বিদ্বান বনাম বিদুষী – ৮
।। আট।।
গ্রামের নাম ডিঙাডুবি।
গ্রামটার এরকম বিদঘুটে নাম কেন হয়েছিল তা নিয়ে অনেক তর্কাতর্কি হয়ে গেছে এ গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে। কিন্তু একথাটা মোটামুটি সকলেই মানে যে কোনো বিশেষ ডিঙা এ-গাঁয়ের কাছে নদীতে ডুবেছিল, আর তার থেকেই এই নাম।
কিন্তু কার ডিঙা?
গাঁয়ের বুড়োদের বরাবরই অতিরঞ্জন করে বলার অভ্যেস। ওরা সবজান্তা জ্ঞানীবদনে মঙ্গলকাব্যের সঙ্গে দিব্যি গ্রামের নামটা জুড়ে বলে যে প্রচুর ধনসম্পত্তি উপার্জন করে বাড়ি ফেরার সময় চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা নাকি মা চণ্ডীর রোষে এই ডিঙাডুবিতেই ডুবেছিল। এখন যেখানে ডিঙাডুবি গ্রাম একসময় সেখান দিয়েই প্রচুর জলরাশি নিয়ে বয়ে যেত বিদ্যাধরী নদী।
ডিঙাডুবি যে একসময় সরে যাওয়া বিদ্যাধরীর গর্ভেই নিমজ্জিত ছিল সে কথা অবশ্য অবিশ্বাসের কোনো কারণ নেই। গ্রামের এদিক ওদিকের বুজে আসা খাতগুলো দেখলেই বোঝা যায় নদী সরে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে বালি জমে খাত ভরাট হয়ে এদিককার ডাঙা জেগে উঠেছিল। মাত্র বিশ হাত মাটি খুঁড়লেই ভেজা-মাটি চুঁইয়ে জল উপরে উঠে আসে। কারও কারও বাড়ির কুয়ো খুঁড়তে গিয়ে ভাঙা নৌকোর কাঠ মাটির নীচ থেকে পাওয়া গেছে এটা অনেকেই নিজ চক্ষে দেখেছে। জাহাজ যে চলতো তা খুব একটা বেশিদিনের কথা নয়। মহারাজ প্রতাপাদিত্যের আমলেও নাকি এই পথে পাল তোলা কাঠের জাহাজ চলাচল করত। গ্রামের পাশে পুষ্করিণী খনন করতে গিয়ে একবার জাহাজের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছিল, ডিঙাডুবির মানুষেরা অনেকে নাকি সেই কাঠ দিয়ে কুঁড়েঘরের খুঁটি বানিয়েছিল সেই খুঁটি আজও দাঁড়িয়ে, এত মজবুত সেই কাঠ।
এ অঞ্চল থেকে কোনো শিলালেখ, তাম্রশাসন বা সনন্দ পাওয়া যায়নি, বা কোনো অতি প্রাচীন পুঁথি-টুথিতে এই গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায় নি। বিপ্রদাস পিপলাইয়ের ‘মনসামঙ্গল’-এ চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্য যাত্রা পথের বর্ণনায় বহু জনপদের উল্লেখ আছে কিন্তু ডিঙাডুবির কোনো উল্লেখই নেই। ডিঙাডুবি তখনকার কোনো বর্ধিষ্ণু জনপদ হলে নিশ্চয়ই তার উল্লেখ থাকত। তবু চাঁদ বেনের সাত-ডিঙার গল্প বিশ্বাস করে অনেক ভাগ্যান্বেষী কতকাল আগে থেকেই ডিঙাডুবির খাতে নেমে মাটি খুঁড়ে খুঁজেছে এককালের সেই সলিল সমাধি পাওয়া ধনরত্ন। সকলেই যে হতাশ হয়েছে তা নয়, কেউ কেউ কদাচিৎ কিছু পেয়েওছে। চণ্ডীমাতাকে প্রণাম করে ঘরে তা তুলে রেখেছে, আর তারপর দৈন্যদশায় পেটের তাগিদে কাপাসডাঙার হার্টে একসময় বেচে দিয়েছে। ধীরে ধীরে এই ভাগ্যান্বেষী মানুষের সংখ্যা কমতে কমতে একমাত্র জটা পাগলাতে এসে ঠেকেছিল।
মোষখাগীর পীর বসির আলি একবার দেওয়ান দুর্লভচাঁদের বাঁজা বৌ এর হাতে তাগা বাঁধতে এ গাঁয়ে পা রেখেই বলে দিয়েছিল—হ্যাঁ, এ মাটির নীচে সোনার চেয়েও অনেক মূল্যবান ধন আছে, যার জন্য আমাদের গোটা বাঙালি জাতি একদিন গর্বে বুক চাপড়ে বেড়াবে। তবে যেদিন বিদ্যাধরীর খাতে রক্ত ছিটিয়ে যাবে সেদিন এ-গাঁয়ের মাটি শ্মশান হয়ে যাবে।
জটা পাগলা রোজ সকালে বিদ্যাধরীর খাতে নামে আর কোদাল দিয়ে মাটি খোঁড়ে। রোদ, বৃষ্টি, শীত, গ্রীষ্ম কোনো তফাৎ নেই। লোকে বলে জটা পাগলা দুর্ভাগা, এত খুঁজেও একটা রদ্দি আধলাও পায়নি। জটা বলে বটে সে চাঁদ সওদাগরের ধন খুঁজছে, কিন্তু জটা পাগলা বিদ্যাধরীর খাতে কী খোঁজে তার আরো কিছু গল্প অবশ্য ফিসফিস করে গ্রামের পুকুরপাড়ে মেয়েদের স্নানের ঘাটে বা হাটের মেঠো মানুষের কানে কানে মাঝে মাঝে জেগে ওঠে, কিন্তু সেই পর্যন্তই, যেমন ডিঙাডুবি নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে পাখমারা গণকের গল্পও লোকের মুখে মুখে ঘুরেই হারিয়ে যায়।
ডিঙাডুবির জমিদার ছিল গোপীচরণ মল্লিকের পূর্বপুরুষেরা। তাদের বংশের কোনো এক দূরদর্শী জমিদার এককালে বিদ্যাধরী নদীর দু’পাশের জলাজমি- বাদাড় ঘেরা তালুকগুলো অতি সস্তায় কিনে নেয়। সে সময় গঙ্গার উপকূলে সুতানুটীতে একটা ক্ষুদ্র হাট ছিল যেখানে বছরের মধ্যে মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট সময়ে সুতা, কাপড় বিক্রি হতো। শেঠ, বসাকরা সেই হাটে ইউরোপীয় বণিকদের কাছে বাংলার প্রসিদ্ধ মসলিন বিক্রি করত। গোপীচরণ মল্লিকের সেই পূর্বপুরুষ লক্ষ করেন যে পুবে ঢাকা, ধামরাই, সোনারগাঁও, পশ্চিমে বীরভূম, জঙ্গলমহল, উত্তরে শান্তিপুর, ফরাসডাঙা, নদীয়া আর দক্ষিণে সুন্দরবন অঞ্চল এসবের মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটা কাপড়ের হাট বসাতে পারলে চারদিকে থেকে তাঁতিরা তাদের পসরা এনে বিক্রি করতে পারে। এবং সেই তাঁতিদের থেকে কর আদায় করে প্রচুর মুনাফা হতে পারে। এ অঞ্চলে বিদ্যাধরীর তীরে নীচু কাদা-জলার মধ্যে জেগে ওঠা এক বিশাল জায়গা জুড়ে উঁচু ডাঙায় অনেক আগে একটা হাট বসত। সরস্বতী নদী শুকিয়ে যাওয়ার পর থেকে সপ্তগ্রাম যখন তার কৌলিন্য হারায়, তখন পর্তুগিজরা জাহাজ নিয়ে বাণিজ্য করতে এসে বেতোড় এবং বিদ্যাধরীর পাশে এই এলাকায় জনমজুর দিয়ে হাটচালা তৈরি করিয়ে হাট বসাতো। পর্তুগিজ কেল্লায় তখন পর্তুগিজরা জাহাজ থেকে আনা মালপত্র এনে রাখত। বেচাকেনা শেষ করে জাহাজে মালপত্র নিয়ে চলে যাবার সময় পর্তুগিজরা হাটচালাগুলোতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে যেত যাতে তাদের অনুপস্থিতিতে অন্য ইউরোপীয় দেশের মানুষ এসে সেখানে বাণিজ্য না করতে পারে। জায়গাটা প্রতি বছর একবার বা দু’বার কয়েক সপ্তাহের জন্য লোকজনের সমাগমে জেগে উঠত, তারপর হাট ভেঙে পর্তুগিজরা ফিরে গেলে এলাকাটা জনশূন্য হয়ে আবার সেই বাঘ শিয়ালের ডাক। সেই স্থান মনোনয়ন করে সেই মাঠে বাঁশ, হোগলা আর খড় দিয়ে হাটচালা বানিয়ে আবার একটা হাট বসানো হল। মূলত কাপড়ের হাট বলে নাম হল কাপাসডাঙা। গোপীচরণ মল্লিকের পূর্বপুরুষ যখন পুনরায় এই মাঠে হাটের সূত্রপাত করলেন তখন বাংলায় গ্রামে গ্রামে তাঁতবস্ত্র বয়ন শিল্প উৎকর্ষের এক অন্যমাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে। চন্দননগর বা ফরাসিদের বাসভূমি ফরাসডাঙা থেকে ধুতি, শাড়ি, খুব উঁচুমানের মসলিন আসত, ঢাকা-সোনারগাঁ থেকে আসত চিকন, চারকোণা, আবই রওয়ান, শবনম, তনজেব, নয়নসুখ, জঙ্গলখাস, ডোরিয়া, জামদানি, বুটি আরো কত কি! এমন কি কাপাসিয়ার তিতাবাদি থেকে ব্যাপারীরা নৌকা ভরে সূক্ষ্ণতম মসলিন বয়নের ফুটী কার্পাস নিয়ে আসত। ঢাকার কলাকোপা, ত্রিপুরার চাঁদপুর, নারায়ণপুর, শ্রীরামপুরে ভোগা তুলোর তৈরি মোটা কাপড়ও আসত। সে সব কাপড় ভাগীরথীর নদীপথে বিদেশে চালান যেত। এখান থেকে ইউরোপীয় বণিকরা কিনে নিত হামাম, খাসা, এলাচি, উতালি, চৌতা, সুসিজ, শিরসূচী এসব উন্নত মানের বস্ত্র।
এত কাপড়, কাপাসতুলো, সুতো এই হাটে বিক্রি হতে লাগল যে কাপাসডাঙার হাটের নাম দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে গেল। গ্রামান্তর থেকে ছোট-বড় তাঁতিরা ধীরে ধীরে এসে চালা বানিয়ে থাকতে শুরু করল। আশেপাশে তাঁতকল ভিত্তিক পেশা গড়ে উঠল। সানাকাররা সানা তৈরি করত, কামাররা মাকু বানিয়ে দিত, চাষিরা বাঁশের ফলা দিয়ে নাটাই তৈরি করত। সব এই হাটেই বিক্রি হতো। এভাবে কাপাসডাঙার মাঠের পাশে জঙ্গলের কাছে প্রায় চল্লিশ ঘর তাঁতি তাঁত বুনে পরিবার পালন করত। অনেকগুলো পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদন হতে শুরু হল এখানে।
ডিঙাডুবি গ্রামে ব্রাহ্মণ ও কায়স্থের বাস প্রায় নগণ্য, অধিকাংশ মানুষ ছিল কৈবর্ত। কৈবর্তরা কৃষিকাজ করে, নদীতে মাঝির কাজ, মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আবার এরা পরিবারের সকলে মিলে তন্তুবায়ের কাজ করত। গ্রামে এক ঘর বৈদ্য অম্বষ্ঠ ছিল সে ভেষজ কবিরাজি ওষুধ পথ্য দিয়ে গ্রামের লোকেদের চিকিৎসা করে। এছাড়া অন্যান্য গ্রামের মতো এগ্রামেও সমবৃত্তির মানুষদের নিয়ে তৈরি হয়েছে পাড়া কুম্ভকার, সৎগোপ, কাংসাবণিক, মালাকার ইত্যাদিরাও এসে বসতি স্থাপন করে, কিন্তু তাদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য।
কাপাসডাঙার বিশাল মাঠের অন্যদিকে ছিল তাঁতিপাড়া। তাঁতিরা দিন রাত তাঁতঘরে মেহনত করত। যা কাপড় বুনত, তা হাটে বিক্রি করত। কিন্তু ওলাওঠার মহামারী সেই তাঁতিপাড়ায় মারণ আঘাত হানল। দেখতে দেখতে তাঁতিপাড়া শ্মশান হয়ে গেল।
গ্রামের শেষে প্রাকার বেষ্টিত একটা জমিদারবাড়ি। জমিদার গোপীচরণ মল্লিকের পূর্ব-পুরুষেরা কিন্তু এই জমিদারবাড়িতে থাকতেন না। তাঁরা থাকতেন গঙ্গা পাড়ে সুতানুটীতে। কলকাতার পুব দিকে যে বিশাল লবণ হ্রদ ছিল সেখানে গোপীচরণ মল্লিক একটা বিশাল বসতবাটি বানিয়ে থাকতে শুরু করেন। কারণটা অনেকেরই অজানা। নিন্দুকেরা বলতো যে ধনলিপ্স গোপীচরণ মল্লিক নাকি বেকানুনি কাজকম্মো করে অনেক অর্থ উপার্জন করে, তার মধ্যে একটি বিশেষ ছিল ডাকাতি।
বিদ্যাধরী নদীতে খুব ডাকাতি হতো। সেসময় অনেক জমিদারদের নিজস্ব ডাকাত দল ছিল, আবার অনেক জমিদার ডাকাতদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ডাকাতরা দিনের বেলায় জেলে-নৌকা নিয়ে মাছ ধরত, আর জলপথে কী কী যাওয়া-আসা করছে তার খোঁজ-খবর রাখত। ওরাই আবার রাতে ছিপ নিয়ে ধনী লোকেদের বজরা, ভাউলিয়া আক্রমণ করে লোহার মুগুর, বল্লম, লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধন-রত্ন লুট করে যাত্রীদের খাঁড়ার কোপে মুণ্ডচ্ছেদ করে জলে ফেলে দিত। নিন্দুকেরা বলে গোপীচরণ মল্লিকও নাকি গোপনে এরকম একটি কুখ্যাত ডাকাত দলের পৃষ্ঠপোষক ছিল। অন্য জমিদারের সঙ্গে লড়াই ঝগড়ায় এই ডাকাতরা তার লেঠেল সেজে লড়াইও করে আসত।
ডাকাত বজ্ররামের দৌরাত্ম্যে সে সময় বিদ্যাধরী ও আশেপাশের জলপথে যাতায়াত অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির খাজনা নৌকা লুট করেছিল এই বজ্ররাম। ইংরেজরা এই ডাকাতকে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেও বারবার নাস্তানাবুদ হয়ে যাচ্ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন গোপীচরণ মল্লিককে অনুরোধ করে বজ্ররামকে ধরিয়ে দিতে। বজ্ররাম গোপীচরণ মল্লিকের পোষা ডাকাত। গোপীচরণ মল্লিক স্বভাবতই রাজি হল না, কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কালেক্টর রবিন সাহেব বলল গোপীচরণ মল্লিক চট্টগ্রাম থেকে যে গোপনে বালিকাদের কিনে কলকাতায় নবাবের উত্তরপুরুষের কাছে বেচে অনেক মুনাফা করেছে সে কথা তারা কোতোয়ালিতে খবর করে দেবে।
বেকায়দায় পড়ল গোপীচরণ মল্লিক। বজ্ররাম অনেক দিনের বিশ্বস্ত ডাকাত, কিন্তু কোম্পানির কালেক্টরদের ক্ষমতা খুব, আর রবিন সাহেব ভয়ঙ্কর একগুঁয়ে এবং এক কথার মানুষ। নিরুপায় গোপীচরণ মল্লিক বজ্ররামকে জিভকাটির জঙ্গলে দেওয়ান দুর্লভচাঁদ মারফত সংবাদ পাঠালো যে বেলেঘাটায় এক সাহেবের কুঠিতে প্রচুর অস্ত্র অরক্ষণীয় অবস্থায় আছে। বজ্ররাম গোপীচরণ মল্লিককে বিশ্বাস করল। ডিঙাডুবি থেকে এসে লবণ হ্রদের পাশে এক আঘাটায় বজ্ররাম রাতের বেলা দশ জন বাছাবাছা ডাকাত নিয়ে তার দ্রুতগামী ছিপ নৌকা নোঙর করল। নদীর পারে দোতলা কুঠি থেকে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রাতের বেলা মশালের সংকেত এল। তা দেখে বজ্ররামের দলবল বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল। কিন্তু ভিতরে ইংরেজদের লাল পাগড়ি বজ্ররামের দলের সকলকে গুলি করে হত্যা করল, আর গোপীচরণ মল্লিকের ইংরেজ কালেক্টর রবিন সাহেবের অধীনে ব্ল্যাক-জমিদার পদ পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেল।
যে সকল গ্রামে জমিদার খোদ নিজে থাকতেন সেসব জমিদারিতে জমিদারের অধস্তন দেওয়ান, নায়েব, সেরেস্তাদার, খাজাঞ্চি, পেশকার, তহবিলদার, মুহুরি, মুন্সি, পাটোয়ারি, মণ্ডল, ধামাধরা মোসাহেবের দল, লেঠেল, পাইক এসব নিয়ে জমিদারবাড়ি সরগরম থাকত, কিন্তু গোপীচরণ মল্লিক নিজে ডিঙাডুবিতে থাকতো না, প্রভুভক্ত দেওয়ান দুর্লভচাঁদ কিছু লেঠেল সঙ্গে নিয়ে জমিদারি দেখত। এই দেওয়ান সর্বেসর্বা হয়ে গ্রামবাসীদের যতটা সম্ভব নিংড়ে অর্থ নিজের কোষাগারে ঢোকাতো। গোপীচরণ মল্লিক তার নদীয়ার কিছু তালুকের পরিবর্তে বেলেঘাটার কিছু জমি এওয়াজীরূপে পেয়ে সেখানে জলটুঙ্গি নির্মাণ করালো। তারপর পাকাপাকি ভাবে কলকাতায় থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের সাহেব সুবোদের তোষামোদ ও উৎকোচে বশীভূত করে মোসাহেব-বেশ্যাসঙ্গে ভোগ- লালসায় গা ভাসিয়ে দিলো।
এদিকে শোলাবন, হোগলাবন, বাদাড়ের মাঝে ডিঙাডুবি গ্রামে অকস্মাৎ একদিন বারাণসী থেকে সত্যাচার্য নামে এক জ্যোতিষী এসে উপস্থিত হল। গ্রামবাসীরা বিস্মিত—এই জলা জঙ্গলে শুদ্রদের মাঝে সুদূর বারাণসী থেকে জ্যোতিষী কেন এল?
পরনে নেতপাটোল, ঊর্ধাঙ্গে নেত উত্তরীয় পরে নৌকা থেকে অবতরণ করে গোটা গ্রাম প্রদক্ষিণ করল সে। তাঁর চন্দনরেখা শোভিত উন্নত ললাট, তেজস্বী মুখমণ্ডল, গৈরিক বসন, সুশ্রী সুদীর্ঘ গৌরবর্ণ চেহারা দেখে স্বাভাবিক কারণেই গ্রামবাসীরা আকৃষ্ট হল। সত্যাচার্য বলল এ গাঁয়ে নাকি খনাদেবীর মন্দির আছে, তাঁর অভিপ্রায় সেই মন্দির দর্শন করা।
‘মন্দির কোথায়? সে তো জঙ্গলে ঢাকা একটা উঁচু ঢিপি। এখান থেকে এক ক্রোশ পথ, একজন গ্রামবাসী বলল। ‘ডিঙাডুবি গ্রামের পর কাপাসডাঙার জনশূন্য মাঠ পেরিয়ে জিভকাটির জঙ্গলের ভিতর বিশাল ঢিপির নীচে মাটি-চাপা সেই মন্দির। কিন্তু সেখানে কেউ যায় না। ঢিপিতে শালগাছ, কচুগাছ, বেডবনে ঠাসা ভয়ঙ্কর জঙ্গল। ঢিপির কাছে বিষাক্ত সাপ, মশা, কীট, জোঁক থিকথিক করছে। এত গভীর জঙ্গল যে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। ঠাকুর, আপনি ওখানে কেন যেতে চান?’
সত্যাচার্য তার ধবল বহুদণ্ডী পৈতায় অঙ্গুলি চালনা করতে করতে বলল, ‘ঈশ্বরের স্বপ্নাদেশ। বাংলাদেশে অযোগ্য তান্ত্রিক জ্যোতিষীদের হাতে কলুষিত জ্যোতিষশাস্ত্র আমি নির্মূল করে বরাহমিহিরের হোরা, তন্ত্র, সংহিতার জ্ঞান বিতরণ করে এদেশের জ্যোতিষ সংশোধন করতে ব্রতী হয়েই বাংলার মাটিতে এসেছি। আমি এখন থেকে এই গ্রামেই থাকব। আজ মার্গভ্রষ্ট বাংলার জ্যোতিষশাস্ত্র। মারণ-উচাটন-বশীকরণ এসব প্রথার বিলুপ্তি ঘটাতে আমি এসেছি। আমি এসেছি আর্যদের তিথি-নক্ষত্রের ইঙ্গিত বিচার, পার্থিব উৎপাতের লক্ষণ নির্ণয়, শাস্ত্রপাঠের নিয়ম ইত্যাদি সম্পর্কিত অবক্ষয়ের পরিশোধন করার জন্য।’
সত্যাচার্যের অভ্যুদয়কে দেওয়ান দুর্লভচাঁদ সৌভাগ্যসূচক ঘটনা বলে মনে করল। চটজলদি একটি সুপরিসর চালাঘর বেঁধে গ্রহবিপ্র সত্যাচার্যকে প্রদান করে দুর্লভচাঁদ বলল—এটি নিষ্কর ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তি। এই স্থানে বাস করার জন্য ঠাকুর আপনাকে কোনো খাজনা দিতে হবে না। পাশে মৃত্তিকা প্রাচীরে বেষ্টিত হোগলাপাতার চালযুক্ত দুই-প্রকোষ্ঠের একটি জ্যোতিষ-মন্দির বানিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হল।
সত্যাচার্য সেই মন্দিরের একটি প্রকোষ্ঠে নিজের আরাধ্য জ্যোতিষগুরু বরাহমিহিরের এক মূর্তি স্থাপনা করল। ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের মহীরূহ বরাহমিহিরের নামে নামকরণ করল বরাহমিহির জ্যোতিষ-মন্দির।
জ্যোতিষশাস্ত্রে সত্যাচার্য এতই পারদর্শী ছিল যে তাঁর জ্যোতিষ গণনার কথা শীঘ্রই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সে যেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, মুখে যা বলে তাই মিলে যায়। সত্যাচার্যের নির্ভুল গণনাতে মুগ্ধ হয়ে কাতারে কাতারে মানুষ এ-গ্রামে আসতে লাগল। এভাবে সত্যাচার্য গ্রামবাসীদের মধ্যে নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করতে শুরু করে ধীরে ধীরে গ্রামবাসীদের ওপর অক্ষুণ্ণ আধিপত্য স্থাপন করে ফেলল।
এই সত্যাচার্য জ্যোতিষীর সুখ্যাতি দুর্লভচাঁদের মাধ্যমে জমিদার গোপীচরণ মল্লিকের কানে গিয়ে যখন পৌঁছোলো তখন গোপীচরণ মল্লিক বেশ বেকায়দা অবস্থায় ছিল। ফোর্ট উইলিয়ামের কালেক্টর রবিন সাহেবের খাতিরদারি করার জন্য তাকে সঙ্গে নিয়ে গোপীচরণ মল্লিক যখন কমলাবাঈয়ের কোঠায় কাশ্মীরী ফরাসের ওপর নরম গেদ্দাবালিশে ঠেস দিয়ে বসে রূপোর রেকাবে মদিরা পান করতে করতে শহরের সব চেয়ে নামী বেশ্যার আগমনের অপেক্ষা করছিল তখন সে কি আর জানত আজ তার কপালে কী দুর্ভাগ্য নাচছে?
কমলাবাঈ অত্যুৎকৃষ্ট বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে আতর, ফুলেল তেল, গোলাপ- জলের খুশবু ছড়িয়ে মখমলের পর্দা ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করল। পাশের সোনাগাজীর মসজিদে সন্ধ্যার আজান আহুত হচ্ছে। কমলাবাঈয়ের শাড়ির পাড়ের ফুল ও পাতার কল্কাদার নক্সার সূক্ষ্ম কাজ দেখে বিস্ফারিত হয়ে গেল জমিদার গোপীচরণ মল্লিকের নেশায় মগ্ন চোখ। এই কাপড় কোথা থেকে এল? এর পাড়ে সুতো একগাছাও নেই। শাড়ির পাড় তৈরি হয়েছে শুধু সোনালি ও রূপালি জরি দিয়ে। জমির একদিকে সোনালি জরি আর অন্যদিকে রূপালি জরি। নেশা কেটে গেল জমিদার গোপীচরণ মল্লিকের। তাঁতি রায়তদের সঙ্গে অনেকদিনের ওঠবস তার, বারাঙ্গনারা শাড়ি খোলার সময় নারী-শরীরের দিকে দৃষ্টি আছড়ে পড়ার আগে তার চোখ যায় তার শাড়ির কাজের দিকে। কী যে অদৃষ্টের লিখন, হতবাক গোপীচরণ মল্লিক নেশার ঘোরে কাঁকড়াপেড়ে শাড়িটার দাম জিজ্ঞাসা করে বসল। কমলাবাঈ গর্বের সঙ্গে বলল এক হাজার টাকা খরচা করে এই শাড়ি কিনেছে দিনেমার ব্যবসায়ীদের থেকে। প্রতিদ্বন্দ্বী দিনেমার নামটা শুনেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রবিন সাহেবের মেজাজ খিঁচড়ে গেল। সে বলে উঠল এ আর তেমন কী, এই সোনাগাজীতেই অন্য বারনারীদের কাছে সে মলবুস খাস দেখেছে। তার একখানার দাম পনেরো হাজার টাকা।
অহংকার ঠিকরে উঠল কমলাবাঈয়ের চোখে। ও কিছু না বলে অন্দরমহলে চলে গেল আর ফিরে এল হাতে রূপার এক ছোট পানদানী নিয়ে। পানদানী খুলে বিশ হাত লম্বা মিহি কাপড় হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে বলল,
‘আসলি মলবুস খাস পচিশ হাজারের কমে পাওয়া যায় না।’
‘আজকাল মলবুস খাস বাজারে পাওয়া যায়?’ ব্যাস নেশা কেটে গেল রবিন সাহেবের।
‘ভালো কড়ি ফেললে তবেই ভালো জিনিস পাওয়া যায় সাহেব,’ কমলাবাঈ অহংকারের হাসি হেসে বলল। ‘এই এলাকায় আমার অর্ধেক মূল্যে তওয়াইফ আপনি পাবেন। কিন্তু আপনি এত সিক্কা টাকা খরচ করে আমার কাছে আসেন কেন? আসলে ভালো মাল তারিফ করার মতো যোগ্যতা সকলের নেই।’
রবিন সাহেব গুম হয়ে রইল। রাতে দোলদার ছক্কর গাড়িতে ফোর্ট উইলিয়ামে ফেরার সময় রবিন সাহেব গোপীচরণ মল্লিককে বলল, ‘মালিক, আমার একটা মলবুস খাস চাই।’
‘সাহেব, নবাবের কড়া হুকুম আছে এসব কাপড় যেন বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিক্রি না করা হয়। নবাবের আদেশ অমান্য করলে নবাব তার কোতল করে। এজনাই এই বেশ্যা কমলাবাঈ লুকিয়ে রেখেছে ওই কাপড়। তাছাড়া আমি যতদূর জানি মলবুস খাস বহুকাল এদেশে বানানো হয় না। জানি না এই কমলাবাঈ হয়তো কোনো নবাবের প্রাচীন ঐতিহ্য কিনেছে। ওর কপাল ভালো, কিন্তু মলবুস খাস এখন অসম্ভব! দশ গজ কাপড়ে উনিশশো সুতো, অথচ এত সূক্ষ্ণ যে ওজন মাত্র ছয় তোলা, গোপীচরণ মল্লিক বলল। ‘এ কাপড় বোনা সকলের কাজ নয়। কিন্তু আপনাদের ইংলন্ডের বাজারে খোঁজ করলে নিশ্চয়ই পেয়ে যাবেন এই মলবুস খাস। শুনেছি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক সময় লুকিয়ে চুরিয়ে বিস্তর রপ্তানি করেছে আপনাদের দেশে এই মলবুস খাস।’
ব্যাস, এই কথা শুনে রবিন সাহেব ক্ষেপে লাল। কিছুক্ষণ গুম হয়ে থেকে সাহেব বলল, ‘মাল্লিক, আমার ওয়াইফ সামনের জাহাজে কলকাতা আসছে। আমি ওয়াইফকে প্রমিস করেছিলাম যে ওকে আমি একটি মলবুস খাস দিব। আমার ওই বস্ত্র চাই-ই চাই। তুমি আমায় মলবুস খাস আনিয়া দাও।’
গোপীচরণ মল্লিক হেসে দু’কানে দু’আঙুল ধরে বলল, ‘হুজুর, এ অসম্ভব!’
‘আমরাও অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করি মাল্লিক,’ রবিন সাহেব গম্ভীর। ‘পর্তুগিজদের থামাতে কোম্পানি সেভেন্টিন থার্টি থ্রিতে যে চুক্তি করেছিল তাতে তোমাদের মতো অনেক দেশি ঠিকাদার ব্যবসায়ীরা সই করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী পর্তুগিজদের সঙ্গে ব্যবসা করার প্রমাণ পেলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাস্তি হিসেবে দশ হাজার রূপি জরিমানা করবে সেটা তো তুমি ভুলে যাওনি নিশ্চয়ই। তুমিও তো সেই বন্ডে সই করেছিলে, তাই না মালিক?’
‘হ্যাঁ সাহেব। কিন্তু আমি কক্ষনো পর্তুগিজদের সঙ্গে ব্যবসা করিনি।’
‘তোমার কাপাসডাঙার হাটে পর্তুগিজ মার্চেন্টরা গুজরাত থেকে কটন নিয়ে এসে বেচছে এটা তো অনেকেই দেখেছে। তোমরা ওদের অনুমতি দিয়েছ তোমাদের ল্যান্ডে ব্যবসা করার। আমি চোখ বুজিয়া থাকি, কিন্তু আমার কান খোলা থাকে। সকল খবরই কানে আসে। আমি মুখ খুলিলে তোমার দশ হাজার রূপি জরিমানা তো অবশ্যম্ভাবী এবং তুমি যে কোম্পানির দালালি করে গ্রামগুলো কিনে যা অর্থ উপার্জন করছ সেই ব্যবসাও শেষ হইয়া যাইবে। কোম্পানি প্রতারকদের পছন্দ করে না। তুমি শুনেছ বোধহয় ফোর্ট উইলিয়ামের দু’জন ইংরেজ ব্যবসায়ী শুধুমাত্র পর্তুগিজদের জাহাজে মাল পাঠাচ্ছিল, তা ধরা পড়ে যাওয়ায় ওদের কঠিন শাস্তি পেতে হয়েছে। আমি চেষ্টা করিতেছি তোমাকে হেল্প করার, বিনিময়ে –.
গোপীচরণ মল্লিকের নেশা-টেশা কেটে গেল। এই একগুঁয়ে দাম্ভিক সাহেবকে সে বিলক্ষণ চেনে। সাহেবকে ফোর্ট উইলিয়ামে পৌঁছে দিয়ে গোপীচরণ মল্লিক সেই রাতেই আবার ফিরে এল বেশ্যাপল্লিতে। চাকরকে বলল কমলাকে এক্ষুনি আসতে বল, বিশেষ দরকার। কমলাবাঈ শয্যা থেকে উঠে ঢুলু ঢুলু চোখে এল, এখন তার আগমনে পায়ের ঘুঙুরের ছমছম নেই, পোশাকেও নেই কোন জেল্লা। গোপীচরণ মল্লিক তার সমস্যার কথা বলল। তা শুনে কমলাবাঈ হাই তুলে বলল এ তার মায়ের স্মৃতি, কোনো মূল্যেই তার পক্ষে এটা হস্তান্তর করা সম্ভব না। অনেক প্রলোভন দেখিয়েও মলবুস খাসটি করায়ত্ত করতে পারল না গোপীচরণ মল্লিক। বাড়ি ফিরে সারা রাত ঘুম এল না। ওর শাস্তি থেকে বাঁচা, ব্ল্যাক-জমিদারি পদ পাওয়া, সব এই রবিন সাহেবের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কী করা যায়? এই অসম্ভব অবস্থা থেকে কীভাবে বের হওয়া যায়?
ডিঙাডুবি থেকে দুর্লভচাঁদ রাতে এসেছিল সত্যাচার্যের খাজনা মুকুবের কাগজপত্রের লেখাপড়া করতে আর দাসব্যবসা সংক্রান্ত কিছু গোপনীয় কথা বলতে। রাত্রি অবসানে জমিদারবাবুর রাতজাগা লাল চোখ দেখে দেওয়ান দুর্লভচাঁদ শিয়ালের মতো ধূর্ত চোখ ঈষৎ সংকুচিত করে বলল, ‘আপনাকে উৎকণ্ঠিত লাগছে!’
‘তোমাকে বলতে পারি দুর্লভচাঁদ, তুমি আমার হিতৈষী,’ গোপীচরণ মল্লিকের কণ্ঠস্বরে হতাশা। ‘ওই বেশ্যা কমলাবাঈ আমায় শেষ করে দিয়েছে।’
দুর্লভচাঁদ ভাবল অত্যাধিক বেশ্যাশক্ত মানুষের গুপ্তরোগের বীজ বোধহয় তার মনিদের দেহেও প্রবেশ করেছে, সে নীচু গলায় জমিদারকে বলল, ‘আমার চেনা এক কবিরাজ ‘
‘কবিরাজ বদ্যি এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না, দুর্লভচাঁদ,’ তারপর গোপীচরণ মল্লিক তার সুহৃদ দেওয়ানকে মলবুস খাসের সমস্যার কথা খুলে বলল। ‘স্বয়ং ভগবানও আমায় এই রবিন অসুরের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না।’
দুর্লভচাঁদ পোড় খাওয়া দেওয়ান, ফন্দি-ফেরেবে পাকা মাথা। সে তৎক্ষণাৎ বুঝে গেল এই সাধ্যাতীত বিপদ থেকে জমিদারকে সত্যি ভগবানও বাঁচাতে আসবেন না। কেননা ভগবান যদি এই অতি দুর্লভ মলবুস খাস কোনোমতে পেয়ে যান, তবে ভগবান নিজেই তাঁর ফ্যামিলির জন্য সে বস্ত্র রেখে দেবেন। সে একটু ভেবে বলল, ‘একটাই মাত্র পথ আমি সামনে দেখতে পাচ্ছি।’
‘আছে? পথ আছে?’ জমিদার দেওয়ানের দু’হাত ধরল।
কিছুদিন আগে আমাদের ডিঙাডুবিতে সত্যাচার্য নামে এক জ্যোতিষী এসেছেন, তিনি বাকসিদ্ধপুরুষ। উনি তুষ্ট হলে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে লোকে গিয়ে ফল পেয়েছে। আপনি একবার ডিঙাডুবিতে গিয়ে ওঁর চরণে একদম সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করুন, কাজ হবেই। আপনার কুষ্ঠীটা সঙ্গে নিয়ে একবার আমার সঙ্গে ডিঙাডুবিতে আসুন।’
পরদিনই নিজে ডিঙাডুবি ছুটল গোপীচরণ মল্লিক। দেওয়ান জমিদারবাড়িতে নিয়ে এল সত্যাচার্যকে। পূর্বাস্য হয়ে বসে গোপীচরণ মল্লিকের কোষ্ঠী ভালোভাবে দেখে কোষ্ঠী মুড়িয়ে জমিদারের হাতে দিয়ে দৈবজ্ঞ বলল, ‘আপনার সময় ভালো যাচ্ছে না। আমি কাল সকালে আপনার সাফল্যের জন্য গ্রহ শান্তি হোম করব। পরশু খণ্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ। আপনি পরশু দিবাবসানে আপনার সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন।’
‘খালি হাতে যাব? আমার হাতে কোনো শাড়িই নেই! মলবুস খাস
জ্যোতিষী মৃদু হেসে বলল, ‘আপনি চিন্তা করবেন না। বলছি তো আপনার জন্য আমি যজ্ঞ করব, আপনার এ যাত্রা কোনো ক্ষতি হতে দেব না।’
‘কোনো ক্ষতি হবে না?’
‘না।’
‘যদি আপনার কথা সত্যি হয় তবে আমি আপনার জন্য এই ডিঙাডুবিতে একটা পাকা কোঠাবাড়ি বানিয়ে দেব।’
সত্যাচার্য বলল, ‘আমার পাকা কোঠাবাড়ির প্রয়োজন নেই, আমি বাংলায় এসেছি এক বিশেষ সঙ্কল্প নিয়ে। যদি আমার যজ্ঞ আপনার দুশ্চিন্তার অবসান করে আপনাকে আসন্ন বিপন্মুক্ত করে তবে আপনি যখন আবার ডিঙাডুবিতে আসবেন, আমি তখন আমার অভিপ্রায় আপনাকে জানাব।’
গোপীচরণ মল্লিক বলল, ‘বেশ আপনার গণনা যদি অভ্রান্ত হয় তবে আমি কথা দিলাম আমার এই বিপদ কেটে গেলেই আমি আপনার কাছে আসব। এবং প্রতিজ্ঞা করছি আপনার চাহিদা আমি যথাসাধ্য পূর্ণ করব।’
‘সব গুরুর ইচ্ছা,’ সত্যাচার্য দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকালো ‘কে কার চাহিদা পূর্ণ করবে তা উনিই স্থির করেন।
গোপীচরণ মল্লিক পরদিন ভোরবেলা ফোর্ট উইলিয়ামে রবিন সাহেবকে খাস হরকরা মারফত পত্র পাঠালো সাহেব আমি অনেক কষ্টে আপনার জন্য জোগাড় করছি একটা মলবুস খাস। দুই দিন সময় লাগবে। কিন্তু আমার পঁচিশ হাজার টাকা লাগছে।
সাহেব খুশি হয়ে গোপীচরণ মল্লিককে লিখে পাঠালো—অতি উত্তম। আমার স্ত্রী কাল এসে পৌঁছাবে। ঠিক আছে, তুমি কাল সন্ধ্যাবেলা আমাকে মলবুস খাস দিয়া যাবে। তোমার বিরুদ্ধে দাসব্যবসার যে অভিযোগ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উপর মহলে আছে আমি আমার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাহা মিথ্যা বলিয়া চিহ্নিত করিব।
গোপীচরণ মল্লিক ভাবল কথা তো দিল, কিন্তু জ্যোতিষীর কথায় নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকলে তো আর চলবে না। সুতানুটীর তাঁতিদের আড়ত থেকে দেশের বিত্তবানদের জন্য বস্ত্র যেত, গোপীচরণ মল্লিক সেখানে লোক পাঠালো। কিন্তু ওখানে ফল হল না। কাপাসডাঙার হাট এখনো দশ দিন বাকি। তখন গোপীচরণ মল্লিকের ফরাসডাঙার কথা মনে এল। ফরাসডাঙাতে অতি উঁচুমানের মসলিন বোনা হতো। গোপীচরণ মল্লিক লোক পাঠিয়ে ফরাসডাঙার পুরোনো তাঁতিদের কাছে খবর পাঠালো, একটা মলবুস খাস চাই-ই। যে কোনো মূল্যে। লোকলস্কররা মুখ শুকনো করে ফিরে এল। গোপীচরণ মল্লিক ভাবল আর কোনো পথ খোলা নেই। সত্যাচার্যই একমাত্র ভরসা। সত্যাচার্যের গণনা যদি মিথ্যা হয় তবে স্ত্রীর কাছে অপমানিত হয়ে রবিন সাহেব ওর গলা কেটে ফেলবে।
একটা দিন কেটে গেল, গোপীচরণ মল্লিক শুকিয়ে গেছে এক্কেবারে। সকাল থেকে বার বার শুধু আকাশের দিকে তাকায়। অসহিষ্ণু। কখন সূর্যগ্রহণ হবে। যদি না হয়! দ্বিপ্রহরে গ্রহণ শুরু হতেই ডিঙাডুবির আকাশের দিকে তাকিয়ে বার কয়েক প্রণাম ঠুকল গোপীচরণ মল্লিক। তবুও মনে একরাশ দুশ্চিন্তা। শেষ রক্ষা হবে তো?
সন্ধ্যাবেলা রবিন সাহেবের এত্তেলা এল। সাহেব এক্ষুনি ফোর্ট উইলিয়ামে আসতে বলেছে। কম্পিত বুকে গোপীচরণ মল্লিক কেল্লায় চলল।
ফোর্ট উইলিয়ামে সাহেবের কোয়ার্টারে ঢুকে চমকে উঠল গোপীচরণ মল্লিক। সাহেব হাপুস নয়নে কাঁদছে। সামনে প্রায় খালি হয়ে আসা একটা পেটমোটা বিলাতী মদের বোতল। ‘আমার সর্বনাশ হয়ে গেল মাল্লিক!’
গোপীচরণ মল্লিক কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সাহেব এবার ওর হাতে একটা জাহাজ কোম্পানির পত্র ধরিয়ে দিল। গোপীচরণ মল্লিক দেখল নরওয়ের জাহাজ লন্ডন থেকে ছেড়ে এক রাত্রি চলার পর ঝড়ে সমুদ্রে জাহাজডুবি হয়েছে। গোরা খালাসিরা কয়েকজন পিপে ধরে ভেসে বেঁচে গেছে। কিন্তু অধিকাংশেরই সলিল সমাধি ঘটেছে। ‘মাই সোফিয়া ওয়াজ ইন দ্যাট শিপ,’ রবিন সাহেব নেশার ঘোরে মদের বোতল জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
গোপীচরণ মল্লিকের বুকের ভিতর হাজার খুশির ঘন্টা টিং-টিং করে বাজতে লাগল। জীবনে প্রচুর মানুষের মৃত্যু সংবাদে গোপীচরণ মল্লিক অত্যন্ত খুশি হয়েছে, কিন্তু এত খুশি সে কারোর মৃত্যুতে হয়নি। জ্যোতিষী সত্যাচার্য ভগবান। কিন্তু গোপীচরণ মল্লিকের মুখে প্রকাশ পেল কাতর যন্ত্রণা।
‘সোফিয়াকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতাম,’ সাহেব কাঁদতে লাগল। আমি কী নিয়ে বাঁচব?’
গোপীচরণ মল্লিক সাহেবকে নানাভাবে শান্ত করার চেষ্টা করেও বিফল হল। তখন সাহেব বলল, ‘কমলাবাঈয়ের সঙ্গে আজকের রাত্রি কাটালে হয়তো মনের জ্বালায় একটু প্রলেপ লাগতে পারে।’
এতক্ষণে গোপীচরণ মল্লিক বুঝল তাকে কেন ডাকা হয়েছে। ও গদগদ স্বরে বলল, ‘আই অ্যাম ইয়োর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট স্যার। আই উইল টেক ইউ টু কমলাবাঈ’
পথে টমটমে সাহেবকে জিজ্ঞাসা করল গোপীচরণ মল্লিক, ‘স্যার, হোয়াট উইল হ্যাপেন টু দা মলবুস খাস? ভেরি হাই কষ্ট!’
‘রিটার্ন!’
সাহেবের বাক্য যেন চিতায় শীতল জল ঢেলে দিল। ‘অ্যাজ ইউ উইশ স্যার, ‘ গোপীচরণ মল্লিক বলল। ‘আই অ্যাম ইয়োর ওবিডিয়েন্ট সার্ভেন্ট।’
টমটম সোনাগাজী এলাকায় প্রবেশ করল। গোপীচরণ মল্লিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবল কাল সকালেই ডিঙাডুবি। ওই ত্রিকালদর্শী জ্যোতিষীটাকে হাতে রাখতে হবে।
রাত্রি অবসানেই গোপীচরণ মল্লিক ডিঙাডুবি রওনা দিলো। অপরাহ্নে ওই বাকসিদ্ধ জ্যোতিষীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলল, ‘ঠাকুর, এবার আমার প্রতিশ্রুতি রাখার পালা। বলুন আপনি কী চান?’
‘আমি খুশি যে আপনি বিপদের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারপর বিপদ কেটে গেলে পরাঙ্মুখ হননি। বেশ, আপনি এই গ্রামের শেষে জিভকাটির জঙ্গলে অবস্থিত ওই ঢিপি সমতল করে ওখানে গুরু বরাহমিহিরের নামে এক বিশাল জ্যোতিষ-মন্দির তৈরি করে দিন।’
‘কিন্তু ওই ঢিপির নীচে নাকি খনার মন্দির আছে। খনার মন্দির ভেঙে ফেলব?’ গোপীচরণ মল্লিক যারপরনাই বিস্মিত। ‘কেন? মন্দির তো এমনিতেই জঙ্গলাকীর্ণ ঢিপির নীচে—’
‘খনা জ্যোতিষশাস্ত্রের বিধাতা বরাহমিহিরের শরীরে কলঙ্কের মতো জেগে থাকে। আমি এই খনা মন্দিরের কথা শুনেছি। আসলে খনা বলে কেউ বরাহমিহিরের জীবনে আসেনি, কিন্তু এই সব মন্দির বাঙালির ভ্রান্ত ধারণাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমি চাই এর অবসান হোক।’
‘কিন্তু প্রভু, জিভকাটি মানে খনার জিভ কেটে
‘মিছে কথা,’ সত্যাচার্য গোপীচরণ মল্লিকের কথার মাঝে রুষ্টস্বরে বলল। ‘জিভকাটির মন্দির আসলে মনসাদেবীর মন্দির। সাপের জিভ কাটা থাকে সেই থেকে জিভকাটি।’
গোপীচরণ মল্লিক দেওয়ানের দিকে তাকালো। দু’জনের দৃষ্টি বিনিময়ে নীরবে অনেক কথা হয়ে গেল। দেওয়ান সত্যাচার্যকে বোঝালো, ‘ঠাকুর, বাঙালিরা বিশ্বাস করে যে খনা ছিল এবং তার জিভ কেটে এই জঙ্গলেই ফেলা হয়েছিল। তাই এই জঙ্গলের নাম জিভকাটির জঙ্গল। আপনি মন্দির ভেঙে ফেললেও এই জঙ্গলের নাম তো মুছতে পারবেন না। বরং মন্দির ভাঙলে বাঙালির বিশ্বাস আরো বেড়ে যাবে যে খনার ওপর সত্যি অত্যাচার হয়েছিল। তখন বাঙালি আপনাকে বরাহমিহিরের প্রতিনিধি ভাববে। জনমানুষের রাগে আপনার প্রাণ বিপন্ন হতে পারে। তাই যা করার আমাদের অনেক ভেবেচিন্তে করতে হবে।’
‘এ আমার দ্বারা সম্ভব না প্রভু,’ গোপীচরণ মল্লিক জোড় হাতে অনুনয়ের সুরে বলল। ‘শুনেছি বড় জাগ্রত এই মন্দির। আমার এক পূর্বপুরুষের সময়ও বারাণসী থেকে একদল জ্যোতিষী এসে এই মন্দির ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তাদের অনেকের নাকি সর্পদংশনে মৃত্যু হয়েছিল। আমি অসমর্থ প্রভু। আপনি অন্য কোনো আদেশ দিন।’
সত্যাচার্য কিছুক্ষণ নীরব রইল। সে সম্ভবত হৃদয়ঙ্গম করল যে তাকে সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সে বলল, ‘বেশ, আপনি আমায় এই প্রতিশ্রুতি দিন যে, আপনার এই তালুকে অন্য কোনো গ্রহবিপ্রের জ্যোতিষ- মন্দির থাকবে না। আমি ছাড়া অন্য কেউ জাতকদের কোষ্ঠী প্রস্তুত করতে পারবেন না। আমিই হব এই এলাকার একমাত্র গ্রহবিপ্র।’
‘এই এলাকায় অন্য কোনো জ্যোতিষী বলতে আমি যতদূর জানি-–’ একটু ভাবলো জমিদার গোপীচরণ। ‘একমাত্র পাখমারা গণক এখানে কোষ্ঠী বানাবার কাজ করেন।’
‘জানি। কিন্তু ও তো বিপ্রই নয়। ও শুদ্র। আর তাছাড়া সকল বৃত্তি সকলের জন্য নয়। এমনকী শ্রোত্রীয় ব্রাহ্মণদেরও অধিকার নেই চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিদ্যার চর্চায়। পাখমারা গণক শুভ্র হয়ে কীভাবে জ্যোতিষচর্চা করে? এই অন্যায় এই মুহূর্তে বন্ধ হোক। আপনি আদেশ দিন। আর আপনি যদি জিভকাটির মন্দির একান্তই ভাঙতে অসমর্থ হোন তবে পণ্ডিতদের দিয়ে বঙ্গদেশে যত খনার পুঁথি আনা সম্ভব তা আমার কাছে নিয়ে আসুন। আমি সব পুঁথি প্রজ্জ্বলন করব। আমি চাইনা এইসব ভ্রান্ত পুঁথি আর ভবিষ্যতের জ্যোতিষীরা পাঠ করে ভ্রান্ত শিক্ষা নিক।’
‘আমি তার উদ্যোগ নিশ্চয়ই করব,’ গোপীচরণ মল্লিক আশ্বাস দিল। ‘আমাকে তিন মাস সময় দিন। তবে পাখমারা গণককে আমার তালুকে থাকতে গেলে ওকে এই গণক বৃত্তি এই মুহূর্তে ত্যাগ করতে হবে।’
‘আয়ুষ্মান ভব,’ সত্যঠাকুর প্রসন্ন হয়ে আশীর্বাদ করল।
সেদিনই গোপীচরণ মল্লিক ফিরে চলল। নদীপথে ফিরতে ফিরতে গোপীচরণ মল্লিক ভাবছিল কেন বারাণসীর এই জ্যোতিষী খনার নাম ও তার লেখা পুঁথি একেবারে ধ্বংস করার জন্য বদ্ধপরিকর?
