বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১

।। এক।।

১৭৩৬ সাল

খলপা-গোলপাতার কুটিরের আগচালায় একটি মাইজ কলাপাতার ওপর শয়ান লখা তাঁতির নিথর দেহ। ভোরে বহুক্ষণ ধরে লখার নাকে ধুনোর ধোঁয়া দিয়ে, সাপের বিষঝাড়ার মন্ত্র পড়ে, অনেক ঝাড়ফুঁক করেও খরিশ-কেউটের প্রাণঘাতী বিষ লখার শরীর থেকে নামাতে ব্যর্থ হয়ে কিছুক্ষণ আগে হতাশ হয়ে ফিরে গেছে ওঝা।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঙিনায় বাড়ছে গ্রামবাসীদের জমায়েত। লখার মৃতদেহের পাশে বসে মাথা চাপড়ে বিলাপ করছে লখার মা। কয়েকজন প্রতিবাসিনী তাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে। একজন বৃদ্ধা চোখ মুছতে মুছতে একটা রঙচটা গামছা দিয়ে ঘষে ঘষে মৃতদেহের ভেজা গোড়ালি থেকে জলকাদা মুছছে। আঙিনার বাইরে গ্রামবাসীরা প্রথা-নিয়ম এসব নিয়ে অনুচ্চস্বরে অনেক জল্পনা-কল্পনা-কথাবার্তা বলে চলেছে। লখা তাঁতির অষ্টাদশ বর্ষীয়া স্ত্রীকে লখার চিতায় সহমরণ করাবার জন্য লোকবল এবং অনেক আলোচনা তো দরকারই

চালাঘরের ভিতরে লখার বৌকে ঘিরে গ্রামের মেয়ে-বৌদের ভিড়। উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে তারা তাকে সমবেদনা জানিয়ে যাচ্ছে। আবার এরই মাঝে কেউ লখার বৌয়ের হাতের মুঠোয় কিছু কড়ি গুঁজে দিয়ে আবার ওর মুঠো খুলে সেই কড়ি নিজেদের আঁচলে বেঁধে নিচ্ছে। বাচ্চার কোমরের ঘুনসিতে সতীর কড়ি বেঁধে রাখলে নাকি তাকে যম স্পর্শ করতে পারে না। লখার বৌ বেহুলা ভয়ে সন্ত্রস্ত। কান্না থামিয়ে এবার সে বিড়বিড় করে ঠাকুরের কাছে কাতর প্রার্থনা করল—ঠাকুর আমায় বাঁচাও! আমার বড় ভয় করছে। আমি মরতে চাই না। ঠাকুর রক্ষা কর। তোমার থানে যে মাথা ঠুকব শরীর খারাপের জন্য তাও পারছি না ঠাকুর।

বেহুলার গঙ্গাজল সই মৌন হয়ে সধবা বেহুলার পায়ে শেষবারের মতো আলতা পরাচ্ছিল। কথাগুলো কানে যেতেই সে থেমে গেল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে পুরোহিতের কানের কাছে গিয়ে অতি নিম্নকণ্ঠে কিছু বলল। তা শুনে লখার মৃতদেহের নাকে তুলো গুঁজে দিতে দিতে চিত্ত পুরোহিতের কপালে চিন্তার ভাঁজ। পুরোহিত হঠাৎ থেমে গেল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে কাঁধ থেকে নেমে আসা উড়ানি তুলে তার দেহ পুনরায় আবৃত করে ভারিক্কি চালে বলল ‘রজস্বলায়াস্তৃতীয়েহহ্নি ভর্ত্তরি মৃতে তৎসহ গমনায় এক রাত্র মাত্র মপি মৃত পতি স্থাপয়েৎ।’

লখার মা কিছু না বুঝে বিলাপ থামিয়ে ভীতিবিহ্বল দৃষ্টিতে পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে রইল। পুরোহিত এবার লখার মা’র দিকে এগিয়ে এসে বলল—‘রজস্বলার তৃতীয় দিনে স্বামীর মৃত্যু হলে সেইদিন সহমরণ শাস্ত্র-অনুমোদিত নয়। আপনি পুত্রবধূকে ভালো করে জিজ্ঞাসা করে আসুন সে কদিনের রজস্বলা।’

লখার বাবা প্রৌঢ় ভুবন জ্যোতিষী দাওয়ায় তিনমাথা হয়ে বসে। অসহায়ের মতো ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সব কিছু দেখছিল। বেহুলা শুধু তার পুত্রবধূই নয়, তার অতি প্রিয় শিষ্যা। পুত্রকে জ্যোতিষ শেখাতে ব্যর্থ ও নিরাশ হয়ে পুত্রবধূর জ্যোতিষে আগ্রহ দেখে তাকেই জ্যোতিষ শেখাতে শুরু করেছিল ভুবন জ্যোতিষী। গত চার বছর ধরে বরাহমিহির, পরাশর, ষষ্ঠীদাস, খনা—অসম্ভব মেধার সঙ্গে এমনকী দেবভাষার ব্যাকরণ ও দেবভাষায় লেখা জ্যোতিষের অনেক পুঁথি অতি দ্রুত অধ্যয়ন করে ফেলেছিল এই মেয়ে। দু’বছর আগে সান্নিপাতিক পীড়ায় দৃষ্টিশক্তি অধিক হ্রাস পেয়ে যখন ভুবন জ্যোতিষী অকর্মণ্য হয়ে পড়েছে, তখন এই বেহুলাই তার জ্যোতিষ-মন্দিরের হাল ধরেছে। জ্যোতিষ শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে করতে মেয়েটা হঠাৎ খনার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠেছিল। নানা গ্রাম থেকে পুরোনো সব জ্যোতিষ-পাততাড়ি আনিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে খনার হারিয়ে যাওয়া শ্লোকগুলো এক জায়গায় জড়ো করে রাখছিল। কিন্তু ‘মেয়েছেলের’ এই জ্যোতিষ নিয়ে বাড়াবাড়ি গ্রামের জ্যোতিষীরা ঘোর অপছন্দ করেছিল। আজ বেহুলার সহমরণের সঙ্গে সেই অনুসন্ধানও অসমাপ্ত রয়ে যাবে।

বেহুলার শাশুড়ি ঘরে ঢুকে বেহুলার পাশে থেবড়ে বসে পুত্রবধূর মাথার কোঁকড়ানো চুলে হাত রেখে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভালো করে ভেবে বল তোর আজ ক’দিন?’

‘তিন দিন।’

শাশুড়ি বাইরে বেরিয়ে গিয়ে চিত্ত পুরুতকে বলল, ‘তিন।’

চিত্ত পুরুত উপস্থিত লোকেদের বলল, ‘আজ ওই শুভকার্য সম্পন্ন হবে না। অশুচি দেহে সতীদাহ হয় না। একদিন মড়া রেখে কাল সতীদাহের আয়োজন করুন।’

গ্রামবাসীরা ধীরে ধীরে চলে গেল। বেহুলা এবার ওর শ্বশুরের কাছে এসে বসে কাতর গলায় বলল ‘বাবা, আমায় বাঁচান! আমি কিছুতেই মরতে চাই না। আমার আগুনে বড় ভয়! আমায় বাঁচান বাবা।’ বেহুলা ভুবন জ্যোতিষীর দু’হাত ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।

ভুবন জ্যোতিষী আর সহ্য করতে পারছিল না। ওর খালি মনে হচ্ছিল চিতার ধোঁয়ায় ভেসে আসা বেহুলার জীবন্ত মাংস-পোড়া গন্ধে ওর শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। ‘আমি জমিদারের কাছে গিয়ে মিনতি করব। এ বড় অন্যায়!’ ভুবন জ্যোতিষী উঠে দাঁড়িয়ে পেয়ারা ডালের যষ্ঠি ঠুকতে ঠুকতে ভিটে ছেড়ে পথে নেমে পড়ল। বিড়বিড় করে সে বারবার বলতে লাগল—‘ঘোর অন্যায়, এ হতে দেওয়া যায় না।’

আজ জমিদারবাড়ির দেউড়িতে পাইক ভুবন জ্যোতিষীকে আটকাল না। জমিদার পারিষদ পরিবেষ্টিত হয়ে কাছারি ঘরে ছিল। গ্রামের সব পণ্ডিতরা সেখানে জড়ো হয়েছে। জমিদারের হাতে গড়গড়ার নল, পিছনে হুঁকা হাতে দণ্ডায়মান হুঁকাবরদার। ভুবন জ্যোতিষী প্রবেশ করতেই জমিদার তাকে আজ মাত্রাতিরিক্ত আপ্যায়ন করল ‘এসো এসো ভুবন। সবাই তোমার আলোচনা করতেই এখানে এসেছে।’

‘জমিদারবাবু, আপনি আমাদের অন্নদাতা। আপনি একটা বিহিত করুন, ‘ ভুবন জ্যোতিষীর গলার স্বর আর্দ্র। ‘বাচ্চা মেয়েটাকে এত কঠোর সাজা পেতে হবে?’

‘সাজা!’ ভুবন জ্যোতিষীর কাছে এ’রকম অর্বাচীন বাক্য শুনে জমিদার অতীব বিস্মিত। ‘কী বলছ কী ভুবন! এ তো পুণ্যকাজ। আমার মা নিজে সতী হয়েছিল। মা বলে গেছিল, দেখিস এ-গ্রাম একদিন একুশ মন্দিরের সতীপীঠ হবে। নদীর ধারে সতীর মাঠে কুড়িটা সতী মন্দিরের পর অনেক দিন তো হয়ে গেল, তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছিল তবে কি আমার জীবদ্দশায় মা’র স্বপ্ন পূর্ণ হবে না? কিন্তু, আজ আমার বড় আনন্দের দিন। মা স্বর্গ থেকে আশীর্বাদ করছে। যাও বাড়ি ফিরে ছেলের বৌকে সজ্জিত কর স্বর্গে যাবার জন্য।’

এবার ভুবন কেঁদে ফেলল— ‘আপনারা গ্রামের বিধাতা। দয়া করুন। আমার পুত্রবধূর কী দোষ?’

‘দোষ তোমার পুত্রবধূর নয়, ভুবন,’ পাশ থেকে ভটচায জ্যোতিষী স্বর টেনে টেনে বলল। ‘দোষ তোমার। পুত্রবধূকে জ্যোতিষশাস্ত্র শেখানো তোমার মোটেই উচিত কাজ হয়নি।’

পাশ থেকে ন্যায়রত্ন উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘তখন পই পই করে নিষেধ করেছিলাম তোমায়। বলেছিলাম মেয়েছেলেদের জ্যোতিষ শিক্ষা দেওয়া অনুচিত, স্বামীর আয়ুক্ষয় হয়—’

ভুবন জ্যোতিষী মানুষগুলোর মুখে শোকের বিন্দুমাত্র চিহ্ন দেখতে পেল না। এত নিষ্ঠুর! তবু সে নরম গলায় বলল, ‘এই বাংলায় খনা স্বয়ং অতবড় জ্যোতিষী ছিলেন

‘সেজন্যই তো খনাকে মরতে হয়েছিল, ভুবন,’ ন্যায়রত্ন উত্তেজিত হয়ে ভুবন জ্যোতিষীকে কথা শেষ করতে দিল না। ‘অতীত থেকে এই সামান্য শিক্ষাটা তুমি নিতে পারলে না? তুমি কি ভাবছ খনা পুরুষ হলে বরাহমুনির সাহস হতো ওর জিভ ছিঁড়ে নেওয়ার? গেরস্থ ভয়ের চোটে নিজেদের মেয়ের নাম কক্ষনো খনা রাখে না।’

ভুবন জ্যোতিষী জানে এরা কেন এত উত্তেজিত। অকেজো জ্যোতিষীর আটহাতি নামাবলি! এদের চালকলা-বাঁধা স্বল্পবিদ্যার উপার্জনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার পুত্রবধূ। আজকাল সকলেই বেহুলাকে দিয়ে জাতকের কোষ্ঠী বানাতে চায়। এই জ্যোতিষীদের জ্যোতিষ-মন্দিরগুলি খালি পড়ে থাকে, ওদিকে আজকাল কেউ ফিরেই তাকায় না।

‘অন্যায়ের সাজা ভগবান ঠিক দিয়ে দেন। মেয়ে হয়ে জ্যোতিষচর্চা করছে!’ ন্যায়রত্ন অনুযোগের কণ্ঠে বলল। ‘এ যে বড় অধর্ম! তাও তো সহমরণ এক সম্মানজনক মৃত্যু। তোমার তো খুশি হওয়া উচিত ভুবন। তোমার পুত্রবধূর নামে একটা সতীমন্দির হবে। সে তো মানবী থেকে দেবী হয়ে যাবে! বাড়ি গিয়ে নিজে পুত্রবধূর হাতে আমডাল ভেঙে দাও।’

‘আপনারা দয়া করুন,’ ভুবন জ্যোতিষী ন্যায়রত্নের কাছে কাতর কণ্ঠে মিনতি জানাল। ‘এ-গ্রামে অনেক বিধবা আছে। তাদের বেলা—’  

‘ভুবন!’ এবার জমিদারবাবু হাত তুলে দৃঢ় গলায় ভুবন জ্যোতিষীকে থামার ইঙ্গিত করল। ভুবন থামলে জমিদার বলল, ‘আমাদের গ্রামের একটা নিয়ম আছে। যে বিধবাদের ছেলেপুলে আছে, তাদের আমরা স্বামীর চিতায় তুলে শিশুদের অনাথ করি না। আমার মা এটা চিতায় ওঠার আগে আমাদের বলে গেছিল।’

ভুবন জ্যোতিষী অসহায়ের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘আচ্ছা কলার মান্দাসে অনেকে সাপে কাটা মড়া ভাসায় তাতে তাতে তো আমার লখা বেঁচে না গেলেও—মেয়েটা তো বেঁচে যাবে—’  

‘তুমি ওসব অযৌক্তিক চিন্তাকে মনে স্থান দিও না ভুবন। সতীদাহে কোনো পাপ হয় না, পুণ্যই হয়। আর আমরা তো আছি,’ এবার জমিদার নরম কণ্ঠে বলল। তারপর অন্য এক পণ্ডিতের দিকে তাকিয়ে জমিদার বলল, ‘ভাদুড়ি ঠাকুর, আজকাল কত খরচা হয় সতীদাহের?

সকলেই জানে ভাদুড়ি ঠাকুর সতীদাহের বিশেষজ্ঞ। তিনি যেন প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। একটি তালিকা বের করে গড়গড় করে পড়ে চললেন—‘ঘৃত তিন আনা, ওড়ন পাড়ন বস্ত্র এক আনা, সতীর পরিধেয় বস্ত্র একজোড়া দুই আনা, কাষ্ঠ তিন আনা, পুরোহিত তিন আনা, সতীর কোনো ধর্মকার্যের জন্য দান এক আনা, তণ্ডুল, সুপারি, পুষ্প, কর্পূর, সিদ্ধি, হরিদ্রা, চন্দন, ধূপ, নারকেল ইত্যাদির খরচ নগণ্য, তারপর বেহারা, ঢুলি আট আনা, নাপতিনী চার আনা, তবলদার সব মিলিয়ে পনেরো-ষোলো টাকা কম করে।’ ভাদুড়ি সেই তালিকা তার ঝোলায় ভরতে ভরতে বলল, ‘এটা সবচেয়ে কম খরচ। গোমস্তা কানাইদত্ত তো পুরোহিতের জন্যই দু’শো টাকা খরচ করল। ভাই মারা যাওয়ার পর বিস্তর ধুমধাম করে সতীদাহ করালো। গোটা কারবার নিজের হাতে আসার খুশিতে আটশো টাকা খরচ করল। তবে হ্যাঁ, সতীর শ্রাদ্ধ কিন্তু আলাদাভাবে হবে। সতীদাহের শ্রাদ্ধের খরচও পনেরো থেকে কুড়ি টাকা। দু’জনে একসঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে বলে যে জোড়া-শ্রাদ্ধ একসঙ্গে, তা তো হয় না।’

‘কুড়ি আর ষোল ছত্তিরিশ,’ জমিদার মুখে মুখে হিসেব কষে বলল। তারপর জিভ চুকচুক করে বলল, ‘তুমি ভেবো না ভুবন। আমি চল্লিশ টাকাই নাহয় তোমার খাজনা মাফ করে দেব। আর বাজনদার, জগঝম্পের খরচা বরাবর জমিদারবাড়িই বহন করে। এবারও অন্যথা হবে না। যাও বাড়ি যাও, পুত্রবধূকে স্বর্গে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করাও।’

ভুবন জ্যোতিষীর বুক ফেটে যাচ্ছে। এমন সময় চিত্ত পুরোহিত কাছারি ঘরে প্রবেশ করে দুম করে ঘোষণা করল ‘লখার বৌ রজস্বলা। আজ তৃতীয় দিন। সহমরণ একদিন পিছিয়ে দিতে হচ্ছে।’

‘মানে?’ জমিদারের মেজাজ বিগড়ে গেল। গড়গড়ার লম্বা নলটা মাটিতে সজোরে ছুঁড়ে মারল। ‘এই মেয়েছেলেদের জাতই এমন। সবসময় বিলম্ব করবে! শুভস্য শীঘ্রমেও বাগড়া দেবে!’

ভুবন জ্যোতিষী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই নিষ্ঠুর লোকগুলোর কাছ থেকে সহানুভূতির আশা করা বৃথা। ‘আমি আসি জমিদারবাবু, ভুবন জ্যোতিষী আর কথা না বলে পিছন ফিরে গমনোদ্যোগ করতেই পিছন থেকে শুনতে পেল জমিদারের কঠিন গলা—‘আর একটা কথা, ভুবন। সতী যেন না পালায় সেদিকে নজর রাখার দায়িত্ব কিন্তু তোমার। সতী পালালে আগেও আমরা সতীকে খুঁজে ধরে এনে চিতায় ঢুকিয়েছি, সে তো তোমার অজানা নয়। আমার বংশী লেঠেল আর পাগলা কুকুরের মধ্যে তো জানো কোনো পার্থক্য নেই, তাই ওকে আমি বিশেষ কাজে ছাড়া ব্যবহার করি না। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে যে বংশী আর আমার লেঠেলরা গোবর্ধনের পালিয়ে যাওয়া বৌকে ধরে এনে গোবরার চিতায় ছুঁড়ে ফেলেছিল। তবে বংশী গেলে ও কী অবস্থায় ধরে এনে চিতায় তুলবে তার দায়িত্ব আমি নিতে পারব না। নিন্দুকেরা বলে গোবর্ধনের আছাড়ি পাছাড়ি করা বৌয়ের শরীরে নাকি অকথ্য পাশবিক অত্যাচারের চিহ্ন ছিল। আমি অবশ্য নিজের চোখে দেখিনি, নিন্দুকদের কথা বিশ্বাস করা উচিত না। তবে তুমি আমার বক্তব্য বুঝে নিও। তোমার বৌমা যেন না পালায় সে খেয়াল রেখো।’

শোকসন্তপ্ত ভীত ভুবন জ্যোতিষী ভিটেতে ফিরে এল। বেহুলা এখন দাওয়ায় মৃত স্বামীর মাথার কাছে এসে বসেছে। ভুবন জ্যোতিষী কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, ‘আমি অনেক চেষ্টা করলাম রে, মা।’ বেহুলা পাথরের মতো বসে রইল। তারপর স্বামীর চিরঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে সে বলল, ‘বাবা, আজ রাত আমি ওনার সঙ্গে ওর তাঁতঘরে কাটাতে চাই। ওই তাঁতঘরই ছিল ওনার স্বর্গ।’

বেহুলার মুখের দিকে চেয়ে ভুবনের খুব মায়া হল। আঠারো বছর বয়সের মেয়ে কাল সোয়ামীর চিতায় উঠবে। ‘মড়া নিয়ে একা সারা রাত নদীর পাড়ে ঐ তাঁতঘরে থাকতে পারবি? ভয় করবে না?’

‘কাল চিতার আগুনকেই যখন সঙ্গী করব, তখন আর কিসের ভয় বাবা?’

ভুবন জ্যোতিষী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নদীর লাগোয়া ঐ তাঁতঘরই লখার ধ্যান জ্ঞান ছিল। সারা রাত জেগে ও পিদিম জ্বালিয়ে ঠকাঠক আওয়াজ করে তাঁত বুনতো। বাচ্চা হবে কীভাবে? বৌটাকে বাঁজা বলে দোষারোপ করে তো লাভ নেই। বৌটা যে তার উড়নচণ্ডে ছেলেটাকে ঘরে চারটে বছর ধরে রেখেছিল এটাই অনেক।

বাইরে দুটো ছেলে বাঁশের মাচায় দড়ি বাঁধছিল। শাশুড়ি ওদের বলল, ‘লখা আজ সারারাত তাঁতঘরে থাকবে। বৌও ওখানেই থাকবে। তোরা ব্যবস্থা কর।’

লখার শবকে তাঁতঘরে স্থানান্তরিত করা হল। আর প্রদোষকাল অতিক্রান্ত হলে কুপি নিয়ে বেহুলাকে নদীর ধারে তাঁতঘরে পৌঁছে দিল শাশুড়ি। এসময়ে প্রেতাত্মারা ভিড় করে মড়ার চারপাশে। তাই শাশুড়ি ভিতরে গেল না। মেয়েটার সাহস আছে। শাশুড়ি মনে মনে রাম রাম জপতে জপতে বাড়ি ফিরে গেল।

বেহুলা খলপা দরমার আগড় ঠেলে ভিতরে ঢুকল। ভিতরে মাটির প্রদীপ জ্বলছে। সামনে মাটির নিকানো মেঝেতে শান্ত হয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে রয়েছে তার স্বামী। তার পিছনে তাঁতকলে প্রায় শেষ হয়ে আসা মিহি এক বস্ত্র। লখা বেহুলাকে শিখিয়েছে এর নাম মলবুস খাস।

লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে বড় মায়া হল বেহুলার। বেহুলা কখনো এত ভালো তাঁতি দেখেনি। লখা তাঁত চালাতো এত দ্রুত যে মনে হতো পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো ওর হাত শূন্যে উড়ছে। ইচ্ছে করলেই বয়রাতি কাপাসের সুতোর মসলিন বানিয়ে বেচে প্রচুর পয়সা উপার্জন করতে পারত লোকটা। কিন্তু তা ও করবে না। ফুটী কাপাসের সুতো ছাড়া অন্য কোনো সুতোয় হাতই দেবে না। আর এত খুঁতখুঁতে! যতক্ষণ না একদম পছন্দ হবে, কাপড় কিছুতেই তাঁত থেকে বের করবে না। পড়শিরা আড়ালে বলতো লখা পাগলা। পাগলা না হলে জ্যোতিষীর ছেলে তাঁত বুনে খায়? বেহুলা নিজের চোখে কতবার দেখেছে কত সুন্দর শাড়ি প্রায় শেষ করে এনেও মনঃপূত না হওয়ায় তাঁত থেকে টেনে খুলে ফেলে দিয়েছে লখা। একে পাগল না বললে আর কাকে পাগল বলবে। কিন্তু যে শাড়ি ওর মনঃপূত হবে তা যেন স্বর্গের অপ্সরাদের যোগ্য। ওদের বিয়ের ফুলশয্যায় বেহুলাকে বিশাল পেখম মেলা ময়ূর আঁকা একখানা মলবুস খাস দিয়েছিল লখা। বেহুলার মনে পড়ল এ ঘরেই তো রাখা। বাঁশের মাচার থেকে একটা ছোট বাঁশের খণ্ড নামাল বেহুলা। ভিতর থেকে বের করল সেই ময়ূর আঁকা মলবুস খাস। শাড়িটা নিজের সর্বাঙ্গে জড়িয়ে কিছুক্ষণ চোখ বুজে বসে রইল বেহুলা। ওর বুকের ভিতর থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে একরাশ অসহায় কান্না গোঙানির মতো বেরিয়ে তাঁতঘরে ছড়িয়ে পড়ল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখের জল মুছে বেহুলা আবার কাপড়টা গুটিয়ে ঢুকিয়ে রাখল বাঁশের চোঙে।

মধ্যরাত অতিক্রান্ত হল। বেহুলার চোখে ঘুম নেই। সামনে স্বামীর মৃতদেহ। বেহুলাকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে লোকটা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। এত নিষ্ঠুর! বেহুলার মনে খুব অভিমান হচ্ছে। চার বছরের বিবাহিত জীবনে লোকটা কক্ষনো বেহুলাকে কাছে টেনে নেয়নি। সারাক্ষণ শুধু তাঁত আর তাঁত। তাঁতই এর ধ্যান-জ্ঞান। বরং বেহুলা স্বামীর কাছাকাছি ঘেষতে গেলে তাঁত বুনতে বুনতে লখা বিরক্ত হয়ে ওকে গায়ের থেকে সরে যেতে বলতো। লখার দোষ নেই, বেহুলা ভাবল, লখার ছকে পত্নীকারক চন্দ্র যুক্ত রয়েছে কেতুর সঙ্গে, আর পত্নীকারক শুক্র রয়েছে রাহুর সঙ্গে যুক্ত। এরকম জাতকের কখনো সহবাসে অনুরাগ থাকে? তাই এক বিছানায় শুতেই আসত না মানুষটা। অথচ, এই লোকটা মারা গেলে তাকে কিনা ওর চিতায় এক বিছানায় শুতে হবে। কেন?

সারাদিনের অবসন্নতায় বেহুলার চোখের পাতা ভারি হয়ে কখন যেন চোখ বুজে গেছিল। হঠাৎ বেহুলার মনে হলো ওর সারা গায়ে আগুন জ্বালিয়ে কারা যেন ওকে এক কুয়োতে ছুঁড়ে ফেলল। আগুনের শিখার মাঝে বেহুলা আর্তনাদ করে উঠল। বেহুলার ঘুম ভেঙে গেল। প্রদীপের আধো আবছায়া। বেহুলার মনে হলো, আমাকে কেন মরতে হবে? এবার বেহুলার মধ্যে একটা জেদের জন্ম নিল। আমি মরব না। আমি কিছুতেই মরব না। বেহুলা বিড়বিড় করে নিজেকে বলল—আমি পালাব। তারপর কপালে যা থাকে দেখা যাবে।

কোথায় পালাব? বেহুলা ভাবতে লাগল। বাপের বাড়ি? না, বাপের ভিটেতে গিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারব না। বাপের ভিটে দক্ষিণে মাত্র তিন ক্রোশ পথ। ওরা লেঠেল নিয়ে প্রথমে ওখানেই হামলা করবে, আর আমাকে ধরে নিয়ে আসবে। আমি দক্ষিণে না গিয়ে উত্তরে যাব। ওরা আমাকে দক্ষিণে খুঁজুক। পালাবার কিছুটা সময় হাতে পাব।

রাতের তিন প্রহরের শিয়াল ডেকে গেল। অমাবস্যার ভরা কোটালের সময় হয়েছে। জোয়ারে নৌকা ভাসাবার এটাই সময়। আর দেরি করলে চলবে না। বেহুলা মাথা উঁচু করে দেখল। বাঁশের মাচায় গোটা চারেক মাটির কলসি। প্রতিটির মুখে মাটি লেপা। পাশে ওর সংগ্রহ খনাবাক্যের পুরোনো সব পুঁথি। পুঁথিগুলো এক জায়গায় একটা লাল সালুতে বাঁধল বেহুলা। আবার চালবাতায় এক কোণে তুলে গুঁজে রাখল। তারপর মলবুস খাসের বাঁশের চোঙটা নিয়ে পাশে রাখা বটুয়া থেকে কড়িগুলো কাপড়ের আঁচলে বেঁধে নিল। এবার উবু হয়ে বসে স্বামীর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল বেহুলা। ঠাণ্ডা কনকনে শরীর মড়া বাস ছাড়ছে। হাতের শাঁখা-পলা খুলতে গিয়েও সে খুলল না। বাতায় ঝুলছে আলোয়ান। বেহুলা আলোয়ান জড়িয়ে, বাঁশের আগড় খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

দ্রুতপায়ে নদীর দিকে হাঁটা লাগাল বেহুলা। বাইরে মাঘের শীতের ঠাণ্ডা। অন্ধকার পথ, বিদ্যাধরীর পাড়ে আঘাটায় বাঁধা সালতি। লোকে বলে লখীন্দরের ডিঙি। এই সালতি চালিয়ে কোথায় কোথায় চলে যায় লখীন্দর। যখন ফিরে আসে সঙ্গে আনে প্রচুর সুতো, কাপাস, কখনো আনে কাচগুড়ো। কতবার বেহুলাকেও নিয়ে গেছে এই সালতিতে। নিম্নবঙ্গের নদনদী, খাল, হাওড়, বিল, খাঁড়ির আধিক্যের জন্য এখানকার পল্লিবাসীরা প্রায় সকলেই নৌকা চালনায় পারদর্শী। কখনো কখনো লখার প্রয়োজনে বেহুলা একলাই ডিঙি বেয়ে পাশের হাট থেকে তুলে এনেছে সুতো। এবার একাই গেছিল লখা। ফুটী কাপাসের চাষ এই গ্রামেই করবে বলে বেশ কিছুদিন হল নিজের মনেই বকবক করছিল। তারপর একদিন ডিঙি নিয়ে উধাও। মাসখানেক দেখা নেই। ফিরল যখন সঙ্গে বাইশটা কলসি। এভাবেই নাকি রাখে ফুটী কাপাসের বীজ, ঘি মাখিয়ে। তাঁতঘরের পিছনে নদীর পার বরাবর বিস্তর জমি ওদেরই। ওখানেই আঠারোটা কলসি থেকে কাপাসের বীজ নিয়ে কাল সারাদিন মাটিতে পুঁতেছে। আজ ভোরে আরো কয়েকটা পুঁততে গিয়ে সাপের কামড় খেল লখা পাগলা।

বেহুলা ক্ষিপ্রপদে বিদ্যাধরীর পাড়ে এল। জোয়ার এসে গেছে। আঘাটায় খেজুর গাছে বাঁধা সালতি। কাছি খুলে বেহুলা কাদায় নেমে সালতিটা টেনে নামিয়ে দিল জলে। তারপর সালতিতে উঠে লগি কাদায় ঠেলে ঠেলে সালতি অন্ধকার নদীজলের গভীরে নিয়ে এল।

অমাবস্যার নিশির গাঢ় তিমিরাবগুণ্ঠনে ঢাকা নদীজলে ভরা জোয়ার। উজানে স্রোতের টান খুব। শীঘ্রই বেহুলার নাও মাঝ-নদীতে পৌঁছে গেল। বেহুলা গলুইতে এসে হাল ধরে দাঁড়াল।

তমসাবৃত স্বামীর গ্রাম। মৃত লখীন্দরকে পিছনে ফেলে রেখে একলাই অদৃষ্টের নদীজলে ভেসে চলল আজকের বেহুলার ভেলা। কিন্তু সমাজের হিংস্রতা থেকে পালিয়ে সে কতদূর যেতে পারবে?