Course Content
আদর্শ হিন্দু-হোটেল – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

রাত্রে হাজারির চোখে ঘুম এল না। অতসীর মতো বড়ঘরের সুন্দরী মেয়ের স্নেহ পাওয়ার মধ্যে একটা আলাদা নেশা আছে—সেই নেশা তাকে গ্রাস করে ফেলল। তার জীবনে এমন ঘটনা সত্যিই অদ্ভুত।

সকালে উঠে হাজারি রাণাঘাটের উদ্দেশে রওনা দিল। পথটা বেশি দূর নয়, মাত্র পাঁচ-ছয় মাইল। হেঁটে গিয়ে সে বেলা সাড়ে আটটার সময় স্টেশনের কাছে সেগুনবনে পৌঁছল।

রেল-বাজারে ঢুকতেই তার মনে হল, একবার পুরোনো কর্মস্থানে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। প্রায় পাঁচ মাস ধরে সে রাণাঘাটে আসেনি। দূর থেকে বেচু চক্রবর্তীর হোটেলের সাইনবোর্ড দেখে তার মন উত্তেজনা আর কৌতূহলে ভরে উঠল। ওই টিনের চালওয়ালা ঘরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার গত ছয় বছরের অসংখ্য স্মৃতি।

হোটেলের গদিঘরে ঢুকতেই সে সামনে পড়ল বেচু চক্রবর্তীর। বেলা তখন প্রায় সাড়ে দশটা। খদ্দেররা আসতে শুরু করেছে। বেচু চক্রবর্তী পুরোনো দিনের মতো তক্তপোশে বসে, হাতবাক্সের সামনে তামাক খাচ্ছেন।

হাজারি প্রণাম করে দাঁড়াতেই বেচু বললেন, “আরে, এই যে হাজারিঠাকুর! কী মনে করে? আজকাল কোথায় আছ? ভালো আছ তো?”

হাজারির মনে এক মুহূর্তে পুরোনো দিন ফিরে এল। সে যেন আবার বেচু চক্রবর্তীর বেতনভোগী রাঁধুনি হয়ে গেল। ভয়, সঙ্কোচ আর মনিবের প্রতি সম্ভ্রমের ভাব তার মন-শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।

সে আগের মতো কাঁচুমাচু গলায় বলল, “আজ্ঞে, আপনার কৃপায় একরকম আছি। আপনি ভালো আছেন তো, বাবু?”

“আজকাল কোথায় আছ?”

“আজ্ঞে, গোপালনগরে কুণ্ডুবাবুদের বাড়িতে।”

“বাড়ির কাজ? কতদিন আছ?”

“এই চার মাস, বাবু।”

“তা বেশ। তবে সেখানে মাইনে কত পাও? হোটেলের মতো মাইনে কি গেরস্তবাড়ি দেবে?”

বেচুর কথায় হাজারি একটা আভাস পেল। ব্যাপার কী? বেচু কি তাকে আবার হোটেলে রাখতে চান? কৌতূহল চাপতে না পেরে সে দেখতে চাইল, শেষ পর্যন্ত কী হয়।

সে নম্রভাবে বলল, “ঠিক বলেছেন, বাবু। গেরস্তবাড়িতে বেশি মাইনে কোথায় পাব?”

“তারপর? এখন আমাদের এখানে এসেছ?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবু।”

“কী মনে করে? এখানে থাকবে?”

হাজারি না ভেবেই বলে ফেলল, “সে আপনার দয়া।”

“তা বেশ, থাকো না। পুরোনো লোক, ভালোই। যাও, কাজে লাগো। কাপড়-চোপড় এনেছ?”

“না, বাবু। আগে থেকে কী করে আনব? চাকরিতে রাখবেন কি না জানতাম না তো। সব গোপালনগরে রয়ে গেছে।”

“আচ্ছা, ঠিক আছে। ভেতরে যাও। রতন ঠাকুরের অসুখ, বংশী একা আছে। তুমি আজ থেকে কাজে লাগো। এ মাসের বাকি দিনগুলোর মাইনে আগাম নিয়ে নিও।”

হাজারি কৃতজ্ঞতায় বেচুকে আরেকবার গভীর প্রণাম করে রান্নাঘরের দিকে চলল, যেন কলের পুতুল।

সেখানে বংশীঠাকুর। তাকে দেখে বংশী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

হাজারি বলল, “বাবু ডেকে আবার বহাল করলেন! ভালো আছ, বংশী? তোমার ভাগ্নেটি ভালো?”

বংশী বলল, “আরে, এসো এসো, হাজারি-দা! তোমার কথা তো প্রায়ই হয়। ভালো আছ? এতদিন কোথায় ছিলে?”

“ডেকে কী চাপিয়েছ? সরো, হাতাটা দাও। মাছ এখনও হয়নি? যাও, মাছটা চড়াও। তেলের বরাদ্দ বাড়েনি, তাই না?”

বংশী বলল, “একটু টেনে নাও। অনেকদিন পর এলে। দাঁড়াও, ডালে নুন দেওয়া হয়নি, দিয়ে দাও।” বলে সে দরমার আড়ালে গাঁজা সাজতে গেল।

চুপিচুপি বলল, “তোমাকে বহাল করেছে কি সাধে? তুমি চলে যাওয়ায় হোটেলের দুর্নাম হয়েছে। কলকাতার বাবুরা এসে শুনেছে তুমি নেই, বলেছে, ‘সেই ঠাকুরের রান্না খেতে এসেছিলাম, সে নেই তো রেলের হোটেলে খাব।’ হাটের খদ্দেরও অনেক গেছে যদু বাঁড়ুজ্যের হোটেলে। বাবু তোমাকে ফিরিয়েছেন কেন জানো? যদু বাঁড়ুজ্যে তোমাকে পেলে এক্ষুনি নিয়ে নেবে। তোমার খোঁজও করেছে ওরা।”

গাঁজার কলিকা হাতে নিয়ে হাজারি একটা দম দিয়ে চোখ বুজে চুপ করে রইল। কী থেকে কী হয়ে গেল! সে তো চাকরি নিতে রাণাঘাট আসেনি। কিন্তু এই পুরোনো জায়গায়, পুরোনো পরিবেশে ফিরে এসে সে বুঝল, এতদিন তার মনে সুখ ছিল না। বেচু চক্রবর্তীর হোটেল, দরমার বেড়ার রান্নাঘর, পাথরের কয়লার স্তূপ, হাতাবেড়ি—এই তার চেনা স্বর্গ। এগুলো ছেড়ে সে কোথায় যাবে? ভগবানও মানুষের জীবনে এমন সুখের দিন আনতে পারেন?

বংশীর হাতে কলিকা ফিরিয়ে দিয়ে হাজারি খুশি মনে বলল, “নাও, আরেকবার টান দিয়ে নাও। আমি ডালে সম্বরা দিচ্ছি—এবেলার বাজার এখনও আসেনি নাকি?”

বংশী বলল, “মাছটা এইমাত্র এসেছে। তরকারি-পত্তর আনতে গোবরা গেছে। গোবরা নতুন চাকর—ভালো লোক, আমার ওপর বেশ ভক্তি। এলে দেখো।”

এমন সময় তৃতীয় শ্রেণির টিকিট হাতে দুজন খদ্দের খাবার ঘরে ঢুকল। হাজারি পুরোনো অভ্যাসে চেঁচিয়ে বলল, “বসুন বাবু, জায়গা ঠিক আছে—নিয়ে যাচ্ছি। বসে পড়ুন। এত সকালে মাছ এখনও হয়নি, তবে ডাল আর ভাজা আছে—বংশী, ভাত নিয়ে এসো—আমি ডালে সম্বরা দিচ্ছি।” বেলা তখন প্রায় দশটা। “কেষ্টনগরের গাড়ি আসার সময় হল। আজকাল স্টেশনের খদ্দের কে আনে?”

হাজারির দেহে-মনে যেন নতুন উৎসাহ জেগেছে। রাণাঘাটের এই শহর-বাজার, লোকজনের ভিড়, গাড়ি-ঘোড়া, রেলগাড়ির হৈচৈ—একবার এখানে থাকলে অন্য কোনো জায়গা আর ভালো লাগে না।

তখনই এক কালোমতো ছেলে, মাথায় তরকারির ঝুড়ি নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল। পিছনে পদ্মঝি। সে আসতে আসতে বলছিল, “বাবা! রাণাঘাটের বাজারে বেগুন কেনার জো নেই। আট পয়সা সের বেগুন—ভূভারতে কে শুনেছে এমন দাম! ফড়েরা বাজার আগুন করে রেখেছে। সব কলকাতায় চলে যাচ্ছে। গরিব-গুরবো লোক কী কিনবে, কী খাবে? ও বংশী, ঝুড়িটা নামিয়ে দে ওর মাথা থেকে।” দরজার চৌকাঠে পা দিয়েই সে হাজারিকে থালায় ভাত বাড়তে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে গেল, যেন কাঠ হয়ে গেছে।

হাজারিও পদ্মঝিকে দেখে থতমত খেয়ে গেল। পুরোনো ভয়টা কোথা থেকে এসে তার মনে জুটল। সে কাষ্ঠহাসি দিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “এই যে পদ্মদিদি, ভালো আছেন? হে-হে-আমি—”

পদ্মঝি বিস্ময় সামলে বংশীর দিকে তাকিয়ে বলল, “ঝুড়িটা নামা না, ঠাকুর? ও তো সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মাছ হয়েছে?” তারপর হাজারির দিকে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে চেয়ে বলল, “কখন এলে?”

“আজই এলাম, পদ্মদিদি।”

“আজ এবেলা এখানে থাকবি?”

বংশী বলল, “হাজারিকে বাবু আবার বহাল করেছেন। ও এখানে কাজ করবে।”

পদ্মঝি কঠিন মুখে বলল, “তা বেশ।” আর রান্নাঘরে না দাঁড়িয়ে বাইরে চলে গেল।

বংশী ফিসফিস করে বলল, “পদ্মদিদি চটেছে। এবার বাবুর সঙ্গে একচোট লাগবে।”

সারা দুপুর পদ্মঝিকে রান্নাঘরের দিকে দেখা গেল না। হাজারির মন ছটফট করছিল—কখন কাজ সেরে কুসুমের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। সে লক্ষ করল, হোটেলের খদ্দের সত্যিই কমে গেছে। আগে যেখানে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত কাজ থামত না, আজ বেলা একটার পর বাইরের খদ্দের আসা বন্ধ হয়ে গেল।

হাজারি বলল, “বংশী, থার্ড ক্লাসের টিকিট মোট ত্রিশটা! আগে তো একবেলায় সত্তর-পঁচাত্তরটা হত। এত খদ্দের গেল কোথায়?”

বংশী বলল, “তবু এখন একটু বেড়েছে। মাঝে তো আরও কমে গিয়েছিল। কুড়িটা টিকিটও হয়েছে এমন দিন গেছে। সবাই যদু বাঁড়ুজ্যের হোটেলে যায়। ওদের এবেলা একশো, ওবেলা ষাট-সত্তর খদ্দের। হাটের দিন আরও বেশি। এখানে খদ্দের থাকবে কী করে? মাছের মুড়ো খদ্দেররা চাইলেও পায় না। বড় মাছ কাটলেই মুড়ো পদ্মদিদি নিয়ে যান। আমাদের কিছু বলার উপায় নেই। আর আজকাল পদ্মদিদির যা চুরি শুরু হয়েছে—সে কথা পরে বলব। আগে খেয়ে নাও।”

খাওয়া-দাওয়া সেরে হাজারি বাইরে এসে মোড়ের দোকান থেকে এক পয়সার বিড়ি কিনে ধরাল। চূর্ণী নদীর ধারে তার চেনা গাছতলায় অনেকদিন বসা হয়নি—আজ সেখানে গিয়ে বসতে হবে। পথে রাধাবল্লভতলায় সে ভক্তিভরে প্রণাম করল। তার মনে আজ প্রচুর আনন্দ। রাধাবল্লভ ঠাকুর জাগ্রত দেবতা—এমন দিনও তার জন্য জুটিয়ে দিয়েছেন! সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কি সে এমনটা ভেবেছিল? স্বপ্নের মতো অবিশ্বাস্য। যারা তাকে চোর বলে বদনাম দিয়ে তাড়িয়েছিল, তারাই আজ এসে তাকে চাকরিতে ফিরিয়ে নিল।

চূর্ণীর ধারে গাছতলায় বসে বিড়ি টানতে টানতে সে মনের আনন্দে বিড়িটা শেষ করে ফেলল। কুসুমের বাড়ি এখন ঘুমিয়ে আছে—গৃহস্থ বাড়িতে এ সময় দেখা করতে যাওয়া যায় না। বেলা কখন পড়বে? অন্তত চারটা না বাজলে কুসুমের কাছে যাওয়া চলে না। এখনও দেড় ঘণ্টা বাকি।

গোপালনগরের কুণ্ডুবাড়ি থেকে তার কাপড়ের পুঁটলি একদিন গিয়ে আনতে হবে। গত মাসের মাইনে বাকি আছে—দিলে ভালো, না দিলে কী আর করা যাবে?

রাতে ঘুম না হওয়া, অনেকদিন পর হোটেলের খাটুনি, আর পাঁচ ক্রোশ হেঁটে গ্রাম থেকে রাণাঘাট আসার ক্লান্তিতে হাজারির শরীর ভেঙে পড়ছিল। গাছতলার ছায়ায় বসে সে কখন ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম ভাঙতে সূর্য দেখে মনে হল চারটে বেজে গেছে।

কিছুক্ষণ পর সে কুসুমের বাড়ির দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ল। কুসুম নিজে এসে খিল খুলল। হাজারিকে দেখে অবাক হয়ে বলল, “জ্যাঠামশায়! কোথা থেকে? আসুন, আসুন—”

তারপর নীচু হয়ে হাজারির পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করল। হাজারি হেসে বলল, “এসো এসো মা, কল্যাণ হোক। ছেলেমেয়েরা সব ভালো? তুমি এত রোগা হয়ে গেছ, ইস! তোমার কাকার মুখে তোমার অসুখের কথা শুনলাম।”

কুসুম তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে মেঝেতে শতরঞ্জি পেতে বসাল। বলল, “ভয় নেই জ্যাঠামশায়, এত তাড়াতাড়ি মরছি না। আপনি যাওয়ার পর থেকে আর কোনো খবর নেই। অসুখের সময় আপনার কথা কত ভেবেছি জানেন? মরে গেলে আর দেখা হত না। এমন আপদ না হলে মরতামই—”

“ছি ছি, মা, এমন কথা বলতে নেই।”

“এতদিন কোথায় ছিলেন? আজ কোথা থেকে এলেন?”

“এঁডোশোলা থেকে।”

কুসুম ব্যস্ত হয়ে বলল, “হেঁটে এসেছেন বুঝি? খাওয়া হয়নি?”

হাজারি হেসে বলল, “ব্যস্ত হয়ো না মা। সব বলছি। সকালে এঁডোশোলা থেকে বেরিয়েছিলাম। ভাবলাম রাণাঘাটে যাই, তোমার সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছে হল। বেলবাজারে বাবুর হোটেলে গিয়েছিলাম, অমনি বাবু কাজে বহাল করলেন। সেখানে কাজ সেরে চূর্ণীর ধারে বেড়িয়ে এখানে এলাম।”

“ওমা, আমার কী হবে? ওরা আবার আপনাকে বহাল করল! তবে মিথ্যে চুরির অপবাদ দিয়েছিল কেন? পদ্ম আছে তো?”

“পদ্ম না থেকে যাবে কোথায়? আছে, খুব আছে।”

পরে গর্বের সুরে বলল, “আমাকে না নিলে হোটেল চলে না। খদ্দের আধেক কমে গেছে। সব গেছে বাঁড়ুজ্যে মশায়ের হোটেলে।”

হোটেলের মালিক হলেও মনিবের সম্মানে হাজারি যদু বাঁড়ুজ্যের নামটা সমীহ করে উচ্চারণ করল।

কুসুম অবাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলল, “বসুন জ্যাঠামশায়, আমি আসছি—”

“না না, শোনো। এখন খাওয়া-দাওয়ার জন্য কিছু করতে যেয়ো না।”

“আপনি বসুন, আমি আসছি—”

কোনো কথাই শুনল না। কুসুম কিছুক্ষণ পর গরম দুধের বাটি আর দুখানা বরফি সন্দেশ রেকাবিতে করে এনে হাজারির সামনে রাখল। বলল, “একটু জলসেবা করুন।”

“ওই তো তোমাদের দোষ, বারণ করলেও শোনো না—”

কুসুম হেসে বলল, “কথা শুনব পরে। দুধটা খান, সবটা। ভালো দুধ—বাড়ির গরুর। ঘন করে জ্বাল দিয়েছি, দুপুর থেকে আঁচে বসানো ছিল।”

“তুমি বড় মুশকিলে ফেললে মা! নাঃ—”

পান সেজে দিয়ে কুসুম বলল, “জ্যাঠামশায়, হোটেল ভালো লাগছে?”

“তা মন্দ লাগছে না। আজ বেশ ভালো লাগল। তবে ভাবছি, এই রেলবাজারে আরেকটা হোটেল চলতে পারে।”

“শুধু চলতে পারে না, জ্যাঠামশায়, খুব ভালো চলবে। আপনার নামে হোটেল দিলে সব হোটেল কানা হয়ে যাবে।”

“তোমার তাই মনে হয়, মা?”

“হ্যাঁ, আমার তাই মনে হয়। খুলুন আপনি হোটেল।”

“আরেকজনও কাল এই কথা বলেছে। তোমার মতো সেও আমার এক মেয়ে। আমাদের গাঁয়ের—”

“কে জ্যাঠামশায়?”

“হরিবাবুর মেয়ে, অতসী। টেঁপির বন্ধু। দুজনে খুব ভাব। সে কাল বলছিল—”

“আমাদের বাবুর মেয়ে? আমি তো দেখিনি কখনো। বয়স কত?”

“ওরা নতুন এসেছে গাঁয়ে, কোথা থেকে দেখবে। বয়স ষোলো-সতেরো হবে। বড় ভালো মেয়ে।”

“সবাই যখন বলছে, তাহলে করুন। টাকা আমি দেব—”

“অতসীও দেবে বলেছে। দুজনের টাকা নিলে জাঁকিয়ে হোটেল দিতে পারব। তবে ভয় হয়, তোমার ব্যাঙের আধুলি নিয়ে লোকসান হলে একুল-ওকুল দুই যাবে। অতসী বড়লোকের মেয়ে, তার দুশো টাকা গেলে কিছু আসে-যায় না—”

“না, আমার টাকাও খাটাতে হবে। সে আমি শুনছি না।”

“তাহলে দুজনের টাকাই নেব। কাল থেকে জায়গা দেখছি। তবে টাকা গেলে আমায় দোষ দিও না।”

“জ্যাঠামশায়, আপনি হোটেল খুললে টাকা ডুববে না—আমি বলছি। তবু যদি ডোবে, তবে আর কী হবে। আপনাকে দোষ দেব না।”

উঠতে গিয়ে কুসুম বলল, “জ্যাঠামশায়, পরশু সংক্রান্তির দিন বাড়িতে সত্যনারায়ণের সিন্নি দেব ভাবছি। আপনি রাতে এখানে সেবা করবেন।”

“তা কী করে হবে, মা? রাত বারোটার আগে ছুটি পাব না!”

“তাহলে পরের দিন দুপুরে? বেলা একটায় আসবেন। আমি লুচি ভেজে রাখব, আপনি এসে তরকারি করে নেবেন। কথা রইল, আসতেই হবে কিন্তু।”

হোটেলে ফিরে হাজারি বড় ডেকে রান্না চাপাল। বংশী এবেলা এখনও আসেনি। হাজারি খুশি মনে চারদিকে তাকাল—সেই চেনা রান্নাঘর, পাঁচ মাস আগে টিনের চালের বাতায় গোঁজা লোহার খুন্তিটা এখনও মরচে পড়ে সেখানেই আছে। সেই বংশী, সেই রতন, সেই পদ্মদিদি।

বংশী এসে ঢুকল। হাজারি বলল, “আজ পেঁপে কুটে দাও তো, বংশী। অনেকদিন পর পেঁপের তরকারি মন দিয়ে রাঁধব। একদিনে বাঁড়ুজ্যে মশায়ের হোটেল কানা করে দেব।”

গদির ঘর থেকে পদ্মঝির গলা শুনে বংশী বলল, “ও পদ্মদিদি, শোনো এদিকে—”

পদ্মঝি থার্ড ক্লাসের খাবার ঘর পেরিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে বলল, “কী হয়েছে?”

বংশী বলল, “এবেলা কী কী রান্না হবে? হাজারি বলছে পেঁপের তরকারি ভালো করে রাঁধবে। আজ থেকে দু-একটা ভালো জিনিস দেখাতে হবে। পেঁপে আছে তো?”

পদ্মঝি বলল, “না, পেঁপে কাল হবে। আজ এবেলা বিলিতি কুমড়ো করো। আর কুচো মাছের ঝাল। ওবেলা সাত আনা সের চিংড়ি গেছে—এবেলা দেখি কী মাছ পাওয়া যায়।”

হাজারি বলল, “পদ্মদিদি, আজ একটু মাংস হলে না?”

পদ্মঝি এতক্ষণ হাজারির সঙ্গে সরাসরি কথা বলেনি। সারাদিনে এই প্রথম তার দিকে তাকিয়ে বলল, “মাংস বুধবার হয়ে গেছে। আজ আর হবে না—শনিবার হবে।”

পদ্ম তার সঙ্গে কথা বলায় হাজারি ভেতরে ভেতরে পুলকিত হল। সেই আনন্দ কাটতে না কাটতেই পদ্মঝি তাকে চমকে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এতদিন কোথায় ছিলে, ঠাকুর?”

হাজারি উৎসাহে বলল, “আমার কথা বলছ, পদ্মদিদি?”

“হ্যাঁ।”

“গোপালনগরে কুণ্ডুবাবুদের বাড়ি। আমি ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছিলাম—তারপর আজ রাণাঘাটে বেড়াতে এসেছিলাম। তা বাবু বললেন—”

“হুঁ, বেশ। থাকো না। তবে বাইরে জিনিসপত্র নিয়ে যেতে পারবে না, বলে দিচ্ছি। ওসব বাবু একদম বন্ধ করে দিয়েছেন। যা পারো এখানে খাও—বুঝলে?”

“না, বাইরে নিয়ে যাব কেন, পদ্মদিদি? তা নিয়ে যাব না।”

“তোমার সেই কুসুম কেমন আছে? দেখা করতে যাওনি?” পদ্মঝির গলায় বিদ্রূপ আর শ্লেষের ছোঁয়া।

হাজারি লজ্জায় ও অপ্রতিভ হয়ে বলল, “কুসুম? হ্যাঁ, তা কুসুম—ভালোই—”

পদ্মঝি মুখ ফিরিয়ে যেন হাসল। অন্তত হাজারির তাই মনে হল। পদ্মঝি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই বংশী বলল, “যাক, তোমার চাকরি পাকা হয়ে গেল, হাজারিদা। দুপুরের পর আমরা চলে গেলে বোধহয় কর্তা-গিন্নীর মধ্যে পরামর্শ হয়েছে। চলো, এক ছিলিম সাজাই।”

হাজারি হাসল। সব দিকেই ভালো, কিন্তু পদ্মদিদি কুসুমের কথা তুলল কেন? ছোট মন—ছিঃ।

বংশী বাইরে থেকে চাপা গলায় ডাকল, “ও হাজারিদা, এসো—একটা টান দাও—”

গাঁজায় কষে দম মেরে হাজারি রান্নাঘরে ফিরে বসতেই হঠাৎ অতসীর মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠল। দুর্গা প্রতিমার মতো মেয়ে অতসী। কী চমৎকার মন! তার কাকাবাবু গাঁজা খায়, অতসী দেখলে কী ভাবত? এই জন্যই গ্রামে সে কখনো গাঁজা খায় না। ছেলেমেয়েদের সামনে লজ্জার কথা।

অতসী টাকা দিতে চেয়েছে, হোটেল তাকে খুলতেই হবে। বংশীকে কথাটা বলবে? বংশী আর রতন দুজনেই ভালো লোক, তাদের বিশ্বাস করা যায়। দুজনেই তাকে ভালোবাসে।

বংশীকে বলল, “আজকাল রাতে টক হয়?”

“সবদিন হয় না। এখন নেবু সস্তা, তাই নেবু দেওয়া হয়। পয়সায় ছয়-সাতটা পাতিলেবু।”

“একটা কিছু করে দেখাতে হবে তো। বড়ির টক করব ভাবছিলাম—”

“তুমি ভাবলে কী হবে? পদ্মদিদি পাস করলে তবে তো হাঁড়িতে উঠবে। আইন-কানুন ভুলে গেলে নাকি, হাজারি?”

হাজারি হো হো করে হেসে উঠল। বলল, “বংশী, একটু চা করে খেলে হত না? তোড়জোড় আছে?”

বংশী বলল, “খাবে? আমি ঠিক করে দিচ্ছি। ডাল চড়িয়ে গরম জল এই ঘটিতে কেটলিতে রাখো। চিনি আছে, চা আনিয়ে নিচ্ছি। মনে আছে গত বছর আমরা চা খেয়েছিলাম? আদার রসও দেব এখন—”

আধঘণ্টার মধ্যে হাজারি ও বংশী কলাই করা বাটিতে মনের আনন্দে চা খাচ্ছিল। ভূতগত খাটুনির মধ্যেও এতে আনন্দ কম কী? হাজারি আগুনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে চিন্তিত মুখে বলল, “যেখানে যার মন টেকে, বুঝলি বংশী। গোপালনগরে সন্ধেবেলা ওদের মন্দিরে ঠাকুরের শীতল হত। সন্দেশ, ফল কাটা, মুগের ডাল ভিজিয়ে আমাকে খেতে দিত। চা আমি উনুনে করে নিতাম। কিন্তু তাতে কী মজা ছিল? একা বসে রান্নাঘরে চা আর খাবার খেতাম, মন হু হু করত। খেয়ে সুখ ছিল না। আজ শুধু চা খাচ্ছি, তবু যেন কত মিষ্টি!”

রাত হয়েছে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম থেকে গাড়ির আওয়াজ পেয়ে হাজারি বলল, “ও বংশী, কেষ্টনগর এল যে। ডালে কাঁটা দিয়ে নাও—”

সঙ্গে সঙ্গে গোবরা চাকর খাবার ঘর থেকে হাঁকল, “থার্ড ক্লাস দু-থালা—” উত্তেজনায় হাজারির সারা দেহ কেঁপে উঠল। কী কাজের ভিড়, কী হৈচৈ, কী ব্যস্ততা—এর মধ্যেই তো মজা। গোপালনগরের মতো পড়াগাঁয়ে কুণ্ডুদের নিস্তব্ধ অট্টালিকার রান্নাঘরে কড়িকাঠ গুনতে গুনতে, বাগানের তেঁতুল গাছে বাদুড় ঝোলা দেখতে দেখতে রান্না করা—সে কি তার পোষায়? সে তো শহরের মানুষ।

সংক্রান্তির পরের দিন বেলা বারোটার সময় হাজারি কুসুমের বাড়ি নিমন্ত্রণ রাখতে গেল। বংশীকে বলে একটু আগে হোটেল থেকে বেরিয়েছিল।

কুসুম গোয়ালঘরের নতুন উনুনে কপির ডালনা রাঁধছিল। একটা কলাপাতায় বেগুন ভাজা আর পাথরের খোরায় ছোলার ডাল। শুদ্ধাচারে সব করতে হচ্ছে বলে এমন ব্যবস্থা। হাজারি দেখে মনে মনে হেসে ভাবল—কুসুমের কাণ্ড দেখো! আমি হোটেলে থাকি, কত ছোঁয়াছুঁয়ি হয়, তার ঠিক নেই। আর ও নেয়ে-ধুয়ে শুদ্ধ কাপড়ে গুরুঠাকুরের মতো রাঁধছে।

কুসুম সলজ্জ হেসে বলল, “জ্যাঠামশায়, এখনও হয়নি। একটু দেরি আছে। আমি তরকারি রেঁধেছি—আপনি শুধু বসে যাবেন—”

হাজারি বলল, “তুমি তরকারি রাঁধলে যে! সে কথা তো ছিল না। আমি তোমার তরকারি খাব কেন?”

“ঠকাতে পারবেন না, জ্যাঠামশায়। কোনো তরকারিতে নুন দিইনি। নুন না দিলে খেতে আপত্তি কী? ভাবলাম, আপনি এত বেলায় এসে তরকারি রাঁধবেন, সে তো কষ্ট। লুচি ভাজা আর হাঙ্গামা, দেরি হবে। তাই রেঁধে নিয়েছি—”

“নুন দাওনি? না মা, তুমি হাসালে। আলুনি তরকারি খাওয়াবে?”

“আর গোয়ালার মেয়ে হয়ে আমি নিজের রান্না দিয়ে আপনার জাত মারব? নরকে পচতে হবে না আমাকে?”

হাজারি হো হো করে হেসে উঠল। বলল, “দাও ময়দাটা, মেখে নিই—”

“সব ঠিক আছে, জ্যাঠামশায়। কিছু করতে হবে না। শুধু নেচি কেটে লুচি বেলে দিন। কপি হয়ে গেলে চাটনি রাঁধব। তারপর লুচি ভেজে গরম গরম—ওতে কী, জ্যাঠামশায়?”

হাজারি গায়ের চাদর থেকে শালপাতার ঠোঙা বার করতে করতে আমতা আমতা করে বলল, “এই, কিছু নতুন গুড়ের সন্দেশ। পয়লা তারিখে মাসের কয়েক দিনের মাইনে দিল—ভাবলাম একটু মিষ্টি—”

কুসুম রেগে বলল, “এটা আপনার বড় অন্যায়, জ্যাঠামশায়। এই সবে চাকরির মাইনে, আমার জন্য খরচ করে সন্দেশ না কিনলে চলত না? আমি আপনাকে দণ্ড দিতে সেবা করতে বলেছি? এসব কী ছেলেমানুষি—”

হাজারি ঠোঙাটা দাওয়ার প্রান্তে অপরাধীর মতো সঙ্কোচে রেখে বলল, “আমার কি ইচ্ছে করে না, মা, তোমার জন্য কিছু আনতে? বাবা মেয়েকে খাওয়ায় না বুঝি?”

কুসুমের হাসি পেলেও সে রাগের সুরে বলল, “না, ভারি চটে গেছি। পয়সা হাতে এলেই খরচ করতে হাত সুড়সুড় করে? ভারি বড়লোক হয়েছেন? সাত দিন কাজ করে কত মাইনে পেয়েছেন যে এক ঢাক সন্দেশ আনলেন?” হাজারি চুপ করে অপ্রতিভ মুখে বসে রইল।

“আসুন এদিকে, এই আসনে বসুন। ময়দাটা নেচি করুন—”

কুসুমের ছেলে-মেয়ে মাকে বকতে দেখতে উঠানে এসে দাঁড়াল। হাজারি ঠোঙা থেকে সন্দেশ বার করে তাদের হাতে দিয়ে বলল, “যাক, নাতি-নাতনিরা আগে খাক। মেয়ে খায় না খায় পরে বুঝবে—”

কুসুমের দিকে ফিরে বলল, “নাও, হাত পাতো। আর রাগ করিস না—”

কুসুম এবার হাসি চাপতে পারল না। বলল, “আমি রাঁধতে রাঁধতে খাব?”

“কেন, আলগোছে?”

“না।”

“কেন?”

“আমি বুড়ো মাগি। ভোগের আগে পেসাদ পড়ে বসে থাকি আর কী!”

হাজারি বুঝল, তার খাওয়া না হলে কুসুম কিছু খাবে না। সে আর কথা না বাড়িয়ে লুচির ময়দা নিয়ে বসে গেল।

কুসুম বলল, “হোটেল খোলার কী করলেন?”

“গোপাল ঘোষের তামাকের দোকানের পাশে ওই ঘরখানা ন’টাকা ভাড়া বলে। দেখেছ ঘরটা?”

কুসুম উৎফুল্ল হয়ে বলল, “কবে খুলবেন?”

“সামনের মাসে। টাকা দেবে তো?”

কুসুম গলা নামিয়ে বলল, “আস্তে আস্তে। কেউ শুনবে—”

“তোমার শাশুড়ি কই?”

“আমি বাইরে যেতে পারিনি, তাই দুধ নিয়ে বেরিয়েছে। এল বলে।”

“বাত সেরেছে?”

“মরচের মাদুলি নিয়ে এখন ভালো আছে। আগে কয়েকদিন পঙ্গু হয়ে পড়েছিল—এখন ঢের ভালো। আপনার জায়গা করে দিই। ওগুলো ভেজে ফেলুন। গরম গরম দেব—”

হাজারি খেতে বসল। কুসুম কাছে বসে লুচি, তরকারি দিতে দিতে বলল, “আপনি তরকারিতে বেশি নুন মেখে খান—”

“রান্না চমৎকার হয়েছে, মা—”

“থাক, আপনার আর—”

“হোটেল যেদিন খুলব, সেদিন তোমায় নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াব—”

“না। ওসব করতে দেব না। বুঝেসুঝে চলতে হবে না? টাকা নিয়ে ভূতনাথের কাণ্ড করবেন?”

“কী করব না! তুমি আমায় চেন না।”

“আমার জন্য এক পয়সা খরচ করতে পাবেন না, বলে দিচ্ছি। তাহলে আপনার সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করে দেব—ঠিক।”

পনেরো দিন পর হাজারি গ্রামে সংসারের খরচ দিতে গেল। বিকেলে হরিবাবুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে দেখল, হরিবাবু বৈঠকখানায় দুজন অপরিচিত ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন। তাকে দেখে বললেন, “এই যে, এসো হাজারি। বসো। এরা কলকাতা থেকে অতসীকে দেখতে এসেছেন। তুমি এসেছ, ভালোই হয়েছে। রাতে আমার এখানে খাও—”

অতসীর তাহলে বিয়ে? এর মধ্যে বিয়ে হয়ে গেলে, শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে টাকার ব্যাপারটা চাপা পড়ে যাবে। হাজারি একটু দমে গেল।

আধঘণ্টা পর হরিবাবু বললেন, “আমি সন্ধ্যাহ্নিক সেরে আসি। আপনাদের ততক্ষণ চা দিয়ে যাক।”

ভদ্রলোক দুজন বললেন, “তিনি ফিরলে একসঙ্গে চা খাওয়া যাবে। আমরা ততক্ষণ নদীর ধারে বেড়িয়ে আসি।”

অল্পক্ষণ পর অতসী বৈঠকখানায় ভেতরের দরজা দিয়ে সন্তর্পণে উঁকি মেরে ঘরে ঢুকল।

“এসো, এসো মা। ভালো আছ?”

“আপনি ভালো আছেন, কাকাবাবু? গোপালনগর থেকে আসছেন?”

“না মা। আমি তো গোপালনগরে নেই। রাণাঘাটের সেই হোটেলে আবার কাজ নিয়েছি। ওরা ডেকে বহাল করল।”

“করবে না? আপনার মতো লোক পাবে কোথায়? আমায় এবার একটা কিছু শিখিয়ে দিয়ে যান, কাকাবাবু। আপনার নাম করব চিরকাল।”

“মা, এ হাতে-কলমে শেখার জিনিস। বলে দিলে হবে না, দেখিয়ে দিতে হবে। তার সুবিধে হবে কী? এর আগেও তোমাকে বলেছি।”

“কাল আপনার বাড়ি যাব। টেঁপিকে বলবেন। তাকে নিয়ে এলেন না কেন? তাকে নিয়ে আসবেন, সেও আমাদের এখানে রাতে খাবে।”

অতসী একটু পরে চলে গেল, কারণ আগন্তুকদের গলার আওয়াজ বাইরে শোনা গেল।

পরদিন সকালে টেঁপির মা উঠান ঝাঁট দিচ্ছে, এমন সময় অতসী মাচাতলা থেকে ডাকল, “টেঁপি, ও টেঁপি—”

টেঁপির মা ঝাঁটা ফেলে তাড়াতাড়ি গেল। জমিদারের মেয়ে অতসী গ্রামে কারও বাড়ি বড় একটা যায় না। তাদের মতো গরিবের বাড়িতে আসছে—এ ভাগ্যের কথা, গর্ব করে বলার মতোও বটে।

হেসে বলল, “টেঁপি বাসন নিয়ে পুকুরে গেছে। এসো, বসো মা।”

“কাকাবাবু কোথায়?”

হাজারি কাল রাতে অতসীদের বাড়ি ভালো খেয়েছিল। আজ তিন ক্রোশ হেঁটে রাণাঘাট যাবে বলে এক বাটি চালভাজা নুন-লঙ্কা দিয়ে দাওয়ায় বসে চিবোচ্ছিল। অতসী এসে দেখে ফেলবে বলে বাটিটা কোঁচার কাপড়ে চাপা দিল।

অতসী এসে বলল, “কই, কাকাবাবু কোন দিকে?”

ভালো সময়ে চালভাজা ঢেকে ফেলেছে। অতসী তাকে রাক্ষস ভাবত—রাতে ওই খাওয়ার পর সকালেই আবার—

“এই যে মা। কী মনে করে এত সকালে?”

“আপনি আমাদের বাড়ি দুপুরে খাবেন, তাই বলতে বললেন বাবা—”

“না মা, আমি এখনই রাণাঘাট বেরোচ্ছি। ছুটি তো নেই। আর কাল রাতে যে খাওয়া হয়েছে—”

“তবে টেঁপি আর খুড়িমা খাবেন। ওঁদের নেমন্তন্ন। আমি বলে যাচ্ছি।” বলে অতসী দাওয়ায় উঠে পিড়ি পেতে বসে গেল। হাজারি প্রমাদ গণল। সময় নেই, দশটার মধ্যে হোটেলে পৌঁছে রান্না চাপাতে হবে। এক বাটি চালভাজা চিবোতেও সময় লাগে। মেয়েটা সব মাটি করে দিল! বাটি লুকিয়ে বসে থাকা কতক্ষণ চলে?

অতসী বলল, “কাকাবাবু, আমার সঙ্গে যদি আপনার আর দেখা না হয়?”

“কেন দেখা হবে না?”

অতসী লাজুক মুখে বলল, “ধরুন যদি আমি—এখান থেকে যদি—”

“বুঝেছি, মা। ভালোই তো, আনন্দের কথা।”

“আপনারা তাড়াতে পারলে বাঁচেন, জানি। মার মুখেও সেই কথা, বাবার মুখেও সেই কথা। সে যা হয় হবে, আমি তা বলছি না। আমি বলছি, আপনি আজ থেকে যান। আমি যে কথা দিয়েছিলাম—সেই টাকা, মনে আছে তো? আজ দিয়ে দিই। বললে এখনই আনি। মনের ভার কমে, তারপর যেখানে বিদায় করেন করবেন—”

“ও কী মা! বিদায় কেউ করছে না। অমন কথা বলতে নেই। কিন্তু টাকা নিতান্তই দেবে তাহলে?”

“যখন বলেছি, তখন কি ভেবেছিলেন আমি মিথ্যে বলছি?”

“তা ভাবিনি। আচ্ছা, ধরো আমি হোটেল খুলে লোকসান দিলাম। তখন তোমার টাকা শোধ দিতে পারব না?”

“আমি তো বলেছি, না দিতে পারেন তাই কী? বসুন, আমি টাকা নিয়ে আসি।”

আধঘণ্টার মধ্যে অতসী ফিরল। আঁচলের গেরো খুলে দুশো টাকার খুচরো নোট গুনে দিয়ে বলল, “এই রইল। ফেরত দিতে হবে না। টেঁপির বিয়ে দেবেন এই টাকায়। আমি যাই, লুকিয়ে এসেছি। বাবা খুঁজবেন আবার।”

রাণাঘাট যেতে সারা পথ হাজারি অন্যমনস্কভাবে চলল। বেশ মেয়ে অতসী। ভগবান ওর ভালো করুন। তার মন বলছে, অতসীর হাত দিয়ে যে টাকা এসেছে, তাতে ব্যবসা খুললে লোকসান হবে না। যেন লক্ষ্মী নিজে এসে টাকা গুঁজে দিয়ে গেলেন।

হোটেলে পৌঁছে দেখল, বংশী ডাল চড়িয়ে একা বসে। তাকে দেখে বলল, “এসো হাজারিদা, বড্ড বেলা করলে যে! বড় ডেকে ভাত চাপাও। নেবে নাকি একটু দম দিয়ে?”

“তা নাও না। সাজো, আমি ডাল দেখছি—”

একটু পর গাঁজার কলিকা হাজারির হাতে দিয়ে বংশী বলল, “একটা বড় কাজে বায়না এসেছে। নেবে? আন্দুলের ঘোষেদের বাড়ি রাস হবে। সাত দিনের ঠিকে কাজ। বঁদে ভিয়েন, সন্দেশ ভিয়েন, রান্না—দু’টাকা মজুরি দিন, খোরাকি ছাড়া।”

হাজারি বলল, “বংশী, একটা কথা বলি। আমি রাণাঘাটের বাজারে হোটেল খুলছি। কাউকে বলিস না। তোমাকে আমার হোটেলে আসতে হবে।”

বংশী ঠিক শুনেছে কি না বুঝতে পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “হোটেল খুলবে? তুমি?”

“হ্যাঁ, আমি না কে? তোমার বেহাই?”

“কী পাগলের মতো বলছ, হাজারিদা? কলকে রাখো, আর টান দিও না। রেলবাজারে হোটেল খুলতে কত টাকা লাগে জানো?”

“কত টাকা বলে তোমার মনে হয়?”

“পাঁচশো টাকার কম নয়।”

“চারশোতে হয় না?”

“আপাতত চলবে। কিন্তু কে তোমায় চারশো টাকা—”

কোঁচার গেরো খুলে হাজারি নোটের তাড়া দেখিয়ে বলল, “এই দেখ, দুশো টাকা আছে। যোগাড় করে এনেছি। এখন লাগো গাছকোমর বেঁধে। তোমার অংশ থাকবে, যদি প্রাণপণে চালাতে পারো। ফাঁকি দেব না। আজ থেকে বাড়ি দেখ। পনেরো টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেব। আর দুশো টাকাও যোগাড় আছে।”

বংশী অস্পষ্ট শব্দ করে বলল, “ভ্যালা আমার মানিক রে! হাজারিদা, এসো তোমায় কোলে করে নাচি। এক অস্ত্রে বেচু চক্রবর্তী বধ, পদ্মদিদি বধ, যদু বাঁড়ুজ্যে বধ—”

“চুপ, চুপ। ছুটির পর দুজনে ঘর দেখি। তামাকের দোকানের পাশে ওই ঘরটা ন’টাকা ভাড়া। জায়গাটা ভালো। আচ্ছা, বাজার কেমন, বংশী?”

“বাজার ভালো। নতুন আলু সস্তা হলে আরও সুবিধে হবে। নতুন আলু উঠেছে। কেবল মাছটা এখনও আক্রা—”

“ঘর দেখার পর একটা ফর্দ করি। থালা-বাসন, বালতি, জালা, শিলনোড়া, বঁটি—”

“আজ খাওয়াও, হাজারিদা। মাইরি, একটা কাজের মতো কাজ করলে। আচ্ছা, টাকা পেলে কোথায়, বলো না?”

“পরে বলব সব। সময় আছে। এখন আগের কাজ আগে করো।”

পদ্মঝি হঠাৎ রান্নাঘরে ঢুকে বলল, “বেশ, দুটিতে বসে খোশগল্প চলছে। ওদিকে মাছ ডাঙায়, তরকারি ডাঙায়। এখনই লোক খেতে আসবে—”

গোবরা হাঁকল, “থার্ড ক্লাস একথালা—”

পদ্মঝি বলল, “ওই! এল তো। মাছ ভাজা পর্যন্ত হয়নি, তাই দিয়ে ভাত দেবে? গাঁজার ধোঁয়ায় রান্নাঘর অন্ধকার। সব তাড়াতে হবে, তবে হোটেল চলবে। কর্তার খেয়েদেয়ে নেই, তাই এমন উনপঞ্চাশে গাঁজাখোর জুটিয়ে হাতাবেড়ি দিয়েছে—”

বংশী বলল, “রাগ করো কেন, পদ্মদিদি? কাল রাতের বাসি মাছ ভেজে রেখেছি। থার্ড ক্লাসের খদ্দেররা সকালে তাই খেয়ে আসছে চিরকাল।”

হাজারি বংশীর দিকে তাকিয়ে বলল, “না বংশী, দই এনে দাও। বাসি মাছ দিও না। ওতে নাম খারাপ হয়—”

পদ্মঝি ঝাঁঝিয়ে বলল, “দইয়ের পয়সা তুমি দিও, ঠাকুর। হোটেল থেকে দেওয়া হবে না। তুমি বেলা করে এলেই মাছ হয়নি। বংশী একা কতদিকে যাবে?”

হাজারি চুপ করে রইল।

হোটেলের ছুটির পর চূর্ণীঘাটে যাওয়ার পথে রাধাবল্লভতলায় বারবার নমস্কার করল। ঠাকুর রাধাবল্লভ যেন এতদিন পর মুখ তুলে তাকিয়েছেন। তার প্রিয় গাছতলায় বসে হাজারি কত কী ভাবতে লাগল। অতসী টাকা দিয়েছে, তার বাড়ি বয়ে এসে টাকা দিয়ে গেছে। হয়তো সে হোটেল খুলতে দেরি করত, কিন্তু আর দেরি করা চলবে না। অতসী মায়ের কাছে কথা দিয়েছে, সে কথা রাখতেই হবে।

রাণাঘাট তার ভালো লাগে। বেচুবাবুর হোটেলই একমাত্র জায়গা যেখানে তার মন ভালো থাকে, জীবন শান্তিতে কাটছে মনে হয়। এই রেলবাজার ছাড়া সে কোথাও যেতে পারবে না। এখানেই হোটেল খুলবে, অন্যত্র নয়।

বিকেলে কুসুমের বাড়ি গেল। কুসুম বলল, “আজ এলেন? আসুন, বসুন।”

হাজারি হেসে বলল, “একটা জিনিস রাখতে হবে, মা।”

“কী?”

কোঁচড় থেকে দুশো টাকার নোট বার করে বলল, “রেখে দাও।”

কুসুম অবাক হয়ে বলল, “কোথায় পেলেন?”

“ভগবান দিয়েছেন। হোটেল খোলার রেস্ত জুটিয়ে দিয়েছেন এতদিন পর। এই দুশো, আর তোমার দুশো। সামনের মাসেই খুলব ভাবছি।”

“এ টাকা কে দিল, জ্যাঠামশায়? আমায় বললেন না?”

“তোমার মতো আরেকটি মা।”

“আমি চিনি না?”

“আমাদের গাঁয়ের বাবুর মেয়ে, অতসী। সে সব কথা আরেকদিন বলব। আজ বেলা যাচ্ছে। আমি গিয়ে ডেক চাপাই। টাকা রেখে দাও এখন।”

হোটেলে এসে বংশীকে বলল, “তোমার ভাগ্নেটিকে চিঠি লিখে আনাও, বংশী। তাকে গদিতে বসতে হবে। লেখাপড়ার কাজ তো আমরা করতে পারব না।”

বংশী বলল, “সে তো বসেই আছে, হাজারিদা। একটা কাজ পেলে বাঁচে। আমি আজই লিখছি। আর ঘর দেখে এসেছি। তামাকের দোকানের পাশে ঘরটা ভালো। ওটাই নাও। লেগে যাও, দুর্গা বলে।”