পাথরের দাঁড়কাক – এহসান চৌধুরী
পাথরের দাঁড়কাক
‘দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ, হোরাশিও, হুইচ ইজ বিয়ন্ড ইয়োর এক্সপেকটেশন,’ এক মুখ সিগারের ধোঁয়ার সাথে কথাগুলো ছুঁড়ে দিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু লোকমান হোসেন। পেশায় ব্যবসায়ী, নেশায় শিকারী। বিগ গেম হান্টার। কথা হচ্ছিল তারই বাড়িতে-রাজধানীর অভিজাত এলাকায়। ছাড়া ছাড়া বাড়িগুলোয় নির্জনতা থাকলেও দারোয়ান, চাকরবাকর ও নাইটগার্ডের কমতি নেই। প্রশস্ত রাজপথে সারারাত মার্কারির আলো-দিনের আমেজ এনে দেয়। তবুও এর মাঝে সেই ঘটনা, যা বন্ধু লোকমানকে বিব্রত করে তুলেছিল।
কথা হচ্ছিল ওরই তেতলার বিশাল ড্রইংরুমে, কম্বাইন্ড হ্যান্ড মতলুব খানিক আগেই আমাদের সামনে ধূমায়িত কফির কাপ রেখে গেছে। সঙ্গে ক্রীমক্রাকার বিস্কুট। জানালার ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ড গোটানো। একটু আগেই সন্ধ্যা নেমেছে মৃদুমন্থর পায়ে। পড়ি পড়ি করেও শীত এখনও পড়েনি। শেষ হেমন্তের কুয়াশা ইতোমধ্যেই রাস্তার বালবগুলোকে ঢেকে দিয়েছে আবছা সাদা চাদরে।
হলরুমের এককোণে মেহগনি কাঠের বিশাল শো-কেসের উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয়: ‘পাথরের দাঁড়কাক’। তা ছাড়া হলরুমের দেয়ালে বাইসনের মাথা, বাঘের স্টাফ করা মুখ, চিতার ট্যান করা চামড়া ইত্যাদি এক নজরেই গৃহস্বামীর শিকারের নেশার পরিচয় দেয়। এই শিকারের মোহেই আমার বন্ধুটি অবিবাহিত রয়ে গেছে, যদিও বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই করছে এখন।
যা হোক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি। যত নষ্টের মূল ওই পাথরের দাঁড়কাক। কুচকুচে কালো রঙ। দুটো লালরঙের চুনী পাথর দিয়ে গড়া চোখ। প্রথম দর্শনেই মনে হবে ক্রূর তীব্র দৃষ্টিতে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে পাখিটা। মাস দুয়েক আগে আসামের জঙ্গলে বুনো হাতি শিকার করতে গিয়ে কোন এক উপজাতীয় মন্দির থেকে তুলে এনেছিল লোকমান। শো-পিস হিসাবে সাজিয়ে রেখেছিল ড্রইংরুমে। দিনকাল নির্বিবাদেই বেশ কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে গতরাতে ঘটে গেছে ব্যাপারটা। রাত প্রায় দেড়টার দিকে কাঁচের শার্সিতে খস্ খস্ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় লোকমানের। ভেবেছিল চোরটোর হবে হয়তো। সাহসী মানুষ, বিছানার ধারে রাখা লোহার রড নিয়ে চুপচাপ উঠে গিয়েছিল ড্রইংরুমে ব্যাপারটা দেখতে।
আওয়াজ আসছে ড্রইংরুমের পশ্চিমের জানালার ওপরে কাঁচের শার্সি থেকে। কে ধাক্কা দিচ্ছে ওপাশ থেকে। ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ড নামানো থাকায় ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না ব্যাপারটা। তবে ওধার থেকে রাস্তার আলো আসায় ছায়া ছায়া কী যেন একটা বস্তুকে দেখা গেল জানালার ফ্রেমে বসে থাকতে। লোকমান অবাক। ওদিকে সানশেড নেই-খাড়া দেয়াল। কীভাবে তিনতলা পর্যন্ত উঠে এল ওটা? লোকমান দ্রুতহাতে ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ডটা তুলে দিতেই রাস্তার আলোয় যা দেখল, তাতে তার মত সাহসী মানুষও ভয়ে আর্তচিৎকার না করে পারেনি। দেখল বিশাল এক হিংস্র দাঁড়কাক ডানা দিয়ে ঝাপ্টা দিচ্ছে কাঁচের শার্সিতে। তার লাল চুনীর মত চোখ দুটো জ্বলছে ক্রুদ্ধভাবে। লোকমানের চিৎকারে বিশাল ডানা বাতাসে ভাসিয়ে উড়ে গেল সেটা। মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।
লোকমানের গতরাতের অভিজ্ঞতা মোটামুটি এই। তবে আমার কাছে তা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। কারণ বরাবর সন্ধ্যার পর ‘জলপথে ভ্রমণ করা তার অভ্যাস। হয়তো গতকাল মাত্রাটা বেশি হয়ে গিয়েছিল, তাই এই দৃষ্টিভ্রম! যা হোক, আমি বিষয়টাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিলাম না বলে লোকমান হয়তো ক্ষুণ্ণ হলো। তবুও তাকে আশ্বাসবাণী শুনিয়ে পাথরের দাঁড়কাকটাকে ভালভাবে পরীক্ষা করে সেদিনের মত বিদায় নিলাম আমি। তবে সেই কালো পাথরের দাঁড়কাকটা, যার দুই চোখ মূল্যবান লাল চুনীখচিত, শিল্প হিসাবে অতুলনীয়-একথা আমি কেন, যে কেউ স্বীকার করবে সন্দেহ নেই।
সপ্তাহখানেকের মধ্যেই টেলিফোন পেলাম অফিসে। দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে লোকমান বাড়িতে। আমাকে বারবার দেখা করার অনুরোধ করল। তাই অফিস ছুটির পর একটা বেবীট্যাক্সী ধরে সরাসরি চলে গেলাম তার বাড়িতে। তিনতলায়, তার শোবার ঘরে পৌঁছে দেখলাম বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে সামনে স্কচের বোতল খুলে বসেছে। আমাকে বিছানায় বসেই অভ্যর্থনা জানাল, ‘আয়, জহির। একা একা খুব বোর ফিল করছিলাম।’
‘ঘটনা কী?’ আমি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাই।
‘আর বলিসনে, দোস্ত! ওই দাঁড়কাকটা—দ্যাট বাস্টার্ড-সেদিন রাতে সিঁড়িতে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল!’
‘কে ফেলে দিয়েছিল?’
‘ওই দাঁড়কাকটা।’
‘বলিস কী?’
‘হ্যাঁ, ক্লাব থেকে ফিরেছি রাত দেড়টার দিকে। লিফট অচল। সিঁড়ির বালবটা কয়েকদিন ফিউজ। কোন রকমে হাতড়ে হাতড়ে উঠছিলাম এমন সময় ছাদের খোলা দরজা দিয়ে জমাট অন্ধকারের স্তূপের মত ওটা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওটার ডানার ধাক্কায় গড়িয়ে পড়েছিলাম কয়েকটা সিঁড়ি। কনুইতে, কোমরে বেশ চোট পেয়েছি। তবে ভাগ্য ভাল, কোন ফ্রান্চার হয়নি।’
‘কী যা তা বকছিস! নিশ্চয়ই সেদিন আনব্যালান্সড ছিলি। ক্লাবে গেলে তোর তো জ্ঞান থাকে না।’
‘না রে, দোস্ত, না। সেদিন খুব বেশি পান করিনি। তা ছাড়া যাই টানি না কেন, মাত্রা ছাড়িয়ে কখনও বেহুঁশ হইনি কোনদিন। তা ছাড়া…’
‘তা ছাড়া কী?’
‘ওই বাস্টার্ডটা প্রতিরাতে জানালায় এসে আমাকে ভয় দেখায়। আজকাল হাতের গোড়ায় লোডেড বন্দুক রেখে দিই। গুলি করে শেষ করে দেব।’
লোকমানের কথাবার্তায় অসংলগ্নতার সুর ধরা পড়েছিল সেদিন।
এর মাসখানেক পরের ঘটনা। রাতে বাসায় লোকমানের টেলিফোন পেয়ে ছুটতে হলো আবার। গিয়ে দেখি মহা ঝামেলা বাধিয়ে বসে আছে। থানা পুলিশের ব্যাপার। রাত দশটার দিকে তিনতলার জানালা দিয়ে পর পর দু’তিনটে গুলি ছুঁড়েছিল সে। ফলে চারদিকে হৈ চৈ। থানায় টেলিফোন যায় একের পর এক। সঙ্গে সঙ্গে একজন এস.আই পুলিশ নিয়ে আসেন এনকোয়ারিতে। এতক্ষণ লোকমানের স্টেটমেন্ট নেওয়া হচ্ছিল। আমি পৌঁছাতে আমারও স্টেটমেন্ট নেওয়া হলো।
লোকমানের সেই একই কথা, সেই দাঁড়কাক। অতিপ্রাকৃত ব্যাপার। যার কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সুতরাং এস.আই তাকে প্রথম বারের মত সতর্ক করে সদলবলে বিদায় নিলেন।
তিনি চলে যাওয়ার পর বিমর্ষ লোকমান আমাকে বলল, ‘ব্যাপারটা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না, জহির। অথচ প্রতিরাতেই এটা ঘটছে।’
‘ওটা তোর মনের ভুল। হ্যালুসিনেশনে ভুগছিস তুই। ভাল কোন ডাক্তার দেখা।’
‘তুই বিশ্বাস করছিস না? অথচ গতরাতে ওটা জানালা ভাঙার চেষ্টা করছিল।’
‘বলিস কী? তা হলে ওই অপয়া দাঁড়কাকটা রেখেই যখন তোর এই দুর্গতি, তখন ওটা বিক্রি করে দে বা যাদুঘরে দিয়ে দে।’
‘তাও পারছি না। কেমন যেন নেশা ধরে গেছে ওটার উপর। একদিনও না দেখে থাকতে পারি না।’
‘তা হলে এই ঝামেলা সহ্য করবি?’
‘আর নয়! এবার গুলি মিস হবে না। শেষ করে ফেলব ওই অপচ্ছায়াটাকে।’
‘যা খুশি কর!’
সেদিনকার মত বিদায় নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম পুরোমাত্রায় ড্রিঙ্ক করে ও নিজেই সবসময় ইলুশনে ভোগে। ফলে এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটা বিচিত্র কিছু নয়।
এর মাসখানেক পরের ঘটনা। লোকমানের জরুরী টেলিফোন পেলাম এবং সাথে সাথে দৌড়ালাম ওর বাড়ি। আমাকে যথারীতি সাদর অভ্যর্থনা করে ওর ড্রইংরুমে বসাল। কম্বাইন্ড হ্যান্ড মতলুব সন্ধ্যায় যথারীতি চা-নাস্তা পরিবেশন করল আমাদের। সান্ধ্য কফি পান শেষে লোকমান সিগার ধরাল।
‘কী ব্যাপার, হঠাৎ তলব?’
‘আছে, দোস্ত, কারণ আছে! এমনি তোকে আসতে বলিনি।’
‘তোর সেই অলৌকিক দাঁড়কাকের খবর কী?’
‘মাঝে মাঝে আসে। আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টাও করে। তবে আজকাল আমি ভয় পাই না। সবসময় হাতের কাছে লোডেড রাইফেল রাখি। বেটা বুঝতে পেরেছে। যা হোক, এই ডায়ারিটা পড়-মনে হয় আমি কাজটা ভাল করিনি।’
লোকমান ব্রিকরেড মলাটওয়ালা একটা ডায়ারি এগিয়ে দিল আমার দিকে পাতায় ফ্ল্যাগ মার্ক করা। নির্দিষ্ট অংশটা পড়তে থাকলাম।
‘….আদিবাসীদের যে গ্রামটায় আমি আতিথ্য নিয়েছিলাম, সেটি আসামের দুর্গম অঞ্চলে। উদ্দেশ্য হাতি শিকার। শুনেছিলাম এই অঞ্চলে এক দলছুট ‘বদমাশ’ হাতি যথেচ্ছ অত্যাচার করে বেড়াচ্ছে। মানুষজনও কয়েকজন মেরেছে। গ্রামপ্রধানের জংলা কুঁড়ে ঘরে দিনতিনেক কাটিয়ে দিলাম হাতির খোঁজে। শেষ দিন প্রচণ্ড ঝড়পানির রাতে দূর এক জংলী পোড়ো মন্দিরে আটকা পড়লাম। প্রচণ্ড পরিশ্রম ও ক্ষুধায় অবসন্ন, কাতর। শরীর চলে না। মন্দিরের দরজা বন্ধ। অনেক ধাক্কাধাক্কির পর দরজা খুলে দিল এক উদ্ভিন্নযৌবনা আদিবাসী দেবদাসী। মন্দিরের মিটমিটে আলোয় তার রূপযৌবন দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। মেয়েটি আমার ঝোড়োকাকের মত দীর্ণ বিধ্বস্ত চেহারা দেখে যথেষ্ট সহানুভূতি দেখাল। মন্দির সংলগ্ন ছোট্ট এক কুঠুরিতে আশ্রয় দিল। সামান্য ফলমূল, ছাগলের দুধ দিয়ে ইশারায় অতিথি সৎকারে কার্পণ্য করেনি সে। আমার খাওয়া শেষে দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে পড়ার ইঙ্গিত করে চলে গেল অন্য কোথাও।
ক্লান্ত শরীরে তখন রাজ্যের ঘুম নেমে আসার কথা। কিন্তু ঘুম এল না। বারবার সেই মেয়েটির যৌবন ডাক দিচ্ছিল চোখের সামনে। নিজেকে বহু চেষ্টা করেও বশে আনতে পারিনি আমি। বাইরে তখন ঝড়বৃষ্টি বজ্রের প্রচণ্ড দাপাদাপি-সেই দাপাদাপি আমার শরীরের স্নায়ুতে। পারলাম না কিছুতেই। চোরের মত পা টিপে টিপে ঘর থেকে মূল মন্দিরের ঘরে ফিরলাম। প্রদীপের ম্লান আলোয় দেখলাম আমার কামনার বস্তুকে। সে তখন মন্দিরের মেঝেতে চাটাই পেতে শুয়ে-গভীর নিদ্রামগ্ন। তারপর যা ঘটার তাই ঘটল। বাধা দিয়েছিল মেয়েটি; কিন্তু দুর্ধর্ষ শিকারী লোকমান হোসেনকে ঠেকানোর ক্ষমতা ছিল না তার।
ভোরের আলো ফোটার আগেই অজ্ঞান, অচেতন মেয়েটিকে ফেলে রেখে পালিয়ে এসেছিলাম আমি। এবং আসার সময় কী ভেবে মন্দিরের বেদীতে রক্ষিত কালোপাথরের দাঁড়কাকটি আমার ঝুলিতে ভরে নিয়ে এসেছিলাম। দাঁড়কাকটির শিল্পসুষমা দেখে আমি লোভ ছাড়তে পারিনি-যদিও জানি এটি চুরি, এটি অন্যায়, এটি আমার জন্য অনুচিত কাজ…’
‘কীরে, পড়লি সবটা?’
‘হুঁ! কাজটা ভাল করিসনি, দোস্ত!’
‘জানি! তবে সে রাতে, সে অবস্থায় মাথার ঠিক ছিল না আমার। এখন মনে হচ্ছে ওটা ওভাবে না আনলেও চলত। হয়তো ওর সঙ্গে কোন তন্ত্রমন্ত্র বা অভিশাপ জড়িয়ে আছে।’
‘যাদুঘরে দিয়ে দে। ঝামেলার কী দরকার?’
‘না। আমি এর একটা হেস্তনেস্ত দেখতে চাই। হয় ওটা থাকবে, নয় আমি।’
‘আমি উঠি, দোস্ত! রাত হয়ে যাচ্ছে।’
‘এখনি? খেয়ে দেয়ে যাবি একেবারে। মতলুব হাঁসের ভুনা খিচুড়ি করেছে। চমৎকার করে আইটেমটা। তোকে ড্রাইভার পৌঁছে দিয়ে আসবে-বসে থাক।’
লোকমানের অনুরোধ ঠেলতে পারলাম না। রাত দশটা সাড়ে দশটা নাগাদ গল্পগুজব করে আমরা রাত এগারোটায় ডাইনিং টেবিলে বসলাম। একথা সেকথায় খাওয়া শেষ হলো রাত বারোটায়। পুনরায় ড্রইংরুমে কফি দিয়ে গেল মতলুব। লোকমান গাড়ি করে পৌঁছে দেবে-সুতরাং নিশ্চিন্ত ছিলাম।
এমন সময় ঘটল ঘটনাটা। দপ্ করে আলো চলে গেল সারা এলাকার। লোডশেডিং। শুধুমাত্র রাস্তার মার্কারি আলো জ্বলছিল। এবং সেই আলোয় দেখলাম অতিকায় কালোছায়ার মত একটা দাঁড়কাক সামনের জানালার চৌকাঠে বসে প্রচণ্ড পাখার ঝাপটা দিল কাঁচের শার্সিতে। ভয়ে প্রথমে আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। পাশে শুনলাম লোকমানের দৃপ্ত কণ্ঠ, ‘ইউ ডেভিল বাস্টার্ড! আজ তোকে খতম করবই।’
চোখের নিমিষে ঘটে গেল ঘটনাটা। সোফার পাশ থেকে লোডেড রাইফেল তুলে নিয়ে লোকমান সেই ছায়ামত দাঁড়কাকটাকে লক্ষ্য করে পর পর দুই রাউন্ড গুলি করে বসল। সাথে সাথে বিকট অপার্থিব ও ভয়ঙ্কর চিৎকার তুলে উড়ে গেল সেই ছায়ামূর্তি। অদৃশ্য হয়ে গেল আকাশের অন্ধকারে। ওদিকে পর পর দুই রাউন্ড রাইফেলের প্রচণ্ড শব্দ, জানালার কাঁচ ভাঙার আওয়াজ এবং সেই অপার্থিব রক্ত হিম করা আর্তনাদ-সব মিলে যে নারকীয় ঘটনা সৃষ্টি হলো; তার ফলে সাইরেনের বাঁশী বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি ঢুকল পাড়ায়। শুরু হলো এনকোয়ারি। সেইসাথে জবানবন্দী নেওয়া হলো আমাদের। এনকোয়ারি শেষে রাইফেল সীজ্ করে নিয়ে গেল পুলিশ। পরদিন সকালে থানায় দেখা করার নির্দেশ দিয়ে গেল।
তারপর অনেক ঝুটঝামেলা গেল দুজনের উপর দিয়ে। লোকমান তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায়, তাকে পাঠানো হলো মানসিক হাসপাতালে। সেই শেষবারের মত তার বাড়ি যেতে হয়েছিল আমাকে। ড্রইংরুমে রক্তাক্ত চুনীচোখের পাথুরে দাঁড়কাকটা দাঁড়িয়ে ছিল শো-কেসের উপর। দেখলাম তার বুকে গোল গোল সাদা দুটো স্পট সম্ভবত নতুনই দেখলাম। আর তার লাল চোখ দুটোয় বিদ্রূপের হাসি।
এহসান চৌধুরী
