বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৪

।। চার।।

ড্রাঙ্কেন ড্রাইভিং আর নার্কোটিক্স—এই ডেডলি কম্বিনেশনের অ্যাটাক যে এই উকিল মহিলার মেয়ের ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশনের জন্য আদালতে ওর বিরুদ্ধে লিথাল এভিডেন্স হবে সেটা নমিতা বেশ ভালই বুঝতে পারছে। কিন্তু যেটা নমিতা বুঝতে পারছে না তা হলো এখানে ওর ভূমিকাটা কী? কত গোছগাছ করা বাকি আছে। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চট করে সময় দেখল নমিতা।

আমার সত্যি আপনার সাহায্য চাই ড. স্যান্যাল, মিস বসাক বললেন। ‘দেখুন মিস বসাক, আমার আপনার প্রতি পুরো সিম্প্যাথি আছে, কিন্তু আমার সাবজেক্ট বাংলা। বায়োলজির রিসার্চ সম্বন্ধে জ্ঞান একদম জিরো। কথায় আছে না মোল্লা বলে গীতা-মনু, অন্ধ বলে রামধনু, অনেকটা সে’রকম। কোনো নলেজ নেই। আপনাকে সাহায্য করব কীভাবে? আর লিগ্যাল মারপ্যাঁচের ব্যাপারেও আমার কোনো নলেজ নেই।’

‘ড. স্যান্যাল, আমি জানি আপনি সায়েন্টিফিক রিসার্চ সম্বন্ধে এক্সপার্ট নন। সেই ফিল্ডে আপনার হেল্প আমাদের দরকার নেই। কিন্তু আপনি জানেন খনা নামে একজন বিদুষী মহিলা ছিলেন তার কথা।

‘খনা!’ নমিতা অবাক। ‘এখানে খনা কোত্থেকে আসছে?’

‘বলছি,’ অ্যাডভোকেট বসাক চায়ে চুমুক দিয়ে চায়ের কাপটা সরিয়ে রাখলেন। ‘বাল্টিমোরের অ্যামফার্মার ‘ভেনম’ এর যে পেটেন্ট আছে তা হল গন্ধনাকুলী নামে একটা উদ্ভিদের শেকড়ের অ্যালকয়েডস এক বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রিজার্ভ করে বাজারে বিক্রি করার। এই গন্ধনাকুলীর ট্রিটমেন্ট আমাদের দেশে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। গুল্মটা ভারতের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে পাওয়া যায়। আগে চব্বিশ পরগনা, হাওড়া, হুগলির মাঠে মাঠে চার পাঁচ ফুট উঁচু এই গুল্ম দেখা যেত। কিন্তু এই গাছ এখন আর বেশি দেখা যায় না। সাহেবরা নিজেদের দেশে বাপের জন্মে এই গুল্ম দেখেছে কিনা সন্দেহ। অথচ ওষুধের পেটেন্টটা পকেটস্থ করা চাই ওদের। সুশ্রুত কোর্টে বলেছে যে বাংলায় গন্ধনাকুলী গাছ বহুকাল থেকে সাপের বিষের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে আসছে। উদাহরণ হিসেবে সুশ্রুত একটা আটপৌরে বই থেকে একটা খনার বচন আদালতে পেশ করে,’ অ্যাডভোকেট বসাক ওঁর চামড়ার ব্রিফকেস খুলে একটা সস্তা পেপারব্যাক চটি বই বের করলেন। নমিতা দেখল বইটার নাম ‘বেহুলার খনা’। বইয়ের একটা পাতায় পেজ মার্কার দেওয়া ছিল, পৃষ্ঠাটা খুলে দেখালেন মিস বসাক। নমিতা দেখল একটা পদ্য—

ছোট চান্দা বড় চান্দা
কী হবে তোর দড়ি বান্ধা
বৃথা গেল সাপের ফনা
বাঁচল নকুল কহে খনা।

‘বুঝলাম না,’ নমিতা বলল।

‘ছোট চান্দা বা চাঁদড় হল রাওউলফিয়া সারপেনটিনা বা গন্ধনাকুলীর পাড়া- গাঁয়ের নাম, আর বড় চাঁদড় হল রাওউলফিয়া ক্যানেসিনস। আগেকার দিনে সাপে কামড়ালে ক্ষতস্থানের উপরে শক্ত করে দড়ির গিঁট বেঁধে দেওয়া হতো যাতে সাপের বিষ মাথায় না উঠতে পারে। প্রথম দু’লাইন এর অর্থ হল ছোট চাঁদড় আর বড় চাঁদড় থাকতে দড়ি বাঁধার কোনো প্রয়োজন নেই। এরাই সাপের বিষের মোক্ষম ওষুধ। এখানে নকুলের নাম জুড়ে দেওয়া। গন্ধনাকুলীকে বলা হয় নকুলেষ্টা। মানে বেজির ইষ্ট বা হিতকারী। সাপে-নেউলে যখন লড়াই হয় তখন হঠাৎ যদি সাপের ছোবল বেজির গায়ে লাগে, বেজি তৎক্ষণাৎ এই গন্ধনাকুলীর গাছের ঝোপে ঢুকে পড়ে গুল্মের গোড়ায় গিয়ে শিকড় চিবোয় আর সেখানে গড়াগড়ি দিয়ে বিষ বের করে। এটা তো পাড়াগাঁয়ের অনেকেই জানে। তাহলে আমেরিকান কোম্পানিই এই ওষুধ আবিষ্কার করেছে এই দাবি কীভাবে করে? এটা তো আমাদের অজানা কিছু না, শুধু ডকুমেন্টেড নেই তাই। কিন্তু ‘বেহুলার খনা’ বইটা আরুষির হাতে আসে। একজন হকার ট্রেনের কামরায় বিক্রি করছিল।

‘আচ্ছা!’ নমিতার মনে তখনও কিছু প্রশ্ন জেগে। ‘খনার বচন! কিন্তু এই চার লাইনের কবিতা দেখে কি কেউ মানবে যে এটা ওষুধের ফর্মুলা?’

‘পেটেন্ট ক্লেইম অ্যাপ্রুভ করার আগে পেটেন্ট এক্সামিনাররা একটা জিনিস দ্যাখে তা হল নভেলটি। মানে, এই আবিষ্কার সম্বন্ধে দেশের জনসাধারণ অনেক দিন ধরেই জানে কিনা। পেটেন্ট পেতে গেলে একদম নতুন আবিষ্কার হতে হয়। খনার এই বচন বলছে যে এই গন্ধনাকুলী ব্যবহার করে এদেশে সাপের বিষের ওষুধ বানানো হতো। খনার বচন প্রাচীন কাল থেকেই ঘরে ঘরে প্রচলিত, তাই—’

‘তাহলে তো আপনাদের সমস্যার সমাধান হয়েই গেল। আমাদের বাংলাদেশের এত প্রাচীন ঐতিহ্য—’

মুখের তালুতে জিভ দিয়ে ক্ল্যাক ক্ল্যাক করে দু’বার নঞর্থক অর্থবহ আওয়াজ করলেন অ্যাডভোকেট মিস বসাক ‘এখানে দুটো প্রবলেম আছে। এই ‘বেহুলার খনা’ বইটাতে বেহুলা নামের এক এইটিন্থ সেঞ্চুরির বিদুষী লিখেছে জ্যোতিষী খনার জীবন সম্বন্ধে। এই বইতে অনেক খনার বচন ছাপিয়েছে, তাদের ব্যাখ্যা করেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে বেহুলা নিজের জীবনের কিছু ঘটনা, আই মিন, কীভাবে বেহুলা খনার এসব পুঁথি পেল এসব সম্বন্ধে লিখেছে। কিন্তু এখানে এমন কিছু উদ্ভট উদ্ভট কাহিনি সে লিখেছে যে বিরোধী পক্ষের উকিল বলেছে যে বেহুলার কথা একদম বিশ্বাস করা যায় না।’

‘কী উদ্ভট কাহিনি লিখেছে বেহুলা?’

‘আপনি পড়লে নিজেই বুঝতে পারবেন, মিস বসাকের গলায় হতাশা। আর তার চেয়েও সিরিয়াস প্রবলেম হল এই কপিটা ছাপানো হয়েছে ২০১৭ সালে, আর অ্যামফার্মার পেটেন্ট হয়েছে ২০১৫-তে। অ্যামফার্মার উকিল বলছে যে শুধু ওদের পেটেন্টটাকে আটকাবার জন্যই এই খনার বচন লিখে বই ছাপানো হয়েছে। ম্যালিশিয়াস ইনটেনশন।’

‘তা কি সম্ভব নাকি? খনার বচন তো ঘরে ঘরে বাঙালি জানে।’

‘বাঙালি জানে, কিন্তু অ্যামফার্মা বলছে খনার কোনো হিস্টোরিক্যাল এভিডেন্স নেই। আগের হিয়ারিংয়ে অপোজিং কাউন্সিল ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার একজন এক্সপার্টের এফিডেভিট রিপোর্ট সাবমিট করেছে। সেই এক্সপার্ট বলেছে যে খনা বলে কেউ ছিলই না। খনা হচ্ছে রূপকথা। গ্রাম্য গুজব। অ্যামফার্মা সেই এক্সপার্টকে ট্রায়ালে উইটনেস হিসেবে হাজির করছে।’

‘বাব্বা! এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সিটি?’

‘পয়সা আছে, তাই ঢালতে পারছে। এ লড়াই হল ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই। আমাদের দেশের ওষুধের কোম্পানিটা ওদের তুলনায় নিতান্ত চুনোপুঁটি। আরুষির দাদু সুব্রত মিশ্র আরুষির এই লড়াই ফাইনান্স করতে গিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন।

‘আরুষির বাবা?’

‘ওর বাবার সত্যিকারের DUI হয়েছিল। মদ খেয়ে নেশায় চুর হয়ে গাড়ি চালাচ্ছিল। হেড অন কলিশন। স্পট ডেড। সেই ঘটনা আরুষিকে এত প্রভাবিত করেছিল যে আরুষি কক্ষনো মদ ছুঁতো না, মিস বসাক হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন।

‘আমি সরি, মিস বসাক,’ নমিতা সমবেদনা জানাল।

‘থ্যাঙ্কস, আর সেজন্যই আমি বিশ্বাস করি না যে আরুষি DUI করতে পারে, ‘ মিস বসাক যেন আবার জেগে উঠলেন। তবে হ্যাঁ, ক্যালিফোর্নিয়ার সেই এক্সপার্টের এলেম আছে এটা স্বীকার করতেই হবে। আমি ওঁর এক্সপার্ট রিপোর্টটা আজ প্লেনে পড়েছি। ভদ্রলোক বাঙালি। খুব ইমপ্রেসিভ! ওদের স্বপক্ষে যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে গেছে এটা প্রমাণ করতে যে খনা একটা রূপকথা।’

‘খনার সম্বন্ধে বলছে? কে এই বাঙালি এক্সপার্ট?’

‘ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের চেয়ার ড. পৃথুযশ ভৌমিক।’

‘ড. পৃথুযশ ভৌমিক!’ নমিতার দু’চোখের তারা ফুলে টেনিস বল।

‘আপনি চেনেন?’

‘বাপরে! উনি তো মস্ত স্কলার। প্রথিতযশা পণ্ডিত। হায়ার সেকেন্ডারিতে আর্টসে ফার্স্ট, বিএ, এমএ-তে অল্পের জন্য গোল্ডমেডেল হাতছাড়া হয়ে গেছিল। দুর্ধর্ষ অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার। আমার সিনিয়র। আমি যখন প্রেসিডেন্সিতে ঢুকছি, তখন ও পাস করে বেরোচ্ছে।’

‘তাই নাকি? আপনার সঙ্গে আলাপ আছে?’

‘নাঃ, ভীষণ দেমাক ছিল ওর। গটগট করে হেঁটে চলে যেত। আমাদের মতো সাধারণ মেয়েদের দিকে তাকাতোই না’

কথাটা অসমাপ্ত রাখল নমিতা ‘যাক ওসব ছাড়ুন। তারপর বলুন কী লিখেছেন উনি।’

‘উনি রিপোর্টে লিখেছেন যে খনা একটা মিথ। খনা বলে সত্যি কেউ ছিল না। আর ওঁর রিপোর্টকে এনডোর্স করেছেন একজন বিখ্যাত আমেরিকান ইন্ডোলজিস্ট—নাম ড. হেনরি গ্যালাগার।

‘পৃথুযশ ডিবেটে তুখোড় ছিল। কলেজে ডিবেটে ওকে হারানো একপ্রকার অসম্ভব ছিল। ওর বন্ধুরা বলতো বাংলা ছেড়ে তুই ল’ পড়, তুই উকিল হলে খুব নাম করবি। ওর হোম-ওয়ার্ক অনবদ্য। ও যদি কোর্টে আসে এমন তৈরি হয়ে আসবে যে হি উইল স্টিল দ্য শো।’ নমিতা জোর দিয়ে বলল।

‘সেখানেই তো সমস্যাটা,’ অ্যাডভোকেট চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকাল। আপনি যদি ড. পৃথুযশ ভৌমিকের এক্সপার্ট রিপোর্টটা স্টাডি করে ওগুলোর মধ্যে কী কী ভুল আছে সেগুলো ধরিয়ে দেন, তবে খুব উপকার হয়। উনি লিখেছেন যে ‘বেহুলার খনা’ বইটার কিছু ইভেন্ট অসম্ভব। মোদ্দা কথা আমাদের প্রুফ করতে হবে যে খনা বাস্তবে ছিলেন এবং ‘বেহুলার খনা’ বইতে লেখা সবকিছু ইভেন্ট হওয়া সম্ভব। আপনি আমাদের ফাইনাল ডকুমেন্টের ওই সেকশনটা বানিয়ে দিন। তাছাড়া ড. পৃথুযশ ভৌমিক ট্রায়ালে টেস্টিফাই করবে। আমি চাই ট্রায়ালে আপনি আমার এক্সপার্ট হিসেবে টেস্টিফাই করুন কোর্টে।’

‘কোর্টে পৃথযশের বিরুদ্ধে?’ নমিতার মুখ দেখে মনে হলো অ্যাডভোকেট বসাক তাকে মাথায় কালো বস্তা পরিয়ে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়াবার প্রোপোজাল দিচ্ছে।

‘আমি ড. গ্যাসাগারের সিভি দেখলাম, উনি একসময় কলকাতায় এসে অনেকদিন ছিলেন। আপনি ড. গ্যালাগারকে চেনেন?’

‘খুব ভালো করে,’ নমিতা বলল। ‘বিটুইন ইউ অ্যান্ড মি, পৃথুযশ হার্ভার্ডে পোস্টডক-এর জবটা পেয়েছিল এই ড. গ্যালাগারের রেকমেন্ডেশনে। দু’জন স্টলওয়ার্টের বিরুদ্ধে আমি! না না, এ লড়াই তো ফাইটিং আ লুজিং ব্যাটল। আমি এর মধ্যে নেই।’

‘লড়তে তো আমাকে হবেই ড. স্যান্যাল। জিততেও হবে। বিদেশি কোম্পানি এখানে এসে দাদাগিরি করে যাবে সেটা আমি কিছুতেই হতে দেব না। আপনি শুধু প্রমাণ করিয়ে দিন যে খনা বাস্তবে ছিলেন। জ্যোতিষশাস্ত্রের একজন বিদুষী।’

‘জ্যোতিষ-ফোতিষের আবার বিদুষী কী?’ নমিতার কণ্ঠস্বরে অবহেলা। ‘দেখুন মিস বসাক, সোজাসুজিই বলি তাহলে,’ নমিতা কথার মাঝে কথা বলল। ‘আমি ছাত্রাবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টির হার্ডকোর সদস্য ছিলাম। জ্যোতিষ-টোতিষে আমি কোনোদিনই বিশ্বাস করি না। আপনি বলছেন এবং আমিও কিছুটা জানি যে খনার অনেক বচন হল ফলিত জ্যোতিষের। কিন্তু আমার দৃঢ়বিশ্বাস জ্যোতিষশাস্ত্র হল বুজরুকি। তাই খনার বচন আমি যে খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি তা নয়। অতএব খনার সম্বন্ধে লড়াই করার জন্য আমি রাইট ক্যানডিডেট নই। আপনারা অন্য-’

‘খনার জ্যোতিষশাস্ত্র ঠিক কি ভুল তা আপনাকে প্রমাণ করতে বলছি না, ড. স্যান্যাল। আমরা শুধু প্রমাণ করতে চাই যে খনা মিথ না, খনা রিয়্যাল। আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে খনা বলে রিয়্যালি কেউ ছিল। একজন অত্যাচারিত বিদুষী বাঙালি মহিলার এক্সিস্টেন্সকেই অস্বীকার করা হচ্ছে, এটা কি ঠিক?’

ঠিক আছে আপনার কথা মানছি যে সেটা মোটেই ঠিক না। কিন্তু এবার বলুন হোয়াই মি? আমি কেন?’

‘আপনি ইতিহাস ও প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের একজন অথরিটি। আমি আজ নার্সিংহোমে বসে অ্যাকাডেমিক সার্কিটে যার সঙ্গেই এ ব্যাপারে কথা বলেছি সকলেই একবাক্যে আপনার নাম বলেছে।’

আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে সকলেই নিজেরা কেটে গেছে, বিড়বিড় করে বলল নমিতা। তবে এটা গ্যারান্টি যে পৃথু্যুশকে হারাবার যোগ্যতা আমার নেই। নমিতা দায়সারা ভাবে বলল, ‘দেখুন মিস বসাক, আমি প্রচণ্ড ব্যস্ত মানুষ। আমার আর্টস ফ্যাকাল্টির কাজ শেষ করতে করতেই প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটা-আটটা বেজে যায়। এত বড় একটা ইউনিভার্সিটির আর্টস ফ্যাকাল্টির দায়িত্ব আমার কাঁধে, সেটা সামলাতে গিয়েই হিমশিম খাচ্ছি। আমার সময় কোথায়? আর তাছাড়া সামনের দু’সপ্তাহ আমি ভেকেশনে—’

‘সময় আপনাকে একটু বের করতেই হবে, ড. স্যান্যাল। নাহলে এক বছরের মধ্যে গন্ধনাকুলীর পেটেন্টের লাইসেন্স আমাদের নাকের ডগা দিয়ে বেচে তার রয়্যালটি খাবে অ্যামফার্মা। আপনি কি তা চান?’ অ্যাডভোকেট বসাক এবার রাইটিং প্যাডটা ব্রিফকেসে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন, ‘বাইরের দেশে একাডিমিয়া ইন্ডাস্ট্রির রিসার্চে প্রচুর হেল্প করে। আপনারাও একটু দেশের জন্য চেষ্টা করুন না। সবাই মিলে দেখি দেশের সম্পদ বাঁচানো যায় কিনা।’

নমিতার মনে ধরল কথাটা। ও অ্যাডভোকেট বসাককে বলল, ‘আচ্ছা দেখি আমরা কতটা করতে পারি। কিন্তু হাতে তো সময় খুবই কম—’

‘টু উইকস। আপনি এই বইটি রাখুন। আমার কাছে আরেকটা কপি আছে।’ অ্যাডভোকেট বসাক ‘বেহুলার খনা’ বইটা নমিতার ডেস্কে রেখে ব্রিফকেস থেকে চেকবই বের করে বললেন, ‘আপনাকে কত অনারেরিয়াম দেব বলুন?’

‘টাকা?’ নমিতা চেকের দিকে তাকিয়ে বলল। ‘না না, আমি লাইফে এসব কাজ করিনি। টাকার কথা এখন থাক। ওটা পরে দেখা যাবে।’

‘ঠিক আছে, যেমন আপনার ইচ্ছা,’ অ্যাডভোকেট বসাক চেক ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে রাখলেন। ‘আপনাকে একটা ব্রেক-থ্রু ইনফরমেশন দিতে চাই সো দ্যাট ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু রিইনভেন্ট দ্য হুইল।’

‘বলুন।’

‘এই বইটার পাবলিশার ‘দি বটতলা পাবলিশার্স’। ভুয়ো নাম। এই নামে কোনো পাবলিশিং কোম্পানি নেই। আমি খোঁজখবর করে জেনেছি যে এই বইটা হকাররা ট্রেনের কামরায় কামরায় কিংবা প্ল্যাটফর্মে ঢেলে বিক্রি করে। আর গগন ঢালি নামে ট্রেনের একজন হকার এই বইয়ের ডিস্ট্রিবিউটর।’

‘আচ্ছা! তাহলে গগন ঢালির সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না?’

‘সুব্রত মিশ্ৰ অনেক খুঁজে গগন ঢালির মোবাইল নম্বর জোগাড় করে আমাকে দিয়েছেন। আমি আপনার কাছে আসার আগে আজ ওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। আমি জিজ্ঞাসা করেছি এই বইটার ম্যানুস্ক্রিপ্ট ওকে কে দিয়েছে? তার সঙ্গে আমার দেখা করাতে পারে কিনা ও? প্রথমে ও গুঁইগাঁই করে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছিল। আমি তখন আমার পরিচয় দিয়ে বললাম কোর্টে একটা কেসে ওর বই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ও আমাকে সাহায্য না করলে ওকে কোর্টে ডাকা হতে পারে। তখন একটু ঘাবড়ে গেল। আমি বললাম ভয়ের কিছু নেই, ওর যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সে আশ্বাস দিলাম। আমার সঙ্গে ও দেখা করতে রাজি হয়েছে। আমাকে বলেছে কাল এগারোটার সময় আহিরীটোলা ঘাটের কাছে অপেক্ষা করতে। যার থেকে ও ম্যানুস্ক্রিপ্ট পেয়েছে তার কাছে নিয়ে যাবে। জানি আপনারা ব্যস্ত মানুষ। যদি একটু ফ্রি করে নিতে পারেন নমিতা ওর আউটলুক ক্যালেন্ডার দেখল ‘ঠিক আছে। আমি যাব।’

‘গ্রেট,’ অ্যাডভোকেট বসাক খুশি হয়ে বললেন। ‘ড. স্যান্যাল, আপনি আমার চিন্তা অনেক লাঘব করে দিলেন, অ্যাডভোকেট বসাক উঠে দাঁড়ালেন। ‘কাল এগারোটায় আহিরীটোলা। আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছি। আমরা জিতবই। আপনাকে বলেছি এই ট্রায়াল আমার জীবনের সব থেকে ইম্পর্টান্ট ট্রায়াল। আমি প্রাণ দিয়েও আমার মেয়েকে ট্রায়ালে জেতাবো। আমার মেয়ের ওরা ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন করেছে, ওদের মাটিতে টেনে এনে নামাতে না পারলে আমার নাম মাধবী বসাক না।’

নমিতা নার্ভাস হাসি হাসল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছে এ পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু পৃথুযশ ভৌমিক মঙ্গল গ্রহের মানুষ। মহাকাশ থেকে তাঁকে আমাদের পৃথিবীর মাটিতে টেনে নামানো প্রায় অসম্ভব কাজ।