ধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত

কামাখ্যা সাহেব – কাজী শাহনূর হোসেন

কামাখ্যা সাহেব

চায়ের কাপে চামচ নাড়ার টুং টাং শব্দ।

‘সাঈদ ভাই, তুহীনের ব্যাপারে আপনি কিছু একটা করুন।’

‘কেন, রেজার কী হয়েছে?’

‘জানেনই তো, আপনার বন্ধু সারাদিন শুধু কাজ নিয়ে ব্যস্ত। খালি লেখা আর লেখা।’

‘ও নামী মানুষ। গুণী লেখক।’

‘ওকে আমি এসব ব্যাপারে বিরক্ত করতে চাই না। কামাখ্যা সাহেব না কী ও এসবের মাথা-মুণ্ডু কিছু বুঝতেও পারবে না। তা ছাড়া এসব কাজে পুরুষমানুষের দরকার।’

ঘরের ভেতর আরামদায়ক, নিশ্চিন্ত পরিবেশ। লম্বা পা দু’খানা ছড়িয়ে দিয়ে আয়েশ করে বসল সাঈদ। রুমা যখন ঘ্যান ঘ্যান করে তখনও ওর মধ্যে আশ্চর্য এক স্নিগ্ধতা খুঁজে পায় ও। শেষ বিকেলের আলোয় ওর ঢেউ খেলানো চুলগুলো অপূর্ব লাগছে। নীলচে সুতি শাড়ি আর লাল ব্লাউজে চমৎকার মানিয়েছে ওকে।

ছোট্ট এক ঘূর্ণিঝড় প্রচণ্ড বেগে ঘরে প্রবেশ করে থমকে গেল, রুমা যখন বলল, ‘তু-হী-ন! সাঈদ চাচাকে স্লামালেকুম বলেছ?’

সালাম দিয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পাঁচ বছরের তুহীন।

‘সাঈদ ভাই…’ রুমা যুগিয়ে দিল।

সিধে হয়ে বসল সাঈদ, মুখে পরে নেয়ার চেষ্টা করল গাম্ভীর্যের মুখোস।

‘হ্যাঁ, তুহীন,’ বলল সে, ‘কোথায় চললে অমন ঝড়ের বেগে?’

‘কামাখ্যা সাহেবের কাছে। সে সন্ধের দিকেই বেশি আসে।’

‘তোমার মার কাছে কামাখ্যা সাহেবের কথা শুনলাম। খুব মজার মানুষ বুঝি?’

‘হ্যাঁ, দারুণ, সাঈদ চাচা। ওর না ইয়া লম্বা একটা লাল নাক, হাতে লাল দস্তানা, লাল লাল চোখ- কাঁদলে যেমন হয় তেমন না, সত্যিকারের লাল- লাল লাল দুটো ডানাও আছে, ঝাপটাতে পারে। ইস, উড়তে পারলে আরও মজা হত। আর কী সুন্দর করে যে কথা বলে যদি শুনতেন। উফ্!’ তুহীনের অভিব্যক্তিতে বোঝা গেল কামাখ্যা সাহেব অসাধারণ একটা কিছু।

‘কামাখ্যা নামটা খুব মজার, তাই না, তুহীন?’

‘হ্যাঁ, আর মানুষটা আরও মজার। মানুষ নাকি ইটির মত কে জানে।’

‘সাঈদ ভাই!’ চোখ রাঙাল রুমা। ‘আপনি দেখছি ওকে আরও লাই দিচ্ছেন। ও তো ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছে। তুমি তো ঠাট্টা করছ আমাদের সাথে, তাই না, তুহীন?’

‘না, আম্মু। কামাখ্যা সাহেব সত্যি সত্যি আছে।’

‘রুমা, তুমি— শোনো, তুহীন বাবু। আমি তোমার কথা ঠিকই বিশ্বাস করি, তোমার আম্মু করুক আর না করুক। এক কাজ করো না, আমাদেরকেও ওই বাগানটাতে নিয়ে চলো, আমরাও তোমার কামাখ্যা সাহেবকে দেখি। তখন দেখা যাবে তোমার আম্মু কী বলে।’

‘উঁহুঁ,’ মাথা নেড়ে বলল তুহীন। ‘কামাখ্যা সাহেব মানুষ-জন পছন্দ করে না। শুধু বাচ্চা ছেলেদের ভালবাসে। আমাকে বলে দিয়েছে আমি যদি কাউকে তার কাছে নিয়ে যাই তা হলে গুংগাকে বলে দেবে। গুংগা খুব খারাপ। ও আমাকে মেরে ফেলবে। আমি এখন যাই।’ ঘূর্ণিঝড়টা পরমুহূর্তে উধাও হয়ে গেল।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুমা। ‘আপনার সামনে তাও তো অনেক কথা বলল আমাকে তো নামটা ছাড়া আর কিছুই বলতে চায় না। তবে এটা বলেছে, কামাখ্যা সাহেব নাকি গুংগার নাম করে ভয় দেখায়। আমিও কায়দা পেয়ে গেছি। খাবে না কিংবা দাঁত ব্রাশ করবে না শুধু গুংগার নাম উচ্চারণ করলেই হলো!’

উঠে পড়ল সাঈদ। ‘চিন্তার কিছু আছে বলে তো মনে হলো না। ওর কামাখ্যা সাহেব ক্ষতির চেয়ে লাভই বেশি করবে। বাচ্চারা কল্পনাশক্তি কাজে লাগালে ভালই তো, বুদ্ধি খোলতাই হবে।’

‘আমার তো কামাখ্যা সাহেব, কামাখ্যা সাহেব শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। আপনাকে শোনালে বুঝতেন- ‘

হেসে উঠল সাঈদ। ‘আজ চলি। সিরিয়াসলি, রেজাকে ওর সাথে কথা বলতে বলো না।’

অসহায়ের মত দু’হাত ছড়িয়ে দিল রুমা।

‘বুঝতে পেরেছি। আমাকেই সামলাতে হবে।’

.

সেদিন বিকেলে খোশমেজাজে পাওয়া গেল কামাখ্যা সাহেবকে। সারাক্ষণ ঝটপট করতে লাগল তার ডানা দুটো। এর অর্থ, ভিনগ্রহ থেকে বন্ধু আসবে দেখা করতে, জানাল কামাখ্যা সাহেব।

আজব আজব সব বন্ধু-বান্ধব রয়েছে কামাখ্যা সাহেবের। বিচিত্র সব কাণ্ড- কারখানা ঘটায় তারা। এজন্যেই সাদামাঠা মানুষ-জন পছন্দ করে না সে। অদ্ভুত কীর্তিকলাপ দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে কিনা।

কামাখ্যা সাহেবের এক বন্ধু টাইম মেশিনে করে পাঁচশো-একহাজার বছর অতীতে কিংবা ভবিষ্যতে চলে যেতে পারে। প্রায়ই তার সাথে ঘুরতে যায় কামাখ্যা সাহেব, আর ফিরে এসে গল্প বলে পাঁচশো বছর আগে ঠিক এই মুহূর্তে কী ঘটেছিল। আরেক বন্ধু তো আরও অদ্ভুত। মহাশূন্যের প্রত্যেকটা গ্রহের সাথে রেডিও যোগাযোগ আছে তার— যখন খুশি ভিনগ্রহের বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-গুজব করে। কিন্তু হ্যাঁ, ওরা যেমন আছে তেমনি গুংগাও আছে। কারও বন্ধু নয় সে, এমনকী কামাখ্যা সাহেবেরও না।

সন্ধে লেগে এসেছে, কিন্তু আম্মু এখনও লোক পাঠায়নি। কাজেই আরও কিছুক্ষণ কামাখ্যা সাহেবের সাথে থাকতে পারবে তুহীন। মনটা খুশি হয়ে উঠল ওর।

কামাখ্যা সাহেব তার রক্তচক্ষু দুটো স্থাপন করল তুহীনের চোখে। ‘তুহীন, চলো আজ তোমাদের বাসায় যাই।’

‘কিন্তু বাসায় তো লোকজন থাকে। আপনি তো লোকজন-’

বারো দিন হলো কামাখ্যা সাহেবের সাথে মিশছে তুহীন। কখনও তো সে বাসায় যেতে চায়নি। আজ কেন চাইছে মাথায় এল না তুহীনের।

‘হ্যাঁ, পছন্দ করি না। তাই তো তোমাদের বাসায় যেতে চাইছি। কই এসো, না হলে কিন্তু-’

কী আর করা, গুংগার নামটা শুনতেও যেহেতু রাজি নয় তুহীন?

থাই অ্যালুমিনিয়ামের জানালা গলে বাবার লেখার ঘরে ঢুকে পড়ল তুহীন। সবাইকে নিষেধ করা আছে না ডাকলে কেউ ওঘরে যাবে না। কিন্তু কামাখ্যা সাহেবের বেলায় তো আর এসব নিয়ম-কানুন খাটে না। আর বিশেষ করে সে তো এঘরেই আসতে চেয়েছে।

বাবা গভীর মনোযোগে লেখার কাজে ব্যস্ত। কামাখ্যা সাহেব সন্তর্পণে একটা টেবিলের কাছে গিয়ে নিঃশব্দে ড্রয়ারটা খুলে ফেলল। ভেতর থেকে বের করে নিল কী একটা যেন।

বাবা কী জন্যে হঠাৎ মুখ তুলতেই দেখতে পেল তুহীনকে। খেপে উঠতে যাচ্ছিল সে: ‘কী ব্যাপার? তুমি এখানে যে? তোমাকে না বলেছি যখন তখন এঘরে আসবে না—’

পরিচয় পর্বটুকু বিনয়ের সাথে সারতে হয়। ‘বাবা, এই যে কামাখ্যা সাহেব। দেখো না কেমন লাল লাল পাখা ওনার-’

ড্রয়ার থেকে বের করা পিস্তলটায় ততক্ষণে সাইলেন্সার জোড়া হয়ে গেছে। বাবার কপালে সই করে একটামাত্র গুলি করল কামাখ্যা সাহেব। সামনের দিকে স্বচ্ছ খুদে এক ফুটো তার পেছনে মস্ত বড় এক গর্ত তৈরি করল বুলেটটা। মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল বাবা।

‘শোনো, তুহীন,’ বলল কামাখ্যা সাহেব, ‘এখানে অনেক লোক আসবে। তোমাকে নানা রকম প্রশ্ন করবে। তুমি এঘরে যা দেখেছ তাই বলবে কেমন, নইলে আমি কিন্তু গুংগাকে পাঠাব তোমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।’

কামাখ্যা সাহেব এবার জানালা গলে পা রাখল মেটে পথে।

.

‘অদ্ভুত ব্যাপার, ইন্সপেক্টর,’ ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন। ‘সাইকিয়াট্রির ওপর আমার কিছু পড়াশোনা আছে। এক্সপার্টরা মতামত দেয়ার আগে আমি আপনাদেরকে একটা সূত্র দিতে পারব আশা করি। বাচ্চাটা বলছে কামাখ্যা সাহেব নামে ওর ভিনগ্রহের বন্ধুটা রেজা সাহেবকে গুলি করেছে। এর দু’রকম অর্থ করা যায়। প্রথমটা হলো, ভদ্রলোক আত্মহত্যা করেছেন, কিন্তু বাচ্চাটা চোখের সামনে এরকম বীভৎস দৃশ্য দেখে ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি, মনগড়া একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে। আর আরেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, ছেলে নিজেই বাপকে খুন করেছে। তারপর বলির পাঁঠা হিসেবে কামাখ্যা সাহেব নামে এক অলৌকিক ভিনগ্রহবাসীর অবতারণা করেছে। দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটার আরও মারাত্মক অর্থও করা যেতে পারে। ছেলেটা হয়তো বাপকে পছন্দ করত না, বাপের বিকল্প তৈরি করেছিল মনে মনে, এবং শেষে সেই বিকল্পকে ব্যবহার করে বাবাকে সরিয়ে দেয় দুনিয়া থেকে। আমার বুদ্ধিতে যা কুলোল তাই বললাম। এখন আপনারা দেখুন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, পিস্তল এগুলো পরীক্ষা করে এক্সপার্টরা কী রায় দেয়। কে খুন করল, কী তার মোটিভ আপনারাই ভাল বুঝবেন…’

.

লাল নাক, চোখ, দস্তানা আর ডানার অধিকারী লোকটা পেছনের পথ দিয়ে আলগোছে নিজের বাড়িতে চলে এল। ভেতরে ঢোকা মাত্র কোটটা খুলে ফেলল সে। কলকব্জা আর রবার দিয়ে তৈরি ডানা দুটো খসিয়ে ফেলল। জিনিসগুলোকে সোজা গ্যাসের চুলোয় চড়াল ও। আগুন ভাল মত ধরলে, দস্তানা জোড়া তাতে ফেলে দিল। এবার নাকটার ব্যবস্থা করল ও, ভাল মত ঘষতে বাইরের লালচে পুটিংটুকু মিলিয়ে গিয়ে স্বাভাবিক বাদামী রংটা বেরিয়ে এল। দেয়ালের ফাটলটায় ওটা সাঁটিয়ে ঘষে মসৃণ করে দিল ও। এবার বাদামী চোখজোড়া থেকে লাল টুকটুকে কন্ট্যাক্ট লেন্স দুটো খুলে কিচেনে চলে এল। একটা হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে স্রেফ পাউডার হয়ে গেল ওদুটো, তারপর ধুয়ে চলে গেল সিঙ্ক বেয়ে।

একটা ড্রিঙ্ক ঢালল সাঈদ, এবং অবাক হয়ে আবিষ্কার করল ড্রিঙ্কের কোনও প্রয়োজন নেই। কিন্তু ক্লান্তি বোধ করছে সে। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ঘটনার আদ্যোপান্ত ভেবে দেখতে পারে ও। সেই কামাখ্যা সাহেবের উদ্ভাবন থেকে আরম্ভ করে আজকের সাফল্য বিচার করে দেখবে ও। তারপর অদূর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখবে তারিয়ে তারিয়ে: সুন্দরী-গুণবতী রুমা যখন গোলাম রেজার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে ওর ঘর আলো করতে আসবে। বিধবা মেয়েটিকে উদ্ধার করলে লোকে যেমন বাহবা দেবে, তেমনি বাপ মরা বাচ্চাটা একজন সত্যিকারের পুরুষমানুষকে বাবা হিসেবে পাবে।

বেডরুমে গিয়ে ঢুকল সাঈদ। তারপর ভূত দেখার মত চমকে উঠল। বিছানায় কে ওটা?

নিথর দাঁড়িয়ে রইল ও।

‘কামাখ্যা সাহেব না?’ বদ্ধ ঘরে গমগম করে উঠল গুংগার কণ্ঠস্বর।

কাজী শাহনূর হোসেন
(বিদেশী গল্প অবলম্বনে)