Course Content
আদর্শ হিন্দু-হোটেল – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

রাণাঘাট থেকে বেরিয়ে হাজারি হাঁটাপথে চাকদার দিকে রওনা দিল। প্রথমে ডাকঘর থেকে বাড়িতে দুটো টাকা মানি অর্ডার পাঠাতে চেয়েছিল, কিন্তু ডাকঘরে গিয়ে দেখল মানি অর্ডার নেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।

ডাকঘর খোলা না থাকায় পরে হাজারি ভগবানকে ধন্যবাদ দিয়েছিল। চাকদা যাওয়ার মাঝপথে সেগুন বাগানের মধ্যে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল। একটা সেগুন গাছের তলায় দুটো গরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। লোকজন নেমে গাছতলায় রান্না চড়িয়েছে। হাজারি জিজ্ঞেস করে জানল, আগামী পূর্ণিমায় কালীগঞ্জে গঙ্গাস্নানের মেলার জন্য তারা মেলায় দোকান দিতে যাচ্ছে। হাজারি তাদের সঙ্গ নিল।

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সবাই গাছতলায় শুয়ে রাত কাটাল। দোকানের মালিকের নাম প্রিয়নাথ ধর, জাতে সুবর্ণ বণিক, মনোহারি দোকান নিয়ে তারা মেলায় যাচ্ছে। হাজারির পরিচয় পেয়ে ধর মশাই প্রস্তাব দিল, মেলায় কয়েকদিন তারা কেনাবেচায় ব্যস্ত থাকবে, এই কয়েকদিন হাজারি যদি রান্না করে সবাইকে খাওয়ায়, তবে সে রোজ খোরাকি আর মেলা শেষে কয়েকদিনের মজুরি হিসেবে দুটো টাকা পাবে।

প্রিয়নাথ ধরের তিনটে দোকান—একটা তার নিজের, বাকি দুটো তার জামাই আর ভাইপোর। কম মাইনেতে যে ওস্তাদ রাঁধুনি পেয়েছে, হাজারির প্রথম দিনের রান্নাতেই তা প্রমাণ হয়ে গেল। সবাই খুব খুশি।

মেলায় পৌঁছে হাজারি দেখল, রান্নার চেয়েও বেশি লাভের একটা ব্যবসা এই মেলাতেই তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে জিনিসপত্র কিনে এনে তেলেভাজা কচুরি আর সিঙ্গাড়ার দোকান খুলে বসল ধর মশাইদের বাসার একপাশে। বিনামূল্যে কচুরি খাওয়ার লোভে ধর মশাই কোনো আপত্তি করলেন না।

কয়েকদিন দোকানে অসম্ভব বিক্রি হল। মূলধন ছিল আগের সেই দুটো টাকা। শেষে খরিদ্দার বাড়তে থাকায় হাজারি ধর মশাইয়ের তহবিল থেকে কয়েকটা টাকা ধার নিল।

চতুর্থ দিনের সন্ধেয় দোকানপাট তুলে ফেলা হল। মেলা শেষ হয়ে গেছে। ধর মশাইয়ের তহবিলের ধার শোধ করে আর সব খরচ বাদ দিয়ে হাজারি দেখল, সাড়ে তেরো টাকা লাভ হয়েছে। এর ওপর ধর মশাইয়ের রান্নার মজুরি দুটো টাকা নিয়ে মোট হল সাড়ে পনেরো টাকা।

প্রিয়নাথ ধর বললেন, “ঠাকুর মশাই, আপনার রান্না যে এত চমৎকার, সেগুন বাগানে প্রথম কাজে লাগানোর সময় তা ভাবিনি। আমি বড়লোক নই, বাড়িতে মেয়েরাই রাঁধে, নইলে আপনাকে কিছুতেই ছাড়তাম না।”

বাড়িতে দশ টাকা পাঠিয়ে দিয়ে হাজারির মন একটু শান্ত হল। এখন সংসারের চিন্তা নিয়ে মাসখানেক নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে। এই এক মাসের মধ্যে নতুন কিছু নিশ্চয় জুটে যাবে।

কালীগঞ্জ থেকে যশোর যাওয়ার পাকা রাস্তা ধরে হাজারি আবার পথ চলল। এই পথের দুপাশে বনজঙ্গল বড় বেশি—আগে গ্রাম ছিল, ম্যালেরিয়ার জ্বালায় অনেক গ্রাম লোকশূন্য হয়ে গিয়ে অনাবাদি মাঠ আর ভাঙা পুরোনো গ্রামগুলো বনজঙ্গলে ঢেকে গেছে।

সকালে কালীগঞ্জ থেকে রওনা দিয়েছিল, দুপুর পেরিয়ে যাওয়ার সময় একটা পুরোনো তেঁতুলগাছের ছায়ায় সে আশ্রয় নিল। কিছুদূরে একটা ছোট চাষিদের গ্রাম। একটা ছোট ছেলে গরু তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাকে জিজ্ঞেস করে জানল গ্রামের নাম নতুন পাড়া। বেশিরভাগ গোয়ালাদের বাস।

হাজারি গ্রামের মধ্যে ঢুকে প্রথমে যে খড়ের বড় অটচালা ঘরটা দেখল, তার উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল।

বাড়ির মালিককে কাউকে দেখল না। একদিকে বড় গোয়াল, অনেকগুলো বলদ গরু বিচালি খাচ্ছে।

একটা ছোট মেয়ে বেরিয়ে উঠোনে দাঁড়াল। হাজারি তাকে ডেকে বলল, “খুকি, শোনো—বাড়িতে কে আছে?” মেয়েটি ভয় পেয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।

প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষা করার পর বাড়ির মালিক এল। তার নাম শ্রীচরণ ঘোষ। হাজারিকে সে খুব খাতির করে বসাল, দুপুর গড়িয়ে গেছে—তাই রান্না-খাওয়ার কথা বলল। বাড়ির ভেতর থেকে একটা জলচৌকি আর এক বালতি জল এনে সামনে রেখে দিল।

এরাও গোয়ালঘরের একপাশে রান্নার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। সেখানে বসে রাঁধতে রাঁধতে হঠাৎ তার মনে পড়ল কুসুমের কথা। কুসুমও তাকে সেদিন গোয়ালঘরেই রান্নার আয়োজন করে দিয়েছিল—কুসুমও গোয়ালার মেয়ে।

বোধহয় সেইজন্যই—এরা গোয়ালা শুনেই—হাজারি এদের বাড়ি এসেছিল। মনের মধ্যে কোনো গোপন আকর্ষণ তাকে এখানে টেনে এনেছিল। হঠাৎ সে অবাক হয়ে গোয়ালঘরের দরজার দিকে তাকাল।

একটা অল্পবয়সি বউ আধঘোমটা দিয়ে গোয়ালঘরে ঢুকে এক চুবড়ি শাক নিয়ে লাজুক ভাবে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছে। শাকগুলো সবে জল থেকে ধুয়ে আনা—চুবড়ি থেকে জল ঝরে গোয়ালঘরের মাটির মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছে। হাজারি তাড়াতাড়ি বলল, “এসো মা, এসো—ওতে কী?”

বউটি লাজুক মুখে একটু হেসে বলল, “চাঁপানটে শাক। এখানে রাখব?”

বউটি কুসুমের চেয়েও বয়সে ছোট। হঠাৎ একটা অকারণ স্নেহে হাজারির মন ভরে উঠল। সে বলল, “রাখো মা, রাখো—”

কিছুক্ষণ পর বউটি আবার ঘর থেকে কয়েকটা কাঁঠাল-বীচি নিয়ে ঢুকল। এবার সে যেন অনেকটা নিঃসঙ্কোচ। বাবার বয়সি এই শান্ত, প্রৌঢ় ব্রাহ্মণের কাছে সঙ্কোচ করতে তার বোধহয় বাধছিল।

হাজারির সঙ্গে বউটির কথোপকথন চলছিল। হাজারি বলল, “কাঁঠাল-বীচি খান?”

বউটি উত্তর দিল, “খাই মা, কিন্তু ওগুলো কুটে দেবে? আমি ডাল চড়িয়েছি, আবার কুটি কখন?”

বউটি একটা পাথরের বাটিতে কাঁঠাল-বীচি এনেছিল। বাটিটা নামিয়ে ছুটে গিয়ে একটা বঁটি নিয়ে এল এবং বীচিগুলো কুটতে শুরু করল। হাজারির মন তৃষিত ছিল—এরা সবাই তার কাছে মেয়ের মতো, সবাই ভালোবাসে, সেবা করে, মনের দুঃখ বোঝে।

হাজারি কিছু বলার আগেই বউটি বলে উঠল, “আপনার গাঁয়ে আমি কত গিয়েছি।”

হাজারি অবাক হয়ে বলল, “আমার গাঁ কোথায় তুমি কী করে জানলে? তুমি সেখানে কী করে গেলে?”

“গঙ্গাধর ঘোষ আমার পিসেমশাই—”

“ওহো—তুমি জীবনের ভাইঝি! তাহলে কুসুমকে তো চেনো—”

“কুসুমদিদিকে তার বিয়ের আগে অনেকবার দেখেছি, বিয়ের পরে আর কখনো দেখিনি। সে আজকাল কোথায় থাকে জানেন নাকি?”

“সে থাকে রাণাঘাটে শ্বশুরবাড়িতে। তবে তোমাকে মা বলে খুব ভালো করেছি, কুসুম আমার মেয়ে।”

বউটি বীচি কোটা থামিয়ে গলায় আঁচল জড়িয়ে দূর থেকেই প্রণাম করল।

হাজারি বলল, “এসো মা, চিরজীবী হও, সাবিত্রী সমান হও।”

বউটি হেসে বলল, “আপনি যখন উঠোনে দাঁড়িয়েছিলেন, তখনই আপনাকে দেখে আমি চিনেছি। আমি শাশুড়ীকে গিয়ে বললাম, আমার পিসিমার গাঁয়ের মানুষ উনি—তখন শাশুড়ী গিয়ে শ্বশুরকে জানালেন।”

“বেশ মা, বেশ। আসবো যাবো, আমার আরেকটি মেয়ে হল, তার সঙ্গে দেখাশোনা করে যাবে। ভালোই হল।”

বউটি সলজ্জভাবে বলল, “আজ কিন্তু আপনাকে যেতে দেব না—থাকতে হবে এখানে।”

“না মা, আমার থাকা হবে না।”

“না, তা হবে না। যান দিকি, কেমন করে যাবেন? আমি জোর করতে পারি না বুঝি?”

“অবশ্যই পারো মা, কিন্তু আমার মনে শান্তি নেই। আবার সুদিন পেলে এসে দু’দিন থেকে যাবো—”

বউটি হাজারির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেন, কী হয়েছে আপনার?”

হাজারির স্বভাবদুর্বল মন সহানুভূতির গন্ধ পেয়ে গলে গেল। সে তার চাকরি যাওয়ার ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা করে গেল—ডাল নামিয়ে চচ্চড়ি রাঁধার ফাঁকে ফাঁকে। একটু গর্ব করার লোভও সে সামলাতে পারল না।

“রান্না যা করতে পারি মা, তোমার কাছে গোমর করে বলছি না, অমন রান্না রাণাঘাটের কোনো হোটেলে কোনো বামুনঠাকুর রাঁধতে পারবে না। হয় না হয় মা, এই তোমাদের এখানে যে চচ্চড়ি রাঁধছি, তোমাদের সবাইকে খাইয়ে দেখাবো। আমি জোর করে বলতে পারি, এরকম চচ্চড়ি কখনো খাওনি, আর কখনো খাবে না।”

বউটি বিস্ময়ে, সম্ভ্রমে, মুগ্ধ দৃষ্টিতে হাজারির দিকে তাকিয়ে কথা শুনছিল। বলল, “তাহলে আমায় শিখিয়ে দিতে হবে খুড়োমশাই—”

“একদিনের কর্ম নয় সে। শেখালেও শিখতে পারা কঠিন হবে—তোমায় ফাঁকি দেওয়া আমার ইচ্ছে নয় মা। এ শেখা এক-আধ দিনে হয় কখনো?”

“তা আপনি যদি অমন রাঁধুনী, আপনার আবার চাকরির ভাবনা কী? কত বড়লোকের বাড়ি ভালো মাইনে দিয়ে রাখবে!”

“অদৃষ্ট যখন খারাপ হয় মা, কিছুতেই কিছু হয় না। হাতে টাকা থাকে দু’দিন, চেষ্টা-চরিত্র করে বেড়াতে পারি। বেড়াবো কী, রেস্ত ফুরিয়ে এসেছে কি না।”

“কত টাকা লাগবে বলুন।”

“কেন, তুমি দেবে নাকি?”

“যদি দিই?”

“সে আমি নিতে পারি না। কুসুম দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তা আমি নেব কেন? তোমরা মেয়েমানুষ, ব্যাঙের আধুলি পুঁজি করে রেখেছ, তা থেকে নিয়ে তোমাদের ক্ষতি করতে চাই না।”

“আচ্ছা, আপনাকে যদি টাকা ধার দিই? আপনাকে বলি শুনুন খুড়োমশাই। আমার মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা এনেছিলাম। এখানে রাখার জো নেই। একটা কথা বলব?”

এদিক-ওদিক তাকিয়ে সুর নীচু করে বলল, “ননদ আর জা ভালো লোক নয়। এখনই যদি টের পায়, নিয়ে নেবে। আমি আপনাকে টাকা ধার দিচ্ছি, আপনি সুদ দেবেন কত করে বলুন?”

এই কুসীদ-লোভী সরলা মেয়েটির প্রতি হাজারির প্রৌঢ় মন করুণায় ও মমতায় গলে গেল। সে আরও খানিক মজা দেখতে চাইল।

“এমনি টাকা দেবে মা? আমায় বিশ্বাস কী?”

“তা বিশ্বাস না করলে কী এ কারবার চলে? আর আপনি তো চেনা লোক। আপনার গাঁ চিনি, বাড়ি চিনি।”

“চিনলেই হল? একটা লেখাপড়া করে নেবে না? কত টাকা দিতে চাও?”

“আমার কাছে আছে আশি টাকা। সবই দিতে পারি, আপনি যদি নেন। সুদ কত দেবেন?”

“কত করে চাও?”

“আপনি যা দেবেন। টাকায় দুপয়সা করে রেট, আপনি এক পয়সা দেবেন, কেমন তো? আপনার পায়ে পড়ি খুড়োমশাই, টাকাগুলো আলাদা আমার তোরঙ্গে তোলা আছে। কেউ জানে না। আপনাকে এনে দিই, টাকাগুলো খাঁটিয়ে দিন আমায়। কাকে বিশ্বাস করে দেব, কে নিয়ে আর দেবে না?”

“কই, লেখাপড়ার কথা বললে না তো?”

“আমি লেখাপড়া জানি না—কী লেখাপড়া করে নেব? আপনি চান একটা কিছু লিখে দিয়ে যান। কিন্তু তাতে লোক-জানাজানি হবে। সে কাজের দরকার নেই। আপনি নিয়ে যান। আমি দিচ্ছি, মিটে গেল। এর আর লেখাপড়া কী?”

ইতিমধ্যে রান্নাবান্না শেষ হয়ে গেল। বউটি একঘটি দুধ এনে বলল, “এই উনুনটা পড়ে দুধটুকু জ্বাল দিয়ে খেতে বসুন—বেলা কি কম হয়েছে?”

খাওয়াদাওয়া মিটে গেল। হাজারির কথা মিথ্যা নয়—গোয়ালাবাড়ির সবাই একবাক্যে বলল, এরকম রান্না খাওয়া তো দূরের কথা, সামান্য জিনিস যে খেতে এমনধারা হয়, তা শোনেনি।

বিকেলে বিশ্রাম করে উঠে হাজারি যাওয়ার জন্য তৈরি হল। তার ইচ্ছে ছিল আরেকবার বউটির সঙ্গে দেখা করে। পল্লীগ্রামে মেয়েদের মধ্যে কড়াকড়ি পর্দা নেই সে জানে, বিশেষত ব্রাহ্মণ-কায়স্থ ছাড়া অন্য জাতির মেয়েদের মধ্যে। মেয়েটিকে তার ভালো লেগেছিল তার সরলতার জন্য। আর বোধহয় টাকাকড়ি সম্বন্ধে কথাটা আরেকবার বলতে তার ইচ্ছে হচ্ছিল। সে ইতিমধ্যে একটা মতলব মাথায় এনেছিল। কুসুম আর এই মেয়েটি যদি তাকে টাকা দেয়, তবে সে তার চিরদিনের স্বপ্নকে সার্থক করে তুলতে পারবে। এদের টাকা সে নষ্ট করবে না—বরং অনেক গুণ বাড়িয়ে এদের হাতে তুলে দিতে পারবে। খেতে বসে হাজারি এসব কথা ভেবে দেখেছিল।

গোয়ালাবাড়ি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়তে একটা পুকুরের ধার দিয়ে যেতে হয়। একটা বড় তেঁতুলগাছ আর তার চারপাশে বন্য গাছের ঝোপ জায়গাটাকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যে বাইরে থেকে হঠাৎ সেখানে কেউ থাকলে তাকে দেখা যায় না।

পুকুরের পাড় ছাড়িয়ে হাজারি হঠাৎ দেখল, মেয়েটি তেঁতুলতলার ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারই অপেক্ষায়।

“চললেন খুড়োমশাই?”

“হ্যাঁ যাই, তুমি এখানে দাঁড়িয়ে?”

“আপনি এই পথ দিয়ে যাবেন জানি, তাই দাঁড়িয়ে আছি। দুটো কথা আপনাকে বলব। আপনার হাতের রান্না চচ্চড়ি খেয়ে ভালো লেগেছে খুড়োমশাই। আমরাও তো রাঁধি, রান্নার ভালো-মন্দ বুঝি। অমন রান্না কখনো খাইনি। আরেকটা কথা হচ্ছে, আমার টাকাটার কথা মনে আছে তো? কী করলেন তার? জানেন তো, মেয়েরা শ্বশুরবাড়ির লোকদের চেয়ে বাপের বাড়ির লোকদের বেশি বিশ্বাস করে? এদের হাতে ও টাকা পড়লে দুদিনে উড়ে যাবে।”

“টাকা তোমার এখনই নিতে পারব না। কিন্তু আবার আমি এই পথে আসব, তোমার সঙ্গে দেখা করব। তখন হয়তো টাকার দরকার হবে, টাকা তখন হয়তো নিতে হবে।”

“কত দিনের মধ্যে আসবেন?”

“তা বলতে পারি না, ধরো মাস দুই। পুজোর পরে কার্তিক-অঘ্রান মাসের দিকে তোমার সঙ্গে দেখা করব।”

“কথা রইল তাহলে?”

“ঠিক রইল। এসো এসো, লক্ষ্মী ছোট্ট মা আমার—সাবিত্রী সমান হও, আশীর্বাদ করি তোমার বাড়-বাড়ন্ত হোক।”

বেলা পড়ে আসছিল। হাজারি আবার পথ চলতে লাগল। গোয়ালাবাড়ির সবাই এবেলা থাকার জন্য অনুরোধ করেছিল, বউটি তো বিশেষ করে। কিন্তু থাকার উপায় নেই, একটা কিছু যোগাড় না করা পর্যন্ত তার মনে সুখ নেই।

মেয়েটি খুব আশ্চর্য ধরনের বটে। নির্বোধ হয়তো—কুসুমের মতো বুদ্ধিমতী নয় ঠিকই, তবুও বড় ভালো মেয়ে।

পথের দুধারে বনজঙ্গল ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছিল। পথ নদীয়া জেলা থেকে যশোর জেলার কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে এই বন বাড়ছিল। স্থানে স্থানে বনজঙ্গল এত ঘন যে হাজারির ভয় করতে লাগল, দিনমানেই বুঝি বাঘের হাতে পড়তে হয়। লোকের বসতি এসব জায়গায় বেশি নেই, ভয় করারই কথা।

সন্ধ্যার আগে বেলের বাজারে এসে পৌঁছল। আগে যখন রেল হয়নি, তখন বেলে বাজার খুব বড় ছিল, হাজারি শুনেছিল তার গ্রামের বুড়োদের মুখে। এখনও পূর্বাঞ্চল থেকে চাকদহের গঙ্গায় শবদাহ করতে অনেকে আসে—তাদের জন্যই বেলের বাজার এখনও টিকে আছে।

হাজারি বেলের বাজার দেখে খুশি হল ও আগ্রহের সঙ্গে দেখতে লাগল। ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছে, কখনো দেখেনি। চমৎকার জায়গা বটে। এই তাহলে বেলে। তার এক মামাতো ভাই যশোর অঞ্চলে বিয়ে করেছিল, তার বুড়ি শাশুড়ির মৃত্যুর পর শব নিয়ে চাকদহে এই পথ দিয়ে আসতে আসতে বেলের বাজারের কাছে ভৌতিক ব্যাপারের মুখোমুখি হয়—এ গল্প সে ওই মামাতো ভাইয়ের মুখে দু-তিনবার শুনেছে।

হাজারি ঘুরে ঘুরে বাজারের দোকানগুলো দেখতে লাগল। সব মিলিয়ে ন’খানা দোকান—চাল-ডাল-মুদিখানার দোকান, কাপড়ের দোকান সব। একজন দোকানদারকে বলল, “একটু তামাক খাওয়াতে পারেন মশাই?”

“আপনারা?”

“ব্রাহ্মণ।”

“প্রণাম হই ঠাকুর মশাই। আসুন, কোথায় যাওয়া হবে? ওরে বন, বামুনের হুঁকোয় জল ফিরিয়ে নিয়ে আয়।”

দোকানখানি কীসের তা হাজারি বুঝতে পারল না। এক পাশে চিটাগুড়ের ক্যানেস্তারা চাল পর্যন্ত একটার গায়ে একটা উঁচু করে সাজানো, আরেক পাশে বড় বড় বস্তা। দোকানদার বৃদ্ধ, বয়স পঁয়ষট্টি থেকে সত্তর হবে, রোগা একহারা চেহারা, গলায় মালা।

“নিন ঠাকুর মশাই, তামাক ইচ্ছে করুন। কোথায় যাওয়া হবে?”

“যাচ্ছি কাজের চেষ্টায়। রাণাঘাট হোটেলে সাত বছর রেঁধেছি, বেচু চক্কোত্তির হোটেলে। নাম শুনেছেন বোধহয়। ভালো রাঁধুনী বলে নাম আছে—কিন্তু চাকরিটুকু গেছে। এখন যাই তো একবার এদিক পানে—যদি কোথাও কিছু জোটে।”

দোকানদার আগের চেয়ে বেশি সম্ভ্রমের চোখে হাজারির দিকে তাকাল। নিতান্ত গ্রাম্য ঠাকুর-পূজারি বামুন নয়—রাণাঘাটের মতো শহর-বাজারের বড় হোটেলে সাত-আট বছর সুখ্যাতির সঙ্গে রান্নার কাজ করেছে, কত দেখেছে, শুনেছে, কত বড়লোকের সঙ্গে মিশেছে—না, লোকটা যা ভেবেছিল তা নয়।

হাজারি বলল, “রাত হয়ে আসছে, একটু থাকার জায়গার কী হয় বলতে পারেন?”

দোকানদার অত্যন্ত খুশি হয়ে বলল, “এখানেই থাকুন, এর আর কী। আমার এই পেছন দিকে দিব্যি চালা রয়েছে, একখানা তক্তপোশ রয়েছে। চালায় রান্না করুন, তক্তপোশে শুয়ে থাকুন।”

কথায় কথায় হাজারি বলল, “আচ্ছা, এখানে গঙ্গাযাত্রী দিনে কত যাতায়াত করে?”

“সে দিন আর নেই বেলের বাজারের। আগে আট-দশ দল, একেক দলে দশ-বারো জন করে মানুষ, এ নিত্য যেত। এখন কোনোদিন মোটেই না, কোনোদিন তিনটে, বড়জোর চারটে। আগে লোকের হাতে পয়সা ছিল, মড়া গঙ্গায় দিত—আজকাল হাতে নেই পয়সা—মরলে নদীর ধারে, খালের ধারে, বিলের ধারে পোড়ায়।”

হাজারি ভাবছিল, বেলের বাজারে একটা ছোটখাটো হোটেল চলতে পারে কি না। তিন দল গঙ্গাযাত্রীতে তিরিশজন লোক থাকলে যদি সবাই খায়, তবে তিরিশজন খরিদ্দার। তিরিশজন খরিদ্দার রোজ খেলে মাসে পঞ্চাশ-ষাট টাকা লাভ থাকে খরচ বাদে। সেই জায়গায় কুড়িজন হোক, দশজন হোক রোজ—তবুও পরের চাকরির চেয়ে ভালো। পরের চাকরি করে পাচ্ছে সাত টাকা আর অজস্র অপমান-বকুনি। সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকা—দশজন খরিদ্দার যে হোটেলে রোজ খায়, সেখানে অন্তত বারো-তেরো টাকা মাসে লাভ থাকে।

পরদিন সকালে উঠে সে গোপালনগরের দিকে রওনা হল। হাতের পয়সা এখনো যথেষ্ট—পাঁচ টাকা আছে, কোনো ভাবনা নেই। কাল রাতে দোকানদার চাল-ডাল-হাঁড়ি কিনে আনতে চেয়েছিল, হাজারি তাতে রাজি হয়নি। নিজে পয়সা খরচ করেছে।

দুপুরের রোদ বড় চড়ল। নির্জন রাস্তা, দুধারে কোথাও ঘন বনজঙ্গল, কোথাও ফাঁকা মাঠ, লোকালয় চোখে পড়ে না, এক-আধখানা চাষাদের গ্রাম ছাড়া। ঘণ্টা দুই হাঁটার পর হাজারির তৃষ্ণা পেল। কিছুদূরে একটা ছোট পুকুর দেখে তার ধারে বসতে যাবে, এমন সময় একটা খালি গরুর গাড়ি পুকুরের পাশের মেটে রাস্তা দিয়ে নামতে দেখল। গাড়োয়ানকে ডেকে বলল, “কাছে কোনো গ্রাম আছে বাপু? একটু জল খাব। ব্রাহ্মণ।”

গাড়োয়ান বলল, “আমার সঙ্গে আসুন ঠাকুর মশাই, কাছেই শ্রীনগর-সিমলে, আমি বামুন বাড়ি যাব। তেনাদের গাড়ি—গাড়িতে আসুন।”

হাজারি শ্রীনগর-সিমলের নাম শুনেছিল। গ্রামের মধ্যে গাড়ি ঢুকতে দেখল, এ তো গ্রাম নয়—বিজন বন। এতখানি বেলা চড়েছে, তবু গ্রামের মধ্যে সূর্যের আলো প্রবেশ করেনি; শুধু আম-কাঁঠালের প্রাচীন বাগান, বাঁশবন, আগাছার জঙ্গল।

একটা গৃহস্থ-বাড়ির উঠোনে গরুর গাড়ি গিয়ে থামল। গাড়োয়ানের ডাকে বাড়ির ভেতর থেকে গৃহস্বামী এলেন। ম্যালেরিয়ায় শীর্ণ চেহারা, মাথার চুল প্রায় উঠে গেছে, বয়স ত্রিশও হতে পারে, পঞ্চাশও হতে পারে। তিনি বাইরে এসেই হাজারিকে দেখতে পেয়ে গাড়োয়ানকে বললেন, “কে রে সঙ্গে?”

গাড়োয়ান বলল, “এজ্ঞে, উনি পাকা রাস্তায় মুদির পুকুরের ধারে বসে ছিলেন। বললেন, একটু জল খাব—তা বললাম, চলুন আমার সঙ্গে। আমার মনিবেরা ব্রাহ্মণ—সেখানে জল খাবেন। তাই সঙ্গে করে আনলাম।”

গৃহস্বামী এগিয়ে এসে হাজারিকে নমস্কার করে বললেন, “আসুন, আসুন। বসুন, বিশ্রাম করুন। ওরে, চণ্ডীমণ্ডপের তক্তপোশে মাদুরটা পেতে দে—আসুন।”

পল্লী অঞ্চলের এই আতিথ্যে কোনো ত্রুটি থাকে না। আধঘণ্টা পরে হাজারি হাত-পা ধুয়ে বসে গাছ থেকে সদ্য পাড়া কচি ডাবের জল পান করে সুস্থ ও খোশমেজাজে হুঁকা টানতে লাগল।

গৃহস্বামীর নাম বিহারীলাল বাঁড়ুজ্জে। চাকরি তিনি জীবনে কখনো করেননি। যথেষ্ট ধানের আবাদ আছে, গরু আছে, পুকুরে মাছ আছে, আম-কাঁঠালের বাগান আছে। এসব কথা হাজারি গৃহস্বামীর কাছ থেকেই গল্পচ্ছলে শুনল।

বিহারী বাঁড়ুজ্জে বলছিলেন, “শ্রীনগর-সিমলে এককালে মস্ত গ্রাম ছিল। কেষ্টনগরের রাজাদের পূর্বপুরুষের রাজধানী ছিল এখানে। জঙ্গলের মধ্যে রাজার গড়খাই আছে, পুরোনো ইটের গাঁথনি আছে। ওবেলা দেখাব। না না, আজ যাবেন কী? ওসব হবে না। দুদিন থাকুন। আমাদের সবই আছে, আপনার বাপ-মার আশীর্বাদে। তবে মানুষজনের মুখ দেখতে পাই না, এই যা কষ্ট। ছেলেবেলায় দেখেছি, গাঁয়ে ত্রিশ-বত্রিশ ঘর ব্রাহ্মণের বাস ছিল। এখন দাঁড়িয়েছে সাত ঘর মোট। তার মধ্যেও দু’ঘর বারোমাস বিদেশে। আপনার নিবাস কোথায় বললেন?”

“আরে, এঁড়োশোলা-গাংনাপুর থেকে নেমে যেতে হয়।”

“তবে তো আপনি আমাদের এদেশেরই লোক। আসুন না আমাদের গাঁয়ে? জায়গা দিচ্ছি, জমি দিচ্ছি, ধান করুন, পাট করুন, বাস করুন এখানে। তবু এক ঘর লোক বাড়ুক গ্রামে। আসুন না?”

হাজারি শিহরিয়ে উঠল। সর্বনাশ! এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে সে বাস করতে আসবে? সেইটুকু অদৃষ্টে বাকি আছে বটে! শহর-বাজারে থেকে সে শহরের কলকোলাহল, কর্মব্যস্ততা পছন্দ করে ফেলেছে। এই বনের মধ্যে সমাধি পেতে হয় বৃদ্ধ বয়সে। তার বয়স ছ’চল্লিশ বছর—দিন এখনো যায়নি। এখনো তার মনে-শরীরে যথেষ্ট উৎসাহ আর শক্তি আছে। তাছাড়া সে হোটেলের কাজ বোঝে। একটা হোটেল খুলতে পারলে তার বয়স দশ বছর কমে যাবে, নতুন যৌবন ফিরে পাবে। চাষবাসের সে কী জানে?

হোটেলের কথা হাজারি এখানে বলল না। সে জানে, হোটেলওয়ালা বামুন বললে অনেকে ঘৃণার চোখে দেখে, বিশেষ করে এসব পড়াগাঁয়ে।

শ্রীনগরে হাজারির মোটেই মন টিকছিল না। এত বনজঙ্গলের অন্ধকার আর নির্জনতায় তার যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তাই বৈকালের দিকে সে গ্রামের বাইরে এসে পথে উঠে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ভাবল, “বাপরে! কুড়ি বিঘে ধানের জমি দিলেও এ গাঁয়ে নয় রে বাবা! মানুষ থাকে এখানে? মানুষজনের মুখ দেখার যো নেই, কাজ নেই, কর্ম নেই—কুঁড়ের মতো বসে থাকে। আর গোলার ধানের ভাত খাও—সর্বনাশ! আর কী জঙ্গল রে বাবা!”

রাস্তার ধারে একটা লোক কাঠ ভাঙছিল। হাজারি তাকে বলল, “সামনে কী বাজার আছে বাপু?”

লোকটা একবার হাজারির দিকে নীরবে তাকিয়ে দেখল। তারপর বলল, “আপনি কি আলেন সিমলে থেকে?”

“হ্যাঁ।”

“এখানে আপনাদের এত্ম্য-কুটুম্ব আছেন বুঝি? আপনারা?”

“ব্রাহ্মণ।”

“প্রণাম হই। কোথায় যাবেন আপনি?”

হাজারি জানে, পল্লীগ্রামে এই শ্রেণীর লোক তাকে অকারণে হাজার প্রশ্ন করে বিরক্ত করবে। এটাই এদের স্বভাব। হাজারিও আগে এমন ছিল, কিন্তু রাণাঘাট শহরে এতকাল থেকে বুঝেছে, অপরিচিত লোককে এসব প্রশ্ন করতে নেই। করলেও লোকে চটে। হাজারি এই প্রশ্নকর্তার হাত এড়াতে সংক্ষেপে দু-একটা কথার উত্তর দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “সামনে কী বাজার পড়বে বাপু?”

“এজ্ঞে যান, গোপালনগরের বড় বাজার পড়বে—কোশ দুই আর আছেন।”

গোপালনগরের নাম হাজারির কাছে খুব পরিচিত। এদিকের বড় গঞ্জ গোপালনগর, সবাই নাম জানে।

মধ্যাহ্নভোজনটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল, রাতে খাওয়ার দরকার নেই। একটু আশ্রয় পেলেই হল। তাই হাজারির মন সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ছিল। এ কয়দিন সে যেন নতুন জীবন যাপন করছে—সকালে ওঠার তাড়া নেই, পড়শির মুখঝাড়া নেই, বেচু চক্কোত্তির কাছে বাজারের হিসেব দিতে যাওয়া নেই, দশ সের কয়লা-জ্বলা অগ্নিকুণ্ডের তাতে বসে সকাল থেকে বেলা একটা আর সন্ধ্যা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত হাতাখুন্তি নাড়া নেই। বেঁচেছে সে।

পথের ধারে একটা গাছতলায় পাকা বেল পড়ে আছে দেখে হাজারি সেটা সংগ্রহ করল। কাল সকালে খাওয়া চলবে।

সব ভালো—কিন্তু তবু হাজারির মনে হয়, এ ধরনের ভবঘুরে জীবন তার পছন্দ নয়। বৃথা ঘুরে বেড়িয়ে কী হবে? চাকরি জোটে তো ভালো। নইলে এ ধরনের জীবন সে কতকাল কাটাতে পারে? একমাসও নয়। সে চায় কাজ। পরিশ্রম করতে সে ভয় পায় না। সে চায় কর্মব্যস্ততা, দু’পয়সা উপার্জন, নাম, উন্নতি। এর-ওর বাড়ি খেয়ে বেড়িয়ে, পথে পথে সময় নষ্ট করে লাভ নেই।

গোপালনগর বাজারে পৌঁছতে বেলা গেল। বেশ বড় বাজার, অনেকগুলো ছোট দোকান, ভালো ব্যবসার জায়গা বটে। হাজারি একটা বড় কাপড়ের দোকানের সামনের টিউবওয়েলে হাত-মুখ ধুল। কাছে একটা কালীমন্দির—মন্দিরের রোয়াকে বসে সম্ভবত মন্দিরের পূজারী ব্রাহ্মণ হুঁকা টানছে দেখে হাজারি তামাক খাওয়ার জন্য কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “একবার তামাক খাওয়াবেন?”

“আপনারা?”

“ব্রাহ্মণ।”

“বসুন, এই নিন।”

“আপনি কি মন্দিরে মায়ের পূজা করেন?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার কোথা থেকে আসা হচ্ছে?”

“আমার বাড়ি গাংনাপুরের কাছে এঁড়োশোলা। রাঁধুনীর কাজ করি—চাকরির চেষ্টায় বেরিয়েছি। এখানে কেউ রাঁধুনী রাখবে বলতে পারেন?”

“একবার এই বড় কাপড়ের দোকানে গিয়ে খোঁজ করুন। ওঁরা বড়লোক, রাঁধুনী ওঁদের বাড়িতে থাকেই। বাবুর ছোট ভাইয়ের বিয়ে আছে, যদি এ সময় নতুন লোকের দরকার পড়ে। ওঁরা জাতে তিলি, বাজারের সেরা ব্যবসাদার, ধনী লোক।”

হাজারি কাপড়ের দোকানে ঢুকে দেখল, একজন শ্যামবর্ণ, দোহারা চেহারার লোক গদির ওপর বসে আছে। সেই লোকটিই যে দোকানের মালিক, এটা কেউ না বললেও বোঝা যায়। হাজারিকে ঢুকতে দেখে লোকটি বলল, “আসুন, কী চাই? ওদিকে যান—ওহে, দেখো ইনি কী নেবেন—” বলে দোকানের অন্য অংশ, যেখানে অনেক কর্মচারী কাজ-কর্ম আর কেনাবেচা করছে, সেদিকটা দেখিয়ে দিল।

হাজারি বলল, “বাবু, দরকার আপনার কাছে। আমি রান্না করি, ব্রাহ্মণ—শুনলাম আপনার বাড়িতে রাঁধুনী রাখবেন, তাই—”

“ও। আপনি রান্না করবেন? রাঁধতে জানেন ভালো? কোথায় ছিলেন এর আগে?”

“আজ্ঞে, রাণাঘাট হোটেলে ছিলাম সাত বছর।”

“হোটেলে? হোটেলের কাজ আর বাড়ির কাজ এক নয়। এখানে খুব ভালো রান্না চাই। আপনি কি তা পারবেন? কলকাতা থেকে কুটুম্ব আসে প্রায়ই—”

হাজারি হেসে ভাবল, “তুমি আর কী রান্না খেয়েছ জীবনে? কাপড়ের দোকান করেই মরেছ, বই তো নয়। তেমন রান্না কখনো চোখেও দেখোনি।”

মুখে বলল, “বাবু, একদিনের জন্য রেখে দেখুন না হয়। রান্না ভালো না হয়, এমনি চলে যাব। কিছু দিতে হবে না।”

দোকানের মালিক পাকা ব্যবসাদার, লোক চেনে। হাজারির কথার ধরন দেখে বুঝল, এ বাজে কথা বলছে না। বলল, “আচ্ছা, আপনি আমাদের বাড়ি যান। এই সামনের রাস্তা দিয়ে বরাবর গিয়ে বাঁ-দিকে দেখবেন বড় বাড়ি—ওরে নিতাই, তুই বাপু একবার যা তো। ঠাকুর মশায়কে বাড়িতে শশধরের হাতে তুলে দিয়ে আয়। বলগে, ইনি এখান থেকে রাঁধবেন। বুঝলি? নিয়ে যা—মাইনে-টাইনে কিন্তু, ঠাকুর মশায়, পরে কাজ দেখে ধার্য হবে। হ্যাঁ—সে দু-চারদিন পরে তবে—নিয়ে যা।”

প্রথম দিনের কাজেই হাজারি নাম কিনে ফেলল। বাড়ির কর্তা দশ টাকা বেতন ধার্য করলেন। তাঁর গৃহিণী অসুস্থ, প্রায় বারোমাস উঠতে-বসতে পারলেও সংসারের কাজকর্ম বড় একটা দেখেন না। দুটি মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, তারা শ্বশুরবাড়ি থাকে। একটি ষোলো-সতেরো বছরের ছেলে স্কুলে পড়ে, আর একটি আট বছরের ছোট মেয়ে।

বাড়ির সবাই ভালো লোক। এতদিন চাকরি করে হাজারির পরের চাকরি সম্বন্ধে যে খারাপ ধারণা হয়েছিল, এখানে এসে তা চলে গেল। এরা জাতে গন্ধবণিক, বাড়ির সবাই ব্রাহ্মণকে খাতির করে চলে। হাজারির মৃদু স্বভাবের জন্যও সে অল্পদিনে বাড়ির সকলের বিশেষ প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল।

মাসখানেক কাজ করার পর হাজারি প্রথম মাসের বেতন পেয়েই বাড়ি যাওয়ার ছুটি চাইল। অনেকদিন বাড়ি যাওয়া হয়নি—টেঁপিকে কতকাল দেখেনি। দোকানের মালিক ছুটিও দিলেন।

গোপালনগর স্টেশনে ট্রেনে চড়ে বাড়ি আসতে প্রায় তিন আনা ভাড়া লাগে। মিছিমিছি তিন আনা পয়সা খরচ করে লাভ নেই। হাঁটাপথে মাত্র সাত-আট ক্রোশ হাজারিদের গ্রাম—হেঁটে যাওয়াই ভালো।

বাড়ি পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। টেঁপি ছুটে এসে বলল, “বাবা, এসো, এসো। কোথেকে এলে এখন?” তারপর সে ঘর থেকে পাখা এনে বাতাস করতে বসে গেল। হাজারির মনে হল, টেঁপির হাতের পাখার বাতাসে তার সারা দেহ-মন জুড়িয়ে গেল। টেঁপির জন্যই সে খেটে সুখ পায়। রাণাঘাট হোটেলের যত কষ্ট, যত দুঃখ—সব সে সহ্য করেছে টেঁপির জন্য। ভবিষ্যতেও করবে।

যদি বংশীধর ঠাকুরের ভাগ্নে সেই ছেলেটির সঙ্গে—যাক, সে সব কথা।

টেঁপি বলল, “বাবা, অতসীদিদি একদিন তোমার কথা বলছিল—”

“আমার কথা? হরিচরণবাবুর মেয়ে?”

“হ্যাঁ বাবা, বলছিল তুমি অনেকদিন আসোনি। চলো না আজ, যাবে? ওখানে গিয়ে চা খাবে এখন। কলের গান শুনবে।”

এই সময় টেঁপির মা ঘাট থেকে গা ধুয়ে বাড়ি ফিরল। হাসিমুখে বলল, “কখন এলে?”

হাজারি বলল, “এই তো খানিকক্ষণ। ভালো তো সব? টাকা পেয়েছিলে?”

“হ্যাঁ। ভালো কথা, ওদের বাড়ির সতীশ বলছিল, রাণাঘাট থেকে পাঠানো নয় টাকা। তুমি এর মধ্যে কোথাও গিয়েছিলে নাকি?”

“রাণাঘাটের চাকরি করি না তো। এখন আছি গোপালনগরে। বেশ ভালো জায়গায় আছি, বুঝলে? গন্ধবণিকের বাড়ি, ব্রাহ্মণ বলে ভক্তিশ্রদ্ধা খুব। খাওয়া-দাওয়া ভালো। কাপড়ের মস্ত দোকান, দিব্যি জলখাবার দেয় সকালে-বিকেলে।”

টেঁপি বলল, “কী জলখাবার দেয় বাবা?”

“এই ধরো, কোনোদিন মুড়ি-নারকেল, কোনোদিন হালুয়া।”

টেঁপির মা বলল, “বোসো, জিরোও। চা নেই, তাহলে করে দিতাম। টেঁপি, যাবি মা, সতীশদের বাড়ি? চা আছে—” (এই কথা বলার সময় টেঁপির মা ভুরু দুটো ওপরে তুলে এমন একটা ভঙ্গি করল, যা শুধু নির্বোধ মেয়েরা করে থাকে।) “দুটো চেয়ে নিয়ে আয়।”

টেঁপি বলল, “দরকার কী মা? আমি নিয়ে যাই না কেন বাবাকে অতসীদিদিদের বাড়ি? সেখানে চা হবে এখন, জলখাবার হবে এখন—”

দু-দুবার টেঁপি অতসীদের বাড়ি যাওয়ার কথা বলেছে। তাই হাজারি মেয়ের মতে মত না দিয়ে থাকতে পারল না। টেঁপির ইচ্ছে তার কাছে অনেকের হুকুমের চেয়ে শক্তিমান।

হরিচরণবাবু বৈঠকখানায় বসে ছিলেন। হাজারিকে যত্ন করে চেয়ারে বসালেন।

“এসো এসো হাজারি, কবে এলে? ও টেঁপি, যা তো অতসীদিদিকে বলগে আমাদের চা দিয়ে যেতে। আমিও এখনো চা খাইনি—”

“বাবু, ভালো আছেন?”

“হ্যাঁ। তুমি ভালো ছিলে? তোমার সেই হোটেলের কী হল? রাণাঘাটেই আছ তো?”

হাজারি সংক্ষেপে রাণাঘাটের চাকরি যাওয়া থেকে গোপালনগরে পুনরায় চাকরি পাওয়া পর্যন্ত বর্ণনা করল।

একসময় অতসী আর টেঁপি ঘরে ঢুকে তাদের সামনের ছোট গোল টেবিলে চা আর খাবার রাখল। খাবার মাত্র এক ডিশ—শুধু হাজারির জন্য। হরিচরণবাবু এখন কিছু খাবেন না।

হাজারি বলল, “বাবু, আপনার খাবার?”

“ও তুমি খাও, তুমি খাও। আমার এখন খেলে অম্বল হয়। আমি শুধু চা খাব।”

হাজারি ভাবল, “এত বড়লোক, এত ভালো জিনিস ঘরে, কিন্তু খেলে অম্বল হয় বলে খাওয়ার জো নেই। এও এক দুর্ভাগ্য। বয়স ছ’চল্লিশ হলেও অম্বল কাকে বলে আমি জানি না। ভূতের মতো খাটুনির কাছে অম্বল-টম্বল দাঁড়াতে পারে না। তবে খাবার জোটে না, এই যা দুঃখ।”

অতসী বেশ বড় রেকাবি সাজিয়ে খাবার এনেছে—ঘি দিয়ে চিঁড়ে ভাজা, নারকেল-কোরা, দুখানা গরম গরম বাড়ির তৈরি কচুরি আর খানিকটা হালুয়া, বড় পেয়ালায় এক পেয়ালা চা। অতসী এটুকু জানে যে টেঁপির বাবা তার বাবার মতো অল্পভোজী নয়। খেতে পারে আর খেতে ভালোবাসে। তাদের অবস্থাও খুব ভালো নয়। তাই টেঁপির বাবাকে ভালো করে খাওয়াতে হবে।

হরিচরণবাবু বললেন, “তোমার হাজারিকাকাকে প্রণাম করেছিস অতসী?”

হাজারি ব্যস্ত আর সঙ্কুচিত হয়ে পড়ল। অতসী তার পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করতে গেলে সে চিঁড়েভাজা চিবোতে চিবোতে কী বলল, ভালো বোঝা গেল না। অতসী কিন্তু চলে গেল না। সে হাজারির সামনে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে তাকে ভালো করে দেখছিল। টেঁপি গল্প করেছে, তার বাবা একজন পাকা রাঁধুনী। অতসীর কৌতূহলের এটাই প্রধান কারণ।

হরিচরণবাবু বললেন, “এখন ক’দিন বাড়িতে আছ?”

“আজ্ঞে, পরশু যাব। পরের চাকরি, থাকলে তো চলে না।”

“তোমার সেই হোটেল খোলার কী হল?”

“এখনো কিছু করতে পারিনি বাবু। টাকার যোগাড় না করতে পারলে তো—বুঝতেই পারছেন।”

“তাহলে ইচ্ছে আছে এখনো?”

“ইচ্ছে আছে খুব। শীতকালের মধ্যে যা হয় করে ফেলব।”

অতসী বলল, “কাকা, গান শুনবেন?”

হরিচরণবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ—আমি একদম ভুলে গেছি। শোনো না হাজারি, অনেক নতুন রেকর্ড এনেছি। নিয়ে এসো তো অতসী—শুনিয়ে দাও তোমার হাজারিকাকাকে।”

হাজারি ভাবল, “বেশ আছে এরা। আমার মতো খেটে খেতে হয় না। শুধু গান আর খাওয়া-দাওয়া। সন্ধ্যা হয়েছে, এ সময় আমি অন্যদিন উনুনে আঁচ দিয়ে ধোঁয়ার মধ্যে ছোট রান্নাঘরে বসে মনিব-গৃহিণীর ফর্দ মতো তরকারি কুটছি। বারো মাসই আমার এই কাজ। ঘরে আবদ্ধ থাকতে হয় বলেই পথে বেরোলেই আমার আনন্দ হয়। আর আজ আনন্দ হচ্ছে—এমন চমৎকার সাজানো বৈঠকখানা, বড় আয়না, বেতমোড়া কেদারায় আমি বসে চা খাচ্ছি, পাশে টেঁপি, টেঁপির বন্ধু কিশোরী মেয়েটি, কলের গান… যেন সব স্বপ্ন।”

কতদিন কুসুমের সঙ্গে দেখা হয়নি। রাণাঘাট ছেড়েছে প্রায় চার মাসের ওপর। এই চার মাস কুসুমকে সে দেখেনি। টেঁপি মেয়ে, কুসুমও মেয়ে। আর নতুন পাড়ার সেই বউটি! সেও আরেক মেয়ে। আজ কলের গানের সুমধুর সুরের ভাবুকতায় তার মন সকলের প্রতি দরদ ও সহানুভূতিতে ভরে গেছে।

অনেকক্ষণ ধরে কলের গান বাজল। হরিচরণবাবু মাঝে একবার বাড়ির ভেতর কী কাজে উঠে গেলেন। তখন রইল অতসী আর টেঁপি। বাবার সামনে বোধহয় অতসী বলতে সাহস করছিল না। হরিচরণবাবু বাড়ির ভেতর চলে গেলে হাজারিকে বলল, “কাকাবাবু, আমাকে রান্না শিখিয়ে দেবেন?”

হাজারি ব্যস্ত হয়ে বলল, “তা কেন দেব না মা? কিন্তু তুমি রান্না জানো নিশ্চয়। কী কী রাঁধতে পারো?”

অতসী বুদ্ধিমতী মেয়ে। সে বুঝল, যার সঙ্গে কথা বলছে, রান্নার ব্যাপারে সে একজন ওস্তাদ শিল্পী। সংগীতের তরুণী ছাত্রী যেমন সঙ্কোচের সঙ্গে তার যশস্বী সংগীত শিক্ষকের সঙ্গে রাগরাগিণী নিয়ে কথা বলে, তেমনি সঙ্কোচে বলল, “তা পারি সব—শুক্তুনি, চচ্চড়ি, ডাল, মাছের ঝোল। মা তো বড় একটা রান্নাঘরে যেতে পারেন না, তার মন খারাপ। আমাকেই সব করতে হয়। টেঁপি বলছিল, আপনি নিরামিষ রান্না বড় চমৎকার করেন। আমায় শিখিয়ে দেবেন কাকাবাবু?”

“টেঁপি বুঝি এসব বলে তোমার কাছে? পাগলি মেয়ে কোথাকার! ওর কথা বাদ দাও।”

“না কাকাবাবু, আমি অন্য জায়গাতেও শুনেছি আপনার রান্নার সুখ্যাতি। সবাই তো বলে।”

পরে আবার স্বরে বলল, “আমাকে শেখাতে হবে কাকাবাবু। আমি ছাড়ছি না। আমি টেঁপিকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করি, আপনি কবে আসবেন, আমি খোঁজ নিই। ও বলেনি আপনাকে? না কাকাবাবু, আমায় শেখান। আমার বড় শখ ভালো রান্না শিখি।”

হাজারি বলল, “ভালো রান্না শেখা একদিনে হয় না মা। মুখে বলে দিলেও হয় না। তোমার পেছনে আমায় লেগে থাকতে হবে অন্তত ঝাড়া দু’মাস-তিন মাস। হাত ধরে বলে দিতে হবে—তুমি রাঁধবে, আমি কাছে দাঁড়িয়ে তোমার ভুল ধরে দেব। এ না হলে শিক্ষা হয় না। তুমি আমার টেঁপির মতো। তোমাকে ছেঁদো কথা বলে ফাঁকি দেব না মা। ছেলেমানুষ, শিখতে চাও, শিখিয়ে দিতে আমার অসাধ্য নয়। কিন্তু কী করে সময় পাব যে তোমায় শেখাব মা!”

অতসী সপ্রশংস দৃষ্টিতে হাজারির মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনছিল। বিশেষজ্ঞ ওস্তাদের মুখের কথা—গুরুত্বপূর্ণ, বাজে ছেঁদো কথা নয়, অনভিজ্ঞ আনাড়ির কথাও নয়। তার চোখে হাজারি দরিদ্র রাঁধুনী বামুন পিতা নয়—যে ব্যবসায় সে ধরেছে, সেই ব্যবসায়ে একজন অভিজ্ঞ, ওস্তাদ, পাকা শিল্পী। হাজারির প্রতি তার মন সম্ভ্রমে ভরে উঠল।

পরদিন হাজারি ঘুম থেকে উঠে তামাক টানছে, এমন সময় হঠাৎ অতসীকে তাদের বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দেখে সে রীতিমতো বিস্মিত হল। বড়মানুষের মেয়ে অতসী, অসময়ে কী মনে করে তার মতো গরিব মানুষের বাড়ি এল?

টেঁপি বাড়ি ছিল না। টেঁপির মাও অতসীকে আসতে দেখে খুব অবাক হয়েছিল। সে ছুটে গিয়ে তার বুদ্ধিতে যতটুকু আসে, সেইভাবে জমিদারবাড়ির মেয়ের অভ্যর্থনা করল।

অতসী বলল, “কাকাবাবু বাড়ি নেই খুড়িমা?”

টেঁপির মা বলল, “হ্যাঁ মা, এসো আমার সঙ্গে। ওই কোণের দাওয়ায় বসে তামাক খাচ্ছে।”

“টেঁপি কোথায়?”

“সে মূলোর বীজ আনতে গেছে সদগোপ-বাড়িতে। এল বলে। বসো, বসো। দাঁড়াও, আসনখানা পেতে—”

অতসী টেঁপির মার হাত থেকে আসনখানা ক্ষিপ্র ও চমৎকার ভঙ্গিতে কেড়ে নিয়ে সুন্দরভাবে হেসে বলল, “রাখুন আসন খুড়িমা। ভারি আমি একেবারে গুরুঠাকুর এলাম কি না—তাই আবার যত্ন করে আসন পেতে দিতে হবে—”

এই হাসি আর এই ভঙ্গিতে সুন্দরী মেয়ে অতসীকে কী সুন্দরই দেখাল! টেঁপির মা মুগ্ধ দৃষ্টিতে অতসীর দিকে তাকিয়ে রইল। ইতিমধ্যে হাজারি সেখানে এসে বলল, “কী মনে করে সকালে লক্ষ্মী-মা?”

অতসী হাজারির কাছে গিয়ে বলল, “আপনার সঙ্গে একটা কথা আছে।”

“কী কথা মা?”

“চলুন ওদিকে, একটু আড়ালে বলব।”

হাজারি ভেবেও পেল না, এমন কী গোপনীয় কথা অতসী তাকে আড়ালে বলতে এসেছে এই সকালবেলায়। দাওয়ার ছাঁচতলার দিকে গিয়ে বলল, “কী কথা মা?”

অতসী বলল, “কাকাবাবু, আপনি যদি কাউকে না বলেন, তবে বলি—”

হাজারি বিস্মিত মুখে বলল, “বলব না মা, বলো তুমি।”

“আপনি হোটেল খুলবেন বলে বাবার কাছে টাকা ধার চেয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ, কিন্তু সে তো এবার নয়, সেবার। তোমায় কে বলল এসব কথা?”

“সে সব কিছু বলব না। আমি আপনাকে টাকা দেব, আপনি হোটেল খুলুন—”

“তুমি কোথায় পাবে?”

অতসী হেসে বলল, “আমার কাছে আছে। দুশো টাকা দিতে পারি—আমি জমিয়ে জমিয়ে করেছি। লুকিয়ে দেব কিন্তু, বাবা যেন জানতে না পারেন। কেউ জানতে না পারে।”

হাজারির চোখে জল এল।

এ পর্যন্ত তার জীবনে তিনটি মেয়ে এসেছে, যারা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে তাকে তার উচ্চাশার পথে ঠেলে দিতে চেয়েছে—তিনজনেই সমান সরলা, তিনজনেই অনাত্মীয়া। তবে অতসী জমিদারবাড়ির সুন্দরী, শিক্ষিত মেয়ে। সে যে এতখানি টান টানবে, এটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত আর আশ্চর্য ঘটনা!

হাজারি বলল, “কিন্তু তুমি একথা শুনলে কোথায়, বলতে হবে মা।”

অতসী হেসে বলল, “সে কথা বলব না, বলেছি তো।”

“তাহলে টাকাও নেব না। আগে বলো কে বলেছে?”

“আচ্ছা, নাম করলে তাকে কী বলবেন না বলুন—”

“কাকে কী বলব, বুঝতে পারছি না তো? বলাবলির কথা কী আছে এর মধ্যে? আচ্ছা, বলব না। বলো তুমি।”

“টেঁপি বলেছিল, বাবার ইচ্ছে একটা হোটেল খোলেন। আমার বাবার কাছে নাকি টাকা চেয়েছিলেন ধার—তা বাবা দিতে পারেননি। দেখুন কাকাবাবু, দাদা মারা যাওয়ার পরে বাবার মন খুব খারাপ। ওঁকে বলা না বলা দুই সমান। আমি ভাবলাম, আমার হাতে তো টাকা আছে—কাকাবাবুকে দিই গে—ওঁদের উপকার হবে। আমার কাছে তো এমনি পড়েই আছে। আপনার হোটেল নিশ্চয়ই খুব ভালো চলবে, আপনারা বড়লোক হয়ে যাবেন। টেঁপিকে আমি বড় ভালোবাসি। ওর মনে যদি আহ্লাদ হয়, আমার তাতে তৃপ্তি। টাকা বাক্সে তুলে রেখে কী হবে?”

“মা, তোমার টাকা তোমার বাবাকে না জানিয়ে আমি নিতে পারি না।”

অতসী যেন বড় দমে গেল। হাজারির সঙ্গে সে অনেকক্ষণ ছেলেমানুষি তর্ক করল—বাবাকে না জানিয়ে টাকা নিলে দোষ কী!

শেষে বলল, “আমি টেঁপিকে এ টাকা দিচ্ছি।”

“তা তুমি দিতে পারো না। তুমি ছেলেমানুষ, টাকা দেওয়ার অধিকার তোমার নেই মা। তুমি তো লেখাপড়া জানো, ভেবে দেখ।”

“আচ্ছা, আমায় লাভের অংশ দেবেন তাহলে?”

হাজারির হাসি পেল। কুসুম, গোয়ালাবাড়ির সেই বউটি, অতসী—সবাই এক কথা বলে। এরা সকলেই মহাজন হয়ে টাকা ব্যবসায়ে খাটাতে চায়। মজার ব্যাপার বটে!

“না মা, সে হয় না। তুমি বড় হও, শ্বশুরবাড়ি যাও। আশীর্বাদ করি, রাজরাণী হও। তখন তোমার এই বুড়ো কাকাবাবুকে যা খুশি দিও। এখন না।”

অতসী দুঃখিত হয়ে চলে গেল।

হাজারির ইচ্ছে হল টেঁপিকে ডেকে বকে দেয়। এসব কথা অতসীর কাছে বলার তার কোনো দরকার ছিল না। কিন্তু অতসীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আছে। টেঁপিকে এটা নিয়ে কিছু বললেই অতসীর কানে গিয়ে পৌঁছবে ভেবে চুপ করে গেল।

সেদিন বিকালে গোয়ালপাড়ায় বেড়াতে গিয়ে কুসুমের বাপের বাড়িতে হাজারি শুনল, রাণাঘাটে কুসুমের অত্যন্ত অসুখ হয়েছিল। কোনোরকমে এ যাত্রা সে সামলে গেছে। হাজারি কিছুই জিজ্ঞেস করেনি, কথায় কথায় কুসুমের কাকা ঘনশ্যাম ঘোষ বলল, “মধ্যে রাণাঘাটে পনেরো দিন ছিলাম দাদাঠাকুর। ছানার কাজ এ মাসটা বড় মন্দা।”

হাজারি বলল, “পনেরো দিন ছিলে? কেন, হঠাৎ এ সময়—”

তারপরেই ঘনশ্যাম কুসুমের কথাটা বলল।

হাজারির কেবল মনে হতে লাগল, কুসুমের সঙ্গে কতদিন দেখা হয়নি। একবার তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে কেমন হয়? কুসুমের অসুখের খবর শুনে তার মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। জীবনে ওই একটি মেয়ের ওপর তার অসীম স্নেহ ও শ্রদ্ধা।

ইচ্ছে হল, কুসুমের সম্বন্ধে ঘনশ্যামকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে। কিন্তু তা করা চলবে না। সে মনের আকুল আগ্রহ মনেই চেপে শুধু উদাসীন ভাবে জিজ্ঞেস করল, “এখন সে আছে কেমন?”

“তা এখন আপনার বাপ-মায়ের আশীর্বাদে সেরে উঠেছে। তবে বড় কষ্ট যাচ্ছে সংসারের। দুধ-দই বেচে তো চালাতো, আজ মাসখানেকের ওপর শয্যাগত অবস্থা। এদিকে আমার সংসারের কাণ্ড তো দেখতেই পাচ্ছেন—কোথেকে কী করি দাদাঠাকুর—”

হাজারি এ সম্বন্ধে আর কিছু বলল না। যেন কুসুমের ব্যাপারে তার সব আগ্রহ ফুরিয়ে গেছে।

বাড়ি ফেরার পথে হাজারি ভাবল, রাণাঘাটে তাকে যেতেই হবে। কুসুমের অসুখ শুনে সে চুপ করে থাকতে পারবে না। কালই একবার সে রাণাঘাট যাবে।

পথে অতসীর পিতা হরিবাবুর সঙ্গে দেখা। তিনি মোটা লাঠি হাতে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। হাজারিকে দেখে বললেন, “এই যে হাজারি, কোথা থেকে ফিরছ? তা এসো আমার এখানে, চলো চা খাবে।”

বৈঠকখানায় হাজারিকে বসিয়ে হরিবাবু বললেন, “বসো, আমি বাড়ির ভেতর থেকে আসছি। তারপর দুজনে একসঙ্গে চা খাওয়া যাবে। যতদিন বাড়ি আছ, আসা-যাওয়া একটু করো হে। কেউ আসে না, একলা সারাদিন বসে বসে সময় আর কাটে না। দাঁড়াও, আসছি—”

হরিবাবু বাড়ির মধ্যে চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে অতসী একখানা রেকাবিতে কয়েকটা লুচি, বেগুনভাজা আর একটু আখের গুড় নিয়ে এল। হাজারির সামনের টেবিলে রেকাবি রেখে বলল, “আপনি ততক্ষণ খান কাকাবাবু, চা দিয়ে যাচ্ছি।”

হাজারি বলল, “বাবু আসুন আগে।”

“বাবা তো খাবার খাবেন না, তিনি খাবেন শুধু চা। আপনি খাবারটা ততক্ষণ খেয়ে নিন। চা একসঙ্গে দেব—”

অতসী চলে গেল না, কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। হাজারি একটু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। বলার কিছু খুঁজে না পেয়ে বলল, “টেঁপি আজ আসেনি মা?”

“না, এ বেলা তো আসেনি।”

হাজারি আর কিছু কথা না পেয়ে নীরবে খেতে লাগল। খেতে খেতে একবার চোখ তুলে দেখল, অতসী একদৃষ্টে তার দিকে চেয়ে আছে। অতসী সুন্দরী মেয়ে, টেঁপির বন্ধু হলেও বয়সে টেঁপির চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড়। এ বয়সের সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে নির্জন ঘরে অল্পক্ষণ কাটানোর অভিজ্ঞতা হাজারির নেই। সে রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।

অতসী হঠাৎ বলল, “কাকাবাবু, আপনি আমার ওপর রাগ করেননি?”

হাজারি থতমত খেয়ে বলল, “রাগ? রাগ কীসের মা—”

“ওবেলার ব্যাপার নিয়ে?”

“না না, এতে আমার রাগ হওয়ার কিছু নেই। বরং তোমারই—”

“না, শুনুন কাকাবাবু। আমি তারপর ভেবে দেখলাম, আপনি আমার টাকা নিলে খুব ভালো করতেন। জানেন, আমার দাদা মারা যাওয়ার পর আমি কেবলই ভাবি, দাদা বেঁচে থাকলে বাবার বিষয় আমি পেতাম না। এখন কিন্তু আমি পাব। কিন্তু ভগবান জানেন কাকাবাবু, আমি এক পয়সা চাই না বিষয়ের। দাদা বিষয় ভোগ করতো তো করতো—নয় তো বাবা বিষয় যা খুশি করে যান, উড়িয়ে যান, পুড়িয়ে যান, দান করুন। আমার যেন এ না মনে হয়, আজ দাদা থাকলে এ বিষয় আমি পেতাম না, দাদাই পেত। বিষয়ের জন্য যেন দাদার ওপর কোনোদিন—আমার নিজের হাতে যা আছে, তাও উড়িয়ে দেব।”

অতসীর চোখ জলে টলটল করে এল। সে চুপ করল।

হাজারি সান্ত্বনার সুরে বলল, “না মা, ওসব কথা কিছু ভেবো না। তোমার বাবা-মাকে তুমিই বুঝিয়ে রাখবে। তুমিই ওঁদের একমাত্র বাঁধন। তুমি ওরকম হলে কী চলে? ছি—মা—”

হাজারি সত্যিই অবাক হয়ে গেল। ভাবল, “এইটুকু মেয়ে, কী উঁচু মন দেখো একবার। বড় বংশ না হলে আর বলেছে কাকে? এ কি বেচুবাবুর হোটেলের পদ্মঝি?”

হাজারি বলল, “আচ্ছা মা, আমাকে টাকা দেওয়ার তোমার ঝোঁক কেন হল বল তো? তোমরা মেয়েরা যদি ভালো হও, তো খুবই ভালো। আর মন্দ হও, তো খুবই মন্দ। আমায় তুমি বিশ্বাস কর মা?”

“আপনি বুঝে দেখুন। না হলে আপনাকে টাকা দিতে চাইব কেন?”

“তোমার বাবাকে না জানিয়ে দেবে?”

“বাবাকে জানালে দিতে দেবেন না। অথচ আমার টাকা পড়ে রয়েছে। আপনার উপকার হবে। আমি জানি, আপনাদের সংসারের কষ্ট। টেঁপির বিয়ে দিতে হবে। কোথায় পাবেন টাকা, কোথায় পাবেন কী! আপনার রান্নার যেমন সুখ্যাতি, আপনার হোটেল খুব ভালো চলবে। ছয় বছরের মধ্যে আমার টাকা আপনি আমায় ফেরত দিয়ে দেবেন।”

হাজারি মুগ্ধ হয়ে গেল অতসীর হৃদয়ের পরিচয় পেয়ে। বলল, “আচ্ছা, তুমি দাও টাকা, আমি নেব। হোটেল এই মাসেই আমি খুলব। তোমার মুখ দিয়ে ভগবান এ কথা বলিয়েছেন মা। তোমরা নিষ্পাপ ছেলেমানুষ, তোমাদের মুখেই ভগবান কথা কন।”

অতসী হেসে বলল, “তাহলে নেবেন ঠিক?”

“ঠিক বলছি। এবার ঘুরে জায়গা দেখে আসি। রাণাঘাট যাচ্ছি কাল সকালেই। হয় সেখানে, নয়তো গোয়াড়ির বাজারে জায়গা দেখব। খবর পাবে তুমি। আবার ঘুরে আসছি তিন-চার দিনের মধ্যেই।”

অতসী বলল, “বাবার আহ্নিক করা হয়ে গেছে। বাবা আসবেন। আপনি বসুন, আমি আপনাদের চা নিয়ে আসি। শুনুন কাকাবাবু, আপনি যেদিন বাবার কাছে হোটেলের জন্য টাকা চান, আমি সেদিন বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনেছিলাম। সেই থেকে আমি ঠিক করে রেখেছি, আমার যা টাকা জমানো আছে, আপনাকে তা দেব।”

“আচ্ছা, বল তো মা একটা সত্যি কথা—আমার ওপর তোমার এত দয়া হল কেন?”

“বলব কাকাবাবু? আপনার দিকে চেয়ে দেখে আমার মনে হত, আপনি খুব সরল লোক আর ভালো লোক। আমার মনে বড় কষ্ট হয় আপনাকে দেখলে, সত্যি বলছি। তবে দয়া বলছেন কেন? আমি আপনার মেয়ের মতো না?”

বলেই অতসী এক প্রকার কুণ্ঠা ও লজ্জা মিশ্রিত হাসি হাসল।

হাজারি বলল, “তুমি আর জন্মে আমার মা ছিলে, তাই দয়ার কথা বলছি। নইলে কি সন্তানের ওপর এত মমতা হয়? তুমি সুখে থাকো, রাজরাণী হও—এই আশীর্বাদ করছি। আমি তোমার গরিব কাকা, এর বেশি আর কী করতে পারি।”

অতসী এগিয়ে এসে হঠাৎ নিচু হয়ে হাজারির পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করল। আর একটুও না দাঁড়িয়ে তৎক্ষণাৎ বাড়ির মধ্যে চলে গেল।