বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৩

।। তিন।।

৬ আগস্ট, ২০১৯

‘বায়োপাইরেসি!’

বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ‘ডিন অব আর্টস ফ্যাকাল্টি’ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে গত কয়েক মাস ধরে প্রায় রোজই নতুন নতুন জ্ঞানগর্ভ শব্দ নমিতার ভোকাবুলারিতে স্থান পাচ্ছে। আজ আরেকটা যোগ হল। বিকেলে বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে এমন সময় ওর অফিসের দরজায় উঁকি দিলেন অলিভ গ্রিন ট্রাউজার্স আর হাতা গোটানো অফ হোয়াইট শার্ট পরা, কাঁধে লুই ভাটানের চামড়ার ব্রিফকেস ঝোলানো, মাথার চুলে গাঁথা রে-ব্যানের সানগ্লাসেস, উচ্চবিত্ত অ্যাপিয়ারেন্সের এই মধ্যবয়স্কা মহিলা। পরিচয় দিলেন—মাধবী বসাক, দিল্লি হাইকোর্টের আইনজীবী। প্রথম দর্শনে মহিলাকে দেখেই অস্বস্তি হয়েছিল নমিতার। বয়স ওর মতোই আর্লি বা মিড ফিফটির হবে, মাথায় সোনালি হাইলাইট করা চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে, দু’গাল ভাঙা। টিয়াপাখির মতো টিকালো নাকের দু’পাশে চোখ দুটো এমনভাবে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে যে মনে হচ্ছে অক্ষিকোটরের পিছন থেকে যেন কেউ চোখের সাদা অংশটাকে জোরে ঠেলা মেরেছে। মহিলার শরীরে এক আউন্স এক্সট্রা ফ্যাট নেই। বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া চাহনি। একসেন্ট্রিক মনে হয়েছিল। এই অস্বস্তিকর দেখতে মহিলাকে এন্টারটেইন করাটা চরম ভুল হয়ে গেছে। আর নমিতা সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছে গত পনেরো মিনিট ধরে। মহিলা ননস্টপ দুর্বোধ্য এত বায়োলজি মেশানো আইনি শব্দ আউড়ে চলেছেন যে নমিতার নিজেকে নিরক্ষর মনে হচ্ছে। এ শব্দটা আগে শুনলেও ঠিক মনে করতে পারছে না বিষয়টা ঠিক কী? ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল নমিতা—‘বায়োপাইরেসি ব্যাপারটা ঠিক –?’

দিল্লির আইনজীবী মহিলার দু’চোখে সারাদিনের পরিশ্রমের ক্লান্তি ঝরে পড়ছে, কিন্তু ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে যায়নি—‘বিলিয়ন ডলারের বিজনেস। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির প্রাচীন জ্ঞানকে নিজেদের আবিষ্কার বলে চালাচ্ছে ইউরোপ আমেরিকার কিছু জায়েন্ট ড্রাগ প্রোডিউসিং কোম্পানি। আমরা বলি বায়োপাইরেসি, আর ওরা বলে বায়ো-প্রসপেক্টিং।’

‘ও আচ্ছা,’ আরেকটা জটিল শব্দ, নমিতা সাবধানে পাস কাটাতে চাইল।

কিন্তু এই মহিলা আইনজীবীর থামার কোনো লক্ষণই নেই বিদেশের কোম্পানিগুলো এরকম প্রায় পাঁচ হাজার পেটেন্ট ইস্যু করেছে আমাদের প্রাচীন মেডিসিনাল প্ল্যান্ট আর ট্র্যাডিশনাল সিস্টেমের ওপর। এর ভ্যালু কত জানেন?’

‘কত?’

‘প্রায় বারোশো ষাট কোটি টাকা।’

‘বারোশো হোয়াট!’ এবার নমিতার চোয়াল ফ্রিজ হয়ে গেল। নমিতা বুঝল ব্যাপারটার ইমপর্টেন্স। ‘আর ইউ কিডিং? আমাদের দেশ কিছু করছে না?’

‘করছে। ভারত সরকার প্রায় দু’লাখ প্রাচীন ভেষজকে পাবলিক প্রপার্টি বলে ডিক্লেয়ার করে বলেছে এগুলো যে কেউ ব্যবহার করতে পারবে, কিন্তু ব্র্যান্ড- নেম জুড়ে বিক্রি করতে পারবে না। তাছাড়া এসব ভেষজের একটা ডেটাবেস বানিয়ে ইউরোপিয়ান পেটেন্ট অফিসকে অ্যাকসেস দিয়েছে যাতে বায়োপাইরেসি বন্ধ হয়। কিন্তু ওরা বড় বড় সব কোম্পানি। আইনের অনেক মার-প্যাঁচ জানে, নানারকমভাবে ঘুরিয়ে নাক দেখিয়ে তাও পেটেন্ট নিয়ে চলেছে।’

ব্যাপারটা আরো গুলিয়ে গেল নমিতার। তার জন্য দিল্লি থেকে হাইকোর্টের উকিল কলকাতায় ওর কাছে কেন এসেছে? মহিলাকে এড়িয়ে যেতে চাইল নমিতা ‘ম্যাম, তাহলে আপনার বোধহয় বায়োলোজি ডিপার্টমেন্টে যাওয়া উচিত। বায়োসায়েন্স আর তাছাড়া আমি পরশু থেকে দু’সপ্তাহের ভেকেশনে স্পিতি ভ্যালি যাচ্ছি

‘আমাকে আপনি মিস বসাক বলতে পারেন,’ মহিলার ঠোঁটে ভদ্রতার হাসি। ‘আমি জানি আমি ঠিক জায়গাতেই এসেছি। একটা হিটেড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটসের মামলায় আপনার হেল্প খুবই দরকার, ড. স্যান্যাল, ‘ অ্যাডভোকেট বললেন। ‘এখানে একজনের লাইফ অ্যাণ্ড ডেথ সিচুয়েশনের জন্য আমায় আসতে হয়েছে। আমি শেষ রাতে বিছানা ছেড়ে আর্লি মর্নিং ফ্লাইট ধরে দিল্লি থেকে সাত-সকালে কলকাতা ছুটে এসেছি, তারপর সারাটা দিন— ‘

নমিতার তীব্র অনিচ্ছুক দৃষ্টি বোধহয় আইনজীবীর নজর এড়াল না। ‘আচ্ছা, আমায় আধ ঘন্টা সময় দিন? আপনাকে এই কেসের জেনেসিসটা একটু বোঝাই? প্লিজ? তারপর আমাকে হেল্প করবেন কী করবেন না দ্যাটস ইয়োর কল।’

মহিলার আবেদন নমিতা ভদ্রতাবশত অগ্রাহ্য করতে পারল না। ‘ঠিক আছে বলুন।’

‘অ্যামফার্মার নাম আপনি শুনেছেন?’

‘না, আমি সরি—’  

‘না না সরি কিসের। অ্যামফার্মা একটা বিখ্যাত আমেরিকান কোম্পানি। জায়েন্ট ড্রাগ প্রোডিউসার। বাল্টিমোরে হেড অফিস, আমেরিকা ইউরোপে ওদের সাতটা দেশে অফিস আর বিশাল বিশাল ল্যাবরেটারি আছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ওষুধ বিক্রি। লং স্টোরি শর্ট, আমেরিকার পেটেন্ট অফিস অ্যামফার্মাকে সর্পদংশনের বিষ প্রতিরোধের ‘ভেনম’ নামে একটা ওষুধের পেটেন্ট গ্র্যান্ট করে ২০১৫ সালে। অথচ আমাদের কলকাতারই একটা ছোট্ট আয়ুর্বেদ ওষুধের কোম্পানি ‘সুশ্রুত’ সর্পদংশনের বিষ প্রতিরোধের একই ওষুধ ‘বিষহরি’ ২০০৬ সাল থেকে বানিয়ে বাংলার বাজারে বিক্রি করে আসছে। ২০১৫ সালে অ্যামফার্মা পেটেন্ট পেতেই অ্যামফার্মার উকিল একটা ‘সিজ অ্যান্ড ডেসিস্ট’ নোটিস ধরিয়ে দেয় সুশ্রুতকে। বলে ইমিডিয়েটলি সুশ্রুতকে এই ওষুধের প্রোডাকশন এবং সেল বন্ধ করতে হবে। সুশ্রুত রাজি হয় না, কারণ সুশ্রুতের কাছে ড্রাগ কন্ট্রোলার অব ইন্ডিয়ার কম্পালসারি লাইসেন্স আছে। অ্যাকচুয়্যালি আমি জানি সুশ্ৰুত কোম্পানির একজন সায়েন্টিস্ট ওই ওষুধের সব কাগজপত্র নিয়ে ২০১৩ সালে আমেরিকা পালায়। সেই সায়েন্টিস্টই ওই কাগজ ও ফর্মুলা অ্যামফার্মাকে বেচে দেয়।’

‘ছিঃ!’ নমিতার গলায় নিন্দার স্বর। ‘বাঙালি সায়েন্টিস্ট?’

‘হ্যাঁ, নাম ড. তথাগত দাস। যাই হোক, সুশ্ৰুত বিক্রি বন্ধ করতে রাজি না হওয়ায় অ্যামফার্মা তখন ভারতের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাপিলেট বোর্ডের কাছে আবেদন করে যে সুশ্রুত তাদের পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট করেছে এবং সুশ্রুতকে আদেশ দেওয়া হোক যাতে ওরা এই ওষুধ বানাতে ও বিক্রি করতে না পারে। কিন্তু ইন্ডিয়ান ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাপিলেট বোর্ড অ্যামফার্মার সেই আবেদন নাকচ করে দেয়।’

‘পেটেন্ট থাকা সত্ত্বেও?’

‘পাবলিক ইন্টারেস্টে এটা করা যায়। বিদেশে ওষুধ তৈরির খরচা অনেক। তাই অ্যামফার্মার বাল্টিমোরে তৈরি ওষুধ বাংলার বাজারে এল আকাশ ছোঁওয়া দামে। ভাবতে পারেন বাংলার মফঃস্বলে এই ওষুধ সাড়ে ন’হাজার টাকায় বিক্রির জন্য ওষুধের দোকানে এল। ক’জন গ্রামের গরীব লোক এত টাকা দিয়ে ওষুধ কিনতে পারে? অথচ সুশ্রুত ‘বিষহরি’ মাত্র সাড়ে তিনশো টাকায় বাজারে বিক্রি করছিল।’

‘তারপর?’

‘এরপর ২০১৬ সালে অ্যামফার্মা কলকাতা হাইকোর্টে কেস করল সুশ্রুতের বিরুদ্ধে। ওরা সুশ্রুতের বিরুদ্ধে রয়্যালটি এবং লস অব বিজনেসের জন্য আট কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।’

খুব হেকটিক গেছে দিনটা, নমিতার ক্লান্ত মস্তিষ্ক এত ড্রাই টেকনিক্যাল কথাবার্তা রেজিস্টার করতে পারছিল না। নমিতা দায়সারাভাবে বলল, ‘আই সি। ঠিক আছে, কোর্ট তাহলে নিশ্চয়ই ফয়সলা করবে যে কে দোষী।’

‘হ্যাঁ, কলকাতা হাইকোর্টে প্রায় তিন বছর ধরে হিয়ারিং চলছে। এখন একজন নতুন জাজ এসে ট্রায়ালের ডেট দিয়ে দিয়েছে। দু’সপ্তাহ পরে ট্রায়াল। কুড়ি আর একুশে আগস্ট। কিন্তু কাল একটা মারাত্মক ব্যাপার ঘটেছে।’ অ্যাডভোকেট বসাক ব্রিফকেস থেকে আইপ্যাড বের করে ফটো অ্যালবামে গিয়ে নমিতাকে কয়েকটা ছবি স্ক্রল করে করে দেখালেন। ছবিগুলো দেখে নমিতা শিউরে উঠল।

প্রথম ছবিটা একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের। গাড়ির বাঁদিকটা একদম থেঁতলে গেছে। ‘ওঃ মাই গড়!’ নমিতা আঁতকে উঠে বলল। একদম পিষে দিয়ে গেছে!’

‘হ্যাঁ গাড়িটা চালাচ্ছিল সুশ্রুত কোম্পানির মালিক ডক্টর আরুষি মিশ্ৰ। ‘মালিক মেয়ে?’

‘কেন? হতে পারে না? মালিক সব সময় পুরুষই হতে হবে?’

‘না না তা বলিনি,’ লজ্জা পেল নমিতা। ‘আসলে সেরকম বেশি দেখা যায় না তো তাই।’

‘এই বত্রিশ বছরের বৈজ্ঞানিক মেয়ে আমেরিকান ড্রাগস জায়েন্ট অ্যামফার্মার সঙ্গে কোর্টে পেটেন্ট ইনফ্রিঞ্জমেন্ট কেস লড়ছে।’

‘লড়ছে, উনি কি বেঁচে আছেন?’

‘হ্যাঁ, ফরচুনেটলি। এখনো আইসিইউ-তে। আমি কাল রাতে খবরটা পেয়ে আজ সকালের ফার্স্ট ফ্লাইটে দিল্লি থেকে এসে সোজা নার্সিংহোমে চলে গেছিলাম। সারাটা দিন ছিলাম নার্সিংহোমে। এখন কন্ডিশন স্টেবল। কিন্তু বাঁ- পায়ের হাড়ে কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার, ডিসলোকেটেড কলার বোন, তাছাড়া কপালে ব্রুজ, উইন্ডশিল্ডের কাচের কুচি মুখে গেঁথে গেছিল।’ অ্যাডভোকেট বসাক দ্বিতীয় ছবিটা দেখালেন। নমিতা দেখল যেন ব্যান্ডেজে মোড়া একটা মিশরের মমি হাসপাতালের বিছানায় বাঁ পা স্লিং এ ঝুলিয়ে শুয়ে আছে।

‘কখন কোথায় হল এই অ্যাকসিডেন্ট?’ নমিতা বলল।

‘কাল রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ। বাইপাসে। একটা ট্রাক হঠাৎ রঙ রুটে উল্টোদিক থেকে এসে ওর গাড়ির বাঁদিকে ছুঁয়ে গেছে, তার ইম্প্যাক্টে—’

‘ড্রাইভার ধরা পড়েছে?’

‘না। হিট অ্যান্ড রান। কিন্তু পুলিশ বলছে অন্য কথা।’

‘কী বলছে পুলিশ?’

‘পুলিশ ড. আরুষি মিশ্রের বিরুদ্ধে ড্রাঙ্কেন ড্রাইভিং এর চার্জ এনেছে।’

‘ড. মিশ্র ড্রিঙ্ক করে ড্রাইভ করছিল?’

‘পুলিশের রিপোর্ট তাই বলে। তাছাড়া পুলিশ ড. মিশ্রের গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে নার্কোটিক ড্রাগস আবিষ্কার করেছে।’

খুব কমপ্লিকেটেড কেস, নমিতা ভাবল। তবে কোনো মন্তব্য না করাই সমীচীন বলে চুপ রইল।

‘এখানে একটা খটকা আছে। দু’দিন আগে ড. মিশ্রের সঙ্গে ওর নিজের উকিল আদিত্য মেহেতার খুব কথা কাটাকাটি হয় এবং ড. আরুষি মিশ্র ওর উকিলকে ফায়ার করেন।

‘ওর উকিলকে ফায়ার? মানে—আপনি ওঁর উকিল নন?’

‘ড. আরুষি মিশ্র আমার মেয়ে।’

‘আপনার মেয়ে?’ এবার নমিতার ঝটকা লাগল।

‘ওর বাবার পদবী মিশ্র। ওর বাবার সঙ্গে যখন আমার ডিভোর্স হয়েছিল তখন আরুষির পাঁচ বছর বয়স।’

‘সরি মিস বসাক,’ নমিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল থেকে কী চান?

‘বলুন আপনি আমার

‘যদিও আরুষি লড়ছে, কিন্তু ওর সামর্থ্য খুবই কম। দেশি ছোট কোম্পানিগুলো বিদেশী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এই লড়াই বেশিদিন টানতে পারে না।’

‘কেন?’

‘রিসোর্স,’ ভদ্রমহিলার মুখ ক্লান্তিতে, গরমে একদম শুকিয়ে গেছে। এত ঘোরাঘুরির বোধহয় অভ্যাস নেই। নমিতা ভদ্রতা করে বলল, ‘আপনি সারাদিন নার্সিংহোমে ছিলেন, ওখানে কিছু খেয়েছেন? কিছু খাবার আনাই?’

‘আয়্যাম গুড। দুপুরে স্যান্ডুইচ খেয়েছি। আর আমি খুব কম খাই।’

‘তাহলে চা?’

‘অসুবিধা না হলে, অ্যাডভোকেট বসাক খুশি হলেন।

‘আমার এখানে টি-ব্যাগ। কোনো অসুবিধা নেই।’ নমিতা কামরার কোণায় টেবিলে রাখা কাপে টি-ব্যাগ রেখে তাতে ইলেকট্রিক কেটলের গরম জল ঢেলে নিজের জন্য এক কাপ আর অ্যাডভোকেট বসাকের জন্য আরেক কাপ চা বানিয়ে নিজের চেয়ারে ফিরে এল। অ্যাডভোকেট বসাক এবার চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তারপর বললেন, ‘চায়ের দারুণ ফ্লেভার তো! দার্জিলিং টি?’

‘সিকিমের টেমি। ফার্স্ট ফ্লাশ।’

‘আপনার এই অফিস দেখলে খুব সম্ভ্রম জাগে ড. স্যান্যাল, মিস বসাকের দৃষ্টিতে প্রশংসা। ‘বাপরে কত সার্টিফিকেট আর প্ল্যাক আপনার পিছনের দেওয়ালে।’

‘একটা প্রবচন শুনেছেন নিশ্চয়ই—অকর্মা নাপিতের ধামাভরা ক্ষুর,’ নমিতা মৃদু হাসল।

‘আপনি খুব মডেস্ট!’ মিস বসাকের ঠোঁটে হাসি। ‘এটা কার ছবি? কন্যা?’

‘হ্যাঁ,’ নমিতা হেসে ডেস্ক থেকে ফ্যামিলি ফটো ফ্রেমটা তুলল।

‘আর এটা? অল্পবয়সে মিঞা-বিবি খুব হাইকিং করতেন বুঝি?’

‘হ্যাঁ। শতদল হাইকিং-পাগল ছিল। ছুটি পেলেই আইস-এক্স আর অ্যালপাইন টেন্ট রাকস্যাকে বেঁধে এ-পাহাড় সে পাহাড়। মেয়ের জন্য ফ্যাক্টরিতে গিয়ে স্পেশাল ছোট স্লিপিং ব্যাগ বানিয়েছিল।’

‘এবারও ভেকেশনে তিনজনে লাহুল-স্পিতির পাহাড়ে হাইক করবেন?’

‘নাঃ,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল নমিতা। ‘মেয়ে এখন টেক্সাস অস্টিনে মাস্টার্স করছে। এক বছর আগে দমদমে সি-অফ করে এসেছি। আর ছ’বছর আগে স্বামীকে নিমতলায় সি-অফ করে এসেছিলাম। এখন আমি একলাই।’

‘আমি সরি, ড. স্যান্যাল, মিস বসাক ক্ষমা চাইলেন।

‘না, ঠিক আছে,’ নমিতা বলল। ‘জীবন তো থেমে নেই। একলা-দোকলা যেভাবেই থাকুন জীবন আপনাকে নিয়েই এগোবে। কাজেই আনন্দ খুঁজে পেয়েছি। ওসব কথা থাক। আচ্ছা, আপনি নিজে একজন ল-ইয়ার। আপনি নিজে কেন আপনার মেয়ের পেটেন্ট কেসটা লড়েননি?’

মিস বসাকের মুখ থেকে হাসি যেন ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে গেল। মিস বসাক হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। ‘আমার মেয়ে আমাকে এত ঘেন্না করে যে আমি আজ আইসিইউতে ওর বেড পর্যন্ত যেতে পারিনি,’ মিস বসাক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘ছেড়ে দিন, ওসব পার্সোনাল টপিক আলোচনা করে লাভ নেই।’

‘তাহলে এখন আপনি কেন মেয়ের হয়ে লড়তে এগিয়ে এসেছেন? দেশে আরো তো উকিল আছে।’

‘এদেশে খুব ভালো পেটেন্ট ল-ইয়ারের সংখ্যা খুব কম। সবচেয়ে নামী এবং দামি হল দিল্লির আহুজা ল’ ফার্ম। অ্যামফার্মাকে রিপ্রেজেন্ট করছে আহুজা। সমীর আহুজা ইজ আ লেজেন্ড। একজন নটোরিয়াস ল-ইয়ার। খুবই এক্সপেন্সিভ উকিল। টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড রুপিজ পার আওয়ার চার্জ করে। একদিন কোর্টে অ্যাপিয়ার করতে পাঁচ লাখ টাকা চার্জ করে।’

‘একবার কোর্টে হাজিরা দিতে পাঁচ লাখ!’

‘আহুজা ট্রায়ালগুলো একদম ক্লিনিক্যালি ফিনিশ করে। ওর ল’ ফার্মের একঝাঁক জুনিয়র ওর কেসের আগাপাস্তলা রিসার্চ করে আহুজার হাতে মোক্ষম সাপোর্টিং ডকুমেন্টস তুলে দেয়। আরুষির প্রত্যেকটা ইমেইল, চিঠিকে মাইক্রোস্কোপের নীচে রেখে ওদের দেখা হয়ে গেছে। একদল প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর আহুজা ল’ফার্মের পে-রোলে। ওদের কাছে সব খবর পৌঁছে যায়। সমীর আহুজা নিজে আইনের ওয়াকিং এনসাইক্লোপিডিয়া। আদালতে এসে দাঁড়ালে জাজরাও খুব সম্ভ্রমের সঙ্গে কথা বলে। ওর বিরুদ্ধে লড়ে নিজেদের রেকর্ডে লাল দাগ ফেলতে অনেক ল-ফার্মই চায় না। আজ আমার এক্স শ্বশুরের সঙ্গে আইসিইউর বাইরে অনেকক্ষণ কথা বললাম। উনি বললেন মেহেতাকে ফায়ার করার পর গত পরশু আর কাল সারাদিন ধরে আরুষি নাকি রেপুটেড অন্তত পাঁচজনের কাছে অ্যাপ্রোচ করেছিল। কিন্তু কেউ ওর কেস নিতে রাজি হয়নি।’

‘কেন?’

‘প্রথমত ট্রায়াল আর মাত্র দু’সপ্তাহ দূরে। তাছাড়া আমাদের দেশে উকিলদের মধ্যে একটা গ্রেপভাইন কমিউনিকেশনস চলে। আদিত্য মেহেতা সম্ভবত পিছন থেকে অন্য ল-ফার্মগুলোকে আরুষির নামে ব্যাড মাউথ করেছে। সম্ভবত কেন, আমি শিওর যে করেছে। পাঁচটা ল-ফার্মই ওকে রিপ্রেজেন্ট করতে রিফুউজ করেছে। এদিকে কোর্টের ডেট এগিয়ে এসেছে। তার মধ্যে ড্রাইভিং আন্ডার ইনফ্লুয়েন্স। আর কোনো রাস্তাও খোলা নেই—’

‘বুঝেছি। কোনো বিকল্প না দেখে ও আপনাকে নিতে রাজি হল, তাই তো?’

‘না। আরুষি আমাকে এত ঘেন্না করে যে ও মরে গেলেও আমায় ওর অ্যাটর্নি হিসেবে রিটেইন করবে না।’

‘তাহলে—’

‘ওর দাদু—সুব্রত মিশ্র। আমার এক্স শ্বশুর। উনিই সুশ্রুত কোম্পানির ফাউন্ডার। কাল অনেক রাতে হাসপাতাল থেকে উনিই উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করে আমাকে জানালেন আরুষির অ্যাকসিডেন্টের কথা। আরুষি আইসিইউ-তে তখন অচেতন। আজ অনেকক্ষণ কথা বললেন উনি আমার সঙ্গে। উনি আমাকে বললেন যে আরুষির সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। উনিই আমাকে অনুরোধ করেন এই কেসটা যেন আমি হাতে নিই। আমি বললাম, আরুষি রাজি হবে? উনি বললেন, উনি যেভাবেই হোক না কেন আরুষিকে রাজি করাবেনই, মিস বসাক একটু থামলেন। ‘আমাকে কাল গভীর রাতে উনি এই কেস হিস্ট্রির একটা ফোল্ডারের লিঙ্ক পাঠিয়েছেন। কাল সারা রাত, তারপর আজ ভোরে এয়ারপোর্টে, প্লেনে আমি এসব পড়তে পড়তে এসেছি।’ মিস বসাক এবার বললেন, ‘ড. স্যান্যাল, এটা আমার জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রায়াল হতে চলেছে। আর মাত্র দুটো সপ্তাহ হাতে। আমি দিনরাত এক করে দেব, কিন্তু এই ট্রায়ালটা আমাকে জিততেই হবে। অ্যাট এনি কস্ট।’

নমিতা কনফিউজড। যে মা মেয়ের জন্য এত কমিটেড, তাঁকে তাঁর মেয়ে এত ঘেন্না করে কেন?