Course Content
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
0/42
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬৭

।। সাতষট্টি।।

২১ আগস্ট, ২০১৯

খুব ভোরে নমিতার মাথায় বজ্রপাত হল!

বিদ্যাদির ফোন—‘নমিতা, সর্বনাশ হয়ে গেছে!’

নমিতার বুকের ভিতর ধড়াস করে উঠল—‘কী হয়েছে বিদ্যাদি?’

‘আমাদের প্ল্যাটফর্মের স্কুলের রূপাকে কাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না,’ বিদ্যাদির গলাতে আতঙ্ক ঝরে পড়ছে।

‘পাওয়া যাচ্ছে না! সে কি? কীভাবে জানলে?’

‘আজ কোর্টে যেতে হবে, তাই আজও আমি আমাদের প্ল্যাটফর্মের স্কুল সকাল সাড়ে ছ’টায় রেখেছিলাম। ঠিক করেছিলাম কালকের মতো রোলকল করেই স্কুল ছুটি দিয়ে দেব। আর তারপর কোর্টে চলে আসব। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে মেয়েটা এল না। বাচ্চারা বলল কেউ ওকে দেখেনি। আমি তাড়াতাড়ি ওর রেললাইনের বস্তির ঝুপড়িতে গেলাম। ওখানে নেই। আমার খুব টেনশন হচ্ছে নমিতা।’

‘কেউ কিছু বলতে পারল না?’

‘ওদের বস্তির একজন বলল কাল বিকেলে কিছু মস্তান চেহারার লোক নাকি রূপার খোঁজ করতে রূপার বস্তিবাড়িতে এসেছিল। রূপা দূর থেকে ওদের দেখতে পেয়ে নাকি ওর বাচ্চাকে নিয়ে বস্তির পিছনের নালা দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেছিল। তারপর ওকে কাল সারা রাত আর দেখা যায়নি। ওই লোকগুলো নাকি আজ খুব সকালে আবার এসেছিল রূপার খোঁজে। ওরা নাকি রূপার বস্তি-বাড়ির ভিতর ঢুকে সব কিছু ওলট পালট করে কিছু খুঁজছিল।’

‘সর্বনাশ!’ নমিতার টেনশন শুরু হল। ‘তুমি এখন কী করবে?’

‘আমি একটা জায়গা জানি যেখানে ও লুকিয়ে থাকতে পারে। আমি সেখানে যাচ্ছি।’

‘বিদ্যাদি, আজ তোমায় কোর্টে সাক্ষী হিসেবে খুব দরকার। তুমি কোর্টে ঠিক সময় মতো আসতে পারবে তো?’

‘জানি না। কিন্তু এটা একটা ক্রিটিকাল সিচুয়েশন, একটু দেরি হয়ে গেলে এসব মেয়েদের ফিরে পাওয়া যায় না। আমি কিছুতেই এটা ইগনোর করতে পারছি না। দাদাও বাড়ি থেকে আসছে। আমরা দু’জনে মিলে রূপাকে খুঁজতে যাচ্ছি। মেয়েটাকে পেতে হবেই।’

‘বিদ্যাদি, তুমি একটু লাইনটা ধর, আমি মিস বসাককে থ্রি-ওয়ে কলে এটা জানাই।’

মিস বসাক কোর্টের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। উনি সব শুনে স্তম্ভিত। উনি কাতর স্বরে বললেন, ‘ও মাই গড!’ মিস বসাক চূড়ান্ত হতাশ। ‘মিস দাস, আপনাকে কিন্তু সকাল দশটায় কোর্টে আসতেই হবে। আপনি না এলে ওরা বলবে ‘বেহুলার খনা’ ত্রিশ বছর আগে লেখা হয়নি। আরুষির কেসটাই উইক হয়ে যাবে। জাজও গোটা ব্যাপারটাকে সন্দেহের চোখে দেখবে।’

‘কিন্তু মেয়েটাকে খুঁজে বের করা আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি, মিস বসাক। আমি রিয়্যালি সরি।’

‘তুমি কোথায় যাচ্ছ বিদ্যাদি?’ নমিতার শরীরেও অস্বস্তি ছেয়ে গেছে।

‘আমি ফোনে বলতে পারব না, নমিতা। আমার খুব সন্দেহ যে ওরা আমার ফোন ট্যাপ করছে। আমি যাওয়ার আগে ওরা রূপার কাছে পৌঁছে যাবে। একটা ঠিকানা আমি জানি, সেখানেই যাচ্ছি।’

‘আমার মনে হয় পুলিশে রিপোর্ট করা দরকার,’ মিস বসাক এবার কথা বললেন, ‘মিস দাস, আপনি বুঝতে পারছেন না, এটা প্রতিপক্ষের একটা চালাকি হতে পারে। ওরা চায় যেভাবেই হোক আপনাকে কোর্ট থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। আপনি সে ফাঁদে পা দেবেন না প্লিজ।’

‘আমি বুঝতে পারছি না আমি আর কী করতে পারি। মেয়েটাকে আমায় যে ভাবেই হোক বাঁচাতে হবেই, আমি রাখছি,’ বিদ্যাদি ফোন বন্ধ করল।

‘এখন কী করবেন মিস বসাক?’

‘সব কিছু গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। সব আমার দোষ, ড. স্যান্যাল! আমার কালই বিদ্যাধরী দেবীর টেস্টিমোনি নিয়ে রাখা উচিত ছিল।’ তারপর মিস বসাক বললেন, ‘আমরা প্রতিপক্ষকে সন্দেহ করছি, কিন্তু অন্য কারণও তো হতে পারে।’

‘মানে?’

‘আমি এখনও জানি না কেন বিদ্যাধরী দাস তার ভাইপোর সঙ্গে গোপনে দেখা করেছিল। কেন সে আমাদের কাছে সেই মিটিং এর কথা গোপন করে গেছে? মনসুর বলেছিল মনে আছে কারুকে বিশ্বাস করা উচিত না। এতদিন সব ঠিক ছিল। ঠিক আজকেই ওই মেয়েটা মিসিং। কোথায় পুলিশ মেয়েটার খোঁজ করবে, তা না মিস দাস আর ওর দাদাকে যেতে হচ্ছে মেয়েটাকে খুঁজতে! আচ্ছা এই ঘটনাটা সাজানো না তো? ওদের উদ্দেশ্য এটা না তো যাতে কোর্টে তথাগত দাস –’ মিস বসাক বাকি কথাটা শেষ করলেন না।

নমিতার মনে হলো মিস বসাকের কথাটা নিষ্ঠুর কুটিলতায় ভরা। মিস বসাক এবার বিচলিত গলায় বললেন, ‘আপনি একটু মাঝে মাঝে মিস দাসকে কন্ট্যাক্ট করার চেষ্টা করবেন, ড. স্যান্যাল? আমি এই ট্রায়ালের থেকে ফোকাস সরাতে চাইছি না। অনেক কিছু রিহার্স করতে হয়।’

‘আপনি চিন্তা করবেন না, মিস বসাক, আমি দেখছি,’ নমিতা ফোন বন্ধ করে আবার বিদ্যাদিকে ফোন করল, কিন্তু ফোন সুইচড অফ। সময় হয়ে আসছে, বার তিনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফোন রেখে নমিতা অস্থির মনে কোর্টে যাবার জন্য তৈরি হতে লাগল।

.

কোর্টরুমের বাইরে মিস বসাকের মুখ দেখে নমিতার মনে হলো মহিলার সুষুম্না দিয়ে চাপা টেনশন বয়ে যাচ্ছে। মিস বসাকের হাতে রোলার সুটকেস, ওঁর সঙ্গে ওঁর জুনিয়র দময়ন্তী। নমিতাকে দেখে দময়ন্তী ফিসফিস করে মিস বসাককে জানাল নমিতা এসে গেছে। মিস বসাক কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মিস দাসের কোনো খবর পেলেন?’

‘বিদ্যাদি ফোন তুলছে না।’

মিস বসাক অস্থির ভাবে বললেন, ‘শেম অন মি! কালই আমার বিদ্যাধরী দেবীর টেস্টিমোনিটা নিয়ে রাখা উচিত ছিল। আমার মন বলছে সব নাটক। কোর্টে না আসার ফন্দি।’

‘মিস বসাক, আপনি খুব স্ট্রেসে আছেন। বিদ্যাদি কিছুতেই সেরকম করবে না। আপনার কেসের অন্য ব্যাপারে ফোকাস করুন প্লিজ। সব ঠিক হয়ে যাবে, ‘ নমিতা আশ্বাস দিল। ‘তবে বিদ্যাদি না এলে এটা অন্তত আপনি বলতে পারবেন যে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনটা অনেক পুরোনো।’

‘কোর্টে ডিসার্টেশনের কপি এক্সিবিট হিসাবে জমা করবো, কিন্তু অরিজিন্যালটা জাজকে দেখানো দরকার। ওটা মিস দাস নিজের কাছে নিয়ে রেখেছেন। এসব প্রিপ্ল্যান্ড কনস্পিরেসি!’

‘আমি আপনাকে এব্যাপারে একটা ইমেল করে দিতে পারি অ্যাজ ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টি। আপনি জাজকে সেটা বলুন

‘আমি বললে জাজ মানবে না। উইটনেস আর এভিডেন্স দুটোই চাই। তারপর আহুজা ডিঙিবৃষ্টি নিয়ে তোলপাড় করবে। সেটা কী তাও বলতে পারব না। জানি না কী হতে চলেছে। আমি সবটা মা সারদার ওপর ছেড়ে রেখেছি। তাঁর যা ইচ্ছা -’ মিস বসাক সেলফোনে নোটস দেখতে লাগলেন।

নটা নাগাদ বিদ্যাদির ফোন এল। ‘বিদ্যাদির ফোন!’ নমিতা মিস বসাককে স্পিকারে দিল। বিদ্যাদির গলার স্বরে এখন খুশির ছোঁয়া—‘নমিতা, পাওয়া গেছে রূপাকে!’

‘পাওয়া গেছে!’ নমিতা উচ্ছ্বসিত। ‘তুমি এখন কোথায়?’

‘আমি ফোনে বলতে চাই না।’

‘তুমি কোর্টে সোজা আসছ তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘প্লিজ স্ট্রেট চলে এসো কোর্টে।’

‘চিন্তা করিস না। আমি দশটার মধ্যে কোর্টে পৌঁছে যাব।’

এবার মিস বসাক কথা বললেন, ‘ঠিক আছে মিস দাস, আপনি আসুন। আমি ভিতরে কোর্টরুমে থাকব। দময়ন্তী বাইরে কোর্টের সিঁড়িতে ওসময়

আপনার জন্য অপেক্ষা করবে।’

নমিতার ধড়ে প্রাণ এল। মিস বসাকের মুখ দেখে মনে হলো উনি খুব এমবেরাসড ফিল করছেন। নমিতার নিজেরও খুব খারাপ লাগছে যে ও নিজেও বিদ্যাদির ইন্টিগ্রিটি নিয়ে সন্দেহ করেছে। কিন্তু সেসব পরেও ভাবা যাবে। রোলার সুটকেস টানতে টানতে মাধবী বসাক কোর্টরুমে ঢুকে গেলেন।

এখন ফোকাস ট্রায়ালে।