খাওয়া শেষ করে বংশীধরের ভাগ্নেটি চলে গেল বটে, কিন্তু হাজারির প্রাণে যেন একটা নতুন সুরের রেশ রেখে গেল। তরুণ মুখের ভঙ্গি, তরুণ চোখের চাহনি থেকে এত প্রেরণা পাওয়া যায়? জীবনে এই সব নতুন অভিজ্ঞতা হাজারির।
বিকেলে চূর্ণীর ধারের গাছতলায় নির্জনে বসে সে কত স্বপ্ন দেখল। নতুন সব স্বপ্ন। টেঁপির সঙ্গে বংশীধরের ভাগ্নেটির বিয়ে হচ্ছে। কোনো বাধা নেই, তাদেরই পালটি ঘর।
টেঁপির ছোট, কোমল হাতখানি নরেনের বলিষ্ঠ হাতে তুলে দিয়েছে… দুজনের হাত এক করে হাজারি মেয়ে-জামাইকে আশীর্বাদ করছে… টেঁপির মার চোখ দিয়ে আনন্দে জল পড়ছে—কি সুন্দর সোনার চাঁদ জামাই!
ছেলেবেলায় কেন সে হোটেলে রাঁধুনিগিরি করতে যাবে? হাজারির নিজের হোটেলে জামাই থাকবে ম্যানেজার, চক্কত্তি মশাইয়ের মতো গদিতে বসে খদ্দেরকে টিকিট বিক্রি করবে—হিসাবপত্র রাখবে।
দ্বিগুণ কাজ করার উৎসাহ আসবে হাজারির—জামাইও যেমন, ছেলেও তেমন। অত বড়, অত সুন্দর, উপযুক্ত ছেলে। টেঁপির সারাজীবনের আনন্দ ও সাধের জিনিস। ওদের দুজনের মুখের দিকে চেয়ে সে প্রাণপণে খাটবে। তিন মাসের মধ্যে হোটেল দাঁড় করিয়ে দেবে।
বেলা পড়ল। চূর্ণীর খেয়ায় লোক পারাপার হচ্ছে, যারা শহরে কেনাবেচা করতে আসছিল—এখন তারা বাড়ি ফিরছে।
একবার কুসুমের সঙ্গে দেখা করে হোটেলে ফিরতে হবে—গাছতলায় বসে আর বেশি সময় আকাশকুসুম ভাবলে চলবে না। রতন ঠাকুর সম্ভব এবারও দেখা দেয়নি, তাকে একাই সব কাজ করতে হবে।
কিন্তু সত্যিই কি এ সব আকাশকুসুম? হোটেল তার হবে না? টেঁপির সঙ্গে ওই ছেলেটির বিয়ে—
যাক, বাজে ভাবনায় দরকার নেই। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
পদ্মঝি বিকেলে হাজারিকে বলল—বলি, হ্যাঁগো ঠাকুর, আজ মাছের মুড়োটা কি হলো গা? আজ তো কর্তাবাবুর জ্বর। তিনি বেলা এগারোটার মধ্যেই চলে গেছেন—অত বড় মুড়োটার একটা টুকরোও চোখে দেখতে পেলাম না—
হাজারি মাছের মুড়োটা লুকিয়ে কুসুমকে দিয়ে এসেছিল। বড় মাছের মুড়ো সাধারণত কর্তার বাসায় যায়, কিন্তু আজ কর্তার অসুখ—তিনি বেশি সময় হোটেলে ছিলেন না—মুড়োটা পদ্মঝি নিজের বাড়ি নিয়ে যেত—হাজারি কখনো মুড়ো নিজে খায়নি—রতনঠাকুর খেয়েছে, পদ্মঝি তো প্রায়ই নিয়ে যায়—হাজারির দাবি কি থাকতে পারে না মুড়োর ওপর? তাই সে সেটা কুসুমকে দিয়ে এসেছিল, ছুটি নিয়ে চূর্ণীর ঘাটে বেড়াতে গেলে।
পদ্মঝির প্রশ্নের উত্তরে হাজারি বলল—কেন গা পদ্মদিদি, এতক্ষণ পরে মুড়োর খোঁজ হলো?
—এতক্ষণ পরেই হোক আর যতক্ষণ পরেই হোক—কি হলো মুড়োটা?
—আমায় কি একদিন খেতে নেই? তোমরা তো সবাই খাও। আমি আজ খেয়েছি।
—কই, মুড়োর কাঁটা-চোখা তো কিছু দেখলাম না? কোথায় বসে খেলে?
হাজারির বিব্রত ভাব পদ্মঝির চোখ এড়াল না। সে চড়া গলায় বলল—খাওনি তুমি। খেলে কিছু বলতাম না। তুমি সেটা লুকিয়ে বিক্রি করেছ—কেমন ঠিক কথা কি না? চোর, জুয়াচোর কোথাকার—হোটেলের জিনিস লুকিয়ে বিক্রি? আচ্ছা, তোমার চুরির মজা টের পাইয়ে দিচ্ছি—আসুক কর্তা—
হাজারি বলল—না পদ্মদিদি, বিক্রি করব কাকে? রাঁধা মুড়ো কে নেবে? সত্যি আমি খেয়েছি।
—আবার মিথ্যে কথা? আমি এতকাল হোটেলে কাজ করে হাতে ঘষা পড়িয়ে ফেললাম, মাছের মুড়োর কাঁটা-চোখা আমি চিনিনে? অত বড় মুড়োটা চার আনার কম বিক্রি করনি। জমা দাও সে পয়সা গদিতে, নইলে দেখো কি হাল করি কর্তার সামনে।
—আচ্ছা, নাও চার আনা পয়সা—আমি দেব। একটু মুড়ো খেয়ে যদি দাম দিতে হয়—তাও নাও।
পদ্মঝি একটু নরম হয়ে বলল—তা হলে বেচেছিলে ঠিক?
—না পদ্মদিদি।
—তবে কি করলে ঠিক করে বলো।
—তোমার তো পয়সা পেলেই হলো, সে খোঁজে তোমার কি দরকার?
—দরকার আছে তাই বলছি—কোথায় গেল মুড়োটা? বলো—নইলে কর্তার সামনে তোমার অপমান করব। বল এখনই—
—আমি খেয়েছি।
—আবার? আমার সঙ্গে চালাকি করবে তুমি? আমি এবার বুঝতে পেরেছি মুড়ো কোথায় গেল।—তোমার সেই—
হাজারি জানে পদ্মঝি বলতে যাচ্ছে—সে পদ্মঝির মুখের কথা চাপা দিতে তাড়াতাড়ি বলল—পদ্মদিদি, তোমাদের তো খেয়ে-পরে মানুষ হচ্ছি গরীব ব্রাহ্মণ। কেন আর ও সামান্য জিনিস নিয়ে বকাঝকা কর?
এ কথায় পদ্মঝি নরম না হয়ে বরং আরও রেগে উঠল। বলল—নিজে খেলে কিছু বলতাম না ঠাকুর—কিন্তু হোটেলের জিনিস পরকে দিয়ে খাওয়ানো সহ্য হয় না। এর একটা বিহিত না করে আমি যদি ছাড়ি, তবে আমার নামে কুকুর পোষো, এ কথা সোজা বলে দিচ্ছি।
হাজারি ভয়ে ও উদ্বেগে কাঠ হয়ে গেল—নিজের জন্য নয়, কুসুমের জন্য। পদ্মঝির অসাধ্য কাজ নেই—সে না জানি কি করে বসবে—কুসুমের শাশুড়ির কানে হয়তো কত রকমের কথা তুলবে, তার ওপর যদি কুসুমের বাপের বাড়ীতে অর্থাৎ তার গ্রামে সে কথা পৌঁছায়—তবে উভয়েরই লজ্জায় মুখ দেখানো ভার হয়ে উঠবে। অথচ কুসুম নিরপরাধিনী। পদ্মঝি চলে গেল।
হাজারি ভেবে-চিন্তে রতনঠাকুরের শরণাপন্ন হলো। তার আত্মীয়কে বিনা পয়সায় খাওয়ার ষড়যন্ত্রে হাজারি ছিল—সুতরাং রতন হাজারির দিকে টানত। সে বলল—তুমি কিছু ভেবো না হাজারিদা, পদ্মদিদিকে আমি ঠাণ্ডা করে দেব। মুড়ো বাইরে নিয়ে যাবে, তা আমায় একবার জানালে হত না? তোমায় কত বুঝিয়ে দেব আমি?
কিছু পরে সন্ধ্যার দিকে বেচু চক্কত্তি এলেন। চাকর হুঁকায় জল ফিরিয়ে তামাক সেজে আনল। হুঁকা হাতে নিয়ে বেচু চক্কত্তি বললেন—ধুনো গঙ্গাজল দে আগে—আর পদ্মকে বাজারের ফর্দ দিতে বলে দে—
কয়লাওয়ালা মহাবীর প্রসাদ বসেছিল পাওনার আশায়—তাকে বললেন—সন্ধ্যের সময় এখন কি? ওবেলা তো সাড়ে বারো আনা নিয়ে গিয়েছ, আবার এবেলা দেওয়া যায়? কাল এসো। তোমার কি?
একটি রোগা কালো লোক হাত জোড় করে প্রণাম করে বলল—বাবু, সেদিন কুমড়ো দিয়েছিলাম—তার পয়সা।
—কুমড়ো? কে কুমড়ো নিয়েছে?
—আজ্ঞে বাবু, আপনাদের হোটেলে দিয়ে গিয়েছিলাম—ছ’আনা দাম বলেছিলাম, তা তিনি বললেন—পাঁচ পয়সা হবে। তা বললাম, ভদ্রলোকের কথা—তাই দ্যান। তিনি বললেন—আজ নয়, বুধবারে এসে নিয়ে যেও—তাই এলাম।
—ছ’আনা পয়সার কুমড়ো ধারে নিয়েছে কে—খাতায় কি বাজারের ফর্দে তো ধরা নেই, এ তো আশ্চর্য কথা। আমরা ধারে জিনিসপত্র কিনি না। যা কিনি তা নগদ। কে তোমার কাছে কুমড়ো নিলে? আচ্ছা দাঁড়াও, দেখি।
বেচু রতন ও হাজারি ঠাকুরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন—তারা কুমড়ো কেনা তো দূরের কথা—গত পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যে কুমড়োর তরকারিই রাঁধেনি, বলল—কোনো কুমড়ো চোখেও দেখেনি এই কয়দিনে।
কথাবার্তার মধ্যে পদ্মঝি বাজারের ফর্দ নিয়ে ঘরে ঢুকতেই কুমড়োওয়ালা বলে উঠল—এই যে! ইনিই তো নিয়েছিলেন! সেই কুমড়ো মা ঠাকরুন।—বলেছিলেন বুধবারে আসতে—তাই আজ এলাম। বাবু জিজ্ঞেস করছিলেন কুমড়ো কে নিয়েছিলেন—
পদ্মঝি হঠাৎ যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। বলল—হ্যাঁ, কুমড়ো নিয়েছিলাম তা কি হবে? পাঁচ আনা পয়সা নিয়ে কি পালিয়ে যাব? দিয়ে দাও তো কর্তাবাবু ওর পয়সা মিটিয়ে—আমি এর পরে—বেচু চক্কত্তি দ্বিরুক্তি না করে কুমড়োওয়ালাকে পয়সা মিটিয়ে দিলেন, সে চলে গেল।
রতনঠাকুর আড়ালে গিয়ে হাজারিকে বলল—হাতে-হাতে ধরা পড়ে গেল পদ্মদিদি—কিন্তু কর্তাবাবুর দরদটা একবার দেখেছ তো হাজারিদা?
—ও আর দেখাদেখি কি, দেখেই আসছি। আমি যদি কুমড়ো নিতাম তবে পদ্মদিদি আজ রসাতল বাধাত—কর্তাবাবুও তাতেই সায় দিতেন। এ তো আর তুমি আমি নই? এ হোটেলে পদ্মদিদিই মালিক। তুমি এইবার একবার বলো পদ্মদিদিকে মুড়োর কথাটা। নইলে ও এখনই লাগাবে কর্তাকে।
রতন পদ্মঝিকে আড়ালে বলল—ও পদ্মদিদি, গরীব ব্রাহ্মণ তোমাদের দোরে খাচ্ছে—কেন আর ওকে নিয়ে অমন করো? একটা মুড়ো যদি সে খেয়েই থাকে—এতদিন খাটছে এখানে, তা নিয়ে তাকে অপমান করো না। সবাই তো নেয়—কেউ তো নিতে ছাড়ে না—আমি নিই না, তুমি নাও না? বেচারাকে কেন বিপদে ফেলবে?
পদ্মঝি বলল—ও খায়নি—ও এখান থেকে বের করে ওর সেই পেয়ারের কুসুমকে দিয়ে এসেছে—আমি কচি খুকী? কিছু বুঝি না? নচ্ছার বদমাইশ লোক কোথাকার—
রতন হেসে বলল—যা বোঝে সে করুক গিয়ে পদ্মদিদি—তোমার আমার কি? সে মুড়ো নিজে খায়, পরকে দেয় তোমার তা দেখবার দরকার কি? তুমি কিছু বলো না আজ আর ওকে।
পদ্মঝি কুমড়োর ব্যাপারে কিছু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল—নতুবা সে রতনের কথা এত সহজে রাখত না। বলল—তাহলে বারণ করে দিও ওকে—বারবার যেন এমন আর না করে। তাহলে আমি অনর্থ বাধাব—কারো কথা শুনব না।
সে রাতে হোটেলের কাজকর্ম শেষ করে হাজারি চূর্ণীর ধারে বেড়াতে গেল। দিব্য জ্যোৎস্না-রাত—প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে।
আজ কি সর্বনাশই আর একটু হলে হয়ে যেত! তার নিজের জন্য সে ভাবে না, ভাবে কুসুমের জন্য। কুসুম পাড়াগাঁয়ের মেয়ে—সেখানে তার বদনাম রটলে উভয়েরই সেখানে মুখ দেখানো চলবে না। আর তার এই বয়সে এই বদনাম রটলে লোকেই বা বলবে কি?
কুসুমকে সে মেয়ের মতো দেখে—ভগবান জানেন। ওসব খেয়াল তার থাকলে এই রাণাঘাট শহরে সে কত মেয়ে জুটাতে পারত। এই রাধাবল্লভতলার মাটি ছুঁয়ে সে বলতে পারে জীবনে কোনোদিন ওসব খেয়াল তার নেই। বিশেষত কুসুম। ছিঃ ছিঃ—টেঁপির সঙ্গে যাকে সে অভিন্ন দেখে না—তার সম্বন্ধে রতন ঠাকুরের কাছে পদ্মঝি যে সব বিশ্রী কথা বলেছে শুনলে কানে আঙুল দিতে হয়।
রাত প্রায় দেড়টা বাজল। শহর নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, কেবল কুণ্ডুদের চূর্ণীর ধারে কাঠের আড়তে হিন্দুস্থানী কুলীরা ঢোলক বাজিয়ে বিকট চিৎকার শুরু করেছে—ওই তাদের নাকি গান! যখন নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেস এসে দাঁড়াল স্টেশনে তখন সে হোটেল থেকে বেরিয়েছে—আর এখন স্টেশন পর্যন্ত নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, কারণ এত রাতে কোনো ট্রেন আসে না। রাত চারটা থেকে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হবে।
হোটেলের দরজা বন্ধ। ডাকাডাকি করে মতি চাকরের ঘুম ভাঙাতে তার প্রবৃত্তি হলো না। বড় গরম—স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে না হয় বাকি রাতটুকু কাটিয়ে দেওয়া যাক। আজ রাতে ঘুম আসছে না চোখে।
ভোরে উঠে হোটেলের সামনে এসে হাজারি দেখল হোটেলের দরজা এখনও বন্ধ। সে একটু আশ্চর্য হলো। মতি চাকর তো অনেকক্ষণ উঠে অন্য দিন দরজা খোলে। ডাকাডাকি করেও কারো সাড়া পাওয়া গেল না—তারপর গদির ঘরের জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে উঁকি মারতে গিয়ে হাজারি লক্ষ্য করল—বাসনের ঘরের মধ্যে অত আলো কেন?
ঘুরে এসে দেখল বাসনের ঘরের দরজা খোলা। ঘরের মধ্যে কেউই নেই। মতি চাকরেরও সাড়াশব্দ নেই কোনদিকে। এরকম তো কখনো হয় না।
এমন সময় যদু বাঁড়ুয্যের হোটেলে একটা চায়ের স্টল আছে—খুব সকাল থেকেই সেখানে চা বিক্রি শুরু হয়।
হাজারির ডাকে নিমাই এল। দুজনে ঘরের মধ্যে ঝুঁকে দেখল মতি চাকর খাবার ঘরে শুয়ে দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। উভয়ের ডাকে মতি ধড়মড় করে উঠল।
হাজারি বলল—মতি দোর খোলা কেন?
মতি বলল—তা তো আমি জানি না! তুমি রাতে ছিলে কোথায়? দোর খুলল কে?
তিনজনে ঘরের মধ্যে এসে এদিক-ওদিক দেখল। হঠাৎ মতি বলে উঠল—হাজারিদা, সর্বনাশ! থালা-বাসন কোথায় গেল? একখানাও তো দেখছি না!
—সে কি!
তিনজনে মিলে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো ঘরেই বাসনের সন্ধান পাওয়া গেল না। নিমাই বলল—চায়ের দুধটা দিয়ে আসি হাজারিদা, বাসন সব চুরি হয়ে গেছে কে। তোমাদের কর্তাকে ডেকে নিয়ে এসো।
ইতিমধ্যে রতন ঠাকুর এল। সে-ই গিয়ে বেচু চক্কত্তিকে ডেকে আনল। পদ্মঝিও এল। চুরি হয়ে গেছে শুনে পাশের হোটেল থেকে যদু বাঁড়ুয্যে এলেন, বাজারের লোকজন জড় হলো—থানায় খবর দিতে তখনই, এ. এস. আই নেপালবাবু ও দুজন কনস্টেবল এল। হৈ হৈ বাধিয়ে গেল। বেচু চক্কত্তি মাথায় হাত দিয়ে ততক্ষণ বসে পড়েছেন, প্রায় ষাট-সত্তর টাকার থালা-বাসন চুরি গেছে।
বেচু চক্কত্তি বললেন—হাজারি রাতে কোথায় ছিলে?
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বাবু। বড্ড গরম হচ্ছিল—তাই ঘাটের ধার থেকে ফিরে ওখানেই রাত কাটালাম।
নেপালবাবু জিজ্ঞাসা করলেন—কত রাত্রে প্ল্যাটফর্মে শুয়েছিলে? কোন প্ল্যাটফর্মে?
—আজ্ঞে, বনগাঁ লাইনের প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চির ওপর।
—তোমায় সেখানে কেউ দেখেছিল?
—না বাবু, তখন অনেক রাত।
—কত?
—দেড়টার বেশি।
—এতক্ষণ পর্যন্ত কোথায় ছিলে?
—রোজ খাওয়া-দাওয়ার পর আমি দুবেলাই চূর্ণীর খেয়াঘাটে গিয়ে বসি। কালও সেখানে ছিলাম।
—আর কোনো দিন হোটেল ছেড়ে প্ল্যাটফর্মে শুয়েছিলে?
—মাঝে মাঝে শুই, তবে খুব কম।
এই সময় বেচু চক্কত্তিকে পদ্মঝি চুপি চুপি কি বলল। বেচু চক্কত্তি নেপালবাবুকে বললেন—দারোগাবাবু, একবার ঘরের মধ্যে একটা কথা শুনে যান দয়া করে—
ঘরের ভিতর থেকে কথা শুনে এসে নেপালবাবু বললেন—হাজারি ঠাকুর, তুমি কুসুমকে চেন?
হাজারির মুখ শুকিয়ে গেল। এর মধ্যে এরা কুসুমের কথা আনল কেন? কুসুমের সঙ্গে এর কি সম্পর্ক?
হাজারির মুখের ভাব নেপালবাবু লক্ষ্য করলেন।
হাজারির উত্তর দিতে একটু দেরি হচ্ছিল, নেপালবাবু ধমক দিয়ে বললেন—কথার জবাব দাও?
হাজারি থতমত খেয়ে বলল—আজ্ঞে চিনি।
পদ্মঝি দোরের কাছে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে হাজারি বুঝল—কুসুমের কথা সে-ই কর্তাকে বলেছে নতুবা তিনি অত খোঁজখবর রাখেন না। কর্তামশায় দারোগাকে বলেছেন কথাটা—সে ওই পদ্মঝির উসকানিতে।
—কুসুম থাকে কোথায়?
—গোয়ালপাড়ায়, বড় বাজারের দিকে।
—সে কি করে?
—দুধ-দই বেচে। গরীব লোক—
—বয়স কত?
—এই চব্বিশ-পঁচিশ—
পদ্মঝি একটু মুচকি হাসল এই উত্তর শুনে, হাজারির তা চোখ এড়াল না। দারোগাবাবুর প্রশ্নের গতি তখনও সে বুঝতে পারেনি—কিন্তু পদ্মঝির মুখের মুচকি হাসি দেখে সে বুঝল কেন এরা কুসুমের কথা এত করে জিজ্ঞাসা করছে।
—তোমার সঙ্গে কুসুমের কত দিনের আলাপ?
—সে আমার গাঁয়ের মেয়ে। সে যখন ছেলেমানুষ তখন থেকে তাকে জানি। তার বাবা আমার বন্ধু লোক—আমাদের পাড়ার পাশেই—
—কুসুমের সঙ্গে তুমি প্রায়ই দেখাশোনা কর—না?
—মাঝে মাঝে দেখা করি বৈকি—গাঁয়ের মেয়ে, তার তত্ত্বাবধান করা তো দরকার— নেপালবাবু হঠাৎ হেসে বললেন—নিশ্চয়ই দরকার। এখানে তার শশুরবাড়ী?
—আজ্ঞে হ্যাঁ।
—স্বামী আছে?
—না, আজ বছর চার-পাঁচ মারা গিয়েছে—শাশুড়ী আছে বাড়ীতে। এক দেওর-পো আছে।
—তুমি মাঝে মাঝে হোটেলের রান্না জিনিস তাকে দিয়ে আস?
লজ্জায় ও সঙ্কোচে হাজারি যেন কেমন হয়ে গেল। এসব কথা এখানে কেন?
পদ্মঝি খিলখিল করে হেসে উঠেই মুখে আঁচল চাপা দিল। নেপালবাবু ধমক দিয়ে বললেন—আঃ, হাসি কিসের? এটা হাসির জায়গা নয়। চুপ—
কিন্তু দারোগাবাবু ধমক দিলে কি হবে—পদ্মঝির হাসি সংক্রামক হয়ে উঠে উপস্থিত লোকজন সকলেরই মুখে একটা চাপা হাসির ঢেউ আনল। অন্য লোকের হাসি হাজারি তত লক্ষ্য করে নি কিন্তু পদ্মঝির হাসিতে সে কিসের একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ঠাওর করে মরীয়া হয়ে বলল—দারোগাবাবু, সে গরীব লোক, আমাদের গাঁয়ের মেয়ে, সে আমাকে বাবা বলে ডাকে—আমার সে মেয়ের মত—তাই মাঝে মাঝে কোনদিন একটু-আধটু তরকারী কি রাঁধা মাংস তাকে দিয়ে আসি। কত তো ফেলা-ঝেলা যায়, তাই ভাবি যে একজন গরীব মেয়ে—
—বুঝেছি, থাক আর তোমার লেকচার দিতে হবে না। কাল রাতে তুমি সেখানে গিয়েছিলে?
—আজ্ঞে না বাবু।
—আজ সকালে গিয়েছিলে?
—না বাবু, সকালে প্ল্যাটফর্ম থেকেই হোটেলে এসেছি।
দারোগাবাবু অন্য সকলের জবানবন্দী নিয়ে ছেড়ে দিলেন। কেবল মতি চাকর ও হাজারিকে বললেন—আমার সঙ্গে তোমাদের থানায় যেতে হবে। কনস্টেবলদের বললেন—এদের ধরে নিয়ে চল।
মতি কান্নাকাটি করতে লাগল—একবার বেচু চক্কত্তি, একবার দারোগাবাবুর হাতে-পায়ে পড়তে লাগল। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ—ঘরের মধ্যে ঘুমাচ্ছিল, তাকে থানায় নিয়ে গিয়ে কি ফল?—ইত্যাদি।
হাজারির প্রাণ উড়ে গেল থানায় ধরে নিয়ে যাবে শুনে।
এ কি বিপদে ভগবান তাকে ফেললেন?
থানা-পুলিস বড় ভয়ানক ব্যাপার, মোকদ্দমা হলে উকিল দেবার ক্ষমতা হবে না তার, বিনা কৈফিয়তে জেল খাটতে হবে—কত বছর তাই বা কে জানে? না খেয়ে স্ত্রীপুত্র মারা পড়বে। জেলখাটা আসামীকে এর পর চাকরিই বা দেবে কে?
কিন্তু তার চেয়েও ভয়ানক ব্যাপার, যদি এরা কুসুমকে এর মধ্যে জড়ায়? জড়াবেই বোধ হয়। হয়তো কুসুমের বাড়ী খানাতল্লাস করতে চাইবে।
নিরপরাধিনী কুসুম! লজ্জায় ঘৃণায় তা হলে সে হয়তো গলায় দড়ি দেবে। আরও কত কি কথা লোকে রটাবে এই সূত্র ধরিয়ে। তাদের গ্রামে এ কথা তো গেলে তার নিজেরও আর মুখ দেখাবার উপায় থাকবে না।
কখনও সে একটা বিড়ি-দেশলাই কারো চুরি করে নি জীবনে—সে করবে হোটেলের বাসন চুরি! নিজের মুখের জিনিস নিজেকে বঞ্চিত করে সে কুসুমকে মাঝে মাঝে দিয়ে আসে বটে—চুরির জিনিস নয় সে সব। সে খেত, না হয় কুসুম খায়।
থানায় গিয়ে প্রায় ঘণ্টা দুই হাজারি ও মতি বসে রইল। হাজারি শুনল বেচু চক্কত্তি ও পদ্মঝি দুজনেই বলেছে তাদের উপরই তাদের সন্দেহ হয়। সুতরাং পুলিস তো তাদের ধরবেই।
থানার বড় দারোগা থানায় ছিলেন না—বেলা একটার সময় তিনি এসে চুরির সব বিবরণ শুনে হাজারি ও মতিকে তার সামনে হাজির করতে বললেন। হাজারি হাত জোড় করে দারোগাবাবুর সামনে দাঁড়াল। দারোগাবাবু জিজ্ঞাসা করলেন—হোটেলে কতদিন কাজ করছ?
—আজ্ঞে বাবু, ছ’বছর।
—বাসন চুরি করে কোথায় রেখে দিয়েছ?
—দোহাই বাবু—আমার বয়েস ছ’চল্লিশ-সাতচল্লিশ হলো—কখনো জীবনে একটা বিড়ি কারো চুরি করিনি।
দারোগাবাবু ধমক দিয়ে বললেন—ওসব বাজে কথা রাখো। তুমি আর ওই চাকর বেটা দুজনে মিলে যোগসাজসে চুরি করেছ। স্বীকার করো—
—বাবু আমি এর কোনো খবর জানি না! আমি সে রাতে হোটেলেই ছিলাম না।
—কোথায় ছিলে?
—স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে ছিলাম সারারাত।
—কেন?
—বাবু, আমি খাওয়া-দাওয়া করে চূর্ণীর ঘাটে বেড়াতে যাই রোজ। বড্ড গরম ছিল বলে সেখানে একটু বেশি রাত পর্যন্ত ছিলাম—ফিরে এসে দেখি দরজা বন্ধ, তাই স্টেশনে—
এই সময় নেপালবাবু ইংরাজিতে বড় দারোগাকে কি বললেন। বড় দারোগা ঘাড় নেড়ে বললেন—ও। আচ্ছা—তুমি কুসুম বলে কোনো মেয়েমানুষের বাড়ী যাতায়াত করো?
বাবু, কুসুম আমার গাঁয়ের মেয়ে। গরীব বিধবা, তাকে আমি মেয়ের মতো দেখি—সেও আমাকে বাবা বলে ডাকে, বাবার মতো ভক্তি করে। যদি সেখানে গিয়ে থাকি, তাহলে তাতে দোষের কথা কি আছে বাবু আপনিই বিবেচনা করে দেখুন। এ কথা লাগিয়েছে আমাদের হোটেলের পদ্মঝি—সে আমাকে দুচোখে দেখতে পারে না কুসুমকেও দেখতে পারে না। আমাদের নামে নানারকম বিশ্রী কথা সে-ই রটিয়েছে। আপনিই হাকিম-দেবতা। আর মাথার ওপর চন্দ্র-সূর্য রয়েছে—আমার পঞ্চাশ বছর বয়েস হতে গেল—আমার সেদিকে কখনো মতিবুদ্ধি যায়নি বাবু। আমি তাকে মেয়ের মত দেখি—তাকে এর মধ্যে জড়াবেন না—সে গেরস্তর বৌ—মরে যাবে ঘেন্নায়।
বড় দারোগা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ লোক। হাজারির চোখমুখের ভাব দেখে তার মনে হলো লোকটা মিথ্যা বলছে না।
বড় দারোগা মতি চাকরকে অনেকক্ষণ ধরে জেরা করলেন। তার কাছেও বিশেষ কোনো সদুত্তর পাওয়া গেল না—তার সেই এক কথা, ঘরের মধ্যে অঘোরে ঘুমাচ্ছিল, সে কিছুই জানে না।
বড় দারোগা বললেন—দু-জনকেই হাজতে পুরে রেখে দাও—এমনি এদের কাছে কথা বেরুবে না—কড়া না হলে চলবে না এদের কাছে।
হাজারি জানে এই কড়া হওয়ার অর্থ কি। অনেক দুঃখ হয়তো সহ্য করতে হবে আজ। সব সহ্য করতে সে প্রস্তুত আছে যদি কুসুমের নাম এরা আর না তোলে।
বেলা দুইটার সময় একজন কনস্টেবল এসে কিছু মুড়ি ও ছোলা-ভাজা দিয়ে গেল। সকাল থেকে হাজারি কিছুই খায়নি—সেগুলি সে গোগ্রাসে খেয়ে ফেলল।
বেলা চারটার সময় রতন ঠাকুর হোটেল থেকে হাজারির জন্য ভাত আনল।
বলল—আলাদা করে বেড়ে রেখেছিলাম, লুকিয়ে নিয়ে এলাম হাজারিদা। কেউ জানে যে তোমার জন্যে ভাত আনছি।
বড় দারোগার কাছে থেকে অনুমতি নিয়ে রতন ঠাকুর হাজতের মধ্যে ভাত নিয়ে এসেছিল। কিন্তু মতির ভাত আনার কথা তার মনে ছিল না—হাজারি বলল—ওই ভাত দু-জনে ভাগ করে খাবো এখন।
রতন বলল—হোটেলে মহাকাণ্ড বেধে গিয়েছে। একটা ঠিকে ঠাকুর আনা হয়েছিল, সে কাজের বহর দেখে এবেলাই পালিয়েছে। খদ্দের অনেক ফিরে গিয়েছে। পদ্ম বলছে তুমি আর মতি দুজনে মিলে এ চুরি করেছ। কুসুমের বাড়ী থানাতল্লাস না করিয়ে পদ্ম ছাড়বে না বলছে। সেখানে বাসন চুরি করে তুমি রেখে এসেছ। কর্তারও তাই মত। তুমি ভেবো না হাজারিদা—মোকদ্দমা বাধে যদি আমি উকিল দেবো তোমার হয়ে। টাকা যা লাগে আমি দেবো। তুমি এ কাজ করনি আমি তা জানি। আর কেউ না জানুক, আমি জানি তুমি কি ধরণের লোক।
হাজারি রতনের হাত ধরে বলল—ভাই আর যা হয় হোক—কুসুমের বাড়ী যেন খানা-তল্লাস না হয় এটা তোমাকে করতে হবে। কোনো উকিলের সঙ্গে না হয় কথা বলো, আমার দু’মাসের মাইনে পাওনা আছে—আমি না হয় তোমাকে দেবো।
রতন হেসে বলল—তোমার সেই মাইনে আবার দেবে ভেবেছ কর্তাবাবু? তা নয়—সে তুমি দাও আর নাই দাও—আমি উকিল দেবো তুমি ভেবো না। কত পয়সা রোজগার করলাম জীবনে হাজারিদা—এক পয়সা তো দাঁড়াল না। সংকাজে দু’পয়সা খরচ হোক।
হাজারি বলল—মতিকে তাহলে ভাত দিয়ে এস—সে অন্য ঘরে কোথায় আছে।
রতন বলল—মতিকে আমার সন্দেহ হয়।
—না বোধ হয়। ও যদি চুরি করবে তো অমন নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে পারে নাক ডাকিয়ে? আর ও সেরকম লোক নয়।
রতন ভাতের থালা নিয়ে চলে গেল।
.
আরও পাঁচ-ছ’দিন হাজারি ও মতি হাজতে আটক থাকল। পুলিস বহু চেষ্টা করেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারল না—সুতরাং চুরির চার্জশীট দেওয়া সম্ভব হলো না।
ছ’দিনের দিন দুজনেই খালাস পেল।
মতি বলল—হাজারিদা, এখন কোথায় যাওয়া যায়? হোটেলে কি আমাদের আর নেবে?
হাজারিও জানে হোটেলে তাদের চাকরি গিয়েছে। কিন্তু সেখানে দু’মাসের মাহিনা বাকি—বেচু চক্কত্তির কাছে গিয়ে মাহিনা চেয়ে নিতে হবে।
বেলা তিনটা। এখন হোটেলে গেলে কর্তামশাই থাকবেন না—সুতরাং হাজারি সন্ধ্যার পরে হোটেলে যাবে ঠিক করল। কতদিন চূর্ণীর ধারে যায়নি—রাধাবল্লভতলায় গিয়ে ঠাকুরকে প্রণাম করে সে আপন মনে চূর্ণীর ধারে গিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ নদীর ধারে বসে হাজারির মনে পড়ল, সে এত বেলা পর্যন্ত কিছু খায়নি। রতন হাজতে রোজ ভাত দিয়ে যেত, আজ দুদিন সে আর আসেনি—কেন আসেনি কে জানে, হয়তো পদ্ম জানতে পেরে বারণ করে দিয়েছে—কিংবা হয়তো তাদের ভাত এনে দেওয়ার অপরাধে তারও চাকরি গিয়েছে।
হাজারির হাতে একটি পয়সাও নেই যে কিছু কিনে খেতে পারে। জেলখানার ভাত হাজারি একদিনও খায়নি—আজও একজন কনস্টেবল ভাত এনেছিল, সে বলেছিল—”তেওয়ারিজি, আমাকে দুটি মুড়ি এনে দিতে পারো? আমার জ্বর হয়েছে, ভাত খাবো না।”
বেলা বারোটার সময় সামান্য দুটি মুড়ি খেয়েছিল—আর সারাদিন কিছু পেটে যায়নি। সন্ধ্যার পর হোটেলে গিয়ে দুটি ভাত খাবে এখন, সেটাই ভালো।
হাজারির সন্দেহ হয়, বাসন আর কেউ চুরি করেনি, পদ্মঝিই নিজে এই কাজ করেছে। কয়দিন জেলে বসে বসে ভেবে তার মনে হয়েছে, পদ্ম অন্য কারো সঙ্গে যোগসাজসে এই কাজ করেছে। ও খুব খারাপ চরিত্রের মেয়েমানুষ, সব পারে। গত বছর খদ্দেরদের কাপড়ের ব্যাগ যে চুরি হয়েছিল—সেটাও পদ্মঝির কাজ—এখন হাজারির এই ধারণা জন্মেছে।
এ ধারণা সে বিদ্বেষবশত করছে না, গত ছ’বছর ধরে হাজারি পদ্মঝির অনেক কাণ্ড দেখেছে যা সে প্রথম প্রথম তত বুঝত না—কিন্তু এখন সব মিলিয়ে সে অনেকটাই বুঝতে পেরেছে।
বৃদ্ধ বেচু চক্কত্তি পদ্মঝির একেবারে হাতের মুঠোয়—দেখেও দেখেন না, বুঝেও বোঝেন না, হোটেলটির কী সর্বনাশ করছে পদ্মদিদি, তা তিনি এখন না বুঝলেও পরে বুঝবেন।
রতন ঠাকুরও সেদিন ভাত দিতে এসে অনেক কথা বলে গেছে—”হাজারিদা, হোটেলের অর্ধেক জিনিস পদ্মদিদির ঘরে—এখন তো বাজারের জিনিস পর্যন্ত যেতে শুরু করেছে। সেদিন দেখলে তো কুমড়োর কাণ্ড? চুষে খাবে এমন সাজানো হোটেলটা বলে দিচ্ছি। পদ্মদিদির কেন এত টান বাড়ির ওপর—সেটাও আমি জানি। তবে বলছি না, যাই হোক আট টাকা মাইনের চাকরিটা করছি—এ বাজারে হঠাৎ চাকরিটা অকারণে হারাবো?”
সন্ধ্যার পর হাজারি হোটেলের গদিঘর দিয়ে ঢুকতে সাহস না করে রান্নাঘরের দিকের দরজা দিয়ে হোটেলে ঢুকল। ভেবেছিল রান্নাঘরে রতন ঠাকুরকে দেখতে পাবে—কিন্তু একজন অপরিচিত উড়িয়া ঠাকুরকে ভাত রাঁধতে দেখে সে যে পথে এসেছিল, সেই পথেই বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পিছন ফিরেছে—এমন সময় খদ্দেরদের খাবারের ঘর থেকে পদ্মঝি বলে উঠল—”কে ওখানে? কে যায়?”
হাজারি ফিরে বলল—”আমি পদ্মদিদি।”
পদ্ম তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল—”আমি?—কে আমি?—ও, হাজারি ঠাকুর… তুমি কি মনে করে? চলে যাচ্ছ কোথায় এত তাড়াতাড়ি? ঢুকলেই বা কেন আর বেরুচ্ছই বা কেন?”
“আজ জেল থেকে খালাস পেয়েছি পদ্মদিদি। কোথায় আর যাব, যাওয়ার তো জায়গা নেই কোথাও—হোটেলেই এলাম, খিদে পেয়েছে—দুটো ভাত খাবো বলে। রান্নাঘরে এসে দেখি রতন ঠাকুর নেই, তাই সামনে দিয়ে গদিঘরে যাই—”
“তা যাও গদিঘরে! এই খদ্দেরদের খাবারের ঘর দিয়েই যাও—”
হাজারি সংকুচিত অবস্থায় হোটেলের খাবারের ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকে গদির ঘরে গেল। পদ্মঝি গেল পিছু পিছু।
বেচু চক্কত্তি বললেন—”এই যে, হাজারি যে! কি মনে করে?”
হাজারি বলল—”আজ্ঞে কর্তামশায়, পুলিসে ছেড়ে দিল আজ—তাই এলাম। যাব আর কোথায়? আপনার দরজায় দুটো করে খাই। তা ছেড়ে আর কোথায় যাবো বলুন?”
বেচু চক্কত্তি কোনো উত্তর দেবার আগেই পদ্মঝি এগিয়ে এসে বেচু চক্কত্তিকে বলল—”ওকে আর একদণ্ড এখানে থাকতে দিও না কর্তাবাবু—এখনই বিদেয় করো। বাসন ও আর মতি যোগসাজসে নিয়েছে। পাকা চোর, পুলিসে কি করবে ওদের?”
হাজারি এবার রেগে গেল। পদ্মঝিকে কখনও সে এ সুরে কথা বলে নি। বলল—”তুমি দেখেছিলে বাসন নিতে পদ্মদিদি?”
পদ্মঝি বলল—”তোমার ও চোখ-রাঙানির ধার ধারে না, তা বলে দিচ্ছি হাজারি ঠাকুর। অমন ভাবে আমার সঙ্গে কথা বলো না—বাসন তোমাকে নিতে দেখলে হাতের দড়ি তোমার খুলতো না তা জেনে রেখো।”
হাজারি নিজেকে সামলিয়ে নিল ততক্ষণ। নিচু হওয়াই তার অভ্যাস—যারা বড়, তাদের কাছে আজীবন সে ছোট হয়েই আসছে—আজ চড়া গলায় তাদের সঙ্গে কথা বলার সাহস তার আসবে কোথা থেকে?
সেইরকম সুরে বলল—”না না, রাগ করছ কেন পদ্মদিদি—আমি এমনিই বলছি, বাসন নিতে যখন তুমি দেখনি—তখন আমি গরীব ব্রাহ্মণ, তোমাদের দরজায় দুটো করে খাই—কেন আর আমাকে—”
এইবার বেচু চক্কত্তি কথা বললেন। একটু নরম সুরে বললেন—”যাক, যাক, কথা কাটাকাটি করে লাভ নেই। আমার বাসন তাতে ফিরবে না। দুজনেই থামো। তারপর তুমি কি বলছ এখন হাজারি?”
“বলছি, কর্তা, আমাকে যেমন পায়ে রেখেছিলেন, তেমনি পায়ে রাখুন। নইলে না খেয়ে মারা যাবো। বাবু, চোর আমি নই, চোর যদি হতাম, আপনার সামনে এসে দাঁড়াতে পারতাম না আর।”
পদ্মঝি বলল—”চোর কি না সে কথায় দরকার নেই—কিন্তু তোমার এখানে জায়গা আর হবে না। তা হলে খদ্দের চলে যাবে।”
বেচু বললেন—”তা ঠিক।—খদ্দের চলে গেলে হোটেল চালাবো কি করে আমি?” হাজারি এ যুক্তির অর্থ বুঝতে পারল না। হোটেলের ঠাকুর চোর হলে সে না হয় হোটেলের জিনিস চুরি করতে পারে, কিন্তু খদ্দেরদের গায়ের শাল খুলে বা তাদের পকেট মারছে না তো—তবে খদ্দেরের আসতে আপত্তি কি?
কিন্তু হাজারি এ প্রশ্ন তুলতে পারল না। তার জবাব হয়ে গেল। সে কিছু খেয়েছে কি না এ কথাও কেউ জিজ্ঞাসা করল না।
অবশেষে সে বলল—”তা হলে আমার মাইনেটা দিয়ে দিন বাবু, দু’মাসের তো বাকি পড়ে রয়েছে, হাওলাত নেই কিছু। খাতা দেখুন।”
বেচু চক্কত্তি বললেন—”সে এখন হবে না, এর পরে এসো।”
পদ্ম একটু বেশি স্পষ্ট কথা বলে। সে বলল—”ওর আশা ছেড়ে দাও, মাইনে পাবে না।”
“কেন পাব না?”
পদ্ম ঝাঁঝের সঙ্গে বলল—”সে তর্ক তোমার সঙ্গে করবার সময় নেই এখন। পাবে না মিটে গেল। নালিশ করো গিয়ে—আদালত তো খোলা রয়েছে।”
হাজারি চোখে অন্ধকার দেখল।
বেচু চক্কত্তির দিকে চেয়ে বিনীত স্বরে বলল—”কর্তামশায়, আজ আপনার দরজায় ছ’বছর খাটছি। আমার হাতে একটি পয়সাও নেই—বাড়িতে দু’মাস খরচ পাঠাতে পারিনি, বাড়ি যাওয়ার রেলভাড়া পর্যন্ত আমার হাতে নেই—আমাকে কিছু না দিলে না খেয়ে মরতে হবে।”
বেচু চক্কত্তি দ্বিরুক্তি না করে ক্যাশবাক্স খুলে একটি আধুলি ফেলে দিয়ে বললেন—”এই নিয়ে যাও। এখানে ঘ্যানঘ্যান করো না—খদ্দের আসতে শুরু করছে, বাইরে যাও গিয়ে।”
হাজারি আধুলিটি কুড়িয়ে নিয়ে চাদরের খুঁটে বাঁধল। তারপর হাত জোড় করে মাটি থেকে শরীরটা খানিকটা নুইয়ে বেচু চক্কত্তিকে প্রণাম করে আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল—”তাহলে বাবু, মাইনের জন্যে কবে আসবো?”
“এসো—এসো এর পরে যখন হয়। সে এখন দেখা যাবে—”
এটা যে অত্যন্ত ফাঁকা কথা, হাজারির তা বুঝতে বিলম্ব হল না। বরং পদ্মঝি যা বলেছে সেটাই ঠিক। মাইনে এরা তাকে দেবে না। তার মাথায় এল একবার শেষ চেষ্টা করবে। মরীয়ার শেষ চেষ্টা। বেচু চক্কত্তির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে পেছন দিয়ে হোটেলের রান্নাঘরে এল। সেখানে পদ্মঝি একটু পরে আসতেই সে হাত জোড় করে বলল—”পদ্মদিদি, গরীব ব্রাহ্মণ—চাকরি করছি এতকাল, একটি রেকাবিও কখনো চুরি করিনি। আমি খুব গরীব। তুমি একটু বলে কর্তামশাইকে আমার মাইনের ব্যবস্থা করে দেও—নইলে বাড়িতে ছেলেপুলে না খেয়ে মরবে। এই আধুলিটাই সম্বল, দোহাই বলছি রাধাবল্লভের—এতে আমি কি খাবো, আর রেলভাড়া কি দেব, বাড়ির জন্যেই বা কি নিয়ে যাবো।”
“আমি হোটেলের মালিক নই যে তোমায় টাকা দেবো। কর্তামশায় যা বলেছেন তার ওপর আমার কি কথা আছে?”
“দয়া করে পদ্মদিদি তুমি একবার বলো উনাকে। না খেয়ে মারা যাবে ছেলেপিলে।”
“কেন তোমার পেয়ারের কুসুমের কাছে যাও না, পদ্মদিদিকে কি দরকার এর বেলা?”
হাজারির ইচ্ছা হল আর একদণ্ডও সে এখানে দাঁড়াবে না। সে চায় না যে এই সব জায়গায় যার-তার মুখে কুসুমের নাম উচ্চারিত হয়, বিশেষ করে পদ্মঝির মুখে। সে চুপ করে রইল। পদ্ম রান্নাঘর থেকে চলে গেল।
একটুখানি দাঁড়িয়ে সে চলে যাচ্ছিল, পদ্মঝি এসে বলল—”যাচ্ছ যে? খাওয়া হয়েছে তোমার?”
হাজারি অবাক হয়ে পদ্মঝির মুখের দিকে তাকাল। কখনও সে এমন কথা তার মুখে শোনে নি। আমতা আমতা করে বলল—”না—খাওয়া—ইয়ে—না হয় নি ধরো।”
“তা হলে বোসো। এখনও মাছটা নামেনি। মাছ নামলে ভাত খেয়ে তবে যাও। দাঁড়িয়ে কেন? বসো না পিঁড়ি একখানা পেতে।”
হাজারি কলের পুতুলের মতো বসল। পদ্মদিদি তাকে অবাক করে দিয়েছে! পদ্মদিদির দরদ!…সাত বছরের মধ্যে একদিনও যা দেখে নি!…আশ্চর্য কাণ্ডই বটে!
মাছ নামলে নতুন ঠাকুর হাজারিকে ভাত বাড়ে দিল। পদ্মঝিকে আর এদিকে দেখা গেল না—সে এখন খদ্দেরদের খাওয়ার ঘরে ব্যস্ত আছে। নতুন ঠাকুর যদিও হাজারিকে চেনে না তবুও এদের কথাবার্তা শুনে সে বুঝেছিল, হাজারি হোটেলের পুরনো ঠাকুর—চাকরি থেকে জবাব হয়ে চলে যাচ্ছে। সে হাজারিকে খুব যত্ন করে খাওয়াল।
যাবার সময় হাজারি পদ্মকে ডেকে বলল—”পদ্মদিদি, চললাম তবে। কিছু মনে করো না।”
পদ্মঝি দরজার কাছে এসে বলল—”হ্যাঁ দাঁড়াও ঠাকুর। এই দুটো টাকা রাখো, কর্তামশায় দিয়েছেন মাইনের দরুন। এই শেষ কিন্তু—আর কিছু পাবে না বলে দিলেন তিনি।”
হাজারি টাকা দুটি নিয়ে আগের আধুলিটির সঙ্গে চাদরের খুঁটে রাখল কিন্তু সে খুব অবাক হয়ে গেছে—সত্যিই অবাক হয়ে গেছে।
“আচ্ছা, তবে আসি।”
“এসো। খাওয়া হয়েছে তো? আচ্ছা।”
রাত সাড়ে ন’টার কম নয়।
এত রাতে সে কোথায় যায়!
চাকরি গেল। তবুও হাতে আড়াইটা টাকা আছে।
বাড়ি গিয়ে কি হবে? চাকরি খুঁজতেই হবে তাকে। বাড়ি গিয়ে বসে থাকলে চলবে না। চাকরি চলে যাবে—এ কথা হাজারি ভাবে নি। সত্যিই চাকরি গেল শেষকালে!
সে জানে রাণাঘাটে কোনো হোটেলে তার চাকরি আর হবে না। যদু বাঁড়ুয্যে একবার তাকে হোটেলে নিতে চেয়েছিলেন বটে, কিন্তু এখন চুরির অপবাদে জেল খেটে এসেছে, কেউই তাকে চাকরি দেবে না।
হাজারি দেখল সে নিজের অজান্তেই চূর্ণী নদীর ধারে চলেছে—তার সেই প্রিয় গাছতলাটিতে গিয়ে বসবে—বসে ভাববে। ভাববার অনেক কিছু আছে।
কিন্তু প্রায় দুই ঘণ্টা নদীর ধারে বসে থাকলেও ভাবনার কোনো মীমাংসা হল না। আজ রাতে অবশ্য স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে থাকবে—কিন্তু কাল যায় কোথায়?
আড়াই টাকার মধ্যে দুটি টাকা বাড়ি পাঠাতে হবে। টেঁপি—টেঁপির মুখে হয়তো তার মা দুটি ভাত দিতে পারছে না।
এ চিন্তা তার পক্ষে অসহ্য।
না—কালই টাকা দুটি পাঠাবে তাকে। মানি অর্ডার ফি দেবে আধুলিটি থেকে। পুরো দু’টাকা বাড়ি যাওয়া চাই।
স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শেষ রাতের দিকে সামান্য ঘুম হল। ফরিদপুর লোকালের শব্দে খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। তবুও সে শুয়েই রইল। আজ আর তাড়াতাড়ি বড় উনুনে ডেকচি চাপাতে হবে না—উঠলে কি হবে?
অনেকক্ষণ পর্যন্ত সে শুয়েই রইল। ডাউন দার্জিলিং মেল এল, চলে গেল। বনগাঁ লাইনের ট্রেন ছাড়ল। রোদ উঠেছে, প্ল্যাটফর্ম ঝাঁট দিতে এসেছে ঝাড়ুদার। একখানা গাড়ির ডাউন দিয়েছে আড়ংঘাটার দিকে। মুর্শিদাবাদ-লালগোলা প্যাসেঞ্জার।
“এই কোন্ নিদ যাতা রে, এই উঠো—হঠ যাও—” ঝাড়ুদার হাঁকল। হাজারি উঠে হাই তুলে কল থেকে হাতমুখ ধুল।
সে কোথায় যায়—কি করে? গত ছ’সাত বছরের মধ্যে এমন নিষ্ক্রিয় জীবন সে কখনো কাটায় নি—কাজ, কাজ, উনুনে ডেকচি চাপাও, কর্তামশায়ের চায়ের জল গরম কর আগে, বাজারে আজ কার পালা? হৈ চৈ—ঝাড়া বকুনি—পদ্মঝির চেঁচামেচি…
বেশ ছিল। পদ্মঝির বকুনিও যেন এখন মিষ্টি মনে হচ্ছে। পদ্ম খারাপ লোক নয়—কাল রাতে খেতে বলেছিল, টাকা দিয়েছে। রতন ঠাকুরও খুব ভাল লোক। তার সেই ভাগ্নেটিও খুব ভাল। সবাই ভাল লোক। রতনের সেই ভাগ্নে তার টেঁপির উপযুক্ত বর। দুজনে সুন্দর মানাবে। ছেলেটিকে খুব পছন্দ হয়েছিল। আকাশকুসুম। মিথ্যে আশা, টেঁপিকে খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই তবে তার বিয়ে।
গত ছ’বছরে হাজারির একটা বড় খারাপ অভ্যাস হয়ে গেছে—সকালে বিকালে চা খাওয়া।
এখন চা খেতে হবে পয়সা খরচ করে—সেজন্য হাজারি চা খাওয়ার ইচ্ছাকে দমন করল।
হঠাৎ তার মনে হল কুসুমের সঙ্গে একবার দেখা করা একান্ত দরকার। আজ সাত আট দিন কুসুমের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। চুরির জন্য জেলে যাওয়ার খবর বোধ হয় কুসুম শোনেনি—কে তাকে এ খবর দেবে? চা ওখানেই খাওয়া চলতে পারে। কুসুমের সঙ্গে একটা পরামর্শও করা দরকার। তার নিজের মাথায় কিছুই আসছে না।
কুসুম কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে হাজারিকে দেখে বিস্মিত কণ্ঠে বলল—”আপনি জ্যাঠামশায়? এমন অসময় যে। এতদিন আসেন নি কেন?”
“চলো, ভেতরে বসি। অনেক কথা আছে।”
কুসুম ঘরের মেঝেতে শতরঞ্জি পেতে দিল। হাজারি বসে বলল—”মা কুসুম, একটু চা খাওয়াবে।”
“এখনই করে দিচ্ছি জ্যাঠামশায়, একটু বসুন আপনি।”
চা শুধু নয়—চায়ের সঙ্গে এল একখানা রেকাবিতে খানিকটা হালুয়া। হাজারি চা খেতে খেতে বলল—”কুসুম মা, আমার চাকরি গিয়েছে।”
কুসুম বিস্মিত সুরে বলল—”কেন?”
“চুরি করেছিলাম বলে।”
“চুরি করেছিলেন!”
“ওরা তাই বলে। পাঁচ-ছ’দিন জেলে ছিলাম।”
“জেলে ছিলেন! হ্যাঁ! মিথ্যে কথা।”
কুসুম দাঁড়িয়ে ছিল—হাজারির সামনে মাটির ওপর ধপাস করে বসে পড়ে কৌতূহল ও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে হাজারির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“না কুসুম, মিথ্যে নয়, সত্যিই জেলে ছিলাম চুরির আসামী হিসেবে।”
“জেলে থাকতে পারেন জ্যাঠামশায়—কিন্তু চুরি আপনি করেন নি—করতে পারেন না। সেইটেই মিথ্যে কথা, তাই বলছি।”
“আমি চুরি করতে পারি না?”
“কখনো না জ্যাঠামশায়। আপনাকে আমি জানি না? চিনি না?”
“তোমার মা, এত বিশ্বাস আছে আমার ওপর!”
কুসুম অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে চুপ করে রইল। মনে হল সে কান্না চাপার চেষ্টা করছে।
হাজারি বাঁচল। কুসুম সত্যিই তার মেয়ে বটে। তার বড় ভয় ছিল কুসুম জিনিসটা কি ভাবে নেবে। যদি বিশ্বাস করে বসে যে সত্যিই সে চোর! জগতে তা হলে হাজারির একটা অবলম্বন চলে যাবে।
“আপনি এখন কোথা থেকে আসছেন জ্যাঠামশায়?”
“কাল রাতে স্টেশনে শুয়ে ছিলাম—যাব আর কোথায়? সেখান থেকে উঠে আসছি। ভাবলাম তোমার সঙ্গে একবার দেখা করাটা দরকার মা, হয়তো আবার কতদিন—”
“কেন, আপনি যাবেন কোথায়?”
“একটা কিছু হিল্লে লাগাতে তো হবে—বসে থাকলে চলবে না বুঝতেই পারো। দেখি কি করা যায়।”
“এখানে আর কোনো হোটেলে—”
“চুরির অপবাদ রটেছে যখন, তখন এখানকার কোনো হোটেলে নেবে না। দেখি, একবার ভাবছি গোয়াড়ি যাই না হয়—সেখানে অনেক হোটেল আছে, খুঁজে দেখি সেখানে।”
কুসুম খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—”আচ্ছা, সে যা হয় হবে এখন। আপাতত আপনি নেয়ে আসুন, তেল এনে দিই। তারপর রান্নার যোগাড় করে দিচ্ছি, এখানে দু’টি ভাতেভাত চড়িয়ে খান।”
“না মা, ওসব ঝামেলায় আর দরকার নেই—থাক, খাওয়ার জন্যে কি হয়েছে—আমি তোমার সঙ্গে দুটো কথা কই বসে। ভাবলাম কুসুমের সঙ্গে একবার পরামর্শ করি গিয়ে, তাই এলাম। একটা বুদ্ধি দাও তো মা খুঁজে—একার বুদ্ধিতে কুলোয় না—তারপর বুড়োও হয়ে পড়েছি তো!”
কুসুম হেসে বলল—”পরামর্শ হবে এখন। না যদি খান, তবে আমিও আজ সারাদিন দাঁতে কুটো কাটবো না বলে দিচ্ছি কিন্তু জ্যাঠামশায়। ওসব শুনবো না—আগে নেয়ে আসুন—তারপর ভাত চাপান, আমিও আপনার প্রসাদ দু’টি পাই। মেয়ের বাড়ি এসেছেন, যতই গরীব হই, আপনাকে না খাইয়ে ছেড়ে দেবো ভেবেছেন বুঝি—ভারি টান তো মেয়ের ওপর?”
অগত্যা হাজারি চূর্ণীর ঘাটে স্নান করতে গেল। ফিরে দেখল গোয়ালঘরের এক কোণ ইতিমধ্যে কুসুম কখন লেপে পুছে পরিষ্কার করে ইট দিয়ে উনুন পেতে ফেলেছে।
একটা পিতলের মাজা হাঁড়ি দেখিয়ে বলল, “এতেই হবে জ্যাঠামশায়, না নতুন হাঁড়ি কাড়বেন?”
“না নতুন হাঁড়ির দরকার নেই। ওতেই বেশ হবে এখন।”
ভাত নামবার কিছু আগে একটি ছেলে গোয়ালঘরের দরজায় এসে উঁকি মারিয়ে ইশারায় কুসুমকে বাইরে ডাকল। হাজারি দেখল, তার হাতে একখানা গামছায় বাঁধা হাটবাজার—অন্য হাতে একটা বড় ইলিশ মাছ ঝোলানো।
“একটুখানি দাঁড়ান জ্যাঠামশায়, মাছ কুটে আনি।”
হাজারি অত্যন্ত লজ্জিত ও বিপন্ন হয়ে উঠল কুসুমের কাণ্ড দেখে। পাশের বাড়ির ছেলেটিকে ডেকে কুসুম কখন বাজার করাতে দিয়েছে—থাক দিয়েছে দিয়েছে—কুসুম গরীব মানুষ, এত বড় মাছ কিনতে দেওয়ার কারণ কি ছিল? নাঃ, বড় ছেলেমানুষ এখনও। এদের জ্ঞানকাণ্ড আর হবে কবে?
কুসুম হাজারির তিরস্কারের কোনো জবাব দিল না। মৃদু মৃদু হেসে বলল—”আপনার রান্না ইলিশ মাছ একদিন খেতে যদি সাধ হয়ে থাকে তবে মেয়েকে অমন করে বকতে নেই জ্যাঠামশায়।”
হাজারি অপ্রসন্ন মুখে বলল—”নাঃ, যত সব ছেলেমানুষের ব্যাপার।”
আহারাদির পর হাজারির বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিয়ে কুসুম খেতে গেল। গত রাতে ভাল ঘুম হয়নি—ইতিমধ্যে হাজারি কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, যখন ঘুম ভাঙল তখন প্রায় বিকাল হয়ে গেছে।
কুসুম ঘরের মধ্যে ঢুকে বলল—”কাল ঘুম হয়নি মোটেই স্টেশনের বেঞ্চিতে শুয়ে—তা বুঝতে পেরেছি। ঘুমিয়েছেন ভাল তো? চা করে আনি, উঠে মুখ ধুয়ে নিন।”
চায়ের সঙ্গে কোথা থেকে কুসুম গরম জিলিপি এনে দিল। বললেও শোনে না, বলল—”এই তো ওই মোড়ে হারান ময়রার দোকানে এ সময় বেশ গরম জিলিপি ভাজে, চায়ের সঙ্গে বেশ লাগবে—শুধু চা খাবেন?”
এসবের উপর আর কত অত্যাচার করা চলে। আজই এখান থেকে সরে না পড়লে উপায় নেই। হাজারি ঠিক করল চা খেয়ে আর একটু বেলা গেলেই এখান থেকে রওনা হবে।
কুসুম পান সেজে এনে হাজারির সামনে মেঝেতে বসল।—”তারপর এখন কি করবেন ভেবেছেন?”
“ওই তো বললাম গোয়াড়ি গিয়ে চাকরির চেষ্টা করি।”
“যদি সেখানে না পান?”
“তবে কলকাতা যাবো। তবে পাড়াগাঁয়ের মানুষ, কলকাতায় যাতায়াত অভ্যাস নেই—এত বড় শহরে থাকাও অভ্যাস নেই—ভয় করে।”
“আমার একটা কথা শুনবেন জ্যাঠামশায়?”
“কি?”
“শোনেন তো বলি।”
“বল না মা কি বলবে?”
“আমার সেই গহনা বাঁধা দিয়ে কি বিক্রি করে আপনাকে দু’শো টাকা এনে দিই। আপনি তাই নিয়ে হোটেল খুলুন। আপনার রান্নার সুখ্যাতি দেশ জুড়ে। হোটেল খুললে দেখবেন কেমন পর জমে—এই রাণাঘাটেই খুলুন, ওই চক্কত্তির হোটেলের পাশেই খুলুন। পদ্ম চোখ টাটিয়ে মরুক। মেয়ের পরামর্শ শুনুন জ্যাঠামশায়—আপনার উন্নতি হবে—কোথায় যাবেন এ বয়সে পরের চাকরি করতে।”
হাজারির চোখে প্রায় জল এল। কি চমৎকার, এই অদ্ভুত মেয়ে কুসুম! মেয়েই বটে তার। কিন্তু তা হবার নয়—নানা কারণে। কুসুমের টাকায় রাণাঘাটে হোটেল খুললে পাঁচজন পাঁচরকম বদনাম রটাবে উভয়ের নামে। তার উপকার করে নিরপরাধিনী কুসুম কলঙ্ক কুড়োতে গেল কেন? ওই পদ্মঝিই সাতরকম রটিয়ে বেড়াবে গাত্রদাহের জ্বালায়।
তা ছাড়া যদি লোকসানই হয়, ধরো—(যদিও হাজারির দৃঢ় বিশ্বাস সে হোটেল খুললে লোকসান হবে না) তা হলে কুসুমের টাকাগুলো মারা পড়বে। না, তার দরকার নেই।
“মা কুসুম, একবার তো তোমাকে বলেছিলাম তোমার ও টাকা নেওয়া হবে না। আবার কেন সে কথা? আমাকে এখন গোয়াড়ি যেতে হবে, উঠি।”
কুসুম গড় হয়ে প্রণাম করে বলল—”আচ্ছা, কথা দিয়ে যান যদি গোয়াড়িতে চাকরি না জুটাতে পারেন তবে আবার আমার কাছে ফিরে আসবেন?”
“তোমার কাছে মা? কেন বলো তো?”
“এসে ওই টাকা নিতে হবে। হোটেল খুলতে হবে। ও টাকা আপনার হোটেলের জন্যে তোলা আছে। শুধু আপনার ভালোর জন্যেই বলছি তা ভাববেন না জ্যাঠামশায়। আমার স্বার্থ আছে। আমার টাকাগুলো আপনার হাতে খাটলে তা থেকে দু’পয়সা আমিও পাবো তো। গরীব মেয়ের একটা উপকার করলেনই বা?”
হাজারি হেসে বলল—”আচ্ছা কথা দিয়ে গেলাম। তবে আসি মা আজ। এসো, এসো, কল্যাণ হোক।”
“মনে রাখবেন মেয়ের কথা।”
“তুমিও মনে রেখো তোমার বুড়ো জ্যাঠামশায়ের কথা—”
“ইস! আমার জ্যাঠামশায় বুড়ো বৈকি?”
“না, ছ’চল্লিশ বছর বয়স হয়েছে—বুড়ো নয় তো কি?”
“দেখায় না তো বুড়োর মত। বয়স হলেই হলো? আসবেন আবার কিন্তু তা হলে।”
“আচ্ছা মা।” হাজারি পুঁটুলি নিয়ে বাড়ির বাইরে এল। কুসুম তার সঙ্গে সঙ্গে বড় রাস্তা পর্যন্ত এসে এগিয়ে দিয়ে গেল।
