শূন্য পথের মল্লিকা – স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

৩৫. ঝিরি

গাড়িটা সানুদার মানে সুন্দরদার। সুন্দর মাইতি । পার্টির বড় নেতা। গাড়িতে লাল আলো লাগানো আছে। সামনে পার্টির ফ্ল্যাগও রয়েছে ড্যাশ বোর্ডের ওপর। সানুদা ওর সঙ্গে চারটে ছেলেকেও দিয়ে দিয়েছে। বলা যায় না বীরেন্দ্রর লোকজন যদি পালটা কিছু করে!

এখন সকাল সাড়ে দশটা বাজে। লকডাউনের কলকাতা বেশ ফাঁকা। সামান্য কিছু লোকজন রাস্তায় ঘুরছে। এত ফাঁকা শহর কোনও দিন দেখেনি ঝিরি। ও মুখের মাস্কটা ভাল করে তুলে নিল। ড্রাইভারের পাশেই বসেছে ও। সকাল থেকে আজ সুন্দরদার কাছেই বসেছিল। বীরেন্দ্রর মৃত্যুর খবর আসার বেশ কিছু পরে এই গাড়িতে করে বেরিয়েছে!

সানুদা ঝিরিকে বলছিল, “তুই ভাল কাজ করেছিস। যদিও আর-একটু হলেই ভেস্তে যেত। উদয়বাবু শেষে বুঝেছেন যে, এই লোককে পার্টিতে নিলে আরও সমস্যা হবে। তাই আমার প্ল্যানে আর বাধা দেননি। তবে ভয় ছিল আমার। আমি ভেবেছিলাম কাজে দেরি হলে উদয়বাবু না আবার পাল্টি খেয়ে যায়! জানিস তো আমরা পাল্টি খেতে ওস্তাদ!”

কথাটা বলে সানুদা নিজেই শব্দ করে হেসেছিল। ঝিরি চুপচাপ বসেছিল ওর সামনে। একটা লোক নেই। খুন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ও জানে এতে কারও কিছু এসে যাবে না। টিভিতে হল্লা হবে কিছু দিন। দ’একটা ছুটকো-ছাটকা ছেলেপিলেকে ধরবে। তার পর সব চাপা পড়ে যাবে। ঝিরি বা সুন্দর অবধি কারও হাত পৌঁছোবে না।

সানুদা বলেছিল, “দেখ আমি বারবার দল চেঞ্জ করি। অন্য দল থেকে বীরেন্দ্রর দল। সেখান থেকে চেঞ্জ করে উদয়জির দল। সব ঠিক আছে। আমি যা করি সোজাসুজি। আর নিজের লোকের গায়ে হাত দিই না। কী নোংরা লোক এই বীরেন্দ্র, ভাব! নিজের মেয়েকে না হলে কেউ মেরে দেয়! আর আমার বহু দিনের রাগ ছিল হারামিটার ওপর। আমায় কী করেছে দেখছিস তো! এই হাত, চোখ! শালা! তা ছাড়া আমার ইয়ং বয়সে আমার এক ঘনিষ্ঠ দাদাকেও মারিয়েছিল মালটা! তাকে মুড়াপোঁতায় আমার প্রথম পলিটিকাল কেরিয়ারের গুরু বলতে পারিস। পরে আমি দল চেঞ্জ করে বীরেন্দ্রর দলে চলে এলেও, সেই গুরুর প্রতি সম্মানটা তো আর যায়নি! শালার ওপর বহু দিনের রাগ আমার। সেবার ডাইরেক্ট চেষ্টা করলাম, মালটা বেঁচে গিয়েছিল। কিন্তু… তুই ভাল কাজ করেছিস ঝিরি।”

“মুড়াপোঁতা!” ঝিরি সোজা হয়ে বসেছিল। এই গ্রামের নামটা যে ওর খুব চেনা! ও জিজ্ঞেস করেছিল, “কী নাম ছিল সেই লোকটার?”

“জগন্নাথ ঘোষ। খুব কাজের লোক ছিল রে! মানুষের জন্য কাজ করত লোকটা,” সানুদার গলাটা সামান্য ম্লান লেগেছিল।

“জগন্নাথ ঘোষ!” ঝিরির সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, “ডার্ক কমপ্লেকশন? ভাল স্বাস্থ্য? বিড়ি খেত খুব?”

“তুই চিনিস?” সুন্দর হাঁ করে তাকিয়েছিল ঝিরির দিকে।

ঝিরি মাথা নিচু করে নিয়েছিল। বীরেন্দ্র লোকটা জগন্নাথমামার খুনের পিছনে ছিল! তা হলে সেই যে কিশোর বয়সে মনখারাপ আর রাগের মুহূর্তে ও ভাবত, জগন্নাথমামার খুনের প্রতিশোধ নেবে একদিন, সেটা এ ভাবে ঘটে গেল জীবনে! নিজের অজান্তে! এ জীবন কী অদ্ভুত! কে এ ভাবে সব মিলিয়ে দেয় জীবনে! ঈশ্বর! ঈশ্বর বলে কি সত্যি কেউ আছে?

সুন্দর এসে আলতো করে হাত দিয়েছিল ওর কাঁধে, “ভাল মানুষ ছিল রে লোকটা। আমি দল বদলে অন্য পার্টিতে চলে গেলেও ভালবাসত আমায়।”

ঝিরি ঘড়ি দেখেছিল। বলেছিল, “যাক গে, তুমি টাকাটা দাও। ওদের কাছে পৌঁছে দিই।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, রেডি আছে। তবে আরও অল্প টাকায় কাজটা করলে পারতিস!” সানুদা হেসে প্রসঙ্গ পাল্টে নিজেকে যেন খানিকটা জোর করেই ওই অতীতের মুহূর্ত থেকে বের করে এনেছিল।

ঝিরি বলেছিল, “তোমাদের তো টাকার অন্ত নেই। ক’টা গরিব মানুষ একটু টাকা পাবে, তাই নিয়েও এত দরাদরি কেন সানুদা! বাচ্চাটার কথা তোমায় বলিনি? পাপী আমরা সবাই। তার মাঝে ভাল কাজ না-হয় একটু করলে। ক্ষতি কী?”

“আরে, আমি এমনি বললাম। তুই হলি আমার ইনিয়েস্তা! তোর ওপর কথা চলে!” সানুদা একটা টোট ব্যাগ এগিয়ে দিয়েছিল পাশের সোফা থেকে তুলে। বলেছিল, “আমি গাড়ি আর ছেলে দিয়ে দিচ্ছি। লকডাউন শুরু হয়েছে। পুলিশ ঝামেলা করলে বা বীরেন্দ্রর লোকজন হামলা করলে সামলে নেবে।“

“আর ডাক্তারের ব্যাপারটা?” ঝিরি জিজ্ঞেস করেছিল।

66 “সেটাও আমি বলে রেখেছি। যতটা সম্ভব সস্তায় চিকিৎসা করে দেবে। ওদের বলবি বাচ্চাটার জন্য আর কিছু দরকার হলে যেন বলে। তুই ডাক্তারের ঠিকানা আর ফোন নাম্বার চেয়েছিলিস, এটা রাখ । আমি কথাও বলে রেখেছি,” সানুদা হেসেছিল।

“হাসলে কেন?” ঝিরি অবাক হয়েছিল।

“এই তোকে দেখে। তুই কী রে? একা থাকিস। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলো করিস। সঙ্গে সঙ্গে এমন কাজও করিস। আবার কার কোথায় চিকিৎসা দরকার, সেটাও মাথায় রাখিস। সত্যি বল তো, তোর কেসটা কী?” সানুদা তাকিয়েছিল ওর দিকে।

ঝিরি হেসে বলেছিল, “আমি নিজে বুঝতে পারলে তোমাকেই প্রথম বলব সানুদা। আপাতত আমি শেষ কাজটুকু সেরে নিই। কেমন?”

গাড়ি যাচ্ছে প্রায় জনশূন্য কলকাতা দিয়ে। শহরটাকে যেন চেনা যাচ্ছে না। লোকজন না থাকলে পৃথিবীর যে-কোনও জায়গাকেই ভূতুড়ে লাগে! ঝিরি ভাবল, বিন্দি কী করছে এখন? ওর কন্ট্রিবিউশনও তো কম নয়। টাকাটা ওকেও পৌঁছে দিতে হবে। তবে সেটা ও নিজে যাবে না। বিন্দি বলেছে সরাসরি ওকেও দিতে হবে না। শোভাবাজার মেট্রোর পাশে সেই মাধুর পানের দোকান আছে। তার কাছে পৌঁছে দিলেই হবে। কিন্তু তিনদিন হল বিন্দির ফোন বন্ধ। মেয়েটা নাকি দেশে গিয়েছে। কেন!

খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে এই বিন্দি। লালুকে ওই তো এগিয়ে দিয়েছিল ঝিরির দিকে।

ঝিরিও সেই সন্ধেবেলা লালুকে সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছিল বীরেন্দ্রকে হত্যা করার। বলেছিল, “লালুবাবু, এই কাজের জন্য তোমাকে কুড়ি লাখ টাকা দেব!”

লালু ঘাবড়ে গিয়েছিল। ভয় পেয়েছিল। কিন্তু একেবারে না করে দেয়নি।

ঝিরিকে বোঝাতে হয়েছিল আর-একটু সময় নিয়ে। ওকে বলতে হয়েছিল যে, বীরেন্দ্র মারা যাবেই আজ নয় কাল। কিন্তু সেটাতে সাহায্য করলে এই টাকাটা ও পাবে।

লালু কিছু পরে বলেছিল, “আমি সরাসরি না মেরে যদি মারার ব্যবস্থা করে দিই। তা হলে আপনারা…”

“করে দাও,” ঝিরি বলেছিল, “বীরেন্দ্রকে একা পাওয়া যায় না। ওকে কোথায় কখন একা পাওয়া যাবে বলে দাও।”

লালু কাঁপা হাতে সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিল, “আমার টাকাটা দেবেন তো? মানে এত টাকা!”

ঝিরির হাসি পেয়েছিল। কুড়ি লাখ নাকি অনেক টাকা! এদের ধারণা নেই রাজনীতিতে কত টাকা ওড়ে। কী পরিমাণ টাকা এদিক-ওদিক হয়।

ও বলেছিল, “কাজ ফাইনাল করো। একসঙ্গে টাকা পেয়ে যাবে।”

তার পর থেকে লালু সময় সময় খবর দিত ওকে। বিন্দিও দিত। কিন্তু বিন্দি, লালুর ব্যাপার জানলেও লালু, বিন্দির ব্যাপারে জানত না।

কাজ কিছু এগোনোর পরে লাল ওকে বলেছিল, কাজ কিছু এগোনোর পরে লালু ওকে বলেছিল, “আমি কবিকেও এর মধ্যে নেব। মানে, ওকে ব্যবহার করব। কিন্তু আপনাকে কথা দিতে হবে ওর কোনও ক্ষতি আপনারা করবেন না।”

ঝিরি বলেছিল, “আমাদের কথা ওকে জানাবে না। জেনো, আমাদের ক্ষতি না হলে ওরও ক্ষতি হবে না ।”

বুকপকেট থেকে ডাক্তারের কার্ডটা বের করে দেখল ঝিরি। সানুদাকে বলে রেখেছিল মেয়েটার চিকিৎসার ব্যাপারটা। সানুদা বলেছিল, “কাজটা সামলে দে, আমি ওটার ব্যবস্থা করে দেব। বলে দেব যাতে খরচটা কম হয়।”

গতকাল রাতেই ঝিরি ফোন পেয়েছিল লালুর। লালু সংক্ষেপে বলেছিল, “আপনি যেমন চেয়েছিলেন, হয়ে যাবে। কালকেই ভোরে। গঙ্গার ঘাটে।”

ঝিরি শান্ত গলায় বলেছিল, “সেটা এখন জানাচ্ছ!”

লালু বলেছিল, “আমি এই মাত্র জানলাম। সঙ্গে দু’জন মাত্র থাকবে। একজন বুলা। লাল চুল আর একজন…”

“কবি,” ঝিরি বলেছিল।

লালু বলেছিল, “আপনি যেমন বলেছিলেন সেটা যেন মনে থাকে। কবি যেন বেঁচে থাকে। ওকে যেন…”

ঝিরি বলেছিল, “সে সব কথা তো হয়েই গিয়েছে। তবে ওকে আহত হতে হবে। না হলে মুশকিল আছে।”

লালু বলেছিল, “আমি কি তা হলে কনফার্ম ধরে নেব?”

“হ্যাঁ,” ছোট্ট করে বলেছিল ঝিরি।

“আর আমার টাকাটা?” লালু জিজ্ঞেস করেছিল।

“ঠিক জায়গায় পৌঁছে যাবে,” ঝিরি বলেছিল, “তুমি জেগে থাকো। আমি আবার ঘণ্টা দুয়েক পরে ফোন করব।”

“ঠিক জায়গা মানে?” লালু জিজ্ঞেস করেছিল।

ঝিরি বলেছিল, “তোমার তো ওই একটাই ঠিক জায়গা। অঞ্জনা আর ছুটি।”

ফোনটা কেটে ঝিরি আর সময় নষ্ট করেনি। আর একটা ফোন করেছিল সানুদাকে। বলেছিল, ও এখনই আসছে। কাল সকালেই কাজ সারতে হবে। আর সময় নেই।

ওদের বাড়ির কাছেই ভজনদা থাকে। গাড়ি ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা আছে লোকটার। তার থেকে গাড়ি ভাড়া নেয় ঝিরি। গতকাল রাতেও নিয়েছিল। বলেছিল ইমার্জেন্সি। ওকে পৌঁছে দিয়ে চলে এলেই হবে।

ভজনদার ড্রাইভার ছিল না। ভজনদা নিজেই গাড়ি চালিয়ে ওকে মাঝরাতে পৌঁছে দিয়েছিল সানুদার বাড়িতে।

নিজের বিশাল সাজানো বসার ঘরে সানুদা অপেক্ষা করছিল ঝিরির জন্য। ওকে দেখে ব্যস্ত হয়ে বলেছিল, “কাল কাজটা হবে তো? আমি ব্যবস্থা করে রেখেছি তোর কথা মতো।”

ঝিরি ধীরেসুস্থে বসেছিল সোফায়। বলেছিল, “হ্যাঁ হবে। আগের বারে অন্ধের মতো গিয়েছিলে বলে হয়নি। এবার আঁটঘাট বাঁধা হয়েছে। তবে একটা কথা। কবিকে মারা যাবে না। বুঝেছ?”

সানুদা চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, “আমার কাজ বীরেন্দ্রকে নিয়ে। ও শুয়োরের বাচ্চার জন্য আজ আমার একটা হাত অকেজো। একটা চোখে ভাল দেখতে পাই না। ওর কুত্তারা আমায় কেমন মেরেছিল আমি ভুলিনি। হোক পঁচিশ বছর পরে, তাও বদলা আমি নেবই। বাকিটা তুই যেমন বুঝবি।”

ঝিরি আর কথা না বাড়িয়ে ফোন করেছিল লালুকে। তার পর বলেছিল, “লালু, এবার শান্ত মাথায় ডিটেলটা দাও। কোথায় কখন আর ক’জন থাকবে। তাড়াহুড়ো নয়, শান্ত মাথায়। জেনো, এর ওপর ছুটির জীবনও নির্ভর করছে।”

সরু গলিটার মুখে বড় রাস্তার ওপর গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিল ঝিরি। পিছনে বসা চারটে ছেলেকে বলল গাড়িতেই থাকতে। তার পর ছোট ব্যাগটা নিয়ে নামল রাস্তায়।

লকডাউন হলেও দু’-একটা দোকান খুলেছে। মানুষ টুকটাক জিনিসপত্র কিনছে। ঝিরিও কিনল। একটা বড় চকোলেট। তার পর সরু গলির মধ্যে ঢুকে গেল।

গলিটা এখন ফাঁকা। রোদ ঢোকে না বলে ছায়া ছায়া। আশপাশের বড় বড় পাঁউরুটি রঙের বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে। লকডাউন এই পাড়ার মানুষের জীবিকার ওপর যে খুব বড় একটা প্রভাব ফেলবে, সেটা জানে ঝিরি।

সামনের বাড়িটা আজ কেমন যেন নিঃঝুম। পাশের চায়ের দোকানটা বন্ধ। লোকজন নেই সেরকম। দু’একজন এদিক-ওদিকে ছায়ায় বসে টুকটাক কথা বলছে। আশপাশে কয়েকটা কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে সরু সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল ঝিরি। ওকে সকালে একবার ফোন করেছিল লালু। ঝিরি, লালুকে বলেছে চিন্তা না করতে। তার পর লালু আর ফোন করেনি।

আজ টানা বারান্দায় বেশ ভিড়। তার মধ্যে বৈশাখীকেও দেখতে পেল ঝিরি। কিন্তু মেয়েটা ওকে চিনতে পারল না। ঝিরির মাথায় আজ টুপি আর মুখে মাস্ক আছে বলেই বোধহয়! ঝিরি দেখল, বৈশাখী হাতে চায়ের কাপ নিয়ে একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে।

দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের মধ্যে অনেকেই ঘুরে দেখল ঝিরিকে। কিন্তু কেউ খুব একটা গা করল না। ঝিরি সবাইকে কাটিয়ে গিয়ে দাঁড়াল অঞ্জনার দরজার সামনে। দরজাটা খোলা। পর্দা উড়ছে। ভেতরে অঞ্জনার গলা পাওয়া যাচ্ছে!

ঝিরি দরজায় টোকা দিল।

“কে?” অঞ্জনা জিজ্ঞেস করল। তার পর একটু সময় নিয়ে উঠে এল। পর্দা সরিয়ে দাঁড়াল ঝিরির সামনে।

ঝিরি বুঝল, ওকে এমন পোশাকে চিনতে পারেনি অঞ্জনা। ও মাথার টুপিটা খুলে মাস্কটাকেও সামান্য সময়ের জন্য সরিয়ে তাকাল অঞ্জনার দিকে।

অঞ্জনার চোখ দুটো বড় হয়ে উঠল। মুখে অপ্রস্তুত ভাব। তবে সে চিনতে পেরেছে!

অঞ্জনা সামান্য হাসার চেষ্টা করল। তার পর বলল, “ও আপনি! আসলে কাজটা আর করতে পারব না। তাই ফোন করিনি। একজন মানে… তার আপত্তি আছে… তাই…”

ঝিরি হাত তুলল। তার পর পকেট থেকে ডাক্তারের কার্ডটা বের করে ব্যাগ-সহ সেটা বাড়িয়ে দিল অঞ্জনার দিকে।

অঞ্জনা অবাক হয়ে তাকাল, “কী এটা? আমায় দিচ্ছেন কেন?”

“ব্যাগে কুড়ি লাখ টাকা আছে। লালু পাঠিয়েছে। আর এই কার্ডটা রাখুন। ডাক্তারের ঠিকানা আর ফোন নাম্বার আছে। কথা বলে নেবেন। অনেক কমে চিকিৎসা হয়ে যাবে ছুটির।”

“টাকা! এত!” ব্যাগটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অঞ্জনা, “এ সবের মানে কী! আর লালু! আপনি লালুকে চেনেন? কী ভাবে?”

ঝিরি বলল, “রাখুন টাকাটা। দরকার পড়বে। আর সব মানে নাই-বা জানলেন।”

“মা, কে এসেছে গো?”

ঝিরি দেখল, ছোট একটা মেয়ে আলুথালু কোঁকড়া চুল নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে অঞ্জনার পাশে। বাচ্চাটাকে দেখেই অসুস্থ লাগছে। তাও চোখ দুটো উজ্জ্বল। ছুটি।

ঝিরি হাট গেড়ে বসে চকোলেটটা বাড়িয়ে দিল ছুটির দিকে। তার পর বলল, “আমি তোমার এক মামা। এই নাও এটা তোমার।”

ছুটি চকোলেটটা নিয়ে হাসল। দু’গালে গভীর টোল জেগে উঠল। ঝিরির ইচ্ছে হল মেয়েটার মাথায় একটু হাত দেয়। কিন্তু দিল না। বাইরে থেকে এসেছে! বাইরে মারণ ভাইরাস ঘুরছে। মানুষকে মানুষের থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ভাইরাস!

ঝিরি উঠে দাঁড়াল। বলল, “অঞ্জনা আমি আসি।”

“আপনি, আপনি ঠিক কে বলুন তো?” অঞ্জনা বিহ্বল গলায় জিজ্ঞেস করল।

ঝিরি মাথায় টুপিটা পরে নিয়ে বলল, “আমি কেউ নই। আপনারা ভাল থাকবেন।”

ওদের অবাক দৃষ্টির সামনে থেকে চলে এল ঝিরি শুধু আজ জগন্নাথমামার কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে সেই টিয়া পাখিটার কথাও। মাঝে মাঝে মানুষের এমন কিছু ঘটনা মনে পড়ে যে, সে নিজেও বোঝে না বর্তমানের সঙ্গে ঠিক কী তার যোগাযোগ।

বড় রাস্তায় বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠল ঝিরি। তার পর পাশে বসা ড্রাইভারকে বলল, “এবার বাড়ি যাব। মাখনপুর।”

বিকেলে ঘুম থেকে উঠে চারিদিকটা আজ কেমন যেন লাগল ঝিরির। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও! এখন ক’টা বাজে! কাল সারা রাত জেগেছিল ঝিরি। সঙ্গে টেনশনও গিয়েছে খুব। তাই বাড়ি ফিরে কোনও মতে একটা কেক আর জল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর এই উঠল।

বাইরে আলো কমে এসেছে। পাখিদের বড্ড চেঁচামেচি চলছে আজও। সারা দিন পরে ফিরে এসে ওরা বোধহয় এই সময়টায় একে-অপরকে সারা দিনের অভিজ্ঞতার কথা বলে ।

ঝিরির মনটা একটু নত হয়ে আছে। আজ একটা মানুষ মারা গিয়েছে। হ্যাঁ, প্রত্যক্ষ ভাবে ওর হাত না থাকলে, পরোক্ষ ভাবে তো ছিলই। তবে এটা প্রথম , নয়। এর আগেও এমন কাজ করতে হয়েছে ওকে। পলিটিকাল ফিক্সার ও। কত ধরনের কাদা-ময়লা যে ওকে ঘাঁটতে হয়! তা-ও যে দিন কেউ মারা যায়, ওর মনটা বিষণ্ন হয়ে থাকে ।

ঝিরি বিছানা থেকে উঠল। পায়ে হাওয়াই চটি গলিয়ে নামল মেঝেতে। এই বাড়িতেও আর বেশি দিন নেই ও। টাকা দিয়ে ওই বোসবাবুদের বাড়িটা বুক করে নিয়েছে। সার্চিং-এও সব ঠিক আছে। এবার বাকি টাকাটা দিয়ে রেজিস্ট্রি করার অপেক্ষা। কিন্তু এখন এটাও ভাবছে ঝিরি যে, অত বড় বাড়িতে একা কী করবে ও! আর এ সব ছেড়ে সেই ফুলের ব্যবসা, সেটাও কি করবে? কার জন্য করবে?

টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে দেখল ঝিরি। সাড়ে পাঁচটা বেজে গিয়েছে। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মতো ঘুমিয়েছে। তাও রাতের ঘুম তো নয়! রাতে ঠিক মতো ঘুম না হলে শরীর ঠিক লাগে না ওর। মাথাটাও ঝিমঝিম করে। এখন যেমন করছে।

নীচে প্রতুলবাবুর চিৎকার শুনল ঝিরি। বাচ্চাদের বল আবার ঢুকে এসেছে বাগানে। হাসি পেল ওর। লোকটা স্বার্থপর দৈত্যের বাগান সাজিয়ে বসেছে। বীরেন্দ্রও তো সাজিয়ে বসিয়েছিল। কিন্তু কী হল! মানুষ এত লোভ, এত ‘আমার আমার’ করে, কিন্তু কেন? সব ছেড়ে তো চলে যেতে হবেই। এ খেলা যে ভাঙবেই।

“আসব?” দরজায় শব্দ হল একটা।

ঝিরি ঘুরে তাকাল। দেখল, দরজা ঠেলে এসে দাঁড়িয়েছে রিপা। হাতে চায়ের কাপ-প্লেট।

ঝিরি হাসল। সামান্য বিষণ্ণ হাসি। সেই স্কুলের সামনে দেখা হওয়ার পর থেকে ওর আর কথা হয়নি রিপার সঙ্গে। আসলে সে দিন ওই ভাবে অটোয় উঠে মেয়েটা চলে যাওয়ার পরে ঝিরিই আর কথা বলেনি। কী হবে বলে! যে ও ভাবে চলে যায় তাকে কী বলবে ও!

রিপা ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তার পর এগিয়ে এসে কাপ-সহ প্লেটটা রাখল টেবিলে।

ঝিরি দেখল, রিপা বেশ গম্ভীর হয়ে আছে। তাতে ওকে আজ যেন আরও সুন্দরী লাগছে। বুকের মধ্যে আবার কেমন যেন কোদালের কোপ পড়ল একটা। এই মেয়েটা অন্যের হয়ে যাবে!

রিপা এবার তাকাল ওর দিকে। মুখ থমথমে। চোখে চাপা রাগ। ঝিরি অবাক হল। রাগ করেছে কেন! আবার কী করল!

ঝিরি আবহাওয়া ঠিক করার জন্য বলল, “আবার চা! প্রতুলবাবু আছেন তো নীচে!”

“তো?” রিপার গলায় ঝাঁঝ!

“রাগ করবেন,” ঝিরি ছোট্ট করে বলল।

“সারা পৃথিবীর সব লোকের রাগের ঠেকা নিয়ে বসে আছ দেখছি!” রিপা ঝামড়ে উঠল, “আর আমি তো মানুষ নই! তাই না?”

ঝিরি চায়ের কাপ-প্লেট হাতে তুলে বলল, “তোমার রাগ দেখার লোক আছে তো!”

“না, কেউ নেই,” রিপা বলল।

“কেন? সেই যে বোনের গান পাঠায়! ‘ফুড ফ্যাক্টরি’র অখাদ্য খাবার খাওয়ায়! ভাল ছেলে,” ঝিরি মাটির দিকে তাকিয়ে বলল।

রিপা বলল, “ভাল ছেলেই তো! খুব ভাল ছেলে। তোমার মতো অহঙ্কারী, জেদি, নির্লিপ্ত নয়!”

“সেটাই বললাম তো। সেই তো আছে,” ঝিরি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“না, কেউ নেই,” রিপা গম্ভীর ভাবে বলল আবার। “নেই? কেন?” ঝিরি অবাক হয়ে তাকাল ওর দিকে।

রিপা বলল, “কারণ, আমার মাথাখারাপ। আমার ভাল জিনিস ভাল লাগে না। আমার বাজে, নিষ্ঠুর, নির্লিপ্ত লোকটাকে ভাল লাগে। তার সঙ্গে ঝগড়া করতে ইচ্ছে করে। তাই দিয়েছি রাধানাথকে দূর করে!”

ঝিরির মাথার মধ্যেটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল হঠাৎ। কী বলল রিপা! এটা কী বলল!

বাইরে আলো কমে এসেছে আরও। ঘরের আলো জ্বালানো নেই, তাই বেশ আবছায়া। তার মধ্যেও রিপাকে যে কী সুন্দরী লাগছে! ঝিরির বুকের মধ্যে কেমন একটা করছে। বুঝতে পারছে যারা এত দিন মাটি কুপিয়ে এসেছে, তারা এবার সেই কোপানো মাটিতে চারাগাছ পুঁতছে। জল দিচ্ছে। তাই শান্ত লাগছে শরীরটা। ভাল লাগছে সব কিছু!

খোলা জানলা দিয়ে হাওয়া আসছে। তাতে রিপার চুল উড়ছে। হালকা শ্যাম্পুর গন্ধ ভেসে আসছে ওর কাছে। গন্ধের অদ্ভুত এক বন্ধন থাকে। বাঁধা পড়ে গিয়েছে ঝিরি। ও বুঝতে পারছে আর বেরোনোর উপায় নেই। কুম্ভ ভাই লড়াই গুটিয়ে নিয়েছে।

ঝিরি নিজেকে সামলাল তা-ও। এমন করা ওর পক্ষে ঠিক নয় ।

ও মাথা নিচু করে কাপ থেকে চা ঢালল প্লেটের ওপর। একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে বলল, “ভেবে বলছ তো?”

ওর হাত থেকে প্লেটটা এবার নিয়ে নিল রিপা। বলল, “অনেক দিন আগেই সব চিন্তাভাবনা হয়ে গিয়েছে আমার। আমি তোমার মতো ভিতু নই,”

তার পর বাকি চা-টা প্লেট থেকে চুমুক দিয়ে খেয়ে নিল।

ঝিরি কাপটা রাখল টেবিলে। তার পর একটু এগিয়ে আলতো করে হাতটা ধরল রিপার।

রিপা বলল, “মেয়েদের স্কুলের অত কাছে বাড়ি কেনা! দেখাচ্ছি মজা। ওই বাড়িতে আমি কাউকে ঢুকতে…”

ঝিরি, রিপার কোমরে হাত দিয়ে ওকে আলতো করে টেনে আনল নিজের কাছে। তার পর ওকে আর কিছু বলতে দিল না।

জানলা দিয়ে হাওয়া আসছে খুব। অভিমানী নদীর জল ছুঁয়ে আজ হাওয়া আসছে সব এলোমেলো করে দিতে। পাখিদের কিচিরমিচির কি বাড়ল! আর-একটা দিন শেষ হয়ে এল আকাশের বুকে। নাকি শুরু হল আর-একটা জীবন!

ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে রিপা ওর বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে রয়েছে এখন। ঝিরি ওকে জড়িয়ে ধরে আলতো করে ওর মাথায় হাত রাখল। ভাবল, যত দিন এইটুকু আছে, তত দিন মানুষ আছে। সামনে হয়তো খুব ভয়ের দিন আসছে। কষ্টের দিন আসছে। কিন্তু ভালবাসাটুকু থাকলে মানুষ সেটাও পার করে যাবে ঠিক।