৩০. লালু
৩০. লালু
লোকটার নাম মাধু। ফরসা, মোটা চেহারা। মাথায় বড় টাক। মুখ ভর্তি পান আর পানের রস। কথা বলার সময় মাথা তুলে মুখটা বাটির মতো করে কথা বলছে। আর কথার সঙ্গে মুখের মধ্যে পাতলা একটা বুড়বুড়ি কাটছে পানের লাল রস।
লালুর খালি মনে হচ্ছে এই বোধহয় মুখ বেয়ে রস গড়িয়ে পড়বে বাইরে। কিন্তু মাধু বেশ কায়দা করে সামলে নিচ্ছে প্রতিবার। অনেকটা যেন টুপটুপু ভর্তি তেলের বাটি নিয়ে হাঁটার মতো।
মাধু পান বিক্রি করে। শোভাবাজার-সুতানুটি স্টেশনের পাশে একটা সরু দোকান আছে ওর। তাতে একটা তাকের মতো করা। তাকের ওপরে মাধুর দোকান আর নীচে কোল্ড ড্রিংক আর চিপসের স্টক। গরম পড়েনি। তাই কোল্ড ড্রিঙ্কের মরসুম শুরু হয়নি সে ভাবে। নীচের দিকটা তাই সবুজ পাল্লা দিয়ে বন্ধ করা আছে। এমন দোকান নাকি মাধুর আরও আছে। দোকানের সামনে দু’-তিনজন কাস্টমার দাঁড়িয়ে আছে এখন। তাদের পান সিগারেট এ সব দিচ্ছে মাধু। আর দিতে দিতে মুখটাকে ওরকম বাটির মতো করে তুলে কথা বলছে।
লালু বিরক্ত হয়ে মোবাইলে সময় দেখল। সন্ধে হয়ে গেছে। প্রায় সাড়ে ছ’টা বাজে। কলকাতা এখন কিছুটা ক্লান্ত। অফিস ফেরতা মানুষজন খানিকটা ব্যতিব্যস্তও। লালুর মনে হয়, কলকাতা যদি মানুষ হত, তা হলে প্রতিদিন এই সময়টায় কলকাতার ভুরু কুঁচকে থাকত। এখন যেমন ও আছে।
আরে বাবা, মাধু ওকে ছেড়ে দিলেই তো পারে! তা না, “একটু দাঁড়ান দাদা,” বলে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ও দিকে পাখিদা দাঁড়িয়ে থাকবে। তার পর অঞ্জনার কাছেও যেতে হবে। ওর কি সময়ের দাম নেই! লালু মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে গলা তুলে বলল, “মাধুভাই, আমায় ছেড়ে দাও। আমার খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর ওয়েট করতে পারছি না।” মাধু একটা পান খিলি করে সামনে দাঁড়ানো কাস্টমারের হাতে তুলে দিয়ে বলল, “এই যে হয়ে গেল দাদা। আপনি আসেন এবার।” লালু এগোল। তার পর আড় করে ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একটা খাম বের করে আনল। সাদা খাম। বড়, মুখ বন্ধ। ভেতরে টাকা আছে। এক লাখ। পাঁচশো টাকার নোটের দুটো বান্ডিল। টাকাটা নিয়ে মাধু হাসল। তার পর একটা ড্রয়ার খুলে ঢুকিয়ে রাখল। “আরে, গুনলেন না?” লালু অবাক হল।
“গুনব? জরুরত হোবে না দাদা! বিন্দি বলেছে যে, আপনি খুব ভরসার লোক। বিন্দির কথা আমি মেনে চলি। ও যা বলে ঠিক বলে,” মাধু ওর খয়েরি রঙের দাঁত দেখিয়ে হাসল।
লালু মাথা নাড়ল। বলল, “তা হলে আমি আসি?”
মাধু বলল, “শোনেন না দাদা, বিন্দি আছে কেমন? ঠিক আছে তো?” লালু হাসল। কী বলবে? বিন্দি এই জীবনে কোনও দিন খুশি থাকতে পারবে? এটা কিসের টাকা সেটা কি আর ও জানে না? কিন্তু মাধু জানে না বলেই এমন প্রশ্ন করতে পারল। জীবনে কোনও কোনও বিষয় না জানলেই মানুষ ভাল থাকে। সে দিন সন্ধেবেলা চপটাকে যত সহজে ও ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, আজ টাকাটাকে তো দিতে পারল না লালু! কারণ, বাস্তব খুবই কঠিন। তাই ওকে এই টাকাটা যখন মাধুকে পৌঁছে দিতে বলেছিল বিন্দি, “না” করতে পারেনি। বিন্দির যে এটা খুব দরকার সেটা ও বুঝেছে।
লালু বলল, “হ্যাঁ আছে। আমি আসি। আমায় আর-এক জায়গায় যেতে হবে।”
“ঠিক আছে। আপনি একটু লজেন্স খান,” মাধু পান ভর্তি মুখ তুলে হেসে দুটো লজেন্স বাড়িয়ে দিল ওর দিকে।
“আরে, এ সব কেন?” লালু সামান্য বিব্রত হল।
“আরে, নিন দাদা। আপনি বিন্দির দাদা। আমারও দাদা। নিন পিলিজ,” মাধু আবার মুখ তুলে হাসল।
লালু লজেন্স দুটো নিয়ে হাসল। তার পর পকেটে রেখে বলল, “ঠিক আছে আমি চলি।”
মাধু আর কিছু না বলে বুকের কাছে হাত জড়ো করে মাথা নাড়ল। দোকানের সামনে থেকে সরে এসে বড় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল লালু। ও অন্যদের মতো দ্রুত হাঁটতে পারে না। ওর একটু সময় লাগে। ছোট থেকেই এই নিয়ে ওর একটা কষ্ট আছে। কিন্তু কী করবে!
আজ ম্যাডাম ওকে বলছিল একটা স্কুটার কিনে দেবে কাজের জন্য। লালু শুনেছে, কিছু বলেনি। কী বলবে! সে দিনের পর থেকে ওর আর কিছু বলার ইচ্ছে নেই। অপমান করে এখন স্কুটার দান করার কোনও মানে হয় না।
লালু দেখছে সে দিনের পর থেকে ম্যাডাম সামান্য হলেও ভাল ব্যবহার করছে ওর সঙ্গে। কিন্তু যা হয়ে গিয়েছে, তা তো আর ম্যাডাম পাল্টাতে পারবে না। একটা সুযোগ চাই লালুর। একটা। তার পর ও দেখাবে মজা!
অঞ্জনার কাছে যাওয়ার পথেই একটা জায়গায় পাখিদা দাঁড়িয়ে থাকবে। কাল ম্যাডামের নতুন লোক লাগবে। সেটা ফাইনাল করে তার পর যাবে অঞ্জনার কাছে। অঞ্জনা ডেকেছে। টাকার নাকি একটা বন্দোবস্ত হতে পারে। দেখা যাক অঞ্জনা কী বন্দোবস্ত করেছে।
লালু মোবাইল বের করল। ও যে টাকাটা দিয়ে দিয়েছে, সেটা বিন্দিকে জানিয়ে দিতে হবে। না, ফোন করবে না। মেসেজ করেই জানিয়ে দেবে।
লালু হাঁটতে হাঁটতেই মেসেজ করে দিল। জানিয়ে দিল যে, টাকাটা পৌঁছে দিয়েছে। আর বিন্দি যেন একবার ফোন করে ব্যাপারটা কনফার্ম করে নেয়।
এক লাখ টাকা! ভাবা যায়! লালু মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে চোয়াল শক্ত করল। এই ম্যাডাম, বীরেন্দ্র সব হারামি! ওর বেলায় টাকা নেই আর সেখানে বিন্দিকে এক লাখ দিয়ে দিল। কী? না বিন্দির থেকে ওর বিজনেস হবে। ছিঃ! আর বিন্দিও এটা পারল কী করে?
কাল রাতে বিন্দি এসেছিল ওর কাছে। রাতে খাওয়ার পরে কবির সঙ্গে কথা বলে নিজের ঘরে চলে এসেছিল লালু।
আজকাল মনমেজাজ ভাল থাকে না। সারাক্ষণ মনে হয় মাথার মধ্যে কেমন একটা ব্যথা। হাই ভোল্টেজ ইলেকট্রিকের তারের কাছে গেলে যেমন গুনগুন শব্দ শোনা যায়, তেমন একটা শব্দ যেন কানের মধ্যে সারাক্ষণ বেজে চলে। ছুটির মুখটা মনে পড়ে। মেয়েটাকে বাঁচানো যাবে না? অঞ্জনার ঘরে ঢুকলে ছুটির জামা ঝোলে খাটের স্ট্যান্ডে। পুতুল পড়ে থাকে এক পাশে। ছুটির স্কুলের ব্যাগ ঝোলে দেওয়ালের আংটায়। চকোলেটের কাগজ ছড়িয়ে থাকে মেঝেয়। এই সব কিছু থাকবে, শুধু মেয়েটাই থাকবে না! এটা কী করে হতে পারে! জীবন কী ভাবে এমন নিষ্ঠুর হয়!
কাল রাতে নিজের ঘরে ফিরে এ সবই ভাবছিল লালু। শরীর ক্লান্ত হলেও ঘুম আসছিল না। ছুটির জন্য টাকা জোগাড় করতে পারছে না, এই অক্ষমতা থেকে তৈরি হওয়া পাপবোধ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল ওকে। কেন কে জানে ওর মনে হচ্ছিল ছুটি ওর জন্যই মারা যাবে।
এটা ঠিক নয়, নিজেকেই নিজে বোঝাচ্ছিল লালু, কিন্তু নিজের মনের মধ্যে বসে থাকা আর-একটা লালুকে যেন কিছুতেই এটা বোঝাতে পারছিল না। নিজের চুল দু’মুঠোর মধ্যে ধরে বসেছিল ও। আর তখনই দরজায় টোকা পড়েছিল।
লালু নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করেছিল। বাইরে কারও সামনে ও নিজের দুর্বলতা দেখাতে পারে না। তা-ও বিন্দি জেনে ফেলেছিল সে দিনের ঘটনাটা। সেটা নিয়েও মনে মনে নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে আছে। কেন ক্ষণিকের দুর্বলতায় ও ওরকমটা করল!
আসলে নিজের শারীরিক সমস্যার জন্য সারা জীবন নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ সহ্য করে এসেছে লালু। ও বুঝেছে এই পৃথিবী প্রচণ্ড নিষ্ঠুর এক জায়গা। কারও কোনও দুর্বলতা দেখলেই সেটার মাধ্যমে তাকে আক্রমণ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে লোকজন। তাই কাউকেই নিজের কোনও রকম দুর্বলতার সন্ধান দেওয়া যাবে না।
নিজেকে সামলে, লালু দরজা খুলে দেখেছিল বিন্দি এসেছে। লালু জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই! এখন?”
বিন্দি লালুকে সামান্য ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়েছিল। তার পর বলেছিল, “একটা দরকার আছে লালুদা। তোমার হেল্প লাগবে আমার। তুমি কি এখনও রেগে আছ আমার ওপর?”
“না রেগে নেই। আর আমার হেয়?” লালু ভাল করে তাকিয়েছিল বিন্দির দিকে। মেয়েটার চোখমুখে কেমন একটা অস্বস্তি ভাব। যেন মেয়েটা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত।
“কী হয়েছে বল,” লালু জিজ্ঞেস করেছিল।
“এটা,” বিন্দি ওড়নার তলা থেকে একটা সাদা খাম বের করেছিল, “এতে সেই টাকাটা আছে। এক জায়গায় দিয়ে আসতে হবে।”
“টাকা! সেইটা?” লালু তাকিয়েছিল বিন্দির দিকে।
বিন্দি ঠোঁট কামড়ে মাথা নামিয়ে নিয়েছিল। তার পর মৃদু গলায় বলেছিল, “হ্যাঁ, এক লাখ।”
“সেই এক লাখ!” লালু চোয়াল শক্ত করে তাকিয়েছিল ওর দিকে। রাগ হচ্ছিল ওর। কিন্তু সেটাকেও লুকিয়ে ফেলেছিল অন্য সব কিছুর মতো।
বিন্দি একই রকম মৃদু গলায় বলেছিল, “জানি, তুমি রাগ করলে। সে দিন সেই চপটাও ফেলে দিলে। কিন্তু আমি কী করব! বোনের বিয়ে। পাত্রপক্ষকে টিভি, ফ্রিজ আর ওয়াশিং মেশিন দিতে হবে। ছেলে টুয়েলভ পাশ। পিওনের চাকরি করে, সরকারি। আমাদের ওদিকে দহেজ ছাড়া কিছু হয় না। বোনটাকে ওখানে বিয়ে না দিলে ওর জীবনও আমার মতো হয়ে যাবে। ছেলেটি নগদ বেশি চায়নি। কিন্তু এগুলো চেয়েছে। আমি ছাড়া আর কে দেবে বলো?”
লালু কিছু বলেনি। চুপচাপ শুনছিল। বুঝতে পারছিল এ সব কথা ওকে নয়, নিজেকে বোঝাতেই বলছে বিন্দি। আর এ-ও বুঝতে পারছিল, ওর বুকের মধ্যে যেমন একটা ঠ্যাঁটা আর অবুঝ লালু আছে, বিন্দির মধ্যেও অমন একটা জিদ্দি বিন্দি আছে। সেই বিন্দিটাকেই তাই এই বিন্দি বুঝিয়ে যাচ্ছে নানা ভাবে।
বিন্দি বলছিল, “স্যরের কাছে দু’জন আসবে। একজন বেশ বয়স্ক। নেতা। তার আমাকে পছন্দ! সার বলেছে আমার দ্বারা নাকি সারের অনেক লাভ হয়েছে। তাই টাকাটা দিয়েছে। তুমি আমায় খারাপ ভাবলেও আমার কিছু করার নেই। আমার টাকার দরকার লালুদা। আমি আর কী করে পারব টাকা জোগাড় করতে? তুমি তো সে দিন টাকা চাইলে, কী হল দ্যাখোনি?”
লালু থমকে গিয়েছিল। আবার মনে পড়ে গিয়েছিল সব। ওকে বাপ-মা তুলে গালি দিয়েছিল!
বিন্দি বলেছিল, “এদের কিছু না দিলে এরা কিছু দেবে না। আমায় তাই দিতেই হল। দুটো লোকের সঙ্গে… আমি…. যা করেছি আমার উপায় ছিল না লালুদা। আমার উপায় ছিল না। তুমি আমায়…. তুমি ….”
বিন্দি ঘুরে গিয়ে দেওয়ালে মাথা রেখে কাঁদছিল। লালু কিছু না বলে চুপচাপ ওই খাম হাতে ধরে দাঁড়িয়েছিল। বিন্দিকে ও খারাপ ভাবেনি। এই জীবনে কোথায় যে কার কষ্ট সেটা কেউ জানে না। অন্যকে দূর থেকে জাজ করে যা খুশি বলে দেওয়াটাকে জানোয়ারের মতো কাজ মনে করে লালু। ও নিজে ওরকম জ্ঞানত করে
না। তাই বিন্দিকেও খারাপ ভাবেনি একটুও। বিন্দি নিজেকে সামলে নিয়ে চোখ মুছে ঘুরে তাকিয়েছিল। তার পর বলেছিল, “তুমি আগে টাকাটা খুলে গুনে নাও। শোভাবাজার মেট্রো স্টেশনের পাশেই মাধুর পানের দোকান আছে। মাধু মোটা, মাথায় টাক। কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে। ও আমাদের গ্রামের লোক। ওকে দিলে ও টাকা পৌঁছে দেবে। আমি কথা বলে নিয়েছি।”
“মাধু!” লালু খাম খুলে টাকা গুনতে গুনতে তাকিয়েছিল বিন্দির দিকে। বিন্দি বলেছিল, “ও আমায় পছন্দ করত গ্রামে থাকতে। কিন্তু বিয়ে করতে পারেনি। ওর বিয়ে হয়ে গিয়েছে এখন। দুটো বাচ্চাও আছে। তাও আমায় মাঝে মাঝে ফোন করে। কথা বলে। টুকটাক দেখাও করে। তুমি আমায় খুব খারাপ ভাবছ, না?”
টাকাটা গুনে খামে ভরে হেসেছিল লালু। বলেছিল, “তুই ঘরে যা এবার। আমি পৌঁছে দেব। আর খারাপ ভাল আমি কিছু ভাবি না রে। সবার জীবন তার নিজের মতো, আলাদা আলাদা। কে কী করে, কেন করে, সে সব বোঝা যায় না!”
বিন্দি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “আসলে সবাই তো ভাবে, তাই বললাম!”
লালু বলেছিল, “ক’জন মানুষ অন্যের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে পারে বল!
মনে মনে অন্যকে খারাপ ভেবে নিতেই তারা আনন্দ পায়। সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স আর কী। সে দিন আমি ডিস্টার্বড ছিলাম, তাই তোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি। তুই কিছু মনে করিস না, প্লিজ।”
“সুপিরিও… কী!” বিন্দি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
“কিছু না। তুই ঘরে যা। আমি কাল পৌঁছে দেব। বিন্দি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে বলেছিল, “তুমি তো পড়াশোনা করেছ। কত জানো। কেন এখানে পড়ে আছ! অপমান সহ্য করছ!”
লালু কিছু না বলে হেসেছিল। এমন সাধারণ বি এ পাশ কত কোটি যে আছে এই দেশে! এই যে সাড়ে বারো হাজারি চাকরি ও পেয়েছে এই তো অনেক।
বিন্দি চলে যাওয়ার পরে টাকাটা টেবিলের একপাশের ড্রয়ারে রেখে বিছানায় বসেছিল লালু। মনে মনে একটা রাগ জন্মাচ্ছিল। বাচ্চা একটা মেয়েকে সাহায্য করার বেলায় ওকে মারল আর নিজের স্বার্থে নোংরামো করার বেলায় টাকা বেরিয়ে পড়ল! বীরেন্দ্র একটা অমানুষ! বিন্দির অসহায়তার সুযোগ নিয়ে ওকে দিয়ে কী সব করাচ্ছে। এটা বাড়ি না নরককুণ্ড!
নিজের মাথার চুল দু’হাতে মুঠো করে চোখ বন্ধ করেছিল লালু। আর তখনই একটা মুখ ভেসে উঠেছিল ওর সামনে। ও যেন দেখতে পেয়েছিল, ওর দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে রেখেছে একটা লোক। সে বলছে, “আমার নাম রূপবান।
ওই দাঁড়িয়ে আছে পাখিদা। কনুই অবধি গোটানো লম্বা হাতার টেরিকটের শার্ট, এলোমেলো চুল, বগলে একটা ফোলিও ব্যাগ আর পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো। একটা মিষ্টির দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে মোবাইলে কী একটা দেখছে।
“পাখিদা,” সামনে গিয়ে লালু আলতো করে ডাকল।
“ইঃ, লাটসাহেব এসেছে!” পাখিদা মুখ তুলে তাকাল, “তোর জন্য দশ মিনিট ওয়েট করছি। আমার সময়ের দাম নেই! লেট করলি কেন?”
লালু হাসল। বলল, “একটা কাজ ছিল শোভাবাজার মেট্রো স্টেশনের কাছে। তার পর অফিস টাইমে বাসে এত ভিড় যে, বাসে উঠিনি। আর এই পা নিয়ে কী করে তাড়াতাড়ি হাঁটি বলো?”
“ভিড়ের জন্য বাসে উঠিসনি? আবার ঢপ মারছিস? পিঁপড়ের পিছন টিপে গুড় বের করে খাওয়া পাবলিক তুই। বাসে উঠবে। সেই টাকাও তুই ঝাড়বি। আমি চিনি না তোকে!” পাখিদা কথা শেষ করে নাক দিয়ে একটা বিরক্তিসূচক আওয়াজ বের করল।
লালু বলল, “কী করব পাখিদা! টাকার দরকার আমার। অনেক টাকার।”
“কেন, কী করবি অনেক টাকা দিয়ে? ক্রিকেটের টিম কিনবি? আমি কিন্তু তোকে টু পারসেন্টের বেশি দিতে পারব না,” পাখিদা সতর্ক গলায় বলল।
লালু দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল নিজের মনে। যে যার ধান্দায় আছে। বলল, “বাদ দাও। কাজটা সেরে নিই।”
ব্যাগ থেকে এবার ট্যাব বের করল লালু। কাল পাখিদা কয়েকজন ছেলের ছবি পাঠিয়েছিল ওকে। ম্যাডাম সেখান থেকে একজনকে পছন্দ করে দিয়েছে। ট্যাব অন করে সেই ছবিটা ও দেখাল পাখিদাকে।
পাখিদা জিজ্ঞেস করল, “পৌঁছে যাবে। তুই এনেছিস টাকা?”
“হ্যাঁ,” লালু, ম্যাডামের দেওয়া খামটা বের করে দিল।
পাখিদা খামটা খুলে দেখল। তার পর লালুকে ওর টাকাটা দিয়ে বলল, “শুধু ম্যাডামের কাট নিয়ে তোর কত দিন চলবে? আরও ক্লায়েন্ট জোগাড় কর। ম্যাডামের তো বিউটি পার্লার আছে। সেখানে তো ভাল ভাল ক্লায়েন্ট আসে। তাদের ধর। আরে, বিজনেস এক্সপ্যান্ড না করলে কী করে হবে?”
লালু প্রথমে ট্যাবটা ঢোকাল ব্যাগে, তার পর টাকাটা বুক পকেটে ঢুকিয়ে বলল, “কী যে বলো! আমাদের পার্লার ওরকম জায়গা নয়। ম্যাডাম জানতে পারলে ক্যালাবে!”
পাখিদা বলল, “জানতে পারবে কেন? তুই গান্ডু নাকি? তোকে আমি ক্যাটালগ পাঠিয়ে দেব। চুপচাপ দেখাবি। আমি টু পারসেন্ট দেব আমার টাকা থেকে। কিন্তু তুই এক্সট্রা হাজার, দু’হাজার চার্জ করতে পারলে তোর উপরি হবে।”
লালু বিরক্ত হল এবার, “এ সবের দালালি করব এখন?” “কেন, খারাপ কী! বিজনেস তো!” পাখিদা রাগে মাথা নাড়াল, “আমি কোন বাড়ির ছেলে জানিস? জানিস, একসময় আমাদের ক’টা হাতি ছিল? আমাদের বাড়িতে বড়লাট কতবার এসেছে জানিস? তাও আমি এই কাজ করি। কারণ, এটা বিজনেস। ডিমান্ড আর সাপ্লাইয়ের বিজনেস।”
লালু চুপ করে রইল। সবাই সব কিছু বুঝবে না। বেকার বুঝিয়ে লাভ নেই। এমনিতেই ওর মাথা-ফাথা ঠিক নেই, কী বলতে কী খিস্তি-ফিস্তি দিয়ে দেবে, পাখিদার প্রেস্টিজ গ্যামাক্সিন হয়ে যাবে! তার চেয়ে এখান থেকে সরে পড়াই ভাল।
লালু বলল, “আমি আসি। আমার কাজ আছে!”
“তুই আর তোর ভাটের কাজ! কাজ মারাচ্ছে, শালা! বলে দালালি। এই যে টাকা নিচ্ছিস সেটা কিসের টাকা রে? দালালির নয়? শুয়োরের বাচ্চা বলে কিনা দালালি! যা, পাঠাব না ছেলে তোর ম্যাডামকে। যা পারিস করে নে,” পাখিদা আচমকা খেঁকিয়ে উঠল।
লালুর কী যে হল হঠাৎ মাথার মধ্যে! শুয়োরের বাচ্চা! ওর বাপ-মা তুলে আবার খিস্তি করা! সবাই ওকে বাজে কথা বলবে! বাপ-মা তুলবে। আর ওকে সহ্য করতে হবে! কেন? কী অন্যায় করেছে ও?
লালু আচমকা বুক পকেট থেকে কমিশনের টাকাটা বের করে দলা পাকিয়ে ছুড়ে মারল পাখিদার মুখে। তার পর চিৎকার করে বলল, “রাখ তোর টাকা শুয়োরের বাচ্চা! তোর টাকায় মুতি আমি! বড় বাড়ির ছেলে! তোর পূর্বপুরুষ ব্রিটিশদের পা চেটে রোজগার করেছে আর এখন তুই মদ্দাদের পা চাটছিস। বেশি বললে না, তোর ওই পুরনো কঙ্কালের মতো বাড়িতে গিয়ে সব ফাঁস করে দেব। ছেলে সাপ্লাই করে বাঞ্চোত আবার বেশি বাতেলা! হারামি শালা!”
পাখিদা প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়ে কী বলবে বুঝতে পারল না। চোখ-মুখ লাল করে তাকিয়ে রইল।
লালু বলল, “আর, ফের বাজে কথা বললে না পেছনে বাঁশ দিয়ে সারা কলকাতায় প্ল্যাকার্ডের মতো ঘোরাব। টাকা নিয়েছিস, ছেলে সাপ্লাই করবি। জানিস তো, ম্যাডামের কত বড় হাতা গলার মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে আখরোট টেনে বের করে আনবে। শুয়ার কা বাচ্চা। ভাগ এখান থেকে!”
লালু কথা শেষ করেই সামনে দাঁড়ানো একটা বাসে কোনও মতে উঠে পড়ল। বাসটা ছেড়েও দিল সঙ্গে সঙ্গে। লালু বাসের দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, “ছেলে পাঠিয়ে দিবি পাখি! দালালির টাকা নিয়েছিস মনে রাখিস। না হলে তোর পাখি কী করে ওড়াতে হয় দেখবি বাঞ্চোত!”
লালু দেখল, রাস্তার লোকজন পাখিদার দিকে তাকিয়ে আছে। পাখিদা মাটি থেকে লালুর ফেলে দেওয়া টাকা কুড়োচ্ছে। লালুর বুকে একটা শাস্তি এল যেন। বাপ-মা তুলে কথা বলছে! সাহস কত!
বাসটা চলছে এখন। ভিড়ের মধ্যে পাশের সিট থেকে একজন বয়স্ক লোক বকের মতো গলা বাড়িয়ে বলল, “কী কেস ভাই?”
লালু তাকাল লোকটার দিকে। তার পর বলল, “খুব অসভ্য কেস দাদু। ওই লোকটা ছেলে সাপ্লাই করে। পুরুষ বেশ্যা। হেভি ফিগার। বুঝলেন? লাগবে আপনার?”
লোকটা থতমত খেয়ে বলল, “এ সব কী কথা!”
“চুপচাপ সিটে বসুন তা হলে। কোথায়, কী, কেন? এত কৌতূহল কিসের? বাড়িতে টিভি নেই? সেখানে সন্ধেবেলা ঝগড়া দেখে মন ভরে না?” লালু খড়খড়ে গলায় বলল। তার পর কন্ডাক্টরের দিকে একটা কুড়ি টাকার নোট বাড়িয়ে একই ফোর্সে গড়গড় করে বলল, “সোনাগাছি যাব। সেই ভাবে টিকিট দাও।”
লালু দেখল, গোটা বাসের লোক ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে হাঁ করে! লালু মাথা নাড়াল। তার পর জোরে জোরে বলল, “শালা, এরা মানুষ!”
বারান্দায় আজ বেশ ভিড় হয়ে আছে। না, কাস্টমারদের ভিড় নয়। স্বপ্না, বৈশাখী, দীপা, কোয়েল-সহ আরও কয়েকজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর সবার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কমলাদি। সবার মুখেই উদ্বেগ। সবাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকলেও, সবার চোখ অঞ্জনার ঘরের দিকে।
ব্যাপারটা কী! লালু একটু দ্রুত এগোল ঘরের দিকে। ওকে দেখে কমলা সরে এল।
লালু জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার? তোমরা সব এখানে? আজ কাজে বসেনি কেউ?”
কমলা বলল, “আরে, বলিস না! মেয়েটার আজ খুব শরীর খারাপ। বুঝিসই তো। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার এসে কী সব ইনজেকশন দিল। তার পর এখন কিছুটা ঠিক আছে। ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। এই অবস্থায় কিছু করা যায় নাকি! আমাদের টাকার দরকার। তাই বলে অমানুষ তো নই কেউ! আমি চেষ্টা করেছি। সমিতিতে গিয়েছি। আশপাশে বলেছি অনেককে। লাখ দেড়েক টাকার মতো উঠতে পারে। কিন্তু আপাতত তো পাঁচ লাখ লাগবে। তার পর আরও ছয়-সাত। দেড় লাখে তো কিছু হবে না, তাই না?”
লালু চোয়াল শক্ত করল। তার পর আস্তে আস্তে ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দেখল, বিছানায় ঘুমিয়ে আছে ছুটি। পাশে ছলছলে চোখে বসে অঞ্জনা। লালু ঘরের মধ্যে ঢুকল।
কমলা বুঝল, ওদের এবার একা থাকতে দেওয়াই ভাল। সে সবাইকে এক রকম তাড়িয়ে নিয়েই চলে গেল ওখান থেকে। শুধু যাওয়ার আগে বলে গেল, কিছু দরকার হলে যেন একবার হাঁক দেয়।
মাথার ওপর কিচকিচ শব্দ করে ফ্যান চলছে। ঘরের মধ্যে আলোও কম। একটা ডিম লাইট জ্বলছে দরজার ওপর।
লালু গিয়ে দাঁড়াল বিছানার পাশে। ছুটির ঘুমন্ত, আবছা মুখটা দেখলে কে বলবে মেয়েটার এরকম শরীর খারাপ! অঞ্জনা তাকাল এবার।
অল্প আলোতেও লালুর বুঝতে অসুবিধে হল না যে, মেয়েটা খুব কেঁদেছে! লালু গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এত কিছু হয়ে গেল, আমায় ফোন করোনি কেন?”
অঞ্জনা হাসল। ম্লান হাসি। বলল, “কী হবে? তুমি ডাক্তার? কিছু করতে পারবে? তা ছাড়া আমার ব্যাপার আমাকেই সামলাতে হবে।”
“তোমার ব্যাপার মানে?” লালু আস্তে করে বসল বিছানার এক পাশে। “মানে, ছুটি আমার মেয়ে। ওর তো বাপ নেই। তাই বাপও আমি। ওর যা কিছু তার দায় আমার। তার জন্য আমায় যা করতে হয় করব। তোমাকে এর মধ্যে জড়াতে চাই না,” অঞ্জনা কথাগুলো বলে চোখ সরিয়ে নিল।
“আশ্চর্য কথা বলছ তো! এর মানে কী!” লালু ভুরু কুঁচকে তাকাল অঞ্জনার দিকে, “আমি কেউ না? আমি তোমার কেউ না অঞ্জনা?”
“না, কেউ না,” অঞ্জনা মৃদু, কিন্তু নিশ্চিত ভাবে বলল।
লালু কী বলবে যেন বুঝতে পারল না। বুকের মধ্যে কেমন একটা কষ্ট হচ্ছে ওর। অঞ্জনা ওকে এ ভাবে বাতিল করে দিল! কিন্তু ও করলটা কী? অঞ্জনা যদি জানত ও টাকার জন্য কী লাঞ্ছনা সহ্য করেছে! যদি জানত কী ভাবে এখন প্রতি মুহূর্তে ও নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, আচমকা আসা একটা সুযোগ নেবে কি নেবে না এই ভেবে! যদি অঞ্জনা জানত রূপবানের কথা!
অঞ্জনা বলল, “আমি মোটামুটি পাঁচ লাখ টাকার একটা ব্যবস্থা করেছি। মানে, প্রাথমিক ভাবে কথা হয়েছে। এখনও পাকাপাকি হ্যাঁ বা না বলিনি। কিন্তু আজ যা হল, আর আজ ডাক্তারবাবু যা বলে গেল, তার পর আর ভাবার সময় নেই। হ্যাঁ বলে দিতেই হবে।”
লালু অবাক হল, “পাঁচ লাখ টাকা! তুমি বন্দোবস্ত করেছ! কী করে? আর কী কাজ করবে যে, এত টাকা তোমায় দেবে কেউ?”
অঞ্জনা একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল, “সিনেমা করব।”
“সিনেমা!” লালু হাঁ হয়ে গেল।
“হ্যাঁ। ছোট ছোট। সব মিলিয়ে বারোটা। আধ ঘণ্টা করে। মোট পাঁচ লাখ দেবে,” অঞ্জনা কপালের ওপর পড়ে থাকা চুলটা সরিয়ে কানের পিছনে নিল।
লালু ভুরু কুঁচকে সামান্য গলা তুলে বলল, “কী? কী সিনেমা?”
“আস্তে কথা বলো। ছুটি ঘুমোচ্ছে!” অঞ্জনা চাপা গলায় ধমক দিল। তার পর বলল, “ব্লু ফিলিম। এই লাইনে নেমেছি যখন, তখন অত ঘোমটা দিলে হবে না। আর আমার টাকার দরকার। সে দিন একজন এসেছিল। কাস্টমার নয়। অন্য একজন। নাম মোহনবাবু। সে-ই বলেছে। কয়েক দিন আগেই ব্যাপারটা হয়েছিল। তার পর আবার ফোন করেছিল জানার জন্য যে, আমি কী বলব। আর তার সঙ্গে বার বার জিজ্ঞেস করেছিল আমার বা কারও আপত্তি আছে কি না। আমি বলে দিয়েছিলাম, কারও আপত্তি নেই। কে আছে আমার যে আপত্তি করবে! কিন্তু তাও সে বলেছে কারও আপত্তি থাকলে তার সঙ্গে যেন কথা বলে নিই। কারণ, সে টাকা ঢালবে, পরে যেন কেউ এসে ঝামেলা হুজ্জতি না বাঁধায়– সেটাই নিশ্চিত করে নিতে চায়। আমি বলেছি ভেবে জানাব। কিন্তু বুঝতে পারছি যে, দেরি করা যাবে না আর।”
“মোহনবাবু! তুমি ঘরে লোক নিচ্ছ?” লালু অবাক হল।
“না নিচ্ছি না। সে আমায় আঙুল দিয়ে ছুঁয়েও দেখেনি। মেয়ের এই অবস্থায় ঘরে লোক নেব! সে এসেছিল এই কাজের জন্যই। এই অফার দিতেই,” অঞ্জনা বলল, “কোথা থেকে খবর পেয়েছে কে জানে! কিন্তু ভগবানই যেন পাঠিয়ে দিয়েছেন।”
“ভগবান না শয়তান! তুমি ও সব নোংরা ছবি করবে!” লালুর মাথায় যেন আগুন লেগে গেল। ও ভাবতেই পারছে না অঞ্জনা ক্যামেরার সামনে ওই ভাবে দাঁড়াবে।
“কেন? আমি ঘরে লোক নিই না?” অঞ্জনা খর গলায় বলল।
“আমি চাই না তুমি লোক নাও। কিন্তু কথা তো শোনো না আমার। আর দুটো এক জিনিস নয়। আর শোনো, এমন সিনেমা আমি মরে গেলেও তোমায় করতে দেব না। কিছুতেই না,” লালু উঠে দাঁড়িয়ে জেদের গলায় বলল।
“কেন করতে দেবে না? তুমি কে জোর করার? আমার মেয়ে যখন, আমিই টাকা জোগাড় করব। দরকারে সবার সামনে জামাকাপড় খুলতে হলেও খুলব,” অঞ্জনা জেদের সঙ্গে বলল।
“আমি বলছি, তুমি অমন করবে না!” লালু অঞ্জনার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“কী অধিকারে এ সব বলছ তুমি? কে দেবে টাকা? তোমার মুরোদ আছে?” অঞ্জনা হিসহিসে গলায় বলল।
“কী অধিকারে? কী অধিকারে?” লালু ফুঁসতে ফুঁসতে আচমকা অঞ্জনার মাথার পিছনটা চেপে ধরে নিজের সামনে টেনে আনল, তার পর জোর করে অঞ্জনার ঠোঁটে চেপে ধরল নিজের ঠোঁট। অঞ্জনা প্রথমে বাধা দিলেও পরমুহূর্তেই দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল লালুকে। তার পর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল ওর ঠোঁট।
ফ্যানের কিচকিচ শব্দটা শোনা যাচ্ছে শুধু। লালুর কাছে যেন মুছে গিয়েছে আর সব কিছু। অঞ্জনাকে ও কিছুতেই ওই পথে যেতে দেবে না। কিছুতেই ওকে নামতে দেবে না ওই অন্ধকারে। ও দু’হাত দিয়ে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরল অঞ্জনাকে। বুঝতে পারল, ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অঞ্জনারও তাই। চুম্বনের সিক্ততায় মিশে যাচ্ছে অশ্রু।
কিছু পরে অঞ্জনা আলগা করে ছাড়ল লালুকে। কিন্তু লালু ছাড়ল না। অঞ্জনা ওর বুকের কাছে মাথা রেখে বলল, “তুমি বলো, আমি কী করব? মেয়েটাকে এই ভাবে মারা যেতে দেব? সরকারি ভাবে চিকিৎসা করালে কী হবে জানো না? সেই ভরসায় মেয়েকে ফেলে রাখব?”
লালু, অঞ্জনার চুলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে বলল, “আমি টাকার ব্যবস্থা করে দেব। তুমি ভেবো না। ওই লোকটাকে ফোন করার দরকার নেই। ও সব করার কথা মোটেও ভাববে না। আমি বেঁচে থাকতে তুমি ও সব করবে না।”
অঞ্জনা আলতো করে চিমটি কাটল লালুকে। বলল, “হুঁ! নিজেকে কী ভাবো? বীরপুরুষ, না প্রসেনজিৎ তুমি?”
লালু বলল, “দেখতেই পাবে আমি কে!”
রাতে খাওয়ার পর ঘরে এসে শুতে যাবে লালু, ঠিক তখনই ফোনটা আবার এল আজ। তাকিয়ে দেখল ফোনটার দিকে। রূপবান! কথা বলে এই কলটা কাটল লালু। কে এই লোকটা! ধূমকেতুর মতো কোথা থেকে এসে উদয় হল! আজকাল মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। কী শান্ত ভঙ্গিতে কথা বলে লোকটা।
ফোনটা হাতে নিয়ে ঝুম হয়ে একটু বসে রইল লালু। কী করতে যাচ্ছে ও! এটা তো ঠিক কাজ নয়! কিন্তু এ ছাড়া আর উপায়ই-বা কী আছে! অঞ্জনা আর ছুটির জন্য এ ছাড়া তো আর কোনও উপায়ই নেই ওর।
লালু উঠল। ফোনটা বারমুডার পকেটে ঢুকিয়ে দরজার চাবিটা নিয়ে টি-শার্টের বুক পকেটে রাখল। তার পর ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। কবির কাছে যেতে হবে ওকে।
কবির ঘরের দরজা খোলা আছে একটু। ওই ফাঁক দিয়ে ঘরের ভেতর থেকে লম্বা একটা আলো এসে পড়েছে বারান্দায়।
লালু দরজায় আলতো টোকা দিল।
“কে?” কবি জিজ্ঞেস করল।
লালু বলল, “আমি রে! আসব?”
“হ্যাঁ, আয়,” কবি ছোট্ট করে বলল।
কবির ঘরটা সুন্দর করে সাজানো। লালু দেখল, কবি বিছানায় বসে ফোনটা ঘাঁটছে। কী হয়েছে ছেলেটার? আজকাল কেমন যেন মুখচোখ শুকনো লাগে ওর। মনে হয় গোপন কোনও এক কষ্ট যেন ঘুণের মতো ওর ভেতরে সিঁদ কেটে চলেছে। এত চাপা ছেলে! কিছু বলে না। তাই কিছু বোঝাও যায় না।
লালু ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে বসল। দেখল, কবি তাকাচ্ছে না ওর দিকে। ফোনের মধ্যেই ডুবে আছে। লালু জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছিস তুই?” কবি কিছু না বলে মাথা নাড়ল শুধু। লালু বলল, “ঢপ মারছিস! মোটেও ভাল নেই তুই। সারাক্ষণ মুখটা কেমন যেন বাংলার পাঁচের মতো করে থাকিস। কেসটা কী বল তো? কী হয়েছে?”
কবি ফোনটা বন্ধ করে ওর দিকে তাকাল। তার পর বলল, “কিছু বলবি?”
লালু ঠোট চাটল একটু। শীতের শেষটায় খুব ড্রাই লাগে সব কিছু। ঠোঁট ফাটে খুব। চোখ জ্বালা করে।
কবি বলল, “কিছু বলার হলে বল। আমি শোব।”
“একটা দরকার আছে তোর সঙ্গে। একটু প্রাইভেট। তুই শুনবি?” লালু সঙ্কোচের সঙ্গে বলল।
“কী হল আবার?” কবি ভুরু কুঁচকে তাকাল। লালু বলল, “আগে সবটা শুনবি, তার পর ‘হ্যাঁ’ ‘না’ যা বলার বলবি, কেমন?”
কবি তাকিয়ে রইল। মানে, ও শুনছে লালুর কথা।
লালু চটি খুলে পা তুলে বসল বিছানায়। তার পর বলল, “আসলে ব্যাপারটা খুব প্রাইভেট আর আর্জেন্ট। তোর হেল্প লাগবে। তবে তার আগে একজনের সম্বন্ধে তোকে একটু বলে নিই। মানে, তার সম্বন্ধে আমি কিছু জানি না। কিন্তু প্রস্তাবটা সেই এনেছে। তাই তার নামটা তোর জানা দরকার।”
কবি জিজ্ঞেস করল, “কে? কী নাম?” লালু কোনও ভণিতা না করে বলল, “লোকটার নাম রূপবান।”
