শূন্য পথের মল্লিকা – স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

২৯. জিনি

২৯. জিনি

নিধির বেডরুমটা এত বড় যে, তার মধ্যে ওদের পুরো বাড়িটাই বোধহয় ঢুকে যাবে। আর সবচেয়ে ভাল জিনিস হল, ঘরের মধ্যে অনেকটা খালি মেঝে ছড়ানো আছে।

ওরা যে-বাড়িতে থাকে, তাতে দুটো শোয়ার ঘর আর একটা বসার ঘর থাকলেও, সেগুলো পরিসরে খুব একটা বড় নয়। টুকটাক আসবাব রাখার পরে সে ভাবে আর খালি মেঝে বলে কিছু নেই।

ছোট থেকেই তাই বড় ঘর, এমন সুন্দর খালি ছড়ানো মেঝে দেখলেই ভাল লাগে জিনির। মনে মনে ওর ইচ্ছে আছে কোনও দিন যদি নিজের কোনও বাড়ি বা ফ্ল্যাট হয়, তা হলে এমন একটা ঘর রাখবে, যেখানে সে ভাবে কোনও ফার্নিচার রাখা থাকবে না। সেখানে মেঝেতে বসবে জিনি। মাদুর পেতে শোবে। একটা বড় খেলনা রেলগাড়ি কিনে মেঝের ওপর লাইন পেতে সেটাকে চালাবে! বাচ্চাদের মতো লাগলেও এটাই ইচ্ছে ওর কিন্তু ইচ্ছে হল শিশির ফোঁটা। বাস্তবের রোদে তা স্থায়ী হয় না বিশেষ।

নিধিদের বাড়িতে আজ প্রথম এল জিনি। ওকে অনেকবার আসতে বলেছে নিধি। কিন্তু নিজের অস্বস্তির জন্যই আসেনি। আসলে কারও বাড়ি গেলে তাকেও তো নিজের বাড়িতে আসতে বলতে হয়। কিন্তু জিনি যেখানে থাকে, সেখানে কাউকে নিয়ে যাওয়া যায় না।

বিদেশে নাকি সব কাজের মর্যাদা আছে। কেউ সেখানে নাকি কাউকে কাজ দিয়ে বিচার করে না। বিচার করে তার মনুষ্যত্ব দিয়ে, মানবিকতা আর মানসিকতা দিয়ে। এটা কতটা সত্যি কে জানে! কিন্তু যাই হোক, আমাদের দেশে তা হয় না মোটেও। যে যাই বলুক, জিনি জানে অধিকাংশ মানুষ মনে মনে সারাক্ষণ অন্যকে জাজ করে চলেছে। সারাক্ষণ তার কাজের চুলচেরা বিচার করে চলেছে। মেপে চলেছে তার যোগ্যতা, তার পকেটের ওজন। তার বাড়িঘরের স্কোয়্যার ফিট। সমাজে তার কোন বড় গাছে ক’টা নৌকো বাঁধা আছে। এই সব। এখানে কে ভদ্র, ভাল ও সৎ মানুষ সে সব কেউ দেখে না! সবাই সর্বগ্রাসী আর্থিক সাফল্যকেই জীবনের ধ্রুবতারা বানিয়ে রেখেছে। তা না হলে এত খারাপ আর অসৎ মানুষজন সমাজে এত গুরুত্ব পায়!

জিনি জানে ওর বাবা ভালমানুষ। খুব নরম আর ভদ্র মানুষ। কিন্তু দিনের পর দিন বাবাকে একটু বেঁচে থাকার জন্য কী ভাবে যে হেনস্থা হতে হয়, সেটা দেখেছে ও। দেখেছে, এমন অবস্থায় থাকতে থাকতে বাবা কেমন খিটখিটে আর চুপচাপ হয়ে গিয়েছে।

জিনি কয়েকবার বাবাকে বলেওছে এই কাজ ছেড়ে দিতে। কিন্তু বাবা চায় না। বলে, বীরেন্দ্র খুব বিপদের সময়ে পাশে ছিল বাবার। ওকে ছেড়ে যেতে পারে না তাই।

জিনির কষ্ট হয় বাবার জন্য। বাবারও হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু কখনও দেখায় না। বরং এমন ভাব করে থাকে যেন সবই ঠিক আছে!

কিছুই ঠিক নেই। জিনি জানে। কিন্তু কী করতে পারে ও। ওর হাতে যে কিছুই নেই। অসহায় ভাবে শুধু ওকে দেখতে হয়, সব কিছু কেমন যেন শুকনো বালির মতো বেরিয়ে যাচ্ছে আঙুলের ফাঁক দিয়ে।

টিং টিং করে ফোনটা বেজে উঠল। ঘোর থেকে ভেসে উঠল জিনি। দেখল, বিছানার এক পাশে পড়ে থাকা নিধির ফোনটা বাজছে। ওর ইচ্ছে না হলেও দেখল বিধানের ফোন।

যাক, একটা কাজ অস্তত ও করতে পেরেছে। বিধানের সঙ্গে নিধির মনের যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে।

এটা দরকার ছিল। নিধি যে বিধানকে পছন্দ করে সেটা জানার পরেই এটা ঠিক করে রেখেছিল ও। ও তো জানে কাউকে পছন্দ হলে, তাকে না পাওয়া অবধি কেমন অস্থিরতা আর কষ্ট হয়। যাক, এখন দু’জনে ভাল থাকলেই হল।

ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। জিনি দেখল, নিধির ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলেই রয়েছে। আর ফোনের ওয়ালপেপারে জ্বলজ্বল করছে বিধানের ছবি।

বুকের ভেতর একটা শূন্যতার মধ্যেও কেমন যেন বিদ্যুৎ চিড়িক দিয়ে উঠল। জিনির মনে পড়ে গেল সেই কবির ঘর। টেবিল। রিং হওয়া ফোন। সেই ওয়ালপেপার। লাল কুর্তি আর হলুদ ওড়না উড়িয়ে দোলনায় দুলতে থাকা উর্জার ছবি।

জিনির গলার কাছে কী যেন পাকিয়ে উঠছে! মনে কষ্ট হলে, এমন গলায় ব্যথা হয় কেন? মাথা ঝিমঝিম করে কেন? কেন এমন গা গোলায়? আর হাতে-পায়ে কেন এমন অসাড় অসাড় ভাব হয়? মন তা হলে কোথায় থাকে? মন কি সারা শরীর জুড়ে বিরাজ করে?

জিনি চোয়াল শক্ত করে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলাল। সে দিনের পর থেকে মাঝে মাঝেই যখন-তখন চোখে জল চলে আসছে। নিজেকে যেন আটকাতে পারছে না। এতে যে কী মুশকিলে পড়ে যাচ্ছে জিনি! এই তো গতকালই সমস্যা হয়েছিল। রাতে খাওয়ার পরে একা একা বারান্দায় বসে ছিল জিনি। কানে ইয়ারফোন দিয়ে ফোনে জমিয়ে রাখা গান শোনার চেষ্টা করছিল। আসলে ঘরে মা আর পিসির কাছ থেকে একটু দূরে দূরে থাকতে চাইছিল ও।

বাবা ঘরে ছিল না। খাবার পর বাবা রোজ টর্চ নিয়ে বেরোয়। ওদের বিশাল কম্পাউন্ডটা ঘুরে বাবা শেষবারের মতো দেখে নেয় সব ঠিক আছে কি না। তার পর দারোয়ান আর চৌকিদারদের সঙ্গে কথা বলে ফিরে আসে। আধ ঘণ্টার মতো সময় লাগে সবটা সারতে।

বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পরে জিনি বারান্দায় বসে গান শুনছিল। পুরনো দিনের গান। লতা মঙ্গেশকরের। ও চোখ বন্ধ করে শুনছিল— ‘আমি যে তোমারই শুধু / জীবনে মরণে / ধরিয়া রাখিতে চাহি নয়নে নয়নে / না যেয়ো না / রজনী এখনও বাকি / আরও কিছু দিতে বাকি / বলে রাত জাগা পাখি / না যেয়ো না।”

গানের কথার মধ্যে, সুরের মধ্যে সলিল চৌধুরী কী ভরে দিয়েছেন কে জানে! জিনির মনে হচ্ছিল পৃথিবীর পেটের ভেতর থেকে কী যেন একটা কষ্ট, নাড়ি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসছে। লতার গলায় ‘আমি যে তোমারই শুধু’-র উচ্চারণে কিসের এমন আর্তি? কখন কোনও মানুষ অন্যের কাছে এমন করে সমর্পণ করে দিতে পারে নিজেকে! চোখ বন্ধ করে বসে জিনির মনে হচ্ছিল, ও যেন মহাশূন্যে ভাসছে। আর অনন্ত নক্ষত্রমণ্ডল ছড়িয়ে রয়েছে ওর চারিদিকে। আর এই অসীম অন্ধকারে, বুকের মধ্যেকার কয়েক আলোকবর্ষ জুড়ে শুধুই শূন্যতা!

“কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন?”

আচমকা গানের মধ্য দিয়ে পিসির ক্ষীণ গলা পেয়ে চোখ খুলে তাকিয়েছিল জিনি। কাঁদছে? সত্যি! কই! ও নিজের গালে হাত দিয়েছিল। আর দেখেছিল হাতে জল লেগে আছে। তাই তো! সত্যিই তো কাঁদছে! এ বাবা এমন কেউ করে! নিজেরই লজ্জা লেগেছিল জিনির। ও গানটা বন্ধ করে কান থেকে ইয়ারফোন খুলে রেখেছিল। তার পর চোখ মুছে বসেছিল সোজা হয়ে। জোর করে হাসার চেষ্টা করেছিল। বলেছিল, “কই। আরে, গানটা এমন সুন্দর! মানে…. অন্য কিছু নয়! গানটা এমন…”

পিসি পাশের একটা মোড়া টেনে বসে বলেছিল, “আমি কি বলেছি তেমন কিছু?”

জিনি চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “আমার পরীক্ষা হয়ে গেলে তোমার কাছে ওই মুড়াপোতায় গিয়ে থাকব কিছু দিন?”

“এ আবার বলার কী! আমি তো কতবার বলেছি। তুই-ই তো যেতে চাস না। গেলে তো আমারই ভাল লাগবে,” পিসি হেসে বলেছিল, “তবে জানবি মন থেকে পালাতে পারবি না কিন্তু।”

জিনি হেসেছিল, “আমি কি নিজের থেকে পালাচ্ছি নাকি?”

পিসি ঝুঁকে পড়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে জিনির চোখ ভাল করে মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল, “দাঁড়া, বৌদিকে বলছি তোর বিয়ের জন্য পাত্র দেখতে।” “বিয়ে? আমি?” জিনি চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “আমি জীবনে বিয়ে করব না!”

পিসি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “কে কী করল তার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করবি কেন? জানি, ভালবাসলে এমন মনে হয়। কিন্তু সময় দে। এখনই ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু ভাবিস না। জীবন কখন কী ভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, নিজেও বুঝতে পারবি না!”

জিনি বলেছিল, “তুমিও তো বিয়ে করোনি। তা হলে?”

“আমি!” পিসি হেসেছিল। বারান্দার আলোয় পিসির মুখে ছায়ার পাতলা আঁশ জড়িয়েছিল যেন।

“হ্যাঁ, তুমি। করোনি তো! তা হলে আমায় এমন বলছ কেন?” জিনি তাকিয়েছিল।

পিসি বলেছিল, “আমার ভালবাসার মানুষ ছিল একজন। আমার চেয়ে বেশ কিছুটা বড়। কিন্তু খুব ভাল ছিল মানুষটা। রাজনীতি করত। ওই অঞ্চলে নাম ছিল খুব। আমার জন্য সেটাও ছেড়ে দেওয়ার জায়গায় চলে গিয়েছিল। কিন্তু… যাক গে। তোকে সে দিন বলছিলাম তো!”

জিনি চুপ করে পিসির সেই আবছায়া মুখের দিকে তাকিয়েছিল। আর এর পরও যা বলার, যতটুকু বলার পিসিই বলবে। এখানে প্রশ্ন করার কোনও মানে হয় না ৷

পিসি সময় নিয়েছিল একটু। তার পর বলেছিল, “ওকে মেরে ফেলা হয়েছিল। রাজনৈতিক খুন। রাতে সাইকেল করে যাচ্ছিল… নীলকরদের মাঠে… একদম কাছ থেকে গুলি করেছিল ওকে…”

জিনি কী বলবে বুঝতে পারছিল না। পিসির জীবন নিয়ে বাড়িতে কথা হয় না। তাই এ সব জানে না ও ।

পিসি বলেছিল, “পরের কয়েকটা বছর আমার সব ঘেঁটে গিয়েছিল। আসলে আমরা অন্য জায়গায় চলে যাব ঠিক করেছিলাম। ও ছেড়ে দিত রাজনীতি। কিন্তু তখনই… আমিও রাজনীতি করতাম। কিন্তু ওই ঘটনার পরে সরে আসি। এ পৃথিবী এমন নৃশংস যে, আমি তার সামনে দাঁড়াতে পারিনি…”

জিনি অস্ফুটে বলেছিল, “তাই তুমি বিয়ে করোনি?”

“কিন্তু জানিস জিনি, এখন মনে হয় বিয়ে করে নিলে হত। আমরা যখন যার প্রেমে পড়ি, তখন মনে হয় এটাই শেষ ও শ্রেষ্ঠ। কিন্তু সেই ঘোর কেটে গেলে আমাদের মন আরও কিছু চায়। এখন এই বয়সে এসে যখন আশপাশে সবার সংসার দেখি, বাচ্চাকাচ্চা দেখি, আমার খুব মনখারাপ করে! বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দেখবি, প্রেমের ধারণাও পাল্টে যাবে। অল্প বয়সে যাকে ছাড়া জীবন অচল মনে হবে, পরে দেখবি তাকে ছাড়াও দিব্যি বেঁচে আছিস। তখন আবার অন্য কাউকে ভাল লাগবে। তার সঙ্গে থাকতে ইচ্ছে করবে। জীবন এমনই। পাল্টে পাল্টে যায়। আমরা জোর করে অবসেশন ধরে রাখতে চাই! রোম্যান্টিক ধারণার মতো বস্তাপচা ধারণার বশবর্তী হয়ে জীবনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে মেরে ফেলি। জানবি, নিজেকে কষ্ট দেওয়ার মধ্যে, মনে মনে ফিক্সেটেড হয়ে থাকার মধ্যে কোনও মহানুভবতা নেই। একগুঁয়ে প্রেমের ধ্বজা তুলে নিজেকে মহান প্রতিপন্ন করার কোনও দরকার নেই! এর জন্য কোথাও কোনও নম্বর বাড়বে না তোর। কেউ ফিরে তাকাবে না! শেষমেশ একা হয়ে যাবি। তার পর এক সময় আফসোস হবে। সেটা কাউকেই বলতে পারবি না। নিজের বিষে নিজেকেই মরতে হবে তিলে তিলে। মনের দরজা খুলে রাখলে কী হতে পারত আর এখন কী হল, সেটার মধ্যে পড়ে সারাক্ষণ তেতো হয়ে থাকবি। আর জানিস তো, বাকি সব কিছুর মতো প্রেমেও পাওয়া না-পাওয়া আছে! তার মানে সেটাকে মনে উল্কি করে রাখার মানে নেই। যার জন্য তোর আজ মনখারাপ, সেটা একদিন কেটে যাবে। সে দিন তুই ডিসাইড করবি তোর জীবন কী হবে। তাই প্রেমে বলিদানের কথা ভাবিস না। আমাদের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই বলেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাঁচা হল প্রকৃতির পক্ষে থাকা আর ‘বলিদান’ হল তাপস পালের সিনেমা! বুঝেছিস?”

জিনি কিছু বলেনি। আসলে ও শুনছিল, কিন্তু মানতে পারছিল না সব কথা। কিন্তু এই নিয়ে ঝগড়া করার তো মানে হয় না! পিসির নিজের যে বিশ্বাস আর অভিজ্ঞতা, তার থেকে এ সব বলছে। সেটা তো ওর চেয়ে আলাদা হবেই। কিন্তু আপাতত যে-জীবনে জিনি বেঁচে আছে, সেখান থেকে ওর যা অভিজ্ঞতা, সেটা মেনেই ও চলবে!

পিসি আর জিনি কথোপকথন চালিয়ে গেল অনেকক্ষণ। তার পর একসময় পিসি উঠে পড়ল।

যাওয়ার আগে জিনিকে বলল, “চেষ্টা করবি। তবে সফল না হলে, মনে নিবি না। এগিয়ে যাবি। বুঝেছিস?”

“আমার ফোন এসেছিল?” ঘরে ঢুকে নিজের বিশাল বড় বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করে নিধি।

জিনি মাথা নাড়ল।

“আমি ওই ঘর থেকে রিং শুনতে পেলাম মনে হল!” নিধি ফোনটা তুলে দেখল, “আরে, বিধান! তুই ধরলি না কেন?”

“তোর ফোন…. মানে…” জিনি কী বলবে বুঝতে পারল না।

নিধি ফোনটা সরিয়ে বলল, “মারব শালা… খুব আমার তোমার শিখেছ, না!” তার পর হাসল। চিত হয়ে শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “নেক্সট উইকে বিধানকে নিয়ে যাব নিউটাউনে… ফ্ল্যাটে। নতুন খাট চলে আসবে। বুঝেছিস! পালং তোড়…” বলেই খিলখিল করে হাসল।

“একটা কথা বলি?” জিনি তাকাল নিধির দিকে।

নিধি এবার বুকের নীচে একটা বালিশ চেপে ধরে উপুড় হয়ে শুয়ে ভুরু নাচাল, “কী?”

“দেখ, তোদের প্রেমটা তো এখনও সে ভাবে পেকে ওঠেনি। আগে পাকতে দে, তার পর শোয়া-বসা করিস! মনের আগে শরীর পেয়ে গেলে না, আমাদের দেশে প্রেম জমে না।”

“বিদেশে তো আগেই শুয়ে পড়ে… প্রেম তো পরে…” নিধি সামান্য বিস্মিত গলায় বলল।

“এটা তো বিদেশ নয়। এখানে আমাদের বড় হয়ে ওঠাটা ওদের চেয়ে আলাদা! যৌনতাকে ট্যাবু করে রাখা হয়েছে আমাদের এখানে। আমাদের কাছে অল্প বয়সে প্রেম ইনএভিটেবল, যৌনতা নয়। ফলে যা পাওয়া যায় না, তার দিকে টান বেশি থাকে। তাই যৌনতার দিকেই ঝোঁক বেশি হয়। শরীর পাওয়ার জন্য এত আঁকুপাঁকু। আর সেটা পেয়ে গেলেই…” জিনি মাথা নাড়ল, “আগে প্রেমটা জমুক। তার পর যা করার করিস। আমাদের এখানে মনের আগে শরীর পেয়ে গেলে মনের কিছু টেকে না।” “বাব্বা!” নিধি উঠে বসল, “বিশাল দিলি কিন্তু! তোকে পরের বার ইউনিভার্সিটির ইলেকশনে দাঁড়াতে হবে।”

জিনি হাসল জোর করে। তার পর প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “যাক গে। আমায় যে জন্য আসতে বলেছিলিস…. সেটা… মানে আমায় ফিরতে হবে।”

“ও ইয়েস!” নিধি কানের পেছনে পার্ম করা চুলগুলো সরিয়ে নিয়ে ওর হাতে একটা কার্ড দিয়ে বলল, “বাবার কার্ড। বাবা বলেছে, কবির চাকরি নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না। মার্চেই ইয়ার এন্ড। এপ্রিল থেকেই জয়েন করতে পারবে। বর্ধমানে যেতে হবে। দেখ, ওকে না দেখেই আমার বাবা জাস্ট আমার কথায় চাকরিটা দিচ্ছে। তুই প্লিজ বলিস, যেন গোলমাল না করে। নেক্সট উইকে একদিন বাবাদের ল্যান্সডাউন রোডের অফিসে গিয়ে ও যেন একবার ফরমালি দেখা করে নেয়। বুঝলি? সেখানেই পেপারস পেয়ে যাবে। লেট যেন না করে। করোনাভাইরাসের জন্য যা শুরু হয়েছে! আমাদের এখানে যদি ছড়ায়, সব কিন্তু গোলমাল হয়ে যাবে।” জিনি হাসল। বলল, “থ্যাঙ্কস। আমি বলব।”

নিধি সামান্য অবাক হয়ে তাকাল জিনির মুখের দিকে। তার পর এগিয়ে এসে হাত ধরল ওর। জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তোর? এমন ফ্যাকাসে লাগছে কেন? যেমন থাকিস রোজ, আজ তো তেমন নেই! কী হয়েছে জিনি? কবির সঙ্গে সব ঠিক আছে তো?”

জিনি কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। মাথাটা যেন টলে গেল একটু। কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। নিধির প্রশ্নের মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যে, ওর চোখে আবার জল আসছে। আবার সারা শরীর জুড়ে মনখারাপ চেপে বসছে। কিন্তু এখানে কিছুতেই ভেঙে পড়লে চলবে না। ওকে শক্ত থাকতেই হবে।

জিনি মাথা নাড়ল, তার পর উঠে আসা কান্না গিলে নিয়ে বলল, “আমি আসি। শরীরটা ভাল নেই রে।”

নিধি উঠে এসে দাঁড়াল, “সত্যি বলছিস?”

জিনি জোর করে হাসল। মাথা নাড়াল। তার পর বলল, “আমি আজ আসি। বাড়ি ফিরে পিসির সঙ্গে একটু বেরোতে হবে।”

বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল জিনি। বিকেল মরে আসছে। কলকাতা যেন সারা দিনের দৌড়ঝাঁপের পরে এখন কিছুটা ক্লান্ত। ও আকাশের দিকে তাকাল। ছাই রঙের আকাশ। কয়েকটা উৎসাহী কাক উড়ছে। আর আরও উপরে উড়ছে কিছু আপাত নির্বিকার চিল।

পায়ে পায়ে বাস স্টপের দিকে এগোল জিনি। আজ কবির জন্য একটা কাজ জোগাড় করেছে ও। ওর তো খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তা তো হচ্ছে না! বরং সারা পৃথিবী জোড়া বিষাদ এসে যেন ঢেকে দিচ্ছে ওকে। সব যেন দুলছে। দোলনায় বসা মানুষের মতো দুলছে।

দোলনা। সেই রোদ। লাল কুর্তি। হলুদ ওড়না। সব আবার ফিরে আসছে মনে। এই রাস্তাঘাট, লোকজন সব কিছু কেমন যেন আবছা লাগছে জিনির। কারও মুখ স্পষ্ট নয়। মাথাটাও কেমন ভার। জিনি তাও পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। ওই যে বাস আসছে। এটাই কি ওর বাড়ি যাওয়ার বাস?

নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করল জিনি। চোখ মুছল। বাসের নাম্বারটা দেখল আবার। হ্যাঁ, এটাই সেই বাস।

বাসটায় মোটামুটি ভিড় আছে। একটু চাপাচাপি করেই উঠল জিনি। বাস চলতে শুরু করেছে। ও ভেতরের দিকে এগোল। একটা ছেলে উঠে দাঁড়াল। বলল, “বসুন আপনি। আমি পরের স্টপে নামব!”

কোনও দিকে না তাকিয়ে বসে পড়ল জিনি। শরীরটা খারাপ লাগছে। এমন কেন হচ্ছে ওর! এর পর ও যা করতে চলেছে সেটা ভেবেই কি এমনটা হচ্ছে? কিন্তু সেটা তো ওকে করতেই হবে। এমন করে মনে আর শরীরে অস্থিরতা নিয়ে ও থাকতে পারবে না যে! নিজেকে শক্ত করতে হবে ওকে। করতেই হবে। নিজের জীবনটা ওকেই দেখতে হবে। আর তো কেউ ঠিক করে দিতে পারবে না।

চোয়াল শক্ত করে সিটে মাথা হেলিয়ে বসল জিনি। নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করল। বাড়িতে গিয়ে যে উর্জার সঙ্গে দেখা করতেই হবে ওকে। সেখানে এমন অস্থির হয়ে থাকলে চলবে না।

বাস স্টপ থেকে বাড়ির দূরত্ব হেঁটে পাঁচ মিনিটের মতো। কিন্তু সেটা পার করতেই জিনির মনে হল, দু’হাজার বছর ধরে হাঁটছে যেন। মনের কষ্ট কি শরীরও ভারী করে দেয়! নিজেকে পিঠে করে হাঁটার মতো, বেঁচে থাকার মতো, কষ্ট কম আছে যে।

কবিকে একদিন জিনি বলেছিল, ওর কবিকে ভাল লাগে। কিন্তু তার কোনও জবাব কবি দেয়নি। সেটা কেন দেয়নি এখন বুঝতে পারছে ও। তলায় তলায় কবির যে অন্য একজনকে পছন্দ। সেটা যত অবাস্তবই হোক না কেন, জিনি জানে, মন মাঝে মাঝে একদম শিশুর মতো হয়ে যায়। তার যা চাই, সেটা তার চাই-ই!

এই যে ভালবেসে কষ্ট পাচ্ছে জিনি, এটা শুনে সবাই বলে, এই সব ঠিক কেটে যাবে একদিন। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু জিনি বোঝে না, সেই একদিনটা কবে আসবে! বা আদৌ আসবে কি না কোনও দিন।

লালু যেমন গতকাল ধরেছিল ওকে। লালুর সঙ্গে কেন, কারও সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না ওর। কিন্তু লালু তো কারও কথা শোনার ছেলে নয়। পাশে এসে বসেছিল ওই ছোট্ট বাগানটায়। বলেছিল, “কী রে, তোর হিরো তো দিনকে দিন সাইলেন্ট হয়ে যাচ্ছে! কেসটা কী?”

জিনি বলেছিল, “আমার শরীর ভাল নেই লালুদা। পরে কথা বলি?” “শরীর! কী হল? করোনাভাইরাস?” লালু গোলগোল চোখ করে তাকিয়েছিল। তার পর বলেছিল, “আমারও মন ভাল নেই। অনেক টাকার দরকার। কোথা থেকে যে পাই!”

“অনেক টাকা?” জিনি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। “

আপাতত পাঁচ লাখ। পরে আরও।

একটা বাচ্চা মেয়ের জন্য,” লালু মাথা নেড়েছিল, “ম্যাডামকে বলেছিলাম। কিন্তু… এ দিকে একটা বাচ্চা মেয়ের ব্যাপার। কী যে করি!”

জিনি চুপ করেছিল। এমনিতেই ওর মনখারাপ। তার ওপর এমন একটা ব্যাপার! ও বুঝতে পারছিল লালুর মনটাও ভাল নেই। আসলে অর্থ এমন একটা জিনিস যে, এর চেয়ে বড় শিকল বোধহয় আর কিছু নেই। জিনি কিছু বলেনি। বলার মানেও হয় না ও জানে। তাই চুপ করে বসেছিল শুধু।

লালু বলেছিল, “কবিই ভাল আছে, জানিস! কোনও ঝামেলা নেই। তুই ওকে আহ্লাদ করছিস। স্যরের সঙ্গে ঘুরছে। স্যর ভরসা করছে। ওর লাইফ পুরো সেট। তাই না?”

জিনি বুঝতে পারছিল, লালু এ সব মনখারাপ থেকে বলছে। কোনও উত্তর শোনার জন্য নয়।

লালু কেমন যেন আনমনা হয়ে নিজের মনে বলেছিল, “একটা উপায় আছে, বুঝলি! টাকাটা জোগাড় করার একটা উপায় আছে। কিন্তু কবির হেল্প চাই। ও রাজি হলে… কিন্তু হবে কি? বুঝতে পারছি না…. কিছু বুঝতে পারছি না। আজকাল ও পুরো সাইলেন্ট মোডে চলে গিয়েছে!”

জিনি জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি বলেছ ওকে?”

লালু মাথা নেড়ে বলেছিল, “আগে নিজের সঙ্গে যুদ্ধটা মেটাই। তার পর ওকে বলব।”

জিনি ভুরু কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “কী সব বলছ! সবাই এমন ফিলসফার হয়ে উঠছে কেন! সারাক্ষণ যেন মহান কিছু ডায়ালগ দেবে দেবে, এরকম ভাব!”

লালু হেসেছিল। খানিকটা যেন জোর করেই। তার পর বলেছিল, “যাক গে, তুই এমন মনখারাপ করিস না। কবিকে পাত্তা কম দে। দেখবি, তোর পায়ে পায়ে ঘুরবে। ম্যাক্সিমাম মানুষই এমন হয়। পাত্তা দিয়েছ কি, মাথায় উঠে বসবে। আর ইগনোর কর, দেখবি লেজ নাড়াচ্ছে। বিনা পয়সায় টিপস দিলাম। কাজে লাগবে। আসি আজ।”

লালু ধীর পায়ে চলে গিয়েছিল। জিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেবেছিল লালুর শেষ কথাটা।

হ্যাঁ, এটা দেখেছে জিনি। কেউ কাউকে মন দিয়ে ভালবাসলে, কেয়ার করলে, সে তাকে পাপোশের মতোই ব্যবহার করে। যেমন-তেমন খুশি ছুড়ে ফেলে দেয়! কষ্ট দেয় অকারণে। সে যে মানুষ, সেইটুকু পর্যন্ত যেন স্বীকার করে না। কেন হয় এটা! সহজে পেয়ে গেলে কি মানুষ তার মূল্য বোঝে না! নাকি তারা এতটাই ডিসফাংশানাল হয় যে, ভালবাসার বদলে তোষামোদে আকৃষ্ট হয়! এটাই বোধহয় মানুষের প্রবৃত্তি। যে এসে নিজে থেকে ধরা দেয়, তাকে অবহেলা করাটাই বোধহয় তার মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য।

উর্জার অফিস থাকে, কিন্তু আজ উর্জাকে সকাল থেকেই বাড়িতে দেখেছিল জিনি। বুঝতে পেরেছিল যে, বাড়িতেই থাকবে হয়তো। আর সেটাই ঠিক। গিয়ে বড় বাড়ির সামনে বিন্দিকে দেখতে পেল জিনি। নিজেই এগিয়ে জিজ্ঞেস করল, “উর্জাদি আছে? আমার একটু দরকার ছিল!”

বিন্দি হাসল, “হ্যাঁ, আজ বাড়িতেই আছে। তুমি যাও না দিদি।”

বড় বাড়ির ভেতরে না ডাকলে যেতে নেই। এটা জানে জিনি। কিন্তু আজ এ সব নিয়ম ও মানতে পারবে না। অনেক কষ্টে নিজের মধ্যে একটা স্রোত এনেছে। এ সব সামান্য ব্যাপারে সেটাতে বাধা আসতে দেবে না।

বড় বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল জিনি। বুকের ভেতরে যেন একসঙ্গে দু’হাজার ড্রাম বাজছে। ও কি ঠিক করছে? এখন আসল সময়ে আসল কথাটা বলতে পারবে তো?

ও বাড়ির দিকে তাকাল। শেষ বিকেলের আলোয় বিশাল বাড়িটা যেন কোনও প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মতো শুয়ে আছে। চারিদিক চুপচাপ। পাখিদের ডাক শোনা যাচ্ছে আশপাশ থেকে। অনেক দিন এই বাড়িতে ঢোকেনি জিনি। এখন ওকে যদি কেউ খারাপ কথা বলে।

জিনি বাড়ির মধ্যে ঢুকল। সেই কাচের দরজা। বড় ঘর। ঠান্ডা মেঝে। সবটাই ওর চেনা। পায়ে পায়ে ও উর্জার ঘরের দিকে এগোল।

উর্জার ঘরের বাইরে গিয়ে আলতো করে দরজায় টোকা দিল জিনি। “কে?” উর্জা জিজ্ঞেস করল।

“আমি জিনি, উর্জাদি। আসব?” কথাটা বলতে গিয়েও গলা কেঁপে গেল জিনির।

উর্জা উঠে এসে দরজাটা খুলে দিল, “আয় আয়…. কী ভাল হল তুই এলি। আমিই যেতাম তোর কাছে।”

“আমার কাছে? কেন?” জিনি ঘরে ঢুকে একপাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

“আমি আসলে একটা কাজে বাইরে যাচ্ছি। কাল। অনেক দিনের জন্য। তাই যাওয়ার আগে দেখা করব ভাবছিলাম,” উর্জা হাসল।

“কাল?” জিনি অবাক হল, “বাইরে? কিন্তু এখন তো করোনাভাইরাস… “সব জায়গায় এখনও বাড়াবাড়ি হয়নি। আমি যেখানে যাব, সেখানে সে ভাবে কিছু হয়নি এখনও। হওয়ার আগেই তাই পৌঁছে যেতে হবে আর কী!” উর্জা হাসল, তার পর টেবিলের কাছে গিয়ে একটা প্যাকেট নিয়ে এসে হাতে দিল জিনির। বলল, “এটা তোর! তোদের দু’জনের জন্য জিনিস আছে এতে!”

“আমাদের দু’জনের মানে?” জিনি অবাক হল।

উর্জা হাসি হাসি মুখে বলল, “তোর আর কবির। তোদের দু’জনের জন্য।”

জিনি কী বলবে বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল!

উর্জা হাসল আবার। বলল, “আমি জানি তুই ওকে পছন্দ করিস। সেই যে ও গাড়িতে উঠেছিল ওষুধ কিনে! তুই যে ভাবে তাকিয়েছিলিস! তার পর দেখেছি, তুই কী ভাবে ওকে চোখ দিয়ে অনুসরণ করিস। না না, লজ্জা পাস না… এটা স্বাভাবিক। এটাই তো জীবন। আমি যেটুকু দেখেছি, ছেলেটা চুপচাপ। দূরে দূরে থাকে। এমন মানুষ নিজের কথা বলতে পারে না, বুঝলি! এটা ওর সঙ্গে ভাগ করবি।”

জিনির বুকের মধ্যে কেমন একটা করছে! ও কী বলতে এসেছিল আর কী হল! এখন কী বলবে উর্জাকে! কী হবে বলে যে, উর্জা যেন কবিকে নিজের থেকে দূরে রাখে! কাল তো আবার চলেই যাচ্ছে। অনেক দিনের জন্য যাচ্ছে। যাওয়ার আগে কি সম্পর্ক জটিল করার কোনও মানে আছে? আর এখন মনে হচ্ছে, উর্জা যদি ও সব শুনে এই বাড়ি থেকে কবিকে তাড়িয়ে দেয়, তা হলে! রাগের আর কষ্টের মাথায় জিনি যা ভেবেছিল, এখন আর তা মনে হচ্ছে না। বরং ওরকম কিছু ভেবেছিল কী করে, সেটা মনে করেই নিজের ওপর রাগ হচ্ছে। কান্না পাচ্ছে আবার। এমন অসহায় কোনও দিন লাগেনি ওর। নিজের মন কী চায়, সেটা এখনও বুঝে উঠতে পারল না যেন।

“কী রে, কিছু বল?” উর্জা হাসল।

জিনি কী বলবে বুঝতে না পেরে মাথা নিচু করে নিল। উর্জা এসে সামনে দাঁড়াল ওর। তার পর বলল, “কী হয়েছে?” জিনি ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেও পারল না। ঠিক মনের ফাঁক দিয়ে দু’-চার ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গালের ওপর।

উর্জা মাথায় আলতো করে হাত দিল ওর। তার পর বলল, “বুঝেছি। শোন, সব যে এক সঙ্গে হয়, তা কিন্তু নয়। যখন ঠিক সময় আসবে, ও তোকে খুঁজে পাবে। তুই তোর জীবনটা কেমন করে আর কার সঙ্গে কাটাতে চাস সেটা দেখতে পেলেও, কবি এখনও পায়নি। যে দিন পাবে সে দিন আর কষ্ট থাকবে না তোর। সামডে হি উইল ফাইভ ইউ। বুঝেছিস? কিন্তু তত দিন তো তোকে থাকতে হবে ওর পাশে। ফলে, নো কান্নাকাটি। জীবন আজকেই শেষ হচ্ছে না। কবিও কারও হয়ে যাচ্ছে না। বুঝলি? একটু বোঝার চেষ্টা কর। পাগলি একটা!”

জিনি তাকাল উর্জার দিকে। উর্জা যদি সত্যিটা জানত! কিন্তু উজা জানুক বা নাই জানুক তাতে কী! তাতে জিনির মনের ভাব তো পাল্টাবে না। ও কবির জন্য যা অনুভব করে সেটা তো মিথ্যে নয়।

আসলে জিনি এখন এই মুহূর্তে বুঝতে পারল, ও পেতে চাইছে বলেই হয়তো কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু যদি এই পেতে চাওয়াটা আপাতত মুলতুবি রাখে? যদি ভালবাসাটুকুর মধ্যেই থাকে শুধু, তা হলে? উর্জা চলে যাওয়ার পরে সামনে যে সম্পূর্ণ একটা ফাঁকা সময় আছে, সেখানে কী হবে? পিসি তো বলেইছে জীবন পাল্টায় দ্রুত। কে বলতে পারে ওরটাও পাল্টাবে না। উর্জা বলল, “তুই কিছু বলবি না?”

জিনি মাথা নাড়ল। চোখ মুছল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে। তার পর বলল, “তুমি খুব ভাল।”

উর্জা হাসল, “দোলনায় চড়িস। আমি বিন্দিকে বলে দিয়েছি। কেমন? আয় এখন।”

বড় বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিল জিনি। বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে আছে ও বাক্সটাকে। মনটা কেমন যেন পাল্টে দিল উর্জার কথাগুলো। সত্যিই তো বলেছে! এই যে কবিকে ও ভালবাসে, সেটা নিয়ে তো সারাক্ষণ মনখারাপ করেই বসে থাকে। ভালবাসলে যে মনের মধ্যে আনন্দ আসে, সেটা একবারও তো ভাবে না! একবারও তো অনুভব করার চেষ্টা করে না! কিন্তু সেই ভাললাগাটাই তো আসল। সেই ভাললাগাটুকুই তো জীবনের মূলধন! সেই ভাললাগা আর ভালবাসার আলোটা থাকতে কেন বোকার মতো এমন অন্ধকার না-পাওয়াটুকু নিয়ে বসে আছে ও!

জিনি তাকাল আকাশের দিকে। বিকেল শেষ হয়ে আসছে। হাওয়া দিচ্ছে। গুলমোহর আর রাধাচূড়া ফুল ঝরে পড়ছে বাগান জুড়ে। পলাশ ফুটছে ডালে ডালে। পৃথিবী সাজছে বসন্তের আগমনে। বাগানের গাছে বেলিফুল ফুটছে। দু’-একটা ঝরেও পড়ছে মাটিতে। বসন্তের হাতে এ যেন মল্লিকার অর্ঘ্য!

ও দেখল, বড় গেট দিয়ে ঢুকছে কবি। একা। রোজ তো বীরেন্দ্রর সঙ্গে ফেরে। তা হলে আজ একা!

জিনি জোরে হাঁটল। তার পর একদম কবির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কবি অবাক হয়ে তাকাল ওর দিকে।

জিনি কোনও কথা না বলে হাতটা ধরল ওর। তার পর বলল, “চলো!” কবি অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”

“আমায় দোলনা চড়াবে। চলো। তার পর তোমার সঙ্গে তোমার চাকরি নিয়ে কথা আছে,” জিনি হাত ধরে টানল ওকে।

“আরে, পড়ে যাব। যাচ্ছি যাচ্ছি,” কবি হাসল একটু। গালে লম্বা দুটো টোল জেগে উঠল।

জিনিও হাসল। শক্ত করে হাতটা ধরল ওর। মনে মনে বলল, ‘একদিন তুমিও এমন করে ধরবে আমার হাত, আমি জানি। কিন্তু তত দিন আমিই না-হয় তোমার হাতটা ধরব নিজে থেকে। জোর করে হলেও ধরব।’ আর মুখে বলল, “হাসবে। তুমি এমন করে হাসবে। তুমি হাসলে আমার খুব ভাল লাগে। মনে হয় মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠল! তুমিই আমার রোদ্দুর, বুঝলে? চলো এবার। খালি ঘ্যাম! খালি প্রশংসা শোনার লোভ! বাজে ছেলে একটা। চলো।”