বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৯
।। নয় ।।
আপন পাঁজি পরকে দিয়ে গণক বেড়ায় পথে পথে!
৮ আগস্ট, ২০১৯
লাঞ্চ সেরে ইউনিভার্সিটিতে এসে মিস বসাকের জন্য অপেক্ষা করতে করতে এসব আগডুম বাগডুম ভাবছিল নমিতা। কোথায় এখন মানালির ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আমেজ উপভোগ করবে তা না ছুটি নেওয়া সত্ত্বেও অন্যের উপকার করতে গিয়ে কলকাতার এই প্রাক ভাদ্রের গরমে পচতে হচ্ছে।
অফিসে নিজের চেয়ারে বসে আজ অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল নমিতার ভেকেশন, কোনো কাজ করতে হবে না আজ। নো মিটিং। একদম স্ট্রেস ফ্রি। মনে হচ্ছিল যেন রিটায়ারি তার পুরোনো কর্মক্ষেত্রে এসেছে। মিস বসাক মেয়েকে নার্সিংহোমে দেখে সোজা এখানে আসবেন, তারপর ওরা বিদ্যাদির সঙ্গে দেখা করতে বৌবাজার যাবে। নমিতার অফিস খোলা দেখে স্ট্যাফেরা কেউ কেউ উঁকি মেরে বিস্ময় প্রকাশ করল ‘আরে, ম্যাডাম! আপনি তো ভেকেশনে!’
‘হ্যাঁ, কিছু পার্সোনাল কাজ আছে, এক্ষুনি বেরিয়ে যাব,’ নমিতা পাশ কাটাল। নমিতা ইমেলের ইনবক্সে চোখ বুলিয়ে নিল। অজস্র ইমেল জমা হয় প্রতিদিন। এমন সময় মিস বসাক হাঁসফাঁস করতে করতে ঢুকলেন—‘কী রোদ্দুর! মাথার তালু পুড়িয়ে দেয়। ভাদ্রমাস পড়ে গেছে?’
‘বসুন,’ নমিতা হেসে ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা জলের বোতল বের করে গ্লাসে ঢালতে যাচ্ছিল, মিস বসাক বললেন, ‘গোটা বোতলটাই দিন।’
বোতল থেকে ঢকঢক করে ঠাণ্ডা জল সোজা গলায় ঢেলে বললেন ‘আঃ!’
‘মেয়ে কেমন আছে?’ নমিতা জিজ্ঞেস করল।
‘কাল রুমে দিয়ে দিয়েছে। ওর দাদু ছিলেন। বললেন ব্রেনে কোনো কংকাশন নেই। স্পাইনও ঠিক আছে। মিরাকুলাস এস্কেপ।’
‘মেয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন?’
‘ভিতরে যাওয়ার সাহস হল না জানেন,’ মিস বসাক খুব নরম গলায় বললেন। ‘ওর দাদু আজ একটা পেন-ড্রাইভ দিলেন। কেসের যাবতীয় ফাইল ডাউনলোড করা। আমি ভাবছি আমার একজন জুনিয়রকে দিল্লি থেকে আনাবো।’
‘চা খাবেন এক কাপ?’ নমিতা বলল।
‘নাঃ, আজ থাক,’ তারপর মিস বসাক নমিতাকে বললেন, ‘এই ছুটির দিনেও আমার জন্য আপনাকে অফিসে আসতে হল। আর আপনি তো দেখছি ছুটির মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন।’
‘খালি বসে থাকার অভ্যাস একদম নেই, হাত নিশপিশ করে,’ নমিতা হেসে বলল। ‘কথায় বলে অভ্যাস না ছাড়ে চোরে, ঠটা হাতেও সিঁদ করে।’
‘বাহ্! আপনি দারুণ দারুণ বাগ্ধারা বলেন তো ড. স্যান্যাল, মিস বসাক প্রশংসা করলেন। ‘কালকেও আপনি দু’তিনটে সলিড প্রবাদ বলেছেন। আপনি তো বচনপিসিকে হারিয়ে দেবেন!’
‘বচনপিসি কী করেছে?’
‘স্পয়লার দেব না। ‘বেহুলার খনা’ পড়ে নিজেই দেখতে পাবেন।’
‘এগুলো বাংলা ডিপার্টমেন্টের অবদান,’ নমিতা হাসল। ‘আমরা ছোটবেলায় বলতাম বাঘধরা। তাহলে চলুন?’
‘হ্যাঁ, চলুন। বাঘ ধরতেই যাই এখন,’ মিস বসাক হাসলেন।
‘বাঘ না বাঘিনী, আহত বাঘিনী,’ নমিতা বলল, ‘প্রতিটি পদক্ষেপ খুব সাবধানে ফেলতে হবে।’
দুপুর দুটো নাগাদ মিস বসাককে নিয়ে বৌবাজার পৌঁছে গেল নমিতা। বৌবাজারের এনজিও ‘অনিকেত’এর অফিসের চেহারা দেখে নমিতা বুঝল এদের আর্থিক সামর্থ্য খুবই কম। জানি না এরা বিদ্যাদিকে কত বেতন দেয়। আধো অন্ধকার সিঁড়ির প্রথম ল্যান্ডিংয়ে যে মেয়েটা একটা বাচ্চা কোলে মেঝেতে বসে ছিল তাকে নমিতা কালকে শোভাবাজারের প্ল্যাটফর্মে বিদ্যাদির স্কুলে দেখেছে। নমিতাদের দেখে সে বলল দিদিমণি আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। ভিতরে ঢুকে বাঁ-দিকে।
ভিতরে একটা আলো আঁধারি হলঘর। একদিকে গোটা দেওয়াল জুড়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের রং পেন্সিলে আঁকা অজস্র ছবি সাঁটা। অন্যদিকে দেওয়ালের মাঝামাঝি একটা ব্ল্যাকবোর্ড। সেখানে চক দিয়ে বড়বড় করে লেখা—গোপাল বড় সুবোধ বালক। বোঝা গেল এখানেও ইস্কুল হয়। বাঁদিকে হলঘরের একদম শেষ মাথায় কাচ আর প্লাইউডের একটা ছোট খুপরির মতো কামরা। কাচের ভিতর দিয়ে বিদ্যাদিকে দেখা যাচ্ছে। বিদ্যাদির ক্লান্ত মুখ। ডেস্কে ঝুঁকে কিছু লিখছে। নমিতা ভাবল এই ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও কিছু মানুষ শিক্ষকতা করে, আর সে নিজের অফিসে এসি খারাপ হয়ে গেছিল বলে ইউনিভার্সিটি মেইনটেনেন্স ডিপার্টমেন্টের লোকেদের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল।
‘আসুন,’ বিদ্যাদি ওদের দেখে মাথা তুলে ভিতরে ডাকল।
ভিতরটা খুবই ছোট। দু’জন ভিজিটার খুব কষ্ট করে বসতে পারে। দেওয়ালে সাঁটা একটা তাকে ম্যাগাজিন, বই, কাগজ, খাতা স্থানাভাবে ঠেসে ঠেসে রাখা হয়েছে। দেওয়ালে মা সারদার একটা ছবি। বিদ্যাদি মনে হলো বাচ্চাদের খাতা দেখছিল, কলমটা খোলা খাতায় রাখল।
‘এত অন্ধকারে স্কুল!’ অ্যাডভোকেট বসাক ইতস্তত করে বললেন।
‘এই স্কুলের ছাত্রীদের মায়েরা আরো অন্ধকার জগতের মানুষ, বিদ্যাদি বলল। ‘বাচ্চা মেয়েদের পাঠায় এখানে যাতে মেয়েগুলোকে অন্ধকার জগতে ফিরে যেতে না হয়।’ বিদ্যাদি হাত বাড়িয়ে আলোর সুইচটা টিপতে দুটো টিউব লাইট জ্বলে হলঘরের অন্ধকার কাটিয়ে দিল। ‘ইলেকট্রিক বিল দেওয়ার মতো ক্ষমতা নেই এই এনজিও-টার। আর এরা বন্ধ হয়ে গেলে মেয়েগুলোর অবস্থা শোচনীয় হয়ে যাবে। তাই যত খরচ কমানো যায়। আপনাদের বসতে অসুবিধা হবে।’
নমিতা লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। বিদ্যাদি ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় ওর থেকে কম করে পঁচাত্তর নম্বর বেশি পেয়েছিল। পৃথু্যুশের মতো সুপার ইন্টেলিজেন্টকে পরীক্ষায় হারাতে গেলে এভারেস্ট সমান মার্কস পেতে হয়। তাকে আজ এই দীন পরিবেশে আতিথেয়তা করতে হচ্ছে।
নমিতা মিস বসাকের জন্য হ্যান্ডেলওয়ালা চেয়ারটা ছেড়ে দিয়ে নিজে মোড়ায় বসল।
‘জল খাবেন?’ বিদ্যাদি বলল।
‘না না, মিস বসাক তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন।
মিস বসাকের এই ‘না না’ টা নমিতার কানে শ্রুতিকটু হয়ে বাজল। ওর মনে হলো গেলাস টেলাসে অন্ধকার জগতের মেয়ের ঠোঁটের ছোঁয়া আছে ভেবেই মিস বসাক সেটা এড়াতে চাইলেন। নমিতার খারাপ লাগল। বিদ্যাদি এদের জন্য নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছে, আর তারা –, নমিতা বলল, ‘আমি খাব।’ মিস বসাককে ডিঙিয়ে নমিতা উঠে জলের কুঁজো থেকে গেলাসে ঢেলে জল খেল। ফিরে এসে বলল, ‘খুব পিপাসা পেয়েছিল। আমরা তোমার বেশি সময় নেব না, বিদ্যাদি।’
‘দাদার মুখে সব শুনলাম। কেমন আছে এখন আরুষি?’
‘রিকভার করছে। প্রাণের ভয় কেটে গেছে, তবে চলাফেরা করতে কয়েক মাস লাগবে।’
‘বলুন, আমার কাছে আপনি কী চান?’ বিদ্যাদি অ্যাডভোকেট বসাকের দিকে তাকিয়ে বলল।
‘বিদ্যাধরী দেবী, আপনার সাহায্য পেলে আরুষির খুব উপকার হবে। তবে তার আগে আমি একটা কথা আপনাকে খোলাখুলি জানাই। কাল আপনার দাদাকে কথাটা আমি বলিনি, কিন্তু আজ আপনাকে বলছি।’
বিদ্যাদি প্রশ্নভরা চোখে তাকাল।
‘আরুষির কোম্পানির বিরুদ্ধে যে বিদেশি কোম্পানি হাইকোর্টে মামলা করেছে তার নাম অ্যামফার্মা। আর অ্যামফার্মার হয়ে আরুষির বিরুদ্ধে লড়াই করছে আপনার ভাইপো ড. তথাগত দাস।’
ঘরের ভিতর নিঃশব্দে একটা বিস্ফোরণ ঘটল। বিদ্যাদির মুখ কালো হয়ে গেল। ‘দাদা বলছিল আরুষির কেসের জন্য রাগ অভিমান ভুলে বাবলুর সাহায্য চাইবে, আর বাবলু নিজেই –’ বিদ্যাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দু’হাতের তালু দিয়ে মুখ ঢেকে অল্পক্ষণ বসে রইল।
‘আমি সরি,’ এবার মিস বসাক বললেন। ‘আমি জানি এই কথা শোনার পর আপনি হয়তো আমাদের সাহায্য করতে চাইবেন না। দ্যাটস ওকে উইথ মি। তবু আমি আপনার থেকে আমার মেয়ের জন্য সাহায্য চাইব। আফটার অল আমি ওর মা তো।’
‘ঈশ্বর আমাকে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন!’ বিদ্যাদির চিন্তিত মুখ। ‘মিস বসাক, আরুষি যেমন আপনার মেয়ে, তথাগত আমার ভাইপো হলেও আমার ছেলে। নমিতা হয়তো আপনাকে বলেছে এক সময় আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। বেশ কয়েক বছর ট্রিটমেন্ট নিতে হয়েছে। তখন আমার চেনাশোনা বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-আত্মীয়ারা সবাই আমার থেকে দূরে সরে গেছিল। কিন্তু তথাগত প্রতিটি দিন আমার পাশে ছিল। আমার জন্য ওকে পাড়া- পড়শিদের কাছে, স্কুলে কম হেনস্থা হতে হয়নি। যে যখন পেরেছে ওকে বুলি করেছে। কিন্তু ও কক্ষনো আমার হাত ছাড়েনি। আমাকে আনন্দ দেবার জন্য ওইটুকু বয়স থেকেই কত কিছু করেছে। আমি আজ ওর বিরুদ্ধে যাব কীভাবে?’
‘আমি বুঝতে পারছি, মিস দাস, অ্যাডভোকেট বসাক বললেন। ‘আপনি আপনার ভাইপোর পক্ষ তো নেবেনই। সেটাই স্বাভাবিক। এই জীবনে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল সেটা এই প্রফেশনে এসে আমার মাঝে মাঝেই গুলিয়ে যায়। আমি সেজন্যই আপনার থেকে এতটুকু সাহায্য চাইবার আগেই আপনাকে সত্যিটা জানালাম। আপনি যদি এই কেসে আরুষিকে সাহায্য না করতে চান তবে আমি কিছু মনে করব না।’
বিদ্যাদি কোনো কথা বলল না। হাতের তালু দিয়ে মুখ আর চিবুক ঢেকে বসে রইল। মাধবী বসাক সামনে ঝুঁকে নিজের দু’হাত বাড়িয়ে বিদ্যাদির হাত ধরলেন— ‘ইটস ওকে, মিস দাস। আই প্রমিস, আমি কিছু মনে করব না। অনেক সময় আমরা নিউট্রাল পজিশন নিই। জীবনটা তো আর অঙ্কের বায়ানারি নাম্বার না যে ওয়ান অর জিরো। এদের মাঝে একটা বিরাট গ্রে এরিয়া থাকে। আমাদের উকিলদের কাজ সেই গ্রে এরিয়াকে নিজের সুবিধামত ঠিক আর ভুলের সংজ্ঞায় ফেলা।’
‘কিন্তু একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না,’ এবার নমিতা বলল। ‘বিদ্যাদি, তোমার ভাইপো তথাগত ভালোভাবেই জানে যে ড. পৃথুযশ ভৌমিক তোমার জীবনে কত ক্ষতি করেছে, কিন্তু তাহলে ও কেন পৃথুযশের সঙ্গে হাত মেলালো? ও কি তোমার কষ্টের দিনগুলো ভুলে গেছে?’
‘তথাগত পৃথু্যুশের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে?’ বিদ্যাদির দু’চোখে পাহাড় প্রমাণ বিস্ময়। ‘অসম্ভব! ঠিক কী হয়েছে আমাকে একটু খুলে বলবে?’
নমিতা তাকাল বিদ্যাদির দিকে। বিদ্যাদির চোখের দৃষ্টিতে ক্লান্তি, বিষাদ, কৌতূহল।
‘আমি বলছি,’ অ্যাডভোকেট বসাক শান্ত গলায় বললেন, ‘আরুষিদের কোম্পানি সুশ্রুত ‘বিষহরি’ নামে একটা সাপের বিষের প্রতিষেধক ওষুধ তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে। আমেরিকার বিখ্যাত ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি অ্যামফার্মা হাইকোর্টে নালিশ করেছে যে সুশ্রুত অ্যামফার্মার পেটেন্ট নেওয়া ফর্মুলার ওষুধ ‘ভেনম’কে কপি করে বাংলায় ওষুধ বানিয়ে বিক্রি করে চলেছে। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে মামলা চলছে।’ মাধবী বসাক থামলেন। ‘তথাগত দাবি করছে তথাগত নাকি ওই ওষুধের আবিষ্কারক। আর আরুষির দাবি তথাগত ওই ওষুধের ফর্মুলা ওদের কোম্পানি সুশ্রুতের থেকে আমেরিকায় নিয়ে গেছে। দু’সপ্তাহ পর কোর্টে এই মামলার ফাইনাল হিয়ারিং।’
‘কিন্তু এখানে পৃথুযশ কোথা থেকে আসছে?’
‘আরুষির পক্ষের যুক্তি যে এই আয়ুর্বেদের ওষুধ আমাদের দেশে অনেক প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। খনার বচনেও এই ওষুধের সম্বন্ধে লেখা আছে। আরুষির উকিল গগনের এই ‘বেহুলার খনা’ থেকে খনার বচন উদাহরণ হিসেবে দেখায়। আমেরিকান কোম্পানি এই বইটাকে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের চেয়ারের কাছে পাঠায় সেই এক্সপার্ট তাঁর রিপোর্টে লিখেছেন যে খনা একটা মিথ। খনা বলে কখনো কেউ ছিলই না। অ্যামফার্মার সেই এক্সপার্টই হলেন ড. পৃথুযশ ভৌমিক।’
বিদ্যাধরীর ক্লান্ত দু’চোখ এক মুহূর্তের জন্য জ্বলে উঠল—‘পৃথুযশ এখন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের চেয়ার?’
‘হ্যাঁ। উনিই বলছেন যে খনা একটা মিথ। খনা বলে কেউ কখনো ছিল না।’
‘যে যা খুশি বললেই আমাদের সেটা মানতে হবে তার কোনো মানে নেই।’
‘একদম ঠিক। মিস দাস, আমরা চাইছিলাম আপনি আমাদের হয়ে ড. পৃথুযশ ভৌমিকের লেখা রিপোর্টের আর্গুমেন্টের কাউন্টার আর্গুমেন্ট লিখে দিন। মিস দাস, আপনি আমাদের এ লড়াইতে জেতাতে পারেন।’
‘আমি আপনাকে লড়াইতে জেতাবো?’ বিদ্যাদির ঠোঁটে ক্লান্ত হাসি। ‘নিজের লড়াইই জিততে পারলাম না।’
‘আপনি পারবেন, মিস দাস, মিস বসাক বললেন। ‘প্লিজ!’
বিদ্যাদির ঠোঁটে ক্লান্ত হাসি—‘লড়তে লড়তে আমি এতটা স্ট্রেসড আউট হয়ে গেছিলাম যে সাইকিয়াট্রিস্টের ওষুধ খেতে হতো। তিরিশ বছর আগে তখন লোকেদের এত অ্যাওয়ারনেস ছিল না। কেউ একজন রটিয়ে দিল বিদ্যাধরী পাগলের ডাক্তার দেখায়। তারপর থেকে লোকে দাদাকে অযাচিত সাহায্য করে বলতে লাগল ওকে রাঁচি পাঠান। কেউ আবার তার প্রতিবাদ করে বলল, না না শুনেছি রাঁচিতে ব্রেনে ইলেক্ট্রিক শক দেয়, তার চেয়ে আগ্রা পাঠান। কী যে ঝড় বয়ে গেছিল! সেই অবসাদ এখনো আমার মস্তিষ্কে চেপে বসে আছে। ডিপ থিংকিং করলে আমার মাথায় আবার যন্ত্রণা শুরু হয়। রাতের পর রাত জেগে থাকতে হয়। এই বেশ আছি বাচ্চাদের নিয়ে। আর লড়াই লড়তে পারব না। সে শক্তি আমার নেই। আমায় ক্ষমা করবেন।’
বিদ্যাদির চোখের দিকে তাকাবার মতো শক্তি ছিল না নমিতার। কিন্তু বিদ্যাদি এতই মহান যে নমিতার নাম একবারও ওর দুর্ভাগ্যের সঙ্গে জড়ায়নি। অবনত মস্তকে মেঝের দিকে তাকিয়ে নমিতা শুনছিল বিদ্যাদির কথা। এবার নমিতা মাথা তুলল, ‘তুমি চিন্তা কোরো না, বিদ্যাদি। আমরা তোমায় আর বিরক্ত করব না। এবার আমি লড়ব পৃথু্যুশের বিরুদ্ধে। তোমার মতো বিদুষী আমি নই। আর ফার্স্ট ইনিংসে গোল্লা পেয়েছি, কিন্তু সেকেন্ড ইনিংসটা ভালো খেলবই।’
বিদ্যাদি কথা বলল না। নমিতার মুখের দিকে চেয়ে রইল।
‘আজ তাহলে আমরা আসি?’ নমিতা বলল।
‘আচ্ছা, আবার কখনো এসো,’ বিদ্যাদি অন্যমনস্কভাবে বলল।
অ্যাডভোকেট বসাক উঠতে উঠতেও মনে হলো স্ট্র্যাটেজি ভাবছিলেন। উনি বললেন, ‘মিস দাস, ‘বেহুলার খনা’তে যত খনাবাক্য আপনারা ছেপেছেন, সেগুলো কি অন্য কোনো পুরোনো বইটইতে লেখা নেই?’
‘এই বইয়ের সমস্ত খনাবাক্য আমার প্রায় তিরিশ বছর আগে জমা দেওয়া প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলারশিপের ডিসার্টেশন থেকে নিয়েছি।’
‘তাই?’ মিস বসাক আবার চেয়ারে বসে পড়লেন। ‘খনার একটা শ্লোক আছে সাপের বিষের সম্বন্ধে, সেটাও আপনার তিরিশ বছর আগেকার ডিসার্টেশনে লেখা আছে?’ মিস বসাকের কণ্ঠস্বরে উত্তেজনা।
‘হাঁ, সব ওখানে আছে। বিদ্যাদি একটু ভেবে বলল, ‘ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে আমার পি আর স্কলারশিপের ডিসার্টেশনের ডকুমেন্টটা থাকা উচিত। সাধারণত ডিসার্টেশনের একটা কপি লাইব্রেরির জার্নাল সেকশনে থাকে।’
‘লেখাটা পাওয়া যাবে?’ অ্যাডভোকেট বসাক উত্তেজিত হয়ে নমিতার দিকে তাকালেন।
‘পাওয়া তো উচিত। আজকাল বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি গোটা জার্নাল সেকশনটা ডিজিটাইজ করে ফেলেছে,’ নমিতা বলল। ‘আর বিদ্যাদির সাবমিট করা প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনের হার্ড-কপি যদি ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির জার্নাল সেকশনে থাকে, তবে আমি ওখান থেকে কালেক্ট করে নেব।’
‘সেটা কি আজ খোঁজা সম্ভব?’ মিস বসাকের তর সইছে না।
‘হ্যাঁ, আমি তাহলে লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখি। আমরা তাহলে আসি, বিদ্যাদি?’
‘আমি একবার দাদার সঙ্গে আলোচনা করি। আপনারা সম্ভব হলে কাল একটা কল করতে পারবেন?’
‘অবশ্যই। অনেক ধন্যবাদ, মিস দাস, অ্যাডভোকেট বসাক পার্স থেকে ভিজিটিং কার্ড বের করে বিদ্যাদির সামনে রাখলেন। নমিতার কী মনে হলো ও নিজের কার্ডটাও পার্স থেকে বের করে বিদ্যাদিকে দিল। ওর সিক্সথ সেন্স বলছে ওদের আবার দেখা হবেই।
