বিদ্বান বনাম বিদুষী – প্রীতম বসু

বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৬

।। ছয়।।

বাড়িটা দেখে ঘাবড়ে গেল নমিতা।

খুব পুরোনো বাড়ি। ভয় হয় যে কোনো মুহূর্তে ছাদ ধসে পড়তে পারে। সন্তোষপুরে স্টেশন-রোড ছেড়ে একটা গলিতে গগনের কথামতো রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে নমিতা। গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দিকে এগোল তিনজনে। দরজায় একটা প্রায় মুছে যাওয়া সাইনবোর্ড—‘ধন্বন্তরি কবিরাজ’। ডোর বেলে হাত রাখার আগে গগন বলল—‘একটু রগচটা ধরনের লোক, একটু বুঝেসুঝে কথা বলবেন।’ গগন কলিং বেলের সুইচ দু’বার টিপল, কলিং বেল বাজল না, তাই দরজায় কড়া নাড়লো।

দরজা ঈষৎ ফাঁক হল। একজন ন্যুব্জ বৃদ্ধ মানুষ, মুখে পাকা দাড়ি, দরজার ফাঁক দিয়ে অচেনা আগন্তুকদের দিকে তাকালেন। তাদের মাঝে চেনা মানুষ গগনকে দেখে তাঁর ঠোঁটে হাসি খেলে গেল, উনি দরজা খুললেন। গগন নমিতাদের পরিচয় করিয়ে দিল। নমিতা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।

‘থাক থাক,’ কবিরাজের হাতের তালুতে আশীর্বাদের মুদ্রা। তারপর গগনের দিকে ভালো করে চেয়ে বললেন, ‘একী! এটা কী করে হল?’

‘বলছি সব। চোট লেগেছে। একটু ওষুধ দিতে পারবেন?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আয় আয়, আপনারা ভিতরে আসুন।’

নমিতা গগনের পিছন পিছন বাড়ির ভিতর ঢুকল। পলেস্তারা খসা দেওয়াল, ঘরের ভিতরের আসবাবপত্রে বার্ধক্য এসে গেছে। ধন্বন্তরি কবিরাজ একটা কাঠের সোফা দেখিয়ে দিলেন। সোফার ব্যাক রেস্টে সাদা কাপড়ের ওপর কুরুশ দিয়ে বোনা হরিণ দুটো কবিরাজের যুবা বয়সের হবে। পাশে একটা কাঠের চেয়ার, একটা মোড়া। সামনে কাঠের ছোট কফি টেবিল। নমিতা বসল।

‘দেখি ভালো করে,’ গগনের নাকটা আস্তে আস্তে দু-আঙুলে ধরে কবিরাজ একটু নাড়িয়ে বললেন ‘না, নাকটা ভাঙেনি। ঠিক আছে, ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এটা কীভাবে বাধালি?’ কবিরাজ এবার গগনের চোখের নীচটা ভালো করে দেখলেন। ‘আমি তোর ওষুধ নিয়ে আসছি, কবিরাজ ভিতরে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পর একটা কাগজের পুরিয়া নিয়ে এসে গগনকে বললেন, ‘এটা খেয়ে নে। রাতে খাওয়ার পর আরেক ডোজ, তিন দিন খাবি—এগুলো পকেটে রাখ। আর চোখের নীচে একটু বরফ ঘষবি কয়েকটা দিন।’

গগন বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লো। কবিরাজ চেয়ারে বসলেন। নমিতা কীভাবে কথা শুরু করবে ভেবে না পেয়ে বলল, ‘বিদ্যাদির সঙ্গে আবার যোগাযোগ হওয়ায় এত ভালো লাগছে। উনি আমাদের যাকে বলে আইডল ছিলেন। কী দুর্ধর্ষ রেজাল্ট!’

‘আপনি তাহলে ওকে মনে রেখেছেন। ও তো লোকচক্ষু থেকে কবে হারিয়ে গেছে,’ ধন্বন্তরি কবিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

বৃদ্ধ মানুষটার চোখের দৃষ্টিতে ব্যথা দেখে নমিতা বুঝল প্রসঙ্গটা পাল্টানো দরকার। অ্যাডভোকেট বসাক বললেন, ‘স্যার, প্রথমে আপনাদের অনেক ধন্যবাদ জানাই এই ‘বেহুলার খনা’ বইতে প্রাচীন খনার বচনগুলি কম্পাইল করে একটা বইয়ে ছাপাবার জন্য। এই বইটা—’

‘ওসব বিদ্যার কাজ। আমাদের মা এই খনাবাক্যগুলি প্রায়ই বলতো। বিদ্যা শিশুকাল থেকেই শ্রুতিধর। বিদ্যা ওর স্মৃতিতে এই খনাবাক্যগুলি এখনও ধারণ করে রেখেছে। ও এখনও প্রতিটি বাক্য আনুপূর্বিক আবৃত্তি করতে পারে। ও-ই গগনকে খনাবাক্যগুলি লিখে দিয়েছে। হ্যাঁ, গগন বলছিল যে বইটা নাকি কোন এক মামলার জন্য কাজে লাগবে। বিদ্যা কী বলল?’

অ্যাডভোকেট বসাক একটু দুঃখিত হয়ে বললেন ‘উনি অনুরোধ করলেন ওঁকে বিরক্ত না করতে। অথচ আমাদের প্রতিপক্ষ খুব শক্তিশালী। বিদ্যাধরী দেবীর সাহায্য পেলে আমরা কোর্টে ওদের হারাবার ক্ষমতা রাখি। কিন্তু উনি এই চাপ নিতে রাজি হলেন না।’

ধন্বন্তরি কবিরাজ একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, ‘মেয়েটা অনেক বছর ভীষণ ভুগেছে। অমানুষিক যন্ত্রণা। ওকে আর আপনারা বিরক্ত করবেন না।’

‘ঠিক আছে,’ মাধবী বসাক বললেন। ‘আমরা ওঁকে নিশ্চয়ই বিরক্ত করব না। আমি জানি না আপনার বোনের কী অসুবিধা। এটা ওঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি একজন উকিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ি। আজও একটা বড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ছি। এটা দেখুন, নমিতা দেখল মিস বসাক কালকের আইপ্যাডের ফটোগুলো ইতিমধ্যে প্রিন্ট করিয়ে রেখেছেন। মিস বসাক গাড়ি অ্যাকসিডেন্টের ছবিগুলো কবিরাজকে দিলেন।

‘ইস! কী মারাত্মক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?’ কবিরাজ মশাই বিস্মিত। ‘কার?’

‘যার অ্যাকসিডেন্টটা হয়েছে তার নাম ড. আরুষি মিশ্র। ‘সুশ্রুত’ নামে এক ওষুধের কোম্পানির

‘কী বললেন? সুশ্রুত! মানে এই জিঞ্জিরাবাজারের কাছে যাদের ফ্যাক্টরি?’

‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। ওই কোম্পানির বর্তমান মালিক ড. আরুষি মিশ্রকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। ভাগ্যক্রমে মেয়েটা বেঁচে গেছে।’

‘হা ভগবান!’ কপাল চাপড়ালেন কবিরাজ। ‘আমি তো ওদের পরিবারকে খুব ভালোভাবে চিনি। সুব্রত মিশ্র, শমীক মিশ্র—’

‘হ্যাঁ, আরুষি শমীক মিশ্রের মেয়ে। আমি ওর মা। মেয়েটা একটা বিদেশি ওষুধের কোম্পানির সঙ্গে আদালতের মামলায় ফেঁসে আছে।’

‘বিদ্যাও তো আরুষিকে খুব ভালো করে চেনে। বিদ্যা জানে এত সব?’

‘না, ওঁর শরীরের কথা ভেবে আমরা আর ওঁকে বিরক্ত করিনি।’

‘না না, তা বললে কি হবে? একটা বাচ্চা মেয়ে একলা লড়াই করছে বিদেশি ওষুধের কোম্পানির সঙ্গে, আমরা তার সঙ্গে থাকব না? নিশ্চয়ই থাকব। আমি আমার ছেলে বাবলুকেও জানাব, ও বিদেশ থেকে যদি কোনো সাহায্য করতে পারে। এই বিদেশি কোম্পানিগুলো খুব ডেঞ্জারাস।’

‘আপনার ছেলে বিদেশে থাকে?’

‘হ্যাঁ, আমার ছেলে বাবলু আমেরিকায় থাকে। বাবলুও একটা বড় ওষুধের কোম্পানিতে কাজ করে। নাম শুনে থাকবেন হয়তো আপনারা—অ্যামফার্মা

‘আপনার ছেলে অ্যামফার্মাতে কাজ করে?’ মিস বসাক বিস্মিত।

‘হ্যাঁ। নামটা শুনেছেন তাহলে। খুব বড় কোম্পানি, খুব বড় চাকুরি। ছেলের এত ব্যস্ততা যে বাড়ি আসার সময় পায় না।’

‘কী নাম আপনার ছেলের?’

‘বাবলু। ভালো নাম তথাগত। ড. তথাগত দাস। আপনারা একদম চিন্তা করবেন না। বিদ্যা বাড়ি আসুক, আমি ওকে বোঝাব।’

কবিরাজের ছেলের নামটা মিস বসাকের মুখে যেন কাঠকয়লা ঘষে দিল। উজ্জ্বল চোখ দুটোতে এক মুহূর্তে রাহুগ্রাসের আঁধার নেমে এল। মিস বসাক ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি এই ফোটোগুলো রেখে দিন, ওঁকে দেখাতে পারেন। আমার কাছে কপি আছে। আর গগনের কী অবস্থা ওরা করেছে নিজের চোখেই দেখুন।’

কবিরাজ বিস্ময়ে গগনের দিকে তাকাল। নমিতা দেখল কবিরাজের দৃষ্টি ক্রমশ কঠোর হয়ে উঠল—‘কেন ওকে এভাবে মেরেছে?’

‘গগনের অপরাধ যে ও মিথ্যা সাক্ষী দিতে অস্বীকার করেছে। শুধু ওকে মেরেই ক্ষান্ত হয়নি। যে কটা খনার বই সঙ্গে ছিল, সব ওরা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে গগনকে শাসিয়েছে যে ও যদি কক্ষনো খনার বই বিক্রি করে তবে ওকে চলন্ত ট্রেন থেকে এবার ফেলে দেবে।’

কবিরাজের দৃষ্টিতে প্রকাশ পাচ্ছে তিনি হতবাক। কী করবেন তা ভেবে উঠতে পাচ্ছেন না।

‘আমরা তাহলে উঠি, স্যার। আমাদের অনুমতি দিন,’ অ্যাডভোকেট মাধবী বসাক উঠে দাঁড়ালেন। তারপর কী মনে করে বললেন ‘একটা প্রশ্ন ছিল স্যার, সম্ভবত এটা কোর্টে প্রতিপক্ষ আমাকে জিজ্ঞাসা করবে। ‘বেহুলার খনা’ বইতে যে ডিঙিবৃষ্টির কথা লেখা আছে সেটা কি সত্যি হয়েছিল?’

‘আমি তো দেখিনি বাবা, কয়েকশো বছর আগের ঘটনা। কিন্তু আমি বেহুলার কথা বিশ্বাস করি। আকাশ থেকে ডিঙি বৃষ্টিতে অজস্র ডিঙি মাটিতে নেমে এসেছিল।’

‘কিসের বৃষ্টি?’ নমিতা ভাবল ও ভুল শুনছে।

‘ডিঙির,’ কবিরাজ বললেন। ‘প্রচুর ডিঙি, ডিঙা, ডোঙা, পানসি, কোশা, ছাঁদি, ভেদী আকাশ থেকে ডিঙিবাদল গ্রামে বৃষ্টিধারার মতো নেমে এসেছিল। গোটা গ্রামের অনেক মানুষ মারা পড়েছিল।’

আর কথা বাড়াবার সাহস হল না নমিতার। মনে অপরাধবোধ। বড় ভুল করে ফেলেছে সে। আরুষির শত্রু তথাগত দাস বিদ্যাদির ভাইপো! তাহলে বিদ্যাদিকে কীভাবে তার নিজের ভাইপোর বিরুদ্ধে লড়তে বলবে?

ধন্বন্তরি কবিরাজ বাইরে গলিতে বেরিয়ে ওদের গাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিলেন। গাড়ি একটু এগিয়ে স্টেশন রোডে উঠতে মাধবী বসাক ফ্রন্ট সিটে বসে তার কাঁধে ঝোলানো পার্স থেকে একটা একশো টাকার বাণ্ডিল বের করলেন। তারপর পিছন ঘুরে গগনের দিকে টাকার বাণ্ডিলটা বাড়িয়ে বললেন, ‘গগন ভাই, আপনি এটা রাখুন।

‘এটা কী ম্যাডাম?’

‘এটা আপনার।’

‘এত টাকা! না না! এ আমি নিতে পারব না ম্যাডাম,’ গগন বলল।

‘মায়ের ব্রোঞ্জের চুড়ি বন্ধক রেখেছেন। মায়ের আশীর্বাদ কাছছাড়া করতে নেই। মায়ের চুড়ি ছাড়িয়ে নেবেন। আমি আপনার থেকে বয়সে অনেক বড়। বড় দিদি দিচ্ছে মনে করুন। নিন, প্লিজ এটা রাখুন, আমার ভালো লাগবে। আমাদের জন্য আপনার অনেক ভোগান্তি গেছে।’

নমিতা রিয়ার ভিউ মিররে গগনের চোখ-মুখ দেখতে পাচ্ছে। নমিতার মনে হলো গগন বুঝি কেঁদেই ফেলবে—‘ম্যাডাম, আমার বিদ্যাদিদিকে দেখে বড় কষ্ট হয়। বিদ্যাদিদিও ঠিক আপনার মতো দয়ালু।’ গগন চোখ মুছল।

স্টেশনের কাছে গগন নেমে গেল। তারপর মিস বসাক নমিতাকে বললেন, আরুষির এই কেসে আপনার বিদ্যাদির সার্ভিস নেওয়া সম্ভব না।’

‘সেটা আমিও বুঝেছি,’ নমিতা বলল। ‘তাছাড়া বিদ্যাদি নিজেই হয়তো রাজি হবেন না।’

মিস বসাক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ‘আপনি কোন দিকে যাবেন?’

মিস বসাককে খুব ক্লান্ত লাগছিল। নমিতার মনে হলো একজন মা মরিয়া হয়ে তার মেয়ের জন্য লড়াই করছে। তাকে এভাবে একলা ছেড়ে দেওয়া যায় না। নমিতা বলল, ‘আমি আপনাকে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে তারপর বাড়ি যাব।’

‘দেবেন?’ মিস বসাকের মুখে খুশির রেখা। ‘আপনার কষ্ট হবে না তো?’

‘না না কষ্ট কিসের? কোথায় উঠেছেন আপনি?’

‘গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন।’

‘আমার বাড়ির কাছাকাছিই। ভালোই হল অনেকটা সময় গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।’

‘থ্যাঙ্ক ইয়ু। সকালে বলছিলেন, আপনার বিদ্যাদির সেই ডিবেটের গল্পটা খুব ইন্টারেস্টিং লাগছিল শুনতে। বলুন না বাকিটা শুনি। ওঁর সাহায্য না পেলেও একজন বিদুষী মহিলার সম্বন্ধে জানতে তো পারব।’

‘হ্যাঁ, ডিবেটে তারপর এলো বিদ্যাদির টার্ন,’ নমিতা যেখানে শেষ করেছিল সেখান থেকে শুরু করল ‘বিদ্যাদি এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল—খনার বচনের ভাষা আধুনিক, অত প্রাচীনকালের খনা আধুনিক ভাষা কিছুতেই লিখতে পারেন না, অতএব খনা ছিলেনই না, এই যুক্তি যে কত বড় ভুল সেটা আগে প্রমাণ করা যাক। একটা উদাহরণ দিই—বাংলায় একটা খুব প্রচলিত প্রবাদ আছে—দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো। এটা এত আধুনিক বাংলা ভাষায় লেখা প্রবাদ যে লোকে বলবে এখনকার কোনো কবি এটা লিখেছেন। কিন্তু তারপর যখন পণ্ডিতেরা চর্যাপদ ঘাঁটতে শুরু করলেন, তাঁরা হঠাৎ একই প্রবচন দেখতে পেলেন সরহপার লেখায় বর সুণ গোহালী কি সো দুঠট বলন্দে, তখন আমরা মেনে নিই যে এই প্রবাদের স্রষ্টা চর্যাপদের লেখক সরহপা, অর্থাৎ এই প্রবাদের উৎসকাল হলো ৮০০-১২০০ সাল। আবার আরো পিছিয়ে যখন সংস্কৃতে পাই—বরং শূণ্যা শালা ন অচ খলু বরং দুষ্টবৃষভঃ, তখন আমাদের ধন্ধ লাগে। তাহলে এই প্রবচনের সময়কাল আরো পুরোনো? খনার বচনের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার হয়েছে। গুপ্তযুগে বিদুষী খনার সংস্কৃতে লেখা মূল্যবান প্রবচনগুলি রূপান্তরিত হতে হতে আজ আধুনিক বাংলার বচনে এসে দাঁড়িয়েছে। অতএব, এই আধুনিক প্রবচন দিয়ে খনার বয়স নির্ণয় করা যুক্তিযুক্ত নয়। খনার ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্য যে খনার পুঁথি পাওয়া যায়নি, পেলে হয়তো সরহপার মতো ব্যাপারটা সহজ হয়ে যেত। আমি আরেকটি উদাহরণ দিই, আধুনিক প্রবাদ আছে যে ‘হাতে শাঁখা দর্পণে দেখা’। একই প্রবাদ কবি ঘনরাম চক্রবর্ত্তী লিখেছেন—হাতে শঙ্খ, দেখিতে দৰ্পণ নাহি খুঁজি। একই প্রবাদ আরো আগে বিদ্যাপতির লেখায় পাই—হাথক কাঁকণ আরসী কি কাজ। আরো আগে যদি কেউ খোঁজেন, তিনি রাজশেখরের কর্পূরমঞ্জরীতে পাবেন হখে কঙ্কণং কিং দপ্পণেন। রাজশেখর ৮৮০ থেকে ৯২০ সালের মধ্যে ছিলেন। একই প্রবাদ সরহপা চর্যাপদে লিখে গেছেন—হাথেরে কাণকণ মা লোউ দাপণ। তাহলে এই বচনের অরিজিনাল লেখক কে? আমরা জানি না। কিন্তু এই অতীতের পুঁথিগুলি যদি না পেতাম এবং আমরা বলতাম যে অতীতের এই কবিরা ছিলই না, সেটা কি ঠিক হতো?’

‘বাহ্! দারুণ কথা বলেছিলেন আপনার বিদ্যাদি,’ মিস বসাক চমৎকৃত।

নমিতা হাসল–‘বিদ্যাদি যে কী ট্যালেন্টেড ছিলেন তা বোঝানো আমার পক্ষে অসম্ভব মিস বসাক। পৃথুযশ ভৌমিক ছিলেন যাকে বলে সরস্বতীর বরপুত্র। তাঁকে বিএ আর এমএ-তে অবলীলাক্রমে হারাতে পারেন একমাত্র স্বয়ং মা সরস্বতী। বিদ্যাদি ছিলেন স্বয়ং মা সরস্বতী।’

‘আপনি তো নিজেকে কমিউনিস্ট বললেন, এখানে ঠাকুর—’ মিস বসাক হাসলেন।

‘ওটা অ্যালিগরি,’ নমিতাও হেসে ফেলল। ‘বিদ্যাদি সেরকমই বিদুষী ছিলেন। ওঁর রিসার্চ—জাস্ট ভাবা যায় না!’

‘এক্সিলেন্ট। পৃথুযশ এর উত্তরে কী বলল?’

‘পৃথুযশ বোধহয় বুঝতে পারছিল ফার্স্ট রাউণ্ডে বিদ্যাদিকে নক আউট করা গেল না। তাই পৃথুযশ এবার বলল, ‘তাই বলে খনার শ্লোক পালটে দেবে? তামাক ঢুকিয়ে দেবে?’ বিদ্যাদি তা শুনে অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল সে দোষটা তো খনার নয়। পরবর্তী যুগের কবির। যেমন, ব্যাসদেবের মূল মহাভারতে আছে দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরের সময় কর্ণ যখন লক্ষ্যভেদ করতে গেল তখন দ্রৌপদী বলল নাহং বরয়ামি সূতম, আমি সারথিকে বিবাহ করব না। তারপর বাংলায় মহাভারত লেখার সময় কাশীরাম দাস ঘটনাটাকে আমূল পালটে লিখলেন কৃষ্ণের চক্রান্তে কর্ণ লক্ষ্যভেদ করতে পারল না।

সুদর্শনচক্রে ঠেকি চূর্ণ হয়ে গেল।
তিলবৎ হয়ে বাণ ভূতলে পড়িল।

কাশীরাম দাস হয়তো চাননি দ্রৌপদীকে জাত-পাতের বিতর্কের মধ্যে টানতে, তাই তিনি এমনটা লিখলেন। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে মূল মহাভারতে এমনটাই লেখা ছিল। তাছাড়া ওটা কাশীরাম দাসেরই যে লেখা কিনা তা কে জানে? কাশীরাম দাস ষোড়শ’-সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ এগারো বছর ধরে মহাভারত অনুবাদ করতে করতে বিরাটপর্ব শেষ করার পর বাঘের আক্রমণে নিহত হয়েছিলেন। তখন বাকি মহাভারতের অনুবাদ শেষ করেন তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা গদাধর, ভ্রাতুষ্পুত্র নন্দরাম এবং আত্মীয় ভিগুরাম।’

‘বাহ্!’ মিস বসাক অন্যমনস্ক। ‘আপনার বিদ্যাদিকে যদি দলে পেতাম!’

‘এরপর বিদ্যাদি পৃথুযশের বক্তব্য খণ্ডন করে বলল আমার পূর্ববর্তী বক্তা বললেন যে খনা বিদুষী ছিল কিনা তার কোনো প্রমাণ নেই। আমার পূর্ববর্তী বক্তা বললেন কতদূরে কলাগাছ পুঁতবে, কিংবা মঙ্গলের ঊষা বুধে পা এসব শুনেই কাউকে বিদুষী বলা যায় কি? খনার জ্ঞান কতটা গভীর ছিল তা বুঝবার মতো শিক্ষা আমাদের ক’জন বাঙালির আছে? বোঝাবার জন্য শুধু একটা উদাহরণ দিই—খনার একটি বচন আছে

দশযোগভঙ্গে পড়ে মহামারী
সপ্তশলাকে বিধবা নারী।’

ট্রাফিক লাইট লাল থেকে সবুজ হল। গাড়ি গিয়ারে দিতে দিতে নমিতা মিস বসাকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এর মানেটা কী বলতে পারবেন?’

‘নাঃ।’

‘সপ্তশলাকবেধ, দশযোগভঙ্গ এসব ফলিত জ্যোতিষের খুবই জটিল বিষয়। আমরা ক’জন জানি এগুলো কতটা জটিল? খনা যে কত বিদুষী ছিল তা প্রমাণ করতে গিয়ে বিদ্যাদি বলল, সপ্তশলাকবেধের সংজ্ঞা হল—

কৃত্তিকাদিচতুঃসপ্তরেখারাশৌ পরিভ্রমন।
গ্রহশ্চেদেকরেখস্থোবেধঃ সপ্তশলাকজঃ।।

কৃত্তিকাদি অষ্টবিংশতিরেখাতে চন্দ্র নিয়তই ভ্রমণ করেন, কিন্তু চন্দ্রাতিরিক্ত গ্রহ যদি কর্মকালীন নক্ষত্রে কী তাহার বেধনক্ষেত্রে অবস্থিতি করেন তবে সপ্তশলাক বেধ হয়ে থাকে। আমার অদ্ভুত লাগে কীভাবে একজন প্রাচীন বিদুষী বাঙালি মহিলা এত কঠিন একটা বিষয় কত সহজ করে আমাদের মতো আনাড়িদের কাছে ব্যাখ্যা করে গেছেন।’

‘বাপরে ড. স্যান্যাল, আপনিও তো কম পণ্ডিত নন, মিস বসাক প্রশংসার স্বরে বললেন। ‘অথচ আপনি এত বিনয়ী, পাণ্ডিত্যের অহংকারের ছোঁয়াও নেই আপনার ব্যবহারে।’

‘যে বিদ্যাদির পাণ্ডিত্য দেখেছে, সে নিজের পাণ্ডিত্য সম্বন্ধে অহংকার করতে লজ্জা পাবে,’ নমিতা বলল। ‘বিদ্যাদি সেদিন ডিবেটে প্রফেসরদের লজ্জা পাইয়ে দিয়েছিল। বিদ্যাদি বলেছিল খনা খুব ভালোই সংস্কৃত জানতেন এবং উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই যে সংস্কৃতেও খনা অত্যন্ত অল্পকথায় তার বচন ব্যক্ত করতেন। এটাই খনার সিগনেচার স্ট্যাম্প।’

‘বাপরে! কিন্তু আপনি এত শ্লোক মুখস্থ করে রেখেছেন?’

‘নিজের চোখে দেখেছি তো। তাছাড়া আমি ক্লাসে এই ডিবেটের গল্প প্রত্যেক বছর ছাত্রদের শোনাই। তাই মুখস্থ হয়ে গেছে,’ নমিতা হাসল।

‘তারপর কী হল? কে জিতল?’

‘আরো কিছুক্ষণ চলল সমানে সমানে টক্কর। বিদ্যাদির একের পর এক ধারালো যুক্তির কাছে পর্যুদস্ত হয়ে পৃথুযশ মরিয়া হয়ে বলল—ঠিক আছে, তবে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা যাক। বঙ্গদেশে কবে জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা শুরু হয়েছে সে বিষয়ে কোনো লিখিত বিবরণ না থাকলেও বাংলার জ্যোতির্বিদদের কুলগ্রন্থ থেকে আমরা একটা মোটামুটি সময় কাল পাই। রাজা শশাঙ্কের সময় বঙ্গে সপ্তসতী নামে ব্রাহ্মণরা জ্যোতিষচর্চা করতেন, তারা এত মূৰ্খ ছিল যে শশাঙ্ককে গ্রহযাগ সম্পাদনের জন্য সরযূ তীর থেকে বারোজন ব্রাহ্মণকে বঙ্গে নিয়ে আসতে হয়। সেই ব্রাহ্মণরা জ্যোতিষে এত পারঙ্গম ছিলেন যে তাঁরা গ্রহবিপ্র নামে খ্যাত হলেন। কিছুকাল পর কনৌজ থেকে আগত ব্রাহ্মণদের গাঞী প্রতিষ্ঠা পেল, তারপর সেন রাজাদের সময়েও জ্যোতিষীদের সমাদর ছিল। এরপর চৈতন্যদেবের জন্মকালে নবদ্বীপের গ্রহবিপ্রগণ তাঁর জন্মের ভাবী ফলাফল গণনা করেন। তারপর সপ্তদশ শতকে নদীয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠার পর থেকে সকল জ্যোতির্বিদের নাম আমরা জানি—পণ্ডিত রামরুদ্রবিদ্যানিধি, রামকৃষ্ণবিদ্যানিধি, প্রাণনাথবিদ্যাভরণ, রামজয়শিরোমণি—ইত্যাদি। খনা যদি বিখ্যাত জ্যোতিষী হবেন তবে খনার নাম এঁদের মতো বাংলার ইতিহাসে নেই কেন?’

‘মিস দাস কী বললেন এর উত্তরে?’

‘বিদ্যাদি এতটুকু বিচলিত না হয়ে বলল—আপনি এতজন পুরুষ জ্যোতিষীর নাম বলে গেলেন, আপনি তিনজন বাঙালি নারী জ্যোতিষীর নাম বলুন তো? এই প্রশ্নের জন্য পৃথুযশ ভৌমিক যেন প্রস্তুত ছিল না। সে থতমত খেয়ে গেল। বিদ্যাদি বলল তার মানে কি এই যে হাজার বছরে আমাদের বাংলায় কোনো নারী বিদুষী জ্যোতিষী ছিলেন না? নিশ্চয়ই ছিলেন। কিন্তু পুরুষেরা তাদের নাম জনসমক্ষে আনতে দিতে চায়নি। তাই ইতিহাসে তাদের নাম নেই। খনাও ছিলেন পুরুষের সেই জটিল মানসিকতার শিকার।’ নমিতা হেসে একটা বড় শ্বাস নিল, তারপর বলল, ‘দুই প্রতিভাধর মানুষের এক ঐতিহাসিক ডিবেট দেখেছিলাম। আপনার এই কেস মিটে গেলে একদিন আপনার সঙ্গে বসে সব ডিটেলে বলব, কিন্তু সেদিন আমি বুঝতে পারলাম যে কেন বিদ্যাদি পৃথুযশের মতো অসাধারণ মেধাবী ছাত্রকে ইউনিভার্সিটির পরীক্ষায় বারবার হারিয়েছে। বিদ্যাদি অসামান্যা। এরকম বিদুষীকে চোখের সামনে দেখার জন্যও ভাগ্য দরকার হয়।’

‘আমার দুর্ভাগ্য!’ মিস বসাক আক্ষেপ করলেন। ‘বিদ্যাধরী দেবীই জিতলো শেষ পর্যন্ত?’

‘এরপর এল বিচারকদের পালা ডিবেটের ফলাফল ঘোষণা করার। ড. বক্সী ও ড. গ্যালাগার দু’জনে নীচু গলায় নিজেদের নোটপ্যাড নিয়ে আলোচনা করলেন। সকলেই বুঝে গেছে যে বিদ্যাধরীই আজকের ডিবেটে জয়ী। কিন্তু সকলকে অবাক করে বিচারকদ্বয় পৃথুযশকে জয়ী ঘোষণা করেছিল। গোটা দ্বারভাঙা হল বাকরহিত।’

‘এ কেমন একপেশে বিচার?’

‘গোটা দ্বারভাঙা হল স্তম্ভিত! সেদিন আমি বুঝিনি, কিন্তু এর ঠিক ছ’মাস পর আমি বুঝেছিলাম কেন বিদ্যাদিকে হারানো হয়েছিল। কত বড় চক্রান্তের শিকার বিদ্যাদি আর কেন বিদ্যাদির জীবনে ঘটেছিল এক মারাত্মক ঘটনা।’

হর্ন দিল নমিতা। রাস্তায় খুব ভিড়। রাসবিহারি থেকে গড়িয়াহাট পর্যন্ত গাড়ির জঙ্গল কচ্ছপের গতিতে পার হতে নমিতার অনেকটা সময় লেগেছে। মিস বসাকের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ‘গগনের ফোন!’ মিস বসাক ফোনটা স্পিকারে রাখলেন। গগনের গলার স্বরে উত্তেজনা। ‘ম্যাডাম, আমি গগন বলছি।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, গগন, বলো। নাক কেমন আছে?’

‘ঠিক আছি ম্যাডাম। কবিরাজমশাই এক্ষুনি ফোন করেছিলেন। দিদি রাজি হয়েছেন আপনাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য।’

‘সত্যি!’ মিস বসাক বললেন।

‘কাল দুপুর দুটোর সময় বৌবাজারে ‘অনিকেত’ নামে একটা এনজিওর অফিসে থাকবেন উনি। আপনাদের সেখানে আসতে বলেছেন।’

‘এ তো দারুণ খবর। কী বললেন উনি?’

‘সব শুনে দিদি নাকি হঠাৎ রেগে গেলেন। তারপর দিদি আমাকে ফোন করে বকাবকি করলেন যে আমি কেন আমার নাক নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছি। তারপর দিদি বললেন আরুষি ম্যাডামকে দিদি খুব ভালোভাবে চেনেন।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ, গগন। তুমি এতটা করলে আমাদের জন্য।’

‘না না, ম্যাডাম। আসল কাজটা তো আপনাদের করতে হবে।’

‘তুমি ‘অনিকেত’এর ঠিকানাটা দিতে পারবে?’

‘আমি বলছি, আপনি লিখে নিন ম্যাডাম।’

মিস বসাক ওর মোবাইলে গগনের বলা ঠিকানাটা লিখে নিলেন। তারপর বললেন, ‘গগন, তোমার পুলিশে একটা রিপোর্ট লেখানো উচিত। আমি কি কাল তোমায় থানায় নিয়ে যাব?’

‘না না ম্যাডাম, থানা-পুলিশ করার কোনো দরকার নেই। পুলিশ-টুলিশের থেকে যত দূর থাকা যায় ততই ভালো।’

‘ঠিক আছে, গগন, আমি যা করার করব,’ মিস বসাক বললেন। ‘লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশের সঙ্গে আমার খুব ভালো আলাপ আছে। আমি অলরেডি ওঁর সঙ্গে আরুষির ব্যাপারে ফোনে কথা বলেছি। আমি লালবাজারে যখন যাব, তোমার কথা বলব। তুমি একদম চিন্তা কোরো না।’

‘তাহলে তো খুব ভালো হয়, ম্যাডাম,’ গগন বলল। ‘আপনাদের উকিলদের তো অনেক চেনাশোনা। আপনি যা ভালো বোঝেন করবেন। পুলিশ চাইলে ঠিক খুঁজে বের করবে ওই বদমাশগুলোকে। ম্যাডাম, আমি এখন মায়ের ব্রোঞ্জের চুড়িটা ছাড়াতে যাচ্ছি। আমি আজ রাখি?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ গগন, ভালো থেকো ভাই।’ মিস বসাক ফোন নামিয়ে রাখলেন। নমিতার মনে হলো ঈশ্বর তাদের দু’জনকেই পুরোনো পাপ মিটিয়ে ফেলার অন্তত একটা সুযোগ দিচ্ছেন। নমিতা বলল, ‘মিস বসাক, আপনি চেনেন ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশকে?’

‘হ্যাঁ,’ মিস বসাক বললেন। ‘আমাদের উকিলদের খুব ভালো নেটওয়ার্ক রাখতে হয়। অবশ্য মনসুর আমার সঙ্গে সেন্ট জেভিয়ার্সে এক ক্লাসে পড়ত। খুব ডাকাবুকো ছেলে ছিল। আরুষির কথা ওকে জানিয়েছি। ও বলেছে চিন্তা না করতে। দেখি ও কতদূর করতে পারে।’

গোলপার্কের পেট্রল পাম্পে গাড়ি থামাল নমিতা। পেট্রল ভরতে হবে। মিস বসাক বললেন, ‘আমি এটুকু হেঁটে চলে যাব।’ গাড়ি থেকে নামল নমিতা। মিস বসাক নমিতার পাশে এসে বললেন, ‘থ্যাঙ্কস আ লট, ড. স্যান্যাল, আপনি আমার জন্য অনেক সময় দিলেন। কাল থেকে আপনার এই কলকাতার গরম থেকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি। উইশ ইউ আ গ্রেট ভেকেশন—’

‘অ্যাকচুয়ালি –’ নমিতা বলল ‘আমার ছুটি আমি ক্যানসেল করছি না মিস বসাক। তবে আমার ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে আমার মানালি ট্রিপটা ক্যানসেল করে দিচ্ছি। কিছু লোকসান হবে, কিন্তু মন বলছে অনেক লাভও হবে। আমি আপনার সঙ্গে সঙ্গে আগামী দু’সপ্তাহ আছি।’

‘রিয়্যালি!’ মিস বসাক খুশিতে আত্মহারা। ‘আপনি আমাদের জানেন না, চেনেন না, তবু আপনি এত সাহায্য করছেন আমার মেয়েটার জন্য। আপনার সঙ্গ আমাকে একটা পজিটিভ ভাইব দিচ্ছে। মনে হচ্ছে ঈশ্বরই আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।’

‘আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট নাস্তিক, মিস বসাক,’ নমিতা হেসে বলল। ‘কলেজে লাল ঝাণ্ডার সামনে দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতাম। সেখানে আপনার ঈশ্বরের নো-অ্যাডমিশন ছিল। অ্যাকচুয়্যালি, আমার নিজের সঙ্গেই একটা ইম্পর্ট্যান্ট বোঝাপড়া আনফিনিশড় রয়ে গেছে। লং ওভারডিউ। সেজন্যই মানালি ট্রিপটা ক্যানসেল করলাম।’

অ্যাডভোকেট বসাক ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন। তারপর বোধহয় নমিতার প্রাইভেসিকে রুম দিতে বললেন ‘চলুন আর কথা বাড়াব না। সবই তাঁর ইচ্ছা। আমি তো মা সারদার কাছে আত্মসমর্পণ করে জীবনে অনেক শান্তি পাই। আপনি যদি সময় নিয়ে ‘বেহুলার খনা’ পড়তে শুরু করেন তাহলে খুব ভালো হয়। সময় তো হাতে বেশি নেই।’

‘আজ রাতে শুরু করব, কাল কলেজ নেই, অনেক রাত পর্যন্ত পড়তে পারব। দেখি কতটা শেষ করতে পারি।’

‘খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়বেন প্লিজ।’

‘হ্যাঁ, পৃথু্যুশের চোখ দিয়ে পড়ব,’ নমিতা হেসে বলল। ‘গুড নাইট।’

‘গুড নাইট,’ মিস বসাক রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের দিকে হাঁটা লাগালেন। নমিতা তাকিয়ে রইল। মনে খুব তৃপ্তি। একজন মায়ের লড়াইতে সে তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। কিন্তু শুধু কি তার জন্য? নাকি নিজের স্বার্থে? তবে আজ রাত্তিরে ‘বেহুলার খনা’ বইটার আগাপাস্তলা পড়ে ফেলতে হবে।