Course Content
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু
0/42
বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১৮

।। আঠারো।।

কাপাসডাঙার মাঠ পেরোতে পেরোতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল বেহুলা। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার কুয়াশা মেখে কাপাসডাঙার মাঠে ছড়িয়ে গেছে। সামনের কাঁচা পথে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বিশ্বনাথ বলল, ‘সব কেমন হারিয়ে গেল। এখানে তাঁতিপাড়ার কী রমরমা ছিল! শ্রাবণে মনসাপুজো, চৈত্রমাসে শিবের গাজন, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে চব্বিশ প্রহরীয় হরিবাসর—বারোমাস পালাপার্বণে এক সময়ে এই তাঁতিপাড়া জমজমাট ছিল। অথচ আজ তাঁতিপাড়া শ্মশান।’

বেহুলা দেখল সত্যি কোনো মানুষজন নেই। মাঝে পুকুরটা একদম এঁদো হয়ে কচুরিপানায় ঢেকে গেছে, বোঁটকা গন্ধ ছড়াচ্ছে। বাঁশগাছগুলো বংশবিস্তার করে জঙ্গল হয়ে গেছে, এদিক ওদিক চালাঘরগুলো যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে, মাটির দেওয়াল স্থানে স্থানে গলে পড়ে গেছে, জন-মনিষ্যি নেই। সত্যি শ্মশান। একটা চারচালার সামনে একটু থামল বিশ্বনাথ। বাঁশের বাতায় বসানো খড়ের চালের অতি অল্পই অবশিষ্ট আছে। কঞ্চি, নল-খাগড়ার সরগাছের আঁটি ছাদে কাত হয়ে আছে। পাশে একটা ভগ্ন রথ। বিশ্বনাথ শূন্য ঠাকুর দালানে প্রণাম করল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘এখান থেকে নবচূড়া রথ বের হতো। আট দিন ধরে মেলা বসত কাপাসডাঙার মাঠে। পাকা কাঁটাল, আনারস থেকে শুরু করে ঘিয়োর, খাজা, কচুরি, মিঠাই, গজা কত কী বিক্রি হতো! কত রকমের গাছের চারা এই রথের মেলায় পাওয়া যেত—আমের কলম, নারকেলের চারা, লেবুর কলম, সুপারি, গোলাপ, জুঁই, টগর, শিউলি, বেল, কামিনী, গন্ধরাজ গাছের চারা কেনার এটাই ছিল সবচেয়ে ভালো সময়। ওটা ছিল রাসমঞ্চ। কত ধর্মনিষ্ঠ পরিবারের বাস ছিল এখানে।’ বিশ্বনাথ আবার চলতে শুরু করল। চলতে চলতে বলল, ‘ওটা আমার বন্ধু বুধনদের বাড়ি। আমি এখানে রোজ আসতাম।’ বিশ্বনাথ দাঁড়াল। মাটি লেপা ছিটে বেড়ার দেওয়াল ধসে যাওয়া কুঁড়ে। পাশে একটা ভাঙা তাঁতঘর। সেখানে তাঁতকলের কাঠামো খুলে ফেলা হয়নি, কিন্তু মাকু, জোয়া, ডাঙি, নরদ, দক্তি ভূলুণ্ঠিত হয়ে এদিক ওদিকে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বাড়িটা ঢেকে দিয়েছে আশশ্যাওড়ার জঙ্গল। বিষণ্ণ মুখে বিশ্বনাথ আবার চলতে শুরু করল।

আরো কিছু দূর হেঁটে বিশ্বনাথ একটা চারচালার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এখানে বাবা জ্যোতিষ চর্চা করত। আর পাশের এটা আমাদের বাড়ি।’ জ্যোতিষ- মন্দিরের ভগ্ন-দশা। শিয়ালকাঁটার ঝাড় জন্মেছে জ্যোতিষ-আশ্রমের দরমার দেওয়ালের চারপাশে। ভেরেণ্ডার ডালপালা ছড়িয়ে গেছে বেড়ায়। বোঝা যাচ্ছে অনেকদিন এই জ্যোতিষ-মন্দির বন্ধ।

পাশের ভিটের দরমা ও বাঁশ দিয়ে বাঁধা বেড়ার ভিতর থেকে তিনবার সন্ধ্যার শাঁখের আওয়াজ ভেসে এল। বেহুলা কপালে যুক্তকর ঠেকিয়ে দেবতাকে প্রণাম করল। শাঁখের আওয়াজ থামলে বিশ্বনাথ দরজায় ধাক্কা দিল।

দরজা খুলল একজন প্রৌঢ়া, পরনে কস্তাপেড়ে শাড়ি, তার ওপর জড়ানো একটা পুরোনো আলোয়ান। প্রৌঢ়ার শুকিয়ে যাওয়া শরীর, মুখে মায়ের দয়ার ঝঞ্ঝাবাতের চিহ্ন, ডান হাতে শাঁখ। বিশ্বনাথকে দেখে খুশিতে হাউমাউ করে উঠল—‘বিশে তুই! যাব আর আসব বলে বেরিয়ে এদ্দিন কোন আণ্ডিল দেশে ছিলি রে? বাড়ি ফেরার নামই নাই?’ তারপর পিছনে বেহুলার দিকে নজর পড়ল তার। চোখ কুঁচকে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখে বলল ‘এ আনখা ছুঁড়িটা কে রে বিশে? হ্যাঁরে বিশে! তুই বিয়ে করেছিস? বাপরে! অবাক কলি বোঝা ভার, গুপ্ত লীলা চমৎকার!’

‘সব বলছি, আগে ভিতরে আসতে দাও,’ বিশ্বনাথ ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল। বেহুলা পিছনে পিছনে ভিতরে ঢুকল। আঙিনায় তুলসী তলায় সাঁঝবাতি জ্বলছে। বিশ্বনাথ তুলসীগাছের দিকে তাকিয়ে কপালে হাত জোড় করে প্রণাম ঠুকল, তারপর বলল ‘বাবা কেমন আছে?’

‘দাদা সন্ধে থেকে জ্বরে কাঁপে। কম্বল জড়িয়ে বিছানায় শুয়ে। এখনো জেগে আছে। ভোরের দিকে অঘোরে ঘুমায়। মানুষটা একদম প্রায় শয্যাশায়ী।’

‘এ বচনপিসি, বিশ্বনাথ বেহুলাকে বলল। ‘পেন্নাম কর।’

‘থাক মা থাক,’ বচনপিসির বিস্ময় কাটেনি, তাই আবার বিশ্বনাথের দিকে তাকাল। ‘আহা! কী সুন্দর তোর বৌ জুটিয়েছিস বিশে! খড়ো ঘরে বেলোয়ারি ঝাড়, পগার আগাড়ে চন্দ্রহার!’

‘বৌ বৌ কোরো না তো পিসি, বিশ্বনাথ বিরক্ত। ‘একটু জিরোতে দাও, সব বলছি।’

উঠোনে মানুষের গলার আওয়াজ শুনে বিছানা থেকে উঠে এল অশীতিপর পাখমারা গণক। শীর্ণ অস্থিচর্মসার রুগ্ন শরীরে দোবজা জড়ানো, কোটরে ঢোকা চোখ, শ্বেতশ্মশ্রু। ‘কে বিয়ে করেছে রে বচন?’ কুঁজো হয়ে কাশতে কাশতে বেরিয়ে বিশ্বনাথকে দেখে আনন্দিত দু’চোখ, কিন্তু সঙ্গে বেহুলাকে দেখেই বৃদ্ধের দু’চোখ বিস্ময়ে অক্ষিকোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে এল ‘এ মেয়ে কে রে?’ বৃদ্ধ উত্তেজিত হয়ে বলল। ‘ওর মুখের সামনে পিদিমটা ভালো করে ধর তো বচন।’

বচনপিসি পিদিমটা বেহুলার মুখের কাছে ধরতেই বৃদ্ধ থরথর করে কেঁপে উঠল। তারপর অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে কি শেষ পর্যন্ত এলি তুই? কত বছর ধরে তোর জন্য অপেক্ষা করছি।’

বচনপিসি প্রতিবাদ করে বলল, ‘জ্বরে ভুগে ভুগে তোমার কি মাথাটা গেছে দাদা? কোথায় কত বছর? বিশে তো গত বছর দুগ্গাপুজোর পর মেলায় সং সাজার জন্য ঘর থেকে বেরল। দেড় বছরও হয়নি।’

‘কথাটা আমি বিশের উদ্দেশ্যে বলিনি, পাখমারা গণক গম্ভীর গলায় বলল।

‘তাহলে?’ বিশ্বনাথ অবাক। ‘এখানে আর কে আছে?’

এবার বচনপিসি গণকের দিকে এগিয়ে গেল। অতীব বিস্মিত কণ্ঠে বলল ‘কী বলছ তুমি দাদা!’ বচনপিসির কণ্ঠস্বরে কৌতূহল ঝরে পড়ছে—‘তবে এই কি সেই, যার আসার কথা ছিল?’

‘জানি নে। সময় সেটা বলবে। হলে ভালো, আর না হলে আরো কতদিন তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে কে জানে!’