো পুরুষ ওই মদের বোতল খুলে চুমুক মেরেছে?’

‘ইয়েস, ম্যাম।’

‘এই ডিএনএ অ্যানালিসিস ভুল হওয়ার প্রবাবিলিটি কত?’

‘ওয়ান ইন থ্রি হান্ড্রেড টোয়েন্টি বিলিয়ন, ম্যাম।’

‘বিলিয়ন?’

‘ইয়েস ম্যাম, একশো কোটি।’

‘মিস্টার ভরদ্বাজ, থ্যাঙ্ক ইউ।’ মিস বসাক বললেন। মাধবী বসাক ওর ল্যাপটপে ফিরে গেল—‘ইয়োর অনার অপোজিং কাউন্সেলের অবজেকশন না থাকলে আমি এটা আদালতে একজিবিট ফোর হিসেবে জমা করতে চাই।

‘নো অবজেকশন,’ আহুজা বলল।

‘একজিবিট ফোর অ্যাকসেপেটেড অ্যাজ এভিডেন্স,’ জাজ বললেন।

‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই।’

‘মিস্টার আহুজা, এনি ক্রশ কোয়েশ্চেন?’ জাজ বললেন।

‘নো কোয়েশ্চেন ইয়োর অনার।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার ভরদ্বাজ,’ জাজ বললেন। ‘আপনি যেতে পারেন।’

পুলিশ অফিসার বেরিয়ে গেল। জাজ বললেন, ‘আধ ঘন্টার রিসেস।’

আধ ঘন্টা পর বিচার আবার শুরু হল। মিস বসাক বললেন, ‘ইয়োর অনার, আদালত অনুমতি দিলে আমি জাজের সামনে সুশ্রুত আয়ুর্বেদ কোম্পানির মালিক ড. আরুষি মিশ্রকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই।’

‘প্লিজ প্রসিড,’ জাজ বললেন।

একজন কোর্টরুম পুলিশ আরুষির হুইলচেয়ার ঠেলে উইটনেস ডেস্কের পাশে এনে দাঁড় করালো। আরুষি সত্যকথনের শপথ নিল।

মিস বসাক বললেন, ড. আরুষি মিশ্র, আপনি কি সুশ্রুত আয়ুর্বেদ কোম্পানির বর্তমান মালিক এবং সিইও?’

‘হ্যাঁ।’

‘ভারতের বাজারে ‘বিষহরি’ নামে যে সাপের বিষের প্রতিষেধক ওষুধ আপনারা বিক্রি করেন, তা আপনাদের ফ্যাক্টরিতে তৈরি?’

‘ইয়েস ম্যাম।’

‘এই ওষুধ কবে লঞ্চ করা হয়েছিল?’

‘তেরো বছর আগে।’

‘সাল তারিখটা মোটামুটি বলতে পারবেন?’

‘হ্যাঁ, মার্চ ২০০৬-এ।’

‘আপনার কাছে কি সেই ওষুধ বিক্রির কোনো প্ৰমাণ আছে?’

‘হ্যাঁ। আমি আগে কোর্টে প্রমাণের এভিডেন্স জমা করেছি। সেখানে আমার সকল কাস্টমারের নাম, ঠিকানা, কে কবে কত ওষুধ কিনেছে তার ডিটেল লেখা আছে।’

‘ইয়োর অনার, কাউন্সিল মিঃ আহুজার অবজেকশন না থাকলে আমি সেই লিস্ট এই ট্রায়ালের একজিবিট ফাইভ হিসেবে কোর্টে অ্যাডমিট করতে চাই।’

‘নো অবজেকশন,’ আহুজা বলল।

‘একজিবিট ফাইভ অ্যাডমিটেড,’ জাজ বললেন।

মিস বসাক মিনারেল ওয়াটারের বোতল খুলে এক চুমুক লাগিয়ে ছিপি বন্ধ করতে করতে বললেন, ‘ড. মিশ্র, এই ওষুধের আবিষ্কারক কে?

‘আমার দাদু সুব্রত মিশ্র এই ওষুধের ফর্মুলা ২০০৪ সালে কবিরাজ ধন্বন্তরি দাসের থেকে কিনেছিলেন। সেই ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করে আমাদের কোম্পানির ল্যাবরেটরিতে এই ‘বিষহরি’ নামের ওষুধ তৈরি করা হয়।’

‘ধন্বন্তরি দাস মানে ড. তথাগত দাসের বাবা, তাই কি?’

‘হ্যাঁ।’

‘এই ওষুধ যে কেনা হয়েছিল তার কোনো লেখাপড়া আছে?’

‘হ্যাঁ। আমার বাবা নিজে উকিল ছিলেন। তাই লেখাপড়া পাকা করে রেখেছিলেন।’

‘এই ট্রায়ালের প্রিপারেশন হিসেবে আপনি কি আমাকে সেই কাগজ দেখিয়েছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘দেখুন তো এটাই কি সেই লেখাপড়া করা চুক্তি?’ মিস বসাক আরুষির কাছে একটা কাগজ নিয়ে আরুষিকে দিলেন। আরুষি কাগজটা দেখে বলল, ‘হ্যাঁ।’

‘ইয়োর অনার, আমি এই এগ্রিমেন্টটা একজিবিট সিক্স হিসেবে আদালতে জমা করার অনুমতি চাইছি,’ মিস বসাক বললেন।

‘পারমিশন গ্র্যান্টেড,’ জাজ বললেন।

‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার,’ মিস বসাক কাগজটা কোর্ট ক্লার্কের কাছে দিয়ে নিজের আসনের কাছে ফিরে এলেন। ‘ড. মিশ্র, এই ওষুধ বিক্রির জন্য আপনার লাইসেন্স আছে?’

‘হ্যাঁ।। ২০০৯ সাল থেকে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অব ইন্ডিয়া আয়ুর্বেদিক প্রোডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এর জন্য AYUSH সার্টিফিকেশন শুরু করেছে। আমাদের কোম্পানির এই ‘বিষহরি’ প্রোডাক্ট আয়ুষ সার্টিফায়েড।’

‘AYUSH?’

‘আয়ুর্বেদ, ইয়োগা এন্ড ন্যাচারোপ্যাথি, ইউনানি, সিদ্ধা এবং হোমিওপ্যাথি থেকে এই অ্যাক্রোনিম তৈরি হয়েছে।’

‘দেখুন তো ড. মিশ্র, এটাই কি সেই সার্টিফিকেট যেটা আপনি আমায় দেখিয়েছিলেন এই ট্রায়ালের প্রিপারেশনের জন্য?’ মিস বসাক আরুষির কাছে একটা কাগজ নিয়ে আবার এগিয়ে গেলেন। আরুষি কাগজটা দেখে বলল, ‘হ্যাঁ, এটাই সেই লাইসেন্স।’

‘ইয়োর অনার, আমি এই এগ্রিমেন্টটা একজিবিট সেভেন হিসেবে আদালতে জমা করার অনুমতি চাইছি,’ মিস বসাক বললেন।

‘পারমিশন গ্র্যান্টেড,’ জাজ বললেন।

‘থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োর অনার,’ মিস বসাক কাগজটা কোর্ট ক্লার্কের কাছে দিয়ে নিজের আসনের কাছে ফিরে এলেন। তারপর আবার আরুষিকে প্রশ্ন করলেন, ‘ড. মিশ্র, ড. তথাগত দাস আপনাদের কোম্পানিতে কাজ করেছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘উনি কি এই ‘বিষহরি’ প্রোডাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস আপনাদের ল্যাবে দেখেছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘উনি কি এই ওষুধের ফর্মুলা দিয়ে অ্যামফার্মার জন্য ওষুধ বানাবার প্রস্তাব আপনার কাছে এনেছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘ড. তথাগত দাসের কাছে কি আপনাদের সুশ্রুত আয়ুর্বেদ কোম্পানির ল্যাবরেটরির অ্যাকসেস ছিল?’

‘হ্যাঁ।’

‘ড. দাসের পক্ষে কি আপনাদের ল্যাবরেটরি থেকে ‘বিষহরি’র ফর্মুলা এবং প্রোডাকশন সম্বন্ধীয় যাবতীয় তথ্য আহরণ করা সম্ভবপর ছিল?’

‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ আহুজা গর্জে উঠল। ‘লিডিং কোয়েশ্চেন।’

‘অবজেকশন সাসটেইন্ড,’ জাজ বললেন।

‘ইয়োর অনার আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই,’ মাধবী বসাক বসে পড়লেন। এবার সমীর আহুজার ক্রশ কোয়েশ্চেন করার পালা।

‘ড. মিশ্র, আপনার কথা থেকে যা বুঝলাম এই ওষুধ আপনাদের আবিষ্কার না। কারেক্ট?’

‘আমি বলেছি যে—’

‘ইয়েস অর নো?’

‘এই কোয়েশ্চেনের উত্তর ইয়েস নো তে দেওয়া যায় না,’ আরুষির গলার স্বরে বিরক্তি। ‘এর ফর্মুলা আমাদের না। কিন্তু ওষুধটা ল্যাবরেটরিতে আমরা সেই ফর্মুলা থেকে তৈরি করেছি।’

‘আপনারা এই ঔষধের পেটেন্ট নেননি কেন?’

‘কারণ ওই ফর্মুলা আমাদের না। ওটা বহুকাল থেকে আয়ুর্বেদ কমিউনিটিতে প্রচলিত ওষুধ। আমরা ওর ম্যানুফ্যাকচার করেছি মাত্র। তাই—’

‘ড. মিশ্র, সুশ্রুত ও ধন্বন্তরি কবিরাজের মধ্যে যে কন্ট্রাক্ট সাইন করা হয়েছে তাতে কি ওষুধের ফর্মুলাটা লেখা আছে?’

‘না,’ আরুষি ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

‘তার মানে সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসেবে অন্য কোনো ওষুধের ফর্মুলাও সেই চুক্তিতে বিক্রি হওয়া সম্ভব, তাই নয় কি?

আরুষি নিরুত্তর। ‘সম্ভব? ইয়েস?’

‘ইয়েস।’

‘সর্পগন্ধা বা গন্ধনাকুলীর ওষধি যে ভারতে প্রাচীনকালে সর্প দংশনের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হতো তার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ আমার অপোজিং কাউন্সিল কোর্টে পেশ করেননি,’ আহুজা বলল। ‘বার্ডেন অব প্রুফ কিন্তু আপনার ড. মিশ্র। বলুন, আপনার কাছে আছে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ?’

এবার আরুষি নিরুত্তর। নমিতার এবার অস্বস্তি শুরু হল। আহুজার মুখে যেন বিজয়ীর হাসি।

‘তাহলে?’ আহুজা সদর্পে বলল। ‘কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, কারেক্ট?’

‘আছে ঐতিহাসিক প্রমাণ,’ এবার দর্শকদের মধ্যে থেকে কথাটা ভেসে এল। ‘সেটা কিন্তু বাবলু জানে। বাবলুকে আমি পড়িয়েছি

নমিতা পাশে তাকাল। গগন হকারের পাশে হাত তুলেছে ধন্বন্তরি কবিরাজ। ‘কে আপনি? আপনি চুপ করুন!’ সমীর আহুজা গর্জে উঠল। ‘কোর্টের কাজে আপনি বাধা দিচ্ছেন!’

ধন্বন্তরি কবিরাজ আহুজাকে এতটুকু পাত্তা না দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে জাজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধর্মাবতার, বাবলু হল আমার ছেলে ড. তথাগত দাস। ওকে আমি শিখিয়েছি। ছোটবেলায় ওকে মুখস্থ করিয়েছি, বিদ্যাও জানে এই শ্লোক নাকুলী সুরসা নাগসুগন্ধা গন্ধনাকুলী—’

গগন হকারের চোখে দৃশ্যটা ভেসে উঠল—ট্রেনের এক কামরা মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে উঠে এই নির্ভীক মানুষটা সেদিন প্রতিবাদ করছে। আজ এই কোর্টে সত্য কথা বলতে এই মানুষ ভয় পাবে? গগন দেখল ন্যুব্জ মানুষটার মেরুদণ্ড ঋজু হয়ে উঠেছে, উন্নত মস্তক ‘নকুলেষ্টা, ভুজঙ্গাক্ষী, সর্পাক্ষী বিষনাশনী—’

‘অর্ডার অর্ডার,’ জাজ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে হাতুড়ি ঠুকলেন। ‘আপনি আর একটা কথা বললে আপনাকে বের করে দেব।’

গগন তাড়াতাড়ি ধন্বন্তরি কবিরাজের হাত ধরে বসিয়ে দিল।

আহুজা তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পাল্টে আরুষির দিকে মিসাইল ছুঁড়ল—‘ড. মিশ্র, আপনি একবার অ্যাবরশন করিয়েছিলেন এটা কি সত্যি?’

আরুষি এই প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল। কোনো উত্তর দিল না।

‘অবজেকশন ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক হতাশায় রাগে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। ‘দিস ইজ ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন অব মাই ক্লায়েন্ট।’

‘অবজেকশন সাস্টেইন্ড,’ জাজ বললেন। ‘মিস্টার আহুজা আপনি কী প্ৰমাণ করতে চাইছেন?’

‘একটা রিভেঞ্জের মোটিভ থেকে ড. মিশ্র ড. তথাগত দাসের প্রফেশনাল ক্যারেক্টারে দাগ লাগাচ্ছেন। ড. মিশ্রের গর্ভের সন্তানের পিতা ছিলেন ড. তথাগত দাস। উনি ড. মিশ্রকে ওই বাচ্চা অ্যাবর্ট করতে বলেন। ইয়োর অনার ড. দাসকে লেখা এই ইমেইলটা আমি একজিবিট ফোর হিসেবে জমা করতে চাই। ড. মিশ্র যখন দেখলেন যে ড. দাস তাকে ডাম্প করেছেন তখন তিনি হিংস্র হয়ে উঠলেন। এই ইমেলে উনি ড. দাসকে ধমকি দিয়েছেন যে উনি ড. দাসের প্রফেশনাল লাইফ শেষ করে দেবেন।’

অবজেকশন ইয়োর অনার,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘অ্যাসাম্পশন। ‘অবজেকশন সাসটেইণ্ড।’

‘ঠিক আছে ইয়োর অনার’ আহুজা বলল। ‘আমার আর কোনো প্ৰশ্ন নেই। এই ইমেলটা লাস্ট একজিবিট হিসাবে অ্যাডমিট করার অনুমতি চাইছি।’

জাজ অনুমতি দিলে আহুজা ইমেইলটা কোর্ট ক্লার্কের কাছে জমা করে বললেন, ‘ধন্যবাদ ইয়োর অনার।’

জাজ বললেন, ‘কোর্ট ইজ অ্যাডজনড আনটিল টুমরো টেন এ এম

আরুষিকে দেখে মনে হচ্ছিল ও খুব ক্লান্ত। মেয়েটার জন্য নমিতার খুব শ্রদ্ধা হচ্ছিল। এই শরীরে এত কঠিন ইমোশনাল জেরার সম্মুখীন হওয়া সামান্য ব্যাপার না। ওর দাদু সুব্রত মিশ্র আর তার ড্রাইভার এসে আরুষির হুইল-চেয়ার ঠেলে কোর্টরুম থেকে বের করে গাড়িতে ওঠালো। নমিতা, বিদ্যাদি, আর গগন ওদের গাড়ি চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল। মিস বসাক কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন। নমিতা মিস বসাককে বলল, ‘কেমন বুঝছেন?’

‘কাল বিদ্যাধরী দেবীর টেস্টিমোনিটা ইমপরট্যান্ট,’ মিস বসাককে ক্লান্ত লাগছে। বিদ্যাদির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কাল আপনাকে বলতে হবে যে ‘বেহুলার খনা’ বইয়ের মেটিরিয়্যাল ওদের পেটেন্ট পাওয়ার পর লেখা হয়নি। ওটা অনেক আগে থেকেই ছিল। তবে ডিঙিবৃষ্টিকে টেনে আনবেই আহুজা। দেখা যাক কী হয় কাল।’